📄 কুরআনের অতিরিক্ত ওহি : সাহাবিদের বুঝ
তাবিয়ি আলকমা (রাহ.) বলেন, আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) হাদীসে নিষিদ্ধ কিছু কাজ সম্পাদনকারী নারীর উপর অভিশাপ করেন। তখন বনি আসাদের উম্মু ইয়াকুব নামের এক মহিলা এসে তাঁকে বলেন, আপনি নাকি এই এই নারীর উপর অভিশাপ করেন? তিনি বলেন, কেন তাকে অভিশাপ করব না, যাকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অভিশাপ করেছেন? যার কথা আল্লাহর কিতাবে আছে? তখন ওই মহিলা বলেন, আমি পুরো কুরআন পড়েছি। কিন্তু আপনি যা বলছেন তা তাতে কোথাও পাইনি। ইবন মাসউদ (রা.) বলেন, তুমি যদি কুরআন পড়তে তবে অবশ্যই পেতে। তুমি কি পড়োনি, মহান আল্লাহ বলেছেন :
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا .
“যা রাসূল নিয়ে এসেছেন তা গ্রহণ করো। আর তিনি যা নিষেধ করেছেন তা বর্জন করো।?”১১৯
তখন মহিলাটি বললেন, অবশ্যই। ইবন মাসউদ (রা.) বললেন, জি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এগুলো সম্পর্কে নিষেধ করেছেন। ১২০
দেখুন, আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) এ আয়াতটিকে হাদীসের প্রামাণ্যতার পক্ষে-হাদীসের ওহি হওয়া, শরীআতের দলীল হওয়ার পক্ষে-প্রমাণ হিসাবে পেশ করছেন এবং হাদীসের বিধিবিধানকে কুরআনে থাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য করছেন। কিন্তু হাদীস অস্বীকারকারী সম্প্রদায় আয়াতের এ ব্যাখ্যা মানেন না। তারা বলেন, এ আয়াত হাদীসের প্রামাণ্যতার দলীল নয়। কেননা আয়াতে বলা হয়েছে, 'রাসূল যা নিয়ে এসেছেন তা গ্রহণ করো। আর তিনি যা নিষেধ করেছেন তা বর্জন করো।' রাসূল নিয়ে এসেছেন কুরআন আর কুরআনের আদেশ-নিষেধই তিনি প্রচার করেছেন। সুতরাং এ আয়াতের মর্ম হচ্ছে, তোমরা রাসূলের নিয়ে আসা কুরআনকে আঁকড়ে ধরো। এর বাইরের কিছু মান্য করার কথা এ আয়াত দ্বারা বোঝা যায় না।
কিন্তু আমরা তো কিছুতেই এ কথা মানতে পারি না যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবিদের থেকে এইসব হাদীস অস্বীকারকারী ব্যক্তিবর্গ কুরআনের মর্ম ভালো বোঝেন। কুরআন নাযিল হয়েছে তাঁদের সামনে, তাঁরা রাসূলের কাছ থেকে তার ব্যাখ্যা শিখেছেন, তাঁরাই কুরআনের বিশুদ্ধ মর্মের উপর সব থেকে নিখুঁতভাবে আমলকারী, যে কারণে আল্লাহ তাআলা আল কুরআনে তাঁদের উপর নিজের সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়েছেন। উপরন্তু এই ব্যাখ্যা তো সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, যাঁর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
مَا حَدَّثَكُمْ ابْنُ مَسْعُوْدٍ فَصَدِّقُوْهُ.
ইবন মাসউদ তোমাদেরকে যা বর্ণনা করে তোমরা তা সত্য বলে মেনে নেবে। ১২১
[তাবিয়ি প্রজন্মও সূরা হাশরের ৭ নং আয়াতটি হাদীসের প্রামাণ্যতার পক্ষে দলীল বলে বিশ্বাস করতেন। যেমন তাবিয়ি ইসমাঈল ইবন উবাইদুল্লাহ (রাহ.) বলেন:
يَنْبَغِي لَنَا أَنْ نَحْفَظَ حَدِيثَ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَمَا يُحْفَظُ الْقُرْآنُ لِأَنَّ اللَّهَ يَقُوْلُ: وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ.
আমাদের কর্তব্য কুরআনের মতোই গুরুত্ব দিয়ে হাদীস মুখস্থ ও সংরক্ষণ করা। কেননা মহান আল্লাহ বলেন, রাসূল যা নিয়ে এসেছেন তোমরা তা গ্রহণ করো। ১২২
তাবিয়ি উমাইয়া ইবন আব্দুল্লাহ (রাহ.) আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা.)-কে বলেন, আমরা আবাসের সালাতের কথা এবং ভীতির সালাতের কথা কুরআনে পেয়েছি, কিন্তু সফরের সালাতের কথা তো কুরআনে পাইনি? উত্তরে ইবন উমার (রা.) বলেন:
يَا ابْنَ أَخِي! إِنَّ اللَّهَ بَعَثَ إِلَيْنَا مُحَمَّدًا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَا نَعْلَمُ شَيْئًا فَإِنَّمَا نَفْعَلُ كَمَا رَأَيْنَاهُ يَفْعَلُ.
হে ভাতিজা, আল্লাহ আমাদের নিকট মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাঠিয়েছেন, তখন আমরা তো কিছুই জানতাম না। তাই আমরা তেমন আমল করি তাঁকে যেমন করতে দেখেছি। ১২৩
কুরআনের অতিরিক্ত ওহির ব্যাপারে সাহাবিদের ঈমান-আকীদা এমনই ছিল। আর আমাদেরকে আদেশ করা হয়েছে তাঁদের মতো ঈমান-আকীদা গ্রহণের। তাঁদের বিপরীত ঈমান-আকীদা ধারণকারীর ঈমানের দাবিকে নাকোচ করে দিয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন :
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَا هُمْ بِمُؤْمِنِينَ.
“কিছু মানুষ দাবি করে, আমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান এনেছি; কিন্তু তারা মুমিন নয়।” ১২৪
টিকাঃ
১১৯. সূরা [৫৯] হাশর, আয়াত: ০৭。
১২০. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৪৮৮৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২১২৫。
১২১. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ২৩২৭৬; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ৩৯৯৯। সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস: ৩৯০২। হাদীসটিকে ইমাম তিরমিযি ও ইবন হিব্বান প্রমাণিত বলেছেন।
১২২. খতীব বাগদাদি, আল কিফায়াহ: ১৭; ইবন আসাকির, তারীখ দিমাঙ্ক, ৮/৪৩৬; মিয্যি, তাহযীবুল কামাল, ৩/১৪。
১২৩. মুআত্তা মালিক, হাদীস: ৩৭৫; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ৫৬৮৩; সুনান নাসায়ি, হাদীস: ১৪৩৪; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস: ১০৬৬; সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস: ৯৪৬; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস : ১৪৫১, ২৭৩৫, মুস্তাদরাক, হাদীস: ৯৪৬; জিয়া মাকদিসি, আল আহাদীসুল মুখতারাহ: ১৩/১৩৭। হাদীসটিকে ইবন খুযাইমা, ইবন হিব্বান, হাকিম, জিয়া মাকদিসি প্রমুখ মুহাদ্দিস প্রমাণিত বলেছেন。
১২৪. সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ০৮。