📄 রাসূলের আনুগত্য সর্বকালে আবশ্যক
মহান আল্লাহ তাঁর নিজের আনুগত্যের মতোই তাঁর রাসূলের আনুগত্য ফরয করেছেন। এ আনুগত্য তাঁর দলনেতা বা রাষ্ট্রনেতা হিসাবে নয়, বরং রাসূল হিসাবে। এ বিষয়ক নির্দেশনায় আল কুরআনে সর্বত্র 'রাসূল' শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি মুমিন, রাসূলের রিসালাতে বিশ্বাসী, সে যে দেশ-কালের মানুষই হোক না কেন, তার উপর আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য আবশ্যক। কেননা যে কারো যেকোনো ধরনের নেতৃত্ব তার মৃত্যুর সাথে সাথে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাত তাঁর জীবদ্দশা ও মৃত্যু-পরবর্তী কাল—সর্বকাল পরিব্যাপ্ত।
কেউ কেউ দাবি করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য এবং তাঁর ব্যাখ্যা মান্য করার আবশ্যকতা কেবল তাঁর জীবদ্দশার সাথে সম্পৃক্ত। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর আনুগত্য আবশ্যক নয়। এ কথা কুরআন বিরোধী। কেননা কুরআন আদেশ করেছে, রাসূলের আনুগত্য করো। আর এ রাসূলের রিসালাতের মেয়াদ রেখেছে সর্বকালব্যাপী। কুরআনের কোনো একটি আয়াতে ইশারায়ও বলা হয়নি যে, রাসূলের এই আনুগত্য শুধু তাঁর জীবদ্দশার সাথে সম্পৃক্ত।
এই ভাইয়েরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাখ্যা বা অনেক হাদীসকে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক দাবি করে বাতিল করে দেন। এখন আমরা দেখব তাদের কৃত আয়াতে কারীমার এই ব্যাখ্যা কতটা রাসূলুলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাখ্যার সাথে সাংঘর্ষিক।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
تَرَكْتُ فِيْكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوْا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا: كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, তোমরা তা যতক্ষণ আঁকড়ে থাকবে পথভ্রষ্ট হবে না। আর তা হচ্ছে, আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত।১০৭
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন :
مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ بَعْدِي فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيَّيْنَ تَمَسَّكُوْا بِهَا وَعَضُوْا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِدِ.
তোমাদের মধ্যে যে আমার পরে বেঁচে থাকবে সে অসংখ্য মতবিরোধ দেখতে পাবে। তখন তোমাদের কর্তব্য আমার সুন্নাত ও হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাত আঁকড়ে ধরা। তোমরা তা দাঁতে কামড়ে ধরে রাখবে। ১০৮
অন্য হাদীসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
كُلُّ أُمَّتِي يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ إِلَّا مَنْ أَبِي قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَنْ يَأْتِي؟ قَالَ: مَنْ أَطَاعَنِي دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ أَبِي.
যে অস্বীকার করল সে ব্যতীত আমার সকল উম্মাত জান্নাতে প্রবেশ করবে। সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, কে অস্বীকার করে? তিনি বললেন, যে আমার আনুগত্য করল সে জান্নাতে প্রবেশ করল আর যে আমার অবাধ্য হলো সে অস্বীকার করল। ১০৯
এ সকল হাদীস দ্বারা আল কুরআনের রাসূলের আনুগত্য বিষয়ক নির্দেশনার এই অর্থ সুস্পষ্ট হলো যে, তাঁর সকল উম্মাত সর্বকালে—তাঁর জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পরেও—তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণ-অনুকরণ করতে বাধ্য। এ আনুগত্য ও অনুসরণ-অনুকরণের সম্পর্ক রাসূল ও উম্মাতের সাথে। যতদিন তাঁর রিসালাত থাকবে ততদিন তাঁর আনুগত্য ও অনুকরণ আবশ্যক থাকবে। আর যে ব্যক্তিই নিজেকে তাঁর উম্মাত বলে দাবি করবে তার উপরেই তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণ বাধ্যতামূলকভাবে সাব্যস্ত হবে। প্রথম ও দ্বিতীয় হাদীসে তো তাঁর মৃত্যু-পরবর্তী কালে আনুগত্যের কথা সুস্পষ্ট করেই বলা হয়েছে।
টিকাঃ
১০৭. মুআত্তা মালিক, হাদীস: ১৮৭৪।
১০৮. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস : ১৭১৪৫; সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৪৬০৭; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ২৬৭৬; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস: ৫; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস : ৩৩১, ৩৩২। ইমাম তিরমিযি, ইবন হিব্বান, হাকিম, আবু নুআইম, ইবনুল মুলাক্কিন, ইবন হাজার প্রমুখ মুহাদ্দিস হাদীসটিকে প্রমাণিত বলেছেন。
১০৯. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৭২৮০; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ৮৭২৮。
📄 কুরআন মানলেই কি রাসূলের আনুগত্য পরিপূর্ণ হয়
কুরআন মানলেই কি রাসূলের আনুগত্য পরিপূর্ণ হয়?-এ প্রশ্নের উত্তর আমরা পূর্বের আলোচনায় পেয়ে গেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আনুগত্য ও অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়ে নাযিল হওয়া আয়াতগুলোকে যখন হাদীস মান্য করার আবশ্যকতার পক্ষে উদ্ধৃত করা হয় তখন হাদীস অস্বীকারকারীরা বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআন মানতে আদিষ্ট ছিলেন। সারা জীবন তিনি কুরআনই মান্য করে গেছেন। তাই কুরআন মানলেই তাঁর আনুগত্য হয়ে যায়। সুতরাং এ সকল আয়াত দ্বারা হাদীস মান্য করার আবশ্যকতা প্রমাণিত হয় না। তাদের এ দাবির ভ্রান্তিও উপরের আলোচনায় প্রস্ফুটিত হয়েছে।
তাছাড়া 'কুরআন-বহির্ভূত ওহি নাযিলের কারণ কী' শিরোনামের আলোচনায় আমরা দেখব, মহান আল্লাহ রাসূলের আনুগত্যের পরীক্ষা নিতে চায় কুরআন-বহির্ভূত ওহির নির্দেশনা প্রতিপালনের মাধ্যমে। সুতরাং কেউ কুরআনের অতিরিক্ত ওহি, অর্থাৎ হাদীস না মানলে নবীজির আনুগত্যের পরীক্ষায় কৃতকার্য হবে না।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহি মানতে আদিষ্ট ছিলেন। তাই তিনি মহান আল্লাহর অনুগত বান্দা হিসাবে ওহির নির্দেশনা পরিপূর্ণরূপে প্রতিপালন করেছেন—সে ওহি আল কুরআনে সংকলিত হোক অথবা আল কুরআনের অতিরিক্ত হোক। অতএব কেউ যদি শুধু আল কুরআনে বর্ণিত বিধিবিধান প্রতিপালন করে আর হাদীস অমান্য করে সে যেমন আংশিক ওহি মান্য করল তেমনিভাবে আল্লাহ ও রাসূলেরও আংশিক ও খণ্ডিতভাবে আনুগত্য করল। সে 'কুরআন দ্বারা প্রমাণিত' কুরআন-বহির্ভূত ওহিকে অস্বীকার করল। এবং যে সকল আয়াতে কুরআন-বহির্ভূত ওহি মানার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আল কুরআনের সেসব আয়াতকেও অস্বীকার করল। কুরআনের আলোকে এটা ভয়ংকর অপরাধ। মহান আল্লাহ বলেন :
أَفَتُؤْمِنُوْنَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَاءُ مَنْ يَفْعَلُ ذلِكَ مِنْكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَى أَشَدِ الْعَذَابِ.
“তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশ বিশ্বাস করবে আর কিছু অংশ অস্বীকার করবে? তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এমনটি করবে তার প্রতিদান এ ছাড়া আর কী হবে যে, পার্থিব জীবনে তার জন্য রয়েছে লাঞ্ছনা আর কিয়ামতের দিন তাকে নিয়ে যাওয়া হবে কঠোর আযাবের দিকে!”১১০
তাছাড়া হাদীস মান্য করা ব্যতীত কুরআনের উপর আমল করা এবং এ পরিমাণ নবীজির আনুগত্য করাও সম্ভব নয়। কেননা কুরআনে বর্ণিত কোন বিধানটির কী মর্ম তিনি বুঝেছেন এবং কীভাবে তার উপর আমল করেছেন তা হাদীস ছাড়া কুরআন থেকে জানা যায় না। আর ঐতিহাসিক সূত্রে এ কথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দীন হিসাবে কুরআন-বহির্ভূত অনেক কিছু পালন করেছেন। অথচ আয়িশা সিদ্দীকা (রা.) তাঁর সমগ্র জীবনকেই 'কুরআন' বলে দাবি করেছেন। কেননা তাঁর কুরআনের অতিরিক্ত আমলগুলোও ওহির নির্দেশনা। আর কুরআনের অতিরিক্ত এই সকল ওহি মান্য করা আল কুরআনের বহুসংখ্যক আয়াতের নির্দেশনা।
সা'দ ইবন হিশাম (রাহ.) বলেন, আমি আয়িশা (রা.)-কে বললাম, হে উম্মুল মুমিনীন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আখলাক কেমন ছিল? জবাবে তিনি বললেন :
كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنَ أَمَا تَقْرَأُ الْقُرْآنَ قَوْلَ اللَّهِ: وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ.
তাঁর আখলাক ছিল কুরআন। তুমি কি কুরআন কারীমে মহান আল্লাহর এই বাণী পড়োনি, 'নিশ্চয় আপনি আছেন সুমহান আখলাকের উপর।'?১১১
সুতরাং হাদীস অস্বীকার করে কুরআন মানা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্যের দাবি করা বাতুলতা এবং অর্থহীন প্রলাপ মাত্র।
টিকাঃ
১১০. সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ৮৫。
১১১. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ২৪৬০১。
📄 কুরআন-বহির্ভূত ওহির গুরুত্ব ও মর্যাদা
আমরা দেখছি, আল কুরআনের বেশ কিছু আয়াত সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, মহান আল্লাহ তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর কুরআনের অতিরিক্ত ওহি নাযিল করেছেন। আর এর ব্যাখ্যায় হাদীস শরীফ আমাদের জানাচ্ছে, তার পরিমাণ কুরআনের অনুরূপ বা তারও অধিক।
এখন কোনো ব্যক্তি যদি এ দাবি করে যে, আমি কুরআনের অতিরিক্ত ওহি তথা হাদীস মানি না, তবে কুরআন মানি। তার এ দাবি যথার্থ নয়। সে মূলত ওহিই অস্বীকারকারী। আল কুরআনের এ সকল আয়াত অস্বীকারের পাশাপাশি এ সকল আয়াত দ্বারা প্রমাণিত বিপুল সংখ্যক (অর্থাৎ কুরআনের পরিমাণ বা তারও অধিক) ওহি সে অস্বীকার করছে।
ওহি, যা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ, তা কুরআনে সংকলিত হোক আর না হোক, বিশ্বাসে ও বিধান প্রণয়নে তার গুরুত্ব ও মর্যাদা অপরিসীম। বেশ কিছু হাদীসে কুরআন-বহির্ভূত ওহিকে কুরআনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে একটি হাদীস আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। অন্য হাদীসে এসেছে, মিকদাম (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
أَلَا وَإِنَّمَا حَرَّمَ رَسُولُ اللَّهِ فَهُوَ مِثْلُ مَا حَرَّمَ اللَّهُ.
"শুনে রাখো, নিশ্চয় আল্লাহর রাসূল যা নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেছেন তা মহান আল্লাহ নিষিদ্ধ করার মতোই।”১১২
আমরা আল কুরআনকে আল্লাহর কিতাব বলে জানি। হাদীস শরীফে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআনের অতিরিক্ত ওহিকেও 'আল্লাহর কিতাব' বলে অভিহিত করেছেন। আবু হুরাইরা (রা.) ও যাইদ ইবন খালিদ জুহানি (রা.) বলেন :
جَاءَ أَعْرَابِيُّ فَقَالَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ اقْضِ بَيْنَنَا بِكِتَابِ اللَّهِ فَقَامَ خَصْمُهُ فَقَالَ: صَدَقَ اقْضِ بَيْنَنَا بِكِتَابِ اللَّهِ فَقَالَ الْأَعْرَابِيُّ: إِنَّ ابْنِي كَانَ عَسِيفًا عَلَى هُذَا فَزَلَى بِامْرَأَتِهِ فَقَالُوْا لِي: عَلَى ابْنِكَ الرَّجْمُ فَفَدَيْتُ ابْنِي مِنْهُ بِمِائَةٍ مِنَ الْغَنَمِ وَوَلِيْدَةٍ ثُمَّ سَأَلْتُ أَهْلَ الْعِلْمِ فَقَالُوْا: إِنَّمَا عَلَى ابْنِكَ جَلْدُ مِائَةٍ وَتَغْرِيبُ عَامٍ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَأَقْضِيَنَّ بَيْنَكُمَا بِكِتَابِ اللَّهِ أَمَّا الْوَلِيْدَةُ وَالْغَنَمُ فَرَدُّ عَلَيْكَ وَعَلَى ابْنِكَ جَلْدُ مِائَةٍ وَتَغْرِيبُ عَامٍ وَأَمَّا أَنْتَ يَا أُنَيْسُ لِرَجُلٍ فَاغْدُ عَلَى امْرَأَةِ هُذَا فَارْجُمْهَا فَغَدَا عَلَيْهَا أُنَيْسُ فَرَجَمَهَا.
এক বেদুইন এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব মোতাবেক ফায়সালা করে দিন। তখন তার প্রতিপক্ষ দাঁড়িয়ে বলল, জি, সে ঠিকই বলেছে, আপনি আমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব মোতাবেক ফায়সালা করুন। তারপর বেদুইন লোকটি বলল, আমার ছেলে এই লোকটির বাড়িতে কাজ করত। এমতাবস্থায় সে লোকটির স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করে। লোকেরা বলল, তোমার ছেলের উপর রজম আবশ্যক হয়ে গেছে। তখন আমি একশত ছাগল ও একটি দাসীর বিনিময়ে এর কাছ থেকে ছেলেকে মুক্ত করে আনি। তারপর আলিমদের জিজ্ঞাসা করলে তারা বলেন, তোমার ছেলের উপর একশ বেত্রাঘাত ও এক বছরের নির্বাসন ওয়াজিব হয়েছে। এসব শুনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই আমি তোমাদের মাঝে 'আল্লাহর কিতাব' অনুযায়ী ফায়সালা করব। দাসী ও ছাগল তুমি ফেরত পাবে। আর তোমার ছেলেকে একশ বেত্রাঘাত ও এক বছরের নির্বাসন দেওয়া হবে। আর তুমি হে উনাইস, এই লোকের স্ত্রীর কাছে যাবে এবং তাকে রজম করবে। উনাইস তার নিকট গিয়ে তাকে রজম করে। ১১৩
ইমাম কুরতুবি (রাহ.) বলেন, এই হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি অবশ্যই তোমাদের মাঝে 'আল্লাহর কিতাব' অনুযায়ী ফায়সালা করে দেব। অতঃপর রজমের ফায়সালা করেছেন। কিন্তু রজমের বিধান আল কুরআনে লিপিবদ্ধ নেই। অর্থাৎ এখানে তিনি 'আল্লাহর কিতাব' বলে 'আল্লাহর বিধান' বুঝিয়েছেন। ১১৪
যে বিধান আল কুরআনে উল্লেখ নেই, বরং কুরআনের অতিরিক্ত ওহির মাধ্যমে এসেছে।
আল কুরআনেও 'আল্লাহর কিতাব' শব্দবন্ধ 'আল্লাহর বিধান' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ كِتَابَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ.
"এবং তোমাদের দক্ষিণ হস্ত যাদের মালিক হয়েছে তারা ব্যতীত সকল সধবা নারী তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ; এটা তোমাদের উপর (কিতাবুল্লাহ বা) আল্লাহর বিধান।"১১৫
টিকাঃ
১১২. সুনান তিরমিযি, হাদীস: ২৬৬৪; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস: ১২; সুনান দারিমি, হাদীস : ৬০৬। ইমাম তিরমিযি হাদীসটিকে হাসান বলেছেন; ইবনুল মুলাক্কিন, আলবানি প্রমুখ মুহাদ্দিস হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
১১৩. মুআত্তা মালিক, হাদীস: ১৭৬০; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১৭০৪২; সহীহ বুখারি, হাদীস : ২৬৯৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৬৯৭; সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৪৪৪৫; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ১৪৩৩; সুনান নাসায়ি, হাদীস: ৫৪১১; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস: ২৫৪৯。
১১৪. কুরতুবি, আল জামি' লি-আহকামিল কুরআন: ২০/১৪৩。
১১৫. সূরা [৪] নিসা, আয়াত: ২৪। আরো দেখুন: সূরা [৮] আনফাল, আয়াত: ৭৫; সূরা [৩৩] আহযাব, আয়াত: ০৬。
📄 কুরআন-বহির্ভূত ওহি নাযিলের কারণ কী
এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যে, মহান আল্লাহ শরীআতের বিধান-সংবলিত সকল ওহি আল কুরআনের অন্তর্ভুক্ত না করে কিছু বিধান কুরআনের বাইরে কেন রাখলেন, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম 'কুরআন' বলে দাবি না করে উম্মাতকে শিক্ষা দিলেন— যা আমাদের কাছে 'হাদীস' বা 'সুন্নাহ' নামে সংকলিত?
আল্লাহর আনুগত্যের পাশাপাশি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্যও আবশ্যক। আল কুরআনে মহান আল্লাহ বারংবার নিজের আনুগত্যের সাথে সাথে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। বিশ্বাসী মানুষ আল্লাহর হুকুম আল্লাহর জন্য পালন করে মহান আল্লাহর আনুগত্য করে। এ বিধান নবীজিই মানুষকে জানান এবং আমলের পদ্ধতিও তিনিই শেখান। এভাবে নবীজির দেওয়া সংবাদের উপর বিশ্বাস করে তাঁর শেখানো পদ্ধতিতে আমল করার দ্বারা যদিও নবীজির আনুগত্য প্রকাশ পায়, তবুও মহান আল্লাহ চান, আরো সুস্পষ্টভাবে নবীজির আনুগত্যের বিষয়টি পরখ করতে। এ উদ্দেশ্যে তিনি কিছু ওহি এমনভাবে নাযিল করেন, যা কুরআন হিসাবে উদ্ধৃত না করে বিবৃত বিধানকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই ঘোষণা করেন। বিষয়টি আল কুরআনে সুস্পষ্টরূপেই বর্ণিত হয়েছে।
মাদানি জীবনের শুরুতে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাইতুল মুকাদ্দাসকে কিবলা করে মুসলিমদের নিয়ে সালাত আদায় করতেন। সতেরো মাস পর কুরআন কারীম এ বিধানকে রহিত করে নতুন বিধান জারি করে:
قَدْ نَرَى تَقَلُّبَ وَجْهِكَ فِي السَّمَاءِ فَلَنُوَلِيَنَّكَ قِبْلَةً تَرْضَاهَا فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَحَيْثُ مَا كُنْتُمْ فَوَلُّوا وُجُوهَكُمْ شَطْرَةً.
“(হে নবী) আমি বারবার আপনার চেহারাকে আকাশের দিকে ফেরাতে দেখছি। সুতরাং আমি আপনাকে আপনার পছন্দনীয় কিবলার দিকেই ফিরিয়ে দেব। সুতরাং আপনি এবার আপনার চেহারাকে মসজিদুল হারামের দিকে ফেরান। আর তোমরা যেখানেই থাকো তোমাদের চেহারাকে সেদিকেই ফেরাবে।”১১৬
বাইতুল্লাহ বা কা'বাকে কিবলা করার এই বিধান আসার পর কিছু মানুষ নানাভাবে আপত্তি উত্থাপন করতে থাকে। তখন আল্লাহ তাআলা তাদের জবাবে বলেন:
وَمَا جَعَلْنَا الْقِبْلَةَ الَّتِي كُنْتَ عَلَيْهَا إِلَّا لِنَعْلَمَ مَنْ يَتَّبِعُ الرَّسُوْلَ مِمَّنْ يَنْقَلِبُ عَلَى عَقِبَيْهِ.
“আপনি পূর্বে যে কিবলার উপর ছিলেন আমি তা নির্ধারণ করেছিলাম এ কথা জেনে নিতে যে, কে রাসূলের আনুগত্য করে আর কে পিছুটান দেয়।"১১৭
এ আয়াতে দুটি বিষয় লক্ষ করুন: ১. নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পূর্বে যে কিবলার উপর ছিলেন, অর্থাৎ বাইতুল মুকাদ্দাস, মহান আল্লাহ বলেন, 'এ বাইতুল মুকাদ্দাসকে আমিই কিবলা হিসাবে নির্ধারণ করেছিলাম।' কিন্তু আল কুরআনে বাইতুল মুকাদ্দাসকে কিবলা হিসাবে নির্ধারণ করার নির্দেশ বিষয়ক কোনো আয়াত নেই। তাহলে বোঝা গেল, এ বিধান নির্ধারিত হয়েছিল কুরআন-বহির্ভূত ওহির মাধ্যমে।
২. তারপর আল্লাহ তাআলা বলেন, এ বিধানটি আমি এভাবে দিয়েছিলাম এ কথা জেনে নিতে যে, কে আমার রাসূলের আনুগত্য করে আর কে পিছুটান দেয়। অর্থাৎ এ কথা পরিষ্কার যে, কুরআন-বহির্ভূত এ ওহি ছিল মানুষের কাছ থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্যের পরীক্ষা নেবার জন্য। ১১৮
সুতরাং যারা কুরআনের অতিরিক্ত ওহি, অর্থাৎ হাদীসকে অস্বীকার করে তারা মহান আল্লাহর এ পরীক্ষায় অকৃতকার্য, অনুত্তীর্ণ-আল কুরআনের অগণিত স্থানে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্যের আদেশ করা হয়েছে, মহান আল্লাহর সে আদেশ অমান্যকারী বলে গণ্য।
টিকাঃ
১১৬. সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ১৪৪。
১১৭. সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ১৪৩。
১১৮. ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম : ১/৪৫৭-৪৫৮; মাওদূদি, সুন্নাতে রাসূলের আইনগত মর্যাদা, পৃ. ৮৩-৮৩ ও ১৯০-১৯৫; তাকি উসমানি, হাদীসের প্রামাণ্যতা, পৃ. ৩৮-৪০。