📄 হাদীসের বিধান কুরআনের স্বীকৃতি
অনেক বিধান এমন আছে যা প্রথমত কুরআনের অতিরিক্ত ওহি দ্বারা সাব্যস্ত ও প্রচলিত হয়েছে। পরে কুরআনে তার নির্দেশ বা স্বীকৃতি নাযিল হয়েছে। এর দ্বারা যেমন কুরআনের অতিরিক্ত ওহি নাযিল হওয়া প্রমাণিত হয়, তেমনি তার মর্যাদাও বোঝা যায়। দুটি প্রমাণ দেখুন।
প্রমাণ-০১: ইসলামের প্রথম যুগে মাক্কি জীবনেই ওযুর বিধান প্রদত্ত হয়। তা সাব্যস্ত হয় কুরআনের অতিরিক্ত ওহি দ্বারা। আর ওযু সংক্রান্ত কুরআনের আয়াত নাযিল হয় মদীনায় হিজরতের অনেক পরে।
মাক্কি জীবনে মিরাজের পর থেকে যখন সালাত ফরয হয় তখন থেকেই তা ওযুসহ আদায়ের বিধান দেওয়া হয়। মাদানি জীবনে নবীজি সাহাবিদের নিকট থেকে এ বিষয়ক প্রশ্নের সম্মুখীন হন যে, আমরা পানি ব্যবহারে অক্ষম হলে কী করব? তখন তায়াম্মুমের বিধান দিয়ে মহান আল্লাহ সূরা মায়িদাহর ৬ নং আয়াতটি নাযিল করেন। এ আয়াতে প্রসঙ্গক্রমে ওযুর বিধানও আলোচিত হয়। এর আগে আল কুরআনে কোথাও ওযুর বিধান আলোচিত হয়নি। অথচ এ আয়াত থেকেই পরিষ্কার বোঝা যায় যে, আয়াতটি নাযিলের আগ থেকেই ওযুর বিধান কার্যকর ছিল। সাহাবিরা অপারগতার কারণে ওযু করতে না পারলে করণীয় জানতে চাইলে আয়াতটি নাযিল হয়। ৯৩
প্রমাণ-০২: মি'রাজের রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয হয়। ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারছি, তখন কোনো সালাতের ওয়াক্ত হলে 'الصَّلَاءُ جَامِعَةُ' বলে ঘোষণা দেওয়া হতো।৯৪ হিজরতের পর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করে সালাতের দিকে আহ্বানের জন্য আযান চালু করেন। সালাতের জন্য ঘোষণা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে এবং তার পদ্ধতি বাতলে দিয়ে আল কুরআনে কোনো আয়াত নাযিল হয়নি। কিন্তু সালাতের জন্য ঘোষণা দেওয়াকে শরীআতের সাধারণ বিধান হিসাবে আল কুরআনের একাধিক আয়াতে উল্লেখ রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে:
وَإِذَا نَادَيْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ اتَّخَذُوْهَا هُزُوًا وَلَعِبًا ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَعْقِلُوْنَ .
“যখন তোমরা সালাতের প্রতি আহ্বান করো, তারা এটাকে খেল-তামাশার বিষয় হিসাবে গ্রহণ করে। কেননা তারা নির্বোধ সম্প্রদায়। "৯৫
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ.
“হে মুমিনগণ, জুমুআহর দিন যখন সালাতের জন্য আহ্বান করা হয় তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং ব্যবসা পরিত্যাগ করো। এটা তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা জানতে পারো।"৯৬
এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কুরআনের অতিরিক্ত ওহির মাধ্যমে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সকল বিধান প্রবর্তন করেছেন কুরআনের দৃষ্টিতে সে সকল বিধানও শরীআতের সাধারণ বিধানের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। কুরআনে উল্লেখিত ও হাদীসে উল্লেখিত বিধানের মাঝে মর্যাদাগত তারতম্য নেই। উভয় বিধানই ওহি দ্বারা সাব্যস্ত।
টিকাঃ
৯৩. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৪৬০৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৩৬৭; ইবনুল আরাবি, আহকামুল কুরআন ২/৪৭。
৯৪. সহীহ ইবন হিব্বান: ২৮৮৪。
৯৫. সূরা [৫] মায়িদাহ, আয়াত: ৫৮。
৯৬. সূরা [৬২] জুমুআহ, আয়াত: ০৯。
📄 শরীআত প্রণয়নে নবীজির অধিকার
উপরে আলোচনার আমরা দেখেছি, মহান আল্লাহ আল কুরআনের বাইরেও শরীআতের বিধান-সংবলিত ওহি নাযিল করেছেন। সুতরাং শরয়ি বিধান জানার জন্য শুধু কুরআনের উপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআনের অতিরিক্ত ওহির মাধ্যমে অনেক শরয়ি বিধান বর্ণনা করেছেন, আদেশ-নিষেধ ও হালাল-হারামের বিধান প্রদান করেছেন। আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
قَالَ عَذَابِي أُصِيبُ بِهِ مَنْ أَشَاءُ وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ فَسَأَكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُوْنَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَالَّذِينَ هُمْ بِآيَاتِنَا يُؤْمِنُوْنَ . الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنْزِلَ مَعَهُ أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ.
“তিনি (আল্লাহ) বলেন, আমি যাকে চাই আমার আযাবে নিপতিত করি, আর আমার দয়া সকল কিছুতে পরিব্যাপ্ত। অতঃপর তা আমি লিপিবদ্ধ করি তাদের জন্য যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, যাকাত প্রদান করে এবং আমার আয়াতে বিশ্বাসী ওই সমস্ত লোকের জন্য যারা এই রাসূলের অনুসরণ করে, যিনি উম্মি নবী, যার কথা তারা তাদের কাছে থাকা তাওরাত ও ইনজীলে লিখিত পায়। এই রাসূল তাদের সৎকাজের আদেশ করেন, অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করেন এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করে দেন আর নিকৃষ্ট বস্তুসমূহ নিষিদ্ধ করে দেন। তিনি তাদের ভার ও গলার বেড়ি নামিয়ে দেবেন, যা তাদের উপর চাপানো ছিল। সুতরাং যারা তাঁর প্রতি ঈমান এনেছে, তাঁর পক্ষাবলম্বন করেছে, তাঁকে সাহায্য করেছে এবং তাঁর সাথে অবতীর্ণ জ্যোতির অনুসরণ করেছে, তারাই কৃতকার্য।”৯৭
এ আয়াতে হালাল-হারামের সম্পর্ক কিতাবের সাথে করা হয়নি, বরং রাসূলের সাথে করা হয়েছে। আয়াতে উল্লেখিত )يُحِلُّ( 'হালাল করে দেন' ও )يُحَرِّمُ( 'নিষিদ্ধ করে দেন' ক্রিয়াপদ দুটির কর্তা মহান আল্লাহ নন, বরং উম্মি নবী। উপরন্তু কুরআনের আলোকে প্রমাণিত ন্যায় ও অন্যায় কাজের আদেশ-নিষেধ থেকে পৃথক করে এই হারাম-হালালের বিধান দানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন :
قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُوْنَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَا يُحَرِّمُوْنَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلَا يَدِينُوْنَ دِيْنَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حَتَّى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُوْنَ.
“কিতাবিদের মধ্যে যারা ঈমান রাখে না আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তাকে হারাম মনে করে না আর গ্রহণ করে না সত্য দীনকে, তাদের সাথে যুদ্ধ করো, যতক্ষণ না তারা হেয় হয়ে নিজ হাতে জিযিয়া প্রদান করে।"৯৮
এ আয়াতে আল্লাহর সাথে রাসূলকেও 'হারام করেছেন' ক্রিয়ার কর্তা বানানো হয়েছে।
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন:
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُوْنَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا.
"যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ের ফায়সালা করেন তখন কোনো মুমিন নারী ও পুরুষের অন্যথা করার অধিকার নেই। যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হলো সে তো সুস্পষ্ট ভ্রান্তিতে পতিত হলো।"৯৯
এ আয়াতেও আল্লাহর সাথে তাঁর রাসূলকে 'ফায়সালা করেন' ক্রিয়ার কর্তা বানানো হয়েছে। এবং উভয়ের মাঝে রয়েছে 'ও' (১) সংযোজক অব্যয়।
আয়াতগুলোর সরল অর্থের আলোকে বিধান প্রণয়নে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিপূর্ণ অধিকার সাব্যস্ত হয়। তবে অন্যান্য দলীলের সমন্বয়ে আমরা বিশ্বাস করি, এক্ষেত্রে মহান আল্লাহর অধিকার যেমন স্বয়ংসম্পূর্ণ, নবীজির অধিকার তেমন স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। তবে এ কথা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয় যে, এসব আয়াতের অর্থ মূলত মহান আল্লাহ আল কুরআনে যেসব বিধান উল্লেখ করেছেন নবীজি কেবল তার প্রচারক। কেননা এ কথা যেমন আয়াতের ব্যাকরণ-সম্মত ও উম্মাহর সর্বজনস্বীকৃত অর্থের পরিপন্থী, তেমনি এ কথার দ্বারা সরল অর্থ সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হয়ে যায় এবং আয়াতের এ সংক্রান্ত আলোচনা একেবারেই অর্থহীন হয়ে পড়ে।
আয়াতগুলোর যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা রয়েছে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসে। তিনি বলেছেন :
أَيَحْسَبُ أَحَدُكُمْ مُتَّكِنَّا عَلَى أَرِيكَتِهِ قَدْ يَظُنُّ أَنَّ اللَّهَ لَمْ يُحَرَّمْ شَيْئًا إِلَّا مَا فِي هَذَا الْقُرْآنِ أَلَا وَإِنِّي وَاللهِ قَدْ وَعَظْتُ وَأَمَرْتُ وَنَهَيْتُ عَنْ أَشْيَاءَ إِنَّهَا لَمِثْلُ الْقُرْآنِ أَوْ أَكْثَرُ.
“তোমাদের কেউ কি আপন আসনে হেলান দিয়ে ধারণা করে যে, এই কুরআনে যা আছে তা ছাড়া আর কিছুই আল্লাহ নিষিদ্ধ করেননি? শুনে রাখো, আল্লাহর কসম, নিশ্চয় আমিও তোমাদের উপদেশ দিয়েছি, অনেক কিছুর আদেশ করেছি এবং নিষিদ্ধ করেছি—তা কুরআনের অনুরূপ অথবা তারও অধিক।"১০০
হাদীসের এই বাচনভঙ্গি থেকে বোঝা যায়, আল কুরআনের অতিরিক্ত যেসব বিধিবিধান নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করেছেন তা তাঁর নিজের কথা নয়; বরং মহান আল্লাহরই বিধান। কেননা প্রথমে তিনি প্রশ্ন করেছেন, 'তোমাদের কেউ কি... ধারণা করে যে, কুরআনে যা আছে তা ছাড়া আর কিছুই আল্লাহ নিষিদ্ধ করেননি?' এ প্রশ্নের অর্থ হচ্ছে, মহান আল্লাহ আল কুরআনের বাইরেও অনেক বিধান দিয়েছেন। কিন্তু সে সকল বিধান তিনি কীভাবে দিয়েছেন? এ প্রশ্নের জবাবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আমিও তোমাদের... অনেক কিছুর আদেশ করেছি এবং নিষিদ্ধ করেছি—তা কুরআনের অনুরূপ অথবা তার অধিক।' অর্থাৎ কুরআনের বাইরে আল্লাহ তাআলা যে সকল বিধান দিয়েছেন সেগুলোই আমি তোমাদের জানিয়েছি।
আরো খেয়াল করুন, আল্লাহর দেওয়া কুরআন-বহির্ভূত বিধান বর্ণনা করাকে নবীজি বলছেন, 'আমিও... অনেক কিছুর আদেশ করেছি এবং নিষিদ্ধ করেছি'। অর্থাৎ কুরআনের অতিরিক্ত ওহির বিধান নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক উম্মাতকে শোনানোই নবীজির বিধান দান হিসাবে সাব্যস্ত।
টিকাঃ
৯৭. সূরা [৭] আ'রাফ, আয়াত: ১৫৬ ও ১৫৭।
৯৮. সূরা [৯] তাওবাহ, আয়াত: ২৯。
৯৯. সূরা [৩৩] আহযাব, আয়াত: ৩৬。
১০০. সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৩০৫০। হাদীসটিকে আব্দুল হক ইশবীলি প্রমাণিত হিসাবে গ্রহণ করেছেন এবং আলবানি এর সনদকে হাসান বলেছেন। দেখুন: আল আহকামুল উসতা : ১/১০৫; সিলসিলাহ সহীহাহ : ২/৫৪১-৫৪২。
📄 রাসূলের আনুগত্য ও অনুসরণ-অনুকরণ
আল কুরআনে আল্লাহ তাআলা বারবার তাঁর নিজের আনুগত্যের নির্দেশ দেওয়ার সাথে সাথে তাঁর রাসূলের আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। সংক্ষেপণের জন্য আমরা মাত্র দুটি আয়াতের অনুবাদ উল্লেখ করছি। তিনি বলেন :
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ.
“আর তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো, যদি তোমরা মুমিন হও।”১০১
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَوَلَّوْا عَنْهُ وَأَنْتُمْ تَسْمَعُوْنَ.
“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো এবং শোনার পরও তোমরা তা থেকে বিমুখ হোয়ো না।”১০২
এভাবে কুরআন মাজীদে যেখানেই আল্লাহ তাআলা নিজের আনুগত্যের কথা বলেছেন সেখানে রাসূলের আনুগত্যের কথাও বলেছেন। একটি স্থানও এমন নেই যেখানে তিনি নিজের আনুগত্যের কথা বলেছেন কিন্তু রাসূলের আনুগত্যের কথা বলেননি। তবে এমন কিছু আয়াত আছে যেখানে রাসূলের আনুগত্যের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু আল্লাহর আনুগত্যের কথা বলা হয়নি। যেমন একটি আয়াতে বলা হয়েছে:
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَطِيعُوا الرَّسُوْلَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ.
“তোমরা সালাত আদায় করো, যাকাত প্রদান করো এবং রাসূলের আনুগত্য করো—তাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে।”১০৩
এছাড়া আল কুরআনে রাসূলের আনুগত্যকেই আল্লাহর আনুগত্য বলে গণ্য করা হয়েছে। কিন্তু কোথাও আল্লাহর আনুগত্যকে রাসূলের আনুগত্য বলা হয়নি। ইরশাদ হয়েছে:
مَنْ يُطِعِ الرَّسُوْلَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ.
“যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল।”১০৪
তাছাড়া অনেক আয়াতে রাসূলের অনুসরণ-অনুকরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতাআত বা আনুগত্য বলা হয় আদেশ-নিষেধ মান্য করাকে আর ইত্তিবা' বা অনুসরণ বলা হয় কাউকে অনুকরণ করে হুবহু তার মতো কর্ম করাকে। আল কুরআনে বারবার এভাবে রাসূলের কর্মের অনুসরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা শুধু দুটি আয়াত উল্লেখ করছি। আল্লাহ বলেন:
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ.
“(হে নবী) আপনি বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসে থাকো, তাহলে আমার অনুসরণ করো। এতে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু।”১০৫
অন্যত্র মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলকে নির্দেশ দিয়ে বলেন:
قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ يُحْيِي وَيُمِيتُ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُوْلِهِ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ الَّذِي يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَكَلِمَاتِهِ وَاتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ.
"আপনি বলে দিন, হে লোকসকল, আমি তোমাদের সকলের নিকট আল্লাহর রাসূল, যিনি সমস্ত আসমান-জমিনের মালিক, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি জীবন ও মৃত্যু দান করেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনো, যিনি উম্মি নবী, যিনি নিজে আল্লাহ ও তাঁর বাণীসমূহে ঈমান রাখেন। এবং তোমরা তাঁর অনুসরণ করো, তাতে তোমরা পথের দিশা পাবে।"১০৬
যে ব্যক্তি ইত্তিবা' বা অনুসরণ শব্দের অর্থ জানেন তিনি কিছুতেই বলতে পারেন না যে, রাসূলের কর্মের অনুকরণ ছাড়া শুধু কুরআন মানলেই তাঁর ইত্তিবা' হয়ে যাবে। কেননা কুরআনে রাসূলের কর্ম বর্ণিত হয়নি। রাসূলের কথা, কর্ম ও কর্মপদ্ধতি হাদীস ও সুন্নাহ নামে সংকলিত হয়েছে এবং আমলে মুতাওয়ারাসের মাধ্যমে প্রজন্ম পরম্পরায় সকল যুগের উম্মাতের কাছে পৌঁছেছে।
এবং শুধু কুরআন মান্য করা বা আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে রাসূলেরও আনুগত্য হয়ে যায়-কুরআনের আলোকে এ দাবিও করা যায় না। কেননা কুরআনে কোথাও আল্লাহর আনুগত্যকে রাসূলের আনুগত্য বলে সাব্যস্ত করা হয়নি। বরং বিপরীতে রাসূলের আনুগত্যকে আল্লাহর আনুগত্য বলে গণ্য করা হয়েছে। সুতরাং কুরআনের আলোকে এ দাবি যথার্থ যে, রাসূলের আনুগত্য করলে বা হাদীস-সুন্নাহ মেনে চললে যেমন আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য হয়, তেমনি রাসূলের অনুসরণ ও অনুকরণ হয়ে যায় এবং পরিপূর্ণরূপে কুরআনও মান্য করা হয়ে যায়। কেননা নবীজি ছিলেন পরিপূর্ণ জীবন্ত কুরআন। আর হাদীস শরীফে নবীজির আনুগত্যের জন্য তাঁর কর্মের প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত বর্ণনা সংরক্ষিত রয়েছে।
এ কথাও স্মর্তব্য যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পিয়ন, রাষ্ট্রপতি বা রাষ্ট্রদূতের সাথে তুলনীয় নন। পিয়ন শুধুই সংবাদবাহক। ভেতরের সংবাদের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। বহন করা সংবাদের সে ব্যাখ্যাকারও নয়, তার বিধিবিধানের উপর আমল করার নমুনাও নয়। তেমনি রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশ আইন বটে। তবে তিনি নাগরিকদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ নন। আর রাষ্ট্রদূত তো কেবলই সংশ্লিষ্ট দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের বক্তব্য-বিবৃতির প্রতিনিধি। পক্ষান্তরে আল কুরআনের আলোকে আল্লাহর রাসূল বার্তাবাহক, তার অনুমোদিত ও নির্বাচিত ব্যাখ্যাকার এবং তার উপর আমল করার একমাত্র অনুকরণীয় আদর্শ।
আল কুরআনের আলোকে এটাও প্রমাণিত যে, মহান আল্লাহর প্রেরিত বার্তা কেবল আল কুরআনেই সীমাবদ্ধ নয়। কুরআনে সংকলিত বার্তার বাইরেও তিনি অনেক বার্তা প্রেরণ করেছেন। নবীজিই এ সকল বার্তার বাহক এবং পালনের আদর্শ।
টিকাঃ
১০১. সূরা [৮] আনফাল, আয়াত: ০১。
১০২. সূরা [৮] আনফাল, আয়াত: ২০。
১০৩. সূরা [২৪] নূর, আয়াত: ৫৬。
১০৪. সূরা [৪] নিসা, আয়াত: ৮০。
১০৫. সূরা [৩] আলে ইমরান, আয়াত: ৩১。
১০৬. সূরা [৭] আ'রাফ, আয়াত: ১৫৮。
📄 রাসূলের আনুগত্য সর্বকালে আবশ্যক
মহান আল্লাহ তাঁর নিজের আনুগত্যের মতোই তাঁর রাসূলের আনুগত্য ফরয করেছেন। এ আনুগত্য তাঁর দলনেতা বা রাষ্ট্রনেতা হিসাবে নয়, বরং রাসূল হিসাবে। এ বিষয়ক নির্দেশনায় আল কুরআনে সর্বত্র 'রাসূল' শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি মুমিন, রাসূলের রিসালাতে বিশ্বাসী, সে যে দেশ-কালের মানুষই হোক না কেন, তার উপর আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য আবশ্যক। কেননা যে কারো যেকোনো ধরনের নেতৃত্ব তার মৃত্যুর সাথে সাথে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাত তাঁর জীবদ্দশা ও মৃত্যু-পরবর্তী কাল—সর্বকাল পরিব্যাপ্ত।
কেউ কেউ দাবি করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য এবং তাঁর ব্যাখ্যা মান্য করার আবশ্যকতা কেবল তাঁর জীবদ্দশার সাথে সম্পৃক্ত। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর আনুগত্য আবশ্যক নয়। এ কথা কুরআন বিরোধী। কেননা কুরআন আদেশ করেছে, রাসূলের আনুগত্য করো। আর এ রাসূলের রিসালাতের মেয়াদ রেখেছে সর্বকালব্যাপী। কুরআনের কোনো একটি আয়াতে ইশারায়ও বলা হয়নি যে, রাসূলের এই আনুগত্য শুধু তাঁর জীবদ্দশার সাথে সম্পৃক্ত।
এই ভাইয়েরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাখ্যা বা অনেক হাদীসকে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক দাবি করে বাতিল করে দেন। এখন আমরা দেখব তাদের কৃত আয়াতে কারীমার এই ব্যাখ্যা কতটা রাসূলুলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাখ্যার সাথে সাংঘর্ষিক।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
تَرَكْتُ فِيْكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوْا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا: كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, তোমরা তা যতক্ষণ আঁকড়ে থাকবে পথভ্রষ্ট হবে না। আর তা হচ্ছে, আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত।১০৭
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন :
مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ بَعْدِي فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيَّيْنَ تَمَسَّكُوْا بِهَا وَعَضُوْا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِدِ.
তোমাদের মধ্যে যে আমার পরে বেঁচে থাকবে সে অসংখ্য মতবিরোধ দেখতে পাবে। তখন তোমাদের কর্তব্য আমার সুন্নাত ও হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাত আঁকড়ে ধরা। তোমরা তা দাঁতে কামড়ে ধরে রাখবে। ১০৮
অন্য হাদীসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
كُلُّ أُمَّتِي يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ إِلَّا مَنْ أَبِي قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَنْ يَأْتِي؟ قَالَ: مَنْ أَطَاعَنِي دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ أَبِي.
যে অস্বীকার করল সে ব্যতীত আমার সকল উম্মাত জান্নাতে প্রবেশ করবে। সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, কে অস্বীকার করে? তিনি বললেন, যে আমার আনুগত্য করল সে জান্নাতে প্রবেশ করল আর যে আমার অবাধ্য হলো সে অস্বীকার করল। ১০৯
এ সকল হাদীস দ্বারা আল কুরআনের রাসূলের আনুগত্য বিষয়ক নির্দেশনার এই অর্থ সুস্পষ্ট হলো যে, তাঁর সকল উম্মাত সর্বকালে—তাঁর জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পরেও—তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণ-অনুকরণ করতে বাধ্য। এ আনুগত্য ও অনুসরণ-অনুকরণের সম্পর্ক রাসূল ও উম্মাতের সাথে। যতদিন তাঁর রিসালাত থাকবে ততদিন তাঁর আনুগত্য ও অনুকরণ আবশ্যক থাকবে। আর যে ব্যক্তিই নিজেকে তাঁর উম্মাত বলে দাবি করবে তার উপরেই তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণ বাধ্যতামূলকভাবে সাব্যস্ত হবে। প্রথম ও দ্বিতীয় হাদীসে তো তাঁর মৃত্যু-পরবর্তী কালে আনুগত্যের কথা সুস্পষ্ট করেই বলা হয়েছে।
টিকাঃ
১০৭. মুআত্তা মালিক, হাদীস: ১৮৭৪।
১০৮. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস : ১৭১৪৫; সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৪৬০৭; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ২৬৭৬; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস: ৫; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস : ৩৩১, ৩৩২। ইমাম তিরমিযি, ইবন হিব্বান, হাকিম, আবু নুআইম, ইবনুল মুলাক্কিন, ইবন হাজার প্রমুখ মুহাদ্দিস হাদীসটিকে প্রমাণিত বলেছেন。
১০৯. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৭২৮০; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ৮৭২৮。