📄 কুরআনের অতিরিক্ত ওহিতে শরয়ি বিধান
আল কুরআনের অতিরিক্ত ওহিতে মহান আল্লাহ শরয়ি বিধান নাযিল করেছেন। এর অনেক প্রমাণ আল কুরআনে বিদ্যমান। কলেবর বৃদ্ধি এড়াতে এ সংক্রান্ত শুধু দুটি প্রমাণ আমরা উল্লেখ করছি :
প্রমাণ-০১: মদীনার প্রসিদ্ধ ইয়াহুদি গোত্র বনু নযীরকে অবরোধের সময় তাদের অস্ত্র সমর্পণে বাধ্য করার জন্য মুসলিমগণ দুর্গের আশপাশের কিছু খেজুর গাছ কেটে দেয়। যুদ্ধ শেষে ইয়াহুদিরা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অভিযোগ করে, আপনি তো বিপর্যয় ও ফাসাদ সৃষ্টি করতে নিষেধ করেন, তাহলে আমাদের খেজুর গাছগুলো কাটার অনুমতি দিলেন কীভাবে? তাদের অভিযোগের জবাবে মহান আল্লাহ মুসলিমদের সম্বোধন করে বলেন:
مَا قَطَعْتُمْ مِنْ لِيْنَةٍ أَوْ تَرَكْتُمُوهَا قَائِمَةً عَلَى أُصُولِهَا فَبِإِذْنِ اللَّهِ وَلِيُخْزِيَ الْفَاسِقِينَ.
"তোমরা যে কিছু কিছু খেজুর গাছ কেটে দিয়েছ এবং কিছু না কেটে মূলের উপর রেখে দিয়েছ-তা তো আল্লাহরই আদেশে এবং যাতে তিনি অবাধ্যদের লাঞ্ছিত করেন।”৮৫
এ আয়াত থেকে আমরা দেখছি যে, অবরোধকালে মুসলিমগণ কর্তৃক কিছু বৃক্ষ কর্তন ও কিছু বৃক্ষ কর্তন না করার বিষয়টি মহান আল্লাহর নির্দেশে হয়েছিল। কিন্তু আল কুরআনের কোথাও এ নির্দেশটি উল্লেখিত হয়নি। তাহলে বোঝা যায়, আল্লাহর এ নির্দেশটি ছিল কুরআন-বহির্ভূত ওহিরনির্দেশ। ৮৬
প্রমাণ-০২: যেসব মুনাফিক হুদাইবিয়ার সফরে অংশগ্রহণ করেনি তারা গনীমতের লোভে খায়বার অভিযানে শরিক হতে চায় এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে। কিন্তু তিনি তাদের অনুমতি না দিয়ে ঘোষণা করে দেন, এ অভিযানে শুধু তারাই অংশগ্রহণ করতে পারবে যারা হুদাইবিয়ায় অংশগ্রহণ করেছিল। কেননা আগে থেকেই মহান আল্লাহ এ বিধান দিয়ে রেখেছিলেন এবং প্রভৃত গনীমতের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। এ ঘটনাটি আল কুরআনে বর্ণিত হয়েছে :
سَيَقُوْلُ الْمُخَلَّفُوْنَ إِذَا انْطَلَقْتُمْ إِلَى مَغَانِمَ لِتَأْخُذُوْهَا ذَرُوْنَا نَتَّبِعْكُمْ يُرِيدُونَ أَنْ يُبَدِّلُوْا كَلَامَ اللَّهِ قُلْ لَنْ تَتَّبِعُوْنَا كَذَلِكُمْ قَالَ اللَّهُ مِنْ قَبْلُ.
“তোমরা যখন যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সংগ্রহের জন্য যাবে তখন যারা (হুদাইবিয়ার সফরে) পেছনে থেকে গিয়েছিল তারা বলবে, আমাদেরও তোমাদের সাথে যেতে দাও। তারা আল্লাহর কালাম পরিবর্তন করতে চায়। বলে দিন, তোমরা কিছুতেই আমাদের সাথে যাবে না; আল্লাহ আগে থেকেই এরূপ বলে দিয়েছেন।”৮৭
মহান আল্লাহ আগে থেকেই বিষয়টি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর এই পূর্বোক্ত বিধান ও প্রতিশ্রুতি আল কুরআনের কোথাও উল্লেখ নেই। এখানে কোনো অস্পষ্টতা নেই যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসা এই বিধানটি ছিল কুরআন-বহির্ভূত ওহি।৮৮
টিকাঃ
৮৫. সূরা [৫৯] হাশর, আয়াত: ০৫।
৮৬. তাবারি, জামিউল বায়ান: ২৩/২৭১-২৭৩; কুরতুবি, আল জামি' লি-আহকামিল কুরআন : ১৮/৬-৮; ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম: ৮/৬১-৬২; তাকি উসমানি, হাদীসের প্রামাণ্যতা: ৪৫-৪৬。
৮৭. সূরা [৪৮] ফাতহ, আয়াত: ১৫。
৮৮. তাকি উসমানি, তাওযীহুল কুরআন: ৩/৩৪৩-৩৪৪।
📄 কুরআনের অতিরিক্ত ওহিতে সংবাদ প্রদান
এছাড়া কুরআনের অতিরিক্ত ওহিতে মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বিভিন্ন সুসংবাদ ও ঘটে যাওয়া বিষয়ের সংবাদ ইত্যাদিও প্রদান করেছেন। এ বিষয়েও আমরা দুটি প্রমাণ উপস্থাপন করছি।
প্রমাণ-০১ : বদর যুদ্ধে মহান আল্লাহ ফেরেশতা পাঠিয়ে মুসলিম বাহিনীকে সাহায্য করেন। উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদের মনোবল চাঙা রাখার জন্য বদরের সাহায্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এ যুদ্ধের প্রাক্কালে আয়াত নাযিল হয় :
وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ بِبَدْرٍ وَأَنْتُمْ أَذِلَّةٌ فَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ.
“আল্লাহ তো বদরে তোমাদেরকে সাহায্য করেছেন, যখন তোমরা ছিলে দুর্বল। সুতরাং আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করো। যাতে তোমরা শুকুরগুজার হতে পারো।”৮৯
বদরের যুদ্ধে যে মহান আল্লাহ ফেরেশতা দিয়ে সাহায্য করবেন যুদ্ধের আগেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলিম বাহিনীকে এই সুসংবাদ শুনিয়ে দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন :
إِذْ تَقُوْلُ لِلْمُؤْمِنِينَ أَلَنْ يَكْفِيَكُمْ أَنْ يُمِدَّكُمْ رَبُّكُمْ بِثَلَاثَةِ آلَافٍ مِّنَ الْمَلَائِكَةِ مُنْزَلِينَ . بَلَى إِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا وَيَأْتُوكُمْ مِنْ فَوْرِهِمْ هَذَا يُمْدِدْكُمْ رَبُّكُمْ بِخَمْسَةِ آلَافٍ مِّنَ الْمَلَائِكَةِ مُسَوِّمِينَ.
“(হে নবী) যখন আপনি মুমিনদেরকে বলছিলেন, তোমাদের জন্য কি যথেষ্ট নয় যে, তোমাদের প্রতিপালক তিন হাজার ফেরেশতা অবতীর্ণ করে তোমাদের সাহায্য করবেন? অবশ্যই, তোমরা যদি ধৈর্যধারণ করো, তাকওয়া অবলম্বন করো আর এ মুহূর্তে যদি অতর্কিতে তারা তোমাদের উপর হামলা করে তাহলে তোমাদের রব তোমাদেরকে সাহায্য করবেন চিহ্নিত পাঁচ হাজার ফেরেশতা দিয়ে।”৯০
বদর যুদ্ধের প্রক্কালে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলিম বাহিনীকে এই যে সুসংবাদ শোনালেন, কুরআন মাজীদের কোথাও এ সুসংবাদ উল্লেখিত হয়নি। অথচ মহান আল্লাহ এই বিষয়টিকে নিজের দিকে সম্পৃক্ত করে বলেন :
وَمَا جَعَلَهُ اللَّهُ إِلَّا بُشْرَى لَكُمْ وَلِتَطْمَئِنَّ قُلُوبُكُمْ بِهِ وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ.
“আল্লাহ এ ব্যবস্থা করেছিলেন তোমাদের জন্য সুসংবাদ-স্বরূপ এবং তোমাদের অন্তরের স্থিরতার জন্য। আর সাহায্য তো কেবল পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে।"৯১
তাহলে এই সুসংবাদ নবীজি নিজের পক্ষ থেকে দিয়েছিলেন নাকি ওহির মাধ্যমে? যদি বলি, ওহির মাধ্যমে দিয়েছিলেন, তবে মানতে হবে, তাঁর নিকট কুরআনের অতিরিক্ত ওহি নাযিল হতো। আর যদি বলি, তিনি নিজের পক্ষ থেকে এ সুসংবাদ শুনিয়েছিলেন, তবে আমাদের মানতে হবে, নবীজির নিজের কথাকেও মহান আল্লাহ তাঁর নিজের কথা বলে গ্রহণ করেছেন। তবে দ্বিতীয় মতটি এখানে গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা আল্লাহ সাহায্য করবেন কি না, কীভাবে করবেন—তা ওহি ছাড়া নবীজির জন্য জানা সম্ভব নয়। অর্থাৎ এই সুসংবাদ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআনের অতিরিক্ত ওহির মাধ্যমেই জানতে পেরেছিলেন।
প্রমাণ-০২: নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার তাঁর এক স্ত্রীকে একটি গোপন কথা বলেন। এ নিয়ে এক অপূর্ব ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি আল কুরআনে বর্ণিত হয়েছে :
وَإِذْ أَسَرَّ النَّبِيُّ إِلَى بَعْضٍ أَزْوَاجِهِ حَدِيثًا فَلَمَّا نَبَّأَتْ بِهِ وَأَظْهَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ عَرَّفَ بَعْضَهُ وَأَعْرَضَ عَنْ بَعْضٍ فَلَمَّا نَبَّأَهَا بِهِ قَالَتْ مَنْ أَنْبَأَكَ هُذَا قَالَ نَبَّأَنِي الْعَلِيمُ الْخَبِيرُ.
“নবী যখন একটি কথা তাঁর এক স্ত্রীকে বলেন। অতঃপর স্ত্রী যখন তা বলে দেয় আর আল্লাহ তা নবীর কাছে প্রকাশ করে দেন তখন নবী কিছু কথা বলেন আর কিছু কথা উহ্য রাখেন। যখন তিনি স্ত্রীকে তা বলেন, স্ত্রী তাঁকে বলে, এ কথা আপনাকে কে জানাল? নবী বলেন, আমাকে জানিয়েছেন সর্বজ্ঞ মহাজ্ঞানী।”৯২
দেখুন, নবীজির বলা গোপন কথা যখন তাঁর সম্মানিতা স্ত্রী প্রকাশ করে দেন তখন মহান আল্লাহ সংবাদটি নবীজিকে জানিয়ে দেন। কিন্তু এ সংবাদ আল কুরআনের কোথাও সংকলিত নেই। সুতরাং এ সংবাদ মহান আল্লাহ কুরআনের অতিরিক্ত ওহির মাধ্যমেই তাঁর নবীকে জানিয়েছিলেন।
টিকাঃ
৮৯. সূরা [৩] আলে ইমরান, আয়াত: ১২৩।
৯০. সূরা [৩] আলে ইমরান, আয়াত: ১২৪ ও ১২৫。
৯১. সূরা [৩] আলে ইমরান, আয়াত: ১২৬。
৯২. সূরা [৬৬] তাহরীম, আয়াত: ০৩。
📄 হাদীসের বিধান কুরআনের স্বীকৃতি
অনেক বিধান এমন আছে যা প্রথমত কুরআনের অতিরিক্ত ওহি দ্বারা সাব্যস্ত ও প্রচলিত হয়েছে। পরে কুরআনে তার নির্দেশ বা স্বীকৃতি নাযিল হয়েছে। এর দ্বারা যেমন কুরআনের অতিরিক্ত ওহি নাযিল হওয়া প্রমাণিত হয়, তেমনি তার মর্যাদাও বোঝা যায়। দুটি প্রমাণ দেখুন।
প্রমাণ-০১: ইসলামের প্রথম যুগে মাক্কি জীবনেই ওযুর বিধান প্রদত্ত হয়। তা সাব্যস্ত হয় কুরআনের অতিরিক্ত ওহি দ্বারা। আর ওযু সংক্রান্ত কুরআনের আয়াত নাযিল হয় মদীনায় হিজরতের অনেক পরে।
মাক্কি জীবনে মিরাজের পর থেকে যখন সালাত ফরয হয় তখন থেকেই তা ওযুসহ আদায়ের বিধান দেওয়া হয়। মাদানি জীবনে নবীজি সাহাবিদের নিকট থেকে এ বিষয়ক প্রশ্নের সম্মুখীন হন যে, আমরা পানি ব্যবহারে অক্ষম হলে কী করব? তখন তায়াম্মুমের বিধান দিয়ে মহান আল্লাহ সূরা মায়িদাহর ৬ নং আয়াতটি নাযিল করেন। এ আয়াতে প্রসঙ্গক্রমে ওযুর বিধানও আলোচিত হয়। এর আগে আল কুরআনে কোথাও ওযুর বিধান আলোচিত হয়নি। অথচ এ আয়াত থেকেই পরিষ্কার বোঝা যায় যে, আয়াতটি নাযিলের আগ থেকেই ওযুর বিধান কার্যকর ছিল। সাহাবিরা অপারগতার কারণে ওযু করতে না পারলে করণীয় জানতে চাইলে আয়াতটি নাযিল হয়। ৯৩
প্রমাণ-০২: মি'রাজের রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয হয়। ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারছি, তখন কোনো সালাতের ওয়াক্ত হলে 'الصَّلَاءُ جَامِعَةُ' বলে ঘোষণা দেওয়া হতো।৯৪ হিজরতের পর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করে সালাতের দিকে আহ্বানের জন্য আযান চালু করেন। সালাতের জন্য ঘোষণা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে এবং তার পদ্ধতি বাতলে দিয়ে আল কুরআনে কোনো আয়াত নাযিল হয়নি। কিন্তু সালাতের জন্য ঘোষণা দেওয়াকে শরীআতের সাধারণ বিধান হিসাবে আল কুরআনের একাধিক আয়াতে উল্লেখ রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে:
وَإِذَا نَادَيْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ اتَّخَذُوْهَا هُزُوًا وَلَعِبًا ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَعْقِلُوْنَ .
“যখন তোমরা সালাতের প্রতি আহ্বান করো, তারা এটাকে খেল-তামাশার বিষয় হিসাবে গ্রহণ করে। কেননা তারা নির্বোধ সম্প্রদায়। "৯৫
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ.
“হে মুমিনগণ, জুমুআহর দিন যখন সালাতের জন্য আহ্বান করা হয় তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং ব্যবসা পরিত্যাগ করো। এটা তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা জানতে পারো।"৯৬
এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কুরআনের অতিরিক্ত ওহির মাধ্যমে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সকল বিধান প্রবর্তন করেছেন কুরআনের দৃষ্টিতে সে সকল বিধানও শরীআতের সাধারণ বিধানের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। কুরআনে উল্লেখিত ও হাদীসে উল্লেখিত বিধানের মাঝে মর্যাদাগত তারতম্য নেই। উভয় বিধানই ওহি দ্বারা সাব্যস্ত।
টিকাঃ
৯৩. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৪৬০৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৩৬৭; ইবনুল আরাবি, আহকামুল কুরআন ২/৪৭。
৯৪. সহীহ ইবন হিব্বান: ২৮৮৪。
৯৫. সূরা [৫] মায়িদাহ, আয়াত: ৫৮。
৯৬. সূরা [৬২] জুমুআহ, আয়াত: ০৯。
📄 শরীআত প্রণয়নে নবীজির অধিকার
উপরে আলোচনার আমরা দেখেছি, মহান আল্লাহ আল কুরআনের বাইরেও শরীআতের বিধান-সংবলিত ওহি নাযিল করেছেন। সুতরাং শরয়ি বিধান জানার জন্য শুধু কুরআনের উপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআনের অতিরিক্ত ওহির মাধ্যমে অনেক শরয়ি বিধান বর্ণনা করেছেন, আদেশ-নিষেধ ও হালাল-হারামের বিধান প্রদান করেছেন। আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
قَالَ عَذَابِي أُصِيبُ بِهِ مَنْ أَشَاءُ وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ فَسَأَكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُوْنَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَالَّذِينَ هُمْ بِآيَاتِنَا يُؤْمِنُوْنَ . الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنْزِلَ مَعَهُ أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ.
“তিনি (আল্লাহ) বলেন, আমি যাকে চাই আমার আযাবে নিপতিত করি, আর আমার দয়া সকল কিছুতে পরিব্যাপ্ত। অতঃপর তা আমি লিপিবদ্ধ করি তাদের জন্য যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, যাকাত প্রদান করে এবং আমার আয়াতে বিশ্বাসী ওই সমস্ত লোকের জন্য যারা এই রাসূলের অনুসরণ করে, যিনি উম্মি নবী, যার কথা তারা তাদের কাছে থাকা তাওরাত ও ইনজীলে লিখিত পায়। এই রাসূল তাদের সৎকাজের আদেশ করেন, অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করেন এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করে দেন আর নিকৃষ্ট বস্তুসমূহ নিষিদ্ধ করে দেন। তিনি তাদের ভার ও গলার বেড়ি নামিয়ে দেবেন, যা তাদের উপর চাপানো ছিল। সুতরাং যারা তাঁর প্রতি ঈমান এনেছে, তাঁর পক্ষাবলম্বন করেছে, তাঁকে সাহায্য করেছে এবং তাঁর সাথে অবতীর্ণ জ্যোতির অনুসরণ করেছে, তারাই কৃতকার্য।”৯৭
এ আয়াতে হালাল-হারামের সম্পর্ক কিতাবের সাথে করা হয়নি, বরং রাসূলের সাথে করা হয়েছে। আয়াতে উল্লেখিত )يُحِلُّ( 'হালাল করে দেন' ও )يُحَرِّمُ( 'নিষিদ্ধ করে দেন' ক্রিয়াপদ দুটির কর্তা মহান আল্লাহ নন, বরং উম্মি নবী। উপরন্তু কুরআনের আলোকে প্রমাণিত ন্যায় ও অন্যায় কাজের আদেশ-নিষেধ থেকে পৃথক করে এই হারাম-হালালের বিধান দানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন :
قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُوْنَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَا يُحَرِّمُوْنَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلَا يَدِينُوْنَ دِيْنَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حَتَّى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُوْنَ.
“কিতাবিদের মধ্যে যারা ঈমান রাখে না আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তাকে হারাম মনে করে না আর গ্রহণ করে না সত্য দীনকে, তাদের সাথে যুদ্ধ করো, যতক্ষণ না তারা হেয় হয়ে নিজ হাতে জিযিয়া প্রদান করে।"৯৮
এ আয়াতে আল্লাহর সাথে রাসূলকেও 'হারام করেছেন' ক্রিয়ার কর্তা বানানো হয়েছে।
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন:
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُوْنَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا.
"যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ের ফায়সালা করেন তখন কোনো মুমিন নারী ও পুরুষের অন্যথা করার অধিকার নেই। যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হলো সে তো সুস্পষ্ট ভ্রান্তিতে পতিত হলো।"৯৯
এ আয়াতেও আল্লাহর সাথে তাঁর রাসূলকে 'ফায়সালা করেন' ক্রিয়ার কর্তা বানানো হয়েছে। এবং উভয়ের মাঝে রয়েছে 'ও' (১) সংযোজক অব্যয়।
আয়াতগুলোর সরল অর্থের আলোকে বিধান প্রণয়নে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিপূর্ণ অধিকার সাব্যস্ত হয়। তবে অন্যান্য দলীলের সমন্বয়ে আমরা বিশ্বাস করি, এক্ষেত্রে মহান আল্লাহর অধিকার যেমন স্বয়ংসম্পূর্ণ, নবীজির অধিকার তেমন স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। তবে এ কথা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয় যে, এসব আয়াতের অর্থ মূলত মহান আল্লাহ আল কুরআনে যেসব বিধান উল্লেখ করেছেন নবীজি কেবল তার প্রচারক। কেননা এ কথা যেমন আয়াতের ব্যাকরণ-সম্মত ও উম্মাহর সর্বজনস্বীকৃত অর্থের পরিপন্থী, তেমনি এ কথার দ্বারা সরল অর্থ সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হয়ে যায় এবং আয়াতের এ সংক্রান্ত আলোচনা একেবারেই অর্থহীন হয়ে পড়ে।
আয়াতগুলোর যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা রয়েছে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসে। তিনি বলেছেন :
أَيَحْسَبُ أَحَدُكُمْ مُتَّكِنَّا عَلَى أَرِيكَتِهِ قَدْ يَظُنُّ أَنَّ اللَّهَ لَمْ يُحَرَّمْ شَيْئًا إِلَّا مَا فِي هَذَا الْقُرْآنِ أَلَا وَإِنِّي وَاللهِ قَدْ وَعَظْتُ وَأَمَرْتُ وَنَهَيْتُ عَنْ أَشْيَاءَ إِنَّهَا لَمِثْلُ الْقُرْآنِ أَوْ أَكْثَرُ.
“তোমাদের কেউ কি আপন আসনে হেলান দিয়ে ধারণা করে যে, এই কুরআনে যা আছে তা ছাড়া আর কিছুই আল্লাহ নিষিদ্ধ করেননি? শুনে রাখো, আল্লাহর কসম, নিশ্চয় আমিও তোমাদের উপদেশ দিয়েছি, অনেক কিছুর আদেশ করেছি এবং নিষিদ্ধ করেছি—তা কুরআনের অনুরূপ অথবা তারও অধিক।"১০০
হাদীসের এই বাচনভঙ্গি থেকে বোঝা যায়, আল কুরআনের অতিরিক্ত যেসব বিধিবিধান নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করেছেন তা তাঁর নিজের কথা নয়; বরং মহান আল্লাহরই বিধান। কেননা প্রথমে তিনি প্রশ্ন করেছেন, 'তোমাদের কেউ কি... ধারণা করে যে, কুরআনে যা আছে তা ছাড়া আর কিছুই আল্লাহ নিষিদ্ধ করেননি?' এ প্রশ্নের অর্থ হচ্ছে, মহান আল্লাহ আল কুরআনের বাইরেও অনেক বিধান দিয়েছেন। কিন্তু সে সকল বিধান তিনি কীভাবে দিয়েছেন? এ প্রশ্নের জবাবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আমিও তোমাদের... অনেক কিছুর আদেশ করেছি এবং নিষিদ্ধ করেছি—তা কুরআনের অনুরূপ অথবা তার অধিক।' অর্থাৎ কুরআনের বাইরে আল্লাহ তাআলা যে সকল বিধান দিয়েছেন সেগুলোই আমি তোমাদের জানিয়েছি।
আরো খেয়াল করুন, আল্লাহর দেওয়া কুরআন-বহির্ভূত বিধান বর্ণনা করাকে নবীজি বলছেন, 'আমিও... অনেক কিছুর আদেশ করেছি এবং নিষিদ্ধ করেছি'। অর্থাৎ কুরআনের অতিরিক্ত ওহির বিধান নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক উম্মাতকে শোনানোই নবীজির বিধান দান হিসাবে সাব্যস্ত।
টিকাঃ
৯৭. সূরা [৭] আ'রাফ, আয়াত: ১৫৬ ও ১৫৭।
৯৮. সূরা [৯] তাওবাহ, আয়াত: ২৯。
৯৯. সূরা [৩৩] আহযাব, আয়াত: ৩৬。
১০০. সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৩০৫০। হাদীসটিকে আব্দুল হক ইশবীলি প্রমাণিত হিসাবে গ্রহণ করেছেন এবং আলবানি এর সনদকে হাসান বলেছেন। দেখুন: আল আহকামুল উসতা : ১/১০৫; সিলসিলাহ সহীহাহ : ২/৫৪১-৫৪২。