📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 নববি ভাষ্য ও সাহাবিদের বুঝ প্রত্যাখ্যানের ফল

📄 নববি ভাষ্য ও সাহাবিদের বুঝ প্রত্যাখ্যানের ফল


যুগে যুগে মহান আল্লাহ মানব জাতির হিদায়াতের জন্য নবী-রাসূল (আ.) প্রেরণ করেছেন। তাঁদের অবর্তমানে তাঁদের উম্মাত পথ হারিয়ে ফেলেছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তাঁর উম্মাতও পথ হারিয়ে বহুধা বিভক্ত হয়ে যাবে। এইসব দল-উপদলের মধ্যে শুধু তারাই হকের উপর টিকে থাকতে পারবে যারা তাঁর ও তাঁর সাহাবিদের পথের উপর থাকবে। হাদীস শরীফে এসেছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إِنَّ بَنِي إِسْرَائِيلَ تَفَرَّقَتْ عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ مِلَّةً وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ مِلَّةً كُلُّهُمْ فِي النَّارِ إِلَّا مِلَّةً وَاحِدَةً قَالُوا: وَمَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي.
বনি ইসরাঈল ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল। আর আমার উম্মাত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। সকলেই জাহান্নামে যাবে, একটি দল ছাড়া। সাহাবাগণ (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, এই দলটি কারা? তিনি বললেন,
আমি ও আমার সাহাবিগণ যে মতের উপর আছি। ৪৮
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলেছে। তাঁর ইন্তিকালের পর সাহাবিদের যুগ থেকে বিভ্রান্তি ও বিভক্তি শুরু হয়। বিভ্রান্তরা বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বিভ্রান্তি ও বিভক্তির বিস্তারিত ইতিহাস ও কার্যকারণ বর্ণনা ও পর্যালোচনার অবকাশ এ পুস্তকে নেই। আমরা শুধু বিভ্রান্তির একটি কারণের সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা করব।
এই সকল বিভ্রান্ত উপদলগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে ভয়ংকর সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনাকারী খারিজি সম্প্রদায়। তাদের বিভ্রান্তির অন্যতম প্রধান কারণ কুরআন ও ইসলাম বোঝার ক্ষেত্রে নববি ব্যাখ্যা ও সাহাবিদের বুঝ প্রত্যাখ্যান করা।
আলী (রা.) ইয়ামান থেকে মাটি মিশ্রিত কিছু স্বর্ণ প্রেরণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাধারণ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে উক্ত স্বর্ণ চারজন নওমুসলিম আরব নেতার মধ্যে বণ্টন করে দেন। এতে উপস্থিতির মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক-কেন তিনি সকল যোদ্ধাকে না দিয়ে সাধারণ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে মাত্র চারজনকে দিলেন! প্রশ্ন করে এটা জেনে নেওয়ার অধিকারও তাদের আছে।
কিন্তু খারিজি সম্প্রদায়ের অন্যতম গুরুজন যুল খুওয়াইসিরার মনে কোনো খটকা জাগে না। তিনি বুঝে নেন যে, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্যায় বণ্টন করেছেন। আর নিজের বুঝকেই চূড়ান্ত সঠিক ধরে নিয়ে নবীর সামনে 'নাহি আনিল মুনকার' করে বসেন,
يَا رَسُوْلَ اللهِ اتَّقِ اللَّهَ وَاللَّهِ مَا عَدَلْتَ].
হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহকে ভয় করুন। আল্লাহর কসম, আপনি ন্যায়বিচার করলেন না। ৪৯
এ ঘটনা যখন সংঘটিত হয় তখনও খারিজি সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটেনি। তবে এই ব্যক্তির অনুগামীদের মধ্য থেকে একটি বিভ্রান্ত দলের উদ্ভব ঘটবে মর্মে ভবিষ্যদ্বাণী করে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন:
إِنَّهُ يَخْرُجُ مِنْ ضِنْضِي هَذَا قَوْمٌ يَتْلُوْنَ كِتَابَ اللَّهِ رَطْبًا لَّا يُجَاوِزُ حَنَاجِرَهُمْ يَمْرُقُوْنَ مِنَ الدِّيْنِ كَمَا يَمْرُقُ السَّهْمُ مِنَ الرَّمِيَّةِ.
এই ব্যক্তির অনুগামীদের মধ্য থেকে একদল মানুষ বের হবে, যারা সর্বদা হৃদয়গ্রাহীভাবে কুরআন তিলাওয়াত করবে। কিন্তু কুরআন তাদের কণ্ঠনালি অতিক্রম করবে না। তারা দীন থেকে বের হয়ে যাবে, যেমন তীর শিকারের দেহ ভেদ করে বের হয়ে যায়। ৫০
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ ভবিষ্যদ্বাণীতে আমরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, যে কেউ কেবল অধিকহারে কুরআন অধ্যয়ন করলেই সঠিক বুঝ পাবে না এবং সঠিক পথে চলতেও পারবে না। বরং সে দীন থেকে সম্পূর্ণ বের হয়েও যেতে পারে। এ হাদীস থেকে আমরা এ কথাও জানতে পারছি যে, তাদের এ পরিণতির অন্যতম কারণ নিজের বুঝকে সঠিকতার চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসাবে গ্রহণ করা এবং তার আলোকে নবীর বুঝকে শরীআত-বিরোধী আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করা-কুরআন ও হাদীসের মাঝে সংঘর্ষ আবিষ্কার করা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে মুখোমুখি দাঁড় করানো।
৩৫ হিজরিতে ইসলামি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান খলীফা উসমান (রা.) কতিপয় বিদ্রোহীর হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন। তারপর আলী (রা.) খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এ সময় উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের বিচার করার আগে মুআবিয়া (রা.) আলী (রা.)-এর আনুগত্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। আলী (রা.)-এর পক্ষ থেকে বলা হয়, ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার আগে বিদ্রোহীদের বিচার শুরু করলে বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পেতে পারে। কাজেই আগে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এ মতভিন্নতার ফলে সিফফীনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করার জন্য একটি সালিশি মজলিস গঠন করে।
এ সময় আলী (রা.)-এর অনুসারীদের মধ্য থেকে কয়েক হাজার মানুষ তাঁর দল ত্যাগ করে। ইসলামের ইতিহাসে এদেরকে খারিজি অর্থাৎ দলত্যাগী বা বিদ্রোহী বলা হয়। তারা দাবি করে যে, একমাত্র কুরআনের আইন ও আল্লাহর বিধান ছাড়া কিছুই চলতে পারে না। কেননা আল্লাহ বলেছেন :
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ. “হুকুম শুধুই আল্লাহর।”৫১
তারা বলেন, মুআবিয়া (রা.)-এর দল সীমালঙ্ঘনকারী। কাজেই আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। এ বিধান আল্লাহ তাআলার। সুতরাং আত্মসমর্পণের আগেই যুদ্ধ থামানো বা এ বিষয়ে মানুষকে সালিশ বানানো আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের বিরোধিতা। আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوْا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِي إِلَى أَمْرِ اللَّهِ.
“মুমিনদের দুটি দল যুদ্ধে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবে। তবুও যদি একটি দল অন্য দলের উপর সীমালঙ্ঘন করে, তাহলে যারা সীমালঙ্ঘন করছে তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকো, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর বিধানের দিকে ফিরে আসে।"৫২
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَبِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ .
“আর যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান ফায়সালা বিচার করে না, তারা কাফির। "৫৩
এ সকল আয়াত উল্লেখ করে খারিজিরা দাবি করেন যে, আলী, মুআবিয়া (রা.) ও তাঁদের অনুসারীগণ সকলেই কুরআন অমান্য করে কাফির হয়ে গেছেন। এরপর তারা তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন।
সাহাবিদের অনেকেই তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, আল্লাহর কালাম বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে পারঙ্গম হলেন আল্লাহর রাসূলের সাহাবাগণ। কেননা কুরআন তাঁদের সামনে নাযিল হয়েছে এবং তাঁরা সরাসরি নবীজির কাছ থেকে এর মর্ম জেনেছেন। সাহাবিদের বুঝের বিপরীতে তোমরা কুরআনের যে মর্ম বুঝেছ তা সঠিক হতে পারে না। বরং তোমাদের বুঝের বিপরীতে তাঁদের ব্যাখ্যাই সঠিক।
আব্দুল্লাহ ইবন যুবাইরের সময় খারিজি সম্প্রদায়ের দুজন লোক ইবন উমার (রা.)-এর কাছে এসে বলেন, মানুষেরা শেষ হয়ে যাচ্ছে, আর আপনি নবীর সাহাবি, কেন যুদ্ধে বের হচ্ছেন না? তিনি বলেন, আমি যুদ্ধে বের হচ্ছি না, কেননা আল্লাহ আমার ভাইয়ের রক্ত হারাম করেছেন। তখন তারা বলেন, আপনি এ কথা বলছেন, কেন আল্লাহ কি যুদ্ধের নির্দেশ দিয়ে বলেননি :
وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُوْنَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ .
"এবং তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকো, যতক্ষণ না ফিতনা দূরীভূত হয় এবং দীন কেবল আল্লাহর জন্য হয়।?"৫৪
তখন আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা.) তাদেরকে বলেন:
فَاتَلْنَا حَتَّى لَمْ تَكُنْ فِتْنَةٌ وَكَانَ الدِّيْنُ لِلَّهِ وَأَنْتُمْ تُرِيدُوْنَ أَنْ تُقَاتِلُوْا حَتَّى تَكُوْنَ فِتْنَةٌ وَيَكُوْنَ الدَّيْنُ لِغَيْرِ اللهِ.
আমরা যুদ্ধ করেছিলাম, তাতে ফিতনা দূরীভূত হয়েছিল এবং আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর তোমরা চাও যে, তোমরা যুদ্ধ করবে যাতে ফিতনা প্রতিষ্ঠিত হয় আর দীন আল্লাহর ছাড়া অন্যের হয়ে যায় (অর্থাৎ তোমাদের এ-জাতীয় কর্মের মাধ্যমে আল্লাহর দীন নয়, বরং ফিতনাই প্রতিষ্ঠিত হবে)।৫৫
সাহাবিদের এভাবে বোঝানোর কারণে কিছু মানুষ উগ্রতা ত্যাগ করলেও বাকিরা তাদের নিজেদের মতকেই সঠিক বলে গণ্য করতে থাকে। এবং সাহাবিদেরকে দালাল, আপসকামী ও অন্যায়ের সহযোগী ইত্যাদি আখ্যায়িত করে তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকে। তাদের হাতে খলীফাতুল মুসলিমীন আলী (রা.)-সহ অসংখ্য মুসলিম শাহাদত-বরণ করেন।
এই খারিজি সম্প্রদায়ের অধিকাংশ সদস্য ছিল যুবক। এদের ধার্মিকতা ও সততা ছিল অতুলনীয়। রাতদিন নফল সালাতে দীর্ঘ সিজদার কারণে তাদের কপালে দাগ পড়ে গিয়েছিল। তাদের ক্যাম্পের পাশ দিয়ে গেলে কেবল কুরআন পাঠের আওয়াজই কানে আসত। কুরআন পাঠ করলে বা শুনলে তারা কাঁদতে কাঁদতে বেহুঁশ হয়ে যেত। ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তারা ছিল অত্যন্ত আন্তরিক।৫৬
এতৎসত্ত্বেও তারা কেন এভাবে বিভ্রান্ত হয়ে গেল! উপরের আলোচনায় এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে। তারা কুরআন ও ইসলাম বোঝার ক্ষেত্রে সাহাবিদের বুঝকে প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের বুঝকেই চূড়ান্ত গণ্য করেছে। এতে তারা সঠিক মর্ম বুঝতে না পেরে ভুল বুঝে, এক স্থানের বিষয় অন্য স্থানে প্রয়োগ করে ভ্রান্ত পথে চলে গেছে। আলী (রা.) তাদের বিভ্রান্তির কারণ উল্লেখ করে বলেছেন:
قَوْمٌ أَصَابَتْهُم فِتْنَةٌ فَعَمُوْا وَصَلُّوْا.
এই সম্প্রদায় (নিজ মতের পূজার) ফিতনায় নিপতিত হয়ে অন্ধ ও বধির হয়ে গেছে। ৫৭
আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা.) বলেছেন:
إِنَّهُمُ انْطَلَقُوا إِلَى آيَاتٍ نَزَلَتْ فِي الكُفَّارِ فَجَعَلُوْهَا عَلَى الْمُؤْمِنِينَ.
যে সকল আয়াত কাফিরদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে এরা সে সকল আয়াত নিয়ে মুমিনদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করেছে। ৫৮
মহান আল্লাহ কুরআন কারীমে বলেছেন:
لَا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُمْ بَعْضًا قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الَّذِينَ يَتَسَلَّلُونَ مِنْكُمْ لِوَاذًا فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ.
“(হে লোকসকল) তোমরা নিজেদের ক্ষেত্রে রাসূলের আহ্বানকে তোমাদের পারস্পরিক আহ্বানের মতো মামুলি বিষয় মনে করবে না। আল্লাহ যথার্থই জানেন, তোমাদের মধ্যে কারা বিভিন্ন বাহানায় সটকে পড়ে। সুতরাং যারা তার নির্দেশের বিরুদ্ধগামী হয় তারা যেন শঙ্কিত হয়-তারা ফিতনায় নিপতিত হতে পারে অথবা তাদের পাকড়াও করতে পারে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।”
জি, আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণই তাদের ফিতনাগ্রস্ত ও বিভ্রান্ত হওয়ার মূল কারণ। তারা কুরআন বুঝতে রাসূলের ব্যাখ্যা গ্রহণ করেননি। তাঁর ব্যাখ্যাকে তারা তাদের নিজেদের ব্যাখ্যার মতো মামুলি মনে করেছে, যা অন্যের জন্য মান্য করা আবশ্যক নয়। যা দুনিয়াতে তাদেরকে ফিতনাগ্রস্ত করেছে আর আখিরাতে অপেক্ষা করছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
তাদের এ বিভ্রান্তি এমন মারাত্মক ফিতনা যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেশকিছু হাদীসে উম্মাতকে তাদের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। এমনকি এ কথা পর্যন্ত বলেছেন যে, আমি তাদেরকে পেলে হত্যা করব, তোমরাও তাদেরকে পেলে হত্যা করবে। তিনি বলেছেন:
لَئِنْ أَدْرَكْتُهُمْ لَأَقْتُلَنَّهُمْ قَتْلَ ثَمُودَ (قَتْلَ عَادٍ).
আমি তাদেরকে পেলে হত্যা করে নির্মূল করব যেভাবে সামূদ বা আদ জাতিকে হত্যা করে নির্মূল করা হয়েছে।৬০
অন্য হাদীসে তিনি বলেছেন :
فَأَيْنَمَا لَقِيتُمُوْهُمْ فَاقْتُلُوْهُمْ فَإِنَّ قَتْلَهُمْ أَجْرٌ لِمَنْ قَتَلَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
তোমরা তাদেরকে যেখানেই পাবে হত্যা করবে। কেননা যে তাদেরকে হত্যা করবে তার জন্য কিয়ামতের দিন এই হত্যার প্রতিদান রয়েছে। ৬১
জনৈক মহাপণ্ডিত তার লেখা ও বক্তৃতায় অনর্গল বলে চলেছেন, মুসলিম বিশ্বে ধর্মীয় উগ্রতা সৃষ্টির কারণ হাদীস। কুরআনকে সিন্দুকে তুলে রেখে হাদীসের তালীম দিয়েই উগ্রবাদী জঙ্গি ও আত্মঘাতী খুনি তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
কিন্তু উপরের আলোচনায় আমরা দেখলাম, মুসলিম বিশ্বের এই প্রথম ভয়ংকর সন্ত্রাসী খারিজি গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে মূলত হাদীসের বুঝ গ্রহণ না করে নিজের মতো করে কুরআন বুঝতে গিয়ে। এখনকার চিত্রও এর থেকে ভিন্ন নয়। বাস্তবতা হচ্ছে, উগ্রতার জন্য কুরআন-হাদীস নয়, বরং দায়ী হচ্ছে অজ্ঞতা-নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাহাবায়ে কিরাম (রা.) হয়ে প্রজন্ম পরম্পরায় চলে আসা স্বীকৃত তুরাসি বুঝকে প্রত্যাখ্যান করা।

টিকাঃ
৪৮. সুনান তিরমিযি, হাদীস: ২৬৩১; লালাকায়ি, শরহু উসুলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাহ, হাদীস : ১৪৫-১৪৭। লালাকায়ি, জাওরাকনি (আল আবাতীল: ২৮৩), বাগাবি (শারহুস সুন্নাহ : ১/২১৩), ইরাকি (তাখরীজুল ইহয়া', পৃ. ১১৩৩) সাখাবি (আল আজবিবাতুল মারযিয়্যাহ : ১৪৭) মুহাম্মাদ তাহির পাট্টানি (তাযকিরাতুল মাওযূআত, পৃ. ১৫) প্রমুখ মুহাদ্দিস হাদীসটিকে প্রমাণিত বলেছেন。
৪৯. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৪৩৫১; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০৬৪; সুনান আবু দাউদ, হাদীস : ৪৭৬৪; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ২৬৫৯。
৫০. প্রাগুক্ত।
৫১. সূরা [৬] আনআম, আয়াত: ৫৭; সূরা [১২] ইউসুফ, আয়াত: ৪০ ও ৬৭。
৫২. সুরা [৫৯] হুজুরাত, আয়াত: ০৯。
৫৩. সূরা [৫] মায়িদাহ, আয়াত: ৪৪。
৫৪. সূরা [৮] আনফাল, আয়াত: ৩ ৯。
৫৫. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৪৫১৩。
৫৬. খারিজিদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন: ইসলামের ইতিহাসে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ: একটি পর্যালোচনা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০০৬ (লেখক, ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রাহ.)। আরো দেখুন:
الخوارج أول الفرق في تاريخ الإسلام للدكتور ناصر بن عبد الكريم العقل, الخوارج نشأتهم، فرقهم، صفاتهم والرد على أبرز عقائدهم للدكتور سليمان بن صالح الغصن.
৫৭. ইবনুল আসীর, আন নিহায়াহ, ২/১৪৯; মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক: ১৮৬৫৬; ইবন আব্দুল বার, আত তামহীদ: ২৩/৩৩৫。
৫৮. ইবন আব্দুল বার, আত তামহীদ: ২৩/৩৩৪, ৩৩৫। সহীহ বুখারিতে (৯/১৬) তা'লীকান আসারটি উল্লেখ করা হয়েছে। ইবন হাজার এর সূত্রকে সহীহ বলেছেন। দেখুন: তাগলীকুত তা'লীক: ৫/২৫৯; ফাতহুল বারি ১২/২৮৬。
৫৯. সূরা [২৪] নূর, আয়াত: ৬৩。
৬০. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৪৩৫১; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০৬৪。
৬১. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৩৬১১; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১০৬৬।

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 কুরআনের অতিরিক্ত ওহি

📄 কুরআনের অতিরিক্ত ওহি


আল কুরআনে আলোচিত বিধিবিধানের বাইরেও অতিরিক্ত ওহি মহান আল্লাহ তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর নাযিল করেছেন। আল কুরআনেও তার অনেক প্রমাণ রয়েছে। এই পুস্তকের সংক্ষিপ্ত পরিসরে সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ নেই। আমরা সংক্ষিপ্ত আলোচনা পেশ করছি।

কিতাব ও হিকমত
আল কুরআনের বেশকিছু আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলের দায়িত্ব-কর্তব্যের কথা আলোচনা করেছেন। সেসব দায়িত্বের মধ্যে দুটি হচ্ছে, মানব জাতিকে 'কিতাব' শিক্ষা দেওয়া এবং 'হিকমত' শিক্ষা দেওয়া। যেমন একটি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে :
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ.
“তিনি উম্মিদের মধ্যে তাদের মধ্য থেকে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের নিকট তাঁর আয়াতসমূহ আবৃত্তি করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন; যদিও তারা ইতঃপূর্বে সুস্পষ্ট ভ্রান্তিতে ছিল।”৬২
এই কিতাব এবং হিকমত উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূলের নিকট অবতীর্ণ। মহান আল্লাহ বলেন :
وَأَنْزَلَ اللَّهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ.
“আর আল্লাহ আপনার উপর কিতাব ও হিকমত নাযিল করেছেন।”৬৩
তিনি আরো বলেন:
وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَمَا أَنْزَلَ عَلَيْكُمْ مِّنَ الْكِتَابِ وَالْحِكْمَةِ يَعِظُكُمْ بِهِ.
“তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ এবং তোমাদেরকে উপদেশ দানের জন্য তোমাদের উপর যে কিতাব ও হিকমত তিনি নাযিল করেছেন তা স্মরণ রেখো। "৬৪
এই কিতাব এবং হিকমত নাযিল করে মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলকে আদেশ করেছেন তিনি যা কিছু নাযিল করেছেন তা মানব জাতির কাছে পৌঁছে দিতে এবং তাদেরকে তা শিক্ষা দিতে। তিনি বলেন:
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ.
“হে রাসূল, আপনার রবের পক্ষ থেকে আপনার নিকট যা কিছু নাযিল করা হয়েছে তা পৌঁছে দিন।”৬৫
অর্থাৎ উম্মাত আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত দুটি জিনিস পেয়েছে: কিতাব ও হিকমত। কিতাব হচ্ছে আল কুরআন। আর কুরআনের বাইরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রাপ্ত যা কিছু উম্মাতের কাছে সংরক্ষিত আছে ইসলামের পরিভাষায় সেগুলোকে একত্রে হাদীস বা সুন্নাহ বলা হয়।
আল কুরআনে বারবার আল্লাহর প্রতি ঈমানের নির্দেশের সাথে সাথে রাসূলের প্রতি ঈমান আনার নির্দেশ উল্লেখিত হয়েছে। তেমনি বারবার আল্লাহর আনুগত্যের নির্দেশের সাথে সাথে রাসূলের আনুগত্যের নির্দেশ বর্ণিত হয়েছে। আর এ সকল আয়াতে বারবার কিতাবের সাথে সাথে হিকমত নাযিল হওয়া এবং কিতাব শিক্ষা দেওয়ার সাথে সাথে হিকমত শিক্ষা দেওয়ার কথা উল্লেখিত হয়েছে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান ও আনুগত্যের বিধান কীভাবে আদায় হবে? আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, অর্থাৎ এই কিতাব ও হিকমত মান্য করার মাধ্যমে।
ঈমান ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে যেমন বলা যায় না যে, আল্লাহ এবং রাসূল আলাদা নয়, বরং একই, আল্লাহর উপর ঈমান আনলেই এবং তাঁর আনুগত্য করলেই রাসূলের উপর ঈমান আনা এবং আনুগত্য করা হয়ে যায়। তেমনি যা মান্য করার মাধ্যমে এই বিধান আদায় হবে সেই কিতাব ও হিকমতও আলাদা। কিতাব হচ্ছে আল্লাহর কিতাব আল কুরআন আর হিকমত হচ্ছে রাসূলের সুন্নাত। 'কুরআন-বহির্ভূত ওহি নাযিলের কারণ কী' শিরোনামের আলোচনায় আমরা দেখব, রাসূলের আনুগত্যের পরীক্ষা দিতে হয় কুরআনের অতিরিক্ত ওহির বিধান মান্য করার মাধ্যমেই।
আল কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে বর্ণিত এই বিষয়টির ব্যাখ্যাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসে এভাবে বর্ণিত হয়েছে :
تَرَكْتُ فِيْكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوْا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا: كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
তোমাদের কাছে দুটি জিনিস রেখে গেলাম, যতক্ষণ তা আঁকড়ে ধরে রাখবে কিছুতেই পথভ্রষ্ট হবে না। তা হচ্ছে, আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ। ৬৬
এই বিষয়টি উল্লেখ করলে কেউ কেউ বলেন, কিতাব ও হিকমত আলাদা বিষয় নয়। বরং কিতাবই হিকমত। কেননা আল কুরআনের অনেক স্থানে কিতাব বা কুরআনকে হাকীম বা হিকমতপূর্ণ বলা হয়েছে।
উপরের আলোচনায় আমরা দেখতে পেলাম, তাদের এ দাবি সঠিক নয়। কুরআন অবশ্যই হাকীম বা হিকমতপূর্ণ গ্রন্থ। তবে এ সকল আয়াতে বর্ণিত কিতাব ও হিকমত আলাদা। কেননা এ বিষয়ক প্রত্যেকটি আয়াতে কিতাব ও হিকমত আলাদা আলাদাভাবে উল্লেখিত।
আল কুরআনে তো মহান আল্লাহকেও হাকীম বা প্রজ্ঞাময় বলা হয়েছে।
তিনি অবশ্যই হাকীম বা প্রজ্ঞাময়। তাই বলে কি আমরা বলতে পারি মহান আল্লাহ আল কুরআনের সমার্থক? তিনি ও তাঁর প্রেরিত কিতাব আল কুরআন এক ও অভিন্ন?
তাছাড়া তাদের বুঝের বিপরীতে রয়েছে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাখ্যা। আমরা কিছুতেই মহান আল্লাহ নিয়োজিত ব্যাখ্যাকারের ব্যাখ্যার বিপরীতে এসব ব্যক্তির বুঝ গ্রহণ করতে পারি না।

টিকাঃ
৬২. সূরা [৬২] জুমুআহ, আয়াত: ০২।
৬৩. সূরা [৪] নিসা, আয়াত: ১১৩。
৬৪. সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ২৩১。
৬৫. সূরা [৫] মায়িদাহ, আয়াত: ৬৭。
৬৬. মুআত্তা মালিক, হাদীস: ১৮৭৪।

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 কিতাব ও হিকমত

📄 কিতাব ও হিকমত


আল কুরআনের বেশকিছু আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলের দায়িত্ব-কর্তব্যের কথা আলোচনা করেছেন। সেসব দায়িত্বের মধ্যে দুটি হচ্ছে, মানব জাতিকে 'কিতাব' শিক্ষা দেওয়া এবং 'হিকমত' শিক্ষা দেওয়া। যেমন একটি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে :
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ.
“তিনি উম্মিদের মধ্যে তাদের মধ্য থেকে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের নিকট তাঁর আয়াতসমূহ আবৃত্তি করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন; যদিও তারা ইতঃপূর্বে সুস্পষ্ট ভ্রান্তিতে ছিল।”৬২
এই কিতাব এবং হিকমত উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূলের নিকট অবতীর্ণ। মহান আল্লাহ বলেন :
وَأَنْزَلَ اللَّهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ.
“আর আল্লাহ আপনার উপর কিতাব ও হিকমত নাযিল করেছেন।”৬৩
তিনি আরো বলেন:
وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَمَا أَنْزَلَ عَلَيْكُمْ مِّنَ الْكِتَابِ وَالْحِكْمَةِ يَعِظُكُمْ بِهِ.
“তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ এবং তোমাদেরকে উপদেশ দানের জন্য তোমাদের উপর যে কিতাব ও হিকমত তিনি নাযিল করেছেন তা স্মরণ রেখো। "৬৪
এই কিতাব এবং হিকমত নাযিল করে মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলকে আদেশ করেছেন তিনি যা কিছু নাযিল করেছেন তা মানব জাতির কাছে পৌঁছে দিতে এবং তাদেরকে তা শিক্ষা দিতে। তিনি বলেন:
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ.
“হে রাসূল, আপনার রবের পক্ষ থেকে আপনার নিকট যা কিছু নাযিল করা হয়েছে তা পৌঁছে দিন।”৬৫
অর্থাৎ উম্মাত আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত দুটি জিনিস পেয়েছে: কিতাব ও হিকমত। কিতাব হচ্ছে আল কুরআন। আর কুরআনের বাইরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রাপ্ত যা কিছু উম্মাতের কাছে সংরক্ষিত আছে ইসলামের পরিভাষায় সেগুলোকে একত্রে হাদীস বা সুন্নাহ বলা হয়।
আল কুরআনে বারবার আল্লাহর প্রতি ঈমানের নির্দেশের সাথে সাথে রাসূলের প্রতি ঈমান আনার নির্দেশ উল্লেখিত হয়েছে। তেমনি বারবার আল্লাহর আনুগত্যের নির্দেশের সাথে সাথে রাসূলের আনুগত্যের নির্দেশ বর্ণিত হয়েছে। আর এ সকল আয়াতে বারবার কিতাবের সাথে সাথে হিকমত নাযিল হওয়া এবং কিতাব শিক্ষা দেওয়ার সাথে সাথে হিকমত শিক্ষা দেওয়ার কথা উল্লেখিত হয়েছে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান ও আনুগত্যের বিধান কীভাবে আদায় হবে? আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, অর্থাৎ এই কিতাব ও হিকমত মান্য করার মাধ্যমে।
ঈমান ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে যেমন বলা যায় না যে, আল্লাহ এবং রাসূল আলাদা নয়, বরং একই, আল্লাহর উপর ঈমান আনলেই এবং তাঁর আনুগত্য করলেই রাসূলের উপর ঈমান আনা এবং আনুগত্য করা হয়ে যায়। তেমনি যা মান্য করার মাধ্যমে এই বিধান আদায় হবে সেই কিতাব ও হিকমতও আলাদা। কিতাব হচ্ছে আল্লাহর কিতাব আল কুরআন আর হিকমত হচ্ছে রাসূলের সুন্নাত। 'কুরআন-বহির্ভূত ওহি নাযিলের কারণ কী' শিরোনামের আলোচনায় আমরা দেখব, রাসূলের আনুগত্যের পরীক্ষা দিতে হয় কুরআনের অতিরিক্ত ওহির বিধান মান্য করার মাধ্যমেই।
আল কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে বর্ণিত এই বিষয়টির ব্যাখ্যাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসে এভাবে বর্ণিত হয়েছে :
تَرَكْتُ فِيْكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوْا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا: كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
তোমাদের কাছে দুটি জিনিস রেখে গেলাম, যতক্ষণ তা আঁকড়ে ধরে রাখবে কিছুতেই পথভ্রষ্ট হবে না। তা হচ্ছে, আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ। ৬৬
এই বিষয়টি উল্লেখ করলে কেউ কেউ বলেন, কিতাব ও হিকমত আলাদা বিষয় নয়। বরং কিতাবই হিকমত। কেননা আল কুরআনের অনেক স্থানে কিতাব বা কুরআনকে হাকীম বা হিকমতপূর্ণ বলা হয়েছে।
উপরের আলোচনায় আমরা দেখতে পেলাম, তাদের এ দাবি সঠিক নয়। কুরআন অবশ্যই হাকীম বা হিকমতপূর্ণ গ্রন্থ। তবে এ সকল আয়াতে বর্ণিত কিতাব ও হিকমত আলাদা। কেননা এ বিষয়ক প্রত্যেকটি আয়াতে কিতাব ও হিকমত আলাদা আলাদাভাবে উল্লেখিত।
আল কুরআনে তো মহান আল্লাহকেও হাকীম বা প্রজ্ঞাময় বলা হয়েছে। তিনি অবশ্যই হাকীম বা প্রজ্ঞাময়। তাই বলে কি আমরা বলতে পারি মহান আল্লাহ আল কুরআনের সমার্থক? তিনি ও তাঁর প্রেরিত কিতাব আল কুরআন এক ও অভিন্ন?
তাছাড়া তাদের বুঝের বিপরীতে রয়েছে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাখ্যা। আমরা কিছুতেই মহান আল্লাহ নিয়োজিত ব্যাখ্যাকারের ব্যাখ্যার বিপরীতে এসব ব্যক্তির বুঝ গ্রহণ করতে পারি না।

টিকাঃ
৬২. সূরা [৬২] জুমুআহ, আয়াত: ০২।
৬৩. সূরা [৪] নিসা, আয়াত: ১১৩。
৬৪. সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ২৩১。
৬৫. সূরা [৫] মায়িদাহ, আয়াত: ৬৭。
৬৬. মুআত্তা মালিক, হাদীস: ১৮৭৪。

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি

📄 তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি


উপরের আলোচনায় কুরআনে বর্ণিত কিতাব ও হিকমতের ব্যাখ্যায় আমরা ইমাম মালিক কর্তৃক মুআত্তায় সংকলিত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদীস উল্লেখ করেছি- তোমাদের কাছে দুটি জিনিস রেখে গেলাম, তোমরা যতক্ষণ তা আঁকড়ে ধরে রাখবে কিছুতেই পথভ্রষ্ট হবে না, তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ।
এই হাদীসের 'এবং তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ' অংশটি মিথ্যাচার বলে দাবি করে জনৈক পণ্ডিত লিখেছেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিদায় হজ্জের ভাষণে কুরআন এবং সুন্নাহ বা হাদীস অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন বলে প্রতিষ্ঠিত জনমত আছে। কিন্তু বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের অধীনে হাদীসের সর্বোচ্চ ডিগ্রি কামেল বা মাস্টার্স অব হাদীসের সিলেবাসভুক্ত ছয়টি প্রসিদ্ধ হাদীসগ্রন্থ [বুখারি, মুসলিম, তিরমিযি, আবু দাউদ, নাসায়ি, ইবন মাজাহ], এমনকি হাদীসের এনসাইক্লোপিডিয়া মুসনাদ আহমাদেও এ অংশটুকু নেই। সিহাহ সিত্তাহে দুটি সহীহ হাদীস আছে, যাতে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিদায় হজ্জের বিস্তারিত বর্ণনা আছে। তাতে সংশ্লিষ্ট অংশে কেবল আল্লাহর কিতাব অনুসরণের কথা বলা আছে।... ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত মুসলিম ও আবু দাউদ শরীফে বাংলায় লেখা আছে যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে বলেছেন কেবল আল্লাহর কিতাব অনুসরণ করলে আমরা পথভ্রষ্ট হব না। কিন্তু আমাদের শোনানো হয় উল্টা কথা। লক্ষাধিক সাহাবির উপস্থিতিতে দেওয়া নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঐতিহাসিক ভাষণ নিয়ে যারা মিথ্যা বলে বা সত্য গোপন করে তারা আমাদের হাজার বছর আগের হাদীস বর্ণনাকারীদের সত্যবাদিতার গ্যারান্টি-ওয়ারেন্টি দিচ্ছেন।
উদ্ধৃত বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, এই পণ্ডিত মহাশয়ের হাদীসশাস্ত্রের প্রাথমিক জানাশোনাও নেই। কোনো বিশেষ গ্রন্থে থাকা না-থাকার সাথে হাদীস বিশুদ্ধ হওয়া না-হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো হাদীস বিশুদ্ধ হওয়ার শর্তসমূহ পূরণ করলেই কেবল সহীহ বলে গণ্য হয়, তা যে কিতাবেই থাকুক। কোনো বিশেষ কিতাবে থাকা বা কোনো ব্যক্তি বিশেষের দাবি যথেষ্ট নয়। শুধু সহীহ হাদীস সংকলন করার মানসে 'সহীহ' শিরোনামে পুস্তক প্রণয়ন করেছেন ইমাম বুখারি, মুসলিম, ইবন খুযাইমা, ইবন হিব্বান (রাহ.) প্রমুখ মুহাদ্দিস ইমাম। কিন্তু তাঁরা প্রচেষ্টা করেছেন আর দাবি করেছেন বলেই মুসলিম উম্মাহ বিনা বিচারে তাঁদের কথা মেনে নেননি। তাঁদের পর শত শত মুহাদ্দিস ইমাম তাঁদের কিতাবের সকল হাদীস বারবার শাস্ত্রীয় মূলনীতির আলোকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। এভাবে তারা নিশ্চিত হয়েছেন ইমাম বুখারি ও মুসলিমের দাবি যথার্থ এবং তাঁদের প্রচেষ্টা সফল। উম্মাত যে বলে, বুখারি-মুসলিমে সংকলিত সকল হাদীস সহীহ, এটা এ কারণে নয় যে, এ গ্রন্থদ্বয় ইমাম বুখারি ও মুসলিম সংকলন করেছেন। বরং এ কারণে যে, এ উভয় কিতাবের হাদীস শাস্ত্রীয় নিরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। এবং এ কারণেই ইবন খুযাইমা ও ইবন হিব্বানের সকল হাদীস উম্মাত বিশুদ্ধ বলে মেনে নেয়নি।
তাছাড়া বিশুদ্ধ হাদীস কোনো একক বা কিছু নির্বাচিত গ্রন্থে সীমাবদ্ধ নয়। কোনো সংকলক বা নিরীক্ষক মুহাদ্দিস ইমাম তা দাবিও করেননি। ইমাম বুখারি ও মুসলিম দাবি করেছেন তাদের কিতাবে তারা কেবল সহীহ হাদীস সংকলন করেছেন। কিন্তু তারা এ দাবি করেননি যে, এর বাইরে আর কোনো সহীহ হাদীস নেই। সুতরাং কোনো হাদীস যদি শাস্ত্রীয় শর্তসমূহ পূরণ করে তবে তা সহীহ বলে গৃহীত হবে, যে কিতাবেই থাক না কেন।
এবং এ কথাও হাদীসশাস্ত্রের ছাত্রমাত্রই জানেন যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে সাহাবায়ে কিরাম সর্বদা পূর্ণাঙ্গ হাদীস বলেন না। বরং কখনো কখনো অংশবিশেষ বলেন, শুধু প্রয়োজনীয় অংশটুকু বলেই থেমে যান। কখনো পরবর্তী বর্ণনাকারীদের কেউ কেউ সংক্ষেপ করেন। সুতরাং কোনো বর্ণনায় কোনো অংশ না থাকা মানেই এ নয় যে, সে অংশ মিথ্যা বা ভুল। বরং এই অতিরিক্ত অংশ গ্রহণ- বর্জনের ক্ষেত্রেও হাদীসশাস্ত্রে সুনির্ধারিত নীতিমালা আছে।
তাছাড়া আমাদের উদ্ধৃত হাদীসটিতে এ কথা নেই যে, তা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজ্জে বলেছেন। হতে পারে তিনি অন্য কোনো সময় এ হাদীসটি বলেছেন। তাই বিদায় হজ্জের হাদীসগুলোতে উদ্দিষ্ট অংশটুকু না থাকাতে তার অস্তিত্ব সন্দেহযুক্ত হয়ে যায় না। তাছাড়া বিদায় হজ্জের ভাষণে নবীজি শুধু আল্লাহর কিতাবের কথা বলে থাকলেও তাতে সুন্নাহর অনুসরণ নাকোচ হয়ে যায় না। কারণ কুরআন-সুন্নাহয় এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে যে, একই বিধানের এক অংশ আজ এখানে বলা হয়েছে, আর তার বাকি অংশ অন্য কোনো সময়ে অন্য কোথাও বলা হয়েছে।
আমরা হাদীসটি উদ্ধৃত করেছি ইমাম মালিকের মুআত্তা গ্রন্থ থেকে। এখন আমরা দেখব হাদীসশাস্ত্রে মুআত্তা মালিকের অবস্থান কী এবং উদ্ধৃত হাদীসটির মান সম্পর্কে শাস্ত্রজ্ঞ মুহাদ্দিস ইমামদের মতামত কী? এ বিষয়ক আমাদের সংক্ষিপ্ত আলোচনায়, ইনশাআল্লাহ, স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এ বর্ণনার উদ্দিষ্ট অংশটুকু অসত্য বা মিথ্যাচার নয়; বরং সুপ্রমাণিত নববি বাণী। এ বিষয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব না, শুধু কতিপয় শাস্ত্রজ্ঞ ইমামের বক্তব্য উদ্ধৃত করব। মহান আল্লাহ তাওফীক দাতা।
ইমাম মুহাম্মাদ ইবন ইদরীস শাফিয়ি (রাহ.) বলেছেন :
مَا مِنْ كِتَابٍ أَكْثَرُ صَوَابًا بَعْدَ كِتَابِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مِنْ كِتَابِ مَالِكِ بْنِ أَنَسٍ يَعْنِي الْمُوَطَّأَ.
মহান আল্লাহর কিতাব আল কুরআনের পর ইমাম মালিক ইবন আনাসের মুআত্তার চেয়ে অধিক বিশুদ্ধ কিতাব আর নেই। ৬৭
কাযি আবু বাকর ইবনুল আরাবি (রাহ.) বলেছেন :
الْمُوَطَّأُ هُوَ الْأَصْلُ الْأَوَّلُ وَاللُّبَابُ وَكِتَابُ الْبُخَارِيِّ هُوَ الْأَصْلُ الثاني في هذَا الْبَابِ وَعَلَيْهِمَا بَنَى الْجَمِيعُ.
মুআত্তা হলো প্রথম ও শ্রেষ্ঠ উৎস। এবং বুখারির কিতাব এ বিষয়ে দ্বিতীয় উৎস। বাকি সব এ দুটির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ৬৮
আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতি (রাহ.) বলেছেন:
مَا مِنْ مُرْسَلٍ فِي الْمُوَطَأَ إِلَّا وَلَهُ عَاضِدُ أَوْ عَوَاضِدُ فَالصَّوَابُ أَنَّ الْمُوَطَّأَ صَحِيحٌ كُلُّهُ لَا يُسْتَثْنَى مِنْهُ شَيْءٌ.
মুআত্তায় সংকলিত সকল মুরসাল বর্ণনার এক বা একাধিক সমর্থক বর্ণনা আছে। সুতরাং বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, মুআত্তা পুরোটাই বিশুদ্ধ। একটি বর্ণনাও এর ব্যতিক্রম নয়। ৬৯
শায়খ সালিহ ইবন মুহাম্মাদ ফুল্লানি (রাহ.) বলেছেন:
فَظَهَرَ بِهَذَا أَنَّهُ لَا فَرْقَ بَيْنَ الْمُوَطَأَ وَالْبُخَارِيِّ وَصَحَّ أَنَّ مَالِكًا أَوَّلُ مَنْ صَنَّفَ فِي الصَّحِيحِ كَمَا ذَكَرَهُ ابْنُ عَبْدِ الْبَرِّ وَابْنُ الْعَرَبِيِّ الْقَاضِي وَالسُّيُوطِيُّ وَمُغْلَطَائِ وَغَيْرُهُمْ.
(মুআত্তার সনদ-বিচ্ছিন্ন বর্ণনার পর্যালোচনা শেষে তিনি বলেন) সুতরাং পরিস্ফুট হলো যে, মুআত্তা ও বুখারির মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। বিশুদ্ধ কথা এই যে, ইমাম মালিকই প্রথম বিশুদ্ধ হাদীসের পুস্তক সংকলন করেন। যেমনটি বলেছেন, ইবন আব্দুল বার, কাযি ইবনুল আরবি, সুয়ূতি, মুগলাতাই প্রমুখ মুহাদ্দিস। ৭০
যে সকল কিতাবে হাদীস সংকলিত হয়েছে শুদ্ধতার মান অনুযায়ী সে সকল কিতাবকে মুহাদ্দিস শাহ ওয়ালি উল্লাহ দেহলভি (রাহ.) পাঁচ স্তরে বিন্যস্ত করেছেন। প্রথম স্তরে শুধু তিনটি কিতাবের নাম উল্লেখ করেছেন। এর প্রথমটি হচ্ছে মুআত্তা মালিক। অন্য দুটি হচ্ছে সহীহ বুখারি ও সহীহ মুসলিম। এরপর ইমাম শাফিয়ির বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন :
وَاتَّفَقَ أَهْلُ الْحَدِيثِ عَلَى أَنَّ جَمِيعَ مَا فِيْهِ صَحِيحٌ عَلَى رَأْيِ مَالِكٍ وَمَنْ وَافَقَهُ وَأَمَّا عَلَى رَأْيِ غَيْرِهِ فَلَيْسَ فِيْهِ مُرْسَلٌ وَلَا مُنْقَطِعُ إِلَّا قَدِ اتَّصَلَ السَّنَدُ بِهِ مِنْ طُرُقٍ أُخْرَى فَلَا جَرَمَ أَنَّهَا صَحِيْحَةٌ مِنْ هَذَا الْوَجْهِ.
হাদীসশাস্ত্রের ইমামগণ একমত যে, মুআত্তার সকল বর্ণনা ইমাম মালিক ও তাঁর সমমনাদের নিকট সহীহ। আর অন্যদের মতেও মুআত্তার সনদ- বিচ্ছিন্ন সকল বর্ণনা অন্য বিভিন্ন সূত্রে মুত্তাসিল-অবিচ্ছিন্ন। সুতরাং এ দৃষ্টিকোণ থেকেও মুআত্তা বিশুদ্ধ হাদীসগ্রন্থ। ৭১
মুহাদ্দিস ইমামদের এই সকল বক্তব্য থেকে আমরা হাদীসশাস্ত্রে মুআত্তা মালিকের উচ্চতর মর্যাদা ও অবস্থানের কথা জানতে পারলাম। কোনো কোনো ইমাম মুআত্তাকে সহীহ বুখারি ও সহীহ মুসলিম থেকেও এগিয়ে রেখেছেন। কেননা মুআত্তাই হচ্ছে এ দুটি কিতাবের মূল। এবং ইমাম বুখারি ও মুসলিম এ কিতাবের রীতি অনুসরণ করেই তাদের কিতাব সংকলন করেছেন। মুআত্তা গ্রন্থিত হয়েছে সিহাহ সিত্তাহ ও মুসনাদ আহমদ সংকলনের বেশ আগে।
সিহাহ সিত্তাহর সংকলক ইমামগণ জন্মগ্রহণ করেছেন মুআত্তা সংকলক ইমাম মালিকের অনেক পরে। এ ছয় ইমামের প্রথম ব্যক্তি ইমাম বুখারি (রাহ.) জন্মগ্রহণ করেছেন ১৯৪ হিজরিতে। তার ১৫ বছর আগে ১৭৯ হিজরিতে ইমাম মালিক (রাহ.) ইন্তিকাল করেছেন। তখন ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলের বয়স মাত্র ১৫ বছর। সুতরাং মুআত্তা মালিকের ঐতিহাসিক মর্যাদা কিছুতেই সিহাহ সিত্তাহ ও মুসনাদ আহমাদ থেকে কম নয়। আর যে হাদীসটি মুআত্তায় সংকলিত হয়েছে সে হাদীস সিহাহ সিত্তাহ ও মুসনাদ আহমাদের অস্তিত্বের আগেই গ্রন্থবদ্ধ হয়েছে।
কেউ যদি এ প্রশ্ন করে যে, ইমাম বুখারি ও মুসলিম যেহেতু মুআত্তা মালিকের রীতি অনুসরণ করে কিতাব সংকলন করেছেন এবং মুআত্তার হাদীস তাদের 'সহীহ' শিরোনামের কিতাবে সংকলন করেছেন তবে মুআত্তার এই এত গুরুত্বপূর্ণ হাদীসটি এই শব্দে তারা কেন সংকলন করেননি? তবে কি তাদের মতে এটি গ্রহণযোগ্য ছিল না?
প্রশ্নকর্তার জ্ঞাতার্থে আমরা প্রথমেই বলে রাখি, গুরুত্বপূর্ণ হাদীসকে বিশেষ কোনো গ্রন্থে সংকলিত হতে হবে বা কোনো বিশেষ গ্রন্থে সংকলিত হলেই হাদীসটি গুরুত্বপূর্ণ হবে—এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। এবং এ ধারণাও ভুল যে, ইমাম বুখারি ও মুসলিম যে হাদীস সংকলন করেননি সে হাদীস তাদের নিকট অগ্রহণযোগ্য বা সে হাদীসের বিশুদ্ধতার মান বুখারি-মুসলিমে সংকলিত হাদীসের থেকে কম। বরং হাদীসের গুরুত্ব ও বিশুদ্ধতার মান নির্ধারণে যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত শাস্ত্রীয় মানদণ্ড আছে। যার সাথে বিশেষ ব্যক্তি দ্বারা বিশেষ কোনো কিতাবে সংকলিত হওয়া না-হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।
ইমাম বুখারি ও মুসলিমও দাবি করেননি যে, তাদের কিতাবে সংকলিত হাদীসের বাইরে কোনো সহীহ হাদীস নেই। বরং তারা সুস্পষ্ট করে বলেছেন, তাদের কিতাবে সংকলিত সকল হাদীস সহীহ। এবং এর বাইরেও প্রচুর সহীহ হাদীস আছে। ইমাম বুখারি (রাহ.) বলেছেন:
لَمْ أَخَرِّجُ فِي الْكِتَابِ إِلَّا صَحِيحًا وَمَا تَرَكْتُ مِنَ الصَّحِيحِ أَكْثَرُ.
আমি এই কিতাবে শুধু সহীহ হাদীসই সংকলন করেছি। আর যে সকল সহীহ হাদীস আমি আনিনি তার সংখ্যাই বেশি। ৭২
কেন তিনি অনেক সহীহ হাদীস সহীহ বুখারিতে আনেননি তার কারণও বলেছেন:
وَتَرَكْتُ مِنَ الصَّحَاحِ لِحَالِ الطُّوْلِ.
গ্রন্থের কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় অনেক সহীহ হাদীস ত্যাগ করেছি। ৭৩
ইমাম মুসলিম (রাহ.) বলেছেন :
إِنَّمَا أَخْرَجْتُ هُذَا الْكِتَابَ وَقُلْتُ هُوَ صِحَاحٌ وَلَمْ أَقُلْ أَنَّ مَا لَمْ أُخْرِجْهُ مِنَ الْحَدِيثِ فِي هَذَا الْكِتَابِ ضَعِيفٌ وَلَكِنِّي إِنَّمَا أَخْرَجْتُ هُذَا مِنَ الْحَدِيثِ الصَّحِيحِ لِيَكُوْنَ مَجْمُوْعًا عِنْدِي وَعِنْدَ مَنْ يَكْتُبُهُ عَنِّى فَلَا يَرْتَابُ فِي صِحَّتِهَا وَلَمْ أَقُلْ إِنَّ مَا سِوَاهُ ضَعِيفٌ.
আমি এই কিতাব সংকলন করেছি এবং বলেছি, এর হাদীসগুলো সহীহ। তবে এ কথা তো বলিনি যে, আমি এই কিতাবে যে হাদীস সংকলন করিনি তা দুর্বল। আমি সহীহ হাদীসের এই সংকলন এ জন্য প্রস্তুত করেছি যাতে আমার কাছে এবং আমার কাছ থেকে যারা কপি করে নেবে তাদের কাছে একটা সংগ্রহ থাকে, যার বিশুদ্ধতা নিয়ে সন্দেহ থাকবে না। আর আমি বলিনি যে, এর বাইরের সব হাদীস দুর্বল। ৭৪
আমাদের উল্লেখিত হাদীসটি ইমাম মালিক (রাহ.) তাঁর মুআত্তা গ্রন্থে সংকলন করেছেন। তিনি যদিও হাদীসটির সনদ উল্লেখ করেননি, কিন্তু আমরা দেখেছি, মুহাদ্দিস ইমামগণ বলেছেন, মুআত্তার সকল সনদ-বিচ্ছিন্ন হাদীসও সহীহ, কেননা অন্য সূত্রে তার অবিচ্ছিন্ন সনদ আছে। উপরন্তু ইবন আব্দিল বার (রাহ.) হাদীসটির অবিচ্ছিন্ন সনদ উল্লেখ করেছেন— কাসীর ইবন আব্দুল্লাহ ইবন আমর ইবন আওফ তার বাবা থেকে, তিনি তার দাদা থেকে। ৭৫
তাছাড়া এ শব্দে হাদীসটির বর্ণনাকারী হিসাবে সাহাবি আমর ইবন আওফ (রা.) একক নন। আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস, আবু হুরাইরা (রা.) প্রমুখ সাহাবি থেকেও এ শব্দে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। হাকিম, বাইহাকি, বাযযার, আবু বাকর شাফিয়ি, ইবন শাহীন, দারাকুতনি, লালকায়ি, মুরশিদ বিল্লাহ শাজারি প্রমুখ মুহাদ্দিস তা সংকলন করেছেন। ৭৬
হাদীসের এনসাইক্লোপিডিয়া মুসনাদ আহমাদ এবং সিহাহ সিত্তাহর সহীহ মুসলিম ও সুনান তিরমিযিতে এ হাদীসের সমর্থক একাধিক বর্ণনা রয়েছে। কয়েকটি বর্ণনা দেখুন :
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيَّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنِّي قَدْ تَرَكْتُ فِيْكُمْ مَا إِنْ أَخَذْتُمْ بِهِ لَنْ تَضِلُّوْا بَعْدِي الثَّقَلَيْنِ وَأَحَدُهُمَا أَكْبَرُ مِنَ الْآخَرِ: كِتَابُ اللَّهِ حَبْلُ مَمْدُودُ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ وَعِتْرَتِي أَهْلُ بَيْتِي.
আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি তোমাদের কাছে দুটি গুরুভার বিষয় রেখে যাচ্ছি। আমার পর তোমরা তা আঁকড়ে ধরে রাখলে পথভ্রষ্ট হবে না। তার একটি অপরটি থেকে বড়। ১. আল্লাহর কিতাব, তা আসমান থেকে জমিন পর্যন্ত প্রলম্বিত রশি, এবং ২. আমার আহ্ল বা পরিজন। ৭৭
عَنْ زَيْدِ بْنِ ثَابِتٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنِّي تَارِكٌ فِيْكُمْ خَلِيْفَتَيْنِ: كِتَابُ اللَّهِ وَأَهْلُ بَيْتِي.
যাইদ ইবন সাবিত (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি তোমাদের মাঝে দুটি প্রতিনিধি রেখে যাচ্ছি—আল্লাহর কিতাব ও আমার আহলে বাইত বা পরিজন। ৭৮
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي حَجَّتِهِ يَوْمَ عَرَفَةَ وَهُوَ عَلَى نَاقَتِهِ الْقَصْوَاءِ يَخْطُبُ فَسَمِعْتُهُ يَقُوْلُ: يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي تَرَكْتُ فِيْكُمْ مَا إِنْ أَخَذْتُمْ بِهِ لَنْ تَضِلُّوْا: كِتَابَ اللَّهِ وَعِتْرَتِي أَهْلَ بَيْتِي.
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর হজ্জে আরাফার দিন কাসওয়া উষ্ট্রীর উপর ভাষণ দিতে দেখেছি। সে ভাষণে তাঁকে বলতে শুনেছি, হে লোকসকল, আমি তোমাদের মধ্যে এমন জিনিস রেখে যাচ্ছি, যা আঁকড়ে ধরে রাখলে তোমরা বিপথগামী হবে না। ১. আল্লাহর কিতাব ও ২. আমার আহ্ল-পরিজন। ৭৯
عَنْ زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ... أَلَا أَيُّهَا النَّاسُ فَإِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ يُوشِكُ أَنْ يَأْتِيَ رَسُوْلُ رَبِّي فَأُجِيْبَ وَأَنَا تَارِكٌ فِيْكُمْ ثَقَلَيْنِ: أَوَّلُهُمَا كِتَابُ اللَّهِ فِيهِ الْهُدَى وَالنُّوْرُ فَخُذُوْا بِكِتَابِ اللهِ وَاسْتَمْسِكُوا بِهِ ... ثُمَّ قَالَ: وَأَهْلُ بَيْتِي أُذَكِّرُكُمُ اللَّهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي أُذَكِّرُكُمُ اللَّهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي أُذَكِّرُكُمُ اللَّهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي.
যাইদ ইবন আরকাম (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, শুনে রাখো, হে লোকসকল, আমি মানুষ। অচিরেই আমার নিকট আমার রবের দূত এসে যাবে। আমি তাঁর ডাকে সাড়া দেব। এমতাবস্থায় আমি তোমাদের মাঝে দুটি গুরুভার জিনিস রেখে যাচ্ছি। প্রথমটি আল্লাহর কিতাব। তার মাঝে পথনির্দেশ ও আলো আছে। সুতরাং তোমরা আল্লাহর কিতাব গ্রহণ করো এবং আঁকড়ে ধরো। এরপর তিনি বলেন, এবং আমার আহলে বাইত বা পরিজন। আমি তোমাদেরকে আমার আহলে বাইতের ব্যাপারে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।...৮০
এ হাদীসগুলোতে আল্লাহর কিতাবের সাথে সাথে 'আহলে বাইত বা নবী- পরিবার'কে আঁকড়ে ধরতে বলা হয়েছে। আহলে বাইত বা নবী-পরিবার প্রধানত তাঁর স্ত্রীগণ। কেননা আল কুরআনে মহান আল্লাহ তাঁদেরকে আহলে বাইত বলে সম্বোধন করেছেন। তাঁরা ছিলেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল উভয়ের আনুগত্যের ব্যাপারে আদিষ্ট এবং কুরআন ও হিকমত বা সুন্নাহ স্মরণ রাখতে ও শিক্ষা দিতে নির্দেশিত। সুতরাং তাঁদেরকে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দানের অর্থ হচ্ছে, কুরআন ও হিকমত তথা হাদীস বা সুন্নাহ উভয়কে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দেওয়া। মহান আল্লাহ বলেন :
يَا نِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَعْرُوفًا . وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى وَأَقِمْنَ الصَّلَاةَ وَآتِينَ الزَّكَاةَ وَأَطِعْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا ، وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُؤْتِكُنَّ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ وَالْحِكْمَةِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ لَطِيفًا خَبِيرًا.
“হে নবী-পত্নীগণ, তোমরা সাধারণ নারীদের মতো নও, যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো। সুতরাং তোমরা কোমল স্বরে কথা বোলো না, তাতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে সে লালায়িত হবে। আর ন্যায়সংগত কথা বলো। নিজ গৃহে অবস্থান করো। প্রাচীন জাহিলি যুগের মতো সাজসজ্জা প্রদর্শন কোরো না। সালাত কায়িম করো, যাকাত আদায় করো। এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো। হে নবী-পরিবার, আল্লাহ তো চান, তোমাদের থেকে মলিনতাকে দূরে রাখতে এবং সর্বতোভাবে তোমাদেরকে পবিত্রতা দান করতে। তোমাদের গৃহে আল্লাহর যে আয়াতসমূহ ও হিকমত পাঠ করা হয় তোমরা তা স্মরণ রেখো বা বর্ণনা কোরো। নিশ্চয় আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী সর্বজ্ঞ।”৮১
যে হাদীসটি একাধিক সাহাবি থেকে বর্ণিত, বহু সনদে বহুসংখ্যক কিতাবে, এমনকি সিহাহ সিত্তাহ ও মুসনাদ আহমাদের অস্তিত্ব লাভেরও আগে মুআত্তা মালিকে সংকলিত, সিহাহ সিত্তাহ ও মুসনাদ আহমাদেও যার সমর্থক বর্ণনা বিদ্যমান, একাধিক শাস্ত্রজ্ঞ ইমাম যার বিশুদ্ধতা ও গ্রহণযোগ্যতার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, মুহাদ্দিসদের নিকট সুপ্রসিদ্ধ এমন একটি সুপ্রমাণিত হাদীসে নববিকে বিশেষ কোনো কিতাবে নেই কেন প্রশ্ন তুলে মিথ্যা বলা বা বাতিল করে দেওয়া নিতান্তই অজ্ঞতা অথবা বিশেষ কোনো মতলব হাসিলের উদ্দেশ্যে গায়ের জোরে সত্যকে বা মেঘমুক্ত দিনের দুপুরে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বহ্নিমান সূর্যকে অস্বীকার করার নামান্তর।
এ ধরনের বর্ণনা তো সনদের কিছু দুর্বলতা সত্ত্বেও অন্যান্য সূত্রের সমর্থনে বিশুদ্ধতার মানে উত্তীর্ণ বলে গণ্য হয়। প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ মুআত্তা মালিকের ব্যাখ্যাকার আল্লামা ইবন আব্দিল বার (রাহ.) এ হাদীসের ব্যাপারে বলেছেন:
هُذَا مَحْفُوظٌ مَعْرُوفٌ مَشْهُورُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عِنْدَ أَهْلِ الْعِلْمِ شُهْرَةً يَكَادُ يُسْتَغْنَى بِهَا عَنِ الْإِسْنَادِ وَرُوِيَ فِي ذلِكَ مِنْ أَخْبَارِ الْآحَادِ أَحَادِيْثُ.
এ বর্ণনাটি সংরক্ষিত এবং হাদীস বিশারদদের নিকটে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস হিসাবে এমন পরিচিত ও প্রসিদ্ধ যে, এর প্রসিদ্ধিই সনদতুল্য। এছাড়া এ বিষয়ে আরো কতিপয় হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ৮২
এ সকল আলোচনার পর আশা করি, পাঠকের নিকট পরিষ্কার হয়েছে যে, হাদীসের এই মর্মটি সুপ্রসিদ্ধ ও সুপ্রমাণিত। এ পর্যায়ে আমরা দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই, এ হাদীসের বক্তব্যই আল কুরআনে বর্ণিত কিতাব ও হিকমতের যথার্থ ব্যাখ্যা। অন্য একটি হাদীসে নবীজি বলেছেন :
أَلَا إِنِّي أُوْتِيْتُ الْقُرْآنَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ.
শুনে রাখো, নিশ্চয় আমাকে দেওয়া হয়েছে কুরআন এবং তার সাথে তার অনুরূপ ওহি।৮৩
বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে গেলে স্ববিরোধী এলোমেলো কথার গোঁজামিল দিতে হয়। হাদীস বিরোধীদেরও এ কাজ করতে হয়। এবং এ কাজে তারা যথেষ্ট পারদর্শীও বটে। মুআত্তা মালিক নিয়ে বাংলাদেশি হাদীস অস্বীকারকারীদের গোঁজামিলের একটি উদাহরণ দিই। আমাদের আলোচ্য হাদীসটি তাদের দাবির পক্ষে একটি বড় বাধা। এজন্য তারা এ হাদীসটি এবং একই কারণে মুআত্তা মালিককে বাতিল ও অস্বীকার করতে চায়। তারা বলে, মুআত্তা মালিক হাদীসের কোনো গুরুত্বপূর্ণ কিতাব নয়। এজন্যই মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের অধীনে হাদীসের সর্বোচ্চ ডিগ্রি কামেল বা মাস্টার্স অব হাদীসে এ কিতাব পড়ানো হয় না।
আবার কখনো তারা বলে, হাদীস সত্যায়ন বা গ্রহণ-বর্জনের কোনো নীতিমালা নেই। এখানে সম্পূর্ণই তুঘলকি কর্মকাণ্ড চলে। নিজের মতাদর্শের পক্ষের হলে সে হাদীস বা হাদীস গ্রন্থকে সহীহ বলে গ্রহণ করা হয় আর বিপক্ষের হলে জাল বা যয়ীফ বলে বাতিল করে দেওয়া হয়। যে কারণে মক্কা-মদীনায় মুআত্তা মালিক সর্বজনগ্রাহ্য হলেও আমাদের দেশে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি, এদেশের কামিল ফিল হাদীসের সিলেবাসভুক্তও করা হয়নি। কারণ আমরা হানাফি কোম্পানি, আমরা মালিকি কোম্পানির খবরে বিশ্বাস করতে পারি না।
তাদের এ কথাগুলো নিতান্তই প্রলাপ। মালিক ইবন আনাস (রাহ.) মালিকি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম। মুআত্তা তাঁর সংকলিত হাদীসের কিতাব। এ দেশে আমরা অধিকাংশই হানাফি মাযহাবের অনুসারী। যদি এ কারণেই বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের কামিল ফিল হাদীসের সিলেবাসে মুআত্তা মালিক রাখা না হয় তবে তো সিহাহ সিত্তাহ নামে প্রসিদ্ধ হাদীসের ছয় কিতাবও সিলেবাসে থাকার কথা নয়। কেননা ওই ছয় কিতাবের সংকলক ছয় ইমাম কেউ-ই হানাফি ছিলেন না।
বাংলাদেশসহ আমাদের সমগ্র উপমহাদেশে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও একনিষ্ঠভাবে হানাফি মাযহাব চর্চা হয় দেওবন্দি ধারার কওমি মাদরাসাগুলোতে। এ মাদরাসাগুলোতে অতিশয় গুরুত্বের সাথে মুআত্তা মালিকের একাধিক ভার্সন পড়ানো হয়। এদেশের হানাফি মুসলিমরা ইমাম মালিক, মালিকি মাযহাব ও মুআত্তা মালিককে প্রত্যাখ্যান করবে কেন? হানাফি মাযহাবের প্রধান তিন ইমামের অন্যতম ইমাম মুহাম্মাদ ইবন হাসান শাইবানি (রাহ.) দীর্ঘ তিন বছর ইমাম মালিকের সান্নিধ্যে থেকে তাঁর দরসে বসে সরাসরি তাঁর কাছ থেকে সম্পূর্ণ মুআত্তার পাঠ গ্রহণ করেছেন এবং সংকলন করেছেন। যে সংকলনটি 'মুআত্তা মুহাম্মাদ' নামে সমধিক পরিচিত। এবং তাঁর বরাতে মালিকি মাযহাবের ফিকহও সংকলিত হয়েছে। ৮৪

টিকাঃ
৬৭. জাওহারি, মুসনাদুল মুআত্তা, বর্ণনা নং ৭৭; আবু নুআইম, হিলয়াতুল আওলিয়া, ৬/৩২৯।
৬৮. লাখলবি, আত তা'লীকুল মুমাজ্জাদ, ১/৭৩。
৬৯. লাখলবি, আত তা'লীকুল মুমাজ্জাদ, ১/৭৫。
৭০. কাত্তানি, আর রিসালাতুল মুস্তাতরাফাহ, পৃ. ০৬; শিনকীতি, দালীলুস সালিক, পৃ. ২১।
৭১. দেহলভি, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, ১/২৩১।
৭২. যাহাবি, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ১০/১২০, ১২/৪৭১।
৭৩. যাহাবি, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ১/৫২; তারীখ বাগদাদ, ২/৩২২।
৭৪. তারীখ বাগদাদ, ৫/৪৫০; হাফিয মিযযি, তাহযীবুল কামাল, ১/৪২০。
৭৫. ইবন আব্দুল বার, তামহীদ: ২৪/৩৩১; সুয়ূতি, তানবীরুল হাওয়ালিক, ২/২০৮; যুরকানি, শারহুল মুআত্তা, ৪/৩৮৭。
৭৬. মুসনাদ বাযযার, হাদীস: ৮৯৯৩; শাফিয়ি, কিতাবুল ফাওয়ায়িদ, হাদীস: ৬৩২; ইবন শাহীন, আত তারগীব ফী ফাযায়িলিল আ'মাল, হাদীস: ৫২৮; শারহু মাযাহিবি আহলিস সুন্নাহ, হাদীস: ৪৪; সুনান দারাকুতনি, হাদীস: ৪৬০৬; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৩১৮ ও ৩১৯; বাইহাকি, আস সুনানুল কুবরা, হাদীস: ২০৩৩৬, ২০৩৩৭; আল ই'তিকাদ, পৃ. ২২৮; ইবন আব্দিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, হাদীস: ১৩৮৯, ১৮৬৬; লালাকায়ি, শারহু উসূলিল ই'তিকাদ, হাদীস : ৯০; শাজারি, তারতীবুল আমালি, হাদীস: ৭৫৩;।
৭৭. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস : ১১১০৪, ১১২১১, ১১৫৬১।
৭৮. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস : ১২৫৭৮, ২১৬৫৪।
৭৯. সুনান তিরমিযি, হাদীস: ৩৭৮৬。
৮০. সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৪০৮; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১৯২৬৫; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ৩৭৮৮।
৮১. সূরা [৩৩] আহযাব, আয়াত: ৩২-৩৪।
৮২. ইবন আব্দিল বার, আত তামহীদ, ২৪/৩৩১; সানআনি, জামিউল উসূল, ১/২৭৭; আলবানি, সহীহুল জামি', ১/৫৬৬; সিলসিলাহ সহীহাহ, ৪/৩৫৫-৩৬১。
৮৩. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস : ১৭১৭৪; সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৪৬০৪।
৮৪. যাহিদ কাওসারি, বুলুগুল আমানি, পৃ. ১৮。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00