📄 কুরআনের শব্দ ও অর্থ সংরক্ষণ
মহান আল্লাহ কুরআন সংরক্ষণের ওয়াদা করেছেন। তিনি বলেছেন:
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُوْنَ.
“নিশ্চয় আমি এই উপদেশগ্রন্থ নাযিল করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষণকারী।” ৪০
আমরা আগেই আলোচনা করেছি, আল কুরআন শুধু তিলাওয়াত করার জন্য নাযিল হয়নি। বরং অর্থ অনুধাবন করা এবং সে অনুযায়ী বিশ্বাস ও কর্মকে পরিচালনা করাও তার অন্যতম মৌলিক দাবি। সুতরাং আল কুরআন সংরক্ষণ মানে শুধু তার শব্দের সংরক্ষণ নয়; বরং অর্থ ও মর্মেরও সংরক্ষণ। কেননা অর্থ ও মর্মের সংরক্ষণ ছাড়া তো তার দাবি অনুযায়ী বিশ্বাস ও কর্মকে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
তাছাড়া এ আয়াতে অর্থ ও মর্ম সংরক্ষণের দিকে বিশেষভাবে ইঙ্গিতও করা হয়েছে। আয়াতটিতে আল কুরআনকে ‘যিকির’ শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে। যিকির কুরআনের একটি নাম। এর অর্থ উপদেশ। আর উপদেশও শুধু শব্দ দ্বারা হয় না। বরং অর্থ অনুধাবন ও মর্ম উপলব্ধি করার মাধ্যমেই হয়ে থাকে। সুতরাং শব্দ ও অর্থ উভয় সংরক্ষণই এ আয়াতের ওয়াদার অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া যদি শুধু শব্দ সংরক্ষণ করা হয় আর অর্থ বিকৃতির পথ খোলা রাখা হয় তবে সংরক্ষিত হওয়ার অর্থই অর্থহীন বলে গণ্য হয়।
দেখা যাবে, কুরআনের শব্দের তো সঠিক আবৃত্তি চলছে, কিন্তু কুরআনের উপর আমলের নামে যা চলছে তার সাথে মহান আল্লাহর চাওয়ার কোনো মিল নেই।
অথরিটি হিসাবে কথা ও কর্মের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল কুরআনের প্রয়োজনীয় স্থানের মর্ম বুঝিয়েছেন, হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়েছেন এবং একাধিক সম্ভাবনাময় অর্থের মধ্য থেকে আল্লাহর উদ্দিষ্ট ও তাঁর নিকট গ্রহণযোগ্য অর্থ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এবং অন্যরা আল কুরআন পড়ে যা বুঝেছেন তার গ্রহণযোগ্য অংশকে তিনি অনুমোদন করেছেন। এভাবে কথা, কর্ম ও অনুমোদনের মাধ্যমে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল কুরআনের যে ব্যাখ্যা করেছেন তা মহান আল্লাহই তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন এবং উম্মাতকে শিখিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন। নবীজির এই কথা, কর্ম ও অনুমোদন হাদীস বা সুন্নাহর উল্লেখযোগ্য অংশ। কুরআনের সঠিক অর্থ সংরক্ষণের জন্য যা সংরক্ষণ করা অতিশয় জরুরি। এ ছাড়া কুরআন সংরক্ষণের অর্থ অর্থপূর্ণ হয় না।
কেননা আমরা দেখেছি, এ সকল হাদীস যদি সংরক্ষণ করা না হয় এবং কুরআন বোঝার জন্য তা মানতে বাধ্য করা না হয়-বরং প্রত্যেককে যার যার ইচ্ছামতো কুরআন বুঝে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়-তবে তো কুরআনের অর্থ বিকৃতির নানান দরজা খুলে যাবে। যার যেমন ইচ্ছা কুরআনের ব্যাখ্যা করবে-না-বুঝ ব্যাখ্যা, ভুল ব্যাখ্যা, মতলবি ব্যাখ্যা আরো কত কী! সুতরাং হাদীস ও সুন্নাহর এই অংশটি সংরক্ষণ করা কুরআন সংরক্ষণে মহান আল্লাহর ওয়াদার অন্তর্ভুক্ত। কেননা হাদীস-সুন্নাহর এই অংশ সংরক্ষণের মাধ্যমেই কুরআনের বাণীতে আল্লাহর উদ্দিষ্ট ও অনুমোদিত অর্থ সংরক্ষিত হয়।
টিকাঃ
৪০. সূরা [১৫] হিজর, আয়াত: ০৯।
📄 আল্লাহ্ ওয়াদা ভঙ্গ করেন না
মহান আল্লাহ কুরআন সংরক্ষণের ওয়াদা করেছেন। উপরের আলোচনায় আমরা নিশ্চিত হয়েছি, কুরআনের শব্দ ও অর্থ উভয়ই এ ওয়াদার অন্তর্ভুক্ত। মহান আল্লাহর শান ওয়াদা রক্ষা করা। তিনি মুসলিম উম্মাহকে কুরআন সংরক্ষণে এমন কর্মযোগ দান করেছেন, যা পৃথিবীতে অপূর্ব ও অনন্য এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর জন্য এক বিপুল বিস্ময়।
আল কুরআনের তিলাওয়াত সংরক্ষণের জন্য কিরাআত ও তাজবীদ সংক্রান্ত কিছু শাস্ত্র গড়ে উঠেছে। যে শাস্ত্রের উদ্দেশ্য পৃথিবীর সকল কাল ও ভূখণ্ডের মানুষ যেন কুরআন ঠিক সেভাবে তিলাওয়াত করতে পারে যেভাবে তা নাযিল হয়েছে। যেভাবে জিবরীল আমীন (আ.)-এর কাছ থেকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিখেছেন। যেভাবে তিনি সাহাবিদেরকে শিখিয়েছেন। এভাবে কুরআনের পাঠ ও পঠন সংরক্ষিত হয়েছে। যেকোনো কালের, যেকোনো ভূখণ্ডের যেকোনো মানুষ চাইলে এ শাস্ত্র ও শাস্ত্রজ্ঞের সহযোগিতায় হুবহু সেভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতে সক্ষম হবে যেভাবে তা নাযিল হয়েছে।
কুরআনের অর্থ ও মর্ম, যা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবিদেরকে শিখিয়েছেন, তাও হাদীসশাস্ত্রের মাধ্যমে যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। এর মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো দেশ ও কালের মানুষ কুরআনের যেকোনো আয়াতের সেই মর্ম বুঝতে পারবে যা মহান আল্লাহর উদ্দিষ্ট, যা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহীর মাধ্যমে জেনেছিলেন ও বুঝেছিলেন, যা তিনি তাঁর সাহাবিদেরকে শিখিয়েছিলেন।
কুরআনের যে অংশের মর্ম কর্মগত নমুনার মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার দরকার ছিল, সাহাবিগণ (রা.) যা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্মের মাধ্যমে শিখেছিলেন, পরবর্তীদেরকেও তো তা কর্মগত নমুনার মাধ্যমেই শিখতে হবে। মহান আল্লাহ আল কুরআনের এই কর্মগত ব্যাখ্যাকেও সংরক্ষণ করেছেন। উম্মাতের প্রত্যেক প্রজন্ম তার পূর্ব প্রজন্মের কর্মের মাধ্যমেই এইসব ব্যাখ্যা শিখে আসছে। এরপরও কোনো ভুলভ্রান্তির অনুপ্রবেশ ঘটলে তা পরিশোধনের ব্যবস্থা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
يَحْمِلُ هَذَا الْعِلْمَ مِنْ كُلِّ خَلَفٍ عُدُولُهُ يَنْفُوْنَ عَنْهُ تَحْرِيفَ الْغَالِينَ وَانْتِحَالَ الْمُبْطِلِينَ وَتَأْوِيلَ الْجَاهِلِينَ.
এই ইলমকে বহন করবে প্রত্যেক উত্তর-প্রজন্মের নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিবর্গ। তারা সীমালঙ্ঘনকারীদের বিকৃতি, বাতিলপন্থীদের মিথ্যাচার ও মূর্খদের অপব্যাখ্যা থেকে ইলমকে পরিচ্ছন্ন রাখবে। ৪১
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন :
إِنَّ اللَّهَ يَبْعَثُ لِهَذِهِ الْأُمَّةِ عَلَى رَأْسِ كُلِّ مِائَةِ سَنَةٍ مَنْ يُجَدِّدُ لَهَا دِينَهَا.
আল্লাহ এই উম্মাতের জন্য প্রত্যেক শতাব্দীর প্রারম্ভে সংস্কারক পাঠান। যিনি তাদের জন্য দীনকে সংস্কার করেন। ৪২
ওয়াদা মোতাবেক মহান আল্লাহ এভাবেই আল কুরআনের সকল দিক অবিকল সংরক্ষণ করেছেন। তিনি ওয়াদা ভঙ্গ করেন না। তাঁর নিজের সম্পর্কে তিনিই তো যথার্থ বলতে পারেন। তিনি বলেছেন :
وَعْدَ اللَّهِ لَا يُخْلِفُ اللَّهُ وَعْدَهُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ.
“এটা আল্লাহর কৃত ওয়াদা। আল্লাহ তাঁর ওয়াদা খেলাফ করেন না। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না। "৪৩
আরো ইরশাদ হয়েছে:
وَعْدَ اللَّهِ حَقًّا وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ قِيلًا.
“আল্লাহর ওয়াদা যথার্থ। আর কে আছে আল্লাহর থেকে অধিক সত্যবাদী। "৪৪
টিকাঃ
৪১. তাহাবি, শারহু মুশকিলিল আসার, হাদীস: ৩৮৮৪; ইবন আদি, আল কামিল: ১/২৪৭-২৪৯; ইবন আব্দিল বার, আত তামহীদ, ১/৫৯। সালাহুদ্দীন আলায়ি হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম আহমাদ সহীহ বলেছেন। কাসতাল্লানি বলেছেন, হাদীসটির সকল সনদেই দুর্বলতা রয়েছে। তবে একাধিক সনদ একটি অপরটিকে শক্তিশালী করে। সুতরাং হাদীসটি হাসান পর্যায়ে উন্নীত, যেমনটি আলায়ি বলেছেন। এছাড়াও একাধিক হাদীস বিশারদ হাদীসটি দিয়ে দলীল দিয়েছেন। বিস্তারিত দেখুন: আলায়ি, বুগয়াতুল মুলতামিস, পৃ. ৩৪-৩৫; ইবনুল মুলাক্কিন, আল বাদরুল মুনীর ১/২৫৯; ইরাকি, আত তাকয়ীদ, পৃ. ১৩৮; কাসতাল্লানি, ইরশাদুস সারি ১/৪; সানআনি, ফাতহুল গাফফার, ৪/২১৮৫; আলী মুত্তাকি, কানযুল উম্মাল, ১০/১৭৬।
৪২. সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৪২৯১; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৮৫৯২; বাইহাকি, মা'রিফাতুস সুনান: ১/২০৮। হাদীসটিকে ইরাকি (ফায়যুল খাতীর ২/২৮২), ইবন হাজার (তাওয়ালিত তা'সীস, পৃ. ৪৯), সাখাবি (আল মাকাসিদুল হাসানাহ: ২৩৮), ইবনুদ দাইবা' (তাময়ীযুত তয়্যিব, পৃ. ৩৮)-সহ আরো অনেকে প্রমাণিত বলেছেন।
৪৩. সূরা [৩০] রূম, আয়াত: ০৬।
৪৪. সূরা [৪] নিসা, আয়াত: ১২২।
📄 ওহির ব্যাখ্যায় ওহি : সাহাবিদের বুঝ
প্রখ্যাত তাবিয়ি হাসান বাসরি (রাহ.) বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশিষ্ট সাহাবি ইমরান ইবন হুসাইন (রা.) আমাদেরকে নবীজির সুন্নাহ বর্ণনা করছিলেন। তখন এক লোক বলে উঠল, আমাদেরকে কুরআনের কথা বলুন। তখন ইমরান (রা.) বললেন, তুমি আর তোমার সাথিরা তো খুব কুরআন পড়ো! সালাত ও হদ্দের বিস্তারিত বিধিবিধান কি তুমি আমাকে শিখিয়েছিলে? স্বর্ণ, উট, গাভি এবং অন্যান্য সম্পদের যাকাত কেমন হবে তা কি তুমি আমাকে বর্ণনা করেছিলে? করোনি। যখন এসব বর্ণনা করা হচ্ছিল তখন আমি উপস্থিত ছিলাম, তুমি নও। তারপর তিনি বলেন:
فَرَضَ عَلَيْنَا رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الزَّكَاةِ كَذَا وَكَذَا.
'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাকাতের ক্ষেত্রে এই এই বিষয় আমাদের উপর ফরয করে দিয়েছেন।' তাঁর কথা শুনে লোকটি বলে, আপনি আমার মাঝে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করেছেন। আল্লাহ আপনাকে বাঁচিয়ে রাখুন। ৪৫
অন্য বর্ণনায় এসেছে, সাহাবি ইমরান ইবন হুসাইন (রা.) একটি জিজ্ঞাসার জবাব দিলেন। তখন এক ব্যক্তি বলল, আপনি কুরআন থেকে বলুন। আপনারা আমাদেরকে এমন হাদীসও বলেন যার কোনো ভিত্তি আমরা কুরআনে পাই না। এ কথায় ইমরান (রা.) রেগে গেলেন। বললেন, তুমি তো দেখছি বড় আহম্মক। তুমি কি আল্লাহর কিতাবে পেয়েছ যে, জুহরের সালাত চার রাকআত এবং তাতে উচ্চৈঃস্বরে কিরাআত পড়া যায় না? এভাবে তিনি তাকে সব ওয়াক্তের সালাত ও যাকাতের নিসাব ইত্যাদি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তারপর তিনি বললেন,
أَتَجِدُ هَذَا فِي كِتَابِ اللهِ مُفَسَّرًا ۚ إِنَّ كِتَابَ اللَّهِ أَبْهَمُ هَذَا وَإِنَّ السُّنَّةَ تُفَسِّرُ ذَلِكَ.
তুমি কি এসব কিছু আল্লাহর কিতাবে ব্যাখ্যা-সংবলিত বিস্তারিত পেয়েছ? পাওনি। হ্যাঁ, আল্লাহর কিতাব এমনই সংক্ষিপ্ত। রাসূলের সুন্নাহ তাকে ব্যাখ্যা করেছে।৪৬
কুরআনের ব্যাখ্যায় হাদীসের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে এমনই ছিল সাহাবিদের স্বীকৃতি ও মান্যতা। এ বিষয়ে এমনই ছিল তাঁদের আকীদা-বিশ্বাস। আর আমাদেরকে তাঁদের মতো ঈমান-আকীদা গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন :
آمِنُوا كَمَا آمَنَ النَّاسُ.
"তোমরা ঈমান আনো যেমন ঈমান এনেছে ওইসব লোকেরা। "৪৭
টিকাঃ
৪৫. তাবারানি, আল মু'জামুল কাবীর, ১৮/১৬৫, হাদীস: ৩৬৯; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস : ৩৭২; নাদরাতুন নাঈম, ৭/২৯৭০। ইমাম হাকিম হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন এবং যাহাবি তাঁর সাথে একমত পোষণ করেছেন।
৪৬. আজুরি, আশ শারীআহ, হাদীস: ৯৮; খতীব বাগদাদি, আল ফকীহ আল মুতাফাক্কিহ: ১/২৩৬। হাদীসটি কিছুটা ভিন্নতাসহ আরো বিস্তারিতভাবেও বর্ণিত হয়েছে। দেখুন: সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ১৫৬১; আল মু'জামুল কাবীর: ১৮/২১৯; আল ইবানাতুল কুবরা: ১/২৩৩。
৪৭. সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ১৩।
📄 নববি ভাষ্য ও সাহাবিদের বুঝ প্রত্যাখ্যানের ফল
যুগে যুগে মহান আল্লাহ মানব জাতির হিদায়াতের জন্য নবী-রাসূল (আ.) প্রেরণ করেছেন। তাঁদের অবর্তমানে তাঁদের উম্মাত পথ হারিয়ে ফেলেছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তাঁর উম্মাতও পথ হারিয়ে বহুধা বিভক্ত হয়ে যাবে। এইসব দল-উপদলের মধ্যে শুধু তারাই হকের উপর টিকে থাকতে পারবে যারা তাঁর ও তাঁর সাহাবিদের পথের উপর থাকবে। হাদীস শরীফে এসেছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إِنَّ بَنِي إِسْرَائِيلَ تَفَرَّقَتْ عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ مِلَّةً وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ مِلَّةً كُلُّهُمْ فِي النَّارِ إِلَّا مِلَّةً وَاحِدَةً قَالُوا: وَمَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي.
বনি ইসরাঈল ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল। আর আমার উম্মাত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। সকলেই জাহান্নামে যাবে, একটি দল ছাড়া। সাহাবাগণ (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, এই দলটি কারা? তিনি বললেন,
আমি ও আমার সাহাবিগণ যে মতের উপর আছি। ৪৮
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলেছে। তাঁর ইন্তিকালের পর সাহাবিদের যুগ থেকে বিভ্রান্তি ও বিভক্তি শুরু হয়। বিভ্রান্তরা বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বিভ্রান্তি ও বিভক্তির বিস্তারিত ইতিহাস ও কার্যকারণ বর্ণনা ও পর্যালোচনার অবকাশ এ পুস্তকে নেই। আমরা শুধু বিভ্রান্তির একটি কারণের সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা করব।
এই সকল বিভ্রান্ত উপদলগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে ভয়ংকর সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনাকারী খারিজি সম্প্রদায়। তাদের বিভ্রান্তির অন্যতম প্রধান কারণ কুরআন ও ইসলাম বোঝার ক্ষেত্রে নববি ব্যাখ্যা ও সাহাবিদের বুঝ প্রত্যাখ্যান করা।
আলী (রা.) ইয়ামান থেকে মাটি মিশ্রিত কিছু স্বর্ণ প্রেরণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাধারণ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে উক্ত স্বর্ণ চারজন নওমুসলিম আরব নেতার মধ্যে বণ্টন করে দেন। এতে উপস্থিতির মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক-কেন তিনি সকল যোদ্ধাকে না দিয়ে সাধারণ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে মাত্র চারজনকে দিলেন! প্রশ্ন করে এটা জেনে নেওয়ার অধিকারও তাদের আছে।
কিন্তু খারিজি সম্প্রদায়ের অন্যতম গুরুজন যুল খুওয়াইসিরার মনে কোনো খটকা জাগে না। তিনি বুঝে নেন যে, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্যায় বণ্টন করেছেন। আর নিজের বুঝকেই চূড়ান্ত সঠিক ধরে নিয়ে নবীর সামনে 'নাহি আনিল মুনকার' করে বসেন,
يَا رَسُوْلَ اللهِ اتَّقِ اللَّهَ وَاللَّهِ مَا عَدَلْتَ].
হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহকে ভয় করুন। আল্লাহর কসম, আপনি ন্যায়বিচার করলেন না। ৪৯
এ ঘটনা যখন সংঘটিত হয় তখনও খারিজি সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটেনি। তবে এই ব্যক্তির অনুগামীদের মধ্য থেকে একটি বিভ্রান্ত দলের উদ্ভব ঘটবে মর্মে ভবিষ্যদ্বাণী করে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন:
إِنَّهُ يَخْرُجُ مِنْ ضِنْضِي هَذَا قَوْمٌ يَتْلُوْنَ كِتَابَ اللَّهِ رَطْبًا لَّا يُجَاوِزُ حَنَاجِرَهُمْ يَمْرُقُوْنَ مِنَ الدِّيْنِ كَمَا يَمْرُقُ السَّهْمُ مِنَ الرَّمِيَّةِ.
এই ব্যক্তির অনুগামীদের মধ্য থেকে একদল মানুষ বের হবে, যারা সর্বদা হৃদয়গ্রাহীভাবে কুরআন তিলাওয়াত করবে। কিন্তু কুরআন তাদের কণ্ঠনালি অতিক্রম করবে না। তারা দীন থেকে বের হয়ে যাবে, যেমন তীর শিকারের দেহ ভেদ করে বের হয়ে যায়। ৫০
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ ভবিষ্যদ্বাণীতে আমরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, যে কেউ কেবল অধিকহারে কুরআন অধ্যয়ন করলেই সঠিক বুঝ পাবে না এবং সঠিক পথে চলতেও পারবে না। বরং সে দীন থেকে সম্পূর্ণ বের হয়েও যেতে পারে। এ হাদীস থেকে আমরা এ কথাও জানতে পারছি যে, তাদের এ পরিণতির অন্যতম কারণ নিজের বুঝকে সঠিকতার চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসাবে গ্রহণ করা এবং তার আলোকে নবীর বুঝকে শরীআত-বিরোধী আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করা-কুরআন ও হাদীসের মাঝে সংঘর্ষ আবিষ্কার করা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে মুখোমুখি দাঁড় করানো।
৩৫ হিজরিতে ইসলামি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান খলীফা উসমান (রা.) কতিপয় বিদ্রোহীর হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন। তারপর আলী (রা.) খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এ সময় উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের বিচার করার আগে মুআবিয়া (রা.) আলী (রা.)-এর আনুগত্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। আলী (রা.)-এর পক্ষ থেকে বলা হয়, ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার আগে বিদ্রোহীদের বিচার শুরু করলে বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পেতে পারে। কাজেই আগে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এ মতভিন্নতার ফলে সিফফীনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করার জন্য একটি সালিশি মজলিস গঠন করে।
এ সময় আলী (রা.)-এর অনুসারীদের মধ্য থেকে কয়েক হাজার মানুষ তাঁর দল ত্যাগ করে। ইসলামের ইতিহাসে এদেরকে খারিজি অর্থাৎ দলত্যাগী বা বিদ্রোহী বলা হয়। তারা দাবি করে যে, একমাত্র কুরআনের আইন ও আল্লাহর বিধান ছাড়া কিছুই চলতে পারে না। কেননা আল্লাহ বলেছেন :
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ. “হুকুম শুধুই আল্লাহর।”৫১
তারা বলেন, মুআবিয়া (রা.)-এর দল সীমালঙ্ঘনকারী। কাজেই আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। এ বিধান আল্লাহ তাআলার। সুতরাং আত্মসমর্পণের আগেই যুদ্ধ থামানো বা এ বিষয়ে মানুষকে সালিশ বানানো আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের বিরোধিতা। আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوْا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِي إِلَى أَمْرِ اللَّهِ.
“মুমিনদের দুটি দল যুদ্ধে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবে। তবুও যদি একটি দল অন্য দলের উপর সীমালঙ্ঘন করে, তাহলে যারা সীমালঙ্ঘন করছে তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকো, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর বিধানের দিকে ফিরে আসে।"৫২
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَبِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ .
“আর যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান ফায়সালা বিচার করে না, তারা কাফির। "৫৩
এ সকল আয়াত উল্লেখ করে খারিজিরা দাবি করেন যে, আলী, মুআবিয়া (রা.) ও তাঁদের অনুসারীগণ সকলেই কুরআন অমান্য করে কাফির হয়ে গেছেন। এরপর তারা তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন।
সাহাবিদের অনেকেই তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, আল্লাহর কালাম বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে পারঙ্গম হলেন আল্লাহর রাসূলের সাহাবাগণ। কেননা কুরআন তাঁদের সামনে নাযিল হয়েছে এবং তাঁরা সরাসরি নবীজির কাছ থেকে এর মর্ম জেনেছেন। সাহাবিদের বুঝের বিপরীতে তোমরা কুরআনের যে মর্ম বুঝেছ তা সঠিক হতে পারে না। বরং তোমাদের বুঝের বিপরীতে তাঁদের ব্যাখ্যাই সঠিক।
আব্দুল্লাহ ইবন যুবাইরের সময় খারিজি সম্প্রদায়ের দুজন লোক ইবন উমার (রা.)-এর কাছে এসে বলেন, মানুষেরা শেষ হয়ে যাচ্ছে, আর আপনি নবীর সাহাবি, কেন যুদ্ধে বের হচ্ছেন না? তিনি বলেন, আমি যুদ্ধে বের হচ্ছি না, কেননা আল্লাহ আমার ভাইয়ের রক্ত হারাম করেছেন। তখন তারা বলেন, আপনি এ কথা বলছেন, কেন আল্লাহ কি যুদ্ধের নির্দেশ দিয়ে বলেননি :
وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُوْنَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ .
"এবং তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকো, যতক্ষণ না ফিতনা দূরীভূত হয় এবং দীন কেবল আল্লাহর জন্য হয়।?"৫৪
তখন আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা.) তাদেরকে বলেন:
فَاتَلْنَا حَتَّى لَمْ تَكُنْ فِتْنَةٌ وَكَانَ الدِّيْنُ لِلَّهِ وَأَنْتُمْ تُرِيدُوْنَ أَنْ تُقَاتِلُوْا حَتَّى تَكُوْنَ فِتْنَةٌ وَيَكُوْنَ الدَّيْنُ لِغَيْرِ اللهِ.
আমরা যুদ্ধ করেছিলাম, তাতে ফিতনা দূরীভূত হয়েছিল এবং আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর তোমরা চাও যে, তোমরা যুদ্ধ করবে যাতে ফিতনা প্রতিষ্ঠিত হয় আর দীন আল্লাহর ছাড়া অন্যের হয়ে যায় (অর্থাৎ তোমাদের এ-জাতীয় কর্মের মাধ্যমে আল্লাহর দীন নয়, বরং ফিতনাই প্রতিষ্ঠিত হবে)।৫৫
সাহাবিদের এভাবে বোঝানোর কারণে কিছু মানুষ উগ্রতা ত্যাগ করলেও বাকিরা তাদের নিজেদের মতকেই সঠিক বলে গণ্য করতে থাকে। এবং সাহাবিদেরকে দালাল, আপসকামী ও অন্যায়ের সহযোগী ইত্যাদি আখ্যায়িত করে তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকে। তাদের হাতে খলীফাতুল মুসলিমীন আলী (রা.)-সহ অসংখ্য মুসলিম শাহাদত-বরণ করেন।
এই খারিজি সম্প্রদায়ের অধিকাংশ সদস্য ছিল যুবক। এদের ধার্মিকতা ও সততা ছিল অতুলনীয়। রাতদিন নফল সালাতে দীর্ঘ সিজদার কারণে তাদের কপালে দাগ পড়ে গিয়েছিল। তাদের ক্যাম্পের পাশ দিয়ে গেলে কেবল কুরআন পাঠের আওয়াজই কানে আসত। কুরআন পাঠ করলে বা শুনলে তারা কাঁদতে কাঁদতে বেহুঁশ হয়ে যেত। ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তারা ছিল অত্যন্ত আন্তরিক।৫৬
এতৎসত্ত্বেও তারা কেন এভাবে বিভ্রান্ত হয়ে গেল! উপরের আলোচনায় এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে। তারা কুরআন ও ইসলাম বোঝার ক্ষেত্রে সাহাবিদের বুঝকে প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের বুঝকেই চূড়ান্ত গণ্য করেছে। এতে তারা সঠিক মর্ম বুঝতে না পেরে ভুল বুঝে, এক স্থানের বিষয় অন্য স্থানে প্রয়োগ করে ভ্রান্ত পথে চলে গেছে। আলী (রা.) তাদের বিভ্রান্তির কারণ উল্লেখ করে বলেছেন:
قَوْمٌ أَصَابَتْهُم فِتْنَةٌ فَعَمُوْا وَصَلُّوْا.
এই সম্প্রদায় (নিজ মতের পূজার) ফিতনায় নিপতিত হয়ে অন্ধ ও বধির হয়ে গেছে। ৫৭
আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা.) বলেছেন:
إِنَّهُمُ انْطَلَقُوا إِلَى آيَاتٍ نَزَلَتْ فِي الكُفَّارِ فَجَعَلُوْهَا عَلَى الْمُؤْمِنِينَ.
যে সকল আয়াত কাফিরদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে এরা সে সকল আয়াত নিয়ে মুমিনদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করেছে। ৫৮
মহান আল্লাহ কুরআন কারীমে বলেছেন:
لَا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُمْ بَعْضًا قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الَّذِينَ يَتَسَلَّلُونَ مِنْكُمْ لِوَاذًا فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ.
“(হে লোকসকল) তোমরা নিজেদের ক্ষেত্রে রাসূলের আহ্বানকে তোমাদের পারস্পরিক আহ্বানের মতো মামুলি বিষয় মনে করবে না। আল্লাহ যথার্থই জানেন, তোমাদের মধ্যে কারা বিভিন্ন বাহানায় সটকে পড়ে। সুতরাং যারা তার নির্দেশের বিরুদ্ধগামী হয় তারা যেন শঙ্কিত হয়-তারা ফিতনায় নিপতিত হতে পারে অথবা তাদের পাকড়াও করতে পারে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।”
জি, আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণই তাদের ফিতনাগ্রস্ত ও বিভ্রান্ত হওয়ার মূল কারণ। তারা কুরআন বুঝতে রাসূলের ব্যাখ্যা গ্রহণ করেননি। তাঁর ব্যাখ্যাকে তারা তাদের নিজেদের ব্যাখ্যার মতো মামুলি মনে করেছে, যা অন্যের জন্য মান্য করা আবশ্যক নয়। যা দুনিয়াতে তাদেরকে ফিতনাগ্রস্ত করেছে আর আখিরাতে অপেক্ষা করছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
তাদের এ বিভ্রান্তি এমন মারাত্মক ফিতনা যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেশকিছু হাদীসে উম্মাতকে তাদের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। এমনকি এ কথা পর্যন্ত বলেছেন যে, আমি তাদেরকে পেলে হত্যা করব, তোমরাও তাদেরকে পেলে হত্যা করবে। তিনি বলেছেন:
لَئِنْ أَدْرَكْتُهُمْ لَأَقْتُلَنَّهُمْ قَتْلَ ثَمُودَ (قَتْلَ عَادٍ).
আমি তাদেরকে পেলে হত্যা করে নির্মূল করব যেভাবে সামূদ বা আদ জাতিকে হত্যা করে নির্মূল করা হয়েছে।৬০
অন্য হাদীসে তিনি বলেছেন :
فَأَيْنَمَا لَقِيتُمُوْهُمْ فَاقْتُلُوْهُمْ فَإِنَّ قَتْلَهُمْ أَجْرٌ لِمَنْ قَتَلَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
তোমরা তাদেরকে যেখানেই পাবে হত্যা করবে। কেননা যে তাদেরকে হত্যা করবে তার জন্য কিয়ামতের দিন এই হত্যার প্রতিদান রয়েছে। ৬১
জনৈক মহাপণ্ডিত তার লেখা ও বক্তৃতায় অনর্গল বলে চলেছেন, মুসলিম বিশ্বে ধর্মীয় উগ্রতা সৃষ্টির কারণ হাদীস। কুরআনকে সিন্দুকে তুলে রেখে হাদীসের তালীম দিয়েই উগ্রবাদী জঙ্গি ও আত্মঘাতী খুনি তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
কিন্তু উপরের আলোচনায় আমরা দেখলাম, মুসলিম বিশ্বের এই প্রথম ভয়ংকর সন্ত্রাসী খারিজি গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে মূলত হাদীসের বুঝ গ্রহণ না করে নিজের মতো করে কুরআন বুঝতে গিয়ে। এখনকার চিত্রও এর থেকে ভিন্ন নয়। বাস্তবতা হচ্ছে, উগ্রতার জন্য কুরআন-হাদীস নয়, বরং দায়ী হচ্ছে অজ্ঞতা-নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাহাবায়ে কিরাম (রা.) হয়ে প্রজন্ম পরম্পরায় চলে আসা স্বীকৃত তুরাসি বুঝকে প্রত্যাখ্যান করা।
টিকাঃ
৪৮. সুনান তিরমিযি, হাদীস: ২৬৩১; লালাকায়ি, শরহু উসুলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাহ, হাদীস : ১৪৫-১৪৭। লালাকায়ি, জাওরাকনি (আল আবাতীল: ২৮৩), বাগাবি (শারহুস সুন্নাহ : ১/২১৩), ইরাকি (তাখরীজুল ইহয়া', পৃ. ১১৩৩) সাখাবি (আল আজবিবাতুল মারযিয়্যাহ : ১৪৭) মুহাম্মাদ তাহির পাট্টানি (তাযকিরাতুল মাওযূআত, পৃ. ১৫) প্রমুখ মুহাদ্দিস হাদীসটিকে প্রমাণিত বলেছেন。
৪৯. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৪৩৫১; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০৬৪; সুনান আবু দাউদ, হাদীস : ৪৭৬৪; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ২৬৫৯。
৫০. প্রাগুক্ত।
৫১. সূরা [৬] আনআম, আয়াত: ৫৭; সূরা [১২] ইউসুফ, আয়াত: ৪০ ও ৬৭。
৫২. সুরা [৫৯] হুজুরাত, আয়াত: ০৯。
৫৩. সূরা [৫] মায়িদাহ, আয়াত: ৪৪。
৫৪. সূরা [৮] আনফাল, আয়াত: ৩ ৯。
৫৫. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৪৫১৩。
৫৬. খারিজিদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন: ইসলামের ইতিহাসে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ: একটি পর্যালোচনা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০০৬ (লেখক, ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রাহ.)। আরো দেখুন:
الخوارج أول الفرق في تاريخ الإسلام للدكتور ناصر بن عبد الكريم العقل, الخوارج نشأتهم، فرقهم، صفاتهم والرد على أبرز عقائدهم للدكتور سليمان بن صالح الغصن.
৫৭. ইবনুল আসীর, আন নিহায়াহ, ২/১৪৯; মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক: ১৮৬৫৬; ইবন আব্দুল বার, আত তামহীদ: ২৩/৩৩৫。
৫৮. ইবন আব্দুল বার, আত তামহীদ: ২৩/৩৩৪, ৩৩৫। সহীহ বুখারিতে (৯/১৬) তা'লীকান আসারটি উল্লেখ করা হয়েছে। ইবন হাজার এর সূত্রকে সহীহ বলেছেন। দেখুন: তাগলীকুত তা'লীক: ৫/২৫৯; ফাতহুল বারি ১২/২৮৬。
৫৯. সূরা [২৪] নূর, আয়াত: ৬৩。
৬০. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৪৩৫১; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০৬৪。
৬১. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৩৬১১; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১০৬৬।