📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 হাদীস অস্বীকারকারীদের ভণ্ডাভাবাজি

📄 হাদীস অস্বীকারকারীদের ভণ্ডাভাবাজি


কুরআন ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই-হাদীস অস্বীকারকারীদের এ দাবিটি যে একটা অবাস্তব ভাঁওতাবাজি, এ কথা তারা নিজেরাও বোঝেন। দাবিটি তারা কুরআনের আলোকে প্রমাণ করতে চান। কুরআনের কিছু আয়াত তারা এর স্বপক্ষে উল্লেখ করেন। তারপর আয়াত দ্বারা কীভাবে দাবিটি প্রমাণিত হয় তা বোঝাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তৃতা করেন বা পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখতে থাকেন।
আমাদের কথা হচ্ছে, কুরআনের সবকিছু যদি এত সহজ হয় যে, যে কেউ পড়েই সবকিছু বুঝে ফেলবে, তাহলে তারা তাদের দাবির পক্ষে একটি দুটি আয়াত উদ্ধৃত করে আয়াত দ্বারা কীভাবে দাবি প্রমাণিত হলো তা বোঝানোর জন্য কেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তৃতা করেন? কেন পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা নিজের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা লিখতে থাকেন? আয়াত বলে দিলেই তো মানুষের বুঝে নেওয়ার কথা! তবে কি তারা বলতে চান, কুরআন বোঝার জন্য ব্যাখ্যা তো লাগবে, তবে সে ব্যাখ্যা দেওয়ার অধিকার তাদের, আল্লাহর রাসূলের কোনো অধিকার নেই? এ থেকেই কি তাদের মতলববাজি সুস্পষ্ট হয় না?
আল কুরআন আল্লাহর বাণী। এ বাণী তিনি জিবরীল (আ.)-এর মাধ্যমে তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নাযিল করেছেন এবং তাঁকে এর প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা শিখিয়েছেন ও মানব জাতিকে শেখানোর দায়িত্ব দিয়েছেন, যা আমরা উপরের আলোচনায় দেখেছি। হাদীস অস্বীকারকারীরা মহান আল্লাহর উদ্দিষ্ট বিশুদ্ধ এই ব্যাখ্যা থেকে বিচ্যুত করে নিজেদের মতলব-মতো ব্যাখ্যা গিলিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চায়। নিজেদের মনমতো কুরআন বিকৃতির পথে হাদীস বাধা বলেই তারা হাদীসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। অন্যথায় আয়াতের ব্যাখ্যা তো তারাও করেন।
তাই আমাদেরকে থাকতে হবে ওই শরীআতের উপর, মহান আল্লাহ যা আমাদেরকে দিয়েছেন তাঁর রাসূলের মাধ্যমে। অজ্ঞ-বিভ্রান্তদের মনগড়া কোনো মতাদর্শের উপরে নয়। মহান আল্লাহ বলেন :
‏ثُمَّ جَعَلْنَاكَ عَلَى شَرِيْعَةٍ مِّنَ الْاَمْرِ فَاتَّبِعْهَا وَلَا تَتَّبِعْ اَهْوَاءَ الَّذِيْنَ لَا يَعْلَمُوْنَۙ‏
“অতঃপর (হে নবী) আমি আপনাকে দীনের এক বিশেষ শরীআতের উপর রেখেছি। সুতরাং আপনি তারই অনুসরণ করুন। আর যারা প্রকৃত জ্ঞান রাখে না তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করবেন না।”৩৯

টিকাঃ
৩৯. সূরা [৪৫] জাসিয়াহ, আয়াত: ১৮।

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 হাদীস অস্বীকারকারীই হাদীস অপরিহার্যতার প্রমাণ

📄 হাদীস অস্বীকারকারীই হাদীস অপরিহার্যতার প্রমাণ


আমরা দেখছি, কুরআন ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে এবং সে ব্যাখ্যা হতে হবে ওহির আলোকে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর নিকট থেকে প্রাপ্ত কুরআনের অতিরিক্ত ওহির মাধ্যমে কুরআনের যথার্থ ব্যাখ্যা উম্মাতকে শিক্ষা দিয়েছেন। পরবর্তী উম্মাত সে ব্যাখ্যার আলোকে কুরআন বুঝেছে এবং ব্যাখ্যা করেছে। সে জন্য তারা আল কুরআনে মহান আল্লাহর উদ্দিষ্ট মর্ম অনুধাবন করতে পেরেছে এবং সে অনুযায়ী বিশ্বাস ও কর্ম পরিচালিত করতে সক্ষম হয়েছে। এ কারণে হাদীসকে বর্জন করে নিজের বুঝ ও ধারণা অনুযায়ী কুরআন বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে চাইলে সে বুঝ হবে ভুল এবং ব্যাখ্যা হবে অপব্যাখ্যা এবং মহান আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ।
জুমহুর উম্মাত এ মতের উপরই আছে। তবে নিজেকে মুসলিম বলে দাবিকারী কিছু লোক—যারা নিজের জ্ঞানবুদ্ধির উপর প্রচণ্ডরূপে আস্থাশীল—তারা দাবি করেন, কুরআন বোঝার জন্য কুরআনের বাইরের কিছুরই প্রয়োজন নেই, শুধু নিজের বুদ্ধি-প্রজ্ঞা আর কমনসেন্স দিয়েই যথার্থভাবে কুরআন বোঝা সম্ভব। এরা 'আহলে কুরআন', 'মুনকিরীনে হাদীস' বা 'হাদীস অস্বীকারকারী' নামে পরিচিত।
আমরা তাদের কুরআন বোঝার নমুনার দিকে তাকালে দেখতে পাব, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহির আলোকে কুরআনের যে আয়াতের যে মর্ম বুঝেছেন, উম্মাতের জুমহুর উলামা যে মর্ম গ্রহণ করেছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের বুঝ এর সম্পূর্ণ বিপরীত ও বিরোধী। আমরা কিছুতেই নবীজি ও জুমহুর উম্মাতের বিপরীতে এই কতিপয় অর্বাচীন বিভ্রান্ত লোকের বুঝকে সঠিক বলতে পারি না। অর্থাৎ আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে চাই, যেখানেই তারা জুমহুর উম্মাতের খেলাফ করেছে সেখানে নিশ্চিত ভ্রান্তিতে নিপতিত হয়েছে।
এই সমস্ত লোক—যারা নিজেদের বুঝবুদ্ধিকে সর্বাধিক আস্থাযোগ্য আশ্রয় মনে করেন—হাদীস বর্জন করে কুরআন বুঝতে গিয়ে তাদের যখন এই দশা, তবে কি তাদের এই হালত এ কথা প্রমাণ করে না যে, নির্ভুলরূপে কুরআন বুঝতে নবীজির হাদীস অপরিহার্য? জি, এ জন্যই আমরা বলি, হাদীস অস্বীকারকারীই কুরআন বুঝতে হাদীস অপরিহার্য হওয়ার অন্যতম প্রমাণ।
তাদের এই যে দাবি, কুরআনই যথেষ্ট, কুরআনের বাইরে কিছুরই দরকার নেই—এই কথা নাকি তারা কুরআনের কিছু আয়াত থেকেই বুঝেছেন। অথবা আমরা বলতে পারি, তাদের এ দাবির পক্ষে তারা কুরআনের কিছু আয়াত পেশ করে থাকেন। এ দাবির পক্ষে তাদের উদ্ধৃত কিছু আয়াত আমরা দেখে নিই :
১. সূরা [২৯] আনকাবূত, আয়াত-৫১ :
أَوَلَمْ يَكْفِهِمْ أَنَّا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ يُتْلَى عَلَيْهِمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَرَحْمَةً وَذِكْرَى لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ.
“তাদের জন্য কি যথেষ্ট নয় যে, তাদের কাছে আবৃত্তি করার জন্য আমি আপনার উপর কিতাব নাযিল করেছি? নিশ্চয় তাতে রয়েছে করুণা এবং মুমিনদের জন্য উপদেশ।”
২. সূরা [৭] আ'রাফ, আয়াত-৩ :
اتَّبِعُوا مَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِنْ رَّبِّكُمْ وَلَا تَتَّبِعُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ .
"তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট যা অবতীর্ণ হয়েছে তোমরা তার অনুসরণ করো, তাকে বাদ দিয়ে অন্যসব অভিভাবকদের অনুসরণ কোরো না। তোমরা কমই উপদেশ গ্রহণ করে থাকো।"
৩. সূরা [১০] ইউনুস, আয়াত-১৫ :
وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُنَا بَيِّنَاتٍ قَالَ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا ائْتِ بِقُرْآنٍ غَيْرِ هُذَا أَوْ بَدِّلُهُ قُلْ مَا يَكُونُ مِنْ أَنْ أُبَدِّلَهُ مِنْ تِلْقَاءِ نَفْسِي إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ إِنِّي أَخَافُ إِنْ عَصَيْتُ رَبِّي عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ .
“যখন তাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ সুস্পষ্টরূপে আবৃত্তি করা হয়—যারা আমার সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে না—তখন তারা বলে, এটি ব্যতীত অন্য কোনো কুরআন নিয়ে এসো, অথবা একে বদলে দাও। আপনি বলে দিন, আমি নিজের পক্ষ থেকে তা বদলানোর অধিকার রাখি না। আমার নিকট যা ওহি হয় আমি কেবল তারই অনুসরণ করি। যদি আমার প্রতিপালকের অবাধ্য হই, তবে তো আমি এক কঠিন দিবসের শাস্তির ভয় করি।"
৪. সূরা [৬] আনআম, আয়াত-১৫৫ :
وَهُذَا كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ مُبَارَكٌ فَاتَّبِعُوهُ وَاتَّقُوْا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ .
"এটি এক কল্যাণময় গ্রন্থ, তা আমি নাযিল করেছি। সুতরাং তোমরা তার অনুসরণ করবে এবং তাকওয়া অবলম্বন করবে। তাতে করুণাপ্রাপ্ত হবে।"
প্রথমত, আমরা দেখব এই চারটি আয়াত থেকে কোনোভাবেই প্রমাণিত হয় না যে, হাদীস মানতে হবে না। প্রথম আয়াতটি নাযিল হয়েছে কাফিরদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে। তারা কিছু নিদর্শন অবতরণের দাবি জানিয়েছিল। এই আয়াতে মহান আল্লাহ তাদের জবাব দিয়ে বলেছেন যে, নিদর্শন হিসাবে কুরআনই যথেষ্ট। হাদীস মান্য করা না-করার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এর আগের আয়াতটি পড়লেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় আয়াতে বলা হয়েছে, একমাত্র আল্লাহর নাযিলকৃত ওহির অনুসরণ করতে হবে। আমরা দেখেছি, কুরআন দ্বারা এ কথা সুস্পষ্ট প্রমাণিত যে, হাদীসও নাযিলকৃত ওহি। সুতরাং এ দুটি আয়াত হাদীস অস্বীকার তো দূরের কথা, বরং কুরআন ও হাদীস উভয়ই অনুসরণের নির্দেশ প্রদান করে।
চতুর্থ আয়াতে আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাবের অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমরা দেখেছি, আল্লাহর কিতাবে তাঁর নবীর প্রতি নাযিলকৃত কুরআনের অতিরিক্ত ওহিরও আনুগত্য করতে বলা হয়েছে। সুতরাং এই আয়াতের নির্দেশ অনুযায়ী কিতাবের অনুসরণ করতে হলে কিতাবের নির্দেশ মোতাবেক হাদীস মান্য করতে হবে।
অর্থাৎ হাদীসের বিপরীতে তাদের উল্লেখকৃত এ চারটি আয়াতের কোনোটিই হাদীস অস্বীকারের ক্ষেত্রে তাদের মতাদর্শের দলীল নয়। তাদের পেশকৃত বাকি দলীলগুলোর অবস্থাও এর থেকে ভিন্ন নয়।
দ্বিতীয়ত, এ সকল আয়াত থেকে তারা যে মর্ম বুঝেছে তা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণ (রা.)-সহ জুমহুর উম্মাতের বুঝের বিপরীত। তাদের এ বিভ্রান্তির কারণ কী? কুরআন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কুরআনের মালিক মহান আল্লাহ কুরআনের অতিরিক্ত যে ওহি নাযিল করেছেন, যার ভিত্তিতে তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেকোনো আয়াতের বক্তব্যের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর উদ্দিষ্ট মর্ম কী তা উম্মাতকে শিক্ষা দিয়েছেন, ওহির এই দ্বিতীয় প্রকার, অর্থাৎ হাদীসকে অস্বীকার করাই তাদের বিভ্রান্তির কারণ। হাদীস অস্বীকার করার কারণে তাদের এই যে বিভ্রান্তি, এটাও প্রমাণ করে যে, কুরআনের ব্যাখ্যায় হাদীস অপরিহার্য।

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 কুরআনের শব্দ ও অর্থ সংরক্ষণ

📄 কুরআনের শব্দ ও অর্থ সংরক্ষণ


মহান আল্লাহ কুরআন সংরক্ষণের ওয়াদা করেছেন। তিনি বলেছেন:
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُوْنَ.
“নিশ্চয় আমি এই উপদেশগ্রন্থ নাযিল করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষণকারী।” ৪০
আমরা আগেই আলোচনা করেছি, আল কুরআন শুধু তিলাওয়াত করার জন্য নাযিল হয়নি। বরং অর্থ অনুধাবন করা এবং সে অনুযায়ী বিশ্বাস ও কর্মকে পরিচালনা করাও তার অন্যতম মৌলিক দাবি। সুতরাং আল কুরআন সংরক্ষণ মানে শুধু তার শব্দের সংরক্ষণ নয়; বরং অর্থ ও মর্মেরও সংরক্ষণ। কেননা অর্থ ও মর্মের সংরক্ষণ ছাড়া তো তার দাবি অনুযায়ী বিশ্বাস ও কর্মকে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
তাছাড়া এ আয়াতে অর্থ ও মর্ম সংরক্ষণের দিকে বিশেষভাবে ইঙ্গিতও করা হয়েছে। আয়াতটিতে আল কুরআনকে ‘যিকির’ শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে। যিকির কুরআনের একটি নাম। এর অর্থ উপদেশ। আর উপদেশও শুধু শব্দ দ্বারা হয় না। বরং অর্থ অনুধাবন ও মর্ম উপলব্ধি করার মাধ্যমেই হয়ে থাকে। সুতরাং শব্দ ও অর্থ উভয় সংরক্ষণই এ আয়াতের ওয়াদার অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া যদি শুধু শব্দ সংরক্ষণ করা হয় আর অর্থ বিকৃতির পথ খোলা রাখা হয় তবে সংরক্ষিত হওয়ার অর্থই অর্থহীন বলে গণ্য হয়।
দেখা যাবে, কুরআনের শব্দের তো সঠিক আবৃত্তি চলছে, কিন্তু কুরআনের উপর আমলের নামে যা চলছে তার সাথে মহান আল্লাহর চাওয়ার কোনো মিল নেই।
অথরিটি হিসাবে কথা ও কর্মের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল কুরআনের প্রয়োজনীয় স্থানের মর্ম বুঝিয়েছেন, হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়েছেন এবং একাধিক সম্ভাবনাময় অর্থের মধ্য থেকে আল্লাহর উদ্দিষ্ট ও তাঁর নিকট গ্রহণযোগ্য অর্থ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এবং অন্যরা আল কুরআন পড়ে যা বুঝেছেন তার গ্রহণযোগ্য অংশকে তিনি অনুমোদন করেছেন। এভাবে কথা, কর্ম ও অনুমোদনের মাধ্যমে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল কুরআনের যে ব্যাখ্যা করেছেন তা মহান আল্লাহই তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন এবং উম্মাতকে শিখিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন। নবীজির এই কথা, কর্ম ও অনুমোদন হাদীস বা সুন্নাহর উল্লেখযোগ্য অংশ। কুরআনের সঠিক অর্থ সংরক্ষণের জন্য যা সংরক্ষণ করা অতিশয় জরুরি। এ ছাড়া কুরআন সংরক্ষণের অর্থ অর্থপূর্ণ হয় না।
কেননা আমরা দেখেছি, এ সকল হাদীস যদি সংরক্ষণ করা না হয় এবং কুরআন বোঝার জন্য তা মানতে বাধ্য করা না হয়-বরং প্রত্যেককে যার যার ইচ্ছামতো কুরআন বুঝে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়-তবে তো কুরআনের অর্থ বিকৃতির নানান দরজা খুলে যাবে। যার যেমন ইচ্ছা কুরআনের ব্যাখ্যা করবে-না-বুঝ ব্যাখ্যা, ভুল ব্যাখ্যা, মতলবি ব্যাখ্যা আরো কত কী! সুতরাং হাদীস ও সুন্নাহর এই অংশটি সংরক্ষণ করা কুরআন সংরক্ষণে মহান আল্লাহর ওয়াদার অন্তর্ভুক্ত। কেননা হাদীস-সুন্নাহর এই অংশ সংরক্ষণের মাধ্যমেই কুরআনের বাণীতে আল্লাহর উদ্দিষ্ট ও অনুমোদিত অর্থ সংরক্ষিত হয়।

টিকাঃ
৪০. সূরা [১৫] হিজর, আয়াত: ০৯।

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 আল্লাহ্ ওয়াদা ভঙ্গ করেন না

📄 আল্লাহ্ ওয়াদা ভঙ্গ করেন না


মহান আল্লাহ কুরআন সংরক্ষণের ওয়াদা করেছেন। উপরের আলোচনায় আমরা নিশ্চিত হয়েছি, কুরআনের শব্দ ও অর্থ উভয়ই এ ওয়াদার অন্তর্ভুক্ত। মহান আল্লাহর শান ওয়াদা রক্ষা করা। তিনি মুসলিম উম্মাহকে কুরআন সংরক্ষণে এমন কর্মযোগ দান করেছেন, যা পৃথিবীতে অপূর্ব ও অনন্য এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর জন্য এক বিপুল বিস্ময়।
আল কুরআনের তিলাওয়াত সংরক্ষণের জন্য কিরাআত ও তাজবীদ সংক্রান্ত কিছু শাস্ত্র গড়ে উঠেছে। যে শাস্ত্রের উদ্দেশ্য পৃথিবীর সকল কাল ও ভূখণ্ডের মানুষ যেন কুরআন ঠিক সেভাবে তিলাওয়াত করতে পারে যেভাবে তা নাযিল হয়েছে। যেভাবে জিবরীল আমীন (আ.)-এর কাছ থেকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিখেছেন। যেভাবে তিনি সাহাবিদেরকে শিখিয়েছেন। এভাবে কুরআনের পাঠ ও পঠন সংরক্ষিত হয়েছে। যেকোনো কালের, যেকোনো ভূখণ্ডের যেকোনো মানুষ চাইলে এ শাস্ত্র ও শাস্ত্রজ্ঞের সহযোগিতায় হুবহু সেভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতে সক্ষম হবে যেভাবে তা নাযিল হয়েছে।
কুরআনের অর্থ ও মর্ম, যা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবিদেরকে শিখিয়েছেন, তাও হাদীসশাস্ত্রের মাধ্যমে যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। এর মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো দেশ ও কালের মানুষ কুরআনের যেকোনো আয়াতের সেই মর্ম বুঝতে পারবে যা মহান আল্লাহর উদ্দিষ্ট, যা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহীর মাধ্যমে জেনেছিলেন ও বুঝেছিলেন, যা তিনি তাঁর সাহাবিদেরকে শিখিয়েছিলেন।
কুরআনের যে অংশের মর্ম কর্মগত নমুনার মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার দরকার ছিল, সাহাবিগণ (রা.) যা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্মের মাধ্যমে শিখেছিলেন, পরবর্তীদেরকেও তো তা কর্মগত নমুনার মাধ্যমেই শিখতে হবে। মহান আল্লাহ আল কুরআনের এই কর্মগত ব্যাখ্যাকেও সংরক্ষণ করেছেন। উম্মাতের প্রত্যেক প্রজন্ম তার পূর্ব প্রজন্মের কর্মের মাধ্যমেই এইসব ব্যাখ্যা শিখে আসছে। এরপরও কোনো ভুলভ্রান্তির অনুপ্রবেশ ঘটলে তা পরিশোধনের ব্যবস্থা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
يَحْمِلُ هَذَا الْعِلْمَ مِنْ كُلِّ خَلَفٍ عُدُولُهُ يَنْفُوْنَ عَنْهُ تَحْرِيفَ الْغَالِينَ وَانْتِحَالَ الْمُبْطِلِينَ وَتَأْوِيلَ الْجَاهِلِينَ.
এই ইলমকে বহন করবে প্রত্যেক উত্তর-প্রজন্মের নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিবর্গ। তারা সীমালঙ্ঘনকারীদের বিকৃতি, বাতিলপন্থীদের মিথ্যাচার ও মূর্খদের অপব্যাখ্যা থেকে ইলমকে পরিচ্ছন্ন রাখবে। ৪১
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন :
إِنَّ اللَّهَ يَبْعَثُ لِهَذِهِ الْأُمَّةِ عَلَى رَأْسِ كُلِّ مِائَةِ سَنَةٍ مَنْ يُجَدِّدُ لَهَا دِينَهَا.
আল্লাহ এই উম্মাতের জন্য প্রত্যেক শতাব্দীর প্রারম্ভে সংস্কারক পাঠান। যিনি তাদের জন্য দীনকে সংস্কার করেন। ৪২
ওয়াদা মোতাবেক মহান আল্লাহ এভাবেই আল কুরআনের সকল দিক অবিকল সংরক্ষণ করেছেন। তিনি ওয়াদা ভঙ্গ করেন না। তাঁর নিজের সম্পর্কে তিনিই তো যথার্থ বলতে পারেন। তিনি বলেছেন :
وَعْدَ اللَّهِ لَا يُخْلِفُ اللَّهُ وَعْدَهُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ.
“এটা আল্লাহর কৃত ওয়াদা। আল্লাহ তাঁর ওয়াদা খেলাফ করেন না। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না। "৪৩
আরো ইরশাদ হয়েছে:
وَعْدَ اللَّهِ حَقًّا وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ قِيلًا.
“আল্লাহর ওয়াদা যথার্থ। আর কে আছে আল্লাহর থেকে অধিক সত্যবাদী। "৪৪

টিকাঃ
৪১. তাহাবি, শারহু মুশকিলিল আসার, হাদীস: ৩৮৮৪; ইবন আদি, আল কামিল: ১/২৪৭-২৪৯; ইবন আব্দিল বার, আত তামহীদ, ১/৫৯। সালাহুদ্দীন আলায়ি হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম আহমাদ সহীহ বলেছেন। কাসতাল্লানি বলেছেন, হাদীসটির সকল সনদেই দুর্বলতা রয়েছে। তবে একাধিক সনদ একটি অপরটিকে শক্তিশালী করে। সুতরাং হাদীসটি হাসান পর্যায়ে উন্নীত, যেমনটি আলায়ি বলেছেন। এছাড়াও একাধিক হাদীস বিশারদ হাদীসটি দিয়ে দলীল দিয়েছেন। বিস্তারিত দেখুন: আলায়ি, বুগয়াতুল মুলতামিস, পৃ. ৩৪-৩৫; ইবনুল মুলাক্কিন, আল বাদরুল মুনীর ১/২৫৯; ইরাকি, আত তাকয়ীদ, পৃ. ১৩৮; কাসতাল্লানি, ইরশাদুস সারি ১/৪; সানআনি, ফাতহুল গাফফার, ৪/২১৮৫; আলী মুত্তাকি, কানযুল উম্মাল, ১০/১৭৬।
৪২. সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৪২৯১; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৮৫৯২; বাইহাকি, মা'রিফাতুস সুনান: ১/২০৮। হাদীসটিকে ইরাকি (ফায়যুল খাতীর ২/২৮২), ইবন হাজার (তাওয়ালিত তা'সীস, পৃ. ৪৯), সাখাবি (আল মাকাসিদুল হাসানাহ: ২৩৮), ইবনুদ দাইবা' (তাময়ীযুত তয়্যিব, পৃ. ৩৮)-সহ আরো অনেকে প্রমাণিত বলেছেন।
৪৩. সূরা [৩০] রূম, আয়াত: ০৬।
৪৪. সূরা [৪] নিসা, আয়াত: ১২২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00