📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 রাসূলের মাধ্যমে কুরআন নাযিলের কারণ

📄 রাসূলের মাধ্যমে কুরআন নাযিলের কারণ


উপরের আলোচনার মাঝে এ বিষয়টিও পরিষ্কাররূপে বিবৃত হয়েছে। সূরা নাহলের উল্লেখিত ৪৪ ও ৬৪ নং আয়াতে মহান আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, তিনি রাসূলের মধ্যস্থতায় কুরআন এজন্যই নাযিল করেছেন যে, তিনি মানুষদের জন্য এ কিতাব ব্যাখ্যা করবেন আর মানুষ সে অনুযায়ী কিতাব বুঝবে ও তার বিধান প্রতিপালন করবে। আল কুরআনের বক্তব্যের আলোকে এ কথাও বোঝা যায় যে, রাসূল কর্তৃক মানুষের জন্য কুরআন ব্যাখ্যার প্রয়োজন না হলে রাসূলের মাধ্যমে কুরআন নাযিলেরও দরকার পড়ত না। সুতরাং যারা কুরআন বোঝার ক্ষেত্রে রাসূলের ব্যাখ্যা অর্থাৎ হাদীস অস্বীকার করে, তারা রাসূলের মাধ্যমে কুরআন নাযিলের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করতে চায়।
সূরা নাহলের উপর্যুক্ত আয়াত উল্লেখ করে মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম (রাহ.) [১৯৮৭ খ্রি.] লিখেছেন, আলোচ্য আয়াতের মূল প্রতিপাদ্য কথা এই যে, জনগণের সম্মুখে কুরআনের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করাই রাসূলের প্রতি কুরআন নাযিল করার আসল উদ্দেশ্য। বস্তুত কোনো বিষয়কে সঠিকরূপে ও পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য তিনটি কাজ একান্ত অপরিহার্য:
প্রথমত, মুখের কথা দ্বারা তার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করা, আলোচনার মাধ্যমে প্রতিটি বিষয়ের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক রূপ উদ্‌ঘাটন করা। দ্বিতীয়ত, নিজ জীবনের কাজকর্ম ও বাস্তব জীবনধারার সাহায্যে তার ব্যবহারিক মূল্য ও গুরুত্ব উজ্জ্বল করে তোলা। তৃতীয়ত, লোকদের দ্বারা তাকে কার্যকর ও বাস্তবায়িত করার জন্য চেষ্টা করা, সঠিকরূপে তারা তার মর্মার্থ অনুধাবন ও অনুসরণ করছে কিনা সেদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা, যাচাই ও পরীক্ষাকার্যে আত্মনিয়োগ করা এবং সঠিকরূপে কার্যকর হতে দেখলে তাকে সমর্থন ও অনুমোদন দান করা আর কোনোরূপ ভুলভ্রান্তি বা ত্রুটি-বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হলে তার সংশোধন করা।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি কুরআন নাযিল হওয়ার এ উদ্দেশ্য ঘোষিত হয়েছে যে, তিনি কুরআনকে এ তিনটি দিক দিয়ে সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল করে জনসম্মুখে তুলে ধরবেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর তেইশ বছরের নবুওয়াতি জীবনে এ দায়িত্ব পূর্ণমাত্রায় ও যথাযথভাবে পালন করেছেন। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি যা কিছু বলেছেন বা করেছেন তার নির্ভরযোগ্য রেকর্ড হচ্ছে হাদীস। ২৯

টিকাঃ
২৯. আবদুর রহীম, হাদীস সংকলনের ইতিহাস, পৃ. ৭৯-৮০।

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 ওহি-ই কুরআন ব্যাখ্যার মূলসূত্র

📄 ওহি-ই কুরআন ব্যাখ্যার মূলসূত্র


উপরের আলোচনায় আল কুরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকে আমাদের কাছে এ বিষয়টি পরিস্ফুট হয়েছে যে, কুরআন ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে, আর এ ব্যাখ্যার অথরিটি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এ জন্যই তাঁর মাধ্যমে কুরআন নাযিল হয়েছে, উম্মাত রাসূলের কাছ থেকে ব্যাখ্যা শিখে নেবে এবং সে অনুযায়ী বিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্ম পরিচালিত করবে। এবং এ কথাও আমরা জানতে পেরেছি যে, রাসূল সে ব্যাখ্যা কেবল নিজের ধারণা অনুযায়ী মনগড়াভাবে করবেন না; বরং মহান আল্লাহর দেওয়া শিক্ষার আলোকে করবেন। আর আল্লাহ নিজেই তাঁকে ব্যাখ্যা শেখানোর ওয়াদাও করেছেন। এছাড়া অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
إِنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّهُ وَلَا تَكُنْ لِلْخَابِنِيْنَ خَصِيْمًا.
"নিশ্চয় আমি আপনার নিকট সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি, যাতে আপনি লোকদের মাঝে ফায়সালা করেন, যা আল্লাহ আপনাকে প্রদর্শন করেছেন তার আলোকে। আপনি খেয়ানতকারীদের পক্ষাবলম্বী হবেন না।"৩০
অর্থাৎ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেই কুরআন ব্যাখ্যা করতে হয়েছে ওহির মাধ্যমে। আল্লাহ প্রদর্শিত জ্ঞানের ভিত্তিতেই তিনি কুরআন মোতাবেক ফায়সালা করেছেন। তাহলে একজন সাধারণ মানুষের জন্য জ্ঞানহীনভাবে নিজের বুঝ অনুযায়ী মনগড়া ব্যাখ্যা করা কীভাবে বৈধ হতে পারে?
কোনো ব্যক্তির প্রদত্ত বক্তব্যের যে অংশের ব্যাখ্যা প্রয়োজন তার সঠিক মর্ম কেবল তিনিই জানেন। তাই কথা ও কর্মের মাধ্যমে তার দেওয়া ব্যাখ্যাই কেবল যথার্থ। অন্যের করা ব্যাখ্যায় ভুলের সমূহ সম্ভাবনা বিদ্যমান। তাই আল কুরআনের নির্ভুল মর্ম উপলব্ধির জন্য স্বয়ং মহান আল্লাহর ব্যাখ্যার প্রয়োজন। সে কাজটি মহান আল্লাহ করেছেন তাঁর রাসূলের মাধ্যমে। তাই উম্মাতকে রাসূলের ব্যাখ্যা অনুযায়ীই কুরআন বুঝতে হবে। নিজেদের বিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্ম সে অনুযায়ীই পরিচালিত করতে হবে। এমনকি পরবর্তীদের জন্য কুরআন ব্যাখ্যার প্রয়োজন হলে তাঁর ব্যাখ্যার আলোকেই ব্যাখ্যা করতে হবে।
হাদীস অর্থাৎ ওহির নির্দেশনা বাদ দিয়ে নিজের বুঝ অনুযায়ী কুরআন বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে গেলে তা যেমন হতে পারে ভুল বুঝ ও অপব্যাখ্যা, তেমনি ক্ষেত্রবিশেষে আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপও। কেননা এতে ব্যক্তির বুঝ ও ব্যাখ্যা আল্লাহর উদ্দিষ্ট মর্মের সম্পূর্ণ বাইরে চলে যেতে পারে। তখন তা হবে আল্লাহর নামে এমন কথা আরোপ করা যা তিনি কখনো বলেননি এবং কোনো বক্তব্য দ্বারা উদ্দেশ্যও নেননি। এটা যেমন পথভ্রান্ত হওয়ার কারণ, তেমনি মারাত্মক অপরাধ। মহান আল্লাহ বলেন :
فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا لِيُضِلَّ النَّاسَ بِغَيْرِ عِلْمٍ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ.
"তার চেয়ে বড় জালিম আর কে, যে ব্যক্তি জ্ঞানহীনভাবে মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য আল্লাহর নামে মিথ্যা আরোপ করে? নিশ্চয় আল্লাহ জালিম সম্প্রদায়কে পথের দিশা দেন না।"৩১
মহান আল্লাহ আরো বলেন:
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِآيَاتِهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ.
“যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে অথবা আল্লাহর আয়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তার অধিক বড় জালিম আর কে? জালিম কখনোই সফল হয় না।"৩২
এ অর্থে আরো অসংখ্য আয়াত বিদ্যমান। এ সকল আয়াতের ব্যাখ্যায় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ওহির ইলম ব্যতীত কুরআনের ব্যাখ্যা করবে নিজের মনগড়া তার ঠিকানা জাহান্নাম। ইবন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
مَنْ قَالَ فِي الْقُرْآنِ بِرَأْيِهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ) فَلْيَتَبَوَّأُ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ.
যে ব্যক্তি ইলম ব্যতীত নিজের মত অনুযায়ী কুরআনের বিষয়ে কথা বলবে সে যেন জাহান্নামকে নিজের ঠিকানা হিসাবে জেনে রাখে। ৩৩
জুনদুব ইবন আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
مَنْ قَالَ فِي الْقُرْآنِ بِرَأْبِهِ فَأَصَابَ فَقَدْ أَخْطَأَ .
যে ব্যক্তি কুরআন বিষয়ে নিজের ধারণা অনুযায়ী কথা বলবে, তার কথা সঠিক হলেও ভুল বলে গণ্য হবে। ৩৪
দীনের বিষয়ে অনুমান করে বলা কথা সঠিক হলেও এই কর্মটি ভুল ও অপরাধ বলে গণ্য। কেননা দীনের নামে কোনো কিছু বলার অর্থ হচ্ছে বক্তব্যটি মহান আল্লাহর বলে দাবি করা। আর আল্লাহর নামে কেবল নিশ্চিত জ্ঞানের ভিত্তিতেই কথা বলা বৈধ। এক্ষেত্রে ধারণা-অনুমানের ভিত্তিতে কিছু বলাটাই মারাত্মক অপরাধ। এতে মহান আল্লাহ ও তাঁর দীন ছেলেখেলায় পরিণত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَلَا تَتَّخِذُوا آيَاتِ اللَّهِ هُزُوًا.
“তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে খেল-তামাশার বিষয়ে পরিণত কোরো না।"৩৫
মহান আল্লাহ আরো বলেন:
قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللهِ مَا لَمْ يُنَزِّلُ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ .
“(হে নবী) আপনি বলে দিন, আমার প্রতিপালক প্রকৃতপক্ষে হারাম করেছেন: প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অশ্লীলতা, গোনাহ, অন্যায় সীমালঙ্ঘন, আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন করা—যার দলীল তিনি নাযিল করেননি—এবং আল্লাহর নামে এমন কথা বলা যা তোমরা জানো না।"৩৬
আল কুরআনের কোনো আয়াতের তাফসীর বা ব্যাখ্যা করার অর্থ হচ্ছে, উক্ত আয়াতে মহান আল্লাহর উদ্দিষ্ট মর্ম ব্যক্ত করা। সুতরাং নিশ্চিত জ্ঞান ছাড়া নিজের ধারণা-অনুমানের ভিত্তিতে কুরআনের ব্যাখ্যা করা মানে আল্লাহর নামে না জেনে কথা বলা। নিশ্চিত জ্ঞান হচ্ছে আল্লাহ প্রেরিত ওহির জ্ঞান। কেননা কেবল মহান আল্লাহই জানেন আল কুরআনের কোন বক্তব্যে তাঁর উদ্দিষ্ট মর্ম কী? তিনি তাঁর নবীকে সে মর্ম শিক্ষা দিয়েছেন। আর নবী উম্মাতকে শিখিয়েছেন। সুতরাং নববি ব্যাখ্যা বা হাদীস পরিত্যাগ করে কুরআন বুঝতে যাওয়া ও ব্যাখ্যা করা আল্লাহর নামে এমন আন্দাজে কথা বলা যা তিনি সুস্পষ্টরূপে হারাম করেছেন। এ কাজ যারা করে তারা আল্লাহর সুস্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করে শয়তানের নির্দেশ প্রতিপালন করে। মহান আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ . إِنَّمَا يَأْمُرُكُمْ بِالسُّوْءِ وَالْفَحْشَاءِ وَأَنْ تَقُوْلُوْا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُوْنَ.
“হে লোকসকল, তোমরা জমিনের বৈধ পবিত্র জিনিস ভক্ষণ করো। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। সে তো তোমাদেরকে আদেশ করে অন্যায় ও অশ্লীল কাজ করতে এবং আল্লাহর নামে এমন কথা বলতে, যা তোমরা জানো না।"৩৭
সুতরাং যারা কুরআন বোঝায় ও ব্যাখ্যায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসকে অস্বীকার করে, তারা মহান আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানকে বন্ধু ও অভিভাবকরূপে গ্রহণ করেছে। আর মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَمَنْ يَتَّخِذِ الشَّيْطَانَ وَلِيًّا مِنْ دُونِ اللَّهِ فَقَدْ خَسِرَ خُسْرَانًا مُّبِينًا.
“আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানকে বন্ধু-অভিভাবক হিসাবে গ্রহণ করল, সে প্রকাশ্য ক্ষতির মধ্যে নিপতিত হলো। "৩৮

টিকাঃ
৩০. সূরা [৪] নিসা, আয়াত: ১০৫।
৩১. সূরা [৬] আনআম, আয়াত: ১৪৪।
৩২. সূরা [৬] আনআম, আয়াত: ২১।
৩৩. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ২০৬৯; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ২৯৫০, ২৯৫১; মুসনাদ আবু ইয়া'লা, হাদীস: ২৫৮৫। ইমাম তিরমিযি হাদীসটিকে হাসান বলেছেন; ইবন কাত্তান সহীহ বলেছেন।
৩৪. সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৩৬৫২; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ২৯৫২; শুআবুল ইমান, হাদীস : ২০৮১。
৩৫. সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ২৩১。
৩৬. সূরা [৭] আ'রাফ, আয়াত: ৩৩。
৩৭. সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ১৬৮-১৬৯।
৩৮. সূরা [৪] নিসা, আয়াত: ১১৯।

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 হাদীস অস্বীকারকারীদের ভণ্ডাভাবাজি

📄 হাদীস অস্বীকারকারীদের ভণ্ডাভাবাজি


কুরআন ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই-হাদীস অস্বীকারকারীদের এ দাবিটি যে একটা অবাস্তব ভাঁওতাবাজি, এ কথা তারা নিজেরাও বোঝেন। দাবিটি তারা কুরআনের আলোকে প্রমাণ করতে চান। কুরআনের কিছু আয়াত তারা এর স্বপক্ষে উল্লেখ করেন। তারপর আয়াত দ্বারা কীভাবে দাবিটি প্রমাণিত হয় তা বোঝাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তৃতা করেন বা পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখতে থাকেন।
আমাদের কথা হচ্ছে, কুরআনের সবকিছু যদি এত সহজ হয় যে, যে কেউ পড়েই সবকিছু বুঝে ফেলবে, তাহলে তারা তাদের দাবির পক্ষে একটি দুটি আয়াত উদ্ধৃত করে আয়াত দ্বারা কীভাবে দাবি প্রমাণিত হলো তা বোঝানোর জন্য কেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তৃতা করেন? কেন পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা নিজের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা লিখতে থাকেন? আয়াত বলে দিলেই তো মানুষের বুঝে নেওয়ার কথা! তবে কি তারা বলতে চান, কুরআন বোঝার জন্য ব্যাখ্যা তো লাগবে, তবে সে ব্যাখ্যা দেওয়ার অধিকার তাদের, আল্লাহর রাসূলের কোনো অধিকার নেই? এ থেকেই কি তাদের মতলববাজি সুস্পষ্ট হয় না?
আল কুরআন আল্লাহর বাণী। এ বাণী তিনি জিবরীল (আ.)-এর মাধ্যমে তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নাযিল করেছেন এবং তাঁকে এর প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা শিখিয়েছেন ও মানব জাতিকে শেখানোর দায়িত্ব দিয়েছেন, যা আমরা উপরের আলোচনায় দেখেছি। হাদীস অস্বীকারকারীরা মহান আল্লাহর উদ্দিষ্ট বিশুদ্ধ এই ব্যাখ্যা থেকে বিচ্যুত করে নিজেদের মতলব-মতো ব্যাখ্যা গিলিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চায়। নিজেদের মনমতো কুরআন বিকৃতির পথে হাদীস বাধা বলেই তারা হাদীসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। অন্যথায় আয়াতের ব্যাখ্যা তো তারাও করেন।
তাই আমাদেরকে থাকতে হবে ওই শরীআতের উপর, মহান আল্লাহ যা আমাদেরকে দিয়েছেন তাঁর রাসূলের মাধ্যমে। অজ্ঞ-বিভ্রান্তদের মনগড়া কোনো মতাদর্শের উপরে নয়। মহান আল্লাহ বলেন :
‏ثُمَّ جَعَلْنَاكَ عَلَى شَرِيْعَةٍ مِّنَ الْاَمْرِ فَاتَّبِعْهَا وَلَا تَتَّبِعْ اَهْوَاءَ الَّذِيْنَ لَا يَعْلَمُوْنَۙ‏
“অতঃপর (হে নবী) আমি আপনাকে দীনের এক বিশেষ শরীআতের উপর রেখেছি। সুতরাং আপনি তারই অনুসরণ করুন। আর যারা প্রকৃত জ্ঞান রাখে না তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করবেন না।”৩৯

টিকাঃ
৩৯. সূরা [৪৫] জাসিয়াহ, আয়াত: ১৮।

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 হাদীস অস্বীকারকারীই হাদীস অপরিহার্যতার প্রমাণ

📄 হাদীস অস্বীকারকারীই হাদীস অপরিহার্যতার প্রমাণ


আমরা দেখছি, কুরআন ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে এবং সে ব্যাখ্যা হতে হবে ওহির আলোকে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর নিকট থেকে প্রাপ্ত কুরআনের অতিরিক্ত ওহির মাধ্যমে কুরআনের যথার্থ ব্যাখ্যা উম্মাতকে শিক্ষা দিয়েছেন। পরবর্তী উম্মাত সে ব্যাখ্যার আলোকে কুরআন বুঝেছে এবং ব্যাখ্যা করেছে। সে জন্য তারা আল কুরআনে মহান আল্লাহর উদ্দিষ্ট মর্ম অনুধাবন করতে পেরেছে এবং সে অনুযায়ী বিশ্বাস ও কর্ম পরিচালিত করতে সক্ষম হয়েছে। এ কারণে হাদীসকে বর্জন করে নিজের বুঝ ও ধারণা অনুযায়ী কুরআন বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে চাইলে সে বুঝ হবে ভুল এবং ব্যাখ্যা হবে অপব্যাখ্যা এবং মহান আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ।
জুমহুর উম্মাত এ মতের উপরই আছে। তবে নিজেকে মুসলিম বলে দাবিকারী কিছু লোক—যারা নিজের জ্ঞানবুদ্ধির উপর প্রচণ্ডরূপে আস্থাশীল—তারা দাবি করেন, কুরআন বোঝার জন্য কুরআনের বাইরের কিছুরই প্রয়োজন নেই, শুধু নিজের বুদ্ধি-প্রজ্ঞা আর কমনসেন্স দিয়েই যথার্থভাবে কুরআন বোঝা সম্ভব। এরা 'আহলে কুরআন', 'মুনকিরীনে হাদীস' বা 'হাদীস অস্বীকারকারী' নামে পরিচিত।
আমরা তাদের কুরআন বোঝার নমুনার দিকে তাকালে দেখতে পাব, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহির আলোকে কুরআনের যে আয়াতের যে মর্ম বুঝেছেন, উম্মাতের জুমহুর উলামা যে মর্ম গ্রহণ করেছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের বুঝ এর সম্পূর্ণ বিপরীত ও বিরোধী। আমরা কিছুতেই নবীজি ও জুমহুর উম্মাতের বিপরীতে এই কতিপয় অর্বাচীন বিভ্রান্ত লোকের বুঝকে সঠিক বলতে পারি না। অর্থাৎ আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে চাই, যেখানেই তারা জুমহুর উম্মাতের খেলাফ করেছে সেখানে নিশ্চিত ভ্রান্তিতে নিপতিত হয়েছে।
এই সমস্ত লোক—যারা নিজেদের বুঝবুদ্ধিকে সর্বাধিক আস্থাযোগ্য আশ্রয় মনে করেন—হাদীস বর্জন করে কুরআন বুঝতে গিয়ে তাদের যখন এই দশা, তবে কি তাদের এই হালত এ কথা প্রমাণ করে না যে, নির্ভুলরূপে কুরআন বুঝতে নবীজির হাদীস অপরিহার্য? জি, এ জন্যই আমরা বলি, হাদীস অস্বীকারকারীই কুরআন বুঝতে হাদীস অপরিহার্য হওয়ার অন্যতম প্রমাণ।
তাদের এই যে দাবি, কুরআনই যথেষ্ট, কুরআনের বাইরে কিছুরই দরকার নেই—এই কথা নাকি তারা কুরআনের কিছু আয়াত থেকেই বুঝেছেন। অথবা আমরা বলতে পারি, তাদের এ দাবির পক্ষে তারা কুরআনের কিছু আয়াত পেশ করে থাকেন। এ দাবির পক্ষে তাদের উদ্ধৃত কিছু আয়াত আমরা দেখে নিই :
১. সূরা [২৯] আনকাবূত, আয়াত-৫১ :
أَوَلَمْ يَكْفِهِمْ أَنَّا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ يُتْلَى عَلَيْهِمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَرَحْمَةً وَذِكْرَى لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ.
“তাদের জন্য কি যথেষ্ট নয় যে, তাদের কাছে আবৃত্তি করার জন্য আমি আপনার উপর কিতাব নাযিল করেছি? নিশ্চয় তাতে রয়েছে করুণা এবং মুমিনদের জন্য উপদেশ।”
২. সূরা [৭] আ'রাফ, আয়াত-৩ :
اتَّبِعُوا مَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِنْ رَّبِّكُمْ وَلَا تَتَّبِعُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ .
"তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট যা অবতীর্ণ হয়েছে তোমরা তার অনুসরণ করো, তাকে বাদ দিয়ে অন্যসব অভিভাবকদের অনুসরণ কোরো না। তোমরা কমই উপদেশ গ্রহণ করে থাকো।"
৩. সূরা [১০] ইউনুস, আয়াত-১৫ :
وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُنَا بَيِّنَاتٍ قَالَ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا ائْتِ بِقُرْآنٍ غَيْرِ هُذَا أَوْ بَدِّلُهُ قُلْ مَا يَكُونُ مِنْ أَنْ أُبَدِّلَهُ مِنْ تِلْقَاءِ نَفْسِي إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ إِنِّي أَخَافُ إِنْ عَصَيْتُ رَبِّي عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ .
“যখন তাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ সুস্পষ্টরূপে আবৃত্তি করা হয়—যারা আমার সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে না—তখন তারা বলে, এটি ব্যতীত অন্য কোনো কুরআন নিয়ে এসো, অথবা একে বদলে দাও। আপনি বলে দিন, আমি নিজের পক্ষ থেকে তা বদলানোর অধিকার রাখি না। আমার নিকট যা ওহি হয় আমি কেবল তারই অনুসরণ করি। যদি আমার প্রতিপালকের অবাধ্য হই, তবে তো আমি এক কঠিন দিবসের শাস্তির ভয় করি।"
৪. সূরা [৬] আনআম, আয়াত-১৫৫ :
وَهُذَا كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ مُبَارَكٌ فَاتَّبِعُوهُ وَاتَّقُوْا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ .
"এটি এক কল্যাণময় গ্রন্থ, তা আমি নাযিল করেছি। সুতরাং তোমরা তার অনুসরণ করবে এবং তাকওয়া অবলম্বন করবে। তাতে করুণাপ্রাপ্ত হবে।"
প্রথমত, আমরা দেখব এই চারটি আয়াত থেকে কোনোভাবেই প্রমাণিত হয় না যে, হাদীস মানতে হবে না। প্রথম আয়াতটি নাযিল হয়েছে কাফিরদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে। তারা কিছু নিদর্শন অবতরণের দাবি জানিয়েছিল। এই আয়াতে মহান আল্লাহ তাদের জবাব দিয়ে বলেছেন যে, নিদর্শন হিসাবে কুরআনই যথেষ্ট। হাদীস মান্য করা না-করার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এর আগের আয়াতটি পড়লেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় আয়াতে বলা হয়েছে, একমাত্র আল্লাহর নাযিলকৃত ওহির অনুসরণ করতে হবে। আমরা দেখেছি, কুরআন দ্বারা এ কথা সুস্পষ্ট প্রমাণিত যে, হাদীসও নাযিলকৃত ওহি। সুতরাং এ দুটি আয়াত হাদীস অস্বীকার তো দূরের কথা, বরং কুরআন ও হাদীস উভয়ই অনুসরণের নির্দেশ প্রদান করে।
চতুর্থ আয়াতে আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাবের অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমরা দেখেছি, আল্লাহর কিতাবে তাঁর নবীর প্রতি নাযিলকৃত কুরআনের অতিরিক্ত ওহিরও আনুগত্য করতে বলা হয়েছে। সুতরাং এই আয়াতের নির্দেশ অনুযায়ী কিতাবের অনুসরণ করতে হলে কিতাবের নির্দেশ মোতাবেক হাদীস মান্য করতে হবে।
অর্থাৎ হাদীসের বিপরীতে তাদের উল্লেখকৃত এ চারটি আয়াতের কোনোটিই হাদীস অস্বীকারের ক্ষেত্রে তাদের মতাদর্শের দলীল নয়। তাদের পেশকৃত বাকি দলীলগুলোর অবস্থাও এর থেকে ভিন্ন নয়।
দ্বিতীয়ত, এ সকল আয়াত থেকে তারা যে মর্ম বুঝেছে তা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণ (রা.)-সহ জুমহুর উম্মাতের বুঝের বিপরীত। তাদের এ বিভ্রান্তির কারণ কী? কুরআন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কুরআনের মালিক মহান আল্লাহ কুরআনের অতিরিক্ত যে ওহি নাযিল করেছেন, যার ভিত্তিতে তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেকোনো আয়াতের বক্তব্যের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর উদ্দিষ্ট মর্ম কী তা উম্মাতকে শিক্ষা দিয়েছেন, ওহির এই দ্বিতীয় প্রকার, অর্থাৎ হাদীসকে অস্বীকার করাই তাদের বিভ্রান্তির কারণ। হাদীস অস্বীকার করার কারণে তাদের এই যে বিভ্রান্তি, এটাও প্রমাণ করে যে, কুরআনের ব্যাখ্যায় হাদীস অপরিহার্য।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00