📄 কুরআন ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা
উপরে উল্লেখিত আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল কুরআনের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেবার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এ ঘোষণার মাধ্যমে আল কুরআনের ব্যাখ্যার যে প্রয়োজনীতা রয়েছে তা পরিষ্কার বিবৃত হয়েছে।
কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য যদিও সহজ করা হয়েছে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, যেকোনো পাঠকই তার সকল বক্তব্য বিনা ব্যাখ্যায় বুঝে ফেলবে। যেমন: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সকল শ্রেণির সিলেবাস প্রণয়ন করা হয় সেই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বয়স ও মেধার উপযোগী বিষয় ও ভাষা দিয়ে— সরল, সুস্পষ্ট ও বিভিন্ন ধরনের উদাহরণসহ। তবুও সকল শিক্ষার্থী শিক্ষক ও গাইডের সাহায্য ছাড়া সকল পড়া ষোলো আনা আয়ত্ত করতে পারে না। আল কুরআনের বক্তব্যের ক্ষেত্রেও একই কথা মহান আল্লাহ বলেছেন :
وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ وَمَا يََعْقِلُهَا إِلَّا الْعَالِمُونَ.
“এইসব দৃষ্টান্ত আমি মানুষের জন্য উপস্থাপন করেছি, অথচ জ্ঞানীগণ ছাড়া তা অনুধাবন করতে পারে না।”১৬
দুটি দৃষ্টান্ত দেখুন। ১. রমাযানের রাতে পানাহারের বৈধতার শেষ সীমা নির্দেশ করে আল কুরআনে আয়াত নাযিল হলো :
وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ.
“তোমরা পানাহার করতে পারো তোমাদের নিকট কালো সুতা (রেখা) থেকে প্রভাতের সাদা সুতা সুস্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত।”১৭
তখন সাহাবিদের কেউ কেউ নিজেদের কাছে কালো সুতা ও সাদা সুতা রেখে দেন এবং সাদা ও কালোর মধ্যে পার্থক্য দেখা না যাওয়া পর্যন্ত পানাহার করেন। তাঁদের একজন ছিলেন আদি ইবন হাতিম (রা.)। তিনি তাঁর বালিশের নিচে সুতা রেখে দেন এবং রাতে বারবার দেখেও সাদা-কালোর পার্থক্য করতে পারেন না। তিনি সকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গিয়ে বিষয়টি জানান। তাঁর কথা শুনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেসে দিয়ে রসিকতা করে বলেন, তোমার বালিশ তো অনেক প্রশস্ত! এখানে তো রাতের আঁধার আর দিনের শুভ্রতা বোঝানো হয়েছে। ১৮
২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর সালাত (দরুদ) ও সালাম পাঠের নির্দেশ দিয়ে সূরা আহযাবের ৫৬ নং আয়াত নাযিল হলো :
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّوْنَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا.
“নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতামণ্ডলী নবীর উপর সালাত পেশ করে থাকে। হে মুমিনগণ, তোমরাও তার উপর সালাত ও যথাযথভাবে সালাম পাঠ করবে।"
আয়াতটি নাযিল হলে সাহাবিগণ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার প্রতি সালামের পদ্ধতি তো আমরা জানি, আল্লাহ আমাদেরকে আপনার উপর সালাত (দরুদ) পাঠেরও নির্দেশ দিয়েছেন। আপনার উপর সালাত কেমন হবে? তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদেরকে শিখিয়ে দেন, কী বলে তাঁর উপর সালাত পাঠ করতে হবে।১৯
সাহাবিগণ ছিলেন আরব। ইবরাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাক (আ.) থেকে চলে আসা ধর্মীয় ঐতিহ্যও তাঁদের ছিল। তবুও আয়াতে বর্ণিত আমল শেখার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দ্বারস্থ তাঁদের হতে হয়েছে।
এরূপ আরো অনেক ঘটনা আছে যে, সাহাবায়ে কিরাম (রা.) আরব ও আল কুরআনের প্রথম সম্বোধিত এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সান্নিধ্যধন্য হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ব্যাখ্যা ছাড়া তাঁরা কুরআনের বক্তব্যের সঠিক মর্ম বুঝে উঠতে পারেননি।
সুতরাং কুরআনের বক্তব্য পুরোপুরি অনুধাবন করার জন্য এবং ইসলামি শরীআতের বিধানাবলি বিস্তারিত ও বিশদভাবে জানার জন্য যে কুরআনের ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে এ কথা কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্যের মাধ্যমে এবং বাস্তবতার নিরিখেই আমরা জানতে পারছি।
টিকাঃ
১৫. সূরা [৭৫] কিয়ামাহ, আয়াত: ১৬-১৯।
১৬. সূরা [২৯] আনকাবূত, আয়াত: ৪৩।
১৭. সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ১৮৭।
১৮. সহীহ বুখারি, হাদীস: ১৯১৭, ৪৫০৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০৯০, ১০৯১।
১৯. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১১৪৩৩; সহীহ বুখারি, হাদীস: ৪৭৯৭; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস : ৯০৫; তাবারানি, আল মু'জামুল কাবীর ১৯/১৩০, হাদীস : ১৮৭।
📄 রাসূল কুরআন ব্যাখ্যার অথরিটি
আমরা কুরআনের আলোকে কুরআন ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তার কথা জানতে পেরেছি। মহান আল্লাহ নিজেই কুরআন ব্যাখ্যার দায়িত্ব নিয়েছেন। তবে সে দায়িত্ব পালনে তিনি কুরআনের ব্যাখ্যাগ্রন্থ হিসাবে আলাদা কোনো গ্রন্থ নাযিল করেননি এবং নিজে এসেও শেখাননি-আর সেটা হবারও নয়, তা তাঁর সুউচ্চ শানের পরিপন্থী। তিনি বরং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছেন এবং তাঁকে আদেশ করেছেন মানব জাতিকে সে ব্যাখ্যা শিক্ষা দিতে। এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্যতম দায়িত্বও বটে। এ কথা আল কুরআনের একাধিক আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন :
لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُوْلًا مِّنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ .
“প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহ মুমিনদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের কাছে তাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের নিকট আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন। আর যদিও তারা ইতঃপূর্বে সুস্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে ছিল।”২০
লক্ষণীয়, এ আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলের যে সকল দায়িত্বের কথা উল্লেখ করেছেন তার একটি হচ্ছে, উম্মাতের নিকট তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত বা আবৃত্তি করা; আরেকটি হচ্ছে, কিতাব শিক্ষা দেওয়া। নিশ্চয় আয়াত আবৃত্তি করে শোনানো আর কিতাব শিক্ষা দেওয়া এক কথা নয়। কেননা এ বিষয়ক সবগুলো আয়াতে প্রথমে আয়াত তিলাওয়াত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তারপর আলাদাভাবে কিতাব শিক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাহলে কিতাব শিক্ষা দেওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য কী? বিষয়টি আল কুরআনের অন্য আয়াত দ্বারা পরিষ্কার প্রতিভাত হয়। মহান আল্লাহ বলেন:
وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ.
“আমি আপনার নিকট উপদেশগ্রন্থ নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষের কাছে ব্যাখ্যা করেন, যা তাদের জন্য নাযিল করা হয়েছে; এবং যাতে তারা চিন্তা-ফিকির করতে পারে।”২১
এ আয়াতে কারীমায় আমরা দেখতে পাচ্ছি, মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট উপদেশগ্রন্থ নাযিলের উদ্দেশ্য হচ্ছে, তিনি মানুষদের জন্য ব্যাখ্যা করে দেবেন যা তাদের জন্য নাযিল করা হয়েছে। এরপর আল্লাহ বলেছেন, 'যাতে তারা চিন্তা-ফিকির করতে পারে।' অর্থাৎ মানুষেরা কুরআন নিয়ে চিন্তা-ফিকির করবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাখ্যার আলোকে। তাঁর ব্যাখ্যা এড়িয়ে কুরআন নিয়ে চিন্তা-ফিকির করা এবং সে চিন্তা-ফিকির থেকে যদি এমন কোনো মর্ম বের হয়, যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাখ্যার সাথে সাংঘর্ষিক, মহান আল্লাহর নিকট তা গ্রহণযোগ্য নয়।
মহান আল্লাহ আরো বলেন:
وَمَا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ إِلَّا لِتُبَيِّنَ لَهُمُ الَّذِي اخْتَلَفُوْا فِيْهِ وَهُدًى وَرَحْمَةً لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ.
"আমি আপনার উপর গ্রন্থ তো এজন্যই নাযিল করেছি যে, আপনি তাদেরকে সুস্পষ্ট করে দেবেন যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করেছে; এবং তা মুমিনদের জন্য পথনির্দেশ ও করুণাস্বরূপ।"২২
এ আয়াতেও লক্ষণীয়, মহান আল্লাহ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর গ্রন্থ নাযিলের উদ্দেশ্য হিসাবে বলেছেন যে, নবীজি মানুষদের মধ্যে মতানৈক্যপূর্ণ বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেবেন। এমনকি কুরআন বুঝতে গিয়ে কারো কোনো ভুল হলে বা মতভিন্নতা সৃষ্টি হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাখ্যার আলোকে তার সমাধান করতে হবে। সুতরাং কুরআনের ক্ষেত্রে নিজের বুঝকে চূড়ান্ত ধরে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বুঝকে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক দাবিকারীর কুরআন অধ্যয়নের পথ ও পন্থা সঠিক নয়। সে হয়তো নিজে বিভ্রান্ত, নয়তো পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী।
আল কুরআন শুধু তিলাওয়াত বা আবৃত্তির জন্য নাযিল হয়নি; বরং এ মহাগ্রন্থ নাযিলের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য অর্থ অনুধাবন ও মর্ম উপলব্ধি করা এবং তার বিধি-নিষেধ প্রতিপালন করা। অর্থাৎ কুরআন সংশ্লিষ্ট বান্দার দায়িত্ব-কর্তব্যের মধ্যে রয়েছে, কুরআন তিলাওয়াত করা, মর্ম অনুধাবন করা এবং সে অনুযায়ী বিশ্বাস ও কর্ম পরিচালিত করা।
জ্ঞানীমাত্রই জানেন, ভাষার মাধ্যমে প্রদত্ত বক্তব্য তিন ধরনের জটিলতা থেকে মুক্ত থাকে না। ১. কখনো কখনো ব্যাখ্যা ছাড়া তার মর্ম অনুধাবন করা যায় না। ২. কখনো কখনো শুধু মৌখিক ব্যাখ্যার দ্বারাও বোঝা যায় না; বরং বাস্তব কর্মগত নমুনা পেশ করতে হয়। এবং ৩. কোনো কোনো বাক্যে একাধিক অর্থের অবকাশ থাকে।
ধরুন, একটি বাক্যের তিনটি অর্থের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বক্তা শুধু একটি অর্থেই বাক্যটি প্রয়োগ করেছে। অথবা তার নিকট বাক্যটির দুটি অর্থ গ্রহণযোগ্য। এখন যদি বাক্যটি আমরা তিনজন ব্যক্তির সামনে পেশ করি আর তারা তিনজন ভিন্ন ভিন্ন তিনটি অর্থ বুঝে নেয় এবং তাদের নিজ নিজ বুঝ অনুযায়ী বাক্যটির নির্দেশের উপর আমল করে তবে নিশ্চয় একজন বা দুজনের বুঝ ও কর্ম সঠিক হবে। আর বাকি একজন বা দুজনের বুঝ ও কর্ম হবে ভুল। এবং কিছুতেই বলা যাবে না যে, এরা বক্তার আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী আমল করেছে।
তাছাড়া কোনো মতলববাজ একাধিক সম্ভাবনা থেকে বা পূর্বাপর থেকে বিচ্ছিন্ন করে খণ্ডিতভাবে উদ্ধৃত করে এমন অর্থও প্রচার করতে পারে, যা বক্তার উদ্দিষ্ট বা তার নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। যদিও সে দাবি করবে যে, এটাই একমাত্র সঠিক অর্থ।
সুতরাং বাস্তবতারও দাবি হচ্ছে, কুরআন ব্যাখ্যার কোনো অথরিটি থাকতে হবে, যিনি লোকদেরকে কুরআনের সঠিক পাঠপদ্ধতি, অনুধাবন এবং বিশ্বাস ও কর্ম হাতেকলমে শিক্ষা দেবেন- মহান আল্লাহর যেখানে যেমন উদ্দেশ্য। উপরের আলোচনায় আমরা দেখেছি, তিনি হচ্ছেন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এ বিষয়ে কুরআনে আরো বহুসংখ্যক আয়াত বিদ্যমান।
জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যেমনটি হয়ে থাকে, প্রথমে ধারণা-অনুমান করা হয়। তারপর দীর্ঘদিনের গবেষণায় একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় এবং সে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমল চলতে থাকে। তারপর কয়েক প্রজন্ম পর হয়তো নতুন কোনো গবেষণায় ধরা পড়ে আগের সিদ্ধান্ত আংশিক কিংবা পুরোপুরি ভুল ছিল।
কুরআন অনুধাবনের জন্যেও যদি কোনো অথরিটি না থাকে, বরং প্রত্যেককে তার নিজ নিজ বুঝের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে ব্যক্তি হয়তো আজ নিজ গবেষণালব্ধ এক বুঝের উপর আমল শুরু করল, কিছুদিন পর তার মনে হলো, পূর্বের বুঝ ভুল ছিল। এখন সে নতুন বুঝ অনুযায়ী তার বিশ্বাস ও কর্ম পরিবর্তন করে নিল। এভাবে তার গবেষণা চলতে থাকবে আর বিশ্বাস ও কর্ম নিয়ত পরিবর্তন হতে থাকবে। ইসলামি আকীদা-বিশ্বাস ও ইবাদত-বন্দেগি এভাবে নিছক ছেলেখেলা ও তামাশার বিষয়ে পরিণত হবে। একটা ইসলামি সমাজে দেখা যাবে সকলেই গবেষক। প্রত্যেকেই নিজ গবেষণালব্ধ বুঝের উপর আমল করছে। দেখা যাবে প্রত্যেকেরই আকীদা-বিশ্বাস ও ইবাদত-বন্দেগির পদ্ধতি ভিন্ন ভিন্ন। একটি আমল একেকজন একেকভাবে করছে। অথচ প্রত্যেকেরই দলীল একই আয়াত।
জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ভুলের হয়তো ক্ষতিপূরণ আছে। অন্ততপক্ষে সে ক্ষতির সীমা আছে। কিন্তু হাশরের মাঠে যদি কোনো গবেষক দেখেন তার কুরআন গবেষণার সিদ্ধান্তগুলো ভুল ছিল। ভুল ছিল তার বিশ্বাস ও কর্ম। এ ভুলের কি কোনো ক্ষতিপূরণ বা সীমা আছে? মহান দয়াময় মাবুদ কি তাঁর বান্দাকে এমন দিশাহীন অনিশ্চিত অবস্থায় ছেড়ে রাখতে পারেন?
না, দয়াময় মাবুদ তাঁর বান্দাদেরকে এমন দিশাহীন অনিশ্চিত অবস্থায় ছেড়ে দেননি। তিনি তাঁর রাসূলকে দিয়ে বান্দাদেরকে এ মসিবত থেকে উদ্ধার করেছেন। এবার সূরা আল ইমরানের ১৬৪ নং আয়াতটি আবার পড়ুন। এটা মুমিনদের উপর মহান আল্লাহর এক বিশেষ অনুগ্রহ যে, তিনি তাঁর কিতাব শিক্ষা দেওয়ার জন্য তাদের মধ্য থেকে তাদের নিকট একজন রাসূল পাঠিয়েছেন।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উপর অর্পিত এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন। তিনি জীবনব্যাপী তাঁর কথা, কর্ম ও अनुमोদনের মাধ্যমে মানুষকে কুরআনের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছেন। এজন্য তাঁর জীবনই হয়ে উঠেছিল আল কুরআনের সমার্থক। আয়িশা সিদ্দীকা (রা.) বলেছেন, 'তাঁর আখলাক হলো আল কুরআন'।২৩
সুতরাং হাদীস অস্বীকারকারীরা যে দাবি করেন, কুরআন বোঝার জন্য হাদীসের কোনো প্রয়োজন নেই, এক্ষেত্রে নবীজির বিশেষ কোনো অথরিটি নেই, যে কেউই তা পাঠ করে বুঝতে পারবে, কেননা কুরআনকে আল্লাহ সহজ করেছেন—তাদের এ দাবি আল কুরআন ও বাস্তবতার আলোকে ভুল প্রমাণিত হলো।
হাদীস অস্বীকারকারী কেউ কেউ অবশ্য বলেন, কোনো বিষয়ে কুরআনে বর্ণিত তথ্যগুলো সামনে রেখে ব্যক্তি যখন সে ক্ষেত্রে আল্লাহর উদ্দেশ্য বুঝতে চেষ্টা করে তখন তার কাছে যেটা সঠিক মনে হবে সে অনুযায়ীই আমল করবে। সেটাই তার জন্য আল্লাহর বিধান। কেননা আল্লাহ দেখেন নিয়ত ও প্রচেষ্টা।
কিন্তু এ কথা সম্পূর্ণ ভুল ও বাতিল। কেননা সদিচ্ছা ও নিয়তের বিশুদ্ধতার দাবি হচ্ছে সাধ্যমতো চেষ্টা করা। আর সাধ্যমতো প্রচেষ্টার বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে কোনো বিষয় যথাযথভাবে বুঝতে ও সঠিক বুঝ পেতে চাইলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অভিজ্ঞ মানুষের শরণাপন্ন হওয়া। এটা আল কুরআনেরও নির্দেশনা। মহান আল্লাহ বলেন : فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ.
"তোমরা না জানলে যারা জানে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করো।”২৪
জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখার জন্য এ নীতি প্রযোজ্য। কোনো শাস্ত্রই এর ব্যতিক্রম নয়। কোনো জ্ঞানী ব্যক্তিই এর ব্যতিক্রম দাবি করেন না। কোনো ছাত্র যদি কোনো শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞের পাঠ গ্রহণ না করে এবং পরীক্ষার খাতায় নিজের ব্যক্তিগত আন্তরিক প্রচেষ্টার ভুল বুঝ লিখে দিয়ে আসে কোনো যুক্তিতেই কি সে মার্ক পাওয়ার উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবে?
কুরআনের নির্দেশ হচ্ছে, কুরআন বুঝতে হবে নবীজির কাছ থেকে এবং কুরআনের বিধানের উপর আমল করতে হবে নবীজির নমুনায়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও বিভিন্ন আমল উল্লেখ করে করে বলেছেন, তোমরা এ বিষয়টি আমার কাছ থেকে শিখে নাও, এ আমলটি আমার অনুকরণে এভাবে আদায় করো। যেমন হজ্জ সম্পর্কে তিনি বলেছেন :
خُذُوْا عَنِّي مَنَاسِكَكُمْ لَعَلَّيْ لَا أَرَاكُمْ بَعْدَ عَامِي هَذَا.
তোমরা আমার কাছ থেকে হজ্জের নিয়মাবলি শিখে নাও। সম্ভবত এ বছরের পর তোমাদের সাথে আমার আর দেখা হবে না। ২৫
সালাত আদায় সম্পর্কে তিনি বলেছেন, صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي.
তোমরা সালাত আদায় করবে যেভাবে আমাকে সালাত আদায় করতে দেখলে। ২৬
নবীজির অনুকরণে তাঁর সুন্নাহ মোতাবেক ইবাদত পালন করা এতটাই অপরিহার্য যে, এর ব্যতিক্রম করে ইবাদত পালন করাকে তিনি ইবাদত পালন বলেই গ্রহণ করেননি। এক ব্যক্তি নবীজির উপস্থিতিতে সালাত আদায় করে তাঁকে সালাম দিল। তিনি উত্তর দিয়ে বললেন, যাও, আবার সালাত আদায় করো; তুমি সালাত আদায় করোনি। এভাবে সে ব্যক্তি তিনবার সালাত আদায় করল। নবীজি তিনবারই তাকে বললেন, তুমি সালাত আদায় করোনি। অবশেষে তিনি নিজেই তাকে সালাত আদায়ের পদ্ধতি দেখিয়ে দিলেন। ২৭
এ থেকে আমরা বুঝতে পারছি, কুরআন নবীজি যেভাবে বুঝেছেন এবং যেভাবে পালন করেছেন আমাদেরকেও সেভাবে বুঝতে হবে এবং পালন করতে হবে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই দ্ব্যর্থহীন বক্তব্যের বিপরীতে হাদীস অস্বীকারকারী অর্বাচীনদের এই দাবির কী মূল্য আছে যে, কুরআন নিজে পড়ে যে যা বুঝবে সেভাবে পালন করলেই তা আল্লাহর বিধান পালন বলে গণ্য হবে?
ইমাম মুহাম্মাদ ইবন ইদরীস শাফিয়ি (রাহ.) বলেন, আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহ আল্লাহর পক্ষ থেকে কুরআনের বক্তব্যে আল্লাহর উদ্দেশ্যের ব্যাখ্যাতা— কোন বিধানটি ব্যাপক আর কোনটি বিশেষ তার নির্ধারক। আল্লাহ তাঁর কিতাবে সুন্নাহকে হিকমাহর সাথে সংযুক্ত করেছেন এবং কিতাব শব্দটির অব্যবহিত পরেই তার উল্লেখ করেছেন। এ অধিকার আল্লাহ তাআলা সমগ্র সৃষ্টিতে তাঁর রাসূল ছাড়া আর কাউকে দেননি।২৮
টিকাঃ
২০. সূরা [৩] আল ইমরান, আয়াত: ১৬৪। আরো দেখুন, সূরা বাকারাহ: ১২৯ আয়াত ও সূরা জুমুআহ: ০২ আয়াত।
২১. সূরা [১৬] নাহল, আয়াত: ৪৪।
২২. সূরা [১৬] নাহল, আয়াত: ৬৪।
২৩. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ২৪৬০১; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৭৪৬।
২৪. সূরা [১৬] নাহল, আয়াত: ৪৩; সূরা [২১] আম্বিয়া', আয়াত: ০৭।
২৫. বাইহাকি, আস সুনানুল কুবরা, হাদীস: ৯৫২৪; ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল ৩/২৮৫। হাদীসটি কাছাকাছি শব্দে মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ি প্রমুখ ইমাম বর্ণনা করেছেন。
২৬. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৬৩১; ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল ৫/৫৭৬。
২৭. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ৯৬৩৫; সহীহ বুখারি, হাদীস: ৭৫৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৩৯৭; সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৮৫৬; সুনান তিরমিযি, হাদীস : ৩০৩。
২৮. শাফিয়ি, আর রিসালাহ, পৃ. ৭৩।
📄 রাসূলের মাধ্যমে কুরআন নাযিলের কারণ
উপরের আলোচনার মাঝে এ বিষয়টিও পরিষ্কাররূপে বিবৃত হয়েছে। সূরা নাহলের উল্লেখিত ৪৪ ও ৬৪ নং আয়াতে মহান আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, তিনি রাসূলের মধ্যস্থতায় কুরআন এজন্যই নাযিল করেছেন যে, তিনি মানুষদের জন্য এ কিতাব ব্যাখ্যা করবেন আর মানুষ সে অনুযায়ী কিতাব বুঝবে ও তার বিধান প্রতিপালন করবে। আল কুরআনের বক্তব্যের আলোকে এ কথাও বোঝা যায় যে, রাসূল কর্তৃক মানুষের জন্য কুরআন ব্যাখ্যার প্রয়োজন না হলে রাসূলের মাধ্যমে কুরআন নাযিলেরও দরকার পড়ত না। সুতরাং যারা কুরআন বোঝার ক্ষেত্রে রাসূলের ব্যাখ্যা অর্থাৎ হাদীস অস্বীকার করে, তারা রাসূলের মাধ্যমে কুরআন নাযিলের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করতে চায়।
সূরা নাহলের উপর্যুক্ত আয়াত উল্লেখ করে মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম (রাহ.) [১৯৮৭ খ্রি.] লিখেছেন, আলোচ্য আয়াতের মূল প্রতিপাদ্য কথা এই যে, জনগণের সম্মুখে কুরআনের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করাই রাসূলের প্রতি কুরআন নাযিল করার আসল উদ্দেশ্য। বস্তুত কোনো বিষয়কে সঠিকরূপে ও পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য তিনটি কাজ একান্ত অপরিহার্য:
প্রথমত, মুখের কথা দ্বারা তার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করা, আলোচনার মাধ্যমে প্রতিটি বিষয়ের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক রূপ উদ্ঘাটন করা। দ্বিতীয়ত, নিজ জীবনের কাজকর্ম ও বাস্তব জীবনধারার সাহায্যে তার ব্যবহারিক মূল্য ও গুরুত্ব উজ্জ্বল করে তোলা। তৃতীয়ত, লোকদের দ্বারা তাকে কার্যকর ও বাস্তবায়িত করার জন্য চেষ্টা করা, সঠিকরূপে তারা তার মর্মার্থ অনুধাবন ও অনুসরণ করছে কিনা সেদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা, যাচাই ও পরীক্ষাকার্যে আত্মনিয়োগ করা এবং সঠিকরূপে কার্যকর হতে দেখলে তাকে সমর্থন ও অনুমোদন দান করা আর কোনোরূপ ভুলভ্রান্তি বা ত্রুটি-বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হলে তার সংশোধন করা।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি কুরআন নাযিল হওয়ার এ উদ্দেশ্য ঘোষিত হয়েছে যে, তিনি কুরআনকে এ তিনটি দিক দিয়ে সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল করে জনসম্মুখে তুলে ধরবেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর তেইশ বছরের নবুওয়াতি জীবনে এ দায়িত্ব পূর্ণমাত্রায় ও যথাযথভাবে পালন করেছেন। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি যা কিছু বলেছেন বা করেছেন তার নির্ভরযোগ্য রেকর্ড হচ্ছে হাদীস। ২৯
টিকাঃ
২৯. আবদুর রহীম, হাদীস সংকলনের ইতিহাস, পৃ. ৭৯-৮০।
📄 ওহি-ই কুরআন ব্যাখ্যার মূলসূত্র
উপরের আলোচনায় আল কুরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকে আমাদের কাছে এ বিষয়টি পরিস্ফুট হয়েছে যে, কুরআন ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে, আর এ ব্যাখ্যার অথরিটি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এ জন্যই তাঁর মাধ্যমে কুরআন নাযিল হয়েছে, উম্মাত রাসূলের কাছ থেকে ব্যাখ্যা শিখে নেবে এবং সে অনুযায়ী বিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্ম পরিচালিত করবে। এবং এ কথাও আমরা জানতে পেরেছি যে, রাসূল সে ব্যাখ্যা কেবল নিজের ধারণা অনুযায়ী মনগড়াভাবে করবেন না; বরং মহান আল্লাহর দেওয়া শিক্ষার আলোকে করবেন। আর আল্লাহ নিজেই তাঁকে ব্যাখ্যা শেখানোর ওয়াদাও করেছেন। এছাড়া অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
إِنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّهُ وَلَا تَكُنْ لِلْخَابِنِيْنَ خَصِيْمًا.
"নিশ্চয় আমি আপনার নিকট সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি, যাতে আপনি লোকদের মাঝে ফায়সালা করেন, যা আল্লাহ আপনাকে প্রদর্শন করেছেন তার আলোকে। আপনি খেয়ানতকারীদের পক্ষাবলম্বী হবেন না।"৩০
অর্থাৎ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেই কুরআন ব্যাখ্যা করতে হয়েছে ওহির মাধ্যমে। আল্লাহ প্রদর্শিত জ্ঞানের ভিত্তিতেই তিনি কুরআন মোতাবেক ফায়সালা করেছেন। তাহলে একজন সাধারণ মানুষের জন্য জ্ঞানহীনভাবে নিজের বুঝ অনুযায়ী মনগড়া ব্যাখ্যা করা কীভাবে বৈধ হতে পারে?
কোনো ব্যক্তির প্রদত্ত বক্তব্যের যে অংশের ব্যাখ্যা প্রয়োজন তার সঠিক মর্ম কেবল তিনিই জানেন। তাই কথা ও কর্মের মাধ্যমে তার দেওয়া ব্যাখ্যাই কেবল যথার্থ। অন্যের করা ব্যাখ্যায় ভুলের সমূহ সম্ভাবনা বিদ্যমান। তাই আল কুরআনের নির্ভুল মর্ম উপলব্ধির জন্য স্বয়ং মহান আল্লাহর ব্যাখ্যার প্রয়োজন। সে কাজটি মহান আল্লাহ করেছেন তাঁর রাসূলের মাধ্যমে। তাই উম্মাতকে রাসূলের ব্যাখ্যা অনুযায়ীই কুরআন বুঝতে হবে। নিজেদের বিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্ম সে অনুযায়ীই পরিচালিত করতে হবে। এমনকি পরবর্তীদের জন্য কুরআন ব্যাখ্যার প্রয়োজন হলে তাঁর ব্যাখ্যার আলোকেই ব্যাখ্যা করতে হবে।
হাদীস অর্থাৎ ওহির নির্দেশনা বাদ দিয়ে নিজের বুঝ অনুযায়ী কুরআন বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে গেলে তা যেমন হতে পারে ভুল বুঝ ও অপব্যাখ্যা, তেমনি ক্ষেত্রবিশেষে আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপও। কেননা এতে ব্যক্তির বুঝ ও ব্যাখ্যা আল্লাহর উদ্দিষ্ট মর্মের সম্পূর্ণ বাইরে চলে যেতে পারে। তখন তা হবে আল্লাহর নামে এমন কথা আরোপ করা যা তিনি কখনো বলেননি এবং কোনো বক্তব্য দ্বারা উদ্দেশ্যও নেননি। এটা যেমন পথভ্রান্ত হওয়ার কারণ, তেমনি মারাত্মক অপরাধ। মহান আল্লাহ বলেন :
فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا لِيُضِلَّ النَّاسَ بِغَيْرِ عِلْمٍ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ.
"তার চেয়ে বড় জালিম আর কে, যে ব্যক্তি জ্ঞানহীনভাবে মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য আল্লাহর নামে মিথ্যা আরোপ করে? নিশ্চয় আল্লাহ জালিম সম্প্রদায়কে পথের দিশা দেন না।"৩১
মহান আল্লাহ আরো বলেন:
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِآيَاتِهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ.
“যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে অথবা আল্লাহর আয়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তার অধিক বড় জালিম আর কে? জালিম কখনোই সফল হয় না।"৩২
এ অর্থে আরো অসংখ্য আয়াত বিদ্যমান। এ সকল আয়াতের ব্যাখ্যায় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ওহির ইলম ব্যতীত কুরআনের ব্যাখ্যা করবে নিজের মনগড়া তার ঠিকানা জাহান্নাম। ইবন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
مَنْ قَالَ فِي الْقُرْآنِ بِرَأْيِهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ) فَلْيَتَبَوَّأُ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ.
যে ব্যক্তি ইলম ব্যতীত নিজের মত অনুযায়ী কুরআনের বিষয়ে কথা বলবে সে যেন জাহান্নামকে নিজের ঠিকানা হিসাবে জেনে রাখে। ৩৩
জুনদুব ইবন আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
مَنْ قَالَ فِي الْقُرْآنِ بِرَأْبِهِ فَأَصَابَ فَقَدْ أَخْطَأَ .
যে ব্যক্তি কুরআন বিষয়ে নিজের ধারণা অনুযায়ী কথা বলবে, তার কথা সঠিক হলেও ভুল বলে গণ্য হবে। ৩৪
দীনের বিষয়ে অনুমান করে বলা কথা সঠিক হলেও এই কর্মটি ভুল ও অপরাধ বলে গণ্য। কেননা দীনের নামে কোনো কিছু বলার অর্থ হচ্ছে বক্তব্যটি মহান আল্লাহর বলে দাবি করা। আর আল্লাহর নামে কেবল নিশ্চিত জ্ঞানের ভিত্তিতেই কথা বলা বৈধ। এক্ষেত্রে ধারণা-অনুমানের ভিত্তিতে কিছু বলাটাই মারাত্মক অপরাধ। এতে মহান আল্লাহ ও তাঁর দীন ছেলেখেলায় পরিণত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَلَا تَتَّخِذُوا آيَاتِ اللَّهِ هُزُوًا.
“তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে খেল-তামাশার বিষয়ে পরিণত কোরো না।"৩৫
মহান আল্লাহ আরো বলেন:
قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللهِ مَا لَمْ يُنَزِّلُ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ .
“(হে নবী) আপনি বলে দিন, আমার প্রতিপালক প্রকৃতপক্ষে হারাম করেছেন: প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অশ্লীলতা, গোনাহ, অন্যায় সীমালঙ্ঘন, আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন করা—যার দলীল তিনি নাযিল করেননি—এবং আল্লাহর নামে এমন কথা বলা যা তোমরা জানো না।"৩৬
আল কুরআনের কোনো আয়াতের তাফসীর বা ব্যাখ্যা করার অর্থ হচ্ছে, উক্ত আয়াতে মহান আল্লাহর উদ্দিষ্ট মর্ম ব্যক্ত করা। সুতরাং নিশ্চিত জ্ঞান ছাড়া নিজের ধারণা-অনুমানের ভিত্তিতে কুরআনের ব্যাখ্যা করা মানে আল্লাহর নামে না জেনে কথা বলা। নিশ্চিত জ্ঞান হচ্ছে আল্লাহ প্রেরিত ওহির জ্ঞান। কেননা কেবল মহান আল্লাহই জানেন আল কুরআনের কোন বক্তব্যে তাঁর উদ্দিষ্ট মর্ম কী? তিনি তাঁর নবীকে সে মর্ম শিক্ষা দিয়েছেন। আর নবী উম্মাতকে শিখিয়েছেন। সুতরাং নববি ব্যাখ্যা বা হাদীস পরিত্যাগ করে কুরআন বুঝতে যাওয়া ও ব্যাখ্যা করা আল্লাহর নামে এমন আন্দাজে কথা বলা যা তিনি সুস্পষ্টরূপে হারাম করেছেন। এ কাজ যারা করে তারা আল্লাহর সুস্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করে শয়তানের নির্দেশ প্রতিপালন করে। মহান আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ . إِنَّمَا يَأْمُرُكُمْ بِالسُّوْءِ وَالْفَحْشَاءِ وَأَنْ تَقُوْلُوْا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُوْنَ.
“হে লোকসকল, তোমরা জমিনের বৈধ পবিত্র জিনিস ভক্ষণ করো। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। সে তো তোমাদেরকে আদেশ করে অন্যায় ও অশ্লীল কাজ করতে এবং আল্লাহর নামে এমন কথা বলতে, যা তোমরা জানো না।"৩৭
সুতরাং যারা কুরআন বোঝায় ও ব্যাখ্যায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসকে অস্বীকার করে, তারা মহান আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানকে বন্ধু ও অভিভাবকরূপে গ্রহণ করেছে। আর মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَمَنْ يَتَّخِذِ الشَّيْطَانَ وَلِيًّا مِنْ دُونِ اللَّهِ فَقَدْ خَسِرَ خُسْرَانًا مُّبِينًا.
“আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানকে বন্ধু-অভিভাবক হিসাবে গ্রহণ করল, সে প্রকাশ্য ক্ষতির মধ্যে নিপতিত হলো। "৩৮
টিকাঃ
৩০. সূরা [৪] নিসা, আয়াত: ১০৫।
৩১. সূরা [৬] আনআম, আয়াত: ১৪৪।
৩২. সূরা [৬] আনআম, আয়াত: ২১।
৩৩. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ২০৬৯; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ২৯৫০, ২৯৫১; মুসনাদ আবু ইয়া'লা, হাদীস: ২৫৮৫। ইমাম তিরমিযি হাদীসটিকে হাসান বলেছেন; ইবন কাত্তান সহীহ বলেছেন।
৩৪. সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৩৬৫২; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ২৯৫২; শুআবুল ইমান, হাদীস : ২০৮১。
৩৫. সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ২৩১。
৩৬. সূরা [৭] আ'রাফ, আয়াত: ৩৩。
৩৭. সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ১৬৮-১৬৯।
৩৮. সূরা [৪] নিসা, আয়াত: ১১৯।