📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 পঞ্চম যুগ

📄 পঞ্চম যুগ


পঞ্চম যুগটি ভারত উপমহাদেশে হাদীস শাস্ত্রের উৎকর্ষের পূর্ণতার যুগ। এই যুগের শুরু হয় যুগের ইমাম শাহ ওয়ালীউল্লাহর সময় থেকে।

শাহ ওয়ালীউল্লাহ্ হিজরী ১১১৪ সনে জন্মগ্রহণ এবং ১১৭৬ সনে ইন্তিকাল করেন।

সেই সময়টি ছিলো ভারত বা হিন্দুস্থানের জন্য শোচনীয় যুগ। মোগল শাসনের দুর্বলতা, রাজনৈতিক ফিতনা-ফাসাদ এবং ধর্মীয় দুর্বলতা সীমা ছাড়িয়ে যায়। বিদআত ব্যাপকতা লাভ করে। যদিও ইতোমধ্যে হাদীস চর্চা মর্যাদার আসন লাভ করে, কিন্তু তখনও সাধারণ মানুষের মধ্যে এর প্রতি আগ্রহের মাত্রা কম ছিলো। শাহ ওয়ালীউল্লাহর প্রচেষ্টায় সুধী সমাজ ও ছাত্র সমাজ ব্যাপকভাবে এর প্রতি মনোযোগী হতে থাকে।

শাহ ওয়ালীউল্লাহ্ হাজী আফজালের নিকট মিশকাত পড়েন। তিনি হিজরী ১১৪৩ সনে আরবে যান এবং শায়খ আবু তাহের কুর্দী, আহমাদ ইবনে সালেম বসরী প্রমুখের নিকট সিহাহ সিত্তাহ অধ্যয়ন করেন। তিনি হাদীস অধ্যাপনার অনুমতি লাভ করেন। দেশে ফিরে তিনি দারসে হাদীস দিতে শুরু করেন।

শাহ ওয়ালীউল্লাহ্ তাফসীরের মূলনীতি নির্ধারণ করেন। তিনি ফারসী ভাষায় আল কুরআনের ভাষ্য লিখেন। কুরআন বোঝার মূলনীতি হিসেবে আল ফাওযুল কবীর পুস্তিকা লিখেন। শারীয়াহর গুরুত্ব সম্বলিত গ্রন্থ হুযযাতুল্লাহিল বালিগাহ সহ বহু গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। দর্শন এবং ফিকাহর সংশোধিত রূপ উম্মাহ্র সামনে পেশ করেন। শিয়া সম্প্রদায়ের অনাচার ও অন্যান্য বিদআত উচ্ছেদের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

এই যুগে হাদীস চর্চার মধ্যমণি হচ্ছেন শাহ ওয়ালীউল্লাহ্। তাঁর অগণিত ছাত্রের মাধ্যমে ইলমুল হাদীসের প্রসার ঘটেছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন হচ্ছেন ফকীহ্ শায়খ নূর মুহাম্মাদ বডহাবী, হাফিযে হাদীস সাইয়িদ মুর্তাজা হুসাইন বিলগিরামী, শাহ আবদুল আযীয মুহাদ্দিস, কুরআনের অনুবাদক রফীউদ্দীন, মুযিহুল কুরআন প্রণেতা শাহ আবদুল কাদির, তৎকালীন বায়হাকী কাযী সানাউল্লা পানিপত্তি, তাফসীরে মাযহারী, মানারুল আহকাম প্রভৃতি প্রণেতা শাহ আশেক ইলাহী ফুলতী, দারসদাতা শায়খ মুঈন সিন্ধী, শায়খ মুহাম্মাদ বিলগিরামী, মুহাম্মাদ ইবনে পীর মুহাম্মাদ, শায়খ আবুল ফাত্‌হ বিলগিরামী, খাজা মুহাম্মাদ আমীন কাশ্মীরী, মাওলানা রফীউদ্দীন মুরাদাবাদী, কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মজদুদ্দীন মাদানী প্রমুখ। বাহরুল উলুম আবদুল আলী লক্ষ্ণৌভী ও আবদুল আযীয বুরহারদীকেও এই যুগের মধ্যে গণ্য করা যায়।

শাহ ওয়ালীউল্লাহ্ পর তাঁর পুত্র আবদুল আযীয মুসনাদে ওয়াক্ত বা যুগশ্রেষ্ঠ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। তাঁর ছাত্র বহু। কয়েকজন হচ্ছেন: শাহ্ রফীউদ্দীন, শাহ্ আবূ সাঈদ মুজাদ্দেদী, শাহ্ মুহাম্মাদ ইসহাক, মুফতী সাদরুদ্দীন, শাহ মুহাম্মাদ ইসমাঈল, শাহ্ মুহাম্মাদ ইয়াকুব, শাহ গোলাম আলী দেহলবী, হাফিযে হাদীস শায়খ আবিদ সিন্ধী, মাওলানা মাহবুব আলী, মাওলানা আবদুল খালেক দেহলবী, মুফতী ইলাহী বকশ কান্দালভী, মাওলানা ফযল হক খায়রাবাদী, হাসান আলী লক্ষ্ণৌভী, হুসাইন আহমাদ মালিহাবাদী, নূরুল হক পতানবিহারী (শাহ সাহেব তাঁর জন্য উজালায়ে নাফিয়াহ্ গ্রন্থ লিখেছিলেন), হায়দার আলী টুনকী, সালামাতুল্লাহ্ মুরাদাবাদী, শাহ রউফ আহমাদ মুজাদ্দেদী, মুহাম্মাদ আমীন আযিমাবাদী, সাইয়িদ কুতুব রায়বেরেলভী, খুররম বুলহওয়ারী, মাওলানা আলে রাসূল (আহমাদ রেযা খান বেরেলভীর উস্তাদ ছিলেন) প্রমুখ। শাহ মুহীউদ্দীন বিলওয়ারী, মোল্লা মুবীনের বংশধর মোল্লা হায়দার ও নঈম হাফীদ বাহরুল উলুমও এই যুগের অন্তর্ভুক্ত।

শাহ্ আবদুল আযীযের পরে তাঁর নাতি শাহ্ ইসহাক যুগশ্রেষ্ঠ হিসেবে প্রসিদ্ধি পান। তাঁর ছাত্র ছিলো অগণিত। প্রখ্যাত কয়েকজন হচ্ছেন শাহ্ আহমাদ সাঈদ মুজাদ্দেদী, শাহ আবদুল গণী মুজাদ্দেদী, সাইয়েদ নাযীর হুসাইন, সহীহুল বুখারীর টীকাকার আহমাদ আলী সাহারানপুরী, আলম আলী নগীনভী, মিশকাতের ভাষ্য মাযাহেরে হকের প্রণেতা নওয়াব কুতুবুদ্দীন খান, শায়খ মুহাম্মাদ থানভী, কারী আবদুর রাহমান পানিপত্তি, শায়খ মুহাম্মাদ আনসারী সাহারানপুরী, শায়খ ইবরাহীম নগর নহসভী বিহারী, সুবহান বখশ মুযাফফরনগরী, আলী আহমাদ টুংকী, মুফতী ইনায়েত আহমাদ কাকুরভী, ফখরুদ্দীন দেহলবী ও ফযলুর রহমান গঞ্জ মুরাদাবাদী।

মাওলানা সাখাওয়াত আলী, শাহ্ ইসমাঈল ও শাহ্ আবদুল হাই-এর ছাত্র শায়খ হুসাইন ইবনে মুহসিন আনসারী, সাঈদ আযীমাবাদী প্রমুখ এই যুগের আলিম।

শাহ্ ইসহাকের পরবর্তীকালে দারসে হাদীসের কেন্দ্রগুলো বিভক্ত হয়ে পড়ে। তাঁর ছাত্রগণ বিভিন্ন স্থানে হাদীস শিক্ষাদান কাজে নিয়োজিত হন।

শাহ্ আবু সাইদ মুজাদ্দেদীর বংশধর শাহ আবদুল গণী এবং প্রখ্যাত ছাত্রবৃন্দ হচ্ছেন আব্দুল হাই লক্ষ্ণৌভী (হিজরী ১৩০৪ সন), রশীদ আহমদ, মুহাম্মাদ কাসেম, মুহাম্মাদ ইয়াকুব, মাওলানা মাযহার, আবদুল হক এলাহাবাদী, মুহসিন তরহনী, হাবীবুর রহমান রুদওলভী, মুহাম্মাদ হুসাইন এলাহাবাদী, শায়খ মুহাম্মাদ মাসূম মুজাদ্দেদী, মুহাম্মাদ জাফরী, আলীমুদ্দীন বলখী, খাযির ইবনে सुলাইমান হায়দরাবাদী, শায়খ মানসূর আহমাদ হিন্দী, শায়খ মুহাম্মাদ মাযহার মুজাদ্দেদী এবং শায়খ মাহমুদ ইবনে সিবগাতুল্লাহ্।

মাওলানা আব্দুল হাই দারস দিতেন ফিরেঙ্গিমহলে। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে বড় বড় আলিম ছিলেন। আবদুল হাই সেকালের উস্তাদুল উলামা ছিলেন। তাঁর প্রখ্যাত কয়েকজন ছাত্র হচ্ছেন আসারুস্ সুনান প্রভৃতি গ্রন্থ প্রণেতা মাযহার আহসান শওকনিমভী, আবদুল হাদী আযীযাবাদী, মুহাম্মাদ হুসাইন এলাহাবাদী, হাফিযে হাদীস ইদ্রিস সাহসারামী, আবদুল গফুর রমযানপুরী, আবদুল করীম পাঞ্জাবী, শাহ্ সুলাইমান ফুলওয়ারী, আইনুল কুযাত, হাফীজুল্লাহ্, সদর মুদাররিস-কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসা, আবদুল হাই এবং কিতাবুরদ্দ আলী ইবনে শাইবাহর প্রণেতা আবদুল ওয়াহ্হাব বিহারী, শরহে কিতাবুল আসার প্রণেতা আবদুল বারী। তিনি সরাসরি আবদুল হাই সাহেবের ছাত্র ছিলেন।

যুগশ্রেষ্ঠ ফকীহ মাওলানা আহমাদ রেযা খান বেরেলভীর অনেক ছাত্র ছিলো। তাঁর প্রখ্যাত ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন আমজাদ আলী ও জামে রিযভী প্রণেতা যাফরুদ্দীন বিহারী।

মাওলানা সাইয়িদ নাযীর হুসাইন দেহলবীর দ্বারা হাদীসের ব্যাপক প্রচার সাধিত হয়। তিনি আহলে হাদীস জামায়াতের নেতা ছিলেন। তাঁর হাজার হাজার ছাত্র ছিলেন। তাঁর কয়েকজন প্রখ্যাত ছাত্র হচ্ছেন গায়েতে মাকসুদ প্রণেতা শামসুল হক দাহালভী, উনুল মা'বুদ প্রণেতা আশরাফ আলী, শরহে তিরমিযী তুহফাতুল আহওয়াযী প্রণেতা আবদুর রহমান মুবারকপুরী, আবদুল্লাহ্ গাযীপুরী, আলীয়া মাদ্রাসার শিক্ষক সায়াদাত হুসাইন, মুহাম্মাদ মংগলকোটী বর্ধমানী, হেদায়ার টীকাকার আমীর আলী, মালিহাবাদী ও সানাউল্লাহ্ অমৃতসরী। মাওলানা আমীর আলীর ছাত্র ও আলীয়া মাদ্রাসার শিক্ষক জামীল আনসারীর নিকট আমি মুয়াত্তা পড়েছি।

মাওলানা আলম আলী নগীনভী রামপুরের মুহাদ্দিস ছিলেন। যুগশ্রেষ্ঠ আলিম আকরাম আরভী তাঁর ছাত্র ছিলেন। পীর মাওলানা সাইয়িদ আবু মুহাম্মাদ বরকত আলী শাহ্ তাঁর নিকট হাদীস পড়েছেন। আমি সাইয়িদ আবু মুহাম্মাদ বরকত আলীর শাহর নিকট সহীহুল বুখারীর প্রাথমিক অধ্যায়সমূহ শ্রবণ করেছি। রামপুরে মাওলানা আলম আলীর স্থলাভিষিক্ত ছিলেন হাসান শাহ্। তারপর তাঁর বংশধর মুহাম্মাদ শাহ। মুহাদ্দিস মুনাওয়ার আলী তাঁর ছাত্র ছিলেন। তিনি রামপুর ও ঢাকায় হাদীস পড়িয়েছেন। আলীয়া মাদ্রাসার সদর মুদাররিস আমার উস্তাদ শামসুল উলামা বেলায়েত হুসাইন তাঁর ছাত্র ছিলেন। আমি মাওলানা বেলায়েত আলীর নিকট সুনanu আবী দাউদ পড়েছি।

মাওলানা শাহ্ আবদুল গণীর ছাত্র মাওলানা মুহাম্মাদ কাসেম ও মাওলানা রশীদ আহমদ দেওবন্দের মতো বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন যা ইসলামী জগতে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষালয় হিসেবে স্বীকৃত। হাজার হাজার আলিম ও মুহাদ্দিস এই মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা লাভ করে বের হয়েছেন।

তাঁদের ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান, আহমাদ হুসাইন আমরুহী এবং ফখরুল হাসান।

মাওলানা রশীদ আহমদের ছাত্রদের মধ্যে বযলুল মজহুদ প্রণেতা খলীল আহমাদ, ইয়াহ্ইয়া কান্ধলুভী ও আমার উস্তাদ শামসুল উলামা মাজেদ আলী বিশেষ মর্যাদার অধিকারী।

মাওলানা মাহমুদুল হাসান দীর্ঘদিন পর্যন্ত দেওবন্দ মাদ্রাসার সদর মুদাররিস পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁর ছাত্রসংখ্যা অসংখ্য। তাঁদের মধ্যে প্রখ্যাত কয়েকজন হচ্ছেন আনওয়ার শাহ্ কাশ্মীরী, হুসাইন আহমাদ মাদানী, উবাইদুল্লাহ্ সিন্ধী, মুফতী কিফায়াতুল্লাহ্, ইজায আলী, শাব্বির আহমাদ, আবদুল আযীয পাঞ্জাবী (নাবরাসুস সারী নামক গ্রন্থ প্রণেতা), ইব্রাহীম বিলইয়াভী, সাইয়িদ আসগার হুসাইন দেওবন্দী, সহুল বিহারী এবং মাদ্রাসা আলীয়ার সদর মুদাররিস শামসুল উলামা ইয়াহ্ইয়া সাহসারামী। আমি মাওলানা ইয়াহইয়ার নিকট সহীহুল বুখারী ও সুনান ইবনে মাজাহ পড়েছি।

মাওলানা শাহ আবদুল গণীর ছাত্র মাওলানা ইয়াকুবের নিকট হাকীমুল উম্মাহ আশরাফ আলী থানভী হাদীস পড়েছেন। তাঁর অনেক ছাত্র ছিলো। স্বনামধন্য ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশে মাওলানা ইসহাক বর্ধমানী। তিনি কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন।

মাওলানা আহমাদ আলী সাহারানপুরী হাদীসের কিতাবাদির টীকাকার ছিলেন। বিশেষত সহীহুল বুখারীর দীর্ঘ টীকার জন্য তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসার সদর মুদাররিস মুফতী আবদুল্লাহ্ টুংকী, মাওলানা ওয়াসি আহমাদ সুরতী এবং নাযির হাসান দেওবন্দী প্রখ্যাত ছিলেন। মাওলানা নাযির হাসান কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসার শায়খুল হাদীস ছিলেন।

তাঁর ছাত্র মুহাদ্দিস মুহাম্মাদ হুসাইন সিলেটীর নিকট আমি তিরমিযী ও নাসাঈ পড়েছি। তাসারুফ ও কারামাতের অধিকারী মাওলানা শাহ্ ফযলুর রহমান গঞ্জ মুরাদাবাদী সেকালের বুযুর্গ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর খানকাহতে হাদীসও পড়ানো হতো। বড় বড় আলিমগণ তাঁর থেকে উপকৃত হয়েছেন। তাঁর কাছে মাওলানা আহমাদ হাসান কানপুরী সিহাহ সিত্তাহ পড়েছেন। মাওলানা মুশতাক আহমাদ কানপুরীর (যিনি মাওলানা আহমাদ হাসানের বংশধর ছিলেন) নিকট আমি সহীহ মুসলিম পড়েছি।

এখানে পঞ্চম যুগের কিছু সংখ্যক মুহাদ্দিসের উল্লেখ করা হলো। এর বাইরে রয়েছেন অসংখ্য মুহাদ্দিস। এই যুগে এই উপমহাদেশের প্রতিটি বড় শহর ও উপশহরে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এগুলোতে দারসে হাদীসের সিলসিলা জারী রয়েছে। বহু আলিম কিতাব সংকলন ও প্রণয়নে মশগুল রয়েছেন। আল্লাহ্ তাঁদেরকে উত্তম প্রতিদান দিন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00