📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 প্রথম যুগ

📄 প্রথম যুগ


এই যুগে রয়েছে হিজরী পঞ্চম শতকের পূর্ব তথা সুলতান মাহমুদের আগমন পর্যন্ত সময়। এই যুগের বিস্তারিত বিবরণ জানা যায় না। অবশ্য কিছুসংখ্যক হাদীস বর্ণনাকারী ও মুহাদ্দিসের নাম পাওয়া যায়। তাঁরা হলেনঃ

১. আল হাকাম ইবনে আবুল আস আস্সাখাভী। ঐতিহাসিক বালাজুরী লিখেছেন যে, আল হাকামের ভাই উসমান ইবনে আবুল আস উমর ফারুক (রা)-এর যুগে বাহরাইনের শাসনকর্তা বুরুজের দিকে আল হাকামকে পাঠিয়েছিলেন। ইবনুল আসীর উসুদুল গাবা-য় লিখেছেন যে, আল হাকাম সাহাবী ছিলেন। তবে অনেকে তাঁকে তাবেঈ বলে উল্লেখ করেছেন, আর তাঁর হাদীস মুরসাল বলে গণ্য করেন।

২. সিনান ইবনে সালমা ইবনে আল মুহাবিকুল হিন্দলী। ইসাবা গ্রন্থে রয়েছে যে, তিনি নবী (সা)-এর যামানায় জন্মগ্রহণ করেন। হিজরী ৫০ সনে যিয়াদ তাঁকে ভারত অভিযানে প্রেরণ করেন। ইবনে সা'দ তাবেঈদের প্রথম স্তরে তাঁকে গণ্য করেছেন। বাজালী তাঁকে বিশ্বস্ত তাবেঈ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি হিজরী ৯৮ সনে ইন্তিকাল করেন।

৩. হাব্বাব ইবনে ফাযালাহ। তিনি হযরত আনাস (রা)-এর ছাত্র ছিলেন। লীসানুল মীযান গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে তিনি আনাস (রা)-এর নিকট ভারত উপমহাদেশে আসার অনুমতি চেয়েছিলেন।

৪. ইসরাঈল ইবনে মূসা ইবনে আবূ মূসা আল মুবসিরিনযীলে হিন্দ। তিনি তাবে'তাবেঈ ছিলেন। হযরত হাসান বসরী, মুহাম্মাদ ইবনে সিরিন, সুফিয়ান সওরী প্রমুখ থেকে তিনি রেওয়ায়েত করেছেন।

৫. শায়খ মুহাদ্দিস আররাবী ইবনে সাবীউস সায়াদী (হিজরী ১৬১ সন)। উল্লেখ্য যে তিনি বসরায় প্রথম হাদীস সংগ্রহকারী ও সুবিন্যস্তকারী ছিলেন। পরে তিনি হিন্দুস্তানে আসেন এবং গুজরাটে ইন্তিকাল করেন। 'তাবাকাতে ইবনে সা'দ, পৃ. ৩৬/২০৭।

৬. ইমামুল মাগাযী আবূ মাশার বাখীহ সিন্ধী। তিনি হিজরী ১৭০ সনে সিন্ধু থেকে মদীনা যান। তিনি মাগাযী ও সিয়ারের ইমাম ছিলেন। আব্বাসী খলীফা হারুনুর রশীদ তাঁর জানাযার নামায পড়িয়েছেন। তিনি সুনানে আরবায়ার বর্ণনাকারী ছিলেন।

৭. রাজাউস সিন্ধী (হিজরী ৩২১ সন)। তিনি সিন্ধু থেকে ইরানে যান। তাঁকে আসফারআহেনী (লৌহমানব) বলা হতো। তিনি উচ্চশ্রেণীর মুহাদ্দিস ছিলেন।

৮. আল আলিমুল মুহাদ্দিস ইবরাহীম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম দীবালী সিন্ধী। (মৃত্যু ৪র্থ শতক)। মূসা ইবনে হারুন ও মুহাম্মাদ ইবনে আলী আস্সায়িউল কবীর প্রমুখ থেকে তিনি রেওয়ায়েত করেছেন।

📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 দ্বিতীয় যুগ

📄 দ্বিতীয় যুগ


এই যুগ হিজরী পঞ্চম-শতকে সুলতান মাহমুদের অভিযানের সময় থেকে শুরু হয়ে অষ্টম শতকে শেষ হয়। এই যুগে কিছু কিছু গ্রন্থও লিপিবদ্ধ হয়। এই যুগে সূফীরাই হাদীসের প্রতি বেশি আগ্রহী ছিলেন। এই যুগের কয়েকজন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস হচ্ছেন:

১. শায়খ ইসমাঈল লাহোরী (হিজরী ৪৪৮ সন)। সুলতান মাসউদ ইবনে সুলতান মাহমুদ গজনভীর সময়ে তিনি লাহোরে আসেন। হাজার হাজার অমুসলমান তাঁর হাতে মুসলিম হন। তারীখে উলামায়ে হিন্দ নামক গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে 'তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি ইলমুল হাদীসকে লাহোরে নিয়ে আসেন।'

২. ইমাম হাসান রাযীউদ্দীন আবুল ফাযায়েল ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে হাসান সান..।নী লাহোরী। হিজরী ৫৭৭ সনে তিনি লাহোরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হিজায ও ইয়ামেনে হাদীস শিক্ষা করেন। তিনি অভিধান ও হাদীস বিশারদ ছিলেন। তিনি 'আবাব' নামীয় অভিধান প্রণয়ন করেন এবং সহীহুল বুখারীর সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা লিখেন। তাঁর প্রসিদ্ধ রচনা হলো মাশারিকুল আনওয়ার। মুসতানসির বিল্লাহর নির্দেশে ইমাম সানয়ানী এই গ্রন্থ রচনা করেন। এতে দু'হাজার ছয়শত ছেচল্লিশটি হাদীস রয়েছে। এই হাদীসগুলো তিনি সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিম থেকে চয়ন করেছেন। এই গ্রন্থের শতাধিক ব্যাখ্যা লেখা হয়েছে। তিনি হিজরী ৬৫০ সনে ইন্তিকাল করেন।

৩. শায়খুল ইসলাম বাহাউদ্দীন যাকারিয়া মুলতানী (হিজরী ৬৬১ সন)। তিনি শায়খ শিহাবুদ্দীন সুহরাওয়ার্দীর খলীফা ছিলেন। তাঁর হাতে তারিকা সুহরাওয়ার্দীয়ার বিশেষ প্রসার হয়। তিনি মুলতানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি শায়খ কামালের নিকট হাদীস অধ্যয়ন করেন। তিনি মদীনাতে ৫৩ বছর হাদীসের শিক্ষকতা করেছেন। পরে তিনি হিন্দুস্থানে ফিরে আসেন।

৪. বুরহানুদ্দীন মাহমুদ দেহলবী। তিনি ইমাম সানয়ানীর ছাত্র ছিলেন। তিনি হিদায়া প্রণেতার নিকট ফিকাহ্ পড়েছেন। গিয়াসুদ্দীন বলবনের সময় তিনি দিল্লী আসেন। তিনি মাশারিকুল আনওয়ারের দারস দিতেন।

৫. কামালুদ্দিন যাহিদ। তিনি বুরহানুদ্দীনের ছাত্র ছিলেন। তিনি দিল্লীতে হাদীসের দারস পেশ করতেন।

৬. সুলতানুল মাশায়েখ নিজামুদ্দীন (হিজরী ৭২৫ সন)। তিনি কামালুদ্দীনের ছাত্র ছিলেন। মাশারিক গ্রন্থটি তাঁর মুখস্থ ছিলো।

৭. শারফুদ্দীন আবু তাওয়ামা। তিনি একজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ছিলেন। বাংলাদেশের সোনারগাঁওতে তিনি মাদ্রাসা স্থাপন করেছিলেন।

৮. মাখদুমুল মুলক শারফুদ্দীন আহমদ ইবনে ইয়াহ্ইয়া বিহারী (হিজরী ৭৭২ সন)। তিনি শায়খ শারফুদ্দীন আবু তাওয়ামার ছাত্র ছিলেন। সহীহুল বুখারী, সহীহ মুসলিম ও মুসনাদে আবু ইয়ালী তাঁর পাঠ্যবস্তু ছিলো।

৯. নাসিরুদ্দীন চিরাগ দেহলবী (হিজরী ৭৫৩ সন)। তিনি সুলতানুল মাশায়েখ দেহলবীর খলীফা ছিলেন।

১০. শামসুদ্দীন উধী। তিনিও সুলতানুল মাশায়েখের খলীফা ছিলেন। তিনি মাশারিকুল আনওয়ার-এর শরাহ লিখেছেন।

১১. ফখরুদ্দীন যারাভী। তিনিও সুলতানুল মাশায়েখের খলীফা ছিলেন। হিদায়া পড়াবার সময় সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিম থেকে প্রমাণ পেশ করতেন।

১২. আখি সিরাজ বাঙালি। তিনি সুলতানুল মাশায়েখের খলীফা এবং যারাভীর ছাত্র ছিলেন।

১৩. আবদুল আযীয আরদেবেলী। হাফিয ইউসুফ মযী, ইমাম যাহাবী ও ইবনে তাইমিয়ার ছাত্র ছিলেন। তিনি ভারতে এলে মুহাম্মাদ শাহ তুগলক তাঁকে অত্যন্ত সম্মান প্রদর্শন করেন। সুলতান তাঁর নিকট হাদীস শুনেন।

📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 তৃতীয় যুগ

📄 তৃতীয় যুগ


এই যুগের সূচনা হিজরী ৮১৩ সনের পর। সেই সময় আহমাদ শাহ (প্রথম) গুজরাটের অধিপতি ছিলেন। তিনি আরব-ভারত সামুদ্রিক পথের প্রতিষ্ঠাতা।

এতে আলিমদেরও যাতায়াত সহজ হয়। এই সময় ইরানে শিয়াগণ প্রাধান্য লাভ করে। তাই বহু মুহাদ্দিস হিজরত করে ভারতে আসেন। তাঁরা হাদীসের বিরাট ভাণ্ডার সাথে নিয়ে এসেছিলেন। এই যুগের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসগণ হচ্ছেন:

১. নূরুদ্দীন সিরাজী। তিনি সাইয়িদুস্ সনদ জুরজানীর (হিজরী ৮১৬ সন) ছাত্র ছিলেন। হাদীসের ভাণ্ডার ইরান থেকে তিনিই প্রথম ভারতে নিয়ে আসেন।

২. শায়খ জালালুদ্দীন দাওয়ানী (হিজরী ৯০৮ সন)। তিনি সাখাভীর সমসাময়িক ছিলেন। তিনি ফিরোজ শাহ তুগলকের সময় ভারতে আসেন। ফিরোজের প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় তিনি তাফসীর, হাদীস, ফিকাহ ও মাকূলাতের দারস দিতেন।

৩. শায়খ জালালুদ্দীন কিরমানী। ফিরোজ শাহের শাসনকালে তিনি শরীয়াহ ও জ্ঞানচর্চায় পারদর্শী ছিলেন।

৪. রাজন ইবনে দাউদ গুজরাটি (হিজরী ৯০৪ সন)। তিনি সাখাভীর ছাত্র ছিলেন। গুজরাটে হাদীসের দারস পেশ করতেন।

৫. ওজীহ গুজরাটি (হিজরী ৯২৯ সন)। তিনি সাখাভীর ছাত্র ছিলেন। গুজরাটের মুহাদ্দিস ছিলেন।

৬. আলাউদ্দীন নহরওয়ালী। তিনি হাফিয ফাহদ এবং নূরুদ্দীনের ছাত্র ছিলেন। তিনি মক্কায় গমন করেন এবং সেখানে দারসে হাদীস দিতেন।

৭. শায়খ জামালুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে উমার (হিজরী ৯৩১ সন)। তিনি সাখাভীর ছাত্র ছিলেন। গুজরাটের অধিপতি তাঁর নিকট হাদীস অধ্যয়ন করেছেন।

৮. শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াযদান বখশ শিরওয়ানী বাঙালি। ঢাকার এক-ডালার এক গ্রামে পুরো সহীহুল বুখারী কপি করে সোনারগাঁওয়ে সাইয়েদ আলাউদ্দীন শাহের (হিজরী ৯০৫-৯২৭ সন) নিকট পেশ করেন। আলাউদ্দীন ছিলেন বাংলার সুলতান। এই কিতাবটি বাঁকীপুর খোদা বখশ খানের লাইব্রেরীতে মওজুদ আছে।

৯. সাইয়িদ রফিউদ্দীন সাফাভী (হিজরী ৯৫৪ সন)। তিনি একজন অভিজ্ঞ মুহাদ্দিস ছিলেন। তিনি সাখাভীর ছাত্র ছিলেন। সুলতান লুধী দারসে হাদীসের জন্য তাঁকে দিল্লী ডেকে পাঠান।

১০. আবুল ফাত্‌হ থানেশ্বরী (হিজরী ৯৬০ সন)। তিনি সাইয়িদ সাফাভীর স্থলাভিষিক্ত হন।

১১. সাইয়িদ জালাল। তিনি সাফাভীর ছাত্র ছিলেন।

১২. সাইয়িদ আবদুল আউয়াল জৌনপুরী গুজরাটি (হিজরী ৯৬৮ সন)। তিনি ফাহের সমসাময়িক ছিলেন। তিনি আরবে গিয়ে হাদীস শিক্ষা করেন। হিন্দুস্থানে এসে দারসে হাদীসের স্থায়ী ব্যবস্থা করেন। আকবরের শাসনকালে খানান তাঁকে গুজরাট থেকে দিল্লীতে নিয়ে আসেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় মুহাদ্দিস যিনি সহীহুল বুখারীর ব্যাপক ভাষ্য ফয়যুল বারী লিখেছেন। তিনি সাফারুস সায়াদাতের সারসংক্ষেপ তৈরি করেন।

১৩. শায়খ তাইয়েব সিন্ধী। তিনি আবদুল আউয়ালের ছাত্র ছিলেন। তিনি তিরমিযীর ব্যাখ্যা লিখেছেন। তিনি বুরহানপুরে দারসে হাদীস পেশ করতেন।

১৪. আবদুল মালিক গুজরাটী (হিজরী ৯৭০ সন)। তিনি অন্য একজনের মাধ্যমে সাখাভীর ছাত্র ছিলেন। তিনি সহীহুল বুখারীর হাফিয ছিলেন।

১৫. শায়খ ভিকারীর কূরী (হিজরী ৯৮১ সন)। তিনি যিয়াউদ্দীন মাদানীর ছাত্র ছিলেন।

১৬. শায়খ আবদুল মুতী মাক্কী। তিনি যাকারিয়া আনসারীর ছাত্র ছিলেন। ভারতে এসে দারসে হাদীস পেশ করতে থাকেন।

১৭. শায়খ শিহাবুদ্দীন আহমদ গুজরাটী (হিজরী ৯৯২ সন)। তিনিও যাকারিয়া আনসারীর ছাত্র ছিলেন। তিনি গুজরাটের মুহাদ্দিস ছিলেন।

১৮. মোল্লা আবদুল কাদের বদাউনী (হিজরী ১০০৪ সন)। তিনি শায়খ আবুল ফাহের ছাত্র ছিলেন। তিনি দিল্লীতে বাদশাহ আকবরের ইমাম ছিলেন।

১৯. মোল্লা কামালুদ্দীন হুসাইনী। তিনিও শায়খ আবুল ফাহের ছাত্র ছিলেন।

২০. মীর সাইয়িদ আমরুহী। তিনি শায়খ জালালের ছাত্র ছিলেন। আকবরের শাসনকালে তিনি আদালতের মীর ছিলেন।

২১. শায়খ আবদুন্ নবী গাংগুহী। তিনি উচ্চ শ্রেণীর মুহাদ্দিস ছিলেন। আকবরের শাসনামলে শায়খুল ইসলাম ছিলেন।

📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 চতুর্থ যুগ

📄 চতুর্থ যুগ


এই যুগের সূচনা হাফিয ইবনে হাজার হাইসুমীর হিন্দুস্থানী ছাত্রদের মাধ্যমে শুরু হয়। এই যুগের সবচে' বেশি উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব দু'জন। এক. শায়খ আহমাদ সরহিন্দী মুজাদ্দিদে আলফেসানী, দুই. শায়খ আবদুল হক দেহলবী। মুজাদ্দিদে আলফেসানীর সংস্কার প্রয়াসের বুনিয়াদ ছিলো হাদীস ও উসওয়ায়ে রাসূল (সা)। তিনি নিজেই দারসে হাদীস পেশ করতেন। সুন্নাহর অনুসৃতির ওপর তিনি জোর দিতেন। মাকতুবাতে তিনি এই ব্যাপারে বিশেষ তাকিদ দিয়েছেন। শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলবী সম্পর্কে তিনি লিখেন যে হিন্দুস্থানে হাদীসের বীজ বপন করেন আবদুল হক দেহলবী।

আবদুল হক দেহলবী দিল্লীতে দারসে হাদীস পেশ করতেন। তিনি সাধারণ লোকদের সুবিধার্থে ফারসী ভাষায় মিশকাতের ব্যাখ্যা লিখেন। তাঁর পুত্র নূরুল হক সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিমের ফারসী ব্যাখ্যা লিখেন। ভারত বা হিন্দুস্তানে হাদীস চর্চার ব্যাপকতা এই সময় হাসিল হয়। এই কাজে খানকাহ ও মাদ্রাসা সমানভাবে কাজ করেছিলো। ইলমুল হাদীস অন্যান্য বিদ্যার প্রতিযোগীর স্থান দখল করে। হাদীস শাস্ত্রের বহু গ্রন্থ প্রণয়ন ও অনুবাদ করা হয়। এই যুগের অন্যান্য প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস হচ্ছেন:

১. শায়খ আলী মুত্তাকী (হিজরী ৯৭৫ সন)। তিনি ইবনে হাজার হাইসুমী ও আবুল হাসান বাকরীর ছাত্র ছিলেন। তিনি আরবে দারসে হাদীস দিতেন। তিনি কানযুল উম্মাল গ্রন্থের প্রণেতা।

২. শায়খ ইয়াকুব শারফী (হিজরী ১০০৩ সন)। তিনি হাইসুমী, বাকরী ও মোল্লা জামীর ছাত্র ছিলেন। তিনি সহীহুল বুখারীর ব্যাখ্যা লিখেছেন। মাগাযী সম্পর্কিত গ্রন্থও লিখেছেন।

৩. আবদুর রাহমান সরহিন্দী।

৪. মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ্ (হিজরী ৯৯২ সন)। তিনি হাইসুমী ও বাকরীর ছাত্র ছিলেন। তিনি গুজরাটের মুহাদ্দিস ছিলেন।

৫. সাইয়িদ আবদুল্লাহ্ ঈদরুম (হিজরী ৯৯০ সন)। তিনি হাইসুমী ও বাকরীর ছাত্র ছিলেন। গুজরাটে তিনি দারসে হাদীস দিতেন।

৬. শায়খ সাঈদ হুসাইনী আশ্ শাফিঈ। তিনি হাইসুমীর ছাত্র ছিলেন। তিনিও গুজরাটে দারসে হাদীস পেশ করতেন।

৭. সাইয়িদ মুর্তাজা শরীফী জুরজানী। তিনিও হাইসুমীর ছাত্র ছিলেন। তিনি আগ্রায় দারসে হাদীস দিতেন।

৮. মীর কাঁলা মুহাদ্দিস। তিনি মীরক শাহের ছাত্র ছিলেন। তিনি জামালুদ্দীন ও মোল্লা কুতুবুদ্দীন নহরওয়ালীরও ছাত্র ছিলেন।

৯. জওহার নাথ কাশ্মীরী। তিনি নও মুসলিম ছিলেন। তিনি হাইসুমী ও মোল্লা আলী কারীর ছাত্র ছিলেন। তিনি কাশ্মীরের মুহাদ্দিস ছিলেন।

১০. মুহাম্মাদ লাহোরী। তিনি লাহোরের মুফতী ছিলেন। তিনি হাদীসের দারস দিতেন। মিশকাত ও সহীহুল বুখারী খতমের উপলক্ষে শানদার মজলিসের ব্যবস্থা করতেন।

১১. শায়খ আহমাদ সরহিন্দী মুজাদ্দিদে আলফেসানী (মৃত্যু হিজরী ১০৩৪ সন)। তিনি ইয়াকুব সারাফীর ছাত্র ছিলেন। সরহিন্দের মুহাদ্দিস ছিলেন।

১২. শায়খ আবদুল ওয়াহ্হাব মুত্তাকী (হিজরী ১০০৮ সন)। তিনি আলী মুত্তাকীর ছাত্র ছিলেন। আরবে হাদীসের দারস দিতেন।

১৩. শায়খ মুহাম্মাদ তাহের ফাতানী (হিজরী ৯৮৬ সন)। তিনি আলী মুত্তাকীর ছাত্র ছিলেন। তিনি গুজরাটে হাদীসের দারস দিতেন। তিনি হাদীস অভিধান মাজমাউল বিহার, আলমুগনী, তাযকিরাতুল মাওযুয়াত, কানুনুল মাওযুয়াত প্রভৃতি গ্রন্থের প্রণেতা।

১৪. শায়খ আবদুল্লাহ্ ইবনে সাঈদ। তিনি আলী মুত্তাকীর ছাত্র ছিলেন এবং গুজরাটের মুহাদ্দিস ছিলেন।

১৫. শায়খ রাহমাতুল্লাহ্ সিন্ধী। তিনিও আলী মুত্তাকীর ছাত্র এবং গুজরাটের মুহাদ্দিস ছিলেন।

১৬. শায়খ বরখোরদার সিন্ধী। তিনি আলী মুত্তাকীর ছাত্র ছিলেন। আরবে তিনি দারসে হাদীস পেশ করতেন তাঁর মাদ্রাসায়।

১৭. শায়খ হামীদ। তিনিও আলী মুত্তাকীর ছাত্র ছিলেন। তিনি আরবে দারসে হাদীস দিতেন।

১৮. শায়খ মুহাম্মাদ ফাযলুল্লাহ্ জৌনপুরী। তিনি তুহফায়ে মুরসালাহ গ্রন্থ প্রণেতা।

১৯. সাইয়িদ ইয়াসিন গুজরাটী। হিন্দুস্থান ও আরবে হাদীস অধ্যয়ন করেন। লাহোরে কিছুকাল হাদীসের দারস দিয়ে বিহারে গমন করেন এবং সেখানে হাদীসের অধ্যাপনা করেন।

২০. হাজী ইবরাহীম। তিনি আরবে গিয়ে হাদীস পড়েন। আগ্রায় দারসে হাদীস দিতেন।

২১. শায়খ মুহাম্মাদ কাসেম সিন্ধী। তিনি আরবে গমন করেন। তিনি রঈসুল মুহাদ্দিসীন বলে পরিচিত ছিলেন।

২২. হাজী মুহাম্মাদ কাশ্মীরী (হিজরী ১০০৬ সন)। তিনি মাওলানা সাদেকের ছাত্র ছিলেন। ইবনে হাজার হাইসুমী এবং জামালুদ্দীনেরও ছাত্র ছিলেন। তিনি তিরমিযীর ভাষ্য লিখেন।

২৩. শায়খ আবদুল হক দেহলবী (হিজরী ১০৫৩ সন) তিনি শায়খ মুত্তাকীর ছাত্র ছিলেন। তিনি মিশকাতের ফারসী ব্যাখ্যা আশ্শায়াতুল লুমুয়াত, মিশকাতের আরবী ব্যাখ্যা আল লুমুয়াত শরহে সাফারুস্ সায়াদাত, মাদারেজুন্ নবুওয়াত প্রভৃতি গ্রন্থের প্রণেতা।

২৪. খাজা মুহাম্মাদ মাসুম উরওয়াতুল উসকা (হিজরী ১০৭০ সন)। তিনি মুজাদ্দিদে আলফেসানীর বংশধর ছিলেন। তিনি পিতার নিকট হাদীস পড়েন। মক্কার মুহাদ্দিসদের নিকট থেকে তিনি সনদ লাভ করেন। তাঁর নয় লাখ ছাত্র ছিলো। বাদশাহ্ শাহজাহান তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তিনি মিশকাতের টীকা লিখেন।

২৫. শায়খ নূরুল হক (হিজরী ১০৭৩ সন)। তিনি আবদুল হক দেহলাবীর পুত্র ছিলেন। তিনি পিতার নিকট হাদীস পড়েন। উরওয়াতুল উসকার শিষ্য ছিলেন। তিনি সহীহুল বুখারীর বিস্তারিত ফারসী শরাহ তাইসীরুল বারী এবং সহীহ মুসলিমের ফারসী শরাহ ইয়ামবাউল ইলম লিখেন।

২৬. খাজা খারেন্দ মুঈনুদ্দীন ওরফে ঈশান। তিনি শায়খ আবদুল হক দেহলবীর ছাত্র ছিলেন।

২৭. মোল্লা সুলাইমান আহমাদ আবাদী। তিনি শায়খ আবদুল হক দেহলবীর ছাত্র ছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত হাদীস চর্চার ধারাবাহিকতা আহমদাবাদে এখনো বিদ্যমান।

২৮. মুহাম্মাদ হুসাইন খানী। তিনি শায়খ আবদুল হক দেহলবীর ছাত্র ছিলেন।

২৯. ফরখশাহ ইবনে খাজা মুহাম্মাদ সাঈদ ইবনে আহমাদ সরহিন্দী। সনদ ও মতনসহ সত্তর হাজার হাদীস তাঁর মুখস্থ ছিলো।

৩০. হাফিয ইউসুফ হিন্দী। তিনি সুরাটের অধিবাসী ছিলেন। বার শতকে হিন্দুস্থানের হাফিযে হাদীস ছিলেন।

৩১. হাজী আফজাল শিয়ালকোটী। তিনি খাজা মুহাম্মাদ সাঈদ খাযীনুর রাহমাতের ছাত্র ছিলেন। তিনি মাযহার শহীদ ও শাহ ওয়ালীউল্লাহ্র উস্তাদ ছিলেন।

৩২. মীর্যা মাযহার শহীদ। তিনি আফজাল শিয়ালকোটীর ছাত্র ছিলেন।

৩৩. শাহ ঈসা। তিনি রঈসুল মুহাদ্দিসীন মুহাম্মাদ কাসেমের বংশধর ও স্থলাভিষিক্ত ছিলেন।

৩৪. ফাত্‌হ মুহাম্মাদ বুরহানপুরী। তিনি শাহ ঈসার সন্তান ও স্থলাভিষিক্ত ছিলেন।

৩৫. শায়খ আবদুর রাযযাক। তিনি শায়খ ইয়াসীন গুজরাটীর ছাত্র ছিলেন। তিনি বিহারে দারসে হাদীস প্রতিষ্ঠিত করেন।

৩৬. আবদুন্ নবী। তিনি শায়খ আবদুর রাযযাকের ছাত্র ও স্থলাভিষিক্ত ছিলেন। তিনি বিহারের মুহাদ্দিস ছিলেন।

৩৭. আবদুল মুকতাদির। তিনি আবদুন্ নবীর ছাত্র ছিলেন। তিনিও বিহারের মুহাদ্দিস ছিলেন।

৩৮. আতীক বিহারী। তিনি শায়খ আবদুল মুকতাদির ও নূরুল হক দেহলাবীর ছাত্র ছিলেন। তিনিও বিহারের মুহাদ্দিস ছিলেন।

৩৯. ওজীহ ফুলওয়ারী। তিনি মাওলানা আতীকের ছাত্র ছিলেন। তিনি বিহারে দারসে হাদীস দিতেন। সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিম সনদ সহকারে পড়বার কথা উল্লেখ আছে। এছাড়া মাশারিকুল আনওয়ার, হিসনে হাসীন, কিতাবুল আযকার, মুয়াত্তা, মুসনাদে আহমাদ, মুসনাদ শাফিঈ ও মুসনাদে আবু হানিফার আলোচনা দারসের সময় পেশ করতেন।

৪০. খাজা ইমাদুদ্দীন কলন্দর। তিনি নূরুল হক দেহলবীর ছাত্র ছিলেন। তিনি ফুলওয়ারীর মুজীবিয়া খানকাহর প্রধান ওয়ারিস ছিলেন।

৪১. মোল্লা ওয়াহিদুল হক ফুলওয়ারী। তিনি মাওলানা ওজীহ ফুলওয়ারীর বংশধর ও ছাত্র ছিলেন।

৪২. শায়খ ফখরুদ্দীন মুহাদ্দিস দেহলবী। তিনি শায়খ নূরুল হকের বংশধর ও ছাত্র ছিলেন। তিনি হিসনে হাসীনের ব্যাখ্যা লিখেছেন।

৪৩. শায়খ সালামুল্লাহ্ দেহলবী। তিনি শায়খ ফখরুদ্দীন দেহলবীর বংশধর ও ছাত্র ছিলেন। তিনি মুহাল্লা নামে মুয়াত্তার শরাহ লিখেছেন।

৪৪. মোল্লা হায়দার কাশ্মীরী। (হিজরী ১০৫৬ সন)। তিনি খাজা খাবেন্দের ছাত্র ও কাশ্মীরের মুহাদ্দিস ছিলেন।

৪৫. মোল্লা মিশকাতী কাশ্মীরী। তিনি মোল্লা হায়দারের ছাত্র ছিলেন। তিনি মিশকাতের হাফিয ছিলেন।

৪৬. খাজা মুহাম্মাদ ফাযিল কাশ্মীরী। তিনিও মোল্লা হায়দারের ছাত্র ছিলেন।

৪৭. মোল্লা ইনায়াতুল্লাহ্ কাশ্মীরী। তিনি মোল্লা হায়দারের ছাত্র ছিলেন। তিনি ৩৬ বছর দারসে হাদীস পেশ করেন।

৪৮. মীর সাইয়িদ মুবারক বিলগিরামী। তিনি শায়খ নূরুল হক বিলগিরামীর ছাত্র ছিলেন। তিনি বিলগিরামীর মুহাদ্দিস ছিলেন।

৪৯. মীর আবদুল জলীল বিলগিরামী। তিনি সাইয়িদ মুবারকের ছাত্র ছিলেন।

৫০. গোলাম আলী আযাদ বিলগিরামী। তিনি মীর আবদুল জলীলের ছাত্র ছিলেন। তিনি শায়খ হায়াত সিন্ধীর নিকটও হাদীস পড়েছেন। তিনি আয যুউদ দুরারী নামে সহীহুল বুখারীর শরাহ্ লিখেছেন।

৫১. আবদুন্ নবী আকবরাবাদী। তিনি যবীয়াতুন্ নাজাত নামে মিশকাত ও নুখবাতুল ফিকরের শরাহ লিখেছেন।

৫২. আবদুল্লাহ্ আল্লবীব। তিনি পাঞ্জাবের মোল্লা আবদুল হাকীম শিয়ালকোটীর বংশধর ছিলেন। তিনি পিতার নিকট হাদীস পড়েছেন। আর মাওলানা শিয়ালকোটী শায়খ আবদুল হক দেহলবীর ছাত্র ছিলেন।

৫৩. শায়খ আবদুল্লাহ্ লাহোরী। তিনি মক্কায় হাদীস শিক্ষা দিতেন।

৫৪. আবুত্ তাইয়েব সিন্ধী। তিনি সিহাহ সিত্তাহ্ ওপর টীকা লিখেছেন।

৫৫. শায়খ আবুল হাসান সিন্ধী। তিনিও সিহাহ সিত্তাহর ওপর টীকা লিখেছেন। তিনি মদীনায় হাদীসের দারস দিতেন।

৫৬. শায়খ হায়াত সিন্ধী। তিনি শায়খ আবুল হাসান সিন্ধীর ছাত্র ছিলেন।

৫৭. শাহ মুহাম্মাদ ফাখির এলাহাবাদী (হিজরী ১১৬৪ সন)। তিনি শায়খ হায়াত সিন্ধী ও মুহাদ্দিস আহমাদ ইবনে সালামের ছাত্র ছিলেন।

৫৮. শায়খ নূরুদ্দীন গুজরাটী (হিজরী ১১৫৫ সন)। তিনি গুজরাটের মুহাদ্দিস ছিলেন। তিনি নূরুল কারী নামে সহীহুল বুখারীর শরাহ লিখেছেন।

৫৯. শায়খ মুহম্মাদ আসয়াদ হানাফী মাক্কী। তিনি মাদ্রাজের উস্তাদুল হাদীস ছিলেন।

৬০. শায়খ হাশিম ইবনে আবদুল গফুর সিন্ধী। তিনি সাহাবাদের ধারাবাহিকতা অনুসারে সহীহুল বুখারী বিন্যস্ত করেন।

৬১. শাহ নূরী বাঙালি ঢাকুভী। তিনি স্বীয় পুস্তক কিবরিতে আহমারে নিজ হাদীস শিক্ষার কথা উল্লেখ করেছেন।

৬২. মোল্লা ইনায়েত কাশ্মীরী (হিজরী ১১২৫ সন)। তিনি সহীহুল বুখারীর দারস প্রদান করেছেন ছত্রিশ বার।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00