📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 চরিত অভিধান সম্পর্কিত গ্রন্থাদি

📄 চরিত অভিধান সম্পর্কিত গ্রন্থাদি


চরিত অভিধান সম্পর্কিত গ্রন্থাদি এবং জেরাহ ও তা'দীলের বর্ণনাকারী বিভিন্ন ধরনের। যথা,

(ক) ঐসব গ্রন্থ যেগুলোতে সহীহ ও দুর্বল উভয় প্রকার হাদীস শামিল আছে। তাবাকাতে ইবনে সা'দ এই বিষয়ের ওপর সবচে' বেশি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। সয়ূতী এর সার-সংক্ষেপ তৈরি করে নাম রাখেন ইনজাযুল ওয়াদ। এই বিষয়ের উপর অন্যান্য প্রখ্যাত গ্রন্থ হচ্ছে খলীফা ইবনে খাইয়াতের (হিজরী ২৪০ সন) তাবাকাত; তাবাকাতে মুসলিম, তারিখে ইবনে খাইসুমাহ, ইমাম বুখারীর তারীখে কবির, আওসাত ও সগীর, তারীখে ইবনে আবী হাতেম, তারীখে হুসাইন ইবনে ইদরীস আল আনসারী ইবনে খুরাম (হিজরী ৩১০ সন), তারীখে ইবনে আলমদীনী, ইবনে হাব্বানের কিতাবুল ওহাম ওয়াল ঈহাম, আবু মুহাম্মাদ ইবনুল জারুদ রচিত কিতাবুল জিরাহ ওয়াত্ তা'দীল, আল ই'তেবারু মুসলিম, নাসাঈ রচিত আত্তামীয, আবু ইয়ালিল খলীলা রচিত আল ইরশাদ, ইবনে কাসির প্রণীত আত্ তাকমীল ফী মারিফাতিস্ সিকাত ওয়া যুয়াফা ওয়াল মাজাহীল, তারীখুয যাহাবী, ইসমাঈল ইবনে উমার ইবনে কাসির প্রণীত আত্ তাকমীল ফী আসমায়িস্ সিকাত ওয়া যুয়াফা, ইবনুল মুলকিন (হিজরী ৮০৪ সন) প্রণীত তাবাকাতুল মুহাদ্দীসীন ওয়াল কামাল ফী মা'রিফাতির-রিজাল।

(খ) ঐসব গ্রন্থ যেগুলো শুধু সিকাত ও হুফফায সম্পর্কে রচিত। এগুলোর মধ্যে রয়েছে আজালী প্রণীত কিতাবুস সিকাত, ইবনে শাহীন প্রণীত কিতাবুস সিকাত, আবী হাতেম প্রণীত কিতাবুস সিকাত, যয়নুদ্দীন কাসেম ইবনে কাতলুবাগা প্রণীত কিতাবুস সিকাত, যাহাবী রচিত তাবাকাতুল হুফফায, ইবনে দাববাগ (হিজরী ৫৪৬ সন) রচিত তাবাকাতুল হুফফায। উক্ত নামে ইবনে হাজার, ইবনে মুফাদ্দাল, সয়ূতী, তকী ইবনে মাহ্দ, মুহাম্মাদ ইবনে হাশেমীও গ্রন্থ রচনা করেছেন। আমিও তাবাকাতুল হুফফায-এর সার সংক্ষেপ লিখেছি।

(গ) ঐসব গ্রন্থ যাতে যয়ীফ সংক্রান্ত আলোচনা রয়েছে। যেমন, ইমাম বুখারীর কিতাবুয যুয়াফা, নাসাঈ রচিত আযযুয়াফাউ ওয়াল মাতরুকীন, আবিল ফারাজ আবদুর রহমান ইবনে আলী আল জুযী রচিত আল যুয়াফাউ, ইবনে জুযী রচিত মুখতাসার যুয়াফা, মুতালতায়ী রচিত বাইলুষ যুয়াফা, আকীলী রচিত আয যুয়াফা, হাসান আস্ সানয়ায়ী রচিত আয্যয়াফা, ইবনে হাব্বান বসতী প্রণীত আয্যুয়াফা, ইবনে আদী রচিত কিতাবুল কামিল, ইবনে রুমিয়াহ্ (হিজরী ৬৩৭ সন) রচিত যায়ল কিতাবুল কামিল, দারু কুতনী রচিত আয্যয়াফা, হাকিম প্রণীত কিতাবুয যুয়াফা, মারদীনী রচিত আয যুয়াফা, যাহাবী প্রণীত মীযানুল ই'তিদাল, ইরাকী রচিত যায়ল মীযানুল ই'তিদাল, ইবনে হাজার কর্তৃক প্রণীত লিসানুল মীযান ওয়া তাকবীমুল লিসান ওয়া তাহবীরুল মীযান ইত্যাদি।

শেষের দিকে উল্লেখিত কতক গ্রন্থে এমন ব্যক্তিরও নাম রয়েছে যারা প্রকৃতপক্ষে দুর্বল নয়।

(ঘ) ঐসব গ্রন্থ যা হাদীস তৈরির অভিযোগে অভিযুক্ত ও মিথ্যাবাদীদের নিয়ে রচিত। যেমন, হালাবী রচিত আল কাশফুল হাসীসু ফী মান রামা বিওযযিল হাদীস, শায়খ মুহাম্মাদ তাহির ফাতানী রচিত কানুনুল মাওযুয়াত ওয়াল কাযযাবীন। আমি কিতাবুল ওয়ায্যায়ীন নামে একটি সারগ্রন্থ লিখেছি।

(ঙ) ঐসব গ্রন্থ যাতে বর্ণনাকারীদের বিশ্বস্ততার সাথে সাথে তাদের সুবিন্যস্ততা সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। হালাবী এই বিষয়ের ওপর আল ইহতিয়াবু বিমান রামা বিল ইখতিলাত নামক পুস্তিকা লিখেছেন। আমি এর সার-কথা লিপিবদ্ধ করেছি।

হাদীস সহীহ হওয়ার জন্য যেমন প্রয়োজন বর্ণনাকারীদের বিশ্বস্ততা, বিন্যস্ততা তেমনি প্রয়োজন ইত্তেসালে সনদ বা সনদের যোগসূত্র। ইত্তেসালের বিপরীত হলো ইনকিতা। আর তা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। যেমন:

১. উভয় ব্যক্তি (হাদীস বর্ণনাকারী ও রেওয়ায়েতকারী) সমকালীন না হওয়া। রেওয়ায়েতকারীর জন্মগ্রহণের পূর্বেই হাদীস বর্ণনাকারী মারা গেছেন। জন্ম-মৃত্যু-সম্পর্কীয় গ্রন্থ লিখা হয়েছে।

২. উভয় ব্যক্তি সমকালীন হওয়া সত্ত্বেও উভয়ের সাক্ষাত ঘটেনি। এই ধরনের রেওয়ায়েতকারী সম্পর্কে মারাসীল গ্রন্থ লেখা হয়েছে।

৩. উভয় ব্যক্তি সমকালীন এবং তাঁদের সাক্ষাত ঘটেছে। কিন্তু রেওয়ায়েতকারী অভ্যাসজনিত কারণে যাঁর থেকে হাদীস শুনেছেন তাঁর নাম উল্লেখ করেননি বরং ঊর্ধ্বের সমকালীন রাবীর নাম উল্লেখ করেন। এই রকমের রাবী মুদাল্লাস। তাঁদের জন্য আসমাউল মুদাল্লিসীন লেখা হয়েছে।

(চ) ঐসব গ্রন্থ যা মুহাদ্দিসীন ও হাদীসের রাবীদের মৃত্যু সম্পর্কে লেখা হয়েছে। এই বিষয়ের ওপর সর্বপ্রথম বই লিখেন আবূ সুলাইমান মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ্। হিজরতের পর থেকে হিজরী ৩৩৮ সন পর্যন্ত সময়ের রাবীদের জন্ম ও মৃত্যু সম্পর্কীয় বিবরণ এতে রয়েছে। এই গ্রন্থের ওপর কাত্তানী (হিজরী ৪৬৬ সন), হিবতুল্লাহ্ আকনানী (হিজরী ৪৮৫ সন), আলী ইবনে মুফায্যাল মুকাদ্দেসী (হিজরী ৬১১ সন), সানযারী (হিজরী ৬৫৬ সন), আযীযুদ্দীন ইবনে মুহাম্মাদ (হিজরী ৬৭৪ সন), দিমইয়াতী (হিজরী ৭০৫ সন) এবং ইরাকী (হিজরী ৮০৬ সন) টীকা লিখেছেন এবং নিজ নিজ যামানা পর্যন্ত রাবীদের জন্য-মৃত্যুর বর্ণনা যোগ করেছেন। তারিখে বারযানীও (হিজরী ৭৩৮ সন) এই বিষয়ের ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। তকীউদ্দীন রাফে এর ওপর টীকা লিখেছেন এবং হিজরী ৭৭৪ সন পর্যন্ত সময়ের রাবীদের জন্ম-মৃত্যুর বিবরণ যোগ করেছেন।

হাফিয ইবনে হাজার এর টীকা লিখেছেন এবং তাঁর সমকালীন রাবীদের জন্ম-মৃত্যুর বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন।

শায়খদের মৃত্যু সম্পর্কে মুবারক ইবনে আহমাদ আনসারী এবং ইবরাহীম ইবনে ইসমাঈল আল হাম্বল (হিজরী ৪৮২ সন) গ্রন্থ লিখেছেন।

(ছ) ঐসব গ্রন্থ যাতে মারাসীল ও মুদাল্লিসীন সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। মারাসিল অর্থাৎ মুনকাতে' হাদীসসমূহের রাবী সম্পর্কিত গ্রন্থ লিখেছেন ইবনে আবী হাতেম। এর নাম মারাসীলে ইবনে হাতেম। আমি এর সার-সংক্ষেপ লিখেছি।

মুদাল্লিসীনের নামসমূহ সর্বপ্রথম হুসাইন ইবনে আলী কারাবিসী (হিজরী ২৪৮ সন) একত্রিত করেছেন। এরপর নাসাঈ, দারু কুতনী, যাহাবী, ইবরাহীম মুকাদ্দেসী, যয়নুদ্দীন, ইরাকী ও ওয়ালীউদ্দীন ইবনে আবী যারআ গ্রন্থ লিখেন। ইবরাহীম জলি (হিজরী ৮৪১ সন) আবিঈন ফী আসমায়িল মুদাল্লিসীন গ্রন্থ লিখেন। ইবনুল ইরাকী, ইবনে হাজার এবং সয়ূতী এর টীকা লিখেছেন। আসমায়ে মুদাল্লিসীন সম্পর্কে আমি একটি পুস্তিকা লিখেছি।

(জ) ঐসব গ্রন্থ যাতে কুনিয়াত (উপনাম), উপাধি ও রাবীদের নাম রয়েছে। রাবী কখনো স্বনামে, কখনো উপনামে আবার কখনো উপাধি দ্বারা পরিচিত হন। অপরিচিত উপনাম বা উপাধি উল্লেখের দরুন কখনো কখনো সংখ্যাজনিত ভ্রম ঘটে যেতে পারে। সেজন্য হাদীস বিশারদগণ এই বিষয়ের ওপর নযর দেয়া প্রয়োজন বলে বোধ করেছেন।

নাম ও উপনামের ওপর যারা গ্রন্থ রচনা করেছেন তাঁরা হচ্ছেন আলী ইবনে আল মদীনী, নাসাঈ, হাকিম ইবনে আবদুল বার, আবু হাতেম এবং যাহাবী। উপাধি সম্পর্কে গ্রন্থ রচনা করেছেন আবুবকর শীরাযী (হিজরী ৪০৭ সন), আবুল ফযল, ইবনুল জুযী, ইবনে হাজার প্রমুখ।

(ঝ) ঐসব গ্রন্থ যাতে মুতালিফ, মুখতালিফ, মুত্তাফিক, মুতাফাররিক এবং মুশতাবাহ নাম রয়েছে। নাম ও নসবে কোন কোন শব্দ লিখায় এক হলেও উচ্চারণে ভিন্ন হয়। একই নামের বিভিন্ন ব্যক্তিও থাকতে পারে। তাই হাদীস বিশারদগণ বিষয়টি সুস্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন।

মুতালিফ ও মুখতালিফ রাবীদের নাম সম্পর্কিত গ্রন্থ সর্বপ্রথম লিখেন আবু আহমাদ আসকারী। এরপর গ্রন্থ রচনা করেন আবদুল গণী ইবনে সাঈদিল আযদী। দারু কুতনী, ইবনে মাকুলা, আহমাদ ইবনে আলী আল খতীব, ইবনে নুকতা, মানসুর, ইবনে সলীম, আবূ মুহাম্মাদ দামেশকী, মোগলতাঈ, ইয়াহইয়া ইবনে আলী মিসরী, মুহাম্মাদ আল আবইউরদী, ইবনুল গুতী এবং মারদীনা।

মুত্তাফিক, মুতাফাররিক এবং মুশতাবাহ সম্পর্কিত বই লিখেছেন আবূ বকর আহমাদ ইবনে আলী আল খতীব।

(ঞ) আসমাউর রিজালের ঐসব গ্রন্থ যা বিশেষ বিশেষ বিষয়ের উপর লিখিত। এগুলোর মধ্যে রয়েছে মুহাম্মাদ ইবনে দাউদুল কুর্দী রচিত রিজালুল বুখারী, ইবনে মনজুইয়া (হিজরী ৪২৮ সন) রচিত রিজালু মুসলিম, আমাদ আল ইসফাহানী (হিজরী ২৬৯ সন) রিজালু মুসলিম, মুহাম্মাদ তাহিরুল মুকাদ্দেসী (হিজরী ৫০৭ সন) প্রণীত রিজলুস্ সহীহাইন, হিবতুল্লাহ্ আল লিলিকাই (হিজরী ৪১৮ সন) রচিত রিজালুস সহীহাইন, জানাই (হিজরী ৪৯৮ সন) রচিত রিজালু আবূ দাউদ, সয়ূতী রচিত কাশফুল মাবতা বিরিজালিল মুয়াত্তা, আইনী রচিত রিজালু শরহে মায়ানীল আসার (কাশফুল আসতার নামে এর সার-সংক্ষেপ বের হয়েছে), হাফিয ইবনে হাজার রচিত তা'জীলুল মুনফিয়াতু লি বি রিজালিল আরবায়াহ (অর্থাৎ মুয়াত্তা, মুসনাদে আহমাদ, মুসনাদে শাফিঈ এবং মুসনাদে আবী হানিফার রিজাল), আহমাদ ইবনে আহমাদ আল কুর্দী প্রণীত রিজালুস সুনানিল আরবায়াহ, আবী মূসা আল ইসফাহানী রচিত রিজাল মুসনাদে আহমাদ আল মুসামমা বি খাসায়েসে মুসনাদিল ইমাম, মুহাম্মাদ আল শাইবানী রচিত কিতাবুল হুজাজ ওয়া কিতাবুল আসার এবং আবিল ওয়াফা আল আফগানী রচিত রিজাল আসার আবী ইউসুফ।

সিহাহ সিত্তাহর বর্ণনাকারীদের নামগুলো আবূ মুহাম্মাদ আবদুল গণী আল-মুকাদ্দেসী (হিজরী ৬০০ সন) 'আল কামাল' নামক গ্রন্থে একত্রিত করেছেন। ইউসুফ মযী একে তাহযীব বা সুবিন্যস্ত রূপ দিয়েছেন। যাহাবী তাহযীবুল কামালের সার-সংক্ষেপ লিখেছেন এবং এর নাম তাহযীবুল কামালই রেখেছেন। মোগলতাঈ তাহযীবুল কামালের ইকমাল করেছেন। হাফিয ইবনে হাজার তাহযীবুল কামালের তাহযীব করেছেন যা তাহযীবুত তাহযীব নামে বার খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। চরিত অভিধানের এটি একটি উন্নতমানের গ্রন্থ। ইবনে হাজার তাহযীবুত তাহযীবের সার-গ্রন্থ রচনা করেছেন যা তাকরীবুত্ তাহযীব নামে একাধিকবার প্রকাশিত হয়েছে। এই বিষয়ে অন্যদের লেখা আরো বই আছে।

মিশকাত প্রণেতা আল ইকমাল ফী আসমায়ির রিজাল নামক গ্রন্থ লিখেছেন। শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলবীও মিশকাতের রিজাল সম্পর্কে বই লিখেছেন। জেরাহ-তা'দীলের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে আবদুল হাই লক্ষ্ণৌভী আব্রাফ্ট ওয়া তাকমীলু ফী জিরাহে ওয়া তা'দীল নামক গ্রন্থ রচনা করেছেন।

📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 ইলমু ইলালিল হাদীস

📄 ইলমু ইলালিল হাদীস


কোন কোন সময় বাহ্যত হাদীস ত্রুটিমুক্ত মনে হয়। এর সনদেও ত্রুটি পরিলক্ষিত হয় না, কিন্তু এর মধ্যে ত্রুটি থাকে যা বিশেষজ্ঞগণ চিহ্নিত করতে পারেন। এই ত্রুটিকে ইলালিল হাদীস বলা হয়। এই ধরনের ত্রুটিযুক্ত হাদীসকে মালুল বলা হয়।

এই বিষয়টি যেমনি গুরুত্বপূর্ণ তেমনি জটিল। এই বিষয়ে যাঁরা গ্রন্থ রচনা করেছেন তাঁরা হচ্ছেন ইবনুল মাদীনী, ইবনে আবী হাতেম, সাজী, জুরজানী, খিলাল, মুসলিম, তিরমিযী, দারু কুতনী, হাকিম, বুআলী, আযযুজাজী, ইবনুল জুযী প্রমুখ।

📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 ইলমু মওযুয়াতিল হাদীস

📄 ইলমু মওযুয়াতিল হাদীস


সহীহ হাদীস গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। মওযু (অর্থাৎ বানোয়াট) হাদীস অবশ্যই বর্জনীয়। সহীহ ও মওযুর মধ্যে সবলতা ও দুর্বলতার বিচারে বিভিন্ন স্তর রয়েছে এবং এগুলো গ্রহণ ও বর্জনের জন্য উম্মাহ্র আলিমদের নির্দিষ্ট কায়দা-কানুন রয়েছে।

মনগড়া হাদীস বলা জঘন্য গুনাহ। ভুয়া হাদীস প্রণয়নকারীগণ উম্মার নিকট নিকৃষ্টতম অপরাধী। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আমার প্রতি মিথ্যা কথা আরোপ করবে তার স্থান জাহান্নামে।' এই হাদীসটি মুতাওয়াতির বা ধারাবাহিকভাবে বর্ণিত। আশারায়ে মুবাশশারাহসহ ষাটজনের বেশি রাবী এটি বর্ণনা করেছেন। নবী (সা)-এর বাণী বর্ণনা করার সময় সাহাবায়ে কিরামের শরীর কম্পিত হতো। আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ একবার হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন' বলে মাথা নত করে নিলেন, দাঁড়িয়ে গেলেন, জামার বোতাম খুলে ফেললেন। তাঁর চোখে পানি দেখা দিলো। ঘাড়ের রগ ফুলে উঠলো। তারপর ভীতভাবে হাদীস বর্ণনা করলেন। কোন সাহাবীই হাদীস বানোয়াটের মতো জঘন্য অপরাধ করেননি। নবী (সা)-এর যামানায় হিজরতের পর শুধুমাত্র একব্যক্তি সুপারিশ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছিলো যদ্দরুন তাকে হত্যা করা হয়।-আহকামে আমাদী

আবূ বকর সিদ্দিক (রা)-এর শাসনামলেও বানোয়াট হাদীসের কোন অস্তিত্ব ছিলো না। খলীফা রাসূল (সা)-এর হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে খুব বেশি সতর্কতা অবলম্বনের জন্য তাকিদ দিতেন।

উমর ফারুক (রা)-এর শাসনামলেও বানোয়াট হাদীসের অস্তিত্ব ছিলো না। অবশ্যই সেই সময় ইসলাম দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিলো। নানা ধরনের বিপুল সংখ্যক লোক তখন ইসলাম গ্রহণ করেছিলো। উমর (রা)-এর কঠোর নীতির ফলে কোন ফিতনাবাজ লোক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি মিথ্যা কথা আরোপ করার সুযোগ পায়নি। উসমান (রা)-এর শাসনামলের শেষের দিকে ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। আরবের নাস্তিকরা এবং অনারব দেশের অমুসলিমরা মুসলিমদের মধ্যে ভাঙ্গন ধরাতে চেষ্টিত হয়। ইয়ামেনের অধিবাসী আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবা সর্বপ্রথম বানোয়াট হাদীস বর্ণনা করে। (লিসানুল মীযান)। তাই উসমান (রা) বলেন, 'কিছু সংখ্যক লোক হাদীস বর্ণনা করে অথচ সেগুলো আমি হাদীস বলে জানিনা।' তাবাকাতে ইবনে সাদে আছে, 'উসমান (রা) এই ব্যাপারে খুব সতর্কতা অবলম্বন করতেন।'

আলী (রা)-এর শাসনামলে ফিতনা বৃদ্ধি পায়। আলী (রা) আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবাসহ বেশ কিছু সংখ্যক ব্যক্তিকে হত্যা করেন। (সহীহুল বুখারী ও মীযানুল ইতিদাল)। এছাড়া তিনি হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবাদের নিকট থেকেও শপথ নেয়া শুরু করেন। (মুসনাদে তায়ালিসী)। তদুপরি সাহাবা নন এমন ব্যক্তিদের হাদীস বর্ণনার ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করেন যে, বিনা সনদে কোন হাদীস বর্ণনা করা যাবে না। যুরকানী আলাল মাওয়াহেব

মাবিয়া (রা)-এর যামানায় বানোয়াট হাদীসের ফিতনা আরো বেড়ে যায়। মাবিয়া (রা) এক ভাষণে বলেন, 'আমি জানতে পেরেছি যে কিছু লোক এমন কথা বলে যা আল্লাহ্ কিতাবেও নেই, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হাদীসেও নেই। এরা আসলে মূর্খ। এদের সম্পর্কে তোমরা সাবধান থেকো।' সহীহুল বুখারী।

এক ঘোষণায় তিনি বলেন, 'তোমাদের উচিত উমার (রা)-এর যামানার হাদীসগুলো গ্রহণ করা। কেননা সেকালের লোকদের তিনি আল্লাহর ভয় প্রদর্শন করতেন।'-সহীহ মুসলিম

ইয়াযিদের শাসনামলেও সাহাবাদের একটি দল জীবিত ছিলেন। কিন্তু ফিতনাবাজদের পূর্ণ আযাদী ছিলো।

বনু মারওয়ানের আমলে বানোয়াট হাদীসের ফিতনা বহুগুণ বেড়ে যায়। এই অবস্থা দেখে মারওয়ানের পৌত্র, কিন্তু অন্যতম খালীফায়ে রাশেদ উমর ইবনে আবদুল আযীয রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হাদীসগুলো সংকলনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফরমান জারী করেন। এতে হাদীসের ইমামগণ হাদীস একত্রিত করণের কাজে উঠেপড়ে লেগে যান। হাদীস পর্যালোচনা ও হাদীস সংগ্রহকারীদের সমলোচনা-পর্যালোচনার কাজ শুরু হয়ে যায়।

ইবনে জুয়ী হাদীস বানোয়াটকারীদেরকে সাত প্রকারের বলে সাব্যস্ত করেছেন। যথা:

১. কতক লোক নিজস্ব ধর্মীয় মতাদর্শের সহায়তার জন্য হাদীস তৈরি করেছে। যেমন, খাত্তাবিয়াহ, শিয়া এবং সালেমিয়া সম্প্রদায়।

২. কতক লোক শাসক ও তাদের পারিষদদের খোশামোদের জন্য ভুয়া হাদীস তৈরি করেছে। যেমন, শামের তাযীম সম্পর্কীয় হাদীস, বনু আব্বাসের খিলাফত সংক্রান্ত হাদীস, বারমেকা সম্পর্কীয় হাদীস। উয়ানা ইবনুল হাকাম বনু উমাইয়ার জন্য হাদীস রচনা করেছে। গিয়াস ইবনে ইবরাহীম মাহদী আব্বাসীর জন্য কবুতরের সাথে খেলার হাদীস তৈরি করেছে।-মুয়াজ্জামুল আদবার, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৯৪

৩. যিন্দিকদের বানোয়াট হাদীস। হাম্মাদ ইবনে যায়েদ বর্ণনা করেন যে যিন্দিকরা চৌদ্দ হাজার জাল হাদীস তৈরি করে জনগণের মধ্যে প্রচার করে।-তাদরীব পৃ. ১০৩। ইবনে আবীল আওজা চার জাহার ভুয়া হাদীস তৈরি করেছিলো।

৪. কতক উস্তাদ পরীক্ষাচ্ছলে কিছু ভুয়া হাদীস ছাত্রদেরকে শুনাতেন তাদের সতর্কতা পরিমাপ করার জন্য এবং পরে তাদেরকে তা বলে দিতেন। কিন্তু ভুলক্রমে তার কিছু লিখা হয়ে গেছে।

আবদুল্লাহ্ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে রাবীয়ার সাথে এই রকম ঘটনা ঘটেছে। কখনো কখনো এমনও হয়েছে যে, উস্তাদ কোন একটি হাদীস শুনাবার জন্য সনদ বর্ণনা করেছেন এবং হাদীসের মতন বর্ণনা করার আগে কোন প্রাসঙ্গিক কথা বলেছেন আর এই কথাকেও হাদীস মনে করা হয়েছে। এইরকম একটি হাদীস ইবনে মাজাহতে রয়েছে। আল্লাহই ভালো জানেন।

৫. কতক লোক নিজের উদ্ভাবিত ফিতনার সমর্থনে জাল হাদীস বর্ণনা করতো। আবুল খাত্তাব ইবনে ওজীহ সম্পর্কে এরূপ বলা হয়ে থাকে।

৬. কতক লোক নিজের বক্তব্যকে চমৎকারিত্ব দানের জন্য অসমর্থিত সনদের দ্বারা হাদীস জাল করতো যাতে শ্রোতারা তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

৭. কতক নির্বোধ লোক জনসাধারণকে ভালো কাজের দিকে উৎসাহিত করার জন্য জাল হাদীস বর্ণনা করতো। ওয়াযকারীগণ, কিচ্ছা-কাহিনীর কথকগণ, সরল প্রকৃতির সূফীগণ এতে বেশি জড়িত হয়ে পড়েন। আবান ইবনে আবী আব্বাসের মতো সর্বত্যাগী, আহমাদ বাহেলীর মতো যাহেদ এবং সুলাইমান ইবনে উমারের মতো আবেদও এই অভিযোগ থেকে মুক্ত থাকেন নি। (মীযান ও লিসান)। আবূ আসীমা নূহ ইবনে মরিয়মকে লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, 'তুমি ইকরামা ইবনে আব্বাসের সনদে কুরআনী সূরার ফযীলতের মরফু হাদীস কোথেকে সংগ্রহ করেছো?' সে উত্তর দিলো, 'আমি জনসাধারণকে কুরআনের দিকে উৎসাহীত করার জন্য নিজেই তা করেছি।'

📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 রেওয়ায়েট হাদীস সম্পর্কিত কিতাবসমূহ

📄 রেওয়ায়েট হাদীস সম্পর্কিত কিতাবসমূহ


কুতুবে মাওযুয়াত মানে হচ্ছে জাল বর্ণনা এবং মুখে মুখে প্রচারিত বে-বুনিয়াদ হাদীস সম্বলিত কিতাবসমূহ।

এই বিষয়ে সর্বপ্রথম গ্রন্থ হচ্ছে মওযুয়াতে ইবনে জুযী। এই গ্রন্থে বানোয়াটি হাদীস উল্লেখিত রয়েছে। এছাড়া কিছু কিছু নিয়ম-কানুনও বর্ণিত হয়েছে যার মাধ্যমে মওযু হাদীস চেনা যায়। কিন্তু ইবনে যুযী অত্যন্ত কঠোর হওয়ার কারণে মওযু নয় এমন কিছু হাদীসকেও মওযু বানিয়ে ছেড়েছেন। এই জন্য মওযুয়াতে ইবনে জুযীর পাঠকের তা'য়াক্কুরাতে সয়ূতী আলাল মওযুয়াতে ইবনিল জুযী গ্রন্থ পাঠ করা অত্যাবশ্যক।

ইবনে জুযীর পরে আরো অনেকে মওযুয়াত সম্পর্কে গ্রন্থ লিখেছেন। এই গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে মাগানীর আদ দুররুল মুলতাকিতু ফী তাবঈনিল গলত, জুরজানী লিখিত কিতাবুল আবাতীল, মুসিলী প্রণীত আল মুগনী, ইবনে আবদুল বার প্রণীত মওযুয়াত, সয়ূতী রচিত আল্লালিল মাসনুয়া ফী আহাদিসীল মওযুয়া, শায়খ মুহাম্মাদ তাহিরুল ফাতনী প্রণীত কিতাবুল মওযুয়াত, ইবনুল কীরানী প্রণীত আল মওযুয়াত, মোল্লা আলীকারী প্রণীত মওযুয়াতুল কবীর, সয়ূতী প্রণীত আদ্‌ দুরুল মুনতাশিরাই ফীল আহাদিসীল মুশতাহিরাহ, সাখাবী প্রণীত আল মাকাসিদুল হাসানাহ ফীল আহাদিসীল মশহুরাহ আলাল, আল সিনাহ শওকানী প্রণীত আলফাওয়াদিল মজমুয়াহ ফীল আহাদিসীল মওযুয়াহ, শায়খ আবিল ফযল আবদুল হক আল হিন্দী প্রণীত তামীযুত তাইয়েব মিনাল খাবীস মিম্মা ইয়াদুরু আলাল আলসিনাতিন্নাসে মিনাল হাদীস, আবদুল হাই লক্ষ্ণৌভী প্রণীত আল আসারুল মরফুয়া ফী আখবারিল মওযুয়া, মাওলানা আনোয়ারুল্লাহ্ হায়দরাবাদী প্রণীত আল কালামুল মরফু ফীমা ইয়াতায়াল্লাকু বিল আহাদিসীল মওযু।

যাঁরা হককে বাতিল থেকে পৃথক করেছেন এবং এক একটি জাল, বে-বুনিয়াদ এ সন্দেহযুক্ত হাদীসের পর্যালোচনা করে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সহীহ হাদীসগুলোকে চিহ্নিত করেছেন এবং দীনের হিফাজত করে মুসলিম উম্মাহ্র বড়ো রকমের কল্যাণ করেছেন, আল্লাহ্ তাঁদেরকে বিপুলভাবে পুরস্কৃত করুন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00