📄 ইলমুল আসমা ওয়াস্ সিফাত
হাদীসের ইবারতকে পরিভাষায় 'মতন' বলা হয়। আর সংগ্রহের ধারাবাহিকতাকে বলা হয় 'সনদ'। ইলমুল হাদীসে সনদের অবস্থা ঘরের ভিত অথবা শরীরের রূহের অবস্থার মতো। বিনা সনদে ইলমুল হাদীসের স্থিতি অসম্ভব।
এ সম্পর্কে ইবনুল মুবারকের মন্তব্য হচ্ছে, 'সনদ দীনের অংশ'। যদি সনদই না থাকে তবে যে যা-ই বলুক না কেন তা গ্রাহ্য করা হবে না।'
ইমাম শাফিঈ বলেন, 'যে ব্যক্তি সনদ ছাড়া হাদীস সংগ্রহ করলো তার দৃষ্টান্ত হলো রাতের আঁধারে জ্বালানী সংগ্রহকারীর মতো যে জানে না সে কি সংগ্রহ করছে'।
ইবনে হাযম যাহেরী আলফসল ১ম খণ্ড ৮২ পৃষ্ঠায় ইলমুল আসনাদ সম্পর্কে লিখেছেন, 'এটি একটি কষ্টসাধ্য বিষয়। আল্লাহ্ তা'আলা আর কোন জাতি নয় শুধু মুসলিমদেরকে তা প্রদান করেছেন এবং সাড়ে চার শত বছরব্যাপী পশ্চিম ও পূর্বে তার স্থায়িত্ব দিয়েছেন।
সনদ শাস্ত্রের সাথে সাথে মুসলিমগণ আসমাউর রিজাল লিপিবদ্ধ করেছে। এতে হাজার হাজার বর্ণনাকারীর জীবন চরিত সংগৃহীত হয়েছে। এর ফলে সনদের সরলতা ও দুর্বলতা দিনের আলোর মতো সুস্পষ্ট হয়েছে।
ইলমুল হাদীসের আসনাদের সূচনা কখন হয়েছে এ নিয়ে মতভেদ আছে। অনেকের মতে, ইমাম যুহরী (হিঃ ১২৪ সন) এবং তাঁর ছাত্র মূসা ইবনে উকবা ও মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক থেকে এর সূচনা। কেউ কেউ বলেন, হিজরী ৭০ সনের কিছুকাল আগে এর সূচনা হয়। সুতরাং উরওয়ার সময়ে সনদের ব্যাপক ব্যবহার ছিলো। কিন্তু আমার মনে হয়, তৃতীয় ও চতুর্থ খলীফার যামানাতেই এর সূচনা। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
স্বীকৃত বিষয় এই যে হযরত আবূ বকর (রা) ও হযরত উমর (রা)-এর যামানায় সনদ প্রকাশের প্রয়োজন ছিলো না। অবশ্য শপথ ও সাক্ষ্য গ্রহণ করা হতো। হযরত উসমান (রা) ও হযরত আলী (রা)-এর যামানায় যখন নতুন নতুন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ফিতনা দেখা দেয় তখন নবী (সা)-এর হাদীস বর্ণনার জন্য সনদ উল্লেখ করা জরুরী মনে করা হতো। শরহে মাওয়াহেব ৫ম খণ্ডের ৩৯৪ পৃষ্ঠায় হযরত আলী (রা)-এর নিম্নোক্ত উক্তি বর্ণিত রয়েছে: 'তোমরা যখন হাদীস লিখবে সনদ সহকারে লিখবে।' অর্থাৎ হিজরী ৩০ সনের পর নবী (সা)-এর হাদীসমূহের সনদ বর্ণনা করা শুরু হয়। ক্রমশ এই সিলসিলার উন্নতি হতে থাকে। সংকলনের যুগে সনদ হাদীসের অংশ হিসেবে স্বীকৃত হয় এবং এটি জ্ঞানের একটি আলাদা শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। হিজরী চতুর্থ এবং পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত এই নিয়ম ছিলো যে মুহাদ্দিস প্রতিটি হাদীসের সনদ বলবেন বা লিখবেন। পঞ্চম-শতাব্দীর পর যখন হাদীস গ্রন্থসমূহ তৈরি হয়ে গেলো তখন সনদ বয়ানের কাজ শেষ হয়ে গেলো। তখন শুধু সংগৃহীত কিতাবের তথ্য নির্দেশকেই যথেষ্ট মনে করা হলো। অবশ্য যতদিন গ্রন্থগুলি মুদ্রিত হয়ে প্রকাশিত হয়নি ততদিন এটাকে জরুরী মনে করা হতো যে গ্রন্থ প্রণেতা পর্যন্ত ছাত্রগণ সনদ পৌঁছাবে এবং প্রণেতাগণ সনদ পরিবেশনকারীদের থেকে সনদ গ্রহণ করবেন। গ্রন্থসমূহ মুদ্রিত হয়ে যাওয়ার পর এই প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও পণ্ডিতগণ এবং হাদীসের ছাত্রদের মাঝে আজও এই নিয়ম চালু আছে। ফন্নে ইসবাতের কিতাবাদিও লেখা হয়েছে। যেমন, শাহ ওয়ালীউল্লাহ্ কর্তৃক লিখিত হাসারুশ্ শারেদ ফী আসানীদিশ্ শায়খ আবেদ, আল ইরশাদ ফী মুহিম্মাতিল ইসনাদ, আল উমাম লিঈকাযিল হিমাম শরতুশ শায়খ বুরহানউদ্দীন আলকুরদী আলকুরানী (হিজরী ১০২৫), বাগিয়াতুত্ তালেবীন শবতুশ শায়খ আহমদুন নখলী (হিজরী ১১১৪ সন), আল ইমদাদ শবতুশ শায়খ আবদুল্লাহ্ ইবনে সালেসিল বসরী, আকতাদুস সামার শবতুশ শায়খুল ফালানী (হিজরী ১২১৮ সন), ইত্তেহাদুল আকাবীর শবতুশ্ শাওকানী (হিজরী ১২৫২ সন), আল ইয়ানিউল জানী শবতুশ শায়খ আবদুল গনী আল মুজাদ্দেদী (হিজরী ১২৯৬ সন)। আমার প্রণীত ছোট গ্রন্থটির নাম মিন্নাতুল বারী।
📄 ইলমু আসমায়ির রিজাল
ইলমুল হাদীসের অন্যতম অত্যাবশ্যকীয় শাখা হচ্ছে চরিত অভিধান। এতে : হাদীস বর্ণনাকারীদের জন্ম-মৃত্যু, নাম-উপাধি, বংশ-গোত্র, জন্মস্থান, বিদ্যার্জন, ধার্মিকতা, স্মৃতিশক্তি, রুচি, সুস্থতা, অসুস্থতা, ওসাকাত ইত্যাদির বর্ণনা রয়েছে। এতে তাঁদের উস্তাদগণের নিবাস, প্রবাস, গুণাবলী এবং ত্রুটি-বিচ্যুতি বর্ণিত হয়েছে। এই বিদ্যা ছাড়া হাদীসের বিশুদ্ধতা ও দুর্বলতার পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্ভব নয়। এই বিদ্যা সম্পর্কে প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ ও দার্শনিক ডঃ স্প্রিংগার বলেন, 'পৃথিবীতে আর কোন জাতি হয়নি, বর্তমানকালেও নেই যারা মুসলমানদের চরিত-অভিধানের (আসমাউর রিজাল) মতো উঁচু মানের শাস্ত্র আবিষ্কার করেছে। এই বিদ্যার বদৌলতে আজ পাঁচ লক্ষ লোকের জীবনকথা জানা যায়।' (ইসাবাহ গ্রন্থের ভূমিকা, কলকাতায় মুদ্রিত)।
দুনিয়ায় যত ঘটনা ঘটে তা জানার উপায় দু'টি। প্রথমত, ঐ ঘটনা ঘটার সময় কোন ব্যক্তি স্বয়ং উপস্থিত থাকবে। এই অবস্থায় ঘটনা জ্ঞাত হওয়া ব্যক্তির ইলম, অনুভূতি ও দেখার ওপর নির্ভর করে। যেমন, নবী (সা)-এর হাদীস সম্পর্কে সাহাবাদের জ্ঞান। এই জ্ঞান সাধারণত অকাট্য। দ্বিতীয়ত, অন্যের নিকট শুনে জ্ঞাত হওয়া। এই অবস্থায় জ্ঞানের নির্ভুলতা নিরূপণের জন্য বর্ণনাকারীর সততা ও ধার্মিকতার দিকে দৃষ্টি দিতে হয়। যদি বর্ণনাকারী সত্যবাদী ও নির্ভরযোগ্য হয় তাহলে ঐ জ্ঞান গ্রহণীয় (ইতিবার), অন্যথায় তা বর্জনীয়। চরিত-অভিধানের উদ্দেশ্য এটাই।
সাহাবাগণ হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রেও ন্যায়পরায়ণ ও সত্যনিষ্ঠ। কিন্তু যাঁরা সাহাবা নন এমন বর্ণনাকারীর বর্ণনার নির্ভুলতা সম্পর্কে নিঃসংশয় হওয়ার প্রয়োজনে চরিত অভিধানে জেরাহ ও তা'দীলের ব্যবস্থাও অত্যাবশ্যক। এই সিলসিলায় ঐসব বড় বড় মুহাদ্দিসের নিকট থেকে তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন যাঁরা বর্ণনাকারীদের অবস্থা সম্পর্কে অবহিত এবং জেরাহ ও তা'দীল সম্পর্কেও ওয়াকিফহাল।
সাহাবাদের নাম সম্বলিত প্রথম চরিত-অভিধান লিখেন ইমাম বুখারী (র)। এরপর এই সম্পর্কে লিখেন আবদুল্লাহ্ আল বাগভী (হিজরী ৩৩০ সন), আবদুল্লাহ্ ইবনে আবী দাউদ (হিজরী ৩১৬ সন), আলী ইবনে আসকন ইবনে শাহীন আবু মানসুর মাওয়ারদী, আবু হাতেম রাযী, ইবনে জান তাবরানী, ইবনে মানদাহ, আবু নাঈম প্রমুখ।
সাহাবাদের নাম সম্বলিত তিনটি গ্রন্থ অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ১. ইবনে আবদুল বার রচিত আল ইসতীয়াব, ২. ইবনুল আসীর রচিত উসুদুল গাবাহ এবং ৩. ইবনে হাজার রচিত আল ইসাবাহ।
এছাড়া হাফিয যাহাবী তাজরীদ আসমায়ে সাহাবা নামক গ্রন্থ লিখেছেন। সাহাবাদের সাথে অ-সাহাবাদের বর্ণনাসহ সুবিন্যস্ত গ্রন্থ লিখেছেন খলীফা ইবনে খাইরাত, (হিজরী ২৪০ সন), ইবনে সা'দ (হিজরী ২৩০ সন), ইয়াকুব ইবনে আবী শাইবাহ (হিজরী ২৭৭ সন), আবুবকর ইবনে খাইসুমা (হিজরী ২৭৯ সন) প্রমুখ।
📄 বর্ণনাকারীদের স্তর
চরিত-অভিধানে তবকা বা বর্ণনাকারীদের স্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তবকা মানে ঐ ব্যক্তিবর্গ যারা সমসাময়িক। এটাও হতে পারে যে একই ব্যক্তি কয়েকটি স্তরে গণ্য। যেমন, হযরত আনাস (রা)। স্তর বিন্যাসে তিনি আশারায়ে মুবাশশারাহর শামিল। আবার বয়সের কারণে তাঁকে পরবর্তী স্তরে গণ্য করা হয়।
ইবনে সা'দ তাঁর রচিত 'তাবাকাতে' সাহাবাদের পাঁচটি স্তর নির্ধারিত করেছেন। যথা,
১. বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীগণ,
২. প্রথমে যাঁরা মুসলিম হয়েছেন,
৩. যারা পরিখা যুদ্ধ ও পরবর্তী যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন,
৪. মক্কা বিজয়ের দিন যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং
৫. সাহাবাদের শিশু ও বালকগণ।
হাকিম সাহাবাদেরকে বারটি স্তরে ভাগ করেছেন।
১. প্রথমে ইসলাম গ্রহণকারীগণ,
২. দারুল আরকামের সাহাবীগণ,
৩. হাবশায় হিজরাতকারীগণ,
৪. প্রথম বাইয়াতে আকাবার সাহাবীগণ,
৫. দ্বিতীয় বাইয়াতে আকাবার সাহাবীগণ,
৬. প্রথম হিজরাতকারীগণ,
৭. বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীগণ,
৮. বদর ও হুদাইবিয়ার মধ্যবর্তী সময়ে হিজরাতকারীগণ,
৯. বাইয়াতে রিদওয়ানের সাহাবীগণ,
১০. হুদাইবিয়া ও মক্কা বিজয়ের মধ্যবর্তী সময়ে হিজরাতকারীগণ,
১১. মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণকারীগণ,
১২. শিশু ও কিশোরগণ যাঁরা মক্কা বিজয় ও বিদায় হজ্জ দেখেছেন।
ইবনে সা'দ তাবেঈগণকে তিনভাগে ভাগ করেছেন। হাকিম তাঁদেরকে ভাগ করেছেন তেরটি ভাগে। ইবনে হাব্বান সকল তাবেঈকে একই শ্রেণীভুক্ত করেছেন। হাফিয ইবনে হাজার তাঁর রচিত তাকরীবুত্ তাহযীব গ্রন্থে হাদীসের বর্ণনাকারীদেরকে বারটি ভাগে বিভক্ত করেছেন। যথা:
১. সাহাবাগণ,
২. উচ্চ শ্রেণীর তাবেঈগণ। যেমন, ইবনুল মুসাইয়েব প্রমুখ। মুখত্যারমীনকেও এই স্তরে রেখেছেন। মুখত্যারমীন হচ্ছেন তাঁরা যাঁরা নবীর যামানা পেয়েছেন কিন্তু সেই সময় মুসলিম হননি অথবা মুসলিম হয়েছেন কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাক্ষাত পাননি। অবশ্য সাহাবাগণ থেকে তাঁরা ফায়দা পেয়েছেন।
৩. মধ্যম শ্রেণীর তাবেঈগণ। যেমন, হাসান বসরী, ইবনে সিরীন প্রমুখ।
৪. ঐসব তাবেঈ যাঁদের বেশিরভাগ রেওয়ায়েত উচ্চশ্রেণীর তাবেঈ থেকে বর্ণিত। যেমন, যুহরী প্রমুখ।
৫. ঐসব তাবেঈ যাঁরা দু' একজন সাহাবা দেখেছেন। যেমন, আ'মাশ ও ইমাম আবূ হানিফা।
৬. তাবেঈগণের সমকালীন তাবে' তাবেঈন। যেমন, ইবনে জরীহ।
৭. উচ্চশ্রেণীর তাবে' তাবেঈন। যেমন, ইমাম মালিক, ইমাম সওরী।
৮. তাবে' তাবেঈনের মধ্যম শ্রেণী। যেমন, ইবনে উয়াইনাহ।
৯. তাবে' তাবেঈনের শেষ শ্রেণী। যেমন, ইমাম শাফিঈ, তায়ালিসী আবদুর রায্যাক প্রমুখ।
১০. তাবে' তাবেঈন থেকে ইলম অর্জনকারীদের প্রথম শ্রেণী; যেমন, ইমাম আহমাদ।
১১. তাবে' তাবেঈন থেকে ইলম অর্জনকারীদের মধ্যম শ্রেণী।
১২. তাবে' তাবেঈনের ছাত্রবৃন্দ। যেমন, ইমাম তিরমিযী।
প্রথম ও দ্বিতীয়ভাগের যামানা হচ্ছে হিজরী প্রথম শতাব্দী। তৃতীয় থেকে অষ্টমভাগের যামানা হচ্ছে হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দী। নবম থেকে দ্বাদশভাগের যামানা হচ্ছে হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর পরবর্তী কাল।
📄 জেরাহ্ ও তা’দীল
ফিতনার যুগে কিছু লোক নিজ নিজ মতের সমর্থনে মনগড়া হাদীস বর্ণনা শুরু করে। ফলে হাদীস বর্ণনাকারীর বিশ্বস্ততা, হাদীস মুখস্থ রাখার সক্ষমতা ইত্যাদি বিষয় বিচার-বিশ্লেষণ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এভাবে চরিত অভিধানে জেরাহ ও তা'দীল স্বতন্ত্র বিদ্যা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
সাহাবাদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রা) (হিজরী ৬৮ সন), হযরত উবাদাহ ইবনে সামিত (রা) (হিজরী ৩৪ সন), হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা) (হিজরী ৯৩ সন) এবং তাবেঈগণের মধ্যে ইবনুল মুসাইয়েব, শা'বী, ইবনে সিরীন, আ'মাশ ও আবু হানিফা প্রমুখ রুওয়াতে হাদীসের জেরাহ ও তা'দীল সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তবে তা ছিলো খুবই সংক্ষিপ্ত।
তাবে' তাবেঈগণের মধ্যে ইমাম শু'বা প্রথম জেরাহ ও তা'দীলের নিয়মাবলী নির্ধারণ করেন। এই কালে মুয়াম্মার (হিজরী ১৫৩ সন), দিশামুস্তুওয়াই (হিজরী ১৫৪ সন), আওযায়ী, সুফিয়ান সাওরী, হাম্মাদ ইবনে সালমাহ, লাইস ইবনে সা'দ, ইমাম মালিক, আবদুল্লাহ্ ইবনুল মুবারক, আবু ইসহাক ফারাবী, মুয়ালী ইবনে ইমরান মুসেনী (হিজরী ১৮৫ সন), বাশার ইবনুল মুফাদ্দাল (হিজরী ১৮৬ সন), হাইসাম (হিজরী ১৮৮ সন), ইবনে আলিয়া (হিজরী ১৯২ সন), ইবনে ওহাব (হিজরী ১৯৭ সন), ওকীহ ইবনুল জারীহ, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ প্রমুখ নির্ভরযোগ্যদের মধ্যে গণ্য।
ছোট তাবে' তাবেঈদের মধ্যে ইয়াহ ইবনে সাঈদুল কাত্তান ও আবদুর রহমান ইবনুল মাহদী এই বিদ্যার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। সাঈদুল কাত্তান জেরাহ ও তা'দীলের ওপর কিতাব লিখেছেন। তাবে' তাবেঈগণের মধ্যে মুহাম্মাদ ইবনে সাঈদ, ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ীন, ইবনুল মাদানী এবং ইমাম মুহাম্মাদ এই বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন।
উপরোক্ত ব্যক্তিদের যামানা এবং তাঁদের পরবর্তীকালে হিজরী নবম শতাব্দী পর্যন্ত জেরাহ ও তা'দীল শাস্ত্রের ইমাম ছিলেন আবু দাউদ তায়ালিসী, ইয়াযীদ ইবনে হারুন (হিজরী ২০৬ সন), আবদুর রাযযাক ইবনে হুমাম, আবু আসিম আয্যাহ্হাক (হিজরী ২১২ সন), ইবনু মাযেশুন (হিজরী ২১৩ সন), আবূ খাইসামা যহীর ইবনে হারব (হিজরী ২৩৪ সন), আবু জাফর আবদুল্লাহ্ আন্নাবিল হাফিযুল জাযরাহ, মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ্ ইবনুন্ নাসীর (হিজরী ২৩৪ সন), আবদুল্লাহ্ ইবনে আমরুল কাওয়ারীরী (হিজরী ২৩৫ সন), ইসহাক ইবনে রাহুইয়া, আবু জাফর মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ্ ইবনে আমারুল মুসেলী (হিজরী ২৪২ সন), আহমাদ ইবনে সালিহ (হিজরী ২৪৮ সন), হারুন ইবনে আবদুল্লাহিল হাম্মাম (হিজরী ২৪২ সন), ইসহাকুল কুসাজ (হিজরী ২৫১ সন), আদ্দারেমী, ইমাম বুখারী, আল আজলী (হিজরী ২৬১ সন), বাকা ইবনে মুখাল্লাদ (হিজরী ২৭৬ সন), আবু যারআ দামেসকী (হিজরী ২৮১ সন), আবদুর রহমান ইবনে ইউসুফ বাগদাদী, ইবরাহীম ইবনে ইসহাক হারবী (হিজরী ২৮৫ সন), মুহাম্মাদ ইবনে ওযাহ (হিজরী ২৮৯ সন), আবু বকর ইবনে আবি আসিম, আবদুল্লাহ্ ইবনে আহমাদ (হিজরী ২৯০ সন), সালিহ জাযয়াহ (হিজরী ২৯৩ সন), আবুবকর আল বাযযার, মুহাম্মাদ ইবনে নাসরুল মাযাভিরী (হিজরী ২৯৪ সন), মুহাম্মাদ ইবনে উসমান ইবনে আবী শাইবাহ (হিজরী ২৯৭ সন), আবু বকর ফারয়াবী, নাসাঈ আসাজী (হিজরী ৩০৭ সন), আবু ইয়ালী, আবুল হাসান সুফিয়ান, ইবনে খুযাইমা, ইবনে জরীর আত্ তাবারী, আবু জাফর আত্ তাহাবী, আবূ বশর আদদাওলাবী, আবূ উরুবা আল হাররানী (হিজরী ৩১৮ সন), আবুল হাসান আহমাদ ইবনে উমাইর, আবু জাফর আল আকীলী (হিজরী ৩২১ সন), ইবনে আবী হাতেম, আহমাদ ইবনে নাসরুল বাগদাদী শায়খ আদদারুল কুর্নী (হিজরী ৩২৩ সন), আবু হাতেম ইবনে হাববানুল বাসতী, তাবরানী ইবনে আদী, আবূ আলী আল হুসাইন ইবনে মুহাম্মাদ আন্ নিশাপুরী (হিজরী ৩৬৫ সন), আবুশ্ শায়খ ইবনে হাব্বান (হিজরী ৩৬৯ সন), আবূ বকর আল ইসমাঈলী (হিজরী ৩৭১ সন), আবু আহমাদ আল হাকিম (হিজরী ৩৭৮ সন), আদ্দারু কুতনী ইবনে শাহীন, ইবনে মান্দাহ, আবূ আবদুল্লাহ্ আল হাকিম, আবু নসর আলকালাবাযী (হিজরী ৩৯৮ সন), আবদুর রহমান ইবনুল ফাতিতস (হিজরী ৪০২ সন), আবদুল গণী ইবনে সাঈদ, আবুবকর ইবনে মারদুইয়া আল ইসফাহানী, মুহাম্মাদ ইবনুল ফাওয়ারেস আল বাগদাদী (হিজরী ৪১২ সন), আবু বকর আলবারকানী (হিজরী ৪২৫ সন), আবু হাতেম আল আবদারী, খালাফ ইবনে মুহাম্মাদ আলওয়াসিতী (হিজরী ৪০১ সন), আবূ মাসউদ আল দামেশকী (হিজরী ৪০০ সন), আবুল ফযল আল ফালাকী (হিজরী ৪৩৮ সন) আবুল হাসান ইবনে মুহাম্মাদ আল খালাল আল বাগদাদী (হিজরী ৪৩৯ সন), আবু ইয়ালী আল খলীলী, ইবনে আবদুল বার, ইবনে হাযম, আল বায়হাকী, আল খতীব, ইবনে মাকুলা আবুল ওয়ালী দুলবাহী, আবূ আবদুল্লাহ্ আল হুমাইদী, আয্যাহলী (হিজরী ৫০৭ সন), আবুল ফযল ইবনে তাহিরুল মুকাদ্দেসী (হিজরী ৫০৭ সন), আল মুতামীন ইবনে আহমাদ (হিজরী ৫০৭ সন), শীরুইয়া আদ্দুয়ালিমী আশ্ শাতরী (হিজরী ৫২২ সন), আস্সাময়ানী (হিজরী ৫৬২ সন), আবূ মূসা আলমদিনী (হিজরী ৫৮১ সন), ইবনুল জুযী, আবুল কাসেম ইবনে আসাকির, ইবনে বশকুওয়াল (হিজরী ৫৭৮ সন), আবুবকর আল হাযেমী (হিজরী ৫৮৪ সন), আবদুল গণী আল মুকাদ্দেসী (হিজরী ৬০০ সন), আর রাহাদী, ইবনে মুফাযযল আল মুকাদ্দেসী (হিজরী ৬১৬ সন), আবুল হাসসান আল কাত্তান (হিজরী ৬৩৮ সন), ইবনুল আনমাতী (হিজরী ৬১৯ সন), ইবনে নুকতা (হিজরী ৬২৯ সন), ইবনুস সালাহ, আলমানদেরী, আবূ আবদুল্লাহ্ আল বারযালী (হিজরী ৬৩৬ সন), ইবনুল আবার, আবু শামাহ (হিজরী ৬২৫ সন), ইবনুদ্ দাবেসী (হিজরী ৬৩৭ সন), ইবনুন্ নাজজার (হিজরী ৬৪৩ সন), ইবনু দাকীকীল ঈদ, আশ শারফুল মারদূমী, দিমইয়াতী, ইবনে তাইমিয়াহ, আলমযী, ইবনু সাইয়িদুন্নাস, আবু আবদুল্লাহ্ ইবনে আইবেক আযযাহাবী, আশিহাব ইবনে ফাযালুল্লাহ্ (হিজরী ৭৪৯ সন), মুগলতাঈ ইবনে আরতকামানী, আশ্ শরীফুল হুসাইনী আল মুকাদ্দেসী, আযযাইনুল ইরাকী, আলওয়ালীউল ইরাকী, আল হাইসুমী, আল বুরহান, আল হালাবী, ইবনুল হাজার আল আসকালানী, বাদরুদ্দীন আল আইনী, ইবনে কাতলুবাগা, আস্সাখাভী প্রমুখ।
জেরাহ ও তা'দীলের ইমামদের এই দীর্ঘ তালিকা এ জন্য দেয়া হলো যাতে আন্দাজ করা যায় কত বিপুলসখ্যক হাদীসবিশারদ হাদীস বাছাইয়ের কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন এবং গুরুত্ব প্রদান করেছেন। আল্লাহ্ তাঁদের প্রতি রহম করুন। তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই উম্মাহ জানতে পেরেছে কোন্ হাদীসটি সহীহ এবং কোন্টি দুর্বল।
ইবনে সুয়ূতী তাঁর 'তারীখুল খুলাফা' গ্রন্থে ইবনে আসাকিরের বরাতে ইবনে আলিয়া থেকে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
ঘটনাটি নিম্নরূপঃ আব্বাসী খলীফা হারুনুর রশীদের নিকট এক যিন্দিককে আনা হলো। খলীফা তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলেন। লোকটি বললো, 'হে আমীরুল মু'মিনীন, আমি যে মনগড়া চার হাজার হাদীস তৈরি করেছি সেগুলোর কি করবেন? সেগুলোর একটি অক্ষরও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বর্ণিত নয়। আর সেগুলো লোকদের মধ্যে প্রচারিত হয়ে গেছে।' খলীফা উত্তরে বললেন, 'তুমি কি আবদুল্লাহ্ ইবনে মুবারক ও আবু ইসহাক ফারায়ীকে চেন? তাঁরা হাদীস পর্যালোচনা করছেন। তাঁরা ভূয়া হাদীসের প্রতিটি অক্ষর বের করে ছাড়বেন।'