📄 ইলমুত্ তাখরীজ
ইলমুত্ তাখরীজ হচ্ছে কোন গ্রন্থের উদ্ধৃতিহীন হাদীসগুলোর উদ্ধৃতি হাদীস গ্রন্থ থেকে দেয়া। এ সম্পর্কে অনেক গ্রন্থ রচিত হয়েছে। তন্মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে নসবুর রায় লি তাখরীজি আহাদীসিল হিদায়াহ, আল মুগনী আনিল আসফার লি তাখরীজি আহাদীসে ইহইয়াইল উলূম, আত্ তাল্ল্বীসুল জাবীর লি তাখরীজি আহাদিসির রাফিয়িল কবীর (হাফিজ ইবনে হাজার), আহাদীসুল কাশাফ (হাফিজ ইবনে হাজার), তাখরীজু আহাদীসিল মুখতার (কাসিম ইবনে কাতলুবাগা), তাখরীজু আহাদীস্ শিফা (সিউতী)। অত্র লেখক তাখরীজু আহাদীসে মাকাতীবে ইমাম রব্বানী মুজাদ্দিদে আলফিসানী লিখেছি যার নাম উমদাতুল মাজানী। আমি রিসালা রদ্দে রাওয়াফিযের হাদীসও বের করেছি।
📄 ইলমুল আসমা ওয়াস্ সিফাত
হাদীসের ইবারতকে পরিভাষায় 'মতন' বলা হয়। আর সংগ্রহের ধারাবাহিকতাকে বলা হয় 'সনদ'। ইলমুল হাদীসে সনদের অবস্থা ঘরের ভিত অথবা শরীরের রূহের অবস্থার মতো। বিনা সনদে ইলমুল হাদীসের স্থিতি অসম্ভব।
এ সম্পর্কে ইবনুল মুবারকের মন্তব্য হচ্ছে, 'সনদ দীনের অংশ'। যদি সনদই না থাকে তবে যে যা-ই বলুক না কেন তা গ্রাহ্য করা হবে না।'
ইমাম শাফিঈ বলেন, 'যে ব্যক্তি সনদ ছাড়া হাদীস সংগ্রহ করলো তার দৃষ্টান্ত হলো রাতের আঁধারে জ্বালানী সংগ্রহকারীর মতো যে জানে না সে কি সংগ্রহ করছে'।
ইবনে হাযম যাহেরী আলফসল ১ম খণ্ড ৮২ পৃষ্ঠায় ইলমুল আসনাদ সম্পর্কে লিখেছেন, 'এটি একটি কষ্টসাধ্য বিষয়। আল্লাহ্ তা'আলা আর কোন জাতি নয় শুধু মুসলিমদেরকে তা প্রদান করেছেন এবং সাড়ে চার শত বছরব্যাপী পশ্চিম ও পূর্বে তার স্থায়িত্ব দিয়েছেন।
সনদ শাস্ত্রের সাথে সাথে মুসলিমগণ আসমাউর রিজাল লিপিবদ্ধ করেছে। এতে হাজার হাজার বর্ণনাকারীর জীবন চরিত সংগৃহীত হয়েছে। এর ফলে সনদের সরলতা ও দুর্বলতা দিনের আলোর মতো সুস্পষ্ট হয়েছে।
ইলমুল হাদীসের আসনাদের সূচনা কখন হয়েছে এ নিয়ে মতভেদ আছে। অনেকের মতে, ইমাম যুহরী (হিঃ ১২৪ সন) এবং তাঁর ছাত্র মূসা ইবনে উকবা ও মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক থেকে এর সূচনা। কেউ কেউ বলেন, হিজরী ৭০ সনের কিছুকাল আগে এর সূচনা হয়। সুতরাং উরওয়ার সময়ে সনদের ব্যাপক ব্যবহার ছিলো। কিন্তু আমার মনে হয়, তৃতীয় ও চতুর্থ খলীফার যামানাতেই এর সূচনা। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
স্বীকৃত বিষয় এই যে হযরত আবূ বকর (রা) ও হযরত উমর (রা)-এর যামানায় সনদ প্রকাশের প্রয়োজন ছিলো না। অবশ্য শপথ ও সাক্ষ্য গ্রহণ করা হতো। হযরত উসমান (রা) ও হযরত আলী (রা)-এর যামানায় যখন নতুন নতুন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ফিতনা দেখা দেয় তখন নবী (সা)-এর হাদীস বর্ণনার জন্য সনদ উল্লেখ করা জরুরী মনে করা হতো। শরহে মাওয়াহেব ৫ম খণ্ডের ৩৯৪ পৃষ্ঠায় হযরত আলী (রা)-এর নিম্নোক্ত উক্তি বর্ণিত রয়েছে: 'তোমরা যখন হাদীস লিখবে সনদ সহকারে লিখবে।' অর্থাৎ হিজরী ৩০ সনের পর নবী (সা)-এর হাদীসমূহের সনদ বর্ণনা করা শুরু হয়। ক্রমশ এই সিলসিলার উন্নতি হতে থাকে। সংকলনের যুগে সনদ হাদীসের অংশ হিসেবে স্বীকৃত হয় এবং এটি জ্ঞানের একটি আলাদা শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। হিজরী চতুর্থ এবং পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত এই নিয়ম ছিলো যে মুহাদ্দিস প্রতিটি হাদীসের সনদ বলবেন বা লিখবেন। পঞ্চম-শতাব্দীর পর যখন হাদীস গ্রন্থসমূহ তৈরি হয়ে গেলো তখন সনদ বয়ানের কাজ শেষ হয়ে গেলো। তখন শুধু সংগৃহীত কিতাবের তথ্য নির্দেশকেই যথেষ্ট মনে করা হলো। অবশ্য যতদিন গ্রন্থগুলি মুদ্রিত হয়ে প্রকাশিত হয়নি ততদিন এটাকে জরুরী মনে করা হতো যে গ্রন্থ প্রণেতা পর্যন্ত ছাত্রগণ সনদ পৌঁছাবে এবং প্রণেতাগণ সনদ পরিবেশনকারীদের থেকে সনদ গ্রহণ করবেন। গ্রন্থসমূহ মুদ্রিত হয়ে যাওয়ার পর এই প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও পণ্ডিতগণ এবং হাদীসের ছাত্রদের মাঝে আজও এই নিয়ম চালু আছে। ফন্নে ইসবাতের কিতাবাদিও লেখা হয়েছে। যেমন, শাহ ওয়ালীউল্লাহ্ কর্তৃক লিখিত হাসারুশ্ শারেদ ফী আসানীদিশ্ শায়খ আবেদ, আল ইরশাদ ফী মুহিম্মাতিল ইসনাদ, আল উমাম লিঈকাযিল হিমাম শরতুশ শায়খ বুরহানউদ্দীন আলকুরদী আলকুরানী (হিজরী ১০২৫), বাগিয়াতুত্ তালেবীন শবতুশ শায়খ আহমদুন নখলী (হিজরী ১১১৪ সন), আল ইমদাদ শবতুশ শায়খ আবদুল্লাহ্ ইবনে সালেসিল বসরী, আকতাদুস সামার শবতুশ শায়খুল ফালানী (হিজরী ১২১৮ সন), ইত্তেহাদুল আকাবীর শবতুশ্ শাওকানী (হিজরী ১২৫২ সন), আল ইয়ানিউল জানী শবতুশ শায়খ আবদুল গনী আল মুজাদ্দেদী (হিজরী ১২৯৬ সন)। আমার প্রণীত ছোট গ্রন্থটির নাম মিন্নাতুল বারী।
📄 ইলমু আসমায়ির রিজাল
ইলমুল হাদীসের অন্যতম অত্যাবশ্যকীয় শাখা হচ্ছে চরিত অভিধান। এতে : হাদীস বর্ণনাকারীদের জন্ম-মৃত্যু, নাম-উপাধি, বংশ-গোত্র, জন্মস্থান, বিদ্যার্জন, ধার্মিকতা, স্মৃতিশক্তি, রুচি, সুস্থতা, অসুস্থতা, ওসাকাত ইত্যাদির বর্ণনা রয়েছে। এতে তাঁদের উস্তাদগণের নিবাস, প্রবাস, গুণাবলী এবং ত্রুটি-বিচ্যুতি বর্ণিত হয়েছে। এই বিদ্যা ছাড়া হাদীসের বিশুদ্ধতা ও দুর্বলতার পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্ভব নয়। এই বিদ্যা সম্পর্কে প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ ও দার্শনিক ডঃ স্প্রিংগার বলেন, 'পৃথিবীতে আর কোন জাতি হয়নি, বর্তমানকালেও নেই যারা মুসলমানদের চরিত-অভিধানের (আসমাউর রিজাল) মতো উঁচু মানের শাস্ত্র আবিষ্কার করেছে। এই বিদ্যার বদৌলতে আজ পাঁচ লক্ষ লোকের জীবনকথা জানা যায়।' (ইসাবাহ গ্রন্থের ভূমিকা, কলকাতায় মুদ্রিত)।
দুনিয়ায় যত ঘটনা ঘটে তা জানার উপায় দু'টি। প্রথমত, ঐ ঘটনা ঘটার সময় কোন ব্যক্তি স্বয়ং উপস্থিত থাকবে। এই অবস্থায় ঘটনা জ্ঞাত হওয়া ব্যক্তির ইলম, অনুভূতি ও দেখার ওপর নির্ভর করে। যেমন, নবী (সা)-এর হাদীস সম্পর্কে সাহাবাদের জ্ঞান। এই জ্ঞান সাধারণত অকাট্য। দ্বিতীয়ত, অন্যের নিকট শুনে জ্ঞাত হওয়া। এই অবস্থায় জ্ঞানের নির্ভুলতা নিরূপণের জন্য বর্ণনাকারীর সততা ও ধার্মিকতার দিকে দৃষ্টি দিতে হয়। যদি বর্ণনাকারী সত্যবাদী ও নির্ভরযোগ্য হয় তাহলে ঐ জ্ঞান গ্রহণীয় (ইতিবার), অন্যথায় তা বর্জনীয়। চরিত-অভিধানের উদ্দেশ্য এটাই।
সাহাবাগণ হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রেও ন্যায়পরায়ণ ও সত্যনিষ্ঠ। কিন্তু যাঁরা সাহাবা নন এমন বর্ণনাকারীর বর্ণনার নির্ভুলতা সম্পর্কে নিঃসংশয় হওয়ার প্রয়োজনে চরিত অভিধানে জেরাহ ও তা'দীলের ব্যবস্থাও অত্যাবশ্যক। এই সিলসিলায় ঐসব বড় বড় মুহাদ্দিসের নিকট থেকে তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন যাঁরা বর্ণনাকারীদের অবস্থা সম্পর্কে অবহিত এবং জেরাহ ও তা'দীল সম্পর্কেও ওয়াকিফহাল।
সাহাবাদের নাম সম্বলিত প্রথম চরিত-অভিধান লিখেন ইমাম বুখারী (র)। এরপর এই সম্পর্কে লিখেন আবদুল্লাহ্ আল বাগভী (হিজরী ৩৩০ সন), আবদুল্লাহ্ ইবনে আবী দাউদ (হিজরী ৩১৬ সন), আলী ইবনে আসকন ইবনে শাহীন আবু মানসুর মাওয়ারদী, আবু হাতেম রাযী, ইবনে জান তাবরানী, ইবনে মানদাহ, আবু নাঈম প্রমুখ।
সাহাবাদের নাম সম্বলিত তিনটি গ্রন্থ অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ১. ইবনে আবদুল বার রচিত আল ইসতীয়াব, ২. ইবনুল আসীর রচিত উসুদুল গাবাহ এবং ৩. ইবনে হাজার রচিত আল ইসাবাহ।
এছাড়া হাফিয যাহাবী তাজরীদ আসমায়ে সাহাবা নামক গ্রন্থ লিখেছেন। সাহাবাদের সাথে অ-সাহাবাদের বর্ণনাসহ সুবিন্যস্ত গ্রন্থ লিখেছেন খলীফা ইবনে খাইরাত, (হিজরী ২৪০ সন), ইবনে সা'দ (হিজরী ২৩০ সন), ইয়াকুব ইবনে আবী শাইবাহ (হিজরী ২৭৭ সন), আবুবকর ইবনে খাইসুমা (হিজরী ২৭৯ সন) প্রমুখ।
📄 বর্ণনাকারীদের স্তর
চরিত-অভিধানে তবকা বা বর্ণনাকারীদের স্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তবকা মানে ঐ ব্যক্তিবর্গ যারা সমসাময়িক। এটাও হতে পারে যে একই ব্যক্তি কয়েকটি স্তরে গণ্য। যেমন, হযরত আনাস (রা)। স্তর বিন্যাসে তিনি আশারায়ে মুবাশশারাহর শামিল। আবার বয়সের কারণে তাঁকে পরবর্তী স্তরে গণ্য করা হয়।
ইবনে সা'দ তাঁর রচিত 'তাবাকাতে' সাহাবাদের পাঁচটি স্তর নির্ধারিত করেছেন। যথা,
১. বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীগণ,
২. প্রথমে যাঁরা মুসলিম হয়েছেন,
৩. যারা পরিখা যুদ্ধ ও পরবর্তী যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন,
৪. মক্কা বিজয়ের দিন যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং
৫. সাহাবাদের শিশু ও বালকগণ।
হাকিম সাহাবাদেরকে বারটি স্তরে ভাগ করেছেন।
১. প্রথমে ইসলাম গ্রহণকারীগণ,
২. দারুল আরকামের সাহাবীগণ,
৩. হাবশায় হিজরাতকারীগণ,
৪. প্রথম বাইয়াতে আকাবার সাহাবীগণ,
৫. দ্বিতীয় বাইয়াতে আকাবার সাহাবীগণ,
৬. প্রথম হিজরাতকারীগণ,
৭. বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীগণ,
৮. বদর ও হুদাইবিয়ার মধ্যবর্তী সময়ে হিজরাতকারীগণ,
৯. বাইয়াতে রিদওয়ানের সাহাবীগণ,
১০. হুদাইবিয়া ও মক্কা বিজয়ের মধ্যবর্তী সময়ে হিজরাতকারীগণ,
১১. মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণকারীগণ,
১২. শিশু ও কিশোরগণ যাঁরা মক্কা বিজয় ও বিদায় হজ্জ দেখেছেন।
ইবনে সা'দ তাবেঈগণকে তিনভাগে ভাগ করেছেন। হাকিম তাঁদেরকে ভাগ করেছেন তেরটি ভাগে। ইবনে হাব্বান সকল তাবেঈকে একই শ্রেণীভুক্ত করেছেন। হাফিয ইবনে হাজার তাঁর রচিত তাকরীবুত্ তাহযীব গ্রন্থে হাদীসের বর্ণনাকারীদেরকে বারটি ভাগে বিভক্ত করেছেন। যথা:
১. সাহাবাগণ,
২. উচ্চ শ্রেণীর তাবেঈগণ। যেমন, ইবনুল মুসাইয়েব প্রমুখ। মুখত্যারমীনকেও এই স্তরে রেখেছেন। মুখত্যারমীন হচ্ছেন তাঁরা যাঁরা নবীর যামানা পেয়েছেন কিন্তু সেই সময় মুসলিম হননি অথবা মুসলিম হয়েছেন কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাক্ষাত পাননি। অবশ্য সাহাবাগণ থেকে তাঁরা ফায়দা পেয়েছেন।
৩. মধ্যম শ্রেণীর তাবেঈগণ। যেমন, হাসান বসরী, ইবনে সিরীন প্রমুখ।
৪. ঐসব তাবেঈ যাঁদের বেশিরভাগ রেওয়ায়েত উচ্চশ্রেণীর তাবেঈ থেকে বর্ণিত। যেমন, যুহরী প্রমুখ।
৫. ঐসব তাবেঈ যাঁরা দু' একজন সাহাবা দেখেছেন। যেমন, আ'মাশ ও ইমাম আবূ হানিফা।
৬. তাবেঈগণের সমকালীন তাবে' তাবেঈন। যেমন, ইবনে জরীহ।
৭. উচ্চশ্রেণীর তাবে' তাবেঈন। যেমন, ইমাম মালিক, ইমাম সওরী।
৮. তাবে' তাবেঈনের মধ্যম শ্রেণী। যেমন, ইবনে উয়াইনাহ।
৯. তাবে' তাবেঈনের শেষ শ্রেণী। যেমন, ইমাম শাফিঈ, তায়ালিসী আবদুর রায্যাক প্রমুখ।
১০. তাবে' তাবেঈন থেকে ইলম অর্জনকারীদের প্রথম শ্রেণী; যেমন, ইমাম আহমাদ।
১১. তাবে' তাবেঈন থেকে ইলম অর্জনকারীদের মধ্যম শ্রেণী।
১২. তাবে' তাবেঈনের ছাত্রবৃন্দ। যেমন, ইমাম তিরমিযী।
প্রথম ও দ্বিতীয়ভাগের যামানা হচ্ছে হিজরী প্রথম শতাব্দী। তৃতীয় থেকে অষ্টমভাগের যামানা হচ্ছে হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দী। নবম থেকে দ্বাদশভাগের যামানা হচ্ছে হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর পরবর্তী কাল।