📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 ইমাম নাসায়ী

📄 ইমাম নাসায়ী


তাঁর নাম আহমাদ, উপনাম আবূ আবদুর রহমান। আহমাদ ইবনে আলী ইবনে শু'আইব বংশ। খোরাসান এলাকার নাসায় হিজরী ২১৫ সনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পনর বছর বয়সে কুতাইবা ইবনে সাঈদ বলখীর নিকট হাদীস শিক্ষার জন্য যান। তারপর ইসহাক ইবনে রাহুইয়া, আলী ইবনে খুশরাম, আবু দাউদ প্রমুখ উচ্চশ্রেণীর মুহাদ্দিস থেকে হাদীস শ্রবণ করেন। ইমাম নাসাঈ ইমাম আহমদের সংগেও সাক্ষাত করেন। হাদীস শিক্ষার জন্য স্বদেশ ছাড়াও হিজায, ইরাক, মিসর, সিরিয়া ও আলজিরিয়া সফর করেন। অবশেষে তিনি মিসরেই বসতি স্থাপন করেন এবং হাদীসের ইমাম, হাফিয ও হুজ্জাতের মর্যাদা লাভ করেন। আলী ইবনে উমাইরের ভাষায় মিসরে সেই সময় ফিকাহ ও হাদীসের সবচে' বেশি অভিজ্ঞ সহীহ ও সকীম হাদীসসমূহের আলেম ছিলেন। রেওয়ায়েতের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। আবুল বাশার দুওয়ালাবী, ইবনুস সুন্নী, আবু জাফর তাহাভী প্রমুখ তাঁর থেকে রেওয়ায়েত করেছেন। শেষ জীবনে ইমাম নাসাঈ হজ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

দামেশকে পৌঁছে তিনি লক্ষ্য করেন যে বনু উমাইয়া সরকারের প্রভাবে ও খারেজীদের কারণে বহু লোক হযরত আলী (রা) সম্পর্কে ভুল ধারণায় নিমজ্জিত। তিনি হযরত আলী (রা)-এর প্রশংসা সম্বলিত হাদীস সংকলন করেন এবং দামেশকের জামে মসজিদে তা পড়ে শুনান। কিছুসংখ্যক লোক তাঁকে আমীর মুয়াবিয়া (রা)-এর প্রশংসাসূচক হাদীস পড়ার জন্য বলে। তিনি জানালেন যে আমীর মুয়াবিয়া (রা)-এর প্রশংসাসূচক হাদীস তাঁর জানা নেই। তবে একটি মরফু' রেওয়ায়েত আছে, 'আল্লাহ্ যেন তার পেটকে আসুদা না করেন'। এই কথা শুনার সংগে সংগেই কতিপয় লোক তাঁকে আক্রমণ করে বসে। এতে ইমাম নাসাঈ গুরুতর আহত হন। তাঁর সাথীরা তাঁকে নিয়ে মক্কার পথে রওয়ানা হন। সেখানে পৌঁছার পর হিজরী ৩০৩ সনের সফর অথবা শাবান মাসের ১৩ তারিখ সোমবার তিনি ৮৮ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন।

ইমাম নাসাঈ (র) একাধিক কিতাব লিখেছেন। তন্মধ্যে 'সুনান'ই বেশি প্রসিদ্ধ।

📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 সুনানে নাসায়ী

📄 সুনানে নাসায়ী


ইমাম নাসাঈ 'কিতাবুস্ সুনান আল কুবরা' নামক হাদীসের একখানা বড় কিতাব প্রণয়ন করেন। এর শর্ত ছিলো যে এখন থেকে প্রত্যেক ব্যক্তি হাদীস লিপিবদ্ধ করবেন যা পরিত্যাগ করার ইজমা ও ইত্তেফাক হয়নি। রামলার আমীর যখন এই কিতাব পেলেন তিনি ইমাম নাসাঈকে জিজ্ঞেস করলেন, 'এই কিতাবের সব হাদীস কি সহীহ?' তিনি উত্তরে বললেন, 'সহীহ, হাসান ও এর নিকটবর্তী সব ধরনের হাদীসই এর মধ্যে রয়েছে।' আমীর অনুরোধ করলেন, 'এই কিতাবের শুধু সহীহ হাদীসগুলো একত্রিত করে দিন।' ইমাম নাসাঈ তখন কিতাবুস্ সুনান আল কুবরা থেকে কিতাবুস্ সুনান আস্ সুগরা সংকলন করেন। আর এর নাম রাখেন মুজতানা (নির্বাচিত) অথবা মুজতাবা (পছন্দনীয়)। এই গ্রন্থ থেকে অন্যান্য হাদীস বাদ দিয়ে কেবল সহীহগুলোই রাখেন।

আহমাদ রামলী বলেন যে ইমাম নাসাঈ বলেছেন, 'সংকলনের সময় প্রত্যেক হাদীস নির্বাচনকালে আমি ইস্তিখারা করতাম। সন্দেহের উদ্রেক হলেই তা পরিত্যাগ করতাম।'

মুজতাবায় তিন ধরনের হাদীস স্থান পেয়েছে। প্রথমত ঐসব হাদীস যেগুলো সহীহাঈনে রয়েছে। দ্বিতীয়ত ঐসব হাদীস যেগুলো উভয়ের শর্ত পূরণ করেছে। তৃতীয়ত ঐসব হাদীস যেগুলো নাসাঈর শর্ত পূরণ করেছে। মুজতানার মধ্যে কিছু সংখ্যক হাদীস মালুল ও মুনকাতা দৃষ্ট হয়। কোন কোন হাদীসের ত্রুটি উক্ত কিতাবেই বর্ণিত রয়েছে। আমার মনে হয় মুজতানার রাবী ইবনুস সুন্নী তা বৃদ্ধি করেছেন। কেননা তিনি সংকলনে শরীক ছিলেন। দেখুন সালাতুল খাওফ ও আন্নাদহু মিনাত তাহারাতে মিন ইবনিস্ সুন্নী যা তিনি নিজেই ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহই সমধিক জ্ঞাত।

ইমাম নাসাঈর কিতাব মুজতানা বাচনভংগির দৃষ্টিতে সহীহ মুসলিমের বৈশিষ্ট্যের অনুরূপ। অধ্যায় নিরূপণ এবং মাসআলা নির্বাচনে এটি সহীহুল বুখারীর অনুরূপ। এটি বুখারী ও মুসলিমের পদ্ধতি একত্রকারী।

এর সাথে ইল্লাতের ফায়দা আলাদা রয়েছে। উপরোক্ত অবস্থানুযায়ী সহীহাঈন ছাড়া অন্যান্য হাদীসের কিতাবের সাথে তুলনা করলে অনেক কম দুর্বল হাদীস ও বিতর্কিত বর্ণনাকারী মুজতানায় পাওয়া যাবে।

মুজতানায় ৫১টি অধ্যায় ও ১৭৪৪টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। হাদীস রয়েছে ৪৪৮২টি। ইমাম নাসাঈ থেকে মুজতানা রেওয়ায়েতকারীর সংখ্যা একাধিক। তবে ইবনুস্ সুন্নীর রেওয়ায়েত প্রসিদ্ধ ও বহুল প্রচলিত।

সিরাজুদ্দীন ইবনে মুলকান মুজতানার শরাহ লিখেছেন। সিন্দি ও সয়ূতী মুজতাবার পাদটিকা লিখেছেন। এর উর্দু তরজমাও প্রকাশিত হয়েছে।

📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 ইমাম আবু দাউদ (র)

📄 ইমাম আবু দাউদ (র)


ইমাম আবু দাউদের নাম সুলাইমান। উপনাম আবূ দাউদ। বংশ পরম্পরা : সুলাইমান ইবনে আশয়াস ইবনে ইসহাক ইবনে বশীর ইবনে শাদ্দাদ ইবনে আমর ইবনে ইমরান। কান্দাহারের নিকটবর্তী সিস্তান তাঁর জন্মস্থান। হিজরী ২০২ সনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

হাদীস শিক্ষার্থে তিনি বিভিন্ন দেশ সফর করেন। ইরাক, খোরাসান, শাম, হিজায, মিসর ও জযীরার মুহাদ্দিসগণের নিকট থেকে তিনি হাদীস শ্রবণ করেন। তিনি ইমাম বুখারীর সমসাময়িক ছিলেন। আহমাদ ইবনে হাম্বল, ইবনে মুয়ীন, উসমান ইবনে আবী শাইবাহ, কুতাইবাহ, কাবেনী, তায়ালিসী প্রমুখ তাঁর উস্তাদ ছিলেন। ইমাম আবূ দাউদ তাঁর উস্তাদগণ থেকে পাচ লাখ হাদীস শিখেছেন। তিরমিযী, নাসাঈ, আহমাদ ইবনে খিলাল প্রমুখ আবূ দাউদের নিকট হাদীস শ্রবণ করেছেন। তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ্ লু'লুয়ীসহ ইবনুল আরাবী ও ইবনে ওয়াসা তাঁর প্রখ্যাত ছাত্র।

ইমাম আবূ দাউদ উঁচু পর্যায়ের হাদীসের হাফিয, ইলাল বিশারদ ও ফকীহ ছিলেন। ইবাদাত, সালাহ ও তাকওয়ায় সুসমন্বিত ছিলেন। তিনি একাধিকবার বাগদাদ আসেন এবং বসরায় বসতি স্থাপন করেন। হিজরী ২৭৫ সনের ১৫ই শাওয়াল জুম'আর দিন তিনি ইন্তিকাল করেন।

ইমাম আবূ দাউদের গ্রন্থাবলীর মধ্যে সুনান ও মারাসীল বেশি প্রসিদ্ধ।

📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 সুনানু আবী দাউদ

📄 সুনানু আবী দাউদ


সুনান অর্থাৎ ধারাবাহিক ফিকহী আহকামের কিতাব হচ্ছে সুনanu আবী দাউদ। পাঁচ লাখ হাদীস থেকে বাছাই করে তিনি এই সংকলন তৈরি করেন। এর মধ্যে সহীহ, হাসান, লাইয়েন ও আমল উপযোগী হাদীসগুলো তিনি সংকলিত করেছেন। তিনি শর্ত করেছিলেন যে, যেসব হাদীস পরিত্যাগ করার ব্যাপারে সকল ইমাম একমত তিনি সেগুলো লিপিবদ্ধ করবেন না। কিন্তু যেগুলো পরিত্যাগের ব্যাপারে তাঁরা একমত নন এবং আয়িম্মায়ে মুজতাহিদীনের মধ্যে কেউ তা আমলকারী হলে তিনি সেগুলো লিপিবদ্ধ করবেন। সুতরাং রাফয়ে ইয়াদাইন, আদমে রাফয়ে ইয়াদাইন, আমীন বিল জিহর ও আমীন বিস্ সির, কিরায়াত খালফাল ইমাম ও আদমে কিরায়াত খালাফাল ইমাম-সব ধরনের হাদীস এর মধ্যে রয়েছে। ইমাম আবূ দাউদের দৃষ্টিতে যে হাদীস মালুল (আপত্তিকর) তিনি তার কারণ বর্ণনা করেছেন। হাদীসের দ্বারা কোন মাস'আলা উদ্ভাবিত হলে তা অধ্যায়ের শিরোনামে উল্লেখ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এ গ্রন্থটি আহকাম সংগ্রহ ও ফিকাহর সংকলনের অনন্য দাবিদার। আবূ দাউদ যেসব হাদীস সম্পর্কে নীরবতা অবলম্বন করেছেন সেই হাদীসগুলো মুহাদ্দিসগণের নিকট গৃহীত। শৃংখলা বিধান ও সৌন্দর্য রক্ষার্থে হাদীস যাতে দীর্ঘ না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে প্রয়োজনে তিনি সংক্ষিপ্ত আকারে হাদীস একত্রিত করেছেন। সংকলনের পর তিনি গ্রন্থটি ইমাম আহমাদের নিকট পেশ করেন। তিনি গ্রন্থখানি পছন্দ করেন। ইমাম গাযালী লিখেছেন, মুজতাহিদদের জন্য তাঁর কিতাবই যথেষ্ট।

এটি খুব জনপ্রিয় সংকলন। সুন্নাতুল জামায়াতের সব ফিরকার আলিম ও ফকীহগণ এই গ্রন্থটি গ্রহণ করেছেন।

সুনanu আবী দাউদে পাঁচ ধাপের (মাধ্যমের) কম কোন হাদীস নেই। শুধু একটি হাদীসে চার ধাপ রয়েছে। সুনানের অধ্যায় সংখ্যা ৪০। এতে মোট চার হাজার আট শত হাদীস সন্নিবেশিত হয়েছে। তন্মধ্যে মারাসীলের সংখ্যা ৬০০টি। সুনanu আবী দাউদ চারটি রেওয়ায়েত হিসেবে প্রসিদ্ধ।

১. ইবনে ওয়াসা আবূ দাউদ থেকে রেওয়ায়েত করেছেন। এটি একটি পরিপূর্ণ রেওয়ায়েত। মাগরিবে এর প্রচলন বেশি।

২. আবী আলী আল লুয়ীর রেওয়ায়েত। এটিই প্রসিদ্ধ সহীহ রেওয়ায়েত। প্রাচ্যে এর প্রচলন বেশি।

৩. আবী সাঈদ ইবনুল 'আরাবীর রেওয়ায়েত। এই রেওয়ায়েতে কিছু ত্রুটি রয়েছে।

৪. আবু ঈসা ইসহাক আর রমলী ওয়ারিক আবী দাউদের রেওয়ায়েত। এই রেওয়ায়েত ইবনে ওয়াসার সমপর্যায়ের রেওয়ায়েত।

সুনanu আবী দাউদের অনেক শরাহ রয়েছে। তন্মধ্যে খাত্তাবীর মায়ালিমু সীন, শায়খ শামসুল হকের গায়াতুল মাকসূদ, শায়খ আশরাফ আলী আযিমাবাদীর উনুল মা'বুদ, শায়খ খলীল আহমদের বযলুল মাযহুদ খুবই প্রসিদ্ধ। ইমাম মুনযিরী সুনanu আবী দাউদের সার-সংক্ষেপ লিখেছেন। সুনানের ওপর পাদটিকা সম্বলিত কয়েকটি কিতাব লিখেছেন। রিজাল (চরিত অভিধান) ও লেখা হয়েছে। আমি (আমীমুল ইহসান) সুনানের মুকাদ্দমা (ভূমিকা) লিখেছি। তা প্রকাশিতও হয়েছে। সুনানের উর্দু অনুবাদও প্রকাশিত হয়েছে। আবু দাউদের মারাসীলও আমার (মুফতী আমীমুল ইহসান) ভূমিকাসহ ছাপা হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00