📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 সহীহায়নের মধ্যে তুলনা

📄 সহীহায়নের মধ্যে তুলনা


অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে সহীহুল বুখারীর পরেই সহীহ মুসলিমের স্থান। কিন্তু কুরতুবী দু'টিকে সমমানের মনে করেন। আর আবূ আলী নিশাপুরী মুসলিমকে বুখারীর ওপর প্রাধান্য দেয়ার পক্ষপাতী।

এতে কোন সন্দেহ নেই যে হাদীসসমূহের বিশুদ্ধতা, বর্ণনাশৈলী, সুন্দর উপস্থাপনা এবং রেওয়ায়েতের শব্দবিন্যাসের দৃষ্টিতে (ইমাম) মুসলিমের সহীহটি অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। অবশ্য শুধু বিশুদ্ধতার দৃষ্টিতে, হাদীসের শক্তিশালী হওয়ার দিক থেকে এবং সতর্কতা-বিচক্ষণতার দৃষ্টিতে বুখারীর প্রাধান্যই স্বীকৃত।

প্রখ্যাত মুহাদ্দিসগণের হাদীস বর্ণনার পাঁচটি শ্রেণী বা স্তর রয়েছে। যথা, ১. কাসীরুয যবত ওয়াল ইতকান ওয়া কাসীরুল মুলাযামাহ, ২. কাসীরুষ যবত ওয়াল ইতকান ওয়া কালীলুল মুলাযামাহ্, ৩. কালীলু যবত ওয়াল ইতকান ওয়া কাসীরুল মুলাযামাহ, ৪. কাশীলু যবত ওয়াল ইতকান ওয়া কালীলুল মুলাযামাহ এবং ৫. কালীলু যবত ওয়াল ইতকান ওয়া কালীলুল মুলাযামাহ--অন্যান্য জটিল জেরাহ সহকারে।

এই ব্যাপারে বলা যায়, যুহরীর ছাত্রদের মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছেন ইউনুস ইবনে ইয়াযিদ আয যেহলী ও মালিক ইবনে আনাস। দ্বিতীয় সারিতে রয়েছেন আওযায়ী ও লাইস ইবনে সাঈদ। তৃতীয় সারিতে রয়েছেন জাফর ইবনে মারওয়ান ও ইসহাক আল কালাবী। চতুর্থ সারিতে রয়েছেন রাবীয়া ইবনে সালিহ ও মুসান্না ইবনুস সাবাহ। আর পঞ্চম সারিতে রয়েছেন আবদুল কুদ্দুস ইবনে হাবীব ও মুহাম্মাদ ইবনে সাঈদ মসলুব।

ঠিক এভাবে নাফি', আ'মাশ প্রমুখের রেওয়ায়েতেরও পাঁচটি শ্রেণী রয়েছে।

১. ইমাম বুখারী প্রথম শ্রেণীকে গ্রহণ করেছেন। দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে সংকলন করেছেন। আর তৃতীয়টি গ্রহণ করেন নি। ইমাম মুসলিম প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণী গ্রহণ করেছেন। তৃতীয়টি থেকে সংকলন করেছেন।

২. ইমাম বুখারী মুয়ানয়ানের মধ্যে সাক্ষাৎকারকে শর্ত সাব্যস্ত করছেন। ইমাম মুসলিম সমকালকে যথেষ্ট মনে করেন।

৩. সহীহুল বুখারীর মুতাফারিদ রাবী ৪৮৩ জন। আর মুতাকাল্লিম ফীহ রেওয়ায়েত ৮০টি। আর সহীহ মুসলিমের মুতাফারিদ রাবী ৬২৫ জন। আর মুতাকাল্লিম ফীহ রেওয়ায়েত ১৬০টি।

৪. সহীহাঈনের ২১০টি হাদীস আলিমগণ সমালোচনা করেছেন। যার মধ্যে ৭৮টি সহীহুল বুখারীর খাস, ১১০টি সহীহ মুসলিমের খাস এবং ৩২টি উভয়ের।

৫. সহীহুল বুখারীর মুতাকাল্লিম ফীহ রেওয়ায়েত বেশির ভাগ বুখারীর শায়খ ও প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গের যাঁদের জীবনী সম্পর্কে তিনি জ্ঞাত ছিলেন। সহীহ মুসলিমের মুতাকাল্লিম ফীহ রেওয়ায়েত বেশির ভাগ উচ্চস্তরের বুযুর্গদের।

মোটকথা সাক্ষ্য দেয় এইসব বিষয় ইমাম বুখারী হাদীস সংগ্রহে কত সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। এটি দেখে বলতে হয়, আল্লাহর কিতাবের পর সহীহ বুখারীর স্থান। এরপরই রয়েছে সহীহ মুসলিমের স্থান। অবশ্য আল্লাহ্ সবচে' ভালো জানেন।

সহীহাঈনের হাদীসের ওপর কোন কোন আলিম সমালোচনাগ্রন্থ রচনা করেছেন। তন্মধ্যে দারু কুতনীর রিসালা আল-ইসতিদরাক ও ওয়াত্তা তাবুব অত্যধিক প্রসিদ্ধ। আবূ মাসউদ দামেশকীও সমালোচনাগ্রন্থ লিখেছেন। আবু আলী গাসসানী তাঁর তানকিদুল মুহমাল ফী জুয়িল ইলালে উভয়ের হাদীসগুলো পর্যালোচনা করেছেন। হাফিয ইবনে হাজার ফাতহুল বারীর ভূমিকায় সকলের জওয়াব প্রদান করেছেন।

📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 ইমাম নাসায়ী

📄 ইমাম নাসায়ী


তাঁর নাম আহমাদ, উপনাম আবূ আবদুর রহমান। আহমাদ ইবনে আলী ইবনে শু'আইব বংশ। খোরাসান এলাকার নাসায় হিজরী ২১৫ সনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পনর বছর বয়সে কুতাইবা ইবনে সাঈদ বলখীর নিকট হাদীস শিক্ষার জন্য যান। তারপর ইসহাক ইবনে রাহুইয়া, আলী ইবনে খুশরাম, আবু দাউদ প্রমুখ উচ্চশ্রেণীর মুহাদ্দিস থেকে হাদীস শ্রবণ করেন। ইমাম নাসাঈ ইমাম আহমদের সংগেও সাক্ষাত করেন। হাদীস শিক্ষার জন্য স্বদেশ ছাড়াও হিজায, ইরাক, মিসর, সিরিয়া ও আলজিরিয়া সফর করেন। অবশেষে তিনি মিসরেই বসতি স্থাপন করেন এবং হাদীসের ইমাম, হাফিয ও হুজ্জাতের মর্যাদা লাভ করেন। আলী ইবনে উমাইরের ভাষায় মিসরে সেই সময় ফিকাহ ও হাদীসের সবচে' বেশি অভিজ্ঞ সহীহ ও সকীম হাদীসসমূহের আলেম ছিলেন। রেওয়ায়েতের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। আবুল বাশার দুওয়ালাবী, ইবনুস সুন্নী, আবু জাফর তাহাভী প্রমুখ তাঁর থেকে রেওয়ায়েত করেছেন। শেষ জীবনে ইমাম নাসাঈ হজ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

দামেশকে পৌঁছে তিনি লক্ষ্য করেন যে বনু উমাইয়া সরকারের প্রভাবে ও খারেজীদের কারণে বহু লোক হযরত আলী (রা) সম্পর্কে ভুল ধারণায় নিমজ্জিত। তিনি হযরত আলী (রা)-এর প্রশংসা সম্বলিত হাদীস সংকলন করেন এবং দামেশকের জামে মসজিদে তা পড়ে শুনান। কিছুসংখ্যক লোক তাঁকে আমীর মুয়াবিয়া (রা)-এর প্রশংসাসূচক হাদীস পড়ার জন্য বলে। তিনি জানালেন যে আমীর মুয়াবিয়া (রা)-এর প্রশংসাসূচক হাদীস তাঁর জানা নেই। তবে একটি মরফু' রেওয়ায়েত আছে, 'আল্লাহ্ যেন তার পেটকে আসুদা না করেন'। এই কথা শুনার সংগে সংগেই কতিপয় লোক তাঁকে আক্রমণ করে বসে। এতে ইমাম নাসাঈ গুরুতর আহত হন। তাঁর সাথীরা তাঁকে নিয়ে মক্কার পথে রওয়ানা হন। সেখানে পৌঁছার পর হিজরী ৩০৩ সনের সফর অথবা শাবান মাসের ১৩ তারিখ সোমবার তিনি ৮৮ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন।

ইমাম নাসাঈ (র) একাধিক কিতাব লিখেছেন। তন্মধ্যে 'সুনান'ই বেশি প্রসিদ্ধ।

📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 সুনানে নাসায়ী

📄 সুনানে নাসায়ী


ইমাম নাসাঈ 'কিতাবুস্ সুনান আল কুবরা' নামক হাদীসের একখানা বড় কিতাব প্রণয়ন করেন। এর শর্ত ছিলো যে এখন থেকে প্রত্যেক ব্যক্তি হাদীস লিপিবদ্ধ করবেন যা পরিত্যাগ করার ইজমা ও ইত্তেফাক হয়নি। রামলার আমীর যখন এই কিতাব পেলেন তিনি ইমাম নাসাঈকে জিজ্ঞেস করলেন, 'এই কিতাবের সব হাদীস কি সহীহ?' তিনি উত্তরে বললেন, 'সহীহ, হাসান ও এর নিকটবর্তী সব ধরনের হাদীসই এর মধ্যে রয়েছে।' আমীর অনুরোধ করলেন, 'এই কিতাবের শুধু সহীহ হাদীসগুলো একত্রিত করে দিন।' ইমাম নাসাঈ তখন কিতাবুস্ সুনান আল কুবরা থেকে কিতাবুস্ সুনান আস্ সুগরা সংকলন করেন। আর এর নাম রাখেন মুজতানা (নির্বাচিত) অথবা মুজতাবা (পছন্দনীয়)। এই গ্রন্থ থেকে অন্যান্য হাদীস বাদ দিয়ে কেবল সহীহগুলোই রাখেন।

আহমাদ রামলী বলেন যে ইমাম নাসাঈ বলেছেন, 'সংকলনের সময় প্রত্যেক হাদীস নির্বাচনকালে আমি ইস্তিখারা করতাম। সন্দেহের উদ্রেক হলেই তা পরিত্যাগ করতাম।'

মুজতাবায় তিন ধরনের হাদীস স্থান পেয়েছে। প্রথমত ঐসব হাদীস যেগুলো সহীহাঈনে রয়েছে। দ্বিতীয়ত ঐসব হাদীস যেগুলো উভয়ের শর্ত পূরণ করেছে। তৃতীয়ত ঐসব হাদীস যেগুলো নাসাঈর শর্ত পূরণ করেছে। মুজতানার মধ্যে কিছু সংখ্যক হাদীস মালুল ও মুনকাতা দৃষ্ট হয়। কোন কোন হাদীসের ত্রুটি উক্ত কিতাবেই বর্ণিত রয়েছে। আমার মনে হয় মুজতানার রাবী ইবনুস সুন্নী তা বৃদ্ধি করেছেন। কেননা তিনি সংকলনে শরীক ছিলেন। দেখুন সালাতুল খাওফ ও আন্নাদহু মিনাত তাহারাতে মিন ইবনিস্ সুন্নী যা তিনি নিজেই ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহই সমধিক জ্ঞাত।

ইমাম নাসাঈর কিতাব মুজতানা বাচনভংগির দৃষ্টিতে সহীহ মুসলিমের বৈশিষ্ট্যের অনুরূপ। অধ্যায় নিরূপণ এবং মাসআলা নির্বাচনে এটি সহীহুল বুখারীর অনুরূপ। এটি বুখারী ও মুসলিমের পদ্ধতি একত্রকারী।

এর সাথে ইল্লাতের ফায়দা আলাদা রয়েছে। উপরোক্ত অবস্থানুযায়ী সহীহাঈন ছাড়া অন্যান্য হাদীসের কিতাবের সাথে তুলনা করলে অনেক কম দুর্বল হাদীস ও বিতর্কিত বর্ণনাকারী মুজতানায় পাওয়া যাবে।

মুজতানায় ৫১টি অধ্যায় ও ১৭৪৪টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। হাদীস রয়েছে ৪৪৮২টি। ইমাম নাসাঈ থেকে মুজতানা রেওয়ায়েতকারীর সংখ্যা একাধিক। তবে ইবনুস্ সুন্নীর রেওয়ায়েত প্রসিদ্ধ ও বহুল প্রচলিত।

সিরাজুদ্দীন ইবনে মুলকান মুজতানার শরাহ লিখেছেন। সিন্দি ও সয়ূতী মুজতাবার পাদটিকা লিখেছেন। এর উর্দু তরজমাও প্রকাশিত হয়েছে।

📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 ইমাম আবু দাউদ (র)

📄 ইমাম আবু দাউদ (র)


ইমাম আবু দাউদের নাম সুলাইমান। উপনাম আবূ দাউদ। বংশ পরম্পরা : সুলাইমান ইবনে আশয়াস ইবনে ইসহাক ইবনে বশীর ইবনে শাদ্দাদ ইবনে আমর ইবনে ইমরান। কান্দাহারের নিকটবর্তী সিস্তান তাঁর জন্মস্থান। হিজরী ২০২ সনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

হাদীস শিক্ষার্থে তিনি বিভিন্ন দেশ সফর করেন। ইরাক, খোরাসান, শাম, হিজায, মিসর ও জযীরার মুহাদ্দিসগণের নিকট থেকে তিনি হাদীস শ্রবণ করেন। তিনি ইমাম বুখারীর সমসাময়িক ছিলেন। আহমাদ ইবনে হাম্বল, ইবনে মুয়ীন, উসমান ইবনে আবী শাইবাহ, কুতাইবাহ, কাবেনী, তায়ালিসী প্রমুখ তাঁর উস্তাদ ছিলেন। ইমাম আবূ দাউদ তাঁর উস্তাদগণ থেকে পাচ লাখ হাদীস শিখেছেন। তিরমিযী, নাসাঈ, আহমাদ ইবনে খিলাল প্রমুখ আবূ দাউদের নিকট হাদীস শ্রবণ করেছেন। তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ্ লু'লুয়ীসহ ইবনুল আরাবী ও ইবনে ওয়াসা তাঁর প্রখ্যাত ছাত্র।

ইমাম আবূ দাউদ উঁচু পর্যায়ের হাদীসের হাফিয, ইলাল বিশারদ ও ফকীহ ছিলেন। ইবাদাত, সালাহ ও তাকওয়ায় সুসমন্বিত ছিলেন। তিনি একাধিকবার বাগদাদ আসেন এবং বসরায় বসতি স্থাপন করেন। হিজরী ২৭৫ সনের ১৫ই শাওয়াল জুম'আর দিন তিনি ইন্তিকাল করেন।

ইমাম আবূ দাউদের গ্রন্থাবলীর মধ্যে সুনান ও মারাসীল বেশি প্রসিদ্ধ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00