📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 সহীহুল বুখারী

📄 সহীহুল বুখারী


একবার ইমাম বুখারী তাঁর উস্তাদ ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহর শিক্ষামজলিসে উপস্থিত ছিলেন। উস্তাদ ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বললেন, "তোমাদের কেউ কি সহীহ হাদীসসমূহ সংকলন করে দেবে।" এ কথাটি ইমাম বুখারীর অন্তরে দাগ কাটে। কিছুদিন পর তিনি স্বপ্নে দেখেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাশরীফ এনেছেন আর তিনি বাতাস করে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছ থেকে মাছি তাড়াচ্ছেন। ব্যাখ্যাকারীগণ এই স্বপ্নের তাবীরে বললেন, "তুমি নবী (সা)-এর সহীহ হাদীসসমূহ থেকে মিথ্যা ও বানোয়াটগুলো দূরীভূত করে দেবে।"

ইমাম বুখারী সহীহ হাদীস সংকলনের কাজে লেগে গেলেন। ছয় লাখ হাদীসের পাণ্ডুলিপি সামনে রেখে ষোল বছর পরিশ্রম করে এই সংকলন সমাপ্ত করেন। যে যে স্থানে বসে তিনি সংকলনের কাজ করেন সেগুলো হচ্ছে কা'বা শরীফ ও মাকামে ইবরাহীমের মধ্যস্থল এবং মসজিদে নববীর মিম্বর ও রাসূলুল্লাহ্র কবরের মধ্যবর্তী স্থান। প্রতিটি হাদীস লিখার জন্য তিনি গোসল করতেন, দু'রাকাত নফল নামায পড়তেন, ইস্তেখারা করতেন এবং পুংখানুপুংখরূপে যাচাই বাছাই করে হাদীস লিপিবদ্ধ করতেন। গ্রন্থটি তৈরি হয়ে যাওয়ার পর তিনি তা ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বাল, ইবনে মুঈন এবং ইবনুল মাদীনীর সামনে পেশ করলেন। তাঁরা এর ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং এর সমস্ত হাদীস বিশুদ্ধ হওয়ার ওপর ঐকমত্য ঘোষণা করেন। অবশ্য মাত্র চারটি হাদীস কিছুটা বিতর্কিত ছিল। ইবনে হাজার বলেন যে, সেগুলোও (অর্থাৎ চারটি বিতর্কিত হাদীস) বিশুদ্ধ হওয়ার বিষয়টি ইমাম বুখারীর পক্ষে ছিল।

'সনদ' সহকারে হাদীস (মুসনাদ) সমূহ সংকলন করার পর তাঁর খেয়াল হলো যে, ফিকাহর বিষয়াদি ও আহকামের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো সংযোজন করলে ভালো হবে। তাই তিনি অধ্যায় ও অধ্যায়ের শিরোনামসমূহ বিন্যস্ত করলেন। এতেও তিনি নিজেই নিজের উদাহরণ হয়ে থাকলেন। তিনি অধ্যায়ের শিরোনাম অনুসারে কোন কোন হাদীসের অংশবিশেষ উল্লেখ করেন এবং অনেক স্থানে হাদীসকে বিভিন্ন সনদ ও মতন সহকারে কয়েকবারই উল্লেখ করেন যাতে অধিকসংখ্যক মাসায়েল অনুধাবন করা যায়। হাদীসের মতনগুলো থেকে যে মর্মার্থ তাঁর বুঝে আসতো তা তিনি বিভিন্ন অধ্যায়ে লিখেছেন এবং অধ্যায়সমূহের শিরোনাম লিখার ব্যাপারে মুসনাদ হাদীসসমূহ থেকে দলীল গ্রহণ করেছেন, চাই শিরোনামের সাথে এগুলোর সামঞ্জস্য যথাযথ হোক কিংবা আংশিক হোক অথবা কোন বৈশিষ্ট্যগত অর্থের দিক দিয়ে হোক কিংবা অন্য কোন পন্থায় হোক। অধ্যায়সমূহের শিরোনামে স্থান বিশেষে তিনি আল কুরআনের আয়াতও উদ্ধৃত করেছেন। আর আলোচ্য মাসআলার সমর্থনে মুয়াল্লাকাতও (সনদ উল্লেখ করা ছাড়া উল্লিখিত হাদীসমূহ) লিখেছেন ইলমে কালাম (আকাঈদ)-এর মাসায়েল এবং উসূল শাস্ত্রের বিষয়াদির ওপরও আলোচনা করেছেন। মোটকথা বিশুদ্ধ হাদীসসমূহের সাথে সাথে তাঁর কিতাবখানা সামগ্রিক ইলমের ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে।

ইমাম বুখারীর পূর্বে ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণ নিজ নিজ প্রণীত গ্রন্থের বুনিয়াদ বিষয়বস্তুর নিরিখে ফিকাহ সংক্রান্ত 'বাব' বা অনুচ্ছেদসমূহের ওপর স্থাপন করতেন কিংবা ইবাদতসমূহ কিংবা যুদ্ধবিগ্রহ কিংবা ক্রীতদাস কিংবা চিকিৎসা কিংবা আকাঈদ অথবা এগুলোর মধ্য থেকে কিছু কিছু কথাবার্তা লিপিবদ্ধ করতেন। সহীহুল বুখারীই প্রথম গ্রন্থ যা বিশুদ্ধ হাদীস লিপিবদ্ধ করা অপরিহার্য করে নেয়া এবং শর্তাবলীর ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও সমস্ত ইসলামী বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ। ওহীর সূচনা থেকে শুরু করে আকাঈদ, ইবাদত, মুয়ামালাত, সিয়ার (জীবনী), যুদ্ধ-বিগ্রহ, তাফসীর, ফাযায়েল, চিকিৎসা, আদাব, ক্রীতদাস প্রভৃতি ৫৪টি বিষয় এই গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক বিধানাবলীসহ দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাট বিষয়াদি এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়েছে। সহীহুল বুখারীর ভাষা অতীব উন্নতমানের। প্রখ্যাত ব্যাকরণবিদ আল্লামা রাদী শীয়ী (মৃত্যু হিজরী ৬৮৬ সন) বলেন, 'আরবী শিখতে হলে প্রথমে কুরআনুল হাকীম, অতঃপর সহীহুল বুখারী, অতঃপর হেদায়া পড়া চাই।'

সহীহ বুখারীর সর্বোচ্চ সনদ হলো "সুলালিয়াত” অর্থাৎ যেগুলোতে শুধু তিনজন বর্ণনাকারী বা মাধ্যম থাকেন। আর সর্বনিম্ন সনদ 'তিসইয়াহ' অর্থাৎ যেগুলোতে নয়জন বর্ণনাকারী বা মাধ্যম থাকেন। ইমাম বুখারী বাইশটি স্থানে 'বা'দুন্নাস' (কোন কোন ব্যক্তি)-এর খণ্ডন করেছেন। এই ধরনের স্থানসমূহের প্রতিটি স্থানেই ব্যক্তিবিশেষ উদ্দেশ্য নয়, বরং বিভিন্ন লোকই উদ্দেশ্য।

সহীহুল বুখারীর ব্যাপকতর অধ্যায়বিশেষের সংখ্যা ৯৮ এবং 'বাব' বা অনুচ্ছেদ-এর সংখ্যা ৩৪৫০। বারবার উল্লিখিত হাদীসসমূহ সহ সমস্ত মুসনাদ হাদীসের সংখ্যা হাফিয ইবনে হাজার (র)-এর গণনা মুতাবিক ৭৩৯৭। আর একাধিকবার উল্লিখিত হাদীসসমূহ বাদে এর সংখ্যা ২৪৬০। মুয়াল্লাকাত (সনদবিহীন উল্লিখিত) হাদীসের সংখ্যা ১৩৪১ যেগুলোর মধ্যে মাত্র ১৬০টি ব্যতীত অন্যগুলো সহীহর অন্যান্য স্থানে মুসনাদ আকারে রয়েছে। ১৬০টি হাদীসও হাফিয ইবনে হাজার অন্যান্য কিতাব থেকে মুসনাদ আকারে লিপিবদ্ধ করেছেন। মুতাবায়াত-এর সংখ্যা ৩৮৪। ইমাম বুখারী (র) থেকে সহীহুল বুখারী ৯০ হাজার লোক শুনেছেন। কিন্তু যাঁদের রেওয়ায়েত বহুল প্রচলিত তাঁরা মাত্র তিনজন। যথা: ১. হাফিয আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ ফারায়রী (মৃত্যু হিজরী ৩২০ সন), ২. হাফিয ইবরাহীম ইবনে মুয়াককাল (মৃত্যু হিজরী ২৯৪ সন) ও হাফিয হাম্মাদ ইবনে শাকির (মৃত্যু হিজরী ২৯০ সন)। প্রথমোক্ত মহান ব্যক্তি থেকে সহীহ রেওয়ায়েত অধিক প্রচার লাভ করেছে।

সহীহুল বুখারীর শরাহ বা ব্যাখ্যা গ্রন্থ ষাটেরও বেশি। হাফিয ইবনে হাজার (মৃত্যু হিজরী ৮৫৫ সন) রচিত ফাতহুল বারী, আইনী (মৃত্যু হিজরী ৮৫৫ সন) রচিত উমদাতুল কারী এবং কুসতুলানী (মৃত্যু হিজরী ৯২২ সন) রচিত ইরশাদুস সারী অধিক প্রসিদ্ধ। সহীহুল বুখারী ফারসী ও উর্দু ভাষাতেও অনূদিত হয়েছে। সম্প্রতি ইংরেজি ও বাংলা অনুবাদও প্রকাশিত হয়েছে। আসমাউর রিজাল-এর ওপর গ্রন্থাবলী লিখা হয়েছে। সেগুলো যাচাই বাছাই করা হয়েছে।

কুরআন হাকীমের পর সহীহুল বুখারী ব্যতীত আর কোন গ্রন্থের ওপর এতো বিপুল সংখ্যক বই লেখা হয়নি।

সহীহুল বুখারীর ওপর মাওলানা আহমদ আলীর টিকা অত্যন্ত চমৎকার ও মূল্যবান। সংক্ষিপ্ত হলেও আল্লামা হিন্দির টীকা উৎকৃষ্ট ও প্রয়োজনীয়।

অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে আল কুরআনের পর বিশুদ্ধতম কিতাব হচ্ছে সহীহুল বুখারী। এর ওপর হাশিয়া (পার্শ্ব টীকা ও পাদটীকা) লিখা হয়েছে। ইমাম বুখারী যাঁদের কাছ থেকে রেওয়ায়েত গ্রহণ করেছেন তাঁদেরকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করা যায়।

**প্রথম ভাগ:** এই ভাগে রয়েছেন তাবেঈন থেকে বর্ণনাকারী উস্তাদগণ। যেমন, হুমাইদী (র)। তিনি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ আনসারী তাবেঈ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

**দ্বিতীয় ভাগ:** এই ভাগে রয়েছেন এমন ব্যক্তি যাঁরা তাবেঈ যুগের লোক বটে, কিন্তু তাবেঈগণ থেকে রেওয়ায়েত করেন নি। যেমন আদম ইবনে উনাস প্রমুখ।

**তৃতীয় ভাগ:** এইভাগে রয়েছেন এমন ব্যক্তি যাঁরা শীর্ষস্থানীয় তাবে' তাবেঈন থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তাঁরা তাবেঈগণের সাক্ষাত পান নি। যেমন, সুলাইমান ইবনে জরব প্রমুখ।

**চতুর্থ ভাগ :** এইভাগে রয়েছেন এমন ব্যক্তিবর্গ যাঁরা ইমাম বুখারীর সমসাময়িক বা বয়সে কিছু বড়। যেমন, মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহইয়া প্রমুখ।

**পঞ্চম ভাগ:** এইভাগে রয়েছেন এমন মুহাদ্দিসগণ যাঁরা ইমাম বুখারীর ছাত্র বা ছাত্রতুল্য। যেমন, আবদুল্লাহ ইবনে হাম্মাদ প্রমুখ। ইমাম বুখারী বলেন, "ততক্ষণ পর্যন্ত কোন ব্যক্তি জ্ঞানী হবেন না যতক্ষণ না তিনি হাদীস রেওয়ায়েত করবেন সেই ব্যক্তি থেকে যিনি তাঁর বড়, সমকক্ষ বা তাঁর চেয়ে কম মর্যাদাবান।” আরেক বক্তব্যে ইমাম বুখারী বলেন, "কোন মুহাদ্দিস কামিল হতে পারেন না যদি না তিনি তাঁর থেকে শ্রেষ্ঠ, তাঁর সমতুল্য বা তাঁর চেয়ে কম মর্যাদাবান ব্যক্তি থেকে হাদীস লিপিবদ্ধ করেন।"

📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 ইমাম মুসলিম (র)

📄 ইমাম মুসলিম (র)


তাঁর নাম মুসলিম। উপনাম আবুল হাসান। উপাধি ছিলো আসাকিরুদ্দীন। মুসলিম ইবনে হাজ্জায ইবনে দারদ ইবনে কুশাদ আল কুশাইরী হাওয়াযিন গোত্রের লোক ছিলেন। তাঁর জন্মস্থান নিশাপুর। হিজরী ২০৪ সনে যেদিন ইমাম শাফিঈর ইন্তিকাল হয় ঐ দিনই ইমাম মুসলিম জন্মগ্রহণ করেন।

আঠারো বছর বয়সেই তিনি হাদীস শোনা শুরু করেন। হাদীস সংগ্রহের জন্য তিনি হিজায, সিরিয়া ও মিসর সফর করেন। তাঁর উস্তাদদের প্রখ্যাত কয়েকজন হচ্ছেন—ইমাম আহমাদ ইবনে ইসহাক ইবনে রাহয়িয়াহ কা'বিনা, ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহ্ইয়া, সাঈদ ইবনে মানসূর, যেহলী এবং ইমাম বুখারী। আবূ হাতেম, রাযী, তিরমিযী, ইবনে খুযাইমা এবং আবূ আওয়ানা তাঁর ছাত্র ছিলেন। ইমাম মুসলিম হাদীস লিপিবদ্ধ করতেন এবং হাদীস চর্চার জন্য আলোচনা মজলিসের ব্যবস্থা করতেন।

ইমাম মুসলিম উঁচু শ্রেণীর হাকিমে হাদীসের অন্যতম ছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনে বিশার বিন্দার বলেন, হাদীসের হাফিয চারজন : বুখারী, মুসলিম, দারেমী ও আবূ যুরআ।

ইমাম মুসলিমের নৈতিক মান অতি উঁচু পর্যায়ের ছিলো। জীবনে তিনি কারো গীবত করেন নি। কাউকে গালি দেননি। কাউকে প্রহার করেন নি।

তিনি সারাজীবন হাদীসের খিদমত করে গেছেন। হিজরী ২৫৯ সনের ২৫ রজব রোববার সন্ধ্যায় ৫৫ বছর বয়সে তিনি ইন্তিকাল করেন। তাঁকে তাঁর জন্মস্থান নিশাপুরে সমাহিত করা হয়।

বহু গ্রন্থ প্রণেতা ইমাম মুসলিমের সবচে' প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হচ্ছে সহীহ মুসলিম।

📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 সহীহ মুসলিম

📄 সহীহ মুসলিম


ইমাম মুসলিম তিন লক্ষ হাদীস থেকে যাচাই বাছাই করে ১৫ বছর পরিশ্রম করে সহীহ হাদীসের এই পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেন। আবূ যুরআ রাযী থেকেও সংগ্রহ সম্পর্কে পরামর্শ গ্রহণ করেছেন। আবু আলী নিশাপুরী হাদীসের গ্রন্থ সমূহের মধ্যে সহীহ মুসলিমকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে সনদের বিশুদ্ধতার সাথে বর্ণনা নৈপুণ্য ও সুশৃংখল উপস্থাপনার দৃষ্টিতে এই কিতাব নজীরবিহীন। তিনি খবর ও হাদীসের মধ্যে পার্থক্য করেন। আর মুজমাল, মুশকিল, মানসুখ, মু'য়ানয়ান ও মুবহাম হাদীসকে সনদ সহকারে বয়ান করেন। অতঃপর সেই সাথে মুবীন, নাসিখ, মুসারাহ, মুয়ীন ও মানসুব হাদীসের উল্লেখ করেছেন। প্রত্যেক হাদীসের বাক্য নিজ মূল সনদের সাথে লিখেছেন। সনদের মতপার্থক্যের সাথে শব্দ ও বাক্যের মতপার্থক্যও তিনি উল্লেখ করেছেন। প্রত্যেক অধ্যায়ের একই মহল নির্ধারণ করেছেন যদ্দরুন পঠন সহজ হয়েছে। আর তালাশের জটিলতাও দূর হয়েছে।

ইমাম মুসলিম সহীহ গ্রন্থের প্রথমে একটি ভূমিকাও লিপিবদ্ধ করেছেন। এতে কিতাব প্রণয়নের উদ্দেশ্য ছাড়া রেওয়ায়েত সম্পর্কে অনেক মূল্যবান বিষয়ের উল্লেখ করেছেন। তিনি ভূমিকায় রাবী বা বর্ণনাকারীদের তিনটি শ্রেণী নির্ধারিত করেছেন। যথা: ১. মারায়াহুল হুফফাযুল মুত্তাকীনুন, ২. মারায়াহুল মাসতুরুন ওয়াল মুতাওয়াসসিতুন, ৩. মারায়াহুয যুয়াফাউ। তিনি নিজ সহীহ সংকলনে প্রথম শ্রেণীর হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন। আর দ্বিতীয় শ্রেণীর হাদীসগুলো আনুষঙ্গিকভাবে উল্লেখ করেছেন। তৃতীয় শ্রেণীর হাদীসগুলো বাদ রেখেছেন। হাযিমী একেই মুসলিমের শর্ত বলে নির্ধারণ করেছেন। সহীহ মুসলিমে সুলাসিয়াত নেই। তবে রুবাইয়াত আশিরও বেশি রয়েছে। বারবার উল্লিখিত হাদীসের সংখ্যা মোট ১৭৫১টি। পুনরুল্লেখ বাদে ৪০০০ হাদীস রয়েছে। সহীহ মুসলিমের তালীকাত দু'টি। প্রকাশ্যে যদিও চৌদ্দটি দেখা যায় কিন্তু বারটি হাদীস অন্যস্থানে বিদ্যমান।

তারাজুমে আবওয়াব বা অধ্যায়ের শিরোনাম ইমাম মুসলিম নিজে স্থাপন করেন নি। অন্যরা পাদটিকা হিসেবে এর প্রবর্তন করেছেন।

মুতাদাওল কিতাবাদির মধ্যে ইমাম নববীর স্থিরকৃত শিরোনাম বা তারাজুম রয়েছে।

সহীহ মুসলিমের দু'জন রাবী আবু ইসহাক ইবরাহীম ইবনে মুহাম্মাদ নিশাপুরী ও আবূ মুহাম্মাদ আহমাদ ইবনে আলী কালানসীর মধ্যে প্রথম জনের রেওয়ায়েত সর্বত্র প্রচলিত।

সহীহ মুসলিমের একাধিক শরাহ (ব্যাখ্যা) রয়েছে। তন্মধ্যে ইমাম নববী, উবাই ও সনূসীর শরাহ মুতাদাওল। মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানীর শরাহ ফাতহুল মুলহিমও প্রসিদ্ধ কিতাব। ইস্তাম্বুলের আলিমগণ এর পাদটিকা লিখেছেন। সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিমের ওপর যথেষ্ট গবেষণা হয়েছে। এগুলোর ফার্সী ও উর্দু অনুবাদও বের হয়েছে।

📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 বুখারী ও মুসলিমের শর্তাবলী

📄 বুখারী ও মুসলিমের শর্তাবলী


সহীহাঈনের মধ্যে শুধু সহীহ হাদীস সীমাবদ্ধ নয়। ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম নিজ নিজ সহীহর মধ্যে সহীহ হাদীসসমূহের সঠিকতার দাবিদার নন। অবশ্য এই দু'জনের সহীহাঈনে যত হাদীস আছে সেগুলো নিশ্চিতভাবে সহীহ এবং সহীহ হাদীসসমূহ থেকেই সংকলিত। কিন্তু এদের কেউ সহীহ হাদীসের মাপকাঠি কি তা উল্লেখ করেন নি। তবে তাঁদের হাদীসের ওপর চিন্তা-ভাবনার পর মুহাদ্দিসগণ এর শর্তাবলী নির্ধারণ করেছেন। ইমাম আবুল ফযল মুহাম্মদ ইবনে তাহির আল মুকাদ্দেসী (মৃত্যু ৫০৭ হিজরী সন) শরুতু আইম্মায়িস্ সিত্তাতে লিখেছেন, "প্রকাশ থাকে যে, বুখারী ও মুসলিমের মুত্তাফিক বর্ণনার শর্ত হলো: কোন প্রসিদ্ধ সাহাবী থেকে নির্ভরযোগ্যতা ও প্রামাণ্যতার মতভেদ ব্যতীত উক্ত হাদীস বর্ণিত হবে এবং এর ইসনাদ মুত্তাসিল বা অবিচ্ছিন্ন থাকবে-কোন রকমের ছেদ পড়বে না। কোন সাহাবী থেকে যদি দুই বা তার অধিক সংখ্যক সাহাবী বর্ণনা করেন তবে তা হবে ভাল। উক্ত হাদীসের যদি একাধিক রাবী না থাকেন এবং উক্ত রাবী পর্যন্ত যদি বর্ণনাসূত্র (সনদ) সহীহ হয়, তাহলে উভয়েই তা গ্রহণ করেন। অবশ্য ইমাম বুখারী তাঁর সন্দেহের জন্য যেসব রাবীর হাদীস ত্যাগ করেছেন ইমাম মুসলিম এমন সব রাবীর হাদীস সমূহও তাদের সন্দেহ দূর করার পর গ্রহণ করেছেন।"

হাফেজ আবু বকর মুহাম্মাদ ইবন মূসা আল হাযিমী (মৃত্যু ৫৮৪ হিঃ) পঞ্চ ইমামের শর্ত সমূহে লিখেছেন: পরে প্রকাশিত হয়েছে যে, বুখারীর উদ্দেশ্য ছিল সংক্ষিপ্তকরণ। তিনি বর্ণনাকারী এবং হাদীস কোনটিতেই পূর্ণতার ইচ্ছা করেন নি। যদিও তিনি সহীহ হাদীস বর্ণনা করা শর্ত সাব্যস্ত করেছেন। কেননা তিনি বলেছেন, আমি এই গ্রন্থে সহীহ ছাড়া কোন হাদীস গ্রহণ করবো না। তিনি অন্যসব বিষয়ের অবতারণা করেন নি। যে হাদীসের সনদ ছেদ ও মিশ্রণ ইত্যাদি দুর্বলতা থেকে নিরাপদ হবে, তা' দুই অবস্থা থেকে খালি নয়--তা' হয়তো সহীহ নামে অভিহিত হবে অথবা তাকে সহীহ নামে অভিহিত করা হবে না। যদি সহীহ নামে অভিহিত হয় তবে তা' বুখারীর শর্ত মুতাবিকই হলো। এই অবস্থায় সংখ্যার কোন গুরুত্ব নেই। আর সহীহ নামে অভিহিত না করলে সংখ্যার কোন প্রভাব নেই। কেননা সন্দেহের সাথে সন্দেহের মিলনে নির্ভরযোগ্যতার ব্যাপারে কোন প্রভাব বিস্তার করে না এবং বিজ্ঞদের কারও এ ধরনের বক্তব্যও নেই।

মুহাদ্দিসগণ এই নিয়ম নির্ধারিত করেছেন (অবশ্য ফকীহগণ এই বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন) যে ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম যেসব হাদীসের ওপর একমত সেগুলো অন্যান্য হাদীসের ওপর অগ্রগণ্য। এরপর স্থান ইমাম বুখারীর অন্যান্য হাদীসের। পরবর্তী স্থানে রয়েছে ইমাম মুসলিমের অন্যান্য হাদীস।

এরপর ঐ হাদীসগুলোর স্থান যেগুলো উভয়ের শর্ত অনুযায়ী সহীহ। তারপর শুধু বুখারীর শর্ত অনুযায়ী সহীহগুলোর স্থান। তারপর শুধু মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহীহগুলোর স্থান। এরপর ঐগুলোর স্থান যেগুলো অন্যান্য ইমামের শর্ত অনুযায়ী সহীহ।

কোন হাদীস বুখারী ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহীহ হওয়া সম্পর্কে দু'টি অভিমত রয়েছে। ১. হাদীসের সনদ এমন বর্ণনাকারী ব্যক্তিদের সাথে যুক্ত হবে যাদের হাদীসগুলো সনদ সহকারে সহীহাঈনে বিদ্যমান। এসব হাদীস সম্পর্কে বলা হয় সহীহুন রিজালুহু রিজালুশ্ শাইখাইন অথবা সহীহুন আলা শারতিশ্ শাইখাইন।

২. হাদীসের সনদের বর্ণনাকারী ঐসব গুণে গুণান্বিত হবে যেসব গুণে গুণান্বিত বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনাকারীগণ যদি উভয়ে এদের থেকে হাদীস গ্রহণ নাও করে থাকেন। অর্থাৎ এদের বিশ্বস্ততা সম্পর্কে কোন সন্দেহ থাকবে না। সনদ কর্তিত হবে না। শাষ, নাফ্রাত (কম প্রচলিত) ইত্যাদি ত্রুটিমুক্ত থাকে। শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী 'মুকাদ্দামা'য় লিখেছেন, বুখারী ও মুসলিমের শর্ত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনাকারীগণের যেসব গুণ থাকা প্রয়োজন, সেইসব গুণের অধিকারী হওয়া। যেমন স্মরণশক্তি, ন্যায়-নিষ্ঠা, প্রয়োজনীয় সংখ্যার কম না হওয়া, অস্বীকৃত ও বাহুল্য না হওয়া। কেউ কেউ বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, স্বয়ং বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনাকারী হওয়া শর্ত।”

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00