📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 হাদীস গ্রন্থসমূহের ভাগ

📄 হাদীস গ্রন্থসমূহের ভাগ


এই যুগের শেষ পর্যন্ত যতগুলো হাদীসগ্রন্থ প্রণীত হয়েছে সেগুলো পাঁচটি ভাগে বিভক্ত।

**প্রথম ভাগ :** যেসব গ্রন্থ সহীহ হাদীসসমূহের জন্য খাস সেগুলো এ ভাগে রয়েছে। যেমন, মুয়াত্তা, সহীহুল বুখারী, সহীহ মুসলিম ইত্যাদি সহীহ সংকলন।

**দ্বিতীয় ভাগ :** যেসব হাদীসগ্রন্থ সাধারণভাবে দলীল হিসেবে গ্রহণ করার যোগ্য ও গৃহীত সেগুলো এই ভাগের অন্তর্ভুক্ত। যেমন, সুনান আন্নাসাঈ, সুনানু আবূ দাউদ, সুনানু তিরমিযী, মুসনাদে আহমাদ, মুসনাদে দারেমী, শরহু মায়ানী আল আসার, তাহাভী ইত্যাদি।

এই কিতাবগুলোর হাদীসসমূহ নির্ভরযোগ্য, কিন্তু সনদের প্রতি লক্ষ্য রাখারও প্রয়োজন আছে। কেননা এগুলোতে দু' একটা দুর্বল হাদীসও রয়েছে। অবশ্য আনুপাতিক হারে এর সংখ্যা খুবই নগণ্য।

**তৃতীয় ভাগ :** এই ভাগে রয়েছে সেসব কিতাব যাতে সহীহ, হাসান, সালিহ, মুনকার ও যয়ীফ--প্রত্যেক প্রকারের গ্রহণীয় ও বর্জনীয় হাদীসসমূহ রয়েছে। যেমন, সুনানু ইবনে মাজাহ, মুসনাদে তায়ালিসী, যিয়াদাতে ইমাম আহমাদ, মুসান্নাফে আবদুর রায্যাক, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহ, সুনানে সাঈদ ইবনে মানসুর, মুসনাদে আবী ইয়ালা, মুসনাদে বারার, মুসনাদে জরীর, মুসান্নাফে তাহাভী, তাহযীবুল আসার তাবারী,, তাফসীরে ইবনে জরীর, তারীখে ইবনে জরীর, তাফসীরে ইবনে মারদুইয়াহ, মায়াজেম সালাসাহ তাবরানী, সুনান দারু কুতনী, সায়াইবে দারু কুতনী, হুলিয়ায়ে আবী নাঈম, সুনানে বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান ইত্যাদি।

এই ভাগের হাদীসগুলোর হুকুম হলো, হাদীসশাস্ত্র বিশারদগণ যে হাদীসের ওপর নির্ভর করবেন তা আহকামেও নির্ভরযোগ্য

**চতুর্থ ভাগ :** এইভাগে রয়েছে এমনসব গ্রন্থ যেগুলোর মধ্যে সাধারণভাবে দুর্বল হাদীস রয়েছে। এসব গ্রন্থের নাম শুনলেই হাদীসের দুর্বলতার দিকে মন ধাবিত হয়। যেমন, নাওয়াদিরুল উসূল, হাকিমে তিরমিযী, মুসনাদুল ফিরদাউস, কিতাবুয দোয়াফা উকাইলী, কামিল ইবনে আদী, তারিখে খতীব ইত্যাদি। এই ভাগের কিতাবগুলোর হাদীসসমূহের ওপর আহকামের (বিধি বিধানের) পরিপ্রেক্ষিতে নির্ভর করা যাবে না। কিন্তু আল্লাহ্ যা চান তাই হয়। অবশ্যই ফাযায়েল ও ইতিহাসে মওযু ব্যতীত অন্য যে কোন হাদীসের ওপর নির্ভর করা যেতে পারে।

**• পঞ্চম ভাগ:** এই ভাগে রয়েছে সেসব কিতাব যেগুলো মওযু (বানোয়াট) হাদীসসমূহের বর্ণনায় লিখিত। যেমন, মওযুয়াতে ইবনে জাওযী, আল লায়ালী আলমাসনূয়াহ ফী আহাদীসিল মওযুয়াহ ইত্যাদি।

হাদীস সংকলনের যুগ থেকে শুরু করে এই যুগ (তৃতীয় যুগ) পর্যন্ত অসংখ্য গ্রন্থ লেখা হয়েছে। সেগুলো থেকে প্রচলিত গ্রন্থাবলীর আলোচনা কাশফুয যুনূন এবং ইত্তেহাফুন নুবালাতে মওজুদ রয়েছে। সেসব কিতাব থেকে যে ছয়টি কিতাব জনপ্রিয়তা লাভ করে সেগুলো আজো পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মুসলিম উম্মাহ সেগুলোকে বিশেষভাবে গ্রহণ করেছে। জ্ঞানীগণ এগুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তাঁরা এগুলোর ব্যাখ্যা লিখেছেন। এগুলোর বর্ণনাকারীদের ওপর গ্রন্থ রচনা করেছেন। এই কিতাবগুলো হলো: ১. সহীহুল বুখারী, ২. সহীহ মুসলিম, ৩. সুনানু নাসাঈ, ৪. সুনানু আবী দাউদ, ৫. সুনানু তিরমিযী, ৬. সুনানু ইবনে মাজাহ। এই ছয়টি হাদীস সংকলনকে 'সিহাহ সিত্তা' বলা হয়। প্রথমোক্ত দু'টোকে বলা হয় সাহীহাইন। শেষোক্ত চারটিকে বলা হয় সুনান।

আমার উস্তাদ মাওলানা মুশতাক আহমদ (র) সেসব গ্রন্থের বৈশিষ্ট্যাবলী সম্পর্কে সনদীর মন্তব্যের উল্লেখ করেছেন:

“যে ব্যক্তি বিশুদ্ধতা সহকারে হাদীসের জ্ঞান অর্জন করতে চায় সে যেন সহীহুল বুখারী পাঠ করে, যে ব্যক্তি সুন্দর বাচনভংগীর বিশুদ্ধ রেওয়ায়েতসমূহ চায় সে যেন সহীহ মুসলিম পাঠ করে। যে ব্যক্তি অধিক আহকাম চায় সে যেন সুনানু আবী দাউদ পাঠ করে। যে ব্যক্তি আধুনিক বিষয়াদি সম্পর্কে অবহিত হতে চায় সে যেন তিরমিযী পাঠ করে। যে ব্যক্তি সুন্দর বর্ণনাভঙ্গী সহকারে জোরালো মাহাত্ম্য ও নিখুঁত আহকাম চায় সে যেন নাসাঈ শরীফ পড়ে। যে ব্যক্তি অধিক মতন সম্বলিত কিতাব চায় সে যেন ইবনে মাজাহ পড়ে। আর যদি কেউ গ্রন্থ প্রণেতার মাহাত্ম্য ও ইমামত দেখতে চায় সে যেন ইমাম মালিকের মুয়াত্তা চর্চা করে। যদি কেউ এমন কোন ব্যাপক কিতাব চায় যা ইসলাম প্রসারের যুগে সংকলিত হয়েছে এবং যা প্রণেতার মাহাত্ম্য প্রকাশ করে তবে সে যেন মুসনাদে ইমাম আহমাদ চর্চা করে।”

এই ছয়টি কিতাবের মধ্যে সহীহাইনের (সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিম) গুরুত্ব সবচে' বেশি। পূর্ব ও পশ্চিমে সকল যুগেই এই সংকলন দু'টির খ্যাতি ও মাকবুলিয়াত উম্মাতে মুহাম্মাদীয়ার কাছে সমভাবে স্বীকৃত। অধিকাংশ হাদীস বিশারদের মতে, এই দু'টি হাদীস গ্রন্থের সমস্ত হাদীসই সহীহ ও গৃহীত। এগুলো থেকে ইলমে নযরী অর্জিত হয়। বরং হাফিয ইবনে হাজার (র), শামসুল আইম্মাহ সারাখসী (র) এবং ইবনুস সালাহ সেগুলো থেকে ইলমে কাতয়ী (অকাট্য জ্ঞান) অর্জিত হওয়ার কথা ঘোষণা করেন। সহীহাইনের পর সুনানে নাসাঈর মর্যাদা। এর নাম হাদীস বিশারদদের ভাষায় মুজতাবা বা মুজতানা। ইমাম নাসাঈর দাবি হলো, 'সুগরা কিতাবে যা উল্লেখ করা হয়েছে সবই সহীহ'।

সুনানে নাসাঈর পর সুনানু আবী দাউদের স্থান। ইমাম আবূ দাউদ নিজ সুনান সম্পর্কে লিখেছেন যে, এর হাদীসগুলো দলীল হিসেবে গ্রহণ করার যোগ্যতা রাখে। সুনানু আবী দাউদের পর জামিউত তিরমিযীর মর্যাদা। এই কিতাবে যয়ীফ, কলবী ও মসলূব-এর রেওয়াতেসমূহ রয়েছে যদিও সেগুলো দুর্বল হাদীসমূহের দুর্বলতা বর্ণনা করে।

এর পরে স্থান হচ্ছে ইলমে মাজাহর। কেননা, এতে আনুপাতিক হারে দুর্বল হাদীস বেশি আছে।

ইমাম বুখারী (র) নিজে মুজতাহিদ ছিলেন। তিনি কারো তাকলীদ করেন নি। ইমাম মুসলিম 'হিত্তাহ' এবং 'আলইয়ানিউলজনীতে' শাফিঈ মাযহাবের অনুসারী বলে উল্লেখিত হয়েছেন। ইমাম তিরমিযী শাফিঈ মাযহাবের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ইমাম নাসাঈ ও ইমাম আবু দাউদ হাম্বলী মাযহাবের লোক ছিলেন। ইমাম ইবনে মাজাহ সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি।

এবার 'সিহাহ সিত্তা'-র প্রণেতাগণের সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং তাদের গ্রন্থাবলীর ওপর আলোচনা পেশ করবো।

📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 ইমাম বুখারী (র)

📄 ইমাম বুখারী (র)


তাঁর প্রকৃত নাম মুহাম্মাদ। কুনিয়াত (উপনাম) আবূ আবদুল্লাহ্। আমীরুল মু'মিনীন ফীল হাদীস, নাসিরুল আহাদীস আন-নববীয়াহ (নবী করীমের হাদীসমূহের সাহায্যকারী) এবং নাশিরুল মাওয়ারীসিল মুহাম্মাদীয়া (নবী মুহাম্মাদের উত্তরাধিকারগুলোর প্রসারকারী) তাঁর উপাধি। বুখারা তাঁর জন্মভূমি। তিনি মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল ইবনে ইবরাহীম ইবনে মুগীরাহ ইবনে বারদিযবাহ বংশীয় ছিলেন। বারদিযবাহ পারসিক বংশজাত জনৈক অগ্নিপূজকের পুত্র ছিলেন। মুগীরাহ বুখারার শাসনকর্তা ইয়ামান জা'ফীর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইমাম বুখারীর পিতা ইসমাঈল ইমাম মালিক (র)-এর ছাত্র ছিলেন। তিনি হাম্মাদ ইবনে যায়িদ এবং ইবনুল মুবারক থেকেও হাদীস শিক্ষা করেছেন।

হিজরী ১৯৪ সনের ১৩ই শাওয়াল জুম'আর দিন ইমাম বুখারী জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই তিনি পিতৃহারা হন। মাতা তাঁকে লালন পালন করেন। দশ বছর বয়স থেকেই তাঁর মাঝে হাদীস হিফয করার আগ্রহ দেখা যায়। তিনি ষোল বছর বয়সে ওয়াকী এবং ইবনুল মুবারকের কিতাব মুখস্থ করে ফেলেন। তিনি মায়ের সাথে হজ্জে যান এবং হিজাযে ইলম অর্জন করেন। সেখানে ছয় বছর অবস্থান করার পর দেশে ফিরে আসেন। তিনি হাদীসের জ্ঞান লাভের জন্য কুফা, বসরা, বাগদাদ, মিসর ও সিরিয়া সফর করেন। তিনি এক হাজার আশিজন যুগবরেণ্য মুহাদ্দিসের নিকট থেকে হাদীস শ্রবণ করেন। তাঁর প্রখ্যাত শিক্ষকগণ হচ্ছেন: ১. নামী ইবনে ইবরাহীম, ২. আবদুল্লাহ্ ইবনে মূসা, ৩. ঈসা ইবনে আসিম, ৪. আলী ইবনিল মাদীনী, ৫. ইসহাক ইবনে রাহুইয়াহ, ৬. আহমাদ ইবনে হাম্বাল, ৭. ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন, ৮. আবূ বকর ইবনে আবী শাইবাহ, ৯. উসমান ইবনে আবী শাইবাহ এবং ১০. হুমাইদী।

ইমাম বুখারী থেকে প্রায় এক লাখ লোক হাদীস শ্রবণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে প্রখ্যাত কয়েকজন হচ্ছেন: ১. ইমাম মুসলিম, ২. ইবনে খুযাইমাহ, ৩. ইমাম তিরমিযী ও ৪. ফারায়রী।

ইমাম বুখারী প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন। আল কুরআন ও সুন্নাহর নিগূঢ় তত্ত্ব অনুধাবন, অনন্য ধীশক্তি, উন্নত মানসিকতা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, ইজতিহাদের ক্ষমতা এবং দীনের পরিপূর্ণ তত্ত্বজ্ঞানে তাঁর সমকক্ষ তখন কেউ ছিলো না। পার্থিব লালসা থেকে মুক্ত জীবন, হাদীসশাস্ত্রের পাণ্ডিত্য, চরিত অভিধান ও ইতিহাসের জ্ঞানের অধিকারের ক্ষেত্রে তিনি নিজেই নিজের উদাহরণ ছিলেন। পাঁচ লাখেরও বেশি সংখ্যক হাদীস তাঁর মুখস্থ ছিল।

ইমাম বুখারী পৈত্রিক উত্তরাধিকার হিসেবে যথেষ্ট সম্পত্তি পেয়েছিলেন। তিনি ছিলেন খুবই দানশীল। মুজাহিদ সুলভ প্রেরণা তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিলো। তিনি যুদ্ধবিদ্যায় দক্ষতা অর্জন করেন।

শেষ বয়সে তিনি বহু দুঃখ-কষ্টের শিকার হন। আল কুরআনের উচ্চারণ কাদিম না হাদেস (চিরন্তন বা অচিরন্তন) এই মাসআলা নিয়ে ইমাম যুহরীর সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ দেখা দেয়। অতঃপর বুখারার শাসনকর্তার সাথে তাঁর মতানৈক্য দেখা দেয়। বুখারার শাসনকর্তা তাঁকে সেখান থেকে বহিষ্কার করেন। ইমাম বুখারী সমরকন্দের দিকে চলে যান।

হিজরী ২৫৬ সনে ঈদুল ফিতরের রাতে মাগরিব ও ইশার সালাতের মধ্যবর্তী সময়ে ইমাম বুখারী ইন্তিকাল করেন। তখন তাঁর বয়স ১৩ দিন কম ৬২ বছর হয়েছিল। সমরকন্দ থেকে তিন মাইল দূরে খরতঙ্গ নামক স্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর প্রতি আল্লাহর অশেষ রহমত বর্ষিত হোক।

ইমাম বুখারী কোন সন্তান রেখে যান নি। 'আল ফাওয়াইদু রাবী ফী তারজুমাতিল বুখারী' নামক জীবনীগ্রন্থের বিবরণ মতে তিনি বিবাহও করেন নি।

ইমাম বুখারীর রচিত গ্রন্থ অনেক। সেগুলোর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রসিদ্ধ হলো তাঁর 'সহীহ' যার পূর্ণ নাম "আল জামিউস সহীহ আল মুসনাদ মিন হাদীসিন নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ওয়া আইয়্যামিহী।"

📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 সহীহুল বুখারী

📄 সহীহুল বুখারী


একবার ইমাম বুখারী তাঁর উস্তাদ ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহর শিক্ষামজলিসে উপস্থিত ছিলেন। উস্তাদ ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বললেন, "তোমাদের কেউ কি সহীহ হাদীসসমূহ সংকলন করে দেবে।" এ কথাটি ইমাম বুখারীর অন্তরে দাগ কাটে। কিছুদিন পর তিনি স্বপ্নে দেখেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাশরীফ এনেছেন আর তিনি বাতাস করে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছ থেকে মাছি তাড়াচ্ছেন। ব্যাখ্যাকারীগণ এই স্বপ্নের তাবীরে বললেন, "তুমি নবী (সা)-এর সহীহ হাদীসসমূহ থেকে মিথ্যা ও বানোয়াটগুলো দূরীভূত করে দেবে।"

ইমাম বুখারী সহীহ হাদীস সংকলনের কাজে লেগে গেলেন। ছয় লাখ হাদীসের পাণ্ডুলিপি সামনে রেখে ষোল বছর পরিশ্রম করে এই সংকলন সমাপ্ত করেন। যে যে স্থানে বসে তিনি সংকলনের কাজ করেন সেগুলো হচ্ছে কা'বা শরীফ ও মাকামে ইবরাহীমের মধ্যস্থল এবং মসজিদে নববীর মিম্বর ও রাসূলুল্লাহ্র কবরের মধ্যবর্তী স্থান। প্রতিটি হাদীস লিখার জন্য তিনি গোসল করতেন, দু'রাকাত নফল নামায পড়তেন, ইস্তেখারা করতেন এবং পুংখানুপুংখরূপে যাচাই বাছাই করে হাদীস লিপিবদ্ধ করতেন। গ্রন্থটি তৈরি হয়ে যাওয়ার পর তিনি তা ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বাল, ইবনে মুঈন এবং ইবনুল মাদীনীর সামনে পেশ করলেন। তাঁরা এর ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং এর সমস্ত হাদীস বিশুদ্ধ হওয়ার ওপর ঐকমত্য ঘোষণা করেন। অবশ্য মাত্র চারটি হাদীস কিছুটা বিতর্কিত ছিল। ইবনে হাজার বলেন যে, সেগুলোও (অর্থাৎ চারটি বিতর্কিত হাদীস) বিশুদ্ধ হওয়ার বিষয়টি ইমাম বুখারীর পক্ষে ছিল।

'সনদ' সহকারে হাদীস (মুসনাদ) সমূহ সংকলন করার পর তাঁর খেয়াল হলো যে, ফিকাহর বিষয়াদি ও আহকামের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো সংযোজন করলে ভালো হবে। তাই তিনি অধ্যায় ও অধ্যায়ের শিরোনামসমূহ বিন্যস্ত করলেন। এতেও তিনি নিজেই নিজের উদাহরণ হয়ে থাকলেন। তিনি অধ্যায়ের শিরোনাম অনুসারে কোন কোন হাদীসের অংশবিশেষ উল্লেখ করেন এবং অনেক স্থানে হাদীসকে বিভিন্ন সনদ ও মতন সহকারে কয়েকবারই উল্লেখ করেন যাতে অধিকসংখ্যক মাসায়েল অনুধাবন করা যায়। হাদীসের মতনগুলো থেকে যে মর্মার্থ তাঁর বুঝে আসতো তা তিনি বিভিন্ন অধ্যায়ে লিখেছেন এবং অধ্যায়সমূহের শিরোনাম লিখার ব্যাপারে মুসনাদ হাদীসসমূহ থেকে দলীল গ্রহণ করেছেন, চাই শিরোনামের সাথে এগুলোর সামঞ্জস্য যথাযথ হোক কিংবা আংশিক হোক অথবা কোন বৈশিষ্ট্যগত অর্থের দিক দিয়ে হোক কিংবা অন্য কোন পন্থায় হোক। অধ্যায়সমূহের শিরোনামে স্থান বিশেষে তিনি আল কুরআনের আয়াতও উদ্ধৃত করেছেন। আর আলোচ্য মাসআলার সমর্থনে মুয়াল্লাকাতও (সনদ উল্লেখ করা ছাড়া উল্লিখিত হাদীসমূহ) লিখেছেন ইলমে কালাম (আকাঈদ)-এর মাসায়েল এবং উসূল শাস্ত্রের বিষয়াদির ওপরও আলোচনা করেছেন। মোটকথা বিশুদ্ধ হাদীসসমূহের সাথে সাথে তাঁর কিতাবখানা সামগ্রিক ইলমের ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে।

ইমাম বুখারীর পূর্বে ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণ নিজ নিজ প্রণীত গ্রন্থের বুনিয়াদ বিষয়বস্তুর নিরিখে ফিকাহ সংক্রান্ত 'বাব' বা অনুচ্ছেদসমূহের ওপর স্থাপন করতেন কিংবা ইবাদতসমূহ কিংবা যুদ্ধবিগ্রহ কিংবা ক্রীতদাস কিংবা চিকিৎসা কিংবা আকাঈদ অথবা এগুলোর মধ্য থেকে কিছু কিছু কথাবার্তা লিপিবদ্ধ করতেন। সহীহুল বুখারীই প্রথম গ্রন্থ যা বিশুদ্ধ হাদীস লিপিবদ্ধ করা অপরিহার্য করে নেয়া এবং শর্তাবলীর ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও সমস্ত ইসলামী বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ। ওহীর সূচনা থেকে শুরু করে আকাঈদ, ইবাদত, মুয়ামালাত, সিয়ার (জীবনী), যুদ্ধ-বিগ্রহ, তাফসীর, ফাযায়েল, চিকিৎসা, আদাব, ক্রীতদাস প্রভৃতি ৫৪টি বিষয় এই গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক বিধানাবলীসহ দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাট বিষয়াদি এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়েছে। সহীহুল বুখারীর ভাষা অতীব উন্নতমানের। প্রখ্যাত ব্যাকরণবিদ আল্লামা রাদী শীয়ী (মৃত্যু হিজরী ৬৮৬ সন) বলেন, 'আরবী শিখতে হলে প্রথমে কুরআনুল হাকীম, অতঃপর সহীহুল বুখারী, অতঃপর হেদায়া পড়া চাই।'

সহীহ বুখারীর সর্বোচ্চ সনদ হলো "সুলালিয়াত” অর্থাৎ যেগুলোতে শুধু তিনজন বর্ণনাকারী বা মাধ্যম থাকেন। আর সর্বনিম্ন সনদ 'তিসইয়াহ' অর্থাৎ যেগুলোতে নয়জন বর্ণনাকারী বা মাধ্যম থাকেন। ইমাম বুখারী বাইশটি স্থানে 'বা'দুন্নাস' (কোন কোন ব্যক্তি)-এর খণ্ডন করেছেন। এই ধরনের স্থানসমূহের প্রতিটি স্থানেই ব্যক্তিবিশেষ উদ্দেশ্য নয়, বরং বিভিন্ন লোকই উদ্দেশ্য।

সহীহুল বুখারীর ব্যাপকতর অধ্যায়বিশেষের সংখ্যা ৯৮ এবং 'বাব' বা অনুচ্ছেদ-এর সংখ্যা ৩৪৫০। বারবার উল্লিখিত হাদীসসমূহ সহ সমস্ত মুসনাদ হাদীসের সংখ্যা হাফিয ইবনে হাজার (র)-এর গণনা মুতাবিক ৭৩৯৭। আর একাধিকবার উল্লিখিত হাদীসসমূহ বাদে এর সংখ্যা ২৪৬০। মুয়াল্লাকাত (সনদবিহীন উল্লিখিত) হাদীসের সংখ্যা ১৩৪১ যেগুলোর মধ্যে মাত্র ১৬০টি ব্যতীত অন্যগুলো সহীহর অন্যান্য স্থানে মুসনাদ আকারে রয়েছে। ১৬০টি হাদীসও হাফিয ইবনে হাজার অন্যান্য কিতাব থেকে মুসনাদ আকারে লিপিবদ্ধ করেছেন। মুতাবায়াত-এর সংখ্যা ৩৮৪। ইমাম বুখারী (র) থেকে সহীহুল বুখারী ৯০ হাজার লোক শুনেছেন। কিন্তু যাঁদের রেওয়ায়েত বহুল প্রচলিত তাঁরা মাত্র তিনজন। যথা: ১. হাফিয আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ ফারায়রী (মৃত্যু হিজরী ৩২০ সন), ২. হাফিয ইবরাহীম ইবনে মুয়াককাল (মৃত্যু হিজরী ২৯৪ সন) ও হাফিয হাম্মাদ ইবনে শাকির (মৃত্যু হিজরী ২৯০ সন)। প্রথমোক্ত মহান ব্যক্তি থেকে সহীহ রেওয়ায়েত অধিক প্রচার লাভ করেছে।

সহীহুল বুখারীর শরাহ বা ব্যাখ্যা গ্রন্থ ষাটেরও বেশি। হাফিয ইবনে হাজার (মৃত্যু হিজরী ৮৫৫ সন) রচিত ফাতহুল বারী, আইনী (মৃত্যু হিজরী ৮৫৫ সন) রচিত উমদাতুল কারী এবং কুসতুলানী (মৃত্যু হিজরী ৯২২ সন) রচিত ইরশাদুস সারী অধিক প্রসিদ্ধ। সহীহুল বুখারী ফারসী ও উর্দু ভাষাতেও অনূদিত হয়েছে। সম্প্রতি ইংরেজি ও বাংলা অনুবাদও প্রকাশিত হয়েছে। আসমাউর রিজাল-এর ওপর গ্রন্থাবলী লিখা হয়েছে। সেগুলো যাচাই বাছাই করা হয়েছে।

কুরআন হাকীমের পর সহীহুল বুখারী ব্যতীত আর কোন গ্রন্থের ওপর এতো বিপুল সংখ্যক বই লেখা হয়নি।

সহীহুল বুখারীর ওপর মাওলানা আহমদ আলীর টিকা অত্যন্ত চমৎকার ও মূল্যবান। সংক্ষিপ্ত হলেও আল্লামা হিন্দির টীকা উৎকৃষ্ট ও প্রয়োজনীয়।

অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে আল কুরআনের পর বিশুদ্ধতম কিতাব হচ্ছে সহীহুল বুখারী। এর ওপর হাশিয়া (পার্শ্ব টীকা ও পাদটীকা) লিখা হয়েছে। ইমাম বুখারী যাঁদের কাছ থেকে রেওয়ায়েত গ্রহণ করেছেন তাঁদেরকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করা যায়।

**প্রথম ভাগ:** এই ভাগে রয়েছেন তাবেঈন থেকে বর্ণনাকারী উস্তাদগণ। যেমন, হুমাইদী (র)। তিনি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ আনসারী তাবেঈ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

**দ্বিতীয় ভাগ:** এই ভাগে রয়েছেন এমন ব্যক্তি যাঁরা তাবেঈ যুগের লোক বটে, কিন্তু তাবেঈগণ থেকে রেওয়ায়েত করেন নি। যেমন আদম ইবনে উনাস প্রমুখ।

**তৃতীয় ভাগ:** এইভাগে রয়েছেন এমন ব্যক্তি যাঁরা শীর্ষস্থানীয় তাবে' তাবেঈন থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তাঁরা তাবেঈগণের সাক্ষাত পান নি। যেমন, সুলাইমান ইবনে জরব প্রমুখ।

**চতুর্থ ভাগ :** এইভাগে রয়েছেন এমন ব্যক্তিবর্গ যাঁরা ইমাম বুখারীর সমসাময়িক বা বয়সে কিছু বড়। যেমন, মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহইয়া প্রমুখ।

**পঞ্চম ভাগ:** এইভাগে রয়েছেন এমন মুহাদ্দিসগণ যাঁরা ইমাম বুখারীর ছাত্র বা ছাত্রতুল্য। যেমন, আবদুল্লাহ ইবনে হাম্মাদ প্রমুখ। ইমাম বুখারী বলেন, "ততক্ষণ পর্যন্ত কোন ব্যক্তি জ্ঞানী হবেন না যতক্ষণ না তিনি হাদীস রেওয়ায়েত করবেন সেই ব্যক্তি থেকে যিনি তাঁর বড়, সমকক্ষ বা তাঁর চেয়ে কম মর্যাদাবান।” আরেক বক্তব্যে ইমাম বুখারী বলেন, "কোন মুহাদ্দিস কামিল হতে পারেন না যদি না তিনি তাঁর থেকে শ্রেষ্ঠ, তাঁর সমতুল্য বা তাঁর চেয়ে কম মর্যাদাবান ব্যক্তি থেকে হাদীস লিপিবদ্ধ করেন।"

📘 হাদিস চর্চার ইতিহাস > 📄 ইমাম মুসলিম (র)

📄 ইমাম মুসলিম (র)


তাঁর নাম মুসলিম। উপনাম আবুল হাসান। উপাধি ছিলো আসাকিরুদ্দীন। মুসলিম ইবনে হাজ্জায ইবনে দারদ ইবনে কুশাদ আল কুশাইরী হাওয়াযিন গোত্রের লোক ছিলেন। তাঁর জন্মস্থান নিশাপুর। হিজরী ২০৪ সনে যেদিন ইমাম শাফিঈর ইন্তিকাল হয় ঐ দিনই ইমাম মুসলিম জন্মগ্রহণ করেন।

আঠারো বছর বয়সেই তিনি হাদীস শোনা শুরু করেন। হাদীস সংগ্রহের জন্য তিনি হিজায, সিরিয়া ও মিসর সফর করেন। তাঁর উস্তাদদের প্রখ্যাত কয়েকজন হচ্ছেন—ইমাম আহমাদ ইবনে ইসহাক ইবনে রাহয়িয়াহ কা'বিনা, ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহ্ইয়া, সাঈদ ইবনে মানসূর, যেহলী এবং ইমাম বুখারী। আবূ হাতেম, রাযী, তিরমিযী, ইবনে খুযাইমা এবং আবূ আওয়ানা তাঁর ছাত্র ছিলেন। ইমাম মুসলিম হাদীস লিপিবদ্ধ করতেন এবং হাদীস চর্চার জন্য আলোচনা মজলিসের ব্যবস্থা করতেন।

ইমাম মুসলিম উঁচু শ্রেণীর হাকিমে হাদীসের অন্যতম ছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনে বিশার বিন্দার বলেন, হাদীসের হাফিয চারজন : বুখারী, মুসলিম, দারেমী ও আবূ যুরআ।

ইমাম মুসলিমের নৈতিক মান অতি উঁচু পর্যায়ের ছিলো। জীবনে তিনি কারো গীবত করেন নি। কাউকে গালি দেননি। কাউকে প্রহার করেন নি।

তিনি সারাজীবন হাদীসের খিদমত করে গেছেন। হিজরী ২৫৯ সনের ২৫ রজব রোববার সন্ধ্যায় ৫৫ বছর বয়সে তিনি ইন্তিকাল করেন। তাঁকে তাঁর জন্মস্থান নিশাপুরে সমাহিত করা হয়।

বহু গ্রন্থ প্রণেতা ইমাম মুসলিমের সবচে' প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হচ্ছে সহীহ মুসলিম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00