📄 ইলমুল হাদীস
সকল প্রশংসা বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহ্ জন্য। আর সাইয়িদুল মুরসালিন, তাঁর পরিজন, তাঁর সাহাবী ও প্রকৃত অনুসারীদের প্রতি রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।
আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টি জগতে মানবজাতিকে বিবেক ও বুদ্ধিতে অন্য সকলের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা দান করেছেন। তিনি মানব জাতির আদি পিতা হযরত আদম (আ)-কে স্বীয় প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছেন এবং আদম সন্তানদেরকে সম্মান ও মর্যাদার আসন দান করেছেন। এই সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন, "নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানদেরকে সম্মানিত করেছি।"
আল্লাহ তা'আলা বিবেক ও বুদ্ধির চাহিদা অনুযায়ী তাদের প্রতি ঈমান ও আমলে সালিহ-র পাবন্দিকেও অপরিহার্য করে দিয়েছেন। আবার বিশেষ অনুগ্রহে মানবজাতির পথ প্রদর্শনের জন্য রাসূলদের পাঠিয়েছেন এবং তাঁদের প্রতি ওহী নাযিল করেছেন, তাঁদেরকে কিতাব দিয়েছেন এবং নবুওয়তের এই ধারাকে পূর্ণতা দান করেছেন সর্বশেষ নবী মুহাম্মদকে (সা) রাসূল হিসেবে প্রেরণ করে।
পাঁচশত একাত্তর খৃস্টাব্দের বাইশে এপ্রিল/বারই রবিউল আউয়াল সোমবার বসন্তের এক মনোরম পরিবেশে এ পৃথিবীর অঙ্গনে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আবির্ভাব ঘটে। চল্লিশ বছর বয়সে তিনি নবুওয়ত লাভ করেন। অতঃপর দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে তিনি মানবজাতিকে সত্যের পথে এগিয়ে আসার আহবান জানাতে থাকেন। মানব চরিত্রের সুন্দর ও পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের জন্য তাঁর প্রতি কুরআনুল করীমের আয়াত নাযিল হতে থাকে। দশম হিজরী সনে, রাসূলুল্লাহর বয়স যখন তেষট্টি বছর, আল্লাহ তা'আলা দীনের পরিপূর্ণতা দান করে ঘোষণা করলেন, "আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ পূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের জন্য আল ইসলামকে দীন হিসেবে মনোনীত করলাম।"-আল মায়িদাহ
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ওফাতের অর্থাৎ এগার হিজরী সনের রবিউল আউয়াল মাসের কিছুদিন আগে কুরআনুল করীমের নাযিল সমাপ্ত হয়। আল কুরআনের আলোকে জীবন অতিবাহিত করে রাসূলুল্লাহ (সা) চরিত্র ও আমলের উন্নততম উদাহরণ রেখে গেছেন দুনিয়াবাসীর অনুসরণের জন্য। সেই সম্পর্কেই মহান আল্লাহ বলেন, "তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মাঝে রয়েছে উসওয়াতুন হাসানাহ বা সর্বোত্তম নমুনা।"
আল্লাহ্র রাসূল (সা)-এর ইন্তিকালের পর খুলাফায়ে রাশিদীন এবং সাহাবীগণ তাঁর উপস্থাপিত দীনের দাওয়াত চালিয়ে যান। তাঁরা নবী করীম (সা)-এর বিভিন্নমুখী শিক্ষার সংরক্ষণ ও উপস্থাপনকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। তাবেঈগণ সাহাবায়ে কিরামের স্থলাভিষিক্ত হয়ে অনুরূপ দায়িত্ব পালন করেন।
সন্দেহাতীতভাবেই আল কুরআন সুরক্ষিত কিতাব। হাদীস ও সুন্নাহ্ তা-ই যাতে রয়েছে নবী করীম (সা)-এর বাণীসমূহ, জীবনাচার ও কর্মপদ্ধতির বিবরণ। কুরআন মজীদ নবী জীবনের শেষ ভাগেই পরিপূর্ণভাবে সংরক্ষিত রূপ লাভ করে। প্রথম শতাব্দীর শেষার্ধ এবং তাবেঈনদের মধ্যযুগ পর্যন্ত হাদীসগুলো কন্ঠ পরম্পরায় চলে আসছিলো। শিক্ষা আদান-প্রদানও মুখে মুখেই হতো। এরপর তা কাগজে লিপিবদ্ধ হতে থাকে। ফলে তা চিরদিনের জন্য সংরক্ষিত হয়ে যায়। এভাবে নিয়ম মাফিক লিপিবদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর এর নাম হয় ইলমুল হাদীস।
দীনের মৌলিকত্বের নিরিখে আল কুরআনের পরই হাদীসে নববীর স্থান। যে পবিত্র মুখ থেকে হিদায়াতের মূল উৎস কুরআনে হাকীম উচ্চারিত হয়েছে, সেই মুখ থেকেই নিঃসরিত হয়েছে আল হাদীস। পার্থক্য এখানে যে, কুরআন মজীদ প্রকাশ্য ওহী আর হাদীসে নববী অপ্রকাশ্য ওহী যা প্রকাশ্য ওহীর ব্যাখ্যা প্রদান করেছে।
আল্লাহর কিতাব এই দু'টো দিক "আল্লাহ্ তোমার প্রতি কিতাব ও হিকমাহ নাযিল করেছেন" এই বাণীর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। মহান আল্লাহ্ আল কুরআন অনুসরণের নির্দেশ দিয়ে বলেন, "তোমাদের রবের পক্ষ থেকে যা কিছু নাযিল হয়েছে তোমরা তার অনুসরণ কর।" অনুরূপভাবে তিনি এই নির্দেশও দিয়েছেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূলের জীবনে রয়েছে উসওয়াতুন হাসানা"; "যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করলো, সে আল্লাহ্রই আনুগত্য করলো", এবং "তোমরা আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহ্ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন।" শেষোক্ত আয়াতগুলো দ্বারা নবী (সা)-এর শিক্ষাকে অনুসরণ করারই নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এ জন্যই সাহাবায়ে কিরাম সর্বদা আল্লাহর কালামের সংরক্ষণ ও উপস্থাপনে তৎপর ছিলেন এবং নবী করীমের হাদীসসমূহের তালাশ ও প্রচারে চেষ্টারত থাকতেন। তাদের সম্পর্কে উমর ইবনে আবদুল আযীয (র) বলেন, "তাঁরা দীনের শিক্ষা বিস্তারের জন্য নিজের মাল ও জান উৎসর্গ করেছিলেন।"
নবী করীম (সা)-এর যামানায় কুরআন মজীদের পূর্ণাঙ্গ সংরক্ষণ সাহাবায়ে কিরামের লিখন ও স্মরণশক্তির উপর নির্ভরশীল ছিলো। অনুরূপভাবে হাদীসসমূহ সংরক্ষণের ব্যাপারটিও তাঁদের স্মরণশক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিলো।
আবূ বকর সিদ্দিক (রা)-এর শাসনামলে ইয়ামামার যুদ্ধে বহু সংখ্যক কুরআনের হাফিজ শহীদ হওয়ার কারণে কুরআন মজীদ সংরক্ষণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা দেখা দেয়। কুরআন মজীদের মূলকপি যা সহীফাকারে সংরক্ষিত ছিলো, কমই পাওয়া যেতো। সেই সময় কুরআন সংরক্ষণ মূলত কন্ঠস্থ রাখার ওপর নির্ভরশীল ছিলো। খুলাফায়ে রাশিদীন এবং সাহাবায়ে কিরামের প্রারম্ভিক যুগে বিশেষ তত্ত্বাবধানে তাঁরা কুরআনে হাকীম লিপিবদ্ধ করার মহান কাজ সম্পন্ন করেছিলেন। সাহাবায়ে কিরামের যুগের শেষ দিকে এবং শীর্ষস্থানীয় তাবেঈদের যুগে উমাইয়া খলিফা হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীযের অন্তরে নবী করীম (সা)-এর হাদীসসমূহ সংরক্ষণের প্রেরণা সৃষ্টি হয়। তিনি সারাদেশে হাদীস সংগ্রহের নির্দেশ জারি করেন। এই নির্দেশের ফলে ইসলামী দুনিয়ায় হাদীস সংগ্রহ ও হাদীস সংকলনের ধারা সৃষ্টি হয়। ক্রমশই তা সমৃদ্ধ হতে থাকে। চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতে বহু হাদীসগ্রন্থ প্রণীত হয়ে যায়।
তাবেঈদের যুগেই হাদীস গ্রন্থনার কাজ শুরু হয়। যেহেতু সুন্নাহ্ ও হাদীসসমূহ বিভিন্ন সূত্রে তাঁদের নিকট পৌঁছেছিলো সেজন্য হাদীস সংগ্রহের মাধ্যমসমূহ বর্ণনা ও লিপিবদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তাও দেখা দেয়। মাধ্যম সম্পর্কিত বিষয় হলো ইলমুল আসনাদ। কালক্রমে ইলমুল আসনাদ-এর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও হাদীস সংকলনের সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় তা আরো উন্নতি লাভ করে। আসমাউর রিজাল নামক বিষয়টিও বিকাশ লাভ করে।
হাদীসসমূহের বেশির ভাগ শুধু এক একজন কিংবা দু' দু'জন সাহাবীর মাধ্যমে তাবেঈরা লাভ করেন। আবার তাবে' তাবেঈরা তাবেঈদের এক একজন বা দু' দু'জন থেকে লাভ করেন। এ কারণে হাদীসসমূহের মধ্যে খুব কম সংখ্যক হাদীসই অকাট্যের মর্যাদা লাভ করেছে। পক্ষান্তরে গোটা কুরআন মজীদই মুতাওয়াতের পন্থায় (তিন যুগেই অসংখ্য বর্ণনাকারী কর্তৃক বর্ণিত) প্রমাণিত বলে তা গোটাটাই অকাট্য।
বর্ণনার নিয়ম ও বর্ণনাকারীর অবস্থাদির বৈচিত্র্য অনুসারে হাদীসসমূহ দু'ভাগে বিভক্ত: মকবুল ও গাইরে মকবুল। মকবুল (গ্রহণীয়) হাদীসসমূহকে গাইরে মকবুল (গ্রহণের অযোগ্য) হাদীসসমূহ থেকে পৃথক করার জন্য একটা সঠিক মাপকাঠি নির্ধারণের প্রয়োজন দেখা দেয়। এ জন্যই হাদীসবেত্তাগণকে ইলমে হাদীসে মৌলিক রীতিসমূহের দিকেও দৃষ্টি দিতে হয়। এ কারণে ইলমে হাদীস সংক্রান্ত বিষয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে শতাধিক। আর ইলমুল হাদীস একটি ব্যাপক ইসলামী বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আলফিয়ায়ে সুউতীতে ইলমুল হাদীসের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, “ইলমে হাদীস দু'টি নিয়মের অধীন, এর দ্বারা হাদীসের মতন ও সনদের অবস্থা জানা যায়।”
যেহেতু ইলমে হাদীসের বিষয়বস্তু সনদ ও মতন সেজন্য সনদ সম্পর্কে আলোচ্য বিষয়সমূহের নাম ইলমে রাওয়াতিল হাদীস; আর মতন সম্পর্কে আলোচিত বিষয়কে ইলমে দিরাইয়াতিল হাদীস বলা হয়।
📄 ইলমুল হাদীসের ইতিহাস
হাদীসের ইতিহাস বলতে হাদীসের প্রচার, প্রসার ও হাদীসশাস্ত্র প্রণয়নের বিভিন্ন যুগকেই বোঝায় যা নবী করীম (সা)-এর যামানা থেকে এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। এসব যুগের বিভিন্নতার ভিত্তিতে আমরা হাদীসশাস্ত্রের ইতিহাসকে বিভিন্ন যুগে ভাগ করতে পারি।
প্রথম যুগ এই যুগে হাদীসবেত্তাগণ হাদীসসমূহকে কাগজে লিপিবদ্ধ করার চাইতে স্মৃতিপটে সংরক্ষণ করতেন বেশি। তাঁরা হাদীসসমূহের মৌখিক প্রচার-প্রসারে ব্যস্ত ছিলেন।
দ্বিতীয় যুগ এই যুগ থেকেই হাদীসসমূহ সংকলন ও সম্পাদনার কাজ শুরু হয়। এরপর থেকেই হাদীসশাস্ত্র যথেষ্ট উন্নতি লাভ করে।
তৃতীয় যুগ এই যুগে হাদীসের কিতাবসমূহ প্রণয়নের ক্ষেত্রে চরম উন্নতি সাধিত হয়। এতে হাদীস ও হাদীসশাস্ত্রের পৃথক পৃথক বিষয় সম্বলিত কিতাবাদি প্রণীত হতে থাকে। সহীহ ও নির্ভরযোগ্য হাদীস সংকলন করার দিকে মুহাদ্দিসগণ মনোযোগ দেন। দুর্বল হাদীস ও বিশুদ্ধ হাদীসসমূহের মধ্যে পার্থক্য নিরূপিত হতে থাকে।
চতুর্থ যুগ এই যুগে হাদীসসমূহকে সুবিন্যস্ত করা, মার্জিত রূপ দান করা এবং হাদীস ব্যাখ্যা করার কাজ শুরু হয়। উল্লেখ্য যে, এসব যুগে ইলমে আসমাউর রিজাল (চরিত অভিধান), ইলমে উসূলে হাদীস (হাদীসের মূলনীতি) এবং ইলমুল হাদীসের অন্যান্য কিতাব প্রণীত হয়।