📄 সাধারণ গ্রন্থাবলী
এ শ্রেণীতে রয়েছে সেসব গ্রন্থ যেখানে সকল বর্ণনাকারীর বা কমপক্ষে সেসব গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনাকারীর জীবন বৃত্তান্ত আলোচনা করা হয়েছে যাদের ব্যাপারে সকলক্ষণ অবগত হওয়া গিয়েছিলো। এ বিষয়ের ওপর লিখিত প্রাচীন গ্রন্থাবলীর অধিকাংশ এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। এ পদ্ধতি অনুসারে হিজরী তৃতীয় শতকে মুহাম্মাদ ইবনু সা'দ-এর তাবাকাতু, ইতিহাস বিষয়ে ইমাম বুখারীর তিনটি গ্রন্থ, আহমাদ ইবনু আবী খাইছামার ইতিহাস ও রিজাল শাস্ত্রের আরো অনেক গ্রন্থ রচনা করা হয়েছিল যা সংক্ষেপে বিবৃত হলো。
তাবাকাতু ইবনি সা'দ
এ বিষয়ে সর্বপ্রাচীন যে গ্রন্থটি আমাদের নিকট পৌঁছেছে তা হলো ইবনু সা'দ-এর লেখা কিতাবুত তাবাকাতিল কাবীর। বিখ্যাত মুহাদ্দিস আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাসের পরিবারের বাযীলনীয় গোলামদের এক পরিবারে আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু সা'দ ইবনু মুনী' যুহরী জন্মগ্রহণ করেন। ইবনু আব্বাসের পরিবার তাদেরকে মুক্ত করে দিয়েছিল। হাদীস শিক্ষার বিখ্যাত কেন্দ্র বসরার জন্মগ্রহণ করা ইবনু সা'দ হাদীস শাস্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং কুফা ও মক্কা ভ্রমণ করে মদিনায় গিয়ে দীর্ঘদিন অবস্থান করেন। পরিশেষে তিনি যখন তৎকালীন সময়ের বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু বাগদাদে আসেন, তখন তিনি অন্যতম আরব ইতিহাসবিদ ওয়াকিদীর জ্ঞানকর্মের ব্যক্তিগত সহকারী হওয়ার অনন্য সুযোগ পেয়ে যান। তিনি এতো দীর্ঘ সময় ধরে এ কাজ চালিয়ে যান যে, পরিশেষে তাঁকে 'কাতিবুল ওয়াকিদী' (ওয়াকিদীর সহকারী) উপাধি দেয়া হয়েছিল। এ উপাধিতেই তিনি সাধারণ পরিচিতি লাভ করেন।
পরিশেষে বাগদাদে একজন ইতিহাসবিদ ও হাদীস বিশারদ হিসেবে ইবনু সা'দ-এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ায় একদল ছাত্র আকৃষ্ট হন এবং তার নিকট হাদীস ও ইতিহাস অধ্যয়ন করেন। সেসব প্রখ্যাত ছাত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ বালাযুরী যিনি তার জীবনের শেষ দিকে বিখ্যাত গ্রন্থ ফুতুহুল বুলদান রচনার ক্ষেত্রে। ইবনু সা'দ থেকে প্রচুর সহযোগিতা নিয়েছেন। ইবনু সা'দ ২৩০ হিজরী/৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।[৪]
ইবনু সা'দের কিতাবু আখবারিন নাবী গ্রন্থটি মূলত তার প্রধান গ্রন্থ তাবাকাত এর একটি অংশ মাত্র। গ্রন্থকার নিজেই তার সঙ্কলন সম্পন্ন করেছিলেন, তবে পরবর্তী প্রজন্মের সামনে এ বইটি হাজির করেছেন তারই ছাত্র হারিছ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আবী উসামাহ (৮০২-৮৯৬)।
তাবাকাত গ্রন্থের পরিকল্পনা ও সঙ্কলনের পুরো কাজটি করেছেন ইবনু সা'দ নিজেই, তবে তিনি তা সম্পন্ন করতে পারেননি। এ গ্রন্থে তিনি যা কিছু লিখেছেন তার সবটুকুই তিনি তার ছাত্র হুসাইন ইবনু ফাহম (৮২৬-৯০১)-এর সামনে পাঠ করে শুনিয়েছেন, আর হুসাইন তা লিখে নিয়েছেন। বর্ণিত আছে যে, হুসাইন ছিলেন হাদীস শাস্ত্র ও বর্ণনাকারীদের জীবনচরিতের একজন উৎসুক শিক্ষার্থী।[৫] ইবনু ফাহম গ্রন্থটিকে গ্রন্থকারের পরিকল্পনা অনুসারে সম্পন্ন করেন এবং এর সাথে কিছু সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত সংক্রান্ত তথ্য যোগ করে দেন। তাছাড়া এ গ্রন্থে তিনি আরো এমন কতিপয় বর্ণনাকারীর জীবনচরিত সন্নিবিষ্ট করে দিয়েছেন যাদের নাম ইবনু সা'দ ইতোপূর্বে তার গ্রন্থের সাধারণ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। গ্রন্থটি তিনি তার নিজের ছাত্রদেরকেও পড়ে শোনান।[৬]
আসমাউর রিজাল শাস্ত্রের প্রাচীনতম গ্রন্থসমূহের অন্যতম হলো ইবনু সা'দের তাবাক্কাত; এতে হাদীসের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনাকারীদের অধিকাংশের জীবনচরিত সংক্রান্ত তথ্য স্থান পেয়েছে। এ গ্রন্থটি হলো ইসলামের প্রাথমিক যুগের ইতিহাসের বিভিন্ন দিক সম্পর্কিত মূল্যবান তথ্যের একটি সমৃদ্ধ আকর। এটিকে শুধু এ বিষয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবেই আখ্যায়িত করা যায় না, এটি সাধারণভাবে সমগ্র আরবি সাহিত্যের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাবলীরও অন্যতম। হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর শুরু থেকে নিয়ে বিপুল সংখ্যক লেখক আরব্য ইতিহাস ও জীবনচরিত রচনার ক্ষেত্রে এটিকে একটি উৎস হিসেবে ব্যাবহার করেছেন। বালাযুরী, তাবারী, খতীব বাগদাদী, ইবনুল আসীর, নববী ও ইবনু হাযার। এদের সকলেই নিজেদের গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছেন; আর সুয়ূতী এ গ্রন্থের একটি সংক্ষিপ্তসার রচনা করেছেন। হাদীস বর্ণনাকারীদের জীবনচরিত সংক্রান্ত একটি সাধারণ অভিধান হিসেবে এটি আসমাউর রিজাল শাস্ত্রে একটি অনন্য স্থান দখল করে আছে। তাবাক্বাত শ্রেণীর অন্যান্য গ্রন্থে শুধু বিশেষ শ্রেণীর বর্ণনাকারীদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।[৭]
ইমাম বুখারীর কিতাবুত তারীখ
ইবনু সা'দের তাবাক্কাত-এর কিছুদিন পর রচিত হয় ইমাম বুখারীর গ্রন্থাবলী। তিনি বলেছিলেন যে, যে ৩,০০,০০০ হাদীস তিনি মুখস্থ করেছেন তার প্রত্যেকটি বর্ণনাকারীর জীবনচরিত সংক্রান্ত তথ্য তার নিকট রয়েছে। তিনি বর্ণনাকারীদের ইতিহাসের ওপর তিনটি সাধারণ গ্রন্থ রচনা করেছেন। তন্মধ্যে সর্ববৃহৎ গ্রন্থটিতে চল্লিশ হাজারেরও বেশি বর্ণনাকারীর জীবনচরিত সংক্রান্ত তথ্য রয়েছে। তবে এ গ্রন্থটির পূর্ণাঙ্গ কোনো পাণ্ডুলিপি অদ্যাবধি টিকে আছে বলে জানা যায় না। কিছু কিছু গ্রন্থাগারে শুধু এর বিভিন্ন অংশ সংরক্ষিত রয়েছে; আর এগুলোর ভিত্তিতে ভারতের হায়দ্রাবাদের দা-ইরাতুল মাআরিফ গ্রন্থটির একটি সংস্করণ তৈরী করে প্রকাশ করেছে।
টিকাঃ
[৪] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১৭২-৩।
[৫] তারীখু বাগদাদ, খণ্ড ৮, পৃ, ৯২।
[৬] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১৭৩।
[৭] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১৭৮।
📄 বিশেষ গ্রন্থাবলী
বিশেষ গ্রন্থ দ্বারা মূলত এমন গ্রন্থকে বুঝানো হয় যেখানে কেবল বর্ণনাকারীদের বিশেষ দল, পটভূমি বা যুগ নিয়ে আলোচনা করা হয়। সাধারণ জীবনচরিতমূলক অভিধানসমূহ রচিত হওয়ার প্রায় সমসাময়িক যুগেই এসব বিশেষায়িত জীবনচরিতমূলক অভিধানসমূহ লেখা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থসমূহ হলো
* সাহাবীদের জীবনচরিত সম্বলিত গ্রন্থাবলী;
* সেসব বর্ণনাকারীর জীবনচরিত সম্বলিত গ্রন্থাবলী যারা কোনো বিশেষ শহর বা প্রদেশে বসবাস কিংবা ভ্রমণ করেছেন;
* আইনবিদদের বিভিন্ন দলের অন্তর্ভুক্ত বর্ণনাকারীদের জীবনবৃত্তান্ত সমৃদ্ধ গ্রন্থাবলী।
সাহাবীদের জীবনচরিত সম্বলিত গ্রন্থাবলী
আসমাউর রিজাল এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখল করে আছে এসব গ্রন্থ। তবে হিজরী তৃতীয় শতকের পূর্বে এ বিষয়ের ওপর কোনো স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করা হয়েছে বলে মনে হয় না। হিজরী তৃতীয় শতকে সর্বপ্রথম ইমাম বুখারী সাহাবীদের জীবনচরিতের ওপর একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেন; আর এ গ্রন্থটি লেখা হয়েছিল প্রধানত এসব গ্রন্থের ভিত্তিতে, (ক) সীরাত সাহিত্য; (খ) ইসলামের প্রাথমিক যুগের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীকে কেন্দ্র করে লিখিত পাণ্ডিত্যপূর্ণ গ্রন্থাবলী; (গ) সাহাবীদের জীবনচরিত সমৃদ্ধ বিপুল সংখ্যক হাদীস এবং আসমাউর রিজাল সংক্রান্ত প্রাথমিক যুগের সাধারণ গ্রন্থাবলী।
ইসলামের ইতিহাসের পরবর্তী যুগে অসংখ্য লেখক ইমাম বুখারীকে অনুসরণ করে এ বিষয়ে প্রচুর গ্রন্থ রচনা করেছেন। আবু ইয়া'লা আহমাদ ইবনু আলী (২০১-৩০৭/৮১৬-৯১৯), বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও অনুলিপিকার আবুল কাসিম আব্দুল্লাহ বাগাভী (৮২৮-৯২৯), ইবনু শাহীন নামে পরিচিত আবু হাফস উমার ইবনু আহমাদ (৯০৯-৯৯৫) – যিনি ছিলেন তার সময়ের বিপুল সংখ্যক গ্রন্থ প্রণেতাদের অন্যতম (যিনি শুধু কালির পেছনেই ৭০০ দিরহাম খরচ করেছিলেন), আবু আব্দিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াহইয়া ইবনু মানদা (মৃত্যু ৩০১/৯১৩), অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস আবু নুয়াইম আহমাদ ইবনু আব্দিল্লাহ (৯৪৭–১০১২), খতীব বাগদাদীর সমসাময়িক কর্ডোবার ইবনু আব্দিল বার-যিনি ছিলেন তার সময়ে (মুসলিম বিশ্বের) পশ্চিমাঞ্চলের সর্বশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, আবু মূসা মুহাম্মাদ ইবনু আবী বাক্স (৫০১-৫৮১/১১০৭-১১৮৫) ও আরো অসংখ্য লেখক সাহাবীদের জীবনচরিত বিষয়ে বিপুল পরিমাণ গ্রন্থ রচনা করেছেন। [৮]
ইবনুল আসীরের উসুদুল গাবাহ
হিজরী সপ্তম শতকে বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ও মুহাদ্দিস ইজ্জুদ্দীন ইবনুল আসীর (৫৫৫-৬৩০/১১৬০-১২৩০) তার উসুদুল গাবাহ নামক গ্রন্থে উপরোল্লিখিত সকল বিশেষজ্ঞের গবেষণার সারনির্যাস একত্রিত করে দিয়েছেন; এ গ্রন্থের প্রধান ভিত্তি হলো ইবনু মানদা, আবু নুয়াইম, আবু মূসা ও ইবনু আব্দিল বার-এর গ্রন্থাবলী। ইবনু আব্দিল বারের আল ইস্তিয়াব গ্রন্থে মাত্র তিন শ' সাহাবীর জীবনচরিত স্থান পেয়েছে; ইবনু ফাতহুন এ গ্রন্থের যে সম্পূরক রচনা করেছেন তাতে প্রায় সমসংখ্যক সাহাবীর জীবন বৃত্তান্ত স্থান পেয়েছে। তবে ইবনুল আসীর তার উৎস গ্রন্থসমূহকে অন্ধভাবে অনুসরণ করেননি।
ইবনুল আসীর উসুদুল গাবা'র ভূমিকায় প্রধান উৎসসমূহের পাশাপাশি তার গ্রন্থের সাধারণ বিন্যাস আলোচনা করার পর 'সাহাবা' পরিভাষাটিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন, নাবী-এর জীবনীর ওপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করেছেন এবং বর্ণনানুক্রমে ৭,৫৫৪ জন সাহাবীর জীবনচরিত তুলে ধরেছেন; কতিপয় ব্যক্তির সাহাবী হওয়ার বিষয়টিকে তিনি তার স্বতন্ত্র গবেষণার মাধ্যমে আবিষ্কার করেছেন। বিভিন্ন নিবন্ধে তিনি সাধারণত সাহাবীদের নাম, উপাধি, বংশ লতিকা ও তাদের জীবন বৃত্তান্ত সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করেছেন। কোনো বিষয়ে তিনি তার উত্তরসূরীদের সাথে ভিন্ন মত পোষণ করলে, তিনি বিষয়টি নিয়ে বিস্তৃত পরিসরে আলোচনা করে নিজের সমর্থনে যুক্তি প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন এবং তার পূর্বসূরীদের ভুলের কারণসমূহ ব্যাখ্যা করেছেন। প্রচুর পুনরাবৃত্তি থাকা সত্ত্বেও উসুদুল গাবাহ গ্রন্থটি সাধারণভাবে সমাদৃত হয়েছে এবং মুহাদ্দিসগণ এটিকে এ বিষয়ের একটি নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে মেনে নিয়েছেন। ইমাম নববী, যাহাবী, কুশাইরী ও সুয়ূতী প্রমুখ জীবনীকারগণ ইবনুল আসীরের এ গ্রন্থের সারাংশ তৈরী করেছেন।[৯]
ইবনু হাযারের আল ইসাবাহ ফী তাময়ীজিস সাহাবাহ
উসুদুল গাবাহ-এর পর হিজরী নবম শতকে এ বিষয়ে আরো ব্যাপক ভিত্তিক একটি গ্রন্থ রচিত হয়; আর তা হলো আল ইসাবাহ ফী তাময়ীজিস সাহাবাহ। এর রচয়িতা শিহাবুদ্দীন আবুল ফজল ইবনু আলী ইবনু হাযার আসকালানী (৭৭৩-৮৫২/১৩৭১-১৪৪৮) ছিলেন তার সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক। তিনি প্রাচীন কায়রোতে ৭৭৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। শিশুকালেই তিনি তার মাতা ও পিতা (যিনি ছিলেন একজন আইনবিদ)-কে হারান। তার এক ব্যবসায়ী আত্মীয়ের তত্ত্বাবধানে তিনি লালিত পালিত হন। কিন্তু প্রকৃতি এ অনাথ শিশুটিকে দিয়েছিল শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য ও উদ্দেশ্য সাধনে নাছোড়বান্দার মতো পড়ে থাকার বিপুল ক্ষমতা। পথ অত্যন্ত বন্ধুর হওয়া সত্ত্বেও জ্ঞান সাধনার লক্ষ্যে তিনি ছিলেন অবিচল; আর এর ফলে অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে তিনি আরবি ভাষা ও সাহিত্যের পাশাপাশি ইসলামী জ্ঞানের সবক'টি শাখা ও আরবি লিপিকলায় প্রভূত জ্ঞান অর্জন করেন। বিশেষত হাদীসের জন্য তিনি তার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় করেন। এতদুদ্দেশ্যে তিনি প্রখ্যাত মুহাদ্দিস যাইনুদ্দীন ইরাকী (৭২৫-৮০৬/১৩৫১-১৪০৪)-এর নিকট টানা দশ বছর পড়ে থাকেন যিনি ইমলা (জোরে জোরে পাঠ করে ছাত্রদেরকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়া) শীর্ষক প্রাচীন পদ্ধতিকে হাদীস শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে পুনরায় প্রয়োগ করেছিলেন এবং হাদীস অধ্যয়নের পুরনো ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে এনেছিলেন। অধ্যয়ন শেষে ইবনু হাযার ১৪০৩ সালে কায়রোতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন এবং হাদীস ও তৎসংশ্লিষ্ট শাখার সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। তার সমকালীন বিশেষজ্ঞগণ মুহাদ্দিস হিসেবে তার কর্তৃত্বকে মেনে নিয়েছিলেন এবং বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাকে হাদীসের অধ্যাপক নিযুক্ত করা হয়েছিল। তিনি বিচারক পদেও দায়িত্ব পালন করেছেন, অবশ্য কয়েকবার প্রত্যাখ্যান করার পর তিনি এ পদ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ৮৫২/১৪০৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি প্রায় ১৫০টি সম্পূর্ণ ও অসম্পূর্ণ রচনা ও সঙ্কলন রেখে গিয়েছেন—যা তার বহুমুখী প্রতিভার স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে আছে।
সহীহ বুখারীর ওপর তার ফাতহুল বারী শীর্ষক ভাষ্যটির বর্ণনায় বলা হয় যে, ইমাম বুখারীর শ্রেষ্ঠ কীর্তিটির প্রতি মুসলিম বিদ্বানদের যে ঋণ বিগত ছয়শ' বছরে পুঞ্জীভূত হয়েছিল ফাতহুল বারীর মাধ্যমে তা পরিশোধ করা হয়েছে।[১০]
সাহাবীদের জীবন বৃত্তান্ত নিয়ে পূর্ববর্তী লেখকগণ যা কিছু লিখেছিলেন ইবনু হাযার তার আল ইসাবাহ ফী তাময়ীজিস সাহাবাহ গ্রন্থে তার সবগুলোর সারনির্যাস তুলে ধরেছেন; কিছু কিছু ক্ষেত্রে তিনি তাদের সমালোচনা করে তাদের তথ্যের সাথে স্বীয় গবেষণার ফলাফল যোগ করে দিয়েছেন। তিনি তার গ্রন্থকে চার ভাগে বিভক্ত করেছেনঃ
প্রথম ভাগ, সেসব ব্যক্তির বর্ণনা যাদেরকে কোনো বিশুদ্ধ বা চলনসই বা দুর্বল হাদীসে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাহাবী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় ভাগ, সেসব ব্যক্তির বর্ণনা যারা নাবী -এর ইন্তেকালের সময় খুব ছোট ছিলেন, তবে নাবী -এর জীবদ্দশাতেই সাহাবীদের পরিবারে তাদের জন্ম হয়েছিল যার ফলে এ ধারণা সৃষ্টি হয় যে, তারা সাহাবী হওয়ার প্রয়োজনীয় শর্তাবলী পূরণ করেছেন।
তৃতীয় ভাগ, সেসব ব্যক্তির বর্ণনা যাদের ব্যাপারে জানা যায় যে, তারা ইসলামের আগমনের পূর্বে ও পরে জীবিত ছিলেন, তবে তারা কখনো নাবী -এর সাহচর্য পেয়েছেন কি না—তা জানা যায় না। এসব ব্যক্তি কখনো সাহাবী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেননি, কিন্তু সাহাবীদের জীবনচরিত সংক্রান্ত কিছু কিছু গ্রন্থে তাঁদের আলোচনা করা হয়েছে নিছক এ কারণে যে, সাহাবীদের যুগে তাঁরা জীবিত ছিলেন।
চতুর্থ ভাগ, এ অংশে সেসব ব্যক্তিদের জীবনচরিত আলোচনা করা হয়েছে যাদেরকে কিছু কিছু গ্রন্থে ভুলক্রমে সাহাবী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।[১]
বিশেষ শহর বা প্রদেশে ভ্রমণ বা বসবাসকারী হাদীস বর্ণনাকারীদের চরিতাভিধান
বিশেষ শহর বা প্রদেশে ভ্রমণ বা বসবাসকারী হাদীস বর্ণনাকারীদের জীবনচরিতের ওপর বিপুল পরিমাণ গ্রন্থ রচনা করা হয়েছে। এ ধরনের অভিধানের সংখ্যা অনেক। শুধু সকল প্রদেশই নয়, বরং প্রায় প্রত্যেকটি শহরে বেশ কয়েকজন জীবনীকার ছিলেন যারা গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যেক মুহাদ্দিস বা সাহিত্যিকের জীবনচরিত লিপিবদ্ধ করেছেন যারা সেসব শহরে বসবাস কিংবা ভ্রমণ করেছেন। মক্কা, মদীনা, বসরা, কুফা, ওয়াসিত, দামেশক, এন্টিওক, আলেকজান্দ্রিয়া, কাইরাওয়ান, কর্ডোবা, মসুল, আলেপ্পো, বাগদাদ, ইস্পাহান, বুখারা ও মারভ প্রভৃতি অঞ্চলের প্রত্যেকটিতে ছিল অসংখ্য ইতিহাসবিদ ও জীবনীকার যারা স্থানীয় বিদ্বান ব্যক্তিদের জীবনী লিপিবদ্ধ করেছেন।
এসব প্রাদেশিক ইতিহাসবিদদের অনেকেই সেসব প্রদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁদের কারো কারো প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল সাধারণভাবে সেসব এলাকার বিদ্বান ব্যক্তি ও বিশেষত মুহাদ্দিস ও হাদীস বর্ণনাকারীদের জীবন বৃত্তান্ত তুলে ধরা। প্রথম দিকের জীবনচরিত সংক্রান্ত যেসব অভিধানে মুসলিমদের মাধ্যমে সেসব এলাকা বিজিত হওয়ার পর থেকে সঙ্কলকদের যুগ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম বিশেষজ্ঞদের জীবন বৃত্তান্ত আলোচনা করা হয়েছে, সেসব গ্রন্থের অনেকগুলোর ওপর পরবর্তী যুগের লেখকগণ সম্পূরক গ্রন্থ রচনা করেছেন; এসব গ্রন্থে পরবর্তী যুগ থেকে শুরু করে প্রায় আধুনিক যুগ পর্যন্ত সময়কার প্রখ্যাত বিদ্বান ব্যক্তিবর্গের জীবন বৃত্তান্ত স্থান পেয়েছে।[২]
খতীব বাগদাদীর তারীখু বাগদাদ
এ ধরনের গ্রন্থাবলীর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটি হলো খতীব বাগদাদীর তারীখু বাগদাদ। বিরাটকায় শহরসমূহে যেসব বিদ্বান ও মুহাদ্দিস জন্মগ্রহণ বা পাঠদান করেছেন তাদের জীবন বৃত্তান্তের ওপর যেসব গ্রন্থ রচিত হয়েছে তন্মধ্যে তারীখু বাগদাদ গ্রন্থটি সর্বপ্রাচীন।
খতীব বাগদাদী—যার পুরো নাম ছিল আবু বাক্ আহমাদ ইবনু আলী—ছিলেন বাগদাদের নিকটবর্তী এক গ্রামের খতীবের পুত্র। তিনি ৩৯২ হিজরী/১০০২ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১১ বছর বয়স থেকে হাদীস অধ্যয়ন করতে শুরু করেন; এ প্রক্রিয়ায় তিনি মেসোপটেমিয়া, সিরিয়া, আরব ও পারস্যের বিভিন্ন শিক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। খতীব ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায়, বিশেষত আসমাউর রিজাল ও হাদীস শাস্ত্রে, ব্যাপক ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তিনি দামেশক, বাগদাদ ও অন্যান্য এলাকার শিক্ষা কেন্দ্রসমূহে পাঠদান করেন এবং তার কতিপয় শিক্ষক (যেমন আযহারী ও বারক্বানী) তাকে হাদীস শাস্ত্রের একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তি হিসেবে মেনে নিয়ে তার নিকট থেকে হাদীসের পাঠ গ্রহণ করেন। পরিশেষে তিনি বাগদাদে বসতি স্থাপন করেন; সেখানে খলিফা ক্বা'ইম ও তার মন্ত্রী ইবনু মাসলামাহ (মৃত্যু ১০৫৮) হাদীস শাস্ত্রে খতীব বাগদাদীর পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি প্রদান করেন। এরা এ মর্মে নির্দেশ জারি করেছিলেন যে, কোনো বক্তা তার বক্তৃতায় এমন কোনো হাদীস বর্ণনা করতে পারবেন না যা খতীব বাগদাদী দ্বারা অনুমোদিত হয়নি। বাগদাদে তিনি তার প্রায় সবগুলো বই স্বীয় ছাত্রদের সামনে পাঠ করে শুনিয়েছেন। তিনি ৪৬৩/১০৭১ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
বাসাসীরীর (১০৫৮) বিদ্রোহের পূর্ব পর্যন্ত বাগদাদে খতীবের জীবন একেবারে ঘটনাবিরল ছিল না। সেই বিদ্রোহে খতীবের পৃষ্ঠপোষক ইবনু মাসলামাহ নিহত হন। বিদ্রোহী ও তার সমর্থকদের হাতে খতীবকে যথেষ্ট ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়। পরিশেষে তিনি বাগদাদ ছেড়ে কিছুদিন সিরিয়ায় ঘুরে বেড়াতে বাধ্য হন। ৪৫১ সালে আসাসীরীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি বাগদাদে ফিরে আসেননি। তাকে হানবালিদের হাতেও কষ্ট ভোগ করতে হয়, কারণ তিনি হানবালি মাযহাব ছেড়ে শাফিয়ী মাযহাবে যোগ দিয়েছিলেন। তাছাড়া এ নিগৃহীত হওয়ার পেছনে আশ'আরী ও সূক্ষ্ম তর্কে পারদর্শী দার্শনিকদের প্রতি তার উদার দৃষ্টিভঙ্গীও দায়ী ছিল। তার বিরুদ্ধে হানবালি তাত্ত্বিকরা যেসব পুস্তিকা রচনা করেছেন হাজী খলিফা তা উল্লেখ করেছেন। তবে খতীব তার সব ক'টি মহৎ ইচ্ছে পূরণ করার সৌভাগ্য লাভ করেন—যেমন • বাগদাদ শহরে স্বীয় ছাত্রদের সামনে তার বিখ্যাত গ্রন্থ বাগদাদের ইতিহাস পাঠ করে শোনানো[৪]; ও * (মৃত্যুর পর) বিশর হাফী (৭৬৭-৮৪১ সাল) এর কবরের পাশে শায়িত হওয়া।[৫]
খতীব ৫৬টি ছোট বড় গ্রন্থ ও পুস্তিকা সঙ্কলন করেছেন; ইয়াকৃত তার মু'জামুল উদাবা গ্রন্থে সেসব গ্রন্থের একটি তালিকা প্রদান করেছেন। তন্মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটি হলো তার তারীখু বাগদাদ। এ অমর কীর্তিতে—যা তিনি ৪৬১ হিজরীতে তার ছাত্রদের সামনে পাঠ করে শুনিয়েছিলেন—বাগদাদ, রুসাফা ও মাদাইন (টেসিফোন)-এর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের বিবরণ দিয়ে খতীব ৭,৮৩১ জন প্রখ্যাত পুরুষ ও নারী (প্রধানত হাদীস বিশারদ)-দের জীবন বৃত্তান্ত আলোচনা করেছেন যারা বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেছেন কিংবা অন্যান্য অঞ্চল থেকে বাগদাদে এসে হাদীসের ওপর পাঠদান করেছেন। তিনি কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরও বিবরণ দিয়েছেন যারা বাগদাদ শহর পরিদর্শন করেছিলেন। এ গ্রন্থে সেসব ব্যক্তির নাম, কুনিয়াহ (বংশীয় উপাধি), মৃত্যুর তারিখ ও জীবনচরিত সংক্রান্ত অন্যান্য তথ্য উল্লেখ করার পাশাপাশি তাদের নির্ভরযোগ্যতা প্রসঙ্গে প্রখ্যাত হাদীস বিশারদগণ যেসব মতামত দিয়েছেন তিনি তা তুলে ধরেছেন।
খতীব বিভিন্ন নিবন্ধ বিন্যাস করার ক্ষেত্রে সাহাবীদেরকে সবচেয়ে গৌরবজনক স্থান দিয়েছেন। তারপর সেসব ব্যক্তির আলোচনা করেছেন যাদের নামে মুহাম্মাদ রয়েছে। অন্যান্য নিবন্ধগুলোকে তিনি বর্ণানুক্রম অনুসারে সাজিয়েছেন। নারী ও কুনিয়াহ দ্বারা পরিচিত ব্যক্তিদের নিবন্ধগুলোকে শেষের দিকে স্থান দেয়া হয়েছে। এ গ্রন্থে হাদীস ও আসমাউর রিজাল শাস্ত্রে খতীব তার বিপুল জ্ঞানের পরিচয় প্রদান করার পাশাপাশি তার নিরপেক্ষতা ও সমালোচনামূলক ধীশক্তিরও বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। তিনি সবসময় তথ্যের উৎস উল্লেখ করেছেন এবং প্রায়শ (নিজস্ব মন্তব্য অংশে) উদ্ধৃত হাদীস ও যেসব বর্ণনা তিনি গ্রহণ করেছেন তার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। কোনো পূর্বচিন্তা বা পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই তিনি সত্য উদঘাটনের চেষ্টা চালিয়েছেন।[৬]
খতীব ইমাম আহমাদ ও শাফিয়ীকে যথাক্রমে 'শ্রেষ্ঠ হাদীস বিশারদ' ও 'আইনবিদ সম্রাট' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এ জন্য তাকে সমালোচিত হতে হলেও এসব উপাধিকে পক্ষপাতদুষ্ট মনে হয় না। তিনি সাধারণভাবে একজন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে সমাদৃত। তিনি ছিলেন তার সময়ে প্রাচ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ হাদীস বিশারদ; যেমনিভাবে তার সমসাময়িক কর্ডোবার ইবনু আব্দিল বার ছিলেন সে সময়ে পাশ্চাত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ হাদীস বিশারদ।[৭]
খতীবের গ্রন্থে যেসব ভুক্তি রয়েছে তা ৪৫০ হিজরী পর্যন্ত সময়কার। তার ইন্তেকালের পর তার উত্তরসূরীগণ এ গ্রন্থটির প্রবৃদ্ধি সাধনের কাজ অব্যাহত রেখেছিলেন। সাম'আনী (৫০৬-৫৬২/১১১৩-১১৬৭), দুবাইছী (৫৫৮-৬৩৭/১১৬৩-১২৩৯), ইবনুন নাজ্জার (৫৭৮-৬৪৩/১১৮৩-১২৪৫) ও অন্যান্য লেখকবৃন্দ তারীখু বাগদাদ-এর সম্পূরক গ্রন্থ রচনা করেছেন। সেসব গ্রন্থে তারা স্ব স্ব সময় পর্যন্ত বাগদাদের প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গের জীবনচরিত সঙ্কলন করেছেন।[৮]
ইবনু আসাকিরের তারীখু দিমাশক
খতীবের বাগদাদের ইতিহাস গ্রন্থের পর দামেশকের প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গের জীবন বৃত্তান্ত নিয়ে ইবনু আসাকির তার বিপুলায়তন চরিতাভিধান রচনা করেছেন। আশি খণ্ডে সমাপ্ত এ গ্রন্থটি পরবর্তী লেখকদের ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
ইবনু আসাকির—যার পুরো নাম আবুল কাসিম আলী ইবনুল হাসান ইবনি হিবাতিল্লাহ ইবনি আব্দিল্লাহ ইবনিল হুসাইন (৪৯৯/১১০৫) সালে দামেশকের এক সম্ভ্রান্ত বিদ্বান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ইবনু আসাকিরের পিতা, ভাই, পুত্র ও ভাইপোকে সুবকী খ্যাতিমান হাদীস বিশারদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।[৯] তার পূর্বসূরীদের কেউ কেউ ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানসমূহে শামিল হয়েছিলেন যা তাকে ইবনুল আসাকির (সৈনিক সন্তান) উপাধি দান করেছে—যে নামে তিনি সর্বসাধারণ্যে পরিচিত। স্বীয় পিতা ও দামেশকের অন্যান্য শিক্ষকের নিকট প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর ইবনুল আসাকির ব্যাপক ভ্রমণে নেমে পড়েন এবং হাদীস শিক্ষার সব ক'টি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন; সুবকী তার তাবাক্বাত গ্রন্থে এর একটি দীর্ঘ তালিকা উল্লেখ করেছেন। তিনি হাদীস শাস্ত্রের তের শতাধিক শিক্ষকের নিকট থেকে জ্ঞানার্জন করেছেন-তন্মধ্যে আশি জন ছিলেন নারী। পরিশেষে তিনি দামেশকে বসতি স্থাপন করে হাদীস ও তসংশ্লিষ্ট বিষয়াবলীর সেবায় পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন। ইবনুল আসাকির গ্রন্থ ও গবেষণামূলক প্রবন্ধ সঙ্কলন করার পাশাপাশি একটি কলেজে সেসব বিষয়ের ওপর পাঠদান করেন। তার জন্য ঐ কলেজটি প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিলেন বিখ্যাত সেনাপতি ও আইনবিদ নূরুদ্দীন মুহাম্মাদ জঙ্গী। নূরুদ্দীন তাকে বিচার বিভাগের কয়েকটি পদ গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন, ইবনুল আসাকির সেসব প্রস্তাবের সবগুলোকে অব্যাহতভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। পরিশেষে ৫৭১/১১৭৫ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।[১০]
ইয়াকৃত তার মু'জামুল উদাবা গ্রন্থে ইবনু আসাকিরের গ্রন্থাবলীর একটি দীর্ঘ তালিকা প্রদান করেছেন।[১১] এসব গ্রন্থের অনেকগুলো এখনো পাণ্ডুলিপি আকারে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে। তার গ্রন্থাবলীর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও বহু খণ্ডে বিভক্ত গ্রন্থটি হলো দামেশকের ইতিহাস। এক বন্ধুর অনুরোধে গ্রন্থকার এ গ্রন্থটি সঙ্কলনের কাজ শুরু করেন। কিন্তু কিছু সমস্যা ও দুঃখজনক ঘটনার দরুন এ কাজটি অব্যাহত রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। তবে এ গ্রন্থের সমাপ্তি দেখার জন্য সোৎসাহে অপেক্ষা করছিলেন নূরুদ্দীন জঙ্গী। পরিশেষে জঙ্গীর উৎসাহ বিজয়ী হয় এবং ইবনুল আসাকির বৃদ্ধ বয়সে এ গ্রন্থটি সম্পন্ন করার অনুপ্রেরণা লাভ করেন।[১২]
ইবনুল আসাকির তার ইতিহাস পর্বের সূচনায় সিরিয়া ও বিশেষত দামেশকের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস আলোচনা করেছেন। তারপর যেসব হাদীসে সিরিয়া ও দামেশকের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা হয়েছে সেগুলোর ভিত্তিতে অন্যান্য স্থানের তুলনায় সিরিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব সংক্ষিপ্ত পরিসরে তুলে ধরার পর তিনি সেখানকার নাবী-রাসূল ও বিভিন্ন আশ্রমের বর্ণনা দিয়েছেন। তারপর ইবনুল আসাকির বিভিন্ন শ্রেণীর (প্রধানত হাদীস বিশারদদের) সেসব প্রখ্যাত পুরুষ ও নারীর জীবন বৃত্তান্ত আলোচনা করেছেন যারা দামেশকে বসবাস বা সফর করেছেন। তার গ্রন্থের জীবনচরিত অংশের শুরুতে রয়েছে সেসব ব্যক্তির আলোচনা যাদের নামে আহমাদ শব্দ রয়েছে; আর এর মধ্যে সর্বপ্রথম স্থান পেয়েছে ইসলামের নাবী -এর সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত। কোনো শ্রেণীবিশেষকে প্রাধান্য না দিয়ে ভুক্তিগুলোকে বর্ণানুক্রমে সাজানো হয়েছে। যেসব পুরুষের নাম জানা যায়নি তাদের জীবন বৃত্তান্ত গ্রন্থের শেষের দিকে স্ব স্ব কুনিয়াহ (বংশীয় পদবী) এর বর্ণানুক্রমে বিন্যস্ত করা হয়েছে। তারপর রয়েছে প্রখ্যাত নারীদের আলোচনা। পুরুষদের ক্ষেত্রে যে বিন্যাস অবলম্বন করা হয়েছে, নারীদের ক্ষেত্রেও সেই একই বিন্যাস অনুসরণ করা হয়েছে।
খতীব বাগদাদী ও ইবনুল আসাকিরের ন্যায় আরো অনেক হাদীস বিশারদ ও ইতিহাসবিদও অন্যান্য শহরের বিদ্বান ব্যাক্তিবর্গ ও হাদীস বিশারদদের জীবন বৃত্তান্ত সঙ্কলন করেছেন। ইবনু মানদাহ (মৃত্যু ৩০১/৯১১) ও ইস্পাহানের আবু নুয়াইম (৩৩৬-৪০৩) নিজ নিজ শহরের হাদীস বিশারদদের জীবন বৃত্তান্ত সঙ্কলন করেছেন। [১৩] আবু নুয়াইমের গ্রন্থটি রামপুর, কন্সট্যান্টিনোপল ও লাইডেনের গ্রন্থাগারসমূহে সংরক্ষিত আছে। হাকিম (৩২১-৪০৫/৯৩৩-১০১৪) নিশাপুরের হাদীস বর্ণনাকারীদের জীবনচরিত সঙ্কলন করেছেন। ইবনুল আদীম নামে পরিচিত আবুল কাসিম উমার ইবনু আহমাদ উকাইলী (৫৫৮-৬৬০/১১৯১–১২৬২) ৩০ খণ্ডে সমাপ্ত একটি গ্রন্থে আলেপ্পোর প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গ ও বিপুল সংখ্যক হাদীস বিশারদদের জীবন বৃত্তান্ত সঙ্কলন করেছেন। তার বেশ কয়েকজন পূর্বসূরী এর সম্পূরক গ্রন্থ রচনা করেছেন। [১৪] আবু সা'দ সাম'আনী (৫০৬-৫৬২/১১১৩-১১৬৭) মারভের হাদীস বিশারদদের ওপর ২০ খণ্ডে সমাপ্ত একটি চরিতাভিধান রচনা করেছেন। [১৫] ইবনুদ দুবাইছী (৫৫৮-৬৩৭/১১৬২-১২৩৯) ওয়াসিতের হাদীস বিশারদদের ওপর একটি চরিতাভিধান রচনা করেছেন; [১৬] একইভাবে ইবনুন নাজ্জার কুফার, [১৭] ইবনু শাব্বাহ (১৭৩-২৬৩/৭৮৯-৮৭৬) বসরার, [১৮] ইবনুল বাজ্জাজ হেরাতের এবং ইবনুর রাফি কাযবীনের[১৯] হাদীস বিশারদদের ওপর চরিতাভিধান রচনা করেছেন।
ইবনুল ফারদী, ইবনু বিশকাওয়াল, হুমাইদী ও অন্যান্য ব্যক্তিবর্গও হাদীস বর্ণনাকারীদের জীবন বৃত্তান্ত সঙ্কলন করেছেন যারা (ইসলামী সাম্রাজ্যের) বিভিন্ন প্রদেশ যেমন আন্দালুস, আফ্রিকা, সান'আ, মিশর, খুরাসান প্রভৃতি এলাকায় বসবাস করেছিলেন।[২০]
টিকাঃ
[১] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১৮২।
[২] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১৮৩।
[৩] ইমাম যিনি জুমু'আর খুতবা প্রদান কতে
[৪] খতীবের পূর্বে বাগদাদ শহরের একমাত্র ইতিহাস গ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন তাইফুর আহমাদ ইবনু আবী তাহির (৮১৯-৯৮৩); তার গ্রন্থের মাত্র ষষ্ঠ খণ্ডটির ব্যাপারে জানা গিয়েছে যেখানে খলিফাদের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এইচ কেলার এ খণ্ডটিকে লিথোগ্রাফ করে জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেছেন।
[৫] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১৮৩-৫।
[৬] তাবাক্বাতু ইবনি সা'দ, খণ্ড ১, পৃ, ২২৪; খণ্ড ২, পৃ, ৫২১; খণ্ড ৪, পৃ, ১৭৬; খণ্ড ৬, পৃ, ১০১।
[৭] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১৮৫-৬।
[৮] কাশফুজ জুনূন, খণ্ড ২, পৃ, ১১৯ (হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১৮৫-৬ এ উদ্ধৃত)।
[৯] তাবাক্বাতুশ শাফিইয়্যাহ আল কুবরা, খণ্ড ৫, পৃ, ১৪৮।
[১০] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১৮৬-৭।
[১১] মু'জামুল উদাবা, খণ্ড ৫, পৃ, ১৪০-৪।
[১২] তারীখু দিমাশক, খণ্ড ১, পৃ, ১০।
[১৩] ওফায়াতুল আ'ইয়ান, নং ৩২ ও ৬৩১।
[১৪] কাশফুয যুনূন, খণ্ড ২, পৃ, ১২৫।
[১৫] ওফায়াতুল আ'ইয়ান, নং ৪০৬।
[১৬] প্রাগুক্ত, নং ৬৭২।
[১৭] মু'জামুল উদাবা, খণ্ড ১, পৃ, ৪১০; পৃ, ১৪১।
[১৮] ওফায়াতুল আ'ইয়ান, নং ৫০২।
[১৯] কাশফুয যুনূন, খণ্ড ২, পৃ, ১৫৭ ও ১৪০।
[২০] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১৮৮।