📄 জামি‘ গ্রন্থাবলী
মৌলিক গ্রন্থ রচনার যুগের সমাপ্তির কয়েক প্রজন্ম পর আরেক ধরনের হাদীস গ্রন্থ রচিত হয়। এসব গ্রন্থে বিশেষজ্ঞগণ বিদ্যমান গ্রন্থাবলীর হাদীসসমূহকে বিভিন্ন পদ্ধতিতে সাজিয়েছেন।
জামি'উ ইবনিল আসীর
মুবারক ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আব্দিল কারীম জাযারী ছিলেন এক বিখ্যাত শিক্ষিত পরিবারের সন্তান। তার ভাই আলী ছিলেন একজন ইতিহাসবিদ যিনি তার আল কামিল ফিত তারীখ গ্রন্থের জন্য ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছেন। তার আরেক ভাই নাসরুল্লাহ ছিলেন অসংখ্য জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থের লেখক। উক্ত তিনজনের প্রত্যেকের উপাধি ছিল ‘ইবনুল আর’।
আমাদের আলোচ্য মুহাদ্দিস ইবনুল আছীর ৫৫৪ হিজরীতে মসুলের উত্তরে জাযীরায়ে ইব্ন্ উমার এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ৫৬৫ হিজরীতে তিনি মসুলে গিয়ে স্থায়ী নিবাস স্থাপন করেন। তিনি সে সময়ের আরবি ভাষা, তাফসীর, হাদীস ও ফিকহ শাস্ত্রের একজন প্রথম সারির বিশেষজ্ঞে পরিণত হন। ইবনুল আছীর পরপর কয়েকটি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। শেষের দিকে তার পা যুগল বাতগ্রস্ত হয়ে পড়ায় তিনি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে অক্ষম হয়ে পড়েন। তার সবগুলো জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থ অসুস্থতার সময়েই রচিত হয়েছে। ইবনুল আছীর তার ছাত্রদের সামনে জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য দিতেন, আর ছাত্ররা তার জন্য তা লিখে ফেলতেন।
হাদীস সাহিত্যে ব্যবহৃত অস্বাভাবিক শব্দসমূহের অর্থ বুঝার জন্য ইবনুল আছীরের আন নিহায়াহ ফী গারীবিল হাদীস গ্রন্থটি গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে জামিউল উসূল ফী আহাদীসির রাসূল শীর্ষক গ্রন্থটি তার প্রধান কীর্তি। এ গ্রন্থে তিনি আল মু'আত্তা, সহীহ বুখারী, সহীহু মুসলিম, জামিউত তিরমিযী, সুনানু আবী দাউদ ও সুনানুন নাসাঈর সবগুলো হাদীস একত্রিত করেছেন। সানাদ বাদ দিয়ে তিনি সেসব হাদীসকে বর্ণানুক্রমে বিভিন্ন অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেছেন। দামেশকের আব্দুল কাদির আরনাউতের সম্পাদিত সংস্করণটি এ গ্রন্থের সর্বোত্তম সংস্করণ।
হাইছামীর যাওয়াইদ
প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর আলী ইবনু আবী বার্ ইবনু সুলাইমান হাইছামী (৭৩৫-৮০৭ হি.) কুরআন অধ্যয়ন করেন। তিনি বিখ্যাত হাদীস বিশেষজ্ঞ যাইনুদ্দীন ইরাকীর সার্বক্ষণিক ছাত্র ও সহচরে পরিণত হন। হাইছামী ইরাকীর মেয়েকে বিয়ে করেন। ইরাকী তাকে হাদীস বিজ্ঞান শেখানোর পাশাপাশি হাদীসের ছয়টি বিশুদ্ধ গ্রন্থে উল্লিখিত হয়নি এমন হাদীস বের করে আনার পদ্ধতিও শেখান। ফলে, হাইছামী এ বিষয়ের একজন বিশেষজ্ঞে পরিণত হন এবং যাওয়াইদ-এর ওপর বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন।
পরবর্তীতে তিনি যাওয়াইদ বিষয়ে তার লেখা সব গ্রন্থ একত্রিত করে বিশ্বকোষতুল্য একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন-তা হলো মাজমাউয যাওয়াইদ ওয়া মামবাউল ফাওয়াইদ। এ গ্রন্থে তিনি সংক্ষিপ্ততার স্বার্থে সানাদ বাদ দিয়ে দিয়েছেন যার ফলে এতে এক প্রকার ত্রুটি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি এ গ্রন্থটিকে জামি ও সনান পদ্ধতিতে বিন্যস্ত করেছেন এবং হাদীসের স্তর ব্যাখ্যা কিংবা ত্রুটিপূর্ণ বর্ণনাকারীদের নামসমূহ উল্লেখ করে দিয়েছেন।
তবে তার এ স্তর বিন্যাস পরবর্তীকালের বিশেষজ্ঞদের নিকট সবসময় গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেনি। ১৩৫২ হিজরীতে এ গ্রন্থটি কায়রো থেকে ১০ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে।
জামিউস সুয়ূতী
জালালুদ্দীন আব্দুর রহমান ইবনু কামালিদ্দীন সুয়ূতী ৮৪৯ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বয়স যখন ছয় বছর তখন তার পিতা মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ১৫০ জন শিক্ষকের যে তালিকা প্রদান করেছেন তাতে সে সময়ের বিখ্যাত সকল বিশেষজ্ঞের নাম রয়েছে।
সুয়ূতী ছয় শতাধিক গ্রন্থ সঙ্কলন করেছেন; এদের বেশীরভাগই হলো প্রথম দিকের বিশেষজ্ঞদের গ্রন্থাবলীর সংক্ষিপ্ত রূপ। তার সময়ের অনেক বিশেষজ্ঞ তার গ্রন্থ রচনার পদ্ধতিকে পছন্দ করেননি এবং তারা তাকে প্রথম দিকের বিশেষজ্ঞদের গ্রন্থের উপাদান চুরি করার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন।
📄 হাদীস সঙ্কলনসমূহের স্তর বিন্যাস
হাদীস বিশারদগণ হাদীস সাহিত্যের গ্রন্থাবলীকে প্রামাণিকতা ও গুরুত্বের বিচারে চার শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেনঃ
প্রথম শ্রেণীতে রয়েছে সেসব গ্রন্থ যেগুলোকে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য মনে করা হয়। এগুলো হলো: * মু'আত্তা মালিক; * সহীহ বুখারী, * সহীহ মুসলিম।
শেষোক্ত দু'টি গ্রন্থে মু'আত্তার প্রায় সবগুলো হাদীস সন্নিবিষ্ট হয়েছে। তাই প্রধান সারির হাদীস বিশারদগণ মু'আত্তাকে হাদীসের ছয়টি বিশুদ্ধ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত করেননি।
সংকলনের সময় থেকেই এসব গ্রন্থ ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে এসেছে। ইমাম শাফিয়ী মু'আত্তাকে কুরআনের পর সর্বাধিক প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। [১০৫] অন্যদিকে ৯০,০০০ ছাত্র সরাসরি গ্রন্থকারের নিকট থেকে সহীহ বুখারী গ্রন্থটি গ্রহণ করেছেন- যা ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে- এবং আবুল হাসান ইবনুল কাত্তান প্রমুখের ন্যায় সে সময়কার প্রভাবশালী হাদীস বিশারদদের সকলেই একে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সহীহ মুসলিম গ্রন্থেরও হাদীস বিশারদদের সাধারণ স্বীকৃতি লাভ করতে খুব বেশি সময় লাগেনি।
দ্বিতীয় শ্রেণীতে রয়েছে চারটি সুনান গ্রন্থ; এগুলোকে দু'টি সহীহ গ্রন্থের সাথে মিলিয়ে আল কুতুবুস সিত্তাহ (ছয়টি গ্রন্থ) বা আস সিহাহুস সিত্তাহ (বিশুদ্ধ ছয়) নামে অভিহিত করা হয়। দু'টি সহীহ গ্রন্থের সাথে কিছু কিছু সুনান গ্রন্থকে মিলানোর প্রবণতা শুরু হয়েছিল হিজরী চতুর্থ শতকের মাঝামাঝি সময়ে; যখন সাঈদ ইবনু সাকান[১০৬] ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, ইমাম বুখারী ও মুসলিমের দু'টি সহীহ এবং ইমাম আবু দাউদ ও নাসাঈর দু'টি সুনান গ্রন্থ ইসলামের ভিত্তি। কিছু দিন পর জামিউত তিরমিযী গ্রন্থকে উপরোক্ত চারটি গ্রন্থের সাথে যোগ করা হয়, আর এ পাঁচটিকে একসাথে নাম দেয়া হয় আল উসূলুল খামছাহ (পঞ্চ ভিত্তি)।[১০৭]
জামিউত তিরমিযী গ্রন্থটি ঠিক কখন হাদীস বিশারদদের সাধারণ স্বীকৃতি লাভ করেছে, তা নির্ণয় করা সহজ নয়। ইবনু হাযাম- নির্ভরযোগ্য হাদীস গ্রন্থসমূহের ওপর যার তালিকা আজও বিদ্যমান- এ গ্রন্থের কিছু সমালোচনা তুলে ধরেছেন; কারণ এ গ্রন্থে মাসনূব ও কালবীর ন্যায় কতিপয় প্রশ্নবিদ্ধ ব্যক্তির বর্ণিত হাদীসও স্থান পেয়েছে।[১০৮] তবে ইমাম তিরমিযীর জামি' গ্রন্থটি ইবনু মাজা'র গ্রন্থের পূর্বেই বিশেষজ্ঞদের সাধারণ স্বীকৃতি লাভ করেছে। ইবনু মাজা'র গ্রন্থটিকে বিশুদ্ধ পাঁচটি গ্রন্থের সাথে সর্বপ্রথম যোগ করেছেন মুহাম্মাদ ইবনু তাহির, যিনি ষষ্ঠ শতকের শুরুর দিকে (৫০৫/১১১৩) মৃত্যুবরণ করেছেন। তা সত্ত্বেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, পুরো ষষ্ঠ শতক জুড়ে হাদীস বিশারদগণ ইবনু মাজা'র গ্রন্থকে বিশুদ্ধ পাঁচটি গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। সপ্তম শতক থেকে ছয়টি গ্রন্থ সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য হাদীস সঙ্কলন হিসেবে সাধারণ স্বীকৃতি লাভ করেছে।
হাদীসের ছয়টি বিশুদ্ধ গ্রন্থ নির্বাচনের ক্ষেত্রে হাদীস বিশারদগণ নিম্নোক্ত মূলনীতিসমূহ অনুসরণ করেছেন-
• সংশ্লিষ্ট গ্রন্থের সঙ্কলকবৃন্দ হাদীস নির্বাচন ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট মূলনীতি প্রণয়ন করেছিলেন।
• সেসব গ্রন্থের অধিকাংশ হাদীস বিশুদ্ধ বা চলনসই, আর কিছু দুর্বল হাদীস থাকলেও তা সাধারণত উল্লেখ করে দেয়া হয়েছে।
• সেসব গ্রন্থের হাদীসসমূহকে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রথম সারির বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে যত্ন সহকারে মূল্যায়ন ও যাচাই করা হয়েছে এবং যুগ পরিক্রমায় সেসব গ্রন্থের ব্যাপকভিত্তিক ভাষ্য রচনা করা হয়েছে, যার ফলে সেগুলোর দোষ-গুণ স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।
• আইনগত ও দ্বীনি বিষয়াদি প্রমাণের ক্ষেত্রে সেসব গ্রন্থকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।[১০৯]
তৃতীয় শ্রেণীতে রয়েছে সেসব মুসনাদ, মুসান্নাফ ও অন্যান্য গ্রন্থাবলী যা ইমাম বুখারী ও মুসলিমের সহীহ গ্রন্থদ্বয় রচিত হওয়ার পূর্বে বা পরে সঙ্কলিত হয়েছে; যেগুলোতে নির্ভরযোগ্য ও অনির্ভরযোগ্য দু' ধরনের হাদীস রয়েছে এবং যেগুলোকে হাদীস বিশারদগণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেননি কিংবা যেগুলোকে আইন ও দ্বীন সংক্রান্ত গ্রন্থাবলীতে উৎস গ্রন্থ হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি। এ ধরনের গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে আবদ ইবনু হুমাইদ ও তায়ালিসীর মুসনাদ এবং আব্দুর রাজ্জাক ও ইবনু আবী শাইবাহ প্রমুখের মুসান্নাফ গ্রন্থাবলী।
চতুর্থ শ্রেণীতে রয়েছে পরবর্তী যুগের সেসব হাদীস সঙ্কলন যেগুলোতে সংশ্লিষ্ট সঙ্কলকগণ এমন কিছু হাদীস সংগ্রহ করেছেন যা প্রথম দিকের সঙ্কলকগণের গ্রন্থাবলীতে নেই। এসব গ্রন্থের অধিকাংশ বর্ণনাই জাল। খারিজমীর মুসনাদ গ্রন্থটিকে এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, পঞ্চম শ্রেণীর কিছু হাদীস গ্রন্থ রয়েছে যেখানে এমনসব হাদীসের সমাবেশ ঘটেছে যেগুলোকে মুসলিম বিশেষজ্ঞগণ অনির্ভরযোগ্য বা সুস্পষ্ট জাল আখ্যায়িত করেছেন।[১১০]
টিকাঃ
[১০৫] হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, খণ্ড ১, পৃ.
[১০৬] একজন প্রখ্যাত হাদীস বিশেষজ্ঞ যিনি ৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে মিশরে ইন্তেকাল করেছেন। তার ইন্তেকালের এক শতাব্দী পর ইবনু হাযাম তার মুছান্নাফ গ্রন্থটিকে সর্বোত্তম হাদীস সঙ্কলনসমূহের অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
[১০৭] তাদরীবুর রাবী, পৃ, ২৯।
[১০৮] তাদরীবুর রাবী, পৃ, ৫৬।
[১০৯] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১২৬।
[১১০] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১২২-৫।