📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 ইমাম মালিকের মু’আত্তা

📄 ইমাম মালিকের মু’আত্তা


মালিক ইবনু আনাস ইবনু আমির (রহ.) ৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতামহ আমির ছিলেন মদীনার প্রধান সাহাবীদের অন্যতম। সে সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ হাদীস বিশারদ যুহরী ও সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু উমারের আযাদকৃত দাস ও বিখ্যাত হাদীস বর্ণনাকারী নাফি'র তত্ত্বাবধানে ইমাম মালিক হাদীস অধ্যয়ন করেন। মালিক কেবল হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে মক্কা গমন ছাড়া কখনও মদীনার বাইরে ভ্রমণে যেতেন না। জোর খাটিয়ে কাউকে তার স্ত্রীকে তালাক দিতে বাধ্য করলে সে তালাক অবৈধ হবে মর্মে সিদ্ধান্ত প্রদান করার কারণে ৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে মদীনার আমীরের নির্দেশে তাকে মারাত্মকভাবে প্রহার করা হয়। এ সিদ্ধান্তটি ছিল আব্বাসী শাসকদের একটি রীতির বিরোধী। রীতিটি ছিল, তারা জনগণের নিকট থেকে আনুগত্যের শপথ নেয়ার সময় এ মর্মে একটি দফা বাড়িয়ে দিয়েছিল যে, যে ব্যক্তিই (আনুগত্যের) শপথ ভঙ্গ করবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার বিবাহ বন্ধন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

ইমাম মালিক চল্লিশ বছরেরও বেশী সময় ধরে মদীনায় হাদীসের পাঠদান অব্যাহত রাখেন এবং এ সময় তিনি নাবী ﷺ-এর হাদীস এবং সাহাবা ও তাবি'ঈদের সিদ্ধান্ত সম্বলিত একটি গ্রন্থ সঙ্কলন করতে সমর্থ হন। তিনি এ গ্রন্থটির নাম দেন আল মু'আত্তা। আব্বাসী খলিফা আবু জা'ফর মনসুরের অনুরোধে (৭৫৪-৭৫৫ সাল) তিনি হাদীস সঙ্কলনের কাজ শুরু করেন। মনসুর নাবী ﷺ-এর সুন্নাহ ভিত্তিক এমন একটি সর্বব্যাপী আইন সংহিতা চেয়েছিলেন যা তিনি মুসলিম সাম্রাজের সর্বত্র একযোগে প্রয়োগ করতে পারেন। কিন্তু সঙ্কলন শেষে মালিক উক্ত গ্রন্থটিকে জনগণের ওপর রাষ্ট্রীয় শক্তিবলে চাপিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি কারণ দেখিয়েছিলেন যে, আল্লাহর নাবীর সাহাবীদের অনেকেই ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছেন এবং তারা এমন অনেক হাদীস সম্পর্কে অবহিত ছিলেন যা হয়তো এ গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়নি; আর গোটা মুসলিম সাম্রাজ্যে প্রয়োগ করার জন্য কোনো আইন প্রণয়ন করতে চাইলে সেগুলোকেও বিবেচনায় রাখতে হবে। খলিফা হারুন অর রশীদও (৭৬৮-৮০৯ সাল) ইমাম মালিকের নিকট একই অনুরোধ পেশ করেন; এবারও ইমাম তার অনুরোধ নাকচ করে দেন। ৮০১ খ্রিস্টাব্দে ৮৩ বছর বয়সে ইমাম মালিক তার জন্ম শহর মদীনায় মৃত্যুবরণ করেন। [৩৫]

হাদীস বর্ণনা ও সমকালীন সমস্যার প্রেক্ষিতে সেসব হাদীসের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ নিয়ে আলোচনা করার মাধ্যমে ইমাম মালিক পাঠদান করতেন। তিনি তার ছাত্রদের সামনে হাদীস ও ইসলামী আইনের বিভিন্ন বিষয়ে সাহাবীদের বক্তব্যসমূহ বর্ণনা করে সেগুলোর তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করতেন, কিংবা তার ছাত্ররা যেসব এলাকা থেকে এসেছে সেসব এলাকায় উদ্ভূত সমস্যা সম্পর্কে তিনি জেনে নিতেন এবং তারপর সেসব সমস্যা সমাধানে যেসব প্রাসঙ্গিক হাদীস বা আসার ব্যবহার করা যায় তা বর্ণনা করতেন।

আল মু'আত্তা রচনা সম্পন্ন করার পর ইমাম মালিক এ গ্রন্থটিকে তার ছাত্রদের সামনে নিজ মাযহাবের সারাংশ হিসেবে পেশ করেন, তবে নতুন তথ্য পেলে তিনি তার আলোকে আবার সংশোধনও করে নিতেন। [৩৬] ফলে তার এ সঙ্কলনটির আশির অধিক ভাষ্য তৈরী হয়। তন্মধ্যে পনেরটি সর্বাধিক খ্যাত। বর্তমানে কেবল ইয়হইয়া ইবনু ইয়াহইয়ার ভাষ্যটিই তার আসল রূপে, পূর্ণাঙ্গ ও মুদ্রিত অবস্থায় পাওয়া যায়। ইবনু আব্দিল বারের ব্যাখ্যা গ্রন্থসমূহ সর্বাধিক খ্যাত। তিনি আত তামহীদ ও আল ইখতিসার নামে দু'টি ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেছেন। মুহাম্মাদ যাকারিয়‍্যা কান্দালভী লিখেছেন আওজাযুল মাসালিক শারহু মু'আত্তা ইমাম মালিক যা ভারত ও মিশর থেকে প্রকাশিত হয়েছে। [৩৭]

টিকাঃ
[৩৫] আল মাদখাল, পৃ, ১৮৪-৯১
[৩৬] এভ্যুলুশন অব ফিকহ, পৃ, ৮৩
[৩৭] স্টাডিজ ইন হাদীস মেথডলজি, পৃ, ৮

📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 মুসনাদ গ্রন্থাবলী

📄 মুসনাদ গ্রন্থাবলী


বড় আকারের হাদীস সঙ্কলনসমূহের বিভিন্ন প্রকারের মধ্যে সর্বাগ্রে রচিত হয় মুসনাদ প্রকৃতির গ্রন্থাবলী। তবে, যেসব মুসনাদ গ্রন্থ প্রথম দিককার প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গের প্রতি আরোপ করা হয় তাদের অনেকগুলোই মূলত পরবর্তী কালের মুহাদ্দিসগণ সঙ্কলন করেছেন। তারা সেসব হাদীস সঙ্কলন করেছেন যা কোনো গুরুত্বপূর্ণ একক বর্ণনাকারী নিজে তাদের নিকট বর্ণনা করেছেন কিংবা তার বরাতে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন ইমাম আবু হানীফা, শাফিয়ী ও উমার ইবনু আব্দিল আযীয (রহ.) প্রমুখের মুসনাদসমূহ- যাদের কেউই বাস্তবে নিজে কোনো মুসনাদ গ্রন্থ সংকলণ করেছেন বলে জানা যায় না। ইমাম আবু হানীফার মুসনাদ নামে সর্বসাধারণ্য যে গ্রন্থটি পরিচিত, তা সঙ্কলন করেছেন আবুল মু'আইয়াদ মুহাম্মাদ ইবনু মাহমুদ খারিজমী (মৃত্যু ১২৫৭ সাল)। কিতাবুল উম্ম ও আল মাবসূত গ্রন্থের ভিত্তিতে মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াকূব আছাম (মৃত্যু ৮৬০ সাল) ইমাম শাফিয়ীর মুসনাদ গ্রন্থটি সঙ্কলন করেন। উমার ইবনু আব্দিল আযীযের মুসনাদ নামক গ্রন্থটি সঙ্কলন করেছেন বাগান্দী (মৃত্যু ৮৯৫ সাল)। আবু দাউদ তায়ালিসীর মুসনাদ শীর্ষক গ্রন্থটি (যাকে এখনো পর্যন্ত সুলভ মুসনাদ গ্রন্থসমূহের মধ্যে প্রাচীনতম মনে করা হয়) বর্তমানে যেভাবে বিন্যস্ত আছে তা স্বয়ং তায়ালিসীর কীর্তি নয়, বরং তা হলো পরবর্তী যুগের খোরাসানের এক হাদীস বিশারদের সঙ্কলিত রূপ。

মুসনাদু আবী দাউদ তায়ালিসী
পাটনার ওরিয়েন্টাল পাবলিক লাইব্রেরীতে এর একটি প্রাচীন, দুর্লভ ও গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত রয়েছে এবং মৌলভী আব্দুল হামীদ বাঙ্কিপুরের ওরিয়েন্টাল পাবলিক লাইব্রেরীর হাদীসের পাণ্ডুলিপি সংক্রান্ত ক্যাটালগে এ গ্রন্থের পূর্ণ বিবরণ দিয়েছেন। এ পাণ্ডুলিপির ভিত্তিতে মুসনাদের হায়দ্রাবাদ সংস্করণটি প্রকাশিত হয়েছে।

আবু দাউদ সুলাইমান ইবনু দাউদ ইবনু জারূদ তায়ালিসী (উক্ত মুসনাদটি সাধারণত যার প্রতি আরোপ করা হয়) ছিলেন পারস্য বংশোদ্ভূত। তিনি ৭৫০/৫১ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তার সমকালীন এক হাজারেরও বেশী বিশেষজ্ঞের নিকট হাদীস অধ্যয়ন করেন। এদের অনেকেই ছিলেন অসাধারণ খ্যাতির অধিকারী। শু'বাহ (যার হাদীসে তায়ালিসী বিশেষত্ব অর্জন করেছিলেন) ও সুফিয়ান ছাওরী প্রমুখ ছিলেন তাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন অত্যন্ত তীক্ষ্ম ও ব্যাপক ধারণক্ষম স্মৃতিশক্তির অধিকারী। তার ব্যাপারে বলা হয় যে, তিনি কোনো কাগজপত্রের সহায়তা ছাড়াই ছাত্রদেরকে দিয়ে চল্লিশ হাজার হাদীস লিপিবদ্ধ করিয়েছেন। জীবদ্দশায় তাকে হাদীস শাস্ত্রের (বিশেষত দীর্ঘ হাদীসসমূহের) একজন অসধারণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ব্যক্তি হিসেবে মেনে নেয়া হয়। এর ফলে মুসলিম বিশ্বের সকল অঞ্চল থেকে ছাত্ররা তার নিকট জড়ো হয়। ছাত্রদের সামনে কয়েকটি হাদীস আলোচনা করার সময় তার শিক্ষক শু'বাহ তার পাঠদান শুনে বলেছিলেন যে, স্বয়ং তিনিও এর চেয়ে ভালো পাঠদান করতে পারতেন না। ইবনু হাম্বল ও আলী ইবনুল মাদীনীর ন্যায় কঠোর হাদীস বিশারদগণও তায়ালিসীর কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে তার নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তা সত্ত্বেও তিনি কতিপয় বিশেষজ্ঞের সমালোচনার ঊর্ধ্বে ছিলেন না; যারা মনে করতেন যে, তার স্মৃতিশক্তি মাঝেমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়তো। ৮১৩ সালে ৭০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

মুসনাদু আবী দাউদ তায়ালিসীর বর্তমান সংস্করণে ২৮১ জন সাহাবী কর্তৃক বর্ণিত ২,৭৬৭টি হাদীস রয়েছে। হাদীসগুলোকে বর্ণনাকারী সাহাবীর নামের পর উল্লেখ করা হয়েছে। সাহাবীদের নামসমূহকে এভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে: * চার খলিফা, * অন্যান্য বদরী সাহাবী, * মুহাজির, * আনসার, * নারী সাহাবী ও * তরুণ সাহাবী।

তবে তায়ালিসী নিজে এ গ্রন্থটিকে বর্তমান রূপে সঙ্কলন বা বিন্যাস করেননি। বরং এটি হলো তার ছাত্র ইউনুস ইবনু হাবীবের কীর্তি যিনি তার শিক্ষকের নিকট থেকে প্রাপ্ত হাদীসসমূহকে একসাথে জড়ো করে চমৎকার এই পন্থায় বিন্যস্ত করে দিয়েছেন।

হাদীসের অন্যান্য সঙ্কলন গ্রন্থসমূহের বিষয়বস্তুর ন্যায় মুসনাদ গ্রন্থের হাদীসসমূহের বিষয়বস্তুও বিভিন্নধর্মী ও অসংখ্য। তবে এতে মু'জিযা বা অলৌকিকত্ব, সাহাবীদের ব্যক্তিগত বা গোত্রীয় মাহাত্ম্য, ভবিষ্যৎ ঘটনাবলী বা ইসলামে বিভিন্ন উপদলের ভবিষ্যদ্বাণী সংক্রান্ত হাদীসের সংখ্যা অনেক কম।

হিজরী অস্টম শতক পর্যন্ত এ গ্রন্থটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। কেবল পাটনার পাণ্ডুলিপিতেই হাদীস শাস্ত্রের তিন শতাধিক ছাত্রছাত্রীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে যারা বিভিন্ন সময় এ গ্রন্থটি অধ্যয়ন করেছেন। তাদের মধ্যে যাহাবী ও মিযযী প্রমুখের ন্যায় বিখ্যাত হাদীস বিশারদের নামও রয়েছে। যে কোনো কারণেই হোক অস্টম শতকের পর এ গ্রন্থটি এতোটাই জনপ্রিয়তা হারিয়েছে যে, এর পাণ্ডুলিপিসমূহ অত্যন্ত দুর্লভ হয়ে পড়েছে।

মুসনাদু আহমাদ ইবনি হাম্বল
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বব্যাপী যে মুসনাদটি আমাদের নিকট পৌঁছেছে তা হলো ইমাম আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবন হাম্বল মাবওয়াযী শায়বানীর মুসনাদ। তার অনন্যসাধারণ অনাড়ম্বর ও অহমিকামুক্ত জীবন এবং আব্বাসী খলিফা মামুন, ওয়াছিক ও মুতাওয়াক্কিলের নিপীড়নমূলক জিজ্ঞাসাবাদ ও দমনের বিরুদ্ধে স্বীয় মতাদর্শের ওপর সুদৃঢ় অবস্থানের ফলে হাদীসের এ মহান সঙ্কলনটিকে ঘিরে পবিত্রতার একটি আবহ সৃষ্টি হয়েছে। বিপুল কলেবরের গ্রন্থ হওয়া সত্ত্বেও কালের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এটি টিকে আছে এবং ১৮৯৬ সালে কায়রোতে মুদ্রিত হয়েছে।[৩৮]

ইমাম ইবনু হাম্বল ছিলেন আরবের শায়বানী বংশোদ্ভূত। তিনি মারভ অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন যেখানে ৭৮০ খ্রিস্টাব্দে তার পিতা জিহাদের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন। তার দ্বীনদার মা সাফিয়্যাহ বিনতু মাইমুনা'র সযত্ন তত্ত্বাবধানে তিনি বাগদাদে বেড়ে ওঠেন। তার পিতা ৩০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন; তখন আহমাদ ছিলেন অনেক ছোট।[৩৯] সেখানকার শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞদের নিকট থেকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে ১৫ বছর বয়সে তিনি ইবরাহীম ইবনু উলাইয়া'র তত্ত্বাবধানে হাদীস শাস্ত্রের গভীর অধ্যয়ন শুরু করেন। রাজধানীর প্রথম সারির সকল হাদীস বিশারদের নিকট অধ্যয়ন শেষে ৭৯৯ সালে তিনি জ্ঞানান্বেষণের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ শুরু করেন। তিনি বসরা, কুফা, ইয়েমেন, হিজায ও অন্যান্য অঞ্চলের হাদীস শিক্ষাকেন্দ্রসমূহ ভ্রমণ করেন, হাদীস বিশারদদের পাঠদানে উপস্থিত হন, বিভিন্ন তথ্য লিপিবদ্ধ করেন এবং বিশেষজ্ঞ ও সহপাঠীদের সাথে সেসব বিষয়ে আলোচনা করেন। পরিশেষে তিনি ৮১০ সালে বাগদাদে ফিরে আসেন। এখানে তিনি ইমাম শাফিয়ীর সাথে সাক্ষাৎ করে তার নিকট ফিকহ ও উসূলুল ফিকহ অধ্যয়ন করেন।

অল্প বয়স থেকেই আহমাদ ইবনু হাম্বল হাদীসের ওপর পাঠদান করতে শুরু করেন। বলা হয় যে, ৮০৪ সালে তিনি যখন অল্প সময়ের জন্য বাগদাদ যান, তখন সেখানকার একটি মাসজিদে তার হাদীস বিষয়ক পাঠদান শোনার জন্য বিপুল সংখ্যক ছাত্র তার চারপাশে জড়ো হয়ে গিয়েছিল।[৪০] নাবী -এর হাদীসের শিক্ষাদান ও খেদমতকে তিনি তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য বানিয়ে নেন এবং ৮৩৩ সালে আব্বাসী সাম্রাজ্যের সর্বত্র মূল ধারার বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্যাতনের এক ঝড় নেমে আসার আগ পর্যন্ত তিনি এ কাজ অব্যাহত রাখেন।

বহিরাগত দর্শনের চর্চাকারী কিছু সহচরদের প্রভাবে খলিফা মনসুর প্রকাশ্যে ‘কুরআন একটি সৃষ্ট বস্তু' শীর্ষক মতবাদসহ মু'তাযিলী দর্শন গ্রহণ করেন। মূলধারার আলিমগণ তার এ মত সমর্থন না করায় তিনি প্রথমে তাদেরকে ভয়-ভীতি দেখান এবং পরবর্তীতে ব্যাপক নির্যাতন করেন। ইমাম আহমাদ সহ অনেক বিশেষজ্ঞ নতি স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান। খলিফা তখন তারসুসে ছিলেন। তিনি তাদেরকে বন্দী করে তার নিকট প্রেরণ করার নির্দেশ দেন। এসব হুকুম তামিল করা হলেও বন্দীরা তাদের গন্তব্যে পৌঁছার আগেই মামুন মৃত্যুবরণ করেন। তবে তার এ মৃত্যু তাদের জন্য খুব একটা সহায়ক হয়নি; কারণ তিনি একটি ওসিয়্যতনামা লিখে গিয়েছিলেন যেখানে তিনি তার উত্তরসূরীকে কুরআনের সৃষ্ট বস্তু হওয়া সংক্রান্ত মতবাদ প্রচারের কাজ চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার অব্যবহিত দু' উত্তরসূরী মু'তাসিম ও ওয়াছিক হিংস্রতার সাথে এ নীতি বাস্তবায়ন করতে থাকেন। মুসলিম বিশেষজ্ঞদেরকে মু'তাযিলী মতবাদ গ্রহণের জন্য নির্যাতন ও জেলে নিক্ষেপ করতেও তারা কোনো দ্বিধা করেননি। মুতাওয়াক্কিলের শাসনামলের তৃতীয় বর্ষের আগ পর্যন্ত এ দমন-পীড়ন বিভিন্ন মাত্রায় চলতে থাকে। পরিশেষে ৮৪৮ সালে মুতাওয়াক্কিল এসব নির্যাতন বন্ধ করে সুন্নী চিন্তা-চেতনার মূল ধারায় ফিরে আসেন।[৪১]

ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন ও আলী ইবনুল মাদীনির ন্যায় কতিপয় হাদীস বিশারদ তাকীয়াহ (ভিন্ন অবস্থার ভান) আশ্রয় গ্রহণ করেন। একমাত্র আহমাদ ইবনু হাম্বলই সেই সঙ্কটময় মুহূর্তে বিশুদ্ধ চিন্তাধারা এবং বিবেক ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা বিষয়ক ইসলামী মূলনীতির ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি খলিফার নির্দেশের সামনে মাথা নত না করে উল্টো গণবিতর্কে তার প্রতিপক্ষের যুক্তিবিন্যাসের ভ্রান্তিসমূহ উন্মোচন করে দেন এবং তাদের বলপ্রয়োগের হুমকির মুখে নতি স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি তাদের নির্যাতন ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করেন। তাকে একটি কক্ষে আঠার মাস বন্দী করে রাখা হয়। সেখানে জল্লাদদের একটি দল তাকে পেটাতে পেটাতে তার কব্জি ভেঙ্গে ফেলে। তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন এবং সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। একবার জ্ঞান ফিরে আসার পর তাকে পানি দেয়া হলে তিনি এ বলে তা ফিরিয়ে দিলেন যে, তিনি সাওম ভঙ্গ করতে চান না।[৪২] তা সত্ত্বেও তিনি তার বিবেকের সিদ্ধান্তকে পুরোপুরি ধরে রাখেন এবং সর্বোচ্চ কৃতিত্বের সাথে এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। আরো হৃদয়গ্রাহী ব্যাপার হলো, জাতির দৃষ্টিতে ইবনু হাম্বল তার শত্রু ও নির্যাতনকারীদের প্রতি দৃষ্টান্তমূলক বদান্যতা দেখিয়েছেন; তাদের কারো প্রতি তিনি প্রতিহিংসাপরায়ণ কোনো আচরণ করেননি। তিনি আহমাদ ইবনু আবী দাউদের বিরুদ্ধে কোনো মত প্রকাশ করা থেকে যথেষ্ট সতর্কতার সাথে বিরত থাকেন। নির্যাতন চলাকালে যিনি তার বিরুদ্ধে প্রধান বিচারকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। [৪৩]

নির্যাতন ভোগের পর ইমাম আহমাদ প্রায় আট বছর জীবিত ছিলেন। এর বেশীরভাগ সময় তিনি পাঠদানে ব্যয় করেন আর বাকী সময়টুকু সালাত ও যিকিরে কাটিয়ে দেন। ৮৫৫ সালে ৭৭ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার জানাযায় বিপুল সংখ্যক লোক অংশগ্রহণ করেন। বিভিন্ন বর্ণনায় এদের সংখ্যা ছয় লাখ থেকে পঁচিশ লাখ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিহাসে এরূপ দৃশ্য অত্যন্ত বিরল। [৪৪]

সারা জীবন ধরে তার দ্বীনদারী চরিত্র তার পরিচিত লোকদেরকে ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে। খলিফার নিকট থেকে ভাতা গ্রহণ করায় তিনি তার ছেলে সালিহ ও আব্দুল্লাহকে বর্জন করেছিলেন। তিনি বিলাসিতাকে ঘৃণা করতেন এবং নিজে যা কিছু উপার্জন করতেন তা দিয়ে তার প্রয়োজন নির্বাহ করতেন। দ্বীনি বিশ্বাসে অত্যন্ত দৃঢ়চেতা ও নীতিবান হওয়া সত্ত্বেও প্রকৃতিগত দিক দিয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র এবং অন্য কারো কষ্টের প্রতি যথেষ্ট সজাগ। সততা ও সুবিচার ছিল তার চরিত্রের সর্বাধিক প্রশংসিত দিকসমূহের অন্যতম। [৪৫]

শেষের কিছু দিন বাদে ইমাম আহমাদ তার সমগ্র জীবন হাদীসের সেবায় নিয়োজিত করেন। তার বিপুল সংখ্যক ছাত্রের মাধ্যমে তিনি হাদীসের জ্ঞানকে মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে দেন। কুরআন ও সুন্নাহ থেকে প্রাসঙ্গিক প্রমাণ উপস্থাপন করে দ্বীনের বিভিন্ন বিষয়ে তিনি গ্রন্থ রচনা করেছেন। ইবনুন নাদীম তার আল ফিহরিস্ত গ্রন্থে ইমাম আহমাদের তেরটি গ্রন্থের কথা উল্লেখ করেছেন, অন্যদিকে কিতাবুস সালাহ-এর ন্যায় আরো কিছু গ্রন্থও তার নামে প্রকাশিত হয়েছে।

মুসনাদ গ্রন্থটি প্রশ্নাতীতভাবে তার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি। এটি সঙ্কলনের সময়কাল অজানা; তবে তার গঠনশৈলী ও বিষয়সূচী থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, এ কাজ সুদীর্ঘ সময় ধরে তার সঙ্কলকের মন-মানসকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নাবী -এর সকল হাদীস সংগ্রহ করা যা তার মাণদণ্ডে বিশুদ্ধ এবং যাকে যুক্তি-তর্কের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। তিনি কখনো দাবি করেননি যে, তার গ্রন্থের সবকিছুই বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য। বরং তিনি বিভিন্ন সময় তার গ্রন্থ থেকে অনেক হাদীস বাদ দিয়েছেন; এমনকি মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থায়ও তিনি তার ছেলেকে মুসনাদ গ্রন্থ থেকে একটি হাদীস বাদ দিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এ গ্রন্থ রচনা করার ক্ষেত্রে ইবনু হাম্বল তার বিপুল জ্ঞান ভাণ্ডার ও সমগ্র হাদীস সাহিত্যের যতখানি তার নিকট সুলভ ছিল তার সহযোগিতা নিয়েছেন। প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ বর্ণনা থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিনি ত্রিশ হাজার হাদীস বেছে নিয়েছেন যা ৯০৪ জন সাহাবী বর্ণনা করেছেন। এসব হাদীসের বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে মাগাযী, মানাকিব, আনুষ্ঠানিক ইবাদাত, আইন-কানুন ও ভবিষ্যদ্বাণী ইত্যাদি। সুদীর্ঘ তের বছর যাবৎ তিনি তার হাদীস সংক্রান্ত নোটসমূহের বিভিন্ন অংশ তার ছাত্র, ছেলে ও ভাইয়ের ছেলের মাধ্যমে লিখিয়ে নিয়েছেন। তিনি নিজেই তার নোটসমূহকে মুসনাদ আকারে সাজাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এর আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ফলে মুসনাদ আকারে বিন্যাসের দায়িত্ব এসে পড়ে তার ছেলে আব্দুল্লাহর ওপর যিনি তার পিতার নোটসমূহকে সম্পাদনা করেছেন। [৪৬]

হাদীস ও তার বর্ণনাকারী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ইবনু হাম্বল কঠোর ছিলেন না। তিন তার নোটসমূহে এমন কিছু বিষয়কেও স্থান দিয়েছেন যাকে কোনোভাবেই হাদীস হিসেবে গণ্য করা যায় না। মুসনাদ গ্রন্থের অনেক হাদীসকে পরবর্তী কালের হাদীস বিশারদগণ ভিত্তিহীন ও জাল আখ্যায়িত করেছেন এবং ইবনু হাম্বল যেসব বর্ণনাকারীর ওপর নির্ভর করেছেন আসমাউর রিজাল বিশেষজ্ঞগণ তাদের অনেককে সন্দেহজনক আখ্যায়িত করেছেন। এদের মধ্যে সর্বাধিক আলোচিত বর্ণনাকারী হলেন আব্দুল্লাহ ইবনু লাহিয়্যাহ (৭১৫-৭৯০), যার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক আজও অব্যাহত রয়েছে।

তবে ইবনু হাম্বলের মুসনাদ গ্রন্থের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। একাধিক বর্ণনাকারীর নিকট থেকে কোনো হাদীস গ্রহণ করার সময় তিনি তাদের মধ্যকার সূক্ষ্মতম পার্থক্যটিও তুলে ধরেছেন।

ইবনু হাম্বলের ছেলে আব্দুল্লাহ (আবু আব্দির রহমান) তার পিতার রেখে যাওয়া নোটসমূহকে সম্পাদনা করার সময় পিতার সতর্ক তত্ত্বাবধান ও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ- এ দু'টি বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেছেন। তিনি তার পিতার বিপুল কিন্তু অসম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপির পুরোটার সাথে নিজের সেসব নোট মিলিয়ে দেখেছেন যা তিনি ইবনু হাম্বল ও অন্যান্য হাদীসবিশারদদের কাছে পাঠদানকালে লিখে রেখেছিলেন। তাছাড়া তিনি এর সাথে সেসব তথ্যকেও মিলিয়ে দেখেছেন যা তিনি তার পিতা ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের সাথে সাধারণ জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনা থেকে শিখেছিলেন। [৪৭]

ইবনু হাম্বলের মুসনাদ গ্রন্থটি হাদীস সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। আরবি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় গ্রন্থ প্রণয়ণের ক্ষেত্রে লেখকরা এ গ্রন্থটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। অসংখ্য বিশেষজ্ঞ ও গ্রন্থকার ভাষ্য কিংবা টীকা প্রণয়নের জন্য মুসনাদ গ্রন্থটিকে ব্যবহার করেছেন; কেউ কেউ আবার এ গ্রন্থটিকে ব্যবহার করেছেন নিজস্ব গ্রন্থ রচনা বা সঙ্কলন প্রণয়নের ক্ষেত্রে। তাদের মধ্যে অল্প কয়েকজনের নাম আমরা এখানে উল্লেখ করছি।

আবু আমর মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াহিদ (মৃত্যু ৯৫৬সাল) মুসনাদ গ্রন্থটিকে পুনঃ- সম্পাদিত করে তাতে কিছু বাড়তি হাদীস যোগ করে দিয়েছেন। অভিধান বিশারদ বাওয়ারতী (মৃত্যু ১১৫৫ সাল) পুরোপুরি এ গ্রন্থের ওপর ভিত্তি করেই তার গারীবুল হাদীস গ্রন্থটি রচনা করেছেন। ইযযুদ্দীন ইবনুল আছীর (মৃত্যু ১২৩৪ সাল) তার জীবনচরিত বিষয়ক অভিধান উসুদুল গাবাহ রচনার ক্ষেত্রে ইবনু হাম্বলের মুসনাদ গ্রন্থটিকে অন্যতম উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ইবনু হাজার (মৃত্যু ১৫০৫ সাল) যেসব গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের ভিত্তিতে তার আতরাফ গ্রন্থটি রচনা করেছেন তার মধ্যে উক্ত মুসনাদ গ্রন্থটি অন্যতম। সিরাজুদ্দীন উমার ইবনুল মুলাক্কিন (মৃত্যু ১৪০২ সাল) এ গ্রন্থটির একটি সারাংশ রচনা করেছেন। সুয়ূতী (মৃত্যু ১৫০৫ সাল) তার ব্যাকরণ বিষয়ক গ্রন্থ উকূদুল জাবারজাদ-এর ভিত্তি হিসেবে এ গ্রন্থটিকে ব্যবহার করেছেন। আবুল হাসান উমার ইবনুল হাদী সিন্দী (মৃত্যু ১৭২৬ সাল) মুসনাদ গ্রন্থের একটি বিস্তৃত ভাষ্য রচনা করেছেন, আর যাইনুদ্দীন উমার ইবনু আহমাদ শাম্মা হালাবী এ গ্রন্থ থেকে কিছু নির্বাচিত অংশ নিয়ে আল মুন্তাক্কা মিন মুসনাদি আহমাদ নামে একটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। আবু বাক্ মুহাম্মাদ ইবনু আব্দিল্লাহ এটিকে পুনঃসম্পাদিত করে মূল বর্ণনাকারীদের নামসমূহের বর্ণানুক্রমিক বিন্যাস অনুযায়ী হাদীসগুলোকে সাজিয়ে দিয়েছেন। নাসিরুদ্দীন ইবনু যুরাইক মুছান্নাফ পদ্ধতিতে এ গ্রন্থটির আরেকটি সংস্করণ প্রস্তুত করেছেন, অন্যদিকে আবুল হাসান হাইছামী এ গ্রন্থের সেসব হাদীস একত্রিত করেছেন যা সাধারণভাবে গৃহীত হাদীসের ছয়টি গ্রন্থে পাওয়া যায় না।[৪৮]

মুসনাদ বিষয়ক অন্যান্য গ্রন্থাবলী
তায়ালিসী ও ইবনু হাম্বলের ন্যায় আরো অনেকে একই পদ্ধতিতে মুসনাদ গ্রন্থ রচনা করেছেন, তবে তাদের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর খুঁটিনাটি বিষয়াবলীতে কিছু পার্থক্য রয়েছে। এসব মুহাদ্দিসের মধ্যে রয়েছেন আবু মুহাম্মাদ আব্দুল হামীদ ইবনু হুমাইদ (মৃত্যু ৮৬৩ সাল), আবু আওয়ানাহ (মৃত্যু ৯২৯ সাল), ইবনু আবী শাইবাহ (মৃত্যু ৮৪৯ সাল), ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহ (মৃত্যু ৮৫২ সাল), হুমাইদী (মৃত্যু ৮৩৪ সাল) ও আবু ইয়া'লা (মৃত্যু ৯১৯ সাল) প্রমুখ রহ.।

টিকাঃ
[৩৮] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ৭৭।
[৩৯] স্টাডিজ ইন হাদীস মেথডলজি, পৃ, ৮৪।
[৪০] তাহযীবুত তাহযীব, খণ্ড ১, নং ১২৬।
[৪১] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ৭৮-৯।
[৪২] স্টাডিজ ইন হাদীস মেথডলজি, পৃ, ৮০।
[৪৩] তাবাকাতুশ শাফিইয়্যাহ, খণ্ড ১, পৃ, ২০০ ও আহমাদ ইবনু হাম্বল এন্ড দ্যা মিহনা, পৃ, ১০৮, ১১২ ও ১৪৫।
[৪৪] তাবাকাতুশ শাফিইয়‍্যাহ, খণ্ড ১, পৃ, ২০০-৪ ও আহমাদ ইবনু হাম্বল এন্ড দ্যা মিহনা, পৃ, ১৭১।
[৪৫] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ৮০-১।
[৪৬] বুস্তানুল মুহাদ্দিসীন, পৃ, ৩১।
[৪৭] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ৮৩-৪।
[৪৮] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ৮৫-৬।

📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 মুসান্নাফ গ্রন্থাবলী

📄 মুসান্নাফ গ্রন্থাবলী


মুসনাদ গ্রন্থের তুলনায় অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কলন হলো মুসান্নাফ। সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হাদীস সঙ্কলনসমূহ মূলত এ প্রকৃতির গ্রন্থ; যেমন ইমাম বুখারী ও মুসলিমের সহীহ এবং ইমাম নাসাঈ, আবু দাউদের সুনান গ্রন্থাবলী। প্রথম দিকের মুসান্নাফ গ্রন্থাবলীর অধিকাংশ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ওয়াকী (মৃত্যু ৮১২ সাল)-এর মুসান্নাফ গ্রন্থের কথা আমরা কেবল পরবর্তী পর্যায়ের গ্রন্থাবলীর উদ্ধৃতির মাধ্যমে জানতে পারি।[৪৯]

মুসান্নাফু আব্দির রাজ্জাক
সর্বপ্রাচীন যে মুসান্নাফ গ্রন্থটি আজো টিকে আছে তা হলো ইয়েমেনের সানা'র অধিবাসী আবু বাক্ আব্দুর রাজ্জাক ইবনু হুমাম (৭৪৩-৮২৬)-এর মুসান্নাফ। ভারতের হাদীস বিশেষজ্ঞ হাবীবুর রহমান আজমী গ্রন্থটিকে দক্ষতার সাথে সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছেন।

আব্দুর রাজ্জাক বিশ বছর বয়সে হাদীস অধ্যয়ন শুরু করেন। তিনি মা'মারের সংস্পর্শে সাত বছর অবস্থান করে তার নিকট থেকে হাদীসের জ্ঞানার্জন করেন এবং ইবনু জুরাইজের ন্যায় প্রথম সারির অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে অধ্যয়ন করেন। পরিশেষে তিনি নিজেই তার সময়ের হাদীস শাস্ত্রে অসাধারণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ব্যক্তিবর্গের একজনে পরিণত হন। পরবর্তী কালের অনেক লেখকই তার প্রতি তাদের ঋণের কথা স্বীকার করেছেন যাদের মধ্যে রয়েছেন ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন ও আহমাদ ইবনু হাম্বলের ন্যায় হাদীস বিশারদগণ। বলা হয়ে থাকে যে, আব্দুর রাজ্জাকের সাথে সাক্ষাৎ করার লক্ষ্যে যে পরিমাণ লোক সফর করেছে, নাবী -এর ইন্তেকালের পর কোনো ব্যক্তির সাথে সাক্ষাতের জন্য আর কখনো এতো বিপুল সংখ্যক লোক সফর করেনি। আইন শাস্ত্রের গ্রন্থাবলীতে যেভাবে বিভিন্ন অধ্যায়কে ভাগ করা হয়, আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্কলন গ্রন্থটিকেও সেভাবে বিভক্ত করে প্রত্যেকটি অধ্যায়ে বিষয়বস্তু অনুযায়ী হাদীস সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে। সর্বশেষ অধ্যায়টি হলো শামায়েল সংক্রান্ত এবং সর্বশেষ হাদীসটি হলো নাবী -এর চুলের বর্ণনা সম্পর্কে।[৫০]

মুসান্নাফু ইবনি আবী শাইবাহ
আব্দুর রাজ্জাকের মুসান্নাফের তুলনায় আবু বাক্ মুহাম্মাদ ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনু আবী শাইবাহ (মৃত্যু ৮৪৯ সাল)-এর মুসান্নাফ গ্রন্থটি অধিকতর ব্যাপক। খলিফা মানসুরের শাসনামলে তার দাদা ওয়াসিতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এ পরিবারে জন্ম নিয়েছেন বহু হাদীস বিশারদ। কুফায় অবস্থান করে তিনি নিজেই আবু যুর'আহ, বুখারী, মুসলিম ও আহমাদ ইবনু হাম্বলের ন্যায় প্রথম সারির মুহাদ্দিসদের নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার মুছান্নাফ গ্রন্থটি- যাকে হাদীস শাস্ত্রের অন্যতম প্রাথমিক উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়- সম্প্রতি তের খণ্ডে মুদ্রিত হয়েছে।[৫১]

সহীহ বুখারী
হাদীস সঙ্কলনসমূহের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুসান্নাফ গ্রন্থ হলো ইমাম বুখারীর আল জামিউস সহীহ। এ সঙ্কলকের ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তিনি বালখ, মারভ, নিশাপুর, হিজাজ, মিশর ও ইরাকের ন্যায় দূরদূরান্তে বসবাসরত সহস্রাধিক হাদীস বিশেষজ্ঞের নিকট থেকে তিনি জ্ঞানার্জন করেছেন। প্রত্যেকটি হাদীস লিপিবদ্ধ করার পূর্বে ইমাম বুখারী সালাতে আল্লাহর নিকট সাহায্য চাইতেন। প্রত্যেকটি শব্দ লিখার পূর্বে তিনি তা যথার্থতার সাথে মূল্যায়ন করে নিতেন। এ সহীহ গ্রন্থ রচনার পেছনে তিনি তার জীবনের এক-চতুর্থাংশেরও বেশী সময় ব্যয় করেছেন। মুসলিমরা এ গ্রন্থটিকে হাসীস গ্রন্থের মধ্যে সর্বাধিক বিশুদ্ধ গ্রন্থ মনে করে।

আবু আব্দিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল বুখারী ৮১০ খ্রিস্টাব্দে বুখারায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন পারস্য বংশোদ্ভূত। তার পূর্বপুরুষ বারদিযবাহ ছিলেন বুখারার সংলগ্ন এলাকার একজন কৃষক। মুসলিমরা ঐ এলাকা জয় করার পর তাকে বন্দী করে নিয়ে আসা হয়। বারদিযবাহ-এর পুত্র মুগীরা নাম ধারণ করে বুখারার মুসলিম গভর্নর ইয়ামান জু'ফীর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং গভর্নরের বংশনামের সাথে মিলিয়ে তিনিও 'জু'ফী' পদবী অর্জন করেন। মুগীরার পুত্র ইবরাহীম (ইমাম বুখারীর দাদা)-এর ইসমাঈল নামে এক পুত্র সন্তান ছিল যিনি একজন মহান দ্বীনদার ও খ্যাতিমান হাদীস বিশারদে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি মালিক ইবনু আনাস, হাম্মাদ ইবনু যাইদ ও ইবনুল মুবারকের ন্যায় বেশ কয়েকজন বিখ্যাত হাদীসবিশারদের তত্ত্বাবধানে অধ্যয়ন করেন।[৫২] নীতিবান স্বভাবের অধিকারী এ মনীষীর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তিনি তার মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থায় বলেছিলেন যে, তার মালিকানায় এমন একটি পয়সাও নেই যা তিনি নিজের সৎ শ্রমের মাধ্যমে অর্জন করেননি।

সমকালীন বহু বিশেষজ্ঞের ন্যায় ইমাম বুখারীও তার মায়ের তত্ত্বাবধানে নিজ শহরে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। মাত্র এগারো বছর বয়সে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে হাদীস শাস্ত্রের অধ্যয়নে তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেন। ছয় বছরে তিনি বুখারার সকল মুহাদ্দিসের জ্ঞান আয়ত্ত করে ফেলেন। পাশাপাশি যেসব বই-পুস্তক সেখানে সুলভ ছিল তিনি সেগুলোর জ্ঞানও অর্জন করে ফেলেন। ইমাম বুখারী শুধু বিশেষজ্ঞদের গ্রন্থাবলীর হাদীসসমূহই মুখস্ত করেননি, পাশাপাশি তিনি বর্ণনাসূত্রে উল্লিখিত সকল বর্ণনাকারীর জন্ম-মৃত্যুর স্থান-কাল ইত্যাদি সহ পুরো জীবন বৃত্তান্তও মুখস্ত করে ফেলেন। তারপর হজ্জের উদ্দেশ্যে তিনি মা ও ভাইকে নিয়ে মক্কা গমন করেন।

পবিত্র মক্কা নগরী থেকে তিনি হাদীসের সন্ধানে একের পর এক ভ্রমণ শুরু করেন। এ সফরে তিনি ইসলামী শিক্ষার সব ক'টি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে গিয়ে যেখানে যতোদিন থাকা প্রয়োজন সেখানে ততোদিন অবস্থান করেন। সেখানে তিনি মুহাদ্দিসদের সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের জানা সকল হাদীস শেখেন এবং তার নিজের জ্ঞান তাদের নিকট পৌঁছে দেন। বর্ণিত আছে যে, তিনি বসরায় চার-পাঁচ বছর এবং হিজাযে ছয় বছর অবস্থান করেন। তিনি দু'বার মিশর ও অসংখ্য বার কুফা ও বাগদাদ সফর করেন।[৫৩]

ইমাম বুখারীর এ ভ্রমণ প্রায় চার দশক ধরে চলতে থাকে। ৮৬৪ সালে তিনি মধ্য এশিয়ার বিখ্যাত শহর নিশাপুর আসেন যেখানে তাকে তার স্তরের মুহাদ্দিসের জন্য উপযুক্ত বিশাল সংবর্ধনা দেয়া হয়। এখানে তিনি হাদীসের পাঠদানে নিজেকে নিয়োজিত করেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তবে মুহাদ্দিস মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াহইয়া যুহালীর প্রতিযোগিতার দরুন তিনি নিশাপুর ছাড়তে বাধ্য হন; কারণ খালিদ ইবনু আহমাদ যুহালীর প্রাসাদে হাদীসের ওপর পাঠদানের জন্য তাকে অনুরোধ করা হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বুখারার নিকটবর্তী গ্রাম খারতাঙ্ক-এর অধিবাসীদের অনুরোধে তিনি নিশাপুর ছেড়ে সেখানে চলে যান এবং ৮৭০ সালে ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন।[৫৪]

ইমাম বুখারীর সারা জীবনের আচরণে একজন দ্বীনদার মুসলিম বিশেষজ্ঞের চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। দ্বীনি দায়িত্ব পালনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। তিনি ব্যাবসার মাধ্যমে নিজের জীবিকা উপার্জন করতেন, আর এ ক্ষেত্রে তার সততা ছিল প্রবাদতুল্য। মূলত তার আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয়িত হতো ছাত্র ও গরীবদের কল্যাণে। বলা হয়ে থাকে যে, রেগে যাওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকলেও তিনি কখনো কারো প্রতি বদ মেজাজ প্রদর্শন করেননি; মনের ভেতর তিনি কারো প্রতি বিদ্বেষও পোষণ করতেন না। এমনকি যাদের কারণে তাকে নিশাপুর ছাড়তে হয়েছে তাদের প্রতিও তিনি কোনো বিদ্বেষ পোষণ করেননি।[৫৫]

কর্মজীবনের সূচনা লগ্ন থেকেই ইমাম বুখারী বিস্ময়কর প্রতিভার বহু নিদর্শন দেখিয়েছেন। বলা হয়ে থাকে যে, এগারো বছর বয়সে তিনি তার শিক্ষকের একটি ভুল ধরিয়ে দিয়েছিলেন। তরুণ ছাত্রের স্পর্ধা দেখে শিক্ষক হেসে দিলেও বুখারী তার সংশোধনীর ওপর অটল থাকেন এবং শিক্ষককে তার গ্রন্থ খুলে দেখার অনুরোধ জানান; গ্রন্থ খোলার পর ছাত্রের বক্তব্যই সঠিক প্রমাণিত হয়।

বিভিন্ন সময় ইমাম বুখারীর জ্ঞানের কঠিন পরীক্ষা নেয়া হয়েছে, আর তা ছিল সে সময়ের কঠোরমনা বিশেষজ্ঞদের গৃহীত একটি সাধারণ রীতি। সেসব পরীক্ষার সব ক'টিতেই তিনি কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন। একবার এক গণ সমাবেশে বাগদাদের দশ জন মুহাদ্দিস এক শ' হাদীসের বর্ণনাসূত্র ও বিষয়বস্তু রদবদল করে ইমাম বুখারীর সামনে পাঠ করেন এবং তাকে সেসব হাদীসের ব্যাপারে প্রশ্ন করেন। ইমাম বুখারী তাদের পঠিত হাদীসের ব্যাপারে প্রথমে তার অজ্ঞতা স্বীকার করেন। তারপর তিনি সংশ্লিষ্ট সবগুলো হাদীসের বিশুদ্ধ রূপ পাঠ করে শুনিয়ে দেন এবং বলেন যে, সম্ভবত তার প্রশ্নকারীরা অসাবধানতাবশত সেসব হাদীস ভুলভাবে পাঠ করেছেন। সমরকন্দে একই পদ্ধতিতে চার শ' ছাত্র ইমাম বুখারীর জ্ঞানের পরীক্ষা নিয়েছেন এবং সেসব ছাত্র হাদীসের কোনো কোনো স্থানে নিজেদের পক্ষ থেকে কী কী শব্দ ঢুকিয়েছেন তিনি তা নির্ভুলভাবে তুলে ধরেন। পুনপুন, এসব পরীক্ষা এবং এসব পরীক্ষায় ইমাম বুখারীর সফলতার ফলে আহমাদ ইবনু হাম্বল, আলী ইবনুল মাদীনি, আবু বাক্ ইবনু আবী শাইবাহ, ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহ প্রমুখের ন্যায় সমকালীন যেসব প্রথম সারির মুহাদ্দিসগণের সংস্পর্শে তিনি এসেছিলেন তারা সবাই তাকে সে সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। [৫৬]

১৮ বছর বয়সে মদীনায় অবস্থানকালে ইমাম বুখারী গ্রন্থ রচনা শুরু করেন। সে সময় তিনি প্রথম দিকের দু'টি গ্রন্থ সঙ্কলন করেন। একটি গ্রন্থে ছিল সাহাবী ও তাবি'ঈদের মতামত ও সিদ্ধান্তসমূহ, আর অপর গ্রন্থে ছিল তার সময়কার গুরুত্বপূর্ণ হাদীস বর্ণনাকারীদের সংক্ষিপ্ত জীবন চরিত। তারপর তিনি অন্যান্য বিষয়ের ওপর বিপুল সংখ্যক সঙ্কলন প্রস্তুত করেন। মুকাদ্দিমাতু ফাতহিল বারী, ইরশাদুস সারী ও আল ফিহরিস্ত গ্রন্থে ইমাম বুখারীর রচনাবলীর একটি তালিকা প্রদান করা হয়েছে।

সহীহ গ্রন্থটি- যা সর্বসাধারণ্য সহীহ বুখারী নামে পরিচিত- তার রচিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। বর্ণিত আছে যে, গ্রন্থকারের ৯০,০০০ ছাত্র তার নিকট থেকে এ গ্রন্থের পাঠ শুনেছেন। প্রায় সকল মুহাদ্দিসের মতে এটি হলো হাদীস সঙ্কলনসমূহের মধ্যে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য। [৫৭]

ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহ (৭৮২-৮৫২)-এর একটি আকস্মিক মন্তব্য থেকে ইমাম বুখারী উক্ত সহীহ গ্রন্থ সঙ্কলনের একটি ধারণা পেয়েছিলেন। ইসহাক বলেছিলেন যে, তিনি চান কোনো এক মুহাদ্দিস যেন এমন একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু সর্বব্যাপী গ্রন্থ সঙ্কলন করে যাতে শুধু বিশুদ্ধ হাদীসসমূহই স্থান পাবে। এ মন্তব্য ইমাম বুখারীর কল্পনাকে চাঙ্গা করে দেয়। অতঃপর তিনি অদম্য শক্তি ও যত্ন সহকারে কাজ শুরু করে দেন। তার জানা সবগুলো হাদীস তিনি নিখুঁততভাবে যাচাই করে তার নিজের উদ্ভাবিত মুল্যায়ন পদ্ধতি অনুযায়ী সেসব হাদীসের বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করে দেখেন। অতঃপর হাদীসের ৬,০০,০০০ বর্ণনা থেকে ৯,০৮২টি হাদীস বেছে নেন। পুনরাবৃত্তি বাদ দিলে তার বাছাইকৃত হাদীসের প্রকৃত সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২,০৬২টি।[৫৮] তিনি সেসব হাদীসকে বিষয়বস্তু অনুযায়ী স্বতন্ত্র শিরোনামের অধীনে বিন্যস্ত করেন; অধিকাংশ শিরোনাম নেয়া হয়েছে কুরআন থেকে আর কিছু ক্ষেত্রে শিরোনাম নেয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট হাদীস থেকে।

যেহেতু ইমাম বুখারী তার গ্রন্থের কোথাও উল্লেখ করেননি যে, হাদীসের বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করার জন্য তিনি মূল্যায়নের কী কী নিয়ম প্রয়োগ করেছেন, কিংবা তিনি যেহেতু এ গ্রন্থ প্রণয়নের নেপথ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদেরকে অবহিত করেননি সেহেতু পরবর্তীকালের বিশেষজ্ঞগণ গ্রন্থের মূলপাঠ থেকে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। হাযিমী তার শুরূতুল আয়িম্মাহ গ্রন্থে, ইরাকী তার আলফিয়্যাহ গ্রন্থে, আইনী ও কাস্তালানী সহীহ বুখারীর ওপর স্ব স্ব ভাষ্যের ভূমিকায় এবং ইবনুস সালাহ এর ন্যায় অন্যান্য লেখকবৃন্দ বুখারীর উপস্থাপিত তথ্য থেকে তার ব্যবহৃত মূলনীতিসমূহ বের করে আনার প্রয়াস চালিয়েছেন।[৫৯]

ইমাম বুখারীর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল শুধু বিশুদ্ধ হাদীসসমূহ একসাথে সংগ্রহ করে দেয়া। কোনো বর্ণনাকারীর বর্ণনাকে ইমাম বুখারী ঠিক তখনই তার গ্রন্থে স্থান দিয়েছেন যখন তিনি স্পষ্টভাবে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন যে, তিনি সেসব হাদীস নিজ শিক্ষকের নিকট থেকে গ্রহণ করেছেন। এক্ষেত্রে তাদের বক্তব্য দ্ব্যর্থক হলে তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে খোঁজ-খবর নিয়ে নিশ্চিত হতেন যে, তাদের শিক্ষকের সাথে তাদের সাক্ষাতের বিষয়টি প্রামাণ্য এবং তারা কোনো অসতর্ক মন্তব্য করেছেন বলে জানা যায় না। তবে এটা ধরে নেয়া ভুল হবে যে, সহীহ বুখারী গ্রন্থটি ভুল-ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কয়েক জায়গায় বর্ণনাকারীদের নির্ভরযোগ্যতা মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি যে মতামত দিয়েছেন তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে এবং হাদীস বিশারদগণ তা উল্লেখ করে দিয়েছেন। ইমাম দারাকুতনী (৯১৮-৯৯৫) তার আল ইসতিদরাক ওয়াত তাতাব্বু' নামক গ্রন্থে সহীহ বুখারীর প্রায় দু' শত হাদীসের দুর্বলতা দেখানোর চেষ্টা করেছেন; ইমাম জাযায়েরী তার তাওজীহুন নাজার গ্রন্থে তার সারাংশ পেশ করেছেন।[৬০] জালালুদ্দীন সুয়ূতীর মতে ৮০ জন বর্ণনাকারী ও ১১০টি হাদীসের ব্যাপারে সমালোচনা রয়েছে। সমালোচনায় দেখা গিয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট হাদীসসমূহ ভুল বা মিথ্যা প্রমাণিত না হলেও সেগুলো ইমাম বুখারীর নির্ধারিত উচ্চ মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়নি।[৬১] দৃষ্টান্তস্বরূপ, ইমাম তিরমিযী বলেন, 'ইবনু আবী লাইলা'র হাদীসসমূহকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল বলেছেন, 'ইবনু আবী লাইলা একজন সাদূক (সত্যবাদী)'। তবে আমি তার নিকট থেকে কোনো হাদীস বর্ণনা করি না, কারণ তিনি তার প্রামাণ্য ও দুর্বল বর্ণনাসমূহের মধ্যে পার্থক্য করতে জানেন না। কারো অবস্থা এরূপ হলে আমি তার নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করি না।[৬২] দামেশকের আবু মাসউদ এবং আবু আলী গাস্সানীও সহীহ বুখারীর কিছু বর্ণনার সমালোচনা করেছেন, অন্যদিকে বদরুদ্দীন আইনী তার বিখ্যাত ভাষ্যে এ গ্রন্থের কতিপয় বিষয়ের ত্রুটি তুলে ধরেছেন।

সহীহু মুসলিম
ইমাম বুখারীর সহীহ গ্রন্থটি হাদীস সাহিত্যে প্রতিদ্বন্দ্বীহীন নয়। প্রায় একই সময়ে আরেকটি সহীহ গ্রন্থ প্রণীত হচ্ছিল যাকে কেউ কেউ সহীহ আল বুখারীর তুলনায় শ্রেষ্ঠতর মনে করেছেন; কারো কারো দৃষ্টিতে তা বুখারীর গ্রন্থটির সমমানের, আর অধিকাংশের দৃষ্টিতে তার অবস্থান সহীহ বুখারীর পরপরই। এ গ্রন্থটি হলো নিশাপুরের আরব কুশাইরী বংশোদ্ভূত মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ ইবনু মুসলিম-এর সহীহ।

ইমাম মুসলিমের বাল্য জীবন সম্পর্কে খুব অল্পই জানা যায়। বলা হয়ে থাকে যে, তিনি ৮১৭ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। খুবই অল্প বয়সে প্রথাগত জ্ঞানসমূহে ব্যাপক ব্যুৎপত্তি অর্জন করে তিনি হাদীস শাস্ত্রের প্রতি মনোনিবেশ করেন। এতদুদ্দেশ্যে তিনি ব্যাপক সফরে নেমে পড়েন এবং পারস্য, ইরাক, সিরিয়া ও মিশরের সব ক'টি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান শিক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। তিনি তার সময়ের প্রখ্যাত মুহাদ্দিসদের অধিকাংশের পাঠদানে উপস্থিত হয়েছিলেন; তাদের মধ্যে ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহ, আহমাদ ইবনু হাম্বল, উবাইদুল্লাহ কাওয়ারীরী, শুয়াইহ ইবনু ইউনুস, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসলামাহ ও হামালাহ ইবনু ইয়াহ্ইয়ার নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। তিনি নিশাপুরে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে একটি ছোট্ট ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা উপার্জন করেন। এবং বাকি সময়টুকু নাবী -এর সুন্নাহর খেদমতে নিয়োজিত করেন। তিনি ৮৭৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

বলা হয়ে থাকে যে, তার চরিত্র ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ইমাম বুখারীর বিরুদ্ধে মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াহইয়া যুহালীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে যখন অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ ইমাম বুখারীকে পরিত্যাগ করেন, তখন ইমাম মুসলিম বুখারীকে সার্বক্ষণিক সঙ্গ প্রদান করেন। আর এর মাধ্যমে সত্যের প্রতি তার নির্ভীক আনুগত্যের দৃশ্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। [৬৩] বুখারীর ন্যায় তিনিও হাদীস ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বেশ কয়েকটি গ্রন্থ ও পুস্তক রচনা করেছেন। ইবনুন নাদীম হাদীস বিষয়ে তার পাঁচটি গ্রন্থের কথা উল্লেখ করেছেন। হাজী খলিফা অবশ্য হাদীস শাস্ত্রের ওপর তার আরো অনেকগুলো গ্রন্থের নাম যোগ করে দিয়েছেন। সহীহ গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে তিনি আড়াই লক্ষ হাদীস পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তা থেকে মাত্র চার হাজার হাদীস বেছে নিয়েছেন; মুহাদ্দিসগণ সর্বসম্মতভাবে এসব হাদীসকে বিশুদ্ধ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

ইমাম বুখারীর ন্যায় মুসলিমও একটি হাদীসকে তখনই সহীহ মনে করতেন যখন তা পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিবর্গের নিকট থেকে একটি নিরবচ্ছিন্ন বর্ণনাসূত্রের মাধ্যমে তার নিকট পৌঁছতো এবং যখন তা একই পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য তথ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতো ও সব ধরনের ত্রুটি থেকে মুক্ত থাকতো। তিনি হাদীসের একটি ত্রিবিধ শ্রেণীবিন্যাসকে গ্রহণ করেছিলেনঃ
প্রথমত, কিছু বর্ণনা ছিল এমন যা সৎ ও দৃঢ়চেতা বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে, যা অন্যান্য নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের বর্ণনার সাথে খুব একটা বিপরীতধর্মী নয় এবং যার বর্ণনাকারীগণ স্ব স্ব বর্ণনায় বোধগম্য পর্যায়ের কোনো বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেননি।
দ্বিতীয়ত, কিছু হাদীস ছিল এমন যার বর্ণনাকারীগণ প্রখর স্মৃতিশক্তি ও বর্ণনার দৃঢ়তার জন্য খুব একটা খ্যাতি অর্জন করতে সক্ষম হননি।
তৃতীয়ত, কিছু হাদীস ছিল এমন কিছু লোকের বরাতে বর্ণিত যাদের নির্ভরযোগ্যতাকে সকল বা অধিকাংশ মুহাদ্দিসই প্রশ্নবিদ্ধ আখ্যায়িত করেছেন।

ইমাম মুসলিমের মতে তার গ্রন্থের বেশীর ভাগ হাদীস প্রথম শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত; প্রথম শ্রেণীর হাদীসের সমর্থনে দ্বিতীয় শ্রেণীর কিছু হাদীস সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে, আর তৃতীয় শ্রেণীর হাদীসসমূহকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।[৬৪]

সহীহ গ্রন্থটির রচনা সম্পন্ন করার পর মন্তব্যের জন্য ইমাম মুসলিম তা বিখ্যাত মুহাদ্দিস রাইয়ের আবু যুর'আহর নিকট পেশ করেন। আবু যার 'আহ গ্রন্থটিকে নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করে দেখেন, অতঃপর যা কিছু তার দৃষ্টিতে ত্রুটিপূর্ণ মনে হয়েছে ইমাম মুসলিম তার প্রত্যেকটিকে বাদ দিয়ে কেবল সেসব হাদীস রেখে দিয়েছেন যেগুলোকে তিনি বিশুদ্ধ আখ্যায়িত করেছেন।

এভাবে যত্নের সাথে ইমাম মুসলিম কর্তৃক সঙ্কলিত ও আবু যার'আহ কর্তৃক সংশোধিত হওয়ায় সহীহু মুসলিম গ্রন্থটি সহীহ বুখারীর পর সর্বাপেক্ষা বিশুদ্ধ হাদীস সঙ্কলন হিসেবে সমাদৃত হয়েছে। বিষয়বস্তু বিন্যাসের বিস্তৃতির দিক দিয়ে এ গ্রন্থটি সহীহ বুখারীর তুলনায় শ্রেষ্ঠতর গ্রন্থের স্বীকৃতি লাভ করেছে। কতিপয় মুহাদ্দিসের মতে এ গ্রন্থটি সব দিক দিয়ে সহীহ বুখারীর তুলনায় শ্রেষ্ঠতর।

ইমাম মুসলিমের পর আরো কতিপয় বিশেষজ্ঞও সহীহ গ্রন্থ সঙ্কলন করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ইবনু খুযাইমাহ (মৃত্যু ৯২৫ সাল), আবু হাতিম মুহাম্মাদ ইবনু হিব্বান (মৃত্যু ৯৬৫ সাল) প্রমুখ।[৬৫] অবশ্য তাদের কেউই ইমাম বুখারী ও মুসলিমের ন্যায় মুসলিম জনতার মধ্যে ততোটা স্বীকৃতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করতে সমর্থ হননি।[৬৬]

টিকাঃ
[৪৯] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ৮৬।
[৫০] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ৮৭-৮৮।
[৫১] স্টাডিজ ইন হাদীস মেথডলজি, পৃ, ৮
[৫২] প্রাগুক্ত, পৃ, ৮৭।
[৫৩] মুকাদ্দিমাতু ফাতহিল বারী, পৃ, ৫৬৪।
[৫৪] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ৯০।
[৫৫] ইরশাদুস সারী, খণ্ড ১, পৃ, ৪৪ পাদটীকা।
[৫৬] ইরশাদুস সারী, খণ্ড ১, পৃ, ৩৬ পাদটীকা।
[৫৭] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ৯২-৩।
[৫৮] স্টাডিজ ইন হাদীস মেথডলজি, পৃ, ৮৯।
[৫৯] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ৯৩।
[৬০] প্রাগুক্ত, পৃ, ৯৬।
[৬১] তাদরীবুর রাবী, খণ্ড ১, পৃ, ১৩৪। দেখুন স্টাডিজ ইন হাদীস মেথডলজি, পৃ, ৯২।
[৬২] সুনানুত তিরমিযী, খণ্ড ২, পৃ, ১৯৯।
[৬৩] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ৯৭-৯।
[৬৪] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ৯৯-১০০।
[৬৫] শারহু সহীহ মুসলিম, পৃ, ৮।
[৬৬] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১০১ ও স্টাডিস, জি, পৃ, ৯২-৩।

📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 সুনান গ্রন্থাবলী

📄 সুনান গ্রন্থাবলী


সুনান গ্রন্থাবলী হাদীস সাহিত্যের সবচেয়ে সমৃদ্ধ শাখা দখল করে আছে। ইসলামের একেবারে শুরু থেকে মুহাদ্দিসগণ ঐতিহাসিক (মাগাযী) প্রকৃতির বর্ণনাসমূহের তুলনায় আইন ও আকীদাহ সংক্রান্ত বর্ণনাসমূহের প্রতি অধিক গুরুত্বারোপ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ তাদের যুক্তি ছিল, ঠিক কোন তারিখ নাবী ﷺ বদর থেকে ফিরে এসেছিলেন তা জানার মধ্যে মুসলিমদের কোনো বাস্তব উপযোগিতা নেই। তারা অনুভব করেছিলেন যে, মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে সেসব বিষয় থাকা উচিত যা মুসলিমদের প্রাত্যহিক জীবনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত, যেমন-উদ্‌, সালাত, ক্রয়-বিক্রয়, বিয়ে ইত্যাদি।
হিজরী তৃতীয় শতকের দ্বিতীয়ার্ধের পর দৈনন্দিন জীবন ঘনিষ্ট বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট হাদীসের ওপর গুরুত্বারোপের প্রবণতা আরো বেড়ে যায়। অধিকাংশ মুহাদ্দিসই শুধু সুনান সংক্রান্ত হাদীসসমূহ সঙ্কলন করেছেন। যেমন আবু দাউদ সিজিস্তানী, তিরমিযী, নাসাঈ, দারিমী, ইবনু মাজাহ, দারাকুতনী ও আরো বেশ কিছু সংখ্যক মুহাদ্দিসের সুনান গ্রন্থাবলী।[৬৭]

সুনানু আবী দাউদ
সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হাদীস সঙ্কলনসমূহের মধ্যে অন্যতম এ গ্রন্থটি হলো আবু দাউদ সুলাইমান ইবনুল আশ'আস সিজিস্তানীর কীর্তি; যার ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তিনি পাঁচ লক্ষ হাদীস পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এ গ্রন্থের জন্য চার হাজার আট শ' হাদীস বেছে নিয়েছেন। তারসুসে এ কাজ সম্পন্ন করতে তার বিশ বছর সময় লেগে গিয়েছিল।[৬৮]

আবু দাউদ ছিলেন আযদ গোত্রের ইমরানের বংশধর যিনি সিফফীনের যুদ্ধে আলী এর পক্ষে অবস্থানকালে নিহত হয়েছিলেন। আবু দাউদ ৮১৭ সালে খুরাসানের সুপরিচিত এলাকা সিজিস্তানে জন্মগ্রহণ করেন।

প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর দশ বছর বয়সে তিনি নিশাপুরের একটি বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে তিনি মুহাম্মাদ ইবনু আসলাম (মৃত্যু ৮৫৬)-এর তত্ত্বাবধানে অধ্যয়ন করেন। তারপর তিনি বসরায় চলে যান এবং হাদীস প্রশিক্ষণের অধিকাংশই সেখানে লাভ করেন। ৮৩৮ সালে কুফা পরিদর্শন করে সেখান থেকে হাদীসের সন্ধানে তিনি একের পর এক ভ্রমণে নেমে পড়েন। এ প্রক্রিয়ায় হিজায, ইরাক, পারস্য, সিরিয়া ও মিশর ভ্রমণ করে তিনি সমকালীন প্রথম সারির অধিকাংশ মুহাদ্দিসের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাদের নিকট থেকে হাদীসের অগাধ জ্ঞান অর্জন করেন।[৬৯]

এসব ভ্রমণের অংশ হিসেবে আবু দাউদ নিয়মিত বাগদাদ মহানগরীতে যেতে থাকেন। একবার সেখানে অবস্থানকালে বিখ্যাত সেনাপতি ও খলিফা মু'তামিদের ভাই আবু আহমাদ মুওয়াফ্ফাক তার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসেন। আবু দাউদ তার আগমনের উদ্দেশ্য জানতে চাইলে মুওয়াফ্ফাক তিনটি উদ্দেশ্যের কথা বলেন। প্রথমত, তিনি আবু দাউদকে বসরায় অবস্থান করার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে চান, কারণ ঝঞ্ঝা- বিদ্রোহের ফলে বসরা তখন পরিত্যক্ত নগরীতে পরিণত হয়েছিল। আশা করা যায়, বিখ্যাত বিদ্বানবর্গ ও তাদের ছাত্রবৃন্দ বসরায় স্থানান্তরিত হলে নগরটি আবার জনবহুল হয়ে ওঠবে।[৭০] দ্বিতীয়ত, তিনি আবু দাউদকে তার পরিবারের সদস্যদের পড়ানোর জন্য অনুরোধ জানাতে চান। তৃতীয়ত, তিনি চান আবু দাউদ যেন তার পরিবারের সদস্যদেরকে বিশেষভাবে পাঠদান করেন, যেখানে সাধারণ ছাত্ররা অংশগ্রহণ করবে না। আবু দাউদ প্রথম দু'টি অনুরোধ গ্রহণ করেন, কিন্তু তৃতীয় অনুরোধ রাখার ক্ষেত্রে তিনি তার অপারগতার কথা জানিয়ে দেন। তার দৃষ্টিতে জ্ঞানের ক্ষেত্রে সকলেই সমান এবং আবু দাউদ ধনী ও গরীব ছাত্রদের মধ্যে কোনো প্রকার তারতম্য বরদাশত করবেন না। ফলে মুওয়াফ্ফাকের ছেলেরাও অন্যান্য আগ্রহী ছাত্রদের পাশাপাশি আবু দাউদের পাঠচক্রে উপস্থিত হতো।

তাজুদ্দীন সুবকী কর্তৃক সংরক্ষিত এ গল্পটি শুধু এ বিষয়েরই প্রমাণ বহন করে না যে, একজন বিদ্বান ও নীতিবান ব্যক্তি হিসেবে আবু দাউদ ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছিলেন, বরং তিনি সর্বশেষ কখন বসরায় বসতি স্থাপন করেছিলেন তা থেকে এ বিষয়েরও একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এটি ৮৮৩ সালের পূর্বে সংঘটিত হওয়া সম্ভব নয়, কারণ ঐ বছরই ঝঞ্ঝা-বিদ্রোহ চূড়ান্তভাবে দমন করা হয়েছিল। ৮৮৮ সালে আবু দাউদ ৭৩ বছর বয়সে বসরায় মৃত্যুবরণ করেন।[৭১]

হাদীসের বিশ্বকোষতুল্য জ্ঞান, অবিকল মনে রাখার স্মৃতিশক্তি, সদ্ব্যবহার ও দয়ার জন্য তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। হাদীস ও আইন-কানুন বিষয়ে তার সর্বাধিক খ্যাতনামা গ্রন্থসমূহের অন্যতম হলো সুনান। এটি শুধু হাদীস সাহিত্যে সর্বপ্রথম সুনান গ্রন্থ হিসেবেই স্বীকৃত নয়, বরং একে সুনান গ্রন্থসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম ও সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ গ্রন্থটিকে বিভিন্ন অধ্যায় ও পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত করা হয়েছে।[৭২]

সংগৃহীত হাদীস পুনরায় উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আবু দাউদ যদিও তার পূর্বসূরীদের অনুসৃত সতর্কতা ও যথার্থতা ধরে রেখেছিলেন, তবুও হাদীস নির্বাচনের মাণদণ্ডের ব্যাপারে তিনি তার পূর্বসূরীদের সাথে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন। সুনান গ্রন্থে তিনি শুধু সহীহ হাদীসকেই সন্নিবিষ্ট করেননি, বরং এমন কিছু হাদীসও অন্তর্ভুক্ত করেছেন যা অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের শ্রেণীবিন্যাস অনুযায়ী দুর্বল বা সংশয়পূর্ণ। তিনি শুধু সেসব বর্ণনাকারীর ওপরই নির্ভর করেননি যাদেরকে সর্বসম্মতভাবে গ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে; তিনি সেসব বর্ণনাকারীর ওপরও নির্ভর করেছেন যাদের ব্যাপারে কিছু সমালোচনা রয়েছে। তার মতে, খুব বেশী দুর্বল না হলে একটি দুর্বল হাদীসও বিশেষজ্ঞদের ব্যক্তিগত মতের তুলনায় উত্তম। [৭৩] এটি অনিবার্যরূপে তার গ্রন্থের কোনো ত্রুটি নয়, কারণ শু'বার ন্যায় কতিপয় হাদীস বিশারদ বর্ণনাকারীদের সমালোচনায় অতিরিক্ত কঠোর ছিলেন। তা সত্ত্বেও আবু দাউদ তার জ্ঞান অনুযায়ী ফিকহের প্রত্যেকটি বিষয়ে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য হাদীস সংগ্রহ করার পাশাপাশি সেসব উৎসও উল্লেখ করে দিয়েছেন যার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট হাদীসসমূহ তার নিকট পৌঁছেছে; সাথে সাথে তিনি সেসব হাদীসের বিভিন্ন সংস্করণও উল্লেখ করেছেন। তিনি যেসব হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়েছেন সেগুলোর মধ্যে কোনো কোনো হাদীসের ত্রুটির প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার পাশাপাশি কোনো পাঠের আপেক্ষিক মূল্য কতটুকু তাও বর্ণনা করেছেন। অবশ্য যেসব হাদীসকে তিনি বিশুদ্ধ মনে করেছেন সেগুলোকে তিনি সম্পূর্ণ মন্তব্যহীন রেখে দিয়েছেন; তাছাড়া তিনি প্রায়শ দীর্ঘ হাদীসের মধ্যে শুধু সেটুকু অংশই উল্লেখ করেছেন যা সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ের সাথে প্রাসঙ্গিক।

কয়েকটি হাদীস প্রসঙ্গে আবু দাউদের নিম্নোক্ত মন্তব্য থেকে আমরা তার হাদীস মূল্যায়নের পদ্ধতি ও প্রকৃতি সম্পর্কে কিছুটা সাধারণ ধারণা লাভ করতে পারিঃ
'আবু দাউদ বলেন, এটি একটি অপ্রামাণ্য (মুনকার) হাদীস। সন্দেহ নেই যে, ইবনু জুরাইজ যিয়াদ ইবনু সা'দ থেকে, তিনি যুহরী থেকে এবং তিনি আনাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন যে নাবী ˜ তালপাতার একটি আংটি পরিধান করে আবার এক সময় তা পরিত্যাগ করেছিলেন।'

এ হাদীসের মধ্যকার ভুলের জন্য হুমামকে দায়ী করতে হবে, কারণ তিনি ছাড়া আর কেউ এ হাদীসটি বর্ণনা করেন নি। [৭৪]

আরেকটি হাদীসের বেলায় দু'টি সংস্করণ উল্লেখ করে তিনি বলেন,
‘আনাসের বর্ণনাটি অন্যদের বর্ণনার তুলনায় অধিকতর সঠিক’।[৭৫]

এই সুনান গ্রন্থকার যেহেতু এমন সব হাদীস সংগ্রহ করে দিয়েছেন যা আর কেউই একত্রিত করতে পারেনি, তাই বিভিন্ন মাযহাবের অসংখ্য বিশেষজ্ঞ— বিশেষত ইরাক, মিশর, উত্তর আফ্রিকা ও মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য অংশে— এ গ্রন্থটিকে একটি বিশুদ্ধ কীর্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন।[৭৬] সর্বাধিক পরিমাণ আইন সংক্রান্ত হাদীস স্থান পেয়েছে সুনানু আবী দাউদ গ্রন্থে।[৭৭]

এ গ্রন্থের ওপর অনেকগুলো ভাষ্য রচনা করা হয়েছে; তন্মধ্যে সর্বোত্তম ভাষ্যটি হলো শামসুল হক আযীমাবাদীর আওনুল মা'বুদ শারহু সুনানু আবী দাউদ। সম্প্রতি আহমাদ শাকিরের সম্পাদনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ভাষ্য কায়রো থেকে ৮ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। তাতে মুনযিরী ও ইবনুল কাইয়িমের ব্যাখ্যাসমূহ স্থান পেয়েছে।[৭৮]

সুনানুত তিরমিযী
হাদীস মুল্যায়নের ক্ষেত্রে আবু দাউদ যেসব সাধারণ নীতিমালা গ্রহণ করেছিলেন, তারই ছাত্র আবু ঈসা মুহাম্মাদ ইবনু ঈসা ইবনু সাওরাহ ইবনু মূসা দাহহাক তিরমিযী সেগুলোকে আরো উন্নত রূপ দিয়ে তার আল জামি' গ্রন্থে প্রয়োগ করেছেন। এ গ্রন্থে আইন, ধর্মতত্ত্ব ও ইতিহাস বিষয়ক বিপুল পরিমাণ হাদীসের সমাবেশ ঘটেছে, যেগুলোকে মূলধারার আইনবিদগণ ইসলামী আইনের উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ইমাম তিরমিযী ৮২১ সালে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। হাদীসের সন্ধানে ব্যাপক সফরকালে তিনি ইরাক, পারস্য ও খুরাসানের ইসলামী শিক্ষার বিখ্যাত কেন্দ্রসমূহ পরিদর্শন করেন। সেসব কেন্দ্রে তিনি বুখারী, মুসলিম, ও আবু দাউদ প্রমুখের ন্যায় বিখ্যাত মুহাদ্দিসগণের সাহচর্য লাভে সক্ষম হন। ৮৬২ সালে তিনি খুরাসান প্রদেশে তার নিজ শহরে ফিরে এসে জামি' গ্রন্থ রচনা করেন। এ গ্রন্থ রচনা করতে প্রায় বিশ বছর লেগে গিয়েছিল। ৮৯২ সালে আবু ঈসা তিরমিয এলাকায় মৃত্যুবরণ করেন।[৭৯]

আবু দাউদের ন্যায় তিরমিযীও অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও হুবহু মনে রাখার মতো স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন। অনেকবার তার এ স্মৃতিশক্তির কড়া পরীক্ষা নেয়া হয়েছিল। বর্ণিত আছে যে, তার সফরের প্রথম দিকে এক মুহাদ্দিস তাকে দিয়ে কিছু হাদীস লিপিবদ্ধ করিয়েছিলেন, যা লিখতে ষোল পৃষ্ঠা কাগজের প্রয়োজন পড়েছিল। কিন্তু পুনরায় পাঠ করার পূর্বে তিরমিযী ঐ কাগজগুলো হারিয়ে ফেলেন। কিছুদিন পর তিনি ঐ মুহাদ্দিসের সাথে পুনরায় সাক্ষাৎ করে কিছু হাদীস পাঠ করে শোনানোর জন্য তাকে অনুরোধ করেন। শিক্ষক বললেন যে, তিনি তার পাণ্ডুলিপি থেকে সেসব হাদীস পড়ে শোনাবেন যা তিনি পূর্বের সাক্ষাতের সময় তিরমিযীকে দিয়ে লিখিয়েছেন এবং তিরমিযী যেন তার লিখিত নোটসমূহের সাথে তার বক্তব্যকে মিলিয়ে দেখেন। তিনি তার লিখিত কাগজগুলো হারিয়ে ফেলেছেন— এ কথা না বলে তিরমিযী কিছু খালি কাগজ হাতে নিয়ে সেগুলোর দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন সেখানে তার পূর্বের লেখাসমূহ রয়েছে; এমতাবস্থায় শিক্ষক তার গ্রন্থ পাঠ করতে শুরু করেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই শিক্ষক তার চালাকি ধরে ফেলেন এবং তার আচরণে রাগান্বিত হয়ে ওঠেন। তবে তিরমিযী ব্যাখ্যা করে বললেন যে, তিনি তাকে দিয়ে যা কিছু লিখিয়েছিলেন তার প্রত্যেকটি শব্দ তিনি মুখস্থ করে ফেলেছেন। শিক্ষক তাকে বিশ্বাস করতে অসম্মত হন এবং তাকে তার স্মৃতি থেকে হাদীসগুলো পাঠ করে শোনাতে বলেন। এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে তিরমিযী কোনো ভুল না করে সবগুলো হাদীস পাঠ করে শুনিয়ে দেন। এতে শিক্ষক তিরমিযীর এ বক্তব্যের প্রতি সন্দেহ পোষণ করেন যে, তিনি তার লিখিত নোটসমূহকে পুনরায় পাঠ করার সুযোগ পাননি। অতঃপর শিক্ষক তার ছাত্রকে এভাবে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি অন্য চল্লিশটি হাদীস পাঠ করে শোনানোর পর তিরমিযী সেগুলো পাঠ করে শোনাবেন। তিরমিযী দ্বিধাহীন চিত্তে অক্ষরে অক্ষরে সেসব হাদীস পাঠ করে শুনিয়ে দেন। এবার শিক্ষক তার ছাত্রের বক্তব্যের সত্যতার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন এবং তরুণ ছাত্রের স্মৃতিশক্তি দেখে সন্তুষ্ট ও মুগ্ধ হন।[৮০]

অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ব্যবহার করে ইমাম তিরমিযী যে জামি' গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন তা হাদীস সাহিত্যের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাবলীর অন্যতম এবং বিশেষজ্ঞগণ সর্বসম্মতভাবে এটিকে হাদীসের ছয়টি প্রামাণ্য গ্রন্থের অন্যতম হিসেবে মেনে নিয়েছেন। এতে প্রায় ৩৯৫৬টি হাদীস সন্নিবিষ্ট হয়েছে।[৮১] তিনি শুধু উদ্ধৃত হাদীসের মধ্যে প্রত্যেক বর্ণনাকারীর পরিচয়, নাম, পদবী ও ডাকনাম নির্ণয় করার পেছনেই প্রচুর পরিশ্রম করেননি, বরং কোন বর্ণনাকারী কতটুকু নির্ভরযোগ্য এবং বিভিন্ন মাযহাবের আইনবিদগণ সেসব হাদীসকে কীভাবে ব্যবহার করেছেন, এসব তথ্যও তিনি উল্লেখ করার প্রয়াস চালিয়েছেন। 'আবু ঈসা বলেন...' - শীর্ষক শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে তিনি প্রায় প্রত্যেকটি হাদীসের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা জুড়ে দিয়েছেন। তারপর তিনি হাদীসের সাথে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু তথ্য উল্লেখ করেছেন। নিম্নোক্ত উদাহরণে এসব সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যার প্রকৃতি ও গুরুত্ব ফুটে ওঠবে।

কুতাইবাহ, হানাদ, আবু কুরাইব, আহমাদ ইবনু মানী, মাহমুদ ইবনু গাইলান ও আবু আম্মার আমাদের নিকট এ মর্মে বর্ণনা করেছেন যে, ওয়াকী আ'মাশ থেকে তিনি হাবীব ইবনু আবী ছাবিত থেকে তিনি উরওয়াহ থেকে এবং আয়েশা থেকে তাদের নিকট বর্ণনা করেছেন যে,
একবার নাবী তাঁর এক স্ত্রীকে চুমু দিয়ে উদ্ না করেই সালাতের জন্য চলে গেলেন। উরওয়াহ আয়েশাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'নাবী -এর সেই স্ত্রী আপনি ছাড়া আর কে হবে?' আর এতে আয়েশা হেসে দিলেন। [৮২]

আবু ঈসা বলেন,
'সাহাবী ও তাবি'ঈদের মধ্যে অনেক বিদ্বান ব্যক্তি এ ধরনের একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন, আর এটি হলো সুফিয়ান ছাওরী ও কুফার আইনবিদদের অভিমত যারা মনে করেন যে, চুম্বনের ফলে উদ্‌ ভঙ্গ হয় না। মালিক ইবনু আনাস, আওযায়ী, শাফিয়ী, আহমাদ ইবনু হাম্বল ও ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহ মনে করেন যে, চুম্বনের ফলে উদ্‌ ভেঙ্গে যায়; আর অসংখ্য বিদ্বান সাহাবী ও তাবি'ঈর মতও এটি। আমাদের লোকজন মালিক ও আহমাদ প্রমুখ আয়েশা -এর বর্ণিত হাদীসটি অনুসরণ করেননি, কারণ ইসনাদের দিক দিয়ে এ হাদীসটি তাদের নিকট বিশুদ্ধ মনে হয়নি। আমি বসরার আবু বাক্ আত্তারকে আলী ইবনুল মাদীনির উদ্ধৃতি দিতে শুনেছি যিনি বলেছিলেন যে, ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ কাত্তান এ হাদীসটিকে দুর্বল ও মূল্যহীন আখ্যায়িত করেছেন। আমি মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈলকেও এ হাদীসটিকে দুর্বল বলতে শুনেছি; তিনি বলেছিলেন যে, হাবীব ইবনু আবী ছাবিত কখনো উরওয়াহ থেকে কোনো হাদীস শ্রবণ করেননি। ইবরাহীম তাইমীও আয়েশা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নাবী তাকে চুম্বন দিয়ে উদ্‌ করেননি; কিন্তু এ হাদীসটিও বিশুদ্ধ নয়, কারণ ইবরাহীম তাইমী এ হাদীসটি আয়েশা থেকে শুনেছেন বলে জানা যায় না। মোদ্দাকথা, এ বিষয়ে নাবী -এর প্রতি যা কিছু আরোপ করা হয়েছে তার কোনো একটিকেও বিশুদ্ধ বলা যায় না”।[৮৩]

আবু ঈসা তার জামি' গ্রন্থের হাদীসসমূহের শেষে যেসব মন্তব্য যোগ করেছেন তার প্রকৃতি তুলে ধরার জন্য উপরোক্ত উদাহরণটিই যথেষ্ট। হাদীসকে তিনি সহীহ, হাসান, সহীহ হাসান, হাসান সহীহ, গারীব, দ'ঈফ, বা মুনকার ইত্যাদি ভাগে বিভক্ত করেছেন। তবে সম্ভবত হাদীসের নির্ভরযোগ্যতা মূল্যায়নে জামি' গ্রন্থের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর হাসান শ্রেণীর হাদীসসমূহ। বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ইবাদাত ও দ্বীনি আইন-কানুনের অধিকাংশের ভিত্তি হলো এ শ্রেণীর হাদীস। ইমাম বুখারী, ইবনু হাম্বল ও অন্যান্য হাদীস বিশারদগণ ইতোপূর্বে এ পরিভাষাটি ব্যবহার করলেও এর পরিমাণ ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত; তাছাড়া এর প্রয়োগও ছিল শিথিল ও অপারিভাষিক অর্থে। আবু ঈসা আইনের উৎস হিসেবে এসব হাদীসের গুরুত্ব অনুধাবন করে হাসান পরিভাষাটিকে সর্বপ্রথম সংজ্ঞায়িত করেন এবং একে সেসব হাদীসের ওপর প্রয়োগ করেন যেগুলোতে হাসান-এর শর্তাবলী পূর্ণ হয়েছে।[৮৪]

এ শ্রেণীর হাদীস ও তার নির্ভরযোগ্যতা নির্ণয়ের লক্ষ্যে ইমাম তিরমিযী কিছু হাদীসকে সহীহ হাসান, কিছু হাদীসকে হাসান ও অন্যগুলোকে হাসান গারীব নামে অভিহিত করেছেন। তবে হাসান পরিভাষা প্রয়োগ করার সময় তিনি সবসময় একই রীতি বজায় রাখতে সক্ষম হননি, আর এ কারণে মুহাদ্দিসগণ তার সমালোচনাও করেছেন।

সুনানুত তিরমিযীর ওপর অনেকগুলো ভাষ্য রচিত হয়েছে। বর্তমানে সুলভ সর্বোত্তম ভাষ্যটি হলো আব্দুর রহমান মুবারকপুরীর লেখা তুহফাতুল আহওয়াযী। চার খণ্ডে সমাপ্ত এ ভাষ্যটি বেশ কয়েকবার পুনঃমুদ্রিত হয়েছে।[৮৫]

সুনানুন নাসাঈ
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুনান গ্রন্থ সঙ্কলন করেছেন আবু আব্দির রহমান আহমাদ ইবনু শুয়াইব নাসাঈ। তিনি ৮২৭ সালে (তিরমিযীর ৬ বা ৭ বছর পর) খুরাসানের নাসা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। নিজের প্রদেশে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে পনের বছর বয়সে তিনি বলখে চলে যান। সেখানে তিনি কুতাইবাহ ইবনু সাঈদের নিকট বছর খানেক হাদীস অধ্যয়ন করেন। [৮৬] হাদীসের সন্ধানে ইরাক, আরব ও সিরিয়া প্রভৃতি এলাকায় ব্যাপক সফর শেষে তিনি মিশরে বসতি স্থাপন করেন। মিশরে বসবাস করতেন তার অন্যতম শিক্ষক ইউনুস ইবনু আব্দিল আ'লা। ৯১৪ সালে তিনি দামেশক গিয়ে এমন কিছু লোকের সন্ধান পান যারা সাবেক উমাইয়া শাসনের প্রভাবের দরুন আলী ইবনু আবী আলিবের বিরুদ্ধে ভুল ধারণা পোষণ করতো। লোকদেরকে সঠিক পথের দিশা দেয়ার লক্ষ্যে তিনি আলী-এর মাহাত্ম্য বিষয়ক একটি গ্রন্থ রচনা করেন এবং মাসজিদের মিম্বার থেকে তা পাঠ করে শোনানোর চেষ্টা চালান। কিন্তু সমবেত লোকজন ধৈর্য সহকারে তার কথা শোনার পরিবর্তে তার সাথে দুর্ব্যবহার করে এবং তাকে প্রহার করে মাসজিদ থেকে তাড়িয়ে দেয়। ৯১৫ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সম্ভবত তার মৃত্যুর পেছনে এ ঘটনাটিও ছিল অন্যতম কারণ।

নাসাঈকে তার সময়ের প্রথম সারির মুহাদ্দিস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হতো। আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ ইবনু হাম্বল, মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহীম, আলী ইবনু উমার ও অন্যান্য প্রধান মুহাদ্দিসগণ ইমাম নাসাঈকে তা-ই মনে করতেন। হাদীস লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তিনি কী পরিমাণ সতর্কতা অবলম্বন করেছেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় এ থেকে যে, তার শিক্ষক হারিছ ইবনু মিসকীন কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের বেলায় তিনি কখনো হাদ্দাসানা বা আমবাআনা পরিভাষা ব্যবহার করেননি, যা তিনি ব্যবহার করেছেন সেসব হাদীসের ক্ষেত্রে যা অন্যান্য বিশেষজ্ঞের মারফতে তার নিকট পৌঁছেছে; কারণ হারিছের হাদীসগুলো তার গণপাঠদান থেকে সংগ্রহ করা হলেও সেসব পাঠে ইমাম নাসাঈর যোগদান নিষিদ্ধ ছিল। আর এর ফলে তিনি পাঠদান কেন্দ্রের দরজার আড়ালে লুকিয়ে থেকে সেসব হাদীস শুনতে বাধ্য হয়েছিলেন। হারিছের হাদীসের ক্ষেত্রে তিনি লিখতেন, 'হারিছ ইবনু মিসকীনকে পড়ে শোনানোর সময় আমি এ হাদীসটি শুনেছি। [৮৭]

ইমাম নাসাঈ তার সুবিশাল সুনান গ্রন্থে (যার ব্যাপারে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তাতে বেশ কিছু সংখ্যক দুর্বল ও সংশয়পূর্ণ হাদীস রয়েছে) আইন সংক্রান্ত সেসব হাদীস সঙ্কলন করেছেন যা তার বিবেচনায় যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য কিংবা সম্ভাব্য নির্ভরযোগ্য। তার কতিপয় বন্ধুর অনুরোধে তিনি আল মুজতাবা বা আস সুনানুস সুগরা নামে সুনান গ্রন্থের একটি সংক্ষিপ্তসার রচনা করেন। বর্তমানে এ শেষোক্ত গ্রন্থটিকে (যাতে, তার দাবি অনুযায়ী, কেবল নির্ভরযোগ্য হাদীসগুলোকে স্থান দেয়া হয়েছে) হাদীসের ছয়টি প্রামাণ্য গ্রন্থের অন্যতম হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।[৮৮]

আস সুনানুস সুগরা গ্রন্থে ইমাম নাসাঈ তার সমকালীন হাদীস বিশারদ তিরমিযীর দৃষ্টিভঙ্গীকে পুরোপুরি উপেক্ষা করেছেন যিনি হাদীসগুলোকে সুনির্দিষ্ট সমস্যার ওপর প্রয়োগ করার প্রয়াস চালিয়েছেন এবং তার আলোকে নিজ গ্রন্থকে বিন্যস্ত করেছেন। ইমাম নাসাঈর প্রধান লক্ষ্য ছিল শুধু হাদীসের মূলপাঠকে প্রতিষ্ঠিত করে দেয়া এবং সংশ্লিষ্ট হাদীসের বিভিন্ন সংস্করণের মধ্যে যেসব পার্থক্য রয়েছে তা লিপিবদ্ধ করা। আবু দাউদ ও তিরমিযী সেসব পার্থক্যের দিকে নিছক ইঙ্গিত প্রদান করেছেন; পক্ষান্তরে নাসাঈ প্রায় সবক'টি হাদীসের রকমারি সংস্করণগুলোকে বিস্তৃত পরিসরে উল্লেখ করেছেন। অনেক জায়গায় বিভিন্ন বর্ণনাকারীর মধ্যকার পার্থক্য আলোচনা করার সময় তিনি সেগুলোর শিরোনাম দিয়ে তাদের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পার্থক্যসমূহও উল্লেখ করেছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটি হাদীসের বিভিন্ন সংস্করণ উল্লেখ করার পর নাসাঈ মন্তব্য করেছেন যে, এদের মধ্যে কিছু কিছু বর্ণনা ভুল। হাদীসের বর্ণনাকারী মূল্যায়ন ও নির্বাচনের ক্ষেত্রে কঠোরতা অবলম্বনের জন্যও তিনি একইভাবে সুপরিচিত। বস্তুত, বলা হয়ে থাকে যে, হাদীস সংকলনের ক্ষেত্রে তিনি যেসব মূলনীতি অনুসরণ করেছেন তা ছিল ইমাম মুসলিমের অনুসৃত মূলনীতিসমূহের চেয়েও কঠোর।[৮৯] তবে এ গ্রন্থে অনেক দুর্বল ও সংশয়পূর্ণ হাদীস রয়েছে যা প্রশ্নবিদ্ধ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী কতিপয় অচেনা বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন।

নাসাঈর সুনান গ্রন্থটির ভাষ্য রচনার জন্য প্রথম দিকের বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়নি। গ্রন্থটি রচিত হওয়ার পাঁচ শ' বছর পর জালালুদ্দীন সুয়ূতী যাহরুর রাবা আলাল মুজতাবা নামে এর একটি সংক্ষিপ্ত ভাষ্য রচনা করেছেন।[৯০]

সুনানুদ দারিমী
সর্বপ্রাচীন যেসব সুনান গ্রন্থ আমাদের নিকট পৌঁছেছে এটি তার অন্যতম। এর গ্রন্থকার আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ইবনু আব্দির রহমান (৭৯৭-৮৬৮ সাল) ছিলেন তামীম গোত্রের শাখা বানু দারিম নামক আরব বংশোদ্ভূত। তার সমকালীন অসংখ্য বিশেষজ্ঞের ন্যায় তিনিও হাদীসের সন্ধানে প্রচুর ভ্রমণ করেছেন এবং ইয়াযীদ ইবনু হারূন ও সাঈদ ইবনু আমির-এর ন্যায় প্রথিতযশা মুহাদ্দিসের তত্ত্বাবধানে অধ্যয়ন করেছেন। হাদীস শাস্ত্রে আত্মনিবেদিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত এ গ্রন্থকার স্বীয় সততা ও দ্বীনদারীর জন্যেও বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। তাকে সমরকন্দের বিচারকের পদ গ্রহণ করার প্রস্তাব দেয়া হলে তিনি এ আশঙ্কায় তা প্রত্যাখ্যান করেন যে, তার দ্বারা কোনো অন্যায় সম্পাদিত হয়ে যেতে পারে; পরিশেষে তাকে বাধ্য করা হলে একটি মামলার বিচার করে তিনি বিচারকের পদ থেকে ইস্তফা দেন। [৯১]

সুনানুদ দারিমীতে প্রায় ৩,৫৫০টি হাদীস রয়েছে যা বিষয়বস্তুর আলোকে ১৪০৮টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে। এ গ্রন্থের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এর সাধারণ ভূমিকাসুলভ অধ্যায় যেখানে সঙ্কলক বিভিন্ন বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু হাদীস উপস্থাপন করেছেন; সেসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে প্রাক ইসলামী যুগের কিছু আরব প্রথা, নাবী-এর জীবন ও চরিত্র সংশ্লিষ্ট কিছু হাদীস এবং জ্ঞানের বিশেষ গুরুত্ব। গ্রন্থের মূল অংশে ইমাম দারিমী সেই একই পথের অনুসরণ করেছেন যা পরবর্তী কালের সুনান গ্রন্থকারগণ করেছেন। এক গুচ্ছ হাদীস উল্লেখ করার পর তিনি কিছু সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন, যেখানে কিছু কিছু বিষয়ে তিনি তার নিজের মত প্রদান করার পাশাপাশি কতিপয় বর্ণনাকারীর পরিচয় তুলে ধরেছেন কিংবা তাদের নির্ভরযোগ্যতার সমালোচনা করেছেন কিংবা একই হাদীসের বিভিন্ন সংস্করণের দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তবে পূর্বোল্লিখিত সুনান গ্রন্থসমূহের তুলনায় সুনানুদ দারিমীতে উল্লিখিত ব্যাখ্যাসমূহ অনেক বেশী সংক্ষিপ্ত।

এ গ্রন্থটি সাধারণভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে গৃহীত হয়েছে এবং কতিপয় মুহাদ্দিসের দৃষ্টিতে এটি হাদীসের ছয়টি প্রামাণ্য গ্রন্থের তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে। কিন্তু এ গ্রন্থটি কখনো পূর্বোক্ত তিনটি সুনান গ্রন্থের স্থান দখল করতে পারেনি, কারণ সেসব গ্রন্থের তুলনায় এতে বেশী পরিমাণ দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ হাদীস রয়েছে। [৯২]

সুনানু ইবনি মাজাহ
অধিকাংশ হাদীস বিশারদ সুনানুদ দারিমীর ওপর সুনানু ইবনি মাজাহ (৮২৪–৮৮৬) গ্রন্থকে প্রাধান্য দিয়ে একে বিশুদ্ধ ছয়টি গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আবু আব্দিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াযীদ ইবনু রাবী (সাধারণভাবে ইবনু মাজাহ নামে পরিচিত) কাযবীনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তার কিশোর বয়সের শেষের দিকে হাদীস অধ্যয়ন শুরু করেন এবং ইরান, ইরাক, সিরিয়া ও মিশরের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্রসমূহ ভ্রমণ করে সমকালীন খ্যাতনামা মুহাদ্দিসদের নিকট হাদীস অধ্যয়ন করেন।[৯৩] ইবনু মাজাহ হাদীসের ওপর বেশ কয়েকটি গ্রন্থ সঙ্কলন করেছেন; তন্মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো সুনান। এ গ্রন্থে তিনি ৩২টি অধ্যায় ও ১৫০০টি অনুচ্ছেদে ৪৩৪১টি হাদীস সংগ্রহ করেছেন। তন্মধ্যে ৩০০২টি হাদীস অন্য পাঁচটি সুনান গ্রন্থকারগণও উল্লেখ করেছেন। অবশিষ্ট ১৩৩৯টি হাদীস শুধু ইবনু মাজাহ উল্লেখ করেছেন; এর মধ্যে ৪২৮টি সহীহ, ১৯৯টি হাসান, ৬১৩টি দ'ঈফ ও ৯৯টি মুনকার (প্রত্যাখ্যাত)।[৯৪] বর্ণিত আছে যে, গ্রন্থটি সম্পন্ন করার পর ইবনু মাজাহ তা সমালোচনার জন্য আবু যুর'আহ্হ্র নিকট পেশ করেন- যিনি ছিলেন সে সময়ের সর্বাধিক দক্ষ হাদীস সমালোচক হিসেবে স্বীকৃত। আবু যুর'আহ গ্রন্থটির সাধারণ বিন্যাসটি পছন্দ করেন এবং মন্তব্য করেন যে, তার প্রত্যাশা হলো এ গ্রন্থটির গ্রহণযোগ্যতা তৎকালে প্রচলিত সুনান গ্রন্থাবলীকে ছাড়িয়ে যাবে। তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, এ গ্রন্থে দুর্বল হাদীসের সংখ্যা খুব বেশি নয়।

এ অনুমোদন সত্ত্বেও দেখা গেছে যে, এ গ্রন্থে অনেক জাল হাদীস সন্নিবিষ্ট হয়েছে। ইবনুল জাওযী তার আল মাওদূ'আত গ্রন্থে ঘোষণা করেছেন যে, ব্যক্তি, গোত্র বা শহরের মাহাত্ম্য সম্পর্কিত সকল হাদীস জাল, আরও এ ধরনের অনেকগুলো হাদীস রয়েছে ইবনু মাজাহ গ্রন্থে। [৯৫] যদিও অন্যান্য সুনান গ্রন্থকারগণও দুর্বল হাদীস সন্নিবিষ্ট করেছেন; অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা তাদের গ্রন্থে তা উল্লেখ করে দিয়েছেন। তবে, ইবনু মাজাহ তার গ্রন্থে দুর্বল হাদীসের ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করেননি। ইবনুল আছীর (মৃত্যু ৬০৬ হি.), ইবনু হাজার (মৃত্যু ৮৫২ হি.) ও কাস্তালানী (মৃত্যু ৯২৩ হি.)-এর ন্যায় বিশেষজ্ঞগণ বিশুদ্ধ ছয়টি গ্রন্থের মধ্যে এ গ্রন্থটির অন্তর্ভুক্তিকে অপছন্দ করেছেন।
সুনানু ইবনি মাজাহ গ্রন্থের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো এতে হাদীসের পুনরাবৃত্তির পরিমাণ অত্যন্ত অল্প এবং অধ্যায় ও পরিচ্ছেদ বিন্যাসের দিক দিয়ে এটি সর্বোত্তম গ্রন্থাবলীর অন্যতম।[৯৬]

সুনানুদ দারাকুতনী
গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি সুনান গ্রন্থ সঙ্কলন করেছেন আবুল হাসান আলী ইবনু উমার (৯১৮-৯৯৫)। বাগদাদ নগরীর দার কুতন এলাকায় বসবাস করার কারণে তিনি সাধারণত দারাকুতনী নামে পরিচিত।
অতি অল্প সময়ের মধ্যে দারাকুতনী আরবি সাহিত্য ও ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা বিশেষত হাদীস কুরআনের বিভিন্নধর্মী কিরাআতে উল্লেখযোগ্য ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। ইলমুল কিরাআতের ওপর তার গ্রন্থটি এ বিষয়ের সর্বপ্রথম গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত এবং পরবর্তী লেখকদের অধিকাংশই তার গ্রন্থের সাধারণ রূপরেখাটি অনুসরণ করেছেন। তার ছাত্রদের মধ্যে হাকিম, আবু নুয়াইম ইস্পাহানী (যার হিলইয়াতুল আউলিয়া গ্রন্থটিকে মুসলিম মনীষীদের জীবন চরিত সংক্রান্ত সর্বোত্তম গ্রন্থ মনে করা হয়), রাইয়ের তাম্মাম ও মুহাদ্দিস আব্দুল গনি অন্যতম। এরা সকলেই হাদীস বিষয়ে ইমাম দারাকুতনীর ব্যাপক ও সূক্ষ্ণ জ্ঞানের কথা স্বীকার করেছেন। বিশেষত হাকিম (যিনি প্রায় দু' হাজার ব্যক্তি থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন) বলেছেন যে, তিনি কখনো ইমাম দারাকুতনীর ন্যায় বিদ্বান ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করেননি; যে বিষয়ই তার সামনে পেশ করা হয়েছে সে বিষয়েই তাকে জ্ঞানের একটি বিশ্বকোষ মনে হয়েছে।

যেসব মুহাদ্দিসগণ বাগদাদ গিয়েছেন তাদের প্রায় প্রত্যেকেই তার সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। আবু মানসূর ইবনুল কারখী তার মুসনাদ সঙ্কলন করার সময় ত্রুটিপূর্ণ হাদীস সনাক্ত করার জন্য ইমাম দারাকুতনীর সাহায্যের ওপর নির্ভর করেছিলেন। অন্যদিকে দারাকুতনী আবু মানসূরকে দিয়ে যেসব কথা লিখিয়েছিলেন তার ওপর ভিত্তি করে আবু বাক্ বারক্কানী হাদীস বিষয়ে একটি বই লিখে ফেলেছেন। একইভাবে মিশরের ইখসীদী শাসকদের মন্ত্রী ইবনু হিনযাবাহ কর্তৃক একটি মুসনাদ সঙ্কলনের ক্ষেত্রেও দারাকুতনী গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করেছেন। উক্ত মুসনাদ গ্রন্থটি সঙ্কলিত হচ্ছে- এ কথা জানতে পেরে ইমাম দারাকুতনী বাগদাদ থেকে মিশরে চলে যান এবং গ্রন্থটি সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। মিশরে অবস্থানের পুরো সময় ইবনু হিনযাবাহ দারাকুতনীর প্রতি ব্যাপক আনুগত্য ও সম্মান প্রদর্শন করেন এবং গ্রন্থ রচনা শেষে তাকে অনেক মূল্যবান উপহার প্রদান করেন।

হাদীস ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইমাম দারাকুতনী নিজেই অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন। দারাকুতনীর সুনান গ্রন্থটি সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য হাদীস সঙ্কলনসমূহের অন্যতম। গুরুত্ব বিবেচনায় হাদীসের ছয়টি বিশুদ্ধ গ্রন্থের পরপরই এর অবস্থান। ইমাম বাগাভী (মৃত্যু ৫২২) তার প্রভাবশালী গ্রন্থ মাছাবীহুস সুন্নাহ এর অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে এ গ্রন্থটিকে ব্যবহার করেছেন, আর এ মাছাবীহুস সুন্নাহর ভিত্তিতে রচিত হয়েছে ইমাম তাবরীযীর মিশকাতুল মাছাবীহ।

সুনান গ্রন্থে দারাকুতনী এমন কিছু হাদীস সন্নিবিষ্ট করেছেন যা তার বিবেচনায় মোটামুটি প্রামাণ্য; বিভিন্ন ইসনাদ ও বিকল্প সংস্করণ উল্লেখ করে তিনি সেসব হাদীসের অনুকূলে বাড়তি প্রমাণ যোগ করেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, একেবারে প্রথম হাদীসটিতে তিনি পাঁচটি স্বতন্ত্র বর্ণনাসূত্র সহকারে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ উল্লেখ করেছেন; তন্মধ্যে কয়েকটিকে তিনি দুর্বল আখ্যায়িত করেছেন। কিছু কিছু হাদীসের ক্ষেত্রে তিনি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা যোগ করে কতিপয় বর্ণনাকারীর নির্ভরযোগ্যতার মাত্রা নির্ণয় ও পরিচয় প্রদানসহ তাদের চরিত্র ও নির্ভরযোগ্যতা মূল্যায়নের প্রয়াস চালিয়েছেন। তবে তার গ্রন্থে দুর্বল হাদীসের সংখ্যা মোটামুটি অনেক। যেসব সুনান গ্রন্থ সাধারণত হাদীসের ছয়টি বিশুদ্ধ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত সেগুলোর তুলনায় এ সুনানে অধিক পরিমাণ দুর্বল হাদীস রয়েছে; আর এ কারণে একে সেসব গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।[৯৭]

সুনানুল বাইহাকী
ইমাম দারাকুতনীর পর আসেন নিশাপুরের নিকটবর্তী গ্রাম বাইহাক এর আবু বাক্ আহমাদ ইবনু হুসাইন। ইমাম বাইহাকী ৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তার সময়ের প্রখ্যাত শতাধিক মুহাদ্দিসের নিকট হাদীস অধ্যয়ন করেন। তন্মধ্যে হাকীম নিশাপুরীর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। বাইহাকী তার প্রখ্যাত ছাত্রে পরিণত হয়েছিলেন। ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করার পর ইমাম বাইহাকী অতি অল্প সময়ের মধ্যে একজন উল্লেখযোগ্য মানের গ্রন্থকার হয়ে ওঠেন। তিনি হাদীস ও শাফিয়ী মাযহাবের আইন-কানুনের উপর কয়েক শ' গ্রন্থ রচনা করেন; তন্মধ্যে কিছু কিছু গ্রন্থ সাহিত্যের ইতিহাসে একেবারে অতুলনীয়।[৯৮] তার দু'টি অস্বাভাবিক বৃহৎ ও পূর্ণাঙ্গ মানের সুনান গ্রন্থের রয়েছে বিশেষ সম্মান। একজন মুহাদ্দিস ও আইনবিদ হিসেবে তার খ্যাতি নিশাপুরের বিদ্বান ব্যক্তিবর্গের দৃষ্টি আকর্ষণ করে; তারা তাকে নিশাপুরে আমন্ত্রণ জানান এবং তার একটি গ্রন্থ তাদেরকে পাঠ করে শোনানোর জন্য অনুরোধ করেন। তিনি ১০৬৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

সুনানু সাঈদ ইবনি মানসূর
অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত হলেও উপরোল্লিখিত সুনান গ্রন্থসমূহের তুলনায় অধিকতর প্রাচীন সুনান গ্রন্থটি সঙ্কলন করেছেন আবু উছমান সাঈদ ইবনু মানসূর ইবনু শু'বাহ (মৃত্যু ৮৪১ সাল)। তিনি মারভে জন্মগ্রহণ করেন এবং বালখ শহরে বেড়ে ওঠেন। মুসলিম বিশ্বের বিশাল অংশ জুড়ে ভ্রমণ শেষে তিনি মক্কায় বসতি স্থাপন করেন।

ইবনু মানসূর বেশ কিছু সংখ্যক প্রখ্যাত মুহাদ্দিসের নিকট থেকে হাদীস শেখেন; তন্মধ্যে ইমাম মালিক, হাম্মাদ ও আবু আওয়ানাহ প্রমুখের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। অতঃপর তিনি নিজেও ইমাম মুসলিম, আবু দাউদ ও আহমাদ ইবনু হাম্বলের ন্যায় হাদীস সাহিত্যের কয়েকজন উজ্জ্বল নক্ষত্রকে পাঠদান করেন। এরা সকলেই তার পাণ্ডিত্যের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন।[৯৯] তার সুনান গ্রন্থটি— যার ব্যাপারে তার ছিল ব্যাপক আত্মবিশ্বাস— তার জীবনের শেষ দিকে এসে রচিত হয়। এ গ্রন্থে বিপুল সংখ্যক হাদীস রয়েছে যা মাত্র তিনজন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে নাবী ﷺ থেকে পাওয়া গিয়েছে।[১০০]

সুনানু আবী মুসলিম কাসসী
আবু মুসলিম ইবরাহীম ইবনু আব্দিল্লাহ কাসসী (মৃত্যু ৮৯৫ সাল) খুজিস্তানের কাস গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আবু আসীম নাবীল ও আবু আওয়ানাহ প্রমুখের নিকট অধ্যয়ন শেষে তিনি বাগদাদ ভ্রমণ করেন এবং সেখানে হাদীসের ওপর পাঠদান করেন। এসব পাঠদান বিপুল সংখ্যক ছাত্রকে আকৃষ্ট করে। বস্তুত, ছাত্রদের সংখ্যা এতো বেশী হয়ে পড়েছিল যে, তার আওয়াজ সকলের কান পর্যন্ত পৌঁছতো না, ফলে তার বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করার জন্য শ্রোতাদের বিভিন্ন অংশে সাতজনকে নিয়োগ করতে হয়েছিল।

ইবনু মানসূরের সঙ্কলনটির ন্যায় তার সুনান গ্রন্থেও বিপুল সংখ্যক হাদীস রয়েছে যা মাত্র তিনজন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে নাবী থেকে পাওয়া গিয়েছে।[১০১]

টিকাঃ
[৬৭] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১০২।
[৬৮] স্টাডিজ ইন হাদীস মেথডলজি, পৃ, ১০০।
[৬৯] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১০৩।
[৭০] স্টাডিজ ইন হাদীস মেথডলজি, পৃ, ৯৯।
[৭১] স্টাডিজ ইন হাদীস লিটারেচার, পৃ, ৯৯।
[৭২] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১০৪-৫।
[৭৩] স্টাডিজ ইন হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১০১।
[৭৪] সুনানু আবী দাউদ, খণ্ড ১, পৃ, ৪।
[৭৫] প্রাগুক্ত, পৃ, ৩২-৩।
[৭৬] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১০৫-৭।
[৭৭] স্টাডিজ ইন হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১০১।
[৭৮] প্রাগুক্ত।
[৭৯] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১০৭।
[৮০] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১০৭-৮।
[৮১] স্টাডিজ ইন হাদীস মেথডলজি, পৃ,
[৮২] সুনানু আবী দাউদ, খণ্ড ১, পৃ, ৪৩, নং ১৭৯, তিরমিযী, নাসাঈ ও ইবনু মাজাহ; সহীহ সুনানু আবী দাউদ, খণ্ড ১, পৃ, ৩৬, নং ১৬৫ ও আহমাদ জামিছ ছহীহ, খণ্ড ১, পৃ, ১৩৩-৪।
[৮৩] সুনানুত তিরমিযী, খণ্ড ১, পৃ, ৫।
[৮৪] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১১১।
[৮৫] স্টাডিজ ইন হাদীস মেথডলজি, পৃ,
[৮৬] তাবাক্বাতুশ শাফিইয়্যাহ আল কুবরা, খণ্ড ২, পৃ, ৮৩-৮৪।
[৮৭] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১১২ ও স্টাডি সজি, পৃ, ৯৭।
[৮৮] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১১৩।
[৮৯] তাযকিরাতুল হুফফাজ, খণ্ড ২, পৃ, ২৬৮।
[৯০] স্টাডিজ ইন হাদীস মেথডলজি, পৃ, ৯৮।
[৯১] তাযকিরাতুল হুফফাজ, খণ্ড ২, পৃ, ১১৫-৭।
[৯২] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১১৩-৫।
[৯৩] স্টাডিজ ইন হাদীস মেথডলজি, পৃ, ১০৫।
[৯৪] প্রাগুক্ত, পৃ, ১০৬।
[৯৫] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১১৫-৬।
[৯৬] স্টাডিজ ইন হাদীস মেথডলজি, পৃ, ১
[৯৭] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১১৬-৮।
[৯৮] তাবাক্বাতুশ শাফিইয়্যাহ আল কুবরা, খণ্ড ৩, পৃ, ৫।
[৯৯] তাযকিরাতুল হুফ্ফায, খণ্ড ২, পৃ, ৫।
[১০০] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১১৮-৯।
[১০১] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১১৯-১২০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00