📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 হাদীস মূল্যায়ন

📄 হাদীস মূল্যায়ন


হাদীস মূল্যায়ন দ্বারা হাদীস সত্যায়ন শাস্ত্র (ইলমুল জারহি ওয়াত তা'দীল) কে বুঝানো হয়— যার মাধ্যমে কিছু সুনির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে কোনো হাদীসকে নির্ভরযোগ্য বা দুর্বল বলে ঘোষণা করা হয়। নাবী -এর বিভিন্ন হাদীসকে বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে বিভিন্ন শ্রেণীভুক্ত করার যে প্রয়াস চালানো হয়েছে তার শেকড় খুঁজে পাওয়া যাবে নাবী -এর এই সতর্কবাণীতে—
“যদি কেউ আমার ব্যাপারে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মিথ্যা কথা বলে, সে যেন জাহান্নামে নিজের ঠিকানা খুঁজে নেয়।” [১]

হাদীস যাচাই-বাছাইয়ের এ প্রক্রিয়া নাবী -এর জীবদ্দশাতেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। তবে, নাবী -এর উদ্ধৃতি দিয়ে যে কথা বলা হয়েছে তাঁর নিকটে গিয়ে উক্ত কথার সত্যতা যাচাই করে নেয়ার মধ্যেই এ স্তরের কাজ সীমাবদ্ধ ছিল। একবার দিমাম ইবনু সা'লাবাহ নাবী -এর নিকটে এসে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে মুহাম্মাদ, আপনার দূত আমাদের কাছে এসে এই এই কথা বলেছে।' জবাবে নাবী বললেন, 'সে তোমাদেরকে সত্য কথাই বলেছে।' [২]

আলী, [৩] উবাই ইবনু কা'ব, [৪] আব্দুল্লাহ ইবনু আমর, [৫] উমার, [৬] ইবনু মাসউদের স্ত্রী যায়নাব [৭] প্রমুখ ও অন্যান্যদের ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তারাও অনুরূপ অনুসন্ধান বা যাচাইয়ের কাজ করেছেন। নাবী ﷺ-কে জিজ্ঞেস করার সুযোগটি তাঁর ইন্তেকালের সাথে সাথে বন্ধ হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও প্রথম খলিফা আবু বাক্, উমার, আলী এবং আয়েশা ও ইবনু উমারের ন্যায় সাহাবীগণ রাদিয়াল্লাহু আনহু হাদীস যাচাইয়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন। খলিফা উসমানের শাসনকালের শেষদিকে এবং খলিফা আলীর শাসনামলের পুরো সময় জুড়ে বিদ্যমান গোলযোগের প্রেক্ষিতে সাহাবীদের ছাত্রদের মধ্যকার বিশেষজ্ঞগণ হাদীস প্রচারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর হয়ে ওঠেন।

সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব (মৃত্যু ৯৩ হি.); সালিম ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনি উমার (মৃত্যু ১০৬ হি.); আলী ইবনু হুসাইন ইবনি আলী (মৃত্যু ৯৩ হি.) ও উরওয়াহ ইবনুয যুবায়ের (মৃত্যু ৯৪ হি.)-এর ন্যায় তাবি'ঈগণ হাদীস যাচাইয়ের প্রচেষ্টাকে অব্যাহত রাখেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীতে বিশেষজ্ঞগণ হাদীস সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ব্যাপক ভ্রমণের জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। হাদীসের জ্ঞানার্জনের জন্য ভ্রমণ এতটা সাধারণ হয়ে ওঠে যে বাগদাদের পণ্ডিত ইয়াহইয়া ইবনু মুঈন (মৃত্যু ২৩৩ হি.) বলেছেন, 'চার শ্রেণীর লোক সারা জীবনেও পরিপক্কতা হাসিল করতে পারেনি; তাদের অন্যতম হলো সেই ব্যক্তি যে হাদীস সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ না করে নিজের শহরে বসেই হাদীস লিপিবদ্ধ করে ফেলে।' [৮]

হাদীস বিশেষজ্ঞগণ হাদীস মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন ইবনুল মুবারক (১১৮-১৮১ হি.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী তা হলো, 'একটি প্রামাণ্য বক্তব্য খুঁজে পেতে হলে বিশেষজ্ঞদের একজনের মতকে অপর জনের মতের সাথে তুলনা করে দেখতে হবে'। [৯] একেবারে শুরু থেকেই বিশেষজ্ঞগণ এ পদ্ধতি ব্যবহার করে এসেছেন। সংশ্লিষ্ট সবগুলো হাদীস একত্রিত করে সতর্কতার সাথে একটির সঙ্গে অপরটির তুলনামূলক পর্যালোচনা করার মাধ্যমে বিশেষজ্ঞগণ তাদের শিক্ষকদের বিশুদ্ধতা নিরূপণে সক্ষম হয়েছেন। তুলনামূলক পর্যালোচনা করার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে। নিম্নে চারটি প্রধান পদ্ধতি তুলে ধরা হলোঃ

• একই বিশেষজ্ঞের বিভিন্ন ছাত্রের হাদীসগুলোর মধ্যে তুলনা।
• একই বিশেষজ্ঞ কর্তৃক জীবনের বিভিন্ন সময়ে দেয়া বক্তব্যসমূহের মধ্যে তুলনা।
• কোনো বিশেষজ্ঞের লিখিত পাঠ ও মৌখিক বর্ণনার মধ্যে তুলনা।
• বর্ণিত হাদীস ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট কুরআনের আয়াতের মধ্যে তুলনা।

বিভিন্ন ছাত্রের মধ্যে তুলনা
এ পদ্ধতির বাস্তব বর্ণনা পাওয়া যাবে তৃতীয় শতাব্দীর হাদীস বিশেষজ্ঞ ইবনু মুঈন (মৃত্যু ২৩৩ হি.)-এর ঘটনায়। তিনি বসরায় বিখ্যাত পণ্ডিত হাম্মাদ ইবনু সালামা'র ছাত্র মূসা ইবনু ইসমাঈলের নিকট গিয়ে তার নিকট হাম্মাদের গ্রন্থসমূহ পাঠ করে শোনাতে বলেন। যখন মূসা তার কাছে জানতে চাইলেন যে, তিনি সেসব গ্রন্থ হাম্মাদের অন্য কোনো ছাত্রকে পাঠ করে শুনিয়েছেন কি না, তখন ইবনু মুঈন জানালেন যে, তিনি ইতোমধ্যে সেসব গ্রন্থ হাম্মাদের আরো সতের জন ছাত্রকে পাঠ করে শুনিয়েছেন। মূসা তাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, এতজনকে পাঠ করে শোনানোর উদ্দেশ্য কী। ইবনু মুঈন জবাব দিলেন, 'হাম্মাদ ইবনু সালামাহ কয়েকটি ভুল করেছেন, আর তার ছাত্ররা সেগুলোর সাথে আরো কিছু ভুল যোগ করে দিয়েছে। তাই আমি হাম্মাদ ও তার ছাত্রদের ভুলগুলোর মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করতে চাই। যদি দেখতে পাই যে, হাম্মাদের সকল ছাত্র একই ভুল করেছেন তাহলে বুঝবো যে, এসব ভুলের উৎস হাম্মাদ। আর যদি দেখি যে, অধিকাংশ ছাত্র এক কথা বলছেন এবং মাত্র একজন ছাত্র তাদের বিপরীত কথা বলছেন, তাহলে ধরে নিবো যে ভুলটি ঐ ছাত্রের। [১০]

ইবনু মুঈন কেবল ছাত্র ও শিক্ষকদের ভুলসমূহের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করতে সক্ষম হননি, বরং তিনি ছাত্রদেরকে তাদের স্ব স্ব বিশুদ্ধতার স্তর অনুযায়ী বিভিন্ন স্তরে বিন্যস্ত করতেও সক্ষম হয়েছিলেন। ইবনু মুঈন প্রথম ব্যক্তি নন যিনি এ পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। খলিফা আবু বকরের শাসনামল থেকেই এটি বিদ্যমান ছিল। দৃষ্টান্তস্বরূপ, এক মৃত ব্যক্তির নানী তার নিকট এসে তার নাতির উত্তরাধিকারে তার অংশের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি জবাব দিয়েছিলেন, 'আমি আল্লাহর কিতাবে তোমার কোনো অংশ খুঁজে পাইনি, আর আমি এও জানি না যে, নাবী এরূপ ক্ষেত্রে কোনো অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছেন।' তিনি এ ব্যাপারে অন্যান্য সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করলে মুগীরা জানালেন যে, নাবী নানীকে এক-ষষ্ঠাংশ প্রদান করেছেন। তারপর আবু বার্ জানতে চাইলেন, কেউ মুগীরার কথার সত্যতা নিরূপণ করতে পারে কি না। তখন মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ দাঁড়িয়ে মুগীরার বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করলেন। তারপর আবু বাক্ উক্ত মহিলাকে এক-ষষ্ঠাংশ প্রদান করেন। [১১]

একবার আবু মূসা আশআরী উমার-কে দেখতে গিয়ে তাকে (ঘরের বাইরে থেকে) তিনবার সালাম দেন। কোনো জবাব না পেয়ে তিনি চলে আসেন। অতঃপর উমার তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, কী তাকে গৃহে প্রবেশ করা থেকে বিরত রেখেছে। তিনি জবাব দিলেন যে, তিনি নাবী-কে বলতে শুনেছেন, 'তোমাদের কেউ যদি ঘরে প্রবেশ করার জন্য তিনবার অনুমতি চাওয়ার পরও অনুমতি না পায় তাহলে সে যেন চলে আসে'। এ কথার প্রেক্ষিতে উমার তার নিকট এ বক্তব্যের সপক্ষে প্রমাণ চাইলেন এবং অন্যথায় তাকে শাস্তি দেয়ার কথা বললেন। অতঃপর আবু মূসা একজন সাক্ষী নিয়ে আসলেন যিনি ঐ কথার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তারপর উমার জানালেন যে, তিনি আবু মূসার বর্ণনার বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেননি, বরং তিনি প্রমাণ চেয়েছেন নিছক এ জন্য যে, এর ফলে লোকজন নাবী-এর নিকট থেকে কোনো কিছু বর্ণনা করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকবে। (১২]

আবু হুরায়রা নাবী-এর এ বক্তব্যটির উদ্ধৃতি প্রদান করেছিলেন, “যে ব্যক্তি মৃত ব্যক্তির নিকট গিয়ে জানাযা পর্যন্ত অবস্থান করে সে এক কিরাত সাওয়াবের অধিকারী হয়, আর যে দাফন পর্যন্ত অবস্থান করে সে লাভ করে দু' কিরাত সাওয়াব।” আব্দুল্লাহ ইবনু উমার আবু হুরায়রার উক্ত বর্ণনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করলে তিনি তাকে হাত ধরে আয়েশা-এর নিকট নিয়ে যান, যিনি তার বর্ণনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। [১৩]

ইবনু আবী মুলাইকাহ, [১৪] যুহরী [১৫] ও শু'বাহ প্রমুখ এর ন্যায় তাবি'ঈগণ হাদীসের সত্যতা নিরূপণের এ পদ্ধতি অব্যাহত রেখেছিলেন।

বুখারীর ছাত্র মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ কর্তৃক ব্যবহৃত এ পদ্ধতির একটি দৃষ্টান্ত

বর্ণিত আছে যে, ইবনু আব্বাস তার ফুফু ও নাবী-এর স্ত্রী মাইমুনাহ-এর গৃহে একবার রাত্রি যাপন করেছিলেন। রাতের বেলা নাবী জেগে উঠে ওযু করে সালাত আদায় করতে লাগলেন। ইবনু আব্বাসও একই কাজ করে নাবী-এর বাম পাশে দাঁড়িয়ে গেলেন। নাবী তাঁকে বাম পাশ থেকে সরিয়ে ডান পাশে নিয়ে আসেন। বিশিষ্ট হাদীস বিশেষজ্ঞ ইয়াযীদ ইবনু আবী যিনাদ এ ঘটনাটি কুরাইবের বরাতে ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন; তাতে তিনি বলেছেন যে, ইবনু আব্বাস নাবী-এর ডান পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, অতঃপর নাবী তাঁকে বাম পাশে নিয়ে আসেন।

ইমাম মুসলিম ইয়াযীদের সতীর্থদের সকল বর্ণনা সংগ্রহ করেছেন যারা তার সাথে কুরাইবের নিকট অধ্যয়ন করেছিলেন। তাতে তিনি দেখতে পান, তারা সবাই এ ব্যাপারে একমত যে ইবনু আব্বাস প্রথমে নাবী-এর বাম পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, অতঃপর তাকে ডান পাশে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। ইয়াযীদের ভুল প্রমাণ করার জন্য এতোটুকুই ছিল যথেষ্ট, কিন্তু ইমাম মুসলিম সেখানেই থেমে যাননি। তিনি অন্যান্য সাহাবীদের সকল বর্ণনা সংগ্রহ করেন যারা নাবী-এর পাশে একাকী সালাত আদায় করেছিলেন; এর মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন যে, তারা সকলেই নাবী-এর ডান পাশে সালাত আদায় করেছিলেন। ফলে, তিনি কেবল ইয়াযীদের ভুলই প্রমাণ করেননি, বরং দৃঢ়তার সাথে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, সঠিক পদ্ধতি হলো ডান পাশে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করা। [১৬]

একজন বিশেষজ্ঞের বিভিন্ন মতের মধ্যে তুলনা
একবার আয়েশা তার ভাগ্নে উরওয়াহকে আব্দুল্লাহ ইবনু আমর থেকে কিছু হাদীস সংগ্রহ করার নির্দেশ দিলেন, কারণ আমর নাবী -এর নিকট থেকে অনেক কিছু শিখেছিলেন। উরওয়াহ ফিরে এসে আব্দুল্লাহ থেকে যা কিছু শুনেছেন তা বর্ণনা করার পর একটি হাদীসের ব্যাপারে আয়েশা কিছুটা সন্দেহ পোষণ করলেন—যেখানে বলা হয়েছে কীভাবে দুনিয়া থেকে জ্ঞান তুলে নেয়া হবে। প্রায় এক বছর পর তিনি উরওয়াহকে পুনরায় আব্দুল্লাহর নিকট গিয়ে আরো কিছু হাদীস শেখার জন্য অনুরোধ করলেন এবং আব্দুল্লাহকে বিশেষত ঐ হাদীসটির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে বললেন যেখানে দুনিয়া থেকে জ্ঞান তুলে নেওয়ার বিষয়ে বলা হয়েছে। ঊরওয়াহ ফিরে এসে জ্ঞান উঠিয়ে নেয়া সহ অন্যান্য হাদীসসমূহ বর্ণনা করেন। তারপর আয়েশা বলেন, ‘আমার বিশ্বাস তার বক্তব্য অবশ্যই সঠিক, কারণ এবারও তিনি তার পূর্বের বক্তব্যের সাথে কোনো কিছু যোগ করেননি, কিংবা তা থেকে কোনো কিছু বাদও দেননি।[১৭]

স্মৃতি ও লিখিত পাঠের মধ্যে তুলনা
মুহাম্মাদ ইবনু মুসলিম ও ফাদল ইবনু আব্বাদ একবার আবু যুর'আহ, মুহাম্মাদ ও ফাদলের সাথে হাদীস অধ্যয়ন করার সময় মুহাম্মাদ ও ফাদল কোনো একটি হাদীসের শব্দের ব্যাপারে মতবিরোধে লিপ্ত হন এবং আবু যুর'আহকে তাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। তিনি তার গ্রন্থাবলী খুলে ঐ হাদীসটি পেয়ে যান এবং নিশ্চিত করেন যে, মুহাম্মাদের মতটি ভুল।

আরেকবার আব্দুর রহমান ইবনু উমার গ্রীষ্মকালে যুহরের সালাত দেরী করে আদায় করা প্রসঙ্গে আবু হুরায়রা থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেন। আবু যুর'আহ বর্ণনাটিকে ভুল সাব্যস্ত করেন। তারপর আব্দুর রহমান তার নিজ শহরে ফিরে আসার পর তার গ্রন্থাবলী যাচাই করে দেখতে পান যে, তার মতটি ভুল। তখন তিনি নিজের ভুল স্বীকার করে আবু যুর'আ'হর নিকট একটি চিঠি লেখেন এবং তার সতীর্থ ও ছাত্রদেরকে তার ভুলটির ব্যাপারে অবহিত করতে বলেন, কারণ জাহান্নামের আগুনের তুলনায় লজ্জা অনেক ভালো।[১৮]

কুরআন ও হাদীসের মধ্যে তুলনা
তালাকপ্রাপ্তা মহিলার ভরণ-পোষণ প্রসঙ্গে ফাতিমা বিনতু কায়সের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করার ক্ষেত্রে উমার ইবনুল খাত্তাব এ পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। ফাতিমা বর্ণনা করেন যে, আবু আমর ইবনু হাফস বাড়ীর বাইরে থাকাকালে তাকে অপ্রত্যাহারযোগ্য তালাক প্রদান করে তার এক প্রতিনিধিকে কিছু যব দিয়ে তার নিকট প্রেরণ করেন। তিনি তাতে অসন্তুষ্ট হলে ঐ প্রতিনিধি তাকে জানিয়ে দেয় যে, ইবনু হাফসের নিকট তার আর কোনো দাবি বা পাওনা নেই। ফলে তিনি আল্লাহর রাসূল -এর নিকট এসে অভিযোগ দায়ের করেন। জবাবে তিনি বলেন, "তার নিকট তোমার কোনো ভরণ- পোষণ পাওনা নেই”। তারপর তিনি তাকে উম্মু শুরাইকের গৃহে ইদ্দাহ পালন করার নির্দেশনা প্রদান করেন..."। [১৯]

শা'বী যখন ফাতিমার হাদীসটি গ্রান্ড মসজিদে বর্ণনা করলেন, তখন নিকটে বসে থাকা আসওয়াদ ইবনু ইয়াযীদ কিছু কঙ্কর তুলে নিয়ে এ কথা বলে শা'বীর দিকে ছুঁড়ে মারলেন, “ধ্বংস তোমার, তুমি কেমন করে এটি বর্ণনা করতে পারো যখন উমার বলেছেন, "আমরা একজন একক মহিলার বর্ণনার ভিত্তিতে আল্লাহর কিতাব ও রাসূল -এর সুন্নাহকে পরিত্যাগ করতে পারি না। আমরা জানি না, সে (আল্লাহর রাসূলের কথা) মনে রাখতে পেরেছে, নাকি ভুলে গিয়েছে। (অপ্রত্যাহারযোগ্য তালাকপ্রাপ্তা মহিলার জন্য) ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা রয়েছে, কারণ মহান আল্লাহ বলেছেন, “তাদেরকে তাদের গৃহ থেকে বের করে দিও না, আর তারাও যেন নিজেদের উদ্যোগে গৃহ থেকে বের হয়ে না যায়, তবে তারা যদি প্রকাশ্যে অনৈতিক কাজ করে থাকে (তাহলে সে ক্ষেত্রে ভিন্ন বিধান প্রযোজ্য)।” (সূরা আত তালাক, ৬৫:১) [২০]

আয়েশা -ও বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন।

হাদীসের যৌক্তিক সমালোচনা
ইতোপূর্বে তুলনা করার যেসব পদ্ধতি উল্লেখ করা হয়েছে তার সব ক'টির সাথে যৌক্তিক চিন্তাশক্তি প্রয়োগের বিষয়টি জড়িত রয়েছে। হাদীসের মূলপাঠ ও বর্ণনাসূত্র, উভয়ের সমালোচনা করার ক্ষেত্রে হাদীস বিশেষজ্ঞগণ যৌক্তিক চিন্তাশক্তি প্রয়োগ করেছেন। এটি বলা যাবে না যে, যুক্তিসিদ্ধ পর্যালোচনা না করেই (কোনো হাদীসকে) প্রামাণ্য ঘোষণা করা হয়েছে। তবে যুক্তিসিদ্ধ সমালোচনার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যেমন আলী ইবনু আবী তালিব বলেছেন,
“যদি দ্বীনের ভিত্তি হতো নিছক মানবীয় যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তি, তাহলে মোজার ওপরের দিক মাসাহ করার চাইতে নীচের দিক মাসাহ করা অধিক জরুরী হতো। অথচ, আমি আল্লাহর রাসূল-কে মোজার ওপরের দিকটি মাসাহ করতে দেখেছি।” (২১)।

আধুনিকতাবাদী দ্বীনি জ্ঞানে অজ্ঞ মুসলিমদের সমালোচনার ভিত্তি হলো বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি-তর্ক। দৃষ্টান্তস্বরূপ, নারী নেতৃত্ব সংক্রান্ত হাদীসের যে সমালোচনা করা হয় তার ভিত্তি হলো নারী ও পুরুষের মধ্যে সহজাত সমতা রয়েছে- এ কথাকে সত্য বলে ধরে নেওয়া। একইভাবে ড. মরিস বুকাইলী তার চমৎকার গ্রন্থ 'দ্যা কুরআন, দ্যা বাইবেল এন্ড মডার্ন সায়েন্স' এ যুক্তি দেখিয়েছেন যে, মাছি সংক্রান্ত হাদীসটি অবশ্যই মিথ্যা; কারণ আধুনিক বিজ্ঞান কেবল এতোটুকু জানে যে, মাছি থেকে রোগ ছড়ায়। একই রকম যুক্তিতর্কের ভিত্তিতে যদি পেটের ওপর শোয়া সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা সম্বলিত হাদীসের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি ব্যবহার করা হতো, তাহলে গত দু' দশকের চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞান সেসব যুক্তিকে ভ্রান্ত প্রমাণ করে দিতো।

বর্ণনাকারীদের যুগের শ্রেণীবিন্যাস
হাদীস শাস্ত্রের ক্রমবিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে হাদীস বিশেষজ্ঞগণ হাদীস বর্ণনাকারী ও সংগ্রাহকদেরকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। এসব শ্রেণীবিন্যাসের অন্যতম হলো যুগভিত্তিক শ্রেণীবিন্যাস। বর্ণনাকারী ও সংগ্রাহকগণ কে কোন যুগে বসবাস করেছেন এবং কে কতটুকু সমকালীন বিখ্যাত পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গের সাহচর্য পেয়েছেন- এগুলোর ভিত্তিতে এ শ্রেণীবিন্যাস করা হয়েছে। এ শ্রেণীবিন্যাসের উদ্দেশ্য ছিল বর্ণনাসূত্রের ধারাবাহিকতা নিয়ে গবেষণার কাজকে সহজতর করে দেয়া। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনু হাযার আসকালানী তার তাক্বরীবুত তাহযীব শীর্ষক গ্রন্থে বর্ণনা স্তরসমূহের যে তালিকা উপস্থাপন করেছেন নিম্নে তা তুলে ধরা হলো:

| স্তর | বর্ণনাকারী | বিবরণ |
|---|---|---|
| ১ম | সাহাবা | যেমন, আবু হুরায়রা |
| ২য় | প্রধান তাবিউন | যেমন, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব |
| ৩য় | মাঝারি তাবিউন | যেমন, হাসান বসরী ও ইবনু সীরিন |

৪র্থ নিম্ন মাঝারি তাবিউন তারা সাহাবা থেকে নয়, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রধান তাবিউন থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন; যেমন যুহরী ও কাতাদাহ
৫ম অল্প বয়সী তাবিউন যারা একজন বা দু'জন সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন, কিন্তু তাদের নিকট থেকে কোনো হাদীস বর্ণনা করেছেন মর্মে কোনো তথ্য নেই। যেমন, আ'মাশ ও আবু হানীফা
৬ষ্ঠ অল্প বয়সী তাবিউনের সমসাময়িক যারা কোনো সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন বলে জানা যায় না। যেমন ইবনু জুরাইজ।
৭ম প্রধান তাবউত তাবি'ঈদের ছাত্র। যেমন ছাওরী ও মালিক
৮ম তাবি ‘ঈতাবি ‘ঈন যেমন, ইবনু উয়াইনাহ ও ইবনু উলাইয়াহ
৯ম মাঝারি তাবউত তাবি'ঈন যেমন, শাফিয়ী ও আব্দুর রায্যাক
১০ম ছোট তাবউত তাবি'ঈন তাবউত তাবি'ঈন থেকে প্রধান বর্ণনাকারী যারা কখনো কোনো তাবি'ঈর সাক্ষাৎ পাননি, যেমন আহমাদ ইবনু হাম্বল
১১শ তাবউত তাবি'ঈন থেকে মাঝারি বর্ণনাকারী যেমন ইমাম বুখারী
১২শ তাবউত তাবি'ঈন থেকে কম বয়সী বর্ণনাকারী যেমন ইমাম তিরমিযী।

বর্ণনাকারীদের নির্ভরযোগ্যতার শ্রেণীবিন্যাস
হাদীস বিশেষজ্ঞগণ হাদীস বর্ণনাকারী ও সংগ্রাহকদেরকে যেসব ভাগে বিভক্ত করেছেন তার আরেকটি হলো 'নির্ভরযোগ্যাতা' ভিত্তিক শ্রেণীবিন্যাস। বর্ণনাকারীদের স্মৃতিশক্তি, ধীশক্তি, নৈতিক চরিত্র, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, খ্যাতি বা অখ্যাতি এবং তাদের দার্শনিক ঝোঁক প্রবণতা- এসব দিক বিবেচনায় তাদের আপেক্ষিক নির্ভরযোগ্যতার ভিত্তিতে এ শ্রেণীবিন্যাস করা হয়েছে।
এ শ্রেণীবিন্যাসে বর্ণনাকারীদেরকে ওপর-নীচ বিন্যাস (descending order) অনুযায়ী সাজানো হয়েছে এবং কে কোন শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত তা বুঝানোর জন্য বিশেষ কিছু পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।

| শ্রেণী | বিবরণ | পরিভাষা |
|---|---|---|
| ১ম | নাবী -এর সাহাবা | সাহাবী; সাহাবিয়্যাহ; লাহু ছুহবাহ |
| ২য় | নিখুঁত স্মৃতিশক্তির জন্য ব্যাপক প্রশংসিত | সিকাহ; সিকাহ হাফিজ; আওছাকুন নাছ |
| ৩য় | সাধারণভাবে নির্ভরযোগ্য | সিকাহ; মুতকিন; বর্ণনাকারী ছাবত বা আদল |
| ৪র্থ | সত্যবাদী বর্ণনাকারী তবে মাঝেমধ্যে ভুল হয়ে যাওয়ার কারণে যার নির্ভরযোগ্যতা কিছুটা ত্রুটিযুক্ত হয়ে পড়েছে | সাদূক; লা বা'সা বিহ বা লাইসা বিহি বা'স |
| ৫ম | সত্যবাদী বর্ণনাকারী তবে যাদের দুর্বল স্মৃতিশক্তি, জরাগ্রস্ততা, ভুল ব্যাখ্যা বা অনুরূপ কোনো কারণে কিছু ভুল হয়ে গিয়েছে। এ শ্রেণীতে সেসব বর্ণনাকারীও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যারা বা তাগায়‍্যারা বি তাশাইয়ু', কাদর, নাসব, ইরজা বা তাজাহহুম আখিরাহ পদ্ধতির বিদ'আতের দায়ে অভিযুক্ত | সাদৃক ইয়ুখত্বি; ইয়াহিমু; সাইয়িউল হিফজ; লাহু আওহাম |
| ৬ষ্ঠ | মাত্র অল্প কিছু হাদীসের বর্ণনাকারী যার প্রত্যাখ্যাত হাদীসসমূহ তার নিজের ত্রুটির কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়নি। তার বর্ণিত হাদীসসমূহকে যাচাই করে গ্রহণ করতে হবে | মাকবুল/মাকবুলাহ |
| ৭ম | যার নিকট থেকে একাধিক বর্ণনাকারী হাদীস বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তাকে সিকাহ শ্রেণীভুক্ত করা হয়নি | মাসতুর বা মাজহুলুল হাল |
| ৮ম | এমন বর্ণনাকারী যার বিরুদ্ধে অনির্ভরযোগ্য হওয়ার সমালোচনা রয়েছে | দঈফ |
| ৯ম | এমন বর্ণনাকারী যার নিকট থেকে মাত্র একজন বর্ণনাকারী হাদীস বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তাকে সিকাহ মনে করা হয় না | মাজহুল |
| ১০ম | সকলের মতে অনির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী | মাতরূক; ছাকিত; মাতরূকুল হাদীস বা ওয়াহিমুল হাদীস |
| ১১শ | মিথ্যার দায়ে অভিযুক্ত বর্ণনাকারী | উত্তহিমা বিল কাযিব |
| ১২শ | মিথ্যুক বা জালিয়াত শ্রেণীভুক্ত | কায্যাব বা ওয়াদ্দা' |

হাদীস গবেষণার একটি দৃষ্টান্ত

حدثنا على بن خشرم حدثنا عيسى بن يونس عن عبيد الله بن ابي زياد القداح عن شهر بن حوشب عن اسماء بنت يزيد ان النبي صلى الله عليه و سلم قال اسم الله الاعظم في هاتين الايتين و الحكم اله واحد لا اله الا هو الرحمن الرحيم و فاتحة ال عمران الم الله لا اله الا هو الحى القيوم قال ابو عيسى هذا حديث حسن صحیح

আলী ইবনু খাসরাম বর্ণনা করেছেন যে, ঈসা ইবনু ইউনুস উবাইদুল্লাহ ইবনু আবী যিয়াদ কাদ্দাহ থেকে তিনি শাহর ইবনু হাওশাব থেকে তিনি আসমা বিনতু ইয়াযীদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে নাবী বলেছেন, "আল্লাহ তা'আলার সর্বশ্রেষ্ঠ নাম রয়েছে এ দু'টি আয়াতে, "আর তোমাদের ইলাহ হলেন মাত্র একজন ইলাহ, তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই; তিনি পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু" এবং আলে ইমরানের প্রথম আয়াত "আলিফ-লাম-মীম, আল্লাহ, তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই; তিনি চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী।”

এ হাদীসটি সংগ্রহ করেছেন ইমাম তিরমিযী। তিনি এটিকে হাসান সহীহ শ্রেণীভুক্ত করেছেন (খণ্ড ৫, পৃ, ১৭৯, নং ৩৫৪৩); ইবনু মাজাহ ও আহমাদ।

হাদীস গবেষণার পদ্ধতি
প্রথম ধাপ
হাদীস বর্ণনাকারীদের তালিকা প্রণয়ন করে তাক্বরীবুত তাহযীব গ্রন্থ থেকে তাদের জীবন চরিতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ লিপিবদ্ধ করা।

দ্বিতীয় ধাপ
উপরোক্ত ৭-১২ শ্রেণীতে ব্যবহৃত পরিভাষাসমূহের কোনো একটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট হাদীসের কোনো বর্ণনাকারীকে দ'ঈফ শ্রেণীভুক্ত করা হলে হাদীসটি আপনা-আপনি 'দ'ঈফ' শ্রেণীভুক্ত ও প্রত্যাখ্যাত হবে।

তৃতীয় ধাপ
বর্ণনাকারীদের মৃত্যু সালগুলোকে মিলিয়ে নিশ্চিত হতে হবে যে, তাদের পরস্পরের সাথে সাক্ষাৎ সম্ভব ছিল। যদি দু'জন বর্ণনাকারীর মধ্যে সাক্ষাৎ সম্ভব না হয়ে থাকে, তাহলে সানাদটিকে মুনকাতি' শ্রেণীভুক্ত করা হবে এবং স্বয়ং হাদীসটিকে 'দ'ঈফ' আখ্যায়িত করে প্রত্যাখ্যান করা হবে।

চতুর্থ ধাপ
অতঃপর বর্ণনাকারীদের যুগসমূহকে তুলনা করে দেখতে হবে যে, তারা যেসব ব্যক্তির নিকট থেকে উক্ত হাদীসটি বর্ণনা করছেন তাদের সকলের পক্ষে সেসব ব্যক্তির নিকট থেকে বর্ণনা করা সম্ভব হয়েছে কি না। যদি কোনো বর্ণনাকারী এমন যুগের লোক হয়ে থাকেন যার পক্ষে তার দাবিকৃত ব্যক্তির নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করা সম্ভব না হয়ে থাকে এবং স্বয়ং তাকে যদি ৫ম বা ৬ষ্ঠ শ্রেণীর বর্ণনাকারী হিসেবে শ্রেণীভুক্ত করা হয়, তাহলে হাদীসটিকেও 'দ'ঈফ' হিসেবে প্রত্যাখ্যান করা হবে। যদি বর্ণনাকারী ৪র্থ বা তার ঊর্ধ্বতন শ্রেণীভুক্ত হন, তাহলে আরেকটু বাড়তি যাচাই করে দেখতে হবে যে, উক্ত বিষয়টি (সাধারণ বিধানের) কোনো ব্যতিক্রম কি না; যদি তা না হয়, তাহলে হাদীসটিকে 'মুরসাল' শ্রেণীভুক্ত করে অন্যান্য প্রশ্নবিদ্ধ বর্ণনাসমূহের অনুকূলে সম্ভাব্য সমর্থন হিসেবে এক পাশে রেখে দেয়া হবে।

পঞ্চম ধাপ
যদি বর্ণনাকারীদের বর্ণনাসূত্রটি নিরবচ্ছিন্ন মনে হয় এবং কোনো একজন বর্ণনাকারী যদি ৪র্থ থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণীভুক্ত হন, তাহলে হাদীসটিকে 'হাসান' শ্রেণীভুক্ত করে একে ইসলামী আইনের এমন কোনো বিধান প্রতিষ্ঠায় প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে যাকে শারী'আহর অনস্বীকার্য বৈধ অংশ হিসেবে মেনে নেয়া হবে।
ষষ্ঠ ধাপ
বর্ণনাসূত্রের সকলেই যদি ১ম থেকে ৩য় শ্রেণীভুক্ত হন, তাহলে হাদীসটিকে 'সহীহ' শ্রেণীভুক্ত করে এমন 'হাসান' হাদীসের ওপর প্রাধান্য দিতে হবে যা এর সাথে সাংঘর্ষিক।

সপ্তম ধাপ
হাদীসের অন্যান্য বর্ণনাসমূহ যাচাই করে দেখা এবং বর্ণনাসূত্রের ওপর গবেষণা চালানো, যাতে হাদীসটিকে 'দ'ঈফ' থেকে 'হাসান লি গাইরিহী' কিংবা 'হাসান লি যাতিহী' থেকে 'সহীহ লি গাইরিহী' পর্যায়ে উন্নীত করার ক্ষেত্রে সম্ভব সহায়ক হিসেবে উক্ত গবেষণাকে কাজে লাগানো যায়।

এ হাদীসের সাথে সংশ্লিষ্ট তাক্বরীবুত তাহযীব গ্রন্থের পৃষ্ঠাসমূহের জন্য পরিশিষ্ট ১ দেখুন।

টিকাঃ
[১] সহীহ বুখারী, ইলম, ৩৮।
[২] সহীহ মুসলিম, ঈমান, ১০ ও সহীহ বুখারী।
[৩] সুনানুন নাসাঈ, খণ্ড ৫, ৩।
[৪] মুসনাদু আহমাদ, ৫, ১৪৩।
[৫] সহীহ বুখারী, মাগাযী, ২৫।
[৬] মুসলিম, মুসাফিরূন, ১।
[৭] সহীহ বুখারী, যাকাত, ৪৪।
[৮] স্টাডিজ ইন আরলি হাদীস লিটারেচার, পৃ, ৫২।
[৯] খতীব, জামি', ৫এ (5a)। স্টাডিজ ইন
[১০] ইবনু হিব্বান, আল মাজরূহীন, ১১ক
[১১] হাকিম, আল মাদখাল, ৪৬।
[১২] সহীহ বুখারী, বুয়ু ৯, সহীহ মুসলিম, আদাব ৩৬।
[১৩] মুসনাদু আহমাদ, ২, ৩৮৭, সহীহ মুসলিম খণ্ড ১ নং ১০৬৭।
[১৪] আহমাদ ইবনু হাম্বল, আল ইলাল, ১, ৩৯৬।
[১৫] সহীহ বুখারী, শাহাদাত, ২।
[১৬] মুসলিম, তাময়ীয, পৃ, ১৩৬-৮।
[১৭] সহীহ মুসলিম, ইলম, ১৪।
[১৮] আল জারহু ওয়াত তা'দীল, ভূমিকা,
[১৯] সহীহ মুসলিম, খণ্ড ২, পৃ, ৭৬৯-৭৭০, নং ৩৫১২।
[২০] সহীহ মুসলিম, খণ্ড ২, পৃ, ৭৭২, নং
[২১] সুনানু আবী দাউদ, খণ্ড ১, পৃ, ৪০, নং ১৬২। সহীহ সুনানু আবী দাউদ গ্রন্থে (খণ্ড ১, পৃ, ৩৩, নং ১৪৭) এ হাদীসটিকে প্রামাণ্য আখ্যায়িত করও

📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 হাদীস শাস্ত্রে নারী বিশেষজ্ঞ

📄 হাদীস শাস্ত্রে নারী বিশেষজ্ঞ


আধুনিক যুগের পূর্বেকার ইতিহাসে অল্প কয়েকটি বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগের কথা লেখা আছে যেখানে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও গুরুত্বপূর্ণ ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। এ ক্ষেত্রে হাদীস শাস্ত্র একটি অসাধারণ ব্যতিক্রম। কুরআনের আয়াত ও নাবী -এর শিক্ষাসমূহে নারীদের গুরুত্বকে সবসময় জোরালোভাবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং প্রাক-ইসলামী যুগের প্রথার বিরুদ্ধে তাদের অধিকারগুলোকে সুরক্ষা প্রদান করা হয়েছে। ফলে মুসলিম জনগোষ্ঠী তাদের দ্বীনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলীর দায়িত্ব সানন্দে নারীদের ওপর অর্পণ করেছে; কেননা, পুরুষের সহযোগী হিসেবে নারীরা আল্লাহর দৃষ্টিতে একই মর্যাদার অধিকারী। এ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে এ বিষয়ের ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে যে, ইসলাম কেন এতো বিপুল সংখ্যক অসাধারণ প্রতিভার অধিকারিণী বিদুষী নারী সৃষ্টি করেছে যাদের সাক্ষ্য ও সঠিক মতামতের ওপর ইসলামের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নির্ভরশীল; অথচ পাশ্চাত্যের চিরায়ত ধর্মসমূহে যার কোনো নজীরই নেই।

ইসলামের একেবারে প্রথম দিন থেকেই নারীরা হাদীস সংরক্ষণ ও বর্ণনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে; আর এ প্রথা চালু ছিল পরবর্তী শত শত বছর ধরে। মুসলিম ইতিহাসের প্রত্যেক যুগে অসংখ্য প্রখ্যাত নারী মুহাদ্দিস ছিলেন যাদেরকে তাদের ভাইয়েরা অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার চোখে দেখেছেন। চরিতাভিধানগুলোর প্রায় প্রত্যেকটির শেষের অধ্যায়গুলোতে বিপুল সংখ্যক নারী মুহাদ্দিসের জীবন বৃত্তান্ত আলোচনা করা হয়েছে।

নাবী -এর জীবদ্দশায় অসংখ্য নারী কেবল প্রচুর পরিমাণ হাদীসের কার্যকারণই ছিলেন না, তারা তাদের দ্বীনি ভাই-বোনদের নিকট সেসব হাদীস পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বও পালন করেছেন। নাবী -এর ইন্তেকালের পর অসংখ্য নারী সাহাবী (বিশেষত নাবী -এর স্ত্রীগণ)-কে জ্ঞানের মৌলিক সংরক্ষক হিসেবে বিবেচনা করা হতো; অন্যান্য সাহাবীরা জ্ঞানার্জনের জন্য তাদের দ্বারস্থ হতেন; আর তারাও নাবী -এর সাহচর্যে থেকে জ্ঞানের যে সমৃদ্ধ ভাণ্ডার লাভ করেছিলেন তা শিক্ষার্থীদেরকে উজার করে দিতেন। হাদীসের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর নিকট প্রথম দিকের অন্যতম মর্যাদাবান হাদীস বর্ণনাকারী হিসেবে হাফসা, উম্মু হাবীবা, মাইমুনা, উম্মু সালামা ও আয়েশা -এর নাম অত্যন্ত সুপরিচিত। বিশেষত আয়েশা হলেন হাদীস সাহিত্যের সমগ্র ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের অন্যতম। তিনি শুধু বিপুল সংখ্যক হাদীসের প্রাচীনতম বর্ণনাকারীদেরই একজন নন, বরং তিনি তাদেরও অন্যতম যারা সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে হাদীসের ব্যাখ্যা করেছেন।

তাবি'ঈদের যুগেও নারীরা মুহাদ্দিস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছিলেন। ইবনু সীরীনের মেয়ে হাফসা, ছোট উম্মুদ দারদা (মৃত্যু ৮১/৭০০) ও আমরাহ বিনতু আব্দির রহমান— প্রমুখ হলো সে যুগের গুরুত্বপূর্ণ নারী মুহাদ্দিসদের মধ্য থেকে অল্প কয়েকজনের নাম। সে যুগের গুরুত্বপূর্ণ মুহাদ্দিস ও অবিসংবাদিত যোগ্যতা ও মেধা সম্পন্ন বিচারক ইয়াস ইবনু মুয়াবিয়ার দৃষ্টিতে উম্মুদ দারদা ছিলেন যুগের অন্য সকল মুহাদ্দিসের তুলনায় শ্রেষ্ঠ, এমনকি হাদীস শাস্ত্রের প্রখ্যাত পণ্ডিত হাসান বসরী ও ইবনু সীরীনের তুলনায়ও। [১] আয়েশা কর্তৃক বর্ণিত হাদীসসমূহের ক্ষেত্রে আমরাহকে বিখ্যাত পণ্ডিত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। তার অন্যতম ছাত্র ও মদীনার প্রখ্যাত বিচারক আবু বাক্ ইবনু হাযামকে খলিফা উমার ইবনু আব্দিল আযীয নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি যেন আমরাহ এর বরাতে বর্ণিত সবগুলো হাদীস লিপিবদ্ধ করে ফেলেন। [২]

তাদের পর আবিদা মাদানিয়্যা, আব্দাহ বিনতু বিশর, উম্মু উমার ছাক্বাফিয়্যা, আলী ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনি আব্বাসের নাতনি যাইনাব, নাফিসা বিনতুল হাসান ইবনি যিয়াদ, খাদিজা উম্মু মুহাম্মাদ, আব্দাহ বিনতু আব্দির রহমান ও আরো অন্যান্য অনেক নারী হাদীসের ওপর গণপাঠদানে ব্যাপক পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। বিভিন্ন পটভূমি থেকে এসব নিবেদিতপ্রাণ নারী এসে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, ইসলামী জ্ঞানে ব্যুৎপত্তি অর্জন করার ক্ষেত্রে শ্রেণী বা লিঙ্গ— কোনোটিই কোনো প্রতিবন্ধক নয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ, আবিদার জীবন শুরু হয়েছিল মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াযীদের মালিকানাধীন বাঁদী হিসেবে; ঐ অবস্থায় তিনি মদীনার শিক্ষকদের নিকট থেকে বিপুল সংখ্যক হাদীস শিখে ফেলেন। স্পেনের বিখ্যাত মুহাদ্দিস হাবীব দাহহুন হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কায় আসার পর আবিদার প্রভু তাকে দাহহুনের নিকট হস্তান্তর করেন। তার জ্ঞানে মুগ্ধ হয়ে দাহহুন তাকে মুক্তি দিয়ে বিয়ে করেন এবং তাকে আন্দালুস নিয়ে যান। সেখানে তিনি তার মদীনার শিক্ষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে দশ সহস্রাধিক হাদীস বর্ণনা করেন।[৩]

পক্ষান্তরে, যাইনাব বিনতু সুলাইমান (মৃত্যু ১৪২/৭৫৯) ছিলেন জন্মসূত্রে রাজকন্যা। তার পিতা ছিলেন আব্বাসী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা সাফফাহ এর চাচাতো ভাই। মনসূরের শাসনামলে তার পিতা বসরা, ওমান ও বাহরাইনের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। উন্নত শিক্ষা-দীক্ষা পাওয়া যাইনাব হাদীস সাহিত্যে বিপুল পাণ্ডিত্য অর্জন করে তার সময়ের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ অন্যতম নারী মুহাদ্দিস হিসেবে ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছিলেন। অসংখ্য নামকরা পুরুষ মুহাদ্দিস ছিলেন তার ছাত্র।[৪]

হাদীস শাস্ত্রের বিখ্যাত গ্রন্থসমূহ রচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত নাবী ﷺ-এর হাদীস চর্চায় পুরুষদের সাথে নারীদের এ অংশগ্রহণ অব্যাহত ছিল। হাদীসের মূলপাঠসমূহকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, একেবারে প্রথম যুগ থেকে শুরু করে হাদীসের সকল গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কলকই মহিলা শিক্ষকদের নিকট থেকে হাদীস গ্রহণ করেছেন। প্রধান প্রধান হাদীস গ্রন্থগুলোর প্রত্যেকটিতে সঙ্কলকের সরাসরি শিক্ষক হিসেবে অসংখ্য নারীর নাম রয়েছে। এসব গ্রন্থ সঙ্কলনকালে নারী মুহাদ্দিসগণ সেসব হাদীস ভালোভাবে আয়ত্ত করে নিয়ে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর সামনে পাঠদান করেছেন এবং সেসব ছাত্রকে অন্যের নিকট হাদীস বর্ণনা করার ইজাযাহ (অনুমতি) প্রদান করেছেন।[৫]

চতুর্থ শতকে আমরা যেসব নারী মুহাদ্দিসের সন্ধান পাই তারা হলেন-ফাতিমা বিনতু আব্দির রহমান (মৃত্যু ৩১২/৯২৪) যিনি তার সাদাসিদে পোশাক ও দ্বীনদারীর জন্য সুফিয়া নামে পরিচিত; সুনান গ্রন্থের রচয়িতা আবু দাউদের নাতনি ফাতিমা; প্রখ্যাত আইনবিদ মুহাম্মিলীর কন্যা আমাতুল ওয়াহিদ (মৃত্যু ৩৭৭/৯৮৭); বিচার আবু বাক্ আহমাদ ((মৃত্যু ৩৫০/৯৬১)-এর কন্যা উম্মুল ফাতহ আমাতুস সালাম (মৃত্যু ৩৯০/৯৯৯) ও জুমু'আহ বিনতু আহমাদ প্রমুখ। তাদের পাঠদানে শ্রদ্ধাভাজন শ্রোতারা সবসময় উপস্থিত থাকতেন।[৬]

হাদীস শাস্ত্রে নারীদের পাণ্ডিত্য অর্জনের এ ইসলামী প্রথা হিজরী পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকেও অব্যাহত থাকে। বিখ্যাত মরমী সাধক ও মুহাদ্দিস আবুল কাসিম কুশাইরীর স্ত্রী ফাতিমা বিনতুল হাসান ইবনি আলী ইবনিল দাক্কাক (মৃত্যু ৪৮০/১০৮৭) শুধু তার দ্বীনদারী ও সুন্দর হস্তলিপির জন্যই বিখ্যাত ছিলেন না, হাদীস ও উৎকৃষ্ট মানের ইসনাদ জ্ঞানের জন্যও তিনি যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। আরো বেশি সুনাম কুড়িয়েছেন কারীমা মারওয়াযিয়্যা (মৃত্যু ৪৬৩/১০৭০); তার সময়ে তাকে সহীহ বুখারীর সর্বশ্রেষ্ঠ পণ্ডিত মনে করা হতো। সে সময়ের প্রথম সারির বিদ্বানদের অন্যতম হেরাতের আবু যার কারীমার পাণ্ডিত্যের মানকে এতো গুরুত্ব দিতেন যে, তিনি তার ছাত্রদেরকে উপদেশ দিয়েছিলেন তারা যেন অন্য কারো নিকট সহীহ বুখারী অধ্যয়ন না করে। এভাবে তিনি ইসলামের এ মৌলিক গ্রন্থটি বংশ পরম্পরায় পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছেন। গোল্ডযিহার লিখেছেন, 'বস্তুত, এ গ্রন্থের মূলপাঠ বর্ণনার ইজাযাহ-এর ক্ষেত্রে তার নাম অসংখ্য বার উচ্চারিত হয়।[৭]

তার অন্যতম ছাত্র ছিলেন খতীব বাগদাদী ও হুমাইদী (৪২৮/১০৩৬-৪৮৮/১০৯৫)।

কারীমা ছাড়াও বেশ কিছু সংখ্যক নারী মুহাদ্দিস সহীহ গ্রন্থের মূলপাঠ বর্ণনার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। তাদের মধ্যে ফাতিমা বিনতু মুহাম্মাদ (মৃত্যু ৫৩৯/১১৪৪); শুহদাহ বিনতু আহমাদ ইবনুল ফারাজ (মৃত্যু ৫৭৪/১১৭৮) ও সিতুল ওযারা বিনতু উমার (মৃত্যু ৭১৬/১৩১৬)-এর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। ফাতিমা এ গ্রন্থটি বিখ্যাত মুহাদ্দিস সাঈদ আইয়ারের বরাতে বর্ণনা করেছেন এবং হাদীস বিশেষজ্ঞদের নিকট থেকে মুসনিদাতু ইসবাহান (ইস্পাহানের বিখ্যাত হাদীস বিশেষজ্ঞ) শীর্ষক গৌরবজনক উপাধি লাভ করেন। শুহদা ছিলেন একজন বিখ্যাত চারু লিপিকার ও খ্যাতনামা মুহাদ্দিস। জীবনচরিতকারগণ তাকে একজন চারুলিপিকার, হাদীসের খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞ ও নারী জাতির গৌরব ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করেছেন। তার প্রপিতামহ ছিলেন সুঁই বিক্রেতা; আর তা থেকে তিনি আল ইবরী উপাধি লাভ করেন। তবে তার পিতা আবু নাসর (মৃত্যু ৫০৬/১১১২) ছিলেন হাদীস অনুরাগী; তিনি বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের নিকট হাদীস অধ্যয়ন করতে সক্ষম হন। সুন্নাহ'র অনুসরণে তিনি তার মেয়েকে উন্নত শিক্ষা প্রদান করেন এবং তার মেয়ে যেন গ্রহণযোগ্য ও খ্যাতিমান মুহাদ্দিসদের নিকট থেকে হাদীস শিখতে পারে— তিনি তাও নিশ্চিত করেন।

তিনি আলী ইবনু মুহাম্মাদ নামে এক বিখ্যাত বিদ্যানুরাগীকে বিয়ে করেন যিনি পরবর্তীতে খলিফা মুকতাফির ঘনিষ্টতা লাভ করেন এবং একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। খলিফা মুকতাফি সে কলেজে উদার হস্তে দান করেন। তবে তার তুলনায় তার স্ত্রী ছিলেন অধিক খ্যাতিমান। তিনি হাদীস সাহিত্যে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেন এবং উন্নত মানের ইসনাদ-এর জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। এ ব্যাপক খ্যাতির ফলে সহীহ বুখারী ও অন্যান্য হাদীস সঙ্কলনের ওপর তার পাঠদানে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ভিড় লেগে যেতো।

সহীহ বুখারীর আরেক নারী বিশেষজ্ঞ ছিলেন সিতুল ওযারা যিনি ইসলামী আইনে প্রশংসনীয় ব্যুৎপত্তির পাশাপাশি তার সময়ের মুসনিদাহ হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তিনি মিশর ও দামেশকে সহীহ ও অন্যান্য গ্রন্থের ওপর পাঠদান করেছেন। একইভাবে উম্মুল খাইর আমাতুল খালিকও (৮১১/১৪০৮-৯১১-১৫০৫) সহীহ বুখারীর ওপর পাঠদান করেছেন যাকে হিজাযের সর্বশেষ বিখ্যাত হাদীস বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। সহীহ বুখারীর আরেক নারী বিশেষজ্ঞ ছিলেন আয়িশা বিনতু আব্দিল হাদী।[৮]

সহীহ বুখারীর ওপর পাণ্ডিত্যের অধিকারী এসব নারীর পাশাপাশি আরো অনেক নারী ছিলেন যাদের পাণ্ডিত্য ছিল হাদীসের অপরাপর গ্রন্থ কেন্দ্রিক। উম্মুল খাইর ফাতিমা বিনতু আলী (মৃত্যু ৫৩২/১১৩৭) ও ফাতিমা শাহরাযুরিয়্যা— উভয়েই সহীহ মুসলিম-এর ওপর পাঠদান করেছেন। ফাতিমা জাওদানিয়্যা (মৃত্যু ৫২৪/১১২৯) তার ছাত্রদের নিকট তাবারানীর তিনটি মুসনাদ বর্ণনা করেছেন। হাররানের যাইনাব (মৃত্যু ৬৮৮/১২৮৯)– যার পাঠদানে প্রচুর ছাত্র উপস্থিত হতো— হাদীসের সর্ববৃহৎ সঙ্কলন আহমাদ ইবনু হাম্বলের মুসনাদ গ্রন্থের ওপর পাঠদান করেছেন। জুয়াইরিয়া বিনতু উমার (মৃত্যু ৭৮৩/১৩৮১) ও যাইনাব বিনতু আহমাদ ইবনি উমার (মৃত্যু ৭২২/১৩২২)— যিনি হাদীসের সন্ধানে ব্যাপক সফর শেষে মিশর ও মদীনায় পাঠদান করেছিলেন— স্ব স্ব ছাত্রদের নিকট সুনানুদ দারিমী ও আবদ ইবনু হুমাইদের গ্রন্থাবলী বর্ণনা করেছেন। তার পাঠদানে হাজির হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীরা দূরদূরান্ত থেকে ভ্রমণ করে আসতো। বিনতুল কামাল নামে পরিচিত যাইনাব বিনতু আহমাদ (মৃত্যু ৭৪০/১৩৩৯) আবু হানিফার মুসনাদ, শামাইলুত তিরমিযী, ও তাহাভীর শারহু মা'আনিল আসার-এর ওপর পাঠদান করেছেন; সর্বশেষ গ্রন্থটি তিনি আজীবা বিনতু আবী বাক্ নাম্নী আরেক নারী মুহাদ্দিসের নিকট অধ্যয়ন করেছিলেন। গোল্ডযিহার বলেন, 'গোথা কোডেক্স-এর প্রামাণিকতার ভিত্তি হলো এ নারী মুহাদ্দিস ... একই ইসনাদে বিপুল সংখ্যক নারীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে যারা এ গ্রন্থ নিয়ে কাজ করেছিলেন।' বিখ্যাত পর্যটক ইবনু বতুতা দামেশকে অবস্থানকালে এ নারী সহ আরো অনেক নারী মুহাদ্দিসের নিকট হাদীস অধ্যয়ন করেছেন।

দামেশকের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনুল আসাকির আমাদেরকে অবহিত করেছেন যে, তিনি বারো শতাধিক পুরুষ ও আশির অধিক নারীর তত্ত্বাবধানে অধ্যয়ন করেছেন এবং ইমাম মালিকের মু'আত্তা বর্ণনা করার জন্য যাইনাব বিনতু আব্দির রহমানের ইজাযাহ লাভ করেছেন। জালালুদ্দীন সুয়ূতী ইমাম শাফিয়ীর আর রিসালাহ গ্রন্থটি হাজার বিনতু মুহাম্মদের নিকট অধ্যয়ন করেছেন। হিজরী নবম শতকের হাদীস বিশারদ আফীফুদ্দীন জুনাইদ সুনানুদ দারিমী গ্রন্থটি ফাতিমা বিনতু আহমাদ ইবনি কাসিমকে পাঠ করে শুনিয়েছেন।

গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য নারী মুহাদ্দিসদের মধ্যে যাইনাব বিনতুশ শাফিয়ী (৫২৪-৬১৫/১১২৯-১২১৮)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি প্রথম সারির বেশ কয়েকজন মুহাদ্দিসের নিকট হাদীস অধ্যয়ন করে অসংখ্য ছাত্রের নিকট পাঠদান করেছেন। তার ছাত্রদের মধ্যে যারা ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছিলেন তাদের অন্যতম হলেন ওফায়াতুল আ'ইয়ান নামক বিখ্যাত চরিতাভিধান রচয়িতা ইবনু খাল্লিকান।[৯] আরেকজন নারী মুহাদ্দিস ছিলেন সিরিয়ার কারীমা (মৃত্যু ৬৪১/১২১৮), যাকে জীবনচরিতকারগণ তার সময়ের সিরিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ হাদীস বিশারদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি অসংখ্য শিক্ষকের বরাতে হাদীসের অনেক গ্রন্থের ওপর পাঠদান করেছেন।

ইবনু হাযার আসকালানী তার আদ দুরারুল কামিনা গ্রন্থে অষ্টম শতকের প্রায় ১৭০ জন প্রখ্যাত নারীর জীবন বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন- যাদের অধিকাংশই হাদীস বিশারদ এবং স্বয়ং গ্রন্থকার তাদের অনেকের তত্ত্বাবধানে শিক্ষা লাভ করেছেন। এসব নারী মুহাদ্দিসদের কেউ কেউ ছিলেন সে সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস হিসেবে স্বীকৃত। দৃষ্টান্তস্বরূপ, জুয়াইরিয়্যা বিনতু আহমাদ- ইতোপূর্বে যার কথা আলোচনা করা হয়েছে- হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থ পুরুষ ও নারী বিশেষজ্ঞদের নিকট অধ্যয়ন করেছেন যারা সে সময়ের বিখ্যাত কলেজসমূহে পাঠদান করেছেন। জ্ঞানার্জন শেষে সেসব বিদুষী নারী ইসলামের বিভিন্ন শাখার ওপর জ্ঞানগর্ভ ভাষণ দিয়েছেন। ইবনু হাযার আসকালানী বলেন, 'স্বয়ং আমার কতিপয় শিক্ষক এবং আমার সমসাময়িক অনেকেই তার পাঠদানে উপস্থিত থাকতো।' আয়িশা বিনতু আব্দিল হাদী (৭২৩-৮১৬)- যার কথাও ইতোপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে- তার সময়ের সর্বোত্তম মুহাদ্দিস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন; একটি উল্লেখযোগ্য সময় জুড়ে যিনি ছিলেন ইবনু হাযারের অন্যতম শিক্ষক। তার তত্ত্বাবধানে দ্বীনের সত্য শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থী তার নিকট ভিড় জমাতো। [১০] সিতুল আরব (মৃত্যু ৭৬০/১৩৫৮) ছিলেন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হাফিজ ইরাকী (মৃত্যু ৭৪১/১৩৪১) সহ আরো অনেকের শিক্ষক যারা নিজেদের জ্ঞানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তার নিকট থেকে অর্জন করেছেন। দাকীকা বিনতু মুরশিদ (মৃত্যু ৭৪৬/১৩৪৫) নাম্নী আরেকজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস বিপুল সংখ্যক নারী মুহাদ্দিসের নিকট থেকে শিক্ষা লাভ করেছেন।

মুহাম্মাদ ইবনু আব্দির রহমান সাখাভী (৮৩০-৮৯৭/১৩৪৭–১৪২৭)-এর লেখা আদ দাওউল লামি' নামক একটি গ্রন্থে নবম শতকের নারী মুহাদ্দিসদের সম্পর্কে তথ্য প্রদান করা হয়েছে। আদ দাওউল লামি' হলো নবম শতকের প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গের চরিতাবিধান। এ সম্পর্কিত আরো তথ্য রয়েছে আব্দুল আযীয ইবনু উমার ইবনি ফাহদ (৮১২-৮৭১/১৪০৯-১৪৬৬)-এর লেখা মু'জামুশ শুয়ূখ গ্রন্থে। ৮৬১ হিজরীতে সঙ্কলিত এ গ্রন্থে ১৩০ জন বিদুষী নারী সহ এগার শতাধিক শিক্ষকের জীবন বৃত্তান্ত আলোচনা করা হয়েছে যাদের তত্ত্বাবধানে উক্ত গ্রন্থকার অধ্যয়ন করেছেন। সেসব নারীর মধ্যে কয়েকজন ছিলেন সে সময়ের সূক্ষ্মদর্শী ও বিদ্বান মুহাদ্দিসদের অন্যতম; তারা পরবর্তী প্রজন্মের অনেক বিখ্যাত পণ্ডিতকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, উম্মু হানী মারইয়াম (৭৭৮-৮৭১/১৩৭৬–১৪৬৬) শিশুকালেই কুরআন মুখস্থ করে ধর্মতত্ত্ব, আইন, ইতিহাস ও ব্যাকরণ সহ ইসলামী জ্ঞানের যে কয়টি শাখা সে যুগে শেখানো হতো সেগুলোর সব ক'টি শাখায় তিনি পারদর্শিতা অর্জন করেন। তারপর তিনি তদানীন্তন কায়রো ও মক্কার সর্বশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসদের নিকট হাদীস অধ্যয়ন করার লক্ষ্যে ভ্রমণে বেরিয়ে যান। উৎকৃষ্ট মানের চারুলিপি, আরবি ভাষার পাণ্ডিত্য, স্বভাবজাত কাব্য প্রতিভা ও দ্বীনি কর্তব্যসমূহের কঠোর অনুসরণের জন্যও তিনি যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তার ছেলে—যিনি ছিলেন দশম শতাব্দীর একজন বিখ্যাত পণ্ডিত—তার প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। জীবনের শেষ দিকে তার ছেলে তার জন্য সারাক্ষণ জেগে ছিলেন। কায়রোর বিখ্যাত কলেজগুলোতে ব্যাপকভাবে পাঠদান করে তিনি অসংখ্য পণ্ডিত ব্যক্তিকে ইজাযাহ প্রদান করেছেন। স্বয়ং ইবনু ফাহদও হাদীসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ তার তত্ত্বাবধানে অধ্যয়ন করেছেন।[১১]

তার সমসাময়িক সিরিয়ার বিদুষী নারী বা'ঈ খাতুন বিনতু আবিল হাসান (মৃত্যু ১৪৫৯) আবু বাক্ মিয্যী সহ অসংখ্য মুহাদ্দিসের নিকট হাদীস অধ্যয়ন করে হাদীস শাস্ত্রের বিপুল সংখ্যক পুরুষ ও নারী বিশেষজ্ঞকে ইজাযাহ প্রদান করেছেন। পরবর্তীতে তিনি সিরিয়া ও কায়রোতে হাদীসের ওপর পাঠদান করেছেন। আমরা জানতে পেরেছি যে, পাঠদানে তিনি বিশেষ আনন্দ লাভ করতেন। বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে ইবনাতুশ শারাইহী নামে পরিচিত আয়িশা বিনতু ইবরাহীমও (১৩৫৮-১৪৩৮) দামেশক, কায়রো ও অন্যান্য স্থানে হাদীস অধ্যয়ন করে তার ওপর পাঠদান করেছেন। সেসব পাঠদানে সে সময়ের প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞগণ নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন। মক্কার উম্মুল খায়র সাঈদাও (মৃত্যু ৮৫০/১৪৪৬) বিভিন্ন শহরের অসংখ্য মুহাদ্দিসের নিকট থেকে হাদীসের জ্ঞানার্জন করে বিদুষী হিসেবে উপরোক্ত নারী মুহাদ্দিসদের সমপরিমাণ ঈর্ষনীয় সুনাম কুড়িয়েছেন।[১২]

বিভিন্ন উৎস থেকে জানা যায় যে, হিজরী দশম শতক (খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতক) থেকে হাদীস ও ইসলামী জ্ঞানের অন্যান্য শাখায় মহিলাদের সম্পৃক্ততা উল্লেখযোগ্য হারে কমতে থাকে। আইদারূসের আন নূরুস সাফির, মুহিব্বীর খুলাসাতুল আখবার ও মুহাম্মাদ ইবনু আব্দিল্লাহ'র আস সুহুবুল ওয়াবিলাহ শীর্ষক চরিতাভিধানসমূহে যথাক্রমে দশম, একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীর প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গের আলোচনা করা হয়েছে। এসব গ্রন্থে মাত্র ডজন খানেক প্রখ্যাত নারী মুহাদ্দিসের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তা থেকে এ অনুসিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া ভুল হবে যে, এ সময়ে এসে নারীরা হাদীসের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। নবম শতকে যেসব নারী মুহাদ্দিস হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তাদের কয়েকজন দশম শতকেও যথারীতি জীবিত ছিলেন এবং সুন্নাহর সেবা অব্যাহত রেখেছিলেন। আসমা বিনতু কামালিদ্দীন (মৃত্যু ৯০৪/১৪৯৮) সে সময়ের সুলতান ও তার কর্মকর্তাদের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। তাদের নিকট তিনি প্রায়শ বিভিন্ন সুপারিশ প্রেরণ করতেন এবং তারা তা সবসময় গ্রহণ করতেন। হাদীসের ওপর পাঠদান করার পাশাপাশি তিনি নারীদেরকে ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার প্রশিক্ষণ দিতেন। আয়িশা বিনতু মুহাম্মাদ (মৃত্যু ৯০৬/১৫০০)-যিনি বিখ্যাত বিচারক মুসলিহুদ্দীনকে বিয়ে করেছিলেন-অসংখ্য ছাত্রের নিকট হাদীসের পাঠদান করেছেন; পরে তাকে দামেশকের সালিহিয়্যা কলেজে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। আলেপ্পোর ফাতিমা বিনতু ইউসুফ (১৪৬৫-১৫১৯) ছিলেন তার সময়ের অন্যতম বিদুষী হিসেবে সমধিক খ্যাত। ১৫৩১ সালে উম্মুল খায়র মক্কায় এক হাজ্জ যাত্রীকে ইজাযাহ প্রদান করেছিলেন।

প্রথম সারির সর্বশেষ নারী মুহাদ্দিস আমাদের নিকট ফাতিমা ফুদাইলিয়্যা (মৃত্যু ১৮৩১) নামে পরিচিত; তিনি শায়খা ফুদাইলিয়্যা নামেও সমধিক পরিচিত। তিনি হিজরী দ্বাদশ শতাব্দী (খ্রিস্টীয় ১৮শ শতাব্দী) সমাপ্ত হওয়ার পূর্বে জন্মগ্রহণ করে অতি অল্প সময়ের মধ্যে চারুলিপি ও ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ব্যাপক পারদর্শিতা অর্জন করেন। হাদীসের প্রতি তার ছিল বিশেষ আগ্রহ; তাই তিনি এ বিষয়ে ব্যাপক পড়াশোনা করেন। উন্নত মানের অসংখ্য বিশেষজ্ঞের নিকট থেকে সানাদ হাসিল করে ফাতিমা নিজ গুণে একজন গুরুত্বপূর্ণ মুহাদ্দিস হিসেবে বেশ সুনাম অর্জন করেন। জীবনের শেষ দিকে তিনি মক্কায় বসতি স্থাপন করে সেখানে একটি সমৃদ্ধ গণপাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেন। মক্কা শহরের অনেক নামকরা মুহাদ্দিস তার পাঠদানে উপস্থিত হয়ে তার নিকট থেকে সানাদ গ্রহণ করেছেন। তন্মধ্যে শায়খ উমার হানাফি ও শায়খ মুহাম্মাদ সালিহ শাফিয়ী'র নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ইসলামে বিদুষী নারীদের সমগ্র ইতিহাস জুড়ে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, সংশ্লিষ্ট নারীরা তাদের অধীত বিদ্যাকে ব্যক্তিগতভাবে হাদীস অধ্যয়নের আগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং শিক্ষার্থী ও শিক্ষক হিসেবে দ্বীনি ভাইদের সাথে গণশিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে নিজেদের আসন গ্রহণ করেছেন। অনেক পাণ্ডুলিপির বিবরণ থেকে জানা যায় যে, তারা কখনো বিরাট পরিসরের সাধারণ শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থী হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন আবার কখনো শিক্ষক হিসেবে নিয়মিত পাঠদান করেছেন।

খতীব বাগদাদীর কিতাবুল কিফায়াহ ও হাদীস বিষয়ক বিভিন্ন পুস্তিকার একটি সঙ্কলনের পাণ্ডুলিপির সংক্ষিপ্ত বিবরণ থেকে জানা যায় যে, নি'মাহ বিনতু আলী, উম্মু আহমাদ যাইনাব বিনতুল মাক্কী ও আরো কয়েকজন নারী মুহাদ্দিস এ দু'টি গ্রন্থের ওপর কখনো স্বতন্ত্রভাবে আবার কখনো পুরুষ মুহাদ্দিসদের সাথে যৌথভাবে আযীযিয়্যা ও দিয়াইয়্যা'র ন্যায় প্রধান প্রধান কলেজসমূহে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে পাঠদান করেছেন। তাদের কয়েকটি পাঠদানে বিখ্যাত সেনাপতি সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর পুত্র আহমাদ উপস্থিত হয়েছিলেন।

টিকাঃ
[১] তাদরীবুর রাবী, পৃ, ২১৫।
[২] কিতাবুত তাবাক্বাতিল কাবীর, খণ্ড ৮,
[৩] নাফহুত তীব, খণ্ড ২, পৃ, ৯৬, হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১৪৩-৪ এ উদ্ধৃত।
[৪] তারীখু বাগদাদ, খণ্ড ১৪, পৃ, ৪৩৪।
[৫] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১৪৩-৪।
[৬] তারীখু বাগদাদ, খণ্ড ১৪, পৃ, ৪৪১-৪।
[৭] মোহামেডানিসে স্টাডীয়েন, খণ্ড২, পৃ, ১৪৫ এ উদ্ধৃত।
[৮] কিতাবুল ইমদাদ, পৃ, ৩৬, হাদীস লিটা "দ্ধৃত।
[৯] ওফায়াতুল আ'ইয়ান, নং ২৫০।
[১০] শাযারাতুয যাহাব, খন্ড ৭, পৃ, ১২০।
[১১] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১৫০-১।
[১২] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১৫০。

📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 পরিশিষ্ট ১

📄 পরিশিষ্ট ১


তাক্করীবুত তাহযীব গ্রন্থে ব্যবহৃত চিহ্নসমূহ
তাক্বরীবুত তাহযীব গ্রন্থে যেসব বর্ণনাকারীর জীবন বৃত্তান্ত আলোচনা করা হয়েছে তাদের হাদীসসমূহ কে সংগ্রহ করেছেন-তা বুঝানোর জন্য ইবনু হাযার আসকালানী চিহ্ন হিসেবে বেশ কিছু সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহার করেছেন। যদি গ্রন্থকারের একাধিক হাদীস সঙ্কলন থাকে কিংবা যদি তার সঙ্কলনে কোনো অনন্য পরিচ্ছেদ থাকে, সে ক্ষেত্রে তিনি সেসব চিহ্নের সাথে আরো কিছু চিহ্নের সমন্বয় ঘটিয়েছেন যাতে বুঝা যায় কোন গ্রন্থে সেসব বর্ণনা পাওয়া যাবে।
| خ | ইমাম বুখারী তার সহীহ গ্রন্থে | خت | ইমাম বুখারী তার সহীহ গ্রন্থের মু'আল্লাক্কাত অংশে |
|---|---|---|---|
| بخ | ইমাম বুখারী তার আল আদাবুল মুফরাদ গ্রন্থে | عخ | ইমাম বুখারী তার খালকু আফ' আলিল ইবাদ গ্রন্থে |
| ز | ইমাম বুখারী তার জুযউল ক্বিরাআহ গ্রন্থে | م | ইমাম মুসলিম তার সহীহ গ্রন্থে |
| ي | ইমাম বুখারী তার রাফউল ইয়াদাইন গ্রন্থে | مد | আবু দাউদ তার সুনান গ্রন্থের মারাসীল অংশে |
| د | আবু দাউদ তার সুনান গ্রন্থে | خد | আবু দাউদ তার আন নাসিখ গ্রন্থে |
| صد | আবু দাউদ তার ফাদাঈলুল আনসার গ্রন্থে | ف | আবু দাউদ তার আত তাফাররুদ গ্রন্থে |
| قد | আবু দাউদ তার আল ক্বাদার গ্রন্থে | کد | আবু দাউদ তার মুসনাদু মালিক গ্রন্থে |
আবু দাউদ তার আল মাসাইল গ্রন্থে
তিরমিযী তার সুনান গ্রন্থে
নাসাঈ তার সুনান গ্রন্থে
নাসাঈ তার মুসনাদু মালিক গ্রন্থে
যদি তার বর্ণনা ছয়টি বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থের সব ক'টিতে থাকে।
যদি তার বর্ণনা চারটি সুনান গ্রন্থের সব ক'টিতে থাকে, কিন্তু বুখারী ও মুসলিমে না থাকে।
যদি তার বর্ণনা ছয়টি বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থের কোনো একটিতেও না থাকে।
তিরমিযী তার আশ শামাইল গ্রন্থে
নাসাঈ তার মুসনাদু আলী গ্রন্থে
ইবনু মাজাহ তার আত তাফসীর গ্রন্থে
ইবনু মাজাহ তার সুনান গ্রন্থে

তাক্বরীবুত তাহযীব, খণ্ড ১, পৃ, ৩৫৫

১৪৪৪. উবায়দুল্লাহ ইবনুয যুবাইব তামীমী আম্বারী, তার ছেলে শুয়াইব তার নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করতেন, আর 'আল কামাল' গ্রন্থকারও তার কথা উল্লেখ করেছেন, তবে তার মাধ্যমে তার পিতার নিকট থেকে বর্ণিত কোনো হাদীস আবু দাউদ সংগ্রহ করেননি, এর পরিবর্তে তিনি শু'বা'র মাধ্যমে তার দাদা যুবাইব থেকে বর্ণিত হাদীস সংগ্রহ করেছেন। উবায়দুল্লাহ তার পিতার বরাতে যে হাদীস বর্ণনা করেছেন তা কেবল মুতাইয়িনের বর্ণনায় পাওয়া যায়। ইবনু হিব্বان তাকে অন্যতম সিকাহ তাবি'ঈতাবি'ঈ হিসে করেছেন।/১
১৪৪৫. উবায়দুল্লাহ ইবনু যাহর, দামরী গোত্রের আযাদকৃত দাস, ইফ্রীকী; সাদৃক ইউখত্নী; ষষ্ঠ স্তরের।/بخ عم
১৪৪৬. উবায়দুল্লাহ ইবনু আবী যিয়াদ রাসাফী; সাদূক; সপ্তম স্তরের।/خت
১৪৪৭. উবায়দুল্লাহ ইবনু আবী যিয়াদ কাদ্দাহ, আবুল হুসাইন মাক্কী; লাইসা বিল ক্বাভী; ৫ম স্তরের; তিনি ১৫০ হিজরীতে (৬৭ সাল) মৃত্যুবরণ করেন।/دت س
১৪৪৮. উবায়দুল্লাহ ইবনু আবী যিয়াদ বা যিয়াদ, আবু যিয়াদাহ বাকরী বা কিন্দী, দিমাশকী; চিকাহ; ৩য় স্তরের। বিলাছ এর বরাতে তার বর্ণনাসমূহ 'মুরসাল'।/১
১৪৪৯. উবায়দুল্লাহ ইবনু সা'দ ইবনি ইবরাহীম ইবনি আব্দির রহমান ইবনি আওফ যুহরী আবিল ফাদল বাগদাদী। তিনি ছিলেন ইস্পাহানের বিচারক; সিকাহ; একাদশ স্তরের; তিনি ৬০ হিজরীতে (৬৮০ সাল) ৭৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। خ دتس
১৪৫০. উবায়দুল্লাহ ইবনু সাঈদ ইবনি মুসলিম জু'আফী, আবু মুসলিম কৃষ্ণী; তিনি আ'মাশের অন্যতম সেনাপতি ছিলেন; দ'ঈফ; সপ্তম স্তরের।/خت
১৪৫১. উবায়দুল্লাহ ইবনু সাঈদ ইবনি ইয়াহইয়া ইয়াসকারী, আবু কুদ্দামাহ সারখাসী; তিনি নিশাপুরে বসতি স্থাপন করেছিলেন; সিকাহ মা'মূন; সুন্নী; দশম স্তরের; তিনি ৪১ হিজরীতে (৬৬২ সাল) মৃত্যুবরণ করেন।/ خ م س
১৪৫২. উবায়দুল্লাহ ইবনু সাঈদ উমাভী হলেন উবায়দ এবং পরবর্তীতে তার আলোচনা করা হবে।
১৪৫৩. উবায়দুল্লাহ ইবনু সাঈদ ছাকাফী কৃষ্ণী; মাজহুল; ৬ষ্ঠ স্তরের; ইবনু হিব্বان বলেছেন যে, মুগীরা'র বরাতে তার বর্ণনাসমূহ মুনকাতি'।/১

তাক্বরীবুত তাহযীব, খণ্ড ২, পৃ, ৩৬
৩২৯. আলী ইবনু হাকিম ইবনি দুবাইয়ান আওদী কৃষ্ণী; সিকাহ; দশম স্তরের; তিনি ১৩১ হিজরীতে (৭৪৯ সাল) মৃত্যুবরণ করেন। / بخ م س
৩৩০. আলী ইবনু হাকীম ইবনি জাহির খুরাসানী; সাদৃক আবিদ; ১০ম স্তরের; তিনি ৩৫ হিজরীতে (৬৫৬ সাল) মৃত্যুবরণ করেন।/ تمییز
৩৩১. আলী ইবনু হাকিম, আব্দুল্লাহ ইবনু শাওযাবের বোনের ছেলে; মাজহুল; ৭ম স্তরের / تمییز
৩৩২. আলী ইবনু হাকিম জাহদারী; মাজহুল; ৯ম স্তরের / تمییز
৩৩৩. আলী ইবনু হাওসাব, আবু সুলাইমান দিমাশকী; লা বা'সা বিহ; ৮ম স্তরের।/১
৩৩৪. আলী ইবনু খালিদ মাদানী; সাদূক; ৩য় স্তরের; তিনি আবু হুরায়রা ও আবু উমামা থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। দাহহাক ইবনু উসমান ও সাঈদ ইবনু হিলাল তার নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করতেন।/س
৩৩৫. আলী ইবনু খাসরাম মারওয়াযী; সিকাহ; ১০ম স্তরের ক্ষুদে বর্ণনাকারীদের অন্যতম; তিনি ৫৭ হিজরীতে (৬৭৭ সাল) বা তার পরে মৃত্যুবরণ করেন; প্রায় শতায়ু পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন।
৩৩৬. আলী ইবনু আবিল খাসিব হলেন ইবনু মুহাম্মাদ এবং পরবর্তীতে তার আলোচনা করা হবে।
৩৩৭. আলী ইবনু দাউদ ইবনি ইয়াযীদ কানতারী আদামী, সাদূক; ১১শ স্তরের; তিনি ৭২ হিজরীতে (৬৯২ সাল) মৃত্যুবরণ করেন।/ت
৩৩৮. আলী ইবনু দাউদ, ইবনু দুআদ নামেঅ পরিচিত, আবুল মুতাওয়াক্কিল নাজী বসরী; কুনিয়ার মাধ্যমে পরিচিত; সিকাহ; ৮ম স্তরের; তিনি ১০৮ হিজরীতে (৭২৭ সাল) বা তার পূর্বে মৃত্যুবরণ করেন। ع
৩৯. আলী ইবনু রাবাহ ইবনি কাসীর খুম্মী আবু আব্দিল্লাহ বসরী; সিকাহ; তাকে মাঝেমধ্যে ভুলক্রমে উবাই নামে ডাকা হতো, এ নামটি তিনি অপছন্দ করতেন; ৩য় স্তরের ক্ষুদে বর্ণনাকারীদের অন্তর্ভুক্ত; তিনি ১১০ হিজরীতে (৭২৯ সাল) মৃত্যুবরণ করেন। বুখ, ম, ম

তাক্বরীবুত তাহযীব, খণ্ড ২, পৃ, ১০৩
৯২৭. ঈসা ইবনু নুমাইলাহ ফাযারী হিজাযী; মাজহুল; ৭ম স্তরের।/১
৯২৮. ঈসা ইবনু হিলাল সালিহী, মূলত 'ইবনু আবী ঈসা' ইতোপূর্বে যার আলোচনা করা হয়েছে।
৯২৯. ঈসা ইবনু হিলাল সাফাদী মিশরী; সাদূক; ৪র্থ স্তরের।/ বুখ, দ, ত, স
৯৩০. ঈসা ইবনু ইয়াযদাদ বা আযদাদ ইয়ামানী ফারিসী; মাজহুলুল হাল; ৬ষ্ঠ স্তরের।/মদ, ক্ব
৯৩১. ঈসা ইবনু ইয়াযীদ আযরাক, আবু মু'আয মারওয়াযী নাহভী (অর্থাৎ ব্যাকরণবিদ); মাক্ববূল; ৭ম স্তরের; তিনি সারখাস শহরের বিচারক ছিলেন।/স, ক্ব
৯৩২. ঈসা ইবনু ইউসুফ ইবনি আবান ফাখুরী, আবু মূসা রামলী; সাদূক ইয়ুখত্বী; ১১শ স্তরের; আবু দাউদ তার হাদীস সংগ্রহ করেননি।/ দ, স, ক্ব
৯৩৩. ঈসা ইবনু ইউনুস ইবনি আবী ইসহাক সাবিঈ ছিলেন ইসমাঈল কূফীর ভাই; তাকে শামে (সিরীয়ায়) সৈনিক হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল; সিকাহ মা'মূন; ৮ম স্তরের; তিনি ৮৭ বা ৯১ হিজরীতে (৭১০ সাল) মৃত্যুবরণ করেন।/
৯৩৪. ঈসা ইবনু ইউনুস তারসূসী; সাদূক; ১১শ স্তরের।/১
৯৩৫. উয়াইনাহ ইবনু আব্দির রহমান ইবনি জাওসাম গাতাফানী; সাদূক; ৭ম স্তরের; তিনি ৫০ হিজরীতে (৬৭০ সাল) মৃত্যুবরণ করেন।/বুখ, ম

তাক্বরীবুত তাহযীব, খণ্ড ২, পৃ, ৫৮৯
আসমা বিনতু আবী বাক্ সিদ্দীক, তিনি ছিলেন যুবাইর ইবনুল আওয়ামের স্ত্রী এবং প্রধান সাহাবীদের অন্যতম। তিনি ৬৩ বা ৭৪ হিজরীতে (৬৯৩ সাল) মৃত্যুবরণ করেন। তিনি শতাধিক বছর জীবিত ছিলেন।/ع
আসমা বিনতু যাইদ ইবনিল খত্তাব আদাবিয়্যাহ; বলা হয়ে থাকে যে তিনি একজন সাহাবিয়্যাহ ছিলেন; তিনি ইবনু আমর ইবনি নাফাইলের পূর্বে মৃত্যুবরণ করেন।/১
আসমা বিনতু সাঈদ ইবনি যাইদ ইবনি আমর ইবনি নুফাইল। বুখারী ও মুসলিমের হাদীস গ্রন্থাবলীতে তার নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবে বাইহাকী তার পরিচয় প্রদান করেছেন; তার ব্যাপারেও বলা হয়ে থাকে যে, তিনি একজন সাহাবিয়্যাহ ছিলেন।/ت ق
আসমা বিনতু সাকাল আনসারিয়্যাহ একজন সাহাবিয়্যাহ ছিলেন। বলা হয় যে, তিনি ছিলেন মূলত 'বিনতু ইয়াযীদ ইবনিস সাকান', কিন্তু তাকে তার দাদার কন্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ঘটনাচক্রে তার নাম বিকৃত হয়ে গিয়েছে।/م
আসমা বিনতু আবিস ইবনি রাবীয়াহ; মাজহুলুল হাল; ৬ষ্ঠ স্তরের; /ق
আসমা বিনতু আব্দির রহমান ইবনি আবী বাক্ সিদ্দীক; মাকবুলাহ; ৬ষ্ঠ স্তরের।/ خت
আসমা বিনতু উমাইছ খাছ'আমিয়্যাহ একজন সাহাবিয়্যাহ ছিলেন যিনি প্রথমে জা'ফর ইবনু আবী তালিবকে, পরে আবু বাক্ সিদ্দিককে এবং তারপর আলী ইবনু আবী তালিবকে বিয়ে করেছিলেন। তার গর্ভে এদের সকলের সন্তান জন্ম হয়। তিনি ছিলেন মাইমুনাহ বিনতুল হারিছের বোন। আলী নিহত হওয়ার পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।/خ عم
আসমা বিনতু ইয়াযীদ ইবনিস সাকান আনসারিয়্যাহ। তার কুনিয়াহ ছিল উম্মু সালামাহ ও উম্মু আমির; তিনি একজন সাহাবিয়্যাহ ছিলেন; তিনি অসংখ্য হাদীস বর্ণনা করেছেন; /خ عم
আসমা বিনতু ইয়াযীদ কায়সিয়্যাহ বসরিয়্যাহ; মাক্ববূলাহ; ৬ষ্ঠ স্তরের; /س

তারকীবুত-তাহযীব
আমাতুল ওয়াহিদ বিনতু ইয়ামীন ইবনি আব্দির রহমান। তিনি ছিলেন ইয়াহইয়া ইবনু বাশীর ইবনি খালিদের মা। তিনি মুহাম্মাদ ইবনু কা'ব কুরাশীর নিকট থেকে এবং তার ছেলে তার নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন; মাজহুলাহ; ৬ষ্ঠ স্তরের, /د
আমাহ বিনতু খালিদ ইবনি সাঈদ ইবনিল আসী ইবনি উমাইয়াহ ছিলেন একজন সাহাবিয়্যাহ এবং একজন সাহাবীর কন্যা। তিনি ইথিওপিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এবং যুবাইর ইবনুল আওয়াম তাকে বিয়ে করেন। তিনি এতো দীর্ঘ দিন জীবিত ছিলেন যে, মূসা ইবনু উকবাহ তার সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন।/خ دس

অতিরিক্ত বর্ণনা
سنن ابن ماجة الدعاء اسم الله الاعظم حدثنا ابو بكر حدثنا عيسى بن يونس عن عبيد الله بن ابي زياد عن شهر بن حوشب عن اسماء بنت يزيد قالت قال رسول الله صلى الله عليه و سلم اسم الله الاعظم في هاتين الايتين و الهكم اله واحد لا اله الا هو الرحمن الرحيم و فاتحة سورة ال عمران
مسند احمد - باقي المكثرين مسند انس بن مالك حدثنا محمد بن بكر اخبرنا عبيد الله بن ابى زياد قال ثنا شهر بن حوشب عن اسماء بنت يزيد قالت سمعت رسول الله صلى الله عليه و سلم يقول في هذين الايتين الله لا اله الا هو الحي القيوم و الم الله لا اله الا هو الحي القيوم ان فيهما اسم الله الاعظم

📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 পরিশিষ্ট ২

📄 পরিশিষ্ট ২


حدثنا اسحاق بن عيسى قال حدثني يحيى بن سليم عن عبد الله بن عثمان بن خثيم عن سعيد بن ابي راشد قال لقيت التنوخي رسول هرقل الى رسول الله صلى الله عليه وسلم بحمص و كان جارا لى شيخا كبيرا قد بلغ الفند او قرب فقلت الا تخبرني عن رسالة هرقل الى النبي صلى الله عليه وسلم و رسالة رسول الله صلى الله عليه وسلم الى هرقل فقال بلى قدم رسول الله صلى الله عليه وسلم تبوك فبعث دحية الكلبي الى هرقل فلما ان جاءه كتاب رسول الله صلى الله عليه وسلم دعا قسيسى الروم و بطارقتها ثم اغلق عليه وعليهم بابا فقال قد نزل هذا الرجل حيث رايتم وقد ارسل الى يدعونى الى ثلاث خصال يدعوني الى ان اتبعه على دينه او على ان نعطيه مالنا على ارضنا و الارض ارضنا او نلقى اليه الحرب و الله لقد عرفتم فيما تقرءون من الكتب ليأخذن ما تحت قدمي فهلم نتبعه على دينه او نعطيه مالنا على ارضنا فنخروا نخرة رجل واحد حتى خرجوا من برانسهم و قالوا تدعونا الى ان ندع النصرانية او نكون عبيدا لأعرابي جاء من الحجاز فلما ظن انهم ان خرجوا من عنده افسدوا عليه الروم رفأهم و لم يكد و قال انما قلت ذلك لكم لأعلم صلابتكم على امركم ثم دعا رجلا من عرب تجيب كان على نصارى العرب فقال ادع لى رجلا حافظا للحديث عربي اللسان ابعثه الى هذا الرجل بجواب كتابه فجاء بي فدفع الى هرقل كتابا فقال اذهب بكتابي الى هذا الرجل فلما ضيعت من حديثه فاحفظ لى منه ثلاث خصال انظر هل يذكر صحيفته التي كتب الى بشيء و انظر اذا قرأ كتابي فهل يذكر الليل و انظر في ظهره هل به شيء يريبك فانطلقت بكتابه حتى جئت تبوك فاذا هو جالس بين ظهرانی اصحابه محتبيا على الماء فقلت این صاحبكم قيلها هو ذا فاقبلت امشي حتى جلست بين يديه فناولته كتابى فوضعه في حجره ثم قال ممن انت فقلت انا احد تنوخ قال هل لك فى الاسلام الحنيفية ملة ابيك ابراهيم قلت اني رسول قوم وعلى دين قوم لا ارجع عنه حتى ارجع اليهم فضحك وقال انك لا تهدى من احببت و لكن الله يهدى من يشاء و هو اعلم بالمهتدين يا اخا تنوخ اني كتبت بكتاب الى كسرى فمزقه و الله ممزقه و ممزق ملكه و كتبت الى النجاشي بصحيفة فخرقها و الله مخرقه و مخرق ملکه و كتبت الى صاحبك بصحيفة فامسكها فلن يزال الناس يجدون منه باسا ما دام فى العيش خير قلت هذه احدى الثلاثة التي اوصاني بها صاحبى و اخذت سهما من جعبتى فكتبتها في جلد سيفى ثم انه ناول الصحيفة رجلا عن يساره قلت من صاحب كتابكم الذى يقرأ لكم قالوا معاوية فاذا في كتاب صاحبي تدعوني الى جنة عرضها السموات و الارض اعدت للمتقين فأين النار فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم سبحان الله این الليل اذا جاء النهار قال فاخذت سهما من جعبتي فكتبته في جلد سيفى فلما ان فرغ من قراءة كتابى قال ان لك حقا و انك رسول فلو وجدت عندنا جائزة جوزناك بها انا سفر مرملون قال فناداه رجل من طائفة الناس قال انا اجوزه ففتح رحله فاذا هو يأتى بحلة صفورية فوضعها في حجري قلت من صاحب الجائزة قيل لى عثمان ثم قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ايكم ينزل هذا الرجل فقال فتى من الانصار انا فقام الانصارى و قمت معه حتى اذا خرجت من طائفة المجلس نادانی رسول الله صلى الله عليه وسلم و قال تعال يا اخا تنوخ فاقبلت اهوى اليه حتى كنت قائما فى مجلسى الذى كنت بين يديه فحل حبوته عن ظهره و قال ها هنا امض لما امرت له فجلت في ظهره فاذا انا بخاتم في موضع غضون الكتف مثل الحجمة الضخمة

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00