📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 তারজীহ (প্রাধান্য প্রদান)

📄 তারজীহ (প্রাধান্য প্রদান)


সমন্বয় সাধন সম্ভব না হলে একটি পাঠকে অপর পাঠের ওপর প্রাধান্য (তারজীহ) দেয়া হয়। প্রাধান্য দানের ভিত্তি হতে পারে ইসনাদের অসমতা কিংবা বক্তব্যের অসমতা।

যেসব বর্ণনাসূত্রের ব্যাপারে বুখারী ও মুসলিম উভয়ে মতৈক্যে উপনীত হয়েছেন সেগুলোকে অন্যান্য গ্রন্থে প্রাপ্ত সহীহ হাদীসের ওপর প্রাধান্য দেয়া হয়। সাধারণত সহীহ হাদীসকে হাসান হাদীসের ওপর প্রাধান্য দেয়া হয়। বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে আক্ষরিক অর্থকে রূপক অর্থের ওপর এবং সুস্পষ্ট অর্থ (ছরীহ)-কে পরোক্ষ (কিনায়াহ) অর্থের ওপর প্রাধান্য দেয়া হয়। ইতিবাচক প্রমাণকে নেতিবাচকের ওপর প্রাধান্য দেয়া হয়। নিষেধাজ্ঞা প্রাধান্য লাভ করে বৈধতার ওপর। [১১] দৃষ্টান্তস্বরূপ, নাবী রমাদান মাসের বাইরে শনিবারে সিয়াম পালন করতে নিষেধ করেছেন [১২] অন্যদিকে আরাফাহ [১৩] ও আশূরার [১৪] দিনসমূহে সিয়াম পালনের পরামর্শ দিয়েছেন। এ মূলনীতির ভিত্তিতে যদি আরাফাহ বা আশূরার কোনো একটি দিন শনিবারে পড়ে, তাহলে সুস্পষ্ট অর্থের ভিত্তিতে সেদিন সিয়াম পালন না করা উচিত। [১৫]

টিকাঃ
[১১] প্রিন্সিপ্লস অব ইসলামিক জুরিস্ফুডেন্স, পৃ, ৩৬০-৩।
[১২] আস সামা বিনতু বুসর সুলামী নাবী -এর একটি বক্তব্যের উদ্ধৃতি প্রদান করেছেন, "তোমাদের ওপর যেসব সিয়াম ফরজ করে দেয়া হয়েছে সেগুলো ব্যতীত শনিবারে সিয়াম পালন করো না। যদি তোমরা (সেদিন) একটি আঙ্গুরের খোসা কিংবা গাছের কোনো অংশ পাও তাহলে তা চিবিয়ে নিও।” (সুনানু আবী দাউদ, খণ্ড ২, পৃ, ৬৬৫, নং ২৪১৫। আল ইরওয়া গ্রন্থে (নং ৯৬০) এ হাদীসটিকে প্রামাণ্য আখ্যায়িত করা হয়েছে।)
[১৩] নবী কে আরাফা'র দিনের সাওম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জবাব দিলেন, "এ দিনের সাওম পেছন ও সামনের বছরের পাপসমূহ মোচন করে দেয়।” তারপর তাঁকে আশূরার দিনের সাওম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, “এ দিনের সাওম পেছনের বছরের পাপসমূহ মোচন করে দেয়।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ২, পৃ, ৫৬৮, নং ২৬০৩)
[১৪] সহীহ বুখারী, খণ্ড ৩, পৃ, ১২৩, নং ২১৯-২২০ ও সহীহ মুসলিম, খণ্ড ২, পৃ, ৫৫০-১, নং ২৫১৮।
[১৫] অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে শনিবার সাওম পালন করা বৈধ। তাদের এ মতের ভিত্তি হলো ইবনু খুযাইমাহ কর্তৃক সংগৃহীত নিম্নোক্ত হাদীস। উম্মু সালামাহ বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল অন্যান্য দিনের তুলনায় শনি ও রবিবারে অধিক সাওম পালন করতেন এবং তিনি বলতেন, "এগুলো হলো মুশরিকদের উৎসবের দিন, আর এসব দিনে আমি তাদের বিপরীত কাজ করতে চাই।” সহীহ ইবনু খুযাইমাহ গ্রন্থে (খণ্ড ৩, পৃ, ৩১৮, নং ২১৬৭) এ হাদীসটিকে প্রামাণ্য আখ্যায়িত করা হয়েছে।

📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 নাসখ (রহিতকরণ)

📄 নাসখ (রহিতকরণ)


সমন্বয় সাধন ও প্রাধান্য দানের উপরোক্ত দু'টি পদ্ধতি প্রয়োগ করা সম্ভব না হলে অবশিষ্ট একমাত্র পন্থা হলো রহিতকরণ (নাস্খ)। 'নাস্খ' শব্দের আক্ষরিক অর্থ সরিয়ে দেয়া বা স্থানান্তর করা। এ কারণে আরবি ভাষায় নকলকারীকে বলা হয় নাসিখ। হাদীস ও ফিকহ শাস্ত্রের পারিভাষিক শব্দ হিসেবে 'নাস্খ' হলো আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক পূর্বের কোনো আইনকে পরবর্তী আইনের মাধ্যমে রহিত করে দেয়া। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের মধ্যে এবং কুরআন ও হাদীসের (বিভিন্ন বিধানের) মধ্যে নাস্খ সংঘটিত হতে পারে। হাদীসের রহিতকরণকে বিভিন্ন হাদীসের মূলপাঠের মধ্যকার আপাতবিরোধ নিরসনের চূড়ান্ত মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

নাসখ সনাক্ত করার বিভিন্ন পন্থা
* নাবী -এর সুস্পষ্ট বক্তব্যের মাধ্যমে নাসখ সনাক্ত করা যেতে পারে। ইমাম মুসলিম কর্তৃক সংগৃহীত সাহাবী বুরাইদা'র একটি হাদীসে এ ধরনের নাসখের একটি নমুনা খুঁজে পাওয়া যাবে। হাদীসটিতে বলা হয়েছে যে নাবী বলেছেন, "আমি ইতিপূর্বে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, তবে এখন তোমরা কবর যিয়ারত করতে পার; কারণ তা পরকালীন জীবনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।”[১৬]

* কখনো কখনো আসার তথা কোনো সাহাবীর বক্তব্যের মাধ্যমেও নাসখ সনাক্ত করা যেতে পারে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ বলেন, আল্লাহর রাসূল -এর দু'টি নির্দেশের মধ্যে শেষের নির্দেশটি হলো আগুনের স্পর্শ পাওয়া (অর্থাৎ আগুন দ্বারা পাকানো) খাবার খাওয়ার পর ওযু না করা প্রসঙ্গে। এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসাঈ ও ইবনু মাজাহ সংগ্রহ করেছেন।[১৭]

* কখনো কখনো ঘটনার তারিখ থেকে কোনো আইন রহিত হওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, শিদাদ ইবনু আনীস নাবী -এর একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন; তাতে তিনি বলেন, "যে শিঙ্গা [১৮] লাগিয়ে দেয় এবং যার শরীরে শিঙ্গা লাগানো হয় উভয়েরই সাওম ভঙ্গ হয়ে যায়।” আবু দাউদ [১৯] কর্তৃক সংগৃহীত এ হাদীসটি ইবনু আব্বাস কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীসের মাধ্যমে রহিত হয়ে গিয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে ইহরাম অবস্থায় সাওম পালনকালে নাবী -এর শরীরে শিঙ্গা লাগানো হয়েছিল। [২০] শিদাদের হাদীসের কিছু কিছু বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, এটি ছিল মক্কা বিজয়ের সময়, অর্থাৎ ৮ হিজরীতে (৬৩০ খ্রিস্টাব্দে)। পক্ষান্তরে ইবনু আব্বাসের বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি বিদায় হাজ্জের সময় অর্থাৎ ১০ হিজরীতে (৬৩২ খ্রিস্টাব্দে) নাবী -এর সঙ্গে ছিলেন।

* সাহাবীদের ইজমা থেকেও নাসখ বুঝা যেতে পারে। এর মানে এ নয় যে, তারা ইসলামের কোনো বিধানকে রহিত করে দিয়েছেন, বরং এর মানে হলো এই যে এই মর্মে একমত হয়েছেন যে, নাবী উক্ত বিধানটিকে রহিত করে গিয়েছেন। একটি হাদীসে এর দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে, যেখানে নাবী বলেছেন, “যে- ই নেশা গ্রহণ করবে, (যতবার ধরা পড়বে ততোবার) তাকে বেত্রাঘাত করো, কিন্তু চতুর্থবার নেশা গ্রহণ করলে তাকে হত্যা করো।” [২১] সাহাবীরা এ ব্যাপারে মতৈক্যে উপনীত হয়েছেন যে, নেশাগ্রস্ত ব্যক্তিকে প্রাণে বধ করা হবে না।

টিকাঃ
[১৬] সহীহ মুসলিম, খণ্ড ২, পৃ, ৪৬৩, নং ২১৩১।
[১৭] সুনানু আবী দাউদ, খণ্ড ১, পৃ, ৪৬-৭, নং ১৯২। সহীহ সুনানু আবী দাউদ গ্রন্থে [খণ্ড ১, পৃ, ৩৯, নং ১৭৭ (পুরাতন সংস্করণ)] এ হাদীসটিকে প্রামাণ্য আখ্যায়িত করা হয়েছে।
[১৮] শিঙ্গা হলো ত্বক ছেদন করে সেখানে শূন্যতা সৃষ্টি করার মাধ্যমে ত্বকের উপরিভাগে রক্ত টেনে আনার পদ্ধতি। রোগ নিরাময়ের উদ্দেশ্য তা করা হয়ে থাকে।
[১৯] সুনানু আবী দাউদ, খণ্ড ২, পৃ, ৬৫০, নং ২৩৬৩। সহীহ সুনানু আবী দাউদ গ্রন্থে [খণ্ড ২, পৃ, ৪৫১, নং ২০৭৫ (পুরাতন সংস্করণ)] এ হাদীসটিকে প্রামাণ্য আখ্যায়িত করা হয়েছে।
[২০] সহীহ বুখারী, খণ্ড ৩, পৃ, ৯১, নং ১৫৯।
[২১] সুনানু আবী দাউদ, খণ্ড ৩, পৃ, ১২৫২-৩, নং ৪৪৬৭-৭১ সহীহ সুনানু আবী দাউদ গ্রন্থে [খণ্ড ৩, পৃ, ৮৪৮, নং ৩৭৬৩-৪ (পুরাতন সংস্করণ)] এ হাদীসটিকে প্রামাণ্য আখ্যায়িত করা হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00