📄 হাদীস জালকরণের নেপথ্য কারণ
রাজনৈতিক মতপার্থক্য
তৃতীয় খলিফা উসমান-এর হত্যাকাণ্ডের পর মুসলিম ইতিহাসে ব্যাপক গোলযোগ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। আলী-এর সমর্থক, আয়েশা-এর সমর্থক (এবং পরবর্তীতে মুয়াবিয়ার সমর্থক)-দের মধ্যকার যুদ্ধের ফলে সৃষ্টি হয় শিয়া ও খারিজী উপদলসমূহের। [৪৮]
আলী ও নাবী-এর পরিবারবর্গের অনুকূলে শিয়ারা নিজেরাই প্রচুর জাল হাদীস রচনা করে নিয়েছে। শরীয়ার একজন বিখ্যাত ভাষ্যকারের বক্তব্য থেকে তার সমর্থন পাওয়া যায়।
ইবনু আবিল হাদীদ বলেনঃ 'ফজিলত প্রসঙ্গে হাদীসের মধ্যে মিথ্যা কথার সংযোজন ঘটিয়েছে মূলত শিয়ারা। শুরুর দিকে তারা তাদের প্রতিপক্ষের সাথে শত্রুতার বশবর্তী হয়ে তাদের পছন্দসই ব্যক্তির অনুকূলে অসংখ্য জাল হাদীস রচনা করে নিয়েছে। শিয়াদের এ কাণ্ড দেখে বাকরিয়্যাহ সম্প্রদায়ও ৪৯] তাদের পছন্দসই ব্যক্তির অনুকূলে জাল হাদীস রচনা করে নিয়েছে।' [৫০]
এ ব্যাপারে তাদের অন্যতম সুপরিচিত বর্ণনাটি হলো গাদীরে খুম (খুমের ঝর্ণা)- এর হাদীস। এতে বলা হয়েছেঃ 'নাবী বিদায় হাজ্জ সম্পন্ন করে (মদীনা) ফেরার পথে সাহাবীদের সামনে আলীর হাত ধরে দাঁড় করিয়ে দেন। সবাই তাকে ভালোভাবে চিনে নেয়ার পর নাবী বললেন, 'সে আমার অছি, ভাই ও আমার পর খলিফা। সুতরাং তার কথা মনোযোগ সহকারে শুনবে ও মান্য করবে'। [৫১]
আরেকটি বর্ণনা হলো জ্ঞানের শহর সংক্রান্ত হাদীস যা নাবী-এর প্রতি আরোপ করা হয়েছেঃ انا مدينة العلم و على بابها فمن اراد الدار فليات الباب 'আমি জ্ঞানের শহর আর আলী তার দরজা। সুতরাং যে ব্যক্তি শহরে ঢুকতে চায় সে যেন দরজার দ্বারস্থ হয়।'
প্রখ্যাত হাদীস শাস্ত্রবিদ ইমাম যাহাবীর বর্ণনা অনুযায়ী, এর বর্ণনাকারী আহমদ ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনু ইয়াযীদ একজন মিথ্যুক, এবং ইবনু আদী তাকে হাদীস জালকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
এ প্রেক্ষাপটে জাল হাদীস রচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় ইরাক। আয়েশা -এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে তিনি বলেছেন,
'ওহে ইরাকবাসী, শামের লোকজন তোমাদের তুলনায় উত্তম। নাবী -এর সাহাবীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তাদের নিকট গিয়েছিলেন। তাই তারা এমন হাদীস বর্ণনা করেছে যা আমাদের জানা। কিন্তু তোমাদের নিকট অল্প সংখ্যক সাহাবী গিয়েছিলেন। তবে তোমরা এমন হাদীস বর্ণনা করেছো যার কিছু অংশ আমাদের জানা আর কিছু অংশ আমাদের অজানা।'
খারিজীরা ছিল আলী ও মুয়াবিয়া- উভয়েরই ঘোর বিরোধী; তবে মিথ্যা বর্জনের ব্যাপারে তাদের কঠোর মূলনীতির দরুন (কারণ তারা কবীরা গুনাহকারীকে মুরতাদ মনে করে) হাদীস জালকরণের সাথে তারা জড়িত হয়নি। একারণে সুলাইমান ইবনুল আশআছ বলেন,
'স্বেচ্ছাচারী লোকদের মধ্যে হাদীসের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের ব্যাপারে খারিজীদের তুলনায় উত্তম কেউ নেই; যেমন ইমরান ইবনু বাত্তাহ অ আবুল হাসান ইবনুল আ'রাজ।'[৫৩]
ইবনু তাইমিয়াহও হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে খারিজীদের সম্পর্কে এসব ইতিবাচক মন্তব্য লিপিবদ্ধ করেছেন, অথচ তিনি ছিলেন হাদীসের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর।
দার্শনিক আন্দোলন
উমাইয়া খিলাফতের শেষের দিকে এবং আব্বাসীদের পুরো সময় জুড়ে ঈমান ও আল্লাহর গুণাবলী সংক্রান্ত কয়েকটি ইস্যু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এ বিতর্ক থেকে বেশ কয়েকটি নতুন দর্শনের উদ্ভব ঘটে। দর্শনকেন্দ্রিক এসব দলের মধ্য রয়েছে কাদারিয়্যাহ, [৫৪] জাবারিয়্যাহ, মু'তাযিলাহ, [৫৫] মুরজিয়াহ, [৫৬] মুজাসসিমাহ ও মুয়াত্তিলাহ।
প্রত্যেকটি মতের সমর্থকগণ কোনো একটি মতের সমর্থনে কিংবা বিরোধিতায় পরস্পর-বিরোধী জাল হাদীস তৈরী করে নিয়েছে।
মুহরিয আবু রাজা-- কাদারিয়্যাহ মতবাদের এক গোড়া সমর্থক- স্বীকার করেছে যে, তারা প্রচুর পরিমাণ জাল হাদীসের নেপথ্যে সক্রিয় ছিল। তিনি বলেন, 'কাদারিয়্যাহ মতবাদের সমর্থকদের মধ্যকার কারো নিকট থেকে কোনো কিছু বর্ণনা করো না, কারণ লোকদেরকে তাকদীরের ওপর বিশ্বাস স্থাপনের জন্য উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে আমরা জাল হাদীস রচনা করতাম, আর এর দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর নিকট থেকে পুরস্কার লাভ করা। [৫৭]
বিশেষ করে বিভিন্ন আমলের ফজিলত সম্পর্কিত জাল হাদীস রচনা করার ক্ষেত্রে কারামিয়্যাহদের [৫৮] কেউ কেউ অত্যন্ত দুঃসাহসিক ভূমিকা পালন করেছিল। এক্ষেত্রে তাদের ব্যাখ্যা ছিল এমন যে নাবী তো বলেছেন, 'যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার 'বিরুদ্ধে' কোনো মিথ্যা কথা বলবে, সে যেন জাহান্নামে তার বাসস্থান নির্ধারণ করে নেয়'। কিন্তু তাদের মন্তব্য ছিল, 'আমরা তাঁর 'বিরুদ্ধে' কোনো মিথ্যা কথা বলিনি, বরং তাঁর অনুকূলে বলেছি।' [৫৯]
মুরতাদ গোষ্ঠী
অনেক কাফির ইসলাম ও مسلمانوں ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। ইসলামের শক্তিমত্তার দরুন প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা ও এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে তারা ছিল অক্ষম। তাই তারা ইসলামের সঠিক চিত্রকে বিকৃত করার লক্ষ্যে বেশ কিছু মিথ্যা কলঙ্কপূর্ণ হাদীস রচনা করে ইসলামের ভিত্তিকে দুর্বল করার প্রয়াস চালায়।
তাদের অন্যতম ছিল আব্দুল কারীম ইবনু আবিল আওজা। বসরার আমীর মুহাম্মাদ ইবনু সুলাইমান ইবনু আলীর নির্দেশে যখন তাকে হত্যা করা হয়েছিল তখন সে স্বীকার করে বলেছিল,
'আল্লাহর শপথ, আমি চার হাজার হাদীস জাল করেছি যার মাধ্যমে আমি হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করে দিয়েছি।' [৬০]
স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রসঙ্গে একটি হাস্যকর হাদীসকে তাদের দুঃসাহসিক পদক্ষেপের অন্যতম নজির মনে করা হয়। তাতে বলা হয়েছে,
'যখন সর্বশক্তিমান আল্লাহ নিজেকে সৃষ্টি করতে চাইলেন তখন তিনি প্রথমে একটি অশ্ব (ঘোড়া) সৃষ্টি করে একে ঘর্মাক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে দিলেন। তারপর তিনি অশ্বের ঘাম থেকে নিজেকে সৃষ্টি করলেন।[৬১]
এমন জঘন্য কথা বলা থেকে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। কুখ্যাত জাল হাদীস রচনাকারী আরেকজন হলো মুহাম্মাদ ইবনু সাঈদ, যাকে আব্বাসী খলিফা আবু জা'ফর শূলে চড়িয়ে মৃতুদণ্ড কার্যকর করেছিলেন। সে নিম্নোক্ত হাদীসটি রচনা করেছে, যেখানে হুমাইদের বরাতে আনাসের মাধ্যমে নাবী সম্পর্কে বলা হয়েছে যে তিনি বলেছেন,
انا خاتم النبيين لا نبي بعدى الا ان يشاء الله 'আমি নাবীদের মোহর এবং আমার পর কোনো নাবী নেই, তবে আল্লাহ চাইলে তা ভিন্ন কথা।' [৬২]
স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, শেষে এ ব্যতিক্রমধর্মী বাক্যাংশ যোগ করার মাধ্যমে উক্ত ব্যক্তি নিজের নুবুয়্যাত দাবির প্রতি (মানুষের) আস্থা সৃষ্টির প্রয়াস চালিয়েছে।
গল্পকথক
অবিশ্বাস্য ঘটনায় ভরপুর ও নান্দনিকভাবে উপস্থাপিত বিস্ময়কর গল্পসমূহ সাধারণ মানুষের মধ্যে সবসময়ই আগ্রহ উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে। এর ফলে গল্পকাররা মাসজিদের শ্রোতাদেরকে সহজে প্রতারিত করার জন্য তাদের সামনে যেসব গল্প প্রচার করতো সেগুলোকে অলঙ্কৃত করার লক্ষ্যে তারা অনেক কথা বানিয়ে বলতো। লোকদেরকে বিনোদন দেয়ার মাধ্যমে অনেক গল্পকথক তাদের জীবিকা নির্বাহ করতো। গল্পের উপাদানসমূহকে আরো বেশী বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার লক্ষ্যে তারা গল্পের পূর্বে একটি পূর্ণ ইসনাদ উল্লেখ করে দিতো। হাদীস বিশেষজ্ঞগণ এসব বর্ণনার অধিকাংশকে বলিষ্ঠভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। বিখ্যাত হাদীস বিশারদ সুলাইমান ইবনু মিহরান আ'মাশ বসরার একটি মাসজিদে প্রবেশ করে এক গল্পকথককে বলতে শুনলেন, 'আ'মাশ আমাদের নিকট আবু ইসহাকের বরাতে বর্ণনা করেছেন যিনি আবু ওয়ালী থেকে... ইত্যাদি। এ কথা শুনে আ'মাশ স্বয়ং ঐ চক্রের মাঝখানে বসে পড়ে নিজের চুল উপড়াতে লাগলেন। গল্পকথক যথেষ্ট বিরক্ত হয়ে বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞেস করলেন, 'লজ্জার ব্যাপার! আমরা যখন জ্ঞানের বিষয়ে আলোচনা করছি তখন তুমি এসব কী করছো?' জবাবে আ'মাশ বললেন, 'আমি যা করছি তা তোমার কাজের তুলনায় উত্তম।' সে জানতে চাইলো, 'কীভাবে?' আ'মাশ জবাব দিলেন, 'কারণ আমি যা করছি তা সুন্নাহ, আর তুমি যা বলছো তা হলো মিথ্যার বেসাতি। আমি আ'মাশ, আর তুমি যা বলছো তার কোনো কিছুই আমি বর্ণনা করিনি।' আহমাদ ইবনু হাম্বল ও ইয়াহইয়া ইবনু মুঈনের ক্ষেত্রেও অনুরূপ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল।
বর্ণিত আছে যে, বাগদাদের এক গল্পকথক সূরা আল ইসরার ৭৯ নং আয়াত ("অচিরেই তোমার রব তোমাকে প্রশংসিত ও মহিমান্বিত স্থানে অধিষ্ঠিত করবেন”) এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিল যে, নাবী-কে আল্লাহ তাঁর সিংহাসনের ওপর তাঁর পাশে অধিষ্ঠিত করাবেন। মুহাম্মাদ ইবনু জারীর তাবারীর নিকট এ ব্যাখ্যা পেশ করা হলে তিনি তা এতোটা সোৎসাহে প্রত্যাখ্যান করেন যে তিনি তার দরজার ওপর খোদাই করে লিখে রেখেছিলেন, 'মহিমান্বিত তিনি, যার কোনো সঙ্গী নেই, নেই এমন কেউ যে তাঁর পাশে তাঁর সিংহাসনে বসে থাকে।' এটি বাগদাদের লোকদের মধ্যে এতোটা ক্রোধের সঞ্চার করে যে, তারা তার গৃহে পাথর নিক্ষেপ করতে করতে তার দরজা ঢেকে ফেলে।।৬৩।
অজ্ঞ সুফী দরবেশ সম্প্রদায়
লোকদের মধ্যে ভালো কাজ সম্পাদনের আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি ও খারাপ কাজের ব্যাপারে ভীতি সঞ্চারের লক্ষ্যে কিছু জাল হাদীস রচনা করা হয়েছিল। এ কাজ যারা করেছিল তারা ছিল সর্বনিকৃষ্ট শ্রেণীর হাদীস জালকারী; কারণ তারা ছিল সন্ন্যাসবাদ, ধার্মিকতা ও নেকীর কাজের সাথে সম্পৃক্ত, আর তাদের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা থাকায় তারা সহজে তাদের জালিয়াতিকে গ্রহণ করে নিয়েছে। যেমন: ইসনাদযুক্ত একটি চিঠিতে দাবি করা হয়েছে যে, এটি শায়খ আহমাদের, যিনি মাসজিদে নববীতে ঘুমন্ত অবস্থায় ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন। প্রত্যেক ৫ বা ১০ বছরের মধ্যে এটি প্রচার করা হয় আর তা পুরোপুরি একটি জালিয়াতি কারবার। অথচ নাবী বলেছেন যে, 'যদি কোনো ব্যক্তি এমন কোনো স্বপ্নের ব্যাপারে কথা বলে যা সে দেখেনি, তাহলে সে তার ঠিকানা জাহান্নামের মধ্যে খুঁজে পাবে।'
অতীতে যারা হাদীস জাল করেছে তাদের অন্যতম হলো মাইসারাহ ইবনু আবদি রাব্বিহ, যার সম্পর্কে ইবনু হিব্বান ইবনু মাহদীর উদ্ধৃতি দিয়ে একটি বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। তাতে তিনি বলেন,
'আমি মাইসারাহ ইবনু আবদি রাব্বিহকে জিজ্ঞেস করলাম, 'তুমি এসব হাদীস কোথায় পেয়েছো যে অমুক অমুক (শব্দ বা বাক্য) পাঠ করলে অমুক অমুক প্রতিদান পাওয়া যাবে?' সে জবাব দিল, 'লোকদেরকে (ভাল কাজের প্রতি) আকৃষ্ট করার জন্য আমি নিজেই এসব হাদীস বানিয়ে নিয়েছি।' [৬৪]
মানুষদেরকে বেশি বেশি নফল ইবাদতে নিযুক্ত করানোর জন্য কতিপয় সুফী-সন্ন্যাসী বিভিন্ন কাজের ফজিলত সম্পর্কে জাল হাদীস রচনা করতো। জানা যায় যে, বাগদাদের অন্যতম বিখ্যাত সুফী গোলাম খলীল (মৃত্যু ২৭৫ হি.) এ ধরনের প্রায় চার শ' হাদীস উদ্ভাবন করেছিল। তার মৃত্যুতে এ কারবারের বাজারে চরম মন্দা দেখা দেয়। ৬৫।
আবু ইসমাহ নূহ ইবনু আবী মারইয়াম মারওয়াযীর ন্যায় লোকেরা কুরআনের প্রত্যেকটি সূরার ফজিলতের ব্যাপারে হাদীস উদ্ভাবন করতো। আবু ইসমাহ পরবর্তীতে তার কাজের ন্যায্যতা প্রতিপাদন করতে গিয়ে বলেছিল,
'আমি দেখতে পেলাম যে, লোকেরা কুরআন পরিত্যাগ করে আবু হানীফার ফিকহ ও ইবনু ইসহাকের মাগাযী (যুদ্ধ বিগ্রহের ইতিবৃত্ত) নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে, তাই আমি (আল্লাহর নিকট থেকে) প্রতিদান পাওয়ার আশায় এসব হাদীস উদ্ভাবন করেছি।'
শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী আরেকটি উদাহরণ পেশ করেছেন, 'পরকাল প্রত্যাশীদের জন্য এ দুনিয়া হারাম, দুনিয়া প্রত্যাশীদের জন্য পরকাল হারাম এবং আল্লাহ প্রত্যাশীদের জন্য উভয়টি হারাম।' [৬৬]
জাতীয়তাবাদ ও দলাদলি
• হাদীস সাহিত্যে বিভিন্ন শহরের ফজিলত ও অন্যান্য বিষয়াদি নিয়ে প্রচুর তথ্য রয়েছে যার অধিকাংশই জাল প্রমাণিত হয়েছে। কোনো বিশেষ স্থানের প্রতি আগাম পছন্দ বা অপছন্দের অনুভূতি এ সংক্রান্ত হাদীস জাল করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। ইবনু ইরাকের গ্রন্থের একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে জেদ্দা, বসরা, জর্দান, খোরাসান, ওমান, আসকালান, কাযবীন, নাসিবীন, এন্টিওক ও ইবাদানের ফজিলত এবং কন্সটান্টিনোপল, তাবরিয়্যাহ ও সানা প্রভৃতি শহরের নিন্দাবাদ সংশ্লিষ্ট হাদীস।
• নিম্নোল্লিখিত হাদীসসমূহের ন্যায় এ বিষয়ের অন্যান্য হাদীস সম্প্রদায়ের আরেকটি কারণ ছিল কোনো বিশেষ জাতির প্রতি আগাম পছন্দ বা অপছন্দের অনুভূতি। যেমন:
'যাঞ্জি (কৃষ্ণাঙ্গ) লোকেরা পরিতৃপ্ত অবস্থায় ব্যভিচার করে এবং ক্ষুধার্ত অবস্থায় চুরি করে। তবে তাদের মধ্যে দানশীলতা ও সাহায্যের মানসিকতাও রয়েছে'। [৬৭]
'তিনটি কারণে আরবদেরকে ভালোবাসবে, আমি আরব। কুরআন আরবি ভাষায় লিখিত এবং জান্নাতবাসীদের ভাষা হবে আরবি'। [৬৮]
'যার নিকট দান করার মতো কিছু নেই তার উচিত ইহুদীদেরকে অভিশাপ দেয়া'।
• নিচের বানোয়াট হাদীসটিতে নিজের ইমামের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও অন্যের ইমামের প্রতি ঘৃণাবোধ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠেছেঃ
سيكون في امتى رجل يقال له محمد بن ادريس هو اضر على امتى من ابليس و سيكون فى امتى رجل يقال له ابو حنيفة هو سراج امتى 'অচিরেই আমার উম্মতের মধ্যে মুহাম্মাদ ইবনু ইদরীস (অর্থাৎ ইমাম শাফিয়ী) নামে এক ব্যক্তির আবির্ভাব হবে, সে হবে আমার উম্মতের জন্য ইবলিসের তুলনায় অধিক ক্ষতিকর, আর অচিরেই আমার উম্মতের আবু হানীফা নামে এক ব্যক্তির আবির্ভাব হবে, সে হবে আমার উম্মতের প্রদীপসম'। [৬৯।
যেসব ভুয়া হাদীসের মাধ্যমে কোনো ইমামের কোনো আইনগত মত সমর্থন কিংবা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, সেগুলো রচনার নেপথ্যেও একই কার্যকারণ সক্রিয় ছিল বলে মনে হয়।
ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে হাদীস উদ্ভাবন
কতিপয় লোক স্ব স্ব শাসকদেরকে তুষ্ট করার জন্য হাদীস উদ্ভাবন করেছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, আব্বাসী খলিফা আল মাহদীর সভাসদ গাইয়াছ ইবনু ইবরাহীমের ব্যাপারে একটি বিখ্যাত ঘটনা রয়েছে। কোনো এক কাজে সে একবার মাহদীর দরবারে উপস্থিত হয়। মাহদী ছিলেন কবুতর প্রেমী। গাইয়াছকে খলিফার উদ্দেশ্যে একটি হাদীস পাঠ করে শোনানোর কথা বলা হলে সে বর্ণনা করলো, অমুক এবং অমুক আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে নাবী ﷺ বলেছেন,
لا سبق الا فى نصل او خف او حافر او جناح 'তীরন্দাজী, উট ও ঘোড় দৌড় এবং কবুতর ওড়ানো ব্যতীত অন্য কোনো প্রতিযোগিতা বৈধ নয়'।
খলিফা মাহদী তাকে একটি পুরস্কার দিলেন; তবে সে চলে যাওয়ার পর তিনি বললেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তোমার মুখ মূলত নাবী ﷺ-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা আরোপকারীর মুখ'। তারপর তিনি বললেন, 'কিন্তু, আমিই তো তাকে এরূপ বানিয়েছি'। এরপর তিনি কবুতরগুলোকে জবাই করার নির্দেশ দিয়ে কবুতর রাখার অভ্যাস ছেড়ে দিলেন।
সাইফ ইবনু উমার তামীমীর বরাতে হাকিম আরেকটি মজার ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তামীম বলেন,
'আমি সাঈদ ইবনু তারীফ এর নিকট বসা থাকাকালে তার ছেলে মাকতাব ৭০ থেকে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ী ফিরলো। সে জিজ্ঞেস করলো, 'কাঁদছো কেন?' শিশুটি জবাব দিল, 'শিক্ষক আমাকে প্রহার করেছেন'। সাঈদ বললো, 'আমি তাকে অপমান করে ছাড়বো'। ইবনু আব্বাসের বরাতে ইকরিমা আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে নাবী বলেছেন, 'তোমাদের শিশুদের শিক্ষকরা তোমাদের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট। ইয়াতীমদের প্রতি এদের দয়ামায়া একেবারে অল্প এবং তোমাদের মধ্যে এরা হলো দরিদ্র মানুষের প্রতি সর্বাধিক নির্মম ও কঠিন-হৃদয়'। [৭১]
বিভিন্ন শাক-সব্জি ও খাদ্যশস্যের ফজিলত সংক্রান্ত হাদীসসমূহের মূল অতি সহজেই খুঁজে পাওয়া যাবে সেসব মানুষের মধ্যে যারা ঐগুলোর ব্যবসা করতো। ইবনুল কাইয়িম তার আল মানারুল মুনীফ ফিস সহীহ ওয়াদ দ'ঈফ শীর্ষক জাল হাদীসের সংকলন গ্রন্থে সেসব হাদীস উল্লেখ করেছেন যেখানে তরমুজ, মসুরি ডাল, মাছ, বেগুন, আঙ্গুর, শিম, মটরশুটি, লবণ, পেঁয়াজ, ডালিম ও অন্যান্য শাক-সব্জির উপকারের কথা বলা হয়েছে। নিম্নোক্ত বর্ণনাটি এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ,
'কুমড়া ব্যবহার করো, কারণ তা মাথা উজ্জ্বল করে এবং মসুরি ডাল ব্যবহার করো, কারণ সত্তর জন নাবী এর মহিমা কীর্তন করেছেন'। [৭২]
আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো মুহাম্মাদ ইবনুল হাজ্জাজ লাখমী ওয়াসিতীর বর্ণনা। সে হারীস এর ব্যবসা করতো, তাই সে নিম্নোক্ত হাদীসটি জাল করেছেঃ اطعمني جبريل الهريسة من الجنة لاشد بها ظهرى لقيام الليل 'জীবরাঈল আমাকে কিছু জান্নাতী হারীস খাইয়েছেন যাতে মধ্যরাতের সালাতের জন্য আমার পিঠ মজবুত হয়'।[৭৩]
ইবনু মুহাম্মাদ ও আবু হাতিম তাকে মিথ্যাবাদী আখ্যায়িত করেছেন, আর ইবনুল জাওযী বলেছেন,
'এ হাদীসটি হারীস ব্যবসায়ী মুহাম্মাদ ইবনুল হাজ্জাজের জালিয়াতি। সানাদের বেশীরভাগ অংশই তাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে এবং অন্যান্য মিথ্যুকরাও এটি তার নিকট থেকে চুরি করেছে'।
প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা হাদীসে রূপান্তরিত হওয়া [৭৪]
কতিপয় বর্ণনাকারী বিভিন্ন নীতিগর্ভ উপমা ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কথাকে নাবী -এর প্রতি আরোপ করার প্রয়াস চালিয়েছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, 'পেট হলো রোগের বাসা আর প্রতিরোধ হলো সর্বপ্রধান প্রতিষেধক'। এ বক্তব্যটির ব্যাপারে আরবরা জানে যে, এটি হলো আরবের সুপরিচিত ডাক্তার হারিছ ইবনু কালদা'র বক্তব্য। তবে তা ভুলক্রমে নাবী -এর প্রতি আরোপ করা হয়েছে। [৭৫] অন্যান্য দৃষ্টান্তের মধ্যে রয়েছে এসব জনপ্রিয় উক্তি, 'জ্ঞান অন্বেষণ করো, প্রয়োজনে চীনে গিয়ে হলেও' এবং 'জ্ঞান অন্বেষণ করো, দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত'।
حَدَّثَنَا حَيُّوَةُ بْنُ شُرَيْحٍ حَدَّثَنَا بَقِيَّةُ عَنْ أَبِي بَكْرِ بْنِ أَبِي مَرْيَمَ عَنْ خَالِدِ بْنِ مُحَمَّدٍ الثَّقْفِيِّ عَنْ بِلَالِ بْنِ أَبِي الدَّرْدَاءِ عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ قَالَ "حُبُّكَ الشَّيْءَ يُعْمِي وَيُصِمُ"
হাইওয়াহ ইবনু শুরাইহ আমাদেরকে (এই বলে) অবহিত করেছেন যে, বাকিয়্যাহ আমাদের নিকট আবু বাক্ ইবনু আবী মারইয়াম থেকে তিনি খালিদ ইবনু মুহাম্মাদ ছাক্কাফী থেকে তিনি বিলাল ইবনু আবিদ দারদা থেকে তিনি আবুদ দারদা থেকে এবং তিনি নাবী থেকে বর্ণনা করেছেন যে তিনি বলেছেন, 'কোনো কিছুর প্রতি তোমার ভালোবাসা (তোমাকে) অন্ধ ও বধির করে দেবে'। [৭৬]
আবু বাক্ ইবনু আবী মারইয়ামের দরুন এর বর্ণনাসূত্রটি দুর্বল, কারণ তার স্মৃতিশক্তি ছিল দুর্বল এবং বর্ণনাসমূহ এলোমেলো হয়ে গিয়েছে।
টিকাঃ
[৪৮] খারিজী (আরবিতে খাওয়ারিজ) অর্থ 'বিচ্ছিন্নতাবাদী'; এরা ছিল মুসলিমদের মধ্যে উদ্ভূত প্রথম উপদল। খারিজী উপদলের আবির্ভাব ঘটে সিফফীন যুদ্ধের সময় (৬৫৭ সাল) যখন একটি অংশ (যাদের অধিকাংশ ছিল প্রধানত তামীম গোত্রের) আলীর সেনাবাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তারা আব্দুল্লাহ ইবনু ওয়াহাব রাসিবী নামক এক অখ্যাত সৈনিককে তাদের নেতা নিযুক্ত করে এবং হারুরী বা মুহাকিমী নাম ধারণ করে। ৬৫৮ সালের জুলাই মাসে খলিফা আলী-এর বিরুদ্ধে সংঘটিত নাহরাওয়ানের যুদ্ধে ইবনু ওয়াহাব ও তার অধিকাংশ অনুসারী নিহত হয়। তবে এর মাধ্যমে বিদ্রোহ সম্পূর্ণ দমন সম্ভব হয়নি; বরং তা পরবর্তী কয়েক বছর ধরে কয়েকটি লাগাতার স্থানীয় বিদ্রোহের আকারে অব্যাহত থাকে। ৬৬১ সালে স্বয়ং আলী খারিজী আব্দুর রহমান ইবনু মুলযিমের ছুরিকাঘাতে নিহত হন, যার স্ত্রীর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নাহরাওয়ানের যুদ্ধে নিহত হয়েছিল।
বিশ্বাস, খারিজীরা মনে করতো, বড় কোনো গুনাহ করলেই একজন মুসলিম মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে যায়। তাদের চরমপন্থী শাখা আযরাকীদের মতে, পাপকাজ সম্পাদনের মাধ্যমে যে ব্যক্তি কাফির হয়ে যায় তার পুনরায় ঈমান আনার কোনো সুযোগ নেই, তাকে তার স্ত্রী ও সন্তানাদি সহকারে হত্যা করতে হবে। খারিজী নয় এমন সকল মুসলিমকে তারা মুরতাদ মনে করতো। এর ওপর ভিত্তি করে তারা ইস্তিরদাদ (ধর্মীয় কারণে হত্যা) শীর্ষক একটি মূলনীতি তৈরী করে নিয়েছিল। আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকেই, এমনকি এর তত্ত্বীয় রূপ সুবিন্যস্ত হওয়ার আগেই এ নীতি প্রয়োগ করা হয়েছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, খারিজীরা অমুসলিমদের প্রতি যেরূপ সহনশীলতা প্রদর্শন করতো তার তুলনায় (অখারিজী মুসলিমদের প্রতি তাদের) এ হিংস্র নীতিটি ছিল একেবারেই বিপরীতধর্মী। তারা আরো মনে করতো যে, ইমাম (সমকালীন শাসক) কোনো পাপাচারে লিপ্ত হলে তার বিরুদ্ধে জিহাদ করা দ্বীনি কর্তব্য।
[৪৯] আবু বকরের সমর্থকবৃন্দ।
[৫০] শারহু নাহজিল বালাগাহ, খণ্ড ১, পৃ, ১৩৫।
[৫১] আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, খণ্ড ৭,
[৫২] আত তারীখুল কাবীর, খণ্ড ১, পৃ, ৬৯।
[৫৩] আল কিফায়াহ, পৃ, ১৩১।
[৫৪] কাদারিয়্যাহ দর্শনের সমর্থকরা তাকদীরকে অস্বীকার করে মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে আল্লাহ তা'আলার মর্জি ও ক্ষমতা থেকে স্বাধীন হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল। যে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে এ মতবাদ ঘোষণা করেছিল সে হলো মা'বাদ জুহানী; সে সাহাবীদের যুগের শেষের দিকে এসে এ ঘোষণা প্রদান করে। বসরার এক পারসিকের নিকট থেকে সে এ শিক্ষা লাভ করে। এ গোষ্ঠীর দু'টি প্রধান শাখা রয়েছে। একটি চরমপন্থী শাখা আল্লাহর জ্ঞান, ইচ্ছা, ক্ষমতা ও আল্লাহ কর্তৃক মানুষের কার্যাবলী সৃষ্টি হওয়ার বিষয়টিকে অস্বীকার করে। কালের বিবর্তনে এ শাখাটি কার্যত হারিয়ে গিয়েছে। তুলনামূলকভাবে কম চরমপন্থী অন্যান্য শাখার লোকজন মানুষের কার্যাবলীর ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার আগাম জ্ঞানে বিশ্বাস করে, তবে তারা অস্বীকার করে যে, মানুষের কার্যাবলী আল্লাহর মর্জি অনুযায়ী তাঁর ক্ষমতার প্রভাবে সংঘটিত হয় এবং মানুষের কার্যাবলী মূলত তাঁরই সৃষ্টিশক্তির ফল। এ দার্শনিক চিন্তাগোষ্ঠীটি শেষোক্ত মতের ওপর অনড় অবস্থান গ্রহণ করে নিয়েছিল। (শারহু লুম'আতিল ই'তিক্বাদ, পৃ, ১৬২)
[৫৫] মু'তাযিলারা ওয়াসিল ইবনু আতা'র অনুসারী, যিনি হাসান বসরীর মাজলিস থেকে নিজেকে আলাদা করে নিয়ে ঘোষণা দিয়েছিল যে, পাপ সম্পাদনকারী লোকজনের অবস্থান ঈমান ও কুফরের মাঝামাঝি এবং তারা চিরকাল জাহান্নামে থাকবে। ওয়াসিল ইবনু আতা'র এ বিশ্বাসের অনুবর্তী হয়েছিল আমর ইবনু উবাইদ। তারা জাহমীদের ন্যায় আসমানী গুণাবলী অস্বীকার করেছিল ও কাদারিয়্যাহদের ন্যায় মানুষের কার্যাবলীতে আল্লাহর ক্ষমতাকে অস্বীকার করেছিল এবং এ দাবি করেছিল যে, কবিরা গুনাহ সম্পাদনকারী চিরকাল জাহান্নামে থাকবে। (শারহু লুম'আতিল ই'তিক্বাদ, পৃ, ১৬৩)
[৫৬] মুরজিয়া দ্বারা সেসব লোককে বুঝানো হয় যারা আমলকে ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে না। তাদের দৃষ্টিতে, নিছক অন্তর দ্বারা গ্রহণ করার নামই ঈমান। ফলে তারা মনে করে যে, একজন পাপিষ্ঠ ব্যক্তি যে ধরনের পাপ কাজই করুক না কেন এবং যে ধরনের ভাল কাজই পরিত্যাগ করুক না কেন- সর্বাবস্থায় তার ঈমান পরিপূর্ণ। অধিকন্তু, যদি কোনো ব্যক্তিকে কিছু দ্বীনি বিধান লঙ্ঘনের দায়ে কাফির আখ্যায়িত করা হয়, তাহলে তা হবে তার অন্তরের ভেতরকার বিশ্বাসের ঘাটতির ফল, কোনো আমল পরিত্যাগ করার ফল নয়। এটি জাহমীদের চিন্তাধারা; খারিজীদের মতবাদ অবশ্য এর বিপরীতধর্মী। (শারহু লুম'আতিল ই'তিক্বাদ, পৃ, ১৬২–৩)
[৫৭] লিসানুল মীযান, খণ্ড ১, পৃ, ১২।
[৫৮] কারামিয়্যাহ একটি উপদল যার নামকরণ করা হয়েছিল নিযার গোত্রের মুহাম্মাদ ইবনু কারাম সিজিস্তানীর (মৃত্যু ২৫৫ হি.) নামানুসারে। সে খোরাসান, বালখ, মারভ ও হেরাতে অধ্যয়ন করে অসাবধানতাবশত আহমাদ ইবনু আব্দিল্লাহ জাওবারী (মৃত্যু ২৪৭) ও মুহাম্মাদ ইবনু তামীম ফারইয়ানানীর নিকট থেকে বেশ কিছু সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করে যাদের উভয়ে ছিল হাদীস জাল করার ক্ষেত্রে কুখ্যাত। মক্কায় পাঁচ বছর অবস্থান করার পর সে সিজিস্তানে প্রত্যাবর্তন করে এবং তার সকল সম্পত্তি বিক্রি করে দেয়। তারপর সে নিশাপুর চলে যায়। সেখানকার গভর্নর মুহাম্মাদ ইবনু তাহির তাকে কারারুদ্ধ করেন। ২৫১ সালে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে সে জেরুজালেম চলে যায় এবং চার বছর পর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করে।
মুহাম্মাদ ইবনু কারামের ধর্মতাত্ত্বিক প্রধান মতবাদ (যার ফলে তার দলকে মুসাব্বিহাহ বা বস্তুতে নরত্ব আরোপকারী দার্শনিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে) ছিল এই যে, কোনো মানবীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ না থাকলেও আল্লাহ হলেন একটি 'বস্তু (জাওহার)' যা মহাশূন্যস্থিত আরশের সংস্পর্শে রয়েছে; তার কতিপয় অনুসারী অবশ্য জাওহারের স্থলে 'দেহ (জিসম)' শব্দ ব্যবহার করেছে। তার অনুসারীদের মতে, আল্লাহ কথা বলার পূর্বেও কথা বলছিলেন এবং যখন কোনো বন্দনাকারী ছিল না তখনও তাঁর বন্দনা করা যেতো। ইবনু কারামের মতে, আল্লাহ তা'আলা কয়েকটি আকস্মিক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলেন যার ওপর তাঁর পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে, এ পৃথিবী ও তার মধ্যস্থিত বিষয়াদি-যেগুলো তাঁর ইচ্ছায় নয় বরং 'কুন' (হও) শব্দ দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে-এসবের ওপর তাঁর কোনো কর্তৃত্ব নেই।
তার অপর একটি মতবাদ হল, ঈমানের দু'টি ঘোষণা একবার উচ্চারণ করলেই ঈমান পূর্ণ হয়ে যায়, এবং এর সাথে সত্যায়ন (তাসদীক্ব) কিংবা কর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। বলা হয় যে, এ চিন্তাধারাটি মুরজিয়াদের মূলতত্ত্বের অনুরূপ হলেও তার পূর্বে কেউ এ মত ব্যক্ত করেননি। (শর্টার এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলাম, পৃ, ২২৩-৪)
[৫৯] আল বা-ইছুল হাছীছ, পৃ, ৭৯।
[৬০] আল মাওদূআতুল কুবরা, খণ্ড ১, পৃ, ৩১।
[৬১] সুয়ূতীর আল আহাদীসুল মাওদু'আহ, খণ্ড ১, পৃ, ৩ এর বরাতে ক্রিটিসিজম অব হাদীস গ্রন্থে (পৃ, ৩৮) উদ্ধৃত।
[৬২] তাদরীবুর রাবী, পৃ, ১৮৬।
[৬৩] তাহছীর, পৃ, ১৬১।
[৬৪] আদ দু'আফা।
[৬৫] তারীখু বাগদাদ, খণ্ড ৫, পৃ, ৭৯।
[৬৬] সিলসিলাতুল আহাদীসিদ দ'ঈফাহ, খণ্ড ১, পৃ, ৫০।
[৬৭] তানযীহুশ শারী'আহ, খণ্ড ২, পৃ, ৩১।
[৬৮] প্রাগুক্ত, খণ্ড ২, পৃ, ৩০।
[৬৯] তারীখু বাগদাদ, খণ্ড ১৪, পৃ, ২৭০।
[৭০] কুরআন শিক্ষাকেন্দ্র।
[৭১] তারীখু বাগদাদ, খণ্ড ১৩, পৃ, ৪৫৩ ও আল লা'আলী, খণ্ড ১, পৃ, ২৬৩।
[৭২] সিলসিলাতুল আহাদীসিদ দু'ঈফাহ, খণ্ড ১, পৃ, ৫৭।
[৭৩] প্রাগুক্ত, নং ৬৯০।
[৭৪] ক্রিটিসিজম অব হাদীস, পৃ, ৩৫-৪৩।
[৭৫] লামহাতুন ফী উসূলিল হাদীস, পৃ, ৩০৫।
[৭৬] আত তারীখুল কাবীর, খণ্ড ২, পৃ, ১, নং ১৭৫, সুনানু আবী দাউদ ও মুসনাদু আহমাদ, খণ্ড ৫, পৃ, ১৯৪ ও খণ্ড ৬, পৃ, ৬৫০।
📄 তাফসীর গ্রন্থসমূহে জাল হাদীস
কুরআনের অনেক মুফাস্সির নিজেদের তাফসীর গ্রন্থসমূহে জাল হাদীস ব্যবহার করেছেন অথচ সেগুলোর অবস্থা ব্যাখ্যা করেননি। কুরআনের বিভিন্ন সূরার ফজিলত প্রসঙ্গে উবাই ইবনু কা'বের প্রতি আরোপিত জাল হাদীসসমূহ হলো সর্বাধিক জনপ্রিয়। এগুলো সা'লাবী, ওয়াহিদী, যামাখশারী ও শাওকানীর তাফসীর গ্রন্থসমূহেও বিদ্যমান।
জাল হাদীসের সঙ্কলন
বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ জাল হাদীসের বিশেষ সঙ্কলন তৈরী করেছেন। এগুলোর মধ্যে ইবনুল জাওযীর আল মাওদূ'আত (যা এ বিষয়ের সর্বপ্রাচীন গ্রন্থ), সুয়ূতীর আল লা'আলিল মাছনু 'আহ ফিল আহাদীস ও শাওকানীর আল ফাওয়াইদুল মাজমু'আহ ফি আহাদীসিল মাওদূ'আহ সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। সিলসিলাতুল আহাদীসিদ দ'ঈফাহ ওয়াল মাওদূ'আহ নামে এ বিষয়ের ওপর একেবারে হালনাগাদ গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন নাসিরুদ্দীন আলবানী।