📄 দ‘ঈফ হাদীস
ভাষাতত্ত্বের বিচারে দ'ঈফ শব্দের অর্থ 'দুর্বল'। তবে হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষায় দ'ঈফ দ্বারা এমন বর্ণনাকে বুঝানো হয় যার মান হাসান হাদীসের নীচে। এটি এমন এক ধরনের হাদীস যেখানে ছিহাহ (বিশুদ্ধতা) এর পাঁচটি শর্তের এক বা একাধিক শর্ত অনুপস্থিত। বাইকূনী উলূমুল হাদীসের ওপর লিখিত কাব্যের এক জায়গায় দ'ঈফ হাদীসকেও একইভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেনঃ
و كل ما عن رتبة الحسن قصر * فهو الضعيف و هو اقسام كثر
যে হাদীসের মান হাসানের নীচে তা-ই দ'ঈফ। তবে দ'ঈফ হাদীসের অনেক প্রকার রয়েছে।
ইমাম তিরমিযী কর্তৃক সংগৃহীত নিম্নোক্ত হাদীসে দ'ঈফ হাদীসের একটি নমুনা খুঁজে পাওয়া যাবেঃ
حدثنا بندار حدثنا يحيى بن سعيد و عبد الرحمن بن مهدی و بهز بن اسد قالوا حدثنا حماد بن سلمة عن حكيم الأثرم عن ابى تميمة الهجيمي عن ابي هريرة عن النبي صلى الله عليه وسلم قال من اتى حائضا او امراة في دبرها أو كاهنا فقد كفر بما انزل على محمد صلى الله عليه و سلم قال ابو عيسى لا نعرف هذا الحديث الا من حديث حكيم الأثرم عن ابى تميمة الهجيمي عن ابي هريرة
বুন্দার আমাদেরকে অবহিত করেছেন যে, ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ, আব্দুর রহমান ইবনু মাহদী ও বাহয ইবনু আসাদ বলেছেন যে, হাম্মাদ ইবনু সালামাহ তাদের নিকট হাকীম আছরাম, তামীমাহ হুজাইমী ও আবু হুরায়রার উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেছেন যে, নাবী বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঋতুবতী নারীর সাথে কিংবা কোনো নারীর পশ্চাদ্দেশ দিয়ে সহবাস করে কিংবা কোনো গণকের দ্বারস্থ হয়, সে মুহাম্মাদ-এর ওপর নাযিলকৃত বিষয়ের প্রতি অবিশ্বাস স্থাপন করেছে।”
আবু ঈসা বলেন, হাকীম আছরাম, তামীমাহ হুজাইমী ও আবু হুরায়রার উদ্ধৃতি ব্যতীত অন্য কোনো বর্ণনাসূত্রের মাধ্যমে আমরা এ হাদীসটি জানতে পারি না। বিশেষজ্ঞগণ হাকীম আছরামকে দুর্বল শ্রেণীভুক্ত করেছেন, আর ইবনু হাযার আসকালানী তাক্বরীবুত তাহযীব গ্রন্থে তাকে লাইয়িন আখ্যায়িত করেছেন।
দ'ঈফ হাদীসের স্তরবিন্যাস
বর্ণনাসূত্র বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া কিংবা বর্ণনাকারীদের মধ্যে প্রাপ্ত ত্রুটি থেকে উদ্ভূত দুর্বলতার তীব্রতা অনুযায়ী হাদীসের দুর্বলতা বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। সবচেয়ে দুর্বল বর্ণনাসূত্রের প্রেক্ষিতে একে মাওদূ' বা জাল বর্ণনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ইমাম হাকিম তার মা'রিফাতু উলূমিল হাদীস গ্রন্থে কিছু দুর্বলতম বর্ণনার বিষয়ে আলোকপাত করেছেন যা বেশ কিছু অঞ্চল ও কতিপয় সাহাবীর নামে চালিয়ে দেয়া হয়েছিল। দৃষ্টান্তস্বরূপ তিনি বলেছেন যে, আবু বাক্র্ সিদ্দীকের সাথে 'ইবনু মূসা দাক্বীক্বী ফারাদ সুবখী থেকে, তিনি মুররাহাত তাইয়িব থেকে এবং তিনি আবু বাক্ থেকে'- মর্মে যে বর্ণনাসূত্রটি প্রচলিত আছে তা হলো সর্বাপেক্ষা দুর্বল। তিনি আরো বলেছেন যে, সিরিয়াবাসীদের নামে যেসব বর্ণনাসূত্র রয়েছে সেগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা দুর্বল বর্ণনাসূত্রটি হলো-'মুহাম্মাদ ইবনু কায়স মাসলুব উবাইদুল্লাহ ইবনু যাহরাহ থেকে, তিনি আলী ইবনু ইয়াযীদ থেকে, তিনি কাসিম থেকে এবং তিনি আবু উমামাহ থেকে'।
দ'ঈফ হাদীসের আইনগত মর্যাদা
দ'ঈফ হাদীসের ব্যবহার নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। দ্বীন ও আইনগত বিধি-বিধান (হালাল ও হারাম)-এর সাথে সংশ্লিষ্ট না হলে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ ভালো কাজের ক্ষেত্রে দ'ঈফ হাদীস গ্রহণ করার অনুমোদন দিয়েছেন; তবে এ ক্ষেত্রে ইমাম ইবনু হাযার আসকালানী তিনটি শর্ত নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
* মিথ্যুক বা জাল বর্ণনাকারী রয়েছে— হাদীসটি এ পর্যায়ের মাত্রাতিরিক্ত দুর্বল হতে পারবে না।
* হাদীসটি নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে (বিশেষজ্ঞদের দ্বারা) স্বীকৃত হতে হবে।
* কেউ এটা মনে করতে পারবে না যে, গ্রহণের কারণে হাদীসটির শক্তি (তথা বিশুদ্ধতা) সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে।
সুফিয়ান সাওরী, আব্দুর রহমান ইবনু মাহদী ও আহমদ ইবনু হাম্বল (রহ.) প্রমুখ দুর্বল বর্ণনা ব্যবহার করতেন। বস্তুত, ইমাম আহমদ কিয়াসের উপর দুর্বল বর্ণনার ব্যবহারকে প্রাধান্য দিতেন।
প্রাচীন অনেক গ্রন্থে দ'ঈফ হাদীসকে আল হাদীসুল মারদুদ (প্রত্যাখ্যাত বর্ণনা) হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। দ'ঈফ হাদীস দ্বারা এমন হাদীসকে বুঝানো হয়, গ্রহণযোগ্যতার এক বা একাধিক শর্ত পূরণ না হওয়ার কারণে যে বর্ণনার সত্যতা চরম সংশয়পূর্ণ হয়ে ওঠেছে। অন্যান্য সহীহ হাদীস দ্বারা সমর্থিত হওয়ার কারণে কিছু দ'ঈফ হাদীসকে অন্য হাদীসের শ্রেণীভুক্ত করা গেলেও কিছু কিছু দ'ঈফ হাদীস সম্পূর্ণই প্রত্যাখ্যাত। গ্রহণযোগ্যতার সে শর্ত পূরণ না হওয়ার প্রেক্ষিতে দ'ঈফ হাদীসসমূহকে আরো কয়েকটি উপভাগে বিভক্ত করা হয়।