📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 সহীহ হাদীস

📄 সহীহ হাদীস


ইসলামী জীবনব্যবস্থা অনুযায়ী আইনগত নির্দেশের একটি উৎস হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে হলে একটি হাদীসকে পাঁচটি মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হবে। ইবনুস সালাহ সহীহ হাদীসের সংজ্ঞায় বলেছেনঃ
'সহীহ হাদীস মূলত এমন এক প্রকার হাদীস যাতে রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন ইসনাদ, যা বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীদের নিকট থেকে বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীগণ করেছেন এবং যা যে কোনো ধরনের অনিয়ম বা ত্রুটি থেকে মুক্ত।' ৬৷

১. ইত্তিসালুস সানাদ (বর্ণনাকারীদের নিরবচ্ছিন্ন বর্ণনাসূত্র)
কোনো হাদীস গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য হাদীসের মূলপাঠ বর্ণনাকারীদের বর্ণনাসূত্র নিরবচ্ছিন্ন হতে হয়। অর্থাৎ, বর্ণনাকারীদের কেউ বর্ণনাসূত্র থেকে অনুপস্থিত থাকতে পারবে না এবং প্রত্যেক বর্ণনাকারীর সাথে তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বর্ণনাকারীর প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ হতে হবে। প্রত্যেক বর্ণনাকারীকে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত হতে হবে, অন্যথায় তাকে মাজহুল (অপরিচিত) ও সানাদটিকে বিচ্ছিন্ন শ্রেণীভুক্ত করা হয়।

২. আদালত (সততা)
কোনো হাদীস গ্রহণযোগ্য হওয়ার দ্বিতীয় প্রধান শর্তটি হলো বর্ণনাকারীদের সততা। সততা দ্বারা বুঝানো হয় যে, বর্ণনাকারী একজন ন্যায়নিষ্ঠভাবে ইসলামের বিধি-বিধান পালনকারী মুসলিম এবং তিনি প্রকাশ্যে কোনো কবীরা গুনাহ করেছেন মর্মে কারো নিকট কোনো তথ্য নেই। তিনি মিথ্যুক হিসেবে পরিচিত হলে তাকে কায্যাব এবং তার বর্ণিত হাদীসকে 'দ'ঈফ' শ্রেণীভুক্ত করা হয়। কুতুবুর রিজাল নামক বর্ণনাকারীদের জীবনচরিত সংক্রান্ত গ্রন্থাদির তথ্যের মাধ্যমে এসব শর্ত যাচাই করা হয়।

৩. দত্ত (নির্ভুলতা)
মূলপাঠের নির্ভুলতা যাচাই করা হয় নিম্নোক্ত দু'টি মাপকাঠির মাধ্যমে, যার প্রত্যেকটিই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মানদণ্ড।

দবতুস সদর (মস্তিস্কের সুস্থতা)
প্রত্যেক বর্ণনাকারীকে তার স্মৃতিশক্তি ও উচ্চ মানের নির্ভুলতা সহকারে হাদীস পুনরাবৃত্তির জন্য সুপরিচিত হতে হবে। কোনো বর্ণনাকারীর একই হাদীস ভিন্ন ভিন্ন ভাবে পুনরাবৃত্তি করার প্রবণতা থাকলে অনুরূপ হাদীসকে মুদতারিব (বিভ্রান্তিকর) ও তার বর্ণিত অন্যান্য হাদীসকে 'দ'ঈফ' শ্রেণীভুক্ত করা হয়। বর্ণনাকারীর নির্ভুলতার স্তর মাঝারি মানের হলে এবং প্রামাণিকতার অন্যান্য শর্ত পূরণ হলে তার বর্ণিত হাদীসকে 'হাসান' শ্রেণীভুক্ত করা হয়।

দবতুল কিতাবাহ (লেখনীর নির্ভুলতা)
কোনো বর্ণনাকারী যদি (ক)-তে উল্লিখিত শর্ত পূরণ করতে না পারে, তাহলে তাকে অবশ্যই তার হাদীস নির্ভুলভাবে গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করার ব্যাপারে সুপরিচিত হতে হবে; এ ক্ষেত্রে তাকে কেবল তার লিখিত গ্রন্থ থেকেই হাদীস বর্ণনা করতে হবে। এ দু'টি পূর্বশর্তও কুতুবুর রিজাল নামক বর্ণনাকারীদের জীবনচরিত সংক্রান্ত গ্রন্থাদির তথ্যের মাধ্যমে যাচাই করা হয়।

৪. গায়রু শায (দুর্লভ না হওয়া)
একটি হাদীস গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য তা একই বিষয়ে অধিকতর শক্তিশালী সনদের মাধ্যমে বর্ণিত অন্যান্য হাদীসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া অত্যন্ত জরুরী। কোনো হাদীসের মূলপাঠ যদি সুপরিচিত অন্য কোনো পাঠের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, যার বর্ণনাসূত্র অধিকতর শক্তিশালী, কিংবা তা যদি একই মানসম্পন্ন অন্য এক গুচ্ছ বর্ণনার সাথে সাংঘর্ষিক হয় তাহলে তাকে শায (দুষ্প্রাপ্য) শ্রেণীভুক্ত করা হয়, যা দ'ঈফ হাদীসেরই একটি প্রকার।

৫. লা ইল্লাহ (গুপ্ত ত্রুটির অনুপস্থিতি)
গুপ্ত ত্রুটি বলতে এমন ত্রুটিকে বুঝানো হয় যার ফলে হাদীসটিকে আপাতদৃশ্যে নির্ভরযোগ্য মনে হয়, কিন্তু গভীর অনুসন্ধান চালালে তার মধ্যে ভুলত্রুটি ধরা পড়ে। কোনো হাদীসকে নির্ভরযোগ্য (সহীহ) হতে হলে তাকে অবশ্যই গুপ্ত ত্রুটি থেকে মুক্ত হতে হবে। গুপ্ত ত্রুটিযুক্ত হাদীসকে মা'লুল বা মুয়াল্লাল বলা হয়। ইবনুল মাদীনী (মৃত্যু ৩২৪ হি.) বলেছেন যে, সংশ্লিষ্ট হাদীসের সবগুলো ইসনাদ সতর্কভাবে তুলনা করার পরই কেবল এর গুপ্ত ত্রুটি গোচরীভূত হয়। তিনি তার গ্রন্থ আল ইলাল এ ৩৪ জন তাবি'ঈর একটি তালিকাসহ তারা যেসব সাহাবীর নিকট থেকে সরাসরি হাদীস শ্রবণ করেছেন তাদের নাম উল্লেখ করেছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, তিনি বলেছেন যে, হাসান বসরী (মৃত্যু ১১০ হি.) আলী (মৃত্যু ৪০ হি.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেননি, যদিও এর একটি ক্ষীণ সম্ভাবনা রয়েছে যে তিনি হয়তো শৈশবে তাকে মদীনায় দেখেছিলেন।

এ ধরনের তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা সূফীদের এমন অসংখ্য বর্ণনাকে বাতিল করে দেয় যেগুলোর ব্যাপারে তারা দাবি করে যে, হাসান বসরী তা আলী (রাঃ)-এর নিকট থেকে শুনেছেন। মাত্র অল্প কয়েকজন হাদীস বিশেষজ্ঞ এ বিষয়ের ওপর গ্রন্থ রচনা করেছেন; তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ইবনু আবী হাতিম রাযী (মৃত্যু ৩২৭ হি.), খাল্লাল (মৃত্যু ৩১১ হি.) ও দারুকুতনী প্রমুখ (মৃত্যু ৩৮৫ হি.)।[৭]

সহীহ হাদীসের আইনগত মর্যাদা
যে হাদীসে বিশুদ্ধতার পাঁচটি শর্তের সবক'টিই পাওয়া যায়, তাকে বলা হয় 'সহীহ' হাদীস। ইসলামী আইনের বিভিন্ন বিধি-বিধান প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে এরূপ হাদীস ব্যবহার করা যায়, এবং রহিত না হয়ে থাকলে এরূপ হাদীস অবশ্যই গ্রহণ ও বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। একটি সহীহ হাদীস থেকে উৎসারিত আইনগত সিদ্ধান্ত কেবল এর চেয়ে শক্তিশালী আরেকটি সহীহ হাদীসের সিদ্ধান্ত দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতে পারে।

সহীহ লি গাইরিহী
সহীহ হাদীসকে আরো দু' ভাগে ভাগ করা যেতে পারে—সহীহ লি যাতিহী ও সহীহ লি গাইরিহী। যেসব হাদীসে পাঁচটি শর্ত পুরোপুরি পাওয়া যায় সেগুলোকে সহীহ লি যাতিহী নামেও অভিহিত করা হয়। অর্থাৎ এসব হাদীস বাইরের কোনো কিছু বিবেচনা করা ছাড়াই নিজে থেকে সহীহ। সহীহ লি গাইরিহী মূলত এমন একটি হাসান হাদীস যা অন্যান্য বর্ণনা দ্বারা সমর্থিত হওয়ার সুবাদে সহীহ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে।

সুনানু আবী দাউদ গ্রন্থে উল্লিখিত নিম্নোক্ত হাদীসটি সহীহ লি গাইরিহী প্রকৃতির হাদীসের একটি উদাহরণঃ

حدثنا ابو كريب حدثنا عبدة بن سليمان عن محمد بن عمرو عن أبي سلمة عن ابى هريرة قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم لو لا ان اشق على امتى لامرتهم بالسواك عند كل صلاة
আবু কুরাইব আমাদেরকে অবহিত করেছেন যে, আবদাহ ইবনু সুলাইমান তাদের নিকট মুহাম্মাদ ইবনু আমর থেকে, তিনি আবু সালামাহ থেকে এবং তিনি আবু হুরায়রা থেকে নাবী ﷺ-এর একটি বক্তব্যের উদ্ধৃতি পেশ করেছেন, তাতে নাবী ﷺ বলেছেন, “আমার উম্মতের ঘাড়ে একটি বড় বোঝা চেপে বসার আশঙ্কা না থাকলে, আমি তাদেরকে প্রত্যেক সালাতের সময় মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।”[৮]

ইবনুস সালাহ বলেছেন যে, মুহাম্মাদ ইবনু আমর ইবনু আলকামাহ ছিলেন তার সত্যবাদিতা ও সততার জন্য সুপরিচিত; কিন্তু তাকে অযথার্থ (সাদূকুন লাহু আওহাম) মনে করা হতো। উপরোক্ত হাদীসের শেষে আবু দাউদ বলেছেন, আবু ঈসা (তিরমিযী) বলেন,
'এ হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহীম থেকে, তিনি আবু সালামাহ থেকে, তিনি যাইদ ইবনু খালিদ থেকে এবং তিনি নাবী ﷺ থেকে বর্ণনা করেছেন এবং আবু হুরায়রা ও যাইদ ইবনু খালিদের বরাতে আবু সালামাহ নাবী ﷺ-এর বক্তব্যের যে দু'টি উদ্ধৃতি প্রদান করেছেন, আমার দৃষ্টিতে তার উভয়টিই সহীহ; কারণ নাবী ﷺ-এর এ বক্তব্যটি আবু হুরায়রার বরাতে একাধিক সানাদ দ্বারা বর্ণিত হয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল (বুখারী)'র বর্ণনা প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন যে, যাইদ ইবনু খালিদের বরাতে আবু সালামাহ যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, তা অধিকতর প্রামাণ্য। আবু ঈসা বলেন, 'এ বিষয়ে আবু বাক্ সিদ্দীক, আলী, আয়েশা, ইবনু আব্বাস, হুযাইফা, যাইদ ইবনু খালিদ, আনাস, আব্দুল্লাহ ইবনু আমর, ইবনু উমার, উম্মু হাবীবাহ, আবু উমামাহ, আবু আইয়ুব, তাম্মাম ইবনু আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনু হানযালাহ, উম্মু সালামাহ, ওয়াসিলাহ ইবনুল আসকা ও আবু মূসার বরাতে আরো কয়েকটি বর্ণনা রয়েছে।[৯]

সহীহ হাদীসের শ্রেণীবিন্যাস এ বিষয়ে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মতটি হলো, নির্দিষ্ট কোনো একটি বিশুদ্ধ বর্ণনাসূত্রকে নির্দিষ্ট অন্য একটি বিশুদ্ধ বর্ণনাসূত্রের চেয়ে শ্রেয়তর দাবী করার সুযোগ নেই। বিশুদ্ধতার পাঁচটি শর্ত দ্বারা বর্ণনাসূত্র ও মূলপাঠ কতটুকু প্রভাবিত হয়, তার ওপরই নির্ভর করে বিশুদ্ধতার শ্রেণীবিন্যাস। দৃষ্টান্তস্বরূপ, বিশুদ্ধ বর্ণনার সর্বনিম্ন স্তরে রয়েছে সেসব হাদীস যার বর্ণনাকারীদের নির্ভুলতার বিষয়টি কিছুটা বিতর্কিত হলেও এর বিশুদ্ধতার সপক্ষের অন্যান্য প্রমাণসমূহ এর নির্ভুল হওয়ার সম্ভাবনাকেই প্রবল করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ সুহাইল ইবনু আবী সালিহ কর্তৃক তার পিতার বরাতে আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত হাদীসসমূহ।

যৌক্তিক এ বাস্তবতা সত্ত্বেও প্রাথমিক যুগের কতিপয় বিশেষজ্ঞ বিশেষ কোনো বর্ণনাসূত্রকে সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন মনে করেছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, আহমদ ইবনু হাম্বল ও ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহ 'যুহরী সালিম থেকে এবং তিনি তার পিতা আব্দুল্লাহ ইবনু উমার থেকে' এই বর্ণনাসূত্রকে সবচেয়ে শক্তিশালী মনে করতেন। পক্ষান্তরে, বুখারী মনে করতেন, 'মালিক নাফি থেকে এবং তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু উমার থেকে' বর্ণনাসূত্রটি সর্বাধিক শক্তিশালী। [১০] এটি 'সোনালী বর্ণনাসূত্র' নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিল।

যথাযথ জ্ঞান না থাকার কারণে অনেকেই মনে করেন যে, বুখারী ও মুসলিমে সকল সহীহ হাদীস সংকলিত হয়ে গেছে। কিন্তু ব্যাপারটি মোটেই এমন নয়; বরং এমন অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে যা এ দুই গ্রন্থের কোনোটিতেই সংকলিত হয়নি। খোদ এ দু' গ্রন্থকার নিজেরাই স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে, সকল সহীহ হাদীস তারা এখানে সংকলিত করেননি। ইমাম বুখারী বলেছেন,
'আমি আমার আল জামি' গ্রন্থে কেবল বিশুদ্ধ হাদীসগুলোকেই লিপিবদ্ধ করেছি; তবে গ্রন্থটির কলেবর বড় হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কিছু প্রামাণ্য হাদীসকেও এখান থেকে বাদ রেখেছি।'

ইমাম মুসলিমও বলেছেন, 'আমি এ গ্রন্থে সকল সহীহ হাদীসকে অন্তর্ভুক্ত করিনি। আমি কেবল সেসব হাদীসই অন্তর্ভুক্ত করেছি যেগুলোর (বিশুদ্ধতার) ব্যাপারে বিশেষজ্ঞগণ একমত হয়েছেন।'

বস্তুত, বিশুদ্ধ হাদীসসমূহের একটি বড় অংশই পাওয়া যায় এ দু'টি সঙ্কলনের বাইরের গ্রন্থসমূহে। ইমাম বুখারী নিজেই বলেছেন,
'আর আমি যে পরিমাণ হাদীস এ গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট করেছি তার তুলনায় বাদ পড়া সহীহ হাদীসের সংখ্যা বেশী। আমি এক লাখ সহীহ ও দু' লাখ দ'ঈফ হাদীস মুখস্থ করেছি।'
অথচ সহীহ বুখারী ও মুসলিমের প্রত্যেকটিতে সন্নিবিষ্ট সর্বমোট হাদীস সংখ্যা চার হাজারের মতো! [১১]

হাদীসকে বিশুদ্ধ সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে ইমাম বুখারী ও মুসলিম যেসব মানদণ্ড ব্যবহার করেছেন তার আলোকে হাদীসসমূহের সাত রকম শ্রেণীবিন্যাস করা যেতে পারেঃ

• সহীহ হাদীস, যা বুখারী ও মুসলিম উভয়েই লিপিবদ্ধ করেছেন। এরূপ বর্ণনাকে বিশেষজ্ঞগণ সাধারণত مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ মুত্তাফাকুন আলাইহি (সর্বসম্মত) নামে অভিহিত করে থাকেন।
• সহীহ হাদীস যা কেবল ইমাম বুখারী সঙ্কলন করেছেন।
• সহীহ হাদীস যা কেবল ইমাম মুসলিম সঙ্কলন করেছেন।
• সহীহ হাদীস যা বুখারী ও মুসলিমের মানদণ্ড অনুযায়ী অন্যান্য লেখকবৃন্দ সঙ্কলন করেছেন।
• সহীহ হাদীস যা কেবল বুখারীর মানদণ্ড অনুযায়ী অন্যান্য লেখকবৃন্দ সঙ্কলন করেছেন।
• সহীহ হাদীস যা কেবল মুসলিমের মানদণ্ড অনুযায়ী অন্যান্য লেখকবৃন্দ সঙ্কলন করেছেন।
• সহীহ হাদীস, তবে তা বুখারী ও মুসলিমের মানদণ্ড অনুযায়ী সঙ্কলন করা হয়নি।

টিকাঃ
[৬] আল মু-ক্কিযাহ, পৃ, ২৪।
[৭] এন ইন্ট্রোডাকশন টু দ্যা সায়েন্স অব
[৮] সুনানু আবী দাউদ, কিতাবুত তাহারাহ, বাবু মা জা আ ফিস সিওয়াক।
[৯] এই মর্মে সহীহ বুখারীর কিতাবুল জুমু'আহ, বাবি সিওয়াকি ইয়াওমিল জুমু'আহ তে ৩টি বর্ণনা ও সহীহ মুসলিমের কিতাবুত তাহারাহ, বাবু রয়েছে।
[১০] দ্যা সায়েন্স অব অথেনটিকেটিং দ্যা পৃ, ৩৮।
[১১] দ্যা সায়েন্স অব অথেনটিকেটিং দ্যা প্রে পৃ, ৩৯-৪০।

📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 হাসান হাদীস

📄 হাসান হাদীস


'হাসান' শব্দটির আভিধানিক অর্থ 'সুন্দর; ন্যায়সঙ্গত; ভালো'। তবে হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা অনুযায়ী হাসান দ্বারা এমন হাদীসকে বুঝানো হয় যার অবস্থান সহীহ ও দ'ঈফ এর মাঝামাঝি পর্যায়ে। ইমাম তিরমিযী (রহ.) সর্বপ্রথম এ পরিভাষাটিকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ব্যবহার করেছেন। তিনি হাসান হাদীসের সংজ্ঞায় লিখেছেন, এটি এমন এক ধরনের হাদীস যার বর্ণনাসূত্রে মিথ্যাবাদিতার সন্দেহে অভিযুক্ত কোনো বর্ণনাকারী নেই এবং যা বিশুদ্ধতর পাঠের সাথে সাংঘর্ষিকও নয়; অধিকন্তু একই রকম শক্তিশালী একাধিক বর্ণনাসূত্রের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে। এ সংজ্ঞাটি অত্যন্ত সরল যার ফলে সহীহ লি গাইরিহী (যা অন্যান্য বর্ণনা দ্বারা সমর্থিত হওয়ার সুবাদে সহীহ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে) প্রকৃতির হাদীসও তার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে পারে। কিংবা এর মাধ্যমে হাসান লি গাইরিহী (যা অন্যান্য বর্ণনা দ্বারা সমর্থিত হওয়ার সুবাদে হাসান পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে) প্রকৃতির হাদীসের একটি দিককে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে।

তবে হাসান শ্রেণীর হাদীসের সবচেয়ে উত্তম সংজ্ঞা প্রদান করেছেন ইমাম ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.)। তার মতে হাসান হাদীস দ্বারা মূলত এমন হাদীসকে বুঝায় যা বিশুদ্ধ বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন বর্ণনাসূত্রে বর্ণিত হয়েছে এবং যা কোনো গোপন দোষত্রুটি কিংবা বিশুদ্ধতর পাঠের সাথে সংঘর্ষ থেকে মুক্ত। তবে এতে এক বা একাধিক এমন বর্ণনাকারী থাকে যাদের নির্ভুলতা একটু নিম্ন পর্যায়ের। এ ধরনের হাদীসকে হাসান লি যাতিহী (নিজ গুণেই হাসান)। [১২] অন্য কথায় দবত (নির্ভুলতা) ব্যতীত সহীহ হাদীসের অন্যান্য শর্তাবলী পূরণ হলে সংশ্লিষ্ট হাদীসকে হাসান হিসেবে গণ্য করা হয়। কোনো বর্ণনাকারীর স্মৃতিশক্তি মধ্যম মানের (সাদূক) হলে, (অর্থাৎ তার ব্যাপারে যদি এটুকু জানা যায় যে, তিনি মাত্র অল্প কয়েকটি ভুল করেছেন) হাদীসটিকে সহীহ স্তর থেকে নামিয়ে হাসান স্তরে নিয়ে আসা হয়। প্রথম দিকে বুখারীর অন্যতম শিক্ষক ইবনু খুযাইমা'র ন্যায় কতিপয় বিশেষজ্ঞ সহীহ হাদীস ও হাসান হাদীসের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেননি। ইবনু হিব্বান ও হাকিমও একই নীতি অনুসরণ করেছেন।

ইমাম তিরমিযীর সুনান গ্রন্থ থেকে একটি হাসান হাদীসের দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলোঃ حدثنا قتيبة حدثنا جعفر بن سليمان الضبعي عن ابي عمران الجونى عن ابي بكر بن ابي موسى الاشعري قال سمعت ابى بحضرة العدو يقول قال رسول الله صلى الله عليه و سلم ان ابواب الجنة تحت ظلال السيوف ... قال ابو عيسى هذا حدیث حسن غریب
কুতাইবাহ আমাদেরকে অবহিত করেছেন যে জা'ফর ইবনু সুলাইমান দুবায়ী আবু ইমরান জাওনীর উদ্ধৃতি দিয়ে আবু বাক্ ইবনু আবী মূসা আশআরীর একটি বক্তব্য তাদের নিকট উল্লেখ করেছেন যেখানে তিনি বলেন, 'আমরা শত্রুর মুখোমুখি হলে আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি যে, নাবী বলেছেন, "নিঃসন্দেহে জান্নাতের অবস্থান হলো তরবারির ছায়াতলে।” ... আবু ঈসা (তিরমিযী) বলেন, 'এটি একটি হাসান ও গরীব হাদীস। [১৩]

এ হাদীসটিকে হাসান হিসেবে গণ্য করার কারণ হলো, উক্ত হাদীসের জা'ফর ইবনু সুলাইমান একজন সাদৃক (অপেক্ষাকৃত কম নির্ভুল তবে চলনসই) পর্যায়ের বর্ণনাকারী, পক্ষান্তরে অন্যান্য বর্ণনাকারীদের সকলেই সিকাহ (চূড়ান্ত নির্ভরযোগ্য) পর্যায়ভুক্ত। [১৪] হাদীসের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সর্বদা সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয় সর্বাপেক্ষা দুর্বল বর্ণনাকারীর মর্যাদার ভিত্তিতে। এটি একটি হাসান লি যাতিহী হাদীস।

তবে উক্ত পাঠের তিনটি বর্ণনা সহীহ বুখারীতে ও দু'টি বর্ণনা সহীহ মুসলিম গ্রন্থে উদ্ধৃত হওয়ায় এটিকে পুনরায় সহীহ লি গাইরিহী পর্যায়ভুক্ত করা হয়েছে। সহীহ আল বুখারীতে উল্লিখিত নিম্নোক্ত হাদীসটি উপরোক্ত হাদীসের বিষয়বস্তুর সমর্থকঃ حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُحَمَّدٍ حَدَّثَنَا مُعَاوِيَةُ بْنُ عَمْرٍو حَدَّثَنَا أَبُو إِسْحَاقَ عَنْ مُوسَى بْنِ عُقْبَةَ عَنْ سَالِمٍ أَبِي النَّضْرِ مَوْلَى عُمَرَ بْنِ عُبَيْدِ اللَّهِ وَ كَانَ كَاتِبَهُ قَالَ كَتَبَ إِلَيْهِ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ أَبِي أَوْفَى رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ” وَاعْلَمُوا أَنَّ الْجَنَّةَ تَحْتَ ظِلَالِ السُّيُوفِ “
আব্দুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ আমাদেরকে অবহিত করেছেন যে, মুয়াবিয়া ইবনু আমর তাদেরকে আবু ইসহাক, মুসা ইবনু উকবাহ ও উমার ইবনু উবাইদুল্লা'র আযাদকৃত গোলাম ও লেখক সালিম ইবনু নাদরের উদ্ধৃতি দিয়ে অবহিত করেছেন যে, তিনি বলেছেন আব্দুল্লাহ ইবনু আবী আওফা তার নিকট এই মর্মে একটি চিঠি লিখেছেন যে, আল্লাহর রাসূল বলেছেন, “জেনে রেখো, জান্নাত হলো তরবারির ছায়াতলে।” [১৫]

স্তরবিন্যাস
সহীহ হাদীসের ক্ষেত্রে যেভাবে কিছু কিছু বর্ণনাসূত্রকে সর্বাধিক শক্তিশালী মনে করা হয়, তেমনিভাবে নিম্নোক্ত দু'টি বর্ণনাসূত্রকেও হাসান হাদীসের ক্ষেত্রে সর্বাধিক শক্তিশালী মনে করা হয়ঃ • বাহজ ইবনু হাকিম তার পিতা থেকে, তিনি তার পিতামহ থেকে। • আমর ইবনু শুয়াইব তার পিতা থেকে, তিনি তার পিতামহ থেকে।

কোনো হাদীসকে হাসান কিংবা দ'ঈফ হিসেবে গণ্য করার ক্ষেত্রে বিতর্ক দেখা দিলে, তাকে নিম্ন মানের হাদীস হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেমন হারিছ ইবনু আব্দুল্লাহ, আসিম ইবনু দামরাহ, হাজ্জাজ ইবনু আরাত প্রমুখ। [১৬]

পরিভাষা
কোনো একটি হাদীস বুঝাতে হাদীস বিশেষজ্ঞগণ যখন صحيح الاسناد সহীহ আল ইসনাদ (প্রামাণ্য বর্ণনাসূত্র সমৃদ্ধ) শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করেন, তখন এর দ্বারা তারা একটি সূক্ষ ইঙ্গিত প্রদান করেন; আর তা হলো, উক্ত হাদীসটি সহীহ হাদীসের তুলনায় একটু নিম্ন পর্যায়ের। অর্থাৎ, সম্ভবত এটি একটি হাসান হাদীস। পক্ষান্তরে, তারা যখন حسن الاسناد হাসানুল ইসনাদ (হাসান বর্ণনাসূত্র সমৃদ্ধ) শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করেন, তখন তার মানে দাঁড়ায় যে, এটি একটি দ'ঈফ হাদীস। এ ধরনের শ্রেণীবিন্যাসের কারণ হলো, প্রথম তিনটি শর্তের (১. আদল, ২. ইত্তিসালুস সানাদ ও ৩. দবত) দিক দিয়ে একটি বর্ণনাসূত্র সহীহ কিংবা হাসান হওয়া সত্ত্বেও তাতে কিছু গোপন ত্রুটি থাকতে পারে কিংবা তা কোনো উন্নততর পাঠের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

ইমাম তিরমিযী তার সুনান গ্রন্থে বিভিন্ন হাদীসের ক্ষেত্রে প্রায়শ حسن صحيح হাসান সহীহ ধরনের দ্ব্যর্থক শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছেন। ইবনু হাজার ও সুয়ূতীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী এ শব্দগুচ্ছের অর্থ নিম্নের দু'টির যে কোনো একটি হতে পারেঃ • এটি এমন একটি হাদীস যার দুই বা ততোধিক বর্ণনাসূত্রের একটি হাসান ও বাকীগুলো সহীহ। অন্য কথায়, এটি একটি সহীহ লি গাইরিহী প্রকৃতির হাদীস। * এটি একক বর্ণনাসূত্র সমৃদ্ধ এমন একটি হাদীস যা কতিপয় বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিতে সহীহ, পক্ষান্তরে অন্যদের দৃষ্টিতে তা হাসান; আর ইমাম তিরমিযী সেসব মতের একটিকে অপরটির উপর প্রাধান্য দিতে নারাজ।

ইমাম বাগাওয়ী (রহ.) তার মাসাবীহুস সুন্নাহ গ্রন্থে সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম গ্রন্থে প্রাপ্ত হাদীসসমূহকে সহীহ শ্রেণীভুক্ত করেছেন, অন্যদিকে তিনি সুনান গ্রন্থের হাদীসসমূহকে হাসান শ্রেণীভুক্ত করেছেন। তবে হাদীস বিশেষজ্ঞগণ তার এই শ্রেণীবিন্যাসকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, কারণ সুনান গ্রন্থের হাদীসসমূহ হলো সহীহ, হাসান, দ'ঈফ ও মওদূ' হাদীসের মিশ্রণ।

হাসান হাদীসের সঙ্কলন
কোনো সুনির্দিষ্ট গ্রন্থে সকল হাসান হাদীসকে স্বতন্ত্রভাবে সঙ্কলিত করা হয়নি। তবে এই স্তরের হাদীসসমূহ সকল সুনান গ্রন্থেই পাওয়া যায়। সুনানু আবী দাউদ গ্রন্থে গ্রন্থকার উল্লেখ করেছেন যে, তিনি সহীহ, দ'ঈফ এবং এগুলোর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বর্ণনাসমূহকে স্পষ্টভাবে সনাক্ত করে দিয়েছেন। তবে যেসব হাদীসের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য উল্লেখ করা হয়নি, তার মূল্যায়ন অনুযায়ী সেগুলো হাসান হাদীস। [১৭]

হাসান লি গাইরিহী হাদীস
বর্ণনাকারীদের এক বা একাধিক ব্যক্তি নিম্ন স্তরের (অর্থাৎ ৫ম কিংবা ৬ষ্ঠ স্তরের) অন্তর্ভুক্ত হলে, অর্থাৎ দুশ্চরিত্র কিংবা মিথ্যাবাদিতার জন্য নয়, বরং বর্ণনাকারীর দুর্বল স্মৃতিশক্তির কারণে হাদীসে দুর্বলতা দেখা দিলে এবং উক্ত হাদীসের সমর্থনে অন্য হাদীস পাওয়া গেলে- তাকে পুনরায় হাসান লি গাইরিহী শ্রেণীভুক্ত করা হয়।

পুনরায় উল্লেখ্য যে, কোনো বর্ণনাসূত্রের সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে তার দুর্বলতম বর্ণনাসূত্রের ওপর। ফলে, বর্ণনাকারীদের সকলেই উচ্চ মানের নির্ভরযোগ্য (সিকাহ) হওয়া সত্ত্বেও বর্ণনাসূত্রের কোনো এক স্তরে একজন বর্ণনাকারী মিথ্যুক (কায্যাব) শ্রেণীভুক্ত হলে, হাদীসটিকে জাল শ্রেণীভুক্ত করা হয়, যদিও তা অন্যান্য ইসনাদ দ্বারা নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত হয়।

সুনানুত তিরমিযীতে উল্লিখিত নিম্নোক্ত হাদীসটি হাসান লি গাইরিহী প্রকৃতির হাদীসের একটি নমুনাঃ

حدثنا محمد بن بشار حدثنا يحيى بن سعيد و عبد الرحمن بن مهدی و محمد بن جعفر قالوا حدثنا شعبة عن عاصم بن عبيد الله قال سمعت عبد الله بن عامر بن ربيعة عن ابيه ان امراة من بنى فزارة تززجت على تعلين فقال رسول الله صلى الله عليه و سلم ارضيت من نفسك و مالك بنعلين قالت نعم قال فاجازه
মুহাম্মাদ ইবনু বাশার আমাদেরকে অবহিত করেছেন যে, ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ ও আব্দুর রহমান ইবনু মাহদী ও মুহাম্মাদ ইবনু জা'ফর বলেছেন, আছিম ইবনু উবাইদুল্লাহর উদ্ধৃতি দিয়ে শু'বাহ আমাদেরকে জানিয়েছেন যে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু আমির ইবনু রাবীয়াহকে তার পিতার উদ্ধৃতি দিয়ে এ কথা বলতে শুনেছেন যে, ফাযারাহ গোত্রের এক মহিলার বিয়ে হয়েছিল যেখানে দেনমোহর ছিল এক জোড়া জুতো। আল্লাহর রাসূল জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি নিজের সত্ত্বা ও সম্পদের ব্যাপারে এক জোড়া জুতো নিয়ে সন্তুষ্ট?' সে জবাব দিল, 'হ্যাঁ'। তখন নাবী ﷺ এ বিয়ের অনুমতি দিলেন।[১৮]

ইয়াহইয়া ইবনু মুঈন ও আহমদ ইবনু হাম্বল আছিম ইবনু উবাইদুল্লাহকে দ'ঈফ শ্রেণীভুক্ত করেছেন, আর বুখারীর দৃষ্টিতে তিনি একজন মুনকার। তবে, ইমাম তিরমিযী আরও বলেন, এ বিষয়ে উমার, আবু হুরাইরা, সাহল ইব্‌ন্ সা'দ, আবু সা'ঈদ, আয়েশা, জাবির, আবু হাদরাদ আল আসলামি কর্তৃক বর্ণিত আরও কয়েকটি হাদিস রয়েছে। তাই আমের ইব্‌ন্ রাবি 'আহর বর্ণনাটি হাসান সাহীহ।

হাসান হাদীসের আইনগত মর্যাদা
ইসলামী আইনশাস্ত্রে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে হাসান হাদীস ব্যবহার করা যায়। সহীহ হাদীস দ্বারা রহিত না হলে হাসান হাদীস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কোনো সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়। এ দিক থেকে হাসান শ্রেণীর হাদীস সহীহ হাদীস থেকে ভিন্ন কিছু নয়। উভয় প্রকৃতির হাদীসেই রয়েছে আল্লাহর রাসূল ﷺ থেকে প্রামাণ্য সূত্রে বর্ণিত দিকনির্দেশনা। আর নাবী ﷺ যখন কোনো বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করেন, তখন তা অবশ্য পালনীয়; এবং তার পরামর্শসমূহও অন্য যে কারো পরামর্শের চেয়ে অনেক উত্তম।

টিকাঃ
[১২] দ্যা সায়েন্স অব অথেনটিকেটিং দ্যা প্রফেট'স ট্রাডিশান্স, পৃ, ৪৭-৮।
[১৩] সুনানুত তিরমিযী, নং ১৫৮৩ (সিডি), কিতাবু ফাদাইলিল জিহাদ, বাবুল জান্নাতি তাহতা...। হাদীসের পূর্ণাঙ্গ পাঠটি নিম্নরূপঃ عن أبي بكر بن أبي موسى الاشعرى قال سمعت ل قال رسول الله صلى الله عليه و سلم ان ابواب الجنة تحت ظلال السيوف فقال رجل من القوم رث الهيئة الانت سمعت هذا من رسول الله صلى الله عليه وسلم يذكره قال نعم فرجع الى اصحابه فقال اقرا عليكم السلام و كسر جفن سيفه فضرب به حتى قتل
[১৪] দ্যা সায়েন্স অব অথেনটিকেটিং দ্যা প্রফেট'স ট্রাডিশান্স, পৃ, ৪৯।
[১৫] সহীহ বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, বাবুল জান্নাতি তাহতাস সুয়ূফ ও সহীহ মুসলিম, বাবু কারাহিয়্যাতি তামান্নি লিকাইল আদুও।
[১৬] দ্যা সায়েন্স অব অথেনটিকেটিং দ্যা পৃ, ৪৯-৫০।
[১৭] দ্যা সায়েন্স অব অথেনটিকেটিং দ্যা প্রজেক্টস, পৃ, ৫০-৩।
[১৮] সুনানুত তিরমিযী, অধ্যায়, আন নিকাহ।'আ ফী মুহরিন নিসা।

📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 দ‘ঈফ হাদীস

📄 দ‘ঈফ হাদীস


ভাষাতত্ত্বের বিচারে দ'ঈফ শব্দের অর্থ 'দুর্বল'। তবে হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষায় দ'ঈফ দ্বারা এমন বর্ণনাকে বুঝানো হয় যার মান হাসান হাদীসের নীচে। এটি এমন এক ধরনের হাদীস যেখানে ছিহাহ (বিশুদ্ধতা) এর পাঁচটি শর্তের এক বা একাধিক শর্ত অনুপস্থিত। বাইকূনী উলূমুল হাদীসের ওপর লিখিত কাব্যের এক জায়গায় দ'ঈফ হাদীসকেও একইভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেনঃ
و كل ما عن رتبة الحسن قصر * فهو الضعيف و هو اقسام كثر
যে হাদীসের মান হাসানের নীচে তা-ই দ'ঈফ। তবে দ'ঈফ হাদীসের অনেক প্রকার রয়েছে।

ইমাম তিরমিযী কর্তৃক সংগৃহীত নিম্নোক্ত হাদীসে দ'ঈফ হাদীসের একটি নমুনা খুঁজে পাওয়া যাবেঃ
حدثنا بندار حدثنا يحيى بن سعيد و عبد الرحمن بن مهدی و بهز بن اسد قالوا حدثنا حماد بن سلمة عن حكيم الأثرم عن ابى تميمة الهجيمي عن ابي هريرة عن النبي صلى الله عليه وسلم قال من اتى حائضا او امراة في دبرها أو كاهنا فقد كفر بما انزل على محمد صلى الله عليه و سلم قال ابو عيسى لا نعرف هذا الحديث الا من حديث حكيم الأثرم عن ابى تميمة الهجيمي عن ابي هريرة
বুন্দার আমাদেরকে অবহিত করেছেন যে, ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ, আব্দুর রহমান ইবনু মাহদী ও বাহয ইবনু আসাদ বলেছেন যে, হাম্মাদ ইবনু সালামাহ তাদের নিকট হাকীম আছরাম, তামীমাহ হুজাইমী ও আবু হুরায়রার উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেছেন যে, নাবী বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঋতুবতী নারীর সাথে কিংবা কোনো নারীর পশ্চাদ্দেশ দিয়ে সহবাস করে কিংবা কোনো গণকের দ্বারস্থ হয়, সে মুহাম্মাদ-এর ওপর নাযিলকৃত বিষয়ের প্রতি অবিশ্বাস স্থাপন করেছে।”

আবু ঈসা বলেন, হাকীম আছরাম, তামীমাহ হুজাইমী ও আবু হুরায়রার উদ্ধৃতি ব্যতীত অন্য কোনো বর্ণনাসূত্রের মাধ্যমে আমরা এ হাদীসটি জানতে পারি না। বিশেষজ্ঞগণ হাকীম আছরামকে দুর্বল শ্রেণীভুক্ত করেছেন, আর ইবনু হাযার আসকালানী তাক্বরীবুত তাহযীব গ্রন্থে তাকে লাইয়িন আখ্যায়িত করেছেন।

দ'ঈফ হাদীসের স্তরবিন্যাস
বর্ণনাসূত্র বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া কিংবা বর্ণনাকারীদের মধ্যে প্রাপ্ত ত্রুটি থেকে উদ্ভূত দুর্বলতার তীব্রতা অনুযায়ী হাদীসের দুর্বলতা বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। সবচেয়ে দুর্বল বর্ণনাসূত্রের প্রেক্ষিতে একে মাওদূ' বা জাল বর্ণনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ইমাম হাকিম তার মা'রিফাতু উলূমিল হাদীস গ্রন্থে কিছু দুর্বলতম বর্ণনার বিষয়ে আলোকপাত করেছেন যা বেশ কিছু অঞ্চল ও কতিপয় সাহাবীর নামে চালিয়ে দেয়া হয়েছিল। দৃষ্টান্তস্বরূপ তিনি বলেছেন যে, আবু বাক্র্ সিদ্দীকের সাথে 'ইবনু মূসা দাক্বীক্বী ফারাদ সুবখী থেকে, তিনি মুররাহাত তাইয়িব থেকে এবং তিনি আবু বাক্ থেকে'- মর্মে যে বর্ণনাসূত্রটি প্রচলিত আছে তা হলো সর্বাপেক্ষা দুর্বল। তিনি আরো বলেছেন যে, সিরিয়াবাসীদের নামে যেসব বর্ণনাসূত্র রয়েছে সেগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা দুর্বল বর্ণনাসূত্রটি হলো-'মুহাম্মাদ ইবনু কায়স মাসলুব উবাইদুল্লাহ ইবনু যাহরাহ থেকে, তিনি আলী ইবনু ইয়াযীদ থেকে, তিনি কাসিম থেকে এবং তিনি আবু উমামাহ থেকে'।
দ'ঈফ হাদীসের আইনগত মর্যাদা
দ'ঈফ হাদীসের ব্যবহার নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। দ্বীন ও আইনগত বিধি-বিধান (হালাল ও হারাম)-এর সাথে সংশ্লিষ্ট না হলে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ ভালো কাজের ক্ষেত্রে দ'ঈফ হাদীস গ্রহণ করার অনুমোদন দিয়েছেন; তবে এ ক্ষেত্রে ইমাম ইবনু হাযার আসকালানী তিনটি শর্ত নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
* মিথ্যুক বা জাল বর্ণনাকারী রয়েছে— হাদীসটি এ পর্যায়ের মাত্রাতিরিক্ত দুর্বল হতে পারবে না।
* হাদীসটি নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে (বিশেষজ্ঞদের দ্বারা) স্বীকৃত হতে হবে।
* কেউ এটা মনে করতে পারবে না যে, গ্রহণের কারণে হাদীসটির শক্তি (তথা বিশুদ্ধতা) সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে।
সুফিয়ান সাওরী, আব্দুর রহমান ইবনু মাহদী ও আহমদ ইবনু হাম্বল (রহ.) প্রমুখ দুর্বল বর্ণনা ব্যবহার করতেন। বস্তুত, ইমাম আহমদ কিয়াসের উপর দুর্বল বর্ণনার ব্যবহারকে প্রাধান্য দিতেন।
প্রাচীন অনেক গ্রন্থে দ'ঈফ হাদীসকে আল হাদীসুল মারদুদ (প্রত্যাখ্যাত বর্ণনা) হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। দ'ঈফ হাদীস দ্বারা এমন হাদীসকে বুঝানো হয়, গ্রহণযোগ্যতার এক বা একাধিক শর্ত পূরণ না হওয়ার কারণে যে বর্ণনার সত্যতা চরম সংশয়পূর্ণ হয়ে ওঠেছে। অন্যান্য সহীহ হাদীস দ্বারা সমর্থিত হওয়ার কারণে কিছু দ'ঈফ হাদীসকে অন্য হাদীসের শ্রেণীভুক্ত করা গেলেও কিছু কিছু দ'ঈফ হাদীস সম্পূর্ণই প্রত্যাখ্যাত। গ্রহণযোগ্যতার সে শর্ত পূরণ না হওয়ার প্রেক্ষিতে দ'ঈফ হাদীসসমূহকে আরো কয়েকটি উপভাগে বিভক্ত করা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00