📄 ইসনাদের ধরন
ইসনাদের ক্ষেত্রে সাধারণত যে পদ্ধতিটি ব্যবহৃত হয় তা হলো, ইসনাদের যতই নীচের দিকে যাওয়া হবে, বর্ণনাকারীদের সংখ্যাও ততই বাড়তে থাকবে। যেমন, গবেষণায় দেখা যায় যে মদীনা, সিরিয়া ও ইরাক, এই তিন অঞ্চলে বসবাসরত দশজন সাহাবী উপরোক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। অন্যতম সাহাবী আবু হুরায়রার সাতজন ছাত্র ছিল যারা কেবল তার নিকট থেকে উক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তাদের চারজন মদীনায়, দু'জন মিশরে এবং একজন ইয়েমেনে বসবাস করতেন। এ সাতজন ছাত্র আবার তাদের ১২ জন ছাত্রের নিকট উক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন যাদের পাঁচজন মদীনায়, দু'জন মক্কায় এবং একজন করে সিরিয়া, কুফা, তায়েফ, মিশর ও ইয়েমেনে বসবাস করতেন। তৃতীয় প্রজন্মের যেসব ব্যক্তি উপরোক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন তাদের সর্বমোট সংখ্যা হলো ছাব্বিশ, যারা দশটি ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় বসবাস করতেন; এলাকাসমূহ হলো মদীনা, মক্কা, মিশর, হিমস, ইয়েমেন, কুফা, সিরিয়া, ওয়াসিত ও তায়েফ। অধিকন্তু, উক্ত হাদীসটি কার্যত একই শব্দ বা অর্থ সহকারে উপরোক্ত দশটি অঞ্চলের সর্বত্রই পাওয়া যায়। [১৩]
حدثنا نصر بن على الجهضمي و حامد بن عمر البكراوى قالا حدثنا بشر بن المفضل عن خالد عن عبد الله بن شقيق عن أبي هريرة أن النبي صلى الله عليه و سلم قال اذا استيقظ احدكم من نومه فلا يغمس يده في الاناء حتى يغسلها ثلاثا فانه لا يدری این باتت یده
নাসর ইবনু আলী জাহদামী ও হাম্মাদ ইবনু উমার বাকরাবী আমাদেরকে এ মর্মে অবহিত করেছেন, বিশর ইবনুল মুফাদ্দাল খালিদ থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু শাকীক থেকে এবং তিনি আবু হুরায়রা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নাবী মুহাম্মাদ বলেছেন, "ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর তোমাদের কেউ যেন তিনবার হাত না ধুয়ে কোনো পাত্রে হাত না দেয়, কারণ সে জানে না ঘুমের মধ্যে তার হাত কোথায় ছিল।” [১৪]
আবু হুরায়রার কমপক্ষে ১৩ জন ছাত্র তার নিকট থেকে উক্ত হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাদের মধ্যে ৮ জন মদীনায়, ১ জন কুফায়, ২ জন বসরায়, ১ জন ইয়েমেনে ও ১ জন সিরিয়ায় বসবাস করতেন।
ষোলজন বিশেষজ্ঞ উক্ত হাদীসটি আবু হুরায়রার ছাত্রদের নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন। তাদের মধ্যে ৬ জন মদীনায়, ৪ জন বসরায়, ২ জন ইরাকের কুফায় এবং মক্কা, ইয়েমেন, ইরানের খোরাসান ও সিরিয়ার হিমসে একজন করে বসবাস করতেন। হাদীসটির বর্ণনাকারীদের সম্পূর্ণ চিত্র দেখুন পরিশিষ্ট ৩-এ।
টিকাঃ
[১৩] স্টাডিজ ইন হাদীস মেথডলজি, পৃ, ৩৫-৬।
[১৪] সহীহ বুখারী, খণ্ড ১, পৃ, ১১৪, নং ১৬৩ ও সহীহ মুসলিম, খণ্ড ১, পৃ, ১৬৬, নং ৫৪১। উপরোক্ত হাদীসের শব্দাবলী নেয়া হয়েছে সহীহ মুসলিম থেকে।
📄 ইসনাদ পদ্ধতির উৎস
জ্ঞানের সকল শাখাতেই এমন কিছু বৈশিষ্ট্যের বিকাশ ঘটে যা তার প্রকৃতি, বিষয়বস্তু ও ঐ শাখার উৎকর্ষ সাধনে তৎপর ব্যক্তিবর্গের বৈশিষ্ট্য এবং যে বিশেষ সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে জ্ঞানের ঐ শাখার উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটেছে, তার সাথেই প্রযোজ্য। হাদীস শাস্ত্রও এ নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম নয়।[১৫] প্রাক ইসলামী যুগের কাব্য বর্ণনার ক্ষেত্রেও ইসনাদ পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো।[১৬] তবে হাদীস শাস্ত্রে এর ব্যবহার হয়েছে সর্বোচ্চ পরিমাণে; এখানে ইসনাদকে স্বয়ং দ্বীনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করা হয়। ইমাম বুখারীর অন্যতম শিক্ষক আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (মৃত্যু ১৮১ হি.) বলেন, 'ইসনাদ দ্বীনের একটি অংশ। ইসনাদ না থাকলে যার যা ইচ্ছা তা-ই বলতে পারতো।'[১৭] ইসনাদ বিজ্ঞান পূর্ণরূপে বিকাশ লাভ করে প্রথম শতাব্দীর শেষ দিকে। তাবি'ঈ ইবনু সীরিন (মৃত্যু ১১০ হি.) বলেন,
'শুরুতে তারা ইসনাদ জানতে চাইতেন না। তবে ফিতনাহ শুরু হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে তারা ইসনাদ জিজ্ঞেস করে যাচাই করে নিতেন, 'এ হাদীস তুমি যার কাছে শুনেছ তার নাম আমাদেরকে বলো'। আহলুস সুন্নাহর (সুন্নাহর অনুসারীদের) বর্ণনাসমূহ গ্রহণ করা হবে, আর আহলুল বিদআহর (বিদআতের অনুসারীদের) বর্ণনাসমূহ হবে প্রত্যাখ্যাত।।১৮।
অর্থাৎ ফিতনাহ শুরু হওয়ার আগে ইসনাদের ব্যবহার হতো কদাচিৎ, তবে ফিতনাহ শুরু হয়ে যাওয়ার পর তারা সতর্ক হয়ে যান।
ইসলামে ইসনাদ পদ্ধতির তাৎপর্যকে খাটো করার লক্ষ্যে প্রাচ্যবাদী পণ্ডিতবর্গ প্রাক ইসলামী যুগের অনারবদের গ্রন্থসমূহে ইসনাদ পদ্ধতির উৎস অনুসন্ধানের প্রয়াস চালিয়েছেন। যোসেফ হরোভিৎস ইহুদীদের সাহিত্যকর্ম থেকে বেশ কয়েকটি দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন, যেখানে দেখানো হয়েছে যে, আরবদের মধ্যে ইসনাদের ব্যবহার শুরু হওয়ার আগে ইহুদীদের মধ্যে ইসনাদের ব্যবহার ছিল। [১৯] তিনি মূসা (আঃ)-এর যুগেও এর ব্যবহার খোঁজার চেষ্টা করেছেন (এবং তার মতে) তালমুদের যুগে এসে এর বর্ণনা পরম্পরা বিরাট দীর্ঘ রূপ লাভ করে। ইসনাদ পদ্ধতি আসলেই মূসা (আঃ)-এর যুগ থেকেই প্রচলিত ছিল কি না, তাতে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে; কারণ এসব ইসনাদ যে পরবর্তী সময়ের সংযোজন নয় তা হরোভিৎস প্রমাণ করে দেখাননি। আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইসলামের বহু পূর্বেই ভারতীয়রা ইসনাদ পদ্ধতি ব্যবহার করেছিল। প্রাচীন হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন সাহিত্যে ইসনাদের কয়েকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। দৃষ্টান্তস্বরূপ, বিখ্যাত মহাকাব্য মহাভারতে বলা হয়েছে,
'এটি রচনা করেছেন ব্যাস, লিপিবদ্ধ করেছেন গণেশ আর (পাঠকের) হাতে তুলে দিয়েছেন বৈসাম্পায়ন যিনি রাজা জনমেজয়ের নিকট এই গ্রন্থ পৌঁছে দিয়েছেন। সৌতি (যিনি সে সময় উপস্থিত ছিলেন) তা শুনে ঋষিদের সমাবেশে বর্ণনা করেছেন'। [২০]
তবে ইসনাদের উৎপত্তি যেখানেই হোক না কে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, মুসলিমরা ইসনাদ পদ্ধতিকে গ্রহণ করে একে হাদীসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ধরে নিয়ে এটাকে একটি পূর্ণাঙ্গ শাস্ত্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। ক্রমধারা পদ্ধতি চালু, হাদীস বর্ণনাকারীদের জীবনচরিত সংগ্রহ এবং হাদীসের আভ্যন্তরীণ বিষয়বস্তুর মান ও বর্ণনাসূত্রের প্রামাণিকতা নির্ণয় সংক্রান্ত বিজ্ঞানের গোড়াপত্তনের মাধ্যমে মুসলিমরা ইসনাদ পদ্ধতিকে একটি দৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়েছে। যতদূর জানা যায়, প্রাচীন ভারতীয়রা কখনোই ইসনাদ পদ্ধতিকে কঠোরতার সাথে ধারাবাহিকভাবে ব্যবহার করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি; তারা ক্রমধারা পদ্ধতির বিকাশও সাধন করেনি।
একইভাবে ইহুদী সাহিত্যেও ক্রমধারা পদ্ধতির কোনো ব্যবহার হয়নি; ফলে তাদের ইসনাদ হয়ে পড়েছে মূল্যহীন। বস্তুত, প্রফেসর হরোভিৎস নিজেই স্বীকার করেছেন যে, 'তালমুদীয় সাহিত্যে ক্রমধারা পদ্ধতির কোনো ধারণা নেই এবং সর্বপ্রাচীন যে সাহিত্যকর্মে এরূপ বিন্যাসের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল তা ছিল ৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের রচনা, যা ছিল ইসনাদ সমালোচনা বিষয়ক সর্বপ্রাচীন ইসলামী গ্রন্থ রচিত হওয়ার একশ' বছর পরের কীর্তি'। এ তথ্যের প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, '(এ যুগের) গুরুত্বপূর্ণ ইহুদী সাহিত্যকর্মসমূহ রচিত হয়েছে মুসলিম রাজ্যগুলোতে; এ থেকে অনুমান করা যেতে পারে যে, (ইসনাদের ওপর ইহুদীদের) এই ঐতিহাসিক গুরুত্বারোপ ছিল মূলত ইসলামী প্রভাবের ফল।' [২১]
কেবল হাদীসের ক্ষেত্রে নয়; বরং হাদীস গ্রন্থাবলীর ক্ষেত্রেও ইসনাদ নির্ধারণ প্রথা বিভিন্ন গ্রন্থের বিশুদ্ধতা সংরক্ষণে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে—বিশেষত এমন এক যুগে যখন মুদ্রণশিল্পের কোনো অস্তিত্ব ছিল না এবং যে যুগে জাল ও বিকৃত গ্রন্থ রচনা করা ছিল তুলনামূলকভাবে সহজ কাজ। উৎস নির্ণয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ ও সুশৃঙ্খল পদ্ধতি ব্যবহারের দিক দিয়ে হাদীস শাস্ত্র যেমন অনুপম, ঠিক তেমনি (মুসলিম) বিশেষজ্ঞদের প্রত্যয়ন প্রথাটিও বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে অনন্য। গ্রীক, ল্যাটিন, হিব্রু ও সুরিয়ানী পাণ্ডুলিপিসমূহে কোনো গ্রন্থের উৎপত্তি ও ব্যবহার সম্বন্ধে এতো বিপুল পরিমাণ তথ্য (যদি আদৌ থাকে) একেবারে কদাচিৎ পরিলক্ষিত হয়।
ইসনাদ পদ্ধতি হাদীস শাস্ত্র থেকে উদ্ভূত হলেও সময়ের পরিক্রমায় আরব গ্রন্থকারগণ এ পদ্ধতিকে ভূগোল, ইতিহাস ও গদ্য সাহিত্যসহ জ্ঞানের অন্যান্য শাখায়ও এর প্রয়োগ করেছেন। [২২]
টিকাঃ
[১৫] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ৭৬।
[১৬] মাসাদিরুশ শি'রিল জা-হিলী, পৃ, ২৫৫-২৬৭ (স্টাডিজ ইন হাদীস মেথডলজি, পৃ, ৩২ গ্রন্থে উদ্ধৃত)।
[১৭] এ উক্তিটি ইমাম মুসলিম তার সহীহ মুসলিম (মুহাম্মাদ ফুয়াদ আব্দুল বাকী কর্তৃক পাঁচ খণ্ডে সম্পাদিত, কায়রো ১৩৭৪/১৯৫৫), [১:১৫] ও সহীহ মুসলিম বি শারহিন নাবাবী (৬ খণ্ডে বাঁধাইকৃত ১৮ খণ্ড, কায়রো, ১৩৪৯) [১:৮৭])।
[১৮] সহীহ মুসলিম বি শারহিন নাবাবী (ভূমিকা) অধ্যায়, ইসনাদ দ্বীনের অংশ, পৃ, ২৫৭ (মাকতাবাতু নাজার মুস্তাফা বাজ-রিয়াদ [প্রথম সংস্করণ]।
[১৯] মিশনা, দ্যা ফাদার্স, ৪৪৬।
[২০] মহাভারত, অধ্যায় ১, কান্ত ১; দেখুন উইনটেনিৎস, হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ান লিটারেচার (কলকাতা, ১৯২৭ সাল), ১, ৩২৩ [হাদীস লিটারেচার (আসিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল কর্তৃক প্রকাশিত)]।
[২১] আল্টার আন্ড আর্সপান্ডস ডেস ইসনাদ, পৃ, ৪৭। হাদীস লিটারেচার গ্রন্থে (পৃ, ৮১) উদ্ধৃত।
[২২] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ৮২-৩।