📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 সনদের ক্রমবিকাশ

📄 সনদের ক্রমবিকাশ


সুন্নাহ শিক্ষাদান, নাবী ﷺ-এর যুগ নাবী মুহাম্মাদ ﷺ যা কিছু বলেছেন বা করেছেন, তাকেই তাঁর সুন্নাহ মনে করা হয়; এতে রয়েছে আসমানী দিকনির্দেশনা অনুযায়ী ইসলামের বাস্তব প্রতিফলন।

নাবী ﷺ তাঁর সুন্নাহ শেখা ও মুখস্থ করার জন্য সাহাবীদেরকে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করতেন। কখনো কখনো তিনি সাহাবীদেরকে বসিয়ে কিছু দুআ পাঠ করাতেন, যা তিনি তাদেরকে মুখস্থ করাতে চাইতেন, ঠিক যেভাবে তিনি তাদেরকে কুরআন শেখাতেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি কোনো কথা তিনবার পুনরাবৃত্তি করতেন যাতে তারা তাঁর অধিকতর তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যসমূহ মুখস্থ করে নিতে পারেন। কখনো কখনো তিনি কিছু আনুষ্ঠানিকতা সম্পাদন করে তাদেরকে তা অনুকরণ করার নির্দেশ দিতেন, আবার কখনো তিনি অধিকতর জটিল বিষয়াবলী সাহাবীদেরকে দিয়ে লিপিবদ্ধ করাতেন।

📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 সাহাবীদের যুগ

📄 সাহাবীদের যুগ


নাবী ﷺ-এর ইন্তেকালের পর অপেক্ষাকৃত বয়স্ক সাহাবীরা তরুণ সাহাবীদেরকে নাবী ﷺ-এর বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মপদ্ধতি শেখাতে শুরু করেন, যা নবীনরা শুনতে কিংবা দেখতে পারেননি। প্রবীণ ও নবীন সাহাবীদের উভয় দলই সেসব লোককে শিক্ষা দান করতেন যারা নাবী ﷺ-এর জীবনের শেষ দিনগুলোতে ইসলাম গ্রহণ করায় সরাসরি তাঁর নিকট থেকে তেমন কিছু শেখার সুযোগ পাননি।

খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনামলে ইসলাম যখন সমগ্র আরব, সিরিয়া, ইরাক, পারস্য ও মিশরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সাহাবীরা ইসলামে নবদীক্ষিত লোকদেরকে দ্বীনের মৌলনীতিসমূহ শেখাতে থাকেন। তারা বলতেন, 'আমি নাবী ﷺ-কে এরূপ করতে দেখেছি,' কিংবা আমি নাবী ﷺ-কে এরূপ বলতে শুনেছি'। আর এভাবেই শুরু হয় সুন্নাহর বর্ণনাসূত্র। যেসব নবদীক্ষিত মুসলিম সাহাবীদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষা লাভ করেছেন, পরবর্তীতে তাদেরকে তাবিউন নামে অভিহিত করা হয়।

সাহাবীগণ নাবী ﷺ-এর যেসব বক্তব্যের উদ্ধৃতি প্রদান করতেন অধিকাংশ তাবি'ঈ তা মুখস্থ ও লিপিবদ্ধ করে নিতেন। সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সংখ্যক সাহাবীর নিকট থেকে নাবী ﷺ-এর সর্বোচ্চ পরিমাণ সুন্নাহ শেখার উদ্দেশ্যে তারা তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অংশে ভ্রমণ করতেন।

📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 কেন এই প্রয়াস?

📄 কেন এই প্রয়াস?


এটা খুবই স্বাভাবিক যে, মানুষ যাকে পছন্দ করে তাকে অনুকরণ করে, তার বক্তব্য ও কার্যাবলী স্মরণে রাখার চেষ্টা করে। আর এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, নাবী মুহাম্মাদ ছিলেন তাঁর অনুসারীদের নিকট পৃথিবীর প্রিয়তম ব্যক্তি। এটা ঈমানের অন্যতম শর্ত। স্বয়ং নাবী ﷺ এ প্রসঙ্গে বলেছেন,
“তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার সন্তান, পিতা-মাতা ও সকল মানুষ অপেক্ষা প্রিয়তর না হবো।” [৭]

কুরআনে আল্লাহ তা’আলা সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে নাবী ﷺ-এর সুন্নাহ’র প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করার জন্য তাগিদ দিয়েছেন। তাঁর সকল নির্দেশের আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেনঃ
« রাসূল তোমাদেরকে যা কিছু প্রদান করে, তোমরা তা গ্রহণ করো; আর যা কিছু তিনি তোমাদেরকে নিষেধ করে, তা বর্জন করো। » [সূরা আল হাশর (৫৯]: ৭]

নাবী ﷺ-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম জাতি কীভাবে ইসলাম পালন করবে? তিনি তাদের মধ্যে বিদ্যমান না থাকলে তারা কেমন করে জানবে যে, আল্লাহর রাসূল ﷺ তাদেরকে কোন বিষয়ের আদেশ দিয়েছেন এবং কোন বিষয়ে নিষেধ করেছেন? এ কারণে সুন্নাহ সংরক্ষণ করে মুসলিমদের পরবর্তী প্রজন্মের মানুষের নিকট তা পৌঁছে দেয়ার জন্য বিশেষ যত্ন নেয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। নাবী ﷺ-ও কোনো পরিবর্তন ছাড়া সুন্নাহ পৌঁছে দেয়ার ওপর অনেক গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি তাদেরকে এই বলে আল্লাহ তা’আলার রহমতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন,
"আল্লাহ তাকে বরকতময় করে দেবেন যে আমার কোনো বক্তব্য শুনে তা মুখস্থ করে ও অনুধাবন করে এবং তা হুবহু মানুষের নিকট পৌঁছে দেয়; কারণ এমনও হতে পারে যে, যার কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে তিনি (সরাসরি) হাদীস শ্রবণকারীর চেয়েও বেশী সমঝদার।”[৮]

যে ব্যক্তি তাঁর নামে মিথ্যা কথা প্রচার করবে তার জন্য ভয়ঙ্কর শাস্তির হুশিয়ারী উচ্চারণ করার মাধ্যমেও তিনি এ বিষয়টির ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন,
| “যে আমার নামে মিথ্যা কথা বলে সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা নির্ধারণ করে নেয়।”[৯]

টিকাঃ
[৭] সহীহ বুখারী, ১/১৪।
[৮] আবু দাউদ ৩/৩৬৫২, তিরমিযী। আল-আলবানী একে সাহীহ বলেছেন।
[৯] সাহীহ বুখারী ১/১০৭-১০৯, মুসলিম। দাউদ ৩/১০৩৬।

📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 তাবি‘ঈনদের যুগ

📄 তাবি‘ঈনদের যুগ


যখন সাহাবীগণ মৃত্যুবরণ করতে শুরু করলেন এবং ভারত, আফগানিস্তান, রাশিয়া, চীন, উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ল, তখন তাবি'ঈগণ সাহাবীদের রেখে যাওয়া কাজ হাতে তুলে নেন এবং নতুন ইসলাম গ্রহণকারী লোকদেরকে দ্বীনের মৌলনীতিসমূহ শেখানোর মহান কাজ শুরু করে দেন। তারা তাদের চারপাশে জড়ো হওয়া লোকদেরকে বলতেন, 'আমি অমুক সাহাবীকে বলতে শুনেছি যে, তিনি নাবী ﷺ-কে এ কাজ করতে দেখেছেন' কিংবা 'আমি অমুক অমুক সাহাবীকে বলতে শুনেছি যে, তিনি নাবী ﷺ-কে এ কথা বলতে শুনেছেন'। এ প্রক্রিয়ায় সুন্নাহ'র বর্ণনা পরম্পরায় দ্বিতীয় সংযোগটি যুক্ত হয়।

যারা তাবি'ঈদের তত্ত্বাবধানে অধ্যয়ন করেছেন পরবর্তীতে তাদেরকে আতবা'উত তাবি'ঈন (অনুসারীদের অনুসারী) নামে অভিহিত করা হয়। এসব নতুন ছাত্রদের অনেকে বিভিন্ন তাবি'ঈর নিকট অধ্যয়ন করার জন্য দিনের পর দিন (এমনকি মাসের পর মাস) ভ্রমণ করেছেন এবং স্ব স্ব শিক্ষকের বর্ণনাসমূহ লিপিবদ্ধ ও মুখস্থ করার ক্ষেত্রে বিশেষ যত্ন নিয়েছেন।

আতবা'উত তাবি'ঈনদের যুগের মাত্র অল্প কয়েকটি গ্রন্থ আমাদের নিকট পৌঁছেছে। এগুলোর মধ্যে সর্বাধিক বিখ্যাত গ্রন্থটি হলো ইমাম মালিকের আল মুয়াত্তা; আর মুয়াত্তার সর্বাধিক খ্যাতনামা কপিটি বর্ণনা করেছেন তার ছাত্র মাসমুদাহ অঞ্চলের বারবার গোত্রের ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া।

ইয়াহইয়া কর্তৃক বর্ণিত মুয়াত্তার দ্বিতীয় খণ্ডে দাব্ব (টিকটিকি) সংক্রান্ত অধ্যায়ে আমরা নিম্নোক্ত হাদীসটি দেখতে পাই,
“মালিক আমাকে বলেছেন যে, তিনি ইবনু শিহাব থেকে, ইবনু শিহাব আবু উমামাহ ইবনু সাহল (ইবনু হুরাইফ) থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস থেকে, তিনি খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি নাবী -এর সাথে তাঁর স্ত্রী মাইমুনাহ -এর ঘরে গেলেন। সেখানে তাঁর সামনে (খাবারের জন্য) একটি ভুনা দাব্ব আনা হলো; এর একটি অংশ খাওয়ার জন্য আল্লাহর রাসূল নিজের হাত বাড়ালেন। মাইমুনাহ'র সাথে থাকা কয়েকজন মহিলা বললেন, 'আল্লাহর রাসূল কী খেতে যাচ্ছেন, তা তাঁকে অবহিত করো।' যখন তাঁকে জানানো হলো যে, এটি একটি দাব্ব; তখন তিনি তাঁর হাত গুটিয়ে নিলেন। (খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ) জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, এটি কি হারাম?' তিনি জবাব দিলেন, 'না, তবে এটি আমার জনগোষ্ঠীর এলাকায় নেই এবং এর প্রতি আমার অনীহা রয়েছে।' তারপর খালিদ বলেন, 'আমি তখন নাবী -এর চোখের সামনেই এর একটি টুকরো ছিঁড়ে নিয়ে পুরোটাই খেয়ে ফেলি।[১০]

এ হাদীসের সানাদ (বর্ণনা পরম্পরা) নিম্নরূপ

নবিজি খালিদ সাহাবি

ইবন 'আব্বাস সাহাবি

আবু উমামাহ সাহাবি

ইবন শিহাব তাবি'ঊন

মালিক আতাবা'উত-তাবিঈন

ইয়াহইয়া আতাব' আতবা'উত-তাবি'ঈন

খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ, ইবনু আব্বাস ও আবু উমামাহ এরা সকলেই সাহাবী; তবে ইবনু আব্বাস ছিলেন একেবারে তরুণ সাহাবী, আর আবু উমামাহ নাবী -কে কেবল তাঁর মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে দেখেছেন। তাই ইবনু আব্বাস খালিদকে দাব্ব ভক্ষণের বৈধতার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে খালিদ এই ঘটনা উল্লেখ করেন। ইবনু আব্বাস তা বর্ণনা করেছেন আবু উমামাহ'র নিকট যিনি পরবর্তীতে ইবনু শিহাবের নিকট বর্ণনা করেছেন, ইবনু শিহাব মালিকের নিকট বর্ণনা করেছেন যিনি তা লিখিত রূপ দিয়েছেন এবং ইয়াহ্ইয়া'র নিকট বর্ণনা করেছেন।

ঐ হাদীসের পর একই বিষয়ের আরেকটি বর্ণনা রয়েছে, 'মালিক আমাকে অবহিত করেছেন যে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু দীনারের নিকট থেকে এবং তিনি ইবনু উমার থেকে শুনেছেন যে, এক ব্যক্তি নবী -কে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, দাব্ব সম্পর্কে আপনার মতামত কী?' আল্লাহর রাসূল জবাব দিলেন, 'আমি এটি খাই না এবং (কাউকে খেতে) নিষেধও করি না।' [১১]

এ ক্ষেত্রে সানাদটি তুলনামূলকভাবে কিছুটা সংক্ষিপ্ত, কারণ এখানে সাহাবী ইবনু উমার সরাসরি তার ছাত্র ইবনু দীনারের নিকট বর্ণনা করেছেন।

নবিজি ইবন 'উমার সাহাবি

ইবন দীনার তাৰিঊন

মালিক আতাবাউত-তাবি'ঈন

ইয়াহইয়া আতাব' আতবা'উত-তাৰি'ঈন

টিকাঃ
[১০] মুয়াত্তা ইমাম মালিক, ১৭৪৫।
[১১] মুয়াত্তা ইমাম মালিক, ১৭৪৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00