📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 হাদীস পাঠচক্রে হাজিরা

📄 হাদীস পাঠচক্রে হাজিরা


হাদীস পাঠচক্রের নিয়মিত হাজিরা বহি সংরক্ষণ করা হতো। একটি গ্রন্থ পঠিত হওয়ার পর শিক্ষক বা উপস্থিত ছাত্রদের একজন একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণীতে যারা সমস্ত গ্রন্থ কিংবা অংশবিশেষের পাঠ শুনেছেন তাদের নাম, তারিখ ও স্থান লিখে রাখতেন। পাঁচ বছরের নীচে হলে সংশ্লিষ্ট ছাত্রকে কেবল উপস্থিত শ্রেণীভুক্ত করা হতো; পক্ষান্তরে পাঁচ বছরের ওপর হলে তাদেরকে ছাত্রের কাতারে শামিল করা হতো। সনদে সাধারণত তিবাক নামে এই মর্মে একটি শর্ত জুড়ে দেয়া হতো যে, উক্ত গ্রন্থে আর কোনো বাড়তি তথ্য সন্নিবেশিত করা যাবে না।

তাবি'ঈদের যুগে ছাত্ররা সাধারণত বিশ বছর বয়সে হাদীস বিশেষজ্ঞদের পাঠচক্রে যোগদান করতেন। এর পূর্বেই তারা সমগ্র কুরআন মুখস্থ এবং ইসলামী আইন ও আরবি ব্যাকরণ অধ্যয়ন সম্পন্ন করে ফেলতেন। যুহরীর বর্ণনা মতে, তিনি হাদীস শাস্ত্রের সর্বকনিষ্ঠ ছাত্র হিসেবে দেখেছেন ইবনু উয়াইনাকে, যার বয়স ছিল পনের; আর ইবনু হাম্বল হাদীস অধ্যয়ন শুরু করেছেন ১৬ বছর বয়সে। তবে পরবর্তী পর্যায়ে যখন হাদীসের মূল পাঠ নির্ভুলভাবে সংরক্ষিত হয়ে গেল এবং শেখা বলতে হাদীস গ্রন্থ থেকে বর্ণনা করাকে বুঝানো হতো সে সময়ের ব্যাপারে বলা হয় যে, কোনো শিশু গাভী ও গাধার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে সমর্থ হলে হাদীস শেখা শুরু করার জন্য তাকে যথেষ্ট বয়স্ক মনে করা হতো। দৃষ্টান্তস্বরূপ, দাবারী আব্দুর রায্যাকের হাদীস গ্রন্থটি বর্ণনা করেছেন, অথচ আব্দুর রায্যাকের ইন্তেকালের সময় দাবারীর বয়স ছিল মাত্র সাত বছর।[৫]

পরবর্তী প্রত্যেক প্রজন্মে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বহুগুণে বেড়ে গিয়েছিল। তাবি'ঈদের যুগেই সুফিয়ান সাওরী, ইবনুল মুবারক ও যুহরীর ন্যায় বিদ্বান ব্যক্তিবর্গ শত শত শিক্ষকের নাম উল্লেখ করেছেন। যুহরীর নিজেরই ছিল পঞ্চাশের অধিক ছাত্র যারা তার নিকট থেকে লিখিত আকারে হাদীস সংগ্রহ করেছিলেন। যেসব ছাত্র তার নিকট থেকে হাদীস লিখেছেন এবং তার পাঠদানে উপস্থিত হয়েছেন তাদের সঠিক সংখ্যা আমাদের জানা নেই। হাদীস বর্ণনাকারীর সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে হাদীস গ্রন্থ ও হাদীস বর্ণনার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। প্রত্যেকটি ইসনাদকে একটি স্বতন্ত্র হাদীস হিসেবে পরিগণিত করা হাদীস বিশেষজ্ঞদের মধ্যে একটি সাধারণ প্রথায় পরিণত হয়েছিল। ফলে একশ' ইসনাদের মাধ্যমে বর্ণিত নাবী-এর একটি বক্তব্যকে একশ' হাদীস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল এবং কয়েক হাজার হাদীস পরিণত হয়েছিল লক্ষ লক্ষ হাদীসে। [৬]

টিকাঃ
[৫] আল-কিফায়াহ ফী 'ইলম আল-হাদীস, পৃষ্ঠা ৬৪। স্টাডিজ ইন হাদীস মেথডোলজি অ্যান্ড লিটারেচার বই থেকে, পৃষ্ঠা ২৩।
[৬] এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য আর্লি হাদীস লিটারেচার, পৃষ্ঠা ৩০২-৩০৫।

📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 সনদের ক্রমবিকাশ

📄 সনদের ক্রমবিকাশ


সুন্নাহ শিক্ষাদান, নাবী ﷺ-এর যুগ নাবী মুহাম্মাদ ﷺ যা কিছু বলেছেন বা করেছেন, তাকেই তাঁর সুন্নাহ মনে করা হয়; এতে রয়েছে আসমানী দিকনির্দেশনা অনুযায়ী ইসলামের বাস্তব প্রতিফলন।

নাবী ﷺ তাঁর সুন্নাহ শেখা ও মুখস্থ করার জন্য সাহাবীদেরকে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করতেন। কখনো কখনো তিনি সাহাবীদেরকে বসিয়ে কিছু দুআ পাঠ করাতেন, যা তিনি তাদেরকে মুখস্থ করাতে চাইতেন, ঠিক যেভাবে তিনি তাদেরকে কুরআন শেখাতেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি কোনো কথা তিনবার পুনরাবৃত্তি করতেন যাতে তারা তাঁর অধিকতর তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যসমূহ মুখস্থ করে নিতে পারেন। কখনো কখনো তিনি কিছু আনুষ্ঠানিকতা সম্পাদন করে তাদেরকে তা অনুকরণ করার নির্দেশ দিতেন, আবার কখনো তিনি অধিকতর জটিল বিষয়াবলী সাহাবীদেরকে দিয়ে লিপিবদ্ধ করাতেন।

📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 সাহাবীদের যুগ

📄 সাহাবীদের যুগ


নাবী ﷺ-এর ইন্তেকালের পর অপেক্ষাকৃত বয়স্ক সাহাবীরা তরুণ সাহাবীদেরকে নাবী ﷺ-এর বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মপদ্ধতি শেখাতে শুরু করেন, যা নবীনরা শুনতে কিংবা দেখতে পারেননি। প্রবীণ ও নবীন সাহাবীদের উভয় দলই সেসব লোককে শিক্ষা দান করতেন যারা নাবী ﷺ-এর জীবনের শেষ দিনগুলোতে ইসলাম গ্রহণ করায় সরাসরি তাঁর নিকট থেকে তেমন কিছু শেখার সুযোগ পাননি।

খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনামলে ইসলাম যখন সমগ্র আরব, সিরিয়া, ইরাক, পারস্য ও মিশরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সাহাবীরা ইসলামে নবদীক্ষিত লোকদেরকে দ্বীনের মৌলনীতিসমূহ শেখাতে থাকেন। তারা বলতেন, 'আমি নাবী ﷺ-কে এরূপ করতে দেখেছি,' কিংবা আমি নাবী ﷺ-কে এরূপ বলতে শুনেছি'। আর এভাবেই শুরু হয় সুন্নাহর বর্ণনাসূত্র। যেসব নবদীক্ষিত মুসলিম সাহাবীদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষা লাভ করেছেন, পরবর্তীতে তাদেরকে তাবিউন নামে অভিহিত করা হয়।

সাহাবীগণ নাবী ﷺ-এর যেসব বক্তব্যের উদ্ধৃতি প্রদান করতেন অধিকাংশ তাবি'ঈ তা মুখস্থ ও লিপিবদ্ধ করে নিতেন। সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সংখ্যক সাহাবীর নিকট থেকে নাবী ﷺ-এর সর্বোচ্চ পরিমাণ সুন্নাহ শেখার উদ্দেশ্যে তারা তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অংশে ভ্রমণ করতেন।

📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 কেন এই প্রয়াস?

📄 কেন এই প্রয়াস?


এটা খুবই স্বাভাবিক যে, মানুষ যাকে পছন্দ করে তাকে অনুকরণ করে, তার বক্তব্য ও কার্যাবলী স্মরণে রাখার চেষ্টা করে। আর এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, নাবী মুহাম্মাদ ছিলেন তাঁর অনুসারীদের নিকট পৃথিবীর প্রিয়তম ব্যক্তি। এটা ঈমানের অন্যতম শর্ত। স্বয়ং নাবী ﷺ এ প্রসঙ্গে বলেছেন,
“তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার সন্তান, পিতা-মাতা ও সকল মানুষ অপেক্ষা প্রিয়তর না হবো।” [৭]

কুরআনে আল্লাহ তা’আলা সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে নাবী ﷺ-এর সুন্নাহ’র প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করার জন্য তাগিদ দিয়েছেন। তাঁর সকল নির্দেশের আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেনঃ
« রাসূল তোমাদেরকে যা কিছু প্রদান করে, তোমরা তা গ্রহণ করো; আর যা কিছু তিনি তোমাদেরকে নিষেধ করে, তা বর্জন করো। » [সূরা আল হাশর (৫৯]: ৭]

নাবী ﷺ-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম জাতি কীভাবে ইসলাম পালন করবে? তিনি তাদের মধ্যে বিদ্যমান না থাকলে তারা কেমন করে জানবে যে, আল্লাহর রাসূল ﷺ তাদেরকে কোন বিষয়ের আদেশ দিয়েছেন এবং কোন বিষয়ে নিষেধ করেছেন? এ কারণে সুন্নাহ সংরক্ষণ করে মুসলিমদের পরবর্তী প্রজন্মের মানুষের নিকট তা পৌঁছে দেয়ার জন্য বিশেষ যত্ন নেয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। নাবী ﷺ-ও কোনো পরিবর্তন ছাড়া সুন্নাহ পৌঁছে দেয়ার ওপর অনেক গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি তাদেরকে এই বলে আল্লাহ তা’আলার রহমতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন,
"আল্লাহ তাকে বরকতময় করে দেবেন যে আমার কোনো বক্তব্য শুনে তা মুখস্থ করে ও অনুধাবন করে এবং তা হুবহু মানুষের নিকট পৌঁছে দেয়; কারণ এমনও হতে পারে যে, যার কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে তিনি (সরাসরি) হাদীস শ্রবণকারীর চেয়েও বেশী সমঝদার।”[৮]

যে ব্যক্তি তাঁর নামে মিথ্যা কথা প্রচার করবে তার জন্য ভয়ঙ্কর শাস্তির হুশিয়ারী উচ্চারণ করার মাধ্যমেও তিনি এ বিষয়টির ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন,
| “যে আমার নামে মিথ্যা কথা বলে সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা নির্ধারণ করে নেয়।”[৯]

টিকাঃ
[৭] সহীহ বুখারী, ১/১৪।
[৮] আবু দাউদ ৩/৩৬৫২, তিরমিযী। আল-আলবানী একে সাহীহ বলেছেন।
[৯] সাহীহ বুখারী ১/১০৭-১০৯, মুসলিম। দাউদ ৩/১০৩৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00