📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 হাদীস বর্ণনার পরিভাষা

📄 হাদীস বর্ণনার পরিভাষা


হাদীসের উৎস ও বর্ণনার ধরণ বুঝাতে হাদীস বিশেষজ্ঞগণ বেশ কিছু পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। হাদীস শাস্ত্রের সাথে পরিচিত নয় এমন লোকজন এসব আরবি পরিভাষা বুঝতে প্রায়শ ভুল করে থাকেন। নিম্নে সর্বাধিক ব্যবহৃত পরিভাষাসমূহ ও সেগুলোর সংক্ষিপ্ত রূপ উল্লেখ করা হলো:
১) হাদ্দাসানা (حدثنا): সচরাচর এ পরিভাষাটিকে সংক্ষেপে ছানা (ثنا) কিংবা না (ث) লিখা হয়।
প্রথম পদ্ধতির শিক্ষণ অর্থাৎ শিক্ষকের পঠন বুঝাতে এ পরিভাষাটি সর্বাধিক ব্যবহৃত হয়েছে।
২) আখবারানা (أخبرنا): অধিকাংশ সময় এ পরিভাষাটিকে সংক্ষেপে আনা (أنا) এবং কদাচিৎ আরানা-ও (أرنا) লিখা হয়।
কতিপয় বিশেষজ্ঞ এ হাদ্দাসানা ও আখবারানা পরিভাষা দু'টিকে পরস্পরের সমার্থবোধক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করেছেন; তবে আখবারানা পরিভাষাটি দ্বিতীয় পদ্ধতির শিক্ষণ অর্থাৎ ছাত্র কর্তৃক শিক্ষকের সামনে পাঠ বুঝাতে অধিক ব্যবহৃত হয়েছে।
৩) আমবাআনা (أنبأنا): ইজাযাহ ও মুনাওয়ালাহ এর ক্ষেত্রে এ পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়েছে।
৪) সামি'আ (سمع): এ পরিভাষাটি প্রথম পদ্ধতির শিক্ষণ বুঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
৫) 'আন (عن): সকল পদ্ধতির শিক্ষণের ক্ষেত্রে এ পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়েছে। অস্পষ্টতার কারণে এ পরিভাষাটিকে হাদীস বর্ণনার সবচেয়ে নিম্ন মানের পদ্ধতি মনে করা হয়।[৪]

হাদ্দাসানা (তিনি আমাদেরকে বলেছেন) ও আখবারানা (তিনি আমাদেরকে অবহিত করেছেন) পরিভাষা দু'টি যেহেতু মৌখিক বর্ণনার ইঙ্গিতবহ, তাই সাধারণত মনে করা হয় যে, সংশ্লিষ্ট হাদীসটি কমপক্ষে একশ' বছর যাবৎ মৌখিকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, নাবী ﷺ-এর অনেক সাহাবী হাদীস লিপিবদ্ধ করেছিলেন; একই কাজ করেছেন তাবি'ঈন ও তাবি'উত তাবি'ঈনগণ। অধিকন্তু, পূর্বে উল্লিখিত আটটি শিক্ষণ পদ্ধতির সাতটিই (অর্থাৎ ২-৮ নং শিক্ষণ পদ্ধতি) ছিল লিখিত গ্রন্থের ওপর প্রায় পুরোপুরি নির্ভরশীল। এমনকি প্রথম পদ্ধতিটিও অনেক ক্ষেত্রে লিখিত গ্রন্থ থেকে পাঠ করে শোনানোর সাথে সম্পৃক্ত ছিল। অতএব হাদ্দাসানা ও আখবারানা পরিভাষা দু'টিতে আক্ষরিক অর্থ প্রযোজ্য নয়; কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে লিখিত গ্রন্থ থেকে হাদীস বর্ণনার জন্যও এ পরিভাষা দু'টি ব্যবহৃত হয়েছে।

টিকাঃ
[২] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৬৩।
[৩] তাদরীব আর-রাউই, পৃষ্ঠা ১২৯-১৫০
[৪] স্টাডিজ ইন হাদীস মেথডোলজি, পৃষ্ঠা

📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 হাদীস পাঠচক্রে হাজিরা

📄 হাদীস পাঠচক্রে হাজিরা


হাদীস পাঠচক্রের নিয়মিত হাজিরা বহি সংরক্ষণ করা হতো। একটি গ্রন্থ পঠিত হওয়ার পর শিক্ষক বা উপস্থিত ছাত্রদের একজন একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণীতে যারা সমস্ত গ্রন্থ কিংবা অংশবিশেষের পাঠ শুনেছেন তাদের নাম, তারিখ ও স্থান লিখে রাখতেন। পাঁচ বছরের নীচে হলে সংশ্লিষ্ট ছাত্রকে কেবল উপস্থিত শ্রেণীভুক্ত করা হতো; পক্ষান্তরে পাঁচ বছরের ওপর হলে তাদেরকে ছাত্রের কাতারে শামিল করা হতো। সনদে সাধারণত তিবাক নামে এই মর্মে একটি শর্ত জুড়ে দেয়া হতো যে, উক্ত গ্রন্থে আর কোনো বাড়তি তথ্য সন্নিবেশিত করা যাবে না।

তাবি'ঈদের যুগে ছাত্ররা সাধারণত বিশ বছর বয়সে হাদীস বিশেষজ্ঞদের পাঠচক্রে যোগদান করতেন। এর পূর্বেই তারা সমগ্র কুরআন মুখস্থ এবং ইসলামী আইন ও আরবি ব্যাকরণ অধ্যয়ন সম্পন্ন করে ফেলতেন। যুহরীর বর্ণনা মতে, তিনি হাদীস শাস্ত্রের সর্বকনিষ্ঠ ছাত্র হিসেবে দেখেছেন ইবনু উয়াইনাকে, যার বয়স ছিল পনের; আর ইবনু হাম্বল হাদীস অধ্যয়ন শুরু করেছেন ১৬ বছর বয়সে। তবে পরবর্তী পর্যায়ে যখন হাদীসের মূল পাঠ নির্ভুলভাবে সংরক্ষিত হয়ে গেল এবং শেখা বলতে হাদীস গ্রন্থ থেকে বর্ণনা করাকে বুঝানো হতো সে সময়ের ব্যাপারে বলা হয় যে, কোনো শিশু গাভী ও গাধার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে সমর্থ হলে হাদীস শেখা শুরু করার জন্য তাকে যথেষ্ট বয়স্ক মনে করা হতো। দৃষ্টান্তস্বরূপ, দাবারী আব্দুর রায্যাকের হাদীস গ্রন্থটি বর্ণনা করেছেন, অথচ আব্দুর রায্যাকের ইন্তেকালের সময় দাবারীর বয়স ছিল মাত্র সাত বছর।[৫]

পরবর্তী প্রত্যেক প্রজন্মে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বহুগুণে বেড়ে গিয়েছিল। তাবি'ঈদের যুগেই সুফিয়ান সাওরী, ইবনুল মুবারক ও যুহরীর ন্যায় বিদ্বান ব্যক্তিবর্গ শত শত শিক্ষকের নাম উল্লেখ করেছেন। যুহরীর নিজেরই ছিল পঞ্চাশের অধিক ছাত্র যারা তার নিকট থেকে লিখিত আকারে হাদীস সংগ্রহ করেছিলেন। যেসব ছাত্র তার নিকট থেকে হাদীস লিখেছেন এবং তার পাঠদানে উপস্থিত হয়েছেন তাদের সঠিক সংখ্যা আমাদের জানা নেই। হাদীস বর্ণনাকারীর সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে হাদীস গ্রন্থ ও হাদীস বর্ণনার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। প্রত্যেকটি ইসনাদকে একটি স্বতন্ত্র হাদীস হিসেবে পরিগণিত করা হাদীস বিশেষজ্ঞদের মধ্যে একটি সাধারণ প্রথায় পরিণত হয়েছিল। ফলে একশ' ইসনাদের মাধ্যমে বর্ণিত নাবী-এর একটি বক্তব্যকে একশ' হাদীস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল এবং কয়েক হাজার হাদীস পরিণত হয়েছিল লক্ষ লক্ষ হাদীসে। [৬]

টিকাঃ
[৫] আল-কিফায়াহ ফী 'ইলম আল-হাদীস, পৃষ্ঠা ৬৪। স্টাডিজ ইন হাদীস মেথডোলজি অ্যান্ড লিটারেচার বই থেকে, পৃষ্ঠা ২৩।
[৬] এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য আর্লি হাদীস লিটারেচার, পৃষ্ঠা ৩০২-৩০৫।

📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 সনদের ক্রমবিকাশ

📄 সনদের ক্রমবিকাশ


সুন্নাহ শিক্ষাদান, নাবী ﷺ-এর যুগ নাবী মুহাম্মাদ ﷺ যা কিছু বলেছেন বা করেছেন, তাকেই তাঁর সুন্নাহ মনে করা হয়; এতে রয়েছে আসমানী দিকনির্দেশনা অনুযায়ী ইসলামের বাস্তব প্রতিফলন।

নাবী ﷺ তাঁর সুন্নাহ শেখা ও মুখস্থ করার জন্য সাহাবীদেরকে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করতেন। কখনো কখনো তিনি সাহাবীদেরকে বসিয়ে কিছু দুআ পাঠ করাতেন, যা তিনি তাদেরকে মুখস্থ করাতে চাইতেন, ঠিক যেভাবে তিনি তাদেরকে কুরআন শেখাতেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি কোনো কথা তিনবার পুনরাবৃত্তি করতেন যাতে তারা তাঁর অধিকতর তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যসমূহ মুখস্থ করে নিতে পারেন। কখনো কখনো তিনি কিছু আনুষ্ঠানিকতা সম্পাদন করে তাদেরকে তা অনুকরণ করার নির্দেশ দিতেন, আবার কখনো তিনি অধিকতর জটিল বিষয়াবলী সাহাবীদেরকে দিয়ে লিপিবদ্ধ করাতেন।

📘 হাদীস বোঝার মূলনীতি > 📄 সাহাবীদের যুগ

📄 সাহাবীদের যুগ


নাবী ﷺ-এর ইন্তেকালের পর অপেক্ষাকৃত বয়স্ক সাহাবীরা তরুণ সাহাবীদেরকে নাবী ﷺ-এর বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মপদ্ধতি শেখাতে শুরু করেন, যা নবীনরা শুনতে কিংবা দেখতে পারেননি। প্রবীণ ও নবীন সাহাবীদের উভয় দলই সেসব লোককে শিক্ষা দান করতেন যারা নাবী ﷺ-এর জীবনের শেষ দিনগুলোতে ইসলাম গ্রহণ করায় সরাসরি তাঁর নিকট থেকে তেমন কিছু শেখার সুযোগ পাননি।

খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনামলে ইসলাম যখন সমগ্র আরব, সিরিয়া, ইরাক, পারস্য ও মিশরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সাহাবীরা ইসলামে নবদীক্ষিত লোকদেরকে দ্বীনের মৌলনীতিসমূহ শেখাতে থাকেন। তারা বলতেন, 'আমি নাবী ﷺ-কে এরূপ করতে দেখেছি,' কিংবা আমি নাবী ﷺ-কে এরূপ বলতে শুনেছি'। আর এভাবেই শুরু হয় সুন্নাহর বর্ণনাসূত্র। যেসব নবদীক্ষিত মুসলিম সাহাবীদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষা লাভ করেছেন, পরবর্তীতে তাদেরকে তাবিউন নামে অভিহিত করা হয়।

সাহাবীগণ নাবী ﷺ-এর যেসব বক্তব্যের উদ্ধৃতি প্রদান করতেন অধিকাংশ তাবি'ঈ তা মুখস্থ ও লিপিবদ্ধ করে নিতেন। সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সংখ্যক সাহাবীর নিকট থেকে নাবী ﷺ-এর সর্বোচ্চ পরিমাণ সুন্নাহ শেখার উদ্দেশ্যে তারা তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অংশে ভ্রমণ করতেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00