📄 তাবিয়ত তাবি‘ঈনদের যুগ
তাবি'তাবি'ঈদের পরবর্তী যুগে হাদীসসমূহকে সুশৃঙ্খল পাঠ আকারে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। প্রাচীনতম কীর্তিসমূহের অন্যতম হলো মালিক ইবনু আনাস (রহ.) কর্তৃক সঙ্কলিত আল মুয়াত্তা। ইমাম মালিকের সমসাময়িক বিশেষজ্ঞগণও হাদীসের অন্যান্য গ্রন্থ রচনা করেছেন; যেমন সিরিয়ার আওযায়ী, খুরাসানের আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, বসরার হাম্মাদ ইবনু সালামাহ এবং কুফার সুফিয়ান ছাওরী (রহ.) প্রমুখ। তবে সে সময়কার গ্রন্থসমূহের মধ্যে একমাত্র ইমাম মালিকের লেখা গ্রন্থটি আজো অবিকল সংরক্ষিত আছে। বলা যায়, এ যুগেই ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন কেন্দ্রে হাদীসের বেশীর ভাগ অংশ সংগৃহীত হয়েছে।
এই তিনটি প্রজন্মের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপের কারণ হলো, নাবী থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন-
“সর্বোত্তম প্রজন্ম আমার প্রজন্ম, তারপর তার পরবর্তী প্রজন্ম, অতঃপর তার পরবর্তী প্রজন্ম।”[১৬]
সুশৃংখলভাবে ও ব্যাপক পরিসরে গ্রন্থাকারে সঙ্কলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত হাদীসসমূহ এই তিন প্রজন্মের মাধ্যমেই সর্বপ্রথম মৌখিক ও লিখিত আকারে প্রচারিত হয়েছে।
টিকাঃ
[১৫] তাবি'ঈতাবি'ঈদের ছাত্রদের প্রজন্মকে তাবি'উত তাবি'ঈতাবি'ঈন নামে অভিহিত করা হয়, যেমন মালিক ইবনু আনাস।
[১৬] সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম।
📄 সহীহ হাদীস সঙ্কলনের যুগ (হিজরী তৃতীয় শতক)
হিজরী তৃতীয় শতকে এমন কতিপয় বিশেষজ্ঞের আবির্ভাব ঘটে যারা প্রথম দু' শতকে বর্ণিত ও সঙ্কলিত হাদীসসমূহের সমালোচনামূলক গবেষণার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তারা তাদের সে নীতির আলোকে যে সমস্ত হাদীসকে বিশুদ্ধ মনে করেছেন সেগুলোকে ইসলামী আইনের বিভিন্ন অধ্যায় বা শাখা অনুযায়ী সাজিয়ে দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, এ যুগেই রচিত হয়েছে ৭,২৭৫টি হাদীস সম্বলিত গ্রন্থ সহীহ বুখারী- যা ইমাম বুখারী (মৃত্যু ৬৭০ সাল) ৬,০০,০০০ হাদীস থেকে বাছাই করে লিপিবদ্ধ করেছেন। ৯,২০০টি হাদীস সম্বলিত গ্রন্থ সহীহ মুসলিম- যা ইমাম মুসলিম ৩,০০,০০০ হাদীস থেকে বাছাই করে গ্রন্থবদ্ধ করেছেন। হাদীসের এ দু'টি গ্রন্থ বাদেও এ যুগের আরো চারটি গ্রন্থ ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। সেগুলো হলো—ইমাম আবু দাউদ (মৃত্যু ৮৮৯ সাল), তিরমিযী (মৃত্যু ৮৯৩ সাল), নাসাঈ (মৃত্যু ৯১৬ সাল) ও ইবনু মাজাহ (মৃত্যু ৯০৮ সাল) রহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ সংকলিত সুনান গ্রন্থসমূহ।
📄 হাদীস লিপিবদ্ধকরণের বিভিন্ন যুগ
• প্রথম স্তর জুড়ে রয়েছে হিজরী প্রথম শতক (যার শুরু ৬২২ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে) বা খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের প্রথম অংশ। এটি ছিল সাহাবী ও তাবি'ঈ-তাবি'ঈদের যুগ। এ যুগকে অনেক সময় সহীফার যুগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সহীফা হলো কোনো কাগজের পাতা কিংবা অংসফলক বা পশুর চামড়া সদৃশ লিখন সামগ্রী—যার ওপর বেশ কিছু হাদীস লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল, যেমন আবু বকরের সহীফা ও আব্দুল্লাহ ইবনু উমারের সহীফায়ে সা-দিক্কাহ। প্রথম পর্যায়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশেষ কোনো বিন্যাস অবলম্বন না করে শুধু হাদীস লিপিবদ্ধ করে যাওয়া।
• দ্বিতীয় যুগে রয়েছে হিজরী দ্বিতীয় শতকের মধ্য ভাগ। এ যুগকে মুছান্নাফ (অর্থাৎ শ্রেণীবদ্ধ সুশৃঙ্খল গ্রন্থ)-এর যুগ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এ যুগে বিষয়বস্তু নির্দেশক বিভিন্ন শিরোনামের অধীনে পরিকল্পিত পদ্ধতিতে হাদীস সঙ্কলন করা হয়েছে, যেমন ইমাম মালিকের মুয়াত্তা।
* তৃতীয় যুগটি মুসনাদ (সাহাবীদের নামানুসারে হাদীস সঙ্কলন) এর যুগ হিসেবে পরিচিত। হিজরী দ্বিতীয় শতকের সমাপ্তিলগ্নে এ যুগের সূচনা। যেমন ইমাম আহমদের মুসনাদ।
• চতুর্থ ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ যুগটি সহীহ এর যুগ হিসেবে পরিচিত। হিজরী তৃতীয় (খ্রিস্টীয় নবম) শতকের প্রথমার্ধ থেকে এ যুগের সূচনা। মুসনাদের যুগটিও এ যুগের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। যেমন সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও সহীহ ইবনি খুযাইমাহ।
📄 হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী
আবু হুরায়রা
বিপুল পরিমাণ হাদীস বর্ণনার সুবাদে হাদীস বর্ণনাকারীদের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন তিনি। স্বয়ং নাবী তাঁকে হাদীসের জ্ঞান আহরণ করার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে সবচেয়ে উৎসুক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বিখ্যাত আযদ গোত্রের শাখা দাউস-এ জন্মগ্রহণকারী আবু হুরায়রা মদীনায় এসেছিলেন হিজরতের সপ্তম বছর; রাসূল তখন খায়বারে অবস্থান করছিলেন। এ কথা জানতে পেরে তিনি সেখানে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন থেকে শুরু করে নাবী -এর ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত তিনি তাঁর সার্বক্ষণিক সাহচর্যে ছিলেন। তিনি নাবী -এর দরবারে হাজির হয়ে তাঁর প্রতিটি কথা মুখস্থ করতেন। এ কাজ করতে গিয়ে তিনি দুনিয়ার অন্য সব কাজ ও আনন্দ বিসর্জন দিয়েছিলেন। বর্ণিত আছে যে, তিনি রাতকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছিলেন—এক ভাগ নিদ্রা গমনের জন্য, এক ভাগ প্রার্থনার জন্য, আর এক ভাগ অধ্যয়নের জন্য।
নাবী -এর ইন্তেকালের পর খলিফা উমারের শাসনামলে তিনি অল্প কিছু দিনের জন্য বাহরাইনের গভর্নর নিযুক্ত হন এবং প্রথম দিকের উমাইয়া শাসকদের অধীনে তিনি মদীনার গভর্নর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি হিজরী ৫৯ (খ্রিস্টীয় ৬৭৮) সালে মৃত্যুবরণ করেন।
নাবী -এর ইন্তেকালের পর যে কোনো সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কোনো তথ্য জানতে চাইলে আবু হুরায়রা তার সযত্নে সংগৃহীত জ্ঞানভাণ্ডার উজাড় করে দিতে থাকেন। কখনও কখনও তাকে কিছু হাদীস বর্ণনার জন্য তিরস্কার শুনতে হতো, কারণ সেগুলোর ব্যাপারে অন্য সাহাবীরা কিছুই জানতেন না। এ ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেন যে, তিনি এমন কিছু হাদীস শিখেছেন যা আনসাররা নিজেদের জমিজমা ও বিষয় সম্পত্তি দেখাশোনা করার পেছনে সময় ব্যয় করতে গিয়ে হাতছাড়া করেছেন এবং মুহাজিররাও নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোনিবেশ করার কারণে সেসব হাদীস শিখতে ব্যর্থ হয়েছেন। একবার একটি বিশেষ হাদীস বর্ণনার জন্য আব্দুল্লাহ ইবনু উমার তাকে তিরস্কার করলে তিনি তাকে আয়েশা -এর নিকট নিয়ে যান এবং আয়েশা ঐ হাদীসের সত্যতার পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করেন। খলীফা মারওয়ান একবার তার জ্ঞান ও স্মৃতিশক্তির পরীক্ষা নিয়েছিলেন। তিনি প্রথমে আবু হুরায়রা কর্তৃক বর্ণিত কিছু হাদীস লিপিবদ্ধ করে রাখেন অতঃপর একবছর পর তাকে সেসব হাদীস বর্ণনা করতে বলেন। মারওয়ান দেখতে পেলেন যে, আবু হুরায়রার উভয় বর্ণনা হুবহু একই রকম।
হাদীস শেখার জন্য আবু হুরায়রার অদম্য আগ্রহ, নাবী -এর প্রতি তার ভক্তি এবং তার স্মৃতিশক্তি ও পাণ্ডিত্য যাচাই করার লক্ষ্যে সমকালীন ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক বিভিন্ন পরীক্ষা গ্রহণ- এসব বিষয় বিবেচনায় রাখলে এটি অবিশ্বাস্য যে, তিনি কোনো হাদীস জাল করে থাকবেন। তবে এর মানে এই নয় যে, পরবর্তীকালে কোনো মিথ্যা বক্তব্য তার প্রতি আরোপ করা হয়নি। তিনি বিপুল সংখ্যক হাদীস এককভাবে বর্ণনা করার কারণে তার নামে বেশ কিছু হাদীস উদ্ভাবন করা হয়েছিল মর্মে একটি চিত্তাকর্ষক ধারণা সৃষ্টি হয়েছে।
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার
অধিক সংখ্যক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীদের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন তিনি। তিনি ছিলেন দ্বিতীয় খলিফা উমার -এর পুত্র। তিনি তার পিতার সাথে একই সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে তার সাথেই মদীনায় হিজরত করেন। নাবী -এর জীবদ্দশায় তিনি বহু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন; পরবর্তীতে তিনি ইরাক, পারস্য ও মিশর যুদ্ধেও শরীক হন। তবে উসমান -এর হত্যাকাণ্ডের পর মুসলিমদের মধ্যে যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছিল, তাতে তিনি কোনো পক্ষ অবলম্বন করা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে রাখেন। সকল স্তরের মুসলমানদের নিকট ব্যাপক সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র হওয়ার কারণে, সাধারণ মানুষ তাকে বারবার খলিফা হওয়ার জন্য অনুরোধ করলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং সকল ফিতনা ফাসাদ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেন। এই সময় তিনি নির্মোহ ও সৎ জীবন যাপন করে একজন আদর্শ নাগরিকের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন; ঠিক যেমনিভাবে তার পিতা স্থাপন করেছিলেন একজন আদর্শ শাসকের দৃষ্টান্ত। তিনি হিজরী ৭৪ (খ্রিস্টীয় ৬৯২) সালে ৮৭ বছর বয়সে মক্কায় মৃত্যুবরণ করেন।
নাবী -এর সাথে আব্দুল্লাহ ইবনু উমারের দীর্ঘ সাহচর্য এবং উম্মুল মু'মিনীন হাফসা ও অন্য কয়েকজন সাহাবীর সাথে তার রক্তের সম্পর্ক তাকে হাদীস শেখার ক্ষেত্রে চমৎকার সুযোগ করে দেয়। তাছাড়া জ্ঞানপিপাসু ব্যক্তিদের মধ্যে হাদীসের শিক্ষা দান ও তার শান্তিপূর্ণ দীর্ঘ জীবন তাকে হাদীসের জ্ঞান সম্প্রসারণের জন্য যথেষ্ট সময় ও অবকাশ এনে দেয়।
হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে চরম সতর্কতা অবলম্বনের জন্য তার একটি বিশেষ খ্যাতি ছিল। এ প্রসঙ্গে ইমাম শা'বী (রহ.) বলেন যে, তিনি একবার পুরো এক বছর তার মুখ থেকে একটি হাদীসও উচ্চারিত হতে শোনেননি। হাদীস বর্ণনার সময় তার চক্ষুযুগল অশ্রুতে ভরে ওঠতো। ইসলামের সেবায় তার কর্মকাণ্ড, তার অনাড়ম্বর জীবন, সহজ সরল ও সৎ চরিত্র এবং হাদীসের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন—এসব বিষয় তার বর্ণিত হাদীসসমূহকে করে তুলেছে সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন।
আনাস ইবনু মালিক
নাবী মদীনায় হিজরতের পর আনাসের মা উম্মু সুলাইম আনাসকে দশ বছর বয়সে নাবী -এর খেদমতে নিয়োজিত করেন। সে সময় থেকে নাবী -এর ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন তার প্রিয় সেবক; পরবর্তীতে আবু বাক্ তাকে বাহরাইনের রাজস্ব আদায়কারী হিসেবে নিয়োগ করেন। জীবনের শেষভাগে এসে তিনি বসরায় বসতি স্থাপন করেন। শতাধিক বছর আয়ু পেয়ে তিনি সেখানেই ৭১১ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।
নাবী-এর খেদমতে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে পূর্ণ দশ বছর সময় কাটিয়েছেন। এসময়ে তিনি তাঁর অসংখ্য বক্তব্য মুখস্থ করে নিতে সক্ষম হন। তাছাড়া তিনি পরবর্তীতে আবু বাক্স, উমারসহ অন্য অনেক সাহাবী থেকেও বিপুল সংখ্যক হাদীস শেখেন। তাই হাদীসের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন বিপুল জ্ঞানের অধিকারী এক মহান ব্যক্তিত্ব।
মুহাদ্দিসগণ তাকে বিপুল পরিমাণ হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীদের অন্যতম হিসেবে স্বীকার করেন।
উম্মুল মু'মিনীন আয়েশা
অধিক সংখ্যক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীদের তালিকার চতুর্থ স্থানে রয়েছেন আয়েশা । তিনি প্রায় সাড়ে আট বছর পর্যন্ত স্ত্রী হিসেবে নাবী -এর সান্নিধ্য লাভ করেন। তিনি হিজরী ৫৭ (খ্রিস্টীয় ৬৭৬) সালে ৬৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
প্রকৃতিগতভাবেই আয়েশা ছিলেন ব্যাপক স্মৃতিশক্তির অধিকারী। বিপুল সংখ্যক প্রাচীন আরবি কবিতা মুখস্থ করে তিনি নিজের মধ্যে ধীরে ধীরে সূক্ষ্ম চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটান। প্রাচীন আরবি কবিতার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সর্বজন স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ।
তার জীবদ্দশায় চিকিৎসা বিজ্ঞান ও ইসলামী আইনে পাণ্ডিত্যের জন্যও তিনি ছিলেন বিশেষ সম্মানের অধিকারী। হাদীস শাস্ত্রে তিনি তাঁর স্বামী নাবী মুহাম্মাদ -এর নিকট থেকে বিপুল সংখ্যক হাদীস কেবল মুখস্তই করেননি, বরং তার মধ্যে নিহিত গভীর তাৎপর্য, আইনগত সিদ্ধান্ত ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণও শিখে নেন। তাই এসব ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ পাণ্ডিত্যের পরিচয় দিয়েছেন এবং হাদীস বুঝার ক্ষেত্রে অনেক সাহাবীর ভুল সংশোধন করে দিয়েছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ইবনু উমার যখন বর্ণনা করলেন যে, নাবী বলেছেন-আপনজনদের বিলাপের কারণে মৃত ব্যক্তিকে কবরে শাস্তি দেয়া হয়; এর ব্যাখ্যায় তিনি বুঝিয়ে দিলেন যে, প্রকৃতপক্ষে নাবী যা বলেছেন তার অর্থ হলো-কবরে যখন মৃত ব্যক্তিকে তার গুনাহের জন্য শাস্তি দেয়া হয়, তখন তার নিকটাত্মীয়রা (তার গুনাহ মাফের জন্য দু'আ না করে) তার জন্য বিলাপ করে।
হাদীস ও ইসলামী আইনে তার ব্যাপক জ্ঞানের কারণে প্রথম সারির মর্যাদাবান সাহাবীরাও বিভিন্ন আইনগত সমস্যার সমাধানে তার পরামর্শ নিতেন। যেসব মুহাদ্দিস তার নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন- ইবনু হাজার আসকালানীর তাহযীবুত তাহযীব গ্রন্থে তাদের একটি দীর্ঘ তালিকা পাওয়া যাবে।
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস
তিনি জন্মগ্রহণ করেন নাবী -এর মদীনায় হিজরতের মাত্র তিন বছর পূর্বে। সেহেতু নাবী -এর ইন্তেকালের সময় তার বয়স ছিল তের বছর। নাবী তাকে খুবই ভালোবাসতেন-তার সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসসমূহে যার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি হিজরী ৬৮ (খ্রিস্টীয় ৬৮৭) সালে ৭১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, কিশোর হওয়া সত্ত্বেও তিনি কিছু হাদীস স্বয়ং নাবী -এর নিকট থেকে শিখেছেন। (ইয়াহইয়া ইবনুল কাত্তানের উদ্ধৃতি দিয়ে) ইবনু হাজার এ মর্মে একটি বক্তব্য উল্লেখ করেছেন যে, ইবনু আব্বাস চার কিংবা দশটি হাদীস সরাসরি নাবী থেকে বর্ণনা করেছেন। তারপর তিনি বলেন যে, এই সংখ্যাটি ভুল; কারণ কেবল বুখারী ও মুসলিমের সহীহ গ্রন্থদ্বয়েই দশের অধিক এমন হাদীস রয়েছে, যা তিনি সরাসরি নাবী থেকে বর্ণনা করেছেন। তবে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, তিনি অন্যান্য সাহাবীর বরাতে যে বিপুল সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করেছেন তার তুলনায় সরাসরি নাবী থেকে তার বর্ণীত হাদীসের সংখ্যা
অনেক কম। বহু বছর যাবৎ কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি সেসব হাদীসের জ্ঞান অর্জন করেছেন। এ বিষয়ে তিনি বলেছেন,
'আমি কোনো সাহাবীর নিকট থেকে কোনো হাদীস শিখতে চাইলে আমি তার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতাম, যতক্ষণ না তিনি বেরিয়ে এসে আমাকে বলতেন, 'হে আল্লাহর রাসূলের চাচাতো ভাই! এখানে এসেছ কেন? তুমি আমাকে ডেকে পাঠাওনি কেন?' তখন আমি জবাবে বলতাম যে, '(যেহেতু আমি জ্ঞান অর্জন করতে চাই) তাই তার কাছেই যাওয়া উচিত।' তারপর আমি তার কাছ থেকে হাদীসটি শিখে নিতাম।
বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ ও স্মৃতিশক্তির জন্য ইবনু আব্বাসকে সবাই সমীহ করতো। তিনি কুরআন ও সুন্নাহ অধ্যয়নে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন এবং তার পাণ্ডিত্যের জন্য তিনি ছিলেন প্রথম চার খলিফা ও তাদের সমসাময়িক বিশেষজ্ঞগণের ভালোবাসার ও স্নেহের পাত্র। তিনি বিপুল সংখ্যক হাদীস সংগ্রহ করে সেগুলোকে গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করেন এবং সেসব বিষয়ে ছাত্রদেরকে পাঠ দান করেন। ইমাম মুজাহিদ (রহঃ)-এর মাধ্যমে প্রচারিত কুরআনের ওপর তার তাফসীর গ্রন্থটি অত্যন্ত সুপরিচিত এবং পরবর্তীকালের বহু মুফাস্সির উক্ত তাফসীর গ্রন্থের উদ্ধৃতি প্রদান করেছেন।
জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ
মদীনার যেসব ব্যক্তি শুরুর দিকে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তিনি হলেন তাদের অন্যতম। মক্কাতে নাবী ﷺ-এর প্রতি আনুগত্য বিষয়ক (বাইআতে আকাবাহ) দ্বিতীয় সভায় তিনি উপস্থিত ছিলেন। নাবী ﷺ-এর সঙ্গে তিনি ১৯টি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। হিজরী ৭৪ (খ্রিস্টীয় ৬৯৩) সালে ৯৪ বছর বয়সে তিনি মদীনায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি শুধু নাবী ﷺ-এর নিকট থেকেই তাঁর হাদীস শেখেননি; বরং আবু বাকর ও উমার সহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক সাহাবীর নিকট থেকেও হাদীসের জ্ঞান আহরণ করেছেন। তিনি কয়েকজন তাবি'ঈর তত্ত্বাবধানেও অধ্যয়ন করেছেন, যাদের অন্যতম ছিলেন আবু বাকর-এর কন্যা খ্যাতিমান উম্মে কুলসুম। মদীনার মসজিদে তিনি নিয়মিত হাদীসের পাঠ দান করতেন।
আবু সাঈদ খুদরী বা সা'দ ইবনু মালিক
মদীনার যেসব লোক শুরুর দিকে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তিনিও তাদের অন্যতম। তার পিতা উহুদ যুদ্ধে নিহত হন। তিনি নিজেও নাবী ﷺ-এর জীবদ্দশায় বারোটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি হিজরী ৬৪ (খ্রিস্টীয় ৬৮৩) সালে মৃত্যুবরণ করেন।
আবু হুরায়রার ন্যায় তিনিও ছিলেন আস্হাবে সুফ্ফাহর অন্যতম। আস্হাবে সুফ্ফাহ বলতে মূলত সেসব লোককে বুঝানো হয়, যারা 'ইবাদাহ ও জ্ঞানাহরণের কঠোর জীবনে নিজেদেরকে উৎসর্গ করে দিয়ে নাবী -এর মাসজিদ সংলগ্ন বাসগৃহের বারান্দায় সারাক্ষণ পড়ে থাকতেন। তিনি নাবী -এর পাশাপাশি আবু বাক্র, উমার ও যাইদ ইবনু সাবিতের ন্যায় প্রখ্যাত সাহাবীদে নিকট থেকে হাদীস শিখেছেন। তরুণ সাহাবীদের মধ্যে তাকে সর্বোত্তম আইনবিদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল 'আস
তিনিও শুরুর দিকে ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণকারী অন্যন্য সাহাবীদের মতো তাঁকেও প্রচুর কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। তিনি দীর্ঘ দিন নাবী -এর সান্নিধ্য লাভ করেছেন। নাবী -এর ইন্তেকালের পর তিনি সুদীর্ঘ সময় জীবিত ছিলেন; আর এ সময়টি তিনি নাবী -এর হাদীস প্রচারের কাজে ব্যয় করেন। উসমান -এর সময় সংঘটিত আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কলহের সময় ইবনু উমারের ন্যায় তিনিও নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেন। তিনি তাঁর পিতার পিড়াপিড়িতে সিফ্ফীন যুদ্ধে উপস্থিত থাকলেও তাতে সক্রিয় অংশ নেননি। নিছক উপস্থিত ছিলেন—এতোটুকুর জন্যেই তিনি বাকি জীবন গভীরভাবে অনুতপ্ত ছিলেন।
নাবী -এর সুন্নাহকে হুবহু অনুসরণের ক্ষেত্রে তাঁর আগ্রহ ছিল অত্যন্ত প্রগাঢ়। তিনি নাবী থেকে যত হাদীস শিখেছেন তাঁর সবগুলোই লিখে ফেলেন এবং আস্ সা-দিক্বাহ নামক একটি সহীফায় এক হাজার হাদীস সঙ্কলন করে রাখেন। মক্কায় অবস্থানকালে হাদীস শিক্ষার্থীরা তাঁর কাছে আসতো। কিন্তু তিনি যেহেতু জীবনের বেশীরভাগ সময় মিশর কিংবা তায়েফে কাটিয়েছেন এবং হাদীসের পাঠ দানের তুলনায় ইবাদাতে অধিক সময় ব্যয় করেছেন; তাই পরবর্তী প্রজন্মের মুসলিমগণ তাঁর নিকট থেকে আবু হুরায়রা, আয়েশা ও অন্যান্য অধিক সংখ্যক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীর তুলনায় কম হাদীস সংগ্রহ করতে পেরেছেন। [১৭]
টিকাঃ
[১৭] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১৯-২৩।