📄 সাহাবায়ে কেরামের যুগ
নাবী-এর ইন্তেকালের পর তাঁর কথা ও কার্যাবলী লিপিবদ্ধকরণ বাড়তি গুরুত্বের অধিকারী হয়ে ওঠে, কারণ তখন নতুন সমস্যা উদ্ভূত হলে তাঁর সাথে পরামর্শ করার আর কোনো সুযোগ নেই। এ যুগে ব্যাপক পরিসরে হাদীস বর্ণনার ধারা শুরু হয়।
উদাহরণস্বরূপ, নাবী -এর ইন্তেকালের পর তাঁকে কোথায় দাফন করা হবে- এ নিয়ে সাহাবীদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। বিষয়টি তখনই থেমে যায় যখন আবু বাক্ তাঁদেরকে বললেন,
'আমি রাসূল ﷺ-কে বলতে শুনেছি, 'কোনো নাবী যেখানে মৃত্যুবরণ করেন, তাঁকে সেখানেই দাফন করা হয়।' [৭]
অতঃপর আয়েশা -এর ঘরের যে বিছানায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন ঠিক তার নীচেই তার জন্য কবর খনন করা হয়। এ যুগে বেশ কয়েকজন প্রথম সারির সাহাবী নাবী ﷺ-এর হাদীস লিপিবদ্ধ করেছেন।
নাবী ﷺ-এর নিকট থেকে প্রথম সারির হাদীস বর্ণনাকারীদের অল্প কয়েকজনের কথা নিম্নে তুলে ধরা হলো- যারা লিখিত আকারে হাদীস সংরক্ষণ করেছিলেন বলে জানা যায়।
আবু হুরায়রা, তাঁর প্রতি ৫৩৭৪টি হাদীসের সানাদ আরোপ করা হয়, বাস্তবে তিনি বর্ণনা করেছেন ১২৩৬টি হাদীস। হাসান ইবনু আমর দামারী তাঁর নিকট অনেক বই দেখেছেন।[৮]
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস, তাঁর প্রতি ১৬৬০টি হাদীসের সানাদ আরোপ করা হয়। তিনি যা কিছু শুনতেন [৯] তা-ই লিখে রাখতেন, এমনকি তাঁকে লিখে দেয়ার জন্য তিনি তাঁর দাসদেরকেও নিয়োগ দিয়েছিলেন।[১০]
আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস, তাঁর প্রতি ৭০০টি হাদীসের সানাদ আরোপ করা হয়। তাঁর ব্যাপারে জানা যায় যে, তিনি নাবী ﷺ-এর জীবদ্দশায় আস সহীফাতুস সহীহাহ নামে হাদীসের একটি সঙ্কলন প্রস্তুত করেছিলেন।
আবু বকর, বর্ণিত আছে যে, তিনি নাবী ﷺ-এর পাঁচ শতাধিক বক্তব্য লিখে রেখেছিলেন।
ইবনুল জাওযী (রহ.)- যিনি হাদীস বর্ণনাকারী সকল সাহাবীর তালিকা প্রণয়ন করেছেন। তিনি প্রায় ১০৬০ জন সাহাবীর নাম-পরিচয় এবং তাদের বর্ণিত হাদীস সংখ্যা উল্লেখ করেছেন。
• ৫০০ জন সাহাবীর প্রত্যেকে মাত্র একটি করে হাদীস বর্ণনা করেছেন; • ১৩২ জন সাহাবী বর্ণনা করেছেন মাত্র ২টি করে; • ৮০ জন ৩টি করে; • ৫২ জন ৪টি করে; • ৩২ জন ৫টি করে; • ২৬ জন ৬টি করে; • ২৭ জন ৭টি করে; • ১৮ জন ৮টি করে; • ১১ জন ৯টি করে; • ৬০ জন ১০ থেকে ২০টি করে; • ৮৪ জন ২০ থেকে ১০০টি করে; • ২৭ জন ১০০ থেকে ৫০০টি করে; • মাত্র ১১ জন সাহাবী পাঁচ শতাধিক এবং • মাত্র ৬ জন সাহাবী সহস্রাধিক হাদীস বর্ণনা করেছেন।
তাদেরকে হাদীস বর্ণনাকারীদের জীবন বৃত্তান্ত সংক্রান্ত শাস্ত্রের পরিভাষায় মুকাস্সিরুন (অধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী) হিসেবে অভিহিত করা হয়। বর্তমানে মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ছাত্রকে হাদীস শাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রী নিতে চাইলে তাকে চার বছরের কোর্সে প্রতি বছর ২৫০টি হাদীস (চার বছরে ১০০০টি হাদীস) মুখস্থ করতে হয়।
উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, হাদীসের বিপুলাংশ বর্ণনা করেছেন তিন শ'য়ের কম সংখ্যক সাহাবী।[১১]
টিকাঃ
[৬] নাবী-এর সাহাবীদেরকে কখনো কখনো ইসলামের প্রথম প্রজন্ম নামে অভিহিত করা হয়। সাহাবী দ্বারা এমন ব্যক্তিকে বুঝানো হয় যিনি নাবী-এর সাথে সাক্ষাৎ করে ঈমানদার অবস্থায় ইন্তেকাল করার সৌভাগ্য লাভ করেছেন।
[৭] দ্যা লাইফ অব মুহাম্মাদ, পৃ, ৬৮৮।
[৮] ফাতহুল বারী, খণ্ড ১, পৃ, ২১৭।
[৯] তাবাকাতু ইবনি সা'দ, খণ্ড ২, পৃ, ১২৩।
[১০] তাক্বরীব, কাত্তানী, খণ্ড ২, পৃ, ২৪৭।
[১১] হাদীস লিটারেচার, পৃ, ১৮-১৯।
📄 তাবি‘ঈদের যুগ (হিজরী প্রথম শতক)
মধ্যপ্রাচ্য, ভারতবর্ষ ও উত্তর আফ্রিকায় ইসলামের সম্প্রসারণ ও হাদীস বর্ণনার ব্যাপক বিস্তৃতির পর এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটে যারা নিজেদের মনগড়া কথাকে হাদীস নামে চালিয়ে দিতে শুরু করে। এই ভয়াবহ সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য খলিফা উমার ইবনু আব্দুল আজীজ (শাসনকাল ৯৯-১০১ হি, ৭১৮-৭২০সাল) হাদীস বিশেষজ্ঞদেরকে নাবী ﷺ-এর হাদীস সঙ্কলনের নির্দেশ দেন। মিথ্যুক ও জাল হাদীস বর্ণনাকারীদের চরিত্র উন্মোচনের লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞগণ অবশ্য ইতোমধ্যেই নিজ উদ্যোগে হাদীস বর্ণনাকারীদের জীবনবৃত্তান্ত সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সম্বলিত গ্রন্থ প্রণয়নের কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন। হাদীস সঙ্কললের জন্য খলিফা যেসব বিশেষজ্ঞকে নির্দেশনা প্রদান করছিলেন—আবু বাক্র ইবনু হাযাম (মৃত্যু ১২০ হি, ৭৩৭ সাল) ছিলেন তাদের অন্যতম। নাবী ﷺ-এর সকল হাদীস ও উমার ইবনুল খাত্তাবের সকল বর্ণনা লিপিবদ্ধ করার পাশাপাশি বিশেষ গুরুত্বের সাথে আমরাহ বিনতু আব্দির রহমানের (যিনি ছিলেন ঐ সময়ে আয়েশা রা.-এর বর্ণিত সর্বাধিক সংখ্যক হাদীসের সম্মানিত সংরক্ষক) হাদীসসমূহ সংগ্রহ করার জন্য খলিফা তাকে অনুরোধ করেছিলেন। সা'দ ইবনু ইবরাহীম ও ইবনু শিহাব যুহরীকেও গ্রন্থ রচনার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল; যুহরী পরিণত হন হাদীসের প্রথম সঙ্কলকে— যিনি বর্ণনাকারীদের চরিত্র ও সততা বিশ্লেষণসহ তাদের জীবন চরিত লিপিবদ্ধ করেছিলেন। এ যুগে মোটামুটি ব্যাপক পরিসরে হাদীসের সুশৃঙ্খল সঙ্কলনের কাজ শুরু হয়।
সাহাবীদের ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই গ্রন্থাকারে হাদীস লিপিবদ্ধ করেছেন।
নাবী ﷺ-এর সাহাবা ও তাদের ছাত্রদের মধ্যে যারা লিখিত আকারে হাদীস সঙ্কলন করেছেন তাদের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের হাদীস বর্ণনাকারী ১২ জনের তালিকা নিম্নে তুলে ধরা হলোঃ
* আবু হুরায়রা (৫৩৭৪)[১৩]: বর্ণিত আছে যে, নয় জন ছাত্র তার নিকট থেকে হাদীস লিখেছেন।
* ইবনু উমার (২৬৩০): আট জন ছাত্র তার নিকট থেকে হাদীস লিখেছেন।
• আনাস ইবনু মালিক (২২৮৬): ষোল জন ছাত্র তার নিকট থেকে হাদীস লিখেছেন।
• আয়েশা বিনতু আবী বাক্ (২২১০): তিন জন ছাত্র তার নিকট থেকে হাদীস লিখেছেন।
• ইবনু আব্বাস (১৬৬০): নয় জন ছাত্র তার নিকট থেকে হাদীস লিখেছেন।
• জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ (১৫৪০): চৌদ্দ জন ছাত্র তার নিকট থেকে হাদীস লিখেছেন।
• আবু সাঈদ খুদরী (১১৭০): তার কোনো ছাত্রই তার নিকট থেকে হাদীস লিখেননি।
• ইবনু মাসউদ (৭৪৮): তার কোনো ছাত্রই তার নিকট থেকে হাদীস লিখেননি।
• আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (৭০০): সাত জন ছাত্র তার নিকট থেকে হাদীস লিখেছেন।
• উমার ইবনুল খাত্তাব (৫৩৭): দাপ্তরিক চিঠিপত্রে তিনি অসংখ্য হাদীস লিপিবদ্ধ করেছেন।
• আলী ইবনু আবী তালিব (৫৩৬): আট জন ছাত্র তার নিকট থেকে হাদীস লিখেছেন।
• আবু মূসা আশ'আরী (৩৬০): তার কিছু হাদীস ইবনু আব্বাসের নিকট লিখিত আকারে সংরক্ষিত ছিল।
• বারা ইবনু আযিব (৩০৫): তার ব্যাপারে জানা যায় যে, তিনি তার ছাত্রদেরকে দিয়ে হাদীস লিখিয়েছেন।
আবু হুরায়রা-এর যে নয়জন ছাত্র লিখিত আকারে হাদীস সঙ্কলন করেছিলেন বলে জানা গেছে তাদের মধ্যে হাম্মাম ইবনু মুনাব্বিহ'র গ্রন্থটি পাণ্ডুলিপি আকারে সংরক্ষিত আছে এবং তা ড, মুহাম্মাদ হামিদুল্লাহ'র সম্পাদনায় ১৯৬১ সালে ভারতের হায়দ্রাবাদ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। [১৪]
টিকাঃ
[১২] সাহাবীদের পরবর্তী প্রজন্ম যারা সাহাবীদের তত্ত্বাবধানে অধ্যয়ন করেছেন, তাদেরকে তাবিঊন (অনুসারী বা উত্তরাধিকারী) নামে অভিহিত করা হয়, যেমন আবু হানিফা ও মুজাহিদ।
[১৩] এ তালিকায় এ সংখ্যাগুলো সংশ্লিষ্ট বর্ণনাকারীর বর্ণিত হাদীসের সামগ্রিক সংখ্যা নির্দেশক।
[১৪] স্টাডিজ ইন আরলি হাদীস লিটারেচারও
📄 তাবিয়ত তাবি‘ঈনদের যুগ
তাবি'তাবি'ঈদের পরবর্তী যুগে হাদীসসমূহকে সুশৃঙ্খল পাঠ আকারে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। প্রাচীনতম কীর্তিসমূহের অন্যতম হলো মালিক ইবনু আনাস (রহ.) কর্তৃক সঙ্কলিত আল মুয়াত্তা। ইমাম মালিকের সমসাময়িক বিশেষজ্ঞগণও হাদীসের অন্যান্য গ্রন্থ রচনা করেছেন; যেমন সিরিয়ার আওযায়ী, খুরাসানের আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, বসরার হাম্মাদ ইবনু সালামাহ এবং কুফার সুফিয়ান ছাওরী (রহ.) প্রমুখ। তবে সে সময়কার গ্রন্থসমূহের মধ্যে একমাত্র ইমাম মালিকের লেখা গ্রন্থটি আজো অবিকল সংরক্ষিত আছে। বলা যায়, এ যুগেই ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন কেন্দ্রে হাদীসের বেশীর ভাগ অংশ সংগৃহীত হয়েছে।
এই তিনটি প্রজন্মের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপের কারণ হলো, নাবী থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন-
“সর্বোত্তম প্রজন্ম আমার প্রজন্ম, তারপর তার পরবর্তী প্রজন্ম, অতঃপর তার পরবর্তী প্রজন্ম।”[১৬]
সুশৃংখলভাবে ও ব্যাপক পরিসরে গ্রন্থাকারে সঙ্কলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত হাদীসসমূহ এই তিন প্রজন্মের মাধ্যমেই সর্বপ্রথম মৌখিক ও লিখিত আকারে প্রচারিত হয়েছে।
টিকাঃ
[১৫] তাবি'ঈতাবি'ঈদের ছাত্রদের প্রজন্মকে তাবি'উত তাবি'ঈতাবি'ঈন নামে অভিহিত করা হয়, যেমন মালিক ইবনু আনাস।
[১৬] সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম।
📄 সহীহ হাদীস সঙ্কলনের যুগ (হিজরী তৃতীয় শতক)
হিজরী তৃতীয় শতকে এমন কতিপয় বিশেষজ্ঞের আবির্ভাব ঘটে যারা প্রথম দু' শতকে বর্ণিত ও সঙ্কলিত হাদীসসমূহের সমালোচনামূলক গবেষণার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তারা তাদের সে নীতির আলোকে যে সমস্ত হাদীসকে বিশুদ্ধ মনে করেছেন সেগুলোকে ইসলামী আইনের বিভিন্ন অধ্যায় বা শাখা অনুযায়ী সাজিয়ে দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, এ যুগেই রচিত হয়েছে ৭,২৭৫টি হাদীস সম্বলিত গ্রন্থ সহীহ বুখারী- যা ইমাম বুখারী (মৃত্যু ৬৭০ সাল) ৬,০০,০০০ হাদীস থেকে বাছাই করে লিপিবদ্ধ করেছেন। ৯,২০০টি হাদীস সম্বলিত গ্রন্থ সহীহ মুসলিম- যা ইমাম মুসলিম ৩,০০,০০০ হাদীস থেকে বাছাই করে গ্রন্থবদ্ধ করেছেন। হাদীসের এ দু'টি গ্রন্থ বাদেও এ যুগের আরো চারটি গ্রন্থ ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। সেগুলো হলো—ইমাম আবু দাউদ (মৃত্যু ৮৮৯ সাল), তিরমিযী (মৃত্যু ৮৯৩ সাল), নাসাঈ (মৃত্যু ৯১৬ সাল) ও ইবনু মাজাহ (মৃত্যু ৯০৮ সাল) রহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ সংকলিত সুনান গ্রন্থসমূহ।