📄 হাদীসের গুরুত্ব
ওয়াহী
নাবী-এর বক্তব্য ও কার্যাবলীর মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত ওয়াহী; আর এ কারণে কুরআনের পর হাদীসকে ইসলামের মৌলিক উৎস হিসেবে বিবেচনা করতে হয়। কুরআনে আল্লাহ তা'আলা নাবী সম্পর্কে বলেছেনঃ
وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَى ﴿۳﴾ إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى )
« সে নিজের খেয়ালখুশী মতো কথা বলে না। তা ওয়াহী ছাড়া আর কিছুই নয়, যা তাঁর কাছে প্রত্যাদেশ করা হয়। »
[সূরা আন নাজম, ৫৩: ৩-৪]
সুতরাং হাদীস হলো আসমানী হিদায়াতের একটি ব্যক্তিকেন্দ্রীক উৎস—যা আল্লাহ তাঁর নাবী-কে প্রদান করেন; আর আইনগত দিক থেকে তা স্বয়ং কুরআনেরই অনুরূপ। নাবী তাঁর একটি সংরক্ষিত বক্তব্যে এ বিষয়টির পুনরাবৃত্তি করেছেন— | “নিঃসন্দেহে আমাকে কুরআন কুরআনের অনুরূপ আরেকটি জিনিষ প্রদান করা হয়েছে।”[৭]
তাফসীর
কুরআনকে যে আল্লাহ হিফাজত করেছেন তা আমরা সকলেই জানি। তবে কুরআন হিফাজতের অর্থ কেবল কুরআনের শব্দাবলীকে পরিবর্তনের হাত থেকে সুরক্ষা দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শুধু শব্দ সুরক্ষার মধ্যে বিষয়টি সীমিত থাকলে এর দ্বারা কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য সফল হতো না; কারণ, মানুষ কুরআনের শব্দাবলীকে অবিকৃত রেখে তার অর্থ ও ব্যাখ্যাকে নিজের ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করে নিতে পারে। তাই স্বয়ং নাবী -এর ওপর কুরআনের অর্থের ব্যাখ্যা প্রদান করার দায়িত্ব অর্পণ করার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা কুরআনের মৌলিক অর্থসমূহকেও বিকৃতির হাত থেকে সুরক্ষা প্রদান করেছেন। কুরআনের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেন, وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ )
« আর এ বাণী আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানুষদের সামনে সেই শিক্ষা ব্যাখ্যা করে দাও, যা তাদের জন্য অবতীর্ণ করা হয়েছে। » [সূরা আন নাহল, ১৬: ৪৪]
অতএব কোনো ব্যক্তি কুরআনের অর্থ বুঝতে চাইলে তাকে অবশ্যই এ আয়াত প্রসঙ্গে নাবী কী বলেছেন তা বিবেচনায় রাখতে হব। দৃষ্টান্তস্বরূপ, কুরআনের দুই নং সূরা আল বাকারা'র ৪৩ নং আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ঈমানদারদেরকে সালাত কায়েম ও যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু কিভাবে সালাত কায়েম করতে হবে, কতটুকু পরিমাণ যাকাত দিতে হবে সে বিষয়ে কুরআনে কিছু বলেননি। তাই এসব নির্দেশ সঠিকভাবে পালন করতে হলে এ ব্যাপারে অবশ্যই নাবী-এর নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। সালাত ও যাকাত সম্পর্কে নাবী অনেক নির্দেশনা প্রদান করেছেন। সেগুলোর এক জায়গায় তিনি তাঁর উম্মাতকে এই মর্মে নির্দেশ প্রদান করেছেন:
| "তোমরা আমাকে যেভাবে সালাত আদায় করতে দেখো, সেভাবে সালাত আদায় করো”।[৮]
এবং সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে, নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে বেশি উদ্বৃত্ত সম্পদ একবছর কারও কাছে থাকলে তার শতকরা আড়াই ভাগ যাকাত প্রদান করতে হবে।[৯]
আইন-কানুন
লোকদের মধ্যকার বিবাদ-বিসংবাদের বিচার ফায়সালা করে দেয়া ছিল নাবী -এর প্রধানতম দায়িত্ব। যেহেতু তাঁর সিদ্ধান্তসমূহের ভিত্তি ছিল ওয়াহী তাই সেগুলোকে ইসলামী রাষ্ট্রে বিচারকার্য পরিচালনার মূলনীতিসমূহের একটি প্রধান উৎস হিসেবে অবশ্যই সামনে রাখতে হবে। ঈমানদারদের এ দায়িত্বের আলোচনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলাও কুরআনে বলেছেনঃ
(يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ)
«হে ঈমানদারগণ! আনুগত্য করো আল্লাহর এবং আনুগত্য করো তাঁর রাসূলের আর তোমাদের মধ্যে দায়িত্বশীলদের। এরপর যদি তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যাপারে বিরোধ দেখা দেয় তাহলে বিষয়টিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও।»
[সূরা আন নিসা, ৪: ৫৯]
ইসলামী রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছন্দ ও গতি সঞ্চার করার জন্য হাদীস অনুসরণ অনিবার্য।
নৈতিক আদর্শ
যেহেতু নাবী তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে সরাসরি ওয়াহী দ্বারা পরিচালিত ছিলেন, তাই তাঁর চরিত্র ও সামাজিক আচার ব্যবহার কিয়ামত পর্যন্ত সকল মুসলিমের জন্য নৈতিক আচরণের সর্বোত্তম উদাহরণ। কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতে এ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছেঃ
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ ) « নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রসূলের মধ্যে রয়েছে একটি উত্তম আদর্শ”।» [সূরা আল আহযাব, ৩৩: ২১]
এরই ফলে হাদীস গ্রন্থাবলীতে নাবী-এর প্রাত্যহিক জীবনের যেসব বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে তাতে রয়েছে সদাচরণের একটি আদর্শ নমুনা। নাবী-এর স্ত্রী আয়েশা-কে তাঁর চরিত্রের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জবাব দিয়েছিলেন, 'কুরআনই হলো তাঁর চরিত্র।' [১০]
ইসলামের সুরক্ষা
নাবী-এর যুগের আগ পর্যন্ত কোনো মানুষের বক্তব্য বর্ণনা, সংগ্রহ ও সমালোচনা সংক্রান্ত জ্ঞানের শাখাটি ছিল বিশ্ববাসীর নিকট অজানা একটি অধ্যায়। মূলত জ্ঞানের এ ধরনের নির্ভরযোগ্য কোনো শাখা না থাকার কারণেই পূর্বেকার নাবী রাসূলদের বাণীসমূহ পরবর্তী পর্যায়ে হারিয়ে গিয়েছে কিংবা বিকৃত হয়ে গিয়েছে। তাই এটা বলা যায় যে, প্রধানত হাদীস শাস্ত্রের কারণেই ইসলামের চূড়ান্ত বার্তা সব সময় আদি বিশুদ্ধতাসহ সুরক্ষিত রয়েছে। কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতে এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছেঃ
نَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ )
« আমিই এই স্মারক (কুরআন) নাযিল করেছি, আর আমিই এর সংরক্ষণকারী।» [সূরা আল হিজর, ১৫: ৯]
টিকাঃ
[৭] হাদীসটির পূর্ণাঙ্গ পাঠ নিম্নরূপঃ
عن المقدام بن معدي كرب عن رسول الله صلى الله عليه و سلم انه قال الا انى اوتيت الكتاب و مثله معه الا يوشك رجل شبعان على اريكته يقول عليكم بهذا القرآن فما وجدتم فيه من حلال فاحلوه و ما وجدتم فيه من حرام فحرموه الا لا يحل لكم لحم الحمار الاهلى و لاكل ذي ناب من السبع و لا لقطة معاهد الا ان يستغنى عنها صاحبها و من نزل بقوم فعليهم ان يقروه فان لم يقروه فله ان يعقبهم بمثل قراه
[৮] হাদীসটির পূর্ণাঙ্গ পাঠ নিম্নরূপঃ مالك بن الحويرث قال اتينا النبي صلى الله عليه و سلم و نحن شبيبة متقاربون فاقمنا عنده عشرين ليلة و كان رسول الله صلى الله عليه و سلم رفيقا فلما ظن انا قد اشتهينا اهلنا أو قد اشتقنا سالنا عمن تركنا بعدنا فاخبرناه قال ارجعوا الى اهليكم فاقيموا فيهم و علموهم و مروهم و ذکر اشياء احفظها أو لا احفظها و صلوا كما رأيتمونى اصلى فاذا حضرت الصلوة فليؤذن لكم احدكم و ليؤمكم اكبركم
সহীহ বুখারী, খণ্ড ১, পৃ, ৩৪৫, নং ৬০৪।
[৯] কোন সম্পদ কী পরিমাণ থাকলে তার যাকাত কখন দিতে হবে-এ ব্যাপারে নবী বেশ কয়েকটি প্রামাণ্য হাদীসে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। আলী ইবনু আবী তালিবের নিম্নোক্ত বর্ণনাটি সেসব হাদীসের অন্যতমঃ
عن على رضى الله عنه عن النبي صلى الله عليه و سلم قال: "فاذا كانت لك ماتا درهم و حال عليها الحول ففيها خمسة دراهم و ليس عليك شيئ يعنى في الذهب حتى يكون لك عشرون دينارا فاذا كان لك عشرون دينارا و حال عليها الحول ففيها نصف دينار فما زاد فبحساب ذلك قال فلا ادرى اعلى يقول فبحساب ذلك او رفعه الى النبي صلى الله عليه و سلم و ليس فى مال زكاة حتى يحول عليها الحول الا ان جريرا قال ابن وهب يزيد في الحديث عن النبي صلى الله عليه وسلم ليس فى مال زكاة حتى يحول عليها الحول
'আলী ইবনু আবী তালিব আল্লাহর রাসূল -এর নিম্নোক্ত বক্তব্যের উদ্ধৃতি প্রদান করেছেন, "যদি তোমার কাছে ২০০ দিরহাম থাকে এবং তার ওপর এক বছর অতিক্রান্ত হয়, তাহলে এর জন্য ৫ দিরহাম যাকাত দিতে হবে। তার অতিরিক্ত কোনো যাকাত তোমাকে প্রদান করতে হবে না, যতক্ষণ না তুমি ২০ দিনারের মালিক হও এবং তার ওপর এক বছর অতিক্রান্ত হয়; এ ক্ষেত্রে তোমাকে অর্ধেক দিনার যাকাত দিতে হবে। এর বাড়তি যা হবে- তা এভাবেই হিসেব করতে হবে। আর কোনো সম্পদের ওপর যাকাত নেই, যতক্ষণ না তার ওপর এক বছর অতিক্রান্ত হয়।” (সুনানু আবী দাউদ, খণ্ড ২, পৃ, ৪১১, নং ১৫৬৮; নাসিরুদ্দীন আলবানী তার সহীহ সুনানু আবী দাউদ গ্রন্থে (খণ্ড ১, পৃ, ৪৩৬, নং ১৫৭৩) এ হাদীসটিকে প্রামাণ্য আখ্যায়িত করেছেন।
[১০] হাদীসটির পূর্ণাঙ্গ পাঠ নিম্নরূপঃ
عن سعد بن هشام بن عامر قال اتيت عائشة فقلت يا ام المؤمنين اخبرني عن خلق رسول الله صلى الله عليه و سلم قالت كان خلقه القرآن اما تقرا القرآن قول الله عز وجل و انك لعلى خلق عظيم قلت فاني اريد ان اتبتل قالت لا تفعل اما تقرا لقد كان لكم في رسول الله اسوة حسنة فقد تزوج رسول الله صلى الله عليه و سلم و قد ولد له মুসনাদু আহমাদ, নং ২৩৪৬০, সিডি।
📄 হাদীস ও সুন্নাহ
অনেক ক্ষেত্রেই 'হাদীস' শব্দটি 'সুন্নাহ' শব্দের প্রতিশব্দে পরিণত হয়েছে, যদিও উভয়ের অর্থের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আরবি অভিধান বিশারদদের মতে, সুন্নাহ শব্দের অর্থ হলো—‘পথ; প্রবাহ; নীতি; কর্ম বা জীবনপদ্ধতি’। [১১] হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা হিসেবে সুন্নাহ শব্দ দ্বারা নাবী -এর প্রত্যেকটি বক্তব্য, ক্রিয়াকলাপ, অনুমোদন ও দৈহিক কিংবা চরিত্রগত বর্ণনাকে বুঝানো হয়; এতে তাঁর নুবুয়্যাত লাভের পূর্বের কিংবা পরের জীবনচরিতও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ দিক থেকে সুন্নাহ শব্দটি হাদীস শব্দের সমার্থবোধক।
তবে ইসলামী আইন শাস্ত্র অনুযায়ী, সুন্নাহ শব্দটি কেবল নাবী -এর কথা, কাজ ও মৌন সম্মতির জন্য প্রযোজ্য। শারী'আহ'র প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত বিধানের ক্ষেত্রেও সুন্নাহ শব্দটি প্রযোজ্য; তখন তা বিদ'আত শব্দের বিপরীত অর্থ প্রকাশ করে। আর আইন শাস্ত্রে সুন্নাহ শব্দ দ্বারা এমন সব বিষয়কে বুঝানো হয় যেগুলোর সানাদ প্রামাণ্য সূত্রে নাবী পর্যন্ত পৌঁছেছে; যা পালন করলে পুরস্কার পাওয়া যাবে, কিন্তু পালন করতে না পারলে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে না। এ শব্দটি বিদ'আত শব্দের বিপরীত অর্থবোধক শব্দ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়; যেমন বলা হয়, সুন্নাহ তালাক ও বিদ'আত তালাক।
সাধারণ সংজ্ঞানুযায়ী কুরআন হলো সুন্নাহর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা নাবী উম্মাহর নিকট পৌঁছে দিয়েছেন। [১২] আরো বলা যেতে পারে যে, হাদীসসমূহ ছিল এমন কিছু পাত্র যার মাধ্যমে নাবী -এর সুন্নাহ তাঁর জীবদ্দশায় ও তাঁর ইন্তেকালের পর আমাদের নিকট পৌঁছে দেয়া হয়েছে।
টিকাঃ
[১১] লেইন'স লেক্সিকন, খণ্ড ১, পৃ, ১৪৩৮।
[১২] আল বিদ'আহ, পৃ, ৬৭।