📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ 📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা) রাতে, ঘুমের সময়, ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে এবং বিছানা ত্যাগের সময় যে আমল করতেন

📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা) রাতে, ঘুমের সময়, ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে এবং বিছানা ত্যাগের সময় যে আমল করতেন


৫১৯. নবী -এর একজন সাহাবী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক সফরে নবী -এর সাথে সাক্ষাত করলাম। এরপর নবী এশার সালাত পড়ে শুয়ে পড়লেন। রাতের কিছু অংশ নিদ্রা যাওয়ার পর তিনি ঘুম থেকে জাগলেন এবং আসমানের দিকে দৃষ্টিপাত করে সূরা আল ইমরানের ১৯২-১৯৪ আয়াত পাঠ করলেন। সাহাবী বলেন, অতপর রাসূলুল্লাহ্ তাঁর হাত মুবারক তাঁর থলের দিকে বাড়ালেন এবং তা থেকে মিস্তয়াক বের করলেন, অতপর ওযু করলেন, তারপর দাঁড়ালেন এবং সালাত পড়লেন। তিনি কিছুক্ষণ নামায পড়লেন, অতপর সালাম ফিরালেন তারপর শুয়ে পড়লেন। তিনি পুনরায় ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে প্রথমবারের মত আমল করলেন। তিনি তিনবার এইরূপ আমল করছিলেন।
৫২০. হুমায়দ ইব্‌ন আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (র) থেকে বর্ণিত যে, একজন সাহাবী বললেন, রাসূলুল্লাহ্ রাতে ঘুম থেকে জাগ্রত হলেন এবং আকাশ পানে তাকিয়ে সূরা আল ইমরানের ১৯২-১৯৪ আয়াত পাঠ করলেন। তারপর তিনি মিসওয়াক নিলেন এবং ওযু করলেন, এরপর দাঁড়ালেন এবং সালাত পড়লেন। তারপর শুয়ে পড়লেন এবং ঘুমিয়ে গেলেন। আবার তিনি পূর্বের ন্যায় আমল করলেন।
৫২১. জাসারা (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবূ যার (রা)-কে বলতে শুনেছি যে, একবার নবী রাতের সালাতে কুরআনের একটি আয়াত পড়তে পড়তে ভোরে উপনীত হলেন। আয়তটি হলো: "(হে আল্লাহ্!) আপনি যদি তাদের শাস্তি দেন তবে তারা আপনারই বান্দা; আর যদি ক্ষমা করেন তবে আপনি তো সর্বজয়ী ও সর্বজ্ঞ" (সূরা মাইদাঃ ১১৮)।
৫২২. হযরত আবূ যার গিফারী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একরাতে নবী -এর সাথে সালাত পড়েছি। তিনি সালাতে দাঁড়ালে আমিও তাঁর সাথে দাঁড়িয়ে গেলাম। তাঁর দীর্ঘ সালাতের কারণে আমি আমার মাথা দেওয়ালের সাথে ঠুকতে লাগলাম।
৫২৩. আতা (র) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আয়েশা (রা) বলেন, এক রাতে নবী বললেন, হে আয়েশা! আমাকে অনুমতি দাও, আমি আমার প্রভুর ইবাদত করি। অতপর তিনি উঠে ওযু করলেন, অতপর দাঁড়িয়ে কুরআন পড়লেন। তিনি অঝোরে কাঁদলেন। আয়েশা (রা) বলেন, অতপর বিলাল (রা) এসে তাঁকে ফজরের সালাত পড়ার কথা বললেন। নবী বললেন, আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না? আজ রাতে আমার উপর সূরা আল ইমরানের ১৯০-১৯১ আয়াত নাযিল হয়েছে। ধ্বংস সেই ব্যক্তির জন্য যে এই আয়াত তিলাওয়াত করে অথচ তার সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে না।
৫২৪. কুরায়ব (র) ইব্‌ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাতের অর্ধেক অতিবাহিত হলে রাসূলুল্লাহ্ জাগ্রত হলেন। তিনি মুখমণ্ডলে হাত মলে ঘুমের রেশ দূর করলেন, তারপর সূরা আলে ইমরানের শেষ দশটি আয়াত তিলাওয়াত করলেন। তারপর ওযু করে সালাত পড়তে দাঁড়ালেন। তিনি দুই রাকআত দুই রাকআত করে সালাত পড়লেন, তারপর বেতের পড়লেন, এরপর শুয়ে পড়লেন। যখন মুয়াযযিন এলো তিনি উঠে সংক্ষেপে দুই রাকআত ফজরের সুন্নত সালাত পড়লেন।
৫২৫. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ রাতের প্রথম ভাগে ঘুমাতেন এবং শেষভাগে ইবাদত-বন্দেগী করতেন।
৫২৬. হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, নবী বলেন : আমার নিকট সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হলো রাতের বেলা দাঁড়িয়ে আল্লাহর ইবাদত করা।
৫২৭. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ কখনও গোটা রাত ধরে কুরআন পড়লে কেবল সূরা বাকারা, আলে ইমরান ও নিসা পর্যন্তই পড়তে পারতেন এবং সুসংবাদ সম্বলিত আয়াত আসলে সেখানে থেমে দু'আ করতেন।
৫২৮. আয়েশা (রা) বলেন, নবী উঠে দাঁত মাজতেন এবং ওযু করতেন। তারপর দাঁড়িয়ে নয় রাকআত, তারপর দুই রাকআত সালাত পড়তেন। রোগাক্রান্ত হওয়ার ফলে যখন তিনি রাতের বেলা সালাত পড়তে অক্ষম হয়ে পড়েছিলেন, তখন দিনের বেলা বার রাকআত সালাত পড়ে নিতেন।
৫২৯. হযরত আবূ সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ রাতে নফল সালাত পড়তে দাঁড়ালে প্রথমে এই দু'আ পাঠ করতেন: “হে আল্লাহ্! জিব্রাঈল, মীকাঈল ও ইসরাফীলের প্রভু... যে সত্যকে নিয়ে তারা মতভেদ করছে আমাকে তুমি সেই সত্যের দিকে পথ দেখাও।"
৫৩০. হুযায়ফা (রা) থেকে বর্ণিত, নবী তাহাজ্জুদের সালাতে সূরা বাকারা তিলাওয়াত করলেন। তিনি রুকু ও সিজদাও দীর্ঘায়িত করতেন। এভাবে তিনি চার রাকআত সালাত পড়লেন এবং তাতে সূরা বাকারা, সূরা আলে ইমরান, সূরা নিসা ও সূরা মায়িদা তিলাওয়াত করলেন।
৫৩১. হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ রাতের বেলা তাঁর জায়নামায থেকে আকাশ পানে তাকাতেন এবং কুরআনের আয়াত পাঠ করতেন: "আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে..." শেষ পর্যন্ত।
৫৩২. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ ঘুম থেকে জেগে বিছানার উপর বসলেন। তারপর মাথা আকাশের দিকে উঠিয়ে তিনবার বললেন, “সুবহানাল মালিকিল কু'দূস"। এরপর সূরা আলে ইমরানের শেষ আয়াতগুলো পড়লেন। সালাত শেষে তিনি নূরের জন্য দু'আ করতেন।

📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ 📄 নবী (সা)-এর কিরাআতের বর্ণনা

📄 নবী (সা)-এর কিরাআতের বর্ণনা


৫৩৩. ইয়ালা ইব্‌ন মুমাল্লাক (র) থেকে বর্ণিত। উম্মে সালামা (রা) বলেন, নবী রাতে সালাত পড়তেন আবার সালাত পড়ার সমপরিমাণ সময় ঘুমাতেন। তারপর উম্মে সালামা (রা) আমাকে নবী কিভাবে কিরাআত পড়তেন তা পড়ে শোনালেন—তাঁর কিরাআত পাঠ ছিলো এমন যে প্রতিটি অক্ষর পরিষ্কারভাবে উচ্চারিত হতো।
৫৩৪. মাকহুল (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আনাস (রা)-কে নবী -এর কুরআন পাঠের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, তাঁর কিরাআত পাঠ ছিলো কিছুটা গুণগুণ শব্দে।
৫৩৫. ইকরামা (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ এতটা উচ্চৈঃস্বরে কুরআন তিলাওয়াত করতেন যে, ঘরে অবস্থানকারীগণ তা শুনতে পেতো।
৫৩৬. আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ রাতের বেলা কখনও উচ্চৈঃস্বরে আবার কখনও নিম্নস্বরে কুরআন পাঠ করতেন।
৫৩৭. উম্মে হানী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার কোঠার ছাদের উপর থেকে রাসূলুল্লাহ্-এর কুরআন পাঠ শুনতে পেতাম।
৫৩৮. আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবু কায়স (রা) থেকে বর্ণিত, আয়েশা (রা) বলেন, তিনি উভয়রূপেই কিরাআত পড়তেন, কখনোও সশব্দে আবার কখনোও নিঃশব্দে।
৫৩৯. কুরাইব (র) থেকে বর্ণিত, ইব্‌ন আব্বাস (রা) বললেন, রাসূলুল্লাহ্ তাঁর কোঠার মধ্যে এমনভাবে কুরআন পাঠ করতেন যে, কোন মুখস্থকারী তা শুনে মুখস্থ করতে চাইলে তা করতে পারতো।
৫৪০. কাতাদা (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আনাস (রা)-এর নিকট জিজ্ঞেস করলাম, রাসূলুল্লাহ্-এর কিরাআত পাঠ কিরূপ ছিলো? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ্ শব্দ করে ও ধীরেসুস্থে কুরআন পাঠ করতেন।

📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ 📄 নবী (সা)-এর মুজাহাদা (সাধনা), ইবাদত, বিনয় ও দীর্ঘ কিয়াম করার বর্ণনা

📄 নবী (সা)-এর মুজাহাদা (সাধনা), ইবাদত, বিনয় ও দীর্ঘ কিয়াম করার বর্ণনা


৫৪১. আয়েশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ কখনও গোটা রাত ধরে কুরআন পড়লে কেবল সূরা বাকারা, আলে ইমরান ও নিসা পর্যন্তই পড়তে পারতেন এবং সুসংবাদ সম্বলিত আয়াত আসলে সেখানে থেমে দু'আ করতেন।
৫৪২. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী বললেন, গত রাতে আমি ব্যথাসহ সাতটি দীর্ঘ সূরা তিলাওয়াত করেছি।
৫৪৩. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী রাতের বেলা সালাতে এত দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেন যে, তাঁর পদদ্বয় ফেটে যেতো। আমি জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না?
৫৪৪. মুগীরা ইব্‌ন শুবা (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী এত দীর্ঘ সময় ধরে সালাত পড়তেন যে, তাঁর পদদ্বয় ফুলে গিয়েছিলো।
৫৪৫. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ এত অধিক ইবাদত করেছেন যে, তিনি একটি পুরাতন মশকের ন্যায় দুর্বল হয়ে যান।
৫৪৬. আতা (র) থেকে বর্ণিত, আয়েশা (রা) বলেন, নবী এক রাতে নামাযে অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকলেন, এমনকি অশ্রুতে তাঁর কোল ভিজে গেলো। নবী বললেন, আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না?
৫৪৭. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক রাতে আমি তাঁকে সিজদায় বলতে শোনলামঃ "আমার দেহ ও খেয়াল আপনাকে সিজদা করেছে, আমার অন্তর আপনার উপর ঈমান এনেছে। প্রভু! আমার বিরাট গুনাহ মাফ করে দিন।"
৫৪৮. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন শিখখীর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী -কে সালাত রত অবস্থায় দেখেছি যে, তাঁর বুক থেকে আগুনের তপ্ত হাঁড়ির (বাষ্পের) আওয়াজের ন্যায় আওয়াজ নির্গত হচ্ছিল।
৫৪৯. হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বদরের যুদ্ধকালে রাসূলুল্লাহ্ একটি গাছের তলায় সালাত পড়ছেন এবং কাঁদছেন—এভাবে ভোর হয়ে যায়।
৫৫০. হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ বদর যুদ্ধের গোটা রাত সালাতে কাটিয়ে দিলেন।
৫৫১. হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনু শিখীর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী -এর পেছনে সালাত পড়লাম এবং তাঁর বুক থেকে আগুনের তাপিত হাঁড়ির আওয়াজের ন্যায় আওয়াজ বের হচ্ছিল।
৫৫২. হযরত জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী সালাতে আল্লাহর কাছে বিনয় প্রকাশ করতেন এবং তাঁর একত্ববাদের সাক্ষ্য দিতেন।
৫৫৩. হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক রাতে নবী -এর সফর সঙ্গী ছিলাম। তিনি "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম" তিলাওয়াত করলেন এবং কাঁদতে কাঁদতে ভূমিতে লুটিয়ে পড়লেন।
৫৫৪. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ অত্যন্ত কষ্ট করে দাঁড়ানো অবস্থায় ইবাদত করতেন। তাঁর বয়স বেড়ে গেলে প্রায়ই বসে বসে সালাত পড়তেন।
৫৫৫. হযরত আবুল মুতাওয়াক্কিল (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক রাতে রাসূলুল্লাহ্ তাহাজ্জুদের সালাতে একটি আয়াত বারংবার তিলাওয়াত করতে থাকেন।

📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ 📄 নবী (সা)-এর পানাহার, বিবাহ ও দাম্পত্য জীবনের শিষ্টাচার

📄 নবী (সা)-এর পানাহার, বিবাহ ও দাম্পত্য জীবনের শিষ্টাচার


৫৫৬. হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ কখনো কোনো খাদ্যদ্রব্যের দোষত্রুটি বর্ণনা করতেন না। (কোনো খাদ্যে) রুচি হলে তিনি খেতেন অন্যথায় তা বর্জন করতেন।
৫৫৭. হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে এ বিষয়ে অন্য সনদে অনুরূপ একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
৫৫৮. হযরত আবু ইয়াহ্ইয়া (রা) থেকে এ বিষয়ে অনুরূপ একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
৫৫৯. হযরত হাসান ইবন আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হিন্দ ইবন আবু হালা (রা)-এর নিকট নবী ﷺ-এর গুণাবলি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নবী ﷺ কখনও কোনো খাদ্যের বদনামও করতেন না এবং প্রশংসাও করতেন না।
৫৬০. হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ কখনো কোনো খাদ্যদ্রব্যের বদনাম করতেন না। তাঁর রুচি হলে তিনি তা খেতেন এবং কখনও অরুচি হলে তা বর্জন করতেন।
৫৬১. হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ﷺ-এর সামনে কোনো খাদ্যদ্রব্য পেশ করা হলে তাঁর মনে চাইলে তিনি তা আহার করতেন, অন্যথায় কোনো মন্তব্য করতেন না।
৫৬২. হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-কে কখনও কোনো খাদ্যের ত্রুটি নির্দেশ করতে দেখিনি। কোনো খাদ্যে তাঁর রুচি হলে তিনি তা আহার করতেন, আর রুচি না হলে বর্জন করতেন।
৫৬৩. হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ কখনও কোনো খাদ্যের ত্রুটি নির্দেশ করেননি, আগ্রহ হলে খেতেন অন্যথায় বর্জন করতেন।

ফায়দা : উল্লেখিত হাদীসসমূহ থেকে জানা যায় যে, খাদ্যদ্রব্যের দোষ খুঁজে বেড়ানো উচিত নয়। সর্বপ্রকারের খাদ্য আল্লাহ্ প্রদত্ত রিযিক। কারো কোনো খাদ্যের প্রতি আকর্ষণবোধ করলে তা খাবে, অন্যথায় খাবে না। খাদ্যের ত্রুটি নির্দেশ করা বা তাতে দোষ খুঁজে বেড়ানো আল্লাহ্ প্রদত্ত রিযিকের প্রতি অকৃতজ্ঞ হওয়ার শামিল। এরূপ আচরণ করা উচিত নহে।

৫৬৪. আ'মাশ (র) থেকে এ বিষয়ে অনুরূপ একখানা হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
৫৬৫. হযরত উবাই ইবনু কা'ব (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী ﷺ আহারের সময় হাঁটু উঁচু করে বসতেন এবং হেলান দিয়ে বসতেন না।

ফায়দা : এই ছিলো নবী ﷺ-এর আহার করার বিনীত ও ভদ্র পন্থা। কিন্তু তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর আদর্শ অনুসরণের দাবিদার আমরা মুসলিমগণ একবার নিজেদের আচরণ ও কার্যকলাপের প্রতি দৃষ্টিপাত করি। পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি আজ আমাদেরকে মারাত্মকভাবে পর্যুদস্ত করে দিয়েছে, তা আমাদের জীবনাচারের অংশে পরিণত হয়েছে। বড় বড় ভোজসভায় টেবিলের চারদিকে জড়ো হয়ে চক্কর দিয়ে শুধু খাওয়া আর খাওয়া। মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন : "কিন্তু যারা কুফরী করে, ভোগবিলাসে মগ্ন থাকে এবং চতুষ্পদ জন্তুর মতো উদর পূর্তি করে তাদের নিবাস জাহান্নাম" (সূরা মুহাম্মদ: ১২)। আল্লাহ্ তা'আলার উপরোক্ত বাণী ওই সব লোকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

৫৬৬. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ যখন আহার করতেন তখন নিজের সামনের দিক থেকে খাবার খেতেন।

ফায়দা: খাদ্যের পাত্র থেকে নিজের নিকটবর্তী খাবার গ্রহণ এবং অপরের নিকটবর্তী খাবার তার জন্য রাখা পানাহারের শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। অপরের সামনের খাবার নেওয়া খুবই আপত্তিকর। নবী ﷺ তাঁর বাস্তব কর্মের মাধ্যমে আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছেন।

৫৬৭. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর নিকট সর্বাধিক প্রিয় খাদ্য ছিলো শাকসব্জি ও তরিতরকারি।
৫৬৮. হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনু জা'ফর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন: গোশতের মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে পিঠের গোশত।
৫৬৯. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন জাফর (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী ﷺ এ বিষয়ে অনুরূপ বলেছেন।
৫৭০. হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনু সাইব ইবনু খাব্বাব (রা) পর্যায়ক্রমে তাঁর পিতা ও তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি (খাব্বাব) বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-কে রোদে শুকনো গোশত একটি পাত্রে নিয়ে আহার করতে দেখেছি। তারপর তিনি পানি ভর্তি একটি মাটির পাত্রের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং পানি পান করলেন।
৫৭১. হযরত জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর সাথে রোদে শুকানো গোশত খেয়েছি।
৫৭২. আবদুল হাকাম (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন জা'ফর (রা) লক্ষ করলেন যে, আমি পাত্রের এখান সেখান থেকে বিক্ষিপ্তভাবে আহার গ্রহণ করছি। আমি তখন বালক ছিলাম। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ যখন আহার করতেন তখন তাঁর হাত পাত্রের মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরতো না।

ফায়দা: পানাহারের শিষ্টাচার এই যে, আহার গ্রহণকারী তার সামনের খাবার থেকে গ্রহণ করবে, অপরের সামনের খাবার তুলে নিবে না এবং পাত্রের মধ্যেও বিক্ষিপ্তভাবে হাত চালনা করবে না। কারণ তা অভদ্রতা এবং সুন্নতের পরিপন্থী, যা পছন্দনীয় হতে পারে না। তবে বিভিন্ন পাত্রে রকমারি খাদ্য থাকলে তা দূরে হলেও অগ্রসর হয়ে তা থেকে পরিমাণমতো তুলে নেওয়ায় দোষ নেই।

৫৭৩. হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমরা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। ইত্যবসরে একপাত্র খাদ্য এনে তাঁর সামনে রাখা হলো। কিন্তু আহার গ্রহণে তিনি তাঁর হাতকে বিরত রাখলেন দেখে আমরাও আমাদের হাত গুটিয়ে রাখলাম। কারণ আমরা কখনও রাসূলুল্লাহ্-এর স্পর্শ করার আগে খাদ্যের পাত্রে হাত দিতাম না। এ সময় এক বেদুঈন দৌড়াতে দৌড়াতে এসে হাযির হলো যেনো তাকে তাড়িয়ে বেড়ানো হচ্ছে। সে উপস্থিত হয়েই খাদ্যের পাত্রে হাত বাড়ালো। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ তার হাত ধরে ফেললেন এবং তাকে বসিয়ে দিলেন। তারপর এক মেয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে এসে উপস্থিত হলো। সেও খাদ্যের পাত্রে হাত দিতে উদ্যত হলো। নবী ﷺ তার হাতও ধরে ফেললেন। তারপর বললেন, কোনো খাবার আল্লাহ্ নাম নিয়ে গ্রহণ না করা হলে তাতে শয়তান অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। শয়তান আমাদেরকে খাবারের পাত্রে হাত ঢুকাতে বিরত থাকতে দেখে খাদ্যে ভাগ বসাবার উদ্দেশ্যে এক বেদুঈনকে ধরে নিয়ে এসেছে। (কিন্তু আমি তার হাত ধরে ফেললে) সে খাদ্য গ্রহণের সুযোগ লাভের জন্য পুনরায় এই মেয়েকে হাঁকিয়ে নিয়ে এসেছে। সেই সত্তার কসম যিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ্ নেই। এখন এই মেয়ের হাতের সাথে শয়তানের হাতও আমার মুঠোর মধ্যে।

ফায়দা : উপরোক্ত হাদীস থেকে জানা যায় যে, 'বিসমিল্লাহ্' বলে পানাহার শুরু করা উচিত। অন্যথায় খাদ্যের বরকত কমে যায় এবং শয়তান পানাহারে শরীক হয়।

৫৭৪. হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর সাথে একত্রে আহার করলে তিনি আহার শুরু না করা পর্যন্ত আমরা শুরু করতাম না।

ফায়দা : বিভিন্ন হাদীস থেকে জানা যায় যে, সাহাবায়ে কিরাম (রা) রাসূলুল্লাহ্-এর আগে কোনো মজলিসে পানাহার শুরু করতেন না।

৫৭৫. হযরত ইকরামা (রা) বলেন, সাঈদ ইব্‌ন জুবায়র (রা) খাদ্য তৈরি করালেন, তারপর ইবন আব্বাস (রা)-কে এই বলে দাওয়াত পাঠালেন যে, আপনি আপনার পরিবারের যাকে খুশি সাথে করে নিয়ে আসুন। রাবী বলেন, ইব্‌ন আব্বাস (রা) এসে উপস্থিত হলেন এবং বললেন, কারো উপর হুকুম চালানো আমি পছন্দ করি না। অবশ্য আমি আপনাকে আমাদের পরিবারের লোকই মনে করি। তাই আমাদের জন্য 'সারীদ' নিয়ে আসুন। কারণ রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর নিকট খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে রুটির সারীদই ছিলো সর্বাধিক পছন্দনীয়।
৫৭৬. হযরত আবূ যিয়াদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়েশা (রা)-এর নিকট পিয়াজ খাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বলেন, নবী ﷺ সর্বশেষ যে খাদ্য গ্রহণ করেছেন তাতে পিয়াজ ছিলো।
৫৭৭. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ আহারের পর তাঁর হাতের আঙুল চাটতেন।
৫৭৮. হযরত কা'ব ইবন উজরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী ﷺ-কে আহারের পর আঙুল চাটতে দেখেছি।
৫৭৯. হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ যখন আহার করতেন তখন তাঁর আঙুল চাটতেন।
৫৮০. হযরত কা'ব ইবন মালিক (রা) বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ﷺ তিন আঙুল দ্বারা আহার গ্রহণ করতেন এবং হাত না চাটা পর্যন্ত তা মুছতেন না।

ফায়দা : উপরোক্ত হাদীসসমূহ থেকে জানা যায় যে, আহারের পর হাত ধৌত করার পূর্বে হাতে বা আঙুলে লেগে থাকা আহারের অংশ চেটে খাওয়া উত্তম।

৫৮১. হযরত কাব ইব্‌ন উজরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-কে তাঁর তিন আঙুল অর্থাৎ বৃদ্ধাঙুল, তর্জনি ও মধ্যমা আঙুলের সাহায্যে আহার করতে দেখেছি। আরও দেখেছি যে, তিনি আঙুলগুলো মোছার পূর্বে চেটেছেন। মধ্যমা ও তর্জনিও যার অন্তর্ভুক্ত ছিলো।
৫৮২. হযরত কা'ব ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ তিন আঙুলের সাহায্যে আহার করতেন।
৫৮৩. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী ﷺ তিন নিঃশ্বাসে পানি পান করতেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px