📄 ঘুমানোর পূর্বে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চোখে সুরমা লাগানোর বর্ণনা
৫০০. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট 'ইসমিদ' নামক সুরমা ছিলো। তিনি ঘুমানোর পূর্বে তা প্রত্যেক চোখে তিনবার করে লাগাতেন।
৫০১. হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী-এর একটি সুরমাদানি ছিলো। তিনি ঘুমানোর পূর্বে তা থেকে প্রত্যেক চোখে তিনবার করে সুরমা লাগাতেন।
৫০২. হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর একটি সুরমাদানি ছিলো। তিনি ঘুমানোর সময় তা থেকে তিনবার করে প্রত্যেক চোখে সুরমা লাগাতেন।
৫০৩. হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ প্রত্যেক চোখে দুইবার করে সুরমা লাগাতেন, তারপর পরবর্তী কাঠি উভয় চোখে একবার লাগাতেন।
৫০৪. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর নিকট কালো সুরমা ছিলো। তিনি ঘুমানোর জন্য বিছানায় গিয়ে এই চোখে তিনবার এবং ওই চোখে তিনবার সুরমা লাগাতেন।
৫০৫. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ তাঁর ডান চোখে তিনবার এবং বাম চোখে তিনবার 'ইস্মিদ' নামক সুরমা লাগাতেন।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আয়না দেখা, চুলে চিরুনি করা এবং মাথায় তৈল মাখার বর্ণনা
৫০৬. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আয়নায় দর্শনকালে বলতেন: হে আল্লাহ্! আমার দৈহিক গঠন যেমন সুন্দর করেছো তেমনি আমার চরিত্রকে সুন্দর করো।
৫০৭. হযরত কাতাদা (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী রাতের বেলা ঘুমানোর উদ্দেশ্যে বিছানায় গিয়ে তাঁর ওযুর পানি, মিস্তয়াক ও চিরুনি এক পাশে রেখে দিতেন। তারপর মহান আল্লাহ্ যখন তাঁকে রাতের বেলা ঘুম থেকে জাগাতেন তখন তিনি মিস্তয়াক করতেন, ওযু করতেন এবং মাথায় চিরুনি করতেন।
৫০৮. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ রাতের বেলা ঘুমানোর উদ্দেশ্যে বিছানায় গেলে তাঁর জন্য তাঁর মিস্তয়াক, ওযুর পানি ও চিরুনি এক পাশে রেখে দেওয়া হতো। তারপর মহান আল্লাহ্ যখন রাতের বেলা তাঁকে ঘুম থেকে জাগাতেন তখন তিনি মিস্ওয়াক করতেন, ওযু করতেন এবং চিরুনি দিয়ে মাথা আঁচড়াতেন।
৫০৯. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন কোন যুদ্ধে যেতেন আমি তাঁর সফরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে দিতাম। আমি তাঁর সাথে যেসব জিনিস দিতাম তার অন্তর্ভুক্ত থাকত তেল, চিরুনি, আয়না, কাঁচি, সুরমাদানি ও মিসওয়াক।
৫১০. হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আয়না দেখার সময় বলতেনঃ "সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমার দেহসৌষ্ঠব ও উত্তম চরিত্র দান করেছেন এবং আমাকে সেই সৌন্দর্য দান করেছেন যা ত্রুটিপূর্ণ দেহের লোকদের দান করা হয়নি।"
৫১১. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন আয়নার উপর দৃষ্টিপাত করতেন তখন বলতেন: "সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমায় পরিপূর্ণভাবে সৃষ্টি করেছেন, আমার মুখমণ্ডলকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছেন এবং আমাদের মুসলিম বানিয়েছেন।"
৫১২. হযরত ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী ইহ্রাম অবস্থায় আয়নায় দর্শন করতেন।
৫১৩. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ তাঁর মাথায় পর্যাপ্ত পরিমাণ তেল মাখতেন।
৫১৪. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী মাথার চুল ও দাড়ি পানি দ্বারা বারবার পরিপাটি করতেন। অতপর তিনি মাথার এক টুকরা কাপড় জড়াতেন। তা একেবারে তেল চিটচিটে হয়ে যেত।
৫১৫. হযরত জাবির ইবন সামুরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ -এর মাথার সামনের এবং দাড়ির সামনের দিকের কয়েকটি চুল সাদা হয়ে গিয়েছিলো। তিনি মাথার সামনের দিকের চুলে চিরুনি করলে এবং তেল লাগালে উক্ত চুল আর দৃষ্টিগোচর হতো না।
৫১৬. হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ মাথায় তেল ব্যবহার ও চিরুনি করার পর মদীনায় রওয়ানা হয়ে যান।
৫১৭. হযরত ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবীকে ঘ্রাণহীন তেল মাখতে দেখেছি।
৫১৮. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ বরই পাতা মিশ্রিত পানি দ্বারা মাথা ধৌত করতেন এবং তাতে ঘ্রাণ যুক্ত তেল মাখতেন।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা) রাতে, ঘুমের সময়, ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে এবং বিছানা ত্যাগের সময় যে আমল করতেন
৫১৯. নবী -এর একজন সাহাবী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক সফরে নবী -এর সাথে সাক্ষাত করলাম। এরপর নবী এশার সালাত পড়ে শুয়ে পড়লেন। রাতের কিছু অংশ নিদ্রা যাওয়ার পর তিনি ঘুম থেকে জাগলেন এবং আসমানের দিকে দৃষ্টিপাত করে সূরা আল ইমরানের ১৯২-১৯৪ আয়াত পাঠ করলেন। সাহাবী বলেন, অতপর রাসূলুল্লাহ্ তাঁর হাত মুবারক তাঁর থলের দিকে বাড়ালেন এবং তা থেকে মিস্তয়াক বের করলেন, অতপর ওযু করলেন, তারপর দাঁড়ালেন এবং সালাত পড়লেন। তিনি কিছুক্ষণ নামায পড়লেন, অতপর সালাম ফিরালেন তারপর শুয়ে পড়লেন। তিনি পুনরায় ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে প্রথমবারের মত আমল করলেন। তিনি তিনবার এইরূপ আমল করছিলেন।
৫২০. হুমায়দ ইব্ন আবদুর রহমান ইব্ন আওফ (র) থেকে বর্ণিত যে, একজন সাহাবী বললেন, রাসূলুল্লাহ্ রাতে ঘুম থেকে জাগ্রত হলেন এবং আকাশ পানে তাকিয়ে সূরা আল ইমরানের ১৯২-১৯৪ আয়াত পাঠ করলেন। তারপর তিনি মিসওয়াক নিলেন এবং ওযু করলেন, এরপর দাঁড়ালেন এবং সালাত পড়লেন। তারপর শুয়ে পড়লেন এবং ঘুমিয়ে গেলেন। আবার তিনি পূর্বের ন্যায় আমল করলেন।
৫২১. জাসারা (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবূ যার (রা)-কে বলতে শুনেছি যে, একবার নবী রাতের সালাতে কুরআনের একটি আয়াত পড়তে পড়তে ভোরে উপনীত হলেন। আয়তটি হলো: "(হে আল্লাহ্!) আপনি যদি তাদের শাস্তি দেন তবে তারা আপনারই বান্দা; আর যদি ক্ষমা করেন তবে আপনি তো সর্বজয়ী ও সর্বজ্ঞ" (সূরা মাইদাঃ ১১৮)।
৫২২. হযরত আবূ যার গিফারী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একরাতে নবী -এর সাথে সালাত পড়েছি। তিনি সালাতে দাঁড়ালে আমিও তাঁর সাথে দাঁড়িয়ে গেলাম। তাঁর দীর্ঘ সালাতের কারণে আমি আমার মাথা দেওয়ালের সাথে ঠুকতে লাগলাম।
৫২৩. আতা (র) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আয়েশা (রা) বলেন, এক রাতে নবী বললেন, হে আয়েশা! আমাকে অনুমতি দাও, আমি আমার প্রভুর ইবাদত করি। অতপর তিনি উঠে ওযু করলেন, অতপর দাঁড়িয়ে কুরআন পড়লেন। তিনি অঝোরে কাঁদলেন। আয়েশা (রা) বলেন, অতপর বিলাল (রা) এসে তাঁকে ফজরের সালাত পড়ার কথা বললেন। নবী বললেন, আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না? আজ রাতে আমার উপর সূরা আল ইমরানের ১৯০-১৯১ আয়াত নাযিল হয়েছে। ধ্বংস সেই ব্যক্তির জন্য যে এই আয়াত তিলাওয়াত করে অথচ তার সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে না।
৫২৪. কুরায়ব (র) ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাতের অর্ধেক অতিবাহিত হলে রাসূলুল্লাহ্ জাগ্রত হলেন। তিনি মুখমণ্ডলে হাত মলে ঘুমের রেশ দূর করলেন, তারপর সূরা আলে ইমরানের শেষ দশটি আয়াত তিলাওয়াত করলেন। তারপর ওযু করে সালাত পড়তে দাঁড়ালেন। তিনি দুই রাকআত দুই রাকআত করে সালাত পড়লেন, তারপর বেতের পড়লেন, এরপর শুয়ে পড়লেন। যখন মুয়াযযিন এলো তিনি উঠে সংক্ষেপে দুই রাকআত ফজরের সুন্নত সালাত পড়লেন।
৫২৫. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ রাতের প্রথম ভাগে ঘুমাতেন এবং শেষভাগে ইবাদত-বন্দেগী করতেন।
৫২৬. হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, নবী বলেন : আমার নিকট সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হলো রাতের বেলা দাঁড়িয়ে আল্লাহর ইবাদত করা।
৫২৭. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ কখনও গোটা রাত ধরে কুরআন পড়লে কেবল সূরা বাকারা, আলে ইমরান ও নিসা পর্যন্তই পড়তে পারতেন এবং সুসংবাদ সম্বলিত আয়াত আসলে সেখানে থেমে দু'আ করতেন।
৫২৮. আয়েশা (রা) বলেন, নবী উঠে দাঁত মাজতেন এবং ওযু করতেন। তারপর দাঁড়িয়ে নয় রাকআত, তারপর দুই রাকআত সালাত পড়তেন। রোগাক্রান্ত হওয়ার ফলে যখন তিনি রাতের বেলা সালাত পড়তে অক্ষম হয়ে পড়েছিলেন, তখন দিনের বেলা বার রাকআত সালাত পড়ে নিতেন।
৫২৯. হযরত আবূ সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ রাতে নফল সালাত পড়তে দাঁড়ালে প্রথমে এই দু'আ পাঠ করতেন: “হে আল্লাহ্! জিব্রাঈল, মীকাঈল ও ইসরাফীলের প্রভু... যে সত্যকে নিয়ে তারা মতভেদ করছে আমাকে তুমি সেই সত্যের দিকে পথ দেখাও।"
৫৩০. হুযায়ফা (রা) থেকে বর্ণিত, নবী তাহাজ্জুদের সালাতে সূরা বাকারা তিলাওয়াত করলেন। তিনি রুকু ও সিজদাও দীর্ঘায়িত করতেন। এভাবে তিনি চার রাকআত সালাত পড়লেন এবং তাতে সূরা বাকারা, সূরা আলে ইমরান, সূরা নিসা ও সূরা মায়িদা তিলাওয়াত করলেন।
৫৩১. হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ রাতের বেলা তাঁর জায়নামায থেকে আকাশ পানে তাকাতেন এবং কুরআনের আয়াত পাঠ করতেন: "আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে..." শেষ পর্যন্ত।
৫৩২. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ ঘুম থেকে জেগে বিছানার উপর বসলেন। তারপর মাথা আকাশের দিকে উঠিয়ে তিনবার বললেন, “সুবহানাল মালিকিল কু'দূস"। এরপর সূরা আলে ইমরানের শেষ আয়াতগুলো পড়লেন। সালাত শেষে তিনি নূরের জন্য দু'আ করতেন।
📄 নবী (সা)-এর কিরাআতের বর্ণনা
৫৩৩. ইয়ালা ইব্ন মুমাল্লাক (র) থেকে বর্ণিত। উম্মে সালামা (রা) বলেন, নবী রাতে সালাত পড়তেন আবার সালাত পড়ার সমপরিমাণ সময় ঘুমাতেন। তারপর উম্মে সালামা (রা) আমাকে নবী কিভাবে কিরাআত পড়তেন তা পড়ে শোনালেন—তাঁর কিরাআত পাঠ ছিলো এমন যে প্রতিটি অক্ষর পরিষ্কারভাবে উচ্চারিত হতো।
৫৩৪. মাকহুল (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আনাস (রা)-কে নবী -এর কুরআন পাঠের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, তাঁর কিরাআত পাঠ ছিলো কিছুটা গুণগুণ শব্দে।
৫৩৫. ইকরামা (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইব্ন আব্বাস (রা) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ এতটা উচ্চৈঃস্বরে কুরআন তিলাওয়াত করতেন যে, ঘরে অবস্থানকারীগণ তা শুনতে পেতো।
৫৩৬. আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ রাতের বেলা কখনও উচ্চৈঃস্বরে আবার কখনও নিম্নস্বরে কুরআন পাঠ করতেন।
৫৩৭. উম্মে হানী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার কোঠার ছাদের উপর থেকে রাসূলুল্লাহ্-এর কুরআন পাঠ শুনতে পেতাম।
৫৩৮. আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবু কায়স (রা) থেকে বর্ণিত, আয়েশা (রা) বলেন, তিনি উভয়রূপেই কিরাআত পড়তেন, কখনোও সশব্দে আবার কখনোও নিঃশব্দে।
৫৩৯. কুরাইব (র) থেকে বর্ণিত, ইব্ন আব্বাস (রা) বললেন, রাসূলুল্লাহ্ তাঁর কোঠার মধ্যে এমনভাবে কুরআন পাঠ করতেন যে, কোন মুখস্থকারী তা শুনে মুখস্থ করতে চাইলে তা করতে পারতো।
৫৪০. কাতাদা (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আনাস (রা)-এর নিকট জিজ্ঞেস করলাম, রাসূলুল্লাহ্-এর কিরাআত পাঠ কিরূপ ছিলো? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ্ শব্দ করে ও ধীরেসুস্থে কুরআন পাঠ করতেন।