📄 নবী (সা)-এর নম্রতা ও বিনয়
١١٤. عَنْ قُدَامَةَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَامِرٍ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَرْمِي الجَمْرَةَ عَلَى نَاقَةٍ شَهَبَاءَ لأَضَرْبَ وَلَا طَرْدَ وَلَا إِلَيْكَ إِلَيْكَ -
১১৪. হযরত কুদামা ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন আমির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-কে (হজ্জের মৌসুমে) খাকী বর্ণের একটি উটনীর উপর সাওয়ার হয়ে (আকাবায়) কংকর নিক্ষেপ করতে দেখেছি। (তিনি এভাবে কংকর নিক্ষেপের জন্য গিয়েছেন যে, লোকজনকে তাঁর কাছ থেকে দূরে থাকার জন্য) না কোন মারপিট ছিল আর না কোন প্রকারের হাঁকডাক। অনুরূপ 'এদিকে যাও' 'ওদিকে সর' এ সব কথাও বলা হয়নি।
ফায়দা: এ অনুচ্ছেদে প্রিয় নবী এর বিনয় ও নম্রতা বিষয়ক হাদীসসমূহ বর্ণনা করা হয়েছে। উল্লিখিত প্রথম হাদীসের থেকে তাঁর পূত-পবিত্র চরিত্রে পরম বিনয় নীতির প্রকাশ পাওয়া যাচ্ছে। কেননা প্রিয় নবী তখন একই সঙ্গে গোটা বিশ্বের পথপ্রদর্শক ও সকল নবীর সর্দার হওয়ার পাশাপাশি সমকালীন প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তা ব্যক্তিও ছিলেন। তা সত্ত্বেও তাঁর চাল-চলনে সর্বোচ্চ কর্তাসুলভ আচরণে কোন ভিন্নতা দেখা যায়নি। হজ্জের মৌসুমে হাজীদের প্রচণ্ড ভিড় থাকে। উপরন্তু তাঁদের অধিকাংশই থাকেন এমন চরিত্রের যারা নাগরিক রীতি-নীতি সম্পর্কে অসচেতন ও অনভ্যস্ত। এমন পরিস্থিতিতে একজনের শরীরে অন্যজনের শরীরের ধাক্কা লাগা, ভিড়ের চাপে কেউ নিচে পড়ে যাওয়া মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে প্রিয় নবী নিজের মর্যাদা বা মান-সম্মান বজায় রাখার উদ্দেশ্যে পৃথক কোন ব্যবস্থাই নেননি। তিনি সাধারণ হাজীদের সঙ্গে মিশে হজ্জের কাজকর্ম সম্পাদন করে যান। তাঁর আগমন উপলক্ষে রাস্তায় পথচারীদের না আসা-যাওয়া বন্ধ করা হয়েছিল, আর না তাঁর সম্মান প্রদর্শনার্থে পথচারীদেরকে 'সর' কিংবা 'দূরে থাক' ইত্যাদি বলা হয়েছিল। মোটকথা প্রিয় নবী নিজের প্রাধান্য প্রদর্শনের কোন ব্যবস্থা অবলম্বন করেননি।
এভাবে প্রিয় নবী-এর নম্রতা ও বিনয় সম্পর্কে আরো জানা যায় যে, তিনি মক্কা শরীফে যখন অসহায় ও শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থায় কালাতিপাত করছিলেন। ধৈর্য ও সহনশীলতা অবলম্বন ব্যতিরেকে তাঁর অন্য কোন পথ ছিল না। তখন আল্লাহ্ পাক তাঁকে ইখতিয়ার দিয়ে বলেছিলেনঃ হে নবী! আপনার অভিমত কি? আপনি কি বাদশাহী সংযুক্ত নবুওয়াত পেতে চান, আর না আবদিয়্যাত সংযুক্ত নবৃওয়াত? প্রিয় নবী নিজের পরম বিনয় প্রকাশ করে বাদশাহীর পরিবর্তে আবদিয়্যাত সংযুক্ত নবৃওয়াত লাভের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন এবং নিজের জন্য অভাব-অনটনের পথ বেছে নেন। অথচ নবুওয়াতের সঙ্গে বাদশাহীর সংযুক্ত প্রার্থনা করতে কোন বাধা ছিল না। তাঁর সম্মুখে হযরত সুলায়মান (আ)-এর উদাহরণও বিদ্যমান ছিল। তাছাড়া এই বাদশাহী গ্রহণ নবৃওয়াতের দায়িত্ব পালনের পথে কোন প্রতিবন্ধক বলেও বিবেচিত হতো না। কিন্তু 'রাহমাতুললিল আলামীন নিজের স্বভাবজাত চাহিদার নিরিখে বাদশাহীর উপর আবদিয়্যাতকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। এ কারণেই একাধিক হাদীসে পাওয়া যায় যে, এর পর প্রিয় নবী কখনো হাতের উপর বা পিঠের উপর ভর করে বসে পানাহার করেননি। স্বয়ং ইরশাদও করেছেন: আমি একজন নগণ্য বান্দা হিসাবে বসি, একজন ক্রীতদাস যেভাবে আহার করে আমিও সেভাবে আহার করি।
নম্রতা ও বিনয়ের এ নীতির কারণে প্রিয় নবী কখনো কোন খাদেম বা কাজের লোককে কোন ভুলের কারণে প্রহার করতেন না। আর কখনো বকাঝকাও দিতেন না। একটি হাদীসে এতটুকুও বলা হয়েছে যে, হযরত উমর (রা) বলেন, প্রিয় নবী ইরশাদ করেছেন যে, আমার প্রশংসা করতে গিয়ে তোমরা খৃস্টানদের মত বাড়াবাড়ি করো না। খৃস্টানরা তাদের নবী ঈসা (আ)-এর প্রশংসা করতে গিয়ে সীমা অতিক্রম করে এবং শেষ পর্যন্ত তার ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্ পুত্র বলে অভিহিত করে। (নাউযুবিল্লাহ্) আমি আল্লাহ্র একজন বান্দা মাত্র। কাজেই তোমরা আমাকে কেবল عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُهُ "আল্লাহ্র বান্দা ও তাঁর রাসূল" এতটুকু প্রশংসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবে।
নম্রতা ও বিনয়ের অভ্যাস আল্লাহ্ পাকের কাছেও খুবই পছন্দনীয়। পক্ষান্তরে অহংকার ও বড়ত্বের মনোভাবকে তিনি খুবই অপছন্দ করেন। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ তাঁর প্রিয় বান্দাদের চরিত্র আলোচনা করে ইরশাদ করেন:
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا -দয়াময় আল্লাহ্র খাস বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে। আর অজ্ঞ লোকেরা যখন সম্বোধন করে তখন তারা তর্কে অবতীর্ণ হয় না বরং শান্তি কামনা করে। (সূরা ফুরকান: ৬৩)
সারকথা মু'মিন মুসলমানদের বৈশিষ্ট্য হলো যে, তারা আচার-আচরণের ক্ষেত্রে নম্রতা ও বিনয় অবলম্বন করে চলে। কখনো কোন অজ্ঞ কিংবা অভদ্র লোক তাদেরকে কোন কটুকথা বললে তারা ক্ষমার চোখে দেখে এবং ভদ্রনীতির প্রদর্শন করে। গর্ব করা, অহংকার করা কিংবা আত্মম্ভরিতা প্রকাশ করা মু'মিনের কাজ নয়।
এ কারনেই একবার হযরত লোকমান (আ) নিজ পুত্রকে বেশ কিছু উপদেশ দেন। সে সব উপদেশের মধ্যে তিনি নম্রতা ও বিনয়ের নীতি অবলম্বনের কথাটি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। পবিত্র কুরআনে সে উপদেশটি নিম্নোক্ত ভাষায় বর্ণিত আছে:
وَلَا تُصَعِرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ বৎস! অহংকারবশে তুমি কখনো মানুষকে অবজ্ঞা করো না। আর পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে চলাফেরা করো না। কারণ আল্লাহ্ কোন উদ্ধত ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না। (সূরা লুকমান: ১৮)
আলিমগণ লিখেছেন, আল্লাহ্ পাকের নিকট যেভাবে অহংকার করা পছন্দনীয় নয় তেমনি অহংকারীদের চাল-চলন, রীতি-নীতি ইত্যাদি অনুসরণ করাও পছন্দনীয় নয়। অর্থাৎ কোন ব্যক্তি এমন হতে পারে যে, সে আন্তরিকভাবে অহংকারী নয় তবে অহংকারী লোকেরা যেভাবে চলে সে ব্যক্তি ঐভাবে চলাফেরা করে থাকে। আল্লাহ্ পাক তার এই চলাফেরাকে পছন্দ করেন না। ইসলামী শরীয়তের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো যে, এখানে আল্লাহ্ তা'আলার তরফ থেকে মানবীয় রীতি-নীতি ও শিষ্টাচারিতার বহু ক্ষুদ্র জিনিসকে বর্ণনা করে দেওয়া হয়েছে।
একখানা হাদীসে হযরত ইয়ায ইবন হাম্মাদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন যে, মহান আল্লাহ্ আমার নিকট এ মর্মে ওহী প্রেরণ করেছেন যে, তোমরা নম্রতা ও বিনয় অবলম্বন কর। কেউ কারুর উপর কোন অবিচার কিংবা বাড়াবাড়ি করো না। অনুরূপ কেউ কারুর উপর অহংকার কিংবা গর্ব প্রকাশ করো না (আবূ দাউদ, খ. ২, পৃষ্ঠা ৬৭১)।
অপর একখানা হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন যে, গরীবকে দান-খয়রাত করার কারণে সম্পদ হ্রাস পায় না। নম্রতা, বিনয় ও ক্ষমাপরায়ণতা ব্যক্তির সম্মান বৃদ্ধি করে। যে ব্যক্তি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে বিনয় অবলম্বন করে আল্লাহ্ পাক তার মান-সম্মান অনেক গুণে বৃদ্ধি করেন। (তিরমিযী শরীফ, খ. ২, পৃষ্ঠা ২৪)
বিনয় ও নম্রতা অবলম্বনের ফলে মানব চরিত্রে অন্যান্য আরো বহু সদ্গুণের সৃষ্টি হয়ে থাকে। বিভিন্ন হাদীসে প্রিয় নবী এগুলিকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। যেমন : এক. বিনয় অবলম্বন নিজেই একটি ইবাদত। পূর্ববর্তী হাদীস থেকে স্পষ্ট যে, আল্লাহ্ পাক মানুষকে বিনয় অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। কাজেই বিনয় অবলম্বনের ফলে ব্যক্তির জীবনে আল্লাহ্ পাকের একটি হুকুম প্রতিফলিত হয়। দুই. বিনয়ী ব্যক্তি একদিকে যেমন মহান আল্লাহ্র কাছে প্রিয় তেমনি মানুষের দৃষ্টিতেও সে পছন্দনীয় ও প্রিয় ব্যক্তি হিসাবে বিবেচিত। লোকজন মন থেকে তাকে ভালবাসে; তার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে ও মেলামেশা করতে আনন্দ পান। বিনয়ী ব্যক্তির পক্ষে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করা সহজ হয়। কারণ লোকজন এ চরিত্রের মানুষকে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কাজকর্মে নিজেদের উপর অগ্রাধিকার ও নেতৃত্ব প্রদান করতে ভালবাসে। বলা বাহুল্য, নম্রতা ও বিনয় এভাবেই মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতের উচ্চমর্যাদা দান করে। তিন. বিনয়ী ও অমায়িক ব্যক্তির দুশমনের সংখ্যা খুবই কম হয়ে থাকে। কারণ মানুষ সাধারণত তার বিনয়ী চরিত্র অবলোকন করে তার শত্রুতা কিংবা বিরোধিতা করা এবং তাকে কোন প্রকার কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকে। চার. বিনয় অবলম্বনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুফল হলো যে, বিনয়ের ফলে ব্যক্তি অতি সহজে চারিত্রিক গুণাবলির দ্বারা নিজেকে গুণান্বিত করতে সক্ষম হয়। তাই চরিত্রবান লোকদেরকে সাধারণভাবে বিনয়ী দেখা যায়। পক্ষান্তরে দাম্ভিক ও অহংকারী মানুষ আল্লাহ্ পাকের দরবারে যেমন অপছন্দনীয় তেমনি মানুষের কাছেও চরম ঘৃণিত। সে দুনিয়াবাসীর অন্তরে কখনো স্থান পায় না। তদ্রূপ আখিরাতেও তার জন্য রয়েছে চরম লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা। লোকজন তার ধনৈশ্বর্যের ভয়ে কিংবা ক্ষমতার কারণে হয়ত তার বিরুদ্ধে মুখে কিছু বলে না তবে মনে মনে তাকে অপছন্দ করে থাকে। এ সত্যতা যাচাইয়ের জন্য খুব দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা এর জ্বলন্ত সাক্ষী।
١١٥. عَنْ أَبِي الْمَلِيْحِ حَدَّثَنِي نَصَرُ بْنُ وَهَبِ الخُزَاعِيُّ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ رَكِبَ حِمَاراً مَرْسُوْنَا بِغَيْرِ سَرْجٍ مُوَكَّفٌ عَلَيْهِ قَطِيفَةٌ جَزْرِيَّةٍ ثُمَّ دَعَا مُعَاذَ بْنَ جَبَلٍ فَأَرْدَفَهُ - فَأَرْدَفَهُ -
১১৫. হযরত নাসর ইবন ওয়াহ্হাব খোযাঈ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, একদা রাসূলুল্লাহ্ এমন একটি গাধার পিঠে আরোহণ করেন যেখানে বসার কোন গদি ছিল না। তবে রশির লাগাম পরা ছিল এবং এর উপর একখণ্ড পুরাতন চামড়া রাখা ছিল। তারপর তিনি হযরত মুআয ইবন জাবাল (রা)-কে ডেকে নেন এবং নিজের পেছনে আরোহণ করান।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস থেকেও প্রিয় -এর পরম বিনয়-নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রিয় নবী নিজের শক্তি ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনের মুহূর্তে একটি সাধারণ গাধার পিঠে আরোহণ করতে দ্বিধা করেননি। অথচ তিনি যদি সামান্য ইঙ্গিতটুকুও করতেন তা হলে জান কুরবান হযরত উসমান ইব্ন আফফান (রা)-এর মত দানবীর সাহাবীগণ তাঁকে উন্নত থেকে উন্নততর সাওয়ারীর ব্যবস্থা করে দিতে বিন্দুমাত্রও বিলম্ব করতেন না।
একখানা হাদীসে হযরত আবূ সালামা (রা) বলেন, আমি প্রিয় নবী -এর যবান মুবারক থেকে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন: যে ব্যক্তির মনে শস্যদানা পরিমাণ অহংকার থাকবে সে বেহেস্তে প্রবেশ করবে না। (তারগীব ওয়া তারহীব, খ. ৪, পৃষ্ঠা ৪৫)
١١٦. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَعُودُ الْمَرِيضِ وَيَتَّبِعُ الْجَنَازَةَ وَيُجِيبُ دَعْوَةَ الْمَعْلُوكَ وَيَرْكَبُ الْحِمَارَ وَكَانَ يَوْمَ خَيْبَرَ وَيَوْمَ قُرَيْظَةَ وَالنَّصْيْرِ عَلَى حِمَارٍ مَخْطُوْمٍ بِحَبْلٍ مِنْ لِيْفَ تَحْتَهُ إِكَافُ مِنْ لِيْفَ -
১১৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর নিয়ম ছিল যে, তিনি অসুস্থদের শুশ্রূষা করতেন, জানাযার সঙ্গে হেঁটে যেতেন, গোলাম ও শ্রমিকদের আমন্ত্রণ কবুল করতেন এবং গাধার পিঠে আরোহণ করতেন। (রাবী বলেন) প্রিয় নবী খাইবার যুদ্ধের দিন একটি গাধার পিঠে আরোহী ছিলেন। এ গাধাটির লাগাম ছিল খেজুরের ছাল দিয়ে পাকানো একটি রশি এবং গাধার গদিটি ছিল খেজুরের কতগুলি ছাল ও ডালের দ্বারা বানানো। (ইবন মাজা, পৃষ্ঠা-৫৪৫)
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসে প্রিয় নবী-এর এমন চারটি উন্নত অনুপম সদ্গুণের উল্লেখ করা হয়েছে যেগুলি সাধারণত কোন নীতিপরায়ণ চরিত্র মাধুরী সম্পন্ন বিনয়ী ব্যক্তির পক্ষেই অবলম্বন করা সম্ভব হয়ে থাকে।
১. অসুস্থের সেবা শুশ্রূষা: হাদীসে পাওয়া যায় যে, প্রিয় নবী আশরাফ-আত্মাফ, ধনী-নির্ধন, আযাদ-গোলাম নির্বিশেষে সকলের খোঁজ-খবর নিতেন। কারোর অসুস্থতার সংবাদ পেলে নিঃসংকোচে তার শুশ্রূষার জন্য যেতেন। এমন কি একবার তাঁর জনৈক ইয়াহুদী খাদেম অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তিনি সেই ইয়াহুদীর শুশ্রূষা করেন। প্রিয় নবী -এর চাচা আবু তালিব ইসলাম গ্রহণ করেননি। অথচ তার অসুস্থতাকালে তিনি শুশ্রূষার জন্য গিয়েছিলেন।
২. লাশের সঙ্গে যাওয়া: প্রিয় নবী মৃতের জানাযায় শরীক হতেন। নিজেই জানাযার সালাত পড়াতেন। জানাযার পর লাশের সঙ্গে গোরস্তান পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে দাফন কাজে শরীক হতেন। একদা মসজিদে নবুবীর ঝাড়ু দানকারিণী এক মহিলা রাত্রিকালে ইন্তিকাল করেন। সাহাবীগণ রাতে প্রিয় নবী-এর কষ্ট হতে পারে এ আশংকায় তাঁকে সংবাদ দেননি। নিজেরাই মহিলার কাফন-দাফনের কাজ সম্পন্ন করে নেন। পরে এ সংবাদ প্রিয় নবী-এর নিকট পৌঁছলে তিনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং মহিলার কবরে গিয়ে জানাযা পড়ে আসেন। অনুরূপভাবে মদীনার অধিবাসী আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই ইব্ন সাল্ল ছিলেন মুনাফিকদের নেতা এবং মুসলমানদের চরম শত্রু ও ইসলাম বিদ্বেষী। এ লোকটি মারা গেলে তখনও প্রিয় নবী তার জানাযার নামায পড়িয়েছিলেন।
৩. দরিদ্রদের আমন্ত্রণ কবুল করা: দরিদ্রদের আমন্ত্রণ কবুল করা এবং তাদের কথা শোনা মানুষের অন্যতম সদ্গুণ। প্রিয় নবী প্রতিটি মানুষের বক্তব্য শুনতে চেষ্টা করতেন। একটি গোলামও যদি তাঁকে নিজ প্রয়োজন সমাধা করে দেয়ার জন্য নিয়ে যেতে চাইত তখন তিনি নিঃসংকোচে গোলামের সঙ্গে চলে যেতেন। এমন কি কোন ক্রীতদাসী পর্যন্ত তুচ্ছ কোন কাজের জন্য যখন তাঁর কাছে সাহায্য চাইত তখনও তিনি তা সমাধা করে দিতে নিজের মর্যাদার জন্য হানিকর বলে মনে করতেন না।
৪. গাধার পিঠে আরোহণ করা: প্রিয় নবী-এর জন্য উট, ঘোড়া ইত্যাদি জাতীয় উন্নত বাহন গ্রহণের ব্যবস্থা ছিল। অথচ তিনি বিনয় প্রকাশার্থে গাধা ও খচ্চরের পিঠেও সাওয়ার হতেন। বাহন হিসাবে গাধা ব্যবহার করাকে নিজের জন্য অপমানজনক মনে করতেন না। এভাবে প্রয়োজনের মুহূর্তে নিজের পেছনে অন্যকে বসিয়ে নিতেন। খায়বার যুদ্ধ ও বনু কুরায়যা ও নাযীর যুদ্ধে তিনি যখন একজন সেনাপতি ও মুসলমানদের প্রধান হিসাবে রণক্ষেত্রের পার্শ্ব অতিক্রম করছিলেন তখন তাঁর বাহনটি ছিল সামান্য একটি গাধা। অথচ এমন অবস্থায় অতিশয় বিনয়ী প্রকৃতির নেতাগণও প্রতিপক্ষকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে নিজের শৌর্যবীর্য ও জাঁকজমকের প্রকাশ আবশ্যক বলে মনে করে থাকেন। কিন্তু প্রিয় নবী-এর চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী। তিনি স্বভাবজাত নম্রতা ও বিনয় ত্যাগ করে কৃত্রিমতা অবলম্বন করাকে পছন্দ করেননি। এটিই ছিল রাহমাতুল লিল্ আলামীন -এর যথাযোগ্য উত্তম অনুপম আদর্শ।
۱۱۷. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا أَنَّهَا سُئِلَتْ مَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَصْنَعُ فِي بَيْتِهِ ؟ قَالَتْ كَمَا يَصْنَعُ أَحَدُكُمْ فِي بَيْتِهِ - يَخْصِفُ النَّعْلَ وَيُرَقِعُ الثوب -
১১৭. (উম্মুল মু'মিনীন) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত যে, একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, রাসূলুল্লাহ্ ঘরে প্রবেশ করে কি কি কাজ করতেন? উত্তরে হযরত আয়েশা (রা) বলেন, তিনি সেই সব কাজই করতেন যেগুলো সাধারণত তোমরা নিজেদের ঘরে করে থাক। তিনি নিজ হাতে জুতা সেলাই করতেন এবং কাপড়ে তালি লাগাতেন।
۱۱۸. عَنْ أَبِي بُرْدَةَ قَالَ قُلْتُ لِعَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا مَا كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَصْنَعُ فِي بَيْتِهِ ؟ قَالَتْ كَانَ فِي مِهْنَةِ أَهْلِهِ -
১১৮. হযরত আবূ বুরদা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়েশা সিদ্দীকা (রা) -কে জিজ্ঞেস করলাম যে, নবী বাড়ির ভেতরে কি কাজ করতেন? তিনি বললেন, নবী ঘরের কাজকর্মে অন্যদের সাহায্য করতেন।
۱۱۹. عَنْ مُجَاهِدٍ عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَ قُلْتُ مَا كَانَ يَصْنَعُ النَّبِيُّ فِي بَيْتِهِ قَالَتْ يَخْصِفُ النَّعْلَ وَيُرْقِعُ التَّوْبَ .
১১৯. মুজাহিদ (র) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম যে, প্রিয় নবী ঘরের ভিতর থাকাকালে কি কি কাজ করতেন? তিনি বললেন, নবী নিজ হাতে নিজের চপ্পল সেলাই করতেন এবং নিজের পোশাকে তালি লাগাতেন।
ফায়দা : উপরোক্ত তিনটি হাদীসের মর্ম প্রায় অভিন্ন। এখানে গৃহের অভ্যন্তরে থাকাকালে প্রিয় নবী যে সব কাজকর্ম করতেন বলে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) বর্ণনা করেছেন। তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ঘরের ভিতরে তিনি অতিশয় সাদাসিধা ও সরল জীবন যাপন করতেন। একজন সাধারণ মানুষের মতই ছিল তাঁর পারিবারিক জীবন। রাজকীয় রীতি-নীতি কিংবা কোন জাঁকজমক তাঁর পরিবারে ছিল না। এখানে গভীরভাবে লক্ষণীয় যে, প্রিয় নবী নবুওয়াতের মহান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হওয়া এবং বিশ্ব নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পদে সমাসীন হওয়া সত্ত্বেও তিনি ঘরে প্রবেশ করে নিজের কাজ নিজ হাতেই সম্পাদন করতেন। পারিবারিক ছোট ছোট কাজগুলি সম্পাদন করতে বিন্দুমাত্র সংকোচ বোধ করতেন না। অনুরূপভাবে তাঁর গৃহে কাজ করার মত লোকের অভাব ছিল এমনও নয়। হযরত আনাস ইবন মালিক ও হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রা) উভয়ে প্রিয় নবী -এর একান্ত খাদেম ছিলেন। প্রিয় নবী-এর কাজকর্ম আঞ্জাম দেওয়ার কাজে তাঁরা এতটুকু ঘনিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলেন যে, লোকেরা তাঁদেরকে প্রিয় নবী-এর পরিবারের সদস্য বলে মনে করতো। অনুরূপ উম্মুল মু'মিনীনদের জন্যও সেবিকা ছিল। এতদসত্ত্বেও প্রিয় নবী নিজ ঘরে প্রবেশের পর নিজের কাজকর্ম নিজেই সম্পাদন করতেন।
নম্রতা ও বিনয় আল্লাহ্ পাকের কাছেও প্রিয় এবং রাসূলুল্লাহ্-এর কাছেও ছিল প্রিয়। একখানা হাদীসে হযরত আবূ সাঈদ খুদ্রী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাকের সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে এক ধাপ বিনয় অবলম্বন করবে আল্লাহ্ পাক বেহেস্তে তার জন্য এক ধাপ মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। আর যে ব্যক্তি এক ধাপ অহংকার অবলম্বন করবে আল্লাহ্ পাক তার জন্য এক ধাপ মর্যাদা অবনতি করে দিবেন। এভাবে অহংকার অবলম্বনের কারণে আল্লাহ্ পাক ব্যক্তির মর্যাদা ক্রমে ক্রমে অবনতি করে অবশেষে দোযখের সর্বনিম্নে নিক্ষেপ করবেন। (ইবন মাজা, পৃষ্ঠা ৫৪৪, মিসর)।
۱۲۰ عَنْ عُرْوَةَ عَنْ أَسَامَةَ بْنِ زَيْدِ أَخْبَرَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ رَكِبَ يَوْمًا حِماراً بِإِكَافَ عَلَيْهِ قَطِيفَةٌ فَرَدِفَهُ أَسَامَةَ ابْنَ زَيْدٍ يَعُودُ سَعْدَ بْنَ عُبَادَةٌ فِي بَنِي الْحَارِثِ ابْنِ خَزْرَجٍ وَذَلِكَ قَبْلَ وَقْعَةِ بَدْرٍ -
১২০. হযরত উরওয়া ইব্ন যুবায়র (রা) হযরত উসামা ইবন যায়িদ (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ একটি গাধার উপর আরোহণ করেন। গাধাটির পিঠে গদি হিসেবে একটি চাদর ছিল। তারপর তিনি নিজের পেছনে হযরত উসামা ইবন যায়িদ (রা)-কে বসালেন এবং হযরত সাদ ইবন উবাদা (রা)-এর শুশ্রূষার জন্য বনু হারিস ইব্ন খাযরাজ গোত্রের আবাসস্থলে গমন করেন। এ ঘটনাটি ছিল বদর যুদ্ধের পূর্বেকার।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস উল্লেখ করার পেছনে গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হলো প্রিয় নবী -এর নম্রতা ও বিনয় চরিত্রের বর্ণনা করা। অবশ্য এতদসংক্রান্ত একখানা হাদীস ইতিপূর্বে ১১৫ নং-এ আলোচিত হয়েছে। এ হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, প্রিয় নবী নিরহংকার চরিত্রের কারণে বাহন হিসেবে সামান্য গাধাকেও ব্যবহার করেছেন। অহংকারী ও দাম্ভিক লোকদের ন্যায় বাহন হিসাবে তুচ্ছ গাধার ব্যবহারকে তিনি নিজের মর্যাদা হানিকর বলে মনে করেননি। এভাবে নিজের সঙ্গে অন্য একজনকেও বসিয়ে নিতে তাঁর কোনই সংকোচবোধ হয়নি। অথচ সাধারণভাবে কোন রাষ্ট্রপতি কিংবা কোন সম্রাট এহেন আচরণ করতে লজ্জাবোধ করবেন। ইতিহাস গ্রন্থে পাওয়া যায় যে, সফরে ও মদীনা শরীফে অবস্থান কালে বিভিন্ন স্থানে প্রিয় নবী চল্লিশ জনেরও অধিক সাহাবীকে নিজের সঙ্গে সাওয়ারীতে আরোহণের মর্যাদা দান করেন। কখনো কখনো তিনি নিজে পেছনে বসে সঙ্গীকে আগে বসতেও দিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ! এটি ছিল মহানবী-এর চরিত্র মাধুরীর নমুনা। প্রিয় নবী-এর আখলাক ও শামাইল সম্পর্কে যাঁরা অধ্যয়ন করেন তাঁদের কাছে তাঁর বিনয় ও নম্রতার বহু ঘটনা সুস্পষ্ট। তিনি সর্বদা মোটা ও স্থূল পোশাক পরিধান করতেন। সাধারণ মানের আহার গ্রহণ করতেন। তালি লাগানো জুতা ব্যবহার করতেন, নিজেই ঘরের বকরীর দুধ দোহন করতেন, নিজের জুতা নিজেই সেলাই করতেন, নিজের কাপড়-চোপড় নিজেই ধুয়ে নিতেন, গাধার পিঠে আরোহণ করে চলতে এবং নিজের সঙ্গে অন্যকে বসিয়ে নিতে কখনো লজ্জাবোধ করতেন না।
١٦١. عَنْ أَنَسٍ قَالَ لَمْ يَكُنْ شَخْصُ أَحَبُّ إِلَيْهِمْ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَكَانُوا إِذَا رَأَوْهُ لَمْ يَقُومُوا إِلَيْهِ لِمَا يَعْرِفُونَ مِنْ كَرَاعِيَّتِهِ لَهُ -
১২১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাহাবীদের মনে রাসূলুল্লাহ্ -এর চেয়ে অধিক ভালবাসা অন্য কারোর জন্য ছিল না। এতসত্ত্বেও তাঁরা রাসূলুল্লাহ্ -কে কখনো আসতে দেখে তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়াতেন না। কারণ তারা জানতেন যে, তিনি এভাবে দাঁড়ানোকে মোটেও পছন্দ করেন না।
ফায়দা : এ হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, প্রিয় নবী তাঁর সাহাবীদেরকে তাঁর প্রতি দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করতে নিষেধ করতেন। কেননা এটি অহংকারী লোকদের রীতি। অহংকারী কর্তা ব্যক্তিরা মানুষের কাছ থেকে এ ধরনের লৌকিক সম্মান পেতে চায়। আর তাদের প্রজা ও দরবারের সদস্যরাও এ পদ্ধতিতে সম্মান জানায়। কর্তা ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য হলো নিজেদের বড়ত্ব ও আধিপত্যের প্রকাশ ঘটানো এবং মানুষের কাছ থেকে জবরদস্তিমূলক সম্মান আদায় করা। আর এ কারণেই তাদের সম্মানার্থে যারা দাঁড়াবে না, তাদেরকে অপরাধী বলে গণ্য করে। অথচ কোন সন্দেহ নেই এটি নিজের অহংকার প্রকাশেরই একটি বিকল্প মাত্র, যা মিছামিছি প্রদর্শনীর অবতারণা বৈ কিছুই নয়। এ অভ্যাস খুবই মন্দ একটি অভ্যাস। এটি ব্যক্তিকে আল্লাহ্ পাকের কঠিন ক্রোধ ও গযবের মধ্যে নিপতিত করে। এ কারণেই প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা এ ধরনের প্রদর্শনী করা থেকে সাহাবীদেরকে নিষেধ করতেন।
একখানা হাদীসে হযরত আবূ উমামা (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ একটি লাঠির উপর ভর করে আমাদের দিকে আসছিলেন। আমরা তাঁর আগমন উপলক্ষে সবাই দাঁড়িয়ে গেলাম। তখন প্রিয় নবী ইরশাদ করেন : তোমরা অনারবদের ন্যায় আমার সম্মান প্রদর্শনের জন্য কখনো দাঁড়াবে না। অনারব লোকেরা একজন অন্যজনের সম্মানে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। (আবু দাউদ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা-১২৯)
প্রিয় নবী এ নির্দেশটি দিয়েছিলেন তাঁর একান্ত বিনয়ী মনোভাবের কারণে। যেন হঠাৎ কেউ দেখলে তাঁর প্রতি অহংকার বা দাম্ভিকতার সন্দেহটুকুও করতে না পারে। নতুবা তিনি খুব ভালভাবেই জানতেন যে, সাহাবীগণ তাঁকে যে সম্মান প্রদর্শন করেন তাতে বিন্দু পরিমাণ খাদ নেই, সম্পূর্ণ অকৃত্রিম। মনের গভীর থেকেই তাঁরা তাঁকে সম্মান করে থাকেন এবং অকৃত্রিমভাবে তাঁকে ভালবাসেন। এ কারণে আলিমগণ লিখেছেন, কোন বিজ্ঞ আলিম কিংবা বুযুর্গ কিংবা ন্যায়পরায়ণ কোন শাসকের সম্মান প্রদর্শনার্থে এভাবে দাঁড়ানোর মধ্যে কোন আপত্তি নেই। তবে কেউ যদি নিজের প্রভুত্ব, আধিপত্য ও অহংকার দেখানোর জন্য এভাবে সম্মানার্থে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেয় তাহলে দাঁড়ানো মাকরূহ।
হযরত আবূ মিজলায (রা) থেকে বর্ণিত যে, হযরত মুআবিয়া (রা) একবার হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র ও ইবন আমির (রা)-এর কাছে গেলেন। হযরত মুআবিয়া (রা)-কে দেখে হযরত ইব্ন আমির (রা) তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে গেলেন। এদিকে হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র (রা) স্বস্থানে উপবিষ্ট থাকেন। তখন হযরত মুআবিয়া (রা) হযরত ইব্ন আমির (রা)-কে বললেন, স্বস্থানে বসে থাকুন। কেননা আমি প্রিয় নবী -কে বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তি অন্যরা তার সম্মানার্থে দাঁড়ানোকে পছন্দ করে সে ব্যক্তির ঠিকানা হবে জাহান্নাম। (আবু দাউদ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২১৯)
উপরোক্ত হাদীস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বর্ণিত নিষেধাজ্ঞা সে সময়ের জন্য, যখন আগমনকারীর দাম্ভিকতা ও অহংকার এ কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করে। তাই দেখা যায় একটি হাদীসে এসেছে যে, আনসারদের অন্যতম বড় আলিম ও সরদার হযরত সাদ ইবন উবাদা (রা) যখন আগমন করছিলেন তখন প্রিয় নবী আনসারদের আদেশ দিয়ে বলেন, তোমাদের সর্দার আগমন করছেন। তোমরা দাঁড়িয়ে যাও। অবশ্য এখানে নবী-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল হযরত সাদ ইবন উবাদা (রা)-এর সম্মানকে বড় করে দেখানো। কেননা তাকে তখন বনু কুরায়যার বন্দীদের ব্যাপারে সালিস নিযুক্ত করা হয়েছিল।
অনুরূপভাবে দূরদেশ থেকে আগত মুসাফিরের অভ্যর্থনা কিংবা অন্তরঙ্গ কোন বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় দাঁড়ানোর মধ্যে কোন আপত্তি নেই। শর্ত হলো উভয় পক্ষের কোন দিকে প্রাণহীন প্রদর্শনী কিংবা অহংকার থাকবে না। যেন আগমনকারী মনে মনে এই সম্মান কামনা না করেন আর অভ্যর্থনাকারী কেবল লৌকিকতার জন্যই না দাঁড়ান।
١٢٢. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يُجِيبُ الْعَبْدَ وَيَعُودُ الْمَرِيضَ وَيَرْكَبُ الْحِمَارَ
১২২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাধারণ একজন গোলামের দাওয়াত কবুল করতেন, অসুস্থদের শুশ্রূষা করতেন এবং গাধার পিঠেও আরোহণ করতেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস থেকেও প্রিয় নবী -এর পরম বিনয় ও নম্রতার পরিচয় ফুটে উঠে। এভাবে আরো অন্যান্য হাদীস থেকে জানা যায় যে, প্রিয়নবী তাঁর সাহাবীদের মজলিসে নিজের জন্য কোন পার্থক্য বজায় না রেখেই বসতেন। তাঁর বসার জন্য পৃথক কোন আসন থাকত না। আর তিনি বসার মধ্যেও নিজেকে ব্যতিক্রম বানিয়ে বসতেন না। তিনি সীমাহীন সরলতা ও অনাড়म्बरতাসহ মজলিসের যেখানেই সুযোগ পেতেন সেখানেই বসতেন। বসে যেতেন। এ কারণে নতুন আগন্তুক লোকদের জন্য জিজ্ঞেস করে নিতে হতো যে, আপনাদের মধ্যে নবী কোন্ জন? কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখন নবী -এর দরবারে দূর দেশের বিভিন্ন প্রতিনিধি দলের আগমন শুরু হলো এবং নবাগতদের নানা প্রশ্নোত্তরের কারণে মজলিসের কাজকর্ম ও আলোচনায় বিঘ্ন ঘটতে লাগল, তখন সাহাবীদের বহু পীড়াপীড়ির দরুন প্রিয় নবী -এর জন্য একটি পৃথক জায়গা বানানোর আবেদন তিনি মঞ্জুর করেন। ফলে মজলিসের মধ্যে নবী কোন্ জন তা নির্ণয় করতে নবাগতদের জন্য সহজ হয়। সাহাবীগণ প্রিয় নবী -এর বসার জায়গাটির মধ্যে মাটি ফেলে সামান্য উঁচু করে খাটের মত বানিয়ে দেন। তারপরেও প্রিয় নবী কখনো সেই উঁচু জায়গায় বসতেন আবার কখনো নিচে বসে উঁচু জায়গাটির উপর হেলান দিয়ে থাকতেন। এতখানি ছিল নবীদের সর্দার শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা -এর নম্রতা ও বিনয়।
একটি হাদীসে পাওয়া যায় যে, প্রিয় নবী -কে কখনো কখনো যবের রুটি কিংবা গন্ধ হয়ে গেছে এমন চর্বি আহারের জন্যও যদি দাওয়াত দেয়া হতো তখনও তিনি কোনরূপ অসন্তুষ্টি প্রকাশ না করে সে দাওয়াত কবুল করতেন। তিনি এমনটা চিন্তা করতেন না যে, এত নিম্নমানের আহারের আমন্ত্রণে আমি কেন যাব?
অনুরূপভাবে তিনি নিজের সাথী-সঙ্গীদের শুশ্রূষার জন্যও যেতেন। অসুস্থ লোকটি আমীর কিংবা গরীব, আযাদ কিংবা গোলাম, 'ছোট কিংবা বড় – সেই বিবেচনা তাঁর কাছে ছিল না। তিনি অসুস্থের খুব কাছে গিয়ে বসতেন এবং তাকে সান্ত্বনা দিতেন। তার সুস্থতার জন্য দু'আ করতেন। হাদীসগ্রন্থে এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা পাওয়া যায়। ইতিপূর্বেও আলোচিত হয়েছে যে, তিনি সামান্য মানের বাহন গাধার পিঠে আরোহণ করতেও সংকোচ বোধ করতেন না। বলা বাহুল্য, প্রিয় নবী সমকালের সম্রাট ও দু'জাহানের রাসূল ছিলেন। তাঁর নগণ্য একজন গোলাম ব্যক্তিও উচ্চমানের বাহনে আরোহণ করে থাকে। অথচ তিনি নিজে গাধার পিঠে নির্দ্বিধায় আরোহণ করেছেন। এ সব কিছু মূলত তিনি বিনয় ও নম্রতা প্রকাশের জন্যই করেছিলেন। যেন উম্মতের লোকেরা তাঁর এ আদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।
۱۲۳. عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَجْلِسُ عَلَى الأَرْضِ وَيَأْكُلُ عَلَى الأَرْضِ وَيَعْتَقِلُ الشَّاةَ، وَيُجِيبُ دَعْوَةَ الْمَمْلُوكِ، قَالَ أَبُو إِسْمَاعِيلَ فَحَدَّثْتُ بِهِ الْأَعْمَشِ عَنْ مُسْلِمٍ فَقَالَ أَمَا إِنَّهُ كَانَ يَطْلُبَ الْعِلْمَ -
১২৩. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ নিঃসংকোচে মাটির উপর বসতেন, মাটিতে বসে আহার করতেন, নিজ হাতে খুঁটির সাথে বক্রী বাঁধতেন ও গোলামের দাওয়াত কবুল করতেন। বর্ণনাকারী আবু ইসমাঈল (র) বলেন, আমি এ হাদীসখানা মুসলিম (র)-এর বরাত দিয়ে হযরত আমাশ (র)-কে শোনালাম। তখন আমাশ (র) বললেন, তবে মনে রেখ, প্রিয় নবী -এর উদ্দেশ্য ছিল নিজ সাহাবীদের অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়া।
ফায়দা : আলোচ্য হাদীসের মধ্যে প্রিয় নবী -এর যে সব সুন্দর নীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে এগুলি তাঁর একান্ত বিনয় ও নম্রতার প্রমাণ বহন করে। কেননা এসব কাজ তিনি প্রয়োজনীয় উপকরণ কিংবা কাজের লোকজনের অভাবজনিত কারণে করেননি। তাঁর কাছে উপকরণ বা লোকজনের অভাব ছিল না। তবে তিনি নিজের নম্রতা ও বিনয় নীতি প্রকাশার্থে এসব কাজ নিজ হাতে ও নিঃসংকোচে করতেন।
বুখারী শরীফে হযরত আসওয়াদ ইব্ন ইয়াযীদ (র) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ নিজ গৃহে কি কি কাজ করে থাকতেন? তখন হযরত আয়েশা (রা) বলেন, তিনি ঘরের অন্যদের কাজকর্ম্মে স্বহস্তে সহযোগিতা করতেন। কিন্তু যখন নামাযের সময় হতো তখন কোন প্রকার বিলম্ব না করে মসজিদে চলে যেতেন। (বুখারী শরীফ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা : ৮৯২)
আলোচ্য হাদীস থেকে এ কথা সুস্পষ্ট যে, প্রিয় নবী অন্যান্য সাধারণ মানুষের ন্যায় পারিবারিক বিভিন্ন কাজে শরীক থাকতেন। উদাহরণস্বরূপ যেমন নিজে বকরীর দুধ দোহন করতেন, নিজের জুতা নিজেই সেলাই করতেন ইত্যাদি। এ বিষয়ে ইতিপূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
١٢٤ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكِ أَنَّهُ مَرَّ بِصِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ ثُمَّ حَدَّثَنَا أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ مَرَّ عَلَى صِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ وَهُوَ مُغِدٍ-
১২৪. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, একদা তিনি বালকদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি তাদেরকে সালাম দেন। তারপর আমাদেরকে হাদীস শুনিয়ে বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ বালকদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি দ্রুত পথচলা অবস্থায় তাদেরকে সালাম দেন।
١٢٥ عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ مَرَّ بِصِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ -
১২৫. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, একদা রাসূলুল্লাহ বাচ্চাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন সে মুহূর্তে তিনি তাদেরকে সালাম দেন।
١٢٦. عَنْ أَنَسٍ قَالَ بَعَثَنِي رَسُولُ اللهِ ﷺ فِي حَاجَةٍ فَمَرَرْتُ بِصِبْيَانِ فَقُمْتُ مَعَهُمْ فَأَبْطَاتُ عَلَيْهِ فَخَرَجَ وَرَانِي مَعَ الصِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ -
১২৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাকে একটি কাজের জন্য পাঠিয়েছিলেন। পথিমধ্যে বাচ্চাদের সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। আমি তাদের সেখানে দাঁড়ালাম। তাতে অনেক দেরি হয়ে গেল। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ্ আমার তালাশে বের হয়ে আমাকে বাচ্চাদের সঙ্গে দেখলেন। তখন তিনি তাদেরকে সালাম দিয়েছিলেন।
۱۲۷. عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ مَرَّ عَلَى صِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِم -
১২৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী বাচ্চাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় তিনি তাদেরকে সালাম দেন।
۱۲۸ عَنْ أَنَسٍ قَالَ أَتَى عَلَيْنَا رَسُولُ اللهِ ﷺ وَأَنَا فِي غِلْمَةٍ نَلْعَبُ فَسَلَّمَ عَلَيْنَا ثُمَّ أَرْسَلَنِي فِي حَاجَةٍ -
১২৮. আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি তখন বাচ্চাদের সঙ্গে মিলে খেলাধুলা করছিলাম। তিনি আমাদেরকে সালাম দেন। তারপর আমাকে একটি কাজের জন্য পাঠিয়ে দেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসগুলোর বক্তব্য অভিন্ন। এখানে প্রিয় নবী-এর পরম বিনয় ও নম্র আচরণের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এ সব হাদীস থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, প্রিয় নবী বাচ্চাদের শিক্ষা দানের জন্য নিজেই সালাম দিতেন। আর এভাবে তাদেরকে সালাম দেওয়া তাঁর দৃষ্টিতে কোন লজ্জা বা সম্মানহানিকর বলে মনে হতো না। বলা বাহুল্য, বাচ্চাদেরকে সালাম দেওয়ার মধ্যে বহু উপকারিতা বিদ্যমান। ১. বাচ্চাদেরকে সালাম দেওয়ার দ্বারা তাদের মধ্যে একজন অন্যজনকে সালাম দানের অভ্যাস গড়ে ওঠে। ২. তাতে সমাজে ইসলামী তাহযীব ও তামাদ্দুনের ভিত কায়েম হয়, ৩. নিজে বাচ্চাদেরকে সালাম করার দ্বারা মন থেকে গর্ব ও অহংকার ইত্যাদি দূরীভূত হয়, ৪. 'আস্সালামু আলাইকুম' বাক্যটি একটি দু'আ বিশেষ। এ দু'আটির ব্যাপক প্রচলনের কারণে শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ গড়ে ওঠে, ৫. এই সালাম ইসলামের বিশেষ একটি প্রতীক। কাজেই সর্বশ্রেণীর মাঝে সালামের ব্যাপক প্রচলন থাকলে সেটি একটি মুসলিম সমাজ বলে বোঝা যায়।
একখানা হাদীসে হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আম্র ইব্ন আস (রা) বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি প্রিয় নবীকে জিজ্ঞেস করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! ইসলামী আমলগুলোর মধ্যে কোন্ আমলটি সর্বাপেক্ষা উত্তম? প্রিয় নবী উত্তর দিলেন যে, লোকজনকে আহার করানো এবং পরিচিত ও অপরিচিত সকলকে সালাম প্রদান করা। (তারগীব ওয়া তারহীব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৩)
অপর একখানা হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন: (হে মানুষ সকল!) তোমরা যতক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণভাবে ঈমান আনয়ন করবে না ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে না। আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানদার হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি গড়ে না নিবে। আচ্ছা! আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি কাজের পরামর্শ দিব যে কাজটি করার কারণে তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও ভালবাসা গড়ে উঠবে? মনে রেখ! সে কাজটি হলো সালামের বহুল প্রচলন। তোমরা যখনই একজন অন্যজনের সাথে সাক্ষাৎ করবে তখনই তাকে সালাম করবে। আর সালাম দেওয়াকে নিজেদের বৈশিষ্ট্য বানিয়ে নাও। (তারগীব ওয়া তারহীব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৩)
একটি হাদীসে হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) রাসূলুল্লাহ্ থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি ইরশাদ করেছেন: তোমরা সালামের ব্যাপক প্রচলন করে নাও। তা হলে নিজেরা শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে থাকতে পারবে। (ঐ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৪)
হযরত সাহল ইবন হুনাইফ (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি শুধু “اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ" বলে তার আমলনামায় দশটি নেকী লেখা হয়। আর যে ব্যক্তি "اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ" বলে তার আমল নামায় বিশটি নেকী লেখা হয়। আর যে ব্যক্তি السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ বলে তার আমলনামায় ত্রিশটি নেকী লেখা হয়। (তারগীব ওয়া তারহীব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৮)
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন যে, সবচেয়ে অথর্ব হলো সে ব্যক্তি যে দু'আ করতেও অক্ষম (অর্থাৎ আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করতেও জানে না।) আর সবচেয়ে বড় কৃপণ সে ব্যক্তি যে সালাম করার ব্যাপারে কার্পণ্য করে। (তারগীব ওয়া তারহীব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৯)
হযরত আবু উমামা (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি আগে সালাম দেয় সে মহান আল্লাহর অধিক ঘনিষ্ঠ। অর্থাৎ সাক্ষাতের সময় আগে সালাম দেয়ার কারণে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাকের সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করে। (মিল্কাত শরীফ, পৃষ্ঠা ৩৯৮)
এভাবে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন যে, অগ্রে সালাম দানকারী ব্যক্তি গর্ব ও অহংকার থেকে মুক্ত থাকে। (মিল্কাত, পৃষ্ঠা ৪০০)
একখানা হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন যে, প্রিয় নবী ইরশাদ করেছেনঃ এক মুসলমানের উপর অন্য মুসলমানের ছয়টি হক (অধিকার) রয়েছে:
এক. সে অসুস্থ হলে তার সেবা-শুশ্রূষা করা, দুই. সে মারা গেলে তার কাফন ও জানাযায় শরীক হওয়া, তিন. একজন অন্যজনকে দাওয়াত করলে তা কবুল করা, চার. একজন অন্যজনের সহিত সাক্ষাতের সময় সালাম করা, পাঁচ. একজন হাঁচি দিয়ে "আলহামদু লিল্লাহ্' বলার পর অন্যজন তার জবাব দেওয়া। অর্থাৎ 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বলা।
ছয়. একজন অন্যজনের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি সর্বাবস্থায় কল্যাণ কামনা করা। (মিশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা ২৬৭)
অপর একখানা হাদীসে হযরত কাতাদা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন : তোমরা নিজ গৃহে প্রবেশের সময় ঘরের লোকজনকে সালাম দিয়ে প্রবেশ কর। আবার ঘর থেকে বের হওয়ার সময় তাদেরকে সালাম দিয়ে বের হও। (যুজাজাতুল মাসাবীহ্, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৮)
ফাতওয়ায়ে আলমগীরী গ্রন্থে আছে, “প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নিজ গৃহে প্রবেশের সময় 'আস্সালামু আলাইকুম' বলে প্রবেশ করা চাই। আর যদি কোন জনশূন্য ঘরে প্রবেশ করে তখন নিম্নোক্ত বাক্যের দ্বারা সালাম করবে। বাক্যটি হলো- السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللهِ الصالحين
۱۲۹. عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ يَزِيدَ أَنَّ النَّبِيُّ ﷺ مَرَّ بِنِسْوَةٍ فَسَلَّمَ عَلَيْهِنَّ -
১২৯. হযরত আসমা বিন্ত ইয়াযীদ (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী মহিলাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি তাদেরকে সালাম দেন।
ফায়দা : আলিমগণ লিখেছেন যে, মহিলাদেরকে সালাম দেওয়ার বিষয়টি প্রিয় নবী -এর ব্যক্তিগত আমল ছিল। কারণ তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিষ্পাপ ও আল্লাহ্ কর্তৃক সংরক্ষিত। তিনি ফিত্নায় পতিত হওয়া থেকে ছিলেন সম্পূর্ণ নিরাপদ। কাজেই প্রিয় নবী ব্যতীত অন্য লোকদের জন্য বিধান হলো গায়রে মুহাররাম মহিলাকে সালাম না দেওয়া উত্তম। অবশ্য কোন মহিলা যদি এমন হয় যে, বয়স বার্ধক্যের সীমানায় পৌঁছে গেছে তাকে সালাম দিতে কোন আপত্তি নেই। আল্লামা ইব্ন আবেদীন (র) শামী গ্রন্থে লিখেছেন যে, "গায়রে মুহাররাম ব্যক্তির জন্য কোন বেগানা মহিলাকে সালাম দেওয়া অনুচিত। তবে ঐ বেগানা মহিলা যদি বৃদ্ধা হন তাহলে তাকে সালাম দেয়া যায়। অনুরূপ যদি কোন বৃদ্ধা হাঁচি দিয়ে 'আল হামদুলিল্লাহ্' বলে তাহলে বৃদ্ধা হওয়ার কারণে তার হাঁচির জবাব দেয়া যায়। পক্ষান্তরে কোন মহিলা যদি বৃদ্ধা না হয় তা হলে তাকে সালাম কিংবা তার হাঁচির জবাব দেয়া যাবে না। (কেননা এখানে ফিত্নায় পতিত হওয়ার আশংকা আছে) তবে মনে মনে হাঁচির জবাব দিতে হবে।"
একখানা হাদীসে হযরত জারীর ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ একদল মহিলার পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় তিনি তাদেরকে সালাম দেন। (মিশকাত, পৃষ্ঠা ৩৯৯)
আল্লামা হালীমী (র) বলেন যে, যেহেতু প্রিয় নবী কোন প্রকার ফিত্নায় পতিত হওয়া থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিলেন, এ কারণে তাঁর জন্য বেগানা মহিলাকে সালাম দেওয়া জায়িয ছিল। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে নিরাপদ থাকার উপর সম্পূর্ণ নিশ্চিত থাকবেন তার জন্যও বেগানা মহিলাকে সালাম দেওয়ার অনুমতি দেওয়া যায়, অন্যথায় তার নীরব থাকাই শ্রেয়। (আউনুল মা'বুদ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫१९)
গ্রন্থকারের এখানে উপরোক্ত হাদীসগুলো উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো সালামের ব্যাপারে প্রিয় নবী -এর আমলী-নীতি তুলে ধরা। অর্থাৎ প্রিয় নবী শিশু কিংবা বৃদ্ধা, পুরুষ কিংবা মহিলা নির্বিশেষে সকলকেই সর্বাগ্রে সালাম দিতেন।
۱۳۰. عَنْ أَنَسٍ قَالَ مَا رَأَيْتُ أَحَدًا كَانَ أَرْحَمَ بِالْعِيَالِ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ وَكَانَ اسْتَرْضَعَ لِابْنِهِ إِبْرَاهِيمَ فِي أَقْصَى الْمَدِينَةِ وَكَانَ زَوْجَهَا قَيْنًا فَيَأْتَيْهِ وَعَلَيْهِ أَثْرُ الْغُبَارِ فَيَلْتَذِمُهُ وَيُقَبِّلُهُ وَيَشُمُّهُ .
১৩০. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ -এর চাইতে সন্তানদের প্রতি অধিক স্নেহপ্রবণ আর কাউকে দেখিনি। তিনি তাঁর দুগ্ধপোষ্য শিশু হযরত ইব্রাহীম (রা)-কে দুধপান করানোর জন্য মদীনার উপকণ্ঠে বসবাসকারিণী জনৈকা ধাত্রীর কাছে দিয়েছিলেন। ধাত্রীর স্বামী ছিলেন একজন কর্মকার। যখন প্রিয় নবী নিজ সন্তানকে দেখার জন্য সেখানে যেতেন তাঁর শরীর ধুলায়িত হয়ে যেত। এ সত্ত্বেও তিনি তাঁকে বুকে জড়িয়ে নিতেন। তাঁকে চুম্বন করতেন এবং নাকের কাছে তুলে সোহাগ করতেন।
۱۳۱. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ أَرْحَمَ النَّاسِ بِالصِبْيَانِ وَكَانَ لَهُ ابْنُ مُسْتَرْضَعُ فِي نَاحِيَةِ الْمَدْنَةِ وَكَانَ ظَبْرهُ قَيْنًا ، وَكَانَ يَأْتِيهِ وَنَحْنُ مَعَهُ وَقَدْ دُحِنَ الْبَيْتُ بِالإِذْخِرِ فَيَشُمُّهُ وَيُقَبِّلُهُ -
১৩১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ শিশুদের প্রতি সর্বাধিক স্নেহপ্রবণ ছিলেন। তাঁর এক দুগ্ধপোষ্য শিশুর জন্য তিনি মদীনার উপকণ্ঠের জনৈকা ধাত্রী ঠিক করেছিলেন। ধাত্রীর স্বামী ছিলেন একজন কর্মকার। প্রিয় নবী নিজ পুত্রকে দেখার জন্য সেখানে যেতেন। তাঁর সঙ্গে আমরাও থাকতাম। ধাত্রীর ঘর ইস্থির ঘাস জ্বালানো ধোঁয়ায় ভরে থাকত। এ সত্ত্বেও তিনি নিজ সন্তানকে কোলে তুলে নিতেন। তাঁকে নাকের কাছে তুলে সোহাগ করতেন এবং চুম্বন করতেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস দুটির বক্তব্য অভিন্ন। গ্রন্থকার আলোচ্য হাদীসদ্বয়কে প্রিয় নবী -এর বিনয় ও নম্রতা অনুচ্ছেদে পেশ করার কারণ হলো, এ দু'টি হাদীসে তাঁর পবিত্র জীবন যাত্রার সরলতা ও অকৃত্রিমতা সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। পাশাপাশি এ কথাও প্রমাণিত হচ্ছে যে, তিনি পরিবারের লোকজন ও সন্তান-সন্ততি বিশেষত শিশুদেরকে গভীরভাবে স্নেহ করতেন। তাঁর পরম নিরহংকারের প্রমাণ এই যে, তিনি নিজের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে দুধ পান করানোর জন্য একজন কর্মকারের মত সাধারণ ব্যক্তির ঘরে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন নি। তাছাড়া সেই কর্মকারের গৃহে বারবার যাতায়াত করা এবং পথিমধ্যে ধুলার কারণে আপাদমস্তক ভরে যাওয়াকে নিজের আত্মমর্যাদা হানিকর বলে মনে করেননি। কর্মকারদের গৃহে স্বাভাবিকভাবেই ধোঁয়া থাকে। প্রিয় নবী এ সত্ত্বেও নিঃসংকোচে তাদের গৃহে প্রবেশ করতেন। তারপর একজন সাধারণ পিতাও যখন ধুলামাখা দেহে সন্তানকে কোলে নিতে দেরি করে সেখানে তিনি এ সব উপেক্ষা করে নিজ সন্তানকে কোলে নিয়ে স্নেহ প্রবণতার পরম উদাহরণ পেশ করলেন। অথচ অহংকারী ও আত্মপূজারী লোকেরা শিশুদের সাথে এভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়া এবং তাদেরকে স্নেহ ও মমতায় জড়িয়ে নেয়াকে নিজেদের মানমর্যাদা হানিকর বলে বোধ করে থাকে।
প্রিয় নবী নিজে যেভাবে শিশুদেরকে আদর-সোহাগ করতেন সেভাবে অন্যদেরকেও তাদের আদর-সোহাগের জন্য উপদেশ দিতেন। হাদীস গ্রন্থগুলোতে এ ধরনের বহু বর্ণনা পাওয়া যায়, যেখানে শিশুদের প্রতি তাঁর সীমাহীন স্নেহ ও মমতার পরিচয় ফুটে উঠেছে। একখানা হাদীসে বলা হয়েছে যে, একদা প্রিয় নবী তাঁর দৌহিত্র হযরত হাসান (রা)-কে গভীরভাবে স্নেহ করছিলেন। এটি দেখে হযরত আকরা ইন্ন হাবিস (রা) নামক এক সাহাবী বলে উঠলেন, আমার তো দশটি সন্তান আছে। অথচ আমি তো কাউকে আদর-সোহাগ করি না। প্রিয় নবী তখন বললেন: যারা মানুষের প্রতি সোহাগ ও মায়া-মমতা করে না তাদের প্রতি আল্লাহ্ পাকও সোহাগ ও মায়া-মমতা করবেন না। (হায়াতুস্ সাহাবা, ২ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৬৯)
হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে অপর একটি সূত্রে বর্ণিত আছে যে, একবার হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-এর কাছে এক মহিলা আসল। মহিলার সঙ্গে দু'টি শিশু ছিল। হযরত আয়েশা (রা) ঐ মহিলাকে তিনটি খেজুর খেতে দিলেন। মহিলাটি তার দু'টি বাচ্চাকে দু'টি খেজুর দিয়ে একটি নিজে খেতে চাইল। এ সময় শিশুরা পুনরায় তার দিকে চোখ তুলে তাকাল। মহিলা খেজুরটিকে দু'টুক্রা করে অর্ধেক করে উভয় বাচ্চাকে দিয়ে দিল। তারপর সে চলে গেল। অতঃপর প্রিয় নবী গৃহে ফিরে আসলে হযরত আয়েশা (রা) এ ঘটনা তাঁকে শোনালেন। তখন প্রিয় নবী ইরশাদ করেন : মহিলাটি (তার সোহাগ ও মমত্ববোধের কারণে) বেহেস্তে প্রবেশ করবে। অর্থাৎ বেহেস্তের উপযুক্ত বিবেচিত হবে। (হায়াতুস্, সাহাবা, ২ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৭০)
۱۳۲. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكَ يَقُولُ مَا رُفِعَ مِنْ بَيْنَ يَدَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَضْلُ شَوَاءٍ قَطُّ وَلَا حُمِلَتْ مَعَهُ طِنْفِسَةٌ .
১৩২. হযরত আনাস ইব্ন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ থেকে কখনো উচ্ছিষ্ট ভুনা মাংস তুলে নেয়া হয়নি এবং তার জন্য কখনো কার্পেট বিছান হয়নি।
ফায়দা: রাসূলুল্লাহ্ একজন বিনয়ী সাধারণ মানুষের মতই মাটিতে বসে আহার করতেন। আহার শেষে তিনি বরতন খুব ভাল করে পরিষ্কার করতেন এবং অহংকারী লোকদের মতো খাবার বরতনে উচ্ছিষ্ট রেখে দিতেন না। খাবার বরতনে যেসব গর্বিত ও অহংকারী লোক কিছু না কিছু উচ্ছিষ্ট রেখে দেয়, তার দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য থাকে স্বীয় ধনাঢ্যতা ও প্রাচুর্য প্রকাশ করা। অর্থাৎ তারা যেনো তাদের ঐ উচ্ছিষ্ট খাবারের প্রতি তার পরিমাপ যা-ই হোক না কোন আদৌ মুখাপেক্ষী নয়। তাদের দৃষ্টিতে আহার্যের কোন কদর ও মর্যাদা নেই। (নাউযুবিল্লাহ্) নবী আকরাম হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা-এর শিক্ষা ও তাঁর জীবন পদ্ধতি এই অর্থহীন অবজ্ঞা লোক-দেখানো প্রাচুর্য থেকে (যা মূলত নিয়ামতের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন) সম্পূর্ণ ভিন্নতর ছিল। তা ছিল বিনয়, বশ্যতা ও আনুগত্যের উপর ভিত্তিশীল। তাঁর শিক্ষা ও পবিত্র জীবন চরিত্র অধ্যয়ন করলে এ সত্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাদেরকে (আহারের পর) আঙুল, বরতন (রেকাবী, প্লেট প্রভৃতি) ভালভাবে পরিষ্কার করে খেতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন, তোমরা কি জানো খাবারের কোন্ লোকমা ও কোন্ অংশের মধ্যে বরকত নিহিত রয়েছে? (মিল্কাত, পৃষ্ঠা ৩৬৩) খাবার খেয়ে রেকাবীতে উচ্ছিষ্ট রেখে দেয়া তা নষ্ট করার নামান্তর ও নিয়ামতের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন স্বরূপ। তাই বরতন ও আঙুলে লেগে থাকা খাবার উত্তমরূপে চেটে খাওয়া উচিত। অবশ্য খাবার যদি বেশি বেঁচে যায় এবং তা নষ্ট করা উদ্দেশ্য না হয়, তবে তা অবশিষ্ট রেখে দিতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু তা এইভাবে অবশিষ্ট রেখে দিবে যা নিজের কিংবা অন্য কারো খেতে ঘৃণা না হয়। এক্ষেত্রে উত্তম পন্থা হচ্ছে, প্রথমেই আহার্য প্রয়োজন মাফিক বরতনে তুলে নিতে হবে। অনুরূপভাবে চামচ বা আঙুলে যে আহার্য লেগে থাকে তাও অবশ্যই চেটে খাওয়া উচিত, যাতে আল্লাহ্ প্রদত্ত এই নিয়ামত নষ্ট না হয়।
অনুরূপ যদি আহার্যের কোনো লোকমা মাটিতে পড়ে যায়, তবে তাও তুলে নিতে হবে। অবশ্য যদি নোংরা ও নাপাক স্থানে না পড়ে। সে ক্ষেত্রে মাটি মিশ্রিত অংশ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট পরিষ্কার অংশ খেতে হবে। এটাই হচ্ছে মহান আল্লাহর দেয়া নিয়ামতের প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন, বিনয় ও আনুগত্যের নিয়ম। এক হাদীসে হযরত জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেন: শয়তান প্রতিটি কাজের সময় তোমাদের কাছে উপস্থিত থাকে এমনকি আহার করার সময়ও। তাই যখন আহার করার সময় লোকমা মাটিতে পড়ে যাবে, তখন তা তুলে নিবে এবং ধুলাবালি পরিষ্কার করে লোকমাটি খাবে। শয়তানের জন্য রেখে দিবে না। অনুরূপভাবে যখন তোমরা আহার শেষ করবে, তখন স্বীয় আঙুলসমূহ পরিষ্কার করবে এবং যে আহার্য তাতে লেগে থাকবে তা চেটে খাবে। কেননা আহার্যের কোন্ অংশে বরকত নিহিত আছে তা তোমাদের জানা নেই। (মিশকাত, পৃষ্ঠা ৩৬৩)
হযরত আনাস ইবন মালিক (রা)-এর উপরোক্ত হাদীস থেকে একথাও জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ মাটিতে বসে খেতেন এবং নিজের জন্য কোনো বিশেষ স্থান বা বিছানা পত্রের ব্যবস্থা করতেন না। যেমনিভাবে অহংকারী ও আত্মপূজারী লোকেরা স্বীয় শানশওকত প্রকাশের জন্য খাবার মজলিসে কার্পেট গালিচা কিংবা টেবিল চেয়ারের বন্দোবস্ত করে থাকে। বরং সরদারে দু'জাহান শাহানশাহে আরব ও আজম সাধারণ মানুষের মত কোনো বিছানা ছাড়াই মাটিতে বসে খানা খেতেন। এতে তার আল্লাহর বান্দাসুলভ বিনয় ও চরম গর্বহীনতাই প্রকাশ পায়। অনুরূপভাবে তিনি আসন করে বসে কিংবা ঠেস দিয়ে কখনো আহার করতেন না। এটাও আত্মগর্বীদের অভ্যাস। এ সম্পর্কে হযরত আবূ জুহায়ফা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, নবী ইরশাদ করেন: আমি আসন করে বসে (কিংবা ঠেস লাগিয়ে) কখনো আহার করি না। (মিশকাত, পৃষ্ঠা-৩৬৩)
হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন্ন আম্র (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্-কে কখনো আসন করে আহার করতে দেখা যায়নি। আর তিনি কখনো তাঁর সঙ্গীদের আগে আগে চলতেন না। (বরং বিনয়বশত তাদের মাঝখানে চলতেন) (মিশকাত, পৃষ্ঠা ২৬৬)
এক হাদীসে নবী বলেন, তোমরা আহার করার সময় জুতা খুলে নাও। কেননা এটা (জুতা খুলে নেয়া) একটি ভাল অভ্যাস। (জামি সগীর, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৮)
যেসব মুসলমান আজকাল ইউরোপের অন্ধ অনুসরণে জুতা পরিধান করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আহার করাকেই ভদ্রতা মনে করে, তাদের চিন্তা করা উচিত যে, হাশরের দিন তারা আল্লাহ্ হাবীব ও উম্মতের সুপারিশকারী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা-এর সামনে কিভাবে উপস্থিত হবে।
এই সব হাদীস থেকে নবী আহার করার সময় কি পরিমাণ বিনয় নম্রতা অবলম্বন করতেন, তা সহজেই অনুমান করা যায়। আল্লাহ্ তা'আলা সকল মুসলমানকে তাঁর সুন্দরতম চরিত্র ও অনুপম আদর্শ অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন!
۱۳۳. عَنْ أَبِي مَسْعُودٍ قَالَ أَتَى النَّبِيَّ رَجُلٌ يُكَلِّمُهُ فَأُرْعِدَ فَقَالَ عَلَيْكَ فَلَسْتُ بِمَلِكَ، إِنَّمَا أَنَا ابْنُ امْرَأَةٍ مِنْ قُرَيْشٍ كَانَتْ تَأْكُلُ الْقَدِيدَ
১৩৩. হযরত আবূ মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি নবী-এর নিকট কিছু কথা বলার জন্য এলো। কিন্তু সে তাঁর ভয়ে কাঁপতে লাগল। তিনি বললেন : ভয় করো না। আমি তো তোমার বাদশাহ নই (যে, আমাকে দেখে তুমি ভয় করবে)। বরং আমি হচ্ছি কুরায়শ বংশের এমন এক মহিলার সন্তান যিনি (সাধারণ মেয়েদের মত) শুকানো গোশত ভক্ষণ করতেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকেও নবী-এর বিনয়, নম্রতা ও আত্মগর্বহীনতা প্রকাশ পায়। এটা স্পষ্ট যে, তিনি একদিকে ছিলেন সমস্ত নবী ও রাসূলদের সরদার এবং অপরদিকে ছিলেন সমগ্র আরব-আজমের নেতা ও দু'জাহানের পথপ্রদর্শক। প্রতিটি ব্যক্তিকেই তাঁর মাহাত্ম্য, মহিমা ও প্রভাবে প্রভাবান্বিত হওয়া ছিল অবশ্যম্ভাবী। যখনই কোনো আগন্তুক তাঁর সামনে আসতো, তার ভয় ও প্রভাবের দরুন তার মধ্যে কম্পন শুরু হয়ে যেত। কিন্তু তাঁর স্বভাবগত বিনয় ও সরলতার অবস্থা ছিল এরূপ যে, তিনি তার সাথে অত্যন্ত নম্রতা ও বিনয় অবলম্বন করতেন। কেউ যদি ভয় পেতো, তবে তিনি তাকে সান্ত্বনা দিতেন এবং কথায় ও কাজে প্রকাশ করতেন। তার প্রতি দয়া ও সহানুভূতি প্রদর্শন করতেন।
134 عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ وَأَبِي ذَرٍ قَالَا كَانَ النَّبِيُّ يَجْلِسُ بَيْنَ ظَهَرَانِي أَصْحَابِهِ، فَيَجِيْبُ الْغَرِيبُ وَلَايَدْرِي أَيُّهُمْ هُوَ حَتَّى يَسْأَلَ، فَطَلَبْنَا إِلَى النَّبِيِّ الاَنْ نَجْعَلَ لَهُ مَجْلِسًا يَعْرِفُهُ الْغَرِيبُ إِذَا أَتَاهُ، فَبَنَيْنَا لَهُ دَكَأَنَا مِنْ طِينٍ فَكَانَ يَجْلِسُ عَلَيْهِ وَتَجْلِسُ بِجَانِبَيْهِ -
১৩৪. হযরত আবূ হুরায়রা ও হযরত আবূ যার (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী তাঁর সাহাবীদের মাঝখানে সাধারণ মানুষের মতো উপবেশন করতেন। কোনো আগন্তুক আগমন করলে বুঝতে পারতো না যে, তাদের মধ্যে তিনি (রাসূলুল্লাহ্) কোন্ জন যে পর্যন্ত সে জিজ্ঞেস না করতো। তাই আমরা (সাহাবীগণ) নবী-এর জন্য এমন একটি আসন তৈরির অনুমতি প্রার্থনা করলাম, যার উপর উপবেশন করলে তাঁকে আগন্তুকরা সহজেই চিনতে পারে। (বর্ণনাকারী বর্ণনা করেন) অতঃপর আমরা (তাঁর অনুমতি নিয়ে) তাঁর জন্য একটি মাটির চত্বর তৈরি করলাম। তিনি তার উপর আসন গ্রহণ করতেন এবং আমরা তাঁর উভয় দিকে (আশপাশে) বসতাম।
ফায়দা : এ হাদীস থেকেও রাসূলুল্লাহ্-এর স্বভাবগত সরলতা ও প্রকৃতিগত বিনয়-প্রিয়তার পরাকাষ্ঠা প্রকাশিত হয়। তিনি সাহাবাদের মাঝে নিরহংকারভাবে উপবেশন করতেন। যেরূপ সাধারণ বন্ধু-বান্ধবরা একসাথে মিশে বসে থাকে। আমীর-উমারা ও রাজা-বাদশাহদের মত তাঁর বসার জন্য কোনো কুরসী ছিল না; কোনো সিংহাসন, কার্পেট-গালিচা ও শাহী দরবারও ছিল না। সেখানে কোনো শাহী আড়ম্বর, দাসদাসীর করজোড় সারি, স্তাবক ও গুণগায়কদের তোশামোদ-খোশামোদও ছিল না—যাতে তাঁর স্বতন্ত্র মর্যাদা প্রকাশ পেতে পারে। কেননা এসব বিষয় ছিল তাঁর প্রকৃতিগত বিনয়ের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তিনি এসব আদৌ পছন্দ করতেন না। কিন্তু যখন বাইরের নতুন নতুন প্রতিনিধি দলের আগমন বেড়ে গেলো এবং দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তাঁর সাক্ষাৎ ও বায়আত গ্রহণের জন্য আসতে লাগলো, তখন সাহাবাগণ এ অনিবার্য প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে তাঁর বসার জন্য একটি স্বতন্ত্র আসন তৈরির আবেদন করলেন এবং তিনিও অপরিহার্যতা লক্ষ করে মাটির একটি আসন তৈরির অনুমতি দেন।
١٣٥ عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ كُلِّ جَعَلَنِي اللَّهُ فِدَاكَ مُتَّكِنًا فَإِنَّهُ أَهْوَنَ عَلَيْكَ، قَالَتْ فَأَصْغَى بِرَأْسِهِ حَتَّى كَادَ أَنْ تُصِيبَ جَبْهَتُهُ الْأَرْضَ ثُمَّ قَالَ لَا بَلْ أَكُلُ كَمَا يَأْكُلُ الْعَبْدُ وَاجْلِسُ كَمَا يَجْلِسُ الْعَبْدُ .
১৩৫. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! (আল্লাহ্ আমাকে আপনার জন্য কুরবান করে দিন) আপনি ঠেস দিয়ে বসে আহার করুন। তাতে আপনি আরাম অনুভব করবেন। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, একথা শুনে তিনি তাঁর শির মুবারক এতই নিচু করলেন যে, তাঁর কপাল মাটি স্পর্শ করার উপক্রম হলো। তারপর তিনি বললেন: না, বরং আমি একজন সাধারণ গোলামের মতো আহার করবো এবং একজন সাধারণ লোকের মতো বসবো।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, দু'জাহানের সরদার, রাব্বুল আলামীনের প্রিয়তম বন্ধু হযরত মুহাম্মদ কোনো অবস্থাতেই সরলতা ও বিনয় ত্যাগ করা পছন্দ করেন নি। খাবার জন্য বসার ক্ষেত্রে তো তিনি বিশেষভাবেই বিনয় অবলম্বন করতেন। তিনি কখনো আসন করে বসে কিংবা হেলান দিয়ে আহার করেন নি। হযরত আয়েশা (রা) যখন ভালবাসা ও সহানুভূতিবশত নবী-কে একটু আরামের সাথে বসে খাবার খেতে অনুরোধ করলেন, বরং তখন তিনি তাঁর অনুরোধ ও অবস্থানের উল্টো দাসত্ব প্রকাশের জন্য আরো যমীনের উপর ঝুঁকে গেলেন এবং মুখেও বিনয় প্রকাশ করলেন।
আলিমগণ বলেন, ঠেস কিংবা হেলান দিয়ে খানা খাওয়ার চারটি অবস্থা হতে পারে। চারটি অবস্থাই এই হাদীসের আওতায় এসে যাচ্ছে। (১) ডান বা বামে কোনো তাকিয়া বা পাঁচিল প্রভৃতির উপর ভর করা। (২) হাতের তালু মাটির উপর রেখে তার উপর ভর করা। (৩) কোনো পাঁচিল বা তাকিয়ার সাথে কোমর লাগিয়ে সাহায্য নেয়া। (৪) গদি কিংবা কার্পেট প্রভৃতির উপর আসন করে বসে আহার করা। এই চারটি অবস্থাই সুন্নতের খেলাফ।
📄 নবী (সা)-এর নম্রতা ও বিনয়
١١٤. عَنْ قُدَامَةَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَامِرٍ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَرْمِي الجَمْرَةَ عَلَى نَاقَةٍ شَهَبَاءَ لأَضَرْبَ وَلَا طَرْدَ وَلَا إِلَيْكَ إِلَيْكَ -
১১৪. হযরত কুদামা ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন আমির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-কে (হজ্জের মৌসুমে) খাকী বর্ণের একটি উটনীর উপর সাওয়ার হয়ে (আকাবায়) কংকর নিক্ষেপ করতে দেখেছি। (তিনি এভাবে কংকর নিক্ষেপের জন্য গিয়েছেন যে, লোকজনকে তাঁর কাছ থেকে দূরে থাকার জন্য) না কোন মারপিট ছিল আর না কোন প্রকারের হাঁকডাক। অনুরূপ 'এদিকে যাও' 'ওদিকে সর' এ সব কথাও বলা হয়নি।
ফায়দা: এ অনুচ্ছেদে প্রিয় নবী এর বিনয় ও নম্রতা বিষয়ক হাদীসসমূহ বর্ণনা করা হয়েছে। উল্লিখিত প্রথম হাদীসের থেকে তাঁর পূত-পবিত্র চরিত্রে পরম বিনয় নীতির প্রকাশ পাওয়া যাচ্ছে। কেননা প্রিয় নবী তখন একই সঙ্গে গোটা বিশ্বের পথপ্রদর্শক ও সকল নবীর সর্দার হওয়ার পাশাপাশি সমকালীন প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তা ব্যক্তিও ছিলেন। তা সত্ত্বেও তাঁর চাল-চলনে সর্বোচ্চ কর্তাসুলভ আচরণে কোন ভিন্নতা দেখা যায়নি। হজ্জের মৌসুমে হাজীদের প্রচণ্ড ভিড় থাকে। উপরন্তু তাঁদের অধিকাংশই থাকেন এমন চরিত্রের যারা নাগরিক রীতি-নীতি সম্পর্কে অসচেতন ও অনভ্যস্ত। এমন পরিস্থিতিতে একজনের শরীরে অন্যজনের শরীরের ধাক্কা লাগা, ভিড়ের চাপে কেউ নিচে পড়ে যাওয়া মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে প্রিয় নবী নিজের মর্যাদা বা মান-সম্মান বজায় রাখার উদ্দেশ্যে পৃথক কোন ব্যবস্থাই নেননি। তিনি সাধারণ হাজীদের সঙ্গে মিশে হজ্জের কাজকর্ম সম্পাদন করে যান। তাঁর আগমন উপলক্ষে রাস্তায় পথচারীদের না আসা-যাওয়া বন্ধ করা হয়েছিল, আর না তাঁর সম্মান প্রদর্শনার্থে পথচারীদেরকে 'সর' কিংবা 'দূরে থাক' ইত্যাদি বলা হয়েছিল। মোটকথা প্রিয় নবী নিজের প্রাধান্য প্রদর্শনের কোন ব্যবস্থা অবলম্বন করেননি।
এভাবে প্রিয় নবী-এর নম্রতা ও বিনয় সম্পর্কে আরো জানা যায় যে, তিনি মক্কা শরীফে যখন অসহায় ও শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থায় কালাতিপাত করছিলেন। ধৈর্য ও সহনশীলতা অবলম্বন ব্যতিরেকে তাঁর অন্য কোন পথ ছিল না। তখন আল্লাহ্ পাক তাঁকে ইখতিয়ার দিয়ে বলেছিলেনঃ হে নবী! আপনার অভিমত কি? আপনি কি বাদশাহী সংযুক্ত নবুওয়াত পেতে চান, আর না আবদিয়্যাত সংযুক্ত নবৃওয়াত? প্রিয় নবী নিজের পরম বিনয় প্রকাশ করে বাদশাহীর পরিবর্তে আবদিয়্যাত সংযুক্ত নবৃওয়াত লাভের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন এবং নিজের জন্য অভাব-অনটনের পথ বেছে নেন। অথচ নবুওয়াতের সঙ্গে বাদশাহীর সংযুক্ত প্রার্থনা করতে কোন বাধা ছিল না। তাঁর সম্মুখে হযরত সুলায়মান (আ)-এর উদাহরণও বিদ্যমান ছিল। তাছাড়া এই বাদশাহী গ্রহণ নবৃওয়াতের দায়িত্ব পালনের পথে কোন প্রতিবন্ধক বলেও বিবেচিত হতো না। কিন্তু 'রাহমাতুললিল আলামীন নিজের স্বভাবজাত চাহিদার নিরিখে বাদশাহীর উপর আবদিয়্যাতকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। এ কারণেই একাধিক হাদীসে পাওয়া যায় যে, এর পর প্রিয় নবী কখনো হাতের উপর বা পিঠের উপর ভর করে বসে পানাহার করেননি। স্বয়ং ইরশাদও করেছেন: আমি একজন নগণ্য বান্দা হিসাবে বসি, একজন ক্রীতদাস যেভাবে আহার করে আমিও সেভাবে আহার করি।
নম্রতা ও বিনয়ের এ নীতির কারণে প্রিয় নবী কখনো কোন খাদেম বা কাজের লোককে কোন ভুলের কারণে প্রহার করতেন না। আর কখনো বকাঝকাও দিতেন না। একটি হাদীসে এতটুকুও বলা হয়েছে যে, হযরত উমর (রা) বলেন, প্রিয় নবী ইরশাদ করেছেন যে, আমার প্রশংসা করতে গিয়ে তোমরা খৃস্টানদের মত বাড়াবাড়ি করো না। খৃস্টানরা তাদের নবী ঈসা (আ)-এর প্রশংসা করতে গিয়ে সীমা অতিক্রম করে এবং শেষ পর্যন্ত তার ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্ পুত্র বলে অভিহিত করে। (নাউযুবিল্লাহ্) আমি আল্লাহ্র একজন বান্দা মাত্র। কাজেই তোমরা আমাকে কেবল عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُهُ "আল্লাহ্র বান্দা ও তাঁর রাসূল" এতটুকু প্রশংসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবে।
নম্রতা ও বিনয়ের অভ্যাস আল্লাহ্ পাকের কাছেও খুবই পছন্দনীয়। পক্ষান্তরে অহংকার ও বড়ত্বের মনোভাবকে তিনি খুবই অপছন্দ করেন। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ তাঁর প্রিয় বান্দাদের চরিত্র আলোচনা করে ইরশাদ করেন:
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا -দয়াময় আল্লাহ্র খাস বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে। আর অজ্ঞ লোকেরা যখন সম্বোধন করে তখন তারা তর্কে অবতীর্ণ হয় না বরং শান্তি কামনা করে। (সূরা ফুরকান: ৬৩)
সারকথা মু'মিন মুসলমানদের বৈশিষ্ট্য হলো যে, তারা আচার-আচরণের ক্ষেত্রে নম্রতা ও বিনয় অবলম্বন করে চলে। কখনো কোন অজ্ঞ কিংবা অভদ্র লোক তাদেরকে কোন কটুকথা বললে তারা ক্ষমার চোখে দেখে এবং ভদ্রনীতির প্রদর্শন করে। গর্ব করা, অহংকার করা কিংবা আত্মম্ভরিতা প্রকাশ করা মু'মিনের কাজ নয়।
এ কারনেই একবার হযরত লোকমান (আ) নিজ পুত্রকে বেশ কিছু উপদেশ দেন। সে সব উপদেশের মধ্যে তিনি নম্রতা ও বিনয়ের নীতি অবলম্বনের কথাটি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। পবিত্র কুরআনে সে উপদেশটি নিম্নোক্ত ভাষায় বর্ণিত আছে:
وَلَا تُصَعِرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ বৎস! অহংকারবশে তুমি কখনো মানুষকে অবজ্ঞা করো না। আর পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে চলাফেরা করো না। কারণ আল্লাহ্ কোন উদ্ধত ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না। (সূরা লুকমান: ১৮)
আলিমগণ লিখেছেন, আল্লাহ্ পাকের নিকট যেভাবে অহংকার করা পছন্দনীয় নয় তেমনি অহংকারীদের চাল-চলন, রীতি-নীতি ইত্যাদি অনুসরণ করাও পছন্দনীয় নয়। অর্থাৎ কোন ব্যক্তি এমন হতে পারে যে, সে আন্তরিকভাবে অহংকারী নয় তবে অহংকারী লোকেরা যেভাবে চলে সে ব্যক্তি ঐভাবে চলাফেরা করে থাকে। আল্লাহ্ পাক তার এই চলাফেরাকে পছন্দ করেন না। ইসলামী শরীয়তের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো যে, এখানে আল্লাহ্ তা'আলার তরফ থেকে মানবীয় রীতি-নীতি ও শিষ্টাচারিতার বহু ক্ষুদ্র জিনিসকে বর্ণনা করে দেওয়া হয়েছে।
একখানা হাদীসে হযরত ইয়ায ইবন হাম্মাদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন যে, মহান আল্লাহ্ আমার নিকট এ মর্মে ওহী প্রেরণ করেছেন যে, তোমরা নম্রতা ও বিনয় অবলম্বন কর। কেউ কারুর উপর কোন অবিচার কিংবা বাড়াবাড়ি করো না। অনুরূপ কেউ কারুর উপর অহংকার কিংবা গর্ব প্রকাশ করো না (আবূ দাউদ, খ. ২, পৃষ্ঠা ৬৭১)।
অপর একখানা হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন যে, গরীবকে দান-খয়রাত করার কারণে সম্পদ হ্রাস পায় না। নম্রতা, বিনয় ও ক্ষমাপরায়ণতা ব্যক্তির সম্মান বৃদ্ধি করে। যে ব্যক্তি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে বিনয় অবলম্বন করে আল্লাহ্ পাক তার মান-সম্মান অনেক গুণে বৃদ্ধি করেন। (তিরমিযী শরীফ, খ. ২, পৃষ্ঠা ২৪)
বিনয় ও নম্রতা অবলম্বনের ফলে মানব চরিত্রে অন্যান্য আরো বহু সদ্গুণের সৃষ্টি হয়ে থাকে। বিভিন্ন হাদীসে প্রিয় নবী এগুলিকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। যেমন : এক. বিনয় অবলম্বন নিজেই একটি ইবাদত। পূর্ববর্তী হাদীস থেকে স্পষ্ট যে, আল্লাহ্ পাক মানুষকে বিনয় অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। কাজেই বিনয় অবলম্বনের ফলে ব্যক্তির জীবনে আল্লাহ্ পাকের একটি হুকুম প্রতিফলিত হয়। দুই. বিনয়ী ব্যক্তি একদিকে যেমন মহান আল্লাহ্র কাছে প্রিয় তেমনি মানুষের দৃষ্টিতেও সে পছন্দনীয় ও প্রিয় ব্যক্তি হিসাবে বিবেচিত। লোকজন মন থেকে তাকে ভালবাসে; তার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে ও মেলামেশা করতে আনন্দ পান। বিনয়ী ব্যক্তির পক্ষে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করা সহজ হয়। কারণ লোকজন এ চরিত্রের মানুষকে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কাজকর্মে নিজেদের উপর অগ্রাধিকার ও নেতৃত্ব প্রদান করতে ভালবাসে। বলা বাহুল্য, নম্রতা ও বিনয় এভাবেই মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতের উচ্চমর্যাদা দান করে। তিন. বিনয়ী ও অমায়িক ব্যক্তির দুশমনের সংখ্যা খুবই কম হয়ে থাকে। কারণ মানুষ সাধারণত তার বিনয়ী চরিত্র অবলোকন করে তার শত্রুতা কিংবা বিরোধিতা করা এবং তাকে কোন প্রকার কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকে। চার. বিনয় অবলম্বনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুফল হলো যে, বিনয়ের ফলে ব্যক্তি অতি সহজে চারিত্রিক গুণাবলির দ্বারা নিজেকে গুণান্বিত করতে সক্ষম হয়। তাই চরিত্রবান লোকদেরকে সাধারণভাবে বিনয়ী দেখা যায়। পক্ষান্তরে দাম্ভিক ও অহংকারী মানুষ আল্লাহ্ পাকের দরবারে যেমন অপছন্দনীয় তেমনি মানুষের কাছেও চরম ঘৃণিত। সে দুনিয়াবাসীর অন্তরে কখনো স্থান পায় না। তদ্রূপ আখিরাতেও তার জন্য রয়েছে চরম লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা। লোকজন তার ধনৈশ্বর্যের ভয়ে কিংবা ক্ষমতার কারণে হয়ত তার বিরুদ্ধে মুখে কিছু বলে না তবে মনে মনে তাকে অপছন্দ করে থাকে। এ সত্যতা যাচাইয়ের জন্য খুব দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা এর জ্বলন্ত সাক্ষী।
١١٥. عَنْ أَبِي الْمَلِيْحِ حَدَّثَنِي نَصَرُ بْنُ وَهَبِ الخُزَاعِيُّ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ رَكِبَ حِمَاراً مَرْسُوْنَا بِغَيْرِ سَرْجٍ مُوَكَّفٌ عَلَيْهِ قَطِيفَةٌ جَزْرِيَّةٍ ثُمَّ دَعَا مُعَاذَ bْنَ جَبَلٍ فَأَرْدَفَهُ - فَأَرْدَفَهُ -
১১৫. হযরত নাসর ইবন ওয়াহ্হাব খোযাঈ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, একদা রাসূলুল্লাহ্ এমন একটি গাধার পিঠে আরোহণ করেন যেখানে বসার কোন গদি ছিল না। তবে রশির লাগাম পরা ছিল এবং এর উপর একখণ্ড পুরাতন চামড়া রাখা ছিল। তারপর তিনি হযরত মুআয ইবন জাবাল (রা)-কে ডেকে নেন এবং নিজের পেছনে আরোহণ করান।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস থেকেও প্রিয় -এর পরম বিনয়-নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রিয় নবী নিজের শক্তি ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনের মুহূর্তে একটি সাধারণ গাধার পিঠে আরোহণ করতে দ্বিধা করেননি। অথচ তিনি যদি সামান্য ইঙ্গিতটুকুও করতেন তা হলে জান কুরবান হযরত উসমান ইব্ন আফফান (রা)-এর মত দানবীর সাহাবীগণ তাঁকে উন্নত থেকে উন্নততর সাওয়ারীর ব্যবস্থা করে দিতে বিন্দুমাত্রও বিলম্ব করতেন না।
একখানা হাদীসে হযরত আবূ সালামা (রা) বলেন, আমি প্রিয় নবী -এর যবান মুবারক থেকে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন: যে ব্যক্তির মনে শস্যদানা পরিমাণ অহংকার থাকবে সে বেহেস্তে প্রবেশ করবে না। (তারগীব ওয়া তারহীব, খ. ৪, পৃষ্ঠা ৪৫)
١١٦. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَعُودُ الْمَرِيضِ وَيَتَّبِعُ الْجَنَازَةَ وَيُجِيبُ دَعْوَةَ الْمَعْلُوكَ وَيَرْكَبُ الْحِمَارَ وَكَانَ يَوْمَ خَيْبَرَ وَيَوْمَ قُرَيْظَةَ وَالنَّصْيْرِ عَلَى حِمَارٍ مَخْطُوْمٍ بِحَبْلٍ مِنْ لِيْفَ تَحْتَهُ إِكَافُ مِنْ لِيْفَ -
১১৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর নিয়ম ছিল যে, তিনি অসুস্থদের শুশ্রূষা করতেন, জানাযার সঙ্গে হেঁটে যেতেন, গোলাম ও শ্রমিকদের আমন্ত্রণ কবুল করতেন এবং গাধার পিঠে আরোহণ করতেন। (রাবী বলেন) প্রিয় নবী খাইবার যুদ্ধের দিন একটি গাধার পিঠে আরোহী ছিলেন। এ গাধাটির লাগাম ছিল খেজুরের ছাল দিয়ে পাকানো একটি রশি এবং গাধার গদিটি ছিল খেজুরের কতগুলি ছাল ও ডালের দ্বারা বানানো। (ইবন মাজা, পৃষ্ঠা-৫৪৫)
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসে প্রিয় নবী-এর এমন চারটি উন্নত অনুপম সদ্গুণের উল্লেখ করা হয়েছে যেগুলি সাধারণত কোন নীতিপরায়ণ চরিত্র মাধুরী সম্পন্ন বিনয়ী ব্যক্তির পক্ষেই অবলম্বন করা সম্ভব হয়ে থাকে।
১. অসুস্থের সেবা শুশ্রূষা: হাদীসে পাওয়া যায় যে, প্রিয় নবী আশরাফ-আত্মাফ, ধনী-নির্ধন, আযাদ-গোলাম নির্বিশেষে সকলের খোঁজ-খবর নিতেন। কারোর অসুস্থতার সংবাদ পেলে নিঃসংকোচে তার শুশ্রূষার জন্য যেতেন। এমন কি একবার তাঁর জনৈক ইয়াহুদী খাদেম অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তিনি সেই ইয়াহুদীর শুশ্রূষা করেন। প্রিয় নবী -এর চাচা আবু তালিব ইসলাম গ্রহণ করেননি। অথচ তার অসুস্থতাকালে তিনি শুশ্রূষার জন্য গিয়েছিলেন।
২. লাশের সঙ্গে যাওয়া: প্রিয় নবী মৃতের জানাযায় শরীক হতেন। নিজেই জানাযার সালাত পড়াতেন। জানাযার পর লাশের সঙ্গে গোরস্তান পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে দাফন কাজে শরীক হতেন। একদা মসজিদে নবুবীর ঝাড়ু দানকারিণী এক মহিলা রাত্রিকালে ইন্তিকাল করেন। সাহাবীগণ রাতে প্রিয় নবী-এর কষ্ট হতে পারে এ আশংকায় তাঁকে সংবাদ দেননি। নিজেরাই মহিলার কাফন-দাফনের কাজ সম্পন্ন করে নেন। পরে এ সংবাদ প্রিয় নবী-এর নিকট পৌঁছলে তিনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং মহিলার কবরে গিয়ে জানাযা পড়ে আসেন। অনুরূপভাবে মদীনার অধিবাসী আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই ইব্ন সাল্ল ছিলেন মুনাফিকদের নেতা এবং مسلمانوں চরম শত্রু ও ইসলাম বিদ্বেষী। এ লোকটি মারা গেলে তখনও প্রিয় নবী তার জানাযার নামায পড়িয়েছিলেন।
৩. দরিদ্রদের আমন্ত্রণ কবুল করা: দরিদ্রদের আমন্ত্রণ কবুল করা এবং তাদের কথা শোনা মানুষের অন্যতম সদ্গুণ। প্রিয় নবী প্রতিটি মানুষের বক্তব্য শুনতে চেষ্টা করতেন। একটি গোলামও যদি তাঁকে নিজ প্রয়োজন সমাধা করে দেয়ার জন্য নিয়ে যেতে চাইত তখন তিনি নিঃসংকোচে গোলামের সঙ্গে চলে যেতেন। এমন কি কোন ক্রীতদাসী পর্যন্ত তুচ্ছ কোন কাজের জন্য যখন তাঁর কাছে সাহায্য চাইত তখনও তিনি তা সমাধা করে দিতে নিজের মর্যাদার জন্য হানিকর বলে মনে করতেন না।
৪. গাধার পিঠে আরোহণ করা: প্রিয় নবী-এর জন্য উট, ঘোড়া ইত্যাদি জাতীয় উন্নত বাহন গ্রহণের ব্যবস্থা ছিল। অথচ তিনি বিনয় প্রকাশার্থে গাধা ও খচ্চরের পিঠেও সাওয়ার হতেন। বাহন হিসাবে গাধা ব্যবহার করাকে নিজের জন্য অপমানজনক মনে করতেন না। এভাবে প্রয়োজনের মুহূর্তে নিজের পেছনে অন্যকে বসিয়ে নিতেন। খায়বার যুদ্ধ ও বনু কুরায়যা ও নাযীর যুদ্ধে তিনি যখন একজন সেনাপতি ও مسلمانوں প্রধান হিসাবে রণক্ষেত্রের পার্শ্ব অতিক্রম করছিলেন তখন তাঁর বাহনটি ছিল সামান্য একটি গাধা। অথচ এমন অবস্থায় অতিশয় বিনয়ী প্রকৃতির নেতাগণও প্রতিপক্ষকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে নিজের শৌর্যবীর্য ও জাঁকজমকের প্রকাশ আবশ্যক বলে মনে করে থাকেন। কিন্তু প্রিয় নবী-এর চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী। তিনি স্বভাবজাত নম্রতা ও বিনয় ত্যাগ করে কৃত্রিমতা অবলম্বন করাকে পছন্দ করেননি। এটিই ছিল রাহমাতুল লিল্ আলামীন -এর যথাযোগ্য উত্তম অনুপম আদর্শ।
۱۱۷. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا أَنَّهَا سُئِلَتْ مَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَصْنَعُ فِي بَيْتِهِ ؟ قَالَتْ كَمَا يَصْنَعُ أَحَدُكُمْ فِي بَيْتِهِ - يَخْصِفُ النَّعْلَ وَيُرَقِعُ الثوب -
১১৭. (উম্মুল মু'মিনীন) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত যে, একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, রাসূলুল্লাহ্ ঘরে প্রবেশ করে কি কি কাজ করতেন? উত্তরে হযরত আয়েশা (রা) বলেন, তিনি সেই সব কাজই করতেন যেগুলো সাধারণত তোমরা নিজেদের ঘরে করে থাক। তিনি নিজ হাতে জুতা সেলাই করতেন এবং কাপড়ে তালি লাগাতেন।
۱۱۸. عَنْ أَبِي بُرْدَةَ قَالَ قُلْتُ لِعَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا مَا كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَصْنَعُ فِي بَيْتِهِ ؟ قَالَتْ كَانَ فِي مِهْنَةِ أَهْلِهِ -
১১৮. হযরত আবূ বুরদা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়েশা সিদ্দীকা (রা) -কে জিজ্ঞেস করলাম যে, নবী বাড়ির ভেতরে কি কাজ করতেন? তিনি বললেন, নবী ঘরের কাজকর্মে অন্যদের সাহায্য করতেন।
۱۱۹. عَنْ مُجَاهِدٍ عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَ قُلْتُ مَا كَانَ يَصْنَعُ النَّبِيُّ فِي بَيْتِهِ قَالَتْ يَخْصِفُ النَّعْلَ وَيُرْقِعُ التَّوْبَ .
১১৯. মুজাহিদ (র) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম যে, প্রিয় নবী ঘরের ভিতর থাকাকালে কি কি কাজ করতেন? তিনি বললেন, নবী নিজ হাতে নিজের চপ্পল সেলাই করতেন এবং নিজের পোশাকে তালি লাগাতেন।
ফায়দা : উপরোক্ত তিনটি হাদীসের মর্ম প্রায় অভিন্ন। এখানে গৃহের অভ্যন্তরে থাকাকালে প্রিয় নবী যে সব কাজকর্ম করতেন বলে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) বর্ণনা করেছেন। তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ঘরের ভিতরে তিনি অতিশয় সাদাসিধা ও সরল জীবন যাপন করতেন। একজন সাধারণ মানুষের মতই ছিল তাঁর পারিবারিক জীবন। রাজকীয় রীতি-নীতি কিংবা কোন জাঁকজমক তাঁর পরিবারে ছিল না। এখানে গভীরভাবে লক্ষণীয় যে, প্রিয় নবী নবুওয়াতের মহান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হওয়া এবং বিশ্ব নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পদে সমাসীন হওয়া সত্ত্বেও তিনি ঘরে প্রবেশ করে নিজের কাজ নিজ হাতেই সম্পাদন করতেন। পারিবারিক ছোট ছোট কাজগুলি সম্পাদন করতে বিন্দুমাত্র সংকোচ বোধ করতেন না। অনুরূপভাবে তাঁর গৃহে কাজ করার মত লোকের অভাব ছিল এমনও নয়। হযরত আনাস ইবন মালিক ও হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রা) উভয়ে প্রিয় নবী -এর একান্ত খাদেম ছিলেন। প্রিয় নবী-এর কাজকর্ম আঞ্জাম দেওয়ার কাজে তাঁরা এতটুকু ঘনিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলেন যে, লোকেরা তাঁদেরকে প্রিয় নবী-এর পরিবারের সদস্য বলে মনে করতো। অনুরূপ উম্মুল মু'মিনীনদের জন্যও সেবিকা ছিল। এতদসত্ত্বেও প্রিয় নবী নিজ ঘরে প্রবেশের পর নিজের কাজকর্ম নিজেই সম্পাদন করতেন।
নম্রতা ও বিনয় আল্লাহ্ পাকের কাছেও প্রিয় এবং রাসূলুল্লাহ্-এর কাছেও ছিল প্রিয়। একখানা হাদীসে হযরত আবূ সাঈদ খুদ্রী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাকের সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে এক ধাপ বিনয় অবলম্বন করবে আল্লাহ্ পাক বেহেস্তে তার জন্য এক ধাপ মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। আর যে ব্যক্তি এক ধাপ অহংকার অবলম্বন করবে আল্লাহ্ পাক তার জন্য এক ধাপ মর্যাদা অবনতি করে দিবেন। এভাবে অহংকার অবলম্বনের কারণে আল্লাহ্ পাক ব্যক্তির মর্যাদা ক্রমে ক্রমে অবনতি করে অবশেষে দোযখের সর্বনিম্নে নিক্ষেপ করবেন। (ইবন মাজা, পৃষ্ঠা ৫৪৪, মিসর)।
۱۲۰ عَنْ عُرْوَةَ عَنْ أَسَامَةَ بْنِ زَيْدِ أَخْبَرَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ رَكِبَ يَوْمًا حِماراً بِإِكَافَ عَلَيْهِ قَطِيفَةٌ فَرَدِفَهُ أَسَامَةَ ابْنَ زَيْدٍ يَعُودُ سَعْدَ بْنَ عُبَادَةٌ فِي بَنِي الْحَارِثِ ابْنِ خَزْرَجٍ وَذَلِكَ قَبْلَ وَقْعَةِ بَدْرٍ -
১২০. হযরত উরওয়া ইব্ন যুবায়র (রা) হযরত উসামা ইবন যায়িদ (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ একটি গাধার উপর আরোহণ করেন। গাধাটির পিঠে গদি হিসেবে একটি চাদর ছিল। তারপর তিনি নিজের পেছনে হযরত উসামা ইবন যায়িদ (রা)-কে বসালেন এবং হযরত সাদ ইবন উবাদা (রা)-এর শুশ্রূষার জন্য বনু হারিস ইব্ন খাযরাজ গোত্রের আবাসস্থলে গমন করেন। এ ঘটনাটি ছিল বদর যুদ্ধের পূর্বেকার।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস উল্লেখ করার পেছনে গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হলো প্রিয় নবী -এর নম্রতা ও বিনয় চরিত্রের বর্ণনা করা। অবশ্য এতদসংক্রান্ত একখানা হাদীস ইতিপূর্বে ১১৫ নং-এ আলোচিত হয়েছে। এ হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, প্রিয় নবী নিরহংকার চরিত্রের কারণে বাহন হিসেবে সামান্য গাধাকেও ব্যবহার করেছেন। অহংকারী ও দাম্ভিক লোকদের ন্যায় বাহন হিসাবে তুচ্ছ গাধার ব্যবহারকে তিনি নিজের মর্যাদা হানিকর বলে মনে করেননি। এভাবে নিজের সঙ্গে অন্য একজনকেও বসিয়ে নিতে তাঁর কোনই সংকোচবোধ হয়নি। অথচ সাধারণভাবে কোন রাষ্ট্রপতি কিংবা কোন সম্রাট এহেন আচরণ করতে লজ্জাবোধ করবেন। ইতিহাস গ্রন্থে পাওয়া যায় যে, সফরে ও মদীনা শরীফে অবস্থান কালে বিভিন্ন স্থানে প্রিয় নবী চল্লিশ জনেরও অধিক সাহাবীকে নিজের সঙ্গে সাওয়ারীতে আরোহণের মর্যাদা দান করেন। কখনো কখনো তিনি নিজে পেছনে বসে সঙ্গীকে আগে বসতেও দিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ! এটি ছিল মহানবী-এর চরিত্র মাধুরীর নমুনা। প্রিয় নবী-এর আখলাক ও শামাইল সম্পর্কে যাঁরা অধ্যয়ন করেন তাঁদের কাছে তাঁর বিনয় ও নম্রতার বহু ঘটনা সুস্পষ্ট। তিনি সর্বদা মোটা ও স্থূল পোশাক পরিধান করতেন। সাধারণ মানের আহার গ্রহণ করতেন। তালি লাগানো জুতা ব্যবহার করতেন, নিজেই ঘরের বকরীর দুধ দোহন করতেন, নিজের জুতা নিজেই সেলাই করতেন, নিজের কাপড়-চোপড় নিজেই ধুয়ে নিতেন, গাধার পিঠে আরোহণ করে চলতে এবং নিজের সঙ্গে অন্যকে বসিয়ে নিতে কখনো লজ্জাবোধ করতেন না।
١٦١. عَنْ أَنَسٍ قَالَ لَمْ يَكُنْ شَخْصُ أَحَبُّ إِلَيْهِمْ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَكَانُوا إِذَا رَأَوْهُ لَمْ يَقُومُوا إِلَيْهِ لِمَا يَعْرِفُونَ مِنْ كَرَاعِيَّتِهِ لَهُ -
১২১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাহাবীদের মনে রাসূলুল্লাহ্ -এর চেয়ে অধিক ভালবাসা অন্য কারোর জন্য ছিল না। এতসত্ত্বেও তাঁরা রাসূলুল্লাহ্ -কে কখনো আসতে দেখে তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়াতেন না। কারণ তারা জানতেন যে, তিনি এভাবে দাঁড়ানোকে মোটেও পছন্দ করেন না।
ফায়দা : এ হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, প্রিয় নবী তাঁর সাহাবীদেরকে তাঁর প্রতি দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করতে নিষেধ করতেন। কেননা এটি অহংকারী লোকদের রীতি। অহংকারী কর্তা ব্যক্তিরা মানুষের কাছ থেকে এ ধরনের লৌকিক সম্মান পেতে চায়। আর তাদের প্রজা ও দরবারের সদস্যরাও এ পদ্ধতিতে সম্মান জানায়। কর্তা ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য হলো নিজেদের বড়ত্ব ও আধিপত্যের প্রকাশ ঘটানো এবং মানুষের কাছ থেকে জবরদস্তিমূলক সম্মান আদায় করা। আর এ কারণেই তাদের সম্মানার্থে যারা দাঁড়াবে না, তাদেরকে অপরাধী বলে গণ্য করে। অথচ কোন সন্দেহ নেই এটি নিজের অহংকার প্রকাশেরই একটি বিকল্প মাত্র, যা মিছামিছি প্রদর্শনীর অবতারণা বৈ কিছুই নয়। এ অভ্যাস খুবই মন্দ একটি অভ্যাস। এটি ব্যক্তিকে আল্লাহ্ পাকের কঠিন ক্রোধ ও গযবের মধ্যে নিপতিত করে। এ কারণেই প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা এ ধরনের প্রদর্শনী করা থেকে সাহাবীদেরকে নিষেধ করতেন।
একখানা হাদীসে হযরত আবূ উমামা (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ একটি লাঠির উপর ভর করে আমাদের দিকে আসছিলেন। আমরা তাঁর আগমন উপলক্ষে সবাই দাঁড়িয়ে গেলাম। তখন প্রিয় নবী ইরশাদ করেন : তোমরা অনারবদের ন্যায় আমার সম্মান প্রদর্শনের জন্য কখনো দাঁড়াবে না। অনারব লোকেরা একজন অন্যজনের সম্মানে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। (আবু দাউদ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা-১২৯)
প্রিয় নবী এ নির্দেশটি দিয়েছিলেন তাঁর একান্ত বিনয়ী মনোভাবের কারণে। যেন হঠাৎ কেউ দেখলে তাঁর প্রতি অহংকার বা দাম্ভিকতার সন্দেহটুকুও করতে না পারে। নতুবা তিনি খুব ভালভাবেই জানতেন যে, সাহাবীগণ তাঁকে যে সম্মান প্রদর্শন করেন তাতে বিন্দু পরিমাণ খাদ নেই, সম্পূর্ণ অকৃত্রিম। মনের গভীর থেকেই তাঁরা তাঁকে সম্মান করে থাকেন এবং অকৃত্রিমভাবে তাঁকে ভালবাসেন। এ কারণে আলিমগণ লিখেছেন, কোন বিজ্ঞ আলিম কিংবা বুযুর্গ কিংবা ন্যায়পরায়ণ কোন শাসকের সম্মান প্রদর্শনার্থে এভাবে দাঁড়ানোর মধ্যে কোন আপত্তি নেই। তবে কেউ যদি নিজের প্রভুত্ব, আধিপত্য ও অহংকার দেখানোর জন্য এভাবে সম্মানার্থে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেয় তাহলে দাঁড়ানো মাকরূহ।
হযরত আবূ মিজলায (রা) থেকে বর্ণিত যে, হযরত মুআবিয়া (রা) একবার হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র ও ইবন আমির (রা)-এর কাছে গেলেন। হযরত মুআবিয়া (রা)-কে দেখে হযরত ইব্ন আমির (রা) তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে গেলেন। এদিকে হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র (রা) স্বস্থানে উপবিষ্ট থাকেন। তখন হযরত মুআবিয়া (রা) হযরত ইব্ন আমির (রা)-কে বললেন, স্বস্থানে বসে থাকুন। কেননা আমি প্রিয় নবী -কে বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তি অন্যরা তার সম্মানার্থে দাঁড়ানোকে পছন্দ করে সে ব্যক্তির ঠিকানা হবে জাহান্নাম। (আবু দাউদ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২১৯)
উপরোক্ত হাদীস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বর্ণিত নিষেধাজ্ঞা সে সময়ের জন্য, যখন আগমনকারীর দাম্ভিকতা ও অহংকার এ কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করে। তাই দেখা যায় একটি হাদীসে এসেছে যে, আনসারদের অন্যতম বড় আলিম ও সরদার হযরত সাদ ইবন উবাদা (রা) যখন আগমন করছিলেন তখন প্রিয় নবী আনসারদের আদেশ দিয়ে বলেন, তোমাদের সর্দার আগমন করছেন। তোমরা দাঁড়িয়ে যাও। অবশ্য এখানে নবী-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল হযরত সাদ ইবন উবাদা (রা)-এর সম্মানকে বড় করে দেখানো। কেননা তাকে তখন বনু কুরায়যার বন্দীদের ব্যাপারে সালিস নিযুক্ত করা হয়েছিল।
অনুরূপভাবে দূরদেশ থেকে আগত মুসাফিরের অভ্যর্থনা কিংবা অন্তরঙ্গ কোন বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় দাঁড়ানোর মধ্যে কোন আপত্তি নেই। শর্ত হলো উভয় পক্ষের কোন দিকে প্রাণহীন প্রদর্শনী কিংবা অহংকার থাকবে না। যেন আগমনকারী মনে মনে এই সম্মান কামনা না করেন আর অভ্যর্থনাকারী কেবল লৌকিকতার জন্যই না দাঁড়ান।
١٢٢. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يُجِيبُ الْعَبْدَ وَيَعُودُ الْمَرِيضَ وَيَرْكَبُ الْحِمَارَ
১২২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাধারণ একজন গোলামের দাওয়াত কবুল করতেন, অসুস্থদের শুশ্রূষা করতেন এবং গাধার পিঠেও আরোহণ করতেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস থেকেও প্রিয় নবী -এর পরম বিনয় ও নম্রতার পরিচয় ফুটে উঠে। এভাবে আরো অন্যান্য হাদীস থেকে জানা যায় যে, প্রিয়নবী তাঁর সাহাবীদের মজলিসে নিজের জন্য কোন পার্থক্য বজায় না রেখেই বসতেন। তাঁর বসার জন্য পৃথক কোন আসন থাকত না। আর তিনি বসার মধ্যেও নিজেকে ব্যতিক্রম বানিয়ে বসতেন না। তিনি সীমাহীন সরলতা ও অনাড়म्बरতাসহ মজলিসের যেখানেই সুযোগ পেতেন সেখানেই বসতেন। বসে যেতেন। এ কারণে নতুন আগন্তুক লোকদের জন্য জিজ্ঞেস করে নিতে হতো যে, আপনাদের মধ্যে নবী কোন্ জন? কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখন নবী -এর দরবারে দূর দেশের বিভিন্ন প্রতিনিধি দলের আগমন শুরু হলো এবং নবাগতদের নানা প্রশ্নোত্তরের কারণে মজলিসের কাজকর্ম ও আলোচনায় বিঘ্ন ঘটতে লাগল, তখন সাহাবীদের বহু পীড়াপীড়ির দরুন প্রিয় নবী -এর জন্য একটি পৃথক জায়গা বানানোর আবেদন তিনি মঞ্জুর করেন। ফলে মজলিসের মধ্যে নবী কোন্ জন তা নির্ণয় করতে নবাগতদের জন্য সহজ হয়। সাহাবীগণ প্রিয় নবী -এর বসার জায়গাটির মধ্যে মাটি ফেলে সামান্য উঁচু করে খাটের মত বানিয়ে দেন। তারপরেও প্রিয় নবী কখনো সেই উঁচু জায়গায় বসতেন আবার কখনো নিচে বসে উঁচু জায়গাটির উপর হেলান দিয়ে থাকতেন। এতখানি ছিল নবীদের সর্দার শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা -এর নম্রতা ও বিনয়।
একটি হাদীসে পাওয়া যায় যে, প্রিয় নবী -কে কখনো কখনো যবের রুটি কিংবা গন্ধ হয়ে গেছে এমন চর্বি আহারের জন্যও যদি দাওয়াত দেয়া হতো তখনও তিনি কোনরূপ অসন্তুষ্টি প্রকাশ না করে সে দাওয়াত কবুল করতেন। তিনি এমনটা চিন্তা করতেন না যে, এত নিম্নমানের আহারের আমন্ত্রণে আমি কেন যাব?
অনুরূপভাবে তিনি নিজের সাথী-সঙ্গীদের শুশ্রূষার জন্যও যেতেন। অসুস্থ লোকটি আমীর কিংবা গরীব, আযাদ কিংবা গোলাম, 'ছোট কিংবা বড় – সেই বিবেচনা তাঁর কাছে ছিল না। তিনি অসুস্থের খুব কাছে গিয়ে বসতেন এবং তাকে সান্ত্বনা দিতেন। তার সুস্থতার জন্য দু'আ করতেন। হাদীসগ্রন্থে এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা পাওয়া যায়। ইতিপূর্বেও আলোচিত হয়েছে যে, তিনি সামান্য মানের বাহন গাধার পিঠে আরোহণ করতেও সংকোচ বোধ করতেন না। বলা বাহুল্য, প্রিয় নবী সমকালের সম্রাট ও দু'জাহানের রাসূল ছিলেন। তাঁর নগণ্য একজন গোলাম ব্যক্তিও উচ্চমানের বাহনে আরোহণ করে থাকে। অথচ তিনি নিজে গাধার পিঠে নির্দ্বিধায় আরোহণ করেছেন। এ সব কিছু মূলত তিনি বিনয় ও নম্রতা প্রকাশের জন্যই করেছিলেন। যেন উম্মতের লোকেরা তাঁর এ আদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।
۱۲۳. عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَجْلِسُ عَلَى الأَرْضِ وَيَأْكُلُ عَلَى الأَرْضِ وَيَعْتَقِلُ الشَّاةَ، وَيُجِيبُ دَعْوَةَ الْمَمْلُوكِ، قَالَ أَبُو إِسْمَاعِيلَ فَحَدَّثْتُ بِهِ الْأَعْمَشِ عَنْ مُسْلِمٍ فَقَالَ أَمَا إِنَّهُ كَانَ يَطْلُبَ الْعِلْمَ -
১২৩. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ নিঃসংকোচে মাটির উপর বসতেন, মাটিতে বসে আহার করতেন, নিজ হাতে খুঁটির সাথে বক্রী বাঁধতেন ও গোলামের দাওয়াত কবুল করতেন। বর্ণনাকারী আবু ইসমাঈল (র) বলেন, আমি এ হাদীসখানা মুসলিম (র)-এর বরাত দিয়ে হযরত আমাশ (র)-কে শোনালাম। তখন আমাশ (র) বললেন, তবে মনে রেখ, প্রিয় নবী -এর উদ্দেশ্য ছিল নিজ সাহাবীদের অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়া।
ফায়দা : আলোচ্য হাদীসের মধ্যে প্রিয় নবী -এর যে সব সুন্দর নীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে এগুলি তাঁর একান্ত বিনয় ও নম্রতার প্রমাণ বহন করে। কেননা এসব কাজ তিনি প্রয়োজনীয় উপকরণ কিংবা কাজের লোকজনের অভাবজনিত কারণে করেননি। তাঁর কাছে উপকরণ বা লোকজনের অভাব ছিল না। তবে তিনি নিজের নম্রতা ও বিনয় নীতি প্রকাশার্থে এসব কাজ নিজ হাতে ও নিঃসংকোচে করতেন।
বুখারী শরীফে হযরত আসওয়াদ ইব্ন ইয়াযীদ (র) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ নিজ গৃহে কি কি কাজ করে থাকতেন? তখন হযরত আয়েশা (রা) বলেন, তিনি ঘরের অন্যদের কাজকর্ম্মে স্বহস্তে সহযোগিতা করতেন। কিন্তু যখন নামাযের সময় হতো তখন কোন প্রকার বিলম্ব না করে মসজিদে চলে যেতেন। (বুখারী শরীফ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা : ৮৯২)
আলোচ্য হাদীস থেকে এ কথা সুস্পষ্ট যে, প্রিয় নবী অন্যান্য সাধারণ মানুষের ন্যায় পারিবারিক বিভিন্ন কাজে শরীক থাকতেন। উদাহরণস্বরূপ যেমন নিজে বকরীর দুধ দোহন করতেন, নিজের জুতা নিজেই সেলাই করতেন ইত্যাদি। এ বিষয়ে ইতিপূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
١٢٤ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكِ أَنَّهُ مَرَّ بِصِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ ثُمَّ حَدَّثَنَا أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ مَرَّ عَلَى صِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ وَهُوَ مُغِدٍ-
১২৪. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, একদা তিনি বালকদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি তাদেরকে সালাম দেন। তারপর আমাদেরকে হাদীস শুনিয়ে বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ বালকদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি দ্রুত পথচলা অবস্থায় তাদেরকে সালাম দেন।
١٢٥ عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ مَرَّ بِصِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ -
১২৫. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, একদা রাসূলুল্লাহ বাচ্চাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন সে মুহূর্তে তিনি তাদেরকে সালাম দেন।
١٢٦. عَنْ أَنَسٍ قَالَ بَعَثَنِي رَسُولُ اللهِ ﷺ فِي حَاجَةٍ فَمَرَرْتُ بِصِبْيَانِ فَقُمْتُ مَعَهُمْ فَأَبْطَاتُ عَلَيْهِ فَخَرَجَ وَرَانِي مَعَ الصِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ -
১২৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাকে একটি কাজের জন্য পাঠিয়েছিলেন। পথিমধ্যে বাচ্চাদের সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। আমি তাদের সেখানে দাঁড়ালাম। তাতে অনেক দেরি হয়ে গেল। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ্ আমার তালাশে বের হয়ে আমাকে বাচ্চাদের সঙ্গে দেখলেন। তখন তিনি তাদেরকে সালাম দিয়েছিলেন।
۱۲۷. عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ مَرَّ عَلَى صِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِم -
১২৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী বাচ্চাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় তিনি তাদেরকে সালাম দেন।
۱۲۸ عَنْ أَنَسٍ قَالَ أَتَى عَلَيْنَا رَسُولُ اللهِ ﷺ وَأَنَا فِي غِلْمَةٍ نَلْعَبُ فَسَلَّمَ عَلَيْنَا ثُمَّ أَرْسَلَنِي فِي حَاجَةٍ -
১২৮. আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি তখন বাচ্চাদের সঙ্গে মিলে খেলাধুলা করছিলাম। তিনি আমাদেরকে সালাম দেন। তারপর আমাকে একটি কাজের জন্য পাঠিয়ে দেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসগুলোর বক্তব্য অভিন্ন। এখানে প্রিয় নবী-এর পরম বিনয় ও নম্র আচরণের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এ সব হাদীস থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, প্রিয় নবী বাচ্চাদের শিক্ষা দানের জন্য নিজেই সালাম দিতেন। আর এভাবে তাদেরকে সালাম দেওয়া তাঁর দৃষ্টিতে কোন লজ্জা বা সম্মানহানিকর বলে মনে হতো না। বলা বাহুল্য, বাচ্চাদেরকে সালাম দেওয়ার মধ্যে বহু উপকারিতা বিদ্যমান। ১. বাচ্চাদেরকে সালাম দেওয়ার দ্বারা তাদের মধ্যে একজন অন্যজনকে সালাম দানের অভ্যাস গড়ে ওঠে। ২. তাতে সমাজে ইসলামী তাহযীব ও তামাদ্দুনের ভিত কায়েম হয়, ৩. নিজে বাচ্চাদেরকে সালাম করার দ্বারা মন থেকে গর্ব ও অহংকার ইত্যাদি দূরীভূত হয়, ৪. 'আস্সালামু আলাইকুম' বাক্যটি একটি দু'আ বিশেষ। এ দু'আটির ব্যাপক প্রচলনের কারণে শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ গড়ে ওঠে, ৫. এই সালাম ইসলামের বিশেষ একটি প্রতীক। কাজেই সর্বশ্রেণীর মাঝে সালামের ব্যাপক প্রচলন থাকলে সেটি একটি মুসলিম সমাজ বলে বোঝা যায়।
একখানা হাদীসে হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আম্র ইব্ন আস (রা) বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি প্রিয় নবীকে জিজ্ঞেস করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! ইসলামী আমলগুলোর মধ্যে কোন্ আমলটি সর্বাপেক্ষা উত্তম? প্রিয় নবী উত্তর দিলেন যে, লোকজনকে আহার করানো এবং পরিচিত ও অপরিচিত সকলকে সালাম প্রদান করা। (তারগীব ওয়া তারহীব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৩)
অপর একখানা হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন: (হে মানুষ সকল!) তোমরা যতক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণভাবে ঈমান আনয়ন করবে না ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে না। আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানদার হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি গড়ে না নিবে। আচ্ছা! আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি কাজের পরামর্শ দিব যে কাজটি করার কারণে তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও ভালবাসা গড়ে উঠবে? মনে রেখ! সে কাজটি হলো সালামের বহুল প্রচলন। তোমরা যখনই একজন অন্যজনের সাথে সাক্ষাৎ করবে তখনই তাকে সালাম করবে। আর সালাম দেওয়াকে নিজেদের বৈশিষ্ট্য বানিয়ে নাও। (তারগীব ওয়া তারহীব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৩)
একটি হাদীসে হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) রাসূলুল্লাহ্ থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি ইরশাদ করেছেন: তোমরা সালামের ব্যাপক প্রচলন করে নাও। তা হলে নিজেরা শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে থাকতে পারবে। (ঐ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৪)
হযরত সাহল ইবন হুনাইফ (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি শুধু “اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ" বলে তার আমলনামায় দশটি নেকী লেখা হয়। আর যে ব্যক্তি "اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ" বলে তার আমল নামায় বিশটি নেকী লেখা হয়। আর যে ব্যক্তি السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ বলে তার আমলনামায় ত্রিশটি নেকী লেখা হয়। (তারগীব ওয়া তারহীব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৮)
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন যে, সবচেয়ে অথর্ব হলো সে ব্যক্তি যে দু'আ করতেও অক্ষম (অর্থাৎ আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করতেও জানে না।) আর সবচেয়ে বড় কৃপণ সে ব্যক্তি যে সালাম করার ব্যাপারে কার্পণ্য করে। (তারগীব ওয়া তারহীব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৯)
হযরত আবু উমামা (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি আগে সালাম দেয় সে মহান আল্লাহর অধিক ঘনিষ্ঠ। অর্থাৎ সাক্ষাতের সময় আগে সালাম দেয়ার কারণে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাকের সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করে। (মিল্কাত শরীফ, পৃষ্ঠা ৩৯৮)
এভাবে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন מסעוד (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন যে, অগ্রে সালাম দানকারী ব্যক্তি গর্ব ও অহংকার থেকে মুক্ত থাকে। (মিল্কাত, পৃষ্ঠা ৪০০)
একখানা হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন যে, প্রিয় নবী ইরশাদ করেছেনঃ এক মুসলমানের উপর অন্য মুসলমানের ছয়টি হক (অধিকার) রয়েছে:
এক. সে অসুস্থ হলে তার সেবা-শুশ্রূষা করা, দুই. সে মারা গেলে তার কাফন ও জানাযায় শরীক হওয়া, তিন. একজন অন্যজনকে দাওয়াত করলে তা কবুল করা, চার. একজন অন্যজনের সহিত সাক্ষাতের সময় সালাম করা, পাঁচ. একজন হাঁচি দিয়ে "আলহামদু লিল্লাহ্' বলার পর অন্যজন তার জবাব দেওয়া। অর্থাৎ 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বলা।
ছয়. একজন অন্যজনের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি সর্বাবস্থায় কল্যাণ কামনা করা। (মিশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা ২৬৭)
অপর একখানা হাদীসে হযরত কাতাদা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন : তোমরা নিজ গৃহে প্রবেশের সময় ঘরের লোকজনকে সালাম দিয়ে প্রবেশ কর। আবার ঘর থেকে বের হওয়ার সময় তাদেরকে সালাম দিয়ে বের হও। (যুজাজাতুল মাসাবীহ্, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৮)
ফাতওয়ায়ে আলমগীরী গ্রন্থে আছে, “প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নিজ গৃহে প্রবেশের সময় 'আস্সালামু আলাইকুম' বলে প্রবেশ করা চাই। আর যদি কোন জনশূন্য ঘরে প্রবেশ করে তখন নিম্নোক্ত বাক্যের দ্বারা সালাম করবে। বাক্যটি হলো- السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللهِ الصالحين
۱۲۹. عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ يَزِيدَ أَنَّ النَّبِيُّ ﷺ مَرَّ بِنِسْوَةٍ فَسَلَّمَ عَلَيْهِنَّ -
১২৯. হযরত আসমা বিন্ত ইয়াযীদ (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী মহিলাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি তাদেরকে সালাম দেন।
ফায়দা : আলিমগণ লিখেছেন যে, মহিলাদেরকে সালাম দেওয়ার বিষয়টি প্রিয় নবী -এর ব্যক্তিগত আমল ছিল। কারণ তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিষ্পাপ ও আল্লাহ্ কর্তৃক সংরক্ষিত। তিনি ফিত্নায় পতিত হওয়া থেকে ছিলেন সম্পূর্ণ নিরাপদ। কাজেই প্রিয় নবী ব্যতীত অন্য লোকদের জন্য বিধান হলো গায়রে মুহাররাম মহিলাকে সালাম না দেওয়া উত্তম। অবশ্য কোন মহিলা যদি এমন হয় যে, বয়স বার্ধক্যের সীমানায় পৌঁছে গেছে তাকে সালাম দিতে কোন আপত্তি নেই। আল্লামা ইব্ন আবেদীন (র) শামী গ্রন্থে লিখেছেন যে, "গায়রে মুহাররাম ব্যক্তির জন্য কোন বেগানা মহিলাকে সালাম দেওয়া অনুচিত। তবে ঐ বেগানা মহিলা যদি বৃদ্ধা হন তাহলে তাকে সালাম দেয়া যায়। অনুরূপ যদি কোন বৃদ্ধা হাঁচি দিয়ে 'আল হামদুলিল্লাহ্' বলে তাহলে বৃদ্ধা হওয়ার কারণে তার হাঁচির জবাব দেয়া যায়। পক্ষান্তরে কোন মহিলা যদি বৃদ্ধা না হয় তা হলে তাকে সালাম কিংবা তার হাঁচির জবাব দেয়া যাবে না। (কেননা এখানে ফিত্নায় পতিত হওয়ার আশংকা আছে) তবে মনে মনে হাঁচির জবাব দিতে হবে।"
একখানা হাদীসে হযরত জারীর ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ একদল মহিলার পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় তিনি তাদেরকে সালাম দেন। (মিশকাত, পৃষ্ঠা ৩৯৯)
আল্লামা হালীমী (র) বলেন যে, যেহেতু প্রিয় নবী কোন প্রকার ফিত্নায় পতিত হওয়া থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিলেন, এ কারণে তাঁর জন্য বেগানা মহিলাকে সালাম দেওয়া জায়িয ছিল। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে নিরাপদ থাকার উপর সম্পূর্ণ নিশ্চিত থাকবেন তার জন্যও বেগানা মহিলাকে সালাম দেওয়ার অনুমতি দেওয়া যায়, অন্যথায় তার নীরব থাকাই শ্রেয়। (আউনুল মা'বুদ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫१९)
গ্রন্থকারের এখানে উপরোক্ত হাদীসগুলো উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো সালামের ব্যাপারে প্রিয় নবী -এর আমলী-নীতি তুলে ধরা। অর্থাৎ প্রিয় নবী শিশু কিংবা বৃদ্ধা, পুরুষ কিংবা মহিলা নির্বিশেষে সকলকেই সর্বাগ্রে সালাম দিতেন।
۱۳۰. عَنْ أَنَسٍ قَالَ مَا رَأَيْتُ أَحَدًا كَانَ أَرْحَمَ بِالْعِيَالِ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ وَكَانَ اسْتَرْضَعَ لِابْنِهِ إِبْرَاهِيمَ فِي أَقْصَى الْمَدِينَةِ وَكَانَ زَوْجَهَا قَيْنًا فَيَأْتَيْهِ وَعَلَيْهِ أَثْرُ الْغُبَارِ فَيَلْتَذِمُهُ وَيُقَبِّلُهُ وَيَشُمُّهُ .
১৩০. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ -এর চাইতে সন্তানদের প্রতি অধিক স্নেহপ্রবণ আর কাউকে দেখিনি। তিনি তাঁর দুগ্ধপোষ্য শিশু হযরত ইব্রাহীম (রা)-কে দুধপান করানোর জন্য মদীনার উপকণ্ঠে বসবাসকারিণী জনৈকা ধাত্রীর কাছে দিয়েছিলেন। ধাত্রীর স্বামী ছিলেন একজন কর্মকার। যখন প্রিয় নবী নিজ সন্তানকে দেখার জন্য সেখানে যেতেন তাঁর শরীর ধুলায়িত হয়ে যেত। এ সত্ত্বেও তিনি তাঁকে বুকে জড়িয়ে নিতেন। তাঁকে চুম্বন করতেন এবং নাকের কাছে তুলে সোহাগ করতেন।
۱۳۱. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ أَرْحَمَ النَّاسِ بِالصِبْيَانِ وَكَانَ لَهُ ابْنُ مُسْتَرْضَعُ فِي نَاحِيَةِ الْمَدْنَةِ وَكَانَ ظَبْرهُ قَيْنًا ، وَكَانَ يَأْتِيهِ وَنَحْنُ مَعَهُ وَقَدْ دُحِنَ الْبَيْتُ بِالإِذْخِرِ فَيَشُمُّهُ وَيُقَبِّلُهُ -
১৩১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ শিশুদের প্রতি সর্বাধিক স্নেহপ্রবণ ছিলেন। তাঁর এক দুগ্ধপোষ্য শিশুর জন্য তিনি মদীনার উপকণ্ঠের জনৈকা ধাত্রী ঠিক করেছিলেন। ধাত্রীর স্বামী ছিলেন একজন কর্মকার। প্রিয় নবী নিজ পুত্রকে দেখার জন্য সেখানে যেতেন। তাঁর সঙ্গে আমরাও থাকতাম। ধাত্রীর ঘর ইস্থির ঘাস জ্বালানো ধোঁয়ায় ভরে থাকত। এ সত্ত্বেও তিনি নিজ সন্তানকে কোলে তুলে নিতেন। তাঁকে নাকের কাছে তুলে সোহাগ করতেন এবং চুম্বন করতেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস দুটির বক্তব্য অভিন্ন। গ্রন্থকার আলোচ্য হাদীসদ্বয়কে প্রিয় নবী -এর বিনয় ও নম্রতা অনুচ্ছেদে পেশ করার কারণ হলো, এ দু'টি হাদীসে তাঁর পবিত্র জীবন যাত্রার সরলতা ও অকৃত্রিমতা সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। পাশাপাশি এ কথাও প্রমাণিত হচ্ছে যে, তিনি পরিবারের লোকজন ও সন্তান-সন্ততি বিশেষত শিশুদেরকে গভীরভাবে স্নেহ করতেন। তাঁর পরম নিরহংকারের প্রমাণ এই যে, তিনি নিজের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে দুধ পান করানোর জন্য একজন কর্মকারের মত সাধারণ ব্যক্তির ঘরে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন নি। তাছাড়া সেই কর্মকারের গৃহে বারবার যাতায়াত করা এবং পথিমধ্যে ধুলার কারণে আপাদমস্তক ভরে যাওয়াকে নিজের আত্মমর্যাদা হানিকর বলে মনে করেননি। কর্মকারদের গৃহে স্বাভাবিকভাবেই ধোঁয়া থাকে। প্রিয় নবী এ সত্ত্বেও নিঃসংকোচে তাদের গৃহে প্রবেশ করতেন। তারপর একজন সাধারণ পিতাও যখন ধুলামাখা দেহে সন্তানকে কোলে নিতে দেরি করে সেখানে তিনি এ সব উপেক্ষা করে নিজ সন্তানকে কোলে নিয়ে স্নেহ প্রবণতার পরম উদাহরণ পেশ করলেন। অথচ অহংকারী ও আত্মপূজারী লোকেরা শিশুদের সাথে এভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়া এবং তাদেরকে স্নেহ ও মমতায় জড়িয়ে নেয়াকে নিজেদের মানমর্যাদা হানিকর বলে বোধ করে থাকে।
প্রিয় নবী নিজে যেভাবে শিশুদেরকে আদর-সোহাগ করতেন সেভাবে অন্যদেরকেও তাদের আদর-সোহাগের জন্য উপদেশ দিতেন। হাদীস গ্রন্থগুলোতে এ ধরনের বহু বর্ণনা পাওয়া যায়, যেখানে শিশুদের প্রতি তাঁর সীমাহীন স্নেহ ও মমতার পরিচয় ফুটে উঠেছে। একখানা হাদীসে বলা হয়েছে যে, একদা প্রিয় নবী তাঁর দৌহিত্র হযরত হাসান (রা)-কে গভীরভাবে স্নেহ করছিলেন। এটি দেখে হযরত আকরা ইন্ন হাবিস (রা) নামক এক সাহাবী বলে উঠলেন, আমার তো দশটি সন্তান আছে। অথচ আমি তো কাউকে আদর-সোহাগ করি না। প্রিয় নবী তখন বললেন: যারা মানুষের প্রতি সোহাগ ও মায়া-মমতা করে না তাদের প্রতি আল্লাহ্ পাকও সোহাগ ও মায়া-মমতা করবেন না। (হায়াতুস্ সাহাবা, ২ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৬৯)
হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে অপর একটি সূত্রে বর্ণিত আছে যে, একবার হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-এর কাছে এক মহিলা আসল। মহিলার সঙ্গে দু'টি শিশু ছিল। হযরত আয়েশা (রা) ঐ মহিলাকে তিনটি খেজুর খেতে দিলেন। মহিলাটি তার দু'টি বাচ্চাকে দু'টি খেজুর দিয়ে একটি নিজে খেতে চাইল। এ সময় শিশুরা পুনরায় তার দিকে চোখ তুলে তাকাল। মহিলা খেজুরটিকে দু'টুক্রা করে অর্ধেক করে উভয় বাচ্চাকে দিয়ে দিল। তারপর সে চলে গেল। অতঃপর প্রিয় নবী গৃহে ফিরে আসলে হযরত আয়েশা (রা) এ ঘটনা তাঁকে শোনালেন। তখন প্রিয় নবী ইরশাদ করেন : মহিলাটি (তার সোহাগ ও মমত্ববোধের কারণে) বেহেস্তে প্রবেশ করবে। অর্থাৎ বেহেস্তের উপযুক্ত বিবেচিত হবে। (হায়াতুস্, সাহাবা, ২ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৭০)
۱۳۲. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكَ يَقُولُ مَا رُفِعَ مِنْ بَيْنَ يَدَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَضْلُ شَوَاءٍ قَطُّ وَلَا حُمِلَتْ مَعَهُ طِنْفِسَةٌ .
১৩২. হযরত আনাস ইব্ন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ থেকে কখনো উচ্ছিষ্ট ভুনা মাংস তুলে নেয়া হয়নি এবং তার জন্য কখনো কার্পেট বিছান হয়নি।
ফায়দা: রাসূলুল্লাহ্ একজন বিনয়ী সাধারণ মানুষের মতই মাটিতে বসে আহার করতেন। আহার শেষে তিনি বরতন খুব ভাল করে পরিষ্কার করতেন এবং অহংকারী লোকদের মতো খাবার বরতনে উচ্ছিষ্ট রেখে দিতেন না। খাবার বরতনে যেসব গর্বিত ও অহংকারী লোক কিছু না কিছু উচ্ছিষ্ট রেখে দেয়, তার দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য থাকে স্বীয় ধনাঢ্যতা ও প্রাচুর্য প্রকাশ করা। অর্থাৎ তারা যেনো তাদের ঐ উচ্ছিষ্ট খাবারের প্রতি তার পরিমাপ যা-ই হোক না কোন আদৌ মুখাপেক্ষী নয়। তাদের দৃষ্টিতে আহার্যের কোন কদর ও মর্যাদা নেই। (নাউযুবিল্লাহ্) নবী আকরাম হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা-এর শিক্ষা ও তাঁর জীবন পদ্ধতি এই অর্থহীন অবজ্ঞা লোক-দেখানো প্রাচুর্য থেকে (যা মূলত নিয়ামতের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন) সম্পূর্ণ ভিন্নতর ছিল। তা ছিল বিনয়, বশ্যতা ও আনুগত্যের উপর ভিত্তিশীল। তাঁর শিক্ষা ও পবিত্র জীবন চরিত্র অধ্যয়ন করলে এ সত্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাদেরকে (আহারের পর) আঙুল, বরতন (রেকাবী, প্লেট প্রভৃতি) ভালভাবে পরিষ্কার করে খেতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন, তোমরা কি জানো খাবারের কোন্ লোকমা ও কোন্ অংশের মধ্যে বরকত নিহিত রয়েছে? (মিল্কাত, পৃষ্ঠা ৩৬৩) খাবার খেয়ে রেকাবীতে উচ্ছিষ্ট রেখে দেয়া তা নষ্ট করার নামান্তর ও নিয়ামতের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন স্বরূপ। তাই বরতন ও আঙুলে লেগে থাকা খাবার উত্তমরূপে চেটে খাওয়া উচিত। অবশ্য খাবার যদি বেশি বেঁচে যায় এবং তা নষ্ট করা উদ্দেশ্য না হয়, তবে তা অবশিষ্ট রেখে দিতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু তা এইভাবে অবশিষ্ট রেখে দিবে যা নিজের কিংবা অন্য কারো খেতে ঘৃণা না হয়। এক্ষেত্রে উত্তম পন্থা হচ্ছে, প্রথমেই আহার্য প্রয়োজন মাফিক বরতনে তুলে নিতে হবে। অনুরূপভাবে চামচ বা আঙুলে যে আহার্য লেগে থাকে তাও অবশ্যই চেটে খাওয়া উচিত, যাতে আল্লাহ্ প্রদত্ত এই নিয়ামত নষ্ট না হয়।
অনুরূপ যদি আহার্যের কোনো লোকমা মাটিতে পড়ে যায়, তবে তাও তুলে নিতে হবে। অবশ্য যদি নোংরা ও নাপাক স্থানে না পড়ে। সে ক্ষেত্রে মাটি মিশ্রিত অংশ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট পরিষ্কার অংশ খেতে হবে। এটাই হচ্ছে মহান আল্লাহর দেয়া নিয়ামতের প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন, বিনয় ও আনুগত্যের নিয়ম। এক হাদীসে হযরত জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেন: শয়তান প্রতিটি কাজের সময় তোমাদের কাছে উপস্থিত থাকে এমনকি আহার করার সময়ও। তাই যখন আহার করার সময় লোকমা মাটিতে পড়ে যাবে, তখন তা তুলে নিবে এবং ধুলাবালি পরিষ্কার করে লোকমাটি খাবে। শয়তানের জন্য রেখে দিবে না। অনুরূপভাবে যখন তোমরা আহার শেষ করবে, তখন স্বীয় আঙুলসমূহ পরিষ্কার করবে এবং যে আহার্য তাতে লেগে থাকবে তা চেটে খাবে। কেননা আহার্যের কোন্ অংশে বরকত নিহিত আছে তা তোমাদের জানা নেই। (মিশকাত, পৃষ্ঠা ৩৬৩)
হযরত আনাস ইবন মালিক (রা)-এর উপরোক্ত হাদীস থেকে একথাও জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ মাটিতে বসে খেতেন এবং নিজের জন্য কোনো বিশেষ স্থান বা বিছানা পত্রের ব্যবস্থা করতেন না। যেমনিভাবে অহংকারী ও আত্মপূজারী লোকেরা স্বীয় শানশওকত প্রকাশের জন্য খাবার মজলিসে কার্পেট গালিচা কিংবা টেবিল চেয়ারের বন্দোবস্ত করে থাকে। বরং সরদারে দু'জাহান শাহানশাহে আরব ও আজম সাধারণ মানুষের মত কোনো বিছানা ছাড়াই মাটিতে বসে খানা খেতেন। এতে তার আল্লাহর বান্দাসুলভ বিনয় ও চরম গর্বহীনতাই প্রকাশ পায়। অনুরূপভাবে তিনি আসন করে বসে কিংবা ঠেস দিয়ে কখনো আহার করতেন না। এটাও আত্মগর্বীদের অভ্যাস। এ সম্পর্কে হযরত আবূ জুহায়ফা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, নবী ইরশাদ করেন: আমি আসন করে বসে (কিংবা ঠেস লাগিয়ে) কখনো আহার করি না। (মিশকাত, পৃষ্ঠা-৩৬৩)
হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন্ন আম্র (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্-কে কখনো আসন করে আহার করতে দেখা যায়নি। আর তিনি কখনো তাঁর সঙ্গীদের আগে আগে চলতেন না। (বরং বিনয়বশত তাদের মাঝখানে চলতেন) (মিশকাত, পৃষ্ঠা ২৬৬)
এক হাদীসে নবী বলেন, তোমরা আহার করার সময় জুতা খুলে নাও। কেননা এটা (জুতা খুলে নেয়া) একটি ভাল অভ্যাস। (জামি সগীর, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৮)
যেসব মুসলমান আজকাল ইউরোপের অন্ধ অনুসরণে জুতা পরিধান করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আহার করাকেই ভদ্রতা মনে করে, তাদের চিন্তা করা উচিত যে, হাশরের দিন তারা আল্লাহ্ হাবীব ও উম্মতের সুপারিশকারী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা-এর সামনে কিভাবে উপস্থিত হবে।
এই সব হাদীস থেকে নবী আহার করার সময় কি পরিমাণ বিনয় নম্রতা অবলম্বন করতেন, তা সহজেই অনুমান করা যায়। আল্লাহ্ তা'আলা সকল মুসলমানকে তাঁর সুন্দরতম চরিত্র ও অনুপম আদর্শ অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন!
۱۳۳. عَنْ أَبِي مَسْعُودٍ قَالَ أَتَى النَّبِيَّ رَجُلٌ يُكَلِّمُهُ فَأُرْعِدَ فَقَالَ عَلَيْكَ فَلَسْتُ بِمَلِكَ، إِنَّمَا أَنَا ابْنُ امْرَأَةٍ مِنْ قُرَيْشٍ كَانَتْ تَأْكُلُ الْقَدِيدَ
১৩৩. হযরত আবূ מסעוד (রা) বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি নবী-এর নিকট কিছু কথা বলার জন্য এলো। কিন্তু সে তাঁর ভয়ে কাঁপতে লাগল। তিনি বললেন : ভয় করো না। আমি তো তোমার বাদশাহ নই (যে, আমাকে দেখে তুমি ভয় করবে)। বরং আমি হচ্ছি কুরায়শ বংশের এমন এক মহিলার সন্তান যিনি (সাধারণ মেয়েদের মত) শুকানো গোশত ভক্ষণ করতেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকেও নবী-এর বিনয়, নম্রতা ও আত্মগর্বহীনতা প্রকাশ পায়। এটা স্পষ্ট যে, তিনি একদিকে ছিলেন সমস্ত নবী ও রাসূলদের সরদার এবং অপরদিকে ছিলেন সমগ্র আরব-আজমের নেতা ও দু'জাহানের পথপ্রদর্শক। প্রতিটি ব্যক্তিকেই তাঁর মাহাত্ম্য, মহিমা ও প্রভাবে প্রভাবান্বিত হওয়া ছিল অবশ্যম্ভাবী। যখনই কোনো আগন্তুক তাঁর সামনে আসতো, তার ভয় ও প্রভাবের দরুন তার মধ্যে কম্পন শুরু হয়ে যেত। কিন্তু তাঁর স্বভাবগত বিনয় ও সরলতার অবস্থা ছিল এরূপ যে, তিনি তার সাথে অত্যন্ত নম্রতা ও বিনয় অবলম্বন করতেন। কেউ যদি ভয় পেতো, তবে তিনি তাকে সান্ত্বনা দিতেন এবং কথায় ও কাজে প্রকাশ করতেন। তার প্রতি দয়া ও সহানুভূতি প্রদর্শন করতেন।
134 عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ وَأَبِي ذَرٍ قَالَا كَانَ النَّبِيُّ يَجْلِسُ بَيْنَ ظَهَرَانِي أَصْحَابِهِ، فَيَجِيْبُ الْغَرِيبُ وَلَايَدْرِي أَيُّهُمْ هُوَ حَتَّى يَسْأَلَ، فَطَلَبْنَا إِلَى النَّبِيِّ الاَنْ نَجْعَلَ لَهُ مَجْلِسًا يَعْرِفُهُ الْغَرِيبُ إِذَا أَتَاهُ، فَبَنَيْنَا لَهُ دَكَأَنَا مِنْ طِينٍ فَكَانَ يَجْلِسُ عَلَيْهِ وَتَجْلِسُ بِجَانِبَيْهِ -
১৩৪. হযরত আবূ হুরায়রা ও হযরত আবূ যার (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী তাঁর সাহাবীদের মাঝখানে সাধারণ মানুষের মতো উপবেশন করতেন। কোনো আগন্তুক আগমন করলে বুঝতে পারতো না যে, তাদের মধ্যে তিনি (রাসূলুল্লাহ্) কোন্ জন যে পর্যন্ত সে জিজ্ঞেস না করতো। তাই আমরা (সাহাবীগণ) নবী-এর জন্য এমন একটি আসন তৈরির অনুমতি প্রার্থনা করলাম, যার উপর উপবেশন করলে তাঁকে আগন্তুকরা সহজেই চিনতে পারে। (বর্ণনাকারী বর্ণনা করেন) অতঃপর আমরা (তাঁর অনুমতি নিয়ে) তাঁর জন্য একটি মাটির চত্বর তৈরি করলাম। তিনি তার উপর আসন গ্রহণ করতেন এবং আমরা তাঁর উভয় দিকে (আশপাশে) বসতাম।
ফায়দা : এ হাদীস থেকেও রাসূলুল্লাহ্-এর স্বভাবগত সরলতা ও প্রকৃতিগত বিনয়-প্রিয়তার পরাকাষ্ঠা প্রকাশিত হয়। তিনি সাহাবাদের মাঝে নিরহংকারভাবে উপবেশন করতেন। যেরূপ সাধারণ বন্ধু-বান্ধবরা একসাথে মিশে বসে থাকে। আমীর-উমারা ও রাজা-বাদশাহদের মত তাঁর বসার জন্য কোনো কুরসী ছিল না; কোনো সিংহাসন, কার্পেট-গালিচা ও শাহী দরবারও ছিল না। সেখানে কোনো শাহী আড়ম্বর, দাসদাসীর করজোড় সারি, স্তাবক ও গুণগায়কদের তোশামোদ-খোশামোদও ছিল না—যাতে তাঁর স্বতন্ত্র মর্যাদা প্রকাশ পেতে পারে। কেননা এসব বিষয় ছিল তাঁর প্রকৃতিগত বিনয়ের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তিনি এসব আদৌ পছন্দ করতেন না। কিন্তু যখন বাইরের নতুন নতুন প্রতিনিধি দলের আগমন বেড়ে গেলো এবং দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তাঁর সাক্ষাৎ ও বায়আত গ্রহণের জন্য আসতে লাগলো, তখন সাহাবাগণ এ অনিবার্য প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে তাঁর বসার জন্য একটি স্বতন্ত্র আসন তৈরির আবেদন করলেন এবং তিনিও অপরিহার্যতা লক্ষ করে মাটির একটি আসন তৈরির অনুমতি দেন।
١٣٥ عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ كُلِّ جَعَلَنِي اللَّهُ فِدَاكَ مُتَّكِنًا فَإِنَّهُ أَهْوَنَ عَلَيْكَ، قَالَتْ فَأَصْغَى بِرَأْسِهِ حَتَّى كَادَ أَنْ تُصِيبَ جَبْهَتُهُ الْأَرْضَ ثُمَّ قَالَ لَا بَلْ أَكُلُ كَمَا يَأْكُلُ الْعَبْدُ وَاجْلِسُ كَمَا يَجْلِسُ الْعَبْدُ .
১৩৫. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! (আল্লাহ্ আমাকে আপনার জন্য কুরবান করে দিন) আপনি ঠেস দিয়ে বসে আহার করুন। তাতে আপনি আরাম অনুভব করবেন। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, একথা শুনে তিনি তাঁর শির মুবারক এতই নিচু করলেন যে, তাঁর কপাল মাটি স্পর্শ করার উপক্রম হলো। তারপর তিনি বললেন: না, বরং আমি একজন সাধারণ গোলামের মতো আহার করবো এবং একজন সাধারণ লোকের মতো বসবো।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, দু'জাহানের সরদার, রাব্বুল আলামীনের প্রিয়তম বন্ধু হযরত মুহাম্মদ কোনো অবস্থাতেই সরলতা ও বিনয় ত্যাগ করা পছন্দ করেন নি। খাবার জন্য বসার ক্ষেত্রে তো তিনি বিশেষভাবেই বিনয় অবলম্বন করতেন। তিনি কখনো আসন করে বসে কিংবা হেলান দিয়ে আহার করেন নি। হযরত আয়েশা (রা) যখন ভালবাসা ও সহানুভূতিবশত নবী-কে একটু আরামের সাথে বসে খাবার খেতে অনুরোধ করলেন, বরং তখন তিনি তাঁর অনুরোধ ও অবস্থানের উল্টো দাসত্ব প্রকাশের জন্য আরো যমীনের উপর ঝুঁকে গেলেন এবং মুখেও বিনয় প্রকাশ করলেন।
আলিমগণ বলেন, ঠেস কিংবা হেলান দিয়ে খানা খাওয়ার চারটি অবস্থা হতে পারে। চারটি অবস্থাই এই হাদীসের আওতায় এসে যাচ্ছে। (১) ডান বা বামে কোনো তাকিয়া বা পাঁচিল প্রভৃতির উপর ভর করা। (২) হাতের তালু মাটির উপর রেখে তার উপর ভর করা। (৩) কোনো পাঁচিল বা তাকিয়ার সাথে কোমর লাগিয়ে সাহায্য নেয়া। (৪) গদি কিংবা কার্পেট প্রভৃতির উপর আসন করে বসে আহার করা। এই চারটি অবস্থাই সুন্নতের খেলাফ।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি বোঝা সম্পর্কিত হাদীসসমূহ
১৩৬. عَنْ أَنَسٍ قَالَ لَمْ يَكُنْ يَأْكُلُ رَسُولُ اللهِ ﷺ عَلَى خِوَانٍ وَلَا فِي سُكُرْجَةٍ حَتَّى لَحِقَ بِاللَّهِ عَزَّ وَ جَلَّ -
১৩৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ কখনো টেবিলে বসে আহার করেন নি। এবং ছোট প্লেটেও নয়। এই অবস্থায়ই তিনি মহিমান্বিত মহান আল্লাহ্র সাথে মিলিত হয়েছেন (ইন্তিকাল করেছেন)।
ফায়দা : এ হাদীস রাসূলুল্লাহ্-এর প্রকৃতিগত বিনয় ও সরলতা সম্বলিত খানা খাওয়ার সুন্নত তরীকা ও আদব প্রকাশ করছে। টেবিল ও ভূমি থেকে উঁচু দস্তরখানে পৃথক পৃথক প্লেটে খানা খাওয়া অহংকারী ও দাম্ভিক লোকদের নিদর্শন। এর উদ্দেশ্য সাধারণত স্বীয় শান-শওকত ও অহমিকা প্রকাশ করা। এছাড়া এটা পাশ্চাত্য সভ্যতার অনুসরণ বৈ কিছু নয়। এই ধরনের লোক ফিরিঙ্গিদের মতো আহার করাকে গর্বের বিষয় বলে মনে করে। অথচ হাদীস শরীফে এসেছে مَنْ تَشَبَهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُم "যে ব্যক্তি যে জাতির অনুসরণ করবে, সে ঐ জাতির লোক বলে গণ্য হবে।" মাটিতে বসে চামড়া কিংবা কাপড় কিংবা চাটাইর দস্তরখানে হলে এক বরতনে যৌথভাবে আহার করা রাসূলে করীম -এর পবিত্র সুন্নত। আল্লাহ্ তা'আলা মুসলমানদেরকে বিশেষ করে শিক্ষিত সমাজকে পাশ্চাত্যের অনুসরণের স্থলে রাসূলুল্লাহ্-এর উসওয়ায়ে হাসানা (উত্তম আদর্শ)-কে মনেপ্রাণে অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন!
مَا ذُكِرَ مِنْ عَلَامَةِ رِضَاهُ وَعَلَامَةِ سُخْطِهِ
রাসূলুল্লাহ-এর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি বোঝা সম্পর্কিত হাদীসসমূহ
۱۳۷. عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ لا يُعْرَفُ رِضَاهُ عَضَبُهُ بِوَجْهِهِ كَانَ إِذَا رَضِيَ فَكَأَنَّمَا مُلَاحَكُ الْجُدُرِ وَجْهَهُ وَإِذْ عَضِبَ خُسِفَ لَوْنُهُ وَاسْوَدٌ، قَالَ أَبُو بَكْرٍ سَمِعْتُ أَبَا الْحَكَمِ اللَّيْثِى يَقُولُ هِيَ الْمِرْأَةُ تُوْضَعُ فِي الشَّمْسِ فَيُرَى ضُوعُهَا عَلَى الْجِدَارِ يَعْنِي قَوْلَهُ مُلَاحَكُ الْجُدُرِ -
১৩৭. হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর সন্তুষ্টি' ও অসন্তুষ্টি তাঁর চেহারা মুবারক দেখেই বোঝা যেতো। তিনি যখন কোনো ব্যাপারে খুশি হতেন, তখন তাঁর চেহারা মুবারক খুশির কারণে চমকাতে থাকতো এবং মনে হতো যেনো পাঁচিলের আলোকচ্ছটা আয়নার মতো তাঁর পবিত্র চেহারায় প্রতিফলিত হচ্ছে। পক্ষান্তরে তিনি যখন কোনো বিষয়ে অসন্তুষ্ট হতেন, তখন তাঁর চেহারা মুবারক অসন্তোষ ও ক্রোধের কারণে মলিন ও বিবর্ণ হয়ে যেতো।
আবূ বাক্স (ইব্ন আবূ আযিম) (র) বলেন, আমি আবুল হাকাম লায়সীর কাছে শুনেছি, তিনি বলতেন, নবী -এর চেহারা মুবারক ছিল আয়নার মতো। তা সূর্যের আলোর সামনে রাখলে প্রাচীরে তার বিকিরণ ঘটতো।
۱۳۸. عَنْ كَعْبِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ وَإِذَا سَرَّهُ الْأَمْرُ اسْتَنَارَ وَجْهُهُ كَأَنَّهُ دَارَةُ الْقَمَرِ -
১৩৮. হযরত কা'ব ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন কোনো বিষয়ে খুশি হতেন, তখন তাঁর চেহারা মুবারক দীপ্ত চাঁদের বৃত্তের মতো মনে হতো।
ফায়দা : এ অনুচ্ছেদে গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য শুধু রাসূলুল্লাহ্-এর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির লক্ষণ ও তা বোঝা সম্পর্কিত হাদীসসমূহ বর্ণনা করা। সুতরাং যে হাদীসেই এই অবস্থা সংক্রান্ত কথা বিদ্যমান ছিল তিনি তা সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। পূর্ণ হাদীস বর্ণনা করেন নি।
কোনো বিষয়ে নবী -এর খুশি ও সন্তুষ্ট হওয়ার লক্ষণ তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডলে তা স্পষ্ট ফুটে উঠতো। অনুরূপভাবে অপছন্দনীয় ও অনভিপ্রেত বিষয় তাঁর মনে সহসা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতো, ফলে তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডলের দিকে তাকালেই বোঝা যেতো যে, এ বিষয়টি তাঁর পছন্দনীয় নয়। প্রত্যেক ব্যক্তিই তাঁর সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি তাঁর চেহারা মুবারক দেখে অনুমান করতে পারতো। এর দ্বারা এও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, নবী সবচেয়ে অনুভূতিশীল ও কোমল-হৃদয় ছিলেন। তাঁর সুস্থ মনে প্রতিটি ভাল-মন্দ বিষয় সহসা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতো।
এক হাদীসে হযরত আবূ সাঈদ খুদ্রী (রা) থেকে পরিষ্কার বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ লজ্জা-শরমের ক্ষেত্রে একজন পর্দানশীল কুমারীর চাইতেও অধিক লজ্জাশীল ছিলেন। তিনি যখন কোনো জিনিস অপছন্দ করতেন আমরা তা তাঁর চেহারা দেখেই বুঝে ফেলতাম। (মিশকাত, পৃষ্ঠা ৬১৯)
দ্বিতীয় যে বিষয়টি এই হাদীসসমূহ থেকে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে তা হলো, রাসূলুল্লাহ্ লোকদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও সুদর্শন ছিলেন। কোনো ব্যক্তি যখন নবী -এর সৌন্দর্য বর্ণনা করতেন তখন তাঁর মুখমণ্ডলকে পূর্ণিমার চাঁদের সাথে তুলনা করতেন। এক হাদীসে হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্-এর চেহারা ছিল সবচেয়ে সুন্দর এবং তাঁর দেহের রং ছিল সবচেয়ে উজ্জ্বল। যেকোন ব্যক্তি তাঁর সৌন্দর্য বর্ণনা করতো, সে তাঁর চেহারাকে পূর্ণিমার চাঁদের সাথে তুলনা করতো। (আল ফাযায়িলুল মুহাম্মাদিয়া, লিনুহাস, পৃষ্ঠা ১৮২)
এক হাদীসে আবূ ইসহাক সুবাঈ থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত বারা'আ ইব্ন আযিব (রা)-কে একবার জিজ্ঞেস করা হলো যে, নবী-এর মুখমণ্ডল কি তলোয়ারের মতো চমকদার ছিল? তিনি বললেন, না। বরং পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল ও দেদীপ্যমান ছিল। (বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০২)
অন্য এক হাদীসে হযরত আবূ বক্র সিদ্দীক (রা) বলেন, নবী -এর মুখমণ্ডল চন্দ্রের বৃত্ত সমতুল্য চমকদার ও গোল ছিল (আল ফাযায়িলুল মুহাম্মাদিয়া, পৃষ্ঠা ১৬৬, সূত্র আবূ নুআয়মের দালায়েল গ্রন্থ)।
এক হাদীসে হযরত জাবির ইবন সামুরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ -এর মুখমণ্ডল চন্দ্র ও সূর্যের মতো উজ্জ্বল, দীপ্ত ও গোলাকার ছিল। (মুসলিম)
উপরোক্ত দু'টি হাদীসের প্রথমটিতে নবী -এর পবিত্র মুখমণ্ডলকে উজ্জ্বল আয়নার সাথে তুলনা করা হয়েছে এবং দ্বিতীয় হাদীসে চন্দ্রের বৃত্তের সাথে যা চমকদারও হয় এবং গোলাকারও। এই দু'টি বস্তু অর্থাৎ চন্দ্র ও সূর্য সর্বাপেক্ষা অধিক উজ্জ্বল বস্তু হলেও প্রকৃত অর্থে নবী -এর মুখমণ্ডলের সাথে তুলনা করা যোগ্য নয়। কোথায় চন্দ্র-সূর্য ও কোথায় তাঁর চমকদার চেহারা মুবারক। যা মহান আল্লাহ্ মা'রিফফাতের নূর ও ওহীর নূর দ্বারা এরূপ উজ্জ্বল ও প্রদীপ্ত ছিল এই অনুভব জগতের কোনো বস্তুই তাঁর সমকক্ষ হতে পারে না।
١٣٩. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ دَخَلَ عَلَى رَسُولُ اللَّهِ مَسْرُورًا تَبْرُقُ أَسَارِيرُ وَجْهِهِ ، فَقَالَ أَلَمْ تَرَى إِلَى زَيْدٍ قَالَ أَبُو بَكْرٍ لَا يَقَوْلُ أَسَارِيرُ وَجْهِهِ إلا اللَّيْثُ -
১৩৯. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ আমার কাছে আনন্দিত অবস্থায় আগমন করলেন। আনন্দের আতিশয্যের দরুন তাঁর চেহারার লাবণ্য চমকাচ্ছিল। তিনি আনন্দিত কণ্ঠে বললেন, তুমি কি যায়দ সম্পর্কে কিছু শোননি? গ্রন্থকার শায়খ আবু বাক্ (র) বলেন, এ হাদীসে উল্লিখিত (أَسَارِيرُ وَجْهِهِ) চেহারার লাবণ্য) শব্দটি হাদীসের রাবী লায়স ব্যতীত অন্য কোনো রাবী বর্ণনা করেন নি।
ফায়দা: গ্রন্থকার (র) যেহেতু কেবল নবী -এর আনন্দ চিহ্ন ও সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির লক্ষণসমূহ বর্ণনা করতে চেয়েছেন, তাই পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন নি। শুধু সেই অংশটুকুই উল্লেখ করেছেন, যা উদ্দেশ্য স্পষ্ট করার জন্য যথেষ্ট ছিল। পুরো হাদীসটি বুখারী শরীফে এই ভাষায় উল্লিখিত হয়েছে:
হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী তাঁর নিকট আগমন করলেন। তখন আনন্দে তাঁর মুখমণ্ডলের (অপরূপ) লাবণ্য চমকাচ্ছিল। অতঃপর তিনি (আনন্দিত কণ্ঠে) বললেন, আয়েশা! তুমি কি জানো না যে, খ্যাতনামা কাইয়্যাফ (Physiognomist) মুজযায মুদলাজী যায়দ ও উসামা সম্পর্কে কি বলেছে? ঐ কাইয়্যাফ এ দু'জনের পা দেখে বলেছে যে, তাদের পায়ের মধ্যে মিল ও সামঞ্জস্য রয়েছে। অর্থাৎ উভয়ের মধ্যে একজন পিতা ও একজন পুত্র। (বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০২)
ঘটনা এই ছিল যে, হযরত উসামা (রা) হযরত যায়দ ইব্ন্ন হারিসা (রা)-এর পুত্র ছিলেন। ঘটনাক্রমে তাঁর গায়ের রং ছিল অত্যন্ত কালো এবং তাঁর পিতা হযরত যায়দ ইব্ন হারিসা (রা)-এর গায়ের রং ছিল অত্যন্ত ফর্সা। এজন্য মক্কার মূর্খ লোকেরা তাঁর বংশ সম্পর্কে খোঁটা দিতো। তারা বলতো যে, উসামা যায়দের পুত্র নয়। (নাউযুবিল্লাহ্)
হযরত যায়দ ইব্ন্ন হারিসা (রা) বনূ কিলাব গোত্রের সাথে সম্পর্কযুক্ত। তাঁর মাতা একবার তাঁকে সাথে নিয়ে তাঁর গোত্রে গিয়েছিলেন। সেখানে লুটতরাজ সংঘটিত হলো, লুটেরারা হযরত যায়দকে ধরে নিয়ে উকায বাজারে বিক্রি করলো। হযরত হাকীম ইব্ন্ন হিযাম (রা) তাকে তাঁর ফুফু খাদীজা (রা)-এর জন্য চারশ' দিরহামে খরিদ করলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ যখন হযরত খাদীজা (রা)-কে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলেন, তখন তিনি তাঁর গোলাম হযরত যায়দ ইব্ন হারিসাকে রাসূলুল্লাহ্-এর সেবাযত্নের জন্য তাঁকে দান করলেন। যায়দের পিতা হারিসা (রা) যখন তাঁর পুত্রের খবর জানতে পারলেন, তখন তিনি তাকে নেয়ার জন্য নবী-এর দরবারে উপস্থিত হলেন। নবী যায়দকে ইতিয়ার দিলেন। তিনি ইচ্ছা করলে তাঁর পিতার সাথে আপন গৃহ ও গোত্রে ফিরে যেতে পারেন এবং ইচ্ছা করলে নবী-এর কাছে থেকেও যেতে পারেন। হযরত যায়দ (রা) তাঁর পিতার সাথে যেতে অস্বীকার করলেন এবং রাসূলুল্লাহ্-এর সান্নিধ্যে থাকাকে স্বীয় গোত্র ও মাতা-পিতার উপর প্রাধান্য দিলেন। নবী তাঁকে পোষ্যপুত্র বানিয়ে নিলেন এবং হযরত উম্মু আয়মান (রা)-এর সাথে তাঁকে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ করলেন। এর গর্ভেই তাঁর পুত্র হযরত উসামা (রা) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তাঁর পিতার রং-এর স্থলে মাতার রং অর্থাৎ কালো রং-এর হয়েছিলেন। তাই আরবের মূর্খ লোকেরা তাঁর বংশ সম্পর্কে সন্দেহ করতো এবং ভর্ৎসনা করতো। কিন্তু জনৈক কাইয়্যাফ যখন তাদের দু'জনের পা দেখে সত্য কথা ব্যক্ত করলো যে, উসামা ও যায়দ পিতা-পুত্র, তখন নবী খুব খুশি হলেন এবং হযরত আয়েশা (রা)-এর কাছেও তিনি তাঁর খুশির কথা ব্যক্ত করলেন। এমন কি সে খুশির নিদর্শন তাঁর মুখমণ্ডলেও পরিদৃষ্ট হচ্ছিল। তাঁর চেহারা মুবারক আনন্দের আতিশয্যে চমকাচ্ছিল। হযরত যায়দ ও উসামা (রা) দু'জনই নবী-এর খুব প্রিয় ছিলেন।
এই হাদীসটিই বুখারী শরীফের অন্য একস্থানে এই ভাষায় বর্ণিত হয়েছে: হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) বলেন, একবার এক কাইয়্যাফ আমাদের নিকট এলো তখন নবী উপস্থিত ছিলেন এবং উসামা ইব্ন যায়দ ও যায়দ ইব্ন হারিসা (রা) উভয়ে (পিতা-পুত্র) একই চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়েছিলেন। তাদের শুধু পা চাদরের বাইরে ছিল। তখন ঐ কাইয়্যাফ তাঁদের পা দেখে বললো, এই পাগুলো পরস্পর মিলে যাচ্ছে। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, কাইয়্যাফের এই উক্তির ফলে রাসূলুল্লাহ্ অত্যন্ত খুশি হলেন। কেননা আরবের লোকেরা কাইয়্যাফের কথা বিশেষত বংশের ক্ষেত্রে দলীল রূপে গণ্য করতো। সুতরাং কাইয়্যাফের এই সাক্ষ্য কুরায়শদের জন্য দাঁতভাঙ্গা জবাব ছিল। একারণেই নবী তার কথা পছন্দ করলেন এবং তিনি হযরত আয়েশার সাথেও এ বিষয়টি আলোচনা করলেন। (বুখারী শরীফ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫২০)
١٤٠. عَنْ عَلِيُّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا رَأَى مَا يُحِبُّ قَالَ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي بِنِعْمَتِهِ تَتِمُّ الصَّالِحَاتُ -
১৪০. হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন কোনো পছন্দনীয় জিনিস দেখতেন, তখন বলতেন )...... الحمد لله الذي بنعمته( সমস্ত প্রশংসা সেই সত্তার জন্য, যাঁর দয়া ও অনুগ্রহে সমস্ত ভাল কাজ সম্পন্ন হয়।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা গেল যে, নবী -এর খুশি ও সন্তুষ্টির এক বাচনিক নিদর্শন এও ছিল যে, তিনি যখন কোনো পছন্দনীয় বিষয় দেখতেন, তখন আনন্দের আতিশয্যে আল্লাহ্ প্রশংসা ও গুণ গাইতেন এবং বলতেন الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي بِنِعْمَتِهِ تَتم الصالحات যেনো এটি কিংবা এই ধরনের আরো প্রশংসা-বাণী তাঁর খুশি ও পছন্দের নিদর্শন ছিলো।
١٤١. عَنْ طَارِقِ بْنِ شِهَابٍ قَالَ سَمِعْتُ ابْنَ مَسْعُودٍ يَقُولُ شَهِدْتُ مِنَ الْمِقْدَادِ مَشْهَداً لِأَنْ أَكُونَ أَنَا صَاحِبُهُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا فِي الْأَرْضِ مِنْ شَيْءٍ وَقَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ إِذَا غَضِبَ احْمَرَّ وَجْهُهُ
১৪১. তারিক ইব্ন শিহাব (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন מסעוד (রা)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলতেন, আমি হযরত মিকদাদ ইব্ন আসওয়াদের এমন এক মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞাত আছি, সে মর্যাদা যদি আমি লাভ করতে পারতাম, তবে দুনিয়ার সকল সম্পদ থেকে আমার কাছে তা প্রিয়তর হতো। হযরত আবদুল্লাহ্ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন কোনো ব্যাপারে অসন্তুষ্ট হতেন, তখন তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল ক্রোধে লাল হয়ে যেতো।
ফায়দা : এ হাদীসের শেষাংশ থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ -এর অসন্তুষ্টির চিহ্ন এই ছিলো যে, তাঁর মুখমণ্ডল ক্রোধে লাল হয়ে উঠতো। এ হাদীসের প্রথম অংশ এক দীর্ঘ হাদীসের সংক্ষিপ্তসার। বুখারী মুসলিমের বিভিন্ন অধ্যায়ে তা সবিস্তার বর্ণিত রয়েছে। যেমন এক হাদীসে তারিক ইব্ন শিহাব (র) বলেন, আমি হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন מסעוד (রা)-কে বলতে শুনেছি, আমি হযরত মিকদাদ ইব্ন আসওয়াদ (রা)-এর এমন এক মর্তবা ও মর্যাদা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল আছি, সে মর্তবা ও মর্যাদা দুনিয়ার সকল সম্পদ থেকে আমার কাছে প্রিয়তর। সে মর্যাদা হচ্ছে এই যে, একবার মিকদাদ ইব্ন আসওয়াদ (রা) রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে হাজির হলেন। তখন নবী লোকদেরকে কাফির ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য উৎসাহিত করছিলেন। তখন মিকদাদ (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! মূসা (আ)-এর জাতি যেরূপ তাদের নবী হযরত মূসাকে বলেছিলো যে, যাও, তুমি' এবং তোমার রব দু'জনে গিয়ে আমালিকা জাতির সাথে যুদ্ধ করো আর আমরা এখানে বসে রইলাম। সেরূপ আমরা কখনো আপনাকে বলবো না। বরং আপনার ডানে-বামে, সামনে-পেছনে থেকে কাফিরদের সাথে তুমুল যুদ্ধ চালিয়ে যাবো এবং শেষ রক্তবিন্দু প্রবাহিত করবো। হাদীসের রাবী হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন מסעוד (রা) বলেন, আমি লক্ষ করলাম মিকদাদের এই কথা নবী খুব পছন্দ করলেন এবং আনন্দে তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল প্রোজ্জ্বল হয়ে উঠলো। (বুখারী শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৬৪)
হযরত মিকদাদ (রা)-এর এই জীবন-উৎসর্গমূলক উক্তি নবী খুব পছন্দ করলেন। তাই হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন מסעוד (রা) আকাঙ্ক্ষা করলেন যে, হযরত মিকদাদ (রা) তাঁর ঐ জীবন-উৎসর্গকারী বক্তব্য দ্বারা যে মর্তবা হাসিল করেছেন, তা যদি আমিও লাভ করতে পারতাম।
١٤٢. عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ وَ إِذَا غَضِبَ أَحْمَرُ وَجْهُهُ -
১৪২. হযরত উম্মু সালাম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন রাগান্বিত হতেন, তখন তাঁর চেহারা মুবারক রাগে লাল হয়ে উঠতো।
ফায়দা: এর পূর্ববর্তী হাদীসটির বিষয়বস্তুও একই। যাতে বোঝা যায় যে, নবী যখন কোনো কিছু অপছন্দ করতেন, কিংবা রাগান্বিত হতেন, তখন তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল রাগে লাল হয়ে উঠতো।
١٤٣. عَنْ أَبِي مُوسَى قَالَ سُئِلَ رَسُولُ اللهِ عَنْ أَشْيَاءَ كَرِهَهَا فَلَمَّا أَكْثَرُوا عَلَيْهِ غَضِبَ فَلَمَّا رَأَى عُمَرُ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ الْغَضَبَ فِي وَجْهِهِ قَالَ أَنَا نَتُوْبُ إِلَى اللَّهِ عَزَّوَجَلَّ عَمَّا كَرِهَ -
১৪৩. হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ -কে এমন কিছু বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, যা তাঁর অপছন্দনীয় ছিল। তিনি নীরব থাকলেন। কিন্তু লোকেরা যখন সে বিষয়ে পীড়াপীড়ি করতে লাগলো, তখন তিনি ক্রুদ্ধ হলেন। হযরত উমর (রা) যখন তাঁর মুখমণ্ডলে ক্রোধের চিহ্ন দেখলেন, তখন বললেন, আমরা আল্লাহ্র কাছে এমন বিষয় সম্পর্কে তাওবা করছি যা নবী পছন্দ করেন না।
📄 নবী (সা) কর্তৃক অপছন্দনীয় জিনিস পরিহার ও এড়িয়ে যাওয়া সম্পর্কিত রিওয়ায়াতসমূহ
١٤٤. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَلْمًا يُوَاجِهُ أَحَدًا بِشَيْءٍ يَكْرَهُهُ، فَقَرَّبَ إِلَيْهِ صَفْحَةٌ فِيهَا قَرْعٌ وَكَانَ يَلْتَمِسُهُ بِاصَابِعِهِ فَدَخَلَ رَجُلٌ عَلَيْهِ أَثْرُ صُفْرَةٍ فَكَرِهَهُ ، فَلَمْ يَقُلْ لَهُ شَيْئًا حَتَّى خَرَجَ ، فَقَالَ بَعْضُ الْقَوْمِ لَوْ قُلْتُمْ لِهَذَا أَنْ يَدَعْ هَذِهِ يَعْنِي الصُّفْرَةُ -
১৪৪. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর অভ্যাস ছিলো, তিনি কারো সামনা-সামনি কোনো কথা খুব কমই বলতেন। অর্থাৎ তাঁর অপছন্দনীয় কোন জিনিস দেখলেও সামনা-সামনি খুব কমই তার প্রতিবাদ করতেন। (সুতরাং) একবার তাঁর সামনে লাউ তরকারির একটি পেয়ালা পেশ করা হলো। তিনি অঙ্গুলি দ্বারা লাউয়ের টূকরা খোঁজ করছিলেন। তখন এমন এক ব্যক্তি তাঁর নিকট প্রবেশ করলো যার গায়ে হলুদ রং-এর খুশবু চিহ্ন পরিলক্ষিত হচ্ছিল। লোকটির এভাবে নবী-এর নিকট আসা তাঁর পছন্দ হলো না। কিন্তু তিনি তাকে কিছুই বললেন না। লোকটির এ ধরনের রং ব্যবহার নবী-এর পছন্দ হলো না, কিন্তু তিনি কিছুই বলার পূর্বে লোকটি বের হয়ে গেল। তখন নবী অপর এক ব্যক্তিকে বললেন, তুমি যদি সে লোকটিকে বলে দিতে যে, হলুদ রং ব্যবহার ছেড়ে দিলেই ভাল হতো।
ফায়দা: এই হাদীস দ্বারা বোঝা যায় নবী কারো থেকে অপছন্দনীয় কোন জিনিস হতে দেখে সাথে সাথেই তাকে সাবধান করতেন না। বরং অধিকাংশ সময় উম্মতের প্রতি সহানুভূতিবশত এড়িয়ে যেতেন। লোকটিকে তৎক্ষণাৎ সামনা-সামনি কিছু না বলার পেছনে রহস্য এই ছিলো যে, এভাবে সামনা-সামনি বললে হয়ত লোকটি তাঁর কথা মান্য না করতেও পারে। এতে লোকটির ইহলোক ও পরলোকের সমূহ ক্ষতি হয়ে যাবে। আর নবী-এর কর্মনীতি এসব বিষয়ের ব্যাপারে হতো যা কোন 'উত্তম কাজ' পরিহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো। এবং এরূপ বিষয়ে দেরিতে সাবধান করলে কোনরূপ ক্ষতি নেই। কিন্তু কোন হারাম ও শরীয়ত নিষিদ্ধ অশ্লীল কাজের বিষয়ে তিনি তৎক্ষণাৎই পাকড়াও করতেন। যাহোক নবী ছিলেন তাঁর উম্মতের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ও মেহেরবান। তাঁর এই দয়া ও স্নেহের কারণেই তিনি কোন অপছন্দনীয় ব্যাপারে যা শরীয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ নহে সঙ্গে সঙ্গে পাকড়াও করতেন না। এর দ্বারা নবী-এর উত্তম তালীম ও তারবিয়াতের (শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ) অনুমান করা যায়।
١٤٥. عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ الْحَكَمِ قَالَ صَلَّيْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَعَطَسَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ فَقُلْتُ يَرْحَمُكَ اللهُ فَرَمَانِي الْقَوْمُ بِأَبْصَارِهِمْ وَضَرَبُوا بِأَيْدِيهِمْ عَلَى أَفْخَانِهِمْ فَلَمَّا رَأَيْتُهُمْ يُصْمِتُونَى لَكِنِّي سَكَتْ قَالَ فَدَعَانِي النَّبِيُّ ﷺ بِأَبِي وَأُمِّي مَا رَأَيْتُ مُعَلَّمًا أَحْسَنَ تَعْلِيمًا مِنْهُ مَا ضَرَبَنِي وَلَا سَبَّنِي ثُمَّ قَالَ إِنَّ هَذِهِ الصَّلَاةُ لَا يَصْلِحُ فِيهَا شَيْءٌ مِنْ كَلَامِ النَّاسِ إِنَّمَا هُوَ التَّسْبِيحُ وَالتَّكْبِيرُ والتَّمْحِيدُ .
১৪৫. হযরত মুয়াবিয়া ইব্ন আবুল হাকাম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি রাসূলুল্লাহ্-এর সাথে জামায়াতে নামায আদায় করি। (নামাযের মধ্যেই) এক ব্যক্তির হাঁচি এল। রাবী বলেন, (আমি 'আলহামদুলিল্লাহ্'-এর জবাবে) 'ইয়ারহামুকাল্লাহ্' বলে ফেললাম। তখন নামাযরত লোকেরা আমাকে চোখ তুলে দেখতে লাগলো এবং উরুর উপর হাত মারতে শুরু করলো। আমি দেখলাম তারা আমাকে জোর করে চুপ করাতে যাচ্ছে (তখন আমার খুব খারাপ লাগলো)। কিন্তু আমি নিশ্চুপ রইলাম। (নামায শেষে) নবী আমাকে ডাকলেন। আমার মাতাপিতা তাঁর জন্য কুরবান হোন। আমি নবী-এর চেয়ে কোন উত্তম শিক্ষক দেখি নাই। তিনি আমাকে না মারধর করলেন, না বকাঝকা করলেন। তারপর বললেন: নামাযে দুনিয়াবী কথাবার্তা বলা ঠিক নয়, নামায হলো আল্লাহ্র তাসবীহ্ (গুণগান) তাকবীর (মহানত্ব) তামহীদ (প্রশংসা)-এর নাম।
ফায়দা : এ ঘটনা হলো তখনকার যখন হযরত মুয়াবিয়া ইব্ন আবুল হাকাম (রা) ছিলেন নও মুসলিম। তখনও তিনি নামাযের সকল বিধি-বিধান শিখতে পারেন নি। তাই এ ঘটনা ঘটে গেল। হযরত মুয়াবিয়া (রা) নিজেই বলেন, ইসলাম গ্রহণের পর আমাকে ইসলামের কিছু কিছু বিধি-বিধান শেখানো হয়েছিলো। তন্মধ্যে আমাকে এও শেখানো হয়েছিলো যে, তোমার হাঁচি এলে 'আলহামদুলিল্লাহ্' বলবে। আর যদি অপর কারো হাঁচি আসে এবং সে 'আলহামদুল্লিাহ্' বলে তবে এর জবাবে তুমি 'ইয়ারহামুকাল্লাহ্' বলবে। হযরত মুয়াবিয়া (রা) বলেন, একবার আমি নবী-এর সাথে নামায পড়ছিলাম। এক ব্যক্তির হাঁচি এল। আর সে 'আলহামদুলিল্লাহ্' বললো। আমি তার জবাবে 'ইয়ারহামুকাল্লাহ্' বললাম। লোকেরা আমার দিকে চোখ তুলে তাকাতে লাগলো। বিষয়টি আমার ভীষণ খারাপ লাগলো। আমি নামাযের মধ্যেই তাদেরকে বলে ফেললাম তোমরা আমার দিকে চোখ তুলে কেনো দেখছো? আমার এ অবস্থা দেখে তারা সুবহানাল্লাহ্ বললো। তারপর নবী যখন নামায শেষ করলেন তখন জিজ্ঞেস করলেন, নামাযে কে কথা বললো? তারপর তিনি নিজেই বললেন: এ বেদুঈন। তারপর তিনি আমাকে ডাকলেন এবং বললেন, নামায ৩ কুরআন পড়া, এবং আল্লাহ্র যিকরের জন্য। সুতরাং তুমি যখন নামাযে থাকবে তখন এ সবই পড়বে। (দুনিয়াবী কথাবার্তা বলবে না।) এ ঘটনা বর্ণনার পর বর্ণনাকারী বলেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ্-এর চেয়ে স্নেহপরায়ণ ও মেহেরবান শিক্ষক জীবনেও দেখিনি।
গ্রন্থকারের এ হাদীসটি এ অনুচ্ছেদে সংকলনের উদ্দেশ্য হলো নবী কর্তৃক সাহাবায়ে কিরামের বিভিন্ন ছোট-খাটো ত্রুটিবিচ্যুতি এড়িয়ে যাওয়ার অবস্থা বর্ণনা করা এবং তিনি কিভাবে ভালবাসা ও স্নেহ-মমতা দিয়ে তালীম দিতেন তা তুলে ধরা। নবী-এর এই অনুপম আদর্শ আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্মের অনুসরণ করা একান্ত কর্তব্য।
١٤٦. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ قَاعِدًا فِي الْمَسْجِدِ وَأَصْحَابُهُ مَعَهُ إِذْ جَاءَ أَعْرَابِيُّ فَبَالَ فِي الْمَسْجِدِ فَقَالَ أَصْحَابُ النَّبِيِّ ﷺ مَا مَنْ فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ لَا تَزْرِمُوهُ ثُمَّ قَالَ إِنَّ هَذِهِ الْمَسَاجِدَ لَا تَصْلُحُ لِشَيْءٍ مِنَ الْقَدْرِ وَالْبَوْلِ وَالْخَلَاءِ أَوْ كَمَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ
১৪৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ মসজিদে অবস্থান করছিলেন। সাহাবা কিরামও তাঁর সাথে বসেছিলেন। ইত্যবসরে এক বেদুঈন সেখানে আসল এবং মসজিদের মধ্যেই (এক পাশে) পেশাব করতে লাগলো। সাহাবা কিরাম হায়! হায়! বলে তাকে পেশাব করতে বিরত রাখতে চাইলেন। কিন্তু নবী বললেন : তাকে পেশাব করতে বাধা দিও না। তারপর ঐ বেদুঈন যখন পেশাব করা শেষ করলো, তখন তাকে তিনি বললেন, দেখো, এই মসজিদগুলো আবর্জনা ছড়ানো ও পেশাব পায়খানা করার জন্য নয়। কিংবা এই ধরনেরই কোনো উক্তি রাসূলুল্লাহ্ করেছেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকেও নবী-এর অপরিসীম দয়া ও মমত্ববোধের অনুমান করা যায়। কোনো কোনো রিওয়ায়াতে আছে, ঐ বেদুঈন যখন পেশাব করা শেষ করলো, তখন নবী পানি আনিয়ে স্বয়ং এ স্থানটি ধৌত ও পবিত্র করান। পেশাব করার মাঝখানে ঐ বেদুঈনকে বাধা দিতে তাঁর নিষেধ করার কারণ হচ্ছে, পেশাব করার মাঝখানে বাধা দিলে তাতে তার কষ্ট হতে পারতো এবং মূত্রনালিতে পেশাব আটকে যেতে পারতো। এক রিওয়ায়াতে আছে, নবী ঐ ব্যক্তিকে ডেকে বললেন : এই মসজিদসমূহ পেশাব ও ময়লা ছড়ানোর জন্য নয়। এগুলো আল্লাহ্ তা'আলার যিক্র, নামায ও কুরআন তিলাওয়াত করার জন্য বানানো হয়েছে। এ হাদীসগুলো উম্মতের সাধারণ মানুষের জন্য উপদেশ ও তালীম-তারবিয়াতের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে এক বিরাট শিক্ষা। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের মূর্খসুলভ কাজকর্মে ধৈর্যধারণ করে তাদেরকে স্নেহ ও ভালবাসার সাথে দীনী বিষয়সমূহ শিক্ষা দেয়া উচিত।
١٤٧. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ إِذَا بَلَغَهُ مَنْ رَجُلٍ شَيْءٍ لَمْ يَقُلْ لَهُ قُلْتَ كَذَا وَكَذَا بَلْ قَالَ مَا بَالُ القَوَامِ يَقُولُوْنَ كَذَا وَكَذَا -
১৪৭. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো অপছন্দনীয় বিষয় অবগত হতেন, তখন তিনি তাকে সম্বোধন করে একথা বলতেন না যে, তুমি এরূপ এরূপ বলেছো। বরং তিনি (অনির্দিষ্টভাবে) বলতেন, লোকদের কি হয়েছে যে, তারা এরূপ এরূপ কথা বলছে?
ফায়দা : এ হাদীস থেকেও নবী সুসামাজিকতা ও মননশীলতার অনুমান করা যায়। তিনি কখনো কাউকে সম্বোধন করেও সাবধান করতেন না। আর কারো নাম ধরেও তার অপছন্দনীয় বিষয় প্রকাশ করতেন না। বরং তিনি যদি কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো অপছন্দনীয় বিষয় অবহিত হতেন এবং তিনি তাকে সতর্ক করতে চাইতেন, তবে সাধারণভাবে সাবধান করে দিতেন। যেমন তিনি বলতেন, লোকদের কি হয়েছে যে, এরূপ অলীক কথা বলে। তিনি কখনো এরূপ বলতেন না যে, অমুক ব্যক্তির কি হয়েছে যে, এরূপ অলীক কথা বলে। এ হচ্ছে তালীম-তারবিয়াতের এমন এক শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি যাতে ঝগড়া-বিবাদ ও শত্রুতা সৃষ্টি হয় না। আর যাকে উদ্দেশ্য করে একথা বলা হলো, সেও তার ভ্রান্তির ব্যাপারে অপর লোকের সামনে লজ্জিত হয় না। সামাজিক আচার বা শিক্ষার ব্যাপকতা ও সার্বজনীনতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ তাঁর উম্মতকে কত পূর্ণাঙ্গ দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, তা এই ধরনের ঘটনাবলি থেকেই অনুমিত হয়। আল্লাহ্ তা'আলা আমাদেরকে তাঁর পদাংক অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন।
١٤٨ عَنْ عِمْرَانَ بْنِ الْحُصَيْنِ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ إِذَا كَرِهَ شَيْئًا عُرِفُ ذَلِكَ فِي وَجْهِهِ -
১৪৮. হযরত ইমরান ইবন হুসায়ন (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন কোনো বিষয় অপছন্দ করতেন, তা তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল থেকেই অনুমান করা যেতো।
ফায়দা : এ বিষয়ে অন্যান্য হাদীস এবং পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদ "নবী-এর সন্তুষ্টির ও অসন্তুষ্টি নিদর্শন"-এ সবিস্তার বর্ণিত হয়েছে।
এখানে গ্রন্থকার এ হাদীসটি কেবল এজন্য বর্ণনা করেছেন যে, নবী প্রতিটি বিষয়ে সামনা-সামনি কাউকে ভর্ৎসনা করতেন না, বরং তিনি কোনো বিষয়কে অপছন্দ করলে নীরব থাকতেন। কিন্তু এই অপছন্দ তাঁর মুখমণ্ডলে অবশ্যই প্রকাশ পেতো। কোনো কোনো অপছন্দনীয় বিষয় এমন হয়, যা কেবল চেহারা দ্বারা প্রকাশ করাই যথেষ্ট হয় এবং কোনো কোনো বিষয় মুখে প্রকাশ করারও প্রয়োজন হয়। প্রথম হাদীসটি শেষোক্ত বিষয় সম্পর্কিত ছিলো। অনুরূপভাবে কোনো কোনো লোক এমন হয়ে থাকে, যাদের সতর্ক করার জন্য কেবল চেহারা দ্বারা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করাই যথেষ্ট হয় এবং কোনো কোনো লোককে সতর্ক করার জন্য মুখে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। এই দুই হাদীসের মধ্যে নবী -এর কর্ম-পদ্ধতির পার্থক্য এর উপরই নির্ভরশীল। যা হোক, নবী যে সব লোককে সংশোধন করতে চাইতেন, তিনি তার কথা ও কাজ দ্বারা তার মনে কোনো কষ্ট দিতেন না। কেননা, সংশোধন ও শিক্ষা-দীক্ষার কাজে মনে কষ্ট দান ক্ষতিকর। এতে ভালোর চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়।
١٤٩. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا اسْتَدْ وَجْهُهُ أَكْثَرَ مَسًّ لِحْيَتِهِ-
১৪৯. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ যখন কোনো কঠিন সংকটে পতিত হতেন, তখন তিনি বারংবার (মুবারক) দাড়িতে হাত বুলাতেন।
ফায়দা: এ অবস্থা রাসূলুল্লাহ্-এর চরম ধৈর্য ও সহিষ্ণুতাকেই প্রকাশ করে। নচেৎ সাধারণত মানুষ এরূপ ক্ষেত্রে মুখে তার মনের আক্রোশ প্রকাশ করে থাকে। কিন্তু তাতে সাধারণত ক্ষতি হয়। ন্যূনপক্ষে এই দুঃখ ও উষ্মা প্রকাশে মানুষের মনে কষ্ট হয়। এ কারণে রাসূলুল্লাহ্ এ পদ্ধতি পরিহার করতেন এবং স্বয়ং কষ্ট সহ্য করতেন।
١٥٠. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ النَّبِىُّ ﷺ عِنْدَ إِحْدَى أُمَّهَاتِ الْمُؤْمِنِيْنَ فَأَرْسَلَتْ إِحْدَى نِسَائِهِ بِقَصْعَةِ فِيْهَا طَعَامٌ، فَضَرَبَتْ بِيَدِ الرَّسُولِ فَسَقَطَتْ الْقَصْعَةُ فَانْكَسَرَتْ، فَأَخَذَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ الْكِسْرَتَيْنِ فَضَمَّ إِحْدَاهُمَا الْأُخْرَى ثُمَّ جَعَلَ وَيَجْمَعُ الطَّعَامَ فَيَقُولُ غَارَتْ أُمُّكُمْ كُلُوا فَكُلُوا ، فَجَلَسَ الرَّسُولُ حَتَّى جَاءَتْ الْكَاسِرَةُ بِقَصْعَتِهَا الَّتِي هِيَ فِي بَيْتِهَا فَدَفَعَ الصُّحْفَةَ الصَّحِيْحَةَ إِلَى الرَّسُوْلِ وَتَرَكَ الْمَكْسُوْرَةَ فِي الَّتِي كَسَرَتْهَا-
১৫০. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী উম্মাহাতুল মু'মিনীন-এর মধ্য থেকে কোনো একজনের নিকট অবস্থান করছিলেন। ইত্যবসরে তাঁর সহধর্মিণীদের মধ্য থেকে কোনো একজন (কিছু খাদ্যদ্রব্যসহ) একটি বাটি তাঁর কাছে প্রেরণ করেন। যে উম্মুল মু'মিনীনের নিকট তিনি ঐ দিন অবস্থান করছিলেন, তিনি খাদ্য নিয়ে আগমনকারীর হাতে হাত দ্বারা আঘাত করলেন। ফলে বাটি পড়ে গিয়ে ভেঙে গেলো। নবী তার উভয় টুক্রা তুলে নিলেন এবং তাকে একে অপরের সাথে মিলিয়ে নিলেন। এরপর ইতস্তত বিক্ষিপ্ত খাবারগুলো একত্রিত করে বললেন যে, তোমাদের মায়ের (উম্মুল মু'মিনীনের) আত্মমর্যাদাবোধে (আঘাত) লেগেছে, তোমরা খাবারগুলো খেয়ে ফেলো। সুতরাং সবাই তা খেয়ে ফেললো। খাবার নিয়ে আগমনকারী বাটি নেয়ার জন্য বসে রইল। ইতিমধ্যে বাটিটি যাঁর হাতে ভেঙেছিলো, তিনি তাঁর ঘর থেকে একটি নিখুঁত বাটি নিয়ে এলেন। নবী খাবার নিয়ে আগমনকারীকে ঐ নিখুঁত বাটিটি দিয়ে দিলেন এবং ভাঙা বাটিটি যিনি ভেঙেছিলেন তাঁরই ঘরে রেখে দিলেন।
ফায়দা : এ ঘটনাটিও নবী-এর মহৎ ক্ষমা গুণের জ্বলন্ত প্রমাণ। ঘটনাটি ছিলো এরূপ : রাসূলুল্লাহ্ উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-এর গৃহে অবস্থান করছিলেন। এই সময় তাঁর অন্য এক সহধর্মিণী কারো মাধ্যমে একটি বাটিতে করে কিছু খাবার নবী-এর নিকট পাঠালেন। একজন নারী হিসাবে হযরত আয়েশা (রা)-এর আত্মমর্যাদায় বাধলো যে, তাঁর গৃহে তাঁর কোনো সতীনের পক্ষ থেকে তাঁর স্বামীর জন্য খাবার আসবে। তাই তিনি ঐ কাজটি করলেন। একটু চিন্তা করুন, নবী-এর বিবেচনায় এ কাজটি কতখানি অপছন্দনীয় হতে পারে। কিন্তু তিনি তাঁর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পরম ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়ে হযরত আয়েশা (রা)-এর এহেন কাজের কোনো কৈফিয়ত তলব করলেন না কিংবা তাঁকে ভর্ৎসনাও করলেন না। বরং হযরত আয়েশা (রা)-এর পক্ষ থেকে নারী জাতির স্বভাবগত আত্মমর্যাদাবোধের (ঈর্ষা) ওজর পেশ করে অন্যদেরকেও নারীর এই স্বভাবগত দুর্বলতা সম্পর্কে অবহিত করলেন এবং বিক্ষিপ্ত খাবারগুলো একত্রিত করে নিজেও খেলেন ও অন্যদেরকেও খাওয়ালেন। বস্তুত এটা নবী-এরই মহান চরিত্রের প্রকৃষ্ট উদাহরণ যে, অপছন্দনীয় বিষয়ের অপছন্দনীয় অংশটুকু উপেক্ষা করে শুধু তার কৈফিয়ত তলব করা ও ভর্ৎসনা করা থেকেই বিরত থাকেননি, বরং তার সপক্ষে প্রকৃতিগত দাবির ওজরও বর্ণনা করেন।
١٥١ عَنْ أَنَسٍ قَالَ اِسْتَحْمَلَ أَبُو مُوسَى النَّبِيُّ ، فَوَافَقَ مِنْهُ شَغَلاً فَقَالَ وَاللَّهِ لَا أَحْمِلُكَ، فَلَمَّا قَفَا دَعَاهُ فَقَالَ يَارَسُوْلَ اللهِ قَدْ حَلَفْتَ لَا تَحْمِلُنِي قَالَ وَأَنَا أَحَلِفُ لَأَحْمِلَنَّكَ فَحَمَلَهُ .
১৫১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আবূ মূসা আশআরী (রা) নবী-এর নিকট সফরের জন্য বাহন চাইলেন। নবী তখন কোনো কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তাই তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! এখন আমি তোমাকে কোনো বাহন দেবো না। কিন্তু আবূ মূসা আশআরী (রা) যখন ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন নবী তাকে বাহন দেওয়ার জন্য ডাকলেন। তখন আবূ মূসা আশআরী (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি তো আমাকে বাহন না দেওয়ার কসম খেয়েছেন। নবী তখন বললেন, এখন আমি কসম করে বলছি যে, তোমাকে অবশ্যই বাহন দেবো। সুতরাং তিনি তাঁকে বাহন দিয়ে দিলেন।
ফায়দা: এ হাদীসের মর্ম সুস্পষ্ট। কোনো কোনো হাদীসে বর্ণিত আছে, যেহেতু তখন নবী এর নিকট দেওয়ার মতো কোনো বাহন ছিলো না, তাই তিনি বাহন দিতে অস্বীকার করেছিলেন। মুসলিম শরীফের (কিতাবুল ঈমান) এক হাদীসে হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, আমি একবার আমার কতিপয় আশআরী বন্ধুর সাথে নবী -এর নিকট সফরের জন্য বাহন চাইতে গেলাম। কিন্তু তিনি বাহন দিতে অস্বীকার করলেন। বললেন, আল্লাহ্র কসম! তোমাকে দেওয়ার মতো কোনো বাহন নেই। (বর্ণনাকারী বলেন) এরপর কিছুক্ষণ আমরা নবী -এর দরবারে অবস্থান করলাম। ইতিমধ্যে তাঁর কাছে কোথাও থেকে কিছু উট এসে গেলো। সুতরাং তিনি উটগুলোর মধ্য থেকে সাদা কুঁজওয়ালা তিনটা উট আমাদেরকে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। উট নিয়ে আমরা চলতে লাগলাম। আমি কিংবা আমাদের মধ্য থেকে কেউ বললো, এ উটগুলোর মধ্যে আল্লাহ্ বরকত দান করবেন না। কেননা, আমরা এসে যখন নবী -এর নিকট বাহন প্রার্থনা করেছিলাম, তখন তিনি বাহন না দেয়ার কসম খেয়েছিলেন। আর এখন আমাদেরকে বাহন দিয়েছিলেন। সুতরাং তারা নবী -এর নিকট ফিরে এলো এবং তাঁকে একথা জানালো। তিনি বললেন, আমি তো তোমাদেরকে বাহন দেইনি। তোমাদেরকে বাহন দিয়েছেন আল্লাহ্ তা'আলা। আর আল্লাহ্র কসম! আমি যদি কখনো কসম করি, এবং তার বিপরীতে তার চেয়ে উত্তম দেখতে পাই, তবে আমি সে কাজ করে ফেলি এবং কসমের কাফ্ফারা প্রদান করি।
এ হাদীস থেকে এও জানা গেলো, যদি কোনো বিষয়ে কসম খাওয়া হয় এবং এর বিপরীত কোন বস্তুতে মংগল বা কল্যাণ পরিলক্ষিত হয়, তবে ঐ কসম ভেঙে ফেলা উচিত এবং কসমের কাফ্ফারা প্রদান করা উচিত।
যেমন এক হাদীসে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, নবী বলেন, যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ে কসম খেয়েছে, তারপর ভিন্ন কাজ তার থেকে উত্তম পেয়েছে, ঐ উত্তম কাজটিই সে গ্রহণ করবে এবং সে তার পেছনের কসমের কাফ্ফারা প্রদান করবে। (মুসলিম শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮)
١٥٢. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كُسِرَتْ رُبَاعِيَّةُ النَّبِيِّ ﷺ يَوْمَ أَحُدٍ وَشَجَّ فَجَعَلَ الدَّمُ يَسِيلُ عَلَى وَجْهِهِ وَهُوَ يَمْسَحُ الدَّمُ وَيَقُولُ كَيْفَ يُفْلِحُ قَوْمُ خَضَبُوا وَجْهَ نَبِيِّهِمْ بِالدَّمِ وَهُوَ يَدْعُوهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ فَأَنْزَلَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْ
১৫২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উহুদ যুদ্ধের দিন নবী-এর দাঁত মুবারক ভেঙে গিয়েছিলো, শির মুবারক জখম হয়েছিল এবং রক্ত তাঁর চেহারা বেয়ে পড়ছিলো। তখন তিনি রক্ত মুছতে মুছতে বলছিলেন : সে জাতি কিরূপে কল্যাণ লাভ করতে পারে, যারা তাদের নবীর চেহারাকে রক্তে রঞ্জিত করে দিয়েছে। অথচ তিনি তাদেরকে আল্লাহর দীনের প্রতি দাওয়াত দিচ্ছেন। তখন মহান আল্লাহ্ এই আয়াত নাযিল করলেন : “لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْئٍ” এ ব্যাপারে আপনার কোনো ইখতিয়ার নেই।
ফায়দা : এটি উহুদ যুদ্ধের প্রসিদ্ধ ঘটনা, যা তৃতীয় হিজরীতে সংঘটিত হয়েছিলো। এ যুদ্ধেই প্রায় ৭০ জন সাহাবী শহীদ হয়েছিলেন। দৃঢ়তা, ত্যাগ ও জীবন কুরবানীর দরুনই আল্লাহ্ তা'আলা مسلمانوں একটি ক্ষুদ্র দলকে কাফিরদের বিরাট বাহিনীর মুকাবিলায় পরাজয়ের পর বিরাট বিজয় দান করেন। এই যুদ্ধেই এক হতভাগ্য আবদুল্লাহ্ ইব্ন কুমাইয়্যা মুসলমান ব্যূহ ভেদ করে সামনে অগ্রসর হয় এবং নবী -এর শিরস্ত্রাণের উপর তলোয়ারের আঘাত হানে। ফলে তাঁর দান্দান মুবারক শহীদ হয় এবং শির মুবারক জখম হয়। এই অবস্থায় তাঁর পবিত্র মুখ দিয়ে এই উক্তি নিঃসৃত হলো “সেই জাতি কিভাবে কল্যাণ লাভ করতে পারে, যারা তাদের নবীর চেহারাকে জখম করে দেয়।” কিন্তু আল্লাহ্ পাক রহমতে আলমের মুখ-নিঃসৃত এই উক্তি পছন্দ করলেন না। আয়াত নাযিল হলো : لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْئُ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظَالِمُونَ তাদের প্রতি ক্ষমাপরবশ হবেন অথবা তাদেরকে শাস্তি দিবেন এ বিষয়ে (হে নবী) আপনার করণীয় কিছুই নেই। কারণ তারা সীমালংঘনকারী।
এ ঘটনা থেকেই অনুমান করুন যে, নবী কি পরিমাণ ক্ষমা ও দয়া প্রদর্শন করতেন। মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার পরও তিনি ঐ কাফির ও মুশরিকদের জন্য মুখে বদ্ দু'আ করেননি এবং একজন মানুষ হিসেবে তাঁর পবিত্র মুখ থেকে যে উক্তি প্রকাশ পেয়েছে তাও আল্লাহ্র নিকট তাঁর মর্যাদার উপযুক্ত মনে করা হয়নি। তাই আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে তৎক্ষণাৎ বলে দেয়া হয়েছে যে, এটা আপনার কাজ নয়। আপনার কাজ তো হচ্ছে ক্ষমা ও দয়া প্রদর্শন করা। কেননা, আপনাকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমতরূপে প্রেরণ করা হয়েছে।
রিওয়ায়াতসমূহে দেখা যায় যে, এই কষ্টদায়ক জখম অবস্থায়ও নবী -এর মুখে ছিলো এই বাণী : رَبِّ اغْفِرْ قَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ "হে আল্লাহ্! আমার জাতিকে তুমি ক্ষমা করো। কেননা, তারা জানে না।
١٥٣ عَنِ الشَّفَاءِ بِنْتِ عَبْدِ اللهِ قَالَتْ أَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَوْمًا أَسْأَلُهُ شَيْئاً فَجَعَلَ يَعْتَذِرُ إِلَى -
১৫৩. হযরত শিফা বিন্ত আবদুল্লাহ্ (রা) বলেন, একবার আমি কিছু চাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট গেলাম। কিন্তু তিনি আমার কাছে অপারগতা প্রকাশ করলেন। (কেননা, তাঁর নিকট তখন দেয়ার মতো কোনো সম্পদ ছিলো না।)
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী এ সাহাবিয়াকে অভদ্র বা শক্ত কথা বলে বিদায় করেননি। বরং সৌজন্য ও ভদ্রতা বজায় রেখে তার কাছে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন যে, এখন আমার কাছে দেয়ার মতো কিছু নেই। নচেৎ আমি তোমাকে অবশ্যই কিছু দিতাম। অথচ এই অপারগতা প্রকাশ করারও তাঁর প্রয়োজন ছিল না।
١٥٤ عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ فَمَا زَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَعْتَنِزُ إِلَى صَفِيَّةَ وَيَقُولُ يَا صَفِيَّةُ إِنَّ أَبَاكَ أَلَّبَ عَلَى الْعَرَبِ وَفَعَلَ حَتَّى ذَهَبَ ذَلِكَ مِنْ نَفْسِهَا -
১৫৪. হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (উম্মুল মু'মিনীন হযরত) সাফিয়্যা (রা)-এর কাছে (তাঁর পিতার হত্যা সম্পর্কে, যে খায়বারের যুদ্ধে مسلمانوں হাতে নিহত হয়েছিল) ওজর পেশ করতে থাকেন এবং বললেন : হে সাফিয়্যা! তোমার পিতাই তো সারা আরবের লোকদেরকে مسلمانوں বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য উস্কিয়ে ছিলো এবং তাদেরকে সমবেত করেছিলো। এরূপ ওজর পেশ করার দরুন তাঁর অন্তর থেকে এই দুঃখ অন্তর্হিত হয়ে যায়।
ফায়দা : উম্মুল মু'মিনীন হযরত সাফিয়্যা (রা) খায়বার অধিপতির কন্যা ছিলেন। তাঁর স্বামী ছিলো বনূ নাযীর গোত্রের বিরাট ধনী ব্যক্তি। পিতা ও স্বামী উভয়েই খায়বারের যুদ্ধে নিহত হয়েছিলো। খায়বার দুর্গ বিজিত হওয়ার পর অন্যান্য যুদ্ধবন্দীর সাথে হযরত সাফিয়্যাও বন্দী হন। তাঁর এই আভিজাত্য ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের দরুন এবং তাঁর মনোরঞ্জন ও মনস্তুষ্টির জন্য নবী-এর তাঁকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করা ছাড়া কোনো উপায় ছিলো না। তাই তিনি গনীমত বণ্টনের মাধ্যমে নবী-এর ভাগে পড়লেন এবং তিনি তাঁকে তৎক্ষণাৎ আযাদ করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলেন। কিন্তু এরপর যখনই তাঁর পিতার কথা মনে পড়তো যে, সে مسلمانوں হাতে খায়বারের যুদ্ধে নিহত হয়েছে, তখন পিতৃত্বের ভালবাসার কারণে নবী-এর কাছে সে সম্পর্কে অভিযোগ উত্থাপন করতেন। নবী তাঁর মনে ব্যথা দিতেন না এবং কোনো রকম ধমক বা তিরস্কার না করে তাঁর সামনে যুক্তিসঙ্গত ওজর পেশ করতেন। তিনি বলতেন দেখ (দোষটা তো তোমার পিতারই), তোমার পিতাই তো স্বয়ং যুদ্ধ শুরু করেছিলো। যুদ্ধ না করলে সে মারাও যেতো না। সে-ই তো সারা আরবকে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্ররোচিত করেছিলো ও উস্কিয়ে দিয়েছিলো। নবী এ ভাবে স্নেহ ও নম্রতা সহকারে তাঁকে বোঝাতেন। ফলে এক সময় তাঁর অন্তর থেকে এই ব্যথা সম্পূর্ণ দূর হয়ে যায়। তিনি আর কোনো দিন এ বিষয়ে নবী -এর নিকট কোনো অভিযোগ করেননি।
١٥٥ عَنِ الْمُهَاجِرِ بْنِ قُنْفُذِ أَنَّهُ أَتَى النَّبِيَّ ﷺ وَهُوَ يَبُولُ فَسَلَّمُ عَلَيْهِ فَلَمْ يَرُدُّ عَلَيْهِ ثُمَّ تَوَضَّا ثُمَّ اعْتذَرَ إِلَيْهِ فَقَالَ إِنِّي كَرِمْتُ أَنْ أَذْكُرَ اللَّهَ إِلَّا عَلَى طُهُرٍ -
১৫৫. হযরত মুহাজির ইন্ন কুনফুয (রা) থেকে বর্ণিত, একবার তিনি নবী-এর নিকট উপস্থিত হন এবং সালাম করেন। নবী ঐ সময় পেশাব করছিলেন। তাই তিনি সালামের জবাব দিলেন না। তারপর (পেশাব শেষ করে) তিনি ওযু করে তার কাছে ওজর পেশ করলেন। বললেন, পবিত্রতা ছাড়া আল্লাহ্ নাম নেয়া আমার কাছে ভাল মনে হয়নি।