📄 নবী (সা)-এর টুপির বর্ণনা
৩০৩. عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَلْبَسُ فَلَنْسُوَةٌ بَيْضَاءَ . ৩০৩. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ কোন কোন সময় সাদা টুপি পরিধান করতেন।
৩০৪. عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ وَعَلَيْهِ فَلَنْسُوَةٌ بَيْضَاءُ شامية - ৩০৪. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-কে শামে (সিরিয়ার) তৈরি সাদা টুপি পরিহিত অবস্থায় দেখেছি।
৩০৫. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ كَانَ يَلْبَسُ مِنَ الْقَلَانَسِ فِي السَّفَرِ ذَوَاتَ الأَذَانِ وَفِي الْحَضْرِ المُشْمَّرَةِ يَعْنِي الشَّامِيَّةَ - ৩০৫. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত যে, সফরে নবী এমন টুপি পরিধান করতেন যা দ্বারা কান ঢাকা যায় এবং বাড়িতে অবস্থানকালে শামে তৈরি (সাধারণ) টুপি পরিধান করতেন।
ফায়দা : নবী -এর অভ্যাস ছিলো সফরে ধুলাবালি ও বাতাস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কান ঢাকা যায় এবং কোন প্রকার কষ্ট না হয় এমন টুপি ব্যবহার করা।
৩০৬. عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ كَانَ لِرَسُولِ اللهِ ﷺ ثَلَاثُ قَلَانِسَ فَلَنُسُوَةٌ بَيْضَاءُ مُضَرْبَةٌ وَقَلَنْسُوَةٌ بُرْدُ حِبَرَةٌ وَقَلَنْسُوَةٌ ذَاتُ أَذَانِ يَلْبَسُهَا فِي السَّفَرِ وَرَبُّمَا وَضَعَهَا بَيْنَ يَدَيْهِ إِذَا صَلَّى - ৩০৬. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ -এর তিন প্রকার টুপি ছিলো। সাদা তুলার আস্তরণ বিশিষ্ট টুপি, ডোরাদার ইয়ামানী চাদর দ্বারা নির্মিত টুপি এবং কান ঢাকা যায় এমন টুপি যা তিনি সফরকালে পরতেন এবং কখনো কখনো সালাত পড়ার সময় সেটিকে সামনে রেখে দিতেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী তিন রকম টুপি ব্যবহার করেছেন। বর্তমানেও পবিত্র মক্কায় তুলার আস্তরণ বিশিষ্ট টুপির প্রচলন আছে এবং এখানকার মানুষ সাধারণত এই টুপি ব্যবহার করেন। নবী কখনো ইয়ামানের তৈরি ডোরাদার কাপড়ের টুপিও ব্যবহার করেছেন। তাছাড়া কান ঢাকা যায় এমন টুপিও তিনি ব্যবহার করেছেন। এ বিষয়ে এর আগের বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। শেষোক্ত ধরনের টুপি যেহেতু তিনি সফরের প্রয়োজনে ব্যবহার করতেন তাই সালাতের সময় তা খুলে সামনে রেখে দিতেন।
৩০৭. عَنْ حُزَيْزِ بْنِ عُثْمَانَ قَالَ لَقِيْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ بُسْرٍ فَقُلْتُ أَخْبَرَنِي قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ وَلَهُ فَلَنْسُوَةٌ طَوِيْلَةً وَقَلَنْسُوَةٌ لَهَا أَذْنَانِ وَقَلَنْسُوَةٌ لَاظية - ৩০৭. হুজাইয ইবন উসমান (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবদুল্লাহ্ ইব্ন বুস্র (রা)-এর সাথে দেখা হলে আমি তাঁকে হাদীস বর্ণনা করতে বললাম। তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ -এর কাছে তিন ধরনের টুপি দেখেছি। একটি লম্বা টুপি, একটি দুই কান বিশিষ্ট (কান ঢাকা যায় এমন) টুপি এবং একটি মাথার সাথে লেগে থাকা টুপি।
ফায়দা : এ হাদীসেও নবী -এর তিন প্রকারের টুপি ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। 'লম্বা টুপি' অর্থ ইয়ামানে তৈরি লম্বা ডোরাদার টুপি, সফরকালীন কান ঢাকা টুপি এবং মাথার সাথে লেপটে থাকা তুলার আস্তরণ বিশিষ্ট টুপি।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পায়জামার বর্ণনা
৩০৮. ইবন সাফওয়ান (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হিজরতের পূর্বে মক্কায় আমি রাসূলুল্লাহ্-এর খিদমতে হাযির হলাম এবং তাঁর কাছে পায়জামার এক টুকরা কাপড় বিক্রি করলাম। রাসূলুল্লাহ্ আমাকে ওযন করে তার মূল্য দিলেন এবং ওযনে বেশি দিলেন।
৩০৯. সুওয়াইদ ইব্ন কায়স (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এবং মাখরামা আল আবদী (রা) হাজার এলাকা থেকে কিছু কাপড় মক্কায় বিক্রি করার জন্য আনলে রাসূলুল্লাহ্ আমাদের কাছে এসে একটি পায়জামা খরিদ করলেন। সেখানে এক ব্যক্তি ছিলো যে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ওযন করে দিতো। তিনি তাকে বললেন, ইযি ওজন করবে তখন ওযনে বেশি করে দিবে।
ফায়দা : এ দু'টি হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী পায়জামা খরিদ করেছিলেন। তবে, এ ব্যাপারে তিনি নিজে পায়জামা পরিধান করেছেন কিনা মুহাদ্দিসগণের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। অধিকাংশ আলিমের মত হচ্ছে, তিনি নিজে পায়জামা পরিধান করেছেন তার কোন প্রমাণ নেই। তিনি সব সময় লুঙ্গি পরিধান করেছেন। তবে এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, তাঁর কাছে পায়জামা ছিলো এবং তিনি নিজে তা খরিদ করেছিলেন। কোন জিনিস সাধারণত ব্যবহার করার জন্যই খরিদ করা হয়। সুতরাং তা ব্যবহারে কোন দ্বিধা থাকা উচিত নয়, বিশেষত সাহাবায়ে কিরাম (রা) যখন পায়জামা পরিধান করেছেন এবং তিনি তা নিষেধ করেন নি।
📄 নবী (সা)-এর পশমী পোশাকের বর্ণনা
৩১০. হযরত সাহল ইব্ন সাদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর জন্য বিভিন্ন রঙের সংমিশ্রণে একটি পশমী জুব্বা তৈরি করা হলে তিনি তা পরিধান করলেন এবং ঐ পোশাকে তিনি যত খুশি হয়েছিলেন ইতিপূর্বে আর কোন পোশাকে তত খুশি হননি। তিনি জুব্বাটি হাত দিয়ে এভাবে স্পর্শ করছিলেন এবং বলছিলেন, দেখো এটা কত সুন্দর! এই সময় সেখানে উপস্থিত লোকদের মধ্যে একজন বেদুঈন ছিলো। সে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এটি আমাকে উপহার দিন। তিনি তখনই জুব্বাটি খুলে তার হাতে তুলে দিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, পরে তিনি অনুরূপ আরেকটি জুব্বা বানানোর নির্দেশ দিলেন। উক্ত জুব্বা তৈরি করার কাজ চলছিলো—এমন অবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর ওফাত হয়ে গেল।
ফায়দা : এই পশমী পোশাকটি তাঁর খুবই পছন্দ হয়েছিলো। তিনি সেটির প্রশংসাও করেছিলেন। কিন্তু বেদুঈন লোকটি সেটি তাঁর কাছে উপহার হিসাবে চেয়ে নিলে তিনি অনুরূপ আরেকটি জুব্বা তৈরির নির্দেশ দিলেন। এ হাদীস থেকে নবী ﷺ-এর বদান্যতা ও দানশীলতার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি বিনাদ্বিধায় তাঁর প্রিয় জুব্বাটি চাওয়া মাত্র বেদুঈনকে হাদিয়া হিসেবে প্রদান করলেন।
৩১১. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (কোন এক সময়) নবী ﷺ শুধুমাত্র পশমী জুব্বা পরিধান করে সালাত পড়ছিলেন। সেই সময় তাঁর পরনে কোন লুঙ্গি বা চাদর ছিলো না। প্রত্যেক বার 'রুকু' করার সময় তিনি হাত উঠিয়েছিলেন।
৩১২. হযরত উবাদা ইব্ন সামিত (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ একবার রোমে তৈরি সংকীর্ণ হাতা বিশিষ্ট পশমী জুব্বা পরে আমাদের সালাত পড়িয়েছেন।
ফায়দা : এসব হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী পশমী জুব্বা পরিধান করেছেন।
৩১৩. হযরত উরওয়া ইব্ন মুগীরা (রা) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-এর গায়ে একটি পশমী জুব্বা দেখেছি।
৩১৪. হযরত মুগীরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী-কে একটি পশমী জুব্বা পরিহিত অবস্থায় দেখেছি।
৩১৫. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ পশমী কাপড়, তালি দেওয়া জুতা ও মোটা বস্ত্র পরিধান করেছেন এবং অরুচিকর খাবার খেয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি হাসানকে জিজ্ঞেস করলাম অরুচিকর খাবার কি? তিনি বললেন, মোটা যব যা পানি ছাড়া গলাধঃকরণ করা যায় না।
ফায়দা : এই হাদীস থেকে অনুমান করা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ কত সহজ-সরল জীবন যাপন করেছেন। তিনি রাজা-বাদশাহদের মত আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসপূর্ণ জীবন যাপন করেননি। সুতরাং পশমী ও সুতী মোটা কাপড় পেলে তাই পরেছেন। তালি দেওয়া জুতা ব্যবহার করেছেন এবং অতি সাধারণ খাবার পেলে তাই খেয়েছেন। যা পেয়েছেন দ্বিধাহীন চিত্তে সহজে তাই ব্যবহার করেছেন, যদিও সামান্য ইংগিত দিলে সব কিছুর ব্যবস্থা হয়ে যেতে পারতো। তিনি উত্তম পোশাক ও উন্নতমানের সুস্বাদু খাদ্য যোগাড় করতে পারতেন। কিন্তু তিনি কখনো সেদিকে আগ্রহী হননি। তাঁর এই সাদামাটা পূত-পবিত্র জীবন মানুষের মনকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেছিলো।
৩১৬. হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী কখনো কখনো শুধু পশমী জুব্বা পরে সালাত পড়েছেন। সেটি ছাড়া তাঁর গায়ে অন্য কোন কাপড় থাকতো না।
৩১৭. আবূ আইউব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ পশমী বস্ত্র পরিধান করতেন, জুতা সেলাই করতেন, জামায় তালি লাগাতেন, গাধার পিঠে আরোহণ করতেন এবং বলতেন, যে ব্যক্তি আমার সুন্নতের প্রতি আগ্রহী নয় সে আমার (উম্মত) নয়।
৩১৮. হযরত আবু বুরদা তাঁর পিতা (আবূ মূসা আশআরী) (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ মোটা পশমী কাপড় পরিধান করতেন, গাধার পিঠে সওয়ার হতেন, বকরী দোহন করতেন এবং দুর্বল ও অসহায়দের ডাকে সাড়া দিতেন।
ফায়দা : নবী কতটা সহজ-সরল জীবন যাপন করতেন এ দু'টি হাদীস থেকেও তা জানা যায়। তিনি এমন কি পারিবারিক কাজকর্ম করতেও দ্বিধা সংকোচ অনুভব বা অপমান বোধ করতেন না। তিনি নিজের সব রকম কাজ নিজেই করতেন।
৩১৯. হযরত আায়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর জন্য একখানা কালো পশমী চাদর তৈরি করা হলে তিনি তা পরিধান করলেন এবং খুবই পছন্দ করলেন। কিন্তু ঘামে ভিজে তা থেকে পশমের গন্ধ আসছে দেখে তিনি তা পরিত্যাগ করলেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী পশমের তৈরি কালো রঙের চাদরও ব্যবহার করেছেন যা তাঁর খুব পছন্দনীয় ছিলো। তবে ঘামের গন্ধের কারণে তা বর্জন করেন। এ হাদীস থেকে তাঁর সুন্দর রুচির পরিচয় পাওয়া যায়।
📄 নবী (সা)-এর কাতান, তুলা ও ইয়ামানী পোশাক ব্যবহার করার বর্ণনা
৩২০. হাম্মাদ ইব্ন যায়দ (রা) হযরত আইউব (রা)-এর এক বন্ধুর নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন, সালত ইব্ন রাশিদ মুহাম্মদ ইব্ন সীরীনের কাছে গেলেন। সে সময় তিনি (সালত ইবন রাশেদ) পশমী জুব্বা, পশমী লুঙ্গি ও পশমী পাগড়ি পরিহিত ছিলেন। মুহাম্মাদ ইব্ন সীরীন তাঁর এই পোশাক অপছন্দ করলেন এবং বললেন, আমার ধারণা যে একদল লোক পশমী পোশাক পরিধান করে এবং বলে যে, ঈসা ইব্ন মারিয়াম (আ)-ও পশমী পোশাক পরিধান করেছেন। অথচ আমি যাকে মিথ্যা বলার সন্দেহ করতে পারি না—এমন একজন লোক আমার কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ সুতি, তুলা এবং নক্শাদার ইয়ামানী কাপড়ের পোশাক ব্যবহার করেছেন। আমাদের নবী-এর সুন্নতই অধিক অনুসরণযোগ্য।
ফায়দা : সালত ইব্ন রাশিদ (রা) যেভাবে আপাদমস্তক শুধু পশমী পোশাক পরিধান করেছিলেন তা দেখে এ ধারণা হতে পারতো যে, এটি সুন্নত পোশাক। তাই ইমাম মুহাম্মদ ইব্ন সীরীনের অপছন্দ করার অর্থ এ নয় যে, নবী কর্তৃক পশমী পোশাক পরিধান প্রমাণিত নয়। বরং এর অর্থ হচ্ছে পশমী বস্ত্র ছাড়া নবী অন্যান্য পোশাকও পরিধান করেছেন এবং সেটিই তাঁর অগ্রাধিকারযোগ্য সুন্নত। সুতরাং পশমী পোশাককে প্রতীক বানিয়ে নেয়ার অর্থ হবে এই যে, পোশাকের ব্যাপারে আমরা নবী-এর অগ্রাধিকারযোগ্য সুন্নতকে উপেক্ষা করছি। ফিকহের এই মাসয়ালাটিকে এর দৃষ্টান্ত হিসেবে পেশ করা যায় যে, সালাতে সর্বদা একই সূরা পড়া ‘মাকরূহ’। কারণ এ কাজ দ্বারা কুরআন মজীদের অন্যান্য সূরার প্রতি বেপরোয়াভাব দেখানো হয়। সুতরাং বোঝা যায় যে, নির্দিষ্ট সূরা পাঠ অপছন্দনীয় নয় এবং কুরআনের অবশিষ্টাংশ না পড়াটা মাকরূহ।