📄 নবী (সা)-এর পাগড়ির বর্ণনা
٢٩٣ عَنْ جَعْفَرِ بْنِ عَمْرِو بْنِ حُرَيْثٍ عَنْ أَبِيهِ قَالَ رَأَيْتُ النَّبِيَّ ﷺ يَخْطُبُ وَعَلَيْهِ عِمَامَةٌ سَوْدَاءُ .
২৯৩. হযরত জাফর ইন্ন আম্মর ইন্ন হুরাইস (রা) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমি নবী -কে কালো পাগড়ি বাঁধা অবস্থায় খুৎবা দিতে দেখেছি।
٢٩٤ عَنْ أَبِي الزُّبَيْرِ عَنْ جَابِرٍ دَخَلَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ مَكَّةَ عَامَ الفَتْحِ وَعَلَيْهِ عِمَامَةُ سَوْدَاءُ .
২৯৪. আবূ যুবায়র (র) জাবির (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, মক্কা বিজয়ের বছর রাসূলুল্লাহ্ মাথায় কালো পাগড়ি বেঁধে মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন।
٢٩٥ عَنْ أَنَسٍ أَنَّهُ رَأَى رَسُولَ اللهِ تَعَمَّمَ بِعِمَامَةِ سَوْدَاءَ -
২৯৫. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, তিনি রাসূলুল্লাহ্ -কে কালো পাগড়ি বাঁধতে দেখেছেন।
ফায়দা : পাগড়ি পরা সুন্নত। রাসূলুল্লাহ্ প্রায়ই পাগড়ি পরতেন। তিনি পাগড়ি পরতে উৎসাহিত করতেন। হযরত উবাদা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, একটি হাদীসে নবী বলেছেন: তোমরা পাগড়ি পরিধান করো। কারণ পাগড়ি ফেরেস্তাদের বিশেষ প্রতীক (অর্থাৎ ফেরেস্তাগণ পাগড়ি পরে থাকেন) আর পাগড়ির প্রান্তভাগকে পিঠের ওপর লটকিয়ে দাও। (মিশকাত, পৃষ্ঠা ৩৭৭)
এ অনুচ্ছেদে বর্ণিত হাদীসসমূহ থেকে জানা যায় যে নবী ওপরে বর্ণিত বিশেষ ক্ষেত্রে কালো রঙের পাগড়ি পরেছেন। তবে বেশির ভাগ সময়ে তিনি সাদা পাগড়ি পরিধান করতেন। যেহেতু রঙের মধ্যে সাদা রঙই ছিলো তাঁর কাছে সর্বাধিক প্রিয়। একটি হাদীসে নবী বলেছেন : সাদা পোশাকই তোমাদের সর্বোত্তম পোশাক। তোমাদের মৃতদেরকে সাদা কাপড়ে দাফন করো। তাই অধিকাংশ সময় তাঁর পাগড়ি হতো সাদা রঙের। কিন্তু বিশেষ কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি কালো রঙের পাগড়ি ব্যবহার করেছেন। উদাহরণস্বরূপ মক্কা বিজয় কিংবা খুৎবা ইত্যাদির সময়। ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন যে, এসব ক্ষেত্রে নবী -এর কালো পাগড়ি পরিধান ছিলো নেতৃত্বের প্রতীকস্বরূপ। আরবী ভাষায় কালো রঙকে সোয়াদ বলে। আর সোয়াদ শব্দ থেকেই সুওদ শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ নেতৃত্ব। বড় আকারের মানব সমাবেশকে আরবীতে সোয়াদ্ আযম বলা হয়। সুতরাং ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, বনু আব্বাস (রা) এই দিকটি বিবেচনা করেই কালো রঙকে নিজেদের প্রতীক বানিয়েছিল।
নবী -এর পবিত্র পাগড়ির পরিমাপ সম্পর্কে আল্লামা জাযরী (র) লিখেছেন: আমি নবী -এর পাগড়ির সঠিক পরিমাপ জানার জন্য অনুসন্ধান চালিয়েছি, যাতে কোন এক জায়গা থেকে তা জানতে পারি। কিন্তু আমি সঠিক পরিমাপ জানতে পারিনি। তবে আমার এক নির্ভরযোগ্য মুরব্বী আল্লামা নববী (র)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, নবী -এর পাগড়ি ছিলো দুই প্রকারের। ছোট এবং বড়। তাঁর ছোট পাগড়ির দৈর্ঘ ছিলো সাত হাত এবং বড় পাগড়ির দৈর্ঘ ছিলো বার হাত। (মিরকাত)
পাগড়ির বহুবিধ পার্থিব উপকারিতাও রয়েছে। যেমন সূর্যের উত্তাপ থেকে রক্ষা পাওয়া, প্রভাব ও গাম্ভীর্য বৃদ্ধি, দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া ইত্যাদি।
٢٩٦. عَنْ جَابِرٍ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ دَخَلَ يَوْمَ فَتْحِ مَكَّةَ وَعَلَيْهِ عِمَامَةٌ سَوْدَاءُ وَالغُبَارُ عَلَى كَتِفَيْهِ.
২৯৬. হযরত জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ যে সময় মক্কায় প্রবেশ করলেন তখন তাঁর মাথায় কালো পাগড়ি ছিলো এবং তাঁর দুই কাঁধের ওপর ধুলাবালি জমে ছিলো।
٢٩٧. عَنْ خَالِدٍ الْحَنَّاءِ حَدَّثَنِي أَبُو عَبْدِ السَّلَامِ قَالَ قُلْتُ لِابْنِ عُمَرَ كَيْفَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَعْتَمُ؟ قَالَ يُدِيرُ كُوْرَ العِمَامَةِ عَلَى رَأْسِهِ وَيَغْرِسُهَا مِنْ وَرَائِهِ وَيُرْخِي لَهَا نُوَابَةُ بَيْنَ كَتِفَيْهِ، قَالَ نَافِعُ وَكَانَ ابْنُ عُمَرَ يَفْعَلُ ذَلِكَ -
২৯৭. খালিদ হায্যা (র) আবূ আবদুস্ সালাম (র) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমি ইবন উমর (রা)-কে জিজ্ঞেস করলাম রাসূলুল্লাহ্ কিভাবে পাগড়ি পরতেন? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ্ পাগড়িটা মাথায় জড়াতেন এবং তার প্রান্তভাগ পেছনের দিকে ভাঁজের মধ্যবর্তী স্থানে লটকিয়ে দিতেন। নাফি' (হাদীস বর্ণনাকারী) বলেন, হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমর (রা)-ও সব সময় এভাবে পাগড়ি বাঁধতেন।
ফায়দা: এ হাদীসে নবী -এর পাগড়ি বাঁধার নিয়ম বর্ণিত হয়েছে। এটাই পাগড়ি বাঁধার সুন্নত পদ্ধতি। আলিমগণ আজ পর্যন্ত এই নিয়মেই পাগড়ি বেঁধে থাকেন।
۲۹۸. عَنْ جَعْفَرِ بْنِ مَحَمَّدٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِهِ قَالَ كَسَا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ عَلَيْمًا عِمَامَةً يُقَالُ لَهَا السَّحَابُ فَاقْبَلَ عَلِيُّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَهِيَ عَلَيْهِ فَقَالَ هُذَا عَلِيٌّ قَدْ أَقْبَلَ فِي السَّحَابِ فَحَرَّفَهَا هَؤُلَاءِ فَقَالُوْا عَلِيُّ فِي السَّحَابِ -
২৯৮. জাফর ইবন মুহাম্মদ (র) তার পিতার মাধ্যমে তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন। তাঁর দাদা বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আলী (রা)-কে সাহাব (মেঘ) নামক একটি পাগড়ি পরিয়েছিলেন। এক সময় আলী (রা) সেই পাগড়ি পরে নবী-এর কাছে আসলেন। তিনি বললেন, এই তো সাহাব (মেঘ) পরে আলী (রা) এসেছেন। কিন্তু এই সব লোক এই বিষয়টিকে বিকৃত করে বলতে শুরু করেছে যে, আলী (রা) মেঘের মধ্যে আছেন।
ফায়দা : এ হাদীসটি বর্ণনায় গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য এ কথা তুলে ধরা যে, নবী -এর কাছে 'আস্ সাহাব' (মেঘ) নামের একটি পাগড়ি ছিলো। তিনি হযরত আলী (রা)-কে সেই পাগড়িটা উপহার দিয়েছিলেন। হযরত আলী (রা) সেটি পরিধান করতেন। একদিন তিনি সেটি পরিধান করে নবী -এর দরবারে হাযির হলে তিনি বললেন, দেখো! আলী সাহাব পাগড়ি পরিধান করে আসছে। বর্ণনাকারী বলেন, হাদীসের এই কথাটা বিকৃত করে গোঁড়া শী'আরা এই বলে তাদের দাবি প্রমাণ করার প্রয়াস পেয়েছে যে, নবী বলেছেন, হযরত আলী মেঘের মধ্যে অর্থাৎ আসমানে আছেন। সুতরাং তারা বিশ্বাস করে যে, হযরত আলী (রা)-কে আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। কিছুকাল পরে তিনি এই পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। এটা যে বিকৃতি ও সত্য গোপন তা সুস্পষ্ট। নবী তো বলেছিলেন যে, আলী 'সাহাব' নামক পাগড়ি পরে আসছে।
۲۹۹. عَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ النَّبِيَّ كَانَ إِذَا اعْتَمَّ سَدَلَ عِمَامَتَهُ بَيْنَ كَتِفَيْهِ -
২৯৯. আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমর (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী পাগড়ি পরিধান করলে তাঁর শামলা (প্রান্তভাগ) দুই কাঁধের মধ্যখানে লটকিয়ে দিতেন।
٣٠٠. عَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنْ رَسُولَ اللهِ ﷺ كَانَ يَسْدِلُهَا بَيْنَ كَتِفَيْهِ -
৩০০. আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ পাগড়ির প্রান্তভাগে দুই কাঁধের মধ্যস্থানে লটকিয়ে দিতেন।
ফায়দা : রাসূলুল্লাহ্ -এর অভ্যাস ছিলো পাগড়ি বাঁধলে তিনি তার প্রান্তভাগ দুই কাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে লটকিয়ে দিতেন। এটাই উত্তম ও সুন্নত পন্থা।
٣٠١ عَنْ أَنَسٍ قَالَ رَأَيْتُ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ يَتَوَضَّاءُ وَعَلَيْهِ عِمَامَةُ قَطَرِيهُ
৩০১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদিন রাসূলুল্লাহ্-কে ওযু করতে দেখলাম। সেই সময় তিনি কাতারে তৈরি একটি পাগড়ি পরেছিলেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ কাতারে তৈরি পাগড়িও পরিধান করেছেন। قطری বলে কাতার শহরের সাথে সম্পর্কিত বোঝানো হয়েছে। সেই যুগে ঐ শহর থেকে উন্নতমানের কাপড় প্রস্তুত হয়ে আসতো।
۳۰۲. عَنْ أَنَسٍ قَالَ دَخَلَ النَّبِيُّ ﷺ يَوْمَ فَتَحِ مَكَّةَ وَعَلَيْهِ عِمَامَةٌ سَوْدَاءُ .
৩০২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন নবী কাল রঙের পাগড়ি পরিধান করে মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন।
📄 নবী (সা)-এর টুপির বর্ণনা
৩০৩. عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَلْبَسُ فَلَنْسُوَةٌ بَيْضَاءَ . ৩০৩. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ কোন কোন সময় সাদা টুপি পরিধান করতেন।
৩০৪. عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ وَعَلَيْهِ فَلَنْسُوَةٌ بَيْضَاءُ شامية - ৩০৪. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-কে শামে (সিরিয়ার) তৈরি সাদা টুপি পরিহিত অবস্থায় দেখেছি।
৩০৫. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ كَانَ يَلْبَسُ مِنَ الْقَلَانَسِ فِي السَّفَرِ ذَوَاتَ الأَذَانِ وَفِي الْحَضْرِ المُشْمَّرَةِ يَعْنِي الشَّامِيَّةَ - ৩০৫. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত যে, সফরে নবী এমন টুপি পরিধান করতেন যা দ্বারা কান ঢাকা যায় এবং বাড়িতে অবস্থানকালে শামে তৈরি (সাধারণ) টুপি পরিধান করতেন।
ফায়দা : নবী -এর অভ্যাস ছিলো সফরে ধুলাবালি ও বাতাস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কান ঢাকা যায় এবং কোন প্রকার কষ্ট না হয় এমন টুপি ব্যবহার করা।
৩০৬. عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ كَانَ لِرَسُولِ اللهِ ﷺ ثَلَاثُ قَلَانِسَ فَلَنُسُوَةٌ بَيْضَاءُ مُضَرْبَةٌ وَقَلَنْسُوَةٌ بُرْدُ حِبَرَةٌ وَقَلَنْسُوَةٌ ذَاتُ أَذَانِ يَلْبَسُهَا فِي السَّفَرِ وَرَبُّمَا وَضَعَهَا بَيْنَ يَدَيْهِ إِذَا صَلَّى - ৩০৬. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ -এর তিন প্রকার টুপি ছিলো। সাদা তুলার আস্তরণ বিশিষ্ট টুপি, ডোরাদার ইয়ামানী চাদর দ্বারা নির্মিত টুপি এবং কান ঢাকা যায় এমন টুপি যা তিনি সফরকালে পরতেন এবং কখনো কখনো সালাত পড়ার সময় সেটিকে সামনে রেখে দিতেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী তিন রকম টুপি ব্যবহার করেছেন। বর্তমানেও পবিত্র মক্কায় তুলার আস্তরণ বিশিষ্ট টুপির প্রচলন আছে এবং এখানকার মানুষ সাধারণত এই টুপি ব্যবহার করেন। নবী কখনো ইয়ামানের তৈরি ডোরাদার কাপড়ের টুপিও ব্যবহার করেছেন। তাছাড়া কান ঢাকা যায় এমন টুপিও তিনি ব্যবহার করেছেন। এ বিষয়ে এর আগের বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। শেষোক্ত ধরনের টুপি যেহেতু তিনি সফরের প্রয়োজনে ব্যবহার করতেন তাই সালাতের সময় তা খুলে সামনে রেখে দিতেন।
৩০৭. عَنْ حُزَيْزِ بْنِ عُثْمَانَ قَالَ لَقِيْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ بُسْرٍ فَقُلْتُ أَخْبَرَنِي قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ وَلَهُ فَلَنْسُوَةٌ طَوِيْلَةً وَقَلَنْسُوَةٌ لَهَا أَذْنَانِ وَقَلَنْسُوَةٌ لَاظية - ৩০৭. হুজাইয ইবন উসমান (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবদুল্লাহ্ ইব্ন বুস্র (রা)-এর সাথে দেখা হলে আমি তাঁকে হাদীস বর্ণনা করতে বললাম। তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ -এর কাছে তিন ধরনের টুপি দেখেছি। একটি লম্বা টুপি, একটি দুই কান বিশিষ্ট (কান ঢাকা যায় এমন) টুপি এবং একটি মাথার সাথে লেগে থাকা টুপি।
ফায়দা : এ হাদীসেও নবী -এর তিন প্রকারের টুপি ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। 'লম্বা টুপি' অর্থ ইয়ামানে তৈরি লম্বা ডোরাদার টুপি, সফরকালীন কান ঢাকা টুপি এবং মাথার সাথে লেপটে থাকা তুলার আস্তরণ বিশিষ্ট টুপি।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পায়জামার বর্ণনা
৩০৮. ইবন সাফওয়ান (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হিজরতের পূর্বে মক্কায় আমি রাসূলুল্লাহ্-এর খিদমতে হাযির হলাম এবং তাঁর কাছে পায়জামার এক টুকরা কাপড় বিক্রি করলাম। রাসূলুল্লাহ্ আমাকে ওযন করে তার মূল্য দিলেন এবং ওযনে বেশি দিলেন।
৩০৯. সুওয়াইদ ইব্ন কায়স (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এবং মাখরামা আল আবদী (রা) হাজার এলাকা থেকে কিছু কাপড় মক্কায় বিক্রি করার জন্য আনলে রাসূলুল্লাহ্ আমাদের কাছে এসে একটি পায়জামা খরিদ করলেন। সেখানে এক ব্যক্তি ছিলো যে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ওযন করে দিতো। তিনি তাকে বললেন, ইযি ওজন করবে তখন ওযনে বেশি করে দিবে।
ফায়দা : এ দু'টি হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী পায়জামা খরিদ করেছিলেন। তবে, এ ব্যাপারে তিনি নিজে পায়জামা পরিধান করেছেন কিনা মুহাদ্দিসগণের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। অধিকাংশ আলিমের মত হচ্ছে, তিনি নিজে পায়জামা পরিধান করেছেন তার কোন প্রমাণ নেই। তিনি সব সময় লুঙ্গি পরিধান করেছেন। তবে এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, তাঁর কাছে পায়জামা ছিলো এবং তিনি নিজে তা খরিদ করেছিলেন। কোন জিনিস সাধারণত ব্যবহার করার জন্যই খরিদ করা হয়। সুতরাং তা ব্যবহারে কোন দ্বিধা থাকা উচিত নয়, বিশেষত সাহাবায়ে কিরাম (রা) যখন পায়জামা পরিধান করেছেন এবং তিনি তা নিষেধ করেন নি।
📄 নবী (সা)-এর পশমী পোশাকের বর্ণনা
৩১০. হযরত সাহল ইব্ন সাদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর জন্য বিভিন্ন রঙের সংমিশ্রণে একটি পশমী জুব্বা তৈরি করা হলে তিনি তা পরিধান করলেন এবং ঐ পোশাকে তিনি যত খুশি হয়েছিলেন ইতিপূর্বে আর কোন পোশাকে তত খুশি হননি। তিনি জুব্বাটি হাত দিয়ে এভাবে স্পর্শ করছিলেন এবং বলছিলেন, দেখো এটা কত সুন্দর! এই সময় সেখানে উপস্থিত লোকদের মধ্যে একজন বেদুঈন ছিলো। সে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এটি আমাকে উপহার দিন। তিনি তখনই জুব্বাটি খুলে তার হাতে তুলে দিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, পরে তিনি অনুরূপ আরেকটি জুব্বা বানানোর নির্দেশ দিলেন। উক্ত জুব্বা তৈরি করার কাজ চলছিলো—এমন অবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর ওফাত হয়ে গেল।
ফায়দা : এই পশমী পোশাকটি তাঁর খুবই পছন্দ হয়েছিলো। তিনি সেটির প্রশংসাও করেছিলেন। কিন্তু বেদুঈন লোকটি সেটি তাঁর কাছে উপহার হিসাবে চেয়ে নিলে তিনি অনুরূপ আরেকটি জুব্বা তৈরির নির্দেশ দিলেন। এ হাদীস থেকে নবী ﷺ-এর বদান্যতা ও দানশীলতার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি বিনাদ্বিধায় তাঁর প্রিয় জুব্বাটি চাওয়া মাত্র বেদুঈনকে হাদিয়া হিসেবে প্রদান করলেন।
৩১১. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (কোন এক সময়) নবী ﷺ শুধুমাত্র পশমী জুব্বা পরিধান করে সালাত পড়ছিলেন। সেই সময় তাঁর পরনে কোন লুঙ্গি বা চাদর ছিলো না। প্রত্যেক বার 'রুকু' করার সময় তিনি হাত উঠিয়েছিলেন।
৩১২. হযরত উবাদা ইব্ন সামিত (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ একবার রোমে তৈরি সংকীর্ণ হাতা বিশিষ্ট পশমী জুব্বা পরে আমাদের সালাত পড়িয়েছেন।
ফায়দা : এসব হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী পশমী জুব্বা পরিধান করেছেন।
৩১৩. হযরত উরওয়া ইব্ন মুগীরা (রা) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-এর গায়ে একটি পশমী জুব্বা দেখেছি।
৩১৪. হযরত মুগীরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী-কে একটি পশমী জুব্বা পরিহিত অবস্থায় দেখেছি।
৩১৫. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ পশমী কাপড়, তালি দেওয়া জুতা ও মোটা বস্ত্র পরিধান করেছেন এবং অরুচিকর খাবার খেয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি হাসানকে জিজ্ঞেস করলাম অরুচিকর খাবার কি? তিনি বললেন, মোটা যব যা পানি ছাড়া গলাধঃকরণ করা যায় না।
ফায়দা : এই হাদীস থেকে অনুমান করা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ কত সহজ-সরল জীবন যাপন করেছেন। তিনি রাজা-বাদশাহদের মত আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসপূর্ণ জীবন যাপন করেননি। সুতরাং পশমী ও সুতী মোটা কাপড় পেলে তাই পরেছেন। তালি দেওয়া জুতা ব্যবহার করেছেন এবং অতি সাধারণ খাবার পেলে তাই খেয়েছেন। যা পেয়েছেন দ্বিধাহীন চিত্তে সহজে তাই ব্যবহার করেছেন, যদিও সামান্য ইংগিত দিলে সব কিছুর ব্যবস্থা হয়ে যেতে পারতো। তিনি উত্তম পোশাক ও উন্নতমানের সুস্বাদু খাদ্য যোগাড় করতে পারতেন। কিন্তু তিনি কখনো সেদিকে আগ্রহী হননি। তাঁর এই সাদামাটা পূত-পবিত্র জীবন মানুষের মনকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেছিলো।
৩১৬. হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী কখনো কখনো শুধু পশমী জুব্বা পরে সালাত পড়েছেন। সেটি ছাড়া তাঁর গায়ে অন্য কোন কাপড় থাকতো না।
৩১৭. আবূ আইউব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ পশমী বস্ত্র পরিধান করতেন, জুতা সেলাই করতেন, জামায় তালি লাগাতেন, গাধার পিঠে আরোহণ করতেন এবং বলতেন, যে ব্যক্তি আমার সুন্নতের প্রতি আগ্রহী নয় সে আমার (উম্মত) নয়।
৩১৮. হযরত আবু বুরদা তাঁর পিতা (আবূ মূসা আশআরী) (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ মোটা পশমী কাপড় পরিধান করতেন, গাধার পিঠে সওয়ার হতেন, বকরী দোহন করতেন এবং দুর্বল ও অসহায়দের ডাকে সাড়া দিতেন।
ফায়দা : নবী কতটা সহজ-সরল জীবন যাপন করতেন এ দু'টি হাদীস থেকেও তা জানা যায়। তিনি এমন কি পারিবারিক কাজকর্ম করতেও দ্বিধা সংকোচ অনুভব বা অপমান বোধ করতেন না। তিনি নিজের সব রকম কাজ নিজেই করতেন।
৩১৯. হযরত আায়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর জন্য একখানা কালো পশমী চাদর তৈরি করা হলে তিনি তা পরিধান করলেন এবং খুবই পছন্দ করলেন। কিন্তু ঘামে ভিজে তা থেকে পশমের গন্ধ আসছে দেখে তিনি তা পরিত্যাগ করলেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী পশমের তৈরি কালো রঙের চাদরও ব্যবহার করেছেন যা তাঁর খুব পছন্দনীয় ছিলো। তবে ঘামের গন্ধের কারণে তা বর্জন করেন। এ হাদীস থেকে তাঁর সুন্দর রুচির পরিচয় পাওয়া যায়।