📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নতুন পোশাক পরিধান করার বর্ণনা
٢٤٨ عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ أَبِي الأَسْوَدِ الْإِصْفَهَانِي قَالَ سَمِعْتُ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ يَقُولُ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ وَإِذَا اسْتَجَدَّ ثَوْبًا لَبِسَهُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ -
২৪৮. আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবুল আসওয়াদ আল ইস্ফাহানী (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত আনাস ইবন মালিক (রা)-কে বলতে শুানেছি যে, নবী ﷺ প্রথম কোনো নতুন পোশাক পরিধান করলে জুমু'আর দিনে শুরু করতেন।
ফায়দা : ইসলামে জুমু'আর দিনকে অত্যন্ত গুরুত্ব ও মর্যাদা দেয়া হয়েছে। জুমু'আর দিনটি مسلمانوں জন্য ছোট আকারের ঈদের দিন। তাই আল্লাহ্ তা'আলা জুমু'আর সালাত ঈদের সালাতের মত সম্মিলিতভাবে আদায় করা ফরয করেছেন, যাতে সমস্ত মুসলিম কোনো একটি বড় স্থানে সমবেত হয়ে জুমু'আর সালাত আদায় করে এবং পরস্পর দেখা-সাক্ষাত করতে ও একে অপরের খোঁজ-খবর নিতে পারে। বিভিন্ন হাদীসেও জুমু'আর সালাতের গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে। জুমু'আর দিন গোসল করা নতুন কিংবা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা এবং চুল কাটানো সুন্নত। জুমু'আর দিনের ইবাদত বন্দেগীর জন্যও বিরাট পুরস্কার ও সাওয়াব রয়েছে। হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জুমু'আর দিনে আল্লাহ্ তা'আলা এমন একটি সময় রেখেছেন যে, সে সময় বান্দা যে দু'আ করুক না কেন তা অবশ্যই কবুল করা হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমানে জুমু'আর গুরুত্ব একেবারেই হারিয়ে যাচ্ছে। বস্তুত দুই ঈদ ছাড়া মুসলিমদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আর কোন পর্ব বা দিন থাকলে তা হচ্ছে জুমু'আর দিন। সম্ভব হলে সেদিন নতুন পোশাক কিংবা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পবিত্র কাপড় পরিধান করা উচিত। এদিনেই অনুষ্ঠানাদি ও বিয়ে-শাদী এবং বেশি বেশি ইবাদত করা উচিত। বিশেষত নবী ﷺ-এর ওপর অনেক বেশি করে দরূদ ও সালাম পেশ করা কর্তব্য। কেননা, হাদীসে এ কাজের অনেক বেশি ফযিলত উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ্ তা'আলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথের হিদায়াত দান করুন।
٢٤٩ عَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا اسْتَجَدَّ ثَوْبًا سَمَّاهُ بِاسْمِهِ قَمِيصًا أَوْ رِدَاءً أَوْ عِمَامَةً ثُمَّ يَقُولُ اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ كَسَوْتَنِيْهِ أَسَالُكَ مِنْ خَيْرِهِ وَخَيْرِ مَا صُنِعَ لَهُ وَأَعُوذُبِكَ مِنْ شَرِّهِ وَشَرِّ مَا صُنِعَ لَهُ -
২৪৯. হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ﷺ যখনই কোনো নতুন পোশাক পরিধান করতেন তখন শোকর প্রকাশের উদ্দেশ্যে জামা, চাদর বা আমামা হিসেবে তার নামকরণ করতেন এবং পরে এই দু'আটি পড়তেন। (দু'আটির অনুবাদ ২৪৩ নং হাদীসে উল্লেখিত আছে।)
📄 নবী (সা)-এর জুব্বা মুবারক-এর বর্ণনা
٢٥٠ عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ أَنَّ النَّبِيُّ كَانَتْ لَهُ جُبَّةٌ طَيَالِسَةٌ مَكْفُوفَةً بِالدِّيبَاجِ يَلْقَى فِيْهَا الْعَدُوُّ
২৫০. হযরত আসমা বিন্ত আবূ বাক্ (রা) বর্ণনা করেন যে, নবী-এর একটি তায়ালেসানী জুব্বা। (আয়তাকার ঢিলেঢালা জামা) ছিলো যার হাতায় রেশমী ফিতা লাগানো ছিলো। এটি পরিধান করে তিনি শত্রুদের সাথে লড়াই করতে যেতেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায় শত্রুর মনে ভীতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিধান করে যুদ্ধের ময়দানে গমন সুন্নত।
٢٥١ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّ ذَا يَزِنَ أَهْدَى إِلَى النَّبِيِّ ﷺ حُلَّةً أَشْتُرِيَتْ بِثَلَاثَةٍ وَثَلاثِينَ بَعِيْرًا فَلَبِسَهَا مَرَّةً .
২৫১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন যে, (হিমইয়ারের মুসলমান বাদশাহ্) যু-ইয়াযান নবীকে এমন একটি পোশাক হাদিয়া দিলেন যা তেত্রিশটি উটের বিনিময়ে খরিদ করা হয়েছিল। নবী এ কাপড় জোড়া একবার মাত্র পরিধান করেছিলেন।
ফায়দা: যেহেতু এই পোশাক সেট ছিলো একজন বাদশাহ্ প্রেরিত এবং মূল্যবান উপহার, তাই নবী তা একবার মাত্র পরিধান করে পরিত্যাগ করেছিলেন। পুনরায় আর কখনো তা পরিধান করেননি। কারণ তিনি অতি মূল্যবান জমকালো পোশাক-পরিচ্ছদ পছন্দ করতেন না। তিনি বলেছেন: অতি মূল্যবান ও জমকালো পোশাক কেবল তারাই পরিধান করে আখিরাতে যাদের কোন অংশ নেই।
٢٥٢ . عَنْ دَحِيَّةَ الْكَلْبِى أَنَّهُ أَهْدَى إِلَى النَّبِيَّ الجُبَّةٌ مِنَ الشَّامِ وَخُفْيْنِ فَلَبِسَهُمَا النَّبِيُّ حَتَّى تَخَرَّقَا فَلَمْ يُتَبَيَّنْ أَوْ لَمْ يُعْلَمْ أَذْكِيَانِ هُمَا أَوْ مَيْتَهُ حَتَّى تَخْرِقًا -
২৫২. হযরত দিহইয়া কালবী (রা) বর্ণনা করেন যে, তিনি নবী-কে শামদেশে (সিরিয়া) তৈরি একটি জুব্বা এবং দু'টি চামড়ার মোজা উপহার দিয়েছিলেন। তিনি ঐ মোজা দু'টি এত অধিক ব্যবহার করেছিলেন যে তা জীর্ণ হয়ে ফেটে গিয়েছিলো। কিংবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) তা মৃত জন্তুর চামড়া দ্বারা প্রস্তুত ছিলো না যবেহৃত জন্তুর চামড়া দ্বারা প্রস্তুত ছিল তা জানা যায়নি। কিন্তু ব্যাপক ব্যবহারে তা ফেটে গিয়েছিলো।
ফায়দা: এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী উপহার গ্রহণ করতেন। যতক্ষণ পর্যন্ত না কাফিরদের তৈরি দ্রব্যাদির নাপাক হওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত ও অকাট্যরূপে কোন কিছু জানা যায় ততক্ষণ তা নাপাক নয়। তাই নবী তাঁকে উপহার হিসেবে প্রদত্ত মোজা মৃত জন্তুর চামড়ায় প্রস্তুত ছিলো না যবেহকৃত জন্তুর চামড়ায় প্রস্তুত ছিলো সে সম্পর্কে অনুসন্ধান করার প্রয়োজন বোধ করেননি। কারণ, পাকা করার পর মৃত জন্তুর চামড়াও পবিত্র হয়ে যায়। সুতরাং উপহার দেয়া মোজা ব্যবহার করতে করতে ছিঁড়ে গিয়েছিল। হানাফীদের মতেও যে কোন চামড়া তা মৃত কিংবা যবেহৃত জন্তুর থেকে হোক পাকানোর পর পবিত্র হয়ে যায় এবং তা ব্যবহার করা বৈধ।
٢٥٣ عَنِ الْمُغِيرَةَ بْنِ شُعْبَةَ قَالَ خَرَجَ النَّبِيُّ لِبَعْضِ حَاجَتِهِ فَأَتْبَعْتُهُ بِادَاوَةٍ مِنْ مَاءٍ فَلَمَّا قَضَى حَاجَتَهُ قُمْتُ لأُوضِنَهُ وَعَلَيْهِ جُبَّةٌ رُومِيَّةً ضَيِّقَةُ الْكُمْ فَأَخْرَجَ يَدَهُ مِنْ تَحْتِهَا وطَرَحَهَا عَاتِقِهِ ثُمَّ تَوَضَّأَ وَمَسَحَ عَلَى خُفَّيْهِ وَالْخِمَارِ ثُمَّ صَلَّى -
২৫৩. হযরত মুগীরা ইন্ন শুবা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য বাইরে গেলে আমি একটি পাত্রে পানি নিয়ে তাঁর পেছনে পেছনে গেলাম। তিনি প্রয়োজন সেরে আসলে আমি তাঁকে ওযু করানোর জন্য এগিয়ে গেলাম। সে সময় তাঁর পরিধানে ছিলো একটি রূমী জুব্বা যার হাতা ছিলো অত্যন্ত সংকীর্ণ। তাই তিনি জুব্বা থেকে হাত বের করলেন এবং জুব্বাটা কাঁধের ওপর রেখে ওযু করলেন এবং মোজা ও মাথায় বাঁধা কাপড়ের ওপর মাসেহ করে সালাত পড়লেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী অন্যান্য দেশের তৈরি পোশাকও ব্যবহার করতেন। তিনি রোমের তৈরি জুব্বা পরিধান করেছিলেন। যেহেতু তার আস্তিন ছিলো অত্যন্ত সংকীর্ণ। তাই তিনি আস্তিন ওপরে টেনে তোলেননি বরং আস্তিনের মধ্য থেকে হাত বের করে জুব্বাটিকে কাঁধের ওপর রেখে ওযু করেছেন। এখানে শুধু জুব্বা সম্পর্কে বর্ণনাই গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য। তাই তিনি এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আনুষঙ্গিকভাবে এ হাদীসে মোজা এবং মাথার কাপড়ের ওপর মাসেহ করা সম্পর্কে যে উল্লেখ রয়েছে, ফিকহ্ গ্রন্থসমূহে তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে। এখানে সে সব মাসয়ালা বর্ণনা করার অবকাশ নেই। অধিকাংশ উলামার মতে শুধু পাগড়ি কিংবা রুমালের উপর মাসেহ করা এবং মাথা আদৌ মাসেহ না করা জায়েয নয়। এতে ওযু পরিশুদ্ধ হবে না।
٢٥٤ عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَتَوَضَّهُ وَعَلَيْهِ جبَّةٌ شَامِيَةٌ ضَيِّقَةُ الْكُمَيْنِ -
২৫৪. হযরত উমর ইবন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদিন নবী -কে ওযু করতে দেখলাম। সেই সময় তিনি রোমের তৈরি সংকীর্ণ হাতাওয়ালা জুব্বা পরিধান করেছিলেন।
٢٥٥. عَنِ الْمُغِيرَةِ قَالَ كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فِي سَفَرٍ فَذَهَبَ يَحْسُرُ عَنْ ذِرَاعَيْهِ مِنْ جُبَّةٍ رُؤْمِيَةٍ فَلَمْ يَخْرُجُ ذِرَاعَيْهِ فَأَخْرَجَهُمَا مِنْ تَحْتِ الْجُبَّةِ -
২৫৫. হযরত মুগীরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক সফরে আমরা রাসূলুল্লাহ্ -এর সাথে ছিলাম। তিনি রোমের তৈরি তাঁর পরিধানের জুব্বাটির হাতা ওপরে গুটাতে শুরু করলেন। কিন্তু হাতা সংকীর্ণ হওয়ার কারণে হাত বের করতে সক্ষম হলেন না। তখন নিজের হাত জুব্বার ভেতর থেকে বের করে ফেললেন।
٢٥٦. عَنْ أَبِي حُجَيْفَةَ قَالَ خَرَجَ النَّبِيُّ ﷺ وَعَلَيْهِ حُلَّةً حَمْرَاءُ مُشَمِّرًا -
২৫৬. হযরত আবূ হুজায়ফা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার নবী বাইরে বের হলে তাঁর গায়ে লাল ডোরা বিশিষ্ট পোশাক ছিলো এবং তা তাঁর পায়ের নলা পর্যন্ত উঠানো ছিলো।
ফায়দা: এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, নবী পায়ের নলা পর্যন্ত দীর্ঘ লাল পোশাক পরিধান করেছেন। পুরুষদের নিরেট লাল রঙের কাপড় পরিধান সম্পর্কে আলিমদের মধ্যে মতানৈক্য আছে। জুব্বাটি ছিলো লাল ডোরা বিশিষ্ট যা সবার মতেই জায়েয। নবী পায়ের গোছার মধ্যভাগ পর্যন্ত উঁচু পোশাক পরতেন। এটাই সুন্নত। পায়ের গিরা পর্যন্ত লম্বা পোশাক পরিধান করাও জায়েয। এর চেয়ে অধিক লম্বা পোশাক পরিধান করা মাকরূহ, কারণ তা কাফির ও অহংকারী লোকদের প্রতীক।
٢٥٧ . عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ رَأَيْتُ النَّبِيُّ ﷺ فِي لَيْلَةِ اضْحِيَانِ وَعَلَيْهِ حَلَّةً حَمَرَاء فَجَعَلْتُ أَنْظُرُ إِلَيْهِ وَإِلَى الْقَمَرِ فَلَهُوَ أَحْسَنُ فِي عَيْنِي مِنَ الْقَمَرِ -
২৫৭. হযরত জাবির ইব্ন সামুরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক চাঁদনি রাতে রাসূলুল্লাহ্-কে লাল ডোরা বিশিষ্ট পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখেছি। (তাঁর গায়ে ঐ পোশাকটি এতই সুন্দর মনে হচ্ছিলো যে) আমি একবার নবী-এর দিকে দেখছিলাম এবং আরেকবার চাঁদের দিকে তাকাচ্ছিলাম। আমার দৃষ্টিতে পূর্ণিমার চাঁদের চেয়ে নবী-কেই অধিক সুন্দর মনে হলো।
ফায়দা: এ হাদীসটিতেও নবী-এর লাল রঙের পোশাক পরিধান করার উল্লেখ আছে। তাই গ্রন্থকার এখানে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এ হাদীসটিতে নবী -এর পোশাকের বর্ণনার চেয়ে তাঁর দেহ মুবারকের সৌন্দর্যের বর্ণনা অনেক বেশি প্রকাশ পেয়েছে। রাসূলুল্লাহ্-এর অনুপম রূপ ও অতুলনীয় সৌন্দর্য পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও অধিক ছিলো তা হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীর অতিশয়োক্তি নয়। বরং বাস্তবেও তিনি তাই ছিলেন। প্রকৃত সত্য হলো, নবী-এর অতুলনীয় রূপ ও সৌন্দর্যের সঠিক অবস্থা ভাষায় বর্ণনা করা মানবীয় ক্ষমতার বাইরে। তাছাড়া যে কোন মুসলিমের আকীদা-বিশ্বাস হলো, গোটা সৃষ্টিজগতের মধ্যে নবী-এর রূপ ও সৌন্দর্য অদ্বিতীয়, অতুলনীয়। তাই এতে সন্দেহ নেই যে, মহান আল্লাহ্ নবী-কে বাতেনী ও রূহানী নূর ও তাজাল্লীর সাথে সাথে অতুলনীয় অনুপম রূপ ও সৌন্দর্য পূর্ণাঙ্গরূপে দিয়েছিলেন। হাফিয শীরাযী (র) সত্যই বলেছেন:
হাসান ইউসুফ ইয়াদ বায়দাউ দাম ঈসা দারী + আন্চে খোবান হামে দারান্দ তু তানহা দারী -
ইউসুফ (আ)-এর সৌন্দর্য, ঈসা (আ)-এর প্রাণসঞ্চারী বিশ্বাস ও মূসা (আ)-এর বিস্ময়কর শুভ্র হাত সবগুলো গুণ আপনার একার মধ্যেই রয়েছে।
٢٥٠ عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ أَنَّ النَّبِيُّ كَانَتْ لَهُ جُبَّةٌ طَيَالِسَةٌ مَكْفُوفَةً بِالدِّيبَاجِ يَلْقَى فِيْهَا الْعَدُوُّ
২৫০. হযরত আসমা বিন্ত আবূ বাক্ (রা) বর্ণনা করেন যে, নবী-এর একটি তায়ালেসানী জুব্বা। (আয়তাকার ঢিলেঢালা জামা) ছিলো যার হাতায় রেশমী ফিতা লাগানো ছিলো। এটি পরিধান করে তিনি শত্রুদের সাথে লড়াই করতে যেতেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায় শত্রুর মনে ভীতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিধান করে যুদ্ধের ময়দানে গমন সুন্নত।
٢٥١ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّ ذَا يَزِنَ أَهْدَى إِلَى النَّبِيِّ ﷺ حُلَّةً أَشْتُرِيَتْ بِثَلَاثَةٍ وَثَلاثِينَ بَعِيْرًا فَلَبِسَهَا مَرَّةً .
২৫১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন যে, (হিমইয়ারের মুসলমান বাদশাহ্) যু-ইয়াযান নবীকে এমন একটি পোশাক হাদিয়া দিলেন যা তেত্রিশটি উটের বিনিময়ে খরিদ করা হয়েছিল। নবী এ কাপড় জোড়া একবার মাত্র পরিধান করেছিলেন।
ফায়দা: যেহেতু এই পোশাক সেট ছিলো একজন বাদশাহ্ প্রেরিত এবং মূল্যবান উপহার, তাই নবী তা একবার মাত্র পরিধান করে পরিত্যাগ করেছিলেন। পুনরায় আর কখনো তা পরিধান করেননি। কারণ তিনি অতি মূল্যবান জমকালো পোশাক-পরিচ্ছদ পছন্দ করতেন না। তিনি বলেছেন: অতি মূল্যবান ও জমকালো পোশাক কেবল তারাই পরিধান করে আখিরাতে যাদের কোন অংশ নেই।
٢٥٢ . عَنْ دَحِيَّةَ الْكَلْبِى أَنَّهُ أَهْدَى إِلَى النَّبِيَّ الجُبَّةٌ مِنَ الشَّامِ وَخُفْيْنِ فَلَبِسَهُمَا النَّبِيُّ حَتَّى تَخَرَّقَا فَلَمْ يُتَبَيَّنْ أَوْ لَمْ يُعْلَمْ أَذْكِيَانِ هُمَا أَوْ مَيْتَهُ حَتَّى تَخْرِقًا -
২৫২. হযরত দিহইয়া কালবী (রা) বর্ণনা করেন যে, তিনি নবী-কে শামদেশে (সিরিয়া) তৈরি একটি জুব্বা এবং দু'টি চামড়ার মোজা উপহার দিয়েছিলেন। তিনি ঐ মোজা দু'টি এত অধিক ব্যবহার করেছিলেন যে তা জীর্ণ হয়ে ফেটে গিয়েছিলো। কিংবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) তা মৃত জন্তুর চামড়া দ্বারা প্রস্তুত ছিলো না যবেহৃত জন্তুর চামড়া দ্বারা প্রস্তুত ছিল তা জানা যায়নি। কিন্তু ব্যাপক ব্যবহারে তা ফেটে গিয়েছিলো।
ফায়দা: এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী উপহার গ্রহণ করতেন। যতক্ষণ পর্যন্ত না কাফিরদের তৈরি দ্রব্যাদির নাপাক হওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত ও অকাট্যরূপে কোন কিছু জানা যায় ততক্ষণ তা নাপাক নয়। তাই নবী তাঁকে উপহার হিসেবে প্রদত্ত মোজা মৃত জন্তুর চামড়ায় প্রস্তুত ছিলো না যবেহকৃত জন্তুর চামড়ায় প্রস্তুত ছিলো সে সম্পর্কে অনুসন্ধান করার প্রয়োজন বোধ করেননি। কারণ, পাকা করার পর মৃত জন্তুর চামড়াও পবিত্র হয়ে যায়। সুতরাং উপহার দেয়া মোজা ব্যবহার করতে করতে ছিঁড়ে গিয়েছিল। হানাফীদের মতেও যে কোন চামড়া তা মৃত কিংবা যবেহৃত জন্তুর থেকে হোক পাকানোর পর পবিত্র হয়ে যায় এবং তা ব্যবহার করা বৈধ।
٢٥٣ عَنِ الْمُغِيرَةَ بْنِ شُعْبَةَ قَالَ خَرَجَ النَّبِيُّ لِبَعْضِ حَاجَتِهِ فَأَتْبَعْتُهُ بِادَاوَةٍ مِنْ مَاءٍ فَلَمَّا قَضَى حَاجَتَهُ قُمْتُ لأُوضِنَهُ وَعَلَيْهِ جُبَّةٌ رُومِيَّةً ضَيِّقَةُ الْكُمْ فَأَخْرَجَ يَدَهُ مِنْ تَحْتِهَا وطَرَحَهَا عَاتِقِهِ ثُمَّ تَوَضَّأَ وَمَسَحَ عَلَى خُفَّيْهِ وَالْخِمَارِ ثُمَّ صَلَّى -
২৫৩. হযরত মুগীরা ইন্ন শুবা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য বাইরে গেলে আমি একটি পাত্রে পানি নিয়ে তাঁর পেছনে পেছনে গেলাম। তিনি প্রয়োজন সেরে আসলে আমি তাঁকে ওযু করানোর জন্য এগিয়ে গেলাম। সে সময় তাঁর পরিধানে ছিলো একটি রূমী জুব্বা যার হাতা ছিলো অত্যন্ত সংকীর্ণ। তাই তিনি জুব্বা থেকে হাত বের করলেন এবং জুব্বাটা কাঁধের ওপর রেখে ওযু করলেন এবং মোজা ও মাথায় বাঁধা কাপড়ের ওপর মাসেহ করে সালাত পড়লেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী অন্যান্য দেশের তৈরি পোশাকও ব্যবহার করতেন। তিনি রোমের তৈরি জুব্বা পরিধান করেছিলেন। যেহেতু তার আস্তিন ছিলো অত্যন্ত সংকীর্ণ। তাই তিনি আস্তিন ওপরে টেনে তোলেননি বরং আস্তিনের মধ্য থেকে হাত বের করে জুব্বাটিকে কাঁধের ওপর রেখে ওযু করেছেন। এখানে শুধু জুব্বা সম্পর্কে বর্ণনাই গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য। তাই তিনি এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আনুষঙ্গিকভাবে এ হাদীসে মোজা এবং মাথার কাপড়ের ওপর মাসেহ করা সম্পর্কে যে উল্লেখ রয়েছে, ফিকহ্ গ্রন্থসমূহে তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে। এখানে সে সব মাসয়ালা বর্ণনা করার অবকাশ নেই। অধিকাংশ উলামার মতে শুধু পাগড়ি কিংবা রুমালের উপর মাসেহ করা এবং মাথা আদৌ মাসেহ না করা জায়েয নয়। এতে ওযু পরিশুদ্ধ হবে না।
٢٥٤ عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَتَوَضَّهُ وَعَلَيْهِ جبَّةٌ شَامِيَةٌ ضَيِّقَةُ الْكُمَيْنِ -
২৫৪. হযরত উমর ইবন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদিন নবী -কে ওযু করতে দেখলাম। সেই সময় তিনি রোমের তৈরি সংকীর্ণ হাতাওয়ালা জুব্বা পরিধান করেছিলেন।
٢٥٥. عَنِ الْمُغِيرَةِ قَالَ كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فِي سَفَرٍ فَذَهَبَ يَحْسُرُ عَنْ ذِرَاعَيْهِ مِنْ جُبَّةٍ رُؤْمِيَةٍ فَلَمْ يَخْرُجُ ذِرَاعَيْهِ فَأَخْرَجَهُمَا مِنْ تَحْتِ الْجُبَّةِ -
২৫৫. হযরত মুগীরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক সফরে আমরা রাসূলুল্লাহ্ -এর সাথে ছিলাম। তিনি রোমের তৈরি তাঁর পরিধানের জুব্বাটির হাতা ওপরে গুটাতে শুরু করলেন। কিন্তু হাতা সংকীর্ণ হওয়ার কারণে হাত বের করতে সক্ষম হলেন না। তখন নিজের হাত জুব্বার ভেতর থেকে বের করে ফেললেন।
٢٥٦. عَنْ أَبِي حُجَيْفَةَ قَالَ خَرَجَ النَّبِيُّ ﷺ وَعَلَيْهِ حُلَّةً حَمْرَاءُ مُشَمِّرًا -
২৫৬. হযরত আবূ হুজায়ফা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার নবী বাইরে বের হলে তাঁর গায়ে লাল ডোরা বিশিষ্ট পোশাক ছিলো এবং তা তাঁর পায়ের নলা পর্যন্ত উঠানো ছিলো।
ফায়দা: এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, নবী পায়ের নলা পর্যন্ত দীর্ঘ লাল পোশাক পরিধান করেছেন। পুরুষদের নিরেট লাল রঙের কাপড় পরিধান সম্পর্কে আলিমদের মধ্যে মতানৈক্য আছে। জুব্বাটি ছিলো লাল ডোরা বিশিষ্ট যা সবার মতেই জায়েয। নবী পায়ের গোছার মধ্যভাগ পর্যন্ত উঁচু পোশাক পরতেন। এটাই সুন্নত। পায়ের গিরা পর্যন্ত লম্বা পোশাক পরিধান করাও জায়েয। এর চেয়ে অধিক লম্বা পোশাক পরিধান করা মাকরূহ, কারণ তা কাফির ও অহংকারী লোকদের প্রতীক।
٢٥٧ . عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ رَأَيْتُ النَّبِيُّ ﷺ فِي لَيْلَةِ اضْحِيَانِ وَعَلَيْهِ حَلَّةً حَمَرَاء فَجَعَلْتُ أَنْظُرُ إِلَيْهِ وَإِلَى الْقَمَرِ فَلَهُوَ أَحْسَنُ فِي عَيْنِي مِنَ الْقَمَرِ -
২৫৭. হযরত জাবির ইব্ন সামুরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক চাঁদনি রাতে রাসূলুল্লাহ্-কে লাল ডোরা বিশিষ্ট পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখেছি। (তাঁর গায়ে ঐ পোশাকটি এতই সুন্দর মনে হচ্ছিলো যে) আমি একবার নবী-এর দিকে দেখছিলাম এবং আরেকবার চাঁদের দিকে তাকাচ্ছিলাম। আমার দৃষ্টিতে পূর্ণিমার চাঁদের চেয়ে নবী-কেই অধিক সুন্দর মনে হলো।
ফায়দা: এ হাদীসটিতেও নবী-এর লাল রঙের পোশাক পরিধান করার উল্লেখ আছে। তাই গ্রন্থকার এখানে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এ হাদীসটিতে নবী -এর পোশাকের বর্ণনার চেয়ে তাঁর দেহ মুবারকের সৌন্দর্যের বর্ণনা অনেক বেশি প্রকাশ পেয়েছে। রাসূলুল্লাহ্-এর অনুপম রূপ ও অতুলনীয় সৌন্দর্য পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও অধিক ছিলো তা হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীর অতিশয়োক্তি নয়। বরং বাস্তবেও তিনি তাই ছিলেন। প্রকৃত সত্য হলো, নবী-এর অতুলনীয় রূপ ও সৌন্দর্যের সঠিক অবস্থা ভাষায় বর্ণনা করা মানবীয় ক্ষমতার বাইরে। তাছাড়া যে কোন মুসলিমের আকীদা-বিশ্বাস হলো, গোটা সৃষ্টিজগতের মধ্যে নবী-এর রূপ ও সৌন্দর্য অদ্বিতীয়, অতুলনীয়। তাই এতে সন্দেহ নেই যে, মহান আল্লাহ্ নবী-কে বাতেনী ও রূহানী নূর ও তাজাল্লীর সাথে সাথে অতুলনীয় অনুপম রূপ ও সৌন্দর্য পূর্ণাঙ্গরূপে দিয়েছিলেন। হাফিয শীরাযী (র) সত্যই বলেছেন:
হাসান ইউসুফ ইয়াদ বায়দাউ দাম ঈসা দারী + আন্চে খোবান হামে দারান্দ তু তানহা দারী -
ইউসুফ (আ)-এর সৌন্দর্য, ঈসা (আ)-এর প্রাণসঞ্চারী বিশ্বাস ও মূসা (আ)-এর বিস্ময়কর শুভ্র হাত সবগুলো গুণ আপনার একার মধ্যেই রয়েছে।
٢٥٠ عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ أَنَّ النَّبِيُّ كَانَتْ لَهُ جُبَّةٌ طَيَالِسَةٌ مَكْفُوفَةً بِالدِّيبَاجِ يَلْقَى فِيْهَا الْعَدُوُّ
২৫০. হযরত আসমা বিন্ত আবূ বাক্ (রা) বর্ণনা করেন যে, নবী-এর একটি তায়ালেসানী জুব্বা। (আয়তাকার ঢিলেঢালা জামা) ছিলো যার হাতায় রেশমী ফিতা লাগানো ছিলো। এটি পরিধান করে তিনি শত্রুদের সাথে লড়াই করতে যেতেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায় শত্রুর মনে ভীতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিধান করে যুদ্ধের ময়দানে গমন সুন্নত।
٢٥١ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّ ذَا يَزِنَ أَهْدَى إِلَى النَّبِيِّ ﷺ حُلَّةً أَشْتُرِيَتْ بِثَلَاثَةٍ وَثَلاثِينَ بَعِيْرًا فَلَبِسَهَا مَرَّةً .
২৫১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন যে, (হিমইয়ারের মুসলমান বাদশাহ্) যু-ইয়াযান নবীকে এমন একটি পোশাক হাদিয়া দিলেন যা তেত্রিশটি উটের বিনিময়ে খরিদ করা হয়েছিল। নবী এ কাপড় জোড়া একবার মাত্র পরিধান করেছিলেন।
ফায়দা: যেহেতু এই পোশাক সেট ছিলো একজন বাদশাহ্ প্রেরিত এবং মূল্যবান উপহার, তাই নবী তা একবার মাত্র পরিধান করে পরিত্যাগ করেছিলেন। পুনরায় আর কখনো তা পরিধান করেননি। কারণ তিনি অতি মূল্যবান জমকালো পোশাক-পরিচ্ছদ পছন্দ করতেন না। তিনি বলেছেন: অতি মূল্যবান ও জমকালো পোশাক কেবল তারাই পরিধান করে আখিরাতে যাদের কোন অংশ নেই।
٢٥٢ . عَنْ دَحِيَّةَ الْكَلْبِى أَنَّهُ أَهْدَى إِلَى النَّبِيَّ الجُبَّةٌ مِنَ الشَّامِ وَخُفْيْنِ فَلَبِسَهُمَا النَّبِيُّ حَتَّى تَخَرَّقَا فَلَمْ يُتَبَيَّنْ أَوْ لَمْ يُعْلَمْ أَذْكِيَانِ هُمَا أَوْ مَيْتَهُ حَتَّى تَخْرِقًا -
২৫২. হযরত দিহইয়া কালবী (রা) বর্ণনা করেন যে, তিনি নবী-কে শামদেশে (সিরিয়া) তৈরি একটি জুব্বা এবং দু'টি চামড়ার মোজা উপহার দিয়েছিলেন। তিনি ঐ মোজা দু'টি এত অধিক ব্যবহার করেছিলেন যে তা জীর্ণ হয়ে ফেটে গিয়েছিলো। কিংবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) তা মৃত জন্তুর চামড়া দ্বারা প্রস্তুত ছিলো না যবেহৃত জন্তুর চামড়া দ্বারা প্রস্তুত ছিল তা জানা যায়নি। কিন্তু ব্যাপক ব্যবহারে তা ফেটে গিয়েছিলো।
ফায়দা: এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী উপহার গ্রহণ করতেন। যতক্ষণ পর্যন্ত না কাফিরদের তৈরি দ্রব্যাদির নাপাক হওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত ও অকাট্যরূপে কোন কিছু জানা যায় ততক্ষণ তা নাপাক নয়। তাই নবী তাঁকে উপহার হিসেবে প্রদত্ত মোজা মৃত জন্তুর চামড়ায় প্রস্তুত ছিলো না যবেহকৃত জন্তুর চামড়ায় প্রস্তুত ছিলো সে সম্পর্কে অনুসন্ধান করার প্রয়োজন বোধ করেননি। কারণ, পাকা করার পর মৃত জন্তুর চামড়াও পবিত্র হয়ে যায়। সুতরাং উপহার দেয়া মোজা ব্যবহার করতে করতে ছিঁড়ে গিয়েছিল। হানাফীদের মতেও যে কোন চামড়া তা মৃত কিংবা যবেহৃত জন্তুর থেকে হোক পাকানোর পর পবিত্র হয়ে যায় এবং তা ব্যবহার করা বৈধ।
٢٥٣ عَنِ الْمُغِيرَةَ بْنِ شُعْبَةَ قَالَ خَرَجَ النَّبِيُّ لِبَعْضِ حَاجَتِهِ فَأَتْبَعْتُهُ بِادَاوَةٍ مِنْ مَاءٍ فَلَمَّا قَضَى حَاجَتَهُ قُمْتُ لأُوضِنَهُ وَعَلَيْهِ جُبَّةٌ رُومِيَّةً ضَيِّقَةُ الْكُمْ فَأَخْرَجَ يَدَهُ مِنْ تَحْتِهَا وطَرَحَهَا عَاتِقِهِ ثُمَّ تَوَضَّأَ وَمَسَحَ عَلَى خُفَّيْهِ وَالْخِمَارِ ثُمَّ صَلَّى -
২৫৩. হযরত মুগীরা ইন্ন শুবা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য বাইরে গেলে আমি একটি পাত্রে পানি নিয়ে তাঁর পেছনে পেছনে গেলাম। তিনি প্রয়োজন সেরে আসলে আমি তাঁকে ওযু করানোর জন্য এগিয়ে গেলাম। সে সময় তাঁর পরিধানে ছিলো একটি রূমী জুব্বা যার হাতা ছিলো অত্যন্ত সংকীর্ণ। তাই তিনি জুব্বা থেকে হাত বের করলেন এবং জুব্বাটা কাঁধের ওপর রেখে ওযু করলেন এবং মোজা ও মাথায় বাঁধা কাপড়ের ওপর মাসেহ করে সালাত পড়লেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী অন্যান্য দেশের তৈরি পোশাকও ব্যবহার করতেন। তিনি রোমের তৈরি জুব্বা পরিধান করেছিলেন। যেহেতু তার আস্তিন ছিলো অত্যন্ত সংকীর্ণ। তাই তিনি আস্তিন ওপরে টেনে তোলেননি বরং আস্তিনের মধ্য থেকে হাত বের করে জুব্বাটিকে কাঁধের ওপর রেখে ওযু করেছেন। এখানে শুধু জুব্বা সম্পর্কে বর্ণনাই গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য। তাই তিনি এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আনুষঙ্গিকভাবে এ হাদীসে মোজা এবং মাথার কাপড়ের ওপর মাসেহ করা সম্পর্কে যে উল্লেখ রয়েছে, ফিকহ্ গ্রন্থসমূহে তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে। এখানে সে সব মাসয়ালা বর্ণনা করার অবকাশ নেই। অধিকাংশ উলামার মতে শুধু পাগড়ি কিংবা রুমালের উপর মাসেহ করা এবং মাথা আদৌ মাসেহ না করা জায়েয নয়। এতে ওযু পরিশুদ্ধ হবে না।
٢٥٤ عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَتَوَضَّهُ وَعَلَيْهِ جبَّةٌ شَامِيَةٌ ضَيِّقَةُ الْكُمَيْنِ -
২৫৪. হযরত উমর ইবন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদিন নবী -কে ওযু করতে দেখলাম। সেই সময় তিনি রোমের তৈরি সংকীর্ণ হাতাওয়ালা জুব্বা পরিধান করেছিলেন।
٢٥٥. عَنِ الْمُغِيرَةِ قَالَ كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فِي سَفَرٍ فَذَهَبَ يَحْسُرُ عَنْ ذِرَاعَيْهِ مِنْ جُبَّةٍ رُؤْمِيَةٍ فَلَمْ يَخْرُجُ ذِرَاعَيْهِ فَأَخْرَجَهُمَا مِنْ تَحْتِ الْجُبَّةِ -
২৫৫. হযরত মুগীরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক সফরে আমরা রাসূলুল্লাহ্ -এর সাথে ছিলাম। তিনি রোমের তৈরি তাঁর পরিধানের জুব্বাটির হাতা ওপরে গুটাতে শুরু করলেন। কিন্তু হাতা সংকীর্ণ হওয়ার কারণে হাত বের করতে সক্ষম হলেন না। তখন নিজের হাত জুব্বার ভেতর থেকে বের করে ফেললেন।
٢٥٦. عَنْ أَبِي حُجَيْفَةَ قَالَ خَرَجَ النَّبِيُّ ﷺ وَعَلَيْهِ حُلَّةً حَمْرَاءُ مُشَمِّرًا -
২৫৬. হযরত আবূ হুজায়ফা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার নবী বাইরে বের হলে তাঁর গায়ে লাল ডোরা বিশিষ্ট পোশাক ছিলো এবং তা তাঁর পায়ের নলা পর্যন্ত উঠানো ছিলো।
ফায়দা: এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, নবী পায়ের নলা পর্যন্ত দীর্ঘ লাল পোশাক পরিধান করেছেন। পুরুষদের নিরেট লাল রঙের কাপড় পরিধান সম্পর্কে আলিমদের মধ্যে মতানৈক্য আছে। জুব্বাটি ছিলো লাল ডোরা বিশিষ্ট যা সবার মতেই জায়েয। নবী পায়ের গোছার মধ্যভাগ পর্যন্ত উঁচু পোশাক পরতেন। এটাই সুন্নত। পায়ের গিরা পর্যন্ত লম্বা পোশাক পরিধান করাও জায়েয। এর চেয়ে অধিক লম্বা পোশাক পরিধান করা মাকরূহ, কারণ তা কাফির ও অহংকারী লোকদের প্রতীক।
٢٥٧ . عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ رَأَيْتُ النَّبِيُّ ﷺ فِي لَيْلَةِ اضْحِيَانِ وَعَلَيْهِ حَلَّةً حَمَرَاء فَجَعَلْتُ أَنْظُرُ إِلَيْهِ وَإِلَى الْقَمَرِ فَلَهُوَ أَحْسَنُ فِي عَيْنِي مِنَ الْقَمَرِ -
২৫৭. হযরত জাবির ইব্ন সামুরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক চাঁদনি রাতে রাসূলুল্লাহ্-কে লাল ডোরা বিশিষ্ট পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখেছি। (তাঁর গায়ে ঐ পোশাকটি এতই সুন্দর মনে হচ্ছিলো যে) আমি একবার নবী-এর দিকে দেখছিলাম এবং আরেকবার চাঁদের দিকে তাকাচ্ছিলাম। আমার দৃষ্টিতে পূর্ণিমার চাঁদের চেয়ে নবী-কেই অধিক সুন্দর মনে হলো।
ফায়দা: এ হাদীসটিতেও নবী-এর লাল রঙের পোশাক পরিধান করার উল্লেখ আছে। তাই গ্রন্থকার এখানে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এ হাদীসটিতে নবী -এর পোশাকের বর্ণনার চেয়ে তাঁর দেহ মুবারকের সৌন্দর্যের বর্ণনা অনেক বেশি প্রকাশ পেয়েছে। রাসূলুল্লাহ্-এর অনুপম রূপ ও অতুলনীয় সৌন্দর্য পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও অধিক ছিলো তা হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীর অতিশয়োক্তি নয়। বরং বাস্তবেও তিনি তাই ছিলেন। প্রকৃত সত্য হলো, নবী-এর অতুলনীয় রূপ ও সৌন্দর্যের সঠিক অবস্থা ভাষায় বর্ণনা করা মানবীয় ক্ষমতার বাইরে। তাছাড়া যে কোন মুসলিমের আকীদা-বিশ্বাস হলো, গোটা সৃষ্টিজগতের মধ্যে নবী-এর রূপ ও সৌন্দর্য অদ্বিতীয়, অতুলনীয়। তাই এতে সন্দেহ নেই যে, মহান আল্লাহ্ নবী-কে বাতেনী ও রূহানী নূর ও তাজাল্লীর সাথে সাথে অতুলনীয় অনুপম রূপ ও সৌন্দর্য পূর্ণাঙ্গরূপে দিয়েছিলেন। হাফিয শীরাযী (র) সত্যই বলেছেন:
হাসান ইউসুফ ইয়াদ বায়দাউ দাম ঈসা দারী + আন্চে খোবান হামে দারান্দ তু তানহা দারী -
ইউসুফ (আ)-এর সৌন্দর্য, ঈসা (আ)-এর প্রাণসঞ্চারী বিশ্বাস ও মূসা (আ)-এর বিস্ময়কর শুভ্র হাত সবগুলো গুণ আপনার একার মধ্যেই রয়েছে।
٢٥٠ عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ أَنَّ النَّبِيُّ كَانَتْ لَهُ جُبَّةٌ طَيَالِسَةٌ مَكْفُوفَةً بِالدِّيبَاجِ يَلْقَى فِيْهَا الْعَدُوُّ
২৫০. হযরত আসমা বিন্ত আবূ বাক্ (রা) বর্ণনা করেন যে, নবী-এর একটি তায়ালেসানী জুব্বা। (আয়তাকার ঢিলেঢালা জামা) ছিলো যার হাতায় রেশমী ফিতা লাগানো ছিলো। এটি পরিধান করে তিনি শত্রুদের সাথে লড়াই করতে যেতেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায় শত্রুর মনে ভীতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিধান করে যুদ্ধের ময়দানে গমন সুন্নত।
٢٥١ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّ ذَا يَزِنَ أَهْدَى إِلَى النَّبِيِّ ﷺ حُلَّةً أَشْتُرِيَتْ بِثَلَاثَةٍ وَثَلاثِينَ بَعِيْرًا فَلَبِسَهَا مَرَّةً .
২৫১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন যে, (হিমইয়ারের মুসলমান বাদশাহ্) যু-ইয়াযান নবীকে এমন একটি পোশাক হাদিয়া দিলেন যা তেত্রিশটি উটের বিনিময়ে খরিদ করা হয়েছিল। নবী এ কাপড় জোড়া একবার মাত্র পরিধান করেছিলেন।
ফায়দা: যেহেতু এই পোশাক সেট ছিলো একজন বাদশাহ্ প্রেরিত এবং মূল্যবান উপহার, তাই নবী তা একবার মাত্র পরিধান করে পরিত্যাগ করেছিলেন। পুনরায় আর কখনো তা পরিধান করেননি। কারণ তিনি অতি মূল্যবান জমকালো পোশাক-পরিচ্ছদ পছন্দ করতেন না। তিনি বলেছেন: অতি মূল্যবান ও জমকালো পোশাক কেবল তারাই পরিধান করে আখিরাতে যাদের কোন অংশ নেই।
٢٥٢ . عَنْ دَحِيَّةَ الْكَلْبِى أَنَّهُ أَهْدَى إِلَى النَّبِيَّ الجُبَّةٌ مِنَ الشَّامِ وَخُفْيْنِ فَلَبِسَهُمَا النَّبِيُّ حَتَّى تَخَرَّقَا فَلَمْ يُتَبَيَّنْ أَوْ لَمْ يُعْلَمْ أَذْكِيَانِ هُمَا أَوْ مَيْتَهُ حَتَّى تَخْرِقًا -
২৫২. হযরত দিহইয়া কালবী (রা) বর্ণনা করেন যে, তিনি নবী-কে শামদেশে (সিরিয়া) তৈরি একটি জুব্বা এবং দু'টি চামড়ার মোজা উপহার দিয়েছিলেন। তিনি ঐ মোজা দু'টি এত অধিক ব্যবহার করেছিলেন যে তা জীর্ণ হয়ে ফেটে গিয়েছিলো। কিংবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) তা মৃত জন্তুর চামড়া দ্বারা প্রস্তুত ছিলো না যবেহৃত জন্তুর চামড়া দ্বারা প্রস্তুত ছিল তা জানা যায়নি। কিন্তু ব্যাপক ব্যবহারে তা ফেটে গিয়েছিলো।
ফায়দা: এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী উপহার গ্রহণ করতেন। যতক্ষণ পর্যন্ত না কাফিরদের তৈরি দ্রব্যাদির নাপাক হওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত ও অকাট্যরূপে কোন কিছু জানা যায় ততক্ষণ তা নাপাক নয়। তাই নবী তাঁকে উপহার হিসেবে প্রদত্ত মোজা মৃত জন্তুর চামড়ায় প্রস্তুত ছিলো না যবেহকৃত জন্তুর চামড়ায় প্রস্তুত ছিলো সে সম্পর্কে অনুসন্ধান করার প্রয়োজন বোধ করেননি। কারণ, পাকা করার পর মৃত জন্তুর চামড়াও পবিত্র হয়ে যায়। সুতরাং উপহার দেয়া মোজা ব্যবহার করতে করতে ছিঁড়ে গিয়েছিল। হানাফীদের মতেও যে কোন চামড়া তা মৃত কিংবা যবেহৃত জন্তুর থেকে হোক পাকানোর পর পবিত্র হয়ে যায় এবং তা ব্যবহার করা বৈধ।
٢٥٣ عَنِ الْمُغِيرَةَ بْنِ شُعْبَةَ قَالَ خَرَجَ النَّبِيُّ لِبَعْضِ حَاجَتِهِ فَأَتْبَعْتُهُ بِادَاوَةٍ مِنْ مَاءٍ فَلَمَّا قَضَى حَاجَتَهُ قُمْتُ لأُوضِنَهُ وَعَلَيْهِ جُبَّةٌ رُومِيَّةً ضَيِّقَةُ الْكُمْ فَأَخْرَجَ يَدَهُ مِنْ تَحْتِهَا وطَرَحَهَا عَاتِقِهِ ثُمَّ تَوَضَّأَ وَمَسَحَ عَلَى خُفَّيْهِ وَالْخِمَارِ ثُمَّ صَلَّى -
২৫৩. হযরত মুগীরা ইন্ন শুবা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য বাইরে গেলে আমি একটি পাত্রে পানি নিয়ে তাঁর পেছনে পেছনে গেলাম। তিনি প্রয়োজন সেরে আসলে আমি তাঁকে ওযু করানোর জন্য এগিয়ে গেলাম। সে সময় তাঁর পরিধানে ছিলো একটি রূমী জুব্বা যার হাতা ছিলো অত্যন্ত সংকীর্ণ। তাই তিনি জুব্বা থেকে হাত বের করলেন এবং জুব্বাটা কাঁধের ওপর রেখে ওযু করলেন এবং মোজা ও মাথায় বাঁধা কাপড়ের ওপর মাসেহ করে সালাত পড়লেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী অন্যান্য দেশের তৈরি পোশাকও ব্যবহার করতেন। তিনি রোমের তৈরি জুব্বা পরিধান করেছিলেন। যেহেতু তার আস্তিন ছিলো অত্যন্ত সংকীর্ণ। তাই তিনি আস্তিন ওপরে টেনে তোলেননি বরং আস্তিনের মধ্য থেকে হাত বের করে জুব্বাটিকে কাঁধের ওপর রেখে ওযু করেছেন। এখানে শুধু জুব্বা সম্পর্কে বর্ণনাই গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য। তাই তিনি এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আনুষঙ্গিকভাবে এ হাদীসে মোজা এবং মাথার কাপড়ের ওপর মাসেহ করা সম্পর্কে যে উল্লেখ রয়েছে, ফিকহ্ গ্রন্থসমূহে তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে। এখানে সে সব মাসয়ালা বর্ণনা করার অবকাশ নেই। অধিকাংশ উলামার মতে শুধু পাগড়ি কিংবা রুমালের উপর মাসেহ করা এবং মাথা আদৌ মাসেহ না করা জায়েয নয়। এতে ওযু পরিশুদ্ধ হবে না।
٢٥٤ عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَتَوَضَّهُ وَعَلَيْهِ جبَّةٌ شَامِيَةٌ ضَيِّقَةُ الْكُمَيْنِ -
২৫৪. হযরত উমর ইবন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদিন নবী -কে ওযু করতে দেখলাম। সেই সময় তিনি রোমের তৈরি সংকীর্ণ হাতাওয়ালা জুব্বা পরিধান করেছিলেন।
٢٥٥. عَنِ الْمُغِيرَةِ قَالَ كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فِي سَفَرٍ فَذَهَبَ يَحْسُرُ عَنْ ذِرَاعَيْهِ مِنْ جُبَّةٍ رُؤْمِيَةٍ فَلَمْ يَخْرُجُ ذِرَاعَيْهِ فَأَخْرَجَهُمَا مِنْ تَحْتِ الْجُبَّةِ -
২৫৫. হযরত মুগীরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক সফরে আমরা রাসূলুল্লাহ্ -এর সাথে ছিলাম। তিনি রোমের তৈরি তাঁর পরিধানের জুব্বাটির হাতা ওপরে গুটাতে শুরু করলেন। কিন্তু হাতা সংকীর্ণ হওয়ার কারণে হাত বের করতে সক্ষম হলেন না। তখন নিজের হাত জুব্বার ভেতর থেকে বের করে ফেললেন।
٢٥٦. عَنْ أَبِي حُجَيْفَةَ قَالَ خَرَجَ النَّبِيُّ ﷺ وَعَلَيْهِ حُلَّةً حَمْرَاءُ مُشَمِّرًا -
২৫৬. হযরত আবূ হুজায়ফা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার নবী বাইরে বের হলে তাঁর গায়ে লাল ডোরা বিশিষ্ট পোশাক ছিলো এবং তা তাঁর পায়ের নলা পর্যন্ত উঠানো ছিলো।
ফায়দা: এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, নবী পায়ের নলা পর্যন্ত দীর্ঘ লাল পোশাক পরিধান করেছেন। পুরুষদের নিরেট লাল রঙের কাপড় পরিধান সম্পর্কে আলিমদের মধ্যে মতানৈক্য আছে। জুব্বাটি ছিলো লাল ডোরা বিশিষ্ট যা সবার মতেই জায়েয। নবী পায়ের গোছার মধ্যভাগ পর্যন্ত উঁচু পোশাক পরতেন। এটাই সুন্নত। পায়ের গিরা পর্যন্ত লম্বা পোশাক পরিধান করাও জায়েয। এর চেয়ে অধিক লম্বা পোশাক পরিধান করা মাকরূহ, কারণ তা কাফির ও অহংকারী লোকদের প্রতীক।
٢٥٧ . عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ رَأَيْتُ النَّبِيُّ ﷺ فِي لَيْلَةِ اضْحِيَانِ وَعَلَيْهِ حَلَّةً حَمَرَاء فَجَعَلْتُ أَنْظُرُ إِلَيْهِ وَإِلَى الْقَمَرِ فَلَهُوَ أَحْسَنُ فِي عَيْنِي مِنَ الْقَمَرِ -
২৫৭. হযরত জাবির ইব্ন সামুরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক চাঁদনি রাতে রাসূলুল্লাহ্-কে লাল ডোরা বিশিষ্ট পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখেছি। (তাঁর গায়ে ঐ পোশাকটি এতই সুন্দর মনে হচ্ছিলো যে) আমি একবার নবী-এর দিকে দেখছিলাম এবং আরেকবার চাঁদের দিকে তাকাচ্ছিলাম। আমার দৃষ্টিতে পূর্ণিমার চাঁদের চেয়ে নবী-কেই অধিক সুন্দর মনে হলো।
ফায়দা: এ হাদীসটিতেও নবী-এর লাল রঙের পোশাক পরিধান করার উল্লেখ আছে। তাই গ্রন্থকার এখানে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এ হাদীসটিতে নবী -এর পোশাকের বর্ণনার চেয়ে তাঁর দেহ মুবারকের সৌন্দর্যের বর্ণনা অনেক বেশি প্রকাশ পেয়েছে। রাসূলুল্লাহ্-এর অনুপম রূপ ও অতুলনীয় সৌন্দর্য পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও অধিক ছিলো তা হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীর অতিশয়োক্তি নয়। বরং বাস্তবেও তিনি তাই ছিলেন। প্রকৃত সত্য হলো, নবী-এর অতুলনীয় রূপ ও সৌন্দর্যের সঠিক অবস্থা ভাষায় বর্ণনা করা মানবীয় ক্ষমতার বাইরে। তাছাড়া যে কোন মুসলিমের আকীদা-বিশ্বাস হলো, গোটা সৃষ্টিজগতের মধ্যে নবী-এর রূপ ও সৌন্দর্য অদ্বিতীয়, অতুলনীয়। তাই এতে সন্দেহ নেই যে, মহান আল্লাহ্ নবী-কে বাতেনী ও রূহানী নূর ও তাজাল্লীর সাথে সাথে অতুলনীয় অনুপম রূপ ও সৌন্দর্য পূর্ণাঙ্গরূপে দিয়েছিলেন। হাফিয শীরাযী (র) সত্যই বলেছেন:
হাসান ইউসুফ ইয়াদ বায়দাউ দাম ঈসা দারী + আন্চে খোবান হামে দারান্দ তু তানহা দারী -
ইউসুফ (আ)-এর সৌন্দর্য, ঈসা (আ)-এর প্রাণসঞ্চারী বিশ্বাস ও মূসা (আ)-এর বিস্ময়কর শুভ্র হাত সবগুলো গুণ আপনার একার মধ্যেই রয়েছে।
📄 নবী (সা)-এর লুঙ্গি ও চাদরের বর্ণনা
٢٥٨ عَنْ أَبِي بُرْدَةَ قَالَ أَخْرَجَتْ إِلَيْنَا عَائِشَةُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا كِسَاءٌ مُلَبَّدًا وَإِزَارًا غَلِيْظًا فَقَالَتْ قُبِضَ رَسُولُ اللَّهِ فِي هَذَيْنِ -
২৫৮. হযরত আবূ বুরদা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত আয়েশা (রা) একখানা তালি লাগানো চাদর ও একখানা মোটা লুঙ্গি বের করে আমাদের দেখিয়ে বললেন, এই দু'খানা কাপড় পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ ওফাতপ্রাপ্ত হয়েছেন।
ফায়দা: এই হাদীসটিতে নবী-এর ব্যবহৃত লুঙ্গি ও চাদরের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এ থেকে জানা যায়, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত সরল-সহজ জীবন যাপন করতেন। নবী-এর যুগেই বিভিন্ন এলাকা বিজিত হতে শুরু হয়েছিলো। এই সময় তাঁর দরবারে ধনসম্পদের স্তূপ জমা হতো। কিন্তু তিনি তা অন্যদের মধ্যে বিলি-বণ্টন করে দিতেন এবং নিজে সাধারণ কিছু পরিধান করতেন। তবে কোন সময়ে বিশেষ কোন উপলক্ষে মূল্যবান পোশাকও পরতেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়, যা সাধারণত উপহার হিসেবে তাঁর কাছে আসতো। কিন্তু তিনি এসব পোশাক একবার মাত্র পরিধান করে কিংবা বিশেষ কোন উপলক্ষে পরিধান করে রেখে দিতেন। ইতোপূর্বে একটি হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইয়ামানের বাদশাহ যু-ইয়াযান তাঁকে এরূপ মূল্যবান এক সেট পোশাক পাঠালে তিনি একবার মাত্র তা পরিধান করেছিলেন পরে আর কখনো তা পরিধান করেননি। যাতে তাঁর পবিত্র জীবন গর্ব ও অহংকারের লেশমাত্র থেকে পবিত্র থাকে। তাঁর এই উত্তম আদর্শ অনুযায়ী উম্মতেরও আমল করা উচিত। তবে যে ক্ষেত্রে গর্ব ও অহংকারের আশংকা থাকবে না সেক্ষেত্রে কেবল আল্লাহ্ প্রদত্ত নিয়ামতের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর উদ্দেশ্যে মূল্যবান পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধানে কোন ক্ষতি নেই।
শরীরের নিচের অংশ ঢাকার জন্য যেসব পোশাক পরিধান করা হয় সে সব পোশাককে আরবীতে 'ইযার' বলা হয়। লুঙ্গি এবং পায়জামা দু'টিই এর অন্তর্ভুক্ত। 'রিদা (رداء) বা 'কিসা' (كساء) সে সব পোশাককে বলে যা শরীরের ওপরের অংশ ঢাকার জন্য ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের প্রতিটি সুতি বা পশমী বস্ত্রকে 'রিদা' এবং পশমী চাদর বা হাল্কা কম্বলকে 'কিসা' বলা হয়।
রাসূলুল্লাহ্ সাধারণত লুঙ্গি পরিধান করতেন। এটাই ছিলো আরবের সাধারণ পোশাক। তিনি কখনো পায়জামা পরেছেন কিনা সে বিষয়ে দ্বিমত রয়েছে। তবে তিনি যে পায়জামা খরিদ করেছিলেন তা নিশ্চিত। বিশুদ্ধ রিওয়ায়াতের মাধ্যমে প্রমাণিত, তিনি পায়জামার প্রশংসা করেছেন এই বলে যে, এর দ্বারা সতর ঢাকার কাজটি অধিক সুন্দরভাবে হয়। পরবর্তীকালে দুনিয়ার বিভিন্ন জাতির মধ্যে ইসলাম যতই ছড়িয়ে পড়েছে সাহাবা কেরাম বিজিত এলাকাসমূহে তত বেশি বসতি স্থাপন করেছেন এবং সাথে সাথে সেখানে পায়জামার প্রচলনও বৃদ্ধি পেয়েছে।
٢٥٩ . عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ ذَاتَ غَدَاةٍ إِلَى الْمَسْجِدِ وَعَلَيْهِ مِرْطٌ مُرَحِلُ مِنْ شَعَرٍ أَسْوَدَ -
২৫৯. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন সকাল বেলা রাসূলুল্লাহ্ মসজিদে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলেন। সেই সময় তাঁর গায়ে ছিলো কালো পশমের তৈরি নক্শাদার কম্বল।
ফায়দা : এ হাদীসে নবী-এর কম্বলের বর্ণনা আছে। তিনি কালো পশমের তৈরি নক্শাদার কম্বল ব্যবহার করেছেন।
٢٦٠ . عَنْ سَلَمَةَ بْنِ الْأَكْوَعِ قَالَ بَعَثَ النَّبِيُّ عُثْمَانَ بْنَ عَفَّانٍ إِلَى مَكَّةَ فَأَجَارَهُ آبَانُ بْنُ سَعِيدٍ فَقَالَ يَا ابْنَ عَمِّ أَلا أَرَاكَ مُتَخَشِعًا أَسْبِلَ كَمَا يُسْبِلُ قَوْمُكَ قَالَ هُكَذَا يَأْتَزِرُ صَاحِبُنَا إِلَى نِصْفِ سَاقَيْهِ -
২৬০. হযরত সালামা ইব্ন আকওয়া (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (হুদায়বিয়ার সন্ধির পূর্বে) নবী উসমান ইব্ন আফফান (রা)-কে মক্কায় পাঠালে আবান ইব্ন সাঈদ তাঁকে নিজের আশ্রয়ে থাকতে দিলেন এবং বললেন, হে আমার চাচাতো ভাই! তুমি এরূপ বিনম্রতা অবলম্বন করেছো কেন। তুমি তোমার পরিধেয় বস্ত্র তোমার কাওমের লোকজনের মত নিচে লটকিয়ে পরিধান করো। উসমান (রা) বললেন, আমাদের সরদার রাসূলুল্লাহ এভাবে পায়ের নলার অর্ধেক পর্যন্ত উঁচু করে লুঙ্গি পরে থাকেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী ও সমস্ত সাহাবায়ে কিরাম অহংকার থেকে দূরে থাকার জন্য লুঙ্গি ও পায়জামা পায়ের নলার অর্ধেক পর্যন্ত উঁচু করে পরতেন। এটাই ইসলামের পদ্ধতি। পক্ষান্তরে কাফির ও মুশরিকরা অহংকার ও গর্বিত ভঙ্গিতে মাটি ছোঁয়া করে লুঙ্গি পরিধান করতো। এটাই ছিলো কুফরীর প্রতীক। অহংকারী লোকেরাই আজকাল ভূমি পর্যন্ত লটকিয়ে লুঙ্গি, পায়জামা, সেলোয়ার এমনকি প্যান্ট পরাকেও মর্যাদার ব্যাপার বলে মনে করে। অপরদিকে নেক্কার পরহেযগার ও দীনদার মুসলমানরা পায়জামা পায়ের গিরার ওপরে পরিধান করে থাকেন। সালাতের অবস্থায় পায়ের গিরার নিচে লুঙ্গি অথবা পায়জামা পরিধান মাকরূহ তাহরীমী।
٢٦١ عَنِ الْأَشْعَثِ بْنِ سُلَيْمٍ قَالَ سَمِعْتُ عَمَّتِي تَحَدِّثُ عَنْ عَمِّهَا أَنَّهُ رَأَى إِذَارِ رَسُولِ اللهِ أَسْفَلَ إِلَى نِصْفِ السَّاقِ -
২৬১. হযরত আশআস ইব্ন সুলাইম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার ফুফুকে তাঁর চাচার নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করতে শুনেছি। তাঁর চাচা দেখেছেন, রাসূলুল্লাহ্-এর পরনের লুঙ্গি তাঁর পায়ের নলার অর্ধেক নিচে পর্যন্ত ঝুলে ছিলো।
٢٦٢ عَنْ عُبَيْدَةَ قَالَ قَدِمْتُ الْمَدِينَةَ فَرَأَيْتُ إِزَارَ رَسُولِ اللَّهِ وَ أَسْفَلَ مِنْ عَضَلَةِ السَّاقِ -
২৬২. হযরত উবায়দা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মদীনায় এসে দেখলাম, রাসূলুল্লাহ্-এর পরনের লুঙ্গি তাঁর পায়ের গোছার নিচে পর্যন্ত নামানো।
٢٦٣ . عَنْ جَابِرٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ وَاللَّهِ إِذَا أَتْزَرَ يَضَعُ صَنَفَةً إِزَارِهِ عَلَى فَحْدِهِ الْيُسْرى -
২৬৩. হয়রত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ লুঙ্গি পরিধান করলে লুঙ্গির প্রান্তের অর্ধাংশ তাঁর বাম উরুর ওপর রাখতেন (যাতে চলার সময় খুলে না যায়)।
٢٦٤. عَنْ أَبِي الْعَالِيَةِ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ كَانَ إِزَارَهُ إِلَى نِصْفِ سَاقَيْهِ وَكَانَ لَهُ إِزَارَ قَدْ أَسْبَلَ خُيُوطَةٌ فَلَمْ يَجْزَهُ وَلَمْ يَكْفُهُ .
২৬৪. আবুল আলীয়া (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্-এর লুঙ্গি পায়ের নলার অর্ধাংশ পর্যন্ত থাকতো। তাছাড়া তাঁর একটি লুঙ্গির সুতা ঝুলে ছিল। তিনি সেগুলি কেটেও ফেলেন নি কিংবা সেলাই করে আটকিয়েও দেননি।
٢٦٥. أَخْبَرَنَا عِكْرِمَةٌ قَالَ رَأَيْتُ ابْنَ عَّبَّاسٍ يَا تَزِرُ فَيَضَعُ حَاشِيَةَ إِزَارِهِ مِنْ مُقَدَّمِهِ عَلَى ظَهْرِ قَدَمِهِ وَيَرْفَعُ مُؤَخَّرُهُ فَقُلْتُ مَا هَذِهِ الْإِزَارَةُ ؟ فَقَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَا تَزِرُهَا -
২৬৫. ইকরিমা (র) বর্ণনা করেন: আমি আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা)-কে দেখেছি তিনি লুঙ্গির সম্মুখ ও প্রান্তভাগ পায়ের উপর ঝুলিয়ে পরতেন এবং পেছনের অংশ উঁচু রাখতেন। আমি তাঁকে বললাম, এটা লুঙ্গি পরিধানের কোন্ নিয়ম? তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-কে এভাবেই লুঙ্গি পরিধান করতে দেখেছি।
ফায়দা : সাহাবায়ে কিরাম (রা) রাসূলুল্লাহ্-কে যেভাবে কাজকর্ম করতে দেখতেন নিজেরাও সেভাবেই তা করার অভ্যাস গড়ে তুলতেন। সুতরাং ইব্ন আব্বাস (রা) শেষ বয়সে নবী-এর শরীর মুবারক কিছুটা মোটা হয়ে যাওয়ার পর তাঁকে যেভাবে লুঙ্গি পরতে দেখেছেন তিনিও তা অনুসরণের জন্য সেভাবেই পরতে শুরু করেছিলেন এবং ইকরিমার প্রশ্নের জবাবে বলেছেন যে, আমি যেহেতু নবী-কে এভাবে লুঙ্গি পরতে দেখেছি তাই আমিও সেভাবেই পরে থাকি। সত্যিই প্রকৃত ভালবাসা ও ভালবাসার পাত্রের সাথে সম্পর্কের দাবি হলো, যিনি ভালবাসবেন তিনি প্রেমাস্পদের প্রতিটি ভঙ্গিকে আত্মস্থ করে নিবেন। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে এ আগ্রহ পূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিল। এ ব্যাপারে তাঁরা নিজেরাই ছিলেন উদাহরণ। মহান আল্লাহ্ সমস্ত মুসলিমকে তাঁর হাবীবের পূর্ণাঙ্গ আনুগত্যের তাওফীক দান করুন।
٢٦٦ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ أَبِي يَحْيِي مِثْلُهُ -
২৬৬. মুহাম্মদ ইব্ন আবু ইয়াহ্ইয়াও উপরে বর্ণিত হাদীসের অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন।
٢٦٧. عَنِ الْهُجَيْمِي أَنَّهُ لَقِي رَسُولَ اللهِ ﷺ فَإِذَا هُوَ مُتَّزِرُ بِإِزَارٍ قُطْنٍ قَدْ انْتَثَرَتْ حَاشِيَتُهُ .
২৬৭. হযরত হুজায়মী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি একবার রাসূলুল্লাহ্ -এর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। সেই সময় তিনি এমন একখানা সুতি লুঙ্গি পরিহিত ছিলেন, যার প্রান্তভাগ ছিল এলোমেলো।
٢٦٨. عَنِ الْحَسَنِ الْبَصْرِى أَنَّ شَيْخًا مِنْ بَنِي سَلِيْطَ أَخْبَرَهُ قَالَ أَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ أَكَلِّمُهُ فِي شَيْءٍ أُصِيْبَ لَنَا فِي الْجَاهِلِيَّةِ - فَإِذَا هُوَ قَاعِدُ وَعَلَيْهِ حَلْقَةُ قَدْ أَطَافَتْ بِهِ وَهُوَ يُحَدِّثُ الْقَوْمَ وَعَلَيْهِ إِزَارُ قُطْنٍ لَهُ غَلِيْظٍ -
২৬৮. হাসান বসরী (র) থেকে বর্ণিত, (তিনি বলেন) বনী সালীত গোত্রের এক সম্মানিত ব্যক্তি আমাকে বলেন যে, আমি জাহেলী যুগে একটি বিষয়ে কথা বলার জন্য নবী -এর কাছে গেলাম। তিনি সে সময় উপবিষ্ট ছিলেন। তাঁর চারপাশে মানুষ বৃত্তাকারে বসেছিলো এবং তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে কথা বলছিলেন। সেই সময় তিনি একখানা মোটা সুতি লুঙ্গি পরেছিলেন।
ফায়দা: এ দু'টি হাদীস থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ খুব মোটা সুতি লুঙ্গিও পরিধান করেছেন।
٢٦٩. عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ أَخَذَ رَسُولُ اللهِ ﷺ كِسَاءً فَدَكِيًّا فَأَدَارَهُ عَلَيْهِمْ ثُمَّ قَالَ هُؤُلَاءِ أَهْلُ بَيْتِي وَحَامَتِي -
২৬৯. হযরত উম্মে সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ফাদাকে তৈরি একটি চাদর নিলেন এবং তার মধ্যে আহলে বায়তদেরকে নিয়ে বললেন, এরাই হচ্ছে আমার আহলে বায়ত এবং আমার পরিবার।
ফায়দা: এ হাদীসটিতেও যেহেতু রাসূলুল্লাহ্-এর চাদরের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, তাই সেই সূত্র ধরে গ্রন্থকার হাদীসটি এখানে উল্লেখ করেছেন। নবী -এর আহলে বায়তদেরকে চাদরের মধ্যে নেয়া সম্পর্কিত ঘটনা সবিস্তার জানার জন্য তাফসীর গ্রন্থ সমূহে সূরা আহযাবের يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ الْآيَةُ আয়াতটির ব্যাখ্যা দেখা যেতে পারে।
٢٥٨ عَنْ أَبِي بُرْدَةَ قَالَ أَخْرَجَتْ إِلَيْنَا عَائِشَةُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا كِسَاءٌ مُلَبَّدًا وَإِزَارًا غَلِيْظًا فَقَالَتْ قُبِضَ رَسُولُ اللَّهِ فِي هَذَيْنِ -
২৫৮. হযরত আবূ বুরদা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত আয়েশা (রা) একখানা তালি লাগানো চাদর ও একখানা মোটা লুঙ্গি বের করে আমাদের দেখিয়ে বললেন, এই দু'খানা কাপড় পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ ওফাতপ্রাপ্ত হয়েছেন।
ফায়দা: এই হাদীসটিতে নবী-এর ব্যবহৃত লুঙ্গি ও চাদরের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এ থেকে জানা যায়, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত সরল-সহজ জীবন যাপন করতেন। নবী-এর যুগেই বিভিন্ন এলাকা বিজিত হতে শুরু হয়েছিলো। এই সময় তাঁর দরবারে ধনসম্পদের স্তূপ জমা হতো। কিন্তু তিনি তা অন্যদের মধ্যে বিলি-বণ্টন করে দিতেন এবং নিজে সাধারণ কিছু পরিধান করতেন। তবে কোন সময়ে বিশেষ কোন উপলক্ষে মূল্যবান পোশাকও পরতেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়, যা সাধারণত উপহার হিসেবে তাঁর কাছে আসতো। কিন্তু তিনি এসব পোশাক একবার মাত্র পরিধান করে কিংবা বিশেষ কোন উপলক্ষে পরিধান করে রেখে দিতেন। ইতোপূর্বে একটি হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইয়ামানের বাদশাহ যু-ইয়াযান তাঁকে এরূপ মূল্যবান এক সেট পোশাক পাঠালে তিনি একবার মাত্র তা পরিধান করেছিলেন পরে আর কখনো তা পরিধান করেননি। যাতে তাঁর পবিত্র জীবন গর্ব ও অহংকারের লেশমাত্র থেকে পবিত্র থাকে। তাঁর এই উত্তম আদর্শ অনুযায়ী উম্মতেরও আমল করা উচিত। তবে যে ক্ষেত্রে গর্ব ও অহংকারের আশংকা থাকবে না সেক্ষেত্রে কেবল আল্লাহ্ প্রদত্ত নিয়ামতের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর উদ্দেশ্যে মূল্যবান পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধানে কোন ক্ষতি নেই।
শরীরের নিচের অংশ ঢাকার জন্য যেসব পোশাক পরিধান করা হয় সে সব পোশাককে আরবীতে 'ইযার' বলা হয়। লুঙ্গি এবং পায়জামা দু'টিই এর অন্তর্ভুক্ত। 'রিদা (رداء) বা 'কিসা' (كساء) সে সব পোশাককে বলে যা শরীরের ওপরের অংশ ঢাকার জন্য ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের প্রতিটি সুতি বা পশমী বস্ত্রকে 'রিদা' এবং পশমী চাদর বা হাল্কা কম্বলকে 'কিসা' বলা হয়।
রাসূলুল্লাহ্ সাধারণত লুঙ্গি পরিধান করতেন। এটাই ছিলো আরবের সাধারণ পোশাক। তিনি কখনো পায়জামা পরেছেন কিনা সে বিষয়ে দ্বিমত রয়েছে। তবে তিনি যে পায়জামা খরিদ করেছিলেন তা নিশ্চিত। বিশুদ্ধ রিওয়ায়াতের মাধ্যমে প্রমাণিত, তিনি পায়জামার প্রশংসা করেছেন এই বলে যে, এর দ্বারা সতর ঢাকার কাজটি অধিক সুন্দরভাবে হয়। পরবর্তীকালে দুনিয়ার বিভিন্ন জাতির মধ্যে ইসলাম যতই ছড়িয়ে পড়েছে সাহাবা কেরাম বিজিত এলাকাসমূহে তত বেশি বসতি স্থাপন করেছেন এবং সাথে সাথে সেখানে পায়জামার প্রচলনও বৃদ্ধি পেয়েছে।
٢٥٩ . عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ ذَاتَ غَدَاةٍ إِلَى الْمَسْجِدِ وَعَلَيْهِ مِرْطٌ مُرَحِلُ مِنْ شَعَرٍ أَسْوَدَ -
২৫৯. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন সকাল বেলা রাসূলুল্লাহ্ মসজিদে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলেন। সেই সময় তাঁর গায়ে ছিলো কালো পশমের তৈরি নক্শাদার কম্বল।
ফায়দা : এ হাদীসে নবী-এর কম্বলের বর্ণনা আছে। তিনি কালো পশমের তৈরি নক্শাদার কম্বল ব্যবহার করেছেন।
٢٦٠ . عَنْ سَلَمَةَ بْنِ الْأَكْوَعِ قَالَ بَعَثَ النَّبِيُّ عُثْمَانَ بْنَ عَفَّانٍ إِلَى مَكَّةَ فَأَجَارَهُ آبَانُ بْنُ سَعِيدٍ فَقَالَ يَا ابْنَ عَمِّ أَلا أَرَاكَ مُتَخَشِعًا أَسْبِلَ كَمَا يُسْبِلُ قَوْمُكَ قَالَ هُكَذَا يَأْتَزِرُ صَاحِبُنَا إِلَى نِصْفِ سَاقَيْهِ -
২৬০. হযরত সালামা ইব্ন আকওয়া (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (হুদায়বিয়ার সন্ধির পূর্বে) নবী উসমান ইব্ন আফফান (রা)-কে মক্কায় পাঠালে আবান ইব্ন সাঈদ তাঁকে নিজের আশ্রয়ে থাকতে দিলেন এবং বললেন, হে আমার চাচাতো ভাই! তুমি এরূপ বিনম্রতা অবলম্বন করেছো কেন। তুমি তোমার পরিধেয় বস্ত্র তোমার কাওমের লোকজনের মত নিচে লটকিয়ে পরিধান করো। উসমান (রা) বললেন, আমাদের সরদার রাসূলুল্লাহ এভাবে পায়ের নলার অর্ধেক পর্যন্ত উঁচু করে লুঙ্গি পরে থাকেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী ও সমস্ত সাহাবায়ে কিরাম অহংকার থেকে দূরে থাকার জন্য লুঙ্গি ও পায়জামা পায়ের নলার অর্ধেক পর্যন্ত উঁচু করে পরতেন। এটাই ইসলামের পদ্ধতি। পক্ষান্তরে কাফির ও মুশরিকরা অহংকার ও গর্বিত ভঙ্গিতে মাটি ছোঁয়া করে লুঙ্গি পরিধান করতো। এটাই ছিলো কুফরীর প্রতীক। অহংকারী লোকেরাই আজকাল ভূমি পর্যন্ত লটকিয়ে লুঙ্গি, পায়জামা, সেলোয়ার এমনকি প্যান্ট পরাকেও মর্যাদার ব্যাপার বলে মনে করে। অপরদিকে নেক্কার পরহেযগার ও দীনদার মুসলমানরা পায়জামা পায়ের গিরার ওপরে পরিধান করে থাকেন। সালাতের অবস্থায় পায়ের গিরার নিচে লুঙ্গি অথবা পায়জামা পরিধান মাকরূহ তাহরীমী।
٢٦١ عَنِ الْأَشْعَثِ بْنِ سُلَيْمٍ قَالَ سَمِعْتُ عَمَّتِي تَحَدِّثُ عَنْ عَمِّهَا أَنَّهُ رَأَى إِذَارِ رَسُولِ اللهِ أَسْفَلَ إِلَى نِصْفِ السَّاقِ -
২৬১. হযরত আশআস ইব্ন সুলাইম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার ফুফুকে তাঁর চাচার নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করতে শুনেছি। তাঁর চাচা দেখেছেন, রাসূলুল্লাহ্-এর পরনের লুঙ্গি তাঁর পায়ের নলার অর্ধেক নিচে পর্যন্ত ঝুলে ছিলো।
٢٦٢ عَنْ عُبَيْدَةَ قَالَ قَدِمْتُ الْمَدِينَةَ فَرَأَيْتُ إِزَارَ رَسُولِ اللَّهِ وَ أَسْفَلَ مِنْ عَضَلَةِ السَّاقِ -
২৬২. হযরত উবায়দা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মদীনায় এসে দেখলাম, রাসূলুল্লাহ্-এর পরনের লুঙ্গি তাঁর পায়ের গোছার নিচে পর্যন্ত নামানো।
٢٦٣ . عَنْ جَابِرٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ وَاللَّهِ إِذَا أَتْزَرَ يَضَعُ صَنَفَةً إِزَارِهِ عَلَى فَحْدِهِ الْيُسْرى -
২৬৩. হয়রত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ লুঙ্গি পরিধান করলে লুঙ্গির প্রান্তের অর্ধাংশ তাঁর বাম উরুর ওপর রাখতেন (যাতে চলার সময় খুলে না যায়)।
٢٦٤. عَنْ أَبِي الْعَالِيَةِ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ كَانَ إِزَارَهُ إِلَى نِصْفِ سَاقَيْهِ وَكَانَ لَهُ إِزَارَ قَدْ أَسْبَلَ خُيُوطَةٌ فَلَمْ يَجْزَهُ وَلَمْ يَكْفُهُ .
২৬৪. আবুল আলীয়া (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্-এর লুঙ্গি পায়ের নলার অর্ধাংশ পর্যন্ত থাকতো। তাছাড়া তাঁর একটি লুঙ্গির সুতা ঝুলে ছিল। তিনি সেগুলি কেটেও ফেলেন নি কিংবা সেলাই করে আটকিয়েও দেননি।
٢٦٥. أَخْبَرَنَا عِكْرِمَةٌ قَالَ رَأَيْتُ ابْنَ عَّبَّاسٍ يَا تَزِرُ فَيَضَعُ حَاشِيَةَ إِزَارِهِ مِنْ مُقَدَّمِهِ عَلَى ظَهْرِ قَدَمِهِ وَيَرْفَعُ مُؤَخَّرُهُ فَقُلْتُ مَا هَذِهِ الْإِزَارَةُ ؟ فَقَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَا تَزِرُهَا -
২৬৫. ইকরিমা (র) বর্ণনা করেন: আমি আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা)-কে দেখেছি তিনি লুঙ্গির সম্মুখ ও প্রান্তভাগ পায়ের উপর ঝুলিয়ে পরতেন এবং পেছনের অংশ উঁচু রাখতেন। আমি তাঁকে বললাম, এটা লুঙ্গি পরিধানের কোন্ নিয়ম? তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-কে এভাবেই লুঙ্গি পরিধান করতে দেখেছি।
ফায়দা : সাহাবায়ে কিরাম (রা) রাসূলুল্লাহ্-কে যেভাবে কাজকর্ম করতে দেখতেন নিজেরাও সেভাবেই তা করার অভ্যাস গড়ে তুলতেন। সুতরাং ইব্ন আব্বাস (রা) শেষ বয়সে নবী-এর শরীর মুবারক কিছুটা মোটা হয়ে যাওয়ার পর তাঁকে যেভাবে লুঙ্গি পরতে দেখেছেন তিনিও তা অনুসরণের জন্য সেভাবেই পরতে শুরু করেছিলেন এবং ইকরিমার প্রশ্নের জবাবে বলেছেন যে, আমি যেহেতু নবী-কে এভাবে লুঙ্গি পরতে দেখেছি তাই আমিও সেভাবেই পরে থাকি। সত্যিই প্রকৃত ভালবাসা ও ভালবাসার পাত্রের সাথে সম্পর্কের দাবি হলো, যিনি ভালবাসবেন তিনি প্রেমাস্পদের প্রতিটি ভঙ্গিকে আত্মস্থ করে নিবেন। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে এ আগ্রহ পূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিল। এ ব্যাপারে তাঁরা নিজেরাই ছিলেন উদাহরণ। মহান আল্লাহ্ সমস্ত মুসলিমকে তাঁর হাবীবের পূর্ণাঙ্গ আনুগত্যের তাওফীক দান করুন।
٢٦٦ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ أَبِي يَحْيِي مِثْلُهُ -
২৬৬. মুহাম্মদ ইব্ন আবু ইয়াহ্ইয়াও উপরে বর্ণিত হাদীসের অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন।
٢٦٧. عَنِ الْهُجَيْمِي أَنَّهُ لَقِي رَسُولَ اللهِ ﷺ فَإِذَا هُوَ مُتَّزِرُ بِإِزَارٍ قُطْنٍ قَدْ انْتَثَرَتْ حَاشِيَتُهُ .
২৬৭. হযরত হুজায়মী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি একবার রাসূলুল্লাহ্ -এর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। সেই সময় তিনি এমন একখানা সুতি লুঙ্গি পরিহিত ছিলেন, যার প্রান্তভাগ ছিল এলোমেলো।
٢٦٨. عَنِ الْحَسَنِ الْبَصْرِى أَنَّ شَيْخًا مِنْ بَنِي سَلِيْطَ أَخْبَرَهُ قَالَ أَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ أَكَلِّمُهُ فِي شَيْءٍ أُصِيْبَ لَنَا فِي الْجَاهِلِيَّةِ - فَإِذَا هُوَ قَاعِدُ وَعَلَيْهِ حَلْقَةُ قَدْ أَطَافَتْ بِهِ وَهُوَ يُحَدِّثُ الْقَوْمَ وَعَلَيْهِ إِزَارُ قُطْنٍ لَهُ غَلِيْظٍ -
২৬৮. হাসান বসরী (র) থেকে বর্ণিত, (তিনি বলেন) বনী সালীত গোত্রের এক সম্মানিত ব্যক্তি আমাকে বলেন যে, আমি জাহেলী যুগে একটি বিষয়ে কথা বলার জন্য নবী -এর কাছে গেলাম। তিনি সে সময় উপবিষ্ট ছিলেন। তাঁর চারপাশে মানুষ বৃত্তাকারে বসেছিলো এবং তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে কথা বলছিলেন। সেই সময় তিনি একখানা মোটা সুতি লুঙ্গি পরেছিলেন।
ফায়দা: এ দু'টি হাদীস থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ খুব মোটা সুতি লুঙ্গিও পরিধান করেছেন।
٢٦٩. عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ أَخَذَ رَسُولُ اللهِ ﷺ كِسَاءً فَدَكِيًّا فَأَدَارَهُ عَلَيْهِمْ ثُمَّ قَالَ هُؤُلَاءِ أَهْلُ بَيْتِي وَحَامَتِي -
২৬৯. হযরত উম্মে সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ফাদাকে তৈরি একটি চাদর নিলেন এবং তার মধ্যে আহলে বায়তদেরকে নিয়ে বললেন, এরাই হচ্ছে আমার আহলে বায়ত এবং আমার পরিবার।
ফায়দা: এ হাদীসটিতেও যেহেতু রাসূলুল্লাহ্-এর চাদরের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, তাই সেই সূত্র ধরে গ্রন্থকার হাদীসটি এখানে উল্লেখ করেছেন। নবী -এর আহলে বায়তদেরকে চাদরের মধ্যে নেয়া সম্পর্কিত ঘটনা সবিস্তার জানার জন্য তাফসীর গ্রন্থ সমূহে সূরা আহযাবের يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ الْآيَةُ আয়াতটির ব্যাখ্যা দেখা যেতে পারে।
٢٥٨ عَنْ أَبِي بُرْدَةَ قَالَ أَخْرَجَتْ إِلَيْنَا عَائِشَةُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا كِسَاءٌ مُلَبَّدًا وَإِزَارًا غَلِيْظًا فَقَالَتْ قُبِضَ رَسُولُ اللَّهِ فِي هَذَيْنِ -
২৫৮. হযরত আবূ বুরদা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত আয়েশা (রা) একখানা তালি লাগানো চাদর ও একখানা মোটা লুঙ্গি বের করে আমাদের দেখিয়ে বললেন, এই দু'খানা কাপড় পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ ওফাতপ্রাপ্ত হয়েছেন।
ফায়দা: এই হাদীসটিতে নবী-এর ব্যবহৃত লুঙ্গি ও চাদরের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এ থেকে জানা যায়, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত সরল-সহজ জীবন যাপন করতেন। নবী-এর যুগেই বিভিন্ন এলাকা বিজিত হতে শুরু হয়েছিলো। এই সময় তাঁর দরবারে ধনসম্পদের স্তূপ জমা হতো। কিন্তু তিনি তা অন্যদের মধ্যে বিলি-বণ্টন করে দিতেন এবং নিজে সাধারণ কিছু পরিধান করতেন। তবে কোন সময়ে বিশেষ কোন উপলক্ষে মূল্যবান পোশাকও পরতেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়, যা সাধারণত উপহার হিসেবে তাঁর কাছে আসতো। কিন্তু তিনি এসব পোশাক একবার মাত্র পরিধান করে কিংবা বিশেষ কোন উপলক্ষে পরিধান করে রেখে দিতেন। ইতোপূর্বে একটি হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইয়ামানের বাদশাহ যু-ইয়াযান তাঁকে এরূপ মূল্যবান এক সেট পোশাক পাঠালে তিনি একবার মাত্র তা পরিধান করেছিলেন পরে আর কখনো তা পরিধান করেননি। যাতে তাঁর পবিত্র জীবন গর্ব ও অহংকারের লেশমাত্র থেকে পবিত্র থাকে। তাঁর এই উত্তম আদর্শ অনুযায়ী উম্মতেরও আমল করা উচিত। তবে যে ক্ষেত্রে গর্ব ও অহংকারের আশংকা থাকবে না সেক্ষেত্রে কেবল আল্লাহ্ প্রদত্ত নিয়ামতের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর উদ্দেশ্যে মূল্যবান পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধানে কোন ক্ষতি নেই।
শরীরের নিচের অংশ ঢাকার জন্য যেসব পোশাক পরিধান করা হয় সে সব পোশাককে আরবীতে 'ইযার' বলা হয়। লুঙ্গি এবং পায়জামা দু'টিই এর অন্তর্ভুক্ত। 'রিদা (رداء) বা 'কিসা' (كساء) সে সব পোশাককে বলে যা শরীরের ওপরের অংশ ঢাকার জন্য ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের প্রতিটি সুতি বা পশমী বস্ত্রকে 'রিদা' এবং পশমী চাদর বা হাল্কা কম্বলকে 'কিসা' বলা হয়।
রাসূলুল্লাহ্ সাধারণত লুঙ্গি পরিধান করতেন। এটাই ছিলো আরবের সাধারণ পোশাক। তিনি কখনো পায়জামা পরেছেন কিনা সে বিষয়ে দ্বিমত রয়েছে। তবে তিনি যে পায়জামা খরিদ করেছিলেন তা নিশ্চিত। বিশুদ্ধ রিওয়ায়াতের মাধ্যমে প্রমাণিত, তিনি পায়জামার প্রশংসা করেছেন এই বলে যে, এর দ্বারা সতর ঢাকার কাজটি অধিক সুন্দরভাবে হয়। পরবর্তীকালে দুনিয়ার বিভিন্ন জাতির মধ্যে ইসলাম যতই ছড়িয়ে পড়েছে সাহাবা কেরাম বিজিত এলাকাসমূহে তত বেশি বসতি স্থাপন করেছেন এবং সাথে সাথে সেখানে পায়জামার প্রচলনও বৃদ্ধি পেয়েছে।
٢٥٩ . عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ ذَاتَ غَدَاةٍ إِلَى الْمَسْجِدِ وَعَلَيْهِ مِرْطٌ مُرَحِلُ مِنْ شَعَرٍ أَسْوَدَ -
২৫৯. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন সকাল বেলা রাসূলুল্লাহ্ মসজিদে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলেন। সেই সময় তাঁর গায়ে ছিলো কালো পশমের তৈরি নক্শাদার কম্বল।
ফায়দা : এ হাদীসে নবী-এর কম্বলের বর্ণনা আছে। তিনি কালো পশমের তৈরি নক্শাদার কম্বল ব্যবহার করেছেন।
٢٦٠ . عَنْ سَلَمَةَ بْنِ الْأَكْوَعِ قَالَ بَعَثَ النَّبِيُّ عُثْمَانَ بْنَ عَفَّانٍ إِلَى مَكَّةَ فَأَجَارَهُ آبَانُ بْنُ سَعِيدٍ فَقَالَ يَا ابْنَ عَمِّ أَلا أَرَاكَ مُتَخَشِعًا أَسْبِلَ كَمَا يُسْبِلُ قَوْمُكَ قَالَ هُكَذَا يَأْتَزِرُ صَاحِبُنَا إِلَى نِصْفِ سَاقَيْهِ -
২৬০. হযরত সালামা ইব্ন আকওয়া (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (হুদায়বিয়ার সন্ধির পূর্বে) নবী উসমান ইব্ন আফফান (রা)-কে মক্কায় পাঠালে আবান ইব্ন সাঈদ তাঁকে নিজের আশ্রয়ে থাকতে দিলেন এবং বললেন, হে আমার চাচাতো ভাই! তুমি এরূপ বিনম্রতা অবলম্বন করেছো কেন। তুমি তোমার পরিধেয় বস্ত্র তোমার কাওমের লোকজনের মত নিচে লটকিয়ে পরিধান করো। উসমান (রা) বললেন, আমাদের সরদার রাসূলুল্লাহ এভাবে পায়ের নলার অর্ধেক পর্যন্ত উঁচু করে লুঙ্গি পরে থাকেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী ও সমস্ত সাহাবায়ে কিরাম অহংকার থেকে দূরে থাকার জন্য লুঙ্গি ও পায়জামা পায়ের নলার অর্ধেক পর্যন্ত উঁচু করে পরতেন। এটাই ইসলামের পদ্ধতি। পক্ষান্তরে কাফির ও মুশরিকরা অহংকার ও গর্বিত ভঙ্গিতে মাটি ছোঁয়া করে লুঙ্গি পরিধান করতো। এটাই ছিলো কুফরীর প্রতীক। অহংকারী লোকেরাই আজকাল ভূমি পর্যন্ত লটকিয়ে লুঙ্গি, পায়জামা, সেলোয়ার এমনকি প্যান্ট পরাকেও মর্যাদার ব্যাপার বলে মনে করে। অপরদিকে নেক্কার পরহেযগার ও দীনদার মুসলমানরা পায়জামা পায়ের গিরার ওপরে পরিধান করে থাকেন। সালাতের অবস্থায় পায়ের গিরার নিচে লুঙ্গি অথবা পায়জামা পরিধান মাকরূহ তাহরীমী।
٢٦١ عَنِ الْأَشْعَثِ بْنِ سُلَيْمٍ قَالَ سَمِعْتُ عَمَّتِي تَحَدِّثُ عَنْ عَمِّهَا أَنَّهُ رَأَى إِذَارِ رَسُولِ اللهِ أَسْفَلَ إِلَى نِصْفِ السَّاقِ -
২৬১. হযরত আশআস ইব্ন সুলাইম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার ফুফুকে তাঁর চাচার নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করতে শুনেছি। তাঁর চাচা দেখেছেন, রাসূলুল্লাহ্-এর পরনের লুঙ্গি তাঁর পায়ের নলার অর্ধেক নিচে পর্যন্ত ঝুলে ছিলো।
٢٦٢ عَنْ عُبَيْدَةَ قَالَ قَدِمْتُ الْمَدِينَةَ فَرَأَيْتُ إِزَارَ رَسُولِ اللَّهِ وَ أَسْفَلَ مِنْ عَضَلَةِ السَّاقِ -
২৬২. হযরত উবায়দা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মদীনায় এসে দেখলাম, রাসূলুল্লাহ্-এর পরনের লুঙ্গি তাঁর পায়ের গোছার নিচে পর্যন্ত নামানো।
٢٦٣ . عَنْ جَابِرٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ وَاللَّهِ إِذَا أَتْزَرَ يَضَعُ صَنَفَةً إِزَارِهِ عَلَى فَحْدِهِ الْيُسْرى -
২৬৩. হয়রত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ লুঙ্গি পরিধান করলে লুঙ্গির প্রান্তের অর্ধাংশ তাঁর বাম উরুর ওপর রাখতেন (যাতে চলার সময় খুলে না যায়)।
٢٦٤. عَنْ أَبِي الْعَالِيَةِ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ كَانَ إِزَارَهُ إِلَى نِصْفِ سَاقَيْهِ وَكَانَ لَهُ إِزَارَ قَدْ أَسْبَلَ خُيُوطَةٌ فَلَمْ يَجْزَهُ وَلَمْ يَكْفُهُ .
২৬৪. আবুল আলীয়া (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্-এর লুঙ্গি পায়ের নলার অর্ধাংশ পর্যন্ত থাকতো। তাছাড়া তাঁর একটি লুঙ্গির সুতা ঝুলে ছিল। তিনি সেগুলি কেটেও ফেলেন নি কিংবা সেলাই করে আটকিয়েও দেননি।
٢٦٥. أَخْبَرَنَا عِكْرِمَةٌ قَالَ رَأَيْتُ ابْنَ عَّبَّاسٍ يَا تَزِرُ فَيَضَعُ حَاشِيَةَ إِزَارِهِ مِنْ مُقَدَّمِهِ عَلَى ظَهْرِ قَدَمِهِ وَيَرْفَعُ مُؤَخَّرُهُ فَقُلْتُ مَا هَذِهِ الْإِزَارَةُ ؟ فَقَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَا تَزِرُهَا -
২৬৫. ইকরিমা (র) বর্ণনা করেন: আমি আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা)-কে দেখেছি তিনি লুঙ্গির সম্মুখ ও প্রান্তভাগ পায়ের উপর ঝুলিয়ে পরতেন এবং পেছনের অংশ উঁচু রাখতেন। আমি তাঁকে বললাম, এটা লুঙ্গি পরিধানের কোন্ নিয়ম? তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-কে এভাবেই লুঙ্গি পরিধান করতে দেখেছি।
ফায়দা : সাহাবায়ে কিরাম (রা) রাসূলুল্লাহ্-কে যেভাবে কাজকর্ম করতে দেখতেন নিজেরাও সেভাবেই তা করার অভ্যাস গড়ে তুলতেন। সুতরাং ইব্ন আব্বাস (রা) শেষ বয়সে নবী-এর শরীর মুবারক কিছুটা মোটা হয়ে যাওয়ার পর তাঁকে যেভাবে লুঙ্গি পরতে দেখেছেন তিনিও তা অনুসরণের জন্য সেভাবেই পরতে শুরু করেছিলেন এবং ইকরিমার প্রশ্নের জবাবে বলেছেন যে, আমি যেহেতু নবী-কে এভাবে লুঙ্গি পরতে দেখেছি তাই আমিও সেভাবেই পরে থাকি। সত্যিই প্রকৃত ভালবাসা ও ভালবাসার পাত্রের সাথে সম্পর্কের দাবি হলো, যিনি ভালবাসবেন তিনি প্রেমাস্পদের প্রতিটি ভঙ্গিকে আত্মস্থ করে নিবেন। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে এ আগ্রহ পূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিল। এ ব্যাপারে তাঁরা নিজেরাই ছিলেন উদাহরণ। মহান আল্লাহ্ সমস্ত মুসলিমকে তাঁর হাবীবের পূর্ণাঙ্গ আনুগত্যের তাওফীক দান করুন।
٢٦٦ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ أَبِي يَحْيِي مِثْلُهُ -
২৬৬. মুহাম্মদ ইব্ন আবু ইয়াহ্ইয়াও উপরে বর্ণিত হাদীসের অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন।
٢٦٧. عَنِ الْهُجَيْمِي أَنَّهُ لَقِي رَسُولَ اللهِ ﷺ فَإِذَا هُوَ مُتَّزِرُ بِإِزَارٍ قُطْنٍ قَدْ انْتَثَرَتْ حَاشِيَتُهُ .
২৬৭. হযরত হুজায়মী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি একবার রাসূলুল্লাহ্ -এর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। সেই সময় তিনি এমন একখানা সুতি লুঙ্গি পরিহিত ছিলেন, যার প্রান্তভাগ ছিল এলোমেলো।
٢٦٨. عَنِ الْحَسَنِ الْبَصْرِى أَنَّ شَيْخًا مِنْ بَنِي سَلِيْطَ أَخْبَرَهُ قَالَ أَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ أَكَلِّمُهُ فِي شَيْءٍ أُصِيْبَ لَنَا فِي الْجَاهِلِيَّةِ - فَإِذَا هُوَ قَاعِدُ وَعَلَيْهِ حَلْقَةُ قَدْ أَطَافَتْ بِهِ وَهُوَ يُحَدِّثُ الْقَوْمَ وَعَلَيْهِ إِزَارُ قُطْنٍ لَهُ غَلِيْظٍ -
২৬৮. হাসান বসরী (র) থেকে বর্ণিত, (তিনি বলেন) বনী সালীত গোত্রের এক সম্মানিত ব্যক্তি আমাকে বলেন যে, আমি জাহেলী যুগে একটি বিষয়ে কথা বলার জন্য নবী -এর কাছে গেলাম। তিনি সে সময় উপবিষ্ট ছিলেন। তাঁর চারপাশে মানুষ বৃত্তাকারে বসেছিলো এবং তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে কথা বলছিলেন। সেই সময় তিনি একখানা মোটা সুতি লুঙ্গি পরেছিলেন।
ফায়দা: এ দু'টি হাদীস থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ খুব মোটা সুতি লুঙ্গিও পরিধান করেছেন।
٢٦٩. عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ أَخَذَ رَسُولُ اللهِ ﷺ كِسَاءً فَدَكِيًّا فَأَدَارَهُ عَلَيْهِمْ ثُمَّ قَالَ هُؤُلَاءِ أَهْلُ بَيْتِي وَحَامَتِي -
২৬৯. হযরত উম্মে সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ফাদাকে তৈরি একটি চাদর নিলেন এবং তার মধ্যে আহলে বায়তদেরকে নিয়ে বললেন, এরাই হচ্ছে আমার আহলে বায়ত এবং আমার পরিবার।
ফায়দা: এ হাদীসটিতেও যেহেতু রাসূলুল্লাহ্-এর চাদরের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, তাই সেই সূত্র ধরে গ্রন্থকার হাদীসটি এখানে উল্লেখ করেছেন। নবী -এর আহলে বায়তদেরকে চাদরের মধ্যে নেয়া সম্পর্কিত ঘটনা সবিস্তার জানার জন্য তাফসীর গ্রন্থ সমূহে সূরা আহযাবের يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ الْآيَةُ আয়াতটির ব্যাখ্যা দেখা যেতে পারে।
٢٥٨ عَنْ أَبِي بُرْدَةَ قَالَ أَخْرَجَتْ إِلَيْنَا عَائِشَةُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا كِسَاءٌ مُلَبَّدًا وَإِزَارًا غَلِيْظًا فَقَالَتْ قُبِضَ رَسُولُ اللَّهِ فِي هَذَيْنِ -
২৫৮. হযরত আবূ বুরদা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত আয়েশা (রা) একখানা তালি লাগানো চাদর ও একখানা মোটা লুঙ্গি বের করে আমাদের দেখিয়ে বললেন, এই দু'খানা কাপড় পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ ওফাতপ্রাপ্ত হয়েছেন।
ফায়দা: এই হাদীসটিতে নবী-এর ব্যবহৃত লুঙ্গি ও চাদরের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এ থেকে জানা যায়, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত সরল-সহজ জীবন যাপন করতেন। নবী-এর যুগেই বিভিন্ন এলাকা বিজিত হতে শুরু হয়েছিলো। এই সময় তাঁর দরবারে ধনসম্পদের স্তূপ জমা হতো। কিন্তু তিনি তা অন্যদের মধ্যে বিলি-বণ্টন করে দিতেন এবং নিজে সাধারণ কিছু পরিধান করতেন। তবে কোন সময়ে বিশেষ কোন উপলক্ষে মূল্যবান পোশাকও পরতেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়, যা সাধারণত উপহার হিসেবে তাঁর কাছে আসতো। কিন্তু তিনি এসব পোশাক একবার মাত্র পরিধান করে কিংবা বিশেষ কোন উপলক্ষে পরিধান করে রেখে দিতেন। ইতোপূর্বে একটি হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইয়ামানের বাদশাহ যু-ইয়াযান তাঁকে এরূপ মূল্যবান এক সেট পোশাক পাঠালে তিনি একবার মাত্র তা পরিধান করেছিলেন পরে আর কখনো তা পরিধান করেননি। যাতে তাঁর পবিত্র জীবন গর্ব ও অহংকারের লেশমাত্র থেকে পবিত্র থাকে। তাঁর এই উত্তম আদর্শ অনুযায়ী উম্মতেরও আমল করা উচিত। তবে যে ক্ষেত্রে গর্ব ও অহংকারের আশংকা থাকবে না সেক্ষেত্রে কেবল আল্লাহ্ প্রদত্ত নিয়ামতের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর উদ্দেশ্যে মূল্যবান পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধানে কোন ক্ষতি নেই।
শরীরের নিচের অংশ ঢাকার জন্য যেসব পোশাক পরিধান করা হয় সে সব পোশাককে আরবীতে 'ইযার' বলা হয়। লুঙ্গি এবং পায়জামা দু'টিই এর অন্তর্ভুক্ত। 'রিদা (رداء) বা 'কিসা' (كساء) সে সব পোশাককে বলে যা শরীরের ওপরের অংশ ঢাকার জন্য ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের প্রতিটি সুতি বা পশমী বস্ত্রকে 'রিদা' এবং পশমী চাদর বা হাল্কা কম্বলকে 'কিসা' বলা হয়।
রাসূলুল্লাহ্ সাধারণত লুঙ্গি পরিধান করতেন। এটাই ছিলো আরবের সাধারণ পোশাক। তিনি কখনো পায়জামা পরেছেন কিনা সে বিষয়ে দ্বিমত রয়েছে। তবে তিনি যে পায়জামা খরিদ করেছিলেন তা নিশ্চিত। বিশুদ্ধ রিওয়ায়াতের মাধ্যমে প্রমাণিত, তিনি পায়জামার প্রশংসা করেছেন এই বলে যে, এর দ্বারা সতর ঢাকার কাজটি অধিক সুন্দরভাবে হয়। পরবর্তীকালে দুনিয়ার বিভিন্ন জাতির মধ্যে ইসলাম যতই ছড়িয়ে পড়েছে সাহাবা কেরাম বিজিত এলাকাসমূহে তত বেশি বসতি স্থাপন করেছেন এবং সাথে সাথে সেখানে পায়জামার প্রচলনও বৃদ্ধি পেয়েছে।
٢٥٩ . عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ ذَاتَ غَدَاةٍ إِلَى الْمَسْجِدِ وَعَلَيْهِ مِرْطٌ مُرَحِلُ مِنْ شَعَرٍ أَسْوَدَ -
২৫৯. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন সকাল বেলা রাসূলুল্লাহ্ মসজিদে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলেন। সেই সময় তাঁর গায়ে ছিলো কালো পশমের তৈরি নক্শাদার কম্বল।
ফায়দা : এ হাদীসে নবী-এর কম্বলের বর্ণনা আছে। তিনি কালো পশমের তৈরি নক্শাদার কম্বল ব্যবহার করেছেন।
٢٦٠ . عَنْ سَلَمَةَ بْنِ الْأَكْوَعِ قَالَ بَعَثَ النَّبِيُّ عُثْمَانَ بْنَ عَفَّانٍ إِلَى مَكَّةَ فَأَجَارَهُ آبَانُ بْنُ سَعِيدٍ فَقَالَ يَا ابْنَ عَمِّ أَلا أَرَاكَ مُتَخَشِعًا أَسْبِلَ كَمَا يُسْبِلُ قَوْمُكَ قَالَ هُكَذَا يَأْتَزِرُ صَاحِبُنَا إِلَى نِصْفِ سَاقَيْهِ -
২৬০. হযরত সালামা ইব্ন আকওয়া (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (হুদায়বিয়ার সন্ধির পূর্বে) নবী উসমান ইব্ন আফফান (রা)-কে মক্কায় পাঠালে আবান ইব্ন সাঈদ তাঁকে নিজের আশ্রয়ে থাকতে দিলেন এবং বললেন, হে আমার চাচাতো ভাই! তুমি এরূপ বিনম্রতা অবলম্বন করেছো কেন। তুমি তোমার পরিধেয় বস্ত্র তোমার কাওমের লোকজনের মত নিচে লটকিয়ে পরিধান করো। উসমান (রা) বললেন, আমাদের সরদার রাসূলুল্লাহ এভাবে পায়ের নলার অর্ধেক পর্যন্ত উঁচু করে লুঙ্গি পরে থাকেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী ও সমস্ত সাহাবায়ে কিরাম অহংকার থেকে দূরে থাকার জন্য লুঙ্গি ও পায়জামা পায়ের নলার অর্ধেক পর্যন্ত উঁচু করে পরতেন। এটাই ইসলামের পদ্ধতি। পক্ষান্তরে কাফির ও মুশরিকরা অহংকার ও গর্বিত ভঙ্গিতে মাটি ছোঁয়া করে লুঙ্গি পরিধান করতো। এটাই ছিলো কুফরীর প্রতীক। অহংকারী লোকেরাই আজকাল ভূমি পর্যন্ত লটকিয়ে লুঙ্গি, পায়জামা, সেলোয়ার এমনকি প্যান্ট পরাকেও মর্যাদার ব্যাপার বলে মনে করে। অপরদিকে নেক্কার পরহেযগার ও দীনদার মুসলমানরা পায়জামা পায়ের গিরার ওপরে পরিধান করে থাকেন। সালাতের অবস্থায় পায়ের গিরার নিচে লুঙ্গি অথবা পায়জামা পরিধান মাকরূহ তাহরীমী।
٢٦١ عَنِ الْأَشْعَثِ بْنِ سُلَيْمٍ قَالَ سَمِعْتُ عَمَّتِي تَحَدِّثُ عَنْ عَمِّهَا أَنَّهُ رَأَى إِذَارِ رَسُولِ اللهِ أَسْفَلَ إِلَى نِصْفِ السَّاقِ -
২৬১. হযরত আশআস ইব্ন সুলাইম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার ফুফুকে তাঁর চাচার নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করতে শুনেছি। তাঁর চাচা দেখেছেন, রাসূলুল্লাহ্-এর পরনের লুঙ্গি তাঁর পায়ের নলার অর্ধেক নিচে পর্যন্ত ঝুলে ছিলো।
٢٦٢ عَنْ عُبَيْدَةَ قَالَ قَدِمْتُ الْمَدِينَةَ فَرَأَيْتُ إِزَارَ رَسُولِ اللَّهِ وَ أَسْفَلَ مِنْ عَضَلَةِ السَّاقِ -
২৬২. হযরত উবায়দা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মদীনায় এসে দেখলাম, রাসূলুল্লাহ্-এর পরনের লুঙ্গি তাঁর পায়ের গোছার নিচে পর্যন্ত নামানো।
٢٦٣ . عَنْ جَابِرٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ وَاللَّهِ إِذَا أَتْزَرَ يَضَعُ صَنَفَةً إِزَارِهِ عَلَى فَحْدِهِ الْيُسْرى -
২৬৩. হয়রত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ লুঙ্গি পরিধান করলে লুঙ্গির প্রান্তের অর্ধাংশ তাঁর বাম উরুর ওপর রাখতেন (যাতে চলার সময় খুলে না যায়)।
٢٦٤. عَنْ أَبِي الْعَالِيَةِ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ كَانَ إِزَارَهُ إِلَى نِصْفِ سَاقَيْهِ وَكَانَ لَهُ إِزَارَ قَدْ أَسْبَلَ خُيُوطَةٌ فَلَمْ يَجْزَهُ وَلَمْ يَكْفُهُ .
২৬৪. আবুল আলীয়া (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্-এর লুঙ্গি পায়ের নলার অর্ধাংশ পর্যন্ত থাকতো। তাছাড়া তাঁর একটি লুঙ্গির সুতা ঝুলে ছিল। তিনি সেগুলি কেটেও ফেলেন নি কিংবা সেলাই করে আটকিয়েও দেননি।
٢٦٥. أَخْبَرَنَا عِكْرِمَةٌ قَالَ رَأَيْتُ ابْنَ عَّبَّاسٍ يَا تَزِرُ فَيَضَعُ حَاشِيَةَ إِزَارِهِ مِنْ مُقَدَّمِهِ عَلَى ظَهْرِ قَدَمِهِ وَيَرْفَعُ مُؤَخَّرُهُ فَقُلْتُ مَا هَذِهِ الْإِزَارَةُ ؟ فَقَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَا تَزِرُهَا -
২৬৫. ইকরিমা (র) বর্ণনা করেন: আমি আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা)-কে দেখেছি তিনি লুঙ্গির সম্মুখ ও প্রান্তভাগ পায়ের উপর ঝুলিয়ে পরতেন এবং পেছনের অংশ উঁচু রাখতেন। আমি তাঁকে বললাম, এটা লুঙ্গি পরিধানের কোন্ নিয়ম? তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-কে এভাবেই লুঙ্গি পরিধান করতে দেখেছি।
ফায়দা : সাহাবায়ে কিরাম (রা) রাসূলুল্লাহ্-কে যেভাবে কাজকর্ম করতে দেখতেন নিজেরাও সেভাবেই তা করার অভ্যাস গড়ে তুলতেন। সুতরাং ইব্ন আব্বাস (রা) শেষ বয়সে নবী-এর শরীর মুবারক কিছুটা মোটা হয়ে যাওয়ার পর তাঁকে যেভাবে লুঙ্গি পরতে দেখেছেন তিনিও তা অনুসরণের জন্য সেভাবেই পরতে শুরু করেছিলেন এবং ইকরিমার প্রশ্নের জবাবে বলেছেন যে, আমি যেহেতু নবী-কে এভাবে লুঙ্গি পরতে দেখেছি তাই আমিও সেভাবেই পরে থাকি। সত্যিই প্রকৃত ভালবাসা ও ভালবাসার পাত্রের সাথে সম্পর্কের দাবি হলো, যিনি ভালবাসবেন তিনি প্রেমাস্পদের প্রতিটি ভঙ্গিকে আত্মস্থ করে নিবেন। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে এ আগ্রহ পূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিল। এ ব্যাপারে তাঁরা নিজেরাই ছিলেন উদাহরণ। মহান আল্লাহ্ সমস্ত মুসলিমকে তাঁর হাবীবের পূর্ণাঙ্গ আনুগত্যের তাওফীক দান করুন।
٢٦٦ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ أَبِي يَحْيِي مِثْلُهُ -
২৬৬. মুহাম্মদ ইব্ন আবু ইয়াহ্ইয়াও উপরে বর্ণিত হাদীসের অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন।
٢٦٧. عَنِ الْهُجَيْمِي أَنَّهُ لَقِي رَسُولَ اللهِ ﷺ فَإِذَا هُوَ مُتَّزِرُ بِإِزَارٍ قُطْنٍ قَدْ انْتَثَرَتْ حَاشِيَتُهُ .
২৬৭. হযরত হুজায়মী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি একবার রাসূলুল্লাহ্ -এর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। সেই সময় তিনি এমন একখানা সুতি লুঙ্গি পরিহিত ছিলেন, যার প্রান্তভাগ ছিল এলোমেলো।
٢٦٨. عَنِ الْحَسَنِ الْبَصْرِى أَنَّ شَيْخًا مِنْ بَنِي سَلِيْطَ أَخْبَرَهُ قَالَ أَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ أَكَلِّمُهُ فِي شَيْءٍ أُصِيْبَ لَنَا فِي الْجَاهِلِيَّةِ - فَإِذَا هُوَ قَاعِدُ وَعَلَيْهِ حَلْقَةُ قَدْ أَطَافَتْ بِهِ وَهُوَ يُحَدِّثُ الْقَوْمَ وَعَلَيْهِ إِزَارُ قُطْنٍ لَهُ غَلِيْظٍ -
২৬৮. হাসান বসরী (র) থেকে বর্ণিত, (তিনি বলেন) বনী সালীত গোত্রের এক সম্মানিত ব্যক্তি আমাকে বলেন যে, আমি জাহেলী যুগে একটি বিষয়ে কথা বলার জন্য নবী -এর কাছে গেলাম। তিনি সে সময় উপবিষ্ট ছিলেন। তাঁর চারপাশে মানুষ বৃত্তাকারে বসেছিলো এবং তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে কথা বলছিলেন। সেই সময় তিনি একখানা মোটা সুতি লুঙ্গি পরেছিলেন।
ফায়দা: এ দু'টি হাদীস থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ খুব মোটা সুতি লুঙ্গিও পরিধান করেছেন।
٢٦٩. عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ أَخَذَ رَسُولُ اللهِ ﷺ كِسَاءً فَدَكِيًّا فَأَدَارَهُ عَلَيْهِمْ ثُمَّ قَالَ هُؤُلَاءِ أَهْلُ بَيْتِي وَحَامَتِي -
২৬৯. হযরত উম্মে সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ফাদাকে তৈরি একটি চাদর নিলেন এবং তার মধ্যে আহলে বায়তদেরকে নিয়ে বললেন, এরাই হচ্ছে আমার আহলে বায়ত এবং আমার পরিবার।
ফায়দা: এ হাদীসটিতেও যেহেতু রাসূলুল্লাহ্-এর চাদরের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, তাই সেই সূত্র ধরে গ্রন্থকার হাদীসটি এখানে উল্লেখ করেছেন। নবী -এর আহলে বায়তদেরকে চাদরের মধ্যে নেয়া সম্পর্কিত ঘটনা সবিস্তার জানার জন্য তাফসীর গ্রন্থ সমূহে সূরা আহযাবের يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ الْآيَةُ আয়াতটির ব্যাখ্যা দেখা যেতে পারে।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পবিত্র চাদরের বর্ণনা
۲۷۰ . عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كُنْتُ امْشِي مَعَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ وَعَلَيْهِ رِدَاءٌ نَجْرَانِي غَلِيْظُ الْحَاشِيَةِ -
২৭০. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ -এর সাথে পথে চলছিলাম। সে সময় তাঁর গায়ে নাজরানে তৈরি মোটা পাড়বিশিষ্ট একখানা চাদর ছিলো।
ফায়দা: এ হাদীসটিতে রাসূলুল্লাহ্-এর পবিত্র চাদরের বর্ণনা স্থান পেয়েছে। তিনি নাজরানের তৈরি মোটা পাড় বিশিষ্ট চাঁদর ব্যবহার করেছেন।
۲۷۱ عَنْ عُرْوَةَ بْنِ الزُّبَيْرِ قَالَ كَانَ طُولُ رِدَاءِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ أَرْبَعَةَ ادْرُع وَعَرْضُهُ ذِرَاعَيْنِ وَنِصْفًا وَكَانَ لَهُ ثَوْبٌ أَخْضَرُ يَلْبَسُهُ لِلْوَفُوْدِ إِذَا قَدِمُوا عَلَيْهِ -
২৭১. হযরত উরওয়া ইন্ন যুবায়র (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ -এর চাদর চার হাত লম্বা ও আড়াই হাত প্রস্থ ছিল। তাঁর কাছে সবুজ রঙের একখানা কাপড় ছিল। বাইরের প্রতিনিধি দল তাঁর কাছে সাক্ষাতের জন্য আসলে তিনি তা পরিধান করে তাদের সাক্ষাৎ দিতেন।
ফায়দা: নবী চার হাত দীর্ঘ ও আড়াই হাত প্রস্থের চাদর ব্যবহার করেছেন। এ হাদীস থেকে আরো জানা যায় যে, তাঁর কাছে সবুজ রঙের একটি জুব্বা ছিলো। বিশেষ করে বাইরের প্রতিনিধিদল আগমন করলে তিনি সেটি পরিধান করে তাদেরকে সাক্ষাৎ দিতেন।
۲۷۲ عَنْ عُرْوَةَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ الَّذِي كَانَ يَخْرُجُ فِيهِ إِلَى الْوَفْدِ رِدَاءُ وَثَوْبُ أَخْضَرَ طُولُهُ أَرْبَعَةُ أَذْرُعٍ وَعَرْضُهُ ذِرَاعَانِ وَشَبِرٍ وَهُوَ عِنْدَ الخُلَفَاءِ الْيَوْمَ قَدْ كَانَ خَلِقَ فَطَوَّقَهُ بِثَوْبٍ يَلْبَسُونَهُ يَوْمَ الْفِطْرِ وَالْأَضْحَى -
২৭২. হযরত উরওয়া (রা) বলেন, যে পোশাক পরিধান করে রাসূলুল্লাহ্ বহিরাগত প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎ দান করতেন তা ছিলো একখানা সবুজ চাদর ও জুব্বা। চাদরখানার দৈর্ঘ ছিলো চার হাত এবং প্রস্থ ছিলো দুই হাত ও এক বিঘত। নবী-এর সেই জুব্বাটি বরকত লাভের জন্য বর্তমানে খলীফাদের কাছে সংরক্ষিত। জুব্বাটি খুবই পুরানো হয়ে গিয়েছে। সংরক্ষণ ও সাবধানতার জন্য তাঁরা সেটিকে ভাঁজ করে আরেকটি কাপড়ের মধ্যে রেখেছেন। এবং তাঁরা কেবল ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার সময় তা ব্যবহার করে থাকেন।
ফায়দা: এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বিশেষ ধরনের পোশাক ব্যবহার করতেন। এসব পোশাকের মধ্যে বিশেষ করে উক্ত সবুজ রঙের চাদর ও জুব্বার উল্লেখ পাওয়া যায়- যা তাঁর পরবর্তী খলীফাগণও বরকত লাভের উদ্দেশ্যে দুই ঈদে ও অন্যান্য বিশেষ অনুষ্ঠানে ব্যবহার করতেন। এ দু'টি পোশাকের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, তিনি সাধারণত আমাদের হিসাব অনুসারে দুই গজ লম্বা ও সোয়া গজ চওড়া চাদর ব্যবহার করতেন।
۲۷۳. عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ يَوْمًا حَتَّى بَلَغَ وَسَطَ الْمَسْجِدِ فَادْرَكَهُ أَعْرَابِي فَجَبَدَ بِرِدَائِهِ مِنْ وَرَائِهِ وَكَانَ رِدَاءَ خَشِنًا فَحَمَرَ رَقْبَتُهُ .
২৭৩. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী একদিন উঠে দাঁড়ালেন এবং মসজিদের মাঝখানে গিয়ে পৌছলেন। তখন এক বেদুঈন তাঁর কাছে গিয়ে পৌঁছলো এবং পেছন দিক থেকে তাঁর চাদর ধরে সজোরে টান দিলো। চাদর বেশ মোটা ছিলো। চাদর ধরে টান দেয়ায় তাঁর ঘাড়ে লাল দাগ পড়ে গেল।
ফায়দা: এখানে নবী -এর চাদরের উল্লেখ করাই কেবল গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য। এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী মোটা চাদর ব্যবহার করতেন।
٢٧٤ عَنْ اسْمَعِيلَ بْنِ عَبْدِ اللهِ بْنِ جَعْفَرَ عَنْ أَبِيْهِ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ ثَوبَانِ مَصْبُوغَانِ بِالزُّعْفَرَانِ رِدَاءُ وَعِمَامَةً
২৭৪. ইসমাঈল ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন জা'ফর তার পিতার থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আমি এমন অবস্থায় নবী -কে দেখেছি যখন তাঁর গায়ে জাফরানী রঙের দুইখানা কাপড় অর্থাৎ একখানা চাদর ও পাগড়ি ছিলো।
ফায়দা : এ হাদীসটিতেও নবী -এর পবিত্র চাদরের উল্লেখ আছে। এ কারণে গ্রন্থকার হাদীসটি এখানে বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া হাদীসটি থেকে এ কথাও জানা যায় যে, নবী জাফরানী রঙের কাপড়ও ব্যবহার করেছেন। অধিক ব্যবহার অথবা ধোয়ার কারণে যার সুবাস নিঃশেষ হয়ে এসেছিলো।
বিভিন্ন হাদীসে পুরুষের জন্য জাফরানী রঙের এমন কাপড় ব্যবহারের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে যাতে এখনো জাফরানের প্রভাব অবশিষ্ট আছে। সুতরাং কুবলা বিনত্ মাখরামা (রা) একটি হাদীসে বলেন, আমি জাফরানী রঙের দু'খানা চাদর পরিহিত অবস্থায় নবী-কে দেখেছিলাম। কাপড়ে তখন আর জাফরানের কোন প্রভাব অবশিষ্ট ছিলো না। সুতরাং এ সব হাদীসের মধ্যে সমন্বয় হলো, জাফরানের সুগন্ধ বিদূরিত হওয়ার পরে তিনি ঐ সব কাপড় ব্যবহার করেছেন।
٢٧٥ عَنْ إِسْمَاعِيلَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ جَعْفَرٍ عَنْ أَبِيْهِ قَالَ رَأَيْتُ عَلَى النَّبِيِّ ثَوْبَيْنِ أَصْفَرَيْنِ -
২৭৫. ইসমাঈল ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন জা'ফর (রা) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-এর পবিত্র দেহে হলুদ রঙের দু'খানা কাপড় দেখেছি।
ফায়দা : এ হাদীস থেকেও জানা যায় যে, নবী হলুদ রঙের কাপড় ব্যবহার করেছেন যাতে জাফরানের সুগন্ধি অবশিষ্ট ছিলো না।
٢٧٦ عَنْ دَلَهُمِ بْنِ صَالِحٍ قَالَ سَمِعْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ بُرَيْدَةَ عَنْ أَبِيْهِ قَالَ إِنَّ النَّجَاشِي كَتَبَ إِلَى النَّبِيِّ إِنِّي قَدْ زَوَّجْتُكَ امْرَأَةً مِنْ قَوْمِكَ وَهِيَ عَلَى دِينِكَ أَمْ حَبِيْبَةَ بِنْتِ أَبِي سُفْيَانَ وَاهْدِى لَكَ هَدِيَّةٌ جَامِعَةً قَمِيصًا وَسَرَاوِيلَ وَعِظَافًا وَ خُفَّيْنِ سَانِجَيْنِ، فَتَوَضَّاءَ النَّبِيُّ ﷺ ومَسَحَ عَلَيْهَا قَالَ سُلَيْمَانُ قُلْتُ لِلْهَيْثَمِ مَا الْعِطَافُ؟ قَالَ الطَّيْلِسَانُ، قُلْتُ لِلْهَيْثَمِ أَلَيْسَ بَيْنَهُمَا رَجُلٌ؟ ابْنَ حُجَيْرَةَ قَالَ قَوْمَهُ لِي وَشَدَّهُ ابْنُ حُجَيْرَةٌ -
২৭৬. দালহাম ইন্ন সালিহ্ (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমি শুনেছি, আবদুল্লাহ্ ইব্ন বুরাইদা (রা) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, (হাবশার বাদশাহ্) নাজাশী, নবী -কে পত্র লিখে জানালেন যে, আপনার কওমের ও আপনার দীনের অনুসারী উম্মে হাবিবা বিন্ত আবু সুফিয়ানকে আপনার সাথে বিয়ে দিয়েছি এবং আপনার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ উপহার অর্থাৎ কামিজ, পায়জামা, ইতাফ ও সাদা চামড়ার তৈরি মোজাও পাঠাচ্ছি। বর্ণনাকারী বলেন, নবী ﷺ ওযু করে সেই মোজার ওপর 'মাসেহ্' করলেন। হাদীসের বর্ণনাকারী সুলাইমান বলেন, আমি আমার উস্তাদ হায়সামকে জিজ্ঞেস করলাম 'ইতাফ' কি? তিনি বললেন, কাঁধের ওপর রাখার সবুজ রঙের তায়লিসান চাদর। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি আবার হায়সামকে বললাম, সালহাম এবং আবদুল্লাহ্ ইব্ন বুরায়দার মাঝখানে কি আর কোন বর্ণনাকারী নেই? তিনি বললেন, তাদের মাঝখানে বর্ণনাকারী হলেন ইবন হুজায়রা। তিনি অত্যন্ত নির্ভরতার সাথে জোর দিয়ে বললেন যে, তাদের দু'জনের মধ্যকার বর্ণনাকারী ইন্ন হুজায়রা।
ফায়দা : উম্মুল মু'মিনীন হযরত উম্মে হাবীবা বিন্ত আবূ সুফিয়ান (রা)-এর আসল নাম রামলা বিন্ত আবূ সুফিয়ান। প্রথমে তাঁর বিয়ে হয়েছিলো আবদুল্লাহ্ ইব্ন জাহাশের সাথে।
আবদুল্লাহ্ মক্কা থেকে হিজরত করে হাবশায় চলে যায়। সেখানে গিয়ে মুরতাদ হয়ে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে এবং ঐ অবস্থায়ই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। কিন্তু উম্মে হাবীবা (রা) ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকেন। হাবশার বাদশাহ্ নাজাশী রাসূলুল্লাহ্ -এর অভিপ্রায় অবহিত হয়ে তাঁর সাথে উম্মে হাবীবার বিয়ে দেন এবং নিজের পক্ষ থেকে বিপুল পরিমাণ মাহর আদায় করেন এবং বিভিন্ন আসবাবপত্রও উপহার হিসাবে প্রদান করেন। এসব উপহার সামগ্রীর মধ্যে কামিজ, পায়জামা, চাদর ও চামড়ার মোজার কথা এ হাদীসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, নাজাশী চারশ দিনার মাহর নির্ধারণ করেছিলেন এবং নিজেই তা আদায় করেছিলেন। এ ঘটনা থেকে অনুমান করা যায়, চোখে না দেখলেও রাসূলুল্লাহ্ -এর প্রতি নাজাশীর কত ভক্তি ও ভালবাসা ছিলো।
হাদীসে মোজার ওপর 'মাসেহ্' করার কথা বলা হয়েছে। এটা ফিকহ মাসয়ালা। চামড়ার মোজার ওপর 'মাসেহ্' করা সকল ইমামের মতে জায়েয। এমনকি সুতি বা পশমী মোজাও যদি এতটা মোটা হয় বা, তা পরে জুতা ছাড়াই রাস্তা চলা সম্ভব তাহলে অধিকাংশ ইমামের মতে তার ওপর 'মাসেহ্' করাও জায়েয। এর সময়সীমা মুসাফিরের জন্য তিনদিন তিন রাত এবং নিজ বাড়িতে অবস্থানকারীর জন্য একদিন ও একরাত। মোজা পরিধানকারী যদি এই সময়সীমার মধ্যে ওযু করার জন্য মোজা না খুলে তার ওপর 'মাসেহ্' করেন তাহলে ওযু বিশুদ্ধ হবে। বিস্তারিত জানার জন্য ফিকহ্ গ্রন্থসমূহ দ্রষ্টব্য।