📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ 📄 নবী (সা)-এর জামা এবং জামা পরিধানের সময় মহান আল্লাহ্র প্রতি হাম্দ ও প্রশংসা

📄 নবী (সা)-এর জামা এবং জামা পরিধানের সময় মহান আল্লাহ্র প্রতি হাম্দ ও প্রশংসা


۲۳۱. عَنْ أُمِّ سَلْمَةَ قَالَتْ كَانَ أَحَبُّ الثِيَابِ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ الْقَمِيصَ

২৩১. হযরত উম্মে সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ -এর কাছে সবচেয়ে প্রিয় পোশাক ছিল জামা।

۲۳۲. عَنِ ابْنِ بُرَيْدَةَ عَنْ أَبِيْهِ عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ مِثْلَهُ -

২৩২. হযরত ইব্‌ন বুরায়দা তাঁর পিতার সূত্রে হযরত উম্মে সালামা (রা) থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

ফায়দা : নবী করীম পোশাক-পরিচ্ছদের মধ্যে বিভিন্ন জিনিস ব্যবহার করেছেন। যেমন জুব্বা, কাবা, জামা, লুঙ্গি, পরিধানের চাদর জোড়া ইত্যাদি। কিন্তু এসবের মধ্যে জামা ছিল তাঁর কাছে অধিকতর পছন্দনীয় বস্ত্র। কোন সন্দেহ নেই যে চাদর, জুব্বা, কাবা ইত্যাদির তুলনায় একমাত্র জামাই হলো এমন একটি পোশাক যা দামে সস্তা হওয়ার পাশাপাশি মানুষের সতর পরিপূর্ণভাবে ঢেকে রাখে। এ পোশাক ব্যবহারে শরীরের উপর অস্বাভাবিক বোঝা অনুভূত হয় না। এটি সামলিয়ে রাখতেও তেমন কোন বেগ পেতে হয় না। অথচ সামাজিক ভদ্রতা ও সৌন্দর্য রক্ষার কাজ পরিপূর্ণভাবে অর্জিত হয়ে থাকে। তাই বলা চলে যে, এক জামার মধ্যে অনেকগুলি উপকারিতা বিদ্যমান। পক্ষান্তরে জুব্বা ওজনে বেশ ভারী। তাছাড়া যতক্ষণ তা পরণে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত শরীরের উপর একটি বোঝা আছে বলে অনুভূত হয়। এ কারণে মানুষ জুব্বা বিশেষ বিশেষ সময়ে পরিধান করে থাকে। কাবা কিংবা চাদরের অবস্থাও অনুরূপ। লুঙ্গি কিংবা পরিধেয় চাদরের দ্বারা সতর ঢেকে রাখার বিষয়ে পূর্ণ নিশ্চিত হওয়া যায় না। আপন সতর রক্ষিত রাখার জন্য তখন ব্যক্তিকে পৃথকভাবে খেয়াল রাখতে হয়। আর সামাজিক ভদ্রতা ও সৌন্দর্য রক্ষার তো এখানে প্রশ্নই আসে না। আর এ কারণে মানুষ সাধারণত এ পোশাকটি বাড়ির ভিতর ব্যবহার করে। কিন্তু আরবীয়দের সেই জামা আমাদের দেশে ব্যবহৃত জামার মত কেবল হাঁটু পর্যন্ত ছিলো না বরং পায়ের গোছা পর্যন্ত লম্বিত থাকতো। জামার ক্ষেত্রে এ সকল উপকারিতার কারণে নবী জামাকে অধিকতর পছন্দ করতেন।

আলিমগণ পোশাকের বিভিন্ন স্তর নির্ধারণ করে দিয়েছেন। অর্থাৎ কিছু পোশাক ওয়াজিব, কিছু মুস্তাহাব, কিছু হারাম, কিছু মাকরূহ আর কিছু হলো মুবাহ। যেমন :

এক. নিজের সতর ঢেকে রাখার প্রয়োজনে যতটুকু বস্ত্র পরিধান করতে হয় ততটুকু পরিধান করা ওয়াজিব অর্থাৎ ফরয।

দুই. যে পোশাক পরিধানের জন্য শরীয়তের পক্ষ থেকে মানুষকে উৎসাহিত করা হয়েছে সেটি পরিধান করা মুস্তাহাব ও সাওয়াবের কাজ। যেমন ঈদের জন্য কিংবা কোন প্রতিনিধি দলের সাক্ষাতের জন্য উন্নতমানের এবং বিশেষ ধরনের পোশাক পরিধান। অনুরূপভাবে জুম'আর সালাতের জন্য সাদা কাপড় পরিধান করা মুস্তাহাব।

তিন. যেসব বস্ত্র পরিধান করতে শরীয়তে নিষেধ করা হয়েছে সেগুলি পরা হারাম। যেমন, পুরুষের জন্য রেশমের কাপড় (বিনা ওযরে) পরিধান করা, কিংবা মহিলাদের জন্য এমন পাতলা কাপড় ব্যবহার করা যার দ্বারা শরীরের ঔজ্জ্বল্য বাহির থেকে দেখা যায়। কিংবা এমন আটসাঁট পোশাক ব্যবহার করা যার দ্বারা শরীরের লুক্কায়িত ও সংরক্ষিত অঙ্গগুলি বাহির থেকে সুস্পষ্ট বোঝা যায়। এসব পোশাক ব্যবহার করা হারাম ও শরীয়তে নিষিদ্ধ।

চার. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও ভাল মানের বস্ত্র থাকা সত্ত্বেও কোন অপরিষ্কার ময়লা কিংবা পুরাতন ছেঁড়া পোশাক পরিধান করা মাকরূহ। অনুরূপভাবে যে পোশাক ব্যক্তির সামাজিক মান-মর্যাদার বিপরীত হয় যেমন কোন সম্পদশালী ব্যক্তির জন্য ছেঁড়া পুরাতন বস্ত্র পরিধান করা কিংবা অহংকার গর্ব প্রকাশ ইত্যাদির জন্য অতিশয় দামী পোশাক পরিধান মাকরূহ।

পাঁচ. উল্লেখিত পন্থাগুলি ব্যতিরেকে অবশিষ্ট যেকোন পোশাক যদি অহংকার কিংবা লোক দেখানোর উদ্দেশ্য না থাকে তা হলে সেটি পরিধান করা মুবাহ।

٢٣٣. عَنْ قَتَادَةَ قَالَ سَأَلْتُ انْسَأَ أَيُّ الرِّبَاسِ كَانَ أَحَبُّ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ أَوْ أَعْجَبَ إِلَيْهِ ؟ قَالَ الْحِبْرَةُ -

২৩৩. হযরত কাতাদা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত আনাস ইব্‌ মালিক (রা)-কে জিজ্ঞেস করলাম, কোন্ পোশাকটি রাসূলুল্লাহ্ -এর কাছে অধিকতর প্রিয় ছিলো? কিংবা তিনি বলেছেন, কোন্ পোশাকটি নবী -এর কাছে অধিকতর পছন্দনীয় ছিল? তিনি উত্তর দিলেন, হিব্রা। (অর্থাৎ ডোরাদার ইয়ামেনি চাদর।)

٢٣٤ عَنْ زَيْدُ بْنُ الْحُبَّابِ حَدَّثَنَا هَمَّامٌ نَحْوُهُ -

২৩৪. হযরত যায়দ ইবন হুবাব (রা) হযরত হাম্মাম (রা)-এর সূত্রে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন।

ফায়দা : ইয়ামন অঞ্চলে তৈরি ডোর বিশিষ্ট চাদরকে 'হিরা' বলা হতো। এ চাদরগুলি সাধারণত তৈরি করা হতো পশম দ্বারা। সেখানে আরবে এটি ছিলো সবচেয়ে গাম্ভীর্যপূর্ণ পোশাক। আর এ কারনেই বিশেষ কোন অনুষ্ঠানের জন্য নবী এই পোশাকের ব্যবহার বেশি পছন্দ করতেন।

٢٣٥. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كَانَ لِرَسُولِ اللهِ ﷺ قَمِيصُ قُطْنِيٌّ قَصِيرُ الطُّولِ قَصِيرُ الْكُمَّيْنِ -

২৩৫. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ -এর সুতি কাপড়ের একটি জামা ছিলো। এ জামাটি দৈর্ঘ্যেও ছিলো খাট আর আস্তিনগুলিও ছিলো ছোট ছোট।

ফায়দা : বর্ণিত জামাটি নবী সম্ভবত এমন সময়ে পরিধান করতেন যে সময় মানুষ হালকা পোশাক পরিধান করে থাকে, যেমন গরমের মৌসুমে। কিংবা এটি ছিলো তার ভিতর বাড়িতে পরিধানের জামা।

٢٣٦. عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَلْبَسُ قَمِيصًا فَوْقَ الْكَعْبَيْنِ مُسْتَوَى الْكُمَيْنِ بِأَطْرَافِ أَصَابِعِهِ -

২৩৬. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী টাখনুর উপর (পায়ের গিরার) উপর পর্যন্ত লম্বিত জামা পরিধান করতেন। সে জামার আস্তিনগুলি তাঁর আঙ্গুলের মাথা পর্যন্ত ছিলো।

۲۳۷. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ قَمِيصُ رَسُولِ اللهِ ﷺ إِلَى رُسُغِهِ -

২৩৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ -এর জামার (আস্তিন) হাতের কব্জি পর্যন্ত লম্বা ছিলো।

۲۳۸. عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ يَزِيدَ قَالَتْ كَانَ قَمِيصُ النَّبِيِّ ﷺ أَسْفَلَ مِنَ الرُّسُغِ -

২৩৮. হযরত আসমা বিন্ত ইয়াযীদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী-এর জামার আস্তিন তাঁর হাতের কব্জির নিচ পর্যন্ত লম্বা ছিলো।

ফায়দা : উপরোক্ত হাদীসগুলিতে নবী -এর জামা ও আস্তিনের দৈর্ঘ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। নবী -এর জামা টাখনু থেকে উপরে থাকতো। আর আস্তিন হাতের কব্জি পর্যন্ত কিংবা কব্জি থেকে সামান্য নিচ পর্যন্ত লম্বিত থাকতো। এ ব্যাপারে বিভিন্ন রকমের বর্ণনা বিদ্যমান। আলিমগণ বলেছেন, আস্তিনের দৈর্ঘ হাতের কব্জি পর্যন্ত হওয়া উত্তম। আর কব্জি থেকে কিছু নিচ পর্যন্ত হওয়া জায়েয। ইমাম জাফরী (র) বলেন, জামার আস্তিনের ক্ষেত্রে সুন্নত হলো হাতের কব্জির সমান হওয়া। পক্ষান্তরে জামা ব্যতীত চোগা ইত্যাদির আস্তিন কব্জির নিচ পর্যন্তও হতে পারে। তবে আঙ্গুল যেন ছাড়িয়ে না যায়। (হযরত শায়খ মুহাম্মদ যাকারিয়‍্যা তাঁর 'খাসাইলে নববী' গ্রন্থে এই অভিমতই ব্যক্ত করেছেন।) কিন্তু জামা বা এ জাতীয় পোশাকের আস্তিন কনুইয়ের উপর পর্যন্ত হওয়া ভালো নয়। এটি আদবের খেলাফ। কনুই খোলা রাখার কারণে সালাতও মাকরূহ হয়ে থাকে।

٢٣٩ ، عَنْ أَبِي كَبْشَةَ الأَنْصَارِيُّ قَالَ كَانَتْ كَمَامُ النَّبِيُّ إِلَى بَطْمِ -

২৩৯. হযরত আবূ কাবশা আনমারী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী-এর টুপি (মাথার তালুর সঙ্গে) চেপে লেগে থাকতো। অর্থাৎ তাঁর টুপি মুবারক খাড়া থাকতো না। কেননা তিনি অধিকাংশ সময় পাগড়ি পরিহিত অবস্থায় থাকতেন।

ফায়দা : এ হাদীসে নবী -এর টুপির কথা বর্ণিত হয়েছে। নবী এমন টুপি পরিধান করতেন যা মাথার সঙ্গে লেগে থাকতো। কারণ হলো, তিনি অধিকাংশ সময় মাথায় পাগড়ি বেঁধে রাখতেন। তবে এ পাগড়ি ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকতো। বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তীতে করা হবে।

٢٤٠ ، عَنْ عَبْدِ الْمَلِكِ قَالَ سَمِعْتُ ابْنَ عُمَرَ يَقُولُ مَا اتَّخِذَ لِرَسُولِ اللهِ ﷺ قَمِيصُ لَهُ زِد -

২৪০. হযরত আবদুল মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা) থেকে শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ্ কখনও বোতাম বিশিষ্ট জামা পরিধান করেন নি।

ফায়দা : এ হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, নবী -এর জামা মুবারকে কোন বোতাম বা মুষ্টি ইত্যাদি থাকতো না। কতিপয় হাদীসে বলা হয়েছে তিনি কাঁটা বা খড়ি জাতীয় জিনিস লাগিয়ে নিতেন। আবার কোন কোন হাদীস' থেকে বোঝা যায় যে, তাঁর জামার গলা সাধারণত খোলাই থাকতো।

٢٤١ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ كَانَ لِرَسُولِ اللهِ ﷺ قَمِيصُ قُطْنِي قَصِيرٌ الطُّولِ قَصْبِرُ الْكُمَيْنِ -

২৪১. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ -এর একটি সুতি জামা ছিল। এ জামাটি দৈর্ঘ্যেও ছিলো খাটো আবার আস্তিনগুলিও ছিলো ছোট।

٢٤٢ عَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا اسْتَجَدَّ ثَوْبًا سَمَاهُ بِاسْمِهِ إِزَارًا كَانَ أَوْ قَمِيصًا أَوْ عِمَامَةً ثُمَّ يَقُولُ اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ كَمَا كَسَوْتَنِي هَذَا أَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِهِ وَخَيْرِ مَا صُنِعَ لَهُ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهِ وَ شَرِّ مَا صُنِعَ لَهُ -

২৪২. হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন কোন নতুন কাপড় পরিধান করতেন তখন (আল্লাহ্ পাকের শুকরিয়া প্রকাশের উদ্দেশ্যে) কাপড়টির একটি নাম রাখতেন। সেটি লুঙ্গি হোক কিংবা জামা কিংবা পাগড়ি। তারপর এ দু'আ পাঠ করতেন - اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ كَمَا .... وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهِ وَشَرِّمَا صُنِعَ لَهُ।
-হে আল্লাহ্! সকল হামদ ও প্রশংসা একমাত্র তোমারই জন্য। তুমি যেভাবে আমাকে এ কাপড় পরিধান করতে দিয়েছো, সেভাবে আমি তোমার শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। (হে আল্লাহ্!) আমি তোমার কাছে ঐ কাপড়ের কল্যাণ এবং এ কাপড় যে কাজের জন্য তৈরি করা হয়েছে সে কাজের কল্যাণ লাভের প্রার্থনা করছি। এবং আমি তোমার কাছে এ কাপড়ের অনিষ্টতা এবং কাপড়টি যে কাজের জন্য তৈরি সে কাজের অনিষ্টতা থেকে পানাহ চাই-অর্থাৎ এ কাপড় আমার জন্য যেন আত্মম্ভরিতা ও লোক দেখানোর কারণ না হয় এবং এ কাপড় পরিধান করে আমার থেকে যেনো কোন পাপ কাজ কিংবা অন্যায় আচরণ ঘটতে না পারে।

ফায়দা: যাবতীয় নিয়ামত তা প্রকাশ্য হোক আর অপ্রকাশ্য একমাত্র মহান আল্লাহ্ প্রদত্ত। কোন একটি নিয়ামতের উপর এই মহান স্রষ্টা ও মহান অধিপতির যতই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হোক তা তুচ্ছ ও নগণ্য। প্রত্যেক মানুষের জন্য কর্তব্য যে, তার মহান প্রভুর দেয়া এ নিয়ামতরাজির শুকরিয়া সকল অবস্থায় আদায় করে যাওয়া। শোকর আদায় করার দু'টি পদ্ধতি রয়েছে। প্রথম হলো, নিজের কাজকর্ম ও আমলের দ্বারা শুকরিয়া আদায় করা। অর্থাৎ এ নিয়ামতকে সঠিক স্থানে সঠিকভাবে ব্যবহার করবে। নিয়ামত দানের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য তথা আল্লাহ্ পাকের ইবাদত ও বন্দেগীর প্রতি যত্নবান হবে। দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো, মুখের দ্বারা এ জগত পালনকর্তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা। স্মরণ রাখতে হবে আল্লাহ্ পাকের প্রতিটি নিয়ামতকে যদি তাঁর নির্দেশ মোতাবেক ব্যবহার করা হয় তাহলে মানুষের জন্য সেই নিয়ামত কল্যাণ তথা ইবাদতে পরিণত হয়। বরং বলা চলে যে, তখন এটি পূর্বাপেক্ষা অধিকতর কল্যাণের কারণ হয়ে থাকে, অধিকতর কল্যাণের পথ খুলে দেয়। পক্ষান্তরে সেই নিয়ামত যদি তাঁর নির্দেশের বিপরীতে ব্যয় বা ব্যবহার করা হয় তখন সেটি মানুষের জন্য অনিষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। মানুষের নাফরমানী ও অবাধ্যতার পথ সুগম করে। কাজেই আল্লাহ্ পাকের কোন নিয়ামত লাভ হওয়ার মুহূর্তেই তাঁর কাছে নিয়ামতের কল্যাণের দু'আ করা এবং অনিষ্ট থেকে পানাহ চাওয়া উচিত। নবী -এর নতুন পোশাকের ব্যাপারটিও ছিল এরূপ। এ কারণেই তিনি উপরোক্ত দু'আ পাঠ করার শিক্ষা দিয়েছেন।

٢٤٣ عَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا اسْتَجَدَّ ثَيْبًا سَمَّاهُ بِاسْمِهِ قَمِيصًا كَانَ أَوْ إِزَارًا أَوْ عَمَامَةً، ثُمَّ يَقُولُ اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ كَسَوْتَنِي أَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِهِ وَخَيْرِ مَا صُنِعَ لَهُ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّمَا صُنِعَ لَهُ - قَالَ أَبُو نَصْرَةً وَكَانَ أَصْحَابُ رَسُولِ اللهِ ﷺ إِذَا رَأَى أَحَدَ عَلَى صَاحِبِهِ ثَوْبًا قَالَ تُبْلَى وَيُخْلِفُ اللهُ.

২৪৩, হযরত আবূ সাঈদ খুদ্রী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ যখন কোন নতুন পোশাক পরিধান করতেন তখন (কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে) সে পোশাকের নাম উল্লেখ করতেন। সেটি জামা হোক কিংবা লুঙ্গি কিংবা পাগড়ি। তারপর দু'আ পাঠ করতেন : اللهم لك الحمد - হে আল্লাহ্! واعوذ بك من شره وشر ما صنع له সকল প্রশংসা ও শুকরিয়া তোমারই জন্য। তুমি আমাকে এ পোশাক পরিধান করতে দিয়েছো। তোমার নিকট এ পোশাকের কল্যাণ এবং এ পোশাক যে কাজের জন্য তৈরি তার কল্যাণ লাভের প্রার্থনা করি। এবং আমি এ পোশাকের অনিষ্টতা ও যে কাজের জন্য পোশাকটি তৈরি করা হয়েছে সে কাজের অনিষ্টতা থেকে তোমার কাছে পানাহ চাই।

হযরত আবু নাদ্রা (র) বলেন, সাহাবাদের নিয়ম ছিলো তাঁরা নিজের সাথীদের কাউকে নতুন পোশাক পরিধান করতে দেখলে দু'আ করে বলতেন تبلى ويخلف الله - তুমি এ পোশাকটি আল্লাহর ইচ্ছায় পুরাতন হওয়া পর্যন্ত পরিধান কর। তারপর আল্লাহ্ তোমাকে এর পরিবর্তে নতুন পোশাক দান করবেন।

٢٤٤ عَنْ عُرْوَةَ بْنِ عَبْدِ اللهِ بْنِ قُشَيْرٍ حَدَّثَنِي مُعَاوِيَةَ بْنُ قُرَّةَ عَنْ أَبِيهِ قَالَ آتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ فِي رَهْطٍ مِنْ مُزَيْنَةَ فَبَايَعَنَاهُ وَإِنَّهُ لَمُطْلَقُ الْأَزْرَارِ فَادْخَلْتُ يَدِي فِي جَيْبِهِ فَمَسَسْتُ الْخَاتِمَ فَمَا رَأَيْتُ مُعَاوِيَةَ وَلَا ابْنَهُ فِي شِتَاءٍ وَلَاخَرُ إِلَّا مُطْلِقِي إِزْرَارِهِمَا لَا يَزُرَانِ أَبَدًا -

২৪৪. উরওয়া ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন কুশাইর (র) মুআবিয়া ইন্ন কুররা থেকে এবং তিনি তাঁর পিতা কুররা ইন ইয়াস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন; আমি মুযায়না গোত্রের একটি প্রতিনিধি দলের সাথে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর খিদমতে উপস্থিত হই। এবং আমরা তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করি। এ সময় নবী ﷺ-এর জামার বোতাম খোলা অবস্থায় ছিলো। আমি বরকত লাভের উদ্দেশ্যে নবী ﷺ-এর পেছনের উন্মুক্ত অংশে হাত রাখলাম। এবং তখন তাঁর মোহরে নবুওয়াত স্পর্শ করলাম। হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত উরওয়া বলেন, সে অনুযায়ী আমি কখনো হযরত মুআবিয়া ইব্‌ন কুররা কিংবা তাঁর পুত্রকে শীতের মৌসুমে হোক আর গরমের মৌসুমে হোক জামার বোতাম লাগানো অবস্থায় দেখিনি। তাঁর সর্বদা জামার বোতাম খোলা রাখতেন।

ফায়দা: এ হাদীস থেকে নবী-এর প্রতি সাহাবায়ে কিরামের সীমাহীন ভক্তি ও ভালবাসার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁদের এহেন অতিশয় ভালবাসা ও মুহব্বতের কারণে আজ পর্যন্ত নবী-এর প্রতিটি আচরণ ও প্রতিটি আমল অবিকৃত অবস্থায় সংরক্ষিত হয়ে আসছে। তাঁদের অবস্থা ছিলো এমন যে, যিনি নবী-কে জামার বোতাম খোলা অবস্থায় দেখেছেন তাঁর গোটা জীবনে কখনো জামায় বোতাম সংযুক্ত করেন নি। উভয় জগতের প্রেমাস্পদ নবী এর এক একটি আচরণ এ প্রক্রিয়ায়ই সংরক্ষিত হয়ে আসছে। সাহাবীগণ তাঁর প্রতিষ্ঠিত আমলের উপর নিজ নিজ জীবন অতিবাহিত করে দিয়েছেন। এ কারণে তাঁর শুধু শিক্ষাগুলিই নয় বরং তাঁর গোটা জীবনের সকল কিছু যথার্থভাবে সংরক্ষিত। বস্তুত এটি তাঁর সত্যিকার নবী হওয়ার একটি দলিল এবং তাঁর নবুওয়াতের একটি উজ্জ্বল মু'জিযা।

٢٤٥. عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ عَنْ أَبِيْهِ قُرَّةَ قَالَ أَتَيْتُ النَّبِيَّ ﷺ فِي رَهْطٍ مِنْ مُزَيْنَةَ وَإِنَّ قَمِيصَهُ لَمُطْلَقَ فَأَدْخَلْتُ يَدِى مِنْ حَبِيبٍ قَمِيصِهِ فَمَسِسْتُ الْخَاتِمِ .

২৪৫. হযরত মুআবিয়া ইব্‌ন কুরা তার পিতা কুরা ইব্‌ন ইয়াস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি মুযায়না গোত্রের একটি প্রতিনিধি দলের সাথে নবী-এর দরবারে উপস্থিত হই। এ সময় নবী-এর জামার বোতাম খোলা ছিল। কাজেই আমি আমার হাত তাঁর জামার অভ্যন্তরে প্রবিষ্ট করি এবং মোহরে নবুওয়াত স্পর্শ করি।

٢٤٦ . عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ ثَوْبَانِ خَسْنَانِ غَلِيظَانِ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ : إِنَّ ثَوبَيْكَ هُدَيْنِ خَسْنَانِ غَلِيْطَانِ تَرْشَحْ فِيهَا فَيَثْقُلَانِ عَلَيْكَ -

২৪৬. হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী-এর গায়ে খদ্দরের দু'টি মোটা জাতীয় বস্ত্র ছিল। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এ দু'টি বস্ত্র তো খুবই অসম ও মোটা জাতীয়। এগুলির দ্বারা আপনি ঘর্মাক্ত হয়ে যান। এগুলি আপনার শরীরের উপর আরো ভারী হয়ে দাঁড়ায়। (আপনি এগুলির পরিবর্তে কোন পাতলা বস্ত্র ব্যবহার করলে কত ভাল হতো।)

ফায়দা : এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, নবী-এর পোশাক-পরিচ্ছদে কোনই আড়ম্বর ছিল না। যখন যা মিলত তা-ই তিনি পরিধান করতেন। এতটুকুই নয়, বরং সাধারণভাবে তিনি সাদাসিধে ও মোটা কাপড়ের পোশাককেই অগ্রাধিকার দিতেন। তাঁর মধ্যে রাজকীয় জাঁকজমকপূর্ণ লৌকিকতা মোটেই ছিলো না। দুনিয়াদার বড়লোকেরা যেমন রাজকীয় জাঁকজমকপূর্ণ লৌকিকতা ও ভণিতা ইত্যাদি কামনা করে থাকে, নবী-এর মন-মানসিকতায় তার লেশমাত্রও ছিলো না। ইচ্ছা করলে উন্নত থেকে উন্নততর পোশাক জুটিয়ে নেয়া তাঁর জন্য মোটেই কষ্টকর ছিলো না। পরপর বিজয় লাভ এবং বিজয় পরবর্তী অগণিত ধন-সম্পদ তাঁর কদম মুবারক চুম্বন করছিলো। কখনো কখনো গনীমতের মালের বিশাল স্তূপ হয়ে যেতো। কিন্তু সন্ধ্যা হওয়ার পূর্বেই তিনি ফকীরদের মাঝে তা বণ্টন করে দিতেন। কোন কারণবশত যদি কিছু সম্পদ অবশিষ্ট থেকে যেত কিংবা তা গ্রহণ করার মতো কেউ উপস্থিত না থাকতো তা হলে সে রাতে তাঁর চোখে ঘুম থাকতো না।

আল্লাহ্ পাক সকল মুসলমানকে তাঁর আদর্শের পরিপূর্ণ অনুসরণের তাওফীক দান করুন। আমীন!

٢٤٧ . عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ الْحَسَنِ قَالَ كَانَ لِرَسُولِ اللَّهِ وَ شَوْيَانِ يَنْسُجَانِ فِي بَنِي النَّجَّارِ وَكَانَ يَخْتَلِفُ إِلَيْهَا يَقُولُ عَجِلُوا بِهِمَا عَلَيْنَا نَتَجَمَّلُ بِهِمَا فِي النَّاسِ -

২৪৭. হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন হাসান (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ -এর এমন দুটি বস্ত্র ছিলো যেগুলি বনু নাজ্জার গোত্রে তৈরি করা হতো। নবী তাদের কাপড় তৈরির কাজ দেখার জন্য তাদের সেখানে আসা-যাওয়া করতেন। তিনি তাদেরকে (উৎসাহ দিয়ে) বলতেন, কাপড়গুলি জলদি তৈরি করো। আমরা এগুলি পরিধান করে মানুষের মাঝে আল্লাহ্ পাকের দেয়া সৌন্দর্য প্রকাশ করি।

ফায়দা: আলোচ্য হাদীসে সেই সৌন্দর্য ও শালীনতা প্রকাশ করার আলোচনা করা হয়েছে, সেটি হলো সেই সৌন্দর্য ও শালীনতা যা সালাত আদায়কালে অবলম্বন করার জন্য আল্লাহ্ পাক নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে: يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِد হে আদম সন্তান! তোমরা সালাত আদায়কালে পোশাকের সৌন্দর্য ও শালীনতা অবলম্বন কর। এ কারণেই ফিকহবিদগণ লিখেছেন, মসজিদে সালাতের জন্য সুন্দর ও শালীন পোশাক পরিধান করে যাওয়া চাই। দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের কর্মনীতি এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা সাধারণভাবে মসজিদে যাওয়ার সময় ভিতর বাড়িতে ব্যবহৃত সেই সাধারণ ও সংক্ষিপ্ত পোশাকই নিয়ে প্রবেশ করি। অথচ এ পোশাকে পার্থিব কোন নেতা বা কর্তার নিকট গমন করা মোটেই পছন্দ করি না। আমাদের এ নীতি যেমন মহান আল্লাহ্ পাকের নির্দেশের বিপরীত তেমনি এটি মাহবুবে ইলাহী নবী -এর সুন্নতেরও বিরোধী।

📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ 📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নতুন পোশাক পরিধান করার বর্ণনা

📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নতুন পোশাক পরিধান করার বর্ণনা


٢٤٨ عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ أَبِي الأَسْوَدِ الْإِصْفَهَانِي قَالَ سَمِعْتُ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ يَقُولُ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ وَإِذَا اسْتَجَدَّ ثَوْبًا لَبِسَهُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ -

২৪৮. আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবুল আসওয়াদ আল ইস্ফাহানী (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত আনাস ইবন মালিক (রা)-কে বলতে শুানেছি যে, নবী ﷺ প্রথম কোনো নতুন পোশাক পরিধান করলে জুমু'আর দিনে শুরু করতেন।

ফায়দা : ইসলামে জুমু'আর দিনকে অত্যন্ত গুরুত্ব ও মর্যাদা দেয়া হয়েছে। জুমু'আর দিনটি مسلمانوں জন্য ছোট আকারের ঈদের দিন। তাই আল্লাহ্ তা'আলা জুমু'আর সালাত ঈদের সালাতের মত সম্মিলিতভাবে আদায় করা ফরয করেছেন, যাতে সমস্ত মুসলিম কোনো একটি বড় স্থানে সমবেত হয়ে জুমু'আর সালাত আদায় করে এবং পরস্পর দেখা-সাক্ষাত করতে ও একে অপরের খোঁজ-খবর নিতে পারে। বিভিন্ন হাদীসেও জুমু'আর সালাতের গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে। জুমু'আর দিন গোসল করা নতুন কিংবা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা এবং চুল কাটানো সুন্নত। জুমু'আর দিনের ইবাদত বন্দেগীর জন্যও বিরাট পুরস্কার ও সাওয়াব রয়েছে। হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জুমু'আর দিনে আল্লাহ্ তা'আলা এমন একটি সময় রেখেছেন যে, সে সময় বান্দা যে দু'আ করুক না কেন তা অবশ্যই কবুল করা হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমানে জুমু'আর গুরুত্ব একেবারেই হারিয়ে যাচ্ছে। বস্তুত দুই ঈদ ছাড়া মুসলিমদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আর কোন পর্ব বা দিন থাকলে তা হচ্ছে জুমু'আর দিন। সম্ভব হলে সেদিন নতুন পোশাক কিংবা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পবিত্র কাপড় পরিধান করা উচিত। এদিনেই অনুষ্ঠানাদি ও বিয়ে-শাদী এবং বেশি বেশি ইবাদত করা উচিত। বিশেষত নবী ﷺ-এর ওপর অনেক বেশি করে দরূদ ও সালাম পেশ করা কর্তব্য। কেননা, হাদীসে এ কাজের অনেক বেশি ফযিলত উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ্ তা'আলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথের হিদায়াত দান করুন।

٢٤٩ عَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا اسْتَجَدَّ ثَوْبًا سَمَّاهُ بِاسْمِهِ قَمِيصًا أَوْ رِدَاءً أَوْ عِمَامَةً ثُمَّ يَقُولُ اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ كَسَوْتَنِيْهِ أَسَالُكَ مِنْ خَيْرِهِ وَخَيْرِ مَا صُنِعَ لَهُ وَأَعُوذُبِكَ مِنْ شَرِّهِ وَشَرِّ مَا صُنِعَ لَهُ -

২৪৯. হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ﷺ যখনই কোনো নতুন পোশাক পরিধান করতেন তখন শোকর প্রকাশের উদ্দেশ্যে জামা, চাদর বা আমামা হিসেবে তার নামকরণ করতেন এবং পরে এই দু'আটি পড়তেন। (দু'আটির অনুবাদ ২৪৩ নং হাদীসে উল্লেখিত আছে।)

📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ 📄 নবী (সা)-এর জুব্বা মুবারক-এর বর্ণনা

📄 নবী (সা)-এর জুব্বা মুবারক-এর বর্ণনা


٢٥٠ عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ أَنَّ النَّبِيُّ كَانَتْ لَهُ جُبَّةٌ طَيَالِسَةٌ مَكْفُوفَةً بِالدِّيبَاجِ يَلْقَى فِيْهَا الْعَدُوُّ

২৫০. হযরত আসমা বিন্ত আবূ বাক্ (রা) বর্ণনা করেন যে, নবী-এর একটি তায়ালেসানী জুব্বা। (আয়তাকার ঢিলেঢালা জামা) ছিলো যার হাতায় রেশমী ফিতা লাগানো ছিলো। এটি পরিধান করে তিনি শত্রুদের সাথে লড়াই করতে যেতেন।

ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায় শত্রুর মনে ভীতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিধান করে যুদ্ধের ময়দানে গমন সুন্নত।

٢٥١ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّ ذَا يَزِنَ أَهْدَى إِلَى النَّبِيِّ ﷺ حُلَّةً أَشْتُرِيَتْ بِثَلَاثَةٍ وَثَلاثِينَ بَعِيْرًا فَلَبِسَهَا مَرَّةً .

২৫১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন যে, (হিমইয়ারের মুসলমান বাদশাহ্) যু-ইয়াযান নবীকে এমন একটি পোশাক হাদিয়া দিলেন যা তেত্রিশটি উটের বিনিময়ে খরিদ করা হয়েছিল। নবী এ কাপড় জোড়া একবার মাত্র পরিধান করেছিলেন।

ফায়দা: যেহেতু এই পোশাক সেট ছিলো একজন বাদশাহ্ প্রেরিত এবং মূল্যবান উপহার, তাই নবী তা একবার মাত্র পরিধান করে পরিত্যাগ করেছিলেন। পুনরায় আর কখনো তা পরিধান করেননি। কারণ তিনি অতি মূল্যবান জমকালো পোশাক-পরিচ্ছদ পছন্দ করতেন না। তিনি বলেছেন: অতি মূল্যবান ও জমকালো পোশাক কেবল তারাই পরিধান করে আখিরাতে যাদের কোন অংশ নেই।

٢٥٢ . عَنْ دَحِيَّةَ الْكَلْبِى أَنَّهُ أَهْدَى إِلَى النَّبِيَّ الجُبَّةٌ مِنَ الشَّامِ وَخُفْيْنِ فَلَبِسَهُمَا النَّبِيُّ حَتَّى تَخَرَّقَا فَلَمْ يُتَبَيَّنْ أَوْ لَمْ يُعْلَمْ أَذْكِيَانِ هُمَا أَوْ مَيْتَهُ حَتَّى تَخْرِقًا -

২৫২. হযরত দিহইয়া কালবী (রা) বর্ণনা করেন যে, তিনি নবী-কে শামদেশে (সিরিয়া) তৈরি একটি জুব্বা এবং দু'টি চামড়ার মোজা উপহার দিয়েছিলেন। তিনি ঐ মোজা দু'টি এত অধিক ব্যবহার করেছিলেন যে তা জীর্ণ হয়ে ফেটে গিয়েছিলো। কিংবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) তা মৃত জন্তুর চামড়া দ্বারা প্রস্তুত ছিলো না যবেহৃত জন্তুর চামড়া দ্বারা প্রস্তুত ছিল তা জানা যায়নি। কিন্তু ব্যাপক ব্যবহারে তা ফেটে গিয়েছিলো।

ফায়দা: এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী উপহার গ্রহণ করতেন। যতক্ষণ পর্যন্ত না কাফিরদের তৈরি দ্রব্যাদির নাপাক হওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত ও অকাট্যরূপে কোন কিছু জানা যায় ততক্ষণ তা নাপাক নয়। তাই নবী তাঁকে উপহার হিসেবে প্রদত্ত মোজা মৃত জন্তুর চামড়ায় প্রস্তুত ছিলো না যবেহকৃত জন্তুর চামড়ায় প্রস্তুত ছিলো সে সম্পর্কে অনুসন্ধান করার প্রয়োজন বোধ করেননি। কারণ, পাকা করার পর মৃত জন্তুর চামড়াও পবিত্র হয়ে যায়। সুতরাং উপহার দেয়া মোজা ব্যবহার করতে করতে ছিঁড়ে গিয়েছিল। হানাফীদের মতেও যে কোন চামড়া তা মৃত কিংবা যবেহৃত জন্তুর থেকে হোক পাকানোর পর পবিত্র হয়ে যায় এবং তা ব্যবহার করা বৈধ।

٢٥٣ عَنِ الْمُغِيرَةَ بْنِ شُعْبَةَ قَالَ خَرَجَ النَّبِيُّ لِبَعْضِ حَاجَتِهِ فَأَتْبَعْتُهُ بِادَاوَةٍ مِنْ مَاءٍ فَلَمَّا قَضَى حَاجَتَهُ قُمْتُ لأُوضِنَهُ وَعَلَيْهِ جُبَّةٌ رُومِيَّةً ضَيِّقَةُ الْكُمْ فَأَخْرَجَ يَدَهُ مِنْ تَحْتِهَا وطَرَحَهَا عَاتِقِهِ ثُمَّ تَوَضَّأَ وَمَسَحَ عَلَى خُفَّيْهِ وَالْخِمَارِ ثُمَّ صَلَّى -

২৫৩. হযরত মুগীরা ইন্ন শুবা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য বাইরে গেলে আমি একটি পাত্রে পানি নিয়ে তাঁর পেছনে পেছনে গেলাম। তিনি প্রয়োজন সেরে আসলে আমি তাঁকে ওযু করানোর জন্য এগিয়ে গেলাম। সে সময় তাঁর পরিধানে ছিলো একটি রূমী জুব্বা যার হাতা ছিলো অত্যন্ত সংকীর্ণ। তাই তিনি জুব্বা থেকে হাত বের করলেন এবং জুব্বাটা কাঁধের ওপর রেখে ওযু করলেন এবং মোজা ও মাথায় বাঁধা কাপড়ের ওপর মাসেহ করে সালাত পড়লেন।

ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী অন্যান্য দেশের তৈরি পোশাকও ব্যবহার করতেন। তিনি রোমের তৈরি জুব্বা পরিধান করেছিলেন। যেহেতু তার আস্তিন ছিলো অত্যন্ত সংকীর্ণ। তাই তিনি আস্তিন ওপরে টেনে তোলেননি বরং আস্তিনের মধ্য থেকে হাত বের করে জুব্বাটিকে কাঁধের ওপর রেখে ওযু করেছেন। এখানে শুধু জুব্বা সম্পর্কে বর্ণনাই গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য। তাই তিনি এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আনুষঙ্গিকভাবে এ হাদীসে মোজা এবং মাথার কাপড়ের ওপর মাসেহ করা সম্পর্কে যে উল্লেখ রয়েছে, ফিকহ্ গ্রন্থসমূহে তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে। এখানে সে সব মাসয়ালা বর্ণনা করার অবকাশ নেই। অধিকাংশ উলামার মতে শুধু পাগড়ি কিংবা রুমালের উপর মাসেহ করা এবং মাথা আদৌ মাসেহ না করা জায়েয নয়। এতে ওযু পরিশুদ্ধ হবে না।

٢٥٤ عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَتَوَضَّهُ وَعَلَيْهِ جبَّةٌ شَامِيَةٌ ضَيِّقَةُ الْكُمَيْنِ -

২৫৪. হযরত উমর ইবন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদিন নবী -কে ওযু করতে দেখলাম। সেই সময় তিনি রোমের তৈরি সংকীর্ণ হাতাওয়ালা জুব্বা পরিধান করেছিলেন।

٢٥٥. عَنِ الْمُغِيرَةِ قَالَ كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فِي سَفَرٍ فَذَهَبَ يَحْسُرُ عَنْ ذِرَاعَيْهِ مِنْ جُبَّةٍ رُؤْمِيَةٍ فَلَمْ يَخْرُجُ ذِرَاعَيْهِ فَأَخْرَجَهُمَا مِنْ تَحْتِ الْجُبَّةِ -

২৫৫. হযরত মুগীরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক সফরে আমরা রাসূলুল্লাহ্ -এর সাথে ছিলাম। তিনি রোমের তৈরি তাঁর পরিধানের জুব্বাটির হাতা ওপরে গুটাতে শুরু করলেন। কিন্তু হাতা সংকীর্ণ হওয়ার কারণে হাত বের করতে সক্ষম হলেন না। তখন নিজের হাত জুব্বার ভেতর থেকে বের করে ফেললেন।

٢٥٦. عَنْ أَبِي حُجَيْفَةَ قَالَ خَرَجَ النَّبِيُّ ﷺ وَعَلَيْهِ حُلَّةً حَمْرَاءُ مُشَمِّرًا -

২৫৬. হযরত আবূ হুজায়ফা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার নবী বাইরে বের হলে তাঁর গায়ে লাল ডোরা বিশিষ্ট পোশাক ছিলো এবং তা তাঁর পায়ের নলা পর্যন্ত উঠানো ছিলো।

ফায়দা: এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, নবী পায়ের নলা পর্যন্ত দীর্ঘ লাল পোশাক পরিধান করেছেন। পুরুষদের নিরেট লাল রঙের কাপড় পরিধান সম্পর্কে আলিমদের মধ্যে মতানৈক্য আছে। জুব্বাটি ছিলো লাল ডোরা বিশিষ্ট যা সবার মতেই জায়েয। নবী পায়ের গোছার মধ্যভাগ পর্যন্ত উঁচু পোশাক পরতেন। এটাই সুন্নত। পায়ের গিরা পর্যন্ত লম্বা পোশাক পরিধান করাও জায়েয। এর চেয়ে অধিক লম্বা পোশাক পরিধান করা মাকরূহ, কারণ তা কাফির ও অহংকারী লোকদের প্রতীক।

٢٥٧ . عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ رَأَيْتُ النَّبِيُّ ﷺ فِي لَيْلَةِ اضْحِيَانِ وَعَلَيْهِ حَلَّةً حَمَرَاء فَجَعَلْتُ أَنْظُرُ إِلَيْهِ وَإِلَى الْقَمَرِ فَلَهُوَ أَحْسَنُ فِي عَيْنِي مِنَ الْقَمَرِ -

২৫৭. হযরত জাবির ইব্‌ন সামুরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক চাঁদনি রাতে রাসূলুল্লাহ্-কে লাল ডোরা বিশিষ্ট পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখেছি। (তাঁর গায়ে ঐ পোশাকটি এতই সুন্দর মনে হচ্ছিলো যে) আমি একবার নবী-এর দিকে দেখছিলাম এবং আরেকবার চাঁদের দিকে তাকাচ্ছিলাম। আমার দৃষ্টিতে পূর্ণিমার চাঁদের চেয়ে নবী-কেই অধিক সুন্দর মনে হলো।

ফায়দা: এ হাদীসটিতেও নবী-এর লাল রঙের পোশাক পরিধান করার উল্লেখ আছে। তাই গ্রন্থকার এখানে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এ হাদীসটিতে নবী -এর পোশাকের বর্ণনার চেয়ে তাঁর দেহ মুবারকের সৌন্দর্যের বর্ণনা অনেক বেশি প্রকাশ পেয়েছে। রাসূলুল্লাহ্-এর অনুপম রূপ ও অতুলনীয় সৌন্দর্য পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও অধিক ছিলো তা হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীর অতিশয়োক্তি নয়। বরং বাস্তবেও তিনি তাই ছিলেন। প্রকৃত সত্য হলো, নবী-এর অতুলনীয় রূপ ও সৌন্দর্যের সঠিক অবস্থা ভাষায় বর্ণনা করা মানবীয় ক্ষমতার বাইরে। তাছাড়া যে কোন মুসলিমের আকীদা-বিশ্বাস হলো, গোটা সৃষ্টিজগতের মধ্যে নবী-এর রূপ ও সৌন্দর্য অদ্বিতীয়, অতুলনীয়। তাই এতে সন্দেহ নেই যে, মহান আল্লাহ্ নবী-কে বাতেনী ও রূহানী নূর ও তাজাল্লীর সাথে সাথে অতুলনীয় অনুপম রূপ ও সৌন্দর্য পূর্ণাঙ্গরূপে দিয়েছিলেন। হাফিয শীরাযী (র) সত্যই বলেছেন:

হাসান ইউসুফ ইয়াদ বায়দাউ দাম ঈসা দারী + আন্‌চে খোবান হামে দারান্দ তু তানহা দারী -

ইউসুফ (আ)-এর সৌন্দর্য, ঈসা (আ)-এর প্রাণসঞ্চারী বিশ্বাস ও মূসা (আ)-এর বিস্ময়কর শুভ্র হাত সবগুলো গুণ আপনার একার মধ্যেই রয়েছে।

٢٥٠ عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ أَنَّ النَّبِيُّ كَانَتْ لَهُ جُبَّةٌ طَيَالِسَةٌ مَكْفُوفَةً بِالدِّيبَاجِ يَلْقَى فِيْهَا الْعَدُوُّ

২৫০. হযরত আসমা বিন্ত আবূ বাক্ (রা) বর্ণনা করেন যে, নবী-এর একটি তায়ালেসানী জুব্বা। (আয়তাকার ঢিলেঢালা জামা) ছিলো যার হাতায় রেশমী ফিতা লাগানো ছিলো। এটি পরিধান করে তিনি শত্রুদের সাথে লড়াই করতে যেতেন।

ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায় শত্রুর মনে ভীতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিধান করে যুদ্ধের ময়দানে গমন সুন্নত।

٢٥١ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّ ذَا يَزِنَ أَهْدَى إِلَى النَّبِيِّ ﷺ حُلَّةً أَشْتُرِيَتْ بِثَلَاثَةٍ وَثَلاثِينَ بَعِيْرًا فَلَبِسَهَا مَرَّةً .

২৫১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন যে, (হিমইয়ারের মুসলমান বাদশাহ্) যু-ইয়াযান নবীকে এমন একটি পোশাক হাদিয়া দিলেন যা তেত্রিশটি উটের বিনিময়ে খরিদ করা হয়েছিল। নবী এ কাপড় জোড়া একবার মাত্র পরিধান করেছিলেন।

ফায়দা: যেহেতু এই পোশাক সেট ছিলো একজন বাদশাহ্ প্রেরিত এবং মূল্যবান উপহার, তাই নবী তা একবার মাত্র পরিধান করে পরিত্যাগ করেছিলেন। পুনরায় আর কখনো তা পরিধান করেননি। কারণ তিনি অতি মূল্যবান জমকালো পোশাক-পরিচ্ছদ পছন্দ করতেন না। তিনি বলেছেন: অতি মূল্যবান ও জমকালো পোশাক কেবল তারাই পরিধান করে আখিরাতে যাদের কোন অংশ নেই।

٢٥٢ . عَنْ دَحِيَّةَ الْكَلْبِى أَنَّهُ أَهْدَى إِلَى النَّبِيَّ الجُبَّةٌ مِنَ الشَّامِ وَخُفْيْنِ فَلَبِسَهُمَا النَّبِيُّ حَتَّى تَخَرَّقَا فَلَمْ يُتَبَيَّنْ أَوْ لَمْ يُعْلَمْ أَذْكِيَانِ هُمَا أَوْ مَيْتَهُ حَتَّى تَخْرِقًا -

২৫২. হযরত দিহইয়া কালবী (রা) বর্ণনা করেন যে, তিনি নবী-কে শামদেশে (সিরিয়া) তৈরি একটি জুব্বা এবং দু'টি চামড়ার মোজা উপহার দিয়েছিলেন। তিনি ঐ মোজা দু'টি এত অধিক ব্যবহার করেছিলেন যে তা জীর্ণ হয়ে ফেটে গিয়েছিলো। কিংবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) তা মৃত জন্তুর চামড়া দ্বারা প্রস্তুত ছিলো না যবেহৃত জন্তুর চামড়া দ্বারা প্রস্তুত ছিল তা জানা যায়নি। কিন্তু ব্যাপক ব্যবহারে তা ফেটে গিয়েছিলো।

ফায়দা: এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী উপহার গ্রহণ করতেন। যতক্ষণ পর্যন্ত না কাফিরদের তৈরি দ্রব্যাদির নাপাক হওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত ও অকাট্যরূপে কোন কিছু জানা যায় ততক্ষণ তা নাপাক নয়। তাই নবী তাঁকে উপহার হিসেবে প্রদত্ত মোজা মৃত জন্তুর চামড়ায় প্রস্তুত ছিলো না যবেহকৃত জন্তুর চামড়ায় প্রস্তুত ছিলো সে সম্পর্কে অনুসন্ধান করার প্রয়োজন বোধ করেননি। কারণ, পাকা করার পর মৃত জন্তুর চামড়াও পবিত্র হয়ে যায়। সুতরাং উপহার দেয়া মোজা ব্যবহার করতে করতে ছিঁড়ে গিয়েছিল। হানাফীদের মতেও যে কোন চামড়া তা মৃত কিংবা যবেহৃত জন্তুর থেকে হোক পাকানোর পর পবিত্র হয়ে যায় এবং তা ব্যবহার করা বৈধ।

٢٥٣ عَنِ الْمُغِيرَةَ بْنِ شُعْبَةَ قَالَ خَرَجَ النَّبِيُّ لِبَعْضِ حَاجَتِهِ فَأَتْبَعْتُهُ بِادَاوَةٍ مِنْ مَاءٍ فَلَمَّا قَضَى حَاجَتَهُ قُمْتُ لأُوضِنَهُ وَعَلَيْهِ جُبَّةٌ رُومِيَّةً ضَيِّقَةُ الْكُمْ فَأَخْرَجَ يَدَهُ مِنْ تَحْتِهَا وطَرَحَهَا عَاتِقِهِ ثُمَّ تَوَضَّأَ وَمَسَحَ عَلَى خُفَّيْهِ وَالْخِمَارِ ثُمَّ صَلَّى -

২৫৩. হযরত মুগীরা ইন্ন শুবা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য বাইরে গেলে আমি একটি পাত্রে পানি নিয়ে তাঁর পেছনে পেছনে গেলাম। তিনি প্রয়োজন সেরে আসলে আমি তাঁকে ওযু করানোর জন্য এগিয়ে গেলাম। সে সময় তাঁর পরিধানে ছিলো একটি রূমী জুব্বা যার হাতা ছিলো অত্যন্ত সংকীর্ণ। তাই তিনি জুব্বা থেকে হাত বের করলেন এবং জুব্বাটা কাঁধের ওপর রেখে ওযু করলেন এবং মোজা ও মাথায় বাঁধা কাপড়ের ওপর মাসেহ করে সালাত পড়লেন।

ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী অন্যান্য দেশের তৈরি পোশাকও ব্যবহার করতেন। তিনি রোমের তৈরি জুব্বা পরিধান করেছিলেন। যেহেতু তার আস্তিন ছিলো অত্যন্ত সংকীর্ণ। তাই তিনি আস্তিন ওপরে টেনে তোলেননি বরং আস্তিনের মধ্য থেকে হাত বের করে জুব্বাটিকে কাঁধের ওপর রেখে ওযু করেছেন। এখানে শুধু জুব্বা সম্পর্কে বর্ণনাই গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য। তাই তিনি এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আনুষঙ্গিকভাবে এ হাদীসে মোজা এবং মাথার কাপড়ের ওপর মাসেহ করা সম্পর্কে যে উল্লেখ রয়েছে, ফিকহ্ গ্রন্থসমূহে তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে। এখানে সে সব মাসয়ালা বর্ণনা করার অবকাশ নেই। অধিকাংশ উলামার মতে শুধু পাগড়ি কিংবা রুমালের উপর মাসেহ করা এবং মাথা আদৌ মাসেহ না করা জায়েয নয়। এতে ওযু পরিশুদ্ধ হবে না।

٢٥٤ عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَتَوَضَّهُ وَعَلَيْهِ جبَّةٌ شَامِيَةٌ ضَيِّقَةُ الْكُمَيْنِ -

২৫৪. হযরত উমর ইবন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদিন নবী -কে ওযু করতে দেখলাম। সেই সময় তিনি রোমের তৈরি সংকীর্ণ হাতাওয়ালা জুব্বা পরিধান করেছিলেন।

٢٥٥. عَنِ الْمُغِيرَةِ قَالَ كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فِي سَفَرٍ فَذَهَبَ يَحْسُرُ عَنْ ذِرَاعَيْهِ مِنْ جُبَّةٍ رُؤْمِيَةٍ فَلَمْ يَخْرُجُ ذِرَاعَيْهِ فَأَخْرَجَهُمَا مِنْ تَحْتِ الْجُبَّةِ -

২৫৫. হযরত মুগীরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক সফরে আমরা রাসূলুল্লাহ্ -এর সাথে ছিলাম। তিনি রোমের তৈরি তাঁর পরিধানের জুব্বাটির হাতা ওপরে গুটাতে শুরু করলেন। কিন্তু হাতা সংকীর্ণ হওয়ার কারণে হাত বের করতে সক্ষম হলেন না। তখন নিজের হাত জুব্বার ভেতর থেকে বের করে ফেললেন।

٢٥٦. عَنْ أَبِي حُجَيْفَةَ قَالَ خَرَجَ النَّبِيُّ ﷺ وَعَلَيْهِ حُلَّةً حَمْرَاءُ مُشَمِّرًا -

২৫৬. হযরত আবূ হুজায়ফা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার নবী বাইরে বের হলে তাঁর গায়ে লাল ডোরা বিশিষ্ট পোশাক ছিলো এবং তা তাঁর পায়ের নলা পর্যন্ত উঠানো ছিলো।

ফায়দা: এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, নবী পায়ের নলা পর্যন্ত দীর্ঘ লাল পোশাক পরিধান করেছেন। পুরুষদের নিরেট লাল রঙের কাপড় পরিধান সম্পর্কে আলিমদের মধ্যে মতানৈক্য আছে। জুব্বাটি ছিলো লাল ডোরা বিশিষ্ট যা সবার মতেই জায়েয। নবী পায়ের গোছার মধ্যভাগ পর্যন্ত উঁচু পোশাক পরতেন। এটাই সুন্নত। পায়ের গিরা পর্যন্ত লম্বা পোশাক পরিধান করাও জায়েয। এর চেয়ে অধিক লম্বা পোশাক পরিধান করা মাকরূহ, কারণ তা কাফির ও অহংকারী লোকদের প্রতীক।

٢٥٧ . عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ رَأَيْتُ النَّبِيُّ ﷺ فِي لَيْلَةِ اضْحِيَانِ وَعَلَيْهِ حَلَّةً حَمَرَاء فَجَعَلْتُ أَنْظُرُ إِلَيْهِ وَإِلَى الْقَمَرِ فَلَهُوَ أَحْسَنُ فِي عَيْنِي مِنَ الْقَمَرِ -

২৫৭. হযরত জাবির ইব্‌ন সামুরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক চাঁদনি রাতে রাসূলুল্লাহ্-কে লাল ডোরা বিশিষ্ট পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখেছি। (তাঁর গায়ে ঐ পোশাকটি এতই সুন্দর মনে হচ্ছিলো যে) আমি একবার নবী-এর দিকে দেখছিলাম এবং আরেকবার চাঁদের দিকে তাকাচ্ছিলাম। আমার দৃষ্টিতে পূর্ণিমার চাঁদের চেয়ে নবী-কেই অধিক সুন্দর মনে হলো।

ফায়দা: এ হাদীসটিতেও নবী-এর লাল রঙের পোশাক পরিধান করার উল্লেখ আছে। তাই গ্রন্থকার এখানে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এ হাদীসটিতে নবী -এর পোশাকের বর্ণনার চেয়ে তাঁর দেহ মুবারকের সৌন্দর্যের বর্ণনা অনেক বেশি প্রকাশ পেয়েছে। রাসূলুল্লাহ্-এর অনুপম রূপ ও অতুলনীয় সৌন্দর্য পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও অধিক ছিলো তা হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীর অতিশয়োক্তি নয়। বরং বাস্তবেও তিনি তাই ছিলেন। প্রকৃত সত্য হলো, নবী-এর অতুলনীয় রূপ ও সৌন্দর্যের সঠিক অবস্থা ভাষায় বর্ণনা করা মানবীয় ক্ষমতার বাইরে। তাছাড়া যে কোন মুসলিমের আকীদা-বিশ্বাস হলো, গোটা সৃষ্টিজগতের মধ্যে নবী-এর রূপ ও সৌন্দর্য অদ্বিতীয়, অতুলনীয়। তাই এতে সন্দেহ নেই যে, মহান আল্লাহ্ নবী-কে বাতেনী ও রূহানী নূর ও তাজাল্লীর সাথে সাথে অতুলনীয় অনুপম রূপ ও সৌন্দর্য পূর্ণাঙ্গরূপে দিয়েছিলেন। হাফিয শীরাযী (র) সত্যই বলেছেন:

হাসান ইউসুফ ইয়াদ বায়দাউ দাম ঈসা দারী + আন্‌চে খোবান হামে দারান্দ তু তানহা দারী -

ইউসুফ (আ)-এর সৌন্দর্য, ঈসা (আ)-এর প্রাণসঞ্চারী বিশ্বাস ও মূসা (আ)-এর বিস্ময়কর শুভ্র হাত সবগুলো গুণ আপনার একার মধ্যেই রয়েছে।

٢٥٠ عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ أَنَّ النَّبِيُّ كَانَتْ لَهُ جُبَّةٌ طَيَالِسَةٌ مَكْفُوفَةً بِالدِّيبَاجِ يَلْقَى فِيْهَا الْعَدُوُّ

২৫০. হযরত আসমা বিন্ত আবূ বাক্ (রা) বর্ণনা করেন যে, নবী-এর একটি তায়ালেসানী জুব্বা। (আয়তাকার ঢিলেঢালা জামা) ছিলো যার হাতায় রেশমী ফিতা লাগানো ছিলো। এটি পরিধান করে তিনি শত্রুদের সাথে লড়াই করতে যেতেন।

ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায় শত্রুর মনে ভীতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিধান করে যুদ্ধের ময়দানে গমন সুন্নত।

٢٥١ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّ ذَا يَزِنَ أَهْدَى إِلَى النَّبِيِّ ﷺ حُلَّةً أَشْتُرِيَتْ بِثَلَاثَةٍ وَثَلاثِينَ بَعِيْرًا فَلَبِسَهَا مَرَّةً .

২৫১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন যে, (হিমইয়ারের মুসলমান বাদশাহ্) যু-ইয়াযান নবীকে এমন একটি পোশাক হাদিয়া দিলেন যা তেত্রিশটি উটের বিনিময়ে খরিদ করা হয়েছিল। নবী এ কাপড় জোড়া একবার মাত্র পরিধান করেছিলেন।

ফায়দা: যেহেতু এই পোশাক সেট ছিলো একজন বাদশাহ্ প্রেরিত এবং মূল্যবান উপহার, তাই নবী তা একবার মাত্র পরিধান করে পরিত্যাগ করেছিলেন। পুনরায় আর কখনো তা পরিধান করেননি। কারণ তিনি অতি মূল্যবান জমকালো পোশাক-পরিচ্ছদ পছন্দ করতেন না। তিনি বলেছেন: অতি মূল্যবান ও জমকালো পোশাক কেবল তারাই পরিধান করে আখিরাতে যাদের কোন অংশ নেই।

٢٥٢ . عَنْ دَحِيَّةَ الْكَلْبِى أَنَّهُ أَهْدَى إِلَى النَّبِيَّ الجُبَّةٌ مِنَ الشَّامِ وَخُفْيْنِ فَلَبِسَهُمَا النَّبِيُّ حَتَّى تَخَرَّقَا فَلَمْ يُتَبَيَّنْ أَوْ لَمْ يُعْلَمْ أَذْكِيَانِ هُمَا أَوْ مَيْتَهُ حَتَّى تَخْرِقًا -

২৫২. হযরত দিহইয়া কালবী (রা) বর্ণনা করেন যে, তিনি নবী-কে শামদেশে (সিরিয়া) তৈরি একটি জুব্বা এবং দু'টি চামড়ার মোজা উপহার দিয়েছিলেন। তিনি ঐ মোজা দু'টি এত অধিক ব্যবহার করেছিলেন যে তা জীর্ণ হয়ে ফেটে গিয়েছিলো। কিংবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) তা মৃত জন্তুর চামড়া দ্বারা প্রস্তুত ছিলো না যবেহৃত জন্তুর চামড়া দ্বারা প্রস্তুত ছিল তা জানা যায়নি। কিন্তু ব্যাপক ব্যবহারে তা ফেটে গিয়েছিলো।

ফায়দা: এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী উপহার গ্রহণ করতেন। যতক্ষণ পর্যন্ত না কাফিরদের তৈরি দ্রব্যাদির নাপাক হওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত ও অকাট্যরূপে কোন কিছু জানা যায় ততক্ষণ তা নাপাক নয়। তাই নবী তাঁকে উপহার হিসেবে প্রদত্ত মোজা মৃত জন্তুর চামড়ায় প্রস্তুত ছিলো না যবেহকৃত জন্তুর চামড়ায় প্রস্তুত ছিলো সে সম্পর্কে অনুসন্ধান করার প্রয়োজন বোধ করেননি। কারণ, পাকা করার পর মৃত জন্তুর চামড়াও পবিত্র হয়ে যায়। সুতরাং উপহার দেয়া মোজা ব্যবহার করতে করতে ছিঁড়ে গিয়েছিল। হানাফীদের মতেও যে কোন চামড়া তা মৃত কিংবা যবেহৃত জন্তুর থেকে হোক পাকানোর পর পবিত্র হয়ে যায় এবং তা ব্যবহার করা বৈধ।

٢٥٣ عَنِ الْمُغِيرَةَ بْنِ شُعْبَةَ قَالَ خَرَجَ النَّبِيُّ لِبَعْضِ حَاجَتِهِ فَأَتْبَعْتُهُ بِادَاوَةٍ مِنْ مَاءٍ فَلَمَّا قَضَى حَاجَتَهُ قُمْتُ لأُوضِنَهُ وَعَلَيْهِ جُبَّةٌ رُومِيَّةً ضَيِّقَةُ الْكُمْ فَأَخْرَجَ يَدَهُ مِنْ تَحْتِهَا وطَرَحَهَا عَاتِقِهِ ثُمَّ تَوَضَّأَ وَمَسَحَ عَلَى خُفَّيْهِ وَالْخِمَارِ ثُمَّ صَلَّى -

২৫৩. হযরত মুগীরা ইন্ন শুবা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য বাইরে গেলে আমি একটি পাত্রে পানি নিয়ে তাঁর পেছনে পেছনে গেলাম। তিনি প্রয়োজন সেরে আসলে আমি তাঁকে ওযু করানোর জন্য এগিয়ে গেলাম। সে সময় তাঁর পরিধানে ছিলো একটি রূমী জুব্বা যার হাতা ছিলো অত্যন্ত সংকীর্ণ। তাই তিনি জুব্বা থেকে হাত বের করলেন এবং জুব্বাটা কাঁধের ওপর রেখে ওযু করলেন এবং মোজা ও মাথায় বাঁধা কাপড়ের ওপর মাসেহ করে সালাত পড়লেন।

ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী অন্যান্য দেশের তৈরি পোশাকও ব্যবহার করতেন। তিনি রোমের তৈরি জুব্বা পরিধান করেছিলেন। যেহেতু তার আস্তিন ছিলো অত্যন্ত সংকীর্ণ। তাই তিনি আস্তিন ওপরে টেনে তোলেননি বরং আস্তিনের মধ্য থেকে হাত বের করে জুব্বাটিকে কাঁধের ওপর রেখে ওযু করেছেন। এখানে শুধু জুব্বা সম্পর্কে বর্ণনাই গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য। তাই তিনি এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আনুষঙ্গিকভাবে এ হাদীসে মোজা এবং মাথার কাপড়ের ওপর মাসেহ করা সম্পর্কে যে উল্লেখ রয়েছে, ফিকহ্ গ্রন্থসমূহে তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে। এখানে সে সব মাসয়ালা বর্ণনা করার অবকাশ নেই। অধিকাংশ উলামার মতে শুধু পাগড়ি কিংবা রুমালের উপর মাসেহ করা এবং মাথা আদৌ মাসেহ না করা জায়েয নয়। এতে ওযু পরিশুদ্ধ হবে না।

٢٥٤ عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَتَوَضَّهُ وَعَلَيْهِ جبَّةٌ شَامِيَةٌ ضَيِّقَةُ الْكُمَيْنِ -

২৫৪. হযরত উমর ইবন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদিন নবী -কে ওযু করতে দেখলাম। সেই সময় তিনি রোমের তৈরি সংকীর্ণ হাতাওয়ালা জুব্বা পরিধান করেছিলেন।

٢٥٥. عَنِ الْمُغِيرَةِ قَالَ كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فِي سَفَرٍ فَذَهَبَ يَحْسُرُ عَنْ ذِرَاعَيْهِ مِنْ جُبَّةٍ رُؤْمِيَةٍ فَلَمْ يَخْرُجُ ذِرَاعَيْهِ فَأَخْرَجَهُمَا مِنْ تَحْتِ الْجُبَّةِ -

২৫৫. হযরত মুগীরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক সফরে আমরা রাসূলুল্লাহ্ -এর সাথে ছিলাম। তিনি রোমের তৈরি তাঁর পরিধানের জুব্বাটির হাতা ওপরে গুটাতে শুরু করলেন। কিন্তু হাতা সংকীর্ণ হওয়ার কারণে হাত বের করতে সক্ষম হলেন না। তখন নিজের হাত জুব্বার ভেতর থেকে বের করে ফেললেন।

٢٥٦. عَنْ أَبِي حُجَيْفَةَ قَالَ خَرَجَ النَّبِيُّ ﷺ وَعَلَيْهِ حُلَّةً حَمْرَاءُ مُشَمِّرًا -

২৫৬. হযরত আবূ হুজায়ফা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার নবী বাইরে বের হলে তাঁর গায়ে লাল ডোরা বিশিষ্ট পোশাক ছিলো এবং তা তাঁর পায়ের নলা পর্যন্ত উঠানো ছিলো।

ফায়দা: এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, নবী পায়ের নলা পর্যন্ত দীর্ঘ লাল পোশাক পরিধান করেছেন। পুরুষদের নিরেট লাল রঙের কাপড় পরিধান সম্পর্কে আলিমদের মধ্যে মতানৈক্য আছে। জুব্বাটি ছিলো লাল ডোরা বিশিষ্ট যা সবার মতেই জায়েয। নবী পায়ের গোছার মধ্যভাগ পর্যন্ত উঁচু পোশাক পরতেন। এটাই সুন্নত। পায়ের গিরা পর্যন্ত লম্বা পোশাক পরিধান করাও জায়েয। এর চেয়ে অধিক লম্বা পোশাক পরিধান করা মাকরূহ, কারণ তা কাফির ও অহংকারী লোকদের প্রতীক।

٢٥٧ . عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ رَأَيْتُ النَّبِيُّ ﷺ فِي لَيْلَةِ اضْحِيَانِ وَعَلَيْهِ حَلَّةً حَمَرَاء فَجَعَلْتُ أَنْظُرُ إِلَيْهِ وَإِلَى الْقَمَرِ فَلَهُوَ أَحْسَنُ فِي عَيْنِي مِنَ الْقَمَرِ -

২৫৭. হযরত জাবির ইব্‌ন সামুরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক চাঁদনি রাতে রাসূলুল্লাহ্-কে লাল ডোরা বিশিষ্ট পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখেছি। (তাঁর গায়ে ঐ পোশাকটি এতই সুন্দর মনে হচ্ছিলো যে) আমি একবার নবী-এর দিকে দেখছিলাম এবং আরেকবার চাঁদের দিকে তাকাচ্ছিলাম। আমার দৃষ্টিতে পূর্ণিমার চাঁদের চেয়ে নবী-কেই অধিক সুন্দর মনে হলো।

ফায়দা: এ হাদীসটিতেও নবী-এর লাল রঙের পোশাক পরিধান করার উল্লেখ আছে। তাই গ্রন্থকার এখানে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এ হাদীসটিতে নবী -এর পোশাকের বর্ণনার চেয়ে তাঁর দেহ মুবারকের সৌন্দর্যের বর্ণনা অনেক বেশি প্রকাশ পেয়েছে। রাসূলুল্লাহ্-এর অনুপম রূপ ও অতুলনীয় সৌন্দর্য পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও অধিক ছিলো তা হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীর অতিশয়োক্তি নয়। বরং বাস্তবেও তিনি তাই ছিলেন। প্রকৃত সত্য হলো, নবী-এর অতুলনীয় রূপ ও সৌন্দর্যের সঠিক অবস্থা ভাষায় বর্ণনা করা মানবীয় ক্ষমতার বাইরে। তাছাড়া যে কোন মুসলিমের আকীদা-বিশ্বাস হলো, গোটা সৃষ্টিজগতের মধ্যে নবী-এর রূপ ও সৌন্দর্য অদ্বিতীয়, অতুলনীয়। তাই এতে সন্দেহ নেই যে, মহান আল্লাহ্ নবী-কে বাতেনী ও রূহানী নূর ও তাজাল্লীর সাথে সাথে অতুলনীয় অনুপম রূপ ও সৌন্দর্য পূর্ণাঙ্গরূপে দিয়েছিলেন। হাফিয শীরাযী (র) সত্যই বলেছেন:

হাসান ইউসুফ ইয়াদ বায়দাউ দাম ঈসা দারী + আন্‌চে খোবান হামে দারান্দ তু তানহা দারী -

ইউসুফ (আ)-এর সৌন্দর্য, ঈসা (আ)-এর প্রাণসঞ্চারী বিশ্বাস ও মূসা (আ)-এর বিস্ময়কর শুভ্র হাত সবগুলো গুণ আপনার একার মধ্যেই রয়েছে।

٢٥٠ عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ أَنَّ النَّبِيُّ كَانَتْ لَهُ جُبَّةٌ طَيَالِسَةٌ مَكْفُوفَةً بِالدِّيبَاجِ يَلْقَى فِيْهَا الْعَدُوُّ

২৫০. হযরত আসমা বিন্ত আবূ বাক্ (রা) বর্ণনা করেন যে, নবী-এর একটি তায়ালেসানী জুব্বা। (আয়তাকার ঢিলেঢালা জামা) ছিলো যার হাতায় রেশমী ফিতা লাগানো ছিলো। এটি পরিধান করে তিনি শত্রুদের সাথে লড়াই করতে যেতেন।

ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায় শত্রুর মনে ভীতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিধান করে যুদ্ধের ময়দানে গমন সুন্নত।

٢٥١ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّ ذَا يَزِنَ أَهْدَى إِلَى النَّبِيِّ ﷺ حُلَّةً أَشْتُرِيَتْ بِثَلَاثَةٍ وَثَلاثِينَ بَعِيْرًا فَلَبِسَهَا مَرَّةً .

২৫১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন যে, (হিমইয়ারের মুসলমান বাদশাহ্) যু-ইয়াযান নবীকে এমন একটি পোশাক হাদিয়া দিলেন যা তেত্রিশটি উটের বিনিময়ে খরিদ করা হয়েছিল। নবী এ কাপড় জোড়া একবার মাত্র পরিধান করেছিলেন।

ফায়দা: যেহেতু এই পোশাক সেট ছিলো একজন বাদশাহ্ প্রেরিত এবং মূল্যবান উপহার, তাই নবী তা একবার মাত্র পরিধান করে পরিত্যাগ করেছিলেন। পুনরায় আর কখনো তা পরিধান করেননি। কারণ তিনি অতি মূল্যবান জমকালো পোশাক-পরিচ্ছদ পছন্দ করতেন না। তিনি বলেছেন: অতি মূল্যবান ও জমকালো পোশাক কেবল তারাই পরিধান করে আখিরাতে যাদের কোন অংশ নেই।

٢٥٢ . عَنْ دَحِيَّةَ الْكَلْبِى أَنَّهُ أَهْدَى إِلَى النَّبِيَّ الجُبَّةٌ مِنَ الشَّامِ وَخُفْيْنِ فَلَبِسَهُمَا النَّبِيُّ حَتَّى تَخَرَّقَا فَلَمْ يُتَبَيَّنْ أَوْ لَمْ يُعْلَمْ أَذْكِيَانِ هُمَا أَوْ مَيْتَهُ حَتَّى تَخْرِقًا -

২৫২. হযরত দিহইয়া কালবী (রা) বর্ণনা করেন যে, তিনি নবী-কে শামদেশে (সিরিয়া) তৈরি একটি জুব্বা এবং দু'টি চামড়ার মোজা উপহার দিয়েছিলেন। তিনি ঐ মোজা দু'টি এত অধিক ব্যবহার করেছিলেন যে তা জীর্ণ হয়ে ফেটে গিয়েছিলো। কিংবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) তা মৃত জন্তুর চামড়া দ্বারা প্রস্তুত ছিলো না যবেহৃত জন্তুর চামড়া দ্বারা প্রস্তুত ছিল তা জানা যায়নি। কিন্তু ব্যাপক ব্যবহারে তা ফেটে গিয়েছিলো।

ফায়দা: এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী উপহার গ্রহণ করতেন। যতক্ষণ পর্যন্ত না কাফিরদের তৈরি দ্রব্যাদির নাপাক হওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত ও অকাট্যরূপে কোন কিছু জানা যায় ততক্ষণ তা নাপাক নয়। তাই নবী তাঁকে উপহার হিসেবে প্রদত্ত মোজা মৃত জন্তুর চামড়ায় প্রস্তুত ছিলো না যবেহকৃত জন্তুর চামড়ায় প্রস্তুত ছিলো সে সম্পর্কে অনুসন্ধান করার প্রয়োজন বোধ করেননি। কারণ, পাকা করার পর মৃত জন্তুর চামড়াও পবিত্র হয়ে যায়। সুতরাং উপহার দেয়া মোজা ব্যবহার করতে করতে ছিঁড়ে গিয়েছিল। হানাফীদের মতেও যে কোন চামড়া তা মৃত কিংবা যবেহৃত জন্তুর থেকে হোক পাকানোর পর পবিত্র হয়ে যায় এবং তা ব্যবহার করা বৈধ।

٢٥٣ عَنِ الْمُغِيرَةَ بْنِ شُعْبَةَ قَالَ خَرَجَ النَّبِيُّ لِبَعْضِ حَاجَتِهِ فَأَتْبَعْتُهُ بِادَاوَةٍ مِنْ مَاءٍ فَلَمَّا قَضَى حَاجَتَهُ قُمْتُ لأُوضِنَهُ وَعَلَيْهِ جُبَّةٌ رُومِيَّةً ضَيِّقَةُ الْكُمْ فَأَخْرَجَ يَدَهُ مِنْ تَحْتِهَا وطَرَحَهَا عَاتِقِهِ ثُمَّ تَوَضَّأَ وَمَسَحَ عَلَى خُفَّيْهِ وَالْخِمَارِ ثُمَّ صَلَّى -

২৫৩. হযরত মুগীরা ইন্ন শুবা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য বাইরে গেলে আমি একটি পাত্রে পানি নিয়ে তাঁর পেছনে পেছনে গেলাম। তিনি প্রয়োজন সেরে আসলে আমি তাঁকে ওযু করানোর জন্য এগিয়ে গেলাম। সে সময় তাঁর পরিধানে ছিলো একটি রূমী জুব্বা যার হাতা ছিলো অত্যন্ত সংকীর্ণ। তাই তিনি জুব্বা থেকে হাত বের করলেন এবং জুব্বাটা কাঁধের ওপর রেখে ওযু করলেন এবং মোজা ও মাথায় বাঁধা কাপড়ের ওপর মাসেহ করে সালাত পড়লেন।

ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী অন্যান্য দেশের তৈরি পোশাকও ব্যবহার করতেন। তিনি রোমের তৈরি জুব্বা পরিধান করেছিলেন। যেহেতু তার আস্তিন ছিলো অত্যন্ত সংকীর্ণ। তাই তিনি আস্তিন ওপরে টেনে তোলেননি বরং আস্তিনের মধ্য থেকে হাত বের করে জুব্বাটিকে কাঁধের ওপর রেখে ওযু করেছেন। এখানে শুধু জুব্বা সম্পর্কে বর্ণনাই গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য। তাই তিনি এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আনুষঙ্গিকভাবে এ হাদীসে মোজা এবং মাথার কাপড়ের ওপর মাসেহ করা সম্পর্কে যে উল্লেখ রয়েছে, ফিকহ্ গ্রন্থসমূহে তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে। এখানে সে সব মাসয়ালা বর্ণনা করার অবকাশ নেই। অধিকাংশ উলামার মতে শুধু পাগড়ি কিংবা রুমালের উপর মাসেহ করা এবং মাথা আদৌ মাসেহ না করা জায়েয নয়। এতে ওযু পরিশুদ্ধ হবে না।

٢٥٤ عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَتَوَضَّهُ وَعَلَيْهِ جبَّةٌ شَامِيَةٌ ضَيِّقَةُ الْكُمَيْنِ -

২৫৪. হযরত উমর ইবন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদিন নবী -কে ওযু করতে দেখলাম। সেই সময় তিনি রোমের তৈরি সংকীর্ণ হাতাওয়ালা জুব্বা পরিধান করেছিলেন।

٢٥٥. عَنِ الْمُغِيرَةِ قَالَ كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فِي سَفَرٍ فَذَهَبَ يَحْسُرُ عَنْ ذِرَاعَيْهِ مِنْ جُبَّةٍ رُؤْمِيَةٍ فَلَمْ يَخْرُجُ ذِرَاعَيْهِ فَأَخْرَجَهُمَا مِنْ تَحْتِ الْجُبَّةِ -

২৫৫. হযরত মুগীরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক সফরে আমরা রাসূলুল্লাহ্ -এর সাথে ছিলাম। তিনি রোমের তৈরি তাঁর পরিধানের জুব্বাটির হাতা ওপরে গুটাতে শুরু করলেন। কিন্তু হাতা সংকীর্ণ হওয়ার কারণে হাত বের করতে সক্ষম হলেন না। তখন নিজের হাত জুব্বার ভেতর থেকে বের করে ফেললেন।

٢٥٦. عَنْ أَبِي حُجَيْفَةَ قَالَ خَرَجَ النَّبِيُّ ﷺ وَعَلَيْهِ حُلَّةً حَمْرَاءُ مُشَمِّرًا -

২৫৬. হযরত আবূ হুজায়ফা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার নবী বাইরে বের হলে তাঁর গায়ে লাল ডোরা বিশিষ্ট পোশাক ছিলো এবং তা তাঁর পায়ের নলা পর্যন্ত উঠানো ছিলো।

ফায়দা: এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, নবী পায়ের নলা পর্যন্ত দীর্ঘ লাল পোশাক পরিধান করেছেন। পুরুষদের নিরেট লাল রঙের কাপড় পরিধান সম্পর্কে আলিমদের মধ্যে মতানৈক্য আছে। জুব্বাটি ছিলো লাল ডোরা বিশিষ্ট যা সবার মতেই জায়েয। নবী পায়ের গোছার মধ্যভাগ পর্যন্ত উঁচু পোশাক পরতেন। এটাই সুন্নত। পায়ের গিরা পর্যন্ত লম্বা পোশাক পরিধান করাও জায়েয। এর চেয়ে অধিক লম্বা পোশাক পরিধান করা মাকরূহ, কারণ তা কাফির ও অহংকারী লোকদের প্রতীক।

٢٥٧ . عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ رَأَيْتُ النَّبِيُّ ﷺ فِي لَيْلَةِ اضْحِيَانِ وَعَلَيْهِ حَلَّةً حَمَرَاء فَجَعَلْتُ أَنْظُرُ إِلَيْهِ وَإِلَى الْقَمَرِ فَلَهُوَ أَحْسَنُ فِي عَيْنِي مِنَ الْقَمَرِ -

২৫৭. হযরত জাবির ইব্‌ন সামুরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক চাঁদনি রাতে রাসূলুল্লাহ্-কে লাল ডোরা বিশিষ্ট পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখেছি। (তাঁর গায়ে ঐ পোশাকটি এতই সুন্দর মনে হচ্ছিলো যে) আমি একবার নবী-এর দিকে দেখছিলাম এবং আরেকবার চাঁদের দিকে তাকাচ্ছিলাম। আমার দৃষ্টিতে পূর্ণিমার চাঁদের চেয়ে নবী-কেই অধিক সুন্দর মনে হলো।

ফায়দা: এ হাদীসটিতেও নবী-এর লাল রঙের পোশাক পরিধান করার উল্লেখ আছে। তাই গ্রন্থকার এখানে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এ হাদীসটিতে নবী -এর পোশাকের বর্ণনার চেয়ে তাঁর দেহ মুবারকের সৌন্দর্যের বর্ণনা অনেক বেশি প্রকাশ পেয়েছে। রাসূলুল্লাহ্-এর অনুপম রূপ ও অতুলনীয় সৌন্দর্য পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও অধিক ছিলো তা হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীর অতিশয়োক্তি নয়। বরং বাস্তবেও তিনি তাই ছিলেন। প্রকৃত সত্য হলো, নবী-এর অতুলনীয় রূপ ও সৌন্দর্যের সঠিক অবস্থা ভাষায় বর্ণনা করা মানবীয় ক্ষমতার বাইরে। তাছাড়া যে কোন মুসলিমের আকীদা-বিশ্বাস হলো, গোটা সৃষ্টিজগতের মধ্যে নবী-এর রূপ ও সৌন্দর্য অদ্বিতীয়, অতুলনীয়। তাই এতে সন্দেহ নেই যে, মহান আল্লাহ্ নবী-কে বাতেনী ও রূহানী নূর ও তাজাল্লীর সাথে সাথে অতুলনীয় অনুপম রূপ ও সৌন্দর্য পূর্ণাঙ্গরূপে দিয়েছিলেন। হাফিয শীরাযী (র) সত্যই বলেছেন:

হাসান ইউসুফ ইয়াদ বায়দাউ দাম ঈসা দারী + আন্‌চে খোবান হামে দারান্দ তু তানহা দারী -

ইউসুফ (আ)-এর সৌন্দর্য, ঈসা (আ)-এর প্রাণসঞ্চারী বিশ্বাস ও মূসা (আ)-এর বিস্ময়কর শুভ্র হাত সবগুলো গুণ আপনার একার মধ্যেই রয়েছে।

📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ 📄 নবী (সা)-এর লুঙ্গি ও চাদরের বর্ণনা

📄 নবী (সা)-এর লুঙ্গি ও চাদরের বর্ণনা


٢٥٨ عَنْ أَبِي بُرْدَةَ قَالَ أَخْرَجَتْ إِلَيْنَا عَائِشَةُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا كِسَاءٌ مُلَبَّدًا وَإِزَارًا غَلِيْظًا فَقَالَتْ قُبِضَ رَسُولُ اللَّهِ فِي هَذَيْنِ -

২৫৮. হযরত আবূ বুরদা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত আয়েশা (রা) একখানা তালি লাগানো চাদর ও একখানা মোটা লুঙ্গি বের করে আমাদের দেখিয়ে বললেন, এই দু'খানা কাপড় পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ ওফাতপ্রাপ্ত হয়েছেন।

ফায়দা: এই হাদীসটিতে নবী-এর ব্যবহৃত লুঙ্গি ও চাদরের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এ থেকে জানা যায়, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত সরল-সহজ জীবন যাপন করতেন। নবী-এর যুগেই বিভিন্ন এলাকা বিজিত হতে শুরু হয়েছিলো। এই সময় তাঁর দরবারে ধনসম্পদের স্তূপ জমা হতো। কিন্তু তিনি তা অন্যদের মধ্যে বিলি-বণ্টন করে দিতেন এবং নিজে সাধারণ কিছু পরিধান করতেন। তবে কোন সময়ে বিশেষ কোন উপলক্ষে মূল্যবান পোশাকও পরতেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়, যা সাধারণত উপহার হিসেবে তাঁর কাছে আসতো। কিন্তু তিনি এসব পোশাক একবার মাত্র পরিধান করে কিংবা বিশেষ কোন উপলক্ষে পরিধান করে রেখে দিতেন। ইতোপূর্বে একটি হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইয়ামানের বাদশাহ যু-ইয়াযান তাঁকে এরূপ মূল্যবান এক সেট পোশাক পাঠালে তিনি একবার মাত্র তা পরিধান করেছিলেন পরে আর কখনো তা পরিধান করেননি। যাতে তাঁর পবিত্র জীবন গর্ব ও অহংকারের লেশমাত্র থেকে পবিত্র থাকে। তাঁর এই উত্তম আদর্শ অনুযায়ী উম্মতেরও আমল করা উচিত। তবে যে ক্ষেত্রে গর্ব ও অহংকারের আশংকা থাকবে না সেক্ষেত্রে কেবল আল্লাহ্ প্রদত্ত নিয়ামতের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর উদ্দেশ্যে মূল্যবান পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধানে কোন ক্ষতি নেই।

শরীরের নিচের অংশ ঢাকার জন্য যেসব পোশাক পরিধান করা হয় সে সব পোশাককে আরবীতে 'ইযার' বলা হয়। লুঙ্গি এবং পায়জামা দু'টিই এর অন্তর্ভুক্ত। 'রিদা (رداء) বা 'কিসা' (كساء) সে সব পোশাককে বলে যা শরীরের ওপরের অংশ ঢাকার জন্য ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের প্রতিটি সুতি বা পশমী বস্ত্রকে 'রিদা' এবং পশমী চাদর বা হাল্কা কম্বলকে 'কিসা' বলা হয়।

রাসূলুল্লাহ্ সাধারণত লুঙ্গি পরিধান করতেন। এটাই ছিলো আরবের সাধারণ পোশাক। তিনি কখনো পায়জামা পরেছেন কিনা সে বিষয়ে দ্বিমত রয়েছে। তবে তিনি যে পায়জামা খরিদ করেছিলেন তা নিশ্চিত। বিশুদ্ধ রিওয়ায়াতের মাধ্যমে প্রমাণিত, তিনি পায়জামার প্রশংসা করেছেন এই বলে যে, এর দ্বারা সতর ঢাকার কাজটি অধিক সুন্দরভাবে হয়। পরবর্তীকালে দুনিয়ার বিভিন্ন জাতির মধ্যে ইসলাম যতই ছড়িয়ে পড়েছে সাহাবা কেরাম বিজিত এলাকাসমূহে তত বেশি বসতি স্থাপন করেছেন এবং সাথে সাথে সেখানে পায়জামার প্রচলনও বৃদ্ধি পেয়েছে।

٢٥٩ . عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ ذَاتَ غَدَاةٍ إِلَى الْمَسْجِدِ وَعَلَيْهِ مِرْطٌ مُرَحِلُ مِنْ شَعَرٍ أَسْوَدَ -

২৫৯. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন সকাল বেলা রাসূলুল্লাহ্ মসজিদে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলেন। সেই সময় তাঁর গায়ে ছিলো কালো পশমের তৈরি নক্শাদার কম্বল।

ফায়দা : এ হাদীসে নবী-এর কম্বলের বর্ণনা আছে। তিনি কালো পশমের তৈরি নক্শাদার কম্বল ব্যবহার করেছেন।

٢٦٠ . عَنْ سَلَمَةَ بْنِ الْأَكْوَعِ قَالَ بَعَثَ النَّبِيُّ عُثْمَانَ بْنَ عَفَّانٍ إِلَى مَكَّةَ فَأَجَارَهُ آبَانُ بْنُ سَعِيدٍ فَقَالَ يَا ابْنَ عَمِّ أَلا أَرَاكَ مُتَخَشِعًا أَسْبِلَ كَمَا يُسْبِلُ قَوْمُكَ قَالَ هُكَذَا يَأْتَزِرُ صَاحِبُنَا إِلَى نِصْفِ سَاقَيْهِ -

২৬০. হযরত সালামা ইব্‌ন আকওয়া (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (হুদায়বিয়ার সন্ধির পূর্বে) নবী উসমান ইব্‌ন আফফান (রা)-কে মক্কায় পাঠালে আবান ইব্‌ন সাঈদ তাঁকে নিজের আশ্রয়ে থাকতে দিলেন এবং বললেন, হে আমার চাচাতো ভাই! তুমি এরূপ বিনম্রতা অবলম্বন করেছো কেন। তুমি তোমার পরিধেয় বস্ত্র তোমার কাওমের লোকজনের মত নিচে লটকিয়ে পরিধান করো। উসমান (রা) বললেন, আমাদের সরদার রাসূলুল্লাহ এভাবে পায়ের নলার অর্ধেক পর্যন্ত উঁচু করে লুঙ্গি পরে থাকেন।

ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী ও সমস্ত সাহাবায়ে কিরাম অহংকার থেকে দূরে থাকার জন্য লুঙ্গি ও পায়জামা পায়ের নলার অর্ধেক পর্যন্ত উঁচু করে পরতেন। এটাই ইসলামের পদ্ধতি। পক্ষান্তরে কাফির ও মুশরিকরা অহংকার ও গর্বিত ভঙ্গিতে মাটি ছোঁয়া করে লুঙ্গি পরিধান করতো। এটাই ছিলো কুফরীর প্রতীক। অহংকারী লোকেরাই আজকাল ভূমি পর্যন্ত লটকিয়ে লুঙ্গি, পায়জামা, সেলোয়ার এমনকি প্যান্ট পরাকেও মর্যাদার ব্যাপার বলে মনে করে। অপরদিকে নেক্কার পরহেযগার ও দীনদার মুসলমানরা পায়জামা পায়ের গিরার ওপরে পরিধান করে থাকেন। সালাতের অবস্থায় পায়ের গিরার নিচে লুঙ্গি অথবা পায়জামা পরিধান মাকরূহ তাহরীমী।

٢٦١ عَنِ الْأَشْعَثِ بْنِ سُلَيْمٍ قَالَ سَمِعْتُ عَمَّتِي تَحَدِّثُ عَنْ عَمِّهَا أَنَّهُ رَأَى إِذَارِ رَسُولِ اللهِ أَسْفَلَ إِلَى نِصْفِ السَّاقِ -

২৬১. হযরত আশআস ইব্‌ন সুলাইম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার ফুফুকে তাঁর চাচার নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করতে শুনেছি। তাঁর চাচা দেখেছেন, রাসূলুল্লাহ্-এর পরনের লুঙ্গি তাঁর পায়ের নলার অর্ধেক নিচে পর্যন্ত ঝুলে ছিলো।

٢٦٢ عَنْ عُبَيْدَةَ قَالَ قَدِمْتُ الْمَدِينَةَ فَرَأَيْتُ إِزَارَ رَسُولِ اللَّهِ وَ أَسْفَلَ مِنْ عَضَلَةِ السَّاقِ -

২৬২. হযরত উবায়দা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মদীনায় এসে দেখলাম, রাসূলুল্লাহ্-এর পরনের লুঙ্গি তাঁর পায়ের গোছার নিচে পর্যন্ত নামানো।

٢٦٣ . عَنْ جَابِرٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ وَاللَّهِ إِذَا أَتْزَرَ يَضَعُ صَنَفَةً إِزَارِهِ عَلَى فَحْدِهِ الْيُسْرى -

২৬৩. হয়রত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ লুঙ্গি পরিধান করলে লুঙ্গির প্রান্তের অর্ধাংশ তাঁর বাম উরুর ওপর রাখতেন (যাতে চলার সময় খুলে না যায়)।

٢٦٤. عَنْ أَبِي الْعَالِيَةِ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ كَانَ إِزَارَهُ إِلَى نِصْفِ سَاقَيْهِ وَكَانَ لَهُ إِزَارَ قَدْ أَسْبَلَ خُيُوطَةٌ فَلَمْ يَجْزَهُ وَلَمْ يَكْفُهُ .

২৬৪. আবুল আলীয়া (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্-এর লুঙ্গি পায়ের নলার অর্ধাংশ পর্যন্ত থাকতো। তাছাড়া তাঁর একটি লুঙ্গির সুতা ঝুলে ছিল। তিনি সেগুলি কেটেও ফেলেন নি কিংবা সেলাই করে আটকিয়েও দেননি।

٢٦٥. أَخْبَرَنَا عِكْرِمَةٌ قَالَ رَأَيْتُ ابْنَ عَّبَّاسٍ يَا تَزِرُ فَيَضَعُ حَاشِيَةَ إِزَارِهِ مِنْ مُقَدَّمِهِ عَلَى ظَهْرِ قَدَمِهِ وَيَرْفَعُ مُؤَخَّرُهُ فَقُلْتُ مَا هَذِهِ الْإِزَارَةُ ؟ فَقَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَا تَزِرُهَا -

২৬৫. ইকরিমা (র) বর্ণনা করেন: আমি আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রা)-কে দেখেছি তিনি লুঙ্গির সম্মুখ ও প্রান্তভাগ পায়ের উপর ঝুলিয়ে পরতেন এবং পেছনের অংশ উঁচু রাখতেন। আমি তাঁকে বললাম, এটা লুঙ্গি পরিধানের কোন্ নিয়ম? তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-কে এভাবেই লুঙ্গি পরিধান করতে দেখেছি।

ফায়দা : সাহাবায়ে কিরাম (রা) রাসূলুল্লাহ্-কে যেভাবে কাজকর্ম করতে দেখতেন নিজেরাও সেভাবেই তা করার অভ্যাস গড়ে তুলতেন। সুতরাং ইব্‌ন আব্বাস (রা) শেষ বয়সে নবী-এর শরীর মুবারক কিছুটা মোটা হয়ে যাওয়ার পর তাঁকে যেভাবে লুঙ্গি পরতে দেখেছেন তিনিও তা অনুসরণের জন্য সেভাবেই পরতে শুরু করেছিলেন এবং ইকরিমার প্রশ্নের জবাবে বলেছেন যে, আমি যেহেতু নবী-কে এভাবে লুঙ্গি পরতে দেখেছি তাই আমিও সেভাবেই পরে থাকি। সত্যিই প্রকৃত ভালবাসা ও ভালবাসার পাত্রের সাথে সম্পর্কের দাবি হলো, যিনি ভালবাসবেন তিনি প্রেমাস্পদের প্রতিটি ভঙ্গিকে আত্মস্থ করে নিবেন। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে এ আগ্রহ পূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিল। এ ব্যাপারে তাঁরা নিজেরাই ছিলেন উদাহরণ। মহান আল্লাহ্ সমস্ত মুসলিমকে তাঁর হাবীবের পূর্ণাঙ্গ আনুগত্যের তাওফীক দান করুন।

٢٦٦ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ أَبِي يَحْيِي مِثْلُهُ -

২৬৬. মুহাম্মদ ইব্‌ন আবু ইয়াহ্ইয়াও উপরে বর্ণিত হাদীসের অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন।

٢٦٧. عَنِ الْهُجَيْمِي أَنَّهُ لَقِي رَسُولَ اللهِ ﷺ فَإِذَا هُوَ مُتَّزِرُ بِإِزَارٍ قُطْنٍ قَدْ انْتَثَرَتْ حَاشِيَتُهُ .

২৬৭. হযরত হুজায়মী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি একবার রাসূলুল্লাহ্ -এর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। সেই সময় তিনি এমন একখানা সুতি লুঙ্গি পরিহিত ছিলেন, যার প্রান্তভাগ ছিল এলোমেলো।

٢٦٨. عَنِ الْحَسَنِ الْبَصْرِى أَنَّ شَيْخًا مِنْ بَنِي سَلِيْطَ أَخْبَرَهُ قَالَ أَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ أَكَلِّمُهُ فِي شَيْءٍ أُصِيْبَ لَنَا فِي الْجَاهِلِيَّةِ - فَإِذَا هُوَ قَاعِدُ وَعَلَيْهِ حَلْقَةُ قَدْ أَطَافَتْ بِهِ وَهُوَ يُحَدِّثُ الْقَوْمَ وَعَلَيْهِ إِزَارُ قُطْنٍ لَهُ غَلِيْظٍ -

২৬৮. হাসান বসরী (র) থেকে বর্ণিত, (তিনি বলেন) বনী সালীত গোত্রের এক সম্মানিত ব্যক্তি আমাকে বলেন যে, আমি জাহেলী যুগে একটি বিষয়ে কথা বলার জন্য নবী -এর কাছে গেলাম। তিনি সে সময় উপবিষ্ট ছিলেন। তাঁর চারপাশে মানুষ বৃত্তাকারে বসেছিলো এবং তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে কথা বলছিলেন। সেই সময় তিনি একখানা মোটা সুতি লুঙ্গি পরেছিলেন।

ফায়দা: এ দু'টি হাদীস থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ খুব মোটা সুতি লুঙ্গিও পরিধান করেছেন।

٢٦٩. عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ أَخَذَ رَسُولُ اللهِ ﷺ كِسَاءً فَدَكِيًّا فَأَدَارَهُ عَلَيْهِمْ ثُمَّ قَالَ هُؤُلَاءِ أَهْلُ بَيْتِي وَحَامَتِي -

২৬৯. হযরত উম্মে সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ফাদাকে তৈরি একটি চাদর নিলেন এবং তার মধ্যে আহলে বায়তদেরকে নিয়ে বললেন, এরাই হচ্ছে আমার আহলে বায়ত এবং আমার পরিবার।

ফায়দা: এ হাদীসটিতেও যেহেতু রাসূলুল্লাহ্-এর চাদরের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, তাই সেই সূত্র ধরে গ্রন্থকার হাদীসটি এখানে উল্লেখ করেছেন। নবী -এর আহলে বায়তদেরকে চাদরের মধ্যে নেয়া সম্পর্কিত ঘটনা সবিস্তার জানার জন্য তাফসীর গ্রন্থ সমূহে সূরা আহযাবের يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ الْآيَةُ আয়াতটির ব্যাখ্যা দেখা যেতে পারে।

٢٥٨ عَنْ أَبِي بُرْدَةَ قَالَ أَخْرَجَتْ إِلَيْنَا عَائِشَةُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا كِسَاءٌ مُلَبَّدًا وَإِزَارًا غَلِيْظًا فَقَالَتْ قُبِضَ رَسُولُ اللَّهِ فِي هَذَيْنِ -

২৫৮. হযরত আবূ বুরদা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত আয়েশা (রা) একখানা তালি লাগানো চাদর ও একখানা মোটা লুঙ্গি বের করে আমাদের দেখিয়ে বললেন, এই দু'খানা কাপড় পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ ওফাতপ্রাপ্ত হয়েছেন।

ফায়দা: এই হাদীসটিতে নবী-এর ব্যবহৃত লুঙ্গি ও চাদরের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এ থেকে জানা যায়, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত সরল-সহজ জীবন যাপন করতেন। নবী-এর যুগেই বিভিন্ন এলাকা বিজিত হতে শুরু হয়েছিলো। এই সময় তাঁর দরবারে ধনসম্পদের স্তূপ জমা হতো। কিন্তু তিনি তা অন্যদের মধ্যে বিলি-বণ্টন করে দিতেন এবং নিজে সাধারণ কিছু পরিধান করতেন। তবে কোন সময়ে বিশেষ কোন উপলক্ষে মূল্যবান পোশাকও পরতেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়, যা সাধারণত উপহার হিসেবে তাঁর কাছে আসতো। কিন্তু তিনি এসব পোশাক একবার মাত্র পরিধান করে কিংবা বিশেষ কোন উপলক্ষে পরিধান করে রেখে দিতেন। ইতোপূর্বে একটি হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইয়ামানের বাদশাহ যু-ইয়াযান তাঁকে এরূপ মূল্যবান এক সেট পোশাক পাঠালে তিনি একবার মাত্র তা পরিধান করেছিলেন পরে আর কখনো তা পরিধান করেননি। যাতে তাঁর পবিত্র জীবন গর্ব ও অহংকারের লেশমাত্র থেকে পবিত্র থাকে। তাঁর এই উত্তম আদর্শ অনুযায়ী উম্মতেরও আমল করা উচিত। তবে যে ক্ষেত্রে গর্ব ও অহংকারের আশংকা থাকবে না সেক্ষেত্রে কেবল আল্লাহ্ প্রদত্ত নিয়ামতের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর উদ্দেশ্যে মূল্যবান পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধানে কোন ক্ষতি নেই।

শরীরের নিচের অংশ ঢাকার জন্য যেসব পোশাক পরিধান করা হয় সে সব পোশাককে আরবীতে 'ইযার' বলা হয়। লুঙ্গি এবং পায়জামা দু'টিই এর অন্তর্ভুক্ত। 'রিদা (رداء) বা 'কিসা' (كساء) সে সব পোশাককে বলে যা শরীরের ওপরের অংশ ঢাকার জন্য ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের প্রতিটি সুতি বা পশমী বস্ত্রকে 'রিদা' এবং পশমী চাদর বা হাল্কা কম্বলকে 'কিসা' বলা হয়।

রাসূলুল্লাহ্ সাধারণত লুঙ্গি পরিধান করতেন। এটাই ছিলো আরবের সাধারণ পোশাক। তিনি কখনো পায়জামা পরেছেন কিনা সে বিষয়ে দ্বিমত রয়েছে। তবে তিনি যে পায়জামা খরিদ করেছিলেন তা নিশ্চিত। বিশুদ্ধ রিওয়ায়াতের মাধ্যমে প্রমাণিত, তিনি পায়জামার প্রশংসা করেছেন এই বলে যে, এর দ্বারা সতর ঢাকার কাজটি অধিক সুন্দরভাবে হয়। পরবর্তীকালে দুনিয়ার বিভিন্ন জাতির মধ্যে ইসলাম যতই ছড়িয়ে পড়েছে সাহাবা কেরাম বিজিত এলাকাসমূহে তত বেশি বসতি স্থাপন করেছেন এবং সাথে সাথে সেখানে পায়জামার প্রচলনও বৃদ্ধি পেয়েছে।

٢٥٩ . عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ ذَاتَ غَدَاةٍ إِلَى الْمَسْجِدِ وَعَلَيْهِ مِرْطٌ مُرَحِلُ مِنْ شَعَرٍ أَسْوَدَ -

২৫৯. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন সকাল বেলা রাসূলুল্লাহ্ মসজিদে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলেন। সেই সময় তাঁর গায়ে ছিলো কালো পশমের তৈরি নক্শাদার কম্বল।

ফায়দা : এ হাদীসে নবী-এর কম্বলের বর্ণনা আছে। তিনি কালো পশমের তৈরি নক্শাদার কম্বল ব্যবহার করেছেন।

٢٦٠ . عَنْ سَلَمَةَ بْنِ الْأَكْوَعِ قَالَ بَعَثَ النَّبِيُّ عُثْمَانَ بْنَ عَفَّانٍ إِلَى مَكَّةَ فَأَجَارَهُ آبَانُ بْنُ سَعِيدٍ فَقَالَ يَا ابْنَ عَمِّ أَلا أَرَاكَ مُتَخَشِعًا أَسْبِلَ كَمَا يُسْبِلُ قَوْمُكَ قَالَ هُكَذَا يَأْتَزِرُ صَاحِبُنَا إِلَى نِصْفِ سَاقَيْهِ -

২৬০. হযরত সালামা ইব্‌ন আকওয়া (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (হুদায়বিয়ার সন্ধির পূর্বে) নবী উসমান ইব্‌ন আফফান (রা)-কে মক্কায় পাঠালে আবান ইব্‌ন সাঈদ তাঁকে নিজের আশ্রয়ে থাকতে দিলেন এবং বললেন, হে আমার চাচাতো ভাই! তুমি এরূপ বিনম্রতা অবলম্বন করেছো কেন। তুমি তোমার পরিধেয় বস্ত্র তোমার কাওমের লোকজনের মত নিচে লটকিয়ে পরিধান করো। উসমান (রা) বললেন, আমাদের সরদার রাসূলুল্লাহ এভাবে পায়ের নলার অর্ধেক পর্যন্ত উঁচু করে লুঙ্গি পরে থাকেন।

ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী ও সমস্ত সাহাবায়ে কিরাম অহংকার থেকে দূরে থাকার জন্য লুঙ্গি ও পায়জামা পায়ের নলার অর্ধেক পর্যন্ত উঁচু করে পরতেন। এটাই ইসলামের পদ্ধতি। পক্ষান্তরে কাফির ও মুশরিকরা অহংকার ও গর্বিত ভঙ্গিতে মাটি ছোঁয়া করে লুঙ্গি পরিধান করতো। এটাই ছিলো কুফরীর প্রতীক। অহংকারী লোকেরাই আজকাল ভূমি পর্যন্ত লটকিয়ে লুঙ্গি, পায়জামা, সেলোয়ার এমনকি প্যান্ট পরাকেও মর্যাদার ব্যাপার বলে মনে করে। অপরদিকে নেক্কার পরহেযগার ও দীনদার মুসলমানরা পায়জামা পায়ের গিরার ওপরে পরিধান করে থাকেন। সালাতের অবস্থায় পায়ের গিরার নিচে লুঙ্গি অথবা পায়জামা পরিধান মাকরূহ তাহরীমী।

٢٦١ عَنِ الْأَشْعَثِ بْنِ سُلَيْمٍ قَالَ سَمِعْتُ عَمَّتِي تَحَدِّثُ عَنْ عَمِّهَا أَنَّهُ رَأَى إِذَارِ رَسُولِ اللهِ أَسْفَلَ إِلَى نِصْفِ السَّاقِ -

২৬১. হযরত আশআস ইব্‌ন সুলাইম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার ফুফুকে তাঁর চাচার নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করতে শুনেছি। তাঁর চাচা দেখেছেন, রাসূলুল্লাহ্-এর পরনের লুঙ্গি তাঁর পায়ের নলার অর্ধেক নিচে পর্যন্ত ঝুলে ছিলো।

٢٦٢ عَنْ عُبَيْدَةَ قَالَ قَدِمْتُ الْمَدِينَةَ فَرَأَيْتُ إِزَارَ رَسُولِ اللَّهِ وَ أَسْفَلَ مِنْ عَضَلَةِ السَّاقِ -

২৬২. হযরত উবায়দা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মদীনায় এসে দেখলাম, রাসূলুল্লাহ্-এর পরনের লুঙ্গি তাঁর পায়ের গোছার নিচে পর্যন্ত নামানো।

٢٦٣ . عَنْ جَابِرٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ وَاللَّهِ إِذَا أَتْزَرَ يَضَعُ صَنَفَةً إِزَارِهِ عَلَى فَحْدِهِ الْيُسْرى -

২৬৩. হয়রত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ লুঙ্গি পরিধান করলে লুঙ্গির প্রান্তের অর্ধাংশ তাঁর বাম উরুর ওপর রাখতেন (যাতে চলার সময় খুলে না যায়)।

٢٦٤. عَنْ أَبِي الْعَالِيَةِ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ كَانَ إِزَارَهُ إِلَى نِصْفِ سَاقَيْهِ وَكَانَ لَهُ إِزَارَ قَدْ أَسْبَلَ خُيُوطَةٌ فَلَمْ يَجْزَهُ وَلَمْ يَكْفُهُ .

২৬৪. আবুল আলীয়া (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্-এর লুঙ্গি পায়ের নলার অর্ধাংশ পর্যন্ত থাকতো। তাছাড়া তাঁর একটি লুঙ্গির সুতা ঝুলে ছিল। তিনি সেগুলি কেটেও ফেলেন নি কিংবা সেলাই করে আটকিয়েও দেননি।

٢٦٥. أَخْبَرَنَا عِكْرِمَةٌ قَالَ رَأَيْتُ ابْنَ عَّبَّاسٍ يَا تَزِرُ فَيَضَعُ حَاشِيَةَ إِزَارِهِ مِنْ مُقَدَّمِهِ عَلَى ظَهْرِ قَدَمِهِ وَيَرْفَعُ مُؤَخَّرُهُ فَقُلْتُ مَا هَذِهِ الْإِزَارَةُ ؟ فَقَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَا تَزِرُهَا -

২৬৫. ইকরিমা (র) বর্ণনা করেন: আমি আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রা)-কে দেখেছি তিনি লুঙ্গির সম্মুখ ও প্রান্তভাগ পায়ের উপর ঝুলিয়ে পরতেন এবং পেছনের অংশ উঁচু রাখতেন। আমি তাঁকে বললাম, এটা লুঙ্গি পরিধানের কোন্ নিয়ম? তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-কে এভাবেই লুঙ্গি পরিধান করতে দেখেছি।

ফায়দা : সাহাবায়ে কিরাম (রা) রাসূলুল্লাহ্-কে যেভাবে কাজকর্ম করতে দেখতেন নিজেরাও সেভাবেই তা করার অভ্যাস গড়ে তুলতেন। সুতরাং ইব্‌ন আব্বাস (রা) শেষ বয়সে নবী-এর শরীর মুবারক কিছুটা মোটা হয়ে যাওয়ার পর তাঁকে যেভাবে লুঙ্গি পরতে দেখেছেন তিনিও তা অনুসরণের জন্য সেভাবেই পরতে শুরু করেছিলেন এবং ইকরিমার প্রশ্নের জবাবে বলেছেন যে, আমি যেহেতু নবী-কে এভাবে লুঙ্গি পরতে দেখেছি তাই আমিও সেভাবেই পরে থাকি। সত্যিই প্রকৃত ভালবাসা ও ভালবাসার পাত্রের সাথে সম্পর্কের দাবি হলো, যিনি ভালবাসবেন তিনি প্রেমাস্পদের প্রতিটি ভঙ্গিকে আত্মস্থ করে নিবেন। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে এ আগ্রহ পূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিল। এ ব্যাপারে তাঁরা নিজেরাই ছিলেন উদাহরণ। মহান আল্লাহ্ সমস্ত মুসলিমকে তাঁর হাবীবের পূর্ণাঙ্গ আনুগত্যের তাওফীক দান করুন।

٢٦٦ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ أَبِي يَحْيِي مِثْلُهُ -

২৬৬. মুহাম্মদ ইব্‌ন আবু ইয়াহ্ইয়াও উপরে বর্ণিত হাদীসের অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন।

٢٦٧. عَنِ الْهُجَيْمِي أَنَّهُ لَقِي رَسُولَ اللهِ ﷺ فَإِذَا هُوَ مُتَّزِرُ بِإِزَارٍ قُطْنٍ قَدْ انْتَثَرَتْ حَاشِيَتُهُ .

২৬৭. হযরত হুজায়মী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি একবার রাসূলুল্লাহ্ -এর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। সেই সময় তিনি এমন একখানা সুতি লুঙ্গি পরিহিত ছিলেন, যার প্রান্তভাগ ছিল এলোমেলো।

٢٦٨. عَنِ الْحَسَنِ الْبَصْرِى أَنَّ شَيْخًا مِنْ بَنِي سَلِيْطَ أَخْبَرَهُ قَالَ أَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ أَكَلِّمُهُ فِي شَيْءٍ أُصِيْبَ لَنَا فِي الْجَاهِلِيَّةِ - فَإِذَا هُوَ قَاعِدُ وَعَلَيْهِ حَلْقَةُ قَدْ أَطَافَتْ بِهِ وَهُوَ يُحَدِّثُ الْقَوْمَ وَعَلَيْهِ إِزَارُ قُطْنٍ لَهُ غَلِيْظٍ -

২৬৮. হাসান বসরী (র) থেকে বর্ণিত, (তিনি বলেন) বনী সালীত গোত্রের এক সম্মানিত ব্যক্তি আমাকে বলেন যে, আমি জাহেলী যুগে একটি বিষয়ে কথা বলার জন্য নবী -এর কাছে গেলাম। তিনি সে সময় উপবিষ্ট ছিলেন। তাঁর চারপাশে মানুষ বৃত্তাকারে বসেছিলো এবং তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে কথা বলছিলেন। সেই সময় তিনি একখানা মোটা সুতি লুঙ্গি পরেছিলেন।

ফায়দা: এ দু'টি হাদীস থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ খুব মোটা সুতি লুঙ্গিও পরিধান করেছেন।

٢٦٩. عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ أَخَذَ رَسُولُ اللهِ ﷺ كِسَاءً فَدَكِيًّا فَأَدَارَهُ عَلَيْهِمْ ثُمَّ قَالَ هُؤُلَاءِ أَهْلُ بَيْتِي وَحَامَتِي -

২৬৯. হযরত উম্মে সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ফাদাকে তৈরি একটি চাদর নিলেন এবং তার মধ্যে আহলে বায়তদেরকে নিয়ে বললেন, এরাই হচ্ছে আমার আহলে বায়ত এবং আমার পরিবার।

ফায়দা: এ হাদীসটিতেও যেহেতু রাসূলুল্লাহ্-এর চাদরের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, তাই সেই সূত্র ধরে গ্রন্থকার হাদীসটি এখানে উল্লেখ করেছেন। নবী -এর আহলে বায়তদেরকে চাদরের মধ্যে নেয়া সম্পর্কিত ঘটনা সবিস্তার জানার জন্য তাফসীর গ্রন্থ সমূহে সূরা আহযাবের يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ الْآيَةُ আয়াতটির ব্যাখ্যা দেখা যেতে পারে।

٢٥٨ عَنْ أَبِي بُرْدَةَ قَالَ أَخْرَجَتْ إِلَيْنَا عَائِشَةُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا كِسَاءٌ مُلَبَّدًا وَإِزَارًا غَلِيْظًا فَقَالَتْ قُبِضَ رَسُولُ اللَّهِ فِي هَذَيْنِ -

২৫৮. হযরত আবূ বুরদা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত আয়েশা (রা) একখানা তালি লাগানো চাদর ও একখানা মোটা লুঙ্গি বের করে আমাদের দেখিয়ে বললেন, এই দু'খানা কাপড় পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ ওফাতপ্রাপ্ত হয়েছেন।

ফায়দা: এই হাদীসটিতে নবী-এর ব্যবহৃত লুঙ্গি ও চাদরের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এ থেকে জানা যায়, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত সরল-সহজ জীবন যাপন করতেন। নবী-এর যুগেই বিভিন্ন এলাকা বিজিত হতে শুরু হয়েছিলো। এই সময় তাঁর দরবারে ধনসম্পদের স্তূপ জমা হতো। কিন্তু তিনি তা অন্যদের মধ্যে বিলি-বণ্টন করে দিতেন এবং নিজে সাধারণ কিছু পরিধান করতেন। তবে কোন সময়ে বিশেষ কোন উপলক্ষে মূল্যবান পোশাকও পরতেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়, যা সাধারণত উপহার হিসেবে তাঁর কাছে আসতো। কিন্তু তিনি এসব পোশাক একবার মাত্র পরিধান করে কিংবা বিশেষ কোন উপলক্ষে পরিধান করে রেখে দিতেন। ইতোপূর্বে একটি হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইয়ামানের বাদশাহ যু-ইয়াযান তাঁকে এরূপ মূল্যবান এক সেট পোশাক পাঠালে তিনি একবার মাত্র তা পরিধান করেছিলেন পরে আর কখনো তা পরিধান করেননি। যাতে তাঁর পবিত্র জীবন গর্ব ও অহংকারের লেশমাত্র থেকে পবিত্র থাকে। তাঁর এই উত্তম আদর্শ অনুযায়ী উম্মতেরও আমল করা উচিত। তবে যে ক্ষেত্রে গর্ব ও অহংকারের আশংকা থাকবে না সেক্ষেত্রে কেবল আল্লাহ্ প্রদত্ত নিয়ামতের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর উদ্দেশ্যে মূল্যবান পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধানে কোন ক্ষতি নেই।

শরীরের নিচের অংশ ঢাকার জন্য যেসব পোশাক পরিধান করা হয় সে সব পোশাককে আরবীতে 'ইযার' বলা হয়। লুঙ্গি এবং পায়জামা দু'টিই এর অন্তর্ভুক্ত। 'রিদা (رداء) বা 'কিসা' (كساء) সে সব পোশাককে বলে যা শরীরের ওপরের অংশ ঢাকার জন্য ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের প্রতিটি সুতি বা পশমী বস্ত্রকে 'রিদা' এবং পশমী চাদর বা হাল্কা কম্বলকে 'কিসা' বলা হয়।

রাসূলুল্লাহ্ সাধারণত লুঙ্গি পরিধান করতেন। এটাই ছিলো আরবের সাধারণ পোশাক। তিনি কখনো পায়জামা পরেছেন কিনা সে বিষয়ে দ্বিমত রয়েছে। তবে তিনি যে পায়জামা খরিদ করেছিলেন তা নিশ্চিত। বিশুদ্ধ রিওয়ায়াতের মাধ্যমে প্রমাণিত, তিনি পায়জামার প্রশংসা করেছেন এই বলে যে, এর দ্বারা সতর ঢাকার কাজটি অধিক সুন্দরভাবে হয়। পরবর্তীকালে দুনিয়ার বিভিন্ন জাতির মধ্যে ইসলাম যতই ছড়িয়ে পড়েছে সাহাবা কেরাম বিজিত এলাকাসমূহে তত বেশি বসতি স্থাপন করেছেন এবং সাথে সাথে সেখানে পায়জামার প্রচলনও বৃদ্ধি পেয়েছে।

٢٥٩ . عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ ذَاتَ غَدَاةٍ إِلَى الْمَسْجِدِ وَعَلَيْهِ مِرْطٌ مُرَحِلُ مِنْ شَعَرٍ أَسْوَدَ -

২৫৯. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন সকাল বেলা রাসূলুল্লাহ্ মসজিদে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলেন। সেই সময় তাঁর গায়ে ছিলো কালো পশমের তৈরি নক্শাদার কম্বল।

ফায়দা : এ হাদীসে নবী-এর কম্বলের বর্ণনা আছে। তিনি কালো পশমের তৈরি নক্শাদার কম্বল ব্যবহার করেছেন।

٢٦٠ . عَنْ سَلَمَةَ بْنِ الْأَكْوَعِ قَالَ بَعَثَ النَّبِيُّ عُثْمَانَ بْنَ عَفَّانٍ إِلَى مَكَّةَ فَأَجَارَهُ آبَانُ بْنُ سَعِيدٍ فَقَالَ يَا ابْنَ عَمِّ أَلا أَرَاكَ مُتَخَشِعًا أَسْبِلَ كَمَا يُسْبِلُ قَوْمُكَ قَالَ هُكَذَا يَأْتَزِرُ صَاحِبُنَا إِلَى نِصْفِ سَاقَيْهِ -

২৬০. হযরত সালামা ইব্‌ন আকওয়া (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (হুদায়বিয়ার সন্ধির পূর্বে) নবী উসমান ইব্‌ন আফফান (রা)-কে মক্কায় পাঠালে আবান ইব্‌ন সাঈদ তাঁকে নিজের আশ্রয়ে থাকতে দিলেন এবং বললেন, হে আমার চাচাতো ভাই! তুমি এরূপ বিনম্রতা অবলম্বন করেছো কেন। তুমি তোমার পরিধেয় বস্ত্র তোমার কাওমের লোকজনের মত নিচে লটকিয়ে পরিধান করো। উসমান (রা) বললেন, আমাদের সরদার রাসূলুল্লাহ এভাবে পায়ের নলার অর্ধেক পর্যন্ত উঁচু করে লুঙ্গি পরে থাকেন।

ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী ও সমস্ত সাহাবায়ে কিরাম অহংকার থেকে দূরে থাকার জন্য লুঙ্গি ও পায়জামা পায়ের নলার অর্ধেক পর্যন্ত উঁচু করে পরতেন। এটাই ইসলামের পদ্ধতি। পক্ষান্তরে কাফির ও মুশরিকরা অহংকার ও গর্বিত ভঙ্গিতে মাটি ছোঁয়া করে লুঙ্গি পরিধান করতো। এটাই ছিলো কুফরীর প্রতীক। অহংকারী লোকেরাই আজকাল ভূমি পর্যন্ত লটকিয়ে লুঙ্গি, পায়জামা, সেলোয়ার এমনকি প্যান্ট পরাকেও মর্যাদার ব্যাপার বলে মনে করে। অপরদিকে নেক্কার পরহেযগার ও দীনদার মুসলমানরা পায়জামা পায়ের গিরার ওপরে পরিধান করে থাকেন। সালাতের অবস্থায় পায়ের গিরার নিচে লুঙ্গি অথবা পায়জামা পরিধান মাকরূহ তাহরীমী।

٢٦١ عَنِ الْأَشْعَثِ بْنِ سُلَيْمٍ قَالَ سَمِعْتُ عَمَّتِي تَحَدِّثُ عَنْ عَمِّهَا أَنَّهُ رَأَى إِذَارِ رَسُولِ اللهِ أَسْفَلَ إِلَى نِصْفِ السَّاقِ -

২৬১. হযরত আশআস ইব্‌ন সুলাইম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার ফুফুকে তাঁর চাচার নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করতে শুনেছি। তাঁর চাচা দেখেছেন, রাসূলুল্লাহ্-এর পরনের লুঙ্গি তাঁর পায়ের নলার অর্ধেক নিচে পর্যন্ত ঝুলে ছিলো।

٢٦٢ عَنْ عُبَيْدَةَ قَالَ قَدِمْتُ الْمَدِينَةَ فَرَأَيْتُ إِزَارَ رَسُولِ اللَّهِ وَ أَسْفَلَ مِنْ عَضَلَةِ السَّاقِ -

২৬২. হযরত উবায়দা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মদীনায় এসে দেখলাম, রাসূলুল্লাহ্-এর পরনের লুঙ্গি তাঁর পায়ের গোছার নিচে পর্যন্ত নামানো।

٢٦٣ . عَنْ جَابِرٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ وَاللَّهِ إِذَا أَتْزَرَ يَضَعُ صَنَفَةً إِزَارِهِ عَلَى فَحْدِهِ الْيُسْرى -

২৬৩. হয়রত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ লুঙ্গি পরিধান করলে লুঙ্গির প্রান্তের অর্ধাংশ তাঁর বাম উরুর ওপর রাখতেন (যাতে চলার সময় খুলে না যায়)।

٢٦٤. عَنْ أَبِي الْعَالِيَةِ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ كَانَ إِزَارَهُ إِلَى نِصْفِ سَاقَيْهِ وَكَانَ لَهُ إِزَارَ قَدْ أَسْبَلَ خُيُوطَةٌ فَلَمْ يَجْزَهُ وَلَمْ يَكْفُهُ .

২৬৪. আবুল আলীয়া (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্-এর লুঙ্গি পায়ের নলার অর্ধাংশ পর্যন্ত থাকতো। তাছাড়া তাঁর একটি লুঙ্গির সুতা ঝুলে ছিল। তিনি সেগুলি কেটেও ফেলেন নি কিংবা সেলাই করে আটকিয়েও দেননি।

٢٦٥. أَخْبَرَنَا عِكْرِمَةٌ قَالَ رَأَيْتُ ابْنَ عَّبَّاسٍ يَا تَزِرُ فَيَضَعُ حَاشِيَةَ إِزَارِهِ مِنْ مُقَدَّمِهِ عَلَى ظَهْرِ قَدَمِهِ وَيَرْفَعُ مُؤَخَّرُهُ فَقُلْتُ مَا هَذِهِ الْإِزَارَةُ ؟ فَقَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَا تَزِرُهَا -

২৬৫. ইকরিমা (র) বর্ণনা করেন: আমি আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রা)-কে দেখেছি তিনি লুঙ্গির সম্মুখ ও প্রান্তভাগ পায়ের উপর ঝুলিয়ে পরতেন এবং পেছনের অংশ উঁচু রাখতেন। আমি তাঁকে বললাম, এটা লুঙ্গি পরিধানের কোন্ নিয়ম? তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-কে এভাবেই লুঙ্গি পরিধান করতে দেখেছি।

ফায়দা : সাহাবায়ে কিরাম (রা) রাসূলুল্লাহ্-কে যেভাবে কাজকর্ম করতে দেখতেন নিজেরাও সেভাবেই তা করার অভ্যাস গড়ে তুলতেন। সুতরাং ইব্‌ন আব্বাস (রা) শেষ বয়সে নবী-এর শরীর মুবারক কিছুটা মোটা হয়ে যাওয়ার পর তাঁকে যেভাবে লুঙ্গি পরতে দেখেছেন তিনিও তা অনুসরণের জন্য সেভাবেই পরতে শুরু করেছিলেন এবং ইকরিমার প্রশ্নের জবাবে বলেছেন যে, আমি যেহেতু নবী-কে এভাবে লুঙ্গি পরতে দেখেছি তাই আমিও সেভাবেই পরে থাকি। সত্যিই প্রকৃত ভালবাসা ও ভালবাসার পাত্রের সাথে সম্পর্কের দাবি হলো, যিনি ভালবাসবেন তিনি প্রেমাস্পদের প্রতিটি ভঙ্গিকে আত্মস্থ করে নিবেন। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে এ আগ্রহ পূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিল। এ ব্যাপারে তাঁরা নিজেরাই ছিলেন উদাহরণ। মহান আল্লাহ্ সমস্ত মুসলিমকে তাঁর হাবীবের পূর্ণাঙ্গ আনুগত্যের তাওফীক দান করুন।

٢٦٦ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ أَبِي يَحْيِي مِثْلُهُ -

২৬৬. মুহাম্মদ ইব্‌ন আবু ইয়াহ্ইয়াও উপরে বর্ণিত হাদীসের অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন।

٢٦٧. عَنِ الْهُجَيْمِي أَنَّهُ لَقِي رَسُولَ اللهِ ﷺ فَإِذَا هُوَ مُتَّزِرُ بِإِزَارٍ قُطْنٍ قَدْ انْتَثَرَتْ حَاشِيَتُهُ .

২৬৭. হযরত হুজায়মী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি একবার রাসূলুল্লাহ্ -এর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। সেই সময় তিনি এমন একখানা সুতি লুঙ্গি পরিহিত ছিলেন, যার প্রান্তভাগ ছিল এলোমেলো।

٢٦٨. عَنِ الْحَسَنِ الْبَصْرِى أَنَّ شَيْخًا مِنْ بَنِي سَلِيْطَ أَخْبَرَهُ قَالَ أَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ أَكَلِّمُهُ فِي شَيْءٍ أُصِيْبَ لَنَا فِي الْجَاهِلِيَّةِ - فَإِذَا هُوَ قَاعِدُ وَعَلَيْهِ حَلْقَةُ قَدْ أَطَافَتْ بِهِ وَهُوَ يُحَدِّثُ الْقَوْمَ وَعَلَيْهِ إِزَارُ قُطْنٍ لَهُ غَلِيْظٍ -

২৬৮. হাসান বসরী (র) থেকে বর্ণিত, (তিনি বলেন) বনী সালীত গোত্রের এক সম্মানিত ব্যক্তি আমাকে বলেন যে, আমি জাহেলী যুগে একটি বিষয়ে কথা বলার জন্য নবী -এর কাছে গেলাম। তিনি সে সময় উপবিষ্ট ছিলেন। তাঁর চারপাশে মানুষ বৃত্তাকারে বসেছিলো এবং তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে কথা বলছিলেন। সেই সময় তিনি একখানা মোটা সুতি লুঙ্গি পরেছিলেন।

ফায়দা: এ দু'টি হাদীস থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ খুব মোটা সুতি লুঙ্গিও পরিধান করেছেন।

٢٦٩. عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ أَخَذَ رَسُولُ اللهِ ﷺ كِسَاءً فَدَكِيًّا فَأَدَارَهُ عَلَيْهِمْ ثُمَّ قَالَ هُؤُلَاءِ أَهْلُ بَيْتِي وَحَامَتِي -

২৬৯. হযরত উম্মে সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ফাদাকে তৈরি একটি চাদর নিলেন এবং তার মধ্যে আহলে বায়তদেরকে নিয়ে বললেন, এরাই হচ্ছে আমার আহলে বায়ত এবং আমার পরিবার।

ফায়দা: এ হাদীসটিতেও যেহেতু রাসূলুল্লাহ্-এর চাদরের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, তাই সেই সূত্র ধরে গ্রন্থকার হাদীসটি এখানে উল্লেখ করেছেন। নবী -এর আহলে বায়তদেরকে চাদরের মধ্যে নেয়া সম্পর্কিত ঘটনা সবিস্তার জানার জন্য তাফসীর গ্রন্থ সমূহে সূরা আহযাবের يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ الْآيَةُ আয়াতটির ব্যাখ্যা দেখা যেতে পারে।

٢٥٨ عَنْ أَبِي بُرْدَةَ قَالَ أَخْرَجَتْ إِلَيْنَا عَائِشَةُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا كِسَاءٌ مُلَبَّدًا وَإِزَارًا غَلِيْظًا فَقَالَتْ قُبِضَ رَسُولُ اللَّهِ فِي هَذَيْنِ -

২৫৮. হযরত আবূ বুরদা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত আয়েশা (রা) একখানা তালি লাগানো চাদর ও একখানা মোটা লুঙ্গি বের করে আমাদের দেখিয়ে বললেন, এই দু'খানা কাপড় পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ ওফাতপ্রাপ্ত হয়েছেন।

ফায়দা: এই হাদীসটিতে নবী-এর ব্যবহৃত লুঙ্গি ও চাদরের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এ থেকে জানা যায়, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত সরল-সহজ জীবন যাপন করতেন। নবী-এর যুগেই বিভিন্ন এলাকা বিজিত হতে শুরু হয়েছিলো। এই সময় তাঁর দরবারে ধনসম্পদের স্তূপ জমা হতো। কিন্তু তিনি তা অন্যদের মধ্যে বিলি-বণ্টন করে দিতেন এবং নিজে সাধারণ কিছু পরিধান করতেন। তবে কোন সময়ে বিশেষ কোন উপলক্ষে মূল্যবান পোশাকও পরতেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়, যা সাধারণত উপহার হিসেবে তাঁর কাছে আসতো। কিন্তু তিনি এসব পোশাক একবার মাত্র পরিধান করে কিংবা বিশেষ কোন উপলক্ষে পরিধান করে রেখে দিতেন। ইতোপূর্বে একটি হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইয়ামানের বাদশাহ যু-ইয়াযান তাঁকে এরূপ মূল্যবান এক সেট পোশাক পাঠালে তিনি একবার মাত্র তা পরিধান করেছিলেন পরে আর কখনো তা পরিধান করেননি। যাতে তাঁর পবিত্র জীবন গর্ব ও অহংকারের লেশমাত্র থেকে পবিত্র থাকে। তাঁর এই উত্তম আদর্শ অনুযায়ী উম্মতেরও আমল করা উচিত। তবে যে ক্ষেত্রে গর্ব ও অহংকারের আশংকা থাকবে না সেক্ষেত্রে কেবল আল্লাহ্ প্রদত্ত নিয়ামতের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর উদ্দেশ্যে মূল্যবান পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধানে কোন ক্ষতি নেই।

শরীরের নিচের অংশ ঢাকার জন্য যেসব পোশাক পরিধান করা হয় সে সব পোশাককে আরবীতে 'ইযার' বলা হয়। লুঙ্গি এবং পায়জামা দু'টিই এর অন্তর্ভুক্ত। 'রিদা (رداء) বা 'কিসা' (كساء) সে সব পোশাককে বলে যা শরীরের ওপরের অংশ ঢাকার জন্য ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের প্রতিটি সুতি বা পশমী বস্ত্রকে 'রিদা' এবং পশমী চাদর বা হাল্কা কম্বলকে 'কিসা' বলা হয়।

রাসূলুল্লাহ্ সাধারণত লুঙ্গি পরিধান করতেন। এটাই ছিলো আরবের সাধারণ পোশাক। তিনি কখনো পায়জামা পরেছেন কিনা সে বিষয়ে দ্বিমত রয়েছে। তবে তিনি যে পায়জামা খরিদ করেছিলেন তা নিশ্চিত। বিশুদ্ধ রিওয়ায়াতের মাধ্যমে প্রমাণিত, তিনি পায়জামার প্রশংসা করেছেন এই বলে যে, এর দ্বারা সতর ঢাকার কাজটি অধিক সুন্দরভাবে হয়। পরবর্তীকালে দুনিয়ার বিভিন্ন জাতির মধ্যে ইসলাম যতই ছড়িয়ে পড়েছে সাহাবা কেরাম বিজিত এলাকাসমূহে তত বেশি বসতি স্থাপন করেছেন এবং সাথে সাথে সেখানে পায়জামার প্রচলনও বৃদ্ধি পেয়েছে।

٢٥٩ . عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ ذَاتَ غَدَاةٍ إِلَى الْمَسْجِدِ وَعَلَيْهِ مِرْطٌ مُرَحِلُ مِنْ شَعَرٍ أَسْوَدَ -

২৫৯. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন সকাল বেলা রাসূলুল্লাহ্ মসজিদে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলেন। সেই সময় তাঁর গায়ে ছিলো কালো পশমের তৈরি নক্শাদার কম্বল।

ফায়দা : এ হাদীসে নবী-এর কম্বলের বর্ণনা আছে। তিনি কালো পশমের তৈরি নক্শাদার কম্বল ব্যবহার করেছেন।

٢٦٠ . عَنْ سَلَمَةَ بْنِ الْأَكْوَعِ قَالَ بَعَثَ النَّبِيُّ عُثْمَانَ بْنَ عَفَّانٍ إِلَى مَكَّةَ فَأَجَارَهُ آبَانُ بْنُ سَعِيدٍ فَقَالَ يَا ابْنَ عَمِّ أَلا أَرَاكَ مُتَخَشِعًا أَسْبِلَ كَمَا يُسْبِلُ قَوْمُكَ قَالَ هُكَذَا يَأْتَزِرُ صَاحِبُنَا إِلَى نِصْفِ سَاقَيْهِ -

২৬০. হযরত সালামা ইব্‌ন আকওয়া (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (হুদায়বিয়ার সন্ধির পূর্বে) নবী উসমান ইব্‌ন আফফান (রা)-কে মক্কায় পাঠালে আবান ইব্‌ন সাঈদ তাঁকে নিজের আশ্রয়ে থাকতে দিলেন এবং বললেন, হে আমার চাচাতো ভাই! তুমি এরূপ বিনম্রতা অবলম্বন করেছো কেন। তুমি তোমার পরিধেয় বস্ত্র তোমার কাওমের লোকজনের মত নিচে লটকিয়ে পরিধান করো। উসমান (রা) বললেন, আমাদের সরদার রাসূলুল্লাহ এভাবে পায়ের নলার অর্ধেক পর্যন্ত উঁচু করে লুঙ্গি পরে থাকেন।

ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী ও সমস্ত সাহাবায়ে কিরাম অহংকার থেকে দূরে থাকার জন্য লুঙ্গি ও পায়জামা পায়ের নলার অর্ধেক পর্যন্ত উঁচু করে পরতেন। এটাই ইসলামের পদ্ধতি। পক্ষান্তরে কাফির ও মুশরিকরা অহংকার ও গর্বিত ভঙ্গিতে মাটি ছোঁয়া করে লুঙ্গি পরিধান করতো। এটাই ছিলো কুফরীর প্রতীক। অহংকারী লোকেরাই আজকাল ভূমি পর্যন্ত লটকিয়ে লুঙ্গি, পায়জামা, সেলোয়ার এমনকি প্যান্ট পরাকেও মর্যাদার ব্যাপার বলে মনে করে। অপরদিকে নেক্কার পরহেযগার ও দীনদার মুসলমানরা পায়জামা পায়ের গিরার ওপরে পরিধান করে থাকেন। সালাতের অবস্থায় পায়ের গিরার নিচে লুঙ্গি অথবা পায়জামা পরিধান মাকরূহ তাহরীমী।

٢٦١ عَنِ الْأَشْعَثِ بْنِ سُلَيْمٍ قَالَ سَمِعْتُ عَمَّتِي تَحَدِّثُ عَنْ عَمِّهَا أَنَّهُ رَأَى إِذَارِ رَسُولِ اللهِ أَسْفَلَ إِلَى نِصْفِ السَّاقِ -

২৬১. হযরত আশআস ইব্‌ন সুলাইম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার ফুফুকে তাঁর চাচার নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করতে শুনেছি। তাঁর চাচা দেখেছেন, রাসূলুল্লাহ্-এর পরনের লুঙ্গি তাঁর পায়ের নলার অর্ধেক নিচে পর্যন্ত ঝুলে ছিলো।

٢٦٢ عَنْ عُبَيْدَةَ قَالَ قَدِمْتُ الْمَدِينَةَ فَرَأَيْتُ إِزَارَ رَسُولِ اللَّهِ وَ أَسْفَلَ مِنْ عَضَلَةِ السَّاقِ -

২৬২. হযরত উবায়দা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মদীনায় এসে দেখলাম, রাসূলুল্লাহ্-এর পরনের লুঙ্গি তাঁর পায়ের গোছার নিচে পর্যন্ত নামানো।

٢٦٣ . عَنْ جَابِرٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ وَاللَّهِ إِذَا أَتْزَرَ يَضَعُ صَنَفَةً إِزَارِهِ عَلَى فَحْدِهِ الْيُسْرى -

২৬৩. হয়রত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ লুঙ্গি পরিধান করলে লুঙ্গির প্রান্তের অর্ধাংশ তাঁর বাম উরুর ওপর রাখতেন (যাতে চলার সময় খুলে না যায়)।

٢٦٤. عَنْ أَبِي الْعَالِيَةِ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ كَانَ إِزَارَهُ إِلَى نِصْفِ سَاقَيْهِ وَكَانَ لَهُ إِزَارَ قَدْ أَسْبَلَ خُيُوطَةٌ فَلَمْ يَجْزَهُ وَلَمْ يَكْفُهُ .

২৬৪. আবুল আলীয়া (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্-এর লুঙ্গি পায়ের নলার অর্ধাংশ পর্যন্ত থাকতো। তাছাড়া তাঁর একটি লুঙ্গির সুতা ঝুলে ছিল। তিনি সেগুলি কেটেও ফেলেন নি কিংবা সেলাই করে আটকিয়েও দেননি।

٢٦٥. أَخْبَرَنَا عِكْرِمَةٌ قَالَ رَأَيْتُ ابْنَ عَّبَّاسٍ يَا تَزِرُ فَيَضَعُ حَاشِيَةَ إِزَارِهِ مِنْ مُقَدَّمِهِ عَلَى ظَهْرِ قَدَمِهِ وَيَرْفَعُ مُؤَخَّرُهُ فَقُلْتُ مَا هَذِهِ الْإِزَارَةُ ؟ فَقَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَا تَزِرُهَا -

২৬৫. ইকরিমা (র) বর্ণনা করেন: আমি আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রা)-কে দেখেছি তিনি লুঙ্গির সম্মুখ ও প্রান্তভাগ পায়ের উপর ঝুলিয়ে পরতেন এবং পেছনের অংশ উঁচু রাখতেন। আমি তাঁকে বললাম, এটা লুঙ্গি পরিধানের কোন্ নিয়ম? তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-কে এভাবেই লুঙ্গি পরিধান করতে দেখেছি।

ফায়দা : সাহাবায়ে কিরাম (রা) রাসূলুল্লাহ্-কে যেভাবে কাজকর্ম করতে দেখতেন নিজেরাও সেভাবেই তা করার অভ্যাস গড়ে তুলতেন। সুতরাং ইব্‌ন আব্বাস (রা) শেষ বয়সে নবী-এর শরীর মুবারক কিছুটা মোটা হয়ে যাওয়ার পর তাঁকে যেভাবে লুঙ্গি পরতে দেখেছেন তিনিও তা অনুসরণের জন্য সেভাবেই পরতে শুরু করেছিলেন এবং ইকরিমার প্রশ্নের জবাবে বলেছেন যে, আমি যেহেতু নবী-কে এভাবে লুঙ্গি পরতে দেখেছি তাই আমিও সেভাবেই পরে থাকি। সত্যিই প্রকৃত ভালবাসা ও ভালবাসার পাত্রের সাথে সম্পর্কের দাবি হলো, যিনি ভালবাসবেন তিনি প্রেমাস্পদের প্রতিটি ভঙ্গিকে আত্মস্থ করে নিবেন। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে এ আগ্রহ পূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিল। এ ব্যাপারে তাঁরা নিজেরাই ছিলেন উদাহরণ। মহান আল্লাহ্ সমস্ত মুসলিমকে তাঁর হাবীবের পূর্ণাঙ্গ আনুগত্যের তাওফীক দান করুন।

٢٦٦ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ أَبِي يَحْيِي مِثْلُهُ -

২৬৬. মুহাম্মদ ইব্‌ন আবু ইয়াহ্ইয়াও উপরে বর্ণিত হাদীসের অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন।

٢٦٧. عَنِ الْهُجَيْمِي أَنَّهُ لَقِي رَسُولَ اللهِ ﷺ فَإِذَا هُوَ مُتَّزِرُ بِإِزَارٍ قُطْنٍ قَدْ انْتَثَرَتْ حَاشِيَتُهُ .

২৬৭. হযরত হুজায়মী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি একবার রাসূলুল্লাহ্ -এর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। সেই সময় তিনি এমন একখানা সুতি লুঙ্গি পরিহিত ছিলেন, যার প্রান্তভাগ ছিল এলোমেলো।

٢٦٨. عَنِ الْحَسَنِ الْبَصْرِى أَنَّ شَيْخًا مِنْ بَنِي سَلِيْطَ أَخْبَرَهُ قَالَ أَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ أَكَلِّمُهُ فِي شَيْءٍ أُصِيْبَ لَنَا فِي الْجَاهِلِيَّةِ - فَإِذَا هُوَ قَاعِدُ وَعَلَيْهِ حَلْقَةُ قَدْ أَطَافَتْ بِهِ وَهُوَ يُحَدِّثُ الْقَوْمَ وَعَلَيْهِ إِزَارُ قُطْنٍ لَهُ غَلِيْظٍ -

২৬৮. হাসান বসরী (র) থেকে বর্ণিত, (তিনি বলেন) বনী সালীত গোত্রের এক সম্মানিত ব্যক্তি আমাকে বলেন যে, আমি জাহেলী যুগে একটি বিষয়ে কথা বলার জন্য নবী -এর কাছে গেলাম। তিনি সে সময় উপবিষ্ট ছিলেন। তাঁর চারপাশে মানুষ বৃত্তাকারে বসেছিলো এবং তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে কথা বলছিলেন। সেই সময় তিনি একখানা মোটা সুতি লুঙ্গি পরেছিলেন।

ফায়দা: এ দু'টি হাদীস থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ খুব মোটা সুতি লুঙ্গিও পরিধান করেছেন।

٢٦٩. عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ أَخَذَ رَسُولُ اللهِ ﷺ كِسَاءً فَدَكِيًّا فَأَدَارَهُ عَلَيْهِمْ ثُمَّ قَالَ هُؤُلَاءِ أَهْلُ بَيْتِي وَحَامَتِي -

২৬৯. হযরত উম্মে সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ফাদাকে তৈরি একটি চাদর নিলেন এবং তার মধ্যে আহলে বায়তদেরকে নিয়ে বললেন, এরাই হচ্ছে আমার আহলে বায়ত এবং আমার পরিবার।

ফায়দা: এ হাদীসটিতেও যেহেতু রাসূলুল্লাহ্-এর চাদরের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, তাই সেই সূত্র ধরে গ্রন্থকার হাদীসটি এখানে উল্লেখ করেছেন। নবী -এর আহলে বায়তদেরকে চাদরের মধ্যে নেয়া সম্পর্কিত ঘটনা সবিস্তার জানার জন্য তাফসীর গ্রন্থ সমূহে সূরা আহযাবের يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ الْآيَةُ আয়াতটির ব্যাখ্যা দেখা যেতে পারে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px