📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ 📄 নবী (সা)-এর পথচলা এবং চলার পথে এদিক-সেদিক দৃষ্টিপাত করার নীতি

📄 নবী (সা)-এর পথচলা এবং চলার পথে এদিক-সেদিক দৃষ্টিপাত করার নীতি


۲۰۲. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكِ كَانَ النَّبِيُّ الإِذَا مَشَى كَأَنَّهُ يَتَوَكَّا -

২০২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন পথ চলতেন তখন মনে হতো তিনি যেন (লাঠি কিংবা অন্য কোন জিনিসের উপর) ভর দিয়ে পথ চলছেন। (অর্থাৎ তিনি সম্মুখের দিকে ঝুঁকে পথ চলতেন।)

، قَالَ كَانَ رَسُولُ الله ﷺ إِذَا مَشَى تَكَفَّا - ۲۰۳ . عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ الله الله

২০৩. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হাঁটার সময়ে রাসূলুল্লাহ্ সম্মুখের দিকে ঝুঁকে পথ চলতেন।

٢٠٤ عَنْ عَاصِمِ بْنِ لَقِيْطِ بْنِ صَبُرَةَ عَنْ أَبِيْهِ أَنَّهُ أَتَى عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا هُوَ وَصَاحِبُ يَطْلُبَانِ النَّبِيُّ الله فَلَمْ يَجِدَاهُ فَلَمْ يَنْشَبْ أَنْ جَاءَ النَّبِيُّ يَتَقَلْعُ يَتَكَفَّ -

২০৪. হযরত আসিম ইব্‌ন লাকীত ইব্‌ন সাবুরা (রা) তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি (হযরত আসিমের পিতা) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-এর খেদমতে উপস্থিত হন। এ সময় তিনি ও তাঁর এক সাথী উভয়ে নবী -কে খুঁজছিলেন। কিন্তু তারা নবী -কে উপস্থিত পাননি। তারা কিছুক্ষণ পরেই নবী এমন অবস্থায় আগমন করলেন যেন তিনি (মাটিতে পা টেনে চলার পরিবর্তে) মাটি থেকে পা তুলে তুলে সম্মুখের দিকে ঈষৎ ঝুঁকে হাঁটছেন।

٢٠٥ . عَنْ أَبِي عِنَبَةَ الْخَوْلَانِيَّ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ إِذَا مَشَى أَقْلَعَ -

২০৫. হযরত আবূ ইনাবা খাওলানী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন হাঁটতেন তখন মাটি থেকে সবলে পা তুলে তুলে হাঁটতেন।

٢٠٦ . عَنْ عَلِيٍّ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ إِذَا مَشَى تَكَفَّأُ تَكَفِّيًا كَأَنَّمَا يَتَقَلَّعُ مِنْ صَبَبٍ لَمْ أَرَ قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ مِثْلَهُ الصَّبَبُ الْمُنْحَدِرُ مِنَ الْأَرْضِ -

২০৬. হযরত আলী ইব্‌ন আবু তালিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর নিয়ম ছিলো তিনি যখন পথ চলতেন তখন সম্মুখের দিকে ঝুঁকে ঝুঁকে চলতেন। (আপাত দৃষ্টিতে মনে হতো) তিনি যেন সবলে পা উত্তোলন পূর্বক ঢালু জায়গা দিয়ে অবতরণ করছেন। আমি তাঁর মত (গুণাবলি সম্পন্ন) মানুষ না পূর্বে কখনো দেখেছি আর না পরে। আরবী ভাষায় 'الصبب.' শব্দের অর্থ হলো ঢালুভূমি।

۲۰۷ . عَنْ رَبِيعَةَ قَالَ دَخَلْنَا عَلَى أَنَسِ بْنِ مَالِكَ فَسَأَلْنَا عَنْ صِفَةِ النَّبِيِّ فَقَالَ كَانَ إِذَا مَشَى كَأَنَّمَا يَمْشِي فِي صَبَب -

২০৭. হযরত রাবীয়া (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা হযরত আনাস ইব্‌ন মালিক (রা)-এর দরবারে গেলাম এবং তাঁকে নবী -এর অনুপম গুণাবলি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। উত্তরে তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন পথ চলতেন তখন তিনি যেন কোনো ঢালু ভূমি দিয়ে চলছেন। (অর্থাৎ চলার পথে তাঁর হাঁটার গতি ছিল কিছুটা দ্রুত।)

ফায়দা : উপরোক্ত হাদীসসমূহে নবী -এর পথ চলার নিয়মনীতি বর্ণনা করা হয়েছে। এ সকল হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, তাঁর পথ চলার মধ্যে তিন ধরনের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিলো :

এক. তিনি নম্রতা অবলম্বনের লক্ষ্যে সম্মুখের দিকে ঝুঁকে চলতেন। অহংকারসুলভ বুকটান করে হাঁটতেন না। (তবে যুদ্ধের ময়দানে মুজাহিদগণের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম রয়েছে। কেননা তাদের ব্যাপারে নির্দেশ হলো কাফিরদের মুকাবিলায় বিনয় ও নম্রতার প্রকাশ নয়; বরং নিজেদের শক্তি, বীরত্ব ও অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার প্রকাশ করা আবশ্যক।)

দুই. নবী পথ চলার সময় মাটি থেকে পা তুলে তুলে সবল পুরুষের মত হাঁটতেন। অলস ও খোঁড়ার মত মাটিতে পা টেনে চলতেন না। কেননা এটি অপছন্দনীয় ও দোষের।

তিন. তিনি তুলনামূলকভাবে দ্রুত চলতেন। খুব ধীর গতিতে অলসের মত কিংবা মেয়েলি চলন তাঁর ছিলো না।

দীন ইসলামের হেফাযতকারীগণ যেভাবে নবী-এর অন্যান্য গুণ, বৈশিষ্ট্য, নীতি ও চরিত্রের আমলী সংরক্ষণ করেছেন তদ্রূপ তাঁর চাল-চলন ও হাঁটার পদ্ধতিও তাঁরা যথার্থভাবে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। তাঁরা নবী এর ছোট থেকে ছোট কোন গুণ কিংবা কোন অভ্যাসকে উপেক্ষা করেননি। বস্তুত এটি সাহাবায়ে কিরামের এমন এক কৃতিত্ব যার উপমা ইতিহাসের কোনো কালেও দেখা যায় না। এটি নবী-এর শেষ নবী হওয়ার এত প্রকৃষ্ট দলীল যা কেউই অস্বীকার করতে পারে না। অর্থাৎ যে ভাবে রাসূলুল্লাহ্-এর রিসালাত ও নবুওয়াতের যাবতীয় বিষয় কিয়ামত পর্যন্ত সময়কালের জন্য সংরক্ষিত হয়ে আছে, সেভাবে তাঁর আকার-আকৃতি, চাল-চলন, উঠা-বসা ইত্যাদির পদ্ধতিও যথাযথভাবে সংরক্ষিত। আর এভাবেই অনাগত ভবিষ্যত বংশধরের জন্য নবী-এর মহান সত্তা একটি সমুজ্জ্বল আদর্শ হয়ে অটুট থাকবে।

۲۰۸. عَنْ جَابِرٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ إِذَا خَرَجَ مَشَى أَصْحَابُهُ أَمَامَهُ وَتَرَكُوا ظَهْرَهُ لِلْمَلَائِكَةِ -

২০৮. হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন বাড়ির বাহির হতেন তখন সাহাবায়ে কিরাম তাঁর আগে আগে চলতেন। তাঁরা নবী -এর পশ্চাৎদিক ফেরেস্তাগণের চলার জন্য ছেড়ে দিতেন।

ফায়দা : অন্যান্য হাদীসে বলা হয়েছে যে, নবী-এর সঙ্গে ফেরেস্তাগণও হেঁটে থাকেন। এ ফেরেস্তাগণ হাঁটতেন নবী-এর পেছনে পেছনে। এ কারণেই সাহাবীগণ বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য রাখতেন এবং নিজেরা তাঁর পশ্চাৎ দিকে হাঁটতেন না। বরং পশ্চাৎ দিকটি ফেরেস্তাগণের জন্য ছেড়ে দিয়ে নিজেরা আগে আগে হাঁটতেন। তাছাড়া আরো কতিপয় হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী নম্রতা ও বিনয় অবলম্বনের লক্ষ্যেও নিজে লোকজনের আগে আগে চলাকে পছন্দ করতেন না। বরং নিজে পেছনে থেকে সাহাবীদেরকে আগে আগে চলতে দিতেন।

۲۰۹. عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَسُولُ اللهِ ﷺ كَانَ إِذَا مَشَى مَشَى مَشْيَا مُجْتَمِعًا لَيْسَ فِيْهِ كَسْلٌ -

২০৯. হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ যখন হাঁটতেন তখন পা তুলে সবল পুরুষের মত হাঁটতেন। তাঁর হাঁটার মধ্যে কোনরূপ আলস্য ও কুঁড়েমির লেশমাত্রও ছিল না।

٢١٠. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كُنَّا إِذَا آتَيْنَا النَّبِيَّ ﷺ جَلَسْنَا خَلْفَهُ -

২১০. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা যখন নবী -এর দরবারে উপস্থিত হতাম তখন আমরা তাঁর পেছনে বসে যেতাম।

٢١١. عَنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ قَالَ سَأَلْتُ هِنْدَ ابْنَ أَبِي هَالَةَ عَنْ مَشْيِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ كَانَ يَمْشِي تَكَفَّيًا وَيَخْطُوْ هَوْنًا ذَرِيعَ الْمَشْيَةِ إِذَا مَشَى كَأَنَّمَا يَتَصَبَّبُ أَوْ يَمْشِي فِي صَبَبِ إِذَا الْتَفَتَ الْتَفَتَ جَمِيْعًا، خَافِضَ الطَّرْفِ نَظْرُهُ إِلَى الْأَرْضِ أَكْثَرُ مِنْ نَظْرِهِ إِلَى السَّمَاءِ جُلُّ نَظَرِهِ الْمُلَاحَظَةُ يَسُوقُ أَصْحَابَهُ وَيَبْدَا مَنْ لَقِيَهُ بِالسَّلَام -

২১১. হযরত হাসান ইব্‌ন আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত হিন্দ ইব্‌ন আবূ হালা (রা)-এর কাছে নবী-এর পথচলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি বললেন, নবী সামান্য ঝুঁকে পথ চলতেন। গাম্ভীর্য ও ঔদার্য রক্ষাপূর্বক তিনি পা তুলতেন। তাঁর পথ চলায় ঈষৎ দ্রুততা ছিলো। চলার সময় মনে হতো তিনি যেন ঢালু ভূমি দিয়ে অবতরণ করছেন। কিংবা বর্ণনাকারী বলেছেন, তিনি যেন কোনো ঢালু ভূমিতে হাঁটছেন। এভাবে তিনি যখন কারোর দিকে দৃষ্টিপাত করতেন তখন সম্পূর্ণভাবে তার দিকে ফিরে তিনি দৃষ্টিপাত করতেন। (পথ চলার সময়) তাঁর চোখের দৃষ্টি যমীনের দিকে অবনমিত থাকতো। এ জন্য আসমানের দিকে তাকানো অপেক্ষা যমীনের দিকে তাঁর দৃষ্টি অধিক থাকতো। অধিকাংশ সময় তিনি চোখের পার্শ্বদেশ দিয়ে তাকাতেন। (লজ্জাশীলতার কারণে) পূর্ণচোখে তাকানো পছন্দ করতেন না। পথচলার সময় সাহাবীদেরকে এভাবে আগে আগে হাঁটতে দিতেন যেন নিজে পেছন থেকে তাদের পরিচালনা করছেন। পথিমধ্যে কারো সঙ্গে দেখা হলে সর্বাগ্রে তিনিই সালাম দিতেন।

ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসেও নবী-এর পথচলার নীতি আলোচনা করা হয়েছে। পূর্বে উল্লেখিত হাদীসের তুলনায় আলোচ্য হাদীসে কতিপয় অতিরিক্ত গুণের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমনঃ

১. নবী অধিকাংশ সময় চোখের দৃষ্টি অবনমিত করে রাখতেন। এদিক সেদিক তাকাতেন না। সাধারণত মাটির দিকেই পতিত থাকতো তাঁর দৃষ্টি। কখনো কখনো আকাশের দিকে দৃষ্টি তুলে তাকাতেন কিন্তু তা ছিলো ওহী লাভের অপেক্ষায়।

২. তিনি যখন কারোর দিকে তাকাতেন তখন অতিশয় লজ্জাশীলতার কারণে কখনো পূর্ণচোখে তাকাতেন না। বরং একপার্শ্ব দিয়ে তাকাতেন।

৩. তিনি যেহেতু কিছুটা দ্রুত চলতেন তাই সাহাবীদেরকে নিজের সামনে হাঁটতে দিতেন। ফলে তারাও যেন সমান্তরালে দ্রুত চলেন এবং তাদের কেউ যেন পিছিয়ে না পড়েন। সাথে সাথে এ ভাবে পেছনে চলার মধ্যে নিজের নম্রতা ও বিনয়ের প্রকাশও উদ্দেশ্য ছিল। দাম্ভিক ও অহংকারীদের ন্যায় সকলের আগে আগে চলাকে তিনি পছন্দ করতেন না। অপর হাদীসে বলা হয়েছে যে, সাহাবীগণ নবী -এর আগে আগে চলার মধ্যে আরো একটি গূঢ় রহস্য ছিল এই যে, তার পশ্চাৎ দিকটি ফেরেস্তাদের হাঁটার জন্য রক্ষিত হতো। হাদীসটিতে বলা হয়েছে, নবী -এর পশ্চাদদিকে ফেরেস্তাগণ হাঁটেন। উভয় বর্ণনার মধ্যে কোন বৈপরীত্য নেই। একটি কাজের পেছনে একাধিক রহস্য বিদ্যমান থাকা বিচিত্র নয়। বিশেষত নবী -এর কাজকর্মসমূহ অগণিত হিকমত ও রহস্যপূর্ণ ছিল। আর তিনি শ্রেষ্ঠ নবী হিসাবে এমনটাই হওয়া বাঞ্ছনীয়।

৪. নবী -এর নিয়ম ছিলো তিনি যখনই কারোর সাক্ষাতে যেতেন তখন সালাম দানে নিজেই অগ্রবর্তী থাকতেন। মহান আল্লাহ্ এ মহান নবী ﷺ ও তাঁর বংশধরের প্রতি অগণিত ও অসংখ্য দরূদ ও সালাম নাযিল করুন। আমীন!

۲۱۲. عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ يُسْرِ صَاحِبُ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ إِذَا أَتَى الْمَنْزِلَ لَمْ يَأْتِهِ مِنْ قَبْلِ الْبَابِ وَلَكِنْ يَأْتِيهِ مِنْ قِبْلِ جَانِبُهِ حَتَّى يَسْتَأْذِنَ -

২১২. নবী -এর সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন বুস্র (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন কারো বাড়ি যেতেন তখন দরজার ঠিক সম্মুখে দাঁড়াতেন না বরং এক পার্শ্বে দাঁড়াতেন। (যেন অজান্তে গৃহবাসীদের উপর দৃষ্টি পতিত না হয়) আর অনুমতি পাওয়া ব্যতিরেকে গৃহে প্রবেশ করতেন না।

ফায়দা : উপরোক্ত হাদীস হলো অনুমতি চাওয়া বিষয়ক। রাসূলুল্লাহ্ -এর নীতি ছিলো তিনি যখন কারোর বাড়ি যেতেন তখন সতর্কতা অবলম্বনের জন্য সেই বাড়ির দরজা বরাবর হয়ে প্রবেশ করতেন না, বরং এক পার্শ্ব বরাবরে প্রবেশ করতেন। উদ্দেশ্য ছিলো যেন অজান্তে গৃহবাসীদের উপর তার দৃষ্টি গিয়ে না পড়ে। তারপর গৃহকর্তার পক্ষ থেকে অনুমতি লাভের পর তিনি গৃহে প্রবেশ করতেন। আলোচ্য হাদীসে আরো বলা হয়েছে যে, তিনি 'আস্সালামু আলাইকুম' বলে প্রবেশ করতেন। তিনি এ সালামকেও একাধিকবার পুনরাবৃত্তি করে বলতেন, যেন ঘরের লোকজন তা ভালভাবে শুনতে পায়।

কারোর গৃহে প্রবেশ করার পূর্বে অনুমতি নেয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে অত্যাবশ্যক। অনুমতি ব্যতীত কারো গৃহে প্রবেশ জায়েয নয়। অবশ্য নিজের ঘরে যখন অপর কোন গায়র মুহাররাম মহিলা নেই বলে নিশ্চিতভাবে জানা থাকে তখন অনুমতি ব্যতিরেকে প্রবেশ করতে কোন আপত্তি নেই। এতদসত্ত্বেও উত্তম হলো নিজের ঘরেও অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করা।

দ্বিতীয়ত: ঘরে প্রবেশ করার সময় 'আস্সালামু আলাইকুম' বলা চাই। এটি ঘরে উপস্থিতদের জন্য সালামতী ও নিরাপত্তার একটি দু'আ। অপরের গৃহে প্রবেশের জন্য তিনবার পর্যন্ত অনুমতি প্রার্থনা করা যেতে পারে। তৃতীয়বারেও যদি কোন উত্তর না পাওয়া যায় কিংবা অনুমতি না মিলে তখন ফিরে আসা চাই।

۲۱۳. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كَانَ أَبْوَابُ النَّبِيِّ تُقَرَّعُ بِالْأَطْفَارِ -

২১৩. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর গৃহের দরজাগুলিতে আঙ্গুলের অগ্রভাগ দ্বারা টোকা দেওয়া হতো।

ফায়দা: এ হাদীস দ্বারা ঘরের দরজায় টোকা দেয়ার নীতি সম্পর্কে জানা যায়। ঘরের দরজায় টোকা দেওয়ার সময় ভারসাম্য বজায় রাখা আবশ্যক। জোরে জোরে দরজায় ধাক্কা দেওয়া কিংবা আঘাত করা ভদ্রতা ও আদবের খেলাফ। তাতে গৃহবাসী লোকজনের মনকষ্ট হয়ে থাকে। টোকা দেওয়ার উত্তম পদ্ধতি হলো আগন্তুক প্রথমে মুখে আওয়াজ করবে। আওয়াজ ঘরের ভিতর পর্যন্ত না পৌঁছার আশংকা থাকলে সেখানে আস্তে আস্তে টোকা দিবে।

٢١٤ . عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ أَنَّهُ سَمِيعَ أَبَا ذَرِّ يَصِفُ النَّبِيُّ ﷺ قَالَ كَانَ يَطَأُ بِقَدَمَيْهِ لَيْسَ لَهُ أَخْمَصَ يَقْبُلُ جَمِيعًا وَيَدْبُرُ جَمِيعًا ، لَمْ أَرَمِثْلَهُ -

২১৪. হযরত সাঈদ ইব্‌ন মুসাইয়্যাব (রা) বলেন, তিনি হযরত আবূ যার গিফারী (রা)-কে নবী-এর নিয়ম-নীতি ও গুণাবলি বর্ণনা করতে শুনেছেন যে, নবী তাঁর পা যুগল উপরে তুলে এভাবে হাঁটতেন যেন তাঁর পায়ের কোন তালুই ছিলো না। তিনি (সামনে অগ্রসর হতে চাইলে) পূর্ণভাবে অগ্রসর হতেন। আবার (পেছনের দিকে যেতে ইচ্ছা করলে) পূর্ণভাবে পেছনে সরে যেতেন। আমি কখনো তাঁর মত কোন মানুষকে দেখিনি।

ফায়দা: পা তুলে হাঁটার অর্থ হলো তিনি মাটির উপর পা স্থাপন করতেন। কিন্তু স্থাপনের পর কোনরূপ বিলম্ব না করেই তৎক্ষণাৎ এমনভাবে পা তুলে নিতেন যে, মনে হতো পায়ের তালুদ্বয়কে মাটিতে পূর্ণভাবে স্পর্শ করতেই দেননি। আসলে তাঁর পায়ের তালু (মাটি থেকে) সামান্য উপরে উঠা অবস্থায় থাকতো। এটিও এক ধরনের পৌরুষ সুলভ সৌন্দর্য।

٢١٥ عَنْ أَبِي الطُّفَيْلِ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ إِذَا مَشَى كَأَنَّمَا يَمْشِي فِي صُبُوب -

২১৫. হযরত আবূ তুফায়েল (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন হাঁটতেন তখন মনে হতো তিনি কোন ঢালু ভূমিতে হাঁটছেন।

ফায়দা: আলোচ্য হাদীসের বিষয়ে প্রাসঙ্গিক কথাবার্তা অনুচ্ছেদের শুরুভাগে আলোচিত হয়েছে। নবী-এর পবিত্র সত্তা মাথা থেকে পা পর্যন্ত ছিলো দিব্যি মুজিযাপূর্ণ। এ জন্য তাঁর পথ চলার নীতির মধ্যেও অতিপ্রকৃত বিষয়ের ন্যায় কতিপয় অলৌকিক পদ্ধতি বিদ্যমান ছিলো। যেমন :

এক, তিনি কিছুটা দ্রুতবেগে হাঁটতেন। অথচ তিনি দ্রুতবেগে হাঁটার মোটেই ইচ্ছা করতেন না। এদিকে সাহাবীদের অবস্থা ছিলো নবী -এর সঙ্গে দ্রুতগতিতে হাঁটতে হাঁটতে তাঁরা হাঁপিয়ে পড়তেন। আর এ কারণেই তিনি নিজে সাহাবীদের পেছনে হাঁটতেন যেন তাঁরা নবী -এর সঙ্গ থেকে পেছনে দূরে রয়ে না যান।

দুই, তিনি সম্মুখের দিকে ঝুঁকে দৃঢ় পদে একজন পুরুষের ন্যায় হাঁটতেন। মাটির উপর পায়ের তালুর স্পর্শ লাগতে দিতেন না। এমন কি হযরত আবূ যার গিফারী (রা) তাঁর বর্ণনায় বলেন, لَيْسَ لَهُ أَخْمَصَ প্রিয় নবী -এর পায়ের তালু ছিলোই না। বর্ণিত রহস্যটি সম্মুখে না রাখা হলে নবী -এর হাঁটা সম্পর্কীয় উভয় উক্তির মাঝে সমন্বয় সৃষ্টি করা জটিল হবে। এ কারণেই হযরত আবূ যার (রা) আরো বলেন, لَمْ أَرَى مِثْلَهُ আমি তাঁর ন্যায় কোন মানুষকে দেখিনি।

তিন, তিনি সমতল ভূমিতে এভাবে হাঁটতেন যেন কোনো ঢালু যমীন দিয়ে নিচের দিকে অবতরণ করছেন। উপরোক্ত রহস্য জানা না থাকলে পথ চলার এই অলৌকিক পদ্ধতিটিও হৃদয়ঙ্গম করা কঠিন। এ কারণে হযরত আলী (রা) স্পষ্টভাবে বলতে বাধ্য হন যে, لَمْ اَزَل قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ مِثْلُهُ আমি নবী -এর ন্যায় পূর্বে আর না তাঁর পরে তাঁর গুণাবলীর কোনো মানুষকে দেখেছি।

কাজেই আমরাও সম্মানিত পাঠক বৃন্দের কাছে আবেদন করবো যে, নবী -এর পবিত্র আকার-আকৃতি সম্পর্কীয় হাদীসসমূহ বিশেষত তাঁর পথচলা সম্পর্কীয় হাদীসগুলি অধ্যয়ন করার সময় একথাটি অবশ্যই সামনে রাখতে হবে যে, যেভাবে তাঁর মহান সত্তা মাথা থেকে পা পর্যন্ত সবটুকু ছিলো অলৌকিক। ঠিক তেমনি তার পথ চলার বিষয়টিও ছিলো একটি অলৌকিক ব্যাপার। হযরত আলী ও হযরত আবূ যার (রা) প্রমুখ উচ্চমানের সাহাবী যাঁরা নবী -কে খুবই নিকট থেকে পর্যবেক্ষণ করার সৌভাগ্য লাভ করেছেন তাঁরাও নিজেদের বক্তব্যে সেই রহস্যের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ 📄 কোন মজলিস ত্যাগ করার সময় নবী (সা)-এর পঠিত দু‘আ

📄 কোন মজলিস ত্যাগ করার সময় নবী (সা)-এর পঠিত দু‘আ


٢١٦ . عَنْ رَافِعِ بْنِ خَدِيجٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ إِذَا اجْتَمَعَ إِلَيْهِ أَصْحَابُهُ فَأَرَادَ أَنْ يُنْهَضَ قَالَ سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ اسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ -

২১৬. হযরত রাফি ইব্‌ন খাদীজ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর নিয়ম ছিল যে, তাঁর সাহাবীগণ কখনো তাঁর কাছে জমায়েত হওয়ার পর যখন তাঁরা মজলিস ত্যাগ করার ইচ্ছা করতেন তখন তিনি এ দু'আ পাঠ করতেন : سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ হে আল্লাহ্! তুমি মহান ও পবিত্র। আমরা তোমারই হাম্দ ও প্রশংসা করি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি ব্যতিরেকে অপর কোনো ইলাহ্ নেই। আমি তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তোমারই দিকে প্রত্যাবর্তন করবো।

۲۱۷. عَنْ رَافِعٍ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا أَرَادَ أَنْ يَنْهَضُ قَالَ سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، قُلْنَا يَا رَسُولَ اللهِ الله إِنَّ هَؤُلَاءِ كَلَمَاتُ أَحْدَثَنَهُنَّ قَالَ أَجَلْ جَاءَتْ بِهِنَّ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَام -

২১৭. হযরত রাফি' ইব্‌ন খাদীজ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন কোন মজলিস ত্যাগ করতে ইচ্ছা করতেন তখন এ দু'আ পড়তেন : سُبْحَانَكَ اَللَّهُمْ وَبِحَمْدِكَ আল্লাহ্! তুমি মহান ও পবিত্র। আমরা তোমারই হাম্দ ও প্রশংসা করি। আমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এ শব্দগুলো পাঠ করার জন্য আপনি নিজ থেকে মনোনীত করে নিয়েছেন ? নবী উত্তর দিলেন, না। এ শব্দগুলো হযরত জিব্রীল (আ) আমার কাছে নিয়ে আসেন।

ফায়দা : রাসূলুল্লাহ্-এর যাবতীয় শিক্ষার সারনির্যাস হলো তিনি নিজের কাজ-কর্ম, রীতি-নীতি ও কর্মপদ্ধতির দ্বারা সর্বদা মানুষকে মহান আল্লাহ্র সাথে সম্পর্ক সৃষ্টির জন্য সচেষ্ট থাকতেন। উম্মতকে তিনি এমন শিক্ষা ও পথনির্দেশ দিয়ে যান যাতে প্রকৃত ইলাহ্ মহান আল্লাহ্র সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়ে ওঠে। এবং জীবনের কোন অবস্থাতেই যেন তারা প্রকৃত মাওলা থেকে উদাসীন না থাকে। যাবতীয় ইবাদত-বন্দেগীর এই হলো সারনির্যাস। এরই মধ্যে নিহিত আছে মানব জীবনের সর্বাঙ্গীণ সফলতা ও কল্যাণ। উপরোক্ত হাদীসদ্বয়েও নবী এমন কিছু দু'আ ও কালেমা শিক্ষা দেন যেখানে আল্লাহ্ পাকের হামদ ও প্রশংসা, তাঁর পবিত্রতার ঘোষণা, তাঁর একত্ববাদের স্বীকৃতি এবং তাঁর কাছে সর্বদা তাওবা ও ইস্তিগফার করা ইত্যাদির প্রতি উৎসাহ দান করা হয়েছে কোন সন্দেহ নেই, মানুষ যখন কোনো মজলিসে কিংবা কোন মাহফিলে বসে তখন সেখানে দুনিয়া-আখিরাত সব ধরনের কথাবার্তা চলে। কখনো কখনো অর্থহীন আলাপ-আলোচনাও শুরু হয়। কাজেই এ স্থানেও নবী উম্মতকে আল্লাহ্ পাকের দিকে মনোযোগী করার লক্ষ্যে বর্ণিত দু'আটি পাঠ করেন। তা ছাড়া সেই মজলিসে জানা কিংবা অজানাভাবে যে সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটে যায় বর্ণিত দু'আর বরকতে তা থেকেও ক্ষমা পাওয়া যায়। এ দু'আর বিষয়ে অপর একখানা হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেন : দু'আটি হলো মজলিসের কাফফারা স্বরূপ। (আবূ দাউদ, পৃষ্ঠা ৬৬৭)

📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ 📄 নবী (সা)-এর সুগন্ধি পছন্দ করা ও সুগন্ধি ব্যবহার করার বর্ণনা

📄 নবী (সা)-এর সুগন্ধি পছন্দ করা ও সুগন্ধি ব্যবহার করার বর্ণনা


۲۱۸. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كُنَّا نَعْرِفُ رَسُولَ اللهِ إِذَا أَقْبَلَ بِطَيْبِ رِيحِهِ -

২১৮. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন আমাদের দিকে আসতেন তখন পূর্বেই তাঁর সুগন্ধির কারণে আমরা টের পেতাম যে তিনি আসছেন।

ফায়দা: আলোচ্য অনুচ্ছেদ দ্বারা গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হলো নবী-এর সুগন্ধির প্রতি অনুরাগ ও সুগন্ধি ব্যবহার করার বিষয়টি বর্ণনা করা। সে মতে এ অনুচ্ছেদে তিনি এতদসংক্রান্ত হাদীসগুলিকেই সন্নিবেশিত করেছেন। কতিপয় হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, তিনি কোন সুগন্ধি ব্যবহার করা ব্যতিরেকেও একান্ত অলৌকিকভাবে তাঁর মুবারক দেহের ঘামের মধ্যে এতটুকু সুগন্ধি বিদ্যমান ছিলো যা সাধারণ ব্যবহারের আতর জাতীয় জিনিস অপেক্ষাও উন্নতমানের ছিলো। নবী-এর শরীর থেকে সেই সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়তো। তিনি যে পথ দিয়ে হেঁটে যেতেন সেই পথও সুগন্ধিতে ভরে যেতো। সাহাবীগণ সহজেই উপলব্ধি করতেন যে, নবী এ পথ দিয়ে হেঁটে গিয়েছেন। কতিপয় সাহাবী তো তাঁর মুবারক ঘর্মবিন্দুগুলিকে আতর হিসাবেও ব্যবহার করতেন। একটি হাদীসে বলা হয়েছে হযরত উম্মে সুলাইম (রা) বলেন, নবী তার গৃহে এসে (দুপুরের আহারোত্তর) বিশ্রাম নিতেন। তখন তিনি নবী-এর বিশ্রাম গ্রহণের জন্য একটি চামড়ার বিছানা বিছিয়ে দিতেন। তাঁর শরীরে প্রচুর ঘাম হতো। উম্মে সুলাইম (রা) সে ঘামগুলি একত্র করে নিজেদের খুশবু ও সুগন্ধির সঙ্গে মিশিয়ে নিতেন। একদা নবী তাকে বললেন, উম্মে সুলাইম! এটি কি জিনিস? উম্মে সুলাইম (রা) বললেন, এটি আপনার শরীরের মুবারক ঘাম। আমরা এগুলিকে নিজেদের আতর জাতীয় দ্রব্যের সঙ্গে মিশিয়ে থাকি। কেননা, এ ঘামগুলি সকল সুগন্ধি অপেক্ষাও উন্নতমানের।

অপর একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, আমি কখনো কোন মৃগনাভি কিংবা কোন আতর এমন পাইনি যার সুগন্ধি নবী-এর ঘাম মুবারক অপেক্ষা উত্তম। (শামাইলে তিরমিযী)

একটি হাদীসে হযরত জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ (রা) বলেন, যখনই কোন পথ দিয়ে নবী হেঁটে যেতেন এবং তারপর অন্য কেউ সে পথ দিয়ে হেঁটে যেতেন তখন সে নবী -এর সুগন্ধির দ্বারা কিংবা বর্ণনাকারী বলেছেন, নবী-এর ঘাম মুবারকের সুগন্ধি দ্বারা বুঝতে পারতো যে, এ পথে তাঁর পদচারণা হয়েছিল।

সারকথা হলো, সুগন্ধি ব্যবহার করা নবী -এর আদর্শ ও মুস্তাহাব। রাসূলুল্লাহ্ সুগন্ধি খুবই পছন্দ করতেন। পরবর্তী হাদীসগুলিতে এ বিষয়ে আরো আলোচনা আসবে। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) একটি হাদীসে বলেন, আমি নবী -এর গায়ে সবচেয়ে উন্নত যে সুগন্ধি থাকত সেটি মাখিয়ে থাকতাম। (মিল্কাত)

۲۱۹. عَنْ أَنَسٍ قَالَ مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ عُرِضَ عَلَيْهِ طَيْبٌ فَرَدُّهُ -

২১৯. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এমনটা কখনো দেখিনি যে, রাসূলুল্লাহ্ -এর কাছে সুগন্ধি পেশ করা হয়েছে আর তিনি তা ফিরিয়ে দিয়েছেন।

ফায়দা : নবী -এর নীতি ছিলো যে, তাকে যদি সুগন্ধি জাতীয় কোন জিনিস হাদিয়া হিসেবে দেওয়া হতো তখন তা ফিরিয়ে দিতেন না। জামি 'তিরমিযী গ্রন্থে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) সূত্রে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেন : তিনটি জিনিস এমন যা ফিরিয়ে দেয়া যায় না। এক. বালিশ, দুই. সুগন্ধি ও তিন, দুধ। অপর একটি হাদীসে হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, নবী কখনোই সুগন্ধি জাতীয় জিনিস ফিরিয়ে দিতেন না। একটি হাদীসে হযরত আবূ উসমান নাহদী (রা) বলেন, নবী ইরশাদ করেন যে, কেউ যদি তোমাদেরকে রেহানা ফুল উপহার দেয় তাহলে সেটি ফিরিয়ে দিও না। কেননা এটি বেহেস্ত থেকে আগত একটি ফুল।

۲۲۰ عَنْ مُوسَى بْنِ أَنَسٍ عَنْ أَبِيْهِ قَالَ كَانَ لِرَسُولِ اللَّهِ ﷺ سُكَّةٌ يَتَطَيَّبُ بِهَا -

২২০. হযরত মূসা ইব্‌ন আনাস তাঁর পিতা হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর নিকট একটি উত্তম আতর ছিলো। তিনি তা ব্যবহার করতেন।

۲۲۱. عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيَّ كَانَ لَهُ سُكَّةٌ يَتَطَيَّبُ مِنْهَا -

২২১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী -এর কাছে একটি উত্তম আতর ছিলো। তিনি তা মাখতেন।

۲۲۲ . عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ الْمُخْتَارِ مِثْلَهُ -

২২২. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন মুগ্ধার (রা) থেকে অনুরূপ বর্ণিত আছে।

ফায়দা: 'সুক্কাহ' শব্দটির দু'টি ব্যাখ্যা আছে। এক. সুক্কাহ্ অর্থ আতরদানী, আতর রাখার পাত্র। সাধারণত শব্দটি এ অর্থে অধিক প্রচলিত। তবে 'কামূস' অভিধানে মিশ্রণ দ্বারা তৈরি এক ধরনের বিশেষ আতরকে সুক্কাহ বলা হয়। কামূস অভিধানে দ্বিতীয় অর্থটিকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।

উপরোক্ত হাদীসসমূহের আলোকে আরো বোঝা যায় যে, সুগন্ধি নবী -এর কাছে খুবই পছন্দের জিনিস ছিলো। বিশেষ সুক্কাহ্ নামক সুগন্ধি বেশি ব্যবহার করতেন। এ সুক্কাহ্ নানা জাতীয় সুগন্ধির মিশ্রণ দ্বারা তৈরি করা হতো।

۲۲۳. عَنْ أَنَسٍ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ حُبِّبَ إِلَيَّ مِنَ الدُّنْيَا النِّسَاءُ وَالطَّيِّبُ -

২২৩. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ইরশাদ করেন যে, জগতে আমার নিকট নারী ও সুগন্ধি অধিক প্রিয় করা হয়েছে।

ফায়দা : নবী এমন এক যুগে এমন এক সমাজে প্রেরিত হয়েছিলেন যে সমাজে নারীর অস্তিত্বকে একটি অভিশাপ, চরম লাঞ্ছনা ও অপমানজনক বলে জ্ঞান করা হতো। প্রাচীন আরবীয়রা আত্মসম্মানের হানি বোধ করে নারীদেরকে জীবন্ত কবর দিতো। তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সম্মান দান তো সে সমাজের কল্পনাতেও ছিলো না। জাহেলী সমাজে এভাবে তাদেরকে মানুষ সমাজ-বহির্ভূত মূল্যহীন পণ্য হিসাবে গণ্য করা হতো। কিন্তু জগতে ইসলাম আগমনের পর ইসলাম সর্বপ্রথম এ অমানবিক নীতির বিরুদ্ধে কঠোরভাবে রুখে দাঁড়ায়। ইসলাম নারীদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করে, মানুষের মন-মানসিকতা ও চিন্তাধারায় নারীদের প্রতি যে ঘৃণাবোধ বিদ্যমান ছিলো তা দূরীভূত করে তাদের প্রতি স্নেহ ভালবাসা ও দয়ার বীজ বপন করে। সমাজে তাদের ন্যায্য (ভারসাম্যপূর্ণ) অধিকারকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করে। তাদেরকে পিতৃ সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে রায় দেয়। অধিকন্তু একজন মুসলিম যে মানে নিজের জীবন যাপন করে সে মানে তার স্ত্রী ও কন্যাদেরকে জীবন যাপন করতে দেওয়াকে ফরয তথা অবশ্য কর্তব্য বলে ঘোষণা দেয়। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে : وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةً وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

আর নারীদের তেমনি ন্যায়সংগত অধিকার আছে যেমন আছে তাদের উপর পুরুষদের। কিন্তু নারীদের উপর পুরুষদের অতিরিক্ত মর্যাদা আছে (সেটি হলো পুরুষ নারীদের তত্ত্বাবধায়ক) আল্লাহ্ মহাপরাক্রমশালী ও পরম প্রজ্ঞাময়। (সূরা বাকারা : ২২৮)

এ কারণে মহান আল্লাহ্ সৃষ্টিগতভাবে মানব প্রকৃতিতে নারীদের প্রতি বিশেষ ধরনের একটি আকর্ষণ ও ভালবাসা দিয়ে দিয়েছেন। মানুষ হিসাবে সকলের প্রকৃতির মধ্যেই কমবেশি এ আকর্ষণ বিদ্যমান। নবী যেহেতু মানুষের মধ্যে সবচেয়ে পরিপূর্ণ মানব এবং মানবতার সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন ছিলেন, সেহেতু তাঁর মধ্যে মানবীয় প্রকৃতিও ছিলো পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান। তাই তাঁর পবিত্র সত্তায় প্রকৃতিগত এ সব বিষয়ের চাহিদাও ছিলো পূর্ণমানের। উপরোক্ত উক্তিটি নবী -এর সেই প্রকৃতিগত ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। কুরআন পাকের মধ্যে কথাটির দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে : وَمِنْ أَيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ من أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً

নিদর্শনাবলির মধ্যে আরো রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন নারীদেরকে, যেন তোমরা তাদের নিকট শান্তি পাও। এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা ও দয়ার সৃষ্টি করেছেন। (সূরা রূম: ২১)

٢٢٤. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَكْرَهُ أَنْ يَخْرُجَ إِلَى أَصْحَابِهِ تَفْلُ الرِّيحِ وَكَانَ إِذَا كَانَ مِنْ آخِرِ اللَّيْلِ مَسَّ طَيْبًا -

২২৪. হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর নীতি ছিল তিনি সাধারণ গন্ধ নিয়ে সাহাবীদের সাক্ষাতে যাওয়া অপছন্দ করতেন। এজন্য তিনি রাতের শেষ ভাগে সুগন্ধি লাগাতেন।

٢٢٥. عَنْ أَنَسٍ أَنَّهُ كَانَ لَا يَرُدُّ الطَّيْبَ وَيُحَدِّثُ أَنَّهُ كَانَ لَا يَرُدُّهُ -

২২৫. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি কখনো সুগন্ধি ফিরিয়ে দিতেন না। আর তিনি (এ ব্যাপারে) নবী -এর হাদীস বর্ণনা করে বলতেন, নবী নিজেও কখনো সুগন্ধির হাদিয়া ফিরিয়ে দিতেন না।

٢٢٦. عَنْ جَابِرٍ قَالَ كَانَ فِي رَسُولِ اللهِ خِصَالُ لَمْ يَكُنْ فِي طَرِيق فَيَسْلَكُهُ أَحَدٌ إِلَّا عُرِفَ أَنَّهُ سَلَكَهُ مِنْ طِيبٍ عَرَفَهُ أَوْ رِيْحٍ عَرَقِهِ -

২২৬. হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর পবিত্র সত্তায় বহু উত্তম গুণ বিদ্যমান ছিলো। একটি হলো তিনি যে পথ দিয়েই যেতেন তারপর সে পথ দিয়ে অন্য কেউ গমন করলে সে ব্যক্তি নবী-এর দেহ থেকে ছড়ানো সুগন্ধির দ্বারা টের করতে পারতো যে, এ পথে তাঁর পদচারণা হয়েছিল।

۲۲۷. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَطْلُبُ الطَّيْبَ فِي جَمِيعِ رِبَاعِ نِسَائِهِ -

২২৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী-এর নিয়ম ছিলো তিনি সকল বিবির ঘরে গিয়ে সুগন্ধি খোঁজ করতেন।

ফায়দা: এ হাদীস থেকেও বোঝা যাচ্ছে যে, নবী-এর কাছে সুগন্ধি জাতীয় জিনিস খুবই পছন্দনীয় ছিলো। তিনি আপন বিবিদের প্রত্যেকের গৃহে সুগন্ধির ব্যবস্থা রাখতেন। তারপর সে গৃহে তাঁর যাওয়া হলে সেই সুগন্ধি ব্যবহারপূর্বক নিজের ও বিবির জন্য মনস্তুষ্টির আয়োজন করে নিতেন।

📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ 📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পোশাক-পরিচ্ছদের বর্ণনা

📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পোশাক-পরিচ্ছদের বর্ণনা


আলোচ্য অনুচ্ছেদে যেসব হাদীস উপস্থাপন করা হয়েছে সেগুলির মধ্যে নবী -এর জামা, তাঁর জোব্বা, লুঙ্গি, চাদর, পাগড়ি, টুপি, পায়জামা, গরম কাপড়, আংটি, আংটিতে পাথর বসানোর স্থান, আংটির উপর অংকিত নক্শা, মোজা, জুতা, ধনুক, তীর, তলোয়ার, বর্ম, শিরস্ত্রাণ, ঝাণ্ডা, পতাকা, বর্শা, ছুরি, চেয়ার, তাঁবু, ঘোড়া, বাহনরূপে খচ্চর, বাহনের গদি, উট, রণক্ষেত্রে উচ্চারিত তাঁর বিভিন্ন শব্দ, বিছানা, ব্যবহৃত লেপ, হেলান দেয়ার জিনিস, বালিশ, খাটিয়া, চাটাই, তাঁর শয়নকালে পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত, শয়নপূর্বে দু'আ পাঠ, সুরমা ব্যবহার, রাত্রিকালের আমল, বিছানায় শোয়া অবস্থার আমল, জাগ্রত হওয়ার মুহূর্তে তাঁর আমল, বিছানা ত্যাগ পরবর্তী আমল ইত্যাদি বিষয় বর্ণিত হয়েছে। নিম্নে এসবের সবিস্তার আলোচিত হচ্ছে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px