📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ > 📄 নবী (সা)-এর ক্রন্দন করা ও দুঃখিত হওয়ার বর্ণনা

📄 নবী (সা)-এর ক্রন্দন করা ও দুঃখিত হওয়ার বর্ণনা


١٩٤ . عَنْ أَنَسٍ قَالَ رَأَيْتُ إِبْرَاهِيمَ بْنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَدَعَاهُ فَضَمَّهُ إِلَيْهِ فَرَأَيْتُهُ بَيْنَ يَدَى رَسُولُ اللهِ ﷺ وَهُوَ يَكِيدُ بِنَفْسِهِ ، فَدَمَعَتْ عَيْنَاهُ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ تَدْمَعُ الْعَيْنُ وَيَحْزَنُ الْقَلْبُ وَلَا نَقُولُ الأَمَا يُرْضَى رَبَّنَا وَإِنَّا بِكَ يَا إِبْرَاهِيمُ لَمَحْزُونُونَ -

১৯৪. আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-এর পুত্র ইব্রাহীম (রা)-কে (তাঁর মৃত্যুর সময়ে) দেখতে গেলাম। (তখন দেখলাম নবী তাঁকে এতই ভালবাসতেন যে, সে মুহূর্তে তিনি ছুটে আসেন এবং) তাঁকে একটি ডাক দিয়ে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নেন। হযরত আনাস (রা) বলেন, তারপর আমি ইব্রাহীমকে নবী-এর কোলে এমতাবস্থায় দেখলাম যখন তিনি জীবনের অন্তিম মুহূর্তগুলি অতিক্রম করছিলেন। এ সময় প্রিয় নবী-এর চক্ষুদ্বয় অশ্রুপাত করতে থাকে আর তিনি বলতে থাকেন, চক্ষু অশ্রুপাত করছে, হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে। কিন্তু মুখ দ্বারা আমরা কেবল এতটুকু কথাই বলতে পারি যতটুকু পর্যন্ত আমাদের প্রতিপালক সন্তুষ্ট থাকেন। হে ইব্রাহীম! আমরা তোমার বিদায়ে খুবই ভারাক্রান্ত ও ব্যথিত।

ফায়দা : উল্লিখিত হাদীসে নবী-এর ক্রন্দন করা ও ব্যথিত হওয়ার অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি হাসার মুহূর্তে যেভাবে ভারসাম্য নীতি পছন্দ করতেন তেমনি দুঃখ ও বেদনার মুহূর্তে ও ক্রন্দন করার ক্ষেত্রেও ভারসাম্য নীতি রক্ষা করতেন। এ কারণে যেমনি তিনি কখনো অট্টহাসি হাসতেন না, তেমনি জোর আওয়াজে কিংবা চিৎকার দিয়ে কখনো ক্রন্দন করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাঁর ক্রন্দনের সীমা কেবল এতটুকু পর্যন্ত পৌছত যে, নয়নযুগল অশ্রুতে ভরে যেত, হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠত। কিন্তু মুখ থেকে কখনো আহ্! উহ্! ধরনের চিৎকার ধ্বনি বেরিয়ে আসতো না। তাঁর নয়নমণি প্রিয়পুত্র যে মুহূর্তে দুনিয়া থেকে শেষবারের মত বিদায় নিচ্ছিলেন তখন বেদনায় তাঁর হৃদয় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়, কিন্তু মুখে কান্না ধ্বনি চিৎকার ইত্যাদির বদলে চক্ষুদ্বয় থেকে কেবল অশ্রুপাত ঘটতে থাকে।

নবী-এর এ নয়নমণি হযরত ইব্রাহীম (রা) উম্মুল মু'মিনীন মারিয়া কিবতিয়া (রা) -এর গর্ভে মদীনা মুনাওয়ারায় জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু দুগ্ধপানের সময়সীমা অতিক্রমের পূর্বেই তিনি ইন্তিকাল করেন। এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ১৮ মাস।

নবী-এর সর্বমোট তিনজন সাহেবজাদা ও চারজন সাহেবজাদী জন্মগ্রহণ করেন। পুত্রদের মধ্যে সর্বপ্রথম জন্মগ্রহণ করেন হযরত কাসিম (রা)। তিনি উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রা)-এর গর্ভে জন্ম নেন। তারপর তিনি যখন সবেমাত্র পা বাড়িয়ে হাঁটার বয়স পর্যন্ত পৌঁছেন তখন ইন্তিকাল করেন। দ্বিতীয় পুত্র হযরত আবদুল্লাহ্ (রা), তিনি মক্কা মুয়ায্যমায় জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই ইন্তিকাল করেন। আর তৃতীয় পুত্র ছিলেন এই হযরত ইব্রাহীম (রা)।

নবী-এর চারজন সাহেবজাদী ছিলেন। হযরত যায়নাব, হযরত রুকাইয়্যা, হযরত উম্মে কুলসূম ও হযরত ফাতিমাতুয যাহরা (রা)। হযরত ফাতিমাতুয যাহরা (রা)-এর মাধ্যমেই দুনিয়ায় তাঁর বংশের বিস্তার লাভ ঘটে। বিস্তারিত বিবরণের জন্য ইতিহাসের গ্রন্থাবলি দ্রষ্টব্য।

١٩٥ . عَنْ خَالِدِ بْنِ سَلَمَةَ الْمَخْزُومِيُّ لَمَّا أُصِيْبَ زَيْدُ بْنِ حَارِثَةَ انْطَلَقَ رَسُولُ اللَّهِ إِلَى مَنْزِلِهِ فَلَمَّا رَأَتْهُ ابْنَتُهُ جَهَشَّتْ فِي وَجْهِهِ فَانْتَحَبَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَقَالَ لَهُ بَعْضُ أَصْحَابِهِ مَا هَذَا يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ هُذَا شَوْقُ الْحَبِيْبِ إِلَى حَبِيْبِهِ -

১৯৫. হযরত খালিদ ইব্‌ন সালামা মাখযূমী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত যায়দ ইবন হারিসা (রা) যখন (মাসতার যুদ্ধে) শাহাদত বরণ করেন তখন রাসূলুল্লাহ্ তাঁর গৃহে যান। হযরত হারিসের কন্যা নবীকে দেখেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। নবী নিজেও তাঁর সাথে কাঁদতে শুরু করেন। তখন জনৈক সাহাবী আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এ কি ব্যাপার! (আপনি নিজেও কাঁদছেন?) নবী ইরশাদ করলেন : এটি হলো এক বন্ধুর প্রতি অপর বন্ধুর ভালবাসার আন্তরিক বহিঃপ্রকাশ।

ফায়দা : হযরত যায়দ ইব্‌ন হারিসা (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ্-এর অন্যতম প্রিয় সাহাবী। জাহেলী যুগে তিনি অপহৃত হন এবং গোলাম হিসাবে বিক্রি হয়ে যান। উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রা) তাঁকে খরিদ পূর্বক নবী-কে হাদিয়া হিসেবে দেন। নবী তাঁকে আযাদ করে দেন এবং নিজের পোষ্যপুত্র রূপে বরণ করেন। তিনি যায়দকে অতিশয় ভালবাসতেন। এমন কি যখন হযরত যায়দের পিতামাতা নিজ পুত্রের সন্ধান পেয়ে তাঁকে ঘরে ফিরিয়ে নিতে চাইলেন তখন হযরত যায়দ (রা) নবী-কে ত্যাগ করে আপন পিতামাতার সঙ্গে যেতে অস্বীকার করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি নবী-এর কাছে থাকাকেই পছন্দ করেন। তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মৃতার যুদ্ধে নবী তাঁকে সেনাপতি নিযুক্ত করে সিরিয়া অভিযানে প্রেরণ করেছিলেন। এ যুদ্ধে (৮ম হিজরীতে) তিনি শাহাদত লাভ করেন। তাঁর মৃত্যুতে নবীশোকে জর্জরিত হয়ে পড়েন। অতঃপর নবী সমবেদনা জ্ঞাপনের জন্য তাঁর কন্যার গৃহে গমন করলে ভালবাসা ও মানবিক কারণে তিনিও ক্রন্দন সংবরণ করতে পারেননি। তাঁর চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে শুরু করেছিলো। সাহাবীগণ তাঁর কাছে এ কান্নার কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, এ কান্নাকাটি বস্তুত মানুষের সহজাত একটি বিষয়। পরস্পরের প্রতি আন্তরিক ভালবাসা ও সম্পর্কের কারণে এটি হয়ে থাকে। এ হাদীসের মধ্যেও নবী থেকে যে কান্নাকাটি করার উল্লেখ পাওয়া যায় সেটিও নির্ধারিত সীমা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিলো। এতে চিৎকার দিয়ে কান্নাকাটি, অস্থিরতা ও বিলাপ করার নাম-গন্ধও নেই। তবে বিরহ যাতনা ও বিরহ বেদনার বহিঃপ্রকাশ ঘটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এতটুকু না হওয়া মানুষের কঠোর চিত্ততার পরিচায়ক। (অথচ কঠোর চিত্ততা, দয়া-মায়াহীনতা হলো মমত্ববোধের বিপরীত যা আল্লাহ্র কাছে পছন্দনীয় নয়।) তবে কান্নাকাটি করার মুহূর্তে সীমা অতিক্রম করা, চিৎকার কিংবা বিলাপ করা ইত্যাদি শরীয়ত বিরোধী ও নিষিদ্ধ। নবী -এর জীবন চরিতের প্রতিটি অধ্যায় উম্মতের জন্য শিক্ষণীয় ও অনুকরণীয়। তাঁর এই কর্মপদ্ধতি পরম যাতনা ক্লিষ্টতা ও ব্যথাতুর হওয়ার মুহূর্তে দুঃখ ও বেদনা প্রকাশের একটি সীমারেখা নির্ধারণ করে দিচ্ছে এবং ভারসাম্যপূর্ণ একটি পথের সন্ধান দিচ্ছে। এটিই ছিল সেই উন্নত ও মহান চরিত্র যাঁর ঘোষণায় মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন : (إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ) (হে রাসূল) নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত। (সূরা কালাম : ৪)

📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ > 📄 নবী (সা)-এর ক্রন্দন করা ও দুঃখিত হওয়ার বর্ণনা

📄 নবী (সা)-এর ক্রন্দন করা ও দুঃখিত হওয়ার বর্ণনা


١٩٤ . عَنْ أَنَسٍ قَالَ رَأَيْتُ إِبْرَاهِيمَ بْنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَدَعَاهُ فَضَمَّهُ إِلَيْهِ فَرَأَيْتُهُ بَيْنَ يَدَى رَسُولُ اللهِ ﷺ وَهُوَ يَكِيدُ بِنَفْسِهِ ، فَدَمَعَتْ عَيْنَاهُ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ تَدْمَعُ الْعَيْنُ وَيَحْزَنُ الْقَلْبُ وَلَا نَقُولُ الأَمَا يُرْضَى رَبَّنَا وَإِنَّا بِكَ يَا إِبْرَاهِيمُ لَمَحْزُونُونَ -

১৯৪. আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-এর পুত্র ইব্রাহীম (রা)-কে (তাঁর মৃত্যুর সময়ে) দেখতে গেলাম। (তখন দেখলাম নবী তাঁকে এতই ভালবাসতেন যে, সে মুহূর্তে তিনি ছুটে আসেন এবং) তাঁকে একটি ডাক দিয়ে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নেন। হযরত আনাস (রা) বলেন, তারপর আমি ইব্রাহীমকে নবী-এর কোলে এমতাবস্থায় দেখলাম যখন তিনি জীবনের অন্তিম মুহূর্তগুলি অতিক্রম করছিলেন। এ সময় প্রিয় নবী-এর চক্ষুদ্বয় অশ্রুপাত করতে থাকে আর তিনি বলতে থাকেন, চক্ষু অশ্রুপাত করছে, হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে। কিন্তু মুখ দ্বারা আমরা কেবল এতটুকু কথাই বলতে পারি যতটুকু পর্যন্ত আমাদের প্রতিপালক সন্তুষ্ট থাকেন। হে ইব্রাহীম! আমরা তোমার বিদায়ে খুবই ভারাক্রান্ত ও ব্যথিত।

ফায়দা : উল্লিখিত হাদীসে নবী-এর ক্রন্দন করা ও ব্যথিত হওয়ার অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি হাসার মুহূর্তে যেভাবে ভারসাম্য নীতি পছন্দ করতেন তেমনি দুঃখ ও বেদনার মুহূর্তে ও ক্রন্দন করার ক্ষেত্রেও ভারসাম্য নীতি রক্ষা করতেন। এ কারণে যেমনি তিনি কখনো অট্টহাসি হাসতেন না, তেমনি জোর আওয়াজে কিংবা চিৎকার দিয়ে কখনো ক্রন্দন করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাঁর ক্রন্দনের সীমা কেবল এতটুকু পর্যন্ত পৌছত যে, নয়নযুগল অশ্রুতে ভরে যেত, হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠত। কিন্তু মুখ থেকে কখনো আহ্! উহ্! ধরনের চিৎকার ধ্বনি বেরিয়ে আসতো না। তাঁর নয়নমণি প্রিয়পুত্র যে মুহূর্তে দুনিয়া থেকে শেষবারের মত বিদায় নিচ্ছিলেন তখন বেদনায় তাঁর হৃদয় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়, কিন্তু মুখে কান্না ধ্বনি চিৎকার ইত্যাদির বদলে চক্ষুদ্বয় থেকে কেবল অশ্রুপাত ঘটতে থাকে।

নবী-এর এ নয়নমণি হযরত ইব্রাহীম (রা) উম্মুল মু'মিনীন মারিয়া কিবতিয়া (রা) -এর গর্ভে মদীনা মুনাওয়ারায় জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু দুগ্ধপানের সময়সীমা অতিক্রমের পূর্বেই তিনি ইন্তিকাল করেন। এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ১৮ মাস।

নবী-এর সর্বমোট তিনজন সাহেবজাদা ও চারজন সাহেবজাদী জন্মগ্রহণ করেন। পুত্রদের মধ্যে সর্বপ্রথম জন্মগ্রহণ করেন হযরত কাসিম (রা)। তিনি উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রা)-এর গর্ভে জন্ম নেন। তারপর তিনি যখন সবেমাত্র পা বাড়িয়ে হাঁটার বয়স পর্যন্ত পৌঁছেন তখন ইন্তিকাল করেন। দ্বিতীয় পুত্র হযরত আবদুল্লাহ্ (রা), তিনি মক্কা মুয়ায্যমায় জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই ইন্তিকাল করেন। আর তৃতীয় পুত্র ছিলেন এই হযরত ইব্রাহীম (রা)।

নবী-এর চারজন সাহেবজাদী ছিলেন। হযরত যায়নাব, হযরত রুকাইয়্যা, হযরত উম্মে কুলসূম ও হযরত ফাতিমাতুয যাহরা (রা)। হযরত ফাতিমাতুয যাহরা (রা)-এর মাধ্যমেই দুনিয়ায় তাঁর বংশের বিস্তার লাভ ঘটে। বিস্তারিত বিবরণের জন্য ইতিহাসের গ্রন্থাবলি দ্রষ্টব্য।

١٩٥ . عَنْ خَالِدِ بْنِ سَلَمَةَ الْمَخْزُومِيُّ لَمَّا أُصِيْبَ زَيْدُ بْنِ حَارِثَةَ انْطَلَقَ رَسُولُ اللَّهِ إِلَى مَنْزِلِهِ فَلَمَّا رَأَتْهُ ابْنَتُهُ جَهَشَّتْ فِي وَجْهِهِ فَانْتَحَبَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَقَالَ لَهُ بَعْضُ أَصْحَابِهِ مَا هَذَا يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ هُذَا شَوْقُ الْحَبِيْبِ إِلَى حَبِيْبِهِ -

১৯৫. হযরত খালিদ ইব্‌ন সালামা মাখযূমী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত যায়দ ইবন হারিসা (রা) যখন (মাসতার যুদ্ধে) শাহাদত বরণ করেন তখন রাসূলুল্লাহ্ তাঁর গৃহে যান। হযরত হারিসের কন্যা নবীকে দেখেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। নবী নিজেও তাঁর সাথে কাঁদতে শুরু করেন। তখন জনৈক সাহাবী আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এ কি ব্যাপার! (আপনি নিজেও কাঁদছেন?) নবী ইরশাদ করলেন : এটি হলো এক বন্ধুর প্রতি অপর বন্ধুর ভালবাসার আন্তরিক বহিঃপ্রকাশ।

ফায়দা : হযরত যায়দ ইব্‌ন হারিসা (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ্-এর অন্যতম প্রিয় সাহাবী। জাহেলী যুগে তিনি অপহৃত হন এবং গোলাম হিসাবে বিক্রি হয়ে যান। উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রা) তাঁকে খরিদ পূর্বক নবী-কে হাদিয়া হিসেবে দেন। নবী তাঁকে আযাদ করে দেন এবং নিজের পোষ্যপুত্র রূপে বরণ করেন। তিনি যায়দকে অতিশয় ভালবাসতেন। এমন কি যখন হযরত যায়দের পিতামাতা নিজ পুত্রের সন্ধান পেয়ে তাঁকে ঘরে ফিরিয়ে নিতে চাইলেন তখন হযরত যায়দ (রা) নবী-কে ত্যাগ করে আপন পিতামাতার সঙ্গে যেতে অস্বীকার করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি নবী-এর কাছে থাকাকেই পছন্দ করেন। তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মৃতার যুদ্ধে নবী তাঁকে সেনাপতি নিযুক্ত করে সিরিয়া অভিযানে প্রেরণ করেছিলেন। এ যুদ্ধে (৮ম হিজরীতে) তিনি শাহাদত লাভ করেন। তাঁর মৃত্যুতে নবীশোকে জর্জরিত হয়ে পড়েন। অতঃপর নবী সমবেদনা জ্ঞাপনের জন্য তাঁর কন্যার গৃহে গমন করলে ভালবাসা ও মানবিক কারণে তিনিও ক্রন্দন সংবরণ করতে পারেননি। তাঁর চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে শুরু করেছিলো। সাহাবীগণ তাঁর কাছে এ কান্নার কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, এ কান্নাকাটি বস্তুত মানুষের সহজাত একটি বিষয়। পরস্পরের প্রতি আন্তরিক ভালবাসা ও সম্পর্কের কারণে এটি হয়ে থাকে। এ হাদীসের মধ্যেও নবী থেকে যে কান্নাকাটি করার উল্লেখ পাওয়া যায় সেটিও নির্ধারিত সীমা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিলো। এতে চিৎকার দিয়ে কান্নাকাটি, অস্থিরতা ও বিলাপ করার নাম-গন্ধও নেই। তবে বিরহ যাতনা ও বিরহ বেদনার বহিঃপ্রকাশ ঘটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এতটুকু না হওয়া মানুষের কঠোর চিত্ততার পরিচায়ক। (অথচ কঠোর চিত্ততা, দয়া-মায়াহীনতা হলো মমত্ববোধের বিপরীত যা আল্লাহ্র কাছে পছন্দনীয় নয়।) তবে কান্নাকাটি করার মুহূর্তে সীমা অতিক্রম করা, চিৎকার কিংবা বিলাপ করা ইত্যাদি শরীয়ত বিরোধী ও নিষিদ্ধ। নবী -এর জীবন চরিতের প্রতিটি অধ্যায় উম্মতের জন্য শিক্ষণীয় ও অনুকরণীয়। তাঁর এই কর্মপদ্ধতি পরম যাতনা ক্লিষ্টতা ও ব্যথাতুর হওয়ার মুহূর্তে দুঃখ ও বেদনা প্রকাশের একটি সীমারেখা নির্ধারণ করে দিচ্ছে এবং ভারসাম্যপূর্ণ একটি পথের সন্ধান দিচ্ছে। এটিই ছিল সেই উন্নত ও মহান চরিত্র যাঁর ঘোষণায় মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন : (إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ) (হে রাসূল) নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত। (সূরা কালাম : ৪)

📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ > 📄 নবী (সা)-এর কথাবার্তা বলার নীতি

📄 নবী (সা)-এর কথাবার্তা বলার নীতি


١٩٦ ، عَنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ قَالَ سَأَلْتُ خَالِى هِنْدًا قُلْتُ صِفْ لِي مَنْطِقَهُ؟ فَقَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مُتَوَاصِلَ الأَحْزَانِ دَائِمُ الْفِكْرِ، لَيْسَتْ لَهُ رَاحَةٌ لا يَتَكَلَّمُ فِي غَيْرِ حَاجَةٍ طَوِيلُ السِّكْتِ، يَفْتَتِحُ الْكَلَامَ وَيَخْتِمُهُ بِأَشْدَاقِهِ ، وَيَتَكَلَّمُ بِجَوَامِعِ الْكَلِمِ فَصْلاً لَا فُضُولَ فِيْهِ وَلَا تَقْصِيرَ دَمَثُ لَيْسَ بِالْجَافِي وَلَا بِالمَهِيْنِ يُعَظِمُ النِعْمَةَ وَإِنْ دُقَّتْ وَلَا يَذُمُّ مِنْهَا شَيْئًا، لَا تُغْضَبُهُ الدُّنْيَا وَمَا كَانَ لَهَا، فَإِذَا تَعُوطِي الْحَقَّ لَمْ يَعْرِفْهُ أَحَدٌ ، وَلَمْ يَقُمْ بِغَضَبِهِ شَيْ حَتَّى يَنْتَصِرَ لَهُ وَإِذَا أَشَارَ أَشَارَ بِكَفِّهِ كُلُّهَا وَإِذَا تَعَجَّبَ قَلْبُهَا ، وَإِذَا تَحَدَّثَ اتِّصَلَ بِهَا يَضْرِبُ بِرَاحَتِهِ الْيُمْنَى بَاطِنَ إِبْهَا مِهِ الْيُسْرَى -

১৯৬. হযরত হাসান ইব্‌ন আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার মামা হযরত হিন্দা ইব্‌ন আবূ হালা (রা)-কে নবী -এর কথাবার্তা বলার নীতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি বললেন, নবী তাঁর নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য মহান আল্লাহ্ পাকের সন্তুষ্টি মোতাবেক পালন করার চিন্তায় চির আত্মনিমগ্ন এবং উম্মতের সফলতা ও কল্যাণ চিন্তায় সর্বদা বিভোর থাকতেন। সামান্য পরিমাণের অস্থিরতাও তাঁর ছিলো না। কাজেই অধিকাংশ সময় তিনি চুপ থাকতেন, প্রয়োজন ব্যতিরেকে কোন কথা বলতেন না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কথা বলতেন খুবই স্পষ্টভাবে। তাঁর কথাগুলি ছিলো উপযুক্ত শব্দমালার দ্বারা গঠিত সৌষ্ঠবতাপূর্ণ বাক্য। এক বাক্য অন্য বাক্য থেকে পৃথক থাকতো। কথাগুলির মধ্যে না কোন অতিরিক্ত শব্দ থাকতো, আর না মর্ম প্রকাশে অক্ষম কোন শব্দ পাওয়া যেত। তিনি ছিলেন মিষ্টভাষী। কদর্যতা কিংবা রূঢ়তা তাঁর ভাষায় ছিলো না। আল্লাহ্ পাকের কোন নিয়ামত তা যতই ছোট হোক, তিনি এর খুবই কদর করতেন। কখনো তা হেয় কিংবা তুচ্ছ মনে করতেন না। জাগতিক কোন কাজ তাকে ক্রোধান্বিত করতো না, (কেননা তাঁর দৃষ্টিতে জাগতিক বিষয়াদির তেমন কোন গুরুত্ব ছিল না) আর জাগতিক কাজকর্ম ক্রোধ নিপাতের বস্তুও নয়। তবে সত্য ও ন্যায়ের উপর হস্তক্ষেপ করা হলে তার চেহারা এত পরিবর্তন হয়ে যেতো যে, কেউ তাঁকে তখন চেনা কঠিন হতো। আর সে মুহূর্তে তাঁর ক্রোধের সামনে দাঁড়িয়ে কোন বিষয় টিকতে সক্ষম হতো না; যতক্ষণ না তিনি অন্যায়ের প্রতিকার করতেন। তিনি যখন কারোর দিকে ইশারা করতেন তখন সম্পূর্ণ হাত দ্বারা ইশারা করতেন। (কেননা শুধু অঙ্গুলী দ্বারা ইশারা করা ভালো নয়।) তিনি কখনো কোন কাজে বিস্ময় প্রকাশ করলে হাত মুবারক ঘুরিয়ে নিতেন। কথা বলার সময় কখনো কখনো হাতও নাড়াচাড়া করতেন। এভাবে কখনো তিনি ডান হাতের তালু বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলের পেটের উপর মারতেন।

ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসটি অনেক দিক থেকে ব্যাপক একটি হাদীস। এ হাদীসে নবী -এর কথাবার্তা বলা, বলার ভঙ্গি ও ধরন, বাক্যের মিষ্টতা ও আকর্ষণ, মন-মানসিকতার স্বরূপ এবং কথাবার্তা বলার নীতি সম্পর্কীয় যাবতীয় বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ পেশ করা হয়েছে। এ হাদীসে নবী-এর কথাবার্তা বলার ধরন সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। তাঁর পবিত্র জীবনাদর্শের এ অংশটুকুর দ্বারা মানবীয় স্বভাব ও উন্নত নৈতিকতা- বোধের এমন একটি অধ্যায়ের সন্ধান মেলে যা সকল মুসলিমের জন্য জীবন-পাথেয় হওয়ার যোগ্যতা রাখে। হাদীসটির মধ্যে এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাগুলি পাওয়া যায়, যেগুলি থেকে উম্মতের শিক্ষা গ্রহণ বাঞ্ছনীয় সেগুলি হলো নিম্নরূপ:
তিনি বিনা প্রয়োজনে কথাবার্তা বলতেন না। নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন চিন্তায় সারাক্ষণ আত্ম-নিমগ্ন থাকতেন। উম্মতের সফলতা ও কল্যাণ লাভের চিন্তা সর্বদা তাঁকে বিভোর করে রাখতো। এ সকল গুরুত্বপূর্ণ কাজের চিন্তা-ভাবনার কারণে প্রয়োজনের মুহূর্তে যখন কথাবার্তা বলতেন তখন খুবই স্পষ্টভাষায় পরিষ্কারভাবে কথা বলতেন। কথার মধ্যে কোন মারপ্যাঁচ থাকতো না। কথাগুলি হতো সৌষ্ঠবতাপূর্ণ উপযুক্ত শব্দমালার দ্বারা সুগঠিত। বাক্যগুলি ছিলো যাচাইকৃত ও যথাযথ। তাতে অযথা শব্দ কিংবা দুর্বোধ্য শব্দের মিশ্রণ ছিলো না। শ্রোতাদের বুঝতে কষ্ট হয় এমন কোন সংযুক্ত বাক্য কিংবা অর্ধবাক্য তাঁর কথায় পাওয়া যেতো না। তাঁর কথাবার্তাগুলি হতো অতিশয় মিষ্ট, শ্রোতাদের মনে রাখার মতো এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ। গরিমা অহংকারবোধ কিংবা বাজারি অভদ্রতার কোন লেশমাত্রও তাঁর কথায় ছিলো না। কথাবার্তা বলা প্রসঙ্গে নবী-এর এই কয়েকটি বুনিয়াদী নীতিকে মানুষ যদি অনুসরণ করে তা হলে ইহকাল ও পরকালের সর্বত্র তাদের জন্য মান-সম্মান, প্রতিপত্তি ও বন্ধুত্ব এবং সার্বিক নিরাপত্তা অবধারিত।

১৯৭. عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ كَانَ إِذَا تَكَلَّمَ بِكَلِمَةٍ رَدَّدُهَا ثَلَاثًا وَإِذْ أَتَى قَوْمًا سَلَّمَ عَلَيْهِمْ ثَلَاثًا -

১৯৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ যখন (গুরুত্বপূর্ণ) কোন কথা বলতেন, তখন কথাটি তিনবার পুনরাবৃত্তি করতেন। আর যখন কোন সম্প্রদায়ের কাছে যেতেন তখন তাদেরকে তিনবার সালাম দিতেন (যেন প্রত্যেকে শুনতে পায়)।

ফায়দা: নবী করীম তাঁর উম্মতের প্রতি খুবই দয়ালু ও উদার ছিলেন। সে কারণে প্রিয় সাহাবাদেরকে তিনি যখন কোন গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতেন তখন তাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে কথাটি পুনঃ পুনঃ বলতেন যেন শ্রোতাদের সকলে কথাটি ভালভাবে শুনে নিতে এবং বুঝতে সক্ষম হয়। যেন অর্ধ কথা শোনে কিংবা মোটেই না শোনার কারণে কারোর মনে এমন ধরনের কোন খুঁতখুঁত ভাব অবশিষ্ট না থাকতে পারে যে, না জানি নবী কি কথাটি বলেছেন, কিংবা আমরাও যদি কথাটি শুনতে পেতাম! অনুরূপ তিনি কোথাও গেলে কিংবা কোন সম্প্রদায়ে তাঁর আগমন ঘটলে উপস্থিত লোকদেরকে তিনি তিনবার সালাম উচ্চারণ করতেন। এর কারণ ছিলো যেন সকলেই প্রিয় নবী -এর এই সালাম ও দু'আর কথাটি শুনতে পারে এবং আনন্দিত হতে পারে। কারোর মনে যেন এমন কোন দুঃখ অবশিষ্ট না থাকে যে, তিনি তো আমাদের সালাম প্রদানের দ্বারা কৃতার্থ করলেন না। এ বিষয়ে আরো আলোচনা সম্মুখস্থ হাদীসেও আসবে।

۱۹۸. أَخْبَرَنَا الزُّهْرِيُّ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ لَا يُسْرِدُ سَرْدَكُمْ هَذَا وَلَكِنَّ يَتَكَلَّمُ بِكَلَامٍ فَضْلٍ يَحْفَظُهُ مَنْهُ -

১৯৮. যুহরী (র) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ তোমাদের দ্রুত কথা বলার মত দ্রুতগতিতে কথা বলতেন না। তিনি কথাবার্তা বলতেন ধীরে ধীরে থেমে থেমে। তাঁর কথাগুলি এতো স্পষ্ট হতো যে, যে কোন ব্যক্তিই তা একবার শোনার দ্বারা মুখস্থ করে ফেলতো।

۱۹۹. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا عَنِ النَّبِيِّ ﷺ

১৯৯. হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেন।

۲۰۰. عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا حَدَّثَ بِحَدِيثٍ تَبَسَّمَ فِي حَدِيثِهِ -

২০০. হযরত আবূ দারদা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন কোনো কথা বলতেন তখন (মমত্ববোধের কারণে) কথা বলার মুহূর্তে তার ওষ্ঠাধারে স্মিত হাসির রেখা ফুটে থাকতো।

ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, নবী অতিশয় হাসিমুখে কথাবার্তা বলতেন। দম্ভপূর্ণ ও রূঢ় কথাবার্তা তাঁর জীবনে আদৌ ছিলো না।

۲۰۱ . عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ طَوِيلَ الصَّمْتِ -

২০১. হযরত জাবির ইবন সামুরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী অধিকাংশ সময় চুপ থাকতেন।

ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস প্রমাণ করে যে, বাচালতা ও বেশি কথা বলার তুলনায় স্বল্পভাষিতা ও কম কথা বলা অধিকতর ভালো অভ্যাস। নীরবতা ও মৌনতার মধ্যেই বস্তুত ইহকাল ও পরকালের মুক্তি ও কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এ কারণেই প্রিয় নবী -এর হাদীস-সমূহে এ বিষয়ের যথেষ্ট আলোচনা বিদ্যমান। যেমন ইরশাদ হচ্ছে, যে ব্যক্তি চুপ থাকে সে মুক্তি পায়। কোন সন্দেহ নেই যে, বাচালতা ও অনর্থক কথা বলা মানুষের জন্য নানা রকম বিপদের কারণ হয়ে। নবী -এর হাদীসে এ ধরনের বদ অভ্যাসের অনেক নিন্দা করা হয়েছে।

📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ > 📄 নবী (সা)-এর কথাবার্তা বলার নীতি

📄 নবী (সা)-এর কথাবার্তা বলার নীতি


١٩٦ ، عَنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ قَالَ سَأَلْتُ خَالِى هِنْدًا قُلْتُ صِفْ لِي مَنْطِقَهُ؟ فَقَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مُتَوَاصِلَ الأَحْزَانِ دَائِمُ الْفِكْرِ، لَيْسَتْ لَهُ رَاحَةٌ لا يَتَكَلَّمُ فِي غَيْرِ حَاجَةٍ طَوِيلُ السِّكْتِ، يَفْتَتِحُ الْكَلَامَ وَيَخْتِمُهُ بِأَشْدَاقِهِ ، وَيَتَكَلَّمُ بِجَوَامِعِ الْكَلِمِ فَصْلاً لَا فُضُولَ فِيْهِ وَلَا تَقْصِيرَ دَمَثُ لَيْسَ بِالْجَافِي وَلَا بِالمَهِيْنِ يُعَظِمُ النِعْمَةَ وَإِنْ دُقَّتْ وَلَا يَذُمُّ مِنْهَا شَيْئًا، لَا تُغْضَبُهُ الدُّنْيَا وَمَا كَانَ لَهَا، فَإِذَا تَعُوطِي الْحَقَّ لَمْ يَعْرِفْهُ أَحَدٌ ، وَلَمْ يَقُمْ بِغَضَبِهِ شَيْ حَتَّى يَنْتَصِرَ لَهُ وَإِذَا أَشَارَ أَشَارَ بِكَفِّهِ كُلُّهَا وَإِذَا تَعَجَّبَ قَلْبُهَا ، وَإِذَا تَحَدَّثَ اتِّصَلَ بِهَا يَضْرِبُ بِرَاحَتِهِ الْيُمْنَى بَاطِنَ إِبْهَا مِهِ الْيُسْرَى -

১৯৬. হযরত হাসান ইব্‌ন আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার মামা হযরত হিন্দা ইব্‌ন আবূ হালা (রা)-কে নবী -এর কথাবার্তা বলার নীতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি বললেন, নবী তাঁর নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য মহান আল্লাহ্ পাকের সন্তুষ্টি মোতাবেক পালন করার চিন্তায় চির আত্মনিমগ্ন এবং উম্মতের সফলতা ও কল্যাণ চিন্তায় সর্বদা বিভোর থাকতেন। সামান্য পরিমাণের অস্থিরতাও তাঁর ছিলো না। কাজেই অধিকাংশ সময় তিনি চুপ থাকতেন, প্রয়োজন ব্যতিরেকে কোন কথা বলতেন না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কথা বলতেন খুবই স্পষ্টভাবে। তাঁর কথাগুলি ছিলো উপযুক্ত শব্দমালার দ্বারা গঠিত সৌষ্ঠবতাপূর্ণ বাক্য। এক বাক্য অন্য বাক্য থেকে পৃথক থাকতো। কথাগুলির মধ্যে না কোন অতিরিক্ত শব্দ থাকতো, আর না মর্ম প্রকাশে অক্ষম কোন শব্দ পাওয়া যেত। তিনি ছিলেন মিষ্টভাষী। কদর্যতা কিংবা রূঢ়তা তাঁর ভাষায় ছিলো না। আল্লাহ্ পাকের কোন নিয়ামত তা যতই ছোট হোক, তিনি এর খুবই কদর করতেন। কখনো তা হেয় কিংবা তুচ্ছ মনে করতেন না। জাগতিক কোন কাজ তাকে ক্রোধান্বিত করতো না, (কেননা তাঁর দৃষ্টিতে জাগতিক বিষয়াদির তেমন কোন গুরুত্ব ছিল না) আর জাগতিক কাজকর্ম ক্রোধ নিপাতের বস্তুও নয়। তবে সত্য ও ন্যায়ের উপর হস্তক্ষেপ করা হলে তার চেহারা এত পরিবর্তন হয়ে যেতো যে, কেউ তাঁকে তখন চেনা কঠিন হতো। আর সে মুহূর্তে তাঁর ক্রোধের সামনে দাঁড়িয়ে কোন বিষয় টিকতে সক্ষম হতো না; যতক্ষণ না তিনি অন্যায়ের প্রতিকার করতেন। তিনি যখন কারোর দিকে ইশারা করতেন তখন সম্পূর্ণ হাত দ্বারা ইশারা করতেন। (কেননা শুধু অঙ্গুলী দ্বারা ইশারা করা ভালো নয়।) তিনি কখনো কোন কাজে বিস্ময় প্রকাশ করলে হাত মুবারক ঘুরিয়ে নিতেন। কথা বলার সময় কখনো কখনো হাতও নাড়াচাড়া করতেন। এভাবে কখনো তিনি ডান হাতের তালু বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলের পেটের উপর মারতেন।

ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসটি অনেক দিক থেকে ব্যাপক একটি হাদীস। এ হাদীসে নবী -এর কথাবার্তা বলা, বলার ভঙ্গি ও ধরন, বাক্যের মিষ্টতা ও আকর্ষণ, মন-মানসিকতার স্বরূপ এবং কথাবার্তা বলার নীতি সম্পর্কীয় যাবতীয় বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ পেশ করা হয়েছে। এ হাদীসে নবী-এর কথাবার্তা বলার ধরন সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। তাঁর পবিত্র জীবনাদর্শের এ অংশটুকুর দ্বারা মানবীয় স্বভাব ও উন্নত নৈতিকতা- বোধের এমন একটি অধ্যায়ের সন্ধান মেলে যা সকল মুসলিমের জন্য জীবন-পাথেয় হওয়ার যোগ্যতা রাখে। হাদীসটির মধ্যে এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাগুলি পাওয়া যায়, যেগুলি থেকে উম্মতের শিক্ষা গ্রহণ বাঞ্ছনীয় সেগুলি হলো নিম্নরূপ:
তিনি বিনা প্রয়োজনে কথাবার্তা বলতেন না। নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন চিন্তায় সারাক্ষণ আত্ম-নিমগ্ন থাকতেন। উম্মতের সফলতা ও কল্যাণ লাভের চিন্তা সর্বদা তাঁকে বিভোর করে রাখতো। এ সকল গুরুত্বপূর্ণ কাজের চিন্তা-ভাবনার কারণে প্রয়োজনের মুহূর্তে যখন কথাবার্তা বলতেন তখন খুবই স্পষ্টভাষায় পরিষ্কারভাবে কথা বলতেন। কথার মধ্যে কোন মারপ্যাঁচ থাকতো না। কথাগুলি হতো সৌষ্ঠবতাপূর্ণ উপযুক্ত শব্দমালার দ্বারা সুগঠিত। বাক্যগুলি ছিলো যাচাইকৃত ও যথাযথ। তাতে অযথা শব্দ কিংবা দুর্বোধ্য শব্দের মিশ্রণ ছিলো না। শ্রোতাদের বুঝতে কষ্ট হয় এমন কোন সংযুক্ত বাক্য কিংবা অর্ধবাক্য তাঁর কথায় পাওয়া যেতো না। তাঁর কথাবার্তাগুলি হতো অতিশয় মিষ্ট, শ্রোতাদের মনে রাখার মতো এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ। গরিমা অহংকারবোধ কিংবা বাজারি অভদ্রতার কোন লেশমাত্রও তাঁর কথায় ছিলো না। কথাবার্তা বলা প্রসঙ্গে নবী-এর এই কয়েকটি বুনিয়াদী নীতিকে মানুষ যদি অনুসরণ করে তা হলে ইহকাল ও পরকালের সর্বত্র তাদের জন্য মান-সম্মান, প্রতিপত্তি ও বন্ধুত্ব এবং সার্বিক নিরাপত্তা অবধারিত।

১৯৭. عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ كَانَ إِذَا تَكَلَّمَ بِكَلِمَةٍ رَدَّدُهَا ثَلَاثًا وَإِذْ أَتَى قَوْمًا سَلَّمَ عَلَيْهِمْ ثَلَاثًا -

১৯৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ যখন (গুরুত্বপূর্ণ) কোন কথা বলতেন, তখন কথাটি তিনবার পুনরাবৃত্তি করতেন। আর যখন কোন সম্প্রদায়ের কাছে যেতেন তখন তাদেরকে তিনবার সালাম দিতেন (যেন প্রত্যেকে শুনতে পায়)।

ফায়দা: নবী করীম তাঁর উম্মতের প্রতি খুবই দয়ালু ও উদার ছিলেন। সে কারণে প্রিয় সাহাবাদেরকে তিনি যখন কোন গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতেন তখন তাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে কথাটি পুনঃ পুনঃ বলতেন যেন শ্রোতাদের সকলে কথাটি ভালভাবে শুনে নিতে এবং বুঝতে সক্ষম হয়। যেন অর্ধ কথা শোনে কিংবা মোটেই না শোনার কারণে কারোর মনে এমন ধরনের কোন খুঁতখুঁত ভাব অবশিষ্ট না থাকতে পারে যে, না জানি নবী কি কথাটি বলেছেন, কিংবা আমরাও যদি কথাটি শুনতে পেতাম! অনুরূপ তিনি কোথাও গেলে কিংবা কোন সম্প্রদায়ে তাঁর আগমন ঘটলে উপস্থিত লোকদেরকে তিনি তিনবার সালাম উচ্চারণ করতেন। এর কারণ ছিলো যেন সকলেই প্রিয় নবী -এর এই সালাম ও দু'আর কথাটি শুনতে পারে এবং আনন্দিত হতে পারে। কারোর মনে যেন এমন কোন দুঃখ অবশিষ্ট না থাকে যে, তিনি তো আমাদের সালাম প্রদানের দ্বারা কৃতার্থ করলেন না। এ বিষয়ে আরো আলোচনা সম্মুখস্থ হাদীসেও আসবে।

۱۹۸. أَخْبَرَنَا الزُّهْرِيُّ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ لَا يُسْرِدُ سَرْدَكُمْ هَذَا وَلَكِنَّ يَتَكَلَّمُ بِكَلَامٍ فَضْلٍ يَحْفَظُهُ مَنْهُ -

১৯৮. যুহরী (র) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ তোমাদের দ্রুত কথা বলার মত দ্রুতগতিতে কথা বলতেন না। তিনি কথাবার্তা বলতেন ধীরে ধীরে থেমে থেমে। তাঁর কথাগুলি এতো স্পষ্ট হতো যে, যে কোন ব্যক্তিই তা একবার শোনার দ্বারা মুখস্থ করে ফেলতো।

۱۹۹. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا عَنِ النَّبِيِّ ﷺ

১৯৯. হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেন।

۲۰۰. عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا حَدَّثَ بِحَدِيثٍ تَبَسَّمَ فِي حَدِيثِهِ -

২০০. হযরত আবূ দারদা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন কোনো কথা বলতেন তখন (মমত্ববোধের কারণে) কথা বলার মুহূর্তে তার ওষ্ঠাধারে স্মিত হাসির রেখা ফুটে থাকতো।

ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, নবী অতিশয় হাসিমুখে কথাবার্তা বলতেন। দম্ভপূর্ণ ও রূঢ় কথাবার্তা তাঁর জীবনে আদৌ ছিলো না।

۲۰۱ . عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ طَوِيلَ الصَّمْتِ -

২০১. হযরত জাবির ইবন সামুরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী অধিকাংশ সময় চুপ থাকতেন।

ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস প্রমাণ করে যে, বাচালতা ও বেশি কথা বলার তুলনায় স্বল্পভাষিতা ও কম কথা বলা অধিকতর ভালো অভ্যাস। নীরবতা ও মৌনতার মধ্যেই বস্তুত ইহকাল ও পরকালের মুক্তি ও কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এ কারণেই প্রিয় নবী -এর হাদীস-সমূহে এ বিষয়ের যথেষ্ট আলোচনা বিদ্যমান। যেমন ইরশাদ হচ্ছে, যে ব্যক্তি চুপ থাকে সে মুক্তি পায়। কোন সন্দেহ নেই যে, বাচালতা ও অনর্থক কথা বলা মানুষের জন্য নানা রকম বিপদের কারণ হয়ে। নবী -এর হাদীসে এ ধরনের বদ অভ্যাসের অনেক নিন্দা করা হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00