📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ 📄 নবী (সা)-এর ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা এবং ক্রোধ সংবরণ বিষয়ক রিওয়ায়াতসমূহ

📄 নবী (সা)-এর ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা এবং ক্রোধ সংবরণ বিষয়ক রিওয়ায়াতসমূহ


١٦٨ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَاعِدًا فِي الْمَسْجِدِ وَمَعَهُ أَصْحَابُهُ إِذْ جَاءَ أَعْرَابِيٌّ فَبَالَ فِي الْمَسْجِدِ فَقَالَ أَصْحَابُ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ مَنْ مَهْ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لَا تَزْرِمُوهُ ثُمَّ دَعَاهُ فَقَالَ إِنَّ هَذَا الْمَسَاجِدَ لَا تَصْلَحُ لِشَيْ مِنَ الْقَدْرِ وَالْبَوْلِ وَالْخَلَاءِ إِنَّمَا هِيَ لِقَرَاءَةِ الْقُرْآنِ وَذِكْرِ اللَّهِ وَالصَّلَاةِ ثُمَّ دَعَا رَسُولُ اللَّهِ بِدَلُو مِنْ مَاءٍ فَشَنَّهُ عَلَيْهِ .

১৬৮. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ সাহাবাদের সঙ্গে মসজিদে উপবিষ্ট ছিলেন। তখন জনৈক বেদুঈন সেখানে আসলো এবং মসজিদের ভিতরে পেশাব করতে শুরু করলো। সাহাবাগণ তাকে বারণ করে বলতে লাগলেন, থাম! থাম! একথা শুনে নবী বললেন, (লোকটিকে পেশাব করতে) বাধা দিও না। তারপর তিনি লোকটিকে ডাকলেন এবং বললেন, দেখ এ মসজিদগুলো পেশাব-পায়খানা কিংবা এ জাতীয় কোন আবর্জনার জায়গা নয়। এগুলো হলো পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত, আল্লাহ্ পাকের যিকর ও সালাত পড়ার স্থান। তারপর তিনি এক বালতি পানি আনতে নির্দেশ দেন এবং পানিটি সেই জায়গায় প্রবাহিত করে দেন। (যেন মসজিদের মাটি পবিত্র হয়ে যায়।)

ফায়দা : উপরোক্ত ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ কতখানি ধৈর্য ও সহিষ্ণু এবং ক্রোধ নিবারণকারী ছিলেন। তিনি বেদুঈনের প্রতি কোমল আচরণ ও সহানুভূতি প্রদর্শন করেন। অতিশয় মমত্ববোধ ও উদারতা নিয়ে তাকে তিনি উপদেশ দেন। তারপর নিজেই সেই অপবিত্র স্থানটি পানি দ্বারা পবিত্র করেন। এই একটি ঘটনা থেকে নবী -এর কয়েকটি উন্নত চরিত্র মাধুরীর অনুমান করা যায়। যেমন : এক অজ্ঞ অসামাজিক লোকটির ক্রোধ উদ্দীপক ত্রুটির ব্যাপারে তিনি ধৈর্য-সহ্য ও সহিষ্ণুতার আচরণ করেন। তারপর আন্তরিকতা ও মমত্ববোধ প্রকাশের মাধ্যমে অতিশয় কার্যকর পদ্ধতিতে তাকে শিক্ষা দেন এবং তার নৈতিক ত্রুটির সংশোধন করেন। উপরন্তু এক অসাধারণ বিনয় প্রকাশের মাধ্যমে নিজেই মসজিদের সে স্থানটি ধুয়ে পবিত্র করেন। এভাবে মৌখিক উপদেশ ও সতর্কীকরণের সাথে সাথে কার্যতভাবেও মানুষের মনে মসজিদের পবিত্রতা ও সম্মান রক্ষার বিষয়টি বদ্ধমূল করে দেন। আল্লাহ্ পাক তাঁর উপর সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন।

١٦٩. عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبْرَى قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مِنْ أَحْلَمِ النَّاسِ وَأَصْبَرِهِمْ وَأَكْظَمِهِمْ لِلْغَيْظِ -

১৬৯. হযরত আবদুর রহমান ইবন আব্যা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক সহিষ্ণুতাপরায়ণ, সর্বাধিক ধৈর্যশীল ও সর্বাধিক ক্রোধ সংবরণকারী।

۱۷۰. عَنْ أَنَسٍ قَالَ بَيْنَمَا نَحْنُ جُلُوسِ إِذْ دَخَلَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مِنْ بَابِ الْمَسْجِدِ مُرْتَدِيًا بِبُرْدِ مِنَ النَّجْرَانِيَّةِ إِذْ تَبِعَهُ أَعْرَابِي ، فَأَخَذَ بِمَجَامِعِ الْبُرْدِ إِلَيْهِ ثُمَّ جَبَذَهُ إِلَيْهِ جَبْدَةً فَرَجَعَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فِي نَحْوِ الْأَعْرَابِي مِنْ شِدَّةِ جَبْنَتِهِ ، وَإِذَا أَثَرُ حَاشِيَةِ الْبُرْدِ فِي نَحْرِ رَسُولِ اللهِ ﷺ فَنَظَرَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللهِ وَضَحِكَ وَقَالَ مَا شَأْنُكَ فَقَالَ لَهُ يَا مُحَمَّدُ جَدْلِى مِنَ الْمَالِ الَّذِي عِنْدَكَ قَالَ مُرُوا لَهُ

১৭০. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা বসা ছিলাম। হঠাৎ রাসূলুল্লাহ দরজা দিয়ে মসজিদের ভিতরে প্রবেশ করলেন। নবী নাজরানে তৈরি একটি চাদর পরিহিত ছিলেন। এ সময় জনৈক বেদুঈন তাঁর পেছনে এসে দাঁড়ায়। সে নবী-এর চাদরের এক পার্শ্ব ধরে তাকে নিজের দিকে সজোরে টান দিয়েছিলো। ফলে নবী বেদুঈন লোকটির দিকে ঘুরে গেলেন এবং তাঁর গ্রীবাদেশে চাদর টানার দাগ পড়ে গেল। (লোকটির এই ত্রুটি ও অমার্জিত আচরণ সত্ত্বেও) তিনি তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন এবং বললেন, তোমার ব্যাপার কি? বেদুঈন লোকটি তাঁকে উত্তর দিল, হে মুহাম্মদ! আপনার কাছে যে সম্পদ আছে তা থেকে আমাকে কিছু দিন। নবী তাকে কিছু দান করতে নির্দেশ দিলেন।

ফায়দা : উপরোক্ত হাদীস থেকে রাসূলুল্লাহ্ -এর সীমাহীন কোমল আচরণের কথা সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়। মানুষের প্রতি তাঁর অসীম উদারতা ও ভালবাসা ছিল। একটি মূর্খ বেদুঈন লোকের এত বড় মূর্খতা ও অভদ্র আচরণ করা সত্ত্বেও তিনি না কোন কিছু মনে করেছেন, না তাকে কোনরূপ তিরস্কার করেছেন। বরং তার অভদ্র ও অসৌজন্যমূলক আচরণ সত্ত্বেও নিজের ক্রোধ নিবারণ করে নেন। নবী এ কারণে শুধু নিজের বিরক্তি বোধকেই চেপে রাখেন নি অধিকন্তু নিজে মৃদু হেসে তাকে কিছু দান করার জন্য নির্দেশও প্রদান করেন। এটি প্রিয় নবী -এর পয়গম্বর সুলভ উন্নত চরিত্র ও অনুপম মমত্ববোধের একটি নমুনা। আল্লাহ্পাক আমাদের সকলকে তাঁর এই উন্নত চরিত্র মাধুরীর পরিপূর্ণ অনুসরণের তাওফীক দান করুন। আমীন!

১৭১. عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنْ أَعْرَابِيًّا جَاءَ إِلَى النَّبِيِّ ﷺ يَسْتَعِينُهُ فِي شَيْءٍ ، فَأَعْطَاهُ شَيْئًا ثُمَّ قَالَ أَحَسَنْتُ إِلَيْكَ ؟ فَقَالَ الأَعْرَابِيُّ ، لَا ، وَلَا أَجْمَلْتَ ، قَالَ فَغَضِبَ الْمُسْلِمُونَ وَقَامُوا إِلَيْهِ ، فَأَشَارَ إِلَيْهِمْ أَنْ كُفُوًا ، قَالَ عِكْرِمَةُ قَالَ أَبُوْهُرَيْرَةَ ثُمَّ قَامَ النَّبِيُّ فَدَخَلَ مَنْزِلَهُ ثُمَّ أَرْسَلَ إِلَى الْأَعْرَابِي فَدَعَاهُ إِلَى الْبَيْتِ فَقَالَ إِنَّكَ جِئْتَنَا فَسَأَلْتَنَا فَأَعْطَيْنَاكَ فَقُلْتَ مَا قُلْتَهُ ، فَزَادَهُ رَسُولُ اللهِ ﷺ شَيْئاً ثُمَّ قَالَ أَحَسَنْتُ إِلَيْكَ ؟ قَالَ الْأَعْرَابِيُّ نَعَمْ ، فَجَزَاكَ اللَّهُ مِنْ أَهْلٍ وَعَشِيْرَةٍ خَيْرًا ، فَقَالَ لَهُ النَّبِيَّ ﷺ إِنَّكَ كُنْتَ جِئْتَنَا فَسَأَلْتَنَا فَأَعْطَيْنَاكَ وَقُلْتَ مَا قُلْتَ وَفِي أَنْفُسِ شَيْءٌ مِنْ ذَلِكَ فَإِنْ أَحْبَبْتَ فَقُلْ بَيْنَ أَيْدِيهِمْ ما قُلْتَ بَيْنَ يَدِى حَتَّى تَذْهَبَ مِنْ صُدُورِهِمْ مَا فِيهَا عَلَيْكَ قَالَ نَعَمْ ، قَالَ عِكْرِمَةً قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ فَلَمَّا كَانَ الْغَدَاءِ العَشِي جَاءَ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِنَّ صَاحِبَكُمْ هَذَا جَاءَ فَسَأَلُنَا فَأَعْطَيْنَاهُ وَقَالَ مَا قَالَ وَإِذَا دَعَوْنَاهُ إِلَى الْبَيْتِ فَأَعْطَيْنَاهُ زَعَمَ أَنَّهُ قَدْ رَضِيَ ، أَكَذَلِكَ ؟ قَالَ لأَعْرَابِيُّ نَعَمْ ، فَجَزَكَ اللَّهُ مِنْ أَهْلِ وَعَشِيْرَةٍ خَيْرًا ، قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ أَلَّا أَنَّ مَثَلِي وَمَثَلُ هُذَا الْأَعْرَابِي كَمَثَلِ رَجُلٍ كَانَتْ لَهُ نَاقَةٌ فَشَرِدَتْ عَلَيْهِ فَاتَّبَعَهَا النَّاسُ فَلَمْ يَزِيدُوهَا إِلَّا نُفُورًا فَنَادَاهُمْ صَاحِبُ النَّاقَةِ ! خَلُّوا بَيْنِي وَبَيْنَ نَاقَتِي ، فَأَنَا أَرْفَقُ بِنَا وَأَعْلَمُ فَتَوَجَّهُ لَهَا صَاحِبُ النَّاقَةِ بَيْنَ يَدَيْهَا وَأَخَذَ لَهَا مِنْ قِمَامِ الأَرْضِ فَرَدَّهَا هَوْنًا هَوْنًا حَتَّى جَاءَتْ وَاسْتَنَاخَتْ وَشَدَّ عَلَيْهَا وَإِنِّي لَوْ تَرَكْتُكُمُ حَيْثُ قَالَ الرَّجُلُ مَا قَالَ فَقَتَلْتُمُوهُ دَخَلَ النَّارَ -

১৭১. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত যে জনৈক বেদুঈন নবী -এর নিকট কিছু সাহায্য প্রার্থনার জন্য আসলো। নবী তাকে কিছু দান করলেন। তারপর বললেন, আমি কি তোমার প্রয়োজন পূরণ করিনি? তোমার প্রতি অনুগ্রহ করিনি? বেদুঈন উত্তর দিলো না, (আপনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেন নি এবং) আমার প্রতি সদাচার করেন নি। বর্ণনাকারী বলেন, লোকটির উত্তর শুনে উপস্থিত মুসলিমগণ ক্ষেপে গেলেন এবং তারা লোকটির দিকে উঠে আসলেন। কিন্তু নবী তাদের হাতের ইশারায় থামিয়ে দেন। হযরত ইকরিমা (রা) বলেন, যে বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর নবী উঠে দাঁড়ালেন এবং বাড়ির দিকে চলে গেলেন। তারপর বেদুঈন লোকটিকে বাড়ি আসার জন্য ডেকে পাঠালেন। (লোকটি, আসলে) তিনি তাকে বললেন যে, তুমি আমাদের কাছে এসে কিছু প্রার্থনা করেছো। আমরা তোমাকে (যতটুকু সম্ভব) দান করেছি। অথচ তুমি এর উপর যা বলার বলে দিয়েছো। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর নবী তাকে আরো কিছু মালামাল দান করে জিজ্ঞেস করলেন, এবার কি আমি তোমার সাথে সুন্দর আচরণ করলাম? লোকটি উত্তর দিল, জী হ্যাঁ! আল্লাহ্ আপনাকে এবং পরিবার-পরিজনকে উত্তম বিনিময় দান করুন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ লোকটিকে বললেন, দেখ, তুমি আমাদের কাছে এসে কিছু প্রার্থনা করেছো। আমরা তোমাকে কিছু দান করলাম। তাতে তুমি যা বলার বলেছো। কিন্তু এর কারণে আমরা সাহাবীদের মনে (তোমার উপর) অসন্তুষ্টির সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই তুমি যদি ভাল মনে করো তাহলে তাদের সামনে গিয়েও তুমি এ কথাটি বলো যা এখন আমার সাথে বলেছো। তা হলে তোমার ব্যাপারে তাদের মনে যে অসন্তুষ্টি বিদ্যমান তা দূরীভূত হয়ে যাবে। বেদুঈন লোকটি বললো, খুব ভাল কথা। হাদীসের বর্ণনাকারী ইকরিমা (র) বলেন যে, হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, অতঃপর যখন প্রভাত হলো (কিংবা তিনি বলেছেন) যখন সন্ধ্যা হলো তখন লোকটি (সাহাবীদের কাছে) আসলো। এ সময় নবী সাহাবীদেরকে লক্ষ করে বললেন, তোমাদের এই সাথী আমার কাছে এসে কিছু প্রার্থনা করেছিল। আমি তাকে কিছু দান করলাম। তাতে সে যা বলার বলেছে। এরপর আমি তাকে বাড়ি ডেকে নেই এবং আরো কিছু প্রদান করি। ফলে সে সন্তুষ্ট হয়ে গেছে। (তারপর তিনি বেদুঈন লোকটির দিকে তাকিয়ে) বললেন, ঘটনা কি এরূপ নয়? সে উত্তর দিল, জী হ্যাঁ। আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে এবং আপনার পরিবার-পরিজনকে উত্তম বিনিময় দান করুন। হযরত আবু হুরায়রা (রা) বলেন, মঃতপর নবী বললেন, দেখো এ বেদুঈন লোকটির সাথে আমার উদাহরণ হলো এমন যেমন কোন ব্যক্তির, যার একটি উট্রী ছিলো। উট্রী সেই লোকের কাছ থেকে ভয় পেয়ে "তে লাগলো। এ সময় লোকজন তাকে ধরার জন্য পেছনে পেছনে ছুটলো। ফলে তার ৩য় আরো বেড়ে গেলো। উটনীর মালিক তখন লোকজনকে বললো, তোমরা আমাকে আমার নীর পেছনে ছুটতে দাও। কেননা আমি এ উটনীর প্রতি তোমাদের চেয়ে অধিক রাণ এবং তার প্রকৃতি সম্পর্কে তোমাদের চেয়ে অধিক জ্ঞাত। তারপর মালিক নিজে .র দিকে অগ্রসর হলো এবং তাকে একটি উঁচুস্থানে গিয়ে ধরে ফেললো। তারপর ধীরে .রে তাকে ফিরিয়ে আনলো। উটনী ফিরে আসার পর মালিক তাকে বসাতে চাইলে সে বসে গেলে, এবং তার পিঠের উপর বোঝা বেঁধে নিলো। কাজেই আমি যদি তোমাদেরকে বেদুঈন লোকটির কথা বলার সময় ছেড়ে দিতাম তাহলে তখন তোমরা তাকে হত্যা করে ফেলতে। আর তাকেও জাহান্নামে চলে যেতে হতো।

ফায়দা : উল্লেখিত হাদীসটি রাসূলুল্লাহ্-এর উন্নত চরিত্র মাধুরী নির্দেশ করছে। এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, নবী নৈতিকতার সকল উন্নত আদর্শ ও গুণাবলির অধিকারী ছিলেন। মানবীয় জীবন ও চরিত্রের কোন একটি ক্ষুদ্র দিকও তার অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি থেকে বাইরে ছিলো না। তিনি সাহাবীদের মনমেজাজ ও প্রকৃতি সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন। সে কারণে কারোর কোন ত্রুটির উপর তাকে তাৎক্ষণিক পাকড়াও করতেন না। বেদুঈন লোকটির সাথে তাঁর আচরণ ঠিক এরূপই হয়েছিল। লোকটির অসৌজন্যমূলক উত্তর দান সত্ত্বেও তিনি তাকে কিছু বলেননি। আর সাহাবাদেরকেও কিছু বলতে অনুমতি দেননি। এহেন নরম আচরণ নবী এ জন্যও অবলম্বন করেছিলেন যেন লোকটির মনে অসন্তুষ্টি আরো বৃদ্ধি পেতে না পারে। তাই তিনি তাকে নিজ বাড়ি ডেকে নেন। অতিরিক্ত আরো কিছু দান করে তাকে খুশি করে দেন। ঘটনাটিকে তিনি সাহাবীদের কাছে একটি উপমার সাহায্যে ঘটনার প্রেক্ষিতসহ বুঝিয়ে দেন, যেন তাদের অন্তরেও লোকটির ব্যাপারে কোন খারাপ ধারণা অবশিষ্ট না থাকতে পারে। এক সার্বজনীন রহমত হিসেবে তাঁর আগমন এ কথার যাবতীয় দাবি ও চাহিদা তাঁর উপরোক্ত উন্নত চরিত্র ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কর্মপদ্ধতির দ্বারা পরিপূর্ণ হলো। আল্লাহ্ তা'আলা আমাদেরকে এ সকল চরিত্র সৌন্দর্য ও প্রজ্ঞার দ্বারা সুসমৃদ্ধ করুন।

۱۷۲. عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ سَلَامٍ قَالَ إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ لَمَا أَرَادَ هُدًى زَيْدِ بْنِ سَعْنَةَ قَالَ زَيْدُ مَا مِنْ عَلَامَاتِ النُّبُوَّةِ شَيْ إِلَّا وَقَدْ عَرَفْتُهَا فِي وَجْهِ مُحَمَّدٍ حِيْنَ نَظَرْتُ إِلَيْهِ إِلَّا إِثْنَانِ لَمْ أَخْبَرْهُمَا مِنْهُ يَسْبِقُ حِلْمُهُ جَهْلَهُ وَلَا يَزِيدُهُ شِدَّةُ الْجَهْلِ إِلا حِلْمًا ، فَكُنْتُ أَنْطَلِقُ إِلَيْهِ لِأُخَالِطَهُ فَاعَرِفَ حِلْمَهِ مِنْ جَهْلِهِ فَخَرَجَ يَوْمًا مِنَ الحُجُرَاتِ يُرِيدُ النَّبِيَّ ﷺ وَمَعَهُ عَلَى بْنُ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ، فَجَاءَ رَجُلُ يَسِيرُ عَلَى رَاحَلَتِهِ كَالْبَدْوِي فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ قَرْيَةُ بَنِي فُلَانٍ أَسْلَمُوا وَدَخَلُوا فِي الإِسْلَامِ وَحَدَّثْتُهُمْ أَنَّهُمْ إِنْ أَسْلَمُوا أَتَتْهُمْ أَزْقُهُمْ رَغَدًا وَقَدْ أَصَابَتْهُمْ سَنَةً وَشِدَّةً وَقُحُوطٌ مِنَ الْعَيشِ وَإِنِّي مُشْفِقُ أَنْ يَخْرُجُوا مِنَ الإِسْلَامِ طَمَعًا كَمَا دَخَلُوْا فِيْهِ طَمَعًا، فَإِنْ رَأَيْتَ أَنْ تُرْسِلَ إِلَيْهِمْ بِشَيْ تُعِينُهُمْ بِهِ فَعَلْتَ، فَقَالَ زَيْدُ بْنُ سَعْنَةُ فَقُلْتُ أَنَا أَبْتَاعُ مِنْكَ بِكَذَا وَكَذَا وَسَقًّا فَبَايَعْنِي وَأَطْلَقْتُ هِمْيَانِي وَأَعْطَيْتُهُ ثَمَانِينَ دِينَارًا ، فَدَفَعْهَا إِلَى الرَّجُلِ وَقَالَ أَعْجِلْ عَلَيْهِمْ بِهَا وَأَعْتُهُمْ فَلَمَّا كَانَ قَبْلَ الْمَحَلِّ بِيَوْمِ أَوْ يَوْمَيْنِ أَوْ ثَلَاثَةِ فَخَرَجَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِلَى جَنَازَةٍ بِالْبَقِيعِ وَمَعَهُ أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرَ فِي نَفَرٍ مِنْ أَصْحَابِهِ فَلَمَّا صلَّى عَلَى الجَنَازَةِ وَدَنَا مِنَ الْجِدَارِ جَذَبْتُ بُرْدَيْهِ جَبْدَةً شَدِيدَةٍ حَتَّى سَقَطَ عَنْ عَاتِقِهِ، ثُمَّ أَقْبَلْتُ بِوَجْهِ جَهْرٍ غَلِيْظٍ فَقُلْتُ أَلا تُقْضِيْنِي يَا مُحَمَّدُ فَوَ اللَّهِ مَا عَلِمْتُكُمْ بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ لَمُطِلُّ وَقَدْ كَانَ لِي بِخَالَطِيكُمْ عِلْمُ قَالَ زَيْدُ فَارْتَعَدَتْ فَرَائِضُ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ كَالْفُلْكِ الْمُسْتَدِيْرِ ثُمَّ رَمَى بِبَصَرِهِ ثُمَّ قَالَ أَيْ عَدُوٌّ اللَّهِ اَتَقُوْلُ هَذَا لِرَسُولِ اللهِ ؟ وَتَصْنَعُ بِهِ مَا أَرَى وَتَقُولُ مَا اسْمَعُ فَوَالَّذِي بَعَثَهُ بِالْحَقِّ لَوْلاَ مَا أَخَافُ فَوْقَهُ لِسَبَقِنِي رَاسُكَ وَرَسُولُ اللَّهِ يَنْظُرُ إِلَى عُمَرَ فِي تَوْدَةٍ وَسُكُونٍ ثُمَّ تَبَسَّمَ ثُمَّ قَالَ لَأَنَا وَهُوَ أَحْوَجُ إِلَى غَيْرِ هَذَا أَن تَأمُرَنِي بِحُسْنِ الأَدَاءِ وَتَامُرَهُ بِحُسْنِ اتبَاعِةِ إِلَى هُنَا عَنْ أَبِي عَاصِمٍ وَزَادَ أَبُو زُرْعَةَ فِي حَدِيثِهِ اذْهَبْ بِهِ يَا عَمَرُ فَاقْضِ حَقَّهُ وَزِدْهُ عِشْرِينَ صَاعًا مِنْ تَمَرٍ مَكَانَ مَا رَعَتْهُ قَالَ زَيْدُ بْنُ سَعْنَةَ فَذَهَبَ بِي عَمَرُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ فَقَضَانِي حَتَّى وَزَادَنِى صَاعًا مِنْ تَمَرٍ، فَقُلْتُ مَا هَذَا قَالَ أَمَرَنِي رَسُولُ اللهِ ﷺ أَنْ أَزِيدَكَ مَكَانَ مَا رَعَتْكُ فَقُلْتُ أَتَعْرَفُنِي يَا عُمَرَ؟ قَالَ لَأَفَمَنْ أَنْتَ ؟ قَالَ أَنَا زَيْدُ ابْنُ سَعْنَةَ قَالَ الْحِبْرُ؟ قُلْتُ الْحِبْرُ قَالَ فَمَا دَعَاكَ إِلَى أَنْ تَفْعَلَ بِرَسُولِ اللهِ ﷺ مَا فَعَلْتَ وَتَقُوْلُ لَهُ مَا قُلْتُ قُلْتُ يَا عُمَرُ إِنَّهُ لَمْ يَبْقَ مِنْ عَلَامَاتِ النَّبُوَّةِ شَيْ إِلَّا وَقَدْ عَرَفْتُهَا فِي وَجْهِ رَسُولِ اللَّهِ حِيْنَ نَظَرْتُ إِلَيْهِ إِلَّا اثْنَتَانِ لَمْ أَخْبِرْهُمَا مِنْهُ يَسْبَقُ حِلْمُهُ جَهْلَهُ ، وَلَا يَزِيدُهُ شِدَّةُ الْجَهْلِ عَلَيْهِ إِلَّا حِلْمًا فَقَدِ اخْتَبَرْتُهُ مِنْهُ فَأَشْهَداكَ يَا عُمَرُ انَّنِي قَدْ رَضِيْتُ بِاللَّهِ رَبَّا وبلاسْلامَ دِينًا وَبِمُحَمَّد الله نَبِيًّا ، وَأَشْهِدُكَ أَنَّ شَطْرَ مَالِيٍّ - فَإِنِّي أَكْثَرُهَا مَالاً - صَدَقَة عَلَى أُمَّةٍ مُحَمَّدٍ فَقَالَ عُمَرُ أَوْ عَلَى بَعْضُهُمْ فَائِكَ لَا تَسَعُهُمْ كُلُّهُمْ قُلْتُ أَوَ عَلَى بَعْضِهِمْ، قَالَ فَرَجَعَ عَمَرُ وَزَيْدُ بْنُ سَعْنَةَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَقَالَ زَيْدُ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلهَ إِلَّا اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّdًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ فَامَنَ بِهِ وَصَدَّقَهُ وَبَايَعَهُ وَشَهِدَ مَعَهُ مَشَاهِدَ كَثِيرَةً -

১৭২. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন সালাম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহান আল্লাহ্ যখন যায়িদ ইবন সা'না (রা)-কে হেদায়েতের ইচ্ছা করলেন তখন যায়িদ ইবন সা'না বলল, আমি মুহাম্মদ মুস্তফা-এর চেহারা মুবারক দর্শন করেই তাঁর নবুওয়াতের নিদর্শনসমূহের দু'টি ব্যতীত অবশিষ্ট সবগুলি অনুধাবন করে নিয়েছি। যে দু'টি আমি অনুধাবন করতে পারিনি সেগুলি হলো, (এক) তাঁর এ পরিমাণ ধৈর্যশীলতা যে, তাঁর ক্রোধের উপর সহিষ্ণুতা প্রবল থাকবে। (দুই) তাঁর সহিত যত বেশি মূর্খতার আচরণ করা হবে ততই তাঁর ধৈর্যশীলতা বৃদ্ধি পাবে। যায়িদ ইবন সা'না বলেন, আমি এ দুটি নিদর্শনের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য চেষ্টা করি।

আমি তাঁর দরবারে বারবার আসা-যাওয়া করি এবং তাঁর সান্নিধ্যে উপস্থিত থেকে ধৈর্যশীলতার গুণ পর্যবেক্ষণ করি, একদা তিনি হুজরাগুলোর কোন একটি থেকে বেরিয়ে আসলেন। হযরত আলী ইব্‌ন আবু তালিব (রা)-ও তাঁর সঙ্গে ছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি একটি বাহনে আরোহণ করে আসল। তাকে দেখতে বেদুঈন মনে হচ্ছিল। লোকটি নবী-কে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্। অমুক গোত্রের লোকেরা ইসলাম কবুল করেছে। আমি তাদেরকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলাম যে, তারা যদি ইসলাম কবুল করে তাহলে তাদের রুজি-রোজগারে সমৃদ্ধি আসবে। অথচ বর্তমানে তারা অভাব-অনটন ও দুর্ভিক্ষে জীবন যাপন করছে। কাজেই আমার আশংকা হচ্ছে যে, তারা যে ভাবে লোভ নিয়ে ইসলামে প্রবেশ করেছে তদ্রূপ অন্য কোন লালসায় পড়ে ইসলাম থেকে বেরিয়ে না যায়। অতএব আপনি যদি ভাল মনে করেন, সাহায্য হিসেবে তাদের জন্য কিছু পাঠিয়ে দিন। (এ কথা শুনে) যায়িদ ইবন সা'না নবী-কে বললেন, আপনি আমার সাথে একটি (অগ্রিম) কেনাবেচা করুন। আমি আপনার নিকট থেকে টাকার বিনিময়ে এক ওয়াসাক জিনিস খরিদ করলাম। এ কথা বলে আমি আমার থলি খুললাম এবং আশিটি স্বর্ণমুদ্রা বের করে নবীকে দিলাম। নবী সেই টাকা লোকটির হাতে দিয়ে বললেন, এ টাকা নিয়ে তুমি তাদের কাছে দ্রুত পৌঁছে যাও এবং তাদের সাহায্য কর। যায়িদ ইবন সা'না (রা) বলেন, তারপর যখন মাল পরিশোধ করার সময় ঘনিয়ে আসল, কেবল দু'-একদিন বাকি। এ সময় তিনি মদীনাবাসীদের গোরস্থান জান্নাতুল বাকীতে এক জানাযায় অংশগ্রহণের জন্য বাইরে আসলেন। হযরত আবু বকর ও হযরত উমর (রা) সহ কতিপয় সাহাবীও তাঁর সঙ্গে ছিলেন। নবী যখন সালাত শেষ করে দেওয়ালের কাছে আসলেন তখন আমি তাঁকে তাঁর চাদরের উভয় পার্শ্ব ধরে সজোরে টান দিলাম যে, গ্রীবাদেশ থেকে চাদরটি নিচে পড়ে গেল। আমি খুবই রূঢ়ভাবে চেহারা বিকৃত করে তাঁর দিকে তাকালাম এবং বললাম, হে মুহাম্মদ! আপনি কি আমার পাওনা পরিশোধ করবেন না? আল্লাহর শপথ! আবদুল মুত্তালিবের গোষ্ঠীর মধ্যে আমি আপনাকে চিনি। আপনি অত্যন্ত টালবাহানাকারী। আপনাদের সাথে চলাফেরা করে আমার এ কথা বুঝতে আর বাকি নেই। (যায়িদ ইবন সা'না) বলেন, (একথা) শুনে হযরত উমর (রা)-এর ঘাড় ও বুক (ঢেউয়ের মাঝে) গোলাকার নৌযানের ন্যায় কাঁপতে শুরু করলো। তিনি চোখ পাকিয়ে আমার দিকে তাকাতে লাগলেন। তারপর বললেন, ওহে আল্লাহর দুশমন! তুমি এমন কথা রাসূলুল্লাহ্-কে বলছো? প্রিয় নবীর সঙ্গে তুমি কি আচরণ করছো? আমি তা দেখে যাচ্ছি আর কী সব কথা বলছো তাও শুনে যাচ্ছি। সেই সত্তার শপথ! যিনি তাঁকে সত্য নবী বানিয়ে পাঠিয়েছেন, যদি আমি আমার ইচ্ছার সেই জিনিসটি নষ্ট হওয়ার আশংকা না করতাম তা হলে আমি তোমার গর্দান উড়িয়ে দিতাম। নবী তখন অতিশয় ধীরসুস্থ ও শান্ত প্রকৃতিতে হযরত উমরের দিকে তাকাচ্ছিলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন, হে উমর, আমার ও এ ব্যক্তির ব্যাপারে এ কথা বলার বদলে অন্য একটি কর্মপদ্ধতি অবলম্বনের প্রয়োজন ছিলো। প্রয়োজনের সে কাজটি হলো তুমি আমাকে তার পাওনা সুন্দরভাবে আদায় করতে বলবে এবং তাকে নরম ভাষায় চাওয়ার নির্দেশ দিবে। আবূ আসিম (রা) হাদীসটির এ পর্যন্ত বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হযরত আবূ যুরআহ (রা) পরবর্তী অংশ সম্পর্কে বলেন, তারপর নবী বললেন, হে উমর! লোকটিকে সঙ্গে নিয়ে যাও এবং তার পাওনা শোধ করে দাও। অধিকন্তু তুমি যেহেতু তাকে ভীতি প্রদর্শন করেছো তাই তাকে বিশ সা' অতিরিক্ত প্রদান করবে। যায়িদ ইবন সা'না (রা) বলেন, অতঃপর হযরত উমর (রা) আমাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যান এবং আমার পাওনা শোধ করে অতিরিক্ত সা' খেজুরও প্রদান করেন। আমি তাকে বললাম, অতিরিক্তটি কিসের বিনিময়ে? তিনি বললেন, নবী আমাকে আদেশ করেছেন যে, আমি যেহেতু তোমাকে ভীতি প্রদর্শন করেছি, এ কারণে তোমাকে কিছু বেশি প্রদান করতে। আমি তাকে বললাম, হে উমর! আপনি আমাকে চেনেন? তিনি বললেন, না, চিনি না। তুমি কে? তখন আমি বললাম, আমি যায়িদ ইবন সা'না। উমর (রা) বললেন, ইয়াহুদীদের পণ্ডিত সা'না? আমি বললাম, জী হ্যাঁ। হযরত উমর (রা) বললেন, তা হলে তুমি প্রিয় নবী -এর সাথে এহেন আচরণ ও এহেন অভদ্র কথাবার্তা বলেছ কেন? আমি বললাম, হে উমর! কথা হলো আমি যখন রাসূলুল্লাহ -এর চেহারার দিকে তাকালাম তখন তাঁর চেহারায় দু'টি ব্যতীত নবুওয়াতের সব চিহ্ন দেখতে পেয়েছি। অবশিষ্ট সেই দু'টি হলো তাঁর ধৈর্যশীলতা ও সহিষ্ণুতা এমন থাকবে যে, তাঁর ধৈর্য তাঁর ক্রোধের উপর প্রবল থাকবে। অপরটি হলো তাঁর সাথে যতই রূঢ় আচরণ করা হবে ততই তাঁর মধ্যে ক্ষমা ও সহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পাবে। কাজেই হে উমর! এখন আমি তোমাকে সাক্ষী রাখছি, আমি মহান আল্লাহকে প্রভু হিসাবে, দীন ইসলামকে সত্য দীন হিসাবে এবং হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা -কে সত্য নবী হিসেবে মেনে নিতে সম্মত। (অর্থাৎ আমি ঈমান আনয়ন করলাম।) আমি তোমাকে আরো সাক্ষী বানাচ্ছি যে, আমার অর্ধেক সম্পদ নবী -এর উম্মতের জন্য ওয়াকফ করে দিচ্ছি। কেননা আমার কাছে প্রচুর সম্পদ রয়েছে। হযরত উমর (রা) বললেন, না কিছু সংখ্যক উম্মতের জন্য? কেননা উম্মতের সকলের জন্য এ সম্পদ যথেষ্ট হবে না। আমি বললাম, ঠিক আছে, উম্মতের কিছু সংখ্যকের জন্য। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর যায়িদ ইবন সা'না ও হযরত উমর (রা) উভয়ে নবী -এর দরবারে উপস্থিত হন। এবং যায়িদ ইবন সানা (রা) কালেমা পড়ে বলেন : أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ الأَاللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ্ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিতেছি যে, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা আল্লাহ্র বান্দা ও তাঁর রাসূল। এভাবে যায়িদ ইব্‌ন সানা (রা) আল্লাহর উপর ঈমান আনয়ন করলেন এবং প্রিয় নবী -এর হাতে বায়'আত গ্রহণ করলেন। তারপর প্রিয় নবী -এর সাথে বহু সংখ্যক যুদ্ধেও তিনি অংশ গ্রহণ করেন।

ফায়দা: এই বিস্তারিত ঘটনাটি থেকে অনুমান করা যায় যে, নবী কতখানি ধৈর্য- গুণসম্পন্ন, সহিষ্ণুতাপরায়ণ ও ক্রোধ দমনকারী ছিলেন। একজন অমুসলিমের এতটুকু ধৃষ্টতা প্রদর্শন সত্ত্বেও নবী তাকে কিছুই বললেন না। অধিকন্তু হযরত উমর (রা) তাকে ভয় দেখানোর কারণে তিনি তার ন্যায্য পাওনার অতিরিক্ত আরো কিছু প্রদান পূর্বক লোকটিকে ভীতিমুক্ত এবং সন্তুষ্ট করার নির্দেশ দেন। নবী-এর এই পরম ধৈর্যশীলতার ফল দাঁড়াল যে, যায়িদ ইবন সা'না (রা) সঙ্গে সঙ্গে তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। বস্তুত জগত জুড়ে ইসলামের ব্যাপকভাবে প্রসারতা লাভের পেছনে প্রিয় নবী-এর উন্নত চরিত্র মাধুরী ও মহৎ আচরণই ছিল সবচেয়ে বড় উপকরণ। তাঁর উন্নত আদর্শের আকর্ষণে লোকজন তাঁর নিকটবর্তী হতে থাকে, তাঁকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ পাক এই উন্নত চরিত্র মাধুরীকে নিম্নোক্ত ভাষায় উপস্থাপন করেছেন:

فَبِمَا رَحْمَةً مِّنَ اللهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ، فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ.

আল্লাহর দয়ায় আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছিলেন। যদি আপনি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতেন তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। সুতরাং আপনি তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। (সূরা আল ইমরান: ১৫৯)

মানুষের প্রতি কোমল আচরণ করা ও ক্ষমাশীল হওয়া উন্নত চারিত্রিক গুণের পরিচায়ক। মহান আল্লাহ্ আমাদের সকলকে উন্নত চরিত্র অবলম্বনের পূর্ণ তাওফীক প্রদান করুন। আমীন!

۱۷۳ عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ عَنْ أَبِيهِ قَالَ أَقْبَلَ أَعْرَابِي عَلَى نَاقَةٍ حَتَّى أَنَّاحُ بَيَابِ الْمَسْجِدِ فَدَخَلَ عَلَى نَبِيِّ اللهِ وَحَمْزَةُ بْن عَبْدِ الْمُطْلَبِ جَالِسُ فِي نَفَرٍ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالأَنْصَارِ فِيهِمُ النُّعَيْمَانُ، فَقَالُوا لِلنُّعْمَانِ وَيْحَكَ إِنْ نَاقَتَهُ نَاوِيَة يعني سَمِينَةُ فَلَوْ نَحَرْتَهَا فَإِنَّا قَدْ قَرَمْنَا إِلَى اللَّحْمِ وَلَوْ قَدْ فَعَلْتَ غَرِمَها رَسُولُ اللهِ ﷺ وَأَكَلْنَا لَحْمًا، فَقَالَ إِنِّي إِنْ فَعَلْتُ ذَلِكَ وَأَخْبَرْتُمُوهُ بِمَا صنعت وجَدْ عَلَى رَسُولِ اللهِ ﷺ قَالُوا لَا تَفْعَلْ فَقَامَ فَضَرَبَ فِي ابْتِهَاتُمُ انْطَلَقَ فَمَرْ بِالْعِقْدَادِ بْنِ عَمْرٍ وَ وَقَدْ حَضَرَ حَفْرَةٌ وَقَدْ اسْتَخْرَجَ مِنْهَا طَيِّنًا. فقَالَ يَا مِقْدَادُ : غَيْبَنِي فِي هذه الحفرة وأطبق على شَيْئًا وَلَا تَدُلُّ عَلَى شَيْئًا فَإِنِّي قَدْ أَحَدِثْتُ حدثًا، فَفَعَلَ فَلَمَّا خَرَجَ الأَعْرَابِيُّ رَأَى نَاقَتَهُ فَصَرَخَ فَخَرَجَ نَبِيُّ V الله ﷺ فَقَالَ مَنْ فَعَلَ هَذَا؟ قَالُوُل نُعَيْمَانُ ، قَالَ وَأَيْنَ تَوَجَّهَ فَتَبِعَهُ رَسُولُ الله ﷺ وَمَعَهُ سَمَزَةُ وَأَصْحَابُهُ حَتَّى أَتَى عَلَى الْمِقْدَادِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لِلْمِقْدَادِ هَلْ رَأَيْتَ لِي نُعَيْمَانَ؟ فَصَمَتَ فَقَالَ لَتُخْبِرَنِي أَيْنَ هُوَ؟ فَقَالَ مَالِي بِهِ عِلْمٍ ؟ وَأَشَارَ بِيَدِهِ إِلَى مَكَانِهِ فَكَشَفَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَقَالَ أَيْ عَدُوٌّ نَفْسِهِ مَاحَمَلَكَ عَلَى مَا صَنَعْتَ؟ قَالَ وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ الأَمَرَنِي بِهِ حَمْزَةُ وَأَصْحَابِهِ وَقَالُوا كَيْتَ وَكَيْتَ فَأَرْضَى رَسُولُ اللهِ ﷺ وَالأَعْرَابِي مِنْ نَاقَتِهِ وَقَالَ شَأْنُكُمْ بِهَا فَأَكُلُوْهَا وَكَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا ذَكَرَ صَنِيْعَهُ ضَحِكَ حَتَّى تَبْدُو نَوَاجِذُهُ -

১৭১. হিশাম ইব্‌ন ওরওয়া তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করে বলেন, একদা জনৈক বেদুঈন একটি উষ্ট্রীর উপর আরোহণ করে নবী -এর সাক্ষাতে আসল। লোকটি মসজিদে নববীর দরজায় উট্রীটিকে বসিয়ে নবী-এর সাক্ষাতের জন্য ভিতরে প্রবেশ করে। সেখানে হযরত হামযা ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব (রা) কতিপয় মুহাজির ও আনসার সাহাবীসহ বসা ছিলেন। তন্মধ্যে হযরত নুআইমানও উপস্থিত ছিলেন। সাথীরা হযরত নুআইমান (রা)-কে বললেন, আরে তুমি কি বেদুঈন লোকটির উট্রীটি দেখতে পাচ্ছ না? কী মোটা-তাজা! এটি যদি যবেহ করতে পারতে! কেননা আজ আমাদের গোস্ত খাওয়ার ইচ্ছা হচ্ছে। তুমি এমনটি ঘটিয়ে ফেললে নবী উটনীর মালিককে জরিমানা আদায় করে দেবেন। এদিকে গোশ্তও আমরা বিনামূল্যে পেয়ে যাবো। নুআইমান (রা) বললেন, আমি এমনটা করে ফেললে তোমরা রাসূলুল্লাহ্ -এর কাছে আমার কথা বলে দেবে। আর তখন তিনি আমার প্রতি রাগ করবেন। সাথীগণ বললেন, না, আমরা তা কিছুতেই করবো না। সে মতে হযরত নুআইমান (রা) দাঁড়ালেন এবং উট্রীটিকে নাহর করে দিলেন। তারপর সে স্থান ত্যাগ করে চলে গেলেন। পথিমধ্যে হযরত মিক্‌দাদ ইব্‌ন আমর (রা)-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। হযরত নুআইমান (রা) তাঁকে বললেন, হে মিকদাদ! তুমি আমাকে এ গর্তে লুকিয়ে থাকতে দাও। আমার মাথার উপর কোন কিছু দিয়ে ঢেকে ফেলো। আর আমার কথা কাউকে জানাবে না। কেননা আমি একটি নতুন দুষ্টমী করে আসছি। হযরত মিকদাদ (রা) তাই করলেন।

এদিকে বেদুঈন লোকটি মসজিদ থেকে বের হয়ে যখন নিজের উট্রী মাটিতে পড়া অবস্থায় দেখল তখন সে চিৎকার দিতে লাগল। এ কাজ করেছে কে? লোকজন বললো, নুআইমান। নবী বললেন, সে কোন্ দিকে গিয়েছে? তারপর তিনি তাঁকে খুঁজতে লাগলেন। হযরত হামযা ও তাঁর সাথীগণও নবী -এর সঙ্গে সঙ্গে চললেন। অবশেষে তাঁরা হযরত মিকদাদ (রা) পর্যন্ত পৌঁছলে রাসূলুল্লাহ্ তাঁকে বললেন, হে মিকদাদ! তুমি কি নুআইমানকে দেখেছো? হযরত মিকদাদ (রা) নিরুত্তর। নবী বললেন, তোমাকে বলতে হবে সে কোথায়? হযরত মিকদাদ (রা) মুখে আমি জানি না বলে হাতের ইশারায় সে স্থানটি দেখিয়ে দেন। সে মতে নবী গর্তের ঢাকনা সরালেন এবং বললেন, আরে নিজ প্রাণের দুশমন। এমনটা করলে কেন? নুআইমান বললেন, কসম আমাকে তো হযরত হামযা ও তাঁর সাথীরা এমনটা করতে বলেছে। তাঁরা আমাকে এ সব কথাও বলেছিল। নবী তখন বেদুঈন লোকটিকে তার উটনীর বিনিময়ে কিছু মালামাল দিয়ে সম্মত করান। তারপর বললেন, যাও উট্নীটি নিয়ে যাও। সেমতে সাথীগণ উট্নীটি নিয়ে গোশ্ত আহার করে। পরবর্তীকালে যখনই নবী তাদের এই দুষ্টুমির কথা মনে করতেন তখন তাঁর হাসি রোধ করতে পারতেন না। তিনি খিলখিল করে হেসে ফেলতেন এমনকি তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত দেখা যেত।

ফায়দা: উল্লিখিত হাদীস থেকেও এ কথা বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ সীমাহীন ক্ষমাশীল ও দয়ালু ছিলেন। কোন কাজে তিনি রাগ করতেন না। তবে হ্যাঁ, যদি দীনী কোন কাজে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হতো তখন তিনি অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করতেন।

١٧٤ عَنْ عُبَيْدِ اللهِ بْنِ الْمُغِيرَةَ قَالَ سَمِعْتُ عَبْدَ اللهِ بْنِ الْحَارِثِ بْنِ جَزْء يَقُوْلُ مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَكْثَرَ مِزَاحًا مِنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ وَلَا أَكْثَرَ تَبَسُمًا مِنْهُ وَإِنْ كَانَ يَسَنُوْ أَهْلَ الصَّبِيِّ إِلَى مِزَاحِهِ -

১৭৪. হযরত উবায়দুল্লাহ্ ইব্‌ন মুগীরা (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন হারিস (রা) থেকে শুনেছি যে, তিনি বলেন, আমি না রাসূলুল্লাহ্ অপেক্ষা অধিক কাউকে কৌতুক করতে দেখেছি, আর না তাঁর চেয়ে অধিক কাউকে মুচকি হাসি হাসতে দেখেছি। আর বাচ্চাদের অভিভাবকরা তো তাঁর এ কৌতুক করাকে নিজেদের গর্ব বলে বোধ করতো এবং খুবই আনন্দিত হতো। এর কারণ ছিলো নবী বাচ্চাদের সাথে খুবই কৌতুক করতেন।

ফায়দা: নবী থেকে যেভাবে কৌতুক করা প্রমাণিত আছে তদ্রূপ কৌতুক করার উপর নিষিদ্ধতাও বর্ণিত হয়েছে। হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থে এ নিষেধ বিদ্যমান। কাজেই বিষয়টির ব্যাখ্যা আবশ্যক, যাতে বোঝা যায় যে, কোন্ ধরনের কৌতুক জায়িয ও পছন্দনীয়, আর কোন্ ধরনের কৌতুক নিষিদ্ধ। বস্তুত কৌতুকের দু'টি রূপ আছে। একটি হলো, এমন কৌতুক যা ব্যক্তিকে মহান আল্লাহ্র স্মরণ ও তাঁর যিকর ফিকর থেকে উদাসীন বানিয়ে দেয়। যা ব্যক্তির কঠোর চিন্তার কারণ হয়ে থাকে। এ ধরনের কৌতুক করা সাধারণত হাটে-বাজারের লোকদের নীতি। তারা কথায় কথায় হাসি-ঠাট্টা করে। নানা গল্প-গুজবে মত্ত থাকে। এ সব কৌতুকের সঙ্গে সত্যতা ও বাস্তবতার লেশমাত্র সম্পর্ক থাকে না। কাজেই এ প্রকৃতির কৌতুক একজন মুসলিমের মান-সম্মান ও গাম্ভীর্যকে খুইয়ে দেয়। অধিকন্তু এ ধরনের কৌতুক কখনো কখনো অন্যজনের সম্মান হানি কিংবা উপহাস এমনকি মনকষ্টের কারণ হয়ে থাকে। কাজেই এটি শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েয। কিন্তু যে কৌতুক মানব মনের প্রফুল্লতা বৃদ্ধি করে সেখানে সে সব জিনিস থাকে না। বরং এ কৌতুক দ্বারা অন্যজনের মন সন্তুষ্টি, প্রসন্নতা, আনন্দ ও চিত্তসুখ বৃদ্ধি পায়। যেগুলি সত্যনির্ভর হয়ে থাকে অর্থাৎ কৌতুক বটে। তবে সত্য ও বাস্তবসম্মত। এমন কৌতুক করতে দোষ নেই বরং মুস্তাহাব ও মসনূন বলা চলে। যেমন একটি হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, সাহাবীগণ বলেছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি আমাদের সঙ্গে কখনো কখনো কৌতুকও করে থাকেন। নবী বললেন, হ্যাঁ, তাতে আপত্তির কি আছে? কিন্তু এ কৌতুকে আমি অসত্য কথা বলি না। (শামায়েলে তিরমিযী।)

١٧٥ عَنْ عُبَيْدِ بْنِ عُمَيْرٍ قَالَ كُنْتُ عِنْدَ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا وَنَحْنُ نَذْكُرُ حُمَّى الْمَدِينَةَ وَانْتِقَالَهَا إِلى مَهِيعَةَ وَنَضْحَكُ ثُمَّ صِرْنَا إِلَى حَدِيْثِ بَرِيرَةَ وَمَسْكَنِهَا، إِذْ افْتَتَحَ عَلَيْنَا عَبْدُ اللهِ بْنِ عُمَرَ وَ فَلَمَّا رَأَيْنَاهُ أَكْثَرْنَا وَقَالَ دَعْنَا مِنْ بَاطِلِكُمَا ، قَالَتْ عَائِشَةُ سُبْحَانَ اللهِ أَلَمْ تَسْمَعْ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ إِنِّي لأَمْزَحُ وَلَا أَقُولُ إِلَّا حَقًّا -

১৭৫. উবায়দ ইব্‌ন উমায়র (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-এর কাছে বসা ছিলাম। আমরা মদীনার প্রসিদ্ধ জ্বর ও জ্বরটির মাহ্যাআ অঞ্চলের দিকে প্রত্যাগমন ইত্যাদি নিয়ে কথাবার্তা ও হাসাহাসি করছিলাম। তারপর আমাদের আলোচনা চলে গেল হযরত বারীরা ও তার ঘর সম্পর্কীয় প্রসিদ্ধ ঘটনার দিকে। ইত্যবসরে আমাদের সম্মুখ দিক দিয়ে আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) প্রবেশ করলেন। আমরা তাকে দেখে হাসি-তামাশার পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দিলাম। তখন তিনি বললেন, আপনারা আমার সামনে এ সব অর্থহীন কথা বলা বন্ধ করুন। এর উপর হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) বললেন, সুবহানাল্লাহ্! আপনি কি রাসূলুল্লাহ্ থেকে শুনেননি যে, তিনি বলতেন, আমি কখনো কখনো কৌতুকও করি। কিন্তু কৌতুকের জন্যও আমি যে কথা বলি সেটিও ন্যায়ানুগ ও সত্য হয়ে থাকে।

ফায়দা: প্রাথমিক যুগে মদীনা তাইয়্যেবা ছিল আরবের অন্যান্য শহরের তুলনায় অধিকতর অস্বাস্থ্যকর শহর। এখানকার আবহাওয়া ছিল স্বাস্থ্যহানিকর। লোকজন নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকতো। বিশেষত সর্দি জ্বরের মত কষ্টদায়ক রোগটি এখানে ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছিল। সাহাবীগণ যখন মক্কা শরীফ থেকে মদীনা শরীফ হিজরত করেন তখন অন্যদেরসহ হযরত আবূ বকর ও হযরত বিলাল (রা)-ও জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। মদীনায় অবস্থানের উপর সাহাবীদের অসন্তুষ্টি দেখা দিতে শুরু করে। এ পরিস্থিতি দেখে নবী মহান আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করেন; হে আল্লাহ্! মদীনাকে তুমি আমাদের জন্য মক্কার চেয়েও অধিক প্রিয় শহর বানিয়ে দাও। এ শহরের জ্বর রোগকে তুমি মাহয়া অর্থাৎ জুফ্ফার দিকে ফিরিয়ে দাও।

আল্লাহ্ পাক নবী -এর এ দু'আ কবুল করেন। তারপর থেকে সেই মদীনা শহর জগতের অন্যান্য শহরের তুলনায় অধিকতর সুন্দর ও অধিকতর স্বাস্থ্যকর শহরে পরিণত হয়। এ ঘটনা বস্তুত নবী -এর এমন একটি স্পষ্ট মুজিযা, যা সকল ভূগোলবিদকেও স্তম্ভিত করে দেয়।

দ্বিতীয় ঘটনাটি হযরত বারীরা (রা) সম্পর্কীয়। তিনি ছিলেন হযরত আয়েশা (রা)-এর ক্রীতদাসী। মুগীস্ নামক জনৈক ক্রীতদাসের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়েছিল। হযরত আয়েশা (রা) যখন তাকে আযাদ করে দেন তখন শরীয়তের আইন অনুসারে নবী তাকে পূর্ব স্বামীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক রাখা কিংবা বিচ্ছিন্ন করার ইস্পিয়ার প্রদান করেন। কেননা, তার স্বামী ছিলেন তখনও ক্রীতদাস অথচ তিনি আযাদী পেয়ে গিয়েছিলেন। ইতিয়ার পেয়ে হযরত বারীরা (রা) সম্পর্ক বিচ্ছেদের পক্ষ অবলম্বনপূর্বক স্বামীর ঘর থেকে চলে যান। তার এ বিরহে স্বামীর খুবই মন কষ্ট হয়। মুগীস বিরহ যাতনায় 'অশ্রুপাত করা অবস্থায় মদীনার অলিগলি ঘুরতে শুরু করে। কিন্তু বারীরার মন কিছুতেই ফিরেনি। শেষ পর্যন্তও সে পূর্ব বিবাহের সম্পর্ক অবশিষ্ট রাখলো না। বৃদ্ধ মুগীস ও বারীরার এ ঘটনা লোকজনের মুখরোচক আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়। লোকজন আনন্দ উল্লাসের সময় এ ঘটনা বলাবলি করতো।

হযরত উবায়দ ইব্‌ন উমায়র ও হযরত আয়েশা (রা) উপরোক্ত ঘটনাদ্বয় নিয়ে হাসি কৌতুক করছিলেন। ইত্যবসরে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) প্রবেশ করেন। তিনি এ ধরনের গল্প বলার উপর আপত্তি উত্থাপন করলে হযরত আয়েশা (রা) তাঁর আপত্তি খণ্ডন করেন। তিনি নবী-এর হাদীসের উদ্ধৃতি শুনিয়ে বলেন, এটি এক ধরনের মিথ্যাযুক্ত প্রফুল্লতা প্রদানকারী কৌতুক। রাসূলুল্লাহ্ নিজেও এ ধরনের কৌতুক করতেন।

١٧٦. عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَجُلاً سَأَلَهُ أَكَانَ النَّبِيُّ يَمْزَحُ فَقَالَ كَانَ النَّبِيُّ يَمْزَحُ -

১৭৬. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি (অবাক হয়ে) জিজ্ঞেস করেছিল, নবী কখনো কি কৌতুক করেছেন? তখন ইব্‌ন আব্বাস (রা) বললেন, হ্যাঁ, নবী কৌতুকও করতেন।

۱۷۷. عَنْ أَنَسٍ أَنَّ رَجُلاً أَتَى النَّبِيِّ فَقَالَ احْمِلْنِي فَقَالَ إِنَّا حَامِلُوكَ عَلَى وَلَدِ النَّاقَةِ قَالَ الشَّيْخُ وَمَا أَصْنَعُ بِوَلَدِ النَّاقَةِ ؟ فَقَالَ هَلْ تَلِدُ الأَبْلُ إِلَّا النَّوْقَ ؟ وَقَالَ لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَجُوْزُ -

১৭৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী -এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমাকে আরোহণ করার জন্য একটি বাহন দান করুন। নবী বললেন, ঠিক আছে। তোমাকে আমি আরোহণের জন্য একটি উটনীর বাচ্চা দিব। প্রার্থনাকারী বৃদ্ধ লোকটি বললো, উটনীর বাচ্চা দিয়ে আমি কি করবো? (আমার তো আরোহণের উপযুক্ত বয়স্ক কোন উট কিংবা উটনীর প্রয়োজন) নবী বললেন: প্রতিটি উটই কোন না কোন উটনীর বাচ্চা। অনুরূপভাবে নবী একদা কৌতুকচ্ছলে বলেছিলেন, (মনে রাখবে) বেহেশতে কোন বৃদ্ধা প্রবেশ করবে না।

ফায়দা : উপরোক্ত হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ কৌতুক করতেন। কিন্তু তাঁর কৌতুকগুলি সর্বদা এমন হতো যা হৃদয়ে আনন্দের সঞ্চার ও প্রফুল্লতা সৃষ্টিসহ সত্য ও বাস্তবসম্মত হয়ে থাকতো। সে মতে তিনি আরোহণের জন্তু সম্পর্কে যা বলেছেন সে ছিল কৌতুক। তারপর প্রশ্নকারীর মনে দ্বিধা-দ্বন্দু দেখে তিনি নিজেই কথাটির রহস্য খুলে দিয়েছেন। আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তিনি কোন বৃদ্ধা বেহেশতে প্রবেশ করবে না বলে যে উক্তি করেছেন সেটিও রহস্যপূর্ণ। কেননা কিয়ামতের দিনে সকল বৃদ্ধই তারুণ্যের রূপ নিয়ে বেহেস্তে প্রবেশ করবে।

۱۷۸ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ لَيَدْلِغُ لِسَانَهُ لِلْحَسَنِ بْنِ عَلِيُّ، فَيَرَى الصَّبِيُّ حُمْرَةً لِسَانِهِ فَيَبْهَشُ إِلَيْهِ -

১৭৮. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (কৌতুক করে) হযরত হাসান ইবন আলী (রা)-এর সামনে মুখ থেকে জিহ্বা বের করে দেখাতেন। তখন সে বাচ্চা [হাসান ইবন আলী (রা)] নবী-এর জিহ্বার লাল রং দেখে (খেজুর কিংবা আহারের কোন জিনিস মনে করে) তা ধরার জন্য হাত ঝাপটাতে থাকতেন।

ফায়দা : এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, নবী যেভাবে বড়দের সঙ্গে হাসি-কৌতুক করতেন তেমনি তিনি শিশুদের সঙ্গেও হাসি-কৌতুক এবং স্বাভাবিক কথাবার্তা বলতেন। এ সব কাজে কোন কিছুতে তিনি সংকোচ অনুভব করতেন না। এমন কি তাঁর আত্মমর্যাদার বিপরীত বলেও জ্ঞান করতেন না। কেননা নবী-এর শান-শওকত তাঁর উচ্চাসন সাধারণ মানুষের ন্যায় কৃত্রিম বা বানোয়াট ছিলো না যে, কৌতুক প্রকাশ বা প্রফুল্লতা সৃষ্টির দরুন তা নষ্ট হয়ে যাবে। বরং তাঁর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধও ছিলো মহান আল্লাহ্ কর্তৃক উম্মতের মনে স্থাপিত একটি বিষয়। সে মতে নবী-এর কোমল আচরণ, হাসি-কৌতুক প্রফুল্লতা ও আনন্দদায়ক কথাবার্তা উম্মতের প্রতি মহান আল্লাহ্ পক্ষ থেকে একটি বড় ধরনের রহমত ও নিয়ামতরূপে বিবেচিত। আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন :

فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ، وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ .

আল্লাহ্র অপার অনুগ্রহে আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছিলেন। যদি আপনি রূঢ় ও কঠোর চিত্ত হতেন তাহলে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। (সূরা আল ইমরান : ১৫৯)

কোন সন্দেহ নেই যে, রাসূলে পাক-এর হাসিখুশি আচরণ ও কোমলতাই ছিল সেই চিত্তাকর্ষক আচরণ যা উম্মতের নারী-পুরুষ, যুবক, বৃদ্ধ ও শিশুদের অন্তরকেও পাগলপারা করে দিয়েছিল। যার ফলে তাদের সকলে রিসালাতের আলোকশিখায় আত্মোৎসর্গকারী পতঙ্গে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।

۱۷۹. عَنْ مُجَاهِدٍ قَالَ دَخَلَ النَّبِيُّ الله عَلَى عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا وَعِنْدَهَا عَجُونٌ، فَقَالَ مَنْ هُذِهِ ؟ قَالَتْ هِيَ مِنْ أَخْوَالِي فَقَالَ النَّبِيُّ لا إِنَّ الْعَجْزَ لَا تَدْخُلُ الْجَنَّةَ فَشَقَّ ذَلِكَ عَلَى الْمَرَأةِ فَلَمَّا دَخَلَ النَّبِيُّ ﷺ قَالَتْ لَهُ عَائِشَةُ فَقَالَ إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يُنْشِئُهُنَّ خَلْقًا غَيْرَ خَلْقِهِنَّ -

১৭৯. হযরত মুজাহিদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা নবী হযরত আয়েশা (রা)-এর গৃহে প্রবেশ করে দেখলেন তার কাছে জনৈকা বৃদ্ধা বসে রয়েছেন। নবী বললেন, এ বৃদ্ধা মহিলাটি কে? হযরত আয়েশা (রা) বললেন, আমার মাতুলালয়ের একজন। নবী কৌতুক করে বলেছিলেন, বৃদ্ধা মহিলা কখনোই বেহেশতে প্রবেশ করবে না। নবী -এর এ কথাটি বৃদ্ধার কাছে ভারী বোধ হলো। (সে অস্থির হয়ে উঠল) কিছুক্ষণ পর নবী ঘরে ফিরে আসলে হযরত আয়েশা (রা) তাঁকে বিষয়টি জান'লেন। তখন বললেন, (আরে) আল্লাহ্ তা'আলা এ বৃদ্ধাদেরকে (কিয়ামতের দিন) তাদের দৈহিক 'অ।কৃতি পরিবর্তন পূর্বক যৌবনের আকৃতিতে পুনরুত্থিত করবেন। (যুবতীর বেশেই সকল বৃদ্ধা বেহেস্তে প্রবেশ করবে)।

ফায়দা : হাদীসের অর্থ হলো কিয়ামতের দিন সকল বৃদ্ধাকে যুবতীর আকৃতিতে পুনরুত্থিত করা হবে এবং এ আকৃতিতে তারা বেহেস্তে প্রবেশ করবে। কাজেই বৃদ্ধা অবস্থায় কেউ বেহেস্তে প্রবেশ করবে না বরং সকলেই প্রবেশ করবে পূর্ণ যৌবনের আকৃতি নিয়ে। বৃদ্ধা মহিলারা সাধারণত কোন কথার গভীর চিন্তা না করেই অস্থির হয়ে উঠে। নবী এ কথা জেনেই হযরত আয়েশার মাতুল সম্পর্কীয় বৃদ্ধার সাথে কৌতুক করেন। স্পষ্ট কথা নবী তাঁর কথাটির রহস্য জানিয়ে দিলে বৃদ্ধা নবী -এর প্রতি গভীরভাবে অনুরাগী হয়ে ওঠেন। হযরত আয়েশা (রা)-ও এ থেকে লাভ করেন পরম চিত্ত প্রফুল্লতা। এটিই ছিল রাহমাতুল্লিল আলামীনের উপযুক্ত মমত্ববোধ ও আন্তরিকতা।

۱۸۰. عَنْ عِكْرِمَةَ قَالَ كَانَ بِالنَّبِيِّ دُعَابَةُ يَعْنِي مِزَاحًا -

১৮০. হযরত ইকরিমা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর পবিত্র সত্তায় হাসি-খুশির স্বভাব বিদ্যমান ছিল।

۱۸۱. عَنِ ابْنِ الْوَرْدِ عَنْ أَبِيهِ قَالَ رَانِي النَّبِيُّ وَرَانِي رَجُلًا أَحْمَرَ فَقَالَ أَنْتَ الْوَرْدُ، قَالَ جُبَارَةُ مَازَحَهُ -

১৮১. হযরত ইব্‌ন আবুল ওয়ারদ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, একদা নবী ﷺ আমাকে দেখতে পেতেন। তিনি আমার শরীরের লালচে শুভ্র বর্ণ দেখে বললেন, তুমি তো রীতিমত গোলাপ ফুল। হযরত জুবায়রা (ইব্‌ন মুফলিস) বলেন, নবী ﷺ এ কথাটি কৌতুক করে বলেছিলেন।

ফায়দা: আবুল ওয়ারদ (রা) ছিলেন নবী ﷺ-এর একজন সাহাবী। তিনি এ উপনামেই অধিকতর প্রসিদ্ধ ছিলেন। ইতিপূর্বে তাঁর নাম এটি ছিলো না। এ নামে প্রসিদ্ধ হওয়ার কারণ হলো তিনি লালচে শুভ্র বর্ণের ছিলেন। নবী ﷺ আদর করে তাঁকে গোলাপ ফুল অভিহিত করে বলেছিলেন তুমি তো রীতিমত গোলাপ ফুল। সেই থেকে তিনি আবুল ওয়ারদ অর্থাৎ গোলাপ ফুলের বাবা নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।

۱۸۲. عَنْ ابْنِ كَعْبِ بْنِ مَالِكِ عَنْ أَبِيْهِ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا سُرَّ بِالْأَمْرِ اسْتَنَارَ كَاسْتَنَارَةِ الْقَمَرِ -

১৮২. হযরত ইব্‌ন কা'ব ইব্‌ন মালিক তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, নবী ﷺ যখন কোন কাজে আনন্দিত হতেন তখন তাঁর চেহারা মুবারক পূর্ণ চন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠত।

۱۸۳. عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ كَعْبٍ عَنْ أَبِيهِ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا سُرَّهُ الْأَمْرُ اسْتِنَارَ وَجْهُهُ اسْتِنَارَةَ الْقَمَرِ -

১৮৩. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন কা'ব তাঁর পিতা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, কোন কাজ যখন নবী ﷺ-কে আনন্দিত করত তখন তাঁর চেহারা মুবারক আলোময় চন্দ্রের ন্যায় আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠত।

١٨٤ عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا أَنَّهَا قَالَتْ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ دَخَلَ مسْرُورًا تَبْرُقُ أَسَارِيرُ وَجْهِهِ -

হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ একদা ঘরে প্রবেশ করলেন আনন্দচিত্ত অবস্থায়। তখন আনন্দের আতিশয্যে তাঁর চেহারা মুবারকের সৌন্দর্য যেন জ্বলজ্বল করছিল।

ফায়দা: প্রিয় নবী ﷺ-এর উজ্জ্বল ললাট ও আলোকময় চেহারা তাঁর প্রসন্ন প্রকৃতি মমত্ববোধ ও উদারতার প্রকৃষ্ট দলীল।

١٨٥. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَ مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ مُسْتَجْمِعًا ضَاحِكًا حَتَّى أَرَى لَهَوَاتِهِ، إِنَّمَا كَانَ يَتَبَسُمُ -

১৮৫. হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী -কে কখনো এভাবে হো হো করে হাসতে দেখিনি যে, তাঁর মুখ গহ্বরের পূর্ণ অংশ আমার নজরে এসেছে, বরং তিনি (আনন্দ ও প্রসন্নতার মুহূর্তে) মুচকি হাসি হাসতেন।

١٨٦ ، عَنْ أَبِي رَجَاءَ حُصَيْنُ بْنِ يَزِيدَ الْكَلْبِي قَالَ مَا رَأَيْتُ النَّبِيُّ ضَاحِكًا مَا كَانَ إِلَّا الْتَبَسُمُ -

১৮৬. হযরত আবূ রাজা হোসাইন ইন ইয়াযীদ কালবী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী-কে কখনো (মুখ খুলে) হাসতে দেখিনি। তাঁর হাসার পদ্ধতি মুচকি হাসির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

ফায়দা : উপরোক্ত হাদীস দুটি থেকে বোঝা যায় যে, নবী কখনো হো হো করে কিংবা মুখ খুলে হাসতেন না। হাসির মুহূর্তে সাধারণত তিনি মুচকি হাসি হাসতেন। এমন মুহূর্ত তাঁর জীবনে খুবই বিরল পাওয়া গিয়েছে, যেখানে হাসতে গিয়ে তাঁর মুখ খুলে গিয়েছিলো। এ কারণেই বর্ণনাকারী প্রিয় নবী -এর সাধারণত নীতির প্রতি সমীহ প্রকাশ করে বলেন, তিনি জোরে হাসার স্থানেও মুচকি হাসি হাসতেন। প্রিয় নবী -এর এই মুচকি হাসির কারণ হলো যে হো হো করে কিংবা মুখ খুলে অট্টহাসি হাসার অভ্যাস মানুষের গাম্ভীর্য ও আত্মসম্মানকে ক্ষুণ্ণ করে দেয়।

۱۸۷ عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا رَأَى مَا يَكْرَهُ قَالَ الْحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى كُلِّ حَالٍ وَإِذَا رَأَى مَا يَسُرُّهُ قَالَ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي بِنِعْمَتِهِ تَتِمُ الصالحات -

১৮৭. হযরত আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন কোন অপছন্দনীয় জিনিস দেখতেন তখন নিম্নোক্ত দু'আ পাঠ করতেন : الْحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى كُلِّ حَالٍ অর্থাৎ সর্বাবস্থায় সকল প্রশংসা আল্লাহ্র জন্য। আর তিনি যখন কোন পছন্দনীয় আনন্দদায়ক জিনিস দেখতেন তখন নিম্নোক্ত দু'আ বলতেন : الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي بِنِعْمَتِهِ تَتِمُّ অর্থাৎ সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য যার অনুগ্রহ ও দয়ার দৌলতেই যাবতীয় কল্যাণকর কাজ সুসম্পন্ন হয়।

ফায়দা : আলোচ্য হাদীসে দু'টি মূল্যবান দু'আর উল্লেখ করা হয়েছে। এ দু'আ দু'টিকে নিজেদের কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত করে নেয়া বড়ই সৌভাগ্য ও কল্যাণের বিষয়। নবী -এর এটিই নিয়ম ছিল।

১৮৮. عَنْ صُهَيْبٍ قَالَ ضَحِكَ رَسُولُ اللهِ ﷺ حَتَّى بَدَتْ نَوَا جِذْهُ -

১৮৮. হযরত সুহাইব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এভাবে মুখ খুলে হাসেন যে, তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত দেখা গিয়েছিল।

۱۸۹. عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ ضَحِكَ رَسُولُ اللهِ ﷺ حَتَّى بَدَتْ أَنْيَابُهُ .

১৮৯. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এভাবে হাসতে থাকেন যে, তাঁর তীক্ষ্ণ দাঁতগুলি পর্যন্ত দেখা গিয়েছিল।

ফায়দা : উপরোক্ত দু'টি হাদীসে প্রিয় নবী ﷺ-এর মুখ খুলে হাসির উল্লেখ করা হয়েছে। বস্তুত এ ধরনের সীমিত সংখ্যক কয়েকটি ঘটনা পাওয়া যায় যেখানে তিনি অনিচ্ছায় মুখ খুলে হেসেছিলেন নতুবা স্বাভাবিকভাবে তাঁর হাসির নীতি ছিল মুচকি হাসি।

۱۹۰. عَنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيِّ قَالَ سَأَلْتُ خَالِي هِنْدًا عَنْ صِفَةِ النَّبِيِّ ﷺ فَقَالَ كَانَ إِذَا غَضِبَ أَعْرَضَ وَأَشَاحَ وَإِذَا فَرِحَ غَضْ طَرْفَهُ جُلُّ ضَحْكِهِ التَّبَسُمُ يَفْتَرُ عَنْ مِثْلِ حَبَّةِ الْغَمَامِ -

১৯০. হযরত হাসান ইব্‌ন আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার মামা হযরত হিন্দা (রা)-কে নবী ﷺ-এর গুণাবলি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি বললেন, নবী ﷺ যখন কারোর প্রতি অসন্তুষ্ট হতেন তখন তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন এবং সে ব্যাপারে অমনোযোগী থাকতেন। আর যখন আনন্দিত হতেন তখন (লজ্জাশীলতার কারণে) দৃষ্টি অবনমিত করে রাখতেন। তাঁর যাবতীয় হাসির নিয়ম ছিল মুচকি হাসি। কিন্তু এ হাসির সময়ে (তাঁর দাঁতগুলি) বরফের মত শুভ্র ও উজ্জল দেখাত।

۱۹۱ ، عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ بَعَثَنِي رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِلَى الْيَمَنِ، أَتَانِي ثَلَاثَةُ نَفَرٍ يَخْتَصِمُونَ فِي غُلَامٍ امْرَأَةٍ وَقَعُوا عَلَيْهَا جَمِيعًا فِي طُهْرٍ وَاحِدٍ وَكُلُّهُمْ يَدْعِى أَنَّهُ ابْنُهُ، فَاقَرَعْتُ بَيْنَهُمْ فَالْحَقْتُهُ بِالَّذِي أَصَابَتْهُ الْقُرْعَةُ وَبِنَصِيْبِهِ لِصَاحَبَيْهِ ثُلُثَى دِيَةِ الْحُرِ فَلَمَّا قَدِمْتُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ ذَكَرْتُ ذَلِكَ لَهُ فَضَحِكَ حَتَّى ضَرَبَ بِرِجْلَيْهِ الْأَرْضَ ثُمَّ قَالَ حَكَمْتَ فِيْهِمْ بِحُكْمِ اللَّهِ أَوْ قَالَ لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ حُكْمَكَ فِيْهِمْ -

১৯১. হযরত আলী ইব্‌ন আবু তালিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাকে যখন ইয়ামেনে (কাযী নিযুক্ত করে) পাঠিয়েছিলেন, তখন আমার কাছে তিনজন লোক এসে একটি মামলা দায়ের করলো। এ লোকেরা এমন একটি মহিলার গর্ভজাত শিশুর অভিভাবকত্ব নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়েছিলো যে তাদের সকলেরই ক্রীতদাসী ছিলো। এর সঙ্গেই তারা একই 'তুহর' চলাকালে শয্যাগ্রহণ করেছিলো। তিনজনের প্রত্যেকেরই দাবি ছিলো যে শিশুটি তার। হযরত আলী (রা) বলেন, আমি তাদের নামে লটারি করলাম। লটারিতে যার নাম উঠেছিলো শিশুটি তাকেই প্রদান করলাম। আর অবশিষ্ট দু'জনের দাবির বিনিময়ে আমি তার কাছ থেকে একজন আযাদ মানুষের যতটুকু দিয়‍্যাত (রক্তপণ) দিতে হয় তার দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ে দু'জনকে দিয়ে দিলাম। তারপর আমি নবী -এর দরবারে উপস্থিত হলে এ ঘটনা বর্ণনা করি। নবী ঘটনা শুনে খুব হাসলেন। এমন কি হাসির আতিশয্যে তিনি আপন পদযুগল যমীনের উপর মারতে থাকেন। তারপর বললেন, হে আলী! তুমি তাদের বিষয়টি আল্লাহর হুকুম মোতাবেক ফয়সালা করেছো। কিংবা নবী বলেছেন, তাদের ব্যাপারে তোমার এ সিদ্ধান্তে মহান আল্লাহ্ খুবই সন্তুষ্ট।

ফায়দা: হাদীস বিশারদ আলিমদের মতে এ হাদীসের সূত্র অতিশয় দুর্বল। গ্রন্থকার (র) এখানে হাদীসটির শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা বিচারের জন্য উপস্থাপন করেন। এবং তাঁর উদ্দেশ্য হলো কেবল নবী -এর হাসি ও মুচকি হাসির পদ্ধতি বর্ণনা করা। এই লক্ষ্যেই তিনি হাদীসটিকে আলোচ্য অনুচ্ছেদে সন্নিবেশিত করেছেন।

۱۹۲. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ تَبَسَمْ حَتَّى بَدَتْ نَوَاجِذُهُ -

১৯২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ -কে এমন ভাবে হাসতে দেখেছি যে, তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত দেখা গিয়েছিল।

١١٣ . عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ الإِذَا غَضِبَ رُنِي بِوَجْهِهِ ظلال -

১৯৩. হযরত বারাআ ইব্‌ন আযিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী রাগান্বিত হতেন তখন তাঁর চেহারা মুবারকে রাগের ছায়ার প্রতিফলন ফুটে উঠত।

ফায়দা : অর্থাৎ যে ভাবে তাঁর চেহারা মুবারকে আনন্দ ও প্রফুল্লতার প্রতিক্রিয়া: তে সঙ্গে ফুটে উঠত, তদ্রূপ তাঁর রাগ ও ক্রোধের প্রতিক্রিয়াও তাঁর মুবারক চেহারায় স্পষ্ট দে যেতো।

📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ 📄 নবী (সা)-এর ক্রন্দন করা ও দুঃখিত হওয়ার বর্ণনা

📄 নবী (সা)-এর ক্রন্দন করা ও দুঃখিত হওয়ার বর্ণনা


١٩٤ . عَنْ أَنَسٍ قَالَ رَأَيْتُ إِبْرَاهِيمَ بْنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَدَعَاهُ فَضَمَّهُ إِلَيْهِ فَرَأَيْتُهُ بَيْنَ يَدَى رَسُولُ اللهِ ﷺ وَهُوَ يَكِيدُ بِنَفْسِهِ ، فَدَمَعَتْ عَيْنَاهُ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ تَدْمَعُ الْعَيْنُ وَيَحْزَنُ الْقَلْبُ وَلَا نَقُولُ الأَمَا يُرْضَى رَبَّنَا وَإِنَّا بِكَ يَا إِبْرَاهِيمُ لَمَحْزُونُونَ -

১৯৪. আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-এর পুত্র ইব্রাহীম (রা)-কে (তাঁর মৃত্যুর সময়ে) দেখতে গেলাম। (তখন দেখলাম নবী তাঁকে এতই ভালবাসতেন যে, সে মুহূর্তে তিনি ছুটে আসেন এবং) তাঁকে একটি ডাক দিয়ে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নেন। হযরত আনাস (রা) বলেন, তারপর আমি ইব্রাহীমকে নবী-এর কোলে এমতাবস্থায় দেখলাম যখন তিনি জীবনের অন্তিম মুহূর্তগুলি অতিক্রম করছিলেন। এ সময় প্রিয় নবী-এর চক্ষুদ্বয় অশ্রুপাত করতে থাকে আর তিনি বলতে থাকেন, চক্ষু অশ্রুপাত করছে, হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে। কিন্তু মুখ দ্বারা আমরা কেবল এতটুকু কথাই বলতে পারি যতটুকু পর্যন্ত আমাদের প্রতিপালক সন্তুষ্ট থাকেন। হে ইব্রাহীম! আমরা তোমার বিদায়ে খুবই ভারাক্রান্ত ও ব্যথিত।

ফায়দা : উল্লিখিত হাদীসে নবী-এর ক্রন্দন করা ও ব্যথিত হওয়ার অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি হাসার মুহূর্তে যেভাবে ভারসাম্য নীতি পছন্দ করতেন তেমনি দুঃখ ও বেদনার মুহূর্তে ও ক্রন্দন করার ক্ষেত্রেও ভারসাম্য নীতি রক্ষা করতেন। এ কারণে যেমনি তিনি কখনো অট্টহাসি হাসতেন না, তেমনি জোর আওয়াজে কিংবা চিৎকার দিয়ে কখনো ক্রন্দন করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাঁর ক্রন্দনের সীমা কেবল এতটুকু পর্যন্ত পৌছত যে, নয়নযুগল অশ্রুতে ভরে যেত, হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠত। কিন্তু মুখ থেকে কখনো আহ্! উহ্! ধরনের চিৎকার ধ্বনি বেরিয়ে আসতো না। তাঁর নয়নমণি প্রিয়পুত্র যে মুহূর্তে দুনিয়া থেকে শেষবারের মত বিদায় নিচ্ছিলেন তখন বেদনায় তাঁর হৃদয় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়, কিন্তু মুখে কান্না ধ্বনি চিৎকার ইত্যাদির বদলে চক্ষুদ্বয় থেকে কেবল অশ্রুপাত ঘটতে থাকে।

নবী-এর এ নয়নমণি হযরত ইব্রাহীম (রা) উম্মুল মু'মিনীন মারিয়া কিবতিয়া (রা) -এর গর্ভে মদীনা মুনাওয়ারায় জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু দুগ্ধপানের সময়সীমা অতিক্রমের পূর্বেই তিনি ইন্তিকাল করেন। এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ১৮ মাস।

নবী-এর সর্বমোট তিনজন সাহেবজাদা ও চারজন সাহেবজাদী জন্মগ্রহণ করেন। পুত্রদের মধ্যে সর্বপ্রথম জন্মগ্রহণ করেন হযরত কাসিম (রা)। তিনি উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রা)-এর গর্ভে জন্ম নেন। তারপর তিনি যখন সবেমাত্র পা বাড়িয়ে হাঁটার বয়স পর্যন্ত পৌঁছেন তখন ইন্তিকাল করেন। দ্বিতীয় পুত্র হযরত আবদুল্লাহ্ (রা), তিনি মক্কা মুয়ায্যমায় জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই ইন্তিকাল করেন। আর তৃতীয় পুত্র ছিলেন এই হযরত ইব্রাহীম (রা)।

নবী-এর চারজন সাহেবজাদী ছিলেন। হযরত যায়নাব, হযরত রুকাইয়্যা, হযরত উম্মে কুলসূম ও হযরত ফাতিমাতুয যাহরা (রা)। হযরত ফাতিমাতুয যাহরা (রা)-এর মাধ্যমেই দুনিয়ায় তাঁর বংশের বিস্তার লাভ ঘটে। বিস্তারিত বিবরণের জন্য ইতিহাসের গ্রন্থাবলি দ্রষ্টব্য।

١٩٥ . عَنْ خَالِدِ بْنِ سَلَمَةَ الْمَخْزُومِيُّ لَمَّا أُصِيْبَ زَيْدُ بْنِ حَارِثَةَ انْطَلَقَ رَسُولُ اللَّهِ إِلَى مَنْزِلِهِ فَلَمَّا رَأَتْهُ ابْنَتُهُ جَهَشَّتْ فِي وَجْهِهِ فَانْتَحَبَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَقَالَ لَهُ بَعْضُ أَصْحَابِهِ مَا هَذَا يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ هُذَا شَوْقُ الْحَبِيْبِ إِلَى حَبِيْبِهِ -

১৯৫. হযরত খালিদ ইব্‌ন সালামা মাখযূমী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত যায়দ ইবন হারিসা (রা) যখন (মাসতার যুদ্ধে) শাহাদত বরণ করেন তখন রাসূলুল্লাহ্ তাঁর গৃহে যান। হযরত হারিসের কন্যা নবীকে দেখেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। নবী নিজেও তাঁর সাথে কাঁদতে শুরু করেন। তখন জনৈক সাহাবী আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এ কি ব্যাপার! (আপনি নিজেও কাঁদছেন?) নবী ইরশাদ করলেন : এটি হলো এক বন্ধুর প্রতি অপর বন্ধুর ভালবাসার আন্তরিক বহিঃপ্রকাশ।

ফায়দা : হযরত যায়দ ইব্‌ন হারিসা (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ্-এর অন্যতম প্রিয় সাহাবী। জাহেলী যুগে তিনি অপহৃত হন এবং গোলাম হিসাবে বিক্রি হয়ে যান। উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রা) তাঁকে খরিদ পূর্বক নবী-কে হাদিয়া হিসেবে দেন। নবী তাঁকে আযাদ করে দেন এবং নিজের পোষ্যপুত্র রূপে বরণ করেন। তিনি যায়দকে অতিশয় ভালবাসতেন। এমন কি যখন হযরত যায়দের পিতামাতা নিজ পুত্রের সন্ধান পেয়ে তাঁকে ঘরে ফিরিয়ে নিতে চাইলেন তখন হযরত যায়দ (রা) নবী-কে ত্যাগ করে আপন পিতামাতার সঙ্গে যেতে অস্বীকার করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি নবী-এর কাছে থাকাকেই পছন্দ করেন। তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মৃতার যুদ্ধে নবী তাঁকে সেনাপতি নিযুক্ত করে সিরিয়া অভিযানে প্রেরণ করেছিলেন। এ যুদ্ধে (৮ম হিজরীতে) তিনি শাহাদত লাভ করেন। তাঁর মৃত্যুতে নবীশোকে জর্জরিত হয়ে পড়েন। অতঃপর নবী সমবেদনা জ্ঞাপনের জন্য তাঁর কন্যার গৃহে গমন করলে ভালবাসা ও মানবিক কারণে তিনিও ক্রন্দন সংবরণ করতে পারেননি। তাঁর চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে শুরু করেছিলো। সাহাবীগণ তাঁর কাছে এ কান্নার কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, এ কান্নাকাটি বস্তুত মানুষের সহজাত একটি বিষয়। পরস্পরের প্রতি আন্তরিক ভালবাসা ও সম্পর্কের কারণে এটি হয়ে থাকে। এ হাদীসের মধ্যেও নবী থেকে যে কান্নাকাটি করার উল্লেখ পাওয়া যায় সেটিও নির্ধারিত সীমা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিলো। এতে চিৎকার দিয়ে কান্নাকাটি, অস্থিরতা ও বিলাপ করার নাম-গন্ধও নেই। তবে বিরহ যাতনা ও বিরহ বেদনার বহিঃপ্রকাশ ঘটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এতটুকু না হওয়া মানুষের কঠোর চিত্ততার পরিচায়ক। (অথচ কঠোর চিত্ততা, দয়া-মায়াহীনতা হলো মমত্ববোধের বিপরীত যা আল্লাহ্র কাছে পছন্দনীয় নয়।) তবে কান্নাকাটি করার মুহূর্তে সীমা অতিক্রম করা, চিৎকার কিংবা বিলাপ করা ইত্যাদি শরীয়ত বিরোধী ও নিষিদ্ধ। নবী -এর জীবন চরিতের প্রতিটি অধ্যায় উম্মতের জন্য শিক্ষণীয় ও অনুকরণীয়। তাঁর এই কর্মপদ্ধতি পরম যাতনা ক্লিষ্টতা ও ব্যথাতুর হওয়ার মুহূর্তে দুঃখ ও বেদনা প্রকাশের একটি সীমারেখা নির্ধারণ করে দিচ্ছে এবং ভারসাম্যপূর্ণ একটি পথের সন্ধান দিচ্ছে। এটিই ছিল সেই উন্নত ও মহান চরিত্র যাঁর ঘোষণায় মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন : (إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ) (হে রাসূল) নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত। (সূরা কালাম : ৪)

📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ 📄 নবী (সা)-এর কথাবার্তা বলার নীতি

📄 নবী (সা)-এর কথাবার্তা বলার নীতি


١٩٦ ، عَنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ قَالَ سَأَلْتُ خَالِى هِنْدًا قُلْتُ صِفْ لِي مَنْطِقَهُ؟ فَقَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مُتَوَاصِلَ الأَحْزَانِ دَائِمُ الْفِكْرِ، لَيْسَتْ لَهُ رَاحَةٌ لا يَتَكَلَّمُ فِي غَيْرِ حَاجَةٍ طَوِيلُ السِّكْتِ، يَفْتَتِحُ الْكَلَامَ وَيَخْتِمُهُ بِأَشْدَاقِهِ ، وَيَتَكَلَّمُ بِجَوَامِعِ الْكَلِمِ فَصْلاً لَا فُضُولَ فِيْهِ وَلَا تَقْصِيرَ دَمَثُ لَيْسَ بِالْجَافِي وَلَا بِالمَهِيْنِ يُعَظِمُ النِعْمَةَ وَإِنْ دُقَّتْ وَلَا يَذُمُّ مِنْهَا شَيْئًا، لَا تُغْضَبُهُ الدُّنْيَا وَمَا كَانَ لَهَا، فَإِذَا تَعُوطِي الْحَقَّ لَمْ يَعْرِفْهُ أَحَدٌ ، وَلَمْ يَقُمْ بِغَضَبِهِ شَيْ حَتَّى يَنْتَصِرَ لَهُ وَإِذَا أَشَارَ أَشَارَ بِكَفِّهِ كُلُّهَا وَإِذَا تَعَجَّبَ قَلْبُهَا ، وَإِذَا تَحَدَّثَ اتِّصَلَ بِهَا يَضْرِبُ بِرَاحَتِهِ الْيُمْنَى بَاطِنَ إِبْهَا مِهِ الْيُسْرَى -

১৯৬. হযরত হাসান ইব্‌ন আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার মামা হযরত হিন্দা ইব্‌ন আবূ হালা (রা)-কে নবী -এর কথাবার্তা বলার নীতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি বললেন, নবী তাঁর নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য মহান আল্লাহ্ পাকের সন্তুষ্টি মোতাবেক পালন করার চিন্তায় চির আত্মনিমগ্ন এবং উম্মতের সফলতা ও কল্যাণ চিন্তায় সর্বদা বিভোর থাকতেন। সামান্য পরিমাণের অস্থিরতাও তাঁর ছিলো না। কাজেই অধিকাংশ সময় তিনি চুপ থাকতেন, প্রয়োজন ব্যতিরেকে কোন কথা বলতেন না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কথা বলতেন খুবই স্পষ্টভাবে। তাঁর কথাগুলি ছিলো উপযুক্ত শব্দমালার দ্বারা গঠিত সৌষ্ঠবতাপূর্ণ বাক্য। এক বাক্য অন্য বাক্য থেকে পৃথক থাকতো। কথাগুলির মধ্যে না কোন অতিরিক্ত শব্দ থাকতো, আর না মর্ম প্রকাশে অক্ষম কোন শব্দ পাওয়া যেত। তিনি ছিলেন মিষ্টভাষী। কদর্যতা কিংবা রূঢ়তা তাঁর ভাষায় ছিলো না। আল্লাহ্ পাকের কোন নিয়ামত তা যতই ছোট হোক, তিনি এর খুবই কদর করতেন। কখনো তা হেয় কিংবা তুচ্ছ মনে করতেন না। জাগতিক কোন কাজ তাকে ক্রোধান্বিত করতো না, (কেননা তাঁর দৃষ্টিতে জাগতিক বিষয়াদির তেমন কোন গুরুত্ব ছিল না) আর জাগতিক কাজকর্ম ক্রোধ নিপাতের বস্তুও নয়। তবে সত্য ও ন্যায়ের উপর হস্তক্ষেপ করা হলে তার চেহারা এত পরিবর্তন হয়ে যেতো যে, কেউ তাঁকে তখন চেনা কঠিন হতো। আর সে মুহূর্তে তাঁর ক্রোধের সামনে দাঁড়িয়ে কোন বিষয় টিকতে সক্ষম হতো না; যতক্ষণ না তিনি অন্যায়ের প্রতিকার করতেন। তিনি যখন কারোর দিকে ইশারা করতেন তখন সম্পূর্ণ হাত দ্বারা ইশারা করতেন। (কেননা শুধু অঙ্গুলী দ্বারা ইশারা করা ভালো নয়।) তিনি কখনো কোন কাজে বিস্ময় প্রকাশ করলে হাত মুবারক ঘুরিয়ে নিতেন। কথা বলার সময় কখনো কখনো হাতও নাড়াচাড়া করতেন। এভাবে কখনো তিনি ডান হাতের তালু বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলের পেটের উপর মারতেন।

ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসটি অনেক দিক থেকে ব্যাপক একটি হাদীস। এ হাদীসে নবী -এর কথাবার্তা বলা, বলার ভঙ্গি ও ধরন, বাক্যের মিষ্টতা ও আকর্ষণ, মন-মানসিকতার স্বরূপ এবং কথাবার্তা বলার নীতি সম্পর্কীয় যাবতীয় বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ পেশ করা হয়েছে। এ হাদীসে নবী-এর কথাবার্তা বলার ধরন সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। তাঁর পবিত্র জীবনাদর্শের এ অংশটুকুর দ্বারা মানবীয় স্বভাব ও উন্নত নৈতিকতা- বোধের এমন একটি অধ্যায়ের সন্ধান মেলে যা সকল মুসলিমের জন্য জীবন-পাথেয় হওয়ার যোগ্যতা রাখে। হাদীসটির মধ্যে এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাগুলি পাওয়া যায়, যেগুলি থেকে উম্মতের শিক্ষা গ্রহণ বাঞ্ছনীয় সেগুলি হলো নিম্নরূপ:
তিনি বিনা প্রয়োজনে কথাবার্তা বলতেন না। নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন চিন্তায় সারাক্ষণ আত্ম-নিমগ্ন থাকতেন। উম্মতের সফলতা ও কল্যাণ লাভের চিন্তা সর্বদা তাঁকে বিভোর করে রাখতো। এ সকল গুরুত্বপূর্ণ কাজের চিন্তা-ভাবনার কারণে প্রয়োজনের মুহূর্তে যখন কথাবার্তা বলতেন তখন খুবই স্পষ্টভাষায় পরিষ্কারভাবে কথা বলতেন। কথার মধ্যে কোন মারপ্যাঁচ থাকতো না। কথাগুলি হতো সৌষ্ঠবতাপূর্ণ উপযুক্ত শব্দমালার দ্বারা সুগঠিত। বাক্যগুলি ছিলো যাচাইকৃত ও যথাযথ। তাতে অযথা শব্দ কিংবা দুর্বোধ্য শব্দের মিশ্রণ ছিলো না। শ্রোতাদের বুঝতে কষ্ট হয় এমন কোন সংযুক্ত বাক্য কিংবা অর্ধবাক্য তাঁর কথায় পাওয়া যেতো না। তাঁর কথাবার্তাগুলি হতো অতিশয় মিষ্ট, শ্রোতাদের মনে রাখার মতো এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ। গরিমা অহংকারবোধ কিংবা বাজারি অভদ্রতার কোন লেশমাত্রও তাঁর কথায় ছিলো না। কথাবার্তা বলা প্রসঙ্গে নবী-এর এই কয়েকটি বুনিয়াদী নীতিকে মানুষ যদি অনুসরণ করে তা হলে ইহকাল ও পরকালের সর্বত্র তাদের জন্য মান-সম্মান, প্রতিপত্তি ও বন্ধুত্ব এবং সার্বিক নিরাপত্তা অবধারিত।

১৯৭. عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ كَانَ إِذَا تَكَلَّمَ بِكَلِمَةٍ رَدَّدُهَا ثَلَاثًا وَإِذْ أَتَى قَوْمًا سَلَّمَ عَلَيْهِمْ ثَلَاثًا -

১৯৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ যখন (গুরুত্বপূর্ণ) কোন কথা বলতেন, তখন কথাটি তিনবার পুনরাবৃত্তি করতেন। আর যখন কোন সম্প্রদায়ের কাছে যেতেন তখন তাদেরকে তিনবার সালাম দিতেন (যেন প্রত্যেকে শুনতে পায়)।

ফায়দা: নবী করীম তাঁর উম্মতের প্রতি খুবই দয়ালু ও উদার ছিলেন। সে কারণে প্রিয় সাহাবাদেরকে তিনি যখন কোন গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতেন তখন তাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে কথাটি পুনঃ পুনঃ বলতেন যেন শ্রোতাদের সকলে কথাটি ভালভাবে শুনে নিতে এবং বুঝতে সক্ষম হয়। যেন অর্ধ কথা শোনে কিংবা মোটেই না শোনার কারণে কারোর মনে এমন ধরনের কোন খুঁতখুঁত ভাব অবশিষ্ট না থাকতে পারে যে, না জানি নবী কি কথাটি বলেছেন, কিংবা আমরাও যদি কথাটি শুনতে পেতাম! অনুরূপ তিনি কোথাও গেলে কিংবা কোন সম্প্রদায়ে তাঁর আগমন ঘটলে উপস্থিত লোকদেরকে তিনি তিনবার সালাম উচ্চারণ করতেন। এর কারণ ছিলো যেন সকলেই প্রিয় নবী -এর এই সালাম ও দু'আর কথাটি শুনতে পারে এবং আনন্দিত হতে পারে। কারোর মনে যেন এমন কোন দুঃখ অবশিষ্ট না থাকে যে, তিনি তো আমাদের সালাম প্রদানের দ্বারা কৃতার্থ করলেন না। এ বিষয়ে আরো আলোচনা সম্মুখস্থ হাদীসেও আসবে।

۱۹۸. أَخْبَرَنَا الزُّهْرِيُّ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ لَا يُسْرِدُ سَرْدَكُمْ هَذَا وَلَكِنَّ يَتَكَلَّمُ بِكَلَامٍ فَضْلٍ يَحْفَظُهُ مَنْهُ -

১৯৮. যুহরী (র) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ তোমাদের দ্রুত কথা বলার মত দ্রুতগতিতে কথা বলতেন না। তিনি কথাবার্তা বলতেন ধীরে ধীরে থেমে থেমে। তাঁর কথাগুলি এতো স্পষ্ট হতো যে, যে কোন ব্যক্তিই তা একবার শোনার দ্বারা মুখস্থ করে ফেলতো।

۱۹۹. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا عَنِ النَّبِيِّ ﷺ

১৯৯. হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেন।

۲۰۰. عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا حَدَّثَ بِحَدِيثٍ تَبَسَّمَ فِي حَدِيثِهِ -

২০০. হযরত আবূ দারদা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন কোনো কথা বলতেন তখন (মমত্ববোধের কারণে) কথা বলার মুহূর্তে তার ওষ্ঠাধারে স্মিত হাসির রেখা ফুটে থাকতো।

ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, নবী অতিশয় হাসিমুখে কথাবার্তা বলতেন। দম্ভপূর্ণ ও রূঢ় কথাবার্তা তাঁর জীবনে আদৌ ছিলো না।

۲۰۱ . عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ طَوِيلَ الصَّمْتِ -

২০১. হযরত জাবির ইবন সামুরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী অধিকাংশ সময় চুপ থাকতেন।

ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস প্রমাণ করে যে, বাচালতা ও বেশি কথা বলার তুলনায় স্বল্পভাষিতা ও কম কথা বলা অধিকতর ভালো অভ্যাস। নীরবতা ও মৌনতার মধ্যেই বস্তুত ইহকাল ও পরকালের মুক্তি ও কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এ কারণেই প্রিয় নবী -এর হাদীস-সমূহে এ বিষয়ের যথেষ্ট আলোচনা বিদ্যমান। যেমন ইরশাদ হচ্ছে, যে ব্যক্তি চুপ থাকে সে মুক্তি পায়। কোন সন্দেহ নেই যে, বাচালতা ও অনর্থক কথা বলা মানুষের জন্য নানা রকম বিপদের কারণ হয়ে। নবী -এর হাদীসে এ ধরনের বদ অভ্যাসের অনেক নিন্দা করা হয়েছে।

📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ 📄 নবী (সা)-এর পথচলা এবং চলার পথে এদিক-সেদিক দৃষ্টিপাত করার নীতি

📄 নবী (সা)-এর পথচলা এবং চলার পথে এদিক-সেদিক দৃষ্টিপাত করার নীতি


۲۰۲. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكِ كَانَ النَّبِيُّ الإِذَا مَشَى كَأَنَّهُ يَتَوَكَّا -

২০২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন পথ চলতেন তখন মনে হতো তিনি যেন (লাঠি কিংবা অন্য কোন জিনিসের উপর) ভর দিয়ে পথ চলছেন। (অর্থাৎ তিনি সম্মুখের দিকে ঝুঁকে পথ চলতেন।)

، قَالَ كَانَ رَسُولُ الله ﷺ إِذَا مَشَى تَكَفَّا - ۲۰۳ . عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ الله الله

২০৩. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হাঁটার সময়ে রাসূলুল্লাহ্ সম্মুখের দিকে ঝুঁকে পথ চলতেন।

٢٠٤ عَنْ عَاصِمِ بْنِ لَقِيْطِ بْنِ صَبُرَةَ عَنْ أَبِيْهِ أَنَّهُ أَتَى عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا هُوَ وَصَاحِبُ يَطْلُبَانِ النَّبِيُّ الله فَلَمْ يَجِدَاهُ فَلَمْ يَنْشَبْ أَنْ جَاءَ النَّبِيُّ يَتَقَلْعُ يَتَكَفَّ -

২০৪. হযরত আসিম ইব্‌ন লাকীত ইব্‌ন সাবুরা (রা) তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি (হযরত আসিমের পিতা) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-এর খেদমতে উপস্থিত হন। এ সময় তিনি ও তাঁর এক সাথী উভয়ে নবী -কে খুঁজছিলেন। কিন্তু তারা নবী -কে উপস্থিত পাননি। তারা কিছুক্ষণ পরেই নবী এমন অবস্থায় আগমন করলেন যেন তিনি (মাটিতে পা টেনে চলার পরিবর্তে) মাটি থেকে পা তুলে তুলে সম্মুখের দিকে ঈষৎ ঝুঁকে হাঁটছেন।

٢٠٥ . عَنْ أَبِي عِنَبَةَ الْخَوْلَانِيَّ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ إِذَا مَشَى أَقْلَعَ -

২০৫. হযরত আবূ ইনাবা খাওলানী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন হাঁটতেন তখন মাটি থেকে সবলে পা তুলে তুলে হাঁটতেন।

٢٠٦ . عَنْ عَلِيٍّ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ إِذَا مَشَى تَكَفَّأُ تَكَفِّيًا كَأَنَّمَا يَتَقَلَّعُ مِنْ صَبَبٍ لَمْ أَرَ قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ مِثْلَهُ الصَّبَبُ الْمُنْحَدِرُ مِنَ الْأَرْضِ -

২০৬. হযরত আলী ইব্‌ন আবু তালিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর নিয়ম ছিলো তিনি যখন পথ চলতেন তখন সম্মুখের দিকে ঝুঁকে ঝুঁকে চলতেন। (আপাত দৃষ্টিতে মনে হতো) তিনি যেন সবলে পা উত্তোলন পূর্বক ঢালু জায়গা দিয়ে অবতরণ করছেন। আমি তাঁর মত (গুণাবলি সম্পন্ন) মানুষ না পূর্বে কখনো দেখেছি আর না পরে। আরবী ভাষায় 'الصبب.' শব্দের অর্থ হলো ঢালুভূমি।

۲۰۷ . عَنْ رَبِيعَةَ قَالَ دَخَلْنَا عَلَى أَنَسِ بْنِ مَالِكَ فَسَأَلْنَا عَنْ صِفَةِ النَّبِيِّ فَقَالَ كَانَ إِذَا مَشَى كَأَنَّمَا يَمْشِي فِي صَبَب -

২০৭. হযরত রাবীয়া (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা হযরত আনাস ইব্‌ন মালিক (রা)-এর দরবারে গেলাম এবং তাঁকে নবী -এর অনুপম গুণাবলি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। উত্তরে তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন পথ চলতেন তখন তিনি যেন কোনো ঢালু ভূমি দিয়ে চলছেন। (অর্থাৎ চলার পথে তাঁর হাঁটার গতি ছিল কিছুটা দ্রুত।)

ফায়দা : উপরোক্ত হাদীসসমূহে নবী -এর পথ চলার নিয়মনীতি বর্ণনা করা হয়েছে। এ সকল হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, তাঁর পথ চলার মধ্যে তিন ধরনের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিলো :

এক. তিনি নম্রতা অবলম্বনের লক্ষ্যে সম্মুখের দিকে ঝুঁকে চলতেন। অহংকারসুলভ বুকটান করে হাঁটতেন না। (তবে যুদ্ধের ময়দানে মুজাহিদগণের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম রয়েছে। কেননা তাদের ব্যাপারে নির্দেশ হলো কাফিরদের মুকাবিলায় বিনয় ও নম্রতার প্রকাশ নয়; বরং নিজেদের শক্তি, বীরত্ব ও অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার প্রকাশ করা আবশ্যক।)

দুই. নবী পথ চলার সময় মাটি থেকে পা তুলে তুলে সবল পুরুষের মত হাঁটতেন। অলস ও খোঁড়ার মত মাটিতে পা টেনে চলতেন না। কেননা এটি অপছন্দনীয় ও দোষের।

তিন. তিনি তুলনামূলকভাবে দ্রুত চলতেন। খুব ধীর গতিতে অলসের মত কিংবা মেয়েলি চলন তাঁর ছিলো না।

দীন ইসলামের হেফাযতকারীগণ যেভাবে নবী-এর অন্যান্য গুণ, বৈশিষ্ট্য, নীতি ও চরিত্রের আমলী সংরক্ষণ করেছেন তদ্রূপ তাঁর চাল-চলন ও হাঁটার পদ্ধতিও তাঁরা যথার্থভাবে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। তাঁরা নবী এর ছোট থেকে ছোট কোন গুণ কিংবা কোন অভ্যাসকে উপেক্ষা করেননি। বস্তুত এটি সাহাবায়ে কিরামের এমন এক কৃতিত্ব যার উপমা ইতিহাসের কোনো কালেও দেখা যায় না। এটি নবী-এর শেষ নবী হওয়ার এত প্রকৃষ্ট দলীল যা কেউই অস্বীকার করতে পারে না। অর্থাৎ যে ভাবে রাসূলুল্লাহ্-এর রিসালাত ও নবুওয়াতের যাবতীয় বিষয় কিয়ামত পর্যন্ত সময়কালের জন্য সংরক্ষিত হয়ে আছে, সেভাবে তাঁর আকার-আকৃতি, চাল-চলন, উঠা-বসা ইত্যাদির পদ্ধতিও যথাযথভাবে সংরক্ষিত। আর এভাবেই অনাগত ভবিষ্যত বংশধরের জন্য নবী-এর মহান সত্তা একটি সমুজ্জ্বল আদর্শ হয়ে অটুট থাকবে।

۲۰۸. عَنْ جَابِرٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ إِذَا خَرَجَ مَشَى أَصْحَابُهُ أَمَامَهُ وَتَرَكُوا ظَهْرَهُ لِلْمَلَائِكَةِ -

২০৮. হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন বাড়ির বাহির হতেন তখন সাহাবায়ে কিরাম তাঁর আগে আগে চলতেন। তাঁরা নবী -এর পশ্চাৎদিক ফেরেস্তাগণের চলার জন্য ছেড়ে দিতেন।

ফায়দা : অন্যান্য হাদীসে বলা হয়েছে যে, নবী-এর সঙ্গে ফেরেস্তাগণও হেঁটে থাকেন। এ ফেরেস্তাগণ হাঁটতেন নবী-এর পেছনে পেছনে। এ কারণেই সাহাবীগণ বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য রাখতেন এবং নিজেরা তাঁর পশ্চাৎ দিকে হাঁটতেন না। বরং পশ্চাৎ দিকটি ফেরেস্তাগণের জন্য ছেড়ে দিয়ে নিজেরা আগে আগে হাঁটতেন। তাছাড়া আরো কতিপয় হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী নম্রতা ও বিনয় অবলম্বনের লক্ষ্যেও নিজে লোকজনের আগে আগে চলাকে পছন্দ করতেন না। বরং নিজে পেছনে থেকে সাহাবীদেরকে আগে আগে চলতে দিতেন।

۲۰۹. عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَسُولُ اللهِ ﷺ كَانَ إِذَا مَشَى مَشَى مَشْيَا مُجْتَمِعًا لَيْسَ فِيْهِ كَسْلٌ -

২০৯. হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ যখন হাঁটতেন তখন পা তুলে সবল পুরুষের মত হাঁটতেন। তাঁর হাঁটার মধ্যে কোনরূপ আলস্য ও কুঁড়েমির লেশমাত্রও ছিল না।

٢١٠. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كُنَّا إِذَا آتَيْنَا النَّبِيَّ ﷺ جَلَسْنَا خَلْفَهُ -

২১০. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা যখন নবী -এর দরবারে উপস্থিত হতাম তখন আমরা তাঁর পেছনে বসে যেতাম।

٢١١. عَنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ قَالَ سَأَلْتُ هِنْدَ ابْنَ أَبِي هَالَةَ عَنْ مَشْيِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ كَانَ يَمْشِي تَكَفَّيًا وَيَخْطُوْ هَوْنًا ذَرِيعَ الْمَشْيَةِ إِذَا مَشَى كَأَنَّمَا يَتَصَبَّبُ أَوْ يَمْشِي فِي صَبَبِ إِذَا الْتَفَتَ الْتَفَتَ جَمِيْعًا، خَافِضَ الطَّرْفِ نَظْرُهُ إِلَى الْأَرْضِ أَكْثَرُ مِنْ نَظْرِهِ إِلَى السَّمَاءِ جُلُّ نَظَرِهِ الْمُلَاحَظَةُ يَسُوقُ أَصْحَابَهُ وَيَبْدَا مَنْ لَقِيَهُ بِالسَّلَام -

২১১. হযরত হাসান ইব্‌ন আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত হিন্দ ইব্‌ন আবূ হালা (রা)-এর কাছে নবী-এর পথচলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি বললেন, নবী সামান্য ঝুঁকে পথ চলতেন। গাম্ভীর্য ও ঔদার্য রক্ষাপূর্বক তিনি পা তুলতেন। তাঁর পথ চলায় ঈষৎ দ্রুততা ছিলো। চলার সময় মনে হতো তিনি যেন ঢালু ভূমি দিয়ে অবতরণ করছেন। কিংবা বর্ণনাকারী বলেছেন, তিনি যেন কোনো ঢালু ভূমিতে হাঁটছেন। এভাবে তিনি যখন কারোর দিকে দৃষ্টিপাত করতেন তখন সম্পূর্ণভাবে তার দিকে ফিরে তিনি দৃষ্টিপাত করতেন। (পথ চলার সময়) তাঁর চোখের দৃষ্টি যমীনের দিকে অবনমিত থাকতো। এ জন্য আসমানের দিকে তাকানো অপেক্ষা যমীনের দিকে তাঁর দৃষ্টি অধিক থাকতো। অধিকাংশ সময় তিনি চোখের পার্শ্বদেশ দিয়ে তাকাতেন। (লজ্জাশীলতার কারণে) পূর্ণচোখে তাকানো পছন্দ করতেন না। পথচলার সময় সাহাবীদেরকে এভাবে আগে আগে হাঁটতে দিতেন যেন নিজে পেছন থেকে তাদের পরিচালনা করছেন। পথিমধ্যে কারো সঙ্গে দেখা হলে সর্বাগ্রে তিনিই সালাম দিতেন।

ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসেও নবী-এর পথচলার নীতি আলোচনা করা হয়েছে। পূর্বে উল্লেখিত হাদীসের তুলনায় আলোচ্য হাদীসে কতিপয় অতিরিক্ত গুণের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমনঃ

১. নবী অধিকাংশ সময় চোখের দৃষ্টি অবনমিত করে রাখতেন। এদিক সেদিক তাকাতেন না। সাধারণত মাটির দিকেই পতিত থাকতো তাঁর দৃষ্টি। কখনো কখনো আকাশের দিকে দৃষ্টি তুলে তাকাতেন কিন্তু তা ছিলো ওহী লাভের অপেক্ষায়।

২. তিনি যখন কারোর দিকে তাকাতেন তখন অতিশয় লজ্জাশীলতার কারণে কখনো পূর্ণচোখে তাকাতেন না। বরং একপার্শ্ব দিয়ে তাকাতেন।

৩. তিনি যেহেতু কিছুটা দ্রুত চলতেন তাই সাহাবীদেরকে নিজের সামনে হাঁটতে দিতেন। ফলে তারাও যেন সমান্তরালে দ্রুত চলেন এবং তাদের কেউ যেন পিছিয়ে না পড়েন। সাথে সাথে এ ভাবে পেছনে চলার মধ্যে নিজের নম্রতা ও বিনয়ের প্রকাশও উদ্দেশ্য ছিল। দাম্ভিক ও অহংকারীদের ন্যায় সকলের আগে আগে চলাকে তিনি পছন্দ করতেন না। অপর হাদীসে বলা হয়েছে যে, সাহাবীগণ নবী -এর আগে আগে চলার মধ্যে আরো একটি গূঢ় রহস্য ছিল এই যে, তার পশ্চাৎ দিকটি ফেরেস্তাদের হাঁটার জন্য রক্ষিত হতো। হাদীসটিতে বলা হয়েছে, নবী -এর পশ্চাদদিকে ফেরেস্তাগণ হাঁটেন। উভয় বর্ণনার মধ্যে কোন বৈপরীত্য নেই। একটি কাজের পেছনে একাধিক রহস্য বিদ্যমান থাকা বিচিত্র নয়। বিশেষত নবী -এর কাজকর্মসমূহ অগণিত হিকমত ও রহস্যপূর্ণ ছিল। আর তিনি শ্রেষ্ঠ নবী হিসাবে এমনটাই হওয়া বাঞ্ছনীয়।

৪. নবী -এর নিয়ম ছিলো তিনি যখনই কারোর সাক্ষাতে যেতেন তখন সালাম দানে নিজেই অগ্রবর্তী থাকতেন। মহান আল্লাহ্ এ মহান নবী ﷺ ও তাঁর বংশধরের প্রতি অগণিত ও অসংখ্য দরূদ ও সালাম নাযিল করুন। আমীন!

۲۱۲. عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ يُسْرِ صَاحِبُ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ إِذَا أَتَى الْمَنْزِلَ لَمْ يَأْتِهِ مِنْ قَبْلِ الْبَابِ وَلَكِنْ يَأْتِيهِ مِنْ قِبْلِ جَانِبُهِ حَتَّى يَسْتَأْذِنَ -

২১২. নবী -এর সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন বুস্র (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন কারো বাড়ি যেতেন তখন দরজার ঠিক সম্মুখে দাঁড়াতেন না বরং এক পার্শ্বে দাঁড়াতেন। (যেন অজান্তে গৃহবাসীদের উপর দৃষ্টি পতিত না হয়) আর অনুমতি পাওয়া ব্যতিরেকে গৃহে প্রবেশ করতেন না।

ফায়দা : উপরোক্ত হাদীস হলো অনুমতি চাওয়া বিষয়ক। রাসূলুল্লাহ্ -এর নীতি ছিলো তিনি যখন কারোর বাড়ি যেতেন তখন সতর্কতা অবলম্বনের জন্য সেই বাড়ির দরজা বরাবর হয়ে প্রবেশ করতেন না, বরং এক পার্শ্ব বরাবরে প্রবেশ করতেন। উদ্দেশ্য ছিলো যেন অজান্তে গৃহবাসীদের উপর তার দৃষ্টি গিয়ে না পড়ে। তারপর গৃহকর্তার পক্ষ থেকে অনুমতি লাভের পর তিনি গৃহে প্রবেশ করতেন। আলোচ্য হাদীসে আরো বলা হয়েছে যে, তিনি 'আস্সালামু আলাইকুম' বলে প্রবেশ করতেন। তিনি এ সালামকেও একাধিকবার পুনরাবৃত্তি করে বলতেন, যেন ঘরের লোকজন তা ভালভাবে শুনতে পায়।

কারোর গৃহে প্রবেশ করার পূর্বে অনুমতি নেয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে অত্যাবশ্যক। অনুমতি ব্যতীত কারো গৃহে প্রবেশ জায়েয নয়। অবশ্য নিজের ঘরে যখন অপর কোন গায়র মুহাররাম মহিলা নেই বলে নিশ্চিতভাবে জানা থাকে তখন অনুমতি ব্যতিরেকে প্রবেশ করতে কোন আপত্তি নেই। এতদসত্ত্বেও উত্তম হলো নিজের ঘরেও অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করা।

দ্বিতীয়ত: ঘরে প্রবেশ করার সময় 'আস্সালামু আলাইকুম' বলা চাই। এটি ঘরে উপস্থিতদের জন্য সালামতী ও নিরাপত্তার একটি দু'আ। অপরের গৃহে প্রবেশের জন্য তিনবার পর্যন্ত অনুমতি প্রার্থনা করা যেতে পারে। তৃতীয়বারেও যদি কোন উত্তর না পাওয়া যায় কিংবা অনুমতি না মিলে তখন ফিরে আসা চাই।

۲۱۳. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كَانَ أَبْوَابُ النَّبِيِّ تُقَرَّعُ بِالْأَطْفَارِ -

২১৩. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর গৃহের দরজাগুলিতে আঙ্গুলের অগ্রভাগ দ্বারা টোকা দেওয়া হতো।

ফায়দা: এ হাদীস দ্বারা ঘরের দরজায় টোকা দেয়ার নীতি সম্পর্কে জানা যায়। ঘরের দরজায় টোকা দেওয়ার সময় ভারসাম্য বজায় রাখা আবশ্যক। জোরে জোরে দরজায় ধাক্কা দেওয়া কিংবা আঘাত করা ভদ্রতা ও আদবের খেলাফ। তাতে গৃহবাসী লোকজনের মনকষ্ট হয়ে থাকে। টোকা দেওয়ার উত্তম পদ্ধতি হলো আগন্তুক প্রথমে মুখে আওয়াজ করবে। আওয়াজ ঘরের ভিতর পর্যন্ত না পৌঁছার আশংকা থাকলে সেখানে আস্তে আস্তে টোকা দিবে।

٢١٤ . عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ أَنَّهُ سَمِيعَ أَبَا ذَرِّ يَصِفُ النَّبِيُّ ﷺ قَالَ كَانَ يَطَأُ بِقَدَمَيْهِ لَيْسَ لَهُ أَخْمَصَ يَقْبُلُ جَمِيعًا وَيَدْبُرُ جَمِيعًا ، لَمْ أَرَمِثْلَهُ -

২১৪. হযরত সাঈদ ইব্‌ন মুসাইয়্যাব (রা) বলেন, তিনি হযরত আবূ যার গিফারী (রা)-কে নবী-এর নিয়ম-নীতি ও গুণাবলি বর্ণনা করতে শুনেছেন যে, নবী তাঁর পা যুগল উপরে তুলে এভাবে হাঁটতেন যেন তাঁর পায়ের কোন তালুই ছিলো না। তিনি (সামনে অগ্রসর হতে চাইলে) পূর্ণভাবে অগ্রসর হতেন। আবার (পেছনের দিকে যেতে ইচ্ছা করলে) পূর্ণভাবে পেছনে সরে যেতেন। আমি কখনো তাঁর মত কোন মানুষকে দেখিনি।

ফায়দা: পা তুলে হাঁটার অর্থ হলো তিনি মাটির উপর পা স্থাপন করতেন। কিন্তু স্থাপনের পর কোনরূপ বিলম্ব না করেই তৎক্ষণাৎ এমনভাবে পা তুলে নিতেন যে, মনে হতো পায়ের তালুদ্বয়কে মাটিতে পূর্ণভাবে স্পর্শ করতেই দেননি। আসলে তাঁর পায়ের তালু (মাটি থেকে) সামান্য উপরে উঠা অবস্থায় থাকতো। এটিও এক ধরনের পৌরুষ সুলভ সৌন্দর্য।

٢١٥ عَنْ أَبِي الطُّفَيْلِ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ إِذَا مَشَى كَأَنَّمَا يَمْشِي فِي صُبُوب -

২১৫. হযরত আবূ তুফায়েল (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন হাঁটতেন তখন মনে হতো তিনি কোন ঢালু ভূমিতে হাঁটছেন।

ফায়দা: আলোচ্য হাদীসের বিষয়ে প্রাসঙ্গিক কথাবার্তা অনুচ্ছেদের শুরুভাগে আলোচিত হয়েছে। নবী-এর পবিত্র সত্তা মাথা থেকে পা পর্যন্ত ছিলো দিব্যি মুজিযাপূর্ণ। এ জন্য তাঁর পথ চলার নীতির মধ্যেও অতিপ্রকৃত বিষয়ের ন্যায় কতিপয় অলৌকিক পদ্ধতি বিদ্যমান ছিলো। যেমন :

এক, তিনি কিছুটা দ্রুতবেগে হাঁটতেন। অথচ তিনি দ্রুতবেগে হাঁটার মোটেই ইচ্ছা করতেন না। এদিকে সাহাবীদের অবস্থা ছিলো নবী -এর সঙ্গে দ্রুতগতিতে হাঁটতে হাঁটতে তাঁরা হাঁপিয়ে পড়তেন। আর এ কারণেই তিনি নিজে সাহাবীদের পেছনে হাঁটতেন যেন তাঁরা নবী -এর সঙ্গ থেকে পেছনে দূরে রয়ে না যান।

দুই, তিনি সম্মুখের দিকে ঝুঁকে দৃঢ় পদে একজন পুরুষের ন্যায় হাঁটতেন। মাটির উপর পায়ের তালুর স্পর্শ লাগতে দিতেন না। এমন কি হযরত আবূ যার গিফারী (রা) তাঁর বর্ণনায় বলেন, لَيْسَ لَهُ أَخْمَصَ প্রিয় নবী -এর পায়ের তালু ছিলোই না। বর্ণিত রহস্যটি সম্মুখে না রাখা হলে নবী -এর হাঁটা সম্পর্কীয় উভয় উক্তির মাঝে সমন্বয় সৃষ্টি করা জটিল হবে। এ কারণেই হযরত আবূ যার (রা) আরো বলেন, لَمْ أَرَى مِثْلَهُ আমি তাঁর ন্যায় কোন মানুষকে দেখিনি।

তিন, তিনি সমতল ভূমিতে এভাবে হাঁটতেন যেন কোনো ঢালু যমীন দিয়ে নিচের দিকে অবতরণ করছেন। উপরোক্ত রহস্য জানা না থাকলে পথ চলার এই অলৌকিক পদ্ধতিটিও হৃদয়ঙ্গম করা কঠিন। এ কারণে হযরত আলী (রা) স্পষ্টভাবে বলতে বাধ্য হন যে, لَمْ اَزَل قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ مِثْلُهُ আমি নবী -এর ন্যায় পূর্বে আর না তাঁর পরে তাঁর গুণাবলীর কোনো মানুষকে দেখেছি।

কাজেই আমরাও সম্মানিত পাঠক বৃন্দের কাছে আবেদন করবো যে, নবী -এর পবিত্র আকার-আকৃতি সম্পর্কীয় হাদীসসমূহ বিশেষত তাঁর পথচলা সম্পর্কীয় হাদীসগুলি অধ্যয়ন করার সময় একথাটি অবশ্যই সামনে রাখতে হবে যে, যেভাবে তাঁর মহান সত্তা মাথা থেকে পা পর্যন্ত সবটুকু ছিলো অলৌকিক। ঠিক তেমনি তার পথ চলার বিষয়টিও ছিলো একটি অলৌকিক ব্যাপার। হযরত আলী ও হযরত আবূ যার (রা) প্রমুখ উচ্চমানের সাহাবী যাঁরা নবী -কে খুবই নিকট থেকে পর্যবেক্ষণ করার সৌভাগ্য লাভ করেছেন তাঁরাও নিজেদের বক্তব্যে সেই রহস্যের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px