📄 উম্মতের প্রতি নবী (সা)-এর সহানুভূতি সম্পর্কিত রিওয়ায়াতসমূহ
١٥٦ عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيُّ الله كَانَ يَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ وَهُوَ فِي الصَّلَاةِ فَيَقْرَا بِالسُّورَةِ الْقَصِيرَةِ وَالسُّورَةِ الْخَفِيفَةِ -
১৫৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ সালাতরত অবস্থায় যখন কোন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতেন তখন (শিশুটির মায়ের মনে কোন অস্থিরতার সৃষ্টি হতে পারে এ আশংকায় তিনি সালাত সংক্ষিপ্ত করে) ছোট একটি আয়াত কিংবা ছোট একটি সূরা তিলাওয়াতের মাধ্যমে সালাত শেষ করে নিতেন।
١٥٧ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ وَأَبِي سَعِيدِ الْخُدْرِى قَالَا صَلَّى بِنَا رَسُولُ اللهِ ﷺ صَلَاةَ الْغَدَاةِ وَسَمِعَ بُكَاءَ الصَّبِيِّ فَخَفَّفَ الصَّلَاةَ، فَقِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ ﷺ خَفَّقْتَ هَذِهِ الصَّلاةَ الْيَوْمَ فَقَالَ إِنِّي سَمِعْتُ بُكَاءَ صَبِي فَخَشِيْتُ أَنْ يَفْتِنَ أُمُّهُ -
১৫৭. হযরত আবূ হুরায়রা ও হযরত আবু সাঈদ খুদ্রী (রা) থেকে বর্ণিত, তাঁরা বলেন, একবার নবী আমাদেরকে নিয়ে ফজরের সালাত পড়ছিলেন। সালাত পড়ানো কালে তাঁর কানে একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ পৌঁছল। নবী তখন সালাত সংক্ষিপ্ত করে দেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো যে, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আজ আপনি সালাতকে এতটুকু সংক্ষিপ্ত করলেন? উত্তরে তিনি ইরশাদ করেন, আমি সালাতরত অবস্থায় যখন কোন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনি তখন আমার আশংকাবোধ হয়, হয়ত শিশুটির মা সালাতরত অবস্থায় পেরেশানীতে পড়বে। (এ কারণে আমি সালাত সংক্ষিপ্ত করে দিয়েছি।)
ফায়দা : উল্লিখিত হাদীসদ্বয়ের অর্থ সুস্পষ্ট। গ্রন্থকার এখানে উম্মতের প্রতি নবী -এর মনে কতটুকু মায়া ও ভালবাসা ছিল এবং তাদের প্রতি তিনি কতটুকু দরদ ও সহানুভূতি পোষণ করতেন তার বর্ণনা পেশ করেছেন। এ ধরনের হাদীসগুলি থেকে বোঝা যায় যে, নবী তাঁর উম্মতের জন্য কতখানি মায়া ও ভালবাসা এবং কতখানি দরদ ও সহানুভূতি রাখতেন। ফজরের সালাতে দীর্ঘ কিরাআত পাঠ করা মুস্তাহাব। এটিই ছিল ফজরের সালাতে নবী -এর নিয়ম। কিন্তু তিনি একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনে কেবল এ কারণে যে, এই শিশু ও শিশুটির সালাতরত মায়ের মনে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে সে জন্য নিজের নিয়ম ভঙ্গ করে সালাত সংক্ষিপ্ত করে নিতেন। যেন সালাত দীর্ঘ হওয়ার কারণে শিশু ও শিশুর মাকে অস্থির হতে না হয়।
বস্তুত মানবীয় গুণাবলির মধ্যে মায়া-মমতা একটি মহৎ গুণ এবং আল্লাহ্ তা'আলার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয় একটি অভ্যাস। এর পরিধি অনেক ব্যাপক। মায়া-মমতা ও ভালবাসার সম্পর্ক কেবল নিজের পরিবার-পরিজন ও সন্তান-সন্ততির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সকল প্রিয়জন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, অধস্তন কর্মচারী, শিষ্য ও গুরু নির্বিশেষে সকল সৃষ্ট জগতের সঙ্গে জড়িত। স্বজনদের সঙ্গে হোক আর পরজনদের সঙ্গে হোক মানুষ যখন এ মায়া-মমতাকে নিজের আদর্শ ও অভ্যাসে পরিণত করে এবং সৃষ্ট জীবের সহিত সর্বদা কোমল আচরণ করেন তখন তিনি নিজেও যেমন শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারেন তেমনি অন্যদের জন্যও শান্তি ও আনন্দপূর্ণ জীবন যাপনের কারণ হিসাবে পরিগণিত হন। এ ধরনের সদাচার দ্বারা গোটা সমাজের মধ্যে পারস্পরিক মায়া-মমতা, ভ্রাতৃত্ব, মান-সম্মান রক্ষা ও কল্যাণ কামনার এমন একটি সুন্দর পরিবেশ গড়ে উঠে যা আল্লাহ্ পাকের নিকট খুবই পছন্দনীয়। আর যে ব্যক্তির কারণে এ পরিবেশ গড়ে উঠে তিনি আল্লাহ্ পাকের বাণী ‘ سَبَقَتْ رَحْمَتِى عَلَى غَضَبِي )আমার দয়া ও অনুগ্রহ আমার ক্রোধ ও গযবের উপর প্রবল হয়ে থাকে)-এর প্রকাশস্থল হিসাবে হন। আমাদের পরম অনুগ্রহকারী সারা বিশ্বের রহমত নবী তাঁর নিম্নোক্ত বাণীতে আমাদেরকে এদিকে পথনির্দেশ করেছেন।
হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ্র নিকট থেকে নম্রতা ও কোমল আচরণ নীতির পরিপূর্ণতা লাভে সক্ষম হয়েছে সে ইহকাল ও পরকাল উভয় জাহানের সকল কল্যাণের পূর্ণতা লাভ করেছে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মায়া-মমতা ও কোমল আচরণ গুণ থেকে বঞ্চিত সে ইহকাল ও পরকাল উভয় জাহানের যাবতীয় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত।” (ইমাম বাগাভী (র) সংকলিত শারহুস্ সুন্নাহ্)।
١٥٨ عَنْ مَالِكِ بْنِ الْحُوَيْرِثِ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ وَ رَحِيمًا رَفِيقًا أَقْمَنَا عِنْدَهُ عِشْرِينَ لَيْلَةً فَظَنَّ إِنَّا قَدْ اسْتَقْنَا فَسَأَلَنَا عَمَّنْ تَرَكْنَاهُ مِنْ أَهْلِنَا فَأَخْبَرْنَاهُ فَقَالَ النَّبِيُّ ارْجِعُوا إِلَى أَهَالِيْكُمْ فَأَقِيمُوا فِيهِمْ .
১৫৮. হযরত মালিক ইবন হুয়ায়রিস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ছিলেন অতিশয় কোমল-প্রাণ, অতীব দয়ালু ও সহানুভূতিশীল। আমরা স্বগোত্রীয় একটি প্রতিনিধি দলের সাথে বিশ দিন পর্যন্ত তাঁর সান্নিধ্যে অবস্থান করেছিলাম। তখন তাঁর মনে হলো, হয়তো আমাদের মনে বাড়ি ফিরে যাওয়ার আগ্রহ সৃষ্টি হয়ে থাকবে। কাজেই তিনি আমাদেরকে ডাকলেন এবং বাড়িতে আমাদের কারা কারা আছে জিজ্ঞেস করলেন। আমরা তাঁকে বিস্তারিত জানালাম। তখন তিনি ইরশাদ করেন : এবার তোমরা নিজ নিজ পরিবার- পরিজনের কাছে ফিরে যাও এবং সেখানেই স্থায়িভাবে অবস্থান কর (এবং দীনের প্রচার ও প্রসারের কাজ করে যাও)।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায় যে, নবী লোকজনের মানসিক অবস্থার প্রতি কতটুকু সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। তা ছাড়া আরো বোঝা যায় যে, মানুষের জন্য তাঁর প্রাণে কতটুকু দয়া ও মমতা বিদ্যমান ছিল। আর এ কারণেই পবিত্র কুরআনে তাঁকে رَحْمَةُ الْعَالَمِينَ' উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। স্বয়ং তিনি তাঁর নিজের ব্যাপারে ইরশাদ করেছেন: أَنَا رَحْمَةُ مُهْدَاةُ -আমি সৃষ্ট জাহানের হিদায়েতের জন্য প্রেরিত রহমত।' সুবহানাল্লাহ্!
١٥٩ عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ وَإِذَا فَقَدَ الرَّجُلُ مِنْ إِخْوَانِهِ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ سَأَلَ عَنْهُ فَإِنْ كَانَ غَائِباً دَعَا لَهُ وَإِنْ كَانَ شَاهِدًا زَارَهُ وَإِنْ كَانَ مَرِيضًا عَادَهُ -
১৫৯. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যদি একাধারে তিনদিন কোন মুসলিম ভাইয়ের সাক্ষাৎ না পেতেন তা হলে তার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। সে যদি সফরে আছে বলে জানতেন তাহলে তার জন্য দু'আ করতেন। আর যদি সে (মদীনায়) উপস্থিত থাকতো (অথচ কোন অপারগতার কারণে হাজির হতে পারছে না) তা হলে তিনি নিজে তার সাক্ষাতের জন্য যেতেন। আর যদি লোকটি অসুস্থ বলে জানতেন তা হলে তিনি সেখানে গিয়ে তার সেবা-শুশ্রূষা করতেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, নবী নিজের সঙ্গী ও পরিচিতদের সাথে কতখানি স্নেহপূর্ণ ও আন্তরিক, মনজয় ও খোঁজ-খবরের আচরণ করতেন। নবুওয়াতের গুরু দায়িত্ব পালনে সর্বদা ব্যাপৃত ও মশগুল থাকা সত্ত্বেও তিনি উপস্থিত ও অনুপস্থিত প্রতিটি সঙ্গীর ব্যাপারে পূর্ণ খবরাখবর রাখতেন এবং প্রত্যেকের জন্য উদার আচরণ প্রদর্শন করতেন। নবী-এর এই উন্নত চরিত্র মাধুরী বর্বর নির্মম আরব জাতির অন্তরে এমন প্রীতি ও মমতার সৃষ্টি করেছিল যার উপমা জগতের কোথাও পাওয়া যায় না। সাহাবীগণ তাঁর জন্য ছিলেন নিবেদিত-প্রাণ। ঘোরতর যুদ্ধ চলাকালে তাঁরা নবী-কে আড়ালে রেখে শত্রুর সকল তীর নিজেদের বুক পেতে নিতেন। নবী-এর যেকোন আহ্বানে তাৎক্ষণিক 'লাব্বায়ক' (আমি হাজির, আমি হাজির) বলে সাড়া দিতেন। মহান আল্লাহ্ আমাদের সকলকে এই মহান নবী-এর অনুপম স্বভাব-চরিত্র এবং তাঁর সুন্দরতম রীতি-নীতি ও কাজকর্মের পূর্ণ অনুসরণের শক্তি দান করুন।
١٦٠. عَنْ عَلِيِّ بْنِ حُسَيْنِ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ صَلَّى صَلَاةً فَعَجَلَ فِيْهَا، فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ إِنَّمَا عَجَلْتُ أَنِّي سَمِعْتُ صَبِيًّا يَبْكِي فَخَشِيْتُ أَنْ يَشُقَّ ذَلِكَ عَلَى أَبْوَيْهِ
১৬০. হযরত আলী ইব্ন হুসাইন (রা) থেকে বর্ণিত যে, একবার নবী সালাত পড়ালেন এবং সালাত খুব দ্রুত শেষ করলেন। তারপর বললেন: আমি সালাত ত্বরা করে শেষ করার কার হলো যে, সালাতে আমি যখন কোন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনি তখন আমার আশঙ্কা হয় যে, শিশুটির এ কান্নার দরুন তার মাতাপিতার মনে কোন কষ্টের উদ্রেক না হয়।
١٦١. عَنْ أَنَسٍ أَنَّ أَعْرَابِيًّا أَتَى النَّبِيَّ ﷺ فَسَأَلَهُ وَعَلَيْهِ بُرْدٌ فَجَذَبُهُ فَشَقَّ الْبُرْدَ حَتَّى بَقِيْتِ الْحَاشِيَةُ فِي عُنُقِ النَّبِيِّ ﷺ فَأَمَرَ لَهُ النَّبِيُّ ﷺ بِشَيْ
১৬১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক বেদুঈন নবী -এর দরবারে হাজির হয়ে কিছু প্রার্থনা করল। নবী একটি চাদর পরিহিত ছিলেন। লোকটি প্রার্থনার আতিশয্যে তাঁর চাদর ধরে এত জোরে টান দিলো যে, চাদরটি ফেঁড়ে গিয়ে একপার্শ্ব নবী-এর কাঁধের উপর ঝুলতে থাকে। নবী লোকটির এই (অসৌজন্যমূলক) আচরণ সত্ত্বেও তাকে কিছু দান করতে নির্দেশ দেন।
ফায়দা: আলোচ্য হাদীসের অর্থ সুস্পষ্ট। এ হাদীস থেকে অনুমান করা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ নিজের উম্মতের প্রতি কতটুকু দয়ালু এবং কতটুকু ক্ষমাশীল ছিলেন। একজন রুক্ষ প্রকৃতির বেদুঈন যে প্রার্থনা করতেও শিখেনি তারপর আবার দু'জাহানের সরদার মহানবী-এর সাথে এহেন অসৌজন্যমূলক আচরণ যা কেবল তাঁরই মান মর্যাদা হানিকর ময় বরং যেকোন ভদ্রলোকের পক্ষেও অসহনীয়। কিন্তু নবী এই রুক্ষ লোকটির সাথে ক্ষমাশীলতা এবং দয়াপূর্ণ আচরণ করেন; যেভাবে তিনি অন্য লোকদের সাথে আচরণ করে থাকেন। বস্তুত উন্নত চরিত্রের এই সুউচ্চ আসন তিনি ব্যতিরেকে অন্য কোন মানুষের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। একমাত্র তাঁরই পবিত্র সত্তা এই পদমর্যাদার পরিপূর্ণ ধারক। এ কারণে কুরআনে হাকীমের মধ্যে তাঁর সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে : إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ (হে নবী) নিশ্চয়ই আপনি উন্নত চরিত্রের অধিকারী। আল্লাহ্ তা'আলা আমাদের সকলকে উন্নত চরিত্র অবলম্বনের তাওফীক দান করুন। আমীন!
١٦٢. عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ قَالَ بَعَثَنِي رَسُولُ اللهِ ﷺ إِلَى الْيَمَنِ فَقَالَ يَا مُعَاذُ إِذَا كَانَ فِي الشَّتَاءِ فَغَلِسُ بِالْفَجْرِ وَاطِلِ الْقِرَاءَةَ قَدْرَ مَا يُطِيقُ النَّاسُ وَلَا تُمِلْهُمْ ، فَإِذَا كَانَ الصَّيْفُ فَأَسْفِرُ بِالْفَجْرِ فَإِنَّ اللَّيْلَ قَصِيرٌ وَالنَّاسِ يَنَامُوْنَ فَأَمْهِلْهُمْ حَتَّى يَدَارَكُوا -
১৬২. হযরত মুআয ইবন জাবাল (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাকে ইয়ামেনে (গভর্নর নিযুক্ত করে) পাঠালেন এবং বলেন, হে মুআয! শীতের মৌসুমে তুমি ফজরের সালাত শুরু ওয়াক্তে পড়াবে। আর সালাতে কিরাআত এতটুকু দীর্ঘ করবে যতটুকু লোকজনের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হয়। অতিশয় দীর্ঘ কিরাআতের কারণে মানুষের মনে যেন বিরক্তি না আসে। আর গরমের মৌসুমে তুমি ফজরের সালাত শেষ ওয়াক্তে পড়াবে। কেননা (গরম কালে) রাত ছোট হয়ে থাকে মানুষের ঘুম শেষ হয় না। কাজেই তাদেরকে এতটুকু সুযোগ দেবে যাতে তারাও সালাতে অংশগ্রহণে সক্ষম হয়।
ফায়দা: আলোচ্য হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ যেভাবে জাগতিক সকল কাজে উম্মতের প্রতি দয়া ও কোমলতার আচরণ করতেন অনুরূপ ইবাদত বন্দেগী ইত্যাদি আদায়ের ক্ষেত্রেও তিনি তাদের জন্য সহজসাধ্য পদ্ধতি অবলম্বনের প্রতি দৃষ্টি রাখতেন। সহ্য করা যায় না এমন কোন কঠোরতার দরুন ইবাদত করতে তাদের মনে যেন বিরক্তি না আসে সে জন্য তিনি সচেতন থাকতেন। এমন কি তিনি সালাতের মত উচ্চমানের ইবাদত, যার ব্যাপারে নিজেই ইরশাদ করেছেন যে, "আমার নয়নের প্রশান্তি হলো সালাত," ব্যাপারেও তিনি সহজলভ্যতা ও সহজসাধ্যতার নীতি পালনের নির্দেশ দিতেন। শীত ও গরমের মৌসুম এবং রাত দিন ছোট বড় হওয়ার প্রতি দৃষ্টি রাখার পেছনে এটিই হলো মূল রহস্য—যেন কঠোরতা দেখে শংকিত হয়ে কেউ দীনাদারী ও ইবাদত বন্দেগী ছেড়ে না বসে। আল্লাহ্ তা'আলা এই দীনের বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করে ইরশাদ করেন : وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّيْنِ مِنْ حَرَجٍ مِنْةَ أَبِيْكُمْ إِبْرَاهِيمَ এই দীনের মাঝে সংকীর্ণতার কোন কিছু নেই, এটি তোমাদের ঊর্ধ্বতন পুরুষ ইব্রাহীমের দীন" (সূরা হাজ্জ : ৭৮)
١٦٣. عَنْ جَابِرٍ قَالَ غَزَا رَسُولُ اللهِ ﷺ إِحْدَى وَعِشْرِينَ غَزْوَةٌ بِنَفْسِهِ، شَهِدْتُ تِسْعَ عَشْرَةَ غِبْتُ عَنِ اثْنَتَيْنِ، فَبَيْنَا أَنَا مَعَهُ فِي بَعْضٍ غَزَوَاتِهِ إِذَا أَعْنِي فَأَضْحَى تَحْتَ اللَّيْلِ فَبَرَكَ وَكَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فِي آخِرِنَا فِي أُخْرَيَاتِ النَّاسِ فَيَزْجِي الضَّعِيفَ وَيَرْدِفُ وَيَدْعُولَهُمْ فَانْتَهَى إِلَى وَأَنَا أَقُولُ يَا لَهَفَ أَمْتَاهُ وَمَا زَالَ لَنَا نَاضِحَ سُوْءٍ، فَقَالَ مَنْ هُذَا ؟ قُلْتُ أَنَا جَابِرُ بِأَبِي وَأُمِّي يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ مَا شَأْنُكَ ؟ قُلْتُ أَعْيِي نَاضِحْي فَقَالَ أَمَعَكَ عَصًا قُلْتُ نَعَمْ فَضَرَبَهُ ثُمَّ بَعَثَهُ ثُمَّ أَنَاخَهُ وَوَطِئَ عَلَى ذِرَاعِهِ وَقَالَ ارْكَبُ فَرَكِبْتُ فَسَايَرْتُهُ فَجَعَلَ جَمَلِي يَسْبِقُهُ فَاسْتَغْفَرَ لِي تِلْكَ اللَّيْلَةَ خَمْسًا وَعِشْرِينَ مَرَّةً - فَقَالَ لِي مَا تَرَكَ عَبْدُ اللَّهِ مِنْ الْوَادِ ؟ يَعْنِي آبَاهُ قُلْتُ سَبْعَ نِسْوَةٍ قَالَ أَتَرَكَ عَلَيْهِ دَيْنَا قُلْتُ نَعَمْ قَالَ فَإِذَا قَدِمْتَ الْمَدِينَةَ فَقَاطِعُهُمْ فَإِنْ أَبَوْا فَإِذَا حَضَرَ جِدَادَ نَخْلِكُمْ فَاذِنِي وَقَالَ لِي هَلْ تَزَوَّجْتَ ؟ قُلْتُ نَعَمْ قَالَ بِمَنْ ؟ قُلْتُ بِفَلَانَةِ بِنْتِ فُلَانٍ بِأَيِّمٍ كَانَتْ بِالْمَدِينَةِ قَالَ فَهَلاً فَتَاة تُلاعِبُهَا وَتُلاعِبُكَ ؟ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ كُنَّ عِنْدِي نِسْوَةٌ خَرَقَ يَعْنِي أَخْوَاتُهُ فَكَرِهْتُ أَنْ أَتَيْهِنَّ بِامْرَأَةٍ خَرْقَاءَ ، فَقُلْتُ هَذِهِ أَجْمَعُ الأَمْرِي قَالَ فَقَدْ أَصَبْتَ وَرَشَدْتَ فَقَالَ بِكُمْ اَشْتَرَيْتَ جَمَلَكَ قُلْتُ بِخَمْسٍ أَوَاقٍ مِنْ ذَهَبٍ قَالَ قَدْ أَخَذْنَاهُ ، فَلَمَّا قَدِمَ الْمَدِينَةَ أَتَيْتُهُ بِالْجَمَلِ فَقَالَ يَا بِلالُ : أَعْطِهِ خَمْسَ أَوَاقٍ مِنْ ذَهَبٍ يَسْتَعِينُ بِهَا فِي دَيْنِ عَبْدِ اللَّهِ وَزِدْهُ ثَلَاثًا وَارْدُدْ عَلَيْهِ جَمَلَهُ ، قَالَ هَلْ قَاطَعْتَ غُرْمَاءَ عَبْدِ اللَّهِ ؟ قُلْتُ لَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ أَتَرَكَ وَفَاء ؟ قُلْتُ لَا قَالَ لَا عَلَيْكَ إِذَا حَضَرَ جِدَادَ نَخْلِكُمْ فَاذِنِي فَاذِنْتُهُ فَجَاءَ فَدَعَا لَنَا فَاسْتَوْفِي كُلِّ غَرِيم مَا كَانَ يَطْلُبُ تَمَرًا وَفَاء وَبَقِيَ لَنَا مَا كَنَّا نَجِدُ وَأَكْثَرَ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ارْفَعُوا وَلَا تَكِيلُوا فَرَفْعَنَا فَأَكَلْنَا مِنْهُ زَمَانًا .
১৬৩. হযরত জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ একুশটি যুদ্ধে স্বয়ং অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে উনিশটিতেই আমি শামিল থাকি। অবশিষ্ট দু'টির মধ্যে উপস্থিত ছিলাম না। একবার আমি নবী -এর সঙ্গে যুদ্ধে যাত্রা করেছিলাম। এমন সময় রাত্রিকালে আমার উটটি হাঁটতে অক্ষম হয়ে পড়ল। নবী পেছনের লোকজনের সাথে আমাদের পেছনে আসছিলেন। পেছনের লোকজনের সাথে তাঁর আসার উদ্দেশ্য ছিল এই যে, তিনি পেছন থেকে দুর্বলদেরকে চলতে সাহায্য করতেন, প্রয়োজনের মুহূর্তে তাদেরকে নিজের বাহনে আরোহণ করিয়ে নিতেন এবং দুর্বলদের জন্য দু'আ করতে থাকতেন। (পথ চলতে চলতে আমিও পেছনে পড়ে গিয়েছিলাম) তিনি যখন আমার কাছে আসলেন আমি তখন নিজের দুর্বলতা ও অক্ষমতার দরুন নিজে নিজেকে তিরস্কার করছিলাম। হায়! আমার মায়ের বিনাশ! কেননা আমার উট অক্ষম হয়ে গিয়েছে। এ সময় নবী জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনার প্রতি আমার মাতাপিতা কুরবান হোক, আমি জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্। তিনি বললেন, তোমার কি হয়েছে? আমি বললাম আমার উটটি (ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে বসে গেছে আর দাঁড়াচ্ছে না)। তিনি বললেন, তোমার হাতে (হাঁকিয়ে নেওয়ার কোন) লাঠি আছে কি? আমি বললাম, জী হ্যাঁ, আছে।
তখন তিনি লাঠির সাহায্যে উটটিকে প্রহার করলেন, এটি দাঁড়াল। তারপর পুনরায় উটটিকে বসিয়ে সম্মুখের পা দু'টি সজোরে চিপে দিলেন। তারপর আমাকে বললেন, যাও, আরোহণ কর। আমি উটটির পিঠে আরোহণ করলাম এবং চালাতে থাকলাম। দেখলাম, নবী -এর মুবারক হাতের স্পর্শের কারণে আমার উটটি তাঁর উট থেকেও আগে আগে চলতে শুরু করেছে। নবী সে রাতে আমার পঁচিশবার মাগফিরাতের দু'আ করেন। তারপর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পিতা আবদুল্লাহ মৃত্যুকালে কতজন সন্তান রেখে গিয়েছেন? আমি বললাম, সাত কন্যা। তিনি বললেন, তার উপর কি কিছু ঋণও ছিল? আমি বললাম, জী হ্যাঁ। তিনি বললেন, এবার মদীনায় ফিরে গিয়ে ঋণদাতাদের সাথে একটা ফয়সালা করে নিও। তারা যদি তোমার ফয়সালা মানতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে খেজুর আহরণের মৌসুমে তুমি আমাকে সংবাদ দিবে। তারপর তিনি আমার প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি বিবাহ করেছ? আমি বললাম, জী হ্যাঁ। তিনি বললেন, কাকে বিবাহ করেছ? আমি বললাম, অমুকের বিধবা কন্যা। তারা মদীনাতেই বসবাস করে। তিনি বললেন, কোনো কুমারীকে বিয়ে করলে না কেন? তাহলে সে তোমার জন্য এবং তুমি তার জন্য অধিকতর মনস্তুষ্টি ও ভালবাসার কারণ হতে। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্। আমাদের ঘরে অনভিজ্ঞ কুমারীরা আছে। (অর্থাৎ আমার ছোট বোনেরা সকলে কুমারী) কাজেই আমি তাদের সমবয়সের আরেকজন কুমারীকে ঘরে আনা পছন্দ করিনি। আমি সিদ্ধান্ত করেছিলাম কোন একজন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মহিলাকে ঘরে আনা হলে আমার পারিবারিক কাজকর্মে অধিকতর কল্যাণজনক প্রমাণিত হবে। নবী বললেন, তাহলে তুমি ঠিক কাজ করেছ এবং উত্তম পথ অবলম্বন করেছ। তারপর নবী আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, এ উট তুমি কত মূল্যে খরিদ করেছিলে? আমি বললাম, পাঁচ উকিয়া স্বর্ণের বিনিময়ে। তিনি বললেন, উটটি আমি তোমার কাছ থেকে খরিদ করে নিলাম। এরপর মদীনা শরীফ পৌঁছে আমি উটটি নবী-এর খেদমতে পেশ করে দেই। তিনি হযরত বিলালকে ডেকে বললেন, বিলাল তুমি জাবিরকে পাঁচ উকিয়া স্বর্ণ পরিশোধ কর। সে (তার পিতা হযরত) আবদুল্লাহ্র ঋণ শোধে এ অর্থ ব্যয় করবে। তাকে আমার পক্ষ থেকে অতিরিক্ত আরো তিন উকিয়া স্বর্ণ দিয়ে দিবে এবং তাকে তার উটটিও ফিরিয়ে দিবে।
তারপর নবী আমাকে বললেন, তুমি তোমার পিতা আবদুল্লাহ্র ঋণদাতাদের সঙ্গে কথাবার্তা ঠিক করেছ কি? আমি বললাম, জী না। নবী বললেন, আবদুল্লাহ্ কি এতটুকু সম্পদ রেখে গেছে যা দিয়ে ঋণ শোধ করা সম্ভব? আমি বললাম, জী না। তিনি বললেন, ঠিক আছে কোন অসুবিধা হবে না। তোমাদের বাগানে খেজুর আহরণের সময় ঘনিয়ে এলে আমাকে সংবাদ দিও। সে মতে আমি (সময়মত) নবীকে স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি আগমন করলেন এবং আমাদের জন্য দু'আ করলেন। (তাঁর সে দু'আর বরকতে) খেজুর থেকে ঋণদাতা সকলের পাওনা পরিপূর্ণভাবে শোধ করে দেওয়া হলো। তারপর আমাদের হাতে সেই পরিমাণ খেজুর অবশিষ্ট রয়ে গেল যতটুকু আমরা অন্যান্য বছর আহরণ করতাম। এমনকি অবশিষ্ট অংশ অন্যান্য বছরের তুলনায় পরিমাণে কিছু বেশিও ছিল। তারপর নবী আমাকে বললেন, এ খেজুরগুলি ঘরে নিয়ে যাও। তবে দেখ এগুলিকে পরিমাপ করবে না। সে মতে আমার উক্ত খেজুর বহুদিন পর্যন্ত খেতে থাকি।
ফায়দা: আলোচ্য হাদীসে প্রিয় নবী-এর দু'টি মুজিয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। একটি হলো, তাঁর দু'আর বরকতে ক্লান্ত হয়ে পড়া অক্ষম একটি উট পুনরায় শক্তি লাভ করে এবং দ্রুত গতিতে চলতে আরম্ভ করে। আর অপরটি হলো, তাঁর বরকতে সামান্য পরিমাণের খেজুর এত অধিক পরিমাণের হলো যে, তা থেকে সকল ঋণ পরিশোধ করেও অতিরিক্ত রয়ে গেল। এমন কি অন্যান্য মৌসূমে যে পরিমাণ খেজুর জাবির (রা) বাগান থেকে পেতেন তার চেয়েও বেশি রয়ে গেল।
উল্লেখিত হাদীসটি বর্ণনা করা গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হলো উম্মতের প্রতি প্রিয় নবী -এর মমত্ববোধ ও আন্তরিকতার দৃষ্টান্ত পেশ করা। বিশেষত তিনি সহায়-সম্বলহীন দরিদ্র মানুষের সাথে কতটুকু সহানুভূতি প্রদর্শন এবং তাদেরকে কত সাহায্য করতেন এ কথার প্রমাণ পেশ করা। এ হাদীসে সুস্পষ্ট বিবরণ বিদ্যমান যে, প্রিয় নবী হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ্ (রা)-কে কেবল মৌখিকভাবেই সহানুভূতি প্রদর্শন করে ক্ষান্ত হননি বরং তাঁর পিতার রেখে যাওয়া ঋণ পরিশোধের জন্য আর্থিকভাবেও সাহায্য করেন। তিনি তাঁর বাগানে উৎপাদিত খেজুরে বরকতের জন্য দু'আ করেন। ফলে আল্লাহ্ পাক তাঁর ঋণসমূহ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন। অধিকন্তু তাঁর পরিবারের আহারের জন্য তাঁর কাছে যথেষ্ট পরিমাণে উদ্বৃত্তও থেকে যায়।
বর্ণিত হাদীসের ঘটনাটির মধ্যে সমবেদনা ও আর্থিক সাহায্যের এ বিষয়টি মনস্তত্বের দিক থেকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষামূলক। এখানে দু'জাহানের রহমত প্রিয় নবী হযরত জাবির (রা)-এর মন থেকে অনুগ্রহ প্রাপ্তির বোঝা লাঘব করার উদ্দেশ্যে নামমাত্র মূল্যে তাঁর উটটি খরিদ করেন-যেন হযরত জাবির (রা)-কে এ উটের মূল্য গ্রহণে কোন সংকোচ বোধ না করেন। তাছাড়া মদীনায় পৌঁছে উটের মূল্য প্রদানের সময় অতিরিক্ত আরো তিন উকিয়াসহ বিক্রীত উটটিও তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বস্তুত হযরত জাবিরের উট খরিদ করা প্রিয় নবী-এর উদ্দেশ্য ছিল না। এ কারণে জাবির (রা) যখন উটের দ্বারা মদীনা পৌঁছা পর্যন্ত আরোহণ করার শর্ত আরোপ করেন তখন মহানবী সেই শর্ত মেনে নেন। অথচ বাহ্যিকভাবে এ ধরনের শর্তারোপ নিষিদ্ধ। কেননা অন্য হাদীসে বলা হয়েছে, نَهَى عَنْ بَيْرٍ وَشَرْطَ নবী শর্তের সাথে কোন বেচাকেনা করতে নিষেধ করেছেন কাজেই যেহেতু প্রিয় নবী -এর মূল উদ্দেশ্য উট খরিদ করা নয়, বরং উদ্দেশ্য ছিল উটের দাম বলে হযরত জাবিরকে আর্থিক সাহায্য করা। আর একারণেই তিনি উপরোক্ত শর্ত মেনে নিতে কোন দ্বিধা প্রকাশ করেন নি। তারপর মদীনা পৌঁছে তিনি কেবল উটের মূল্যই নয় বরং উটসহ অতিরিক্ত আরো তিন উকিয়া স্বর্ণ তাকে প্রদান করেন। এভাবে এ উম্মতের জন্যও কর্তব্য যে, তারা যখন নিজেদের কোন অভাবী ঋণগ্রস্ত ভাইয়ের আর্থিক সাহায্য করার ইচ্ছা করবেন তখন এমন পন্থা অবলম্বন করবেন যার ফলে অভাবী ব্যক্তি সাহায্য গ্রহণ করতে সংকোচবোধ না করেন এবং যথাসম্ভব অভাবী লোকটি অনুগ্রহ ভাজন হওয়ার বোঝা থেকে যেন হাল্কা রাখেন।
١٦٤. عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ وَاللَّهِ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ إِنْ كُنْتُ لَاشُدُّ الْحَجَرَ عَلَى بَطْنِي مِنَ الْجُوعِ وَإِنْ كُنْتُ لَاعْتَمِدُ بِيَدَيَّ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْجُوعِ وَلَقَدْ قَعَدْتُ يَوْمًا عَلَى طَرِيقِهِمْ الَّذِي يَخْرُجُونَ فِيهِ فَمَرَّ بِي أَبُو بَكْرٍ فَسَأَلْتُهُ عَنْ آيَةٍ مِنْ كِتَابِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مَا أَسْأَلُهُ عَنْهَا إِلَّا لِيَسْتَبْتَعْنِي فَمَرَّ وَلَمْ يَفْعَلْ ، ثُمَّ مَرَّ عُمَرُ فَسَأَلْتُهُ عَنْ آيَةٍ مِنْ كِتَابِ اللَّهِ مَا سَأَلْتُهُ إِلَّا لِيَسْتَبْتَعَنِي فَمَرَّ وَلَمْ يَفْعَلْ ثُمَّ مَرَّ أَبُو الْقَاسِمِ ﷺ فَعَرَفَ مَا فِي نَفْسِي وَمَا فِي وَجْهِي فَتَبَسَّمَ وَقَالَ أَبَا هُرَّ الْحَقِّ فَاتَّبَعْتُهُ فَدَخَلَ فَاسْتَأْذِنَتْ فَأَذِنَ لِي فَوَجَدَ لَبَنًا فِي قَدْحٍ فَقَالَ لِأَهْلِهِ أَنَّى لَكُمْ هُذَا اللَبَنُ ؟ قَالُوا أَهْدَاهُ لَكَ فُلَانُ، فَقَالَ يَا أَبَاهُرْ انْطَلِقِ إِلَى أَهْلِ الصُّفَةِ فَادْعُهُمْ لِي قَالَ فَاحْزَنَنِي ذَلِكَ وَأَهْلُ الصُّفَّةِ أَصْيَافُ الْإِسْلَامِ لَا يَاوُونَ إِلَى أَهْلِ وَلَا مَالٍ إِذَا جَاءَتْهُ أَرْسَلَ بِهَا إِلَيْهِمْ وَلَمْ يَزْرَا مِنْهَا شَيْئًا وَإِذَا جَاءَتْهُ هَدْيَةُ أَرْسَلَ إِلَيْهِمْ فَاشْرَكَهُمْ فِيهَا فَأَصَابَ مِنْهَا قَالَ فَأَحْزَنَنِي إِرْسَالُهُ إِيَّايَ وَقُلْتُ أَرْجُو أَنْ أَشْرَبَ مِنْ هَذَا اللَّبْنِ شَرْبَةً أَتَغَدَّى بِهَا فَمَا يُغْنِي عَنِّي هُذَا اللَّبَنُ فِي أَهْلِ الصُّفَةِ وَأَنَا الرَّسُولُ ، فَإِذَا جَاؤُا أَمَرَنِي فَكُنْتُ أَنَا أعَاطِيْهِمْ وَلَمْ يَكُنْ مِنْ طَاعَةِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَطَاعَةِ رَسُولِهِ بُدٌّ ، فَانْطَلَقْتُ إِلَيْهِمْ فَدَعَوْتُهُمْ فَأَقْبَلُوا فَاسْتَأْذَنُوا فَأَذِنَ لَهُمْ فَأَخَذُوا مَجَالِسَهُمْ مِنَ الْبَيْتِ ، وَقَالَ آبَاهُرُ قُلْتُ لَبَّيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ قُمْ فَأَعْطِهِمْ فَاخَذِ الْقَدْحَ فَاعْطِي الرَّجُلَ حَتَّى يَرْوِي ، ثُمَّ يَرُدُّهُ إِلَى حَتَّى رَوِيَ جَمِيعُ الْقَوْمَ فَانْتَهَيْتُ إِلَى رَسُولِ اللهِ ﷺ فَأَخَذَ الْقَدْحَ فَوَضَعَهُ عَلَى يَدَيْهِ ثُمَّ رَفَعَ رَأْسَهُ فَنَظَرَ إِلَى فَتَبَسَّمَ وَقَالَ أَقْعُدْ فَقَعَدْتُ فَشَرِبْتُ وَقَالَ أَشْرَبْ ، رال يَقُولُ اشْرَبْ حَتَّى قُلْتُ وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ مَا أَجِدُ لَهُ مَسْلَكًا ، قَالَ فَارْنِي فَرَدَدْتُ إِلَيْهِ الإِنَاءَ فَحَمِدَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ شَرِبَ مِنْهُ -
১৬৪. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সেই পবিত্র সত্তার কসম! যিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই যে, আমি (অনেক সময়) ক্ষুধার তাড়নায় নিজের পেটের উপর পাথর বেঁধে রাখতাম। আর (কোন কোন সময়) এই ক্ষুধাজনিত কষ্টের কারণে নিজের দু'হাত দ্বারা মাটির উপর ভর দিয়ে বসে থাকতাম। আল্লাহর শপথ, একদিন এমন হয়ে গিয়েছিলো যে, (মসজিদে নববী থেকে) বেরিয়ে যাওয়ার পথের উপর বসে পড়ি। (যেন আমার ক্ষুধার্ত অবস্থা কারোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে) এ সময় হযরত আবূ বক্র সিদ্দীক (রা) আমার নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি তাঁকে শুধু এ উদ্দেশ্যে যে, তিনি আমাকে সঙ্গে করে (ঘরে) নিয়ে যাবেন এবং কিছু খেতে দিবেন-পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু তিনি আমার প্রকৃত ইচ্ছা কিছুই উপলব্ধি করলেন না। (প্রশ্নটির জবাব দিয়ে) চলে গেলেন। আমাকে আর সঙ্গে করে নিলেন না। অতঃপর (এ পথ দিয়ে) হযরত উমর ইবন খাত্তাব (রা)-এর আগমন ঘটল। আমি তাঁকেও এ উদ্দেশ্য নিয়ে কুরআনে পাকের একটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। (এ আশায় যে) তিনি হয়ত আমাকে সঙ্গে করে ঘরে নিয়ে যাবেন। কিন্তু তিনি আমার প্রকৃত মনোভাবটি উপলব্ধি করলেন না। প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চলে গেলেন। আমাকে আর সঙ্গে করে নিলেন না। এরপর রহমতে আলম আবুল কাসিম এ পথে আগমন করলেন। তিনি আমার চেহারা দেখেই আমার অন্তরের ভাষা উপলব্ধি করে নেন। তিনি স্মিত হেসে বললেন, আবূ হির, আস, আমার সঙ্গে চল। আমি নবী -এর পিছু পিছু চললাম। তিনি উম্মুল মু'মিনীনদের একজনের ঘরে প্রবেশ করলেন। আমি বাহির থেকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে ভিতরে ডেকে নেন। এ সময় তিনি ঘরে এক পেয়ালা দুধ রক্ষিত আছে দেখলেন। জিজ্ঞেস করলেন, এ দুধ তোমার কাছে কোথা থেকে এসেছে? ঘরওয়ালারা বললেন, অমুক ব্যক্তি আপনার জন্য হাদিয়া পাঠিয়েছে। নবী তখন আমাকে বললেন, হে আবূ হির! যাও সুফফার সকলকে ডেকে আনো। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, এ কথা শুনে আমি বড় চিন্তায় পড়ে গেলাম। কেননা আহলে সুফফার সকলেই ইসলাম ও مسلمانوں মেহমান। তাদের কারোর না আছে কোন ঘরবাড়ি আর না কোন পরিবার-পরিজন। সাদাকার যে সকল জিনিস প্রিয় নবীর কাছে আসতো তিনি তা তাদের জন্য পাঠিয়ে দিতেন। তিনি নিজের জন্য এ থেকে কিছুই রাখতেন না। আর তাঁর কাছে যদি হাদিয়ার কোন কিছু আসতো তাহলে সকলকে ডেকে এনে নিজের সঙ্গে আহার করাতেন। তখন প্রিয় নবী নিজেও আহার করতেন, সঙ্গে অন্যরাও আহার করতো। (মোট কথা আহলে সুফ্ফার লোকেরা প্রায়ই অভুক্ত অবস্থায় দু'জাহানের রহমত নবী-এর অপেক্ষায় বসে থাকতেন।) আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, কাজেই নবী-এর আমাকে তাদের ডেকে আনতে পাঠানোর বিষয়টি আমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিলো। আমি মনে মনে ভাবলাম, আশা তো করেছিলাম আমি এ দুধটুকু পান করে কিছুটা স্বস্তি লাভ করবো। কিন্তু আহলে সুফফার সকলের সাথে এই এক পেয়ালা দুধের কতটুকু আমার ভাগ্যে আসবে। আবার যেহেতু আমিই তাঁদেরকে ডেকে আনছি, কাজেই তারা যখন আসবে নবী তখন আমাকেই সকলের মাঝে দুধ বণ্টন করে দিতে নির্দেশ দিবেন। (আমি নিজে রয়ে যাবো সকলের শেষে। কাজেই আমার জন্য কিছু অবশিষ্ট থাকবে কিনা বলা যায় না।)
কিন্তু আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ পালন ব্যতিরেকে কোন গত্যন্তরও নেই। এসব ভেবে আমি সুফাবাসীদের কাছে গেলাম। তাদেরকে ডাকলে তারা সকলে আসলেন। তারপর নবী -এর গৃহে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করলে তিনি অনুমতি দেন। সকলে নিজ নিজ আসনে বসার পর নবী আমাকে বললেন, হে আবূ হির! আমি বললাম, লাব্বাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তিনি বললেন, দাঁড়াও সকলকে একের পর এক দুধের এই পেয়ালা থেকে পান করতে দাও। সে মতে আমি পেয়ালাটি একজন থেকে নিয়ে অন্যজনকে পৌঁছিয়ে দিতে থাকি। তারা প্রত্যেকে তৃপ্তি ভরে পান করার পর পেয়ালা আমাকে ফেরত দিতেন। এভাবে পালাক্রমে আহলে সুফ্ফার সকলেই পেট পূর্ণ করে পান করার পর আমি পেয়ালাটি নিয়ে প্রিয় নবীর কাছে উপস্থিত হই। তিনি পেয়ালাটি নিজের সামনে রাখলেন। তারপর মাথা উপরে তুলে আমার দিকে তাকালেন এবং স্মিত হেসে বললেন, বসে পড়ো। আমি বসে গেলাম। তিনি বললেন, এবার তুমি পান করো। সে মতে আমি পেটভরে দুধ পান করলাম। তিনি পুনরায় আমাকে বললেন, পান করো। ফলে আমি আবার পান করি। (এভাবে তিনি বারবার আমাকে বলতে থাকেন আর আমি পান করতে থাকি।) অবশেষে আমি বললাম, কসম সেই সত্তার! যিনি আপনাকে সত্যসহ নবী বানিয়ে পাঠিয়েছেন, এক ঢোক পরিমাণ দুধ পান করার মতও কোন জায়গা খালি নেই। তিনি বললেন, ঠিক আছে পেয়ালাটি আমাকে দাও। আমি পেয়ালাটি প্রিয় নবীর হাতে তুলে দিলে তিনি মহান আল্লাহ্র প্রশংসা জ্ঞাপন করলেন এবং নিজেও সেই পেয়ালা থেকে পান করলেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসে প্রিয় নবী-এর এমন অত্যাশ্চর্য একটি মুজিযার বর্ণনা করা হয়েছে যা মানবীয় বুদ্ধি ও উপলব্ধির সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে। এক পেয়ালা দুধ নবী-এর বরকতে এবং তাঁর হাতে প্রকাশিত মুজিযা হিসাবে এত অধিক পরিমাণ হয়েছে যে, ষাট কিংবা সত্তর জন ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত মানুষের একটি দল তা থেকে তৃপ্তিভরে পান করার পরও তা শেষ না হওয়া মানুষের বুদ্ধির অগম্য। বস্তুতঃ মাক্সারে এ ধরনের আরো হাজার হাজার মুজিযা প্রিয় নবী-এর বরহক নবী হওয়ার কারণ করে। হযরত আবূ হুরায়রা (রা), যাকে আহলে সুফ্ফার এক পর্যায়ের নাযিম বলা চলে তিনিও মাত্র এক পেয়ালা দুধে এত সংখ্যক মানুষের জন্য যথেষ্ট হওয়ার বিষয়টি কল্পনা করতে পারেন নি। নিজে নিজের অস্থিরতা ও ব্যাকুলতার অবস্থা অতিশয় সরলতার সাথে ব্যক্ত করে দেন। আল্লাহ্ পাক এ সামান্য দুধে এত অত্যাশ্চর্যজনক বৃদ্ধি ও বরকত প্রদান করেন যে, তা সকলের জন্যই যথেষ্ট হয়ে গেল। বরং কিছু অবশিষ্টও রইল। মনে হয় যেন পেয়ালাটির পরতে পরতে কোন ঝর্ণা বিদ্যমান ছিল যে, মানুষ যতটুকু পান করেছিলো সঙ্গে সঙ্গে ততটুকু আবার পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।
এ হাদীস থেকে আরো বোঝা যায় যে, উম্মতের জন্য প্রিয় নবী ﷺ-এর মনে কতখানি আন্তরিকতা ও দরদ বিদ্যমান ছিলো। তাঁর দরদপূর্ণ দৃষ্টি উম্মতের অন্তরস্থ সূক্ষ্ম অবস্থা ও চিন্তাভাবনাকে তাদের চেহারা গবাক্ষপথ দিয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করত। হযরত আবূ বকর (রা)-এর দৃষ্টি আবূ হুরায়রা (রা)-এর চেহারা ও তার প্রশ্ন করা থেকে যে ভাবকে অনুধাবন করতে পারেননি, হযরত উমরের সচেতন চাহনি যা অনুভব করেনি দয়ার মহাসমুদ্র প্রিয় নবী ﷺ-এর দরদমাখা দৃষ্টি তা সহজেই উপলব্ধি করে নেয়।
এ হাদীস থেকে সবচেয়ে বড় যে কথাটি বোঝা যায় তা হলো অনাহারক্লিষ্ট সাহাবীদের আত্মমর্যাদাবোধ। তাঁরা অনাহার ও দারিদ্রে অকল্পনীয় যাতনা নীরবে সহ্য করতেন। কিন্তু কারোর সামনে তা প্রকাশ করতেন না। কারোর কাছে ভিক্ষা চাওয়া বা হাত পাতা তো কল্পনাই করা যায় না। এরাই হলেন সেসব দারিদ্র ব্যক্তিত্ব যাদের ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ্ পাকের ইরশাদ হলো : لِلْفُقَرَاءِ الَّذِينَ أُحْصِرُوا فِي سَبِيلِ اللهِ لَا يَسْتَطِيعُونَ ضَرْبًا فِي الْأَرْضِ يَحْسَبُهُمُ الْجَاهِلُ أَغْنِيَاءَ مِنْ التَّعَفُّفِ تَعْرِفُهُمْ بِسِيمَاهُمْ لَا يَسْأَلُونَ النَّاسَ إِلْحَافًا - প্রকৃত প্রাপ্য হলো সেসব অভাবগ্রস্ত লোকজনের, যারা আল্লাহ্ পথে এমনভাবে ব্যাপৃত থাকে যে, দেশময় ঘোরাফেরা করার সুযোগ থাকে না। যাচ্ঞা না করার কারণে অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে অভাবমুক্ত বলে ধারণা করে; (হে নবী) আপনি তাদেরকে লক্ষণ দেখেই চিনতে পারেন। তারা মানুষের কাছে নাছোড় হয়ে যাচ্ঞা করে না। (সূরা বাকারা : ২৭৩)
তাদের সম্পর্কে প্রিয় নবী ﷺ ইরশাদ করেন : يَدْخُلُ الْفُقَرَاءُ الْجَنَّةَ قَبْلَ الْأَغْنِيَاء অভাবগ্রস্তরা সম্পদশালীদের সত্তর বছর পূর্বে বেহেস্তে প্রবেশ করবে। (আল-হাদীস)
١٦٥. عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا حَدَّثَ بِالْحَدِيثِ أَوْ سَأَلَ عَنِ الْأَمْرِ كَرَّرَهُ ثَلَاثًا لَيُفْهِمْ وَيُفْهَمَ عَنْهُ -
অতি উত্তম যা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব, যদিও না সে আমল সামান্য পরিমাণের হয়। তারপর তিনি বললেন, আমাকে এখানে সালাত পড়তে কেবল এ আশংকাটিই বারণ করেছে যে, এ ব্যাপারে আবার আমার উপর এমন কোন নির্দেশনা অবতীর্ণ হয়ে যায় যা পালনে তোমরা সক্ষম হবে না।
ফায়দা : ইতিপূর্বে একটি হাদীসের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ তাঁর উম্মতের ব্যাপারে সীমাহীন দরদী ও অতিশয় দয়ালু ছিলেন। এমনকি তিনি তাদের বিভিন্ন ইবাদত পালন ও আমল করার ক্ষেত্রেও সহজসাধ্যতা ও সহজলভ্যতার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখতেন। এই দরদ ও দয়ার কারণেই তিনি রাতের সেই নিয়মিত নফল পড়া বর্জন করেন। এখানে নবী -এর আশংকাবোধ হয়েছিল যে, এভাবে নিয়মিত আদায় করা হলে এ সালাত উম্মতের উপর ফরয হয়ে যেতে পারে। আর তখন তাদের পক্ষে তা পালন করে যাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়বে।
١٦٧. عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ قَالَ بَعَثَنِي رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِلَى الْيَمِنِ وَذَكَرَ الْحَدِيثَ -
১৬৭. হযরত মুআয ইব্ন জাবাল (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাকে ইয়ামেনে (গভর্নর নিযুক্ত করে) প্রেরণ করেন। তারপর তিনি পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন।
ফায়দা : এ হাদীসটি জামে তিরমিযী গ্রন্থে পরিপূর্ণ বর্ণিত হয়েছে। সেখানে হযরত মুআয (রা) বলেছেন যে, প্রিয় নবী আমাকে ইয়ামেনের গভর্নর বানিয়ে পাঠান। আমি যখন যাত্রা করলাম তখন তিনি জনৈক ব্যক্তিকে পাঠিয়ে আমাকে পুনরায় ডাকালেন। আমি ফিরে আসার পর তিনি আমাকে বললেন, তুমি নিশ্চয় জান আমি তোমাকে লোক পাঠিয়ে ডেকে এনেছি কেন। তিনি আরো বললেন, দেখ "তুমি আমার অনুমতি ব্যতিরেকে হাদিয়ার নামে মানুষের কাছ থেকে কোন জিনিস গ্রহণ করো না। কেননা এটি খেয়ানতের মাল-এর অন্তর্ভুক্ত। যে ব্যক্তি খেয়ানতের মাধ্যমে সম্পদ গ্রহণ করবে তাকে কিয়ামতের দিন সেই মালসহ আল্লাহ্র সামনে উপস্থিত হতে হবে।" আমি তোমাকে এই এতটুকু কথা বলে দেয়ার জন্য পুনরায় ডেকে এনেছি। যাও, নিজের কর্তব্য পালন করো।
প্রিয় নবী -এর ওসীয়ত করার মূল কারণও হলো তাঁর অন্তরে উম্মতের প্রতি মমত্ববোধ। তিনি চাইতেন মানুষের উপর যেন কাজকে সহজ করা হয়, তাদের সাথে কোমল আচরণ করা হয়। গভর্নর বা শাসনকর্তাদেরকে হাদিয়া-তোহফা প্রদানের জটিলতা যেন তাদেরকে পোহাতে না হয়। প্রিয় নবী নিজেও এ নীতির উপর আমল করতেন এবং নিজের গভর্নরদেরকেও এ নীতি পালনের নির্দেশ দিতেন।
📄 উম্মতের প্রতি নবী (সা)-এর সহানুভূতি সম্পর্কিত রিওয়ায়াতসমূহ
١٥٦ عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيُّ الله كَانَ يَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ وَهُوَ فِي الصَّلَاةِ فَيَقْرَا بِالسُّورَةِ الْقَصِيرَةِ وَالسُّورَةِ الْخَفِيفَةِ -
১৫৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ সালাতরত অবস্থায় যখন কোন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতেন তখন (শিশুটির মায়ের মনে কোন অস্থিরতার সৃষ্টি হতে পারে এ আশংকায় তিনি সালাত সংক্ষিপ্ত করে) ছোট একটি আয়াত কিংবা ছোট একটি সূরা তিলাওয়াতের মাধ্যমে সালাত শেষ করে নিতেন।
١٥٧ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ وَأَبِي سَعِيدِ الْخُدْرِى قَالَا صَلَّى بِنَا رَسُولُ اللهِ ﷺ صَلَاةَ الْغَدَاةِ وَسَمِعَ بُكَاءَ الصَّبِيِّ فَخَفَّفَ الصَّلَاةَ، فَقِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ ﷺ خَفَّقْتَ هَذِهِ الصَّلاةَ الْيَوْمَ فَقَالَ إِنِّي سَمِعْتُ بُكَاءَ صَبِي فَخَشِيْتُ أَنْ يَفْتِنَ أُمُّهُ -
১৫৭. হযরত আবূ হুরায়রা ও হযরত আবু সাঈদ খুদ্রী (রা) থেকে বর্ণিত, তাঁরা বলেন, একবার নবী আমাদেরকে নিয়ে ফজরের সালাত পড়ছিলেন। সালাত পড়ানো কালে তাঁর কানে একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ পৌঁছল। নবী তখন সালাত সংক্ষিপ্ত করে দেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো যে, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আজ আপনি সালাতকে এতটুকু সংক্ষিপ্ত করলেন? উত্তরে তিনি ইরশাদ করেন, আমি সালাতরত অবস্থায় যখন কোন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনি তখন আমার আশংকাবোধ হয়, হয়ত শিশুটির মা সালাতরত অবস্থায় পেরেশানীতে পড়বে। (এ কারণে আমি সালাত সংক্ষিপ্ত করে দিয়েছি।)
ফায়দা : উল্লিখিত হাদীসদ্বয়ের অর্থ সুস্পষ্ট। গ্রন্থকার এখানে উম্মতের প্রতি নবী -এর মনে কতটুকু মায়া ও ভালবাসা ছিল এবং তাদের প্রতি তিনি কতটুকু দরদ ও সহানুভূতি পোষণ করতেন তার বর্ণনা পেশ করেছেন। এ ধরনের হাদীসগুলি থেকে বোঝা যায় যে, নবী তাঁর উম্মতের জন্য কতখানি মায়া ও ভালবাসা এবং কতখানি দরদ ও সহানুভূতি রাখতেন। ফজরের সালাতে দীর্ঘ কিরাআত পাঠ করা মুস্তাহাব। এটিই ছিল ফজরের সালাতে নবী -এর নিয়ম। কিন্তু তিনি একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনে কেবল এ কারণে যে, এই শিশু ও শিশুটির সালাতরত মায়ের মনে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে সে জন্য নিজের নিয়ম ভঙ্গ করে সালাত সংক্ষিপ্ত করে নিতেন। যেন সালাত দীর্ঘ হওয়ার কারণে শিশু ও শিশুর মাকে অস্থির হতে না হয়।
বস্তুত মানবীয় গুণাবলির মধ্যে মায়া-মমতা একটি মহৎ গুণ এবং আল্লাহ্ তা'আলার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয় একটি অভ্যাস। এর পরিধি অনেক ব্যাপক। মায়া-মমতা ও ভালবাসার সম্পর্ক কেবল নিজের পরিবার-পরিজন ও সন্তান-সন্ততির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সকল প্রিয়জন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, অধস্তন কর্মচারী, শিষ্য ও গুরু নির্বিশেষে সকল সৃষ্ট জগতের সঙ্গে জড়িত। স্বজনদের সঙ্গে হোক আর পরজনদের সঙ্গে হোক মানুষ যখন এ মায়া-মমতাকে নিজের আদর্শ ও অভ্যাসে পরিণত করে এবং সৃষ্ট জীবের সহিত সর্বদা কোমল আচরণ করেন তখন তিনি নিজেও যেমন শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারেন তেমনি অন্যদের জন্যও শান্তি ও আনন্দপূর্ণ জীবন যাপনের কারণ হিসাবে পরিগণিত হন। এ ধরনের সদাচার দ্বারা গোটা সমাজের মধ্যে পারস্পরিক মায়া-মমতা, ভ্রাতৃত্ব, মান-সম্মান রক্ষা ও কল্যাণ কামনার এমন একটি সুন্দর পরিবেশ গড়ে উঠে যা আল্লাহ্ পাকের নিকট খুবই পছন্দনীয়। আর যে ব্যক্তির কারণে এ পরিবেশ গড়ে উঠে তিনি আল্লাহ্ পাকের বাণী ‘ سَبَقَتْ رَحْمَتِى عَلَى غَضَبِي )আমার দয়া ও অনুগ্রহ আমার ক্রোধ ও গযবের উপর প্রবল হয়ে থাকে)-এর প্রকাশস্থল হিসাবে হন। আমাদের পরম অনুগ্রহকারী সারা বিশ্বের রহমত নবী তাঁর নিম্নোক্ত বাণীতে আমাদেরকে এদিকে পথনির্দেশ করেছেন।
হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ্র নিকট থেকে নম্রতা ও কোমল আচরণ নীতির পরিপূর্ণতা লাভে সক্ষম হয়েছে সে ইহকাল ও পরকাল উভয় জাহানের সকল কল্যাণের পূর্ণতা লাভ করেছে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মায়া-মমতা ও কোমল আচরণ গুণ থেকে বঞ্চিত সে ইহকাল ও পরকাল উভয় জাহানের যাবতীয় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত।” (ইমাম বাগাভী (র) সংকলিত শারহুস্ সুন্নাহ্)।
١٥٨ عَنْ مَالِكِ بْنِ الْحُوَيْرِثِ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ وَ رَحِيمًا رَفِيقًا أَقْمَنَا عِنْدَهُ عِشْرِينَ لَيْلَةً فَظَنَّ إِنَّا قَدْ اسْتَقْنَا فَسَأَلَنَا عَمَّنْ تَرَكْنَاهُ مِنْ أَهْلِنَا فَأَخْبَرْنَاهُ فَقَالَ النَّبِيُّ ارْجِعُوا إِلَى أَهَالِيْكُمْ فَأَقِيمُوا فِيهِمْ .
১৫৮. হযরত মালিক ইবন হুয়ায়রিস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ছিলেন অতিশয় কোমল-প্রাণ, অতীব দয়ালু ও সহানুভূতিশীল। আমরা স্বগোত্রীয় একটি প্রতিনিধি দলের সাথে বিশ দিন পর্যন্ত তাঁর সান্নিধ্যে অবস্থান করেছিলাম। তখন তাঁর মনে হলো, হয়তো আমাদের মনে বাড়ি ফিরে যাওয়ার আগ্রহ সৃষ্টি হয়ে থাকবে। কাজেই তিনি আমাদেরকে ডাকলেন এবং বাড়িতে আমাদের কারা কারা আছে জিজ্ঞেস করলেন। আমরা তাঁকে বিস্তারিত জানালাম। তখন তিনি ইরশাদ করেন : এবার তোমরা নিজ নিজ পরিবার- পরিজনের কাছে ফিরে যাও এবং সেখানেই স্থায়িভাবে অবস্থান কর (এবং দীনের প্রচার ও প্রসারের কাজ করে যাও)।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায় যে, নবী লোকজনের মানসিক অবস্থার প্রতি কতটুকু সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। তা ছাড়া আরো বোঝা যায় যে, মানুষের জন্য তাঁর প্রাণে কতটুকু দয়া ও মমতা বিদ্যমান ছিল। আর এ কারণেই পবিত্র কুরআনে তাঁকে رَحْمَةُ الْعَالَمِينَ' উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। স্বয়ং তিনি তাঁর নিজের ব্যাপারে ইরশাদ করেছেন: أَنَا رَحْمَةُ مُهْدَاةُ -আমি সৃষ্ট জাহানের হিদায়েতের জন্য প্রেরিত রহমত।' সুবহানাল্লাহ্!
١٥٩ عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ وَإِذَا فَقَدَ الرَّجُلُ مِنْ إِخْوَانِهِ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ سَأَلَ عَنْهُ فَإِنْ كَانَ غَائِباً دَعَا لَهُ وَإِنْ كَانَ شَاهِدًا زَارَهُ وَإِنْ كَانَ مَرِيضًا عَادَهُ -
১৫৯. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যদি একাধারে তিনদিন কোন মুসলিম ভাইয়ের সাক্ষাৎ না পেতেন তা হলে তার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। সে যদি সফরে আছে বলে জানতেন তাহলে তার জন্য দু'আ করতেন। আর যদি সে (মদীনায়) উপস্থিত থাকতো (অথচ কোন অপারগতার কারণে হাজির হতে পারছে না) তা হলে তিনি নিজে তার সাক্ষাতের জন্য যেতেন। আর যদি লোকটি অসুস্থ বলে জানতেন তা হলে তিনি সেখানে গিয়ে তার সেবা-শুশ্রূষা করতেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, নবী নিজের সঙ্গী ও পরিচিতদের সাথে কতখানি স্নেহপূর্ণ ও আন্তরিক, মনজয় ও খোঁজ-খবরের আচরণ করতেন। নবুওয়াতের গুরু দায়িত্ব পালনে সর্বদা ব্যাপৃত ও মশগুল থাকা সত্ত্বেও তিনি উপস্থিত ও অনুপস্থিত প্রতিটি সঙ্গীর ব্যাপারে পূর্ণ খবরাখবর রাখতেন এবং প্রত্যেকের জন্য উদার আচরণ প্রদর্শন করতেন। নবী-এর এই উন্নত চরিত্র মাধুরী বর্বর নির্মম আরব জাতির অন্তরে এমন প্রীতি ও মমতার সৃষ্টি করেছিল যার উপমা জগতের কোথাও পাওয়া যায় না। সাহাবীগণ তাঁর জন্য ছিলেন নিবেদিত-প্রাণ। ঘোরতর যুদ্ধ চলাকালে তাঁরা নবী-কে আড়ালে রেখে শত্রুর সকল তীর নিজেদের বুক পেতে নিতেন। নবী-এর যেকোন আহ্বানে তাৎক্ষণিক 'লাব্বায়ক' (আমি হাজির, আমি হাজির) বলে সাড়া দিতেন। মহান আল্লাহ্ আমাদের সকলকে এই মহান নবী-এর অনুপম স্বভাব-চরিত্র এবং তাঁর সুন্দরতম রীতি-নীতি ও কাজকর্মের পূর্ণ অনুসরণের শক্তি দান করুন।
١٦٠. عَنْ عَلِيِّ بْنِ حُسَيْنِ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ صَلَّى صَلَاةً فَعَجَلَ فِيْهَا، فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ إِنَّمَا عَجَلْتُ أَنِّي سَمِعْتُ صَبِيًّا يَبْكِي فَخَشِيْتُ أَنْ يَشُقَّ ذَلِكَ عَلَى أَبْوَيْهِ
১৬০. হযরত আলী ইব্ন হুসাইন (রা) থেকে বর্ণিত যে, একবার নবী সালাত পড়ালেন এবং সালাত খুব দ্রুত শেষ করলেন। তারপর বললেন: আমি সালাত ত্বরা করে শেষ করার কার হলো যে, সালাতে আমি যখন কোন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনি তখন আমার আশঙ্কা হয় যে, শিশুটির এ কান্নার দরুন তার মাতাপিতার মনে কোন কষ্টের উদ্রেক না হয়।
١٦١. عَنْ أَنَسٍ أَنَّ أَعْرَابِيًّا أَتَى النَّبِيَّ ﷺ فَسَأَلَهُ وَعَلَيْهِ بُرْدٌ فَجَذَبُهُ فَشَقَّ الْبُرْدَ حَتَّى بَقِيْتِ الْحَاشِيَةُ فِي عُنُقِ النَّبِيِّ ﷺ فَأَمَرَ لَهُ النَّبِيُّ ﷺ بِشَيْ
১৬১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক বেদুঈন নবী -এর দরবারে হাজির হয়ে কিছু প্রার্থনা করল। নবী একটি চাদর পরিহিত ছিলেন। লোকটি প্রার্থনার আতিশয্যে তাঁর চাদর ধরে এত জোরে টান দিলো যে, চাদরটি ফেঁড়ে গিয়ে একপার্শ্ব নবী-এর কাঁধের উপর ঝুলতে থাকে। নবী লোকটির এই (অসৌজন্যমূলক) আচরণ সত্ত্বেও তাকে কিছু দান করতে নির্দেশ দেন।
ফায়দা: আলোচ্য হাদীসের অর্থ সুস্পষ্ট। এ হাদীস থেকে অনুমান করা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ নিজের উম্মতের প্রতি কতটুকু দয়ালু এবং কতটুকু ক্ষমাশীল ছিলেন। একজন রুক্ষ প্রকৃতির বেদুঈন যে প্রার্থনা করতেও শিখেনি তারপর আবার দু'জাহানের সরদার মহানবী-এর সাথে এহেন অসৌজন্যমূলক আচরণ যা কেবল তাঁরই মান মর্যাদা হানিকর ময় বরং যেকোন ভদ্রলোকের পক্ষেও অসহনীয়। কিন্তু নবী এই রুক্ষ লোকটির সাথে ক্ষমাশীলতা এবং দয়াপূর্ণ আচরণ করেন; যেভাবে তিনি অন্য লোকদের সাথে আচরণ করে থাকেন। বস্তুত উন্নত চরিত্রের এই সুউচ্চ আসন তিনি ব্যতিরেকে অন্য কোন মানুষের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। একমাত্র তাঁরই পবিত্র সত্তা এই পদমর্যাদার পরিপূর্ণ ধারক। এ কারণে কুরআনে হাকীমের মধ্যে তাঁর সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে : إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ (হে নবী) নিশ্চয়ই আপনি উন্নত চরিত্রের অধিকারী। আল্লাহ্ তা'আলা আমাদের সকলকে উন্নত চরিত্র অবলম্বনের তাওফীক দান করুন। আমীন!
١٦٢. عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ قَالَ بَعَثَنِي رَسُولُ اللهِ ﷺ إِلَى الْيَمَنِ فَقَالَ يَا مُعَاذُ إِذَا كَانَ فِي الشَّتَاءِ فَغَلِسُ بِالْفَجْرِ وَاطِلِ الْقِرَاءَةَ قَدْرَ مَا يُطِيقُ النَّاسُ وَلَا تُمِلْهُمْ ، فَإِذَا كَانَ الصَّيْفُ فَأَسْفِرُ بِالْفَجْرِ فَإِنَّ اللَّيْلَ قَصِيرٌ وَالنَّاسِ يَنَامُوْنَ فَأَمْهِلْهُمْ حَتَّى يَدَارَكُوا -
১৬২. হযরত মুআয ইবন জাবাল (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাকে ইয়ামেনে (গভর্নর নিযুক্ত করে) পাঠালেন এবং বলেন, হে মুআয! শীতের মৌসুমে তুমি ফজরের সালাত শুরু ওয়াক্তে পড়াবে। আর সালাতে কিরাআত এতটুকু দীর্ঘ করবে যতটুকু লোকজনের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হয়। অতিশয় দীর্ঘ কিরাআতের কারণে মানুষের মনে যেন বিরক্তি না আসে। আর গরমের মৌসুমে তুমি ফজরের সালাত শেষ ওয়াক্তে পড়াবে। কেননা (গরম কালে) রাত ছোট হয়ে থাকে মানুষের ঘুম শেষ হয় না। কাজেই তাদেরকে এতটুকু সুযোগ দেবে যাতে তারাও সালাতে অংশগ্রহণে সক্ষম হয়।
ফায়দা: আলোচ্য হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ যেভাবে জাগতিক সকল কাজে উম্মতের প্রতি দয়া ও কোমলতার আচরণ করতেন অনুরূপ ইবাদত বন্দেগী ইত্যাদি আদায়ের ক্ষেত্রেও তিনি তাদের জন্য সহজসাধ্য পদ্ধতি অবলম্বনের প্রতি দৃষ্টি রাখতেন। সহ্য করা যায় না এমন কোন কঠোরতার দরুন ইবাদত করতে তাদের মনে যেন বিরক্তি না আসে সে জন্য তিনি সচেতন থাকতেন। এমন কি তিনি সালাতের মত উচ্চমানের ইবাদত, যার ব্যাপারে নিজেই ইরশাদ করেছেন যে, "আমার নয়নের প্রশান্তি হলো সালাত," ব্যাপারেও তিনি সহজলভ্যতা ও সহজসাধ্যতার নীতি পালনের নির্দেশ দিতেন। শীত ও গরমের মৌসুম এবং রাত দিন ছোট বড় হওয়ার প্রতি দৃষ্টি রাখার পেছনে এটিই হলো মূল রহস্য—যেন কঠোরতা দেখে শংকিত হয়ে কেউ দীনাদারী ও ইবাদত বন্দেগী ছেড়ে না বসে। আল্লাহ্ তা'আলা এই দীনের বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করে ইরশাদ করেন : وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّيْنِ مِنْ حَرَجٍ مِنْةَ أَبِيْكُمْ إِبْرَاهِيمَ এই দীনের মাঝে সংকীর্ণতার কোন কিছু নেই, এটি তোমাদের ঊর্ধ্বতন পুরুষ ইব্রাহীমের দীন" (সূরা হাজ্জ : ৭৮)
١٦٣. عَنْ جَابِرٍ قَالَ غَزَا رَسُولُ اللهِ ﷺ إِحْدَى وَعِشْرِينَ غَزْوَةٌ بِنَفْسِهِ، شَهِدْتُ تِسْعَ عَشْرَةَ غِبْتُ عَنِ اثْنَتَيْنِ، فَبَيْنَا أَنَا مَعَهُ فِي بَعْضٍ غَزَوَاتِهِ إِذَا أَعْنِي فَأَضْحَى تَحْتَ اللَّيْلِ فَبَرَكَ وَكَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فِي آخِرِنَا فِي أُخْرَيَاتِ النَّاسِ فَيَزْجِي الضَّعِيفَ وَيَرْدِفُ وَيَدْعُولَهُمْ فَانْتَهَى إِلَى وَأَنَا أَقُولُ يَا لَهَفَ أَمْتَاهُ وَمَا زَالَ لَنَا نَاضِحَ سُوْءٍ، فَقَالَ مَنْ هُذَا ؟ قُلْتُ أَنَا جَابِرُ بِأَبِي وَأُمِّي يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ مَا شَأْنُكَ ؟ قُلْتُ أَعْيِي نَاضِحْي فَقَالَ أَمَعَكَ عَصًا قُلْتُ نَعَمْ فَضَرَبَهُ ثُمَّ بَعَثَهُ ثُمَّ أَنَاخَهُ وَوَطِئَ عَلَى ذِرَاعِهِ وَقَالَ ارْكَبُ فَرَكِبْتُ فَسَايَرْتُهُ فَجَعَلَ جَمَلِي يَسْبِقُهُ فَاسْتَغْفَرَ لِي تِلْكَ اللَّيْلَةَ خَمْسًا وَعِشْرِينَ مَرَّةً - فَقَالَ لِي مَا تَرَكَ عَبْدُ اللَّهِ مِنْ الْوَادِ ؟ يَعْنِي آبَاهُ قُلْتُ سَبْعَ نِسْوَةٍ قَالَ أَتَرَكَ عَلَيْهِ دَيْنَا قُلْتُ نَعَمْ قَالَ فَإِذَا قَدِمْتَ الْمَدِينَةَ فَقَاطِعُهُمْ فَإِنْ أَبَوْا فَإِذَا حَضَرَ جِدَادَ نَخْلِكُمْ فَاذِنِي وَقَالَ لِي هَلْ تَزَوَّجْتَ ؟ قُلْتُ نَعَمْ قَالَ بِمَنْ ؟ قُلْتُ بِفَلَانَةِ بِنْتِ فُلَانٍ بِأَيِّمٍ كَانَتْ بِالْمَدِينَةِ قَالَ فَهَلاً فَتَاة تُلاعِبُهَا وَتُلاعِبُكَ ؟ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ كُنَّ عِنْدِي نِسْوَةٌ خَرَقَ يَعْنِي أَخْوَاتُهُ فَكَرِهْتُ أَنْ أَتَيْهِنَّ بِامْرَأَةٍ خَرْقَاءَ ، فَقُلْتُ هَذِهِ أَجْمَعُ الأَمْرِي قَالَ فَقَدْ أَصَبْتَ وَرَشَدْتَ فَقَالَ بِكُمْ اَشْتَرَيْتَ جَمَلَكَ قُلْتُ بِخَمْسٍ أَوَاقٍ مِنْ ذَهَبٍ قَالَ قَدْ أَخَذْنَاهُ ، فَلَمَّا قَدِمَ الْمَدِينَةَ أَتَيْتُهُ بِالْجَمَلِ فَقَالَ يَا بِلالُ : أَعْطِهِ خَمْسَ أَوَاقٍ مِنْ ذَهَبٍ يَسْتَعِينُ بِهَا فِي دَيْنِ عَبْدِ اللَّهِ وَزِدْهُ ثَلَاثًا وَارْدُدْ عَلَيْهِ جَمَلَهُ ، قَالَ هَلْ قَاطَعْتَ غُرْمَاءَ عَبْدِ اللَّهِ ؟ قُلْتُ لَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ أَتَرَكَ وَفَاء ؟ قُلْتُ لَا قَالَ لَا عَلَيْكَ إِذَا حَضَرَ جِدَادَ نَخْلِكُمْ فَاذِنِي فَاذِنْتُهُ فَجَاءَ فَدَعَا لَنَا فَاسْتَوْفِي كُلِّ غَرِيم مَا كَانَ يَطْلُبُ تَمَرًا وَفَاء وَبَقِيَ لَنَا مَا كَنَّا نَجِدُ وَأَكْثَرَ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ارْفَعُوا وَلَا تَكِيلُوا فَرَفْعَنَا فَأَكَلْنَا مِنْهُ زَمَانًا .
১৬৩. হযরত জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ একুশটি যুদ্ধে স্বয়ং অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে উনিশটিতেই আমি শামিল থাকি। অবশিষ্ট দু'টির মধ্যে উপস্থিত ছিলাম না। একবার আমি নবী -এর সঙ্গে যুদ্ধে যাত্রা করেছিলাম। এমন সময় রাত্রিকালে আমার উটটি হাঁটতে অক্ষম হয়ে পড়ল। নবী পেছনের লোকজনের সাথে আমাদের পেছনে আসছিলেন। পেছনের লোকজনের সাথে তাঁর আসার উদ্দেশ্য ছিল এই যে, তিনি পেছন থেকে দুর্বলদেরকে চলতে সাহায্য করতেন, প্রয়োজনের মুহূর্তে তাদেরকে নিজের বাহনে আরোহণ করিয়ে নিতেন এবং দুর্বলদের জন্য দু'আ করতে থাকতেন। (পথ চলতে চলতে আমিও পেছনে পড়ে গিয়েছিলাম) তিনি যখন আমার কাছে আসলেন আমি তখন নিজের দুর্বলতা ও অক্ষমতার দরুন নিজে নিজেকে তিরস্কার করছিলাম। হায়! আমার মায়ের বিনাশ! কেননা আমার উট অক্ষম হয়ে গিয়েছে। এ সময় নবী জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনার প্রতি আমার মাতাপিতা কুরবান হোক, আমি জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্। তিনি বললেন, তোমার কি হয়েছে? আমি বললাম আমার উটটি (ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে বসে গেছে আর দাঁড়াচ্ছে না)। তিনি বললেন, তোমার হাতে (হাঁকিয়ে নেওয়ার কোন) লাঠি আছে কি? আমি বললাম, জী হ্যাঁ, আছে।
তখন তিনি লাঠির সাহায্যে উটটিকে প্রহার করলেন, এটি দাঁড়াল। তারপর পুনরায় উটটিকে বসিয়ে সম্মুখের পা দু'টি সজোরে চিপে দিলেন। তারপর আমাকে বললেন, যাও, আরোহণ কর। আমি উটটির পিঠে আরোহণ করলাম এবং চালাতে থাকলাম। দেখলাম, নবী -এর মুবারক হাতের স্পর্শের কারণে আমার উটটি তাঁর উট থেকেও আগে আগে চলতে শুরু করেছে। নবী সে রাতে আমার পঁচিশবার মাগফিরাতের দু'আ করেন। তারপর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পিতা আবদুল্লাহ মৃত্যুকালে কতজন সন্তান রেখে গিয়েছেন? আমি বললাম, সাত কন্যা। তিনি বললেন, তার উপর কি কিছু ঋণও ছিল? আমি বললাম, জী হ্যাঁ। তিনি বললেন, এবার মদীনায় ফিরে গিয়ে ঋণদাতাদের সাথে একটা ফয়সালা করে নিও। তারা যদি তোমার ফয়সালা মানতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে খেজুর আহরণের মৌসুমে তুমি আমাকে সংবাদ দিবে। তারপর তিনি আমার প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি বিবাহ করেছ? আমি বললাম, জী হ্যাঁ। তিনি বললেন, কাকে বিবাহ করেছ? আমি বললাম, অমুকের বিধবা কন্যা। তারা মদীনাতেই বসবাস করে। তিনি বললেন, কোনো কুমারীকে বিয়ে করলে না কেন? তাহলে সে তোমার জন্য এবং তুমি তার জন্য অধিকতর মনস্তুষ্টি ও ভালবাসার কারণ হতে। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্। আমাদের ঘরে অনভিজ্ঞ কুমারীরা আছে। (অর্থাৎ আমার ছোট বোনেরা সকলে কুমারী) কাজেই আমি তাদের সমবয়সের আরেকজন কুমারীকে ঘরে আনা পছন্দ করিনি। আমি সিদ্ধান্ত করেছিলাম কোন একজন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মহিলাকে ঘরে আনা হলে আমার পারিবারিক কাজকর্মে অধিকতর কল্যাণজনক প্রমাণিত হবে। নবী বললেন, তাহলে তুমি ঠিক কাজ করেছ এবং উত্তম পথ অবলম্বন করেছ। তারপর নবী আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, এ উট তুমি কত মূল্যে খরিদ করেছিলে? আমি বললাম, পাঁচ উকিয়া স্বর্ণের বিনিময়ে। তিনি বললেন, উটটি আমি তোমার কাছ থেকে খরিদ করে নিলাম। এরপর মদীনা শরীফ পৌঁছে আমি উটটি নবী-এর খেদমতে পেশ করে দেই। তিনি হযরত বিলালকে ডেকে বললেন, বিলাল তুমি জাবিরকে পাঁচ উকিয়া স্বর্ণ পরিশোধ কর। সে (তার পিতা হযরত) আবদুল্লাহ্র ঋণ শোধে এ অর্থ ব্যয় করবে। তাকে আমার পক্ষ থেকে অতিরিক্ত আরো তিন উকিয়া স্বর্ণ দিয়ে দিবে এবং তাকে তার উটটিও ফিরিয়ে দিবে।
তারপর নবী আমাকে বললেন, তুমি তোমার পিতা আবদুল্লাহ্র ঋণদাতাদের সঙ্গে কথাবার্তা ঠিক করেছ কি? আমি বললাম, জী না। নবী বললেন, আবদুল্লাহ্ কি এতটুকু সম্পদ রেখে গেছে যা দিয়ে ঋণ শোধ করা সম্ভব? আমি বললাম, জী না। তিনি বললেন, ঠিক আছে কোন অসুবিধা হবে না। তোমাদের বাগানে খেজুর আহরণের সময় ঘনিয়ে এলে আমাকে সংবাদ দিও। সে মতে আমি (সময়মত) নবীকে স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি আগমন করলেন এবং আমাদের জন্য দু'আ করলেন। (তাঁর সে দু'আর বরকতে) খেজুর থেকে ঋণদাতা সকলের পাওনা পরিপূর্ণভাবে শোধ করে দেওয়া হলো। তারপর আমাদের হাতে সেই পরিমাণ খেজুর অবশিষ্ট রয়ে গেল যতটুকু আমরা অন্যান্য বছর আহরণ করতাম। এমনকি অবশিষ্ট অংশ অন্যান্য বছরের তুলনায় পরিমাণে কিছু বেশিও ছিল। তারপর নবী আমাকে বললেন, এ খেজুরগুলি ঘরে নিয়ে যাও। তবে দেখ এগুলিকে পরিমাপ করবে না। সে মতে আমার উক্ত খেজুর বহুদিন পর্যন্ত খেতে থাকি।
ফায়দা: আলোচ্য হাদীসে প্রিয় নবী-এর দু'টি মুজিয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। একটি হলো, তাঁর দু'আর বরকতে ক্লান্ত হয়ে পড়া অক্ষম একটি উট পুনরায় শক্তি লাভ করে এবং দ্রুত গতিতে চলতে আরম্ভ করে। আর অপরটি হলো, তাঁর বরকতে সামান্য পরিমাণের খেজুর এত অধিক পরিমাণের হলো যে, তা থেকে সকল ঋণ পরিশোধ করেও অতিরিক্ত রয়ে গেল। এমন কি অন্যান্য মৌসূমে যে পরিমাণ খেজুর জাবির (রা) বাগান থেকে পেতেন তার চেয়েও বেশি রয়ে গেল।
উল্লেখিত হাদীসটি বর্ণনা করা গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হলো উম্মতের প্রতি প্রিয় নবী -এর মমত্ববোধ ও আন্তরিকতার দৃষ্টান্ত পেশ করা। বিশেষত তিনি সহায়-সম্বলহীন দরিদ্র মানুষের সাথে কতটুকু সহানুভূতি প্রদর্শন এবং তাদেরকে কত সাহায্য করতেন এ কথার প্রমাণ পেশ করা। এ হাদীসে সুস্পষ্ট বিবরণ বিদ্যমান যে, প্রিয় নবী হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ্ (রা)-কে কেবল মৌখিকভাবেই সহানুভূতি প্রদর্শন করে ক্ষান্ত হননি বরং তাঁর পিতার রেখে যাওয়া ঋণ পরিশোধের জন্য আর্থিকভাবেও সাহায্য করেন। তিনি তাঁর বাগানে উৎপাদিত খেজুরে বরকতের জন্য দু'আ করেন। ফলে আল্লাহ্ পাক তাঁর ঋণসমূহ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন। অধিকন্তু তাঁর পরিবারের আহারের জন্য তাঁর কাছে যথেষ্ট পরিমাণে উদ্বৃত্তও থেকে যায়।
বর্ণিত হাদীসের ঘটনাটির মধ্যে সমবেদনা ও আর্থিক সাহায্যের এ বিষয়টি মনস্তত্বের দিক থেকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষামূলক। এখানে দু'জাহানের রহমত প্রিয় নবী হযরত জাবির (রা)-এর মন থেকে অনুগ্রহ প্রাপ্তির বোঝা লাঘব করার উদ্দেশ্যে নামমাত্র মূল্যে তাঁর উটটি খরিদ করেন-যেন হযরত জাবির (রা)-কে এ উটের মূল্য গ্রহণে কোন সংকোচ বোধ না করেন। তাছাড়া মদীনায় পৌঁছে উটের মূল্য প্রদানের সময় অতিরিক্ত আরো তিন উকিয়াসহ বিক্রীত উটটিও তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বস্তুত হযরত জাবিরের উট খরিদ করা প্রিয় নবী-এর উদ্দেশ্য ছিল না। এ কারণে জাবির (রা) যখন উটের দ্বারা মদীনা পৌঁছা পর্যন্ত আরোহণ করার শর্ত আরোপ করেন তখন মহানবী সেই শর্ত মেনে নেন। অথচ বাহ্যিকভাবে এ ধরনের শর্তারোপ নিষিদ্ধ। কেননা অন্য হাদীসে বলা হয়েছে, نَهَى عَنْ بَيْرٍ وَشَرْطَ নবী শর্তের সাথে কোন বেচাকেনা করতে নিষেধ করেছেন কাজেই যেহেতু প্রিয় নবী -এর মূল উদ্দেশ্য উট খরিদ করা নয়, বরং উদ্দেশ্য ছিল উটের দাম বলে হযরত জাবিরকে আর্থিক সাহায্য করা। আর একারণেই তিনি উপরোক্ত শর্ত মেনে নিতে কোন দ্বিধা প্রকাশ করেন নি। তারপর মদীনা পৌঁছে তিনি কেবল উটের মূল্যই নয় বরং উটসহ অতিরিক্ত আরো তিন উকিয়া স্বর্ণ তাকে প্রদান করেন। এভাবে এ উম্মতের জন্যও কর্তব্য যে, তারা যখন নিজেদের কোন অভাবী ঋণগ্রস্ত ভাইয়ের আর্থিক সাহায্য করার ইচ্ছা করবেন তখন এমন পন্থা অবলম্বন করবেন যার ফলে অভাবী ব্যক্তি সাহায্য গ্রহণ করতে সংকোচবোধ না করেন এবং যথাসম্ভব অভাবী লোকটি অনুগ্রহ ভাজন হওয়ার বোঝা থেকে যেন হাল্কা রাখেন।
١٦٤. عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ وَاللَّهِ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ إِنْ كُنْتُ لَاشُدُّ الْحَجَرَ عَلَى بَطْنِي مِنَ الْجُوعِ وَإِنْ كُنْتُ لَاعْتَمِدُ بِيَدَيَّ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْجُوعِ وَلَقَدْ قَعَدْتُ يَوْمًا عَلَى طَرِيقِهِمْ الَّذِي يَخْرُجُونَ فِيهِ فَمَرَّ بِي أَبُو بَكْرٍ فَسَأَلْتُهُ عَنْ آيَةٍ مِنْ كِتَابِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مَا أَسْأَلُهُ عَنْهَا إِلَّا لِيَسْتَبْتَعْنِي فَمَرَّ وَلَمْ يَفْعَلْ ، ثُمَّ مَرَّ عُمَرُ فَسَأَلْتُهُ عَنْ آيَةٍ مِنْ كِتَابِ اللَّهِ مَا سَأَلْتُهُ إِلَّا لِيَسْتَبْتَعَنِي فَمَرَّ وَلَمْ يَفْعَلْ ثُمَّ مَرَّ أَبُو الْقَاسِمِ ﷺ فَعَرَفَ مَا فِي نَفْسِي وَمَا فِي وَجْهِي فَتَبَسَّمَ وَقَالَ أَبَا هُرَّ الْحَقِّ فَاتَّبَعْتُهُ فَدَخَلَ فَاسْتَأْذِنَتْ فَأَذِنَ لِي فَوَجَدَ لَبَنًا فِي قَدْحٍ فَقَالَ لِأَهْلِهِ أَنَّى لَكُمْ هُذَا اللَبَنُ ؟ قَالُوا أَهْدَاهُ لَكَ فُلَانُ، فَقَالَ يَا أَبَاهُرْ انْطَلِقِ إِلَى أَهْلِ الصُّفَةِ فَادْعُهُمْ لِي قَالَ فَاحْزَنَنِي ذَلِكَ وَأَهْلُ الصُّفَّةِ أَصْيَافُ الْإِسْلَامِ لَا يَاوُونَ إِلَى أَهْلِ وَلَا مَالٍ إِذَا جَاءَتْهُ أَرْسَلَ بِهَا إِلَيْهِمْ وَلَمْ يَزْرَا مِنْهَا شَيْئًا وَإِذَا جَاءَتْهُ هَدْيَةُ أَرْسَلَ إِلَيْهِمْ فَاشْرَكَهُمْ فِيهَا فَأَصَابَ مِنْهَا قَالَ فَأَحْزَنَنِي إِرْسَالُهُ إِيَّايَ وَقُلْتُ أَرْجُو أَنْ أَشْرَبَ مِنْ هَذَا اللَّبْنِ شَرْبَةً أَتَغَدَّى بِهَا فَمَا يُغْنِي عَنِّي هُذَا اللَّبَنُ فِي أَهْلِ الصُّفَةِ وَأَنَا الرَّسُولُ ، فَإِذَا جَاؤُا أَمَرَنِي فَكُنْتُ أَنَا أعَاطِيْهِمْ وَلَمْ يَكُنْ مِنْ طَاعَةِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَطَاعَةِ رَسُولِهِ بُدٌّ ، فَانْطَلَقْتُ إِلَيْهِمْ فَدَعَوْتُهُمْ فَأَقْبَلُوا فَاسْتَأْذَنُوا فَأَذِنَ لَهُمْ فَأَخَذُوا مَجَالِسَهُمْ مِنَ الْبَيْتِ ، وَقَالَ آبَاهُرُ قُلْتُ لَبَّيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ قُمْ فَأَعْطِهِمْ فَاخَذِ الْقَدْحَ فَاعْطِي الرَّجُلَ حَتَّى يَرْوِي ، ثُمَّ يَرُدُّهُ إِلَى حَتَّى رَوِيَ جَمِيعُ الْقَوْمَ فَانْتَهَيْتُ إِلَى رَسُولِ اللهِ ﷺ فَأَخَذَ الْقَدْحَ فَوَضَعَهُ عَلَى يَدَيْهِ ثُمَّ رَفَعَ رَأْسَهُ فَنَظَرَ إِلَى فَتَبَسَّمَ وَقَالَ أَقْعُدْ فَقَعَدْتُ فَشَرِبْتُ وَقَالَ أَشْرَبْ ، رال يَقُولُ اشْرَبْ حَتَّى قُلْتُ وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ مَا أَجِدُ لَهُ مَسْلَكًا ، قَالَ فَارْنِي فَرَدَدْتُ إِلَيْهِ الإِنَاءَ فَحَمِدَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ شَرِبَ مِنْهُ -
১৬৪. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সেই পবিত্র সত্তার কসম! যিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই যে, আমি (অনেক সময়) ক্ষুধার তাড়নায় নিজের পেটের উপর পাথর বেঁধে রাখতাম। আর (কোন কোন সময়) এই ক্ষুধাজনিত কষ্টের কারণে নিজের দু'হাত দ্বারা মাটির উপর ভর দিয়ে বসে থাকতাম। আল্লাহর শপথ, একদিন এমন হয়ে গিয়েছিলো যে, (মসজিদে নববী থেকে) বেরিয়ে যাওয়ার পথের উপর বসে পড়ি। (যেন আমার ক্ষুধার্ত অবস্থা কারোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে) এ সময় হযরত আবূ বক্র সিদ্দীক (রা) আমার নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি তাঁকে শুধু এ উদ্দেশ্যে যে, তিনি আমাকে সঙ্গে করে (ঘরে) নিয়ে যাবেন এবং কিছু খেতে দিবেন-পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু তিনি আমার প্রকৃত ইচ্ছা কিছুই উপলব্ধি করলেন না। (প্রশ্নটির জবাব দিয়ে) চলে গেলেন। আমাকে আর সঙ্গে করে নিলেন না। অতঃপর (এ পথ দিয়ে) হযরত উমর ইবন খাত্তাব (রা)-এর আগমন ঘটল। আমি তাঁকেও এ উদ্দেশ্য নিয়ে কুরআনে পাকের একটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। (এ আশায় যে) তিনি হয়ত আমাকে সঙ্গে করে ঘরে নিয়ে যাবেন। কিন্তু তিনি আমার প্রকৃত মনোভাবটি উপলব্ধি করলেন না। প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চলে গেলেন। আমাকে আর সঙ্গে করে নিলেন না। এরপর রহমতে আলম আবুল কাসিম এ পথে আগমন করলেন। তিনি আমার চেহারা দেখেই আমার অন্তরের ভাষা উপলব্ধি করে নেন। তিনি স্মিত হেসে বললেন, আবূ হির, আস, আমার সঙ্গে চল। আমি নবী -এর পিছু পিছু চললাম। তিনি উম্মুল মু'মিনীনদের একজনের ঘরে প্রবেশ করলেন। আমি বাহির থেকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে ভিতরে ডেকে নেন। এ সময় তিনি ঘরে এক পেয়ালা দুধ রক্ষিত আছে দেখলেন। জিজ্ঞেস করলেন, এ দুধ তোমার কাছে কোথা থেকে এসেছে? ঘরওয়ালারা বললেন, অমুক ব্যক্তি আপনার জন্য হাদিয়া পাঠিয়েছে। নবী তখন আমাকে বললেন, হে আবূ হির! যাও সুফফার সকলকে ডেকে আনো। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, এ কথা শুনে আমি বড় চিন্তায় পড়ে গেলাম। কেননা আহলে সুফফার সকলেই ইসলাম ও مسلمانوں মেহমান। তাদের কারোর না আছে কোন ঘরবাড়ি আর না কোন পরিবার-পরিজন। সাদাকার যে সকল জিনিস প্রিয় নবীর কাছে আসতো তিনি তা তাদের জন্য পাঠিয়ে দিতেন। তিনি নিজের জন্য এ থেকে কিছুই রাখতেন না। আর তাঁর কাছে যদি হাদিয়ার কোন কিছু আসতো তাহলে সকলকে ডেকে এনে নিজের সঙ্গে আহার করাতেন। তখন প্রিয় নবী নিজেও আহার করতেন, সঙ্গে অন্যরাও আহার করতো। (মোট কথা আহলে সুফ্ফার লোকেরা প্রায়ই অভুক্ত অবস্থায় দু'জাহানের রহমত নবী-এর অপেক্ষায় বসে থাকতেন।) আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, কাজেই নবী-এর আমাকে তাদের ডেকে আনতে পাঠানোর বিষয়টি আমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিলো। আমি মনে মনে ভাবলাম, আশা তো করেছিলাম আমি এ দুধটুকু পান করে কিছুটা স্বস্তি লাভ করবো। কিন্তু আহলে সুফফার সকলের সাথে এই এক পেয়ালা দুধের কতটুকু আমার ভাগ্যে আসবে। আবার যেহেতু আমিই তাঁদেরকে ডেকে আনছি, কাজেই তারা যখন আসবে নবী তখন আমাকেই সকলের মাঝে দুধ বণ্টন করে দিতে নির্দেশ দিবেন। (আমি নিজে রয়ে যাবো সকলের শেষে। কাজেই আমার জন্য কিছু অবশিষ্ট থাকবে কিনা বলা যায় না।)
কিন্তু আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ পালন ব্যতিরেকে কোন গত্যন্তরও নেই। এসব ভেবে আমি সুফাবাসীদের কাছে গেলাম। তাদেরকে ডাকলে তারা সকলে আসলেন। তারপর নবী -এর গৃহে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করলে তিনি অনুমতি দেন। সকলে নিজ নিজ আসনে বসার পর নবী আমাকে বললেন, হে আবূ হির! আমি বললাম, লাব্বাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তিনি বললেন, দাঁড়াও সকলকে একের পর এক দুধের এই পেয়ালা থেকে পান করতে দাও। সে মতে আমি পেয়ালাটি একজন থেকে নিয়ে অন্যজনকে পৌঁছিয়ে দিতে থাকি। তারা প্রত্যেকে তৃপ্তি ভরে পান করার পর পেয়ালা আমাকে ফেরত দিতেন। এভাবে পালাক্রমে আহলে সুফ্ফার সকলেই পেট পূর্ণ করে পান করার পর আমি পেয়ালাটি নিয়ে প্রিয় নবীর কাছে উপস্থিত হই। তিনি পেয়ালাটি নিজের সামনে রাখলেন। তারপর মাথা উপরে তুলে আমার দিকে তাকালেন এবং স্মিত হেসে বললেন, বসে পড়ো। আমি বসে গেলাম। তিনি বললেন, এবার তুমি পান করো। সে মতে আমি পেটভরে দুধ পান করলাম। তিনি পুনরায় আমাকে বললেন, পান করো। ফলে আমি আবার পান করি। (এভাবে তিনি বারবার আমাকে বলতে থাকেন আর আমি পান করতে থাকি।) অবশেষে আমি বললাম, কসম সেই সত্তার! যিনি আপনাকে সত্যসহ নবী বানিয়ে পাঠিয়েছেন, এক ঢোক পরিমাণ দুধ পান করার মতও কোন জায়গা খালি নেই। তিনি বললেন, ঠিক আছে পেয়ালাটি আমাকে দাও। আমি পেয়ালাটি প্রিয় নবীর হাতে তুলে দিলে তিনি মহান আল্লাহ্র প্রশংসা জ্ঞাপন করলেন এবং নিজেও সেই পেয়ালা থেকে পান করলেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসে প্রিয় নবী-এর এমন অত্যাশ্চর্য একটি মুজিযার বর্ণনা করা হয়েছে যা মানবীয় বুদ্ধি ও উপলব্ধির সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে। এক পেয়ালা দুধ নবী-এর বরকতে এবং তাঁর হাতে প্রকাশিত মুজিযা হিসাবে এত অধিক পরিমাণ হয়েছে যে, ষাট কিংবা সত্তর জন ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত মানুষের একটি দল তা থেকে তৃপ্তিভরে পান করার পরও তা শেষ না হওয়া মানুষের বুদ্ধির অগম্য। বস্তুতঃ মাক্সারে এ ধরনের আরো হাজার হাজার মুজিযা প্রিয় নবী-এর বরহক নবী হওয়ার কারণ করে। হযরত আবূ হুরায়রা (রা), যাকে আহলে সুফ্ফার এক পর্যায়ের নাযিম বলা চলে তিনিও মাত্র এক পেয়ালা দুধে এত সংখ্যক মানুষের জন্য যথেষ্ট হওয়ার বিষয়টি কল্পনা করতে পারেন নি। নিজে নিজের অস্থিরতা ও ব্যাকুলতার অবস্থা অতিশয় সরলতার সাথে ব্যক্ত করে দেন। আল্লাহ্ পাক এ সামান্য দুধে এত অত্যাশ্চর্যজনক বৃদ্ধি ও বরকত প্রদান করেন যে, তা সকলের জন্যই যথেষ্ট হয়ে গেল। বরং কিছু অবশিষ্টও রইল। মনে হয় যেন পেয়ালাটির পরতে পরতে কোন ঝর্ণা বিদ্যমান ছিল যে, মানুষ যতটুকু পান করেছিলো সঙ্গে সঙ্গে ততটুকু আবার পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।
এ হাদীস থেকে আরো বোঝা যায় যে, উম্মতের জন্য প্রিয় নবী ﷺ-এর মনে কতখানি আন্তরিকতা ও দরদ বিদ্যমান ছিলো। তাঁর দরদপূর্ণ দৃষ্টি উম্মতের অন্তরস্থ সূক্ষ্ম অবস্থা ও চিন্তাভাবনাকে তাদের চেহারা গবাক্ষপথ দিয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করত। হযরত আবূ বকর (রা)-এর দৃষ্টি আবূ হুরায়রা (রা)-এর চেহারা ও তার প্রশ্ন করা থেকে যে ভাবকে অনুধাবন করতে পারেননি, হযরত উমরের সচেতন চাহনি যা অনুভব করেনি দয়ার মহাসমুদ্র প্রিয় নবী ﷺ-এর দরদমাখা দৃষ্টি তা সহজেই উপলব্ধি করে নেয়।
এ হাদীস থেকে সবচেয়ে বড় যে কথাটি বোঝা যায় তা হলো অনাহারক্লিষ্ট সাহাবীদের আত্মমর্যাদাবোধ। তাঁরা অনাহার ও দারিদ্রে অকল্পনীয় যাতনা নীরবে সহ্য করতেন। কিন্তু কারোর সামনে তা প্রকাশ করতেন না। কারোর কাছে ভিক্ষা চাওয়া বা হাত পাতা তো কল্পনাই করা যায় না। এরাই হলেন সেসব দারিদ্র ব্যক্তিত্ব যাদের ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ্ পাকের ইরশাদ হলো : لِلْفُقَرَاءِ الَّذِينَ أُحْصِرُوا فِي سَبِيلِ اللهِ لَا يَسْتَطِيعُونَ ضَرْبًا فِي الْأَرْضِ يَحْسَبُهُمُ الْجَاهِلُ أَغْنِيَاءَ مِنْ التَّعَفُّفِ تَعْرِفُهُمْ بِسِيمَاهُمْ لَا يَسْأَلُونَ النَّاسَ إِلْحَافًا - প্রকৃত প্রাপ্য হলো সেসব অভাবগ্রস্ত লোকজনের, যারা আল্লাহ্ পথে এমনভাবে ব্যাপৃত থাকে যে, দেশময় ঘোরাফেরা করার সুযোগ থাকে না। যাচ্ঞা না করার কারণে অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে অভাবমুক্ত বলে ধারণা করে; (হে নবী) আপনি তাদেরকে লক্ষণ দেখেই চিনতে পারেন। তারা মানুষের কাছে নাছোড় হয়ে যাচ্ঞা করে না। (সূরা বাকারা : ২৭৩)
তাদের সম্পর্কে প্রিয় নবী ﷺ ইরশাদ করেন : يَدْخُلُ الْفُقَرَاءُ الْجَنَّةَ قَبْلَ الْأَغْنِيَاء অভাবগ্রস্তরা সম্পদশালীদের সত্তর বছর পূর্বে বেহেস্তে প্রবেশ করবে। (আল-হাদীস)
١٦٥. عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا حَدَّثَ بِالْحَدِيثِ أَوْ سَأَلَ عَنِ الْأَمْرِ كَرَّرَهُ ثَلَاثًا لَيُفْهِمْ وَيُفْهَمَ عَنْهُ -
অতি উত্তম যা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব, যদিও না সে আমল সামান্য পরিমাণের হয়। তারপর তিনি বললেন, আমাকে এখানে সালাত পড়তে কেবল এ আশংকাটিই বারণ করেছে যে, এ ব্যাপারে আবার আমার উপর এমন কোন নির্দেশনা অবতীর্ণ হয়ে যায় যা পালনে তোমরা সক্ষম হবে না।
ফায়দা : ইতিপূর্বে একটি হাদীসের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ তাঁর উম্মতের ব্যাপারে সীমাহীন দরদী ও অতিশয় দয়ালু ছিলেন। এমনকি তিনি তাদের বিভিন্ন ইবাদত পালন ও আমল করার ক্ষেত্রেও সহজসাধ্যতা ও সহজলভ্যতার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখতেন। এই দরদ ও দয়ার কারণেই তিনি রাতের সেই নিয়মিত নফল পড়া বর্জন করেন। এখানে নবী -এর আশংকাবোধ হয়েছিল যে, এভাবে নিয়মিত আদায় করা হলে এ সালাত উম্মতের উপর ফরয হয়ে যেতে পারে। আর তখন তাদের পক্ষে তা পালন করে যাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়বে।
١٦٧. عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ قَالَ بَعَثَنِي رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِلَى الْيَمِنِ وَذَكَرَ الْحَدِيثَ -
১৬৭. হযরত মুআয ইব্ন জাবাল (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাকে ইয়ামেনে (গভর্নর নিযুক্ত করে) প্রেরণ করেন। তারপর তিনি পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন।
ফায়দা : এ হাদীসটি জামে তিরমিযী গ্রন্থে পরিপূর্ণ বর্ণিত হয়েছে। সেখানে হযরত মুআয (রা) বলেছেন যে, প্রিয় নবী আমাকে ইয়ামেনের গভর্নর বানিয়ে পাঠান। আমি যখন যাত্রা করলাম তখন তিনি জনৈক ব্যক্তিকে পাঠিয়ে আমাকে পুনরায় ডাকালেন। আমি ফিরে আসার পর তিনি আমাকে বললেন, তুমি নিশ্চয় জান আমি তোমাকে লোক পাঠিয়ে ডেকে এনেছি কেন। তিনি আরো বললেন, দেখ "তুমি আমার অনুমতি ব্যতিরেকে হাদিয়ার নামে মানুষের কাছ থেকে কোন জিনিস গ্রহণ করো না। কেননা এটি খেয়ানতের মাল-এর অন্তর্ভুক্ত। যে ব্যক্তি খেয়ানতের মাধ্যমে সম্পদ গ্রহণ করবে তাকে কিয়ামতের দিন সেই মালসহ আল্লাহ্র সামনে উপস্থিত হতে হবে।" আমি তোমাকে এই এতটুকু কথা বলে দেয়ার জন্য পুনরায় ডেকে এনেছি। যাও, নিজের কর্তব্য পালন করো।
প্রিয় নবী -এর ওসীয়ত করার মূল কারণও হলো তাঁর অন্তরে উম্মতের প্রতি মমত্ববোধ। তিনি চাইতেন মানুষের উপর যেন কাজকে সহজ করা হয়, তাদের সাথে কোমল আচরণ করা হয়। গভর্নর বা শাসনকর্তাদেরকে হাদিয়া-তোহফা প্রদানের জটিলতা যেন তাদেরকে পোহাতে না হয়। প্রিয় নবী নিজেও এ নীতির উপর আমল করতেন এবং নিজের গভর্নরদেরকেও এ নীতি পালনের নির্দেশ দিতেন।
📄 নবী (সা)-এর ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা এবং ক্রোধ সংবরণ বিষয়ক রিওয়ায়াতসমূহ
١٦٨ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَاعِدًا فِي الْمَسْجِدِ وَمَعَهُ أَصْحَابُهُ إِذْ جَاءَ أَعْرَابِيٌّ فَبَالَ فِي الْمَسْجِدِ فَقَالَ أَصْحَابُ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ مَنْ مَهْ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لَا تَزْرِمُوهُ ثُمَّ دَعَاهُ فَقَالَ إِنَّ هَذَا الْمَسَاجِدَ لَا تَصْلَحُ لِشَيْ مِنَ الْقَدْرِ وَالْبَوْلِ وَالْخَلَاءِ إِنَّمَا هِيَ لِقَرَاءَةِ الْقُرْآنِ وَذِكْرِ اللَّهِ وَالصَّلَاةِ ثُمَّ دَعَا رَسُولُ اللَّهِ بِدَلُو مِنْ مَاءٍ فَشَنَّهُ عَلَيْهِ .
১৬৮. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ সাহাবাদের সঙ্গে মসজিদে উপবিষ্ট ছিলেন। তখন জনৈক বেদুঈন সেখানে আসলো এবং মসজিদের ভিতরে পেশাব করতে শুরু করলো। সাহাবাগণ তাকে বারণ করে বলতে লাগলেন, থাম! থাম! একথা শুনে নবী বললেন, (লোকটিকে পেশাব করতে) বাধা দিও না। তারপর তিনি লোকটিকে ডাকলেন এবং বললেন, দেখ এ মসজিদগুলো পেশাব-পায়খানা কিংবা এ জাতীয় কোন আবর্জনার জায়গা নয়। এগুলো হলো পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত, আল্লাহ্ পাকের যিকর ও সালাত পড়ার স্থান। তারপর তিনি এক বালতি পানি আনতে নির্দেশ দেন এবং পানিটি সেই জায়গায় প্রবাহিত করে দেন। (যেন মসজিদের মাটি পবিত্র হয়ে যায়।)
ফায়দা : উপরোক্ত ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ কতখানি ধৈর্য ও সহিষ্ণু এবং ক্রোধ নিবারণকারী ছিলেন। তিনি বেদুঈনের প্রতি কোমল আচরণ ও সহানুভূতি প্রদর্শন করেন। অতিশয় মমত্ববোধ ও উদারতা নিয়ে তাকে তিনি উপদেশ দেন। তারপর নিজেই সেই অপবিত্র স্থানটি পানি দ্বারা পবিত্র করেন। এই একটি ঘটনা থেকে নবী -এর কয়েকটি উন্নত চরিত্র মাধুরীর অনুমান করা যায়। যেমন : এক অজ্ঞ অসামাজিক লোকটির ক্রোধ উদ্দীপক ত্রুটির ব্যাপারে তিনি ধৈর্য-সহ্য ও সহিষ্ণুতার আচরণ করেন। তারপর আন্তরিকতা ও মমত্ববোধ প্রকাশের মাধ্যমে অতিশয় কার্যকর পদ্ধতিতে তাকে শিক্ষা দেন এবং তার নৈতিক ত্রুটির সংশোধন করেন। উপরন্তু এক অসাধারণ বিনয় প্রকাশের মাধ্যমে নিজেই মসজিদের সে স্থানটি ধুয়ে পবিত্র করেন। এভাবে মৌখিক উপদেশ ও সতর্কীকরণের সাথে সাথে কার্যতভাবেও মানুষের মনে মসজিদের পবিত্রতা ও সম্মান রক্ষার বিষয়টি বদ্ধমূল করে দেন। আল্লাহ্ পাক তাঁর উপর সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন।
١٦٩. عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبْرَى قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مِنْ أَحْلَمِ النَّاسِ وَأَصْبَرِهِمْ وَأَكْظَمِهِمْ لِلْغَيْظِ -
১৬৯. হযরত আবদুর রহমান ইবন আব্যা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক সহিষ্ণুতাপরায়ণ, সর্বাধিক ধৈর্যশীল ও সর্বাধিক ক্রোধ সংবরণকারী।
۱۷۰. عَنْ أَنَسٍ قَالَ بَيْنَمَا نَحْنُ جُلُوسِ إِذْ دَخَلَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مِنْ بَابِ الْمَسْجِدِ مُرْتَدِيًا بِبُرْدِ مِنَ النَّجْرَانِيَّةِ إِذْ تَبِعَهُ أَعْرَابِي ، فَأَخَذَ بِمَجَامِعِ الْبُرْدِ إِلَيْهِ ثُمَّ جَبَذَهُ إِلَيْهِ جَبْدَةً فَرَجَعَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فِي نَحْوِ الْأَعْرَابِي مِنْ شِدَّةِ جَبْنَتِهِ ، وَإِذَا أَثَرُ حَاشِيَةِ الْبُرْدِ فِي نَحْرِ رَسُولِ اللهِ ﷺ فَنَظَرَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللهِ وَضَحِكَ وَقَالَ مَا شَأْنُكَ فَقَالَ لَهُ يَا مُحَمَّدُ جَدْلِى مِنَ الْمَالِ الَّذِي عِنْدَكَ قَالَ مُرُوا لَهُ
১৭০. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা বসা ছিলাম। হঠাৎ রাসূলুল্লাহ দরজা দিয়ে মসজিদের ভিতরে প্রবেশ করলেন। নবী নাজরানে তৈরি একটি চাদর পরিহিত ছিলেন। এ সময় জনৈক বেদুঈন তাঁর পেছনে এসে দাঁড়ায়। সে নবী-এর চাদরের এক পার্শ্ব ধরে তাকে নিজের দিকে সজোরে টান দিয়েছিলো। ফলে নবী বেদুঈন লোকটির দিকে ঘুরে গেলেন এবং তাঁর গ্রীবাদেশে চাদর টানার দাগ পড়ে গেল। (লোকটির এই ত্রুটি ও অমার্জিত আচরণ সত্ত্বেও) তিনি তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন এবং বললেন, তোমার ব্যাপার কি? বেদুঈন লোকটি তাঁকে উত্তর দিল, হে মুহাম্মদ! আপনার কাছে যে সম্পদ আছে তা থেকে আমাকে কিছু দিন। নবী তাকে কিছু দান করতে নির্দেশ দিলেন।
ফায়দা : উপরোক্ত হাদীস থেকে রাসূলুল্লাহ্ -এর সীমাহীন কোমল আচরণের কথা সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়। মানুষের প্রতি তাঁর অসীম উদারতা ও ভালবাসা ছিল। একটি মূর্খ বেদুঈন লোকের এত বড় মূর্খতা ও অভদ্র আচরণ করা সত্ত্বেও তিনি না কোন কিছু মনে করেছেন, না তাকে কোনরূপ তিরস্কার করেছেন। বরং তার অভদ্র ও অসৌজন্যমূলক আচরণ সত্ত্বেও নিজের ক্রোধ নিবারণ করে নেন। নবী এ কারণে শুধু নিজের বিরক্তি বোধকেই চেপে রাখেন নি অধিকন্তু নিজে মৃদু হেসে তাকে কিছু দান করার জন্য নির্দেশও প্রদান করেন। এটি প্রিয় নবী -এর পয়গম্বর সুলভ উন্নত চরিত্র ও অনুপম মমত্ববোধের একটি নমুনা। আল্লাহ্পাক আমাদের সকলকে তাঁর এই উন্নত চরিত্র মাধুরীর পরিপূর্ণ অনুসরণের তাওফীক দান করুন। আমীন!
১৭১. عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنْ أَعْرَابِيًّا جَاءَ إِلَى النَّبِيِّ ﷺ يَسْتَعِينُهُ فِي شَيْءٍ ، فَأَعْطَاهُ شَيْئًا ثُمَّ قَالَ أَحَسَنْتُ إِلَيْكَ ؟ فَقَالَ الأَعْرَابِيُّ ، لَا ، وَلَا أَجْمَلْتَ ، قَالَ فَغَضِبَ الْمُسْلِمُونَ وَقَامُوا إِلَيْهِ ، فَأَشَارَ إِلَيْهِمْ أَنْ كُفُوًا ، قَالَ عِكْرِمَةُ قَالَ أَبُوْهُرَيْرَةَ ثُمَّ قَامَ النَّبِيُّ فَدَخَلَ مَنْزِلَهُ ثُمَّ أَرْسَلَ إِلَى الْأَعْرَابِي فَدَعَاهُ إِلَى الْبَيْتِ فَقَالَ إِنَّكَ جِئْتَنَا فَسَأَلْتَنَا فَأَعْطَيْنَاكَ فَقُلْتَ مَا قُلْتَهُ ، فَزَادَهُ رَسُولُ اللهِ ﷺ شَيْئاً ثُمَّ قَالَ أَحَسَنْتُ إِلَيْكَ ؟ قَالَ الْأَعْرَابِيُّ نَعَمْ ، فَجَزَاكَ اللَّهُ مِنْ أَهْلٍ وَعَشِيْرَةٍ خَيْرًا ، فَقَالَ لَهُ النَّبِيَّ ﷺ إِنَّكَ كُنْتَ جِئْتَنَا فَسَأَلْتَنَا فَأَعْطَيْنَاكَ وَقُلْتَ مَا قُلْتَ وَفِي أَنْفُسِ شَيْءٌ مِنْ ذَلِكَ فَإِنْ أَحْبَبْتَ فَقُلْ بَيْنَ أَيْدِيهِمْ ما قُلْتَ بَيْنَ يَدِى حَتَّى تَذْهَبَ مِنْ صُدُورِهِمْ مَا فِيهَا عَلَيْكَ قَالَ نَعَمْ ، قَالَ عِكْرِمَةً قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ فَلَمَّا كَانَ الْغَدَاءِ العَشِي جَاءَ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِنَّ صَاحِبَكُمْ هَذَا جَاءَ فَسَأَلُنَا فَأَعْطَيْنَاهُ وَقَالَ مَا قَالَ وَإِذَا دَعَوْنَاهُ إِلَى الْبَيْتِ فَأَعْطَيْنَاهُ زَعَمَ أَنَّهُ قَدْ رَضِيَ ، أَكَذَلِكَ ؟ قَالَ لأَعْرَابِيُّ نَعَمْ ، فَجَزَكَ اللَّهُ مِنْ أَهْلِ وَعَشِيْرَةٍ خَيْرًا ، قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ أَلَّا أَنَّ مَثَلِي وَمَثَلُ هُذَا الْأَعْرَابِي كَمَثَلِ رَجُلٍ كَانَتْ لَهُ نَاقَةٌ فَشَرِدَتْ عَلَيْهِ فَاتَّبَعَهَا النَّاسُ فَلَمْ يَزِيدُوهَا إِلَّا نُفُورًا فَنَادَاهُمْ صَاحِبُ النَّاقَةِ ! خَلُّوا بَيْنِي وَبَيْنَ نَاقَتِي ، فَأَنَا أَرْفَقُ بِنَا وَأَعْلَمُ فَتَوَجَّهُ لَهَا صَاحِبُ النَّاقَةِ بَيْنَ يَدَيْهَا وَأَخَذَ لَهَا مِنْ قِمَامِ الأَرْضِ فَرَدَّهَا هَوْنًا هَوْنًا حَتَّى جَاءَتْ وَاسْتَنَاخَتْ وَشَدَّ عَلَيْهَا وَإِنِّي لَوْ تَرَكْتُكُمُ حَيْثُ قَالَ الرَّجُلُ مَا قَالَ فَقَتَلْتُمُوهُ دَخَلَ النَّارَ -
১৭১. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত যে জনৈক বেদুঈন নবী -এর নিকট কিছু সাহায্য প্রার্থনার জন্য আসলো। নবী তাকে কিছু দান করলেন। তারপর বললেন, আমি কি তোমার প্রয়োজন পূরণ করিনি? তোমার প্রতি অনুগ্রহ করিনি? বেদুঈন উত্তর দিলো না, (আপনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেন নি এবং) আমার প্রতি সদাচার করেন নি। বর্ণনাকারী বলেন, লোকটির উত্তর শুনে উপস্থিত মুসলিমগণ ক্ষেপে গেলেন এবং তারা লোকটির দিকে উঠে আসলেন। কিন্তু নবী তাদের হাতের ইশারায় থামিয়ে দেন। হযরত ইকরিমা (রা) বলেন, যে বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর নবী উঠে দাঁড়ালেন এবং বাড়ির দিকে চলে গেলেন। তারপর বেদুঈন লোকটিকে বাড়ি আসার জন্য ডেকে পাঠালেন। (লোকটি, আসলে) তিনি তাকে বললেন যে, তুমি আমাদের কাছে এসে কিছু প্রার্থনা করেছো। আমরা তোমাকে (যতটুকু সম্ভব) দান করেছি। অথচ তুমি এর উপর যা বলার বলে দিয়েছো। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর নবী তাকে আরো কিছু মালামাল দান করে জিজ্ঞেস করলেন, এবার কি আমি তোমার সাথে সুন্দর আচরণ করলাম? লোকটি উত্তর দিল, জী হ্যাঁ! আল্লাহ্ আপনাকে এবং পরিবার-পরিজনকে উত্তম বিনিময় দান করুন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ লোকটিকে বললেন, দেখ, তুমি আমাদের কাছে এসে কিছু প্রার্থনা করেছো। আমরা তোমাকে কিছু দান করলাম। তাতে তুমি যা বলার বলেছো। কিন্তু এর কারণে আমরা সাহাবীদের মনে (তোমার উপর) অসন্তুষ্টির সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই তুমি যদি ভাল মনে করো তাহলে তাদের সামনে গিয়েও তুমি এ কথাটি বলো যা এখন আমার সাথে বলেছো। তা হলে তোমার ব্যাপারে তাদের মনে যে অসন্তুষ্টি বিদ্যমান তা দূরীভূত হয়ে যাবে। বেদুঈন লোকটি বললো, খুব ভাল কথা। হাদীসের বর্ণনাকারী ইকরিমা (র) বলেন যে, হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, অতঃপর যখন প্রভাত হলো (কিংবা তিনি বলেছেন) যখন সন্ধ্যা হলো তখন লোকটি (সাহাবীদের কাছে) আসলো। এ সময় নবী সাহাবীদেরকে লক্ষ করে বললেন, তোমাদের এই সাথী আমার কাছে এসে কিছু প্রার্থনা করেছিল। আমি তাকে কিছু দান করলাম। তাতে সে যা বলার বলেছে। এরপর আমি তাকে বাড়ি ডেকে নেই এবং আরো কিছু প্রদান করি। ফলে সে সন্তুষ্ট হয়ে গেছে। (তারপর তিনি বেদুঈন লোকটির দিকে তাকিয়ে) বললেন, ঘটনা কি এরূপ নয়? সে উত্তর দিল, জী হ্যাঁ। আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে এবং আপনার পরিবার-পরিজনকে উত্তম বিনিময় দান করুন। হযরত আবু হুরায়রা (রা) বলেন, মঃতপর নবী বললেন, দেখো এ বেদুঈন লোকটির সাথে আমার উদাহরণ হলো এমন যেমন কোন ব্যক্তির, যার একটি উট্রী ছিলো। উট্রী সেই লোকের কাছ থেকে ভয় পেয়ে "তে লাগলো। এ সময় লোকজন তাকে ধরার জন্য পেছনে পেছনে ছুটলো। ফলে তার ৩য় আরো বেড়ে গেলো। উটনীর মালিক তখন লোকজনকে বললো, তোমরা আমাকে আমার নীর পেছনে ছুটতে দাও। কেননা আমি এ উটনীর প্রতি তোমাদের চেয়ে অধিক রাণ এবং তার প্রকৃতি সম্পর্কে তোমাদের চেয়ে অধিক জ্ঞাত। তারপর মালিক নিজে .র দিকে অগ্রসর হলো এবং তাকে একটি উঁচুস্থানে গিয়ে ধরে ফেললো। তারপর ধীরে .রে তাকে ফিরিয়ে আনলো। উটনী ফিরে আসার পর মালিক তাকে বসাতে চাইলে সে বসে গেলে, এবং তার পিঠের উপর বোঝা বেঁধে নিলো। কাজেই আমি যদি তোমাদেরকে বেদুঈন লোকটির কথা বলার সময় ছেড়ে দিতাম তাহলে তখন তোমরা তাকে হত্যা করে ফেলতে। আর তাকেও জাহান্নামে চলে যেতে হতো।
ফায়দা : উল্লেখিত হাদীসটি রাসূলুল্লাহ্-এর উন্নত চরিত্র মাধুরী নির্দেশ করছে। এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, নবী নৈতিকতার সকল উন্নত আদর্শ ও গুণাবলির অধিকারী ছিলেন। মানবীয় জীবন ও চরিত্রের কোন একটি ক্ষুদ্র দিকও তার অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি থেকে বাইরে ছিলো না। তিনি সাহাবীদের মনমেজাজ ও প্রকৃতি সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন। সে কারণে কারোর কোন ত্রুটির উপর তাকে তাৎক্ষণিক পাকড়াও করতেন না। বেদুঈন লোকটির সাথে তাঁর আচরণ ঠিক এরূপই হয়েছিল। লোকটির অসৌজন্যমূলক উত্তর দান সত্ত্বেও তিনি তাকে কিছু বলেননি। আর সাহাবাদেরকেও কিছু বলতে অনুমতি দেননি। এহেন নরম আচরণ নবী এ জন্যও অবলম্বন করেছিলেন যেন লোকটির মনে অসন্তুষ্টি আরো বৃদ্ধি পেতে না পারে। তাই তিনি তাকে নিজ বাড়ি ডেকে নেন। অতিরিক্ত আরো কিছু দান করে তাকে খুশি করে দেন। ঘটনাটিকে তিনি সাহাবীদের কাছে একটি উপমার সাহায্যে ঘটনার প্রেক্ষিতসহ বুঝিয়ে দেন, যেন তাদের অন্তরেও লোকটির ব্যাপারে কোন খারাপ ধারণা অবশিষ্ট না থাকতে পারে। এক সার্বজনীন রহমত হিসেবে তাঁর আগমন এ কথার যাবতীয় দাবি ও চাহিদা তাঁর উপরোক্ত উন্নত চরিত্র ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কর্মপদ্ধতির দ্বারা পরিপূর্ণ হলো। আল্লাহ্ তা'আলা আমাদেরকে এ সকল চরিত্র সৌন্দর্য ও প্রজ্ঞার দ্বারা সুসমৃদ্ধ করুন।
۱۷۲. عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ سَلَامٍ قَالَ إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ لَمَا أَرَادَ هُدًى زَيْدِ بْنِ سَعْنَةَ قَالَ زَيْدُ مَا مِنْ عَلَامَاتِ النُّبُوَّةِ شَيْ إِلَّا وَقَدْ عَرَفْتُهَا فِي وَجْهِ مُحَمَّدٍ حِيْنَ نَظَرْتُ إِلَيْهِ إِلَّا إِثْنَانِ لَمْ أَخْبَرْهُمَا مِنْهُ يَسْبِقُ حِلْمُهُ جَهْلَهُ وَلَا يَزِيدُهُ شِدَّةُ الْجَهْلِ إِلا حِلْمًا ، فَكُنْتُ أَنْطَلِقُ إِلَيْهِ لِأُخَالِطَهُ فَاعَرِفَ حِلْمَهِ مِنْ جَهْلِهِ فَخَرَجَ يَوْمًا مِنَ الحُجُرَاتِ يُرِيدُ النَّبِيَّ ﷺ وَمَعَهُ عَلَى بْنُ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ، فَجَاءَ رَجُلُ يَسِيرُ عَلَى رَاحَلَتِهِ كَالْبَدْوِي فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ قَرْيَةُ بَنِي فُلَانٍ أَسْلَمُوا وَدَخَلُوا فِي الإِسْلَامِ وَحَدَّثْتُهُمْ أَنَّهُمْ إِنْ أَسْلَمُوا أَتَتْهُمْ أَزْقُهُمْ رَغَدًا وَقَدْ أَصَابَتْهُمْ سَنَةً وَشِدَّةً وَقُحُوطٌ مِنَ الْعَيشِ وَإِنِّي مُشْفِقُ أَنْ يَخْرُجُوا مِنَ الإِسْلَامِ طَمَعًا كَمَا دَخَلُوْا فِيْهِ طَمَعًا، فَإِنْ رَأَيْتَ أَنْ تُرْسِلَ إِلَيْهِمْ بِشَيْ تُعِينُهُمْ بِهِ فَعَلْتَ، فَقَالَ زَيْدُ بْنُ سَعْنَةُ فَقُلْتُ أَنَا أَبْتَاعُ مِنْكَ بِكَذَا وَكَذَا وَسَقًّا فَبَايَعْنِي وَأَطْلَقْتُ هِمْيَانِي وَأَعْطَيْتُهُ ثَمَانِينَ دِينَارًا ، فَدَفَعْهَا إِلَى الرَّجُلِ وَقَالَ أَعْجِلْ عَلَيْهِمْ بِهَا وَأَعْتُهُمْ فَلَمَّا كَانَ قَبْلَ الْمَحَلِّ بِيَوْمِ أَوْ يَوْمَيْنِ أَوْ ثَلَاثَةِ فَخَرَجَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِلَى جَنَازَةٍ بِالْبَقِيعِ وَمَعَهُ أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرَ فِي نَفَرٍ مِنْ أَصْحَابِهِ فَلَمَّا صلَّى عَلَى الجَنَازَةِ وَدَنَا مِنَ الْجِدَارِ جَذَبْتُ بُرْدَيْهِ جَبْدَةً شَدِيدَةٍ حَتَّى سَقَطَ عَنْ عَاتِقِهِ، ثُمَّ أَقْبَلْتُ بِوَجْهِ جَهْرٍ غَلِيْظٍ فَقُلْتُ أَلا تُقْضِيْنِي يَا مُحَمَّدُ فَوَ اللَّهِ مَا عَلِمْتُكُمْ بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ لَمُطِلُّ وَقَدْ كَانَ لِي بِخَالَطِيكُمْ عِلْمُ قَالَ زَيْدُ فَارْتَعَدَتْ فَرَائِضُ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ كَالْفُلْكِ الْمُسْتَدِيْرِ ثُمَّ رَمَى بِبَصَرِهِ ثُمَّ قَالَ أَيْ عَدُوٌّ اللَّهِ اَتَقُوْلُ هَذَا لِرَسُولِ اللهِ ؟ وَتَصْنَعُ بِهِ مَا أَرَى وَتَقُولُ مَا اسْمَعُ فَوَالَّذِي بَعَثَهُ بِالْحَقِّ لَوْلاَ مَا أَخَافُ فَوْقَهُ لِسَبَقِنِي رَاسُكَ وَرَسُولُ اللَّهِ يَنْظُرُ إِلَى عُمَرَ فِي تَوْدَةٍ وَسُكُونٍ ثُمَّ تَبَسَّمَ ثُمَّ قَالَ لَأَنَا وَهُوَ أَحْوَجُ إِلَى غَيْرِ هَذَا أَن تَأمُرَنِي بِحُسْنِ الأَدَاءِ وَتَامُرَهُ بِحُسْنِ اتبَاعِةِ إِلَى هُنَا عَنْ أَبِي عَاصِمٍ وَزَادَ أَبُو زُرْعَةَ فِي حَدِيثِهِ اذْهَبْ بِهِ يَا عَمَرُ فَاقْضِ حَقَّهُ وَزِدْهُ عِشْرِينَ صَاعًا مِنْ تَمَرٍ مَكَانَ مَا رَعَتْهُ قَالَ زَيْدُ بْنُ سَعْنَةَ فَذَهَبَ بِي عَمَرُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ فَقَضَانِي حَتَّى وَزَادَنِى صَاعًا مِنْ تَمَرٍ، فَقُلْتُ مَا هَذَا قَالَ أَمَرَنِي رَسُولُ اللهِ ﷺ أَنْ أَزِيدَكَ مَكَانَ مَا رَعَتْكُ فَقُلْتُ أَتَعْرَفُنِي يَا عُمَرَ؟ قَالَ لَأَفَمَنْ أَنْتَ ؟ قَالَ أَنَا زَيْدُ ابْنُ سَعْنَةَ قَالَ الْحِبْرُ؟ قُلْتُ الْحِبْرُ قَالَ فَمَا دَعَاكَ إِلَى أَنْ تَفْعَلَ بِرَسُولِ اللهِ ﷺ مَا فَعَلْتَ وَتَقُوْلُ لَهُ مَا قُلْتُ قُلْتُ يَا عُمَرُ إِنَّهُ لَمْ يَبْقَ مِنْ عَلَامَاتِ النَّبُوَّةِ شَيْ إِلَّا وَقَدْ عَرَفْتُهَا فِي وَجْهِ رَسُولِ اللَّهِ حِيْنَ نَظَرْتُ إِلَيْهِ إِلَّا اثْنَتَانِ لَمْ أَخْبِرْهُمَا مِنْهُ يَسْبَقُ حِلْمُهُ جَهْلَهُ ، وَلَا يَزِيدُهُ شِدَّةُ الْجَهْلِ عَلَيْهِ إِلَّا حِلْمًا فَقَدِ اخْتَبَرْتُهُ مِنْهُ فَأَشْهَداكَ يَا عُمَرُ انَّنِي قَدْ رَضِيْتُ بِاللَّهِ رَبَّا وبلاسْلامَ دِينًا وَبِمُحَمَّد الله نَبِيًّا ، وَأَشْهِدُكَ أَنَّ شَطْرَ مَالِيٍّ - فَإِنِّي أَكْثَرُهَا مَالاً - صَدَقَة عَلَى أُمَّةٍ مُحَمَّدٍ فَقَالَ عُمَرُ أَوْ عَلَى بَعْضُهُمْ فَائِكَ لَا تَسَعُهُمْ كُلُّهُمْ قُلْتُ أَوَ عَلَى بَعْضِهِمْ، قَالَ فَرَجَعَ عَمَرُ وَزَيْدُ بْنُ سَعْنَةَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَقَالَ زَيْدُ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلهَ إِلَّا اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّdًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ فَامَنَ بِهِ وَصَدَّقَهُ وَبَايَعَهُ وَشَهِدَ مَعَهُ مَشَاهِدَ كَثِيرَةً -
১৭২. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন সালাম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহান আল্লাহ্ যখন যায়িদ ইবন সা'না (রা)-কে হেদায়েতের ইচ্ছা করলেন তখন যায়িদ ইবন সা'না বলল, আমি মুহাম্মদ মুস্তফা-এর চেহারা মুবারক দর্শন করেই তাঁর নবুওয়াতের নিদর্শনসমূহের দু'টি ব্যতীত অবশিষ্ট সবগুলি অনুধাবন করে নিয়েছি। যে দু'টি আমি অনুধাবন করতে পারিনি সেগুলি হলো, (এক) তাঁর এ পরিমাণ ধৈর্যশীলতা যে, তাঁর ক্রোধের উপর সহিষ্ণুতা প্রবল থাকবে। (দুই) তাঁর সহিত যত বেশি মূর্খতার আচরণ করা হবে ততই তাঁর ধৈর্যশীলতা বৃদ্ধি পাবে। যায়িদ ইবন সা'না বলেন, আমি এ দুটি নিদর্শনের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য চেষ্টা করি।
আমি তাঁর দরবারে বারবার আসা-যাওয়া করি এবং তাঁর সান্নিধ্যে উপস্থিত থেকে ধৈর্যশীলতার গুণ পর্যবেক্ষণ করি, একদা তিনি হুজরাগুলোর কোন একটি থেকে বেরিয়ে আসলেন। হযরত আলী ইব্ন আবু তালিব (রা)-ও তাঁর সঙ্গে ছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি একটি বাহনে আরোহণ করে আসল। তাকে দেখতে বেদুঈন মনে হচ্ছিল। লোকটি নবী-কে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্। অমুক গোত্রের লোকেরা ইসলাম কবুল করেছে। আমি তাদেরকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলাম যে, তারা যদি ইসলাম কবুল করে তাহলে তাদের রুজি-রোজগারে সমৃদ্ধি আসবে। অথচ বর্তমানে তারা অভাব-অনটন ও দুর্ভিক্ষে জীবন যাপন করছে। কাজেই আমার আশংকা হচ্ছে যে, তারা যে ভাবে লোভ নিয়ে ইসলামে প্রবেশ করেছে তদ্রূপ অন্য কোন লালসায় পড়ে ইসলাম থেকে বেরিয়ে না যায়। অতএব আপনি যদি ভাল মনে করেন, সাহায্য হিসেবে তাদের জন্য কিছু পাঠিয়ে দিন। (এ কথা শুনে) যায়িদ ইবন সা'না নবী-কে বললেন, আপনি আমার সাথে একটি (অগ্রিম) কেনাবেচা করুন। আমি আপনার নিকট থেকে টাকার বিনিময়ে এক ওয়াসাক জিনিস খরিদ করলাম। এ কথা বলে আমি আমার থলি খুললাম এবং আশিটি স্বর্ণমুদ্রা বের করে নবীকে দিলাম। নবী সেই টাকা লোকটির হাতে দিয়ে বললেন, এ টাকা নিয়ে তুমি তাদের কাছে দ্রুত পৌঁছে যাও এবং তাদের সাহায্য কর। যায়িদ ইবন সা'না (রা) বলেন, তারপর যখন মাল পরিশোধ করার সময় ঘনিয়ে আসল, কেবল দু'-একদিন বাকি। এ সময় তিনি মদীনাবাসীদের গোরস্থান জান্নাতুল বাকীতে এক জানাযায় অংশগ্রহণের জন্য বাইরে আসলেন। হযরত আবু বকর ও হযরত উমর (রা) সহ কতিপয় সাহাবীও তাঁর সঙ্গে ছিলেন। নবী যখন সালাত শেষ করে দেওয়ালের কাছে আসলেন তখন আমি তাঁকে তাঁর চাদরের উভয় পার্শ্ব ধরে সজোরে টান দিলাম যে, গ্রীবাদেশ থেকে চাদরটি নিচে পড়ে গেল। আমি খুবই রূঢ়ভাবে চেহারা বিকৃত করে তাঁর দিকে তাকালাম এবং বললাম, হে মুহাম্মদ! আপনি কি আমার পাওনা পরিশোধ করবেন না? আল্লাহর শপথ! আবদুল মুত্তালিবের গোষ্ঠীর মধ্যে আমি আপনাকে চিনি। আপনি অত্যন্ত টালবাহানাকারী। আপনাদের সাথে চলাফেরা করে আমার এ কথা বুঝতে আর বাকি নেই। (যায়িদ ইবন সা'না) বলেন, (একথা) শুনে হযরত উমর (রা)-এর ঘাড় ও বুক (ঢেউয়ের মাঝে) গোলাকার নৌযানের ন্যায় কাঁপতে শুরু করলো। তিনি চোখ পাকিয়ে আমার দিকে তাকাতে লাগলেন। তারপর বললেন, ওহে আল্লাহর দুশমন! তুমি এমন কথা রাসূলুল্লাহ্-কে বলছো? প্রিয় নবীর সঙ্গে তুমি কি আচরণ করছো? আমি তা দেখে যাচ্ছি আর কী সব কথা বলছো তাও শুনে যাচ্ছি। সেই সত্তার শপথ! যিনি তাঁকে সত্য নবী বানিয়ে পাঠিয়েছেন, যদি আমি আমার ইচ্ছার সেই জিনিসটি নষ্ট হওয়ার আশংকা না করতাম তা হলে আমি তোমার গর্দান উড়িয়ে দিতাম। নবী তখন অতিশয় ধীরসুস্থ ও শান্ত প্রকৃতিতে হযরত উমরের দিকে তাকাচ্ছিলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন, হে উমর, আমার ও এ ব্যক্তির ব্যাপারে এ কথা বলার বদলে অন্য একটি কর্মপদ্ধতি অবলম্বনের প্রয়োজন ছিলো। প্রয়োজনের সে কাজটি হলো তুমি আমাকে তার পাওনা সুন্দরভাবে আদায় করতে বলবে এবং তাকে নরম ভাষায় চাওয়ার নির্দেশ দিবে। আবূ আসিম (রা) হাদীসটির এ পর্যন্ত বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হযরত আবূ যুরআহ (রা) পরবর্তী অংশ সম্পর্কে বলেন, তারপর নবী বললেন, হে উমর! লোকটিকে সঙ্গে নিয়ে যাও এবং তার পাওনা শোধ করে দাও। অধিকন্তু তুমি যেহেতু তাকে ভীতি প্রদর্শন করেছো তাই তাকে বিশ সা' অতিরিক্ত প্রদান করবে। যায়িদ ইবন সা'না (রা) বলেন, অতঃপর হযরত উমর (রা) আমাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যান এবং আমার পাওনা শোধ করে অতিরিক্ত সা' খেজুরও প্রদান করেন। আমি তাকে বললাম, অতিরিক্তটি কিসের বিনিময়ে? তিনি বললেন, নবী আমাকে আদেশ করেছেন যে, আমি যেহেতু তোমাকে ভীতি প্রদর্শন করেছি, এ কারণে তোমাকে কিছু বেশি প্রদান করতে। আমি তাকে বললাম, হে উমর! আপনি আমাকে চেনেন? তিনি বললেন, না, চিনি না। তুমি কে? তখন আমি বললাম, আমি যায়িদ ইবন সা'না। উমর (রা) বললেন, ইয়াহুদীদের পণ্ডিত সা'না? আমি বললাম, জী হ্যাঁ। হযরত উমর (রা) বললেন, তা হলে তুমি প্রিয় নবী -এর সাথে এহেন আচরণ ও এহেন অভদ্র কথাবার্তা বলেছ কেন? আমি বললাম, হে উমর! কথা হলো আমি যখন রাসূলুল্লাহ -এর চেহারার দিকে তাকালাম তখন তাঁর চেহারায় দু'টি ব্যতীত নবুওয়াতের সব চিহ্ন দেখতে পেয়েছি। অবশিষ্ট সেই দু'টি হলো তাঁর ধৈর্যশীলতা ও সহিষ্ণুতা এমন থাকবে যে, তাঁর ধৈর্য তাঁর ক্রোধের উপর প্রবল থাকবে। অপরটি হলো তাঁর সাথে যতই রূঢ় আচরণ করা হবে ততই তাঁর মধ্যে ক্ষমা ও সহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পাবে। কাজেই হে উমর! এখন আমি তোমাকে সাক্ষী রাখছি, আমি মহান আল্লাহকে প্রভু হিসাবে, দীন ইসলামকে সত্য দীন হিসাবে এবং হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা -কে সত্য নবী হিসেবে মেনে নিতে সম্মত। (অর্থাৎ আমি ঈমান আনয়ন করলাম।) আমি তোমাকে আরো সাক্ষী বানাচ্ছি যে, আমার অর্ধেক সম্পদ নবী -এর উম্মতের জন্য ওয়াকফ করে দিচ্ছি। কেননা আমার কাছে প্রচুর সম্পদ রয়েছে। হযরত উমর (রা) বললেন, না কিছু সংখ্যক উম্মতের জন্য? কেননা উম্মতের সকলের জন্য এ সম্পদ যথেষ্ট হবে না। আমি বললাম, ঠিক আছে, উম্মতের কিছু সংখ্যকের জন্য। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর যায়িদ ইবন সা'না ও হযরত উমর (রা) উভয়ে নবী -এর দরবারে উপস্থিত হন। এবং যায়িদ ইবন সানা (রা) কালেমা পড়ে বলেন : أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ الأَاللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ্ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিতেছি যে, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা আল্লাহ্র বান্দা ও তাঁর রাসূল। এভাবে যায়িদ ইব্ন সানা (রা) আল্লাহর উপর ঈমান আনয়ন করলেন এবং প্রিয় নবী -এর হাতে বায়'আত গ্রহণ করলেন। তারপর প্রিয় নবী -এর সাথে বহু সংখ্যক যুদ্ধেও তিনি অংশ গ্রহণ করেন।
ফায়দা: এই বিস্তারিত ঘটনাটি থেকে অনুমান করা যায় যে, নবী কতখানি ধৈর্য- গুণসম্পন্ন, সহিষ্ণুতাপরায়ণ ও ক্রোধ দমনকারী ছিলেন। একজন অমুসলিমের এতটুকু ধৃষ্টতা প্রদর্শন সত্ত্বেও নবী তাকে কিছুই বললেন না। অধিকন্তু হযরত উমর (রা) তাকে ভয় দেখানোর কারণে তিনি তার ন্যায্য পাওনার অতিরিক্ত আরো কিছু প্রদান পূর্বক লোকটিকে ভীতিমুক্ত এবং সন্তুষ্ট করার নির্দেশ দেন। নবী-এর এই পরম ধৈর্যশীলতার ফল দাঁড়াল যে, যায়িদ ইবন সা'না (রা) সঙ্গে সঙ্গে তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। বস্তুত জগত জুড়ে ইসলামের ব্যাপকভাবে প্রসারতা লাভের পেছনে প্রিয় নবী-এর উন্নত চরিত্র মাধুরী ও মহৎ আচরণই ছিল সবচেয়ে বড় উপকরণ। তাঁর উন্নত আদর্শের আকর্ষণে লোকজন তাঁর নিকটবর্তী হতে থাকে, তাঁকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ পাক এই উন্নত চরিত্র মাধুরীকে নিম্নোক্ত ভাষায় উপস্থাপন করেছেন:
فَبِمَا رَحْمَةً مِّنَ اللهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ، فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ.
আল্লাহর দয়ায় আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছিলেন। যদি আপনি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতেন তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। সুতরাং আপনি তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। (সূরা আল ইমরান: ১৫৯)
মানুষের প্রতি কোমল আচরণ করা ও ক্ষমাশীল হওয়া উন্নত চারিত্রিক গুণের পরিচায়ক। মহান আল্লাহ্ আমাদের সকলকে উন্নত চরিত্র অবলম্বনের পূর্ণ তাওফীক প্রদান করুন। আমীন!
۱۷۳ عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ عَنْ أَبِيهِ قَالَ أَقْبَلَ أَعْرَابِي عَلَى نَاقَةٍ حَتَّى أَنَّاحُ بَيَابِ الْمَسْجِدِ فَدَخَلَ عَلَى نَبِيِّ اللهِ وَحَمْزَةُ بْن عَبْدِ الْمُطْلَبِ جَالِسُ فِي نَفَرٍ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالأَنْصَارِ فِيهِمُ النُّعَيْمَانُ، فَقَالُوا لِلنُّعْمَانِ وَيْحَكَ إِنْ نَاقَتَهُ نَاوِيَة يعني سَمِينَةُ فَلَوْ نَحَرْتَهَا فَإِنَّا قَدْ قَرَمْنَا إِلَى اللَّحْمِ وَلَوْ قَدْ فَعَلْتَ غَرِمَها رَسُولُ اللهِ ﷺ وَأَكَلْنَا لَحْمًا، فَقَالَ إِنِّي إِنْ فَعَلْتُ ذَلِكَ وَأَخْبَرْتُمُوهُ بِمَا صنعت وجَدْ عَلَى رَسُولِ اللهِ ﷺ قَالُوا لَا تَفْعَلْ فَقَامَ فَضَرَبَ فِي ابْتِهَاتُمُ انْطَلَقَ فَمَرْ بِالْعِقْدَادِ بْنِ عَمْرٍ وَ وَقَدْ حَضَرَ حَفْرَةٌ وَقَدْ اسْتَخْرَجَ مِنْهَا طَيِّنًا. فقَالَ يَا مِقْدَادُ : غَيْبَنِي فِي هذه الحفرة وأطبق على شَيْئًا وَلَا تَدُلُّ عَلَى شَيْئًا فَإِنِّي قَدْ أَحَدِثْتُ حدثًا، فَفَعَلَ فَلَمَّا خَرَجَ الأَعْرَابِيُّ رَأَى نَاقَتَهُ فَصَرَخَ فَخَرَجَ نَبِيُّ V الله ﷺ فَقَالَ مَنْ فَعَلَ هَذَا؟ قَالُوُل نُعَيْمَانُ ، قَالَ وَأَيْنَ تَوَجَّهَ فَتَبِعَهُ رَسُولُ الله ﷺ وَمَعَهُ سَمَزَةُ وَأَصْحَابُهُ حَتَّى أَتَى عَلَى الْمِقْدَادِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لِلْمِقْدَادِ هَلْ رَأَيْتَ لِي نُعَيْمَانَ؟ فَصَمَتَ فَقَالَ لَتُخْبِرَنِي أَيْنَ هُوَ؟ فَقَالَ مَالِي بِهِ عِلْمٍ ؟ وَأَشَارَ بِيَدِهِ إِلَى مَكَانِهِ فَكَشَفَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَقَالَ أَيْ عَدُوٌّ نَفْسِهِ مَاحَمَلَكَ عَلَى مَا صَنَعْتَ؟ قَالَ وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ الأَمَرَنِي بِهِ حَمْزَةُ وَأَصْحَابِهِ وَقَالُوا كَيْتَ وَكَيْتَ فَأَرْضَى رَسُولُ اللهِ ﷺ وَالأَعْرَابِي مِنْ نَاقَتِهِ وَقَالَ شَأْنُكُمْ بِهَا فَأَكُلُوْهَا وَكَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا ذَكَرَ صَنِيْعَهُ ضَحِكَ حَتَّى تَبْدُو نَوَاجِذُهُ -
১৭১. হিশাম ইব্ন ওরওয়া তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করে বলেন, একদা জনৈক বেদুঈন একটি উষ্ট্রীর উপর আরোহণ করে নবী -এর সাক্ষাতে আসল। লোকটি মসজিদে নববীর দরজায় উট্রীটিকে বসিয়ে নবী-এর সাক্ষাতের জন্য ভিতরে প্রবেশ করে। সেখানে হযরত হামযা ইব্ন আবদুল মুত্তালিব (রা) কতিপয় মুহাজির ও আনসার সাহাবীসহ বসা ছিলেন। তন্মধ্যে হযরত নুআইমানও উপস্থিত ছিলেন। সাথীরা হযরত নুআইমান (রা)-কে বললেন, আরে তুমি কি বেদুঈন লোকটির উট্রীটি দেখতে পাচ্ছ না? কী মোটা-তাজা! এটি যদি যবেহ করতে পারতে! কেননা আজ আমাদের গোস্ত খাওয়ার ইচ্ছা হচ্ছে। তুমি এমনটি ঘটিয়ে ফেললে নবী উটনীর মালিককে জরিমানা আদায় করে দেবেন। এদিকে গোশ্তও আমরা বিনামূল্যে পেয়ে যাবো। নুআইমান (রা) বললেন, আমি এমনটা করে ফেললে তোমরা রাসূলুল্লাহ্ -এর কাছে আমার কথা বলে দেবে। আর তখন তিনি আমার প্রতি রাগ করবেন। সাথীগণ বললেন, না, আমরা তা কিছুতেই করবো না। সে মতে হযরত নুআইমান (রা) দাঁড়ালেন এবং উট্রীটিকে নাহর করে দিলেন। তারপর সে স্থান ত্যাগ করে চলে গেলেন। পথিমধ্যে হযরত মিক্দাদ ইব্ন আমর (রা)-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। হযরত নুআইমান (রা) তাঁকে বললেন, হে মিকদাদ! তুমি আমাকে এ গর্তে লুকিয়ে থাকতে দাও। আমার মাথার উপর কোন কিছু দিয়ে ঢেকে ফেলো। আর আমার কথা কাউকে জানাবে না। কেননা আমি একটি নতুন দুষ্টমী করে আসছি। হযরত মিকদাদ (রা) তাই করলেন।
এদিকে বেদুঈন লোকটি মসজিদ থেকে বের হয়ে যখন নিজের উট্রী মাটিতে পড়া অবস্থায় দেখল তখন সে চিৎকার দিতে লাগল। এ কাজ করেছে কে? লোকজন বললো, নুআইমান। নবী বললেন, সে কোন্ দিকে গিয়েছে? তারপর তিনি তাঁকে খুঁজতে লাগলেন। হযরত হামযা ও তাঁর সাথীগণও নবী -এর সঙ্গে সঙ্গে চললেন। অবশেষে তাঁরা হযরত মিকদাদ (রা) পর্যন্ত পৌঁছলে রাসূলুল্লাহ্ তাঁকে বললেন, হে মিকদাদ! তুমি কি নুআইমানকে দেখেছো? হযরত মিকদাদ (রা) নিরুত্তর। নবী বললেন, তোমাকে বলতে হবে সে কোথায়? হযরত মিকদাদ (রা) মুখে আমি জানি না বলে হাতের ইশারায় সে স্থানটি দেখিয়ে দেন। সে মতে নবী গর্তের ঢাকনা সরালেন এবং বললেন, আরে নিজ প্রাণের দুশমন। এমনটা করলে কেন? নুআইমান বললেন, কসম আমাকে তো হযরত হামযা ও তাঁর সাথীরা এমনটা করতে বলেছে। তাঁরা আমাকে এ সব কথাও বলেছিল। নবী তখন বেদুঈন লোকটিকে তার উটনীর বিনিময়ে কিছু মালামাল দিয়ে সম্মত করান। তারপর বললেন, যাও উট্নীটি নিয়ে যাও। সেমতে সাথীগণ উট্নীটি নিয়ে গোশ্ত আহার করে। পরবর্তীকালে যখনই নবী তাদের এই দুষ্টুমির কথা মনে করতেন তখন তাঁর হাসি রোধ করতে পারতেন না। তিনি খিলখিল করে হেসে ফেলতেন এমনকি তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত দেখা যেত।
ফায়দা: উল্লিখিত হাদীস থেকেও এ কথা বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ সীমাহীন ক্ষমাশীল ও দয়ালু ছিলেন। কোন কাজে তিনি রাগ করতেন না। তবে হ্যাঁ, যদি দীনী কোন কাজে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হতো তখন তিনি অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করতেন।
١٧٤ عَنْ عُبَيْدِ اللهِ بْنِ الْمُغِيرَةَ قَالَ سَمِعْتُ عَبْدَ اللهِ بْنِ الْحَارِثِ بْنِ جَزْء يَقُوْلُ مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَكْثَرَ مِزَاحًا مِنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ وَلَا أَكْثَرَ تَبَسُمًا مِنْهُ وَإِنْ كَانَ يَسَنُوْ أَهْلَ الصَّبِيِّ إِلَى مِزَاحِهِ -
১৭৪. হযরত উবায়দুল্লাহ্ ইব্ন মুগীরা (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ্ ইব্ন হারিস (রা) থেকে শুনেছি যে, তিনি বলেন, আমি না রাসূলুল্লাহ্ অপেক্ষা অধিক কাউকে কৌতুক করতে দেখেছি, আর না তাঁর চেয়ে অধিক কাউকে মুচকি হাসি হাসতে দেখেছি। আর বাচ্চাদের অভিভাবকরা তো তাঁর এ কৌতুক করাকে নিজেদের গর্ব বলে বোধ করতো এবং খুবই আনন্দিত হতো। এর কারণ ছিলো নবী বাচ্চাদের সাথে খুবই কৌতুক করতেন।
ফায়দা: নবী থেকে যেভাবে কৌতুক করা প্রমাণিত আছে তদ্রূপ কৌতুক করার উপর নিষিদ্ধতাও বর্ণিত হয়েছে। হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থে এ নিষেধ বিদ্যমান। কাজেই বিষয়টির ব্যাখ্যা আবশ্যক, যাতে বোঝা যায় যে, কোন্ ধরনের কৌতুক জায়িয ও পছন্দনীয়, আর কোন্ ধরনের কৌতুক নিষিদ্ধ। বস্তুত কৌতুকের দু'টি রূপ আছে। একটি হলো, এমন কৌতুক যা ব্যক্তিকে মহান আল্লাহ্র স্মরণ ও তাঁর যিকর ফিকর থেকে উদাসীন বানিয়ে দেয়। যা ব্যক্তির কঠোর চিন্তার কারণ হয়ে থাকে। এ ধরনের কৌতুক করা সাধারণত হাটে-বাজারের লোকদের নীতি। তারা কথায় কথায় হাসি-ঠাট্টা করে। নানা গল্প-গুজবে মত্ত থাকে। এ সব কৌতুকের সঙ্গে সত্যতা ও বাস্তবতার লেশমাত্র সম্পর্ক থাকে না। কাজেই এ প্রকৃতির কৌতুক একজন মুসলিমের মান-সম্মান ও গাম্ভীর্যকে খুইয়ে দেয়। অধিকন্তু এ ধরনের কৌতুক কখনো কখনো অন্যজনের সম্মান হানি কিংবা উপহাস এমনকি মনকষ্টের কারণ হয়ে থাকে। কাজেই এটি শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েয। কিন্তু যে কৌতুক মানব মনের প্রফুল্লতা বৃদ্ধি করে সেখানে সে সব জিনিস থাকে না। বরং এ কৌতুক দ্বারা অন্যজনের মন সন্তুষ্টি, প্রসন্নতা, আনন্দ ও চিত্তসুখ বৃদ্ধি পায়। যেগুলি সত্যনির্ভর হয়ে থাকে অর্থাৎ কৌতুক বটে। তবে সত্য ও বাস্তবসম্মত। এমন কৌতুক করতে দোষ নেই বরং মুস্তাহাব ও মসনূন বলা চলে। যেমন একটি হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, সাহাবীগণ বলেছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি আমাদের সঙ্গে কখনো কখনো কৌতুকও করে থাকেন। নবী বললেন, হ্যাঁ, তাতে আপত্তির কি আছে? কিন্তু এ কৌতুকে আমি অসত্য কথা বলি না। (শামায়েলে তিরমিযী।)
١٧٥ عَنْ عُبَيْدِ بْنِ عُمَيْرٍ قَالَ كُنْتُ عِنْدَ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا وَنَحْنُ نَذْكُرُ حُمَّى الْمَدِينَةَ وَانْتِقَالَهَا إِلى مَهِيعَةَ وَنَضْحَكُ ثُمَّ صِرْنَا إِلَى حَدِيْثِ بَرِيرَةَ وَمَسْكَنِهَا، إِذْ افْتَتَحَ عَلَيْنَا عَبْدُ اللهِ بْنِ عُمَرَ وَ فَلَمَّا رَأَيْنَاهُ أَكْثَرْنَا وَقَالَ دَعْنَا مِنْ بَاطِلِكُمَا ، قَالَتْ عَائِشَةُ سُبْحَانَ اللهِ أَلَمْ تَسْمَعْ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ إِنِّي لأَمْزَحُ وَلَا أَقُولُ إِلَّا حَقًّا -
১৭৫. উবায়দ ইব্ন উমায়র (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-এর কাছে বসা ছিলাম। আমরা মদীনার প্রসিদ্ধ জ্বর ও জ্বরটির মাহ্যাআ অঞ্চলের দিকে প্রত্যাগমন ইত্যাদি নিয়ে কথাবার্তা ও হাসাহাসি করছিলাম। তারপর আমাদের আলোচনা চলে গেল হযরত বারীরা ও তার ঘর সম্পর্কীয় প্রসিদ্ধ ঘটনার দিকে। ইত্যবসরে আমাদের সম্মুখ দিক দিয়ে আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) প্রবেশ করলেন। আমরা তাকে দেখে হাসি-তামাশার পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দিলাম। তখন তিনি বললেন, আপনারা আমার সামনে এ সব অর্থহীন কথা বলা বন্ধ করুন। এর উপর হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) বললেন, সুবহানাল্লাহ্! আপনি কি রাসূলুল্লাহ্ থেকে শুনেননি যে, তিনি বলতেন, আমি কখনো কখনো কৌতুকও করি। কিন্তু কৌতুকের জন্যও আমি যে কথা বলি সেটিও ন্যায়ানুগ ও সত্য হয়ে থাকে।
ফায়দা: প্রাথমিক যুগে মদীনা তাইয়্যেবা ছিল আরবের অন্যান্য শহরের তুলনায় অধিকতর অস্বাস্থ্যকর শহর। এখানকার আবহাওয়া ছিল স্বাস্থ্যহানিকর। লোকজন নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকতো। বিশেষত সর্দি জ্বরের মত কষ্টদায়ক রোগটি এখানে ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছিল। সাহাবীগণ যখন মক্কা শরীফ থেকে মদীনা শরীফ হিজরত করেন তখন অন্যদেরসহ হযরত আবূ বকর ও হযরত বিলাল (রা)-ও জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। মদীনায় অবস্থানের উপর সাহাবীদের অসন্তুষ্টি দেখা দিতে শুরু করে। এ পরিস্থিতি দেখে নবী মহান আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করেন; হে আল্লাহ্! মদীনাকে তুমি আমাদের জন্য মক্কার চেয়েও অধিক প্রিয় শহর বানিয়ে দাও। এ শহরের জ্বর রোগকে তুমি মাহয়া অর্থাৎ জুফ্ফার দিকে ফিরিয়ে দাও।
আল্লাহ্ পাক নবী -এর এ দু'আ কবুল করেন। তারপর থেকে সেই মদীনা শহর জগতের অন্যান্য শহরের তুলনায় অধিকতর সুন্দর ও অধিকতর স্বাস্থ্যকর শহরে পরিণত হয়। এ ঘটনা বস্তুত নবী -এর এমন একটি স্পষ্ট মুজিযা, যা সকল ভূগোলবিদকেও স্তম্ভিত করে দেয়।
দ্বিতীয় ঘটনাটি হযরত বারীরা (রা) সম্পর্কীয়। তিনি ছিলেন হযরত আয়েশা (রা)-এর ক্রীতদাসী। মুগীস্ নামক জনৈক ক্রীতদাসের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়েছিল। হযরত আয়েশা (রা) যখন তাকে আযাদ করে দেন তখন শরীয়তের আইন অনুসারে নবী তাকে পূর্ব স্বামীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক রাখা কিংবা বিচ্ছিন্ন করার ইস্পিয়ার প্রদান করেন। কেননা, তার স্বামী ছিলেন তখনও ক্রীতদাস অথচ তিনি আযাদী পেয়ে গিয়েছিলেন। ইতিয়ার পেয়ে হযরত বারীরা (রা) সম্পর্ক বিচ্ছেদের পক্ষ অবলম্বনপূর্বক স্বামীর ঘর থেকে চলে যান। তার এ বিরহে স্বামীর খুবই মন কষ্ট হয়। মুগীস বিরহ যাতনায় 'অশ্রুপাত করা অবস্থায় মদীনার অলিগলি ঘুরতে শুরু করে। কিন্তু বারীরার মন কিছুতেই ফিরেনি। শেষ পর্যন্তও সে পূর্ব বিবাহের সম্পর্ক অবশিষ্ট রাখলো না। বৃদ্ধ মুগীস ও বারীরার এ ঘটনা লোকজনের মুখরোচক আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়। লোকজন আনন্দ উল্লাসের সময় এ ঘটনা বলাবলি করতো।
হযরত উবায়দ ইব্ন উমায়র ও হযরত আয়েশা (রা) উপরোক্ত ঘটনাদ্বয় নিয়ে হাসি কৌতুক করছিলেন। ইত্যবসরে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) প্রবেশ করেন। তিনি এ ধরনের গল্প বলার উপর আপত্তি উত্থাপন করলে হযরত আয়েশা (রা) তাঁর আপত্তি খণ্ডন করেন। তিনি নবী-এর হাদীসের উদ্ধৃতি শুনিয়ে বলেন, এটি এক ধরনের মিথ্যাযুক্ত প্রফুল্লতা প্রদানকারী কৌতুক। রাসূলুল্লাহ্ নিজেও এ ধরনের কৌতুক করতেন।
١٧٦. عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَجُلاً سَأَلَهُ أَكَانَ النَّبِيُّ يَمْزَحُ فَقَالَ كَانَ النَّبِيُّ يَمْزَحُ -
১৭৬. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি (অবাক হয়ে) জিজ্ঞেস করেছিল, নবী কখনো কি কৌতুক করেছেন? তখন ইব্ন আব্বাস (রা) বললেন, হ্যাঁ, নবী কৌতুকও করতেন।
۱۷۷. عَنْ أَنَسٍ أَنَّ رَجُلاً أَتَى النَّبِيِّ فَقَالَ احْمِلْنِي فَقَالَ إِنَّا حَامِلُوكَ عَلَى وَلَدِ النَّاقَةِ قَالَ الشَّيْخُ وَمَا أَصْنَعُ بِوَلَدِ النَّاقَةِ ؟ فَقَالَ هَلْ تَلِدُ الأَبْلُ إِلَّا النَّوْقَ ؟ وَقَالَ لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَجُوْزُ -
১৭৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী -এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমাকে আরোহণ করার জন্য একটি বাহন দান করুন। নবী বললেন, ঠিক আছে। তোমাকে আমি আরোহণের জন্য একটি উটনীর বাচ্চা দিব। প্রার্থনাকারী বৃদ্ধ লোকটি বললো, উটনীর বাচ্চা দিয়ে আমি কি করবো? (আমার তো আরোহণের উপযুক্ত বয়স্ক কোন উট কিংবা উটনীর প্রয়োজন) নবী বললেন: প্রতিটি উটই কোন না কোন উটনীর বাচ্চা। অনুরূপভাবে নবী একদা কৌতুকচ্ছলে বলেছিলেন, (মনে রাখবে) বেহেশতে কোন বৃদ্ধা প্রবেশ করবে না।
ফায়দা : উপরোক্ত হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ কৌতুক করতেন। কিন্তু তাঁর কৌতুকগুলি সর্বদা এমন হতো যা হৃদয়ে আনন্দের সঞ্চার ও প্রফুল্লতা সৃষ্টিসহ সত্য ও বাস্তবসম্মত হয়ে থাকতো। সে মতে তিনি আরোহণের জন্তু সম্পর্কে যা বলেছেন সে ছিল কৌতুক। তারপর প্রশ্নকারীর মনে দ্বিধা-দ্বন্দু দেখে তিনি নিজেই কথাটির রহস্য খুলে দিয়েছেন। আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তিনি কোন বৃদ্ধা বেহেশতে প্রবেশ করবে না বলে যে উক্তি করেছেন সেটিও রহস্যপূর্ণ। কেননা কিয়ামতের দিনে সকল বৃদ্ধই তারুণ্যের রূপ নিয়ে বেহেস্তে প্রবেশ করবে।
۱۷۸ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ لَيَدْلِغُ لِسَانَهُ لِلْحَسَنِ بْنِ عَلِيُّ، فَيَرَى الصَّبِيُّ حُمْرَةً لِسَانِهِ فَيَبْهَشُ إِلَيْهِ -
১৭৮. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (কৌতুক করে) হযরত হাসান ইবন আলী (রা)-এর সামনে মুখ থেকে জিহ্বা বের করে দেখাতেন। তখন সে বাচ্চা [হাসান ইবন আলী (রা)] নবী-এর জিহ্বার লাল রং দেখে (খেজুর কিংবা আহারের কোন জিনিস মনে করে) তা ধরার জন্য হাত ঝাপটাতে থাকতেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, নবী যেভাবে বড়দের সঙ্গে হাসি-কৌতুক করতেন তেমনি তিনি শিশুদের সঙ্গেও হাসি-কৌতুক এবং স্বাভাবিক কথাবার্তা বলতেন। এ সব কাজে কোন কিছুতে তিনি সংকোচ অনুভব করতেন না। এমন কি তাঁর আত্মমর্যাদার বিপরীত বলেও জ্ঞান করতেন না। কেননা নবী-এর শান-শওকত তাঁর উচ্চাসন সাধারণ মানুষের ন্যায় কৃত্রিম বা বানোয়াট ছিলো না যে, কৌতুক প্রকাশ বা প্রফুল্লতা সৃষ্টির দরুন তা নষ্ট হয়ে যাবে। বরং তাঁর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধও ছিলো মহান আল্লাহ্ কর্তৃক উম্মতের মনে স্থাপিত একটি বিষয়। সে মতে নবী-এর কোমল আচরণ, হাসি-কৌতুক প্রফুল্লতা ও আনন্দদায়ক কথাবার্তা উম্মতের প্রতি মহান আল্লাহ্ পক্ষ থেকে একটি বড় ধরনের রহমত ও নিয়ামতরূপে বিবেচিত। আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন :
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ، وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ .
আল্লাহ্র অপার অনুগ্রহে আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছিলেন। যদি আপনি রূঢ় ও কঠোর চিত্ত হতেন তাহলে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। (সূরা আল ইমরান : ১৫৯)
কোন সন্দেহ নেই যে, রাসূলে পাক-এর হাসিখুশি আচরণ ও কোমলতাই ছিল সেই চিত্তাকর্ষক আচরণ যা উম্মতের নারী-পুরুষ, যুবক, বৃদ্ধ ও শিশুদের অন্তরকেও পাগলপারা করে দিয়েছিল। যার ফলে তাদের সকলে রিসালাতের আলোকশিখায় আত্মোৎসর্গকারী পতঙ্গে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।
۱۷۹. عَنْ مُجَاهِدٍ قَالَ دَخَلَ النَّبِيُّ الله عَلَى عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا وَعِنْدَهَا عَجُونٌ، فَقَالَ مَنْ هُذِهِ ؟ قَالَتْ هِيَ مِنْ أَخْوَالِي فَقَالَ النَّبِيُّ لا إِنَّ الْعَجْزَ لَا تَدْخُلُ الْجَنَّةَ فَشَقَّ ذَلِكَ عَلَى الْمَرَأةِ فَلَمَّا دَخَلَ النَّبِيُّ ﷺ قَالَتْ لَهُ عَائِشَةُ فَقَالَ إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يُنْشِئُهُنَّ خَلْقًا غَيْرَ خَلْقِهِنَّ -
১৭৯. হযরত মুজাহিদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা নবী হযরত আয়েশা (রা)-এর গৃহে প্রবেশ করে দেখলেন তার কাছে জনৈকা বৃদ্ধা বসে রয়েছেন। নবী বললেন, এ বৃদ্ধা মহিলাটি কে? হযরত আয়েশা (রা) বললেন, আমার মাতুলালয়ের একজন। নবী কৌতুক করে বলেছিলেন, বৃদ্ধা মহিলা কখনোই বেহেশতে প্রবেশ করবে না। নবী -এর এ কথাটি বৃদ্ধার কাছে ভারী বোধ হলো। (সে অস্থির হয়ে উঠল) কিছুক্ষণ পর নবী ঘরে ফিরে আসলে হযরত আয়েশা (রা) তাঁকে বিষয়টি জান'লেন। তখন বললেন, (আরে) আল্লাহ্ তা'আলা এ বৃদ্ধাদেরকে (কিয়ামতের দিন) তাদের দৈহিক 'অ।কৃতি পরিবর্তন পূর্বক যৌবনের আকৃতিতে পুনরুত্থিত করবেন। (যুবতীর বেশেই সকল বৃদ্ধা বেহেস্তে প্রবেশ করবে)।
ফায়দা : হাদীসের অর্থ হলো কিয়ামতের দিন সকল বৃদ্ধাকে যুবতীর আকৃতিতে পুনরুত্থিত করা হবে এবং এ আকৃতিতে তারা বেহেস্তে প্রবেশ করবে। কাজেই বৃদ্ধা অবস্থায় কেউ বেহেস্তে প্রবেশ করবে না বরং সকলেই প্রবেশ করবে পূর্ণ যৌবনের আকৃতি নিয়ে। বৃদ্ধা মহিলারা সাধারণত কোন কথার গভীর চিন্তা না করেই অস্থির হয়ে উঠে। নবী এ কথা জেনেই হযরত আয়েশার মাতুল সম্পর্কীয় বৃদ্ধার সাথে কৌতুক করেন। স্পষ্ট কথা নবী তাঁর কথাটির রহস্য জানিয়ে দিলে বৃদ্ধা নবী -এর প্রতি গভীরভাবে অনুরাগী হয়ে ওঠেন। হযরত আয়েশা (রা)-ও এ থেকে লাভ করেন পরম চিত্ত প্রফুল্লতা। এটিই ছিল রাহমাতুল্লিল আলামীনের উপযুক্ত মমত্ববোধ ও আন্তরিকতা।
۱۸۰. عَنْ عِكْرِمَةَ قَالَ كَانَ بِالنَّبِيِّ دُعَابَةُ يَعْنِي مِزَاحًا -
১৮০. হযরত ইকরিমা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর পবিত্র সত্তায় হাসি-খুশির স্বভাব বিদ্যমান ছিল।
۱۸۱. عَنِ ابْنِ الْوَرْدِ عَنْ أَبِيهِ قَالَ رَانِي النَّبِيُّ وَرَانِي رَجُلًا أَحْمَرَ فَقَالَ أَنْتَ الْوَرْدُ، قَالَ جُبَارَةُ مَازَحَهُ -
১৮১. হযরত ইব্ন আবুল ওয়ারদ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, একদা নবী ﷺ আমাকে দেখতে পেতেন। তিনি আমার শরীরের লালচে শুভ্র বর্ণ দেখে বললেন, তুমি তো রীতিমত গোলাপ ফুল। হযরত জুবায়রা (ইব্ন মুফলিস) বলেন, নবী ﷺ এ কথাটি কৌতুক করে বলেছিলেন।
ফায়দা: আবুল ওয়ারদ (রা) ছিলেন নবী ﷺ-এর একজন সাহাবী। তিনি এ উপনামেই অধিকতর প্রসিদ্ধ ছিলেন। ইতিপূর্বে তাঁর নাম এটি ছিলো না। এ নামে প্রসিদ্ধ হওয়ার কারণ হলো তিনি লালচে শুভ্র বর্ণের ছিলেন। নবী ﷺ আদর করে তাঁকে গোলাপ ফুল অভিহিত করে বলেছিলেন তুমি তো রীতিমত গোলাপ ফুল। সেই থেকে তিনি আবুল ওয়ারদ অর্থাৎ গোলাপ ফুলের বাবা নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।
۱۸۲. عَنْ ابْنِ كَعْبِ بْنِ مَالِكِ عَنْ أَبِيْهِ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا سُرَّ بِالْأَمْرِ اسْتَنَارَ كَاسْتَنَارَةِ الْقَمَرِ -
১৮২. হযরত ইব্ন কা'ব ইব্ন মালিক তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, নবী ﷺ যখন কোন কাজে আনন্দিত হতেন তখন তাঁর চেহারা মুবারক পূর্ণ চন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠত।
۱۸۳. عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ كَعْبٍ عَنْ أَبِيهِ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا سُرَّهُ الْأَمْرُ اسْتِنَارَ وَجْهُهُ اسْتِنَارَةَ الْقَمَرِ -
১৮৩. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন কা'ব তাঁর পিতা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, কোন কাজ যখন নবী ﷺ-কে আনন্দিত করত তখন তাঁর চেহারা মুবারক আলোময় চন্দ্রের ন্যায় আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠত।
١٨٤ عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا أَنَّهَا قَالَتْ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ دَخَلَ مسْرُورًا تَبْرُقُ أَسَارِيرُ وَجْهِهِ -
হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ একদা ঘরে প্রবেশ করলেন আনন্দচিত্ত অবস্থায়। তখন আনন্দের আতিশয্যে তাঁর চেহারা মুবারকের সৌন্দর্য যেন জ্বলজ্বল করছিল।
ফায়দা: প্রিয় নবী ﷺ-এর উজ্জ্বল ললাট ও আলোকময় চেহারা তাঁর প্রসন্ন প্রকৃতি মমত্ববোধ ও উদারতার প্রকৃষ্ট দলীল।
١٨٥. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَ مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ مُسْتَجْمِعًا ضَاحِكًا حَتَّى أَرَى لَهَوَاتِهِ، إِنَّمَا كَانَ يَتَبَسُمُ -
১৮৫. হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী -কে কখনো এভাবে হো হো করে হাসতে দেখিনি যে, তাঁর মুখ গহ্বরের পূর্ণ অংশ আমার নজরে এসেছে, বরং তিনি (আনন্দ ও প্রসন্নতার মুহূর্তে) মুচকি হাসি হাসতেন।
١٨٦ ، عَنْ أَبِي رَجَاءَ حُصَيْنُ بْنِ يَزِيدَ الْكَلْبِي قَالَ مَا رَأَيْتُ النَّبِيُّ ضَاحِكًا مَا كَانَ إِلَّا الْتَبَسُمُ -
১৮৬. হযরত আবূ রাজা হোসাইন ইন ইয়াযীদ কালবী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী-কে কখনো (মুখ খুলে) হাসতে দেখিনি। তাঁর হাসার পদ্ধতি মুচকি হাসির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
ফায়দা : উপরোক্ত হাদীস দুটি থেকে বোঝা যায় যে, নবী কখনো হো হো করে কিংবা মুখ খুলে হাসতেন না। হাসির মুহূর্তে সাধারণত তিনি মুচকি হাসি হাসতেন। এমন মুহূর্ত তাঁর জীবনে খুবই বিরল পাওয়া গিয়েছে, যেখানে হাসতে গিয়ে তাঁর মুখ খুলে গিয়েছিলো। এ কারণেই বর্ণনাকারী প্রিয় নবী -এর সাধারণত নীতির প্রতি সমীহ প্রকাশ করে বলেন, তিনি জোরে হাসার স্থানেও মুচকি হাসি হাসতেন। প্রিয় নবী -এর এই মুচকি হাসির কারণ হলো যে হো হো করে কিংবা মুখ খুলে অট্টহাসি হাসার অভ্যাস মানুষের গাম্ভীর্য ও আত্মসম্মানকে ক্ষুণ্ণ করে দেয়।
۱۸۷ عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا رَأَى مَا يَكْرَهُ قَالَ الْحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى كُلِّ حَالٍ وَإِذَا رَأَى مَا يَسُرُّهُ قَالَ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي بِنِعْمَتِهِ تَتِمُ الصالحات -
১৮৭. হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন কোন অপছন্দনীয় জিনিস দেখতেন তখন নিম্নোক্ত দু'আ পাঠ করতেন : الْحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى كُلِّ حَالٍ অর্থাৎ সর্বাবস্থায় সকল প্রশংসা আল্লাহ্র জন্য। আর তিনি যখন কোন পছন্দনীয় আনন্দদায়ক জিনিস দেখতেন তখন নিম্নোক্ত দু'আ বলতেন : الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي بِنِعْمَتِهِ تَتِمُّ অর্থাৎ সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য যার অনুগ্রহ ও দয়ার দৌলতেই যাবতীয় কল্যাণকর কাজ সুসম্পন্ন হয়।
ফায়দা : আলোচ্য হাদীসে দু'টি মূল্যবান দু'আর উল্লেখ করা হয়েছে। এ দু'আ দু'টিকে নিজেদের কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত করে নেয়া বড়ই সৌভাগ্য ও কল্যাণের বিষয়। নবী -এর এটিই নিয়ম ছিল।
১৮৮. عَنْ صُهَيْبٍ قَالَ ضَحِكَ رَسُولُ اللهِ ﷺ حَتَّى بَدَتْ نَوَا جِذْهُ -
১৮৮. হযরত সুহাইব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এভাবে মুখ খুলে হাসেন যে, তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত দেখা গিয়েছিল।
۱۸۹. عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ ضَحِكَ رَسُولُ اللهِ ﷺ حَتَّى بَدَتْ أَنْيَابُهُ .
১৮৯. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এভাবে হাসতে থাকেন যে, তাঁর তীক্ষ্ণ দাঁতগুলি পর্যন্ত দেখা গিয়েছিল।
ফায়দা : উপরোক্ত দু'টি হাদীসে প্রিয় নবী ﷺ-এর মুখ খুলে হাসির উল্লেখ করা হয়েছে। বস্তুত এ ধরনের সীমিত সংখ্যক কয়েকটি ঘটনা পাওয়া যায় যেখানে তিনি অনিচ্ছায় মুখ খুলে হেসেছিলেন নতুবা স্বাভাবিকভাবে তাঁর হাসির নীতি ছিল মুচকি হাসি।
۱۹۰. عَنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيِّ قَالَ سَأَلْتُ خَالِي هِنْدًا عَنْ صِفَةِ النَّبِيِّ ﷺ فَقَالَ كَانَ إِذَا غَضِبَ أَعْرَضَ وَأَشَاحَ وَإِذَا فَرِحَ غَضْ طَرْفَهُ جُلُّ ضَحْكِهِ التَّبَسُمُ يَفْتَرُ عَنْ مِثْلِ حَبَّةِ الْغَمَامِ -
১৯০. হযরত হাসান ইব্ন আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার মামা হযরত হিন্দা (রা)-কে নবী ﷺ-এর গুণাবলি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি বললেন, নবী ﷺ যখন কারোর প্রতি অসন্তুষ্ট হতেন তখন তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন এবং সে ব্যাপারে অমনোযোগী থাকতেন। আর যখন আনন্দিত হতেন তখন (লজ্জাশীলতার কারণে) দৃষ্টি অবনমিত করে রাখতেন। তাঁর যাবতীয় হাসির নিয়ম ছিল মুচকি হাসি। কিন্তু এ হাসির সময়ে (তাঁর দাঁতগুলি) বরফের মত শুভ্র ও উজ্জল দেখাত।
۱۹۱ ، عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ بَعَثَنِي رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِلَى الْيَمَنِ، أَتَانِي ثَلَاثَةُ نَفَرٍ يَخْتَصِمُونَ فِي غُلَامٍ امْرَأَةٍ وَقَعُوا عَلَيْهَا جَمِيعًا فِي طُهْرٍ وَاحِدٍ وَكُلُّهُمْ يَدْعِى أَنَّهُ ابْنُهُ، فَاقَرَعْتُ بَيْنَهُمْ فَالْحَقْتُهُ بِالَّذِي أَصَابَتْهُ الْقُرْعَةُ وَبِنَصِيْبِهِ لِصَاحَبَيْهِ ثُلُثَى دِيَةِ الْحُرِ فَلَمَّا قَدِمْتُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ ذَكَرْتُ ذَلِكَ لَهُ فَضَحِكَ حَتَّى ضَرَبَ بِرِجْلَيْهِ الْأَرْضَ ثُمَّ قَالَ حَكَمْتَ فِيْهِمْ بِحُكْمِ اللَّهِ أَوْ قَالَ لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ حُكْمَكَ فِيْهِمْ -
১৯১. হযরত আলী ইব্ন আবু তালিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাকে যখন ইয়ামেনে (কাযী নিযুক্ত করে) পাঠিয়েছিলেন, তখন আমার কাছে তিনজন লোক এসে একটি মামলা দায়ের করলো। এ লোকেরা এমন একটি মহিলার গর্ভজাত শিশুর অভিভাবকত্ব নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়েছিলো যে তাদের সকলেরই ক্রীতদাসী ছিলো। এর সঙ্গেই তারা একই 'তুহর' চলাকালে শয্যাগ্রহণ করেছিলো। তিনজনের প্রত্যেকেরই দাবি ছিলো যে শিশুটি তার। হযরত আলী (রা) বলেন, আমি তাদের নামে লটারি করলাম। লটারিতে যার নাম উঠেছিলো শিশুটি তাকেই প্রদান করলাম। আর অবশিষ্ট দু'জনের দাবির বিনিময়ে আমি তার কাছ থেকে একজন আযাদ মানুষের যতটুকু দিয়্যাত (রক্তপণ) দিতে হয় তার দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ে দু'জনকে দিয়ে দিলাম। তারপর আমি নবী -এর দরবারে উপস্থিত হলে এ ঘটনা বর্ণনা করি। নবী ঘটনা শুনে খুব হাসলেন। এমন কি হাসির আতিশয্যে তিনি আপন পদযুগল যমীনের উপর মারতে থাকেন। তারপর বললেন, হে আলী! তুমি তাদের বিষয়টি আল্লাহর হুকুম মোতাবেক ফয়সালা করেছো। কিংবা নবী বলেছেন, তাদের ব্যাপারে তোমার এ সিদ্ধান্তে মহান আল্লাহ্ খুবই সন্তুষ্ট।
ফায়দা: হাদীস বিশারদ আলিমদের মতে এ হাদীসের সূত্র অতিশয় দুর্বল। গ্রন্থকার (র) এখানে হাদীসটির শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা বিচারের জন্য উপস্থাপন করেন। এবং তাঁর উদ্দেশ্য হলো কেবল নবী -এর হাসি ও মুচকি হাসির পদ্ধতি বর্ণনা করা। এই লক্ষ্যেই তিনি হাদীসটিকে আলোচ্য অনুচ্ছেদে সন্নিবেশিত করেছেন।
۱۹۲. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ تَبَسَمْ حَتَّى بَدَتْ نَوَاجِذُهُ -
১৯২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ -কে এমন ভাবে হাসতে দেখেছি যে, তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত দেখা গিয়েছিল।
١١٣ . عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ الإِذَا غَضِبَ رُنِي بِوَجْهِهِ ظلال -
১৯৩. হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী রাগান্বিত হতেন তখন তাঁর চেহারা মুবারকে রাগের ছায়ার প্রতিফলন ফুটে উঠত।
ফায়দা : অর্থাৎ যে ভাবে তাঁর চেহারা মুবারকে আনন্দ ও প্রফুল্লতার প্রতিক্রিয়া: তে সঙ্গে ফুটে উঠত, তদ্রূপ তাঁর রাগ ও ক্রোধের প্রতিক্রিয়াও তাঁর মুবারক চেহারায় স্পষ্ট দে যেতো।
📄 নবী (সা)-এর ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা এবং ক্রোধ সংবরণ বিষয়ক রিওয়ায়াতসমূহ
١٦٨ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَاعِدًا فِي الْمَسْجِدِ وَمَعَهُ أَصْحَابُهُ إِذْ جَاءَ أَعْرَابِيٌّ فَبَالَ فِي الْمَسْجِدِ فَقَالَ أَصْحَابُ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ مَنْ مَهْ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لَا تَزْرِمُوهُ ثُمَّ دَعَاهُ فَقَالَ إِنَّ هَذَا الْمَسَاجِدَ لَا تَصْلَحُ لِشَيْ مِنَ الْقَدْرِ وَالْبَوْلِ وَالْخَلَاءِ إِنَّمَا هِيَ لِقَرَاءَةِ الْقُرْآنِ وَذِكْرِ اللَّهِ وَالصَّلَاةِ ثُمَّ دَعَا رَسُولُ اللَّهِ بِدَلُو مِنْ مَاءٍ فَشَنَّهُ عَلَيْهِ .
১৬৮. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ সাহাবাদের সঙ্গে মসজিদে উপবিষ্ট ছিলেন। তখন জনৈক বেদুঈন সেখানে আসলো এবং মসজিদের ভিতরে পেশাব করতে শুরু করলো। সাহাবাগণ তাকে বারণ করে বলতে লাগলেন, থাম! থাম! একথা শুনে নবী বললেন, (লোকটিকে পেশাব করতে) বাধা দিও না। তারপর তিনি লোকটিকে ডাকলেন এবং বললেন, দেখ এ মসজিদগুলো পেশাব-পায়খানা কিংবা এ জাতীয় কোন আবর্জনার জায়গা নয়। এগুলো হলো পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত, আল্লাহ্ পাকের যিকর ও সালাত পড়ার স্থান। তারপর তিনি এক বালতি পানি আনতে নির্দেশ দেন এবং পানিটি সেই জায়গায় প্রবাহিত করে দেন। (যেন মসজিদের মাটি পবিত্র হয়ে যায়।)
ফায়দা : উপরোক্ত ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ কতখানি ধৈর্য ও সহিষ্ণু এবং ক্রোধ নিবারণকারী ছিলেন। তিনি বেদুঈনের প্রতি কোমল আচরণ ও সহানুভূতি প্রদর্শন করেন। অতিশয় মমত্ববোধ ও উদারতা নিয়ে তাকে তিনি উপদেশ দেন। তারপর নিজেই সেই অপবিত্র স্থানটি পানি দ্বারা পবিত্র করেন। এই একটি ঘটনা থেকে নবী -এর কয়েকটি উন্নত চরিত্র মাধুরীর অনুমান করা যায়। যেমন : এক অজ্ঞ অসামাজিক লোকটির ক্রোধ উদ্দীপক ত্রুটির ব্যাপারে তিনি ধৈর্য-সহ্য ও সহিষ্ণুতার আচরণ করেন। তারপর আন্তরিকতা ও মমত্ববোধ প্রকাশের মাধ্যমে অতিশয় কার্যকর পদ্ধতিতে তাকে শিক্ষা দেন এবং তার নৈতিক ত্রুটির সংশোধন করেন। উপরন্তু এক অসাধারণ বিনয় প্রকাশের মাধ্যমে নিজেই মসজিদের সে স্থানটি ধুয়ে পবিত্র করেন। এভাবে মৌখিক উপদেশ ও সতর্কীকরণের সাথে সাথে কার্যতভাবেও মানুষের মনে মসজিদের পবিত্রতা ও সম্মান রক্ষার বিষয়টি বদ্ধমূল করে দেন। আল্লাহ্ পাক তাঁর উপর সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন।
١٦٩. عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبْرَى قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مِنْ أَحْلَمِ النَّاسِ وَأَصْبَرِهِمْ وَأَكْظَمِهِمْ لِلْغَيْظِ -
১৬৯. হযরত আবদুর রহমান ইবন আব্যা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক সহিষ্ণুতাপরায়ণ, সর্বাধিক ধৈর্যশীল ও সর্বাধিক ক্রোধ সংবরণকারী।
۱۷۰. عَنْ أَنَسٍ قَالَ بَيْنَمَا نَحْنُ جُلُوسِ إِذْ دَخَلَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مِنْ بَابِ الْمَسْجِدِ مُرْتَدِيًا بِبُرْدِ مِنَ النَّجْرَانِيَّةِ إِذْ تَبِعَهُ أَعْرَابِي ، فَأَخَذَ بِمَجَامِعِ الْبُرْدِ إِلَيْهِ ثُمَّ جَبَذَهُ إِلَيْهِ جَبْدَةً فَرَجَعَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فِي نَحْوِ الْأَعْرَابِي مِنْ شِدَّةِ جَبْنَتِهِ ، وَإِذَا أَثَرُ حَاشِيَةِ الْبُرْدِ فِي نَحْرِ رَسُولِ اللهِ ﷺ فَنَظَرَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللهِ وَضَحِكَ وَقَالَ مَا شَأْنُكَ فَقَالَ لَهُ يَا مُحَمَّدُ جَدْلِى مِنَ الْمَالِ الَّذِي عِنْدَكَ قَالَ مُرُوا لَهُ
১৭০. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা বসা ছিলাম। হঠাৎ রাসূলুল্লাহ দরজা দিয়ে মসজিদের ভিতরে প্রবেশ করলেন। নবী নাজরানে তৈরি একটি চাদর পরিহিত ছিলেন। এ সময় জনৈক বেদুঈন তাঁর পেছনে এসে দাঁড়ায়। সে নবী-এর চাদরের এক পার্শ্ব ধরে তাকে নিজের দিকে সজোরে টান দিয়েছিলো। ফলে নবী বেদুঈন লোকটির দিকে ঘুরে গেলেন এবং তাঁর গ্রীবাদেশে চাদর টানার দাগ পড়ে গেল। (লোকটির এই ত্রুটি ও অমার্জিত আচরণ সত্ত্বেও) তিনি তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন এবং বললেন, তোমার ব্যাপার কি? বেদুঈন লোকটি তাঁকে উত্তর দিল, হে মুহাম্মদ! আপনার কাছে যে সম্পদ আছে তা থেকে আমাকে কিছু দিন। নবী তাকে কিছু দান করতে নির্দেশ দিলেন।
ফায়দা : উপরোক্ত হাদীস থেকে রাসূলুল্লাহ্ -এর সীমাহীন কোমল আচরণের কথা সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়। মানুষের প্রতি তাঁর অসীম উদারতা ও ভালবাসা ছিল। একটি মূর্খ বেদুঈন লোকের এত বড় মূর্খতা ও অভদ্র আচরণ করা সত্ত্বেও তিনি না কোন কিছু মনে করেছেন, না তাকে কোনরূপ তিরস্কার করেছেন। বরং তার অভদ্র ও অসৌজন্যমূলক আচরণ সত্ত্বেও নিজের ক্রোধ নিবারণ করে নেন। নবী এ কারণে শুধু নিজের বিরক্তি বোধকেই চেপে রাখেন নি অধিকন্তু নিজে মৃদু হেসে তাকে কিছু দান করার জন্য নির্দেশও প্রদান করেন। এটি প্রিয় নবী -এর পয়গম্বর সুলভ উন্নত চরিত্র ও অনুপম মমত্ববোধের একটি নমুনা। আল্লাহ্পাক আমাদের সকলকে তাঁর এই উন্নত চরিত্র মাধুরীর পরিপূর্ণ অনুসরণের তাওফীক দান করুন। আমীন!
১৭১. عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنْ أَعْرَابِيًّا جَاءَ إِلَى النَّبِيِّ ﷺ يَسْتَعِينُهُ فِي شَيْءٍ ، فَأَعْطَاهُ شَيْئًا ثُمَّ قَالَ أَحَسَنْتُ إِلَيْكَ ؟ فَقَالَ الأَعْرَابِيُّ ، لَا ، وَلَا أَجْمَلْتَ ، قَالَ فَغَضِبَ الْمُسْلِمُونَ وَقَامُوا إِلَيْهِ ، فَأَشَارَ إِلَيْهِمْ أَنْ كُفُوًا ، قَالَ عِكْرِمَةُ قَالَ أَبُوْهُرَيْرَةَ ثُمَّ قَامَ النَّبِيُّ فَدَخَلَ مَنْزِلَهُ ثُمَّ أَرْسَلَ إِلَى الْأَعْرَابِي فَدَعَاهُ إِلَى الْبَيْتِ فَقَالَ إِنَّكَ جِئْتَنَا فَسَأَلْتَنَا فَأَعْطَيْنَاكَ فَقُلْتَ مَا قُلْتَهُ ، فَزَادَهُ رَسُولُ اللهِ ﷺ شَيْئاً ثُمَّ قَالَ أَحَسَنْتُ إِلَيْكَ ؟ قَالَ الْأَعْرَابِيُّ نَعَمْ ، فَجَزَاكَ اللَّهُ مِنْ أَهْلٍ وَعَشِيْرَةٍ خَيْرًا ، فَقَالَ لَهُ النَّبِيَّ ﷺ إِنَّكَ كُنْتَ جِئْتَنَا فَسَأَلْتَنَا فَأَعْطَيْنَاكَ وَقُلْتَ مَا قُلْتَ وَفِي أَنْفُسِ شَيْءٌ مِنْ ذَلِكَ فَإِنْ أَحْبَبْتَ فَقُلْ بَيْنَ أَيْدِيهِمْ ما قُلْتَ بَيْنَ يَدِى حَتَّى تَذْهَبَ مِنْ صُدُورِهِمْ مَا فِيهَا عَلَيْكَ قَالَ نَعَمْ ، قَالَ عِكْرِمَةً قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ فَلَمَّا كَانَ الْغَدَاءِ العَشِي جَاءَ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِنَّ صَاحِبَكُمْ هَذَا جَاءَ فَسَأَلُنَا فَأَعْطَيْنَاهُ وَقَالَ مَا قَالَ وَإِذَا دَعَوْنَاهُ إِلَى الْبَيْتِ فَأَعْطَيْنَاهُ زَعَمَ أَنَّهُ قَدْ رَضِيَ ، أَكَذَلِكَ ؟ قَالَ لأَعْرَابِيُّ نَعَمْ ، فَجَزَكَ اللَّهُ مِنْ أَهْلِ وَعَشِيْرَةٍ خَيْرًا ، قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ أَلَّا أَنَّ مَثَلِي وَمَثَلُ هُذَا الْأَعْرَابِي كَمَثَلِ رَجُلٍ كَانَتْ لَهُ نَاقَةٌ فَشَرِدَتْ عَلَيْهِ فَاتَّبَعَهَا النَّاسُ فَلَمْ يَزِيدُوهَا إِلَّا نُفُورًا فَنَادَاهُمْ صَاحِبُ النَّاقَةِ ! خَلُّوا بَيْنِي وَبَيْنَ نَاقَتِي ، فَأَنَا أَرْفَقُ بِنَا وَأَعْلَمُ فَتَوَجَّهُ لَهَا صَاحِبُ النَّاقَةِ بَيْنَ يَدَيْهَا وَأَخَذَ لَهَا مِنْ قِمَامِ الأَرْضِ فَرَدَّهَا هَوْنًا هَوْنًا حَتَّى جَاءَتْ وَاسْتَنَاخَتْ وَشَدَّ عَلَيْهَا وَإِنِّي لَوْ تَرَكْتُكُمُ حَيْثُ قَالَ الرَّجُلُ مَا قَالَ فَقَتَلْتُمُوهُ دَخَلَ النَّارَ -
১৭১. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত যে জনৈক বেদুঈন নবী -এর নিকট কিছু সাহায্য প্রার্থনার জন্য আসলো। নবী তাকে কিছু দান করলেন। তারপর বললেন, আমি কি তোমার প্রয়োজন পূরণ করিনি? তোমার প্রতি অনুগ্রহ করিনি? বেদুঈন উত্তর দিলো না, (আপনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেন নি এবং) আমার প্রতি সদাচার করেন নি। বর্ণনাকারী বলেন, লোকটির উত্তর শুনে উপস্থিত মুসলিমগণ ক্ষেপে গেলেন এবং তারা লোকটির দিকে উঠে আসলেন। কিন্তু নবী তাদের হাতের ইশারায় থামিয়ে দেন। হযরত ইকরিমা (রা) বলেন, যে বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর নবী উঠে দাঁড়ালেন এবং বাড়ির দিকে চলে গেলেন। তারপর বেদুঈন লোকটিকে বাড়ি আসার জন্য ডেকে পাঠালেন। (লোকটি, আসলে) তিনি তাকে বললেন যে, তুমি আমাদের কাছে এসে কিছু প্রার্থনা করেছো। আমরা তোমাকে (যতটুকু সম্ভব) দান করেছি। অথচ তুমি এর উপর যা বলার বলে দিয়েছো। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর নবী তাকে আরো কিছু মালামাল দান করে জিজ্ঞেস করলেন, এবার কি আমি তোমার সাথে সুন্দর আচরণ করলাম? লোকটি উত্তর দিল, জী হ্যাঁ! আল্লাহ্ আপনাকে এবং পরিবার-পরিজনকে উত্তম বিনিময় দান করুন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ লোকটিকে বললেন, দেখ, তুমি আমাদের কাছে এসে কিছু প্রার্থনা করেছো। আমরা তোমাকে কিছু দান করলাম। তাতে তুমি যা বলার বলেছো। কিন্তু এর কারণে আমরা সাহাবীদের মনে (তোমার উপর) অসন্তুষ্টির সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই তুমি যদি ভাল মনে করো তাহলে তাদের সামনে গিয়েও তুমি এ কথাটি বলো যা এখন আমার সাথে বলেছো। তা হলে তোমার ব্যাপারে তাদের মনে যে অসন্তুষ্টি বিদ্যমান তা দূরীভূত হয়ে যাবে। বেদুঈন লোকটি বললো, খুব ভাল কথা। হাদীসের বর্ণনাকারী ইকরিমা (র) বলেন যে, হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, অতঃপর যখন প্রভাত হলো (কিংবা তিনি বলেছেন) যখন সন্ধ্যা হলো তখন লোকটি (সাহাবীদের কাছে) আসলো। এ সময় নবী সাহাবীদেরকে লক্ষ করে বললেন, তোমাদের এই সাথী আমার কাছে এসে কিছু প্রার্থনা করেছিল। আমি তাকে কিছু দান করলাম। তাতে সে যা বলার বলেছে। এরপর আমি তাকে বাড়ি ডেকে নেই এবং আরো কিছু প্রদান করি। ফলে সে সন্তুষ্ট হয়ে গেছে। (তারপর তিনি বেদুঈন লোকটির দিকে তাকিয়ে) বললেন, ঘটনা কি এরূপ নয়? সে উত্তর দিল, জী হ্যাঁ। আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে এবং আপনার পরিবার-পরিজনকে উত্তম বিনিময় দান করুন। হযরত আবু হুরায়রা (রা) বলেন, মঃতপর নবী বললেন, দেখো এ বেদুঈন লোকটির সাথে আমার উদাহরণ হলো এমন যেমন কোন ব্যক্তির, যার একটি উট্রী ছিলো। উট্রী সেই লোকের কাছ থেকে ভয় পেয়ে "তে লাগলো। এ সময় লোকজন তাকে ধরার জন্য পেছনে পেছনে ছুটলো। ফলে তার ৩য় আরো বেড়ে গেলো। উটনীর মালিক তখন লোকজনকে বললো, তোমরা আমাকে আমার নীর পেছনে ছুটতে দাও। কেননা আমি এ উটনীর প্রতি তোমাদের চেয়ে অধিক রাণ এবং তার প্রকৃতি সম্পর্কে তোমাদের চেয়ে অধিক জ্ঞাত। তারপর মালিক নিজে .র দিকে অগ্রসর হলো এবং তাকে একটি উঁচুস্থানে গিয়ে ধরে ফেললো। তারপর ধীরে .রে তাকে ফিরিয়ে আনলো। উটনী ফিরে আসার পর মালিক তাকে বসাতে চাইলে সে বসে গেলে, এবং তার পিঠের উপর বোঝা বেঁধে নিলো। কাজেই আমি যদি তোমাদেরকে বেদুঈন লোকটির কথা বলার সময় ছেড়ে দিতাম তাহলে তখন তোমরা তাকে হত্যা করে ফেলতে। আর তাকেও জাহান্নামে চলে যেতে হতো।
ফায়দা : উল্লেখিত হাদীসটি রাসূলুল্লাহ্-এর উন্নত চরিত্র মাধুরী নির্দেশ করছে। এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, নবী নৈতিকতার সকল উন্নত আদর্শ ও গুণাবলির অধিকারী ছিলেন। মানবীয় জীবন ও চরিত্রের কোন একটি ক্ষুদ্র দিকও তার অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি থেকে বাইরে ছিলো না। তিনি সাহাবীদের মনমেজাজ ও প্রকৃতি সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন। সে কারণে কারোর কোন ত্রুটির উপর তাকে তাৎক্ষণিক পাকড়াও করতেন না। বেদুঈন লোকটির সাথে তাঁর আচরণ ঠিক এরূপই হয়েছিল। লোকটির অসৌজন্যমূলক উত্তর দান সত্ত্বেও তিনি তাকে কিছু বলেননি। আর সাহাবাদেরকেও কিছু বলতে অনুমতি দেননি। এহেন নরম আচরণ নবী এ জন্যও অবলম্বন করেছিলেন যেন লোকটির মনে অসন্তুষ্টি আরো বৃদ্ধি পেতে না পারে। তাই তিনি তাকে নিজ বাড়ি ডেকে নেন। অতিরিক্ত আরো কিছু দান করে তাকে খুশি করে দেন। ঘটনাটিকে তিনি সাহাবীদের কাছে একটি উপমার সাহায্যে ঘটনার প্রেক্ষিতসহ বুঝিয়ে দেন, যেন তাদের অন্তরেও লোকটির ব্যাপারে কোন খারাপ ধারণা অবশিষ্ট না থাকতে পারে। এক সার্বজনীন রহমত হিসেবে তাঁর আগমন এ কথার যাবতীয় দাবি ও চাহিদা তাঁর উপরোক্ত উন্নত চরিত্র ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কর্মপদ্ধতির দ্বারা পরিপূর্ণ হলো। আল্লাহ্ তা'আলা আমাদেরকে এ সকল চরিত্র সৌন্দর্য ও প্রজ্ঞার দ্বারা সুসমৃদ্ধ করুন।
۱۷۲. عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ سَلَامٍ قَالَ إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ لَمَا أَرَادَ هُدًى زَيْدِ بْنِ سَعْنَةَ قَالَ زَيْدُ مَا مِنْ عَلَامَاتِ النُّبُوَّةِ شَيْ إِلَّا وَقَدْ عَرَفْتُهَا فِي وَجْهِ مُحَمَّدٍ حِيْنَ نَظَرْتُ إِلَيْهِ إِلَّا إِثْنَانِ لَمْ أَخْبَرْهُمَا مِنْهُ يَسْبِقُ حِلْمُهُ جَهْلَهُ وَلَا يَزِيدُهُ شِدَّةُ الْجَهْلِ إِلا حِلْمًا ، فَكُنْتُ أَنْطَلِقُ إِلَيْهِ لِأُخَالِطَهُ فَاعَرِفَ حِلْمَهِ مِنْ جَهْلِهِ فَخَرَجَ يَوْمًا مِنَ الحُجُرَاتِ يُرِيدُ النَّبِيَّ ﷺ وَمَعَهُ عَلَى بْنُ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ، فَجَاءَ رَجُلُ يَسِيرُ عَلَى رَاحَلَتِهِ كَالْبَدْوِي فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ قَرْيَةُ بَنِي فُلَانٍ أَسْلَمُوا وَدَخَلُوا فِي الإِسْلَامِ وَحَدَّثْتُهُمْ أَنَّهُمْ إِنْ أَسْلَمُوا أَتَتْهُمْ أَزْقُهُمْ رَغَدًا وَقَدْ أَصَابَتْهُمْ سَنَةً وَشِدَّةً وَقُحُوطٌ مِنَ الْعَيشِ وَإِنِّي مُشْفِقُ أَنْ يَخْرُجُوا مِنَ الإِسْلَامِ طَمَعًا كَمَا دَخَلُوْا فِيْهِ طَمَعًا، فَإِنْ رَأَيْتَ أَنْ تُرْسِلَ إِلَيْهِمْ بِشَيْ تُعِينُهُمْ بِهِ فَعَلْتَ، فَقَالَ زَيْدُ بْنُ سَعْنَةُ فَقُلْتُ أَنَا أَبْتَاعُ مِنْكَ بِكَذَا وَكَذَا وَسَقًّا فَبَايَعْنِي وَأَطْلَقْتُ هِمْيَانِي وَأَعْطَيْتُهُ ثَمَانِينَ دِينَارًا ، فَدَفَعْهَا إِلَى الرَّجُلِ وَقَالَ أَعْجِلْ عَلَيْهِمْ بِهَا وَأَعْتُهُمْ فَلَمَّا كَانَ قَبْلَ الْمَحَلِّ بِيَوْمِ أَوْ يَوْمَيْنِ أَوْ ثَلَاثَةِ فَخَرَجَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِلَى جَنَازَةٍ بِالْبَقِيعِ وَمَعَهُ أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرَ فِي نَفَرٍ مِنْ أَصْحَابِهِ فَلَمَّا صلَّى عَلَى الجَنَازَةِ وَدَنَا مِنَ الْجِدَارِ جَذَبْتُ بُرْدَيْهِ جَبْدَةً شَدِيدَةٍ حَتَّى سَقَطَ عَنْ عَاتِقِهِ، ثُمَّ أَقْبَلْتُ بِوَجْهِ جَهْرٍ غَلِيْظٍ فَقُلْتُ أَلا تُقْضِيْنِي يَا مُحَمَّدُ فَوَ اللَّهِ مَا عَلِمْتُكُمْ بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ لَمُطِلُّ وَقَدْ كَانَ لِي بِخَالَطِيكُمْ عِلْمُ قَالَ زَيْدُ فَارْتَعَدَتْ فَرَائِضُ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ كَالْفُلْكِ الْمُسْتَدِيْرِ ثُمَّ رَمَى بِبَصَرِهِ ثُمَّ قَالَ أَيْ عَدُوٌّ اللَّهِ اَتَقُوْلُ هَذَا لِرَسُولِ اللهِ ؟ وَتَصْنَعُ بِهِ مَا أَرَى وَتَقُولُ مَا اسْمَعُ فَوَالَّذِي بَعَثَهُ بِالْحَقِّ لَوْلاَ مَا أَخَافُ فَوْقَهُ لِسَبَقِنِي رَاسُكَ وَرَسُولُ اللَّهِ يَنْظُرُ إِلَى عُمَرَ فِي تَوْدَةٍ وَسُكُونٍ ثُمَّ تَبَسَّمَ ثُمَّ قَالَ لَأَنَا وَهُوَ أَحْوَجُ إِلَى غَيْرِ هَذَا أَن تَأمُرَنِي بِحُسْنِ الأَدَاءِ وَتَامُرَهُ بِحُسْنِ اتبَاعِةِ إِلَى هُنَا عَنْ أَبِي عَاصِمٍ وَزَادَ أَبُو زُرْعَةَ فِي حَدِيثِهِ اذْهَبْ بِهِ يَا عَمَرُ فَاقْضِ حَقَّهُ وَزِدْهُ عِشْرِينَ صَاعًا مِنْ تَمَرٍ مَكَانَ مَا رَعَتْهُ قَالَ زَيْدُ بْنُ سَعْنَةَ فَذَهَبَ بِي عَمَرُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ فَقَضَانِي حَتَّى وَزَادَنِى صَاعًا مِنْ تَمَرٍ، فَقُلْتُ مَا هَذَا قَالَ أَمَرَنِي رَسُولُ اللهِ ﷺ أَنْ أَزِيدَكَ مَكَانَ مَا رَعَتْكُ فَقُلْتُ أَتَعْرَفُنِي يَا عُمَرَ؟ قَالَ لَأَفَمَنْ أَنْتَ ؟ قَالَ أَنَا زَيْدُ ابْنُ سَعْنَةَ قَالَ الْحِبْرُ؟ قُلْتُ الْحِبْرُ قَالَ فَمَا دَعَاكَ إِلَى أَنْ تَفْعَلَ بِرَسُولِ اللهِ ﷺ مَا فَعَلْتَ وَتَقُوْلُ لَهُ مَا قُلْتُ قُلْتُ يَا عُمَرُ إِنَّهُ لَمْ يَبْقَ مِنْ عَلَامَاتِ النَّبُوَّةِ شَيْ إِلَّا وَقَدْ عَرَفْتُهَا فِي وَجْهِ رَسُولِ اللَّهِ حِيْنَ نَظَرْتُ إِلَيْهِ إِلَّا اثْنَتَانِ لَمْ أَخْبِرْهُمَا مِنْهُ يَسْبَقُ حِلْمُهُ جَهْلَهُ ، وَلَا يَزِيدُهُ شِدَّةُ الْجَهْلِ عَلَيْهِ إِلَّا حِلْمًا فَقَدِ اخْتَبَرْتُهُ مِنْهُ فَأَشْهَداكَ يَا عُمَرُ انَّنِي قَدْ رَضِيْتُ بِاللَّهِ رَبَّا وبلاسْلامَ دِينًا وَبِمُحَمَّd الله نَبِيًّا ، وَأَشْهِدُكَ أَنَّ شَطْرَ مَالِيٍّ - فَإِنِّي أَكْثَرُهَا مَالاً - صَدَقَة عَلَى أُمَّةٍ مُحَمَّdٍ فَقَالَ عُمَرُ أَوْ عَلَى بَعْضُهُمْ فَائِكَ لَا تَسَعُهُمْ كُلُّهُمْ قُلْتُ أَوَ عَلَى بَعْضِهِمْ، قَالَ فَرَجَعَ عَمَرُ وَزَيْدُ بْنُ سَعْنَةَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَقَالَ زَيْدُ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلهَ إِلَّا اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّdًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ فَامَنَ بِهِ وَصَدَّقَهُ وَبَايَعَهُ وَشَهِدَ مَعَهُ مَشَاهِدَ كَثِيرَةً -
১৭২. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন সালাম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহান আল্লাহ্ যখন যায়িদ ইবন সা'না (রা)-কে হেদায়েতের ইচ্ছা করলেন তখন যায়িদ ইবন সা'না বলল, আমি মুহাম্মদ মুস্তফা-এর চেহারা মুবারক দর্শন করেই তাঁর নবুওয়াতের নিদর্শনসমূহের দু'টি ব্যতীত অবশিষ্ট সবগুলি অনুধাবন করে নিয়েছি। যে দু'টি আমি অনুধাবন করতে পারিনি সেগুলি হলো, (এক) তাঁর এ পরিমাণ ধৈর্যশীলতা যে, তাঁর ক্রোধের উপর সহিষ্ণুতা প্রবল থাকবে। (দুই) তাঁর সহিত যত বেশি মূর্খতার আচরণ করা হবে ততই তাঁর ধৈর্যশীলতা বৃদ্ধি পাবে। যায়িদ ইবন সা'না বলেন, আমি এ দুটি নিদর্শনের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য চেষ্টা করি।
আমি তাঁর দরবারে বারবার আসা-যাওয়া করি এবং তাঁর সান্নিধ্যে উপস্থিত থেকে ধৈর্যশীলতার গুণ পর্যবেক্ষণ করি, একদা তিনি হুজরাগুলোর কোন একটি থেকে বেরিয়ে আসলেন। হযরত আলী ইব্ন আবু তালিব (রা)-ও তাঁর সঙ্গে ছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি একটি বাহনে আরোহণ করে আসল। তাকে দেখতে বেদুঈন মনে হচ্ছিল। লোকটি নবী-কে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্। অমুক গোত্রের লোকেরা ইসলাম কবুল করেছে। আমি তাদেরকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলাম যে, তারা যদি ইসলাম কবুল করে তাহলে তাদের রুজি-রোজগারে সমৃদ্ধি আসবে। অথচ বর্তমানে তারা অভাব-অনটন ও দুর্ভিক্ষে জীবন যাপন করছে। কাজেই আমার আশংকা হচ্ছে যে, তারা যে ভাবে লোভ নিয়ে ইসলামে প্রবেশ করেছে তদ্রূপ অন্য কোন লালসায় পড়ে ইসলাম থেকে বেরিয়ে না যায়। অতএব আপনি যদি ভাল মনে করেন, সাহায্য হিসেবে তাদের জন্য কিছু পাঠিয়ে দিন। (এ কথা শুনে) যায়িদ ইবন সা'না নবী-কে বললেন, আপনি আমার সাথে একটি (অগ্রিম) কেনাবেচা করুন। আমি আপনার নিকট থেকে টাকার বিনিময়ে এক ওয়াসাক জিনিস খরিদ করলাম। এ কথা বলে আমি আমার থলি খুললাম এবং আশিটি স্বর্ণমুদ্রা বের করে নবীকে দিলাম। নবী সেই টাকা লোকটির হাতে দিয়ে বললেন, এ টাকা নিয়ে তুমি তাদের কাছে দ্রুত পৌঁছে যাও এবং তাদের সাহায্য কর। যায়িদ ইবন সা'না (রা) বলেন, তারপর যখন মাল পরিশোধ করার সময় ঘনিয়ে আসল, কেবল দু'-একদিন বাকি। এ সময় তিনি মদীনাবাসীদের গোরস্থান জান্নাতুল বাকীতে এক জানাযায় অংশগ্রহণের জন্য বাইরে আসলেন। হযরত আবু বকর ও হযরত উমর (রা) সহ কতিপয় সাহাবীও তাঁর সঙ্গে ছিলেন। নবী যখন সালাত শেষ করে দেওয়ালের কাছে আসলেন তখন আমি তাঁকে তাঁর চাদরের উভয় পার্শ্ব ধরে সজোরে টান দিলাম যে, গ্রীবাদেশ থেকে চাদরটি নিচে পড়ে গেল। আমি খুবই রূঢ়ভাবে চেহারা বিকৃত করে তাঁর দিকে তাকালাম এবং বললাম, হে মুহাম্মদ! আপনি কি আমার পাওনা পরিশোধ করবেন না? আল্লাহর শপথ! আবদুল মুত্তালিবের গোষ্ঠীর মধ্যে আমি আপনাকে চিনি। আপনি অত্যন্ত টালবাহানাকারী। আপনাদের সাথে চলাফেরা করে আমার এ কথা বুঝতে আর বাকি নেই। (যায়িদ ইবন সা'না) বলেন, (একথা) শুনে হযরত উমর (রা)-এর ঘাড় ও বুক (ঢেউয়ের মাঝে) গোলাকার নৌযানের ন্যায় কাঁপতে শুরু করলো। তিনি চোখ পাকিয়ে আমার দিকে তাকাতে লাগলেন। তারপর বললেন, ওহে আল্লাহর দুশমন! তুমি এমন কথা রাসূলুল্লাহ্-কে বলছো? প্রিয় নবীর সঙ্গে তুমি কি আচরণ করছো? আমি তা দেখে যাচ্ছি আর কী সব কথা বলছো তাও শুনে যাচ্ছি। সেই সত্তার শপথ! যিনি তাঁকে সত্য নবী বানিয়ে পাঠিয়েছেন, যদি আমি আমার ইচ্ছার সেই জিনিসটি নষ্ট হওয়ার আশংকা না করতাম তা হলে আমি তোমার গর্দান উড়িয়ে দিতাম। নবী তখন অতিশয় ধীরসুস্থ ও শান্ত প্রকৃতিতে হযরত উমরের দিকে তাকাচ্ছিলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন, হে উমর, আমার ও এ ব্যক্তির ব্যাপারে এ কথা বলার বদলে অন্য একটি কর্মপদ্ধতি অবলম্বনের প্রয়োজন ছিলো। প্রয়োজনের সে কাজটি হলো তুমি আমাকে তার পাওনা সুন্দরভাবে আদায় করতে বলবে এবং তাকে নরম ভাষায় চাওয়ার নির্দেশ দিবে। আবূ আসিম (রা) হাদীসটির এ পর্যন্ত বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হযরত আবূ যুরআহ (রা) পরবর্তী অংশ সম্পর্কে বলেন, তারপর নবী বললেন, হে উমর! লোকটিকে সঙ্গে নিয়ে যাও এবং তার পাওনা শোধ করে দাও। অধিকন্তু তুমি যেহেতু তাকে ভীতি প্রদর্শন করেছো তাই তাকে বিশ সা' অতিরিক্ত প্রদান করবে। যায়িদ ইবন সা'না (রা) বলেন, অতঃপর হযরত উমর (রা) আমাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যান এবং আমার পাওনা শোধ করে অতিরিক্ত সা' খেজুরও প্রদান করেন। আমি তাকে বললাম, অতিরিক্তটি কিসের বিনিময়ে? তিনি বললেন, নবী আমাকে আদেশ করেছেন যে, আমি যেহেতু তোমাকে ভীতি প্রদর্শন করেছি, এ কারণে তোমাকে কিছু বেশি প্রদান করতে। আমি তাকে বললাম, হে উমর! আপনি আমাকে চেনেন? তিনি বললেন, না, চিনি না। তুমি কে? তখন আমি বললাম, আমি যায়িদ ইবন সা'না। উমর (রা) বললেন, ইয়াহুদীদের পণ্ডিত সা'না? আমি বললাম, জী হ্যাঁ। হযরত উমর (রা) বললেন, তা হলে তুমি প্রিয় নবী -এর সাথে এহেন আচরণ ও এহেন অভদ্র কথাবার্তা বলেছ কেন? আমি বললাম, হে উমর! কথা হলো আমি যখন রাসূলুল্লাহ -এর চেহারার দিকে তাকালাম তখন তাঁর চেহারায় দু'টি ব্যতীত নবুওয়াতের সব চিহ্ন দেখতে পেয়েছি। অবশিষ্ট সেই দু'টি হলো তাঁর ধৈর্যশীলতা ও সহিষ্ণুতা এমন থাকবে যে, তাঁর ধৈর্য তাঁর ক্রোধের উপর প্রবল থাকবে। অপরটি হলো তাঁর সাথে যতই রূঢ় আচরণ করা হবে ততই তাঁর মধ্যে ক্ষমা ও সহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পাবে। কাজেই হে উমর! এখন আমি তোমাকে সাক্ষী রাখছি, আমি মহান আল্লাহকে প্রভু হিসাবে, দীন ইসলামকে সত্য দীন হিসাবে এবং হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা -কে সত্য নবী হিসেবে মেনে নিতে সম্মত। (অর্থাৎ আমি ঈমান আনয়ন করলাম।) আমি তোমাকে আরো সাক্ষী বানাচ্ছি যে, আমার অর্ধেক সম্পদ নবী -এর উম্মতের জন্য ওয়াকফ করে দিচ্ছি। কেননা আমার কাছে প্রচুর সম্পদ রয়েছে। হযরত উমর (রা) বললেন, না কিছু সংখ্যক উম্মতের জন্য? কেননা উম্মতের সকলের জন্য এ সম্পদ যথেষ্ট হবে না। আমি বললাম, ঠিক আছে, উম্মতের কিছু সংখ্যকের জন্য। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর যায়িদ ইবন সা'না ও হযরত উমর (রা) উভয়ে নবী -এর দরবারে উপস্থিত হন। এবং যায়িদ ইবন সানা (রা) কালেমা পড়ে বলেন : أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ الأَاللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّdًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ্ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিতেছি যে, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা আল্লাহ্র বান্দা ও তাঁর রাসূল। এভাবে যায়িদ ইব্ন সানা (রা) আল্লাহর উপর ঈমান আনয়ন করলেন এবং প্রিয় নবী -এর হাতে বায়'আত গ্রহণ করলেন। তারপর প্রিয় নবী -এর সাথে বহু সংখ্যক যুদ্ধেও তিনি অংশ গ্রহণ করেন।
ফায়দা: এই বিস্তারিত ঘটনাটি থেকে অনুমান করা যায় যে, নবী কতখানি ধৈর্য- গুণসম্পন্ন, সহিষ্ণুতাপরায়ণ ও ক্রোধ দমনকারী ছিলেন। একজন অমুসলিমের এতটুকু ধৃষ্টতা প্রদর্শন সত্ত্বেও নবী তাকে কিছুই বললেন না। অধিকন্তু হযরত উমর (রা) তাকে ভয় দেখানোর কারণে তিনি তার ন্যায্য পাওনার অতিরিক্ত আরো কিছু প্রদান পূর্বক লোকটিকে ভীতিমুক্ত এবং সন্তুষ্ট করার নির্দেশ দেন। নবী-এর এই পরম ধৈর্যশীলতার ফল দাঁড়াল যে, যায়িদ ইবন সা'না (রা) সঙ্গে সঙ্গে তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। বস্তুত জগত জুড়ে ইসলামের ব্যাপকভাবে প্রসারতা লাভের পেছনে প্রিয় নবী-এর উন্নত চরিত্র মাধুরী ও মহৎ আচরণই ছিল সবচেয়ে বড় উপকরণ। তাঁর উন্নত আদর্শের আকর্ষণে লোকজন তাঁর নিকটবর্তী হতে থাকে, তাঁকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ পাক এই উন্নত চরিত্র মাধুরীকে নিম্নোক্ত ভাষায় উপস্থাপন করেছেন:
فَبِمَا رَحْمَةً مِّنَ اللهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ، فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ.
আল্লাহর দয়ায় আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছিলেন। যদি আপনি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতেন তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। সুতরাং আপনি তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। (সূরা আল ইমরান: ১৫৯)
মানুষের প্রতি কোমল আচরণ করা ও ক্ষমাশীল হওয়া উন্নত চারিত্রিক গুণের পরিচায়ক। মহান আল্লাহ্ আমাদের সকলকে উন্নত চরিত্র অবলম্বনের পূর্ণ তাওফীক প্রদান করুন। আমীন!
۱۷۳ عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ عَنْ أَبِيهِ قَالَ أَقْبَلَ أَعْرَابِي عَلَى نَاقَةٍ حَتَّى أَنَّاحُ بَيَابِ الْمَسْجِدِ فَدَخَلَ عَلَى نَبِيِّ اللهِ وَحَمْزَةُ بْن عَبْدِ الْمُطْلَبِ جَالِسُ فِي نَفَرٍ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالأَنْصَارِ فِيهِمُ النُّعَيْمَانُ، فَقَالُوا لِلنُّعْمَانِ وَيْحَكَ إِنْ نَاقَتَهُ نَاوِيَة يعني سَمِينَةُ فَلَوْ نَحَرْتَهَا فَإِنَّا قَدْ قَرَمْنَا إِلَى اللَّحْمِ وَلَوْ قَدْ فَعَلْتَ غَرِمَها رَسُولُ اللهِ ﷺ وَأَكَلْنَا لَحْمًا، فَقَالَ إِنِّي إِنْ فَعَلْتُ ذَلِكَ وَأَخْبَرْتُمُوهُ بِمَا صنعت وجَدْ عَلَى رَسُولِ اللهِ ﷺ قَالُوا لَا تَفْعَلْ فَقَامَ فَضَرَبَ فِي ابْتِهَاتُمُ انْطَلَقَ فَمَرْ بِالْعِقْدَادِ بْنِ عَمْرٍ وَ وَقَدْ حَضَرَ حَفْرَةٌ وَقَدْ اسْتَخْرَجَ مِنْهَا طَيِّنًا. فقَالَ يَا مِقْدَادُ : غَيْبَنِي فِي هذه الحفرة وأطبق على شَيْئًا وَلَا تَدُلُّ عَلَى شَيْئًا فَإِنِّي قَدْ أَحَدِثْتُ حدثًا، فَفَعَلَ فَلَمَّا خَرَجَ الأَعْرَابِيُّ رَأَى نَاقَتَهُ فَصَرَخَ فَخَرَجَ نَبِيُّ V الله ﷺ فَقَالَ مَنْ فَعَلَ هَذَا؟ قَالُوُل نُعَيْمَانُ ، قَالَ وَأَيْنَ تَوَجَّهَ فَتَبِعَهُ رَسُولُ الله ﷺ وَمَعَهُ سَمَزَةُ وَأَصْحَابُهُ حَتَّى أَتَى عَلَى الْمِقْدَادِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لِلْمِقْدَادِ هَلْ رَأَيْتَ لِي نُعَيْمَانَ؟ فَصَمَتَ فَقَالَ لَتُخْبِرَنِي أَيْنَ هُوَ؟ فَقَالَ مَالِي بِهِ عِلْمٍ ؟ وَأَشَارَ بِيَدِهِ إِلَى مَكَانِهِ فَكَشَفَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَقَالَ أَيْ عَدُوٌّ نَفْسِهِ مَاحَمَلَكَ عَلَى مَا صَنَعْتَ؟ قَالَ وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ الأَمَرَنِي بِهِ حَمْزَةُ وَأَصْحَابِهِ وَقَالُوا كَيْتَ وَكَيْتَ فَأَرْضَى رَسُولُ اللهِ ﷺ وَالأَعْرَابِي مِنْ نَاقَتِهِ وَقَالَ شَأْنُكُمْ بِهَا فَأَكُلُوْهَا وَكَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا ذَكَرَ صَنِيْعَهُ ضَحِكَ حَتَّى تَبْدُو نَوَاجِذُهُ -
১৭১. হিশাম ইব্ন ওরওয়া তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করে বলেন, একদা জনৈক বেদুঈন একটি উষ্ট্রীর উপর আরোহণ করে নবী -এর সাক্ষাতে আসল। লোকটি মসজিদে নববীর দরজায় উট্রীটিকে বসিয়ে নবী-এর সাক্ষাতের জন্য ভিতরে প্রবেশ করে। সেখানে হযরত হামযা ইব্ন আবদুল মুত্তালিব (রা) কতিপয় মুহাজির ও আনসার সাহাবীসহ বসা ছিলেন। তন্মধ্যে হযরত নুআইমানও উপস্থিত ছিলেন। সাথীরা হযরত নুআইমান (রা)-কে বললেন, আরে তুমি কি বেদুঈন লোকটির উট্রীটি দেখতে পাচ্ছ না? কী মোটা-তাজা! এটি যদি যবেহ করতে পারতে! কেননা আজ আমাদের গোস্ত খাওয়ার ইচ্ছা হচ্ছে। তুমি এমনটি ঘটিয়ে ফেললে নবী উটনীর মালিককে জরিমানা আদায় করে দেবেন। এদিকে গোশ্তও আমরা বিনামূল্যে পেয়ে যাবো। নুআইমান (রা) বললেন, আমি এমনটা করে ফেললে তোমরা রাসূলুল্লাহ্ -এর কাছে আমার কথা বলে দেবে। আর তখন তিনি আমার প্রতি রাগ করবেন। সাথীগণ বললেন, না, আমরা তা কিছুতেই করবো না। সে মতে হযরত নুআইমান (রা) দাঁড়ালেন এবং উট্রীটিকে নাহর করে দিলেন। তারপর সে স্থান ত্যাগ করে চলে গেলেন। পথিমধ্যে হযরত মিক্দাদ ইব্ন আমর (রা)-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। হযরত নুআইমান (রা) তাঁকে বললেন, হে মিকদাদ! তুমি আমাকে এ গর্তে লুকিয়ে থাকতে দাও। আমার মাথার উপর কোন কিছু দিয়ে ঢেকে ফেলো। আর আমার কথা কাউকে জানাবে না। কেননা আমি একটি নতুন দুষ্টমী করে আসছি। হযরত মিকদাদ (রা) তাই করলেন।
এদিকে বেদুঈন লোকটি মসজিদ থেকে বের হয়ে যখন নিজের উট্রী মাটিতে পড়া অবস্থায় দেখল তখন সে চিৎকার দিতে লাগল। এ কাজ করেছে কে? লোকজন বললো, নুআইমান। নবী বললেন, সে কোন্ দিকে গিয়েছে? তারপর তিনি তাঁকে খুঁজতে লাগলেন। হযরত হামযা ও তাঁর সাথীগণও নবী -এর সঙ্গে সঙ্গে চললেন। অবশেষে তাঁরা হযরত মিকদাদ (রা) পর্যন্ত পৌঁছলে রাসূলুল্লাহ্ তাঁকে বললেন, হে মিকদাদ! তুমি কি নুআইমানকে দেখেছো? হযরত মিকদাদ (রা) নিরুত্তর। নবী বললেন, তোমাকে বলতে হবে সে কোথায়? হযরত মিকদাদ (রা) মুখে আমি জানি না বলে হাতের ইশারায় সে স্থানটি দেখিয়ে দেন। সে মতে নবী গর্তের ঢাকনা সরালেন এবং বললেন, আরে নিজ প্রাণের দুশমন। এমনটা করলে কেন? নুআইমান বললেন, কসম আমাকে তো হযরত হামযা ও তাঁর সাথীরা এমনটা করতে বলেছে। তাঁরা আমাকে এ সব কথাও বলেছিল। নবী তখন বেদুঈন লোকটিকে তার উটনীর বিনিময়ে কিছু মালামাল দিয়ে সম্মত করান। তারপর বললেন, যাও উট্নীটি নিয়ে যাও। সেমতে সাথীগণ উট্নীটি নিয়ে গোশ্ত আহার করে। পরবর্তীকালে যখনই নবী তাদের এই দুষ্টুমির কথা মনে করতেন তখন তাঁর হাসি রোধ করতে পারতেন না। তিনি খিলখিল করে হেসে ফেলতেন এমনকি তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত দেখা যেত।
ফায়দা: উল্লিখিত হাদীস থেকেও এ কথা বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ সীমাহীন ক্ষমাশীল ও দয়ালু ছিলেন। কোন কাজে তিনি রাগ করতেন না। তবে হ্যাঁ, যদি দীনী কোন কাজে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হতো তখন তিনি অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করতেন।
١٧٤ عَنْ عُبَيْدِ اللهِ بْنِ الْمُغِيرَةَ قَالَ سَمِعْتُ عَبْدَ اللهِ بْنِ الْحَارِثِ بْنِ جَزْء يَقُوْلُ مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَكْثَرَ مِزَاحًا مِنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ وَلَا أَكْثَرَ تَبَسُمًا مِنْهُ وَإِنْ كَانَ يَسَنُوْ أَهْلَ الصَّبِيِّ إِلَى مِزَاحِهِ -
১৭৪. হযরত উবায়দুল্লাহ্ ইব্ন মুগীরা (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ্ ইব্ন হারিস (রা) থেকে শুনেছি যে, তিনি বলেন, আমি না রাসূলুল্লাহ্ অপেক্ষা অধিক কাউকে কৌতুক করতে দেখেছি, আর না তাঁর চেয়ে অধিক কাউকে মুচকি হাসি হাসতে দেখেছি। আর বাচ্চাদের অভিভাবকরা তো তাঁর এ কৌতুক করাকে নিজেদের গর্ব বলে বোধ করতো এবং খুবই আনন্দিত হতো। এর কারণ ছিলো নবী বাচ্চাদের সাথে খুবই কৌতুক করতেন।
ফায়দা: নবী থেকে যেভাবে কৌতুক করা প্রমাণিত আছে তদ্রূপ কৌতুক করার উপর নিষিদ্ধতাও বর্ণিত হয়েছে। হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থে এ নিষেধ বিদ্যমান। কাজেই বিষয়টির ব্যাখ্যা আবশ্যক, যাতে বোঝা যায় যে, কোন্ ধরনের কৌতুক জায়িয ও পছন্দনীয়, আর কোন্ ধরনের কৌতুক নিষিদ্ধ। বস্তুত কৌতুকের দু'টি রূপ আছে। একটি হলো, এমন কৌতুক যা ব্যক্তিকে মহান আল্লাহ্র স্মরণ ও তাঁর যিকর ফিকর থেকে উদাসীন বানিয়ে দেয়। যা ব্যক্তির কঠোর চিন্তার কারণ হয়ে থাকে। এ ধরনের কৌতুক করা সাধারণত হাটে-বাজারের লোকদের নীতি। তারা কথায় কথায় হাসি-ঠাট্টা করে। নানা গল্প-গুজবে মত্ত থাকে। এ সব কৌতুকের সঙ্গে সত্যতা ও বাস্তবতার লেশমাত্র সম্পর্ক থাকে না। কাজেই এ প্রকৃতির কৌতুক একজন মুসলিমের মান-সম্মান ও গাম্ভীর্যকে খুইয়ে দেয়। অধিকন্তু এ ধরনের কৌতুক কখনো কখনো অন্যজনের সম্মান হানি কিংবা উপহাস এমনকি মনকষ্টের কারণ হয়ে থাকে। কাজেই এটি শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েয। কিন্তু যে কৌতুক মানব মনের প্রফুল্লতা বৃদ্ধি করে সেখানে সে সব জিনিস থাকে না। বরং এ কৌতুক দ্বারা অন্যজনের মন সন্তুষ্টি, প্রসন্নতা, আনন্দ ও চিত্তসুখ বৃদ্ধি পায়। যেগুলি সত্যনির্ভর হয়ে থাকে অর্থাৎ কৌতুক বটে। তবে সত্য ও বাস্তবসম্মত। এমন কৌতুক করতে দোষ নেই বরং মুস্তাহাব ও মসনূন বলা চলে। যেমন একটি হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, সাহাবীগণ বলেছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি আমাদের সঙ্গে কখনো কখনো কৌতুকও করে থাকেন। নবী বললেন, হ্যাঁ, তাতে আপত্তির কি আছে? কিন্তু এ কৌতুকে আমি অসত্য কথা বলি না। (শামায়েলে তিরমিযী।)
١٧٥ عَنْ عُبَيْدِ بْنِ عُمَيْرٍ قَالَ كُنْتُ عِنْدَ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا وَنَحْنُ نَذْكُرُ حُمَّى الْمَدِينَةَ وَانْتِقَالَهَا إِلى مَهِيعَةَ وَنَضْحَكُ ثُمَّ صِرْنَا إِلَى حَدِيْثِ بَرِيرَةَ وَمَسْكَنِهَا، إِذْ افْتَتَحَ عَلَيْنَا عَبْدُ اللهِ بْنِ عُمَرَ وَ فَلَمَّا رَأَيْنَاهُ أَكْثَرْنَا وَقَالَ دَعْنَا مِنْ بَاطِلِكُمَا ، قَالَتْ عَائِشَةُ سُبْحَانَ اللهِ أَلَمْ تَسْمَعْ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ إِنِّي لأَمْزَحُ وَلَا أَقُولُ إِلَّا حَقًّا -
১৭৫. উবায়দ ইব্ন উমায়র (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-এর কাছে বসা ছিলাম। আমরা মদীনার প্রসিদ্ধ জ্বর ও জ্বরটির মাহ্যাআ অঞ্চলের দিকে প্রত্যাগমন ইত্যাদি নিয়ে কথাবার্তা ও হাসাহাসি করছিলাম। তারপর আমাদের আলোচনা চলে গেল হযরত বারীরা ও তার ঘর সম্পর্কীয় প্রসিদ্ধ ঘটনার দিকে। ইত্যবসরে আমাদের সম্মুখ দিক দিয়ে আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) প্রবেশ করলেন। আমরা তাকে দেখে হাসি-তামাশার পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দিলাম। তখন তিনি বললেন, আপনারা আমার সামনে এ সব অর্থহীন কথা বলা বন্ধ করুন। এর উপর হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) বললেন, সুবহানাল্লাহ্! আপনি কি রাসূলুল্লাহ্ থেকে শুনেননি যে, তিনি বলতেন, আমি কখনো কখনো কৌতুকও করি। কিন্তু কৌতুকের জন্যও আমি যে কথা বলি সেটিও ন্যায়ানুগ ও সত্য হয়ে থাকে।
ফায়দা: প্রাথমিক যুগে মদীনা তাইয়্যেবা ছিল আরবের অন্যান্য শহরের তুলনায় অধিকতর অস্বাস্থ্যকর শহর। এখানকার আবহাওয়া ছিল স্বাস্থ্যহানিকর। লোকজন নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকতো। বিশেষত সর্দি জ্বরের মত কষ্টদায়ক রোগটি এখানে ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছিল। সাহাবীগণ যখন মক্কা শরীফ থেকে মদীনা শরীফ হিজরত করেন তখন অন্যদেরসহ হযরত আবূ বকর ও হযরত বিলাল (রা)-ও জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। মদীনায় অবস্থানের উপর সাহাবীদের অসন্তুষ্টি দেখা দিতে শুরু করে। এ পরিস্থিতি দেখে নবী মহান আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করেন; হে আল্লাহ্! মদীনাকে তুমি আমাদের জন্য মক্কার চেয়েও অধিক প্রিয় শহর বানিয়ে দাও। এ শহরের জ্বর রোগকে তুমি মাহয়া অর্থাৎ জুফ্ফার দিকে ফিরিয়ে দাও।
আল্লাহ্ পাক নবী -এর এ দু'আ কবুল করেন। তারপর থেকে সেই মদীনা শহর জগতের অন্যান্য শহরের তুলনায় অধিকতর সুন্দর ও অধিকতর স্বাস্থ্যকর শহরে পরিণত হয়। এ ঘটনা বস্তুত নবী -এর এমন একটি স্পষ্ট মুজিযা, যা সকল ভূগোলবিদকেও স্তম্ভিত করে দেয়।
দ্বিতীয় ঘটনাটি হযরত বারীরা (রা) সম্পর্কীয়। তিনি ছিলেন হযরত আয়েশা (রা)-এর ক্রীতদাসী। মুগীস্ নামক জনৈক ক্রীতদাসের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়েছিল। হযরত আয়েশা (রা) যখন তাকে আযাদ করে দেন তখন শরীয়তের আইন অনুসারে নবী তাকে পূর্ব স্বামীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক রাখা কিংবা বিচ্ছিন্ন করার ইস্পিয়ার প্রদান করেন। কেননা, তার স্বামী ছিলেন তখনও ক্রীতদাস অথচ তিনি আযাদী পেয়ে গিয়েছিলেন। ইতিয়ার পেয়ে হযরত বারীরা (রা) সম্পর্ক বিচ্ছেদের পক্ষ অবলম্বনপূর্বক স্বামীর ঘর থেকে চলে যান। তার এ বিরহে স্বামীর খুবই মন কষ্ট হয়। মুগীস বিরহ যাতনায় 'অশ্রুপাত করা অবস্থায় মদীনার অলিগলি ঘুরতে শুরু করে। কিন্তু বারীরার মন কিছুতেই ফিরেনি। শেষ পর্যন্তও সে পূর্ব বিবাহের সম্পর্ক অবশিষ্ট রাখলো না। বৃদ্ধ মুগীস ও বারীরার এ ঘটনা লোকজনের মুখরোচক আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়। লোকজন আনন্দ উল্লাসের সময় এ ঘটনা বলাবলি করতো।
হযরত উবায়দ ইব্ন উমায়র ও হযরত আয়েশা (রা) উপরোক্ত ঘটনাদ্বয় নিয়ে হাসি কৌতুক করছিলেন। ইত্যবসরে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) প্রবেশ করেন। তিনি এ ধরনের গল্প বলার উপর আপত্তি উত্থাপন করলে হযরত আয়েশা (রা) তাঁর আপত্তি খণ্ডন করেন। তিনি নবী-এর হাদীসের উদ্ধৃতি শুনিয়ে বলেন, এটি এক ধরনের মিথ্যাযুক্ত প্রফুল্লতা প্রদানকারী কৌতুক। রাসূলুল্লাহ্ নিজেও এ ধরনের কৌতুক করতেন।
١٧٦. عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَجُلاً سَأَلَهُ أَكَانَ النَّبِيُّ يَمْزَحُ فَقَالَ كَانَ النَّبِيُّ يَمْزَحُ -
১৭৬. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি (অবাক হয়ে) জিজ্ঞেস করেছিল, নবী কখনো কি কৌতুক করেছেন? তখন ইব্ন আব্বাস (রা) বললেন, হ্যাঁ, নবী কৌতুকও করতেন।
۱۷۷. عَنْ أَنَسٍ أَنَّ رَجُلاً أَتَى النَّبِيِّ فَقَالَ احْمِلْنِي فَقَالَ إِنَّا حَامِلُوكَ عَلَى وَلَدِ النَّاقَةِ قَالَ الشَّيْخُ وَمَا أَصْنَعُ بِوَلَدِ النَّاقَةِ ؟ فَقَالَ هَلْ تَلِدُ الأَبْلُ إِلَّا النَّوْقَ ؟ وَقَالَ لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَجُوْزُ -
১৭৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী -এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমাকে আরোহণ করার জন্য একটি বাহন দান করুন। নবী বললেন, ঠিক আছে। তোমাকে আমি আরোহণের জন্য একটি উটনীর বাচ্চা দিব। প্রার্থনাকারী বৃদ্ধ লোকটি বললো, উটনীর বাচ্চা দিয়ে আমি কি করবো? (আমার তো আরোহণের উপযুক্ত বয়স্ক কোন উট কিংবা উটনীর প্রয়োজন) নবী বললেন: প্রতিটি উটই কোন না কোন উটনীর বাচ্চা। অনুরূপভাবে নবী একদা কৌতুকচ্ছলে বলেছিলেন, (মনে রাখবে) বেহেশতে কোন বৃদ্ধা প্রবেশ করবে না।
ফায়দা : উপরোক্ত হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ কৌতুক করতেন। কিন্তু তাঁর কৌতুকগুলি সর্বদা এমন হতো যা হৃদয়ে আনন্দের সঞ্চার ও প্রফুল্লতা সৃষ্টিসহ সত্য ও বাস্তবসম্মত হয়ে থাকতো। সে মতে তিনি আরোহণের জন্তু সম্পর্কে যা বলেছেন সে ছিল কৌতুক। তারপর প্রশ্নকারীর মনে দ্বিধা-দ্বন্দু দেখে তিনি নিজেই কথাটির রহস্য খুলে দিয়েছেন। আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তিনি কোন বৃদ্ধা বেহেশতে প্রবেশ করবে না বলে যে উক্তি করেছেন সেটিও রহস্যপূর্ণ। কেননা কিয়ামতের দিনে সকল বৃদ্ধই তারুণ্যের রূপ নিয়ে বেহেস্তে প্রবেশ করবে।
۱۷۸ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ لَيَدْلِغُ لِسَانَهُ لِلْحَسَنِ بْنِ عَلِيُّ، فَيَرَى الصَّبِيُّ حُمْرَةً لِسَانِهِ فَيَبْهَشُ إِلَيْهِ -
১৭৮. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (কৌতুক করে) হযরত হাসান ইবন আলী (রা)-এর সামনে মুখ থেকে জিহ্বা বের করে দেখাতেন। তখন সে বাচ্চা [হাসান ইবন আলী (রা)] নবী-এর জিহ্বার লাল রং দেখে (খেজুর কিংবা আহারের কোন জিনিস মনে করে) তা ধরার জন্য হাত ঝাপটাতে থাকতেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, নবী যেভাবে বড়দের সঙ্গে হাসি-কৌতুক করতেন তেমনি তিনি শিশুদের সঙ্গেও হাসি-কৌতুক এবং স্বাভাবিক কথাবার্তা বলতেন। এ সব কাজে কোন কিছুতে তিনি সংকোচ অনুভব করতেন না। এমন কি তাঁর আত্মমর্যাদার বিপরীত বলেও জ্ঞান করতেন না। কেননা নবী-এর শান-শওকত তাঁর উচ্চাসন সাধারণ মানুষের ন্যায় কৃত্রিম বা বানোয়াট ছিলো না যে, কৌতুক প্রকাশ বা প্রফুল্লতা সৃষ্টির দরুন তা নষ্ট হয়ে যাবে। বরং তাঁর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধও ছিলো মহান আল্লাহ্ কর্তৃক উম্মতের মনে স্থাপিত একটি বিষয়। সে মতে নবী-এর কোমল আচরণ, হাসি-কৌতুক প্রফুল্লতা ও আনন্দদায়ক কথাবার্তা উম্মতের প্রতি মহান আল্লাহ্ পক্ষ থেকে একটি বড় ধরনের রহমত ও নিয়ামতরূপে বিবেচিত। আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন :
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ، وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ .
আল্লাহ্র অপার অনুগ্রহে আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছিলেন। যদি আপনি রূঢ় ও কঠোর চিত্ত হতেন তাহলে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। (সূরা আল ইমরান : ১৫৯)
কোন সন্দেহ নেই যে, রাসূলে পাক-এর হাসিখুশি আচরণ ও কোমলতাই ছিল সেই চিত্তাকর্ষক আচরণ যা উম্মতের নারী-পুরুষ, যুবক, বৃদ্ধ ও শিশুদের অন্তরকেও পাগলপারা করে দিয়েছিল। যার ফলে তাদের সকলে রিসালাতের আলোকশিখায় আত্মোৎসর্গকারী পতঙ্গে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।
۱۷۹. عَنْ مُجَاهِدٍ قَالَ دَخَلَ النَّبِيُّ الله عَلَى عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا وَعِنْدَهَا عَجُونٌ، فَقَالَ مَنْ هُذِهِ ؟ قَالَتْ هِيَ مِنْ أَخْوَالِي فَقَالَ النَّبِيُّ لا إِنَّ الْعَجْزَ لَا تَدْخُلُ الْجَنَّةَ فَشَقَّ ذَلِكَ عَلَى الْمَرَأةِ فَلَمَّا دَخَلَ النَّبِيُّ ﷺ قَالَتْ لَهُ عَائِشَةُ فَقَالَ إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يُنْشِئُهُنَّ خَلْقًا غَيْرَ خَلْقِهِنَّ -
১৭৯. হযরত মুজাহিদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা নবী হযরত আয়েশা (রা)-এর গৃহে প্রবেশ করে দেখলেন তার কাছে জনৈকা বৃদ্ধা বসে রয়েছেন। নবী বললেন, এ বৃদ্ধা মহিলাটি কে? হযরত আয়েশা (রা) বললেন, আমার মাতুলালয়ের একজন। নবী কৌতুক করে বলেছিলেন, বৃদ্ধা মহিলা কখনোই বেহেশতে প্রবেশ করবে না। নবী -এর এ কথাটি বৃদ্ধার কাছে ভারী বোধ হলো। (সে অস্থির হয়ে উঠল) কিছুক্ষণ পর নবী ঘরে ফিরে আসলে হযরত আয়েশা (রা) তাঁকে বিষয়টি জান'লেন। তখন বললেন, (আরে) আল্লাহ্ তা'আলা এ বৃদ্ধাদেরকে (কিয়ামতের দিন) তাদের দৈহিক 'অ।কৃতি পরিবর্তন পূর্বক যৌবনের আকৃতিতে পুনরুত্থিত করবেন। (যুবতীর বেশেই সকল বৃদ্ধা বেহেস্তে প্রবেশ করবে)।
ফায়দা : হাদীসের অর্থ হলো কিয়ামতের দিন সকল বৃদ্ধাকে যুবতীর আকৃতিতে পুনরুত্থিত করা হবে এবং এ আকৃতিতে তারা বেহেস্তে প্রবেশ করবে। কাজেই বৃদ্ধা অবস্থায় কেউ বেহেস্তে প্রবেশ করবে না বরং সকলেই প্রবেশ করবে পূর্ণ যৌবনের আকৃতি নিয়ে। বৃদ্ধা মহিলারা সাধারণত কোন কথার গভীর চিন্তা না করেই অস্থির হয়ে উঠে। নবী এ কথা জেনেই হযরত আয়েশার মাতুল সম্পর্কীয় বৃদ্ধার সাথে কৌতুক করেন। স্পষ্ট কথা নবী তাঁর কথাটির রহস্য জানিয়ে দিলে বৃদ্ধা নবী -এর প্রতি গভীরভাবে অনুরাগী হয়ে ওঠেন। হযরত আয়েশা (রা)-ও এ থেকে লাভ করেন পরম চিত্ত প্রফুল্লতা। এটিই ছিল রাহমাতুল্লিল আলামীনের উপযুক্ত মমত্ববোধ ও আন্তরিকতা।
۱۸۰. عَنْ عِكْرِمَةَ قَالَ كَانَ بِالنَّبِيِّ دُعَابَةُ يَعْنِي مِزَاحًا -
১৮০. হযরত ইকরিমা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর পবিত্র সত্তায় হাসি-খুশির স্বভাব বিদ্যমান ছিল।
۱۸۱. عَنِ ابْنِ الْوَرْدِ عَنْ أَبِيهِ قَالَ رَانِي النَّبِيُّ وَرَانِي رَجُلًا أَحْمَرَ فَقَالَ أَنْتَ الْوَرْدُ، قَالَ جُبَارَةُ مَازَحَهُ -
১৮১. হযরত ইব্ন আবুল ওয়ারদ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, একদা নবী ﷺ আমাকে দেখতে পেতেন। তিনি আমার শরীরের লালচে শুভ্র বর্ণ দেখে বললেন, তুমি তো রীতিমত গোলাপ ফুল। হযরত জুবায়রা (ইব্ন মুফলিস) বলেন, নবী ﷺ এ কথাটি কৌতুক করে বলেছিলেন।
ফায়দা: আবুল ওয়ারদ (রা) ছিলেন নবী ﷺ-এর একজন সাহাবী। তিনি এ উপনামেই অধিকতর প্রসিদ্ধ ছিলেন। ইতিপূর্বে তাঁর নাম এটি ছিলো না। এ নামে প্রসিদ্ধ হওয়ার কারণ হলো তিনি লালচে শুভ্র বর্ণের ছিলেন। নবী ﷺ আদর করে তাঁকে গোলাপ ফুল অভিহিত করে বলেছিলেন তুমি তো রীতিমত গোলাপ ফুল। সেই থেকে তিনি আবুল ওয়ারদ অর্থাৎ গোলাপ ফুলের বাবা নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।
۱۸۲. عَنْ ابْنِ كَعْبِ بْنِ مَالِكِ عَنْ أَبِيْهِ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا سُرَّ بِالْأَمْرِ اسْتَنَارَ كَاسْتَنَارَةِ الْقَمَرِ -
১৮২. হযরত ইব্ন কা'ব ইব্ন মালিক তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, নবী ﷺ যখন কোন কাজে আনন্দিত হতেন তখন তাঁর চেহারা মুবারক পূর্ণ চন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠত।
۱۸۳. عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ كَعْبٍ عَنْ أَبِيهِ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا سُرَّهُ الْأَمْرُ اسْتِنَارَ وَجْهُهُ اسْتِنَارَةَ الْقَمَرِ -
১৮৩. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন কা'ব তাঁর পিতা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, কোন কাজ যখন নবী ﷺ-কে আনন্দিত করত তখন তাঁর চেহারা মুবারক আলোময় চন্দ্রের ন্যায় আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠত।
١٨٤ عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا أَنَّهَا قَالَتْ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ دَخَلَ مسْرُورًا تَبْرُقُ أَسَارِيرُ وَجْهِهِ -
হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ একদা ঘরে প্রবেশ করলেন আনন্দচিত্ত অবস্থায়। তখন আনন্দের আতিশয্যে তাঁর চেহারা মুবারকের সৌন্দর্য যেন জ্বলজ্বল করছিল।
ফায়দা: প্রিয় নবী ﷺ-এর উজ্জ্বল ললাট ও আলোকময় চেহারা তাঁর প্রসন্ন প্রকৃতি মমত্ববোধ ও উদারতার প্রকৃষ্ট দলীল।
١٨٥. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَ مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ مُسْتَجْمِعًا ضَاحِكًا حَتَّى أَرَى لَهَوَاتِهِ، إِنَّمَا كَانَ يَتَبَسُمُ -
১৮৫. হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী -কে কখনো এভাবে হো হো করে হাসতে দেখিনি যে, তাঁর মুখ গহ্বরের পূর্ণ অংশ আমার নজরে এসেছে, বরং তিনি (আনন্দ ও প্রসন্নতার মুহূর্তে) মুচকি হাসি হাসতেন।
١٨٦ ، عَنْ أَبِي رَجَاءَ حُصَيْنُ بْنِ يَزِيدَ الْكَلْبِي قَالَ مَا رَأَيْتُ النَّبِيُّ ضَاحِكًا مَا كَانَ إِلَّا الْتَبَسُمُ -
১৮৬. হযরত আবূ রাজা হোসাইন ইন ইয়াযীদ কালবী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী-কে কখনো (মুখ খুলে) হাসতে দেখিনি। তাঁর হাসার পদ্ধতি মুচকি হাসির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
ফায়দা : উপরোক্ত হাদীস দুটি থেকে বোঝা যায় যে, নবী কখনো হো হো করে কিংবা মুখ খুলে হাসতেন না। হাসির মুহূর্তে সাধারণত তিনি মুচকি হাসি হাসতেন। এমন মুহূর্ত তাঁর জীবনে খুবই বিরল পাওয়া গিয়েছে, যেখানে হাসতে গিয়ে তাঁর মুখ খুলে গিয়েছিলো। এ কারণেই বর্ণনাকারী প্রিয় নবী -এর সাধারণত নীতির প্রতি সমীহ প্রকাশ করে বলেন, তিনি জোরে হাসার স্থানেও মুচকি হাসি হাসতেন। প্রিয় নবী -এর এই মুচকি হাসির কারণ হলো যে হো হো করে কিংবা মুখ খুলে অট্টহাসি হাসার অভ্যাস মানুষের গাম্ভীর্য ও আত্মসম্মানকে ক্ষুণ্ণ করে দেয়।
۱۸۷ عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا رَأَى مَا يَكْرَهُ قَالَ الْحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى كُلِّ حَالٍ وَإِذَا رَأَى مَا يَسُرُّهُ قَالَ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي بِنِعْمَتِهِ تَتِمُ الصالحات -
১৮৭. হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন কোন অপছন্দনীয় জিনিস দেখতেন তখন নিম্নোক্ত দু'আ পাঠ করতেন : الْحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى كُلِّ حَالٍ অর্থাৎ সর্বাবস্থায় সকল প্রশংসা আল্লাহ্র জন্য। আর তিনি যখন কোন পছন্দনীয় আনন্দদায়ক জিনিস দেখতেন তখন নিম্নোক্ত দু'আ বলতেন : الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي بِنِعْمَتِهِ تَتِمُّ অর্থাৎ সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য যার অনুগ্রহ ও দয়ার দৌলতেই যাবতীয় কল্যাণকর কাজ সুসম্পন্ন হয়।
ফায়দা : আলোচ্য হাদীসে দু'টি মূল্যবান দু'আর উল্লেখ করা হয়েছে। এ দু'আ দু'টিকে নিজেদের কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত করে নেয়া বড়ই সৌভাগ্য ও কল্যাণের বিষয়। নবী -এর এটিই নিয়ম ছিল।
১৮৮. عَنْ صُهَيْبٍ قَالَ ضَحِكَ رَسُولُ اللهِ ﷺ حَتَّى بَدَتْ نَوَا جِذْهُ -
১৮৮. হযরত সুহাইব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এভাবে মুখ খুলে হাসেন যে, তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত দেখা গিয়েছিল।
۱۸۹. عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ ضَحِكَ رَسُولُ اللهِ ﷺ حَتَّى بَدَتْ أَنْيَابُهُ .
১৮৯. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এভাবে হাসতে থাকেন যে, তাঁর তীক্ষ্ণ দাঁতগুলি পর্যন্ত দেখা গিয়েছিল।
ফায়দা : উপরোক্ত দু'টি হাদীসে প্রিয় নবী ﷺ-এর মুখ খুলে হাসির উল্লেখ করা হয়েছে। বস্তুত এ ধরনের সীমিত সংখ্যক কয়েকটি ঘটনা পাওয়া যায় যেখানে তিনি অনিচ্ছায় মুখ খুলে হেসেছিলেন নতুবা স্বাভাবিকভাবে তাঁর হাসির নীতি ছিল মুচকি হাসি।
۱۹۰. عَنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيِّ قَالَ سَأَلْتُ خَالِي هِنْدًا عَنْ صِفَةِ النَّبِيِّ ﷺ فَقَالَ كَانَ إِذَا غَضِبَ أَعْرَضَ وَأَشَاحَ وَإِذَا فَرِحَ غَضْ طَرْفَهُ جُلُّ ضَحْكِهِ التَّبَسُمُ يَفْتَرُ عَنْ مِثْلِ حَبَّةِ الْغَمَامِ -
১৯০. হযরত হাসান ইব্ন আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার মামা হযরত হিন্দা (রা)-কে নবী ﷺ-এর গুণাবলি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি বললেন, নবী ﷺ যখন কারোর প্রতি অসন্তুষ্ট হতেন তখন তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন এবং সে ব্যাপারে অমনোযোগী থাকতেন। আর যখন আনন্দিত হতেন তখন (লজ্জাশীলতার কারণে) দৃষ্টি অবনমিত করে রাখতেন। তাঁর যাবতীয় হাসির নিয়ম ছিল মুচকি হাসি। কিন্তু এ হাসির সময়ে (তাঁর দাঁতগুলি) বরফের মত শুভ্র ও উজ্জল দেখাত।
۱۹۱ ، عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ بَعَثَنِي رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِلَى الْيَمَنِ، أَتَانِي ثَلَاثَةُ نَفَرٍ يَخْتَصِمُونَ فِي غُلَامٍ امْرَأَةٍ وَقَعُوا عَلَيْهَا جَمِيعًا فِي طُهْرٍ وَاحِدٍ وَكُلُّهُمْ يَدْعِى أَنَّهُ ابْنُهُ، فَاقَرَعْتُ بَيْنَهُمْ فَالْحَقْتُهُ بِالَّذِي أَصَابَتْهُ الْقُرْعَةُ وَبِنَصِيْبِهِ لِصَاحَبَيْهِ ثُلُثَى دِيَةِ الْحُرِ فَلَمَّا قَدِمْتُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ ذَكَرْتُ ذَلِكَ لَهُ فَضَحِكَ حَتَّى ضَرَبَ بِرِجْلَيْهِ الْأَرْضَ ثُمَّ قَالَ حَكَمْتَ فِيْهِمْ بِحُكْمِ اللَّهِ أَوْ قَالَ لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ حُكْمَكَ فِيْهِمْ -
১৯১. হযরত আলী ইব্ন আবু তালিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাকে যখন ইয়ামেনে (কাযী নিযুক্ত করে) পাঠিয়েছিলেন, তখন আমার কাছে তিনজন লোক এসে একটি মামলা দায়ের করলো। এ লোকেরা এমন একটি মহিলার গর্ভজাত শিশুর অভিভাবকত্ব নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়েছিলো যে তাদের সকলেরই ক্রীতদাসী ছিলো। এর সঙ্গেই তারা একই 'তুহর' চলাকালে শয্যাগ্রহণ করেছিলো। তিনজনের প্রত্যেকেরই দাবি ছিলো যে শিশুটি তার। হযরত আলী (রা) বলেন, আমি তাদের নামে লটারি করলাম। লটারিতে যার নাম উঠেছিলো শিশুটি তাকেই প্রদান করলাম। আর অবশিষ্ট দু'জনের দাবির বিনিময়ে আমি তার কাছ থেকে একজন আযাদ মানুষের যতটুকু দিয়্যাত (রক্তপণ) দিতে হয় তার দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ে দু'জনকে দিয়ে দিলাম। তারপর আমি নবী -এর দরবারে উপস্থিত হলে এ ঘটনা বর্ণনা করি। নবী ঘটনা শুনে খুব হাসলেন। এমন কি হাসির আতিশয্যে তিনি আপন পদযুগল যমীনের উপর মারতে থাকেন। তারপর বললেন, হে আলী! তুমি তাদের বিষয়টি আল্লাহর হুকুম মোতাবেক ফয়সালা করেছো। কিংবা নবী বলেছেন, তাদের ব্যাপারে তোমার এ সিদ্ধান্তে মহান আল্লাহ্ খুবই সন্তুষ্ট।
ফায়দা: হাদীস বিশারদ আলিমদের মতে এ হাদীসের সূত্র অতিশয় দুর্বল। গ্রন্থকার (র) এখানে হাদীসটির শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা বিচারের জন্য উপস্থাপন করেন। এবং তাঁর উদ্দেশ্য হলো কেবল নবী -এর হাসি ও মুচকি হাসির পদ্ধতি বর্ণনা করা। এই লক্ষ্যেই তিনি হাদীসটিকে আলোচ্য অনুচ্ছেদে সন্নিবেশিত করেছেন।
۱۹۲. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ تَبَسَمْ حَتَّى بَدَتْ نَوَاجِذُهُ -
১৯২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ -কে এমন ভাবে হাসতে দেখেছি যে, তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত দেখা গিয়েছিল।
١١٣ . عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ الإِذَا غَضِبَ رُنِي بِوَجْهِهِ ظلال -
১৯৩. হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী রাগান্বিত হতেন তখন তাঁর চেহারা মুবারকে রাগের ছায়ার প্রতিফলন ফুটে উঠত।
ফায়দা : অর্থাৎ যে ভাবে তাঁর চেহারা মুবারকে আনন্দ ও প্রফুল্লতার প্রতিক্রিয়া: তে সঙ্গে ফুটে উঠত, তদ্রূপ তাঁর রাগ ও ক্রোধের প্রতিক্রিয়াও তাঁর মুবারক চেহারায় স্পষ্ট দে যেতো।