📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ > 📄 নবী (সা) কর্তৃক অপছন্দনীয় জিনিস পরিহার ও এড়িয়ে যাওয়া সম্পর্কিত রিওয়ায়াতসমূহ

📄 নবী (সা) কর্তৃক অপছন্দনীয় জিনিস পরিহার ও এড়িয়ে যাওয়া সম্পর্কিত রিওয়ায়াতসমূহ


١٤٤. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَلْمًا يُوَاجِهُ أَحَدًا بِشَيْءٍ يَكْرَهُهُ، فَقَرَّبَ إِلَيْهِ صَفْحَةٌ فِيهَا قَرْعٌ وَكَانَ يَلْتَمِسُهُ بِاصَابِعِهِ فَدَخَلَ رَجُلٌ عَلَيْهِ أَثْرُ صُفْرَةٍ فَكَرِهَهُ ، فَلَمْ يَقُلْ لَهُ شَيْئًا حَتَّى خَرَجَ ، فَقَالَ بَعْضُ الْقَوْمِ لَوْ قُلْتُمْ لِهَذَا أَنْ يَدَعْ هَذِهِ يَعْنِي الصُّفْرَةُ -

১৪৪. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর অভ্যাস ছিলো, তিনি কারো সামনা-সামনি কোনো কথা খুব কমই বলতেন। অর্থাৎ তাঁর অপছন্দনীয় কোন জিনিস দেখলেও সামনা-সামনি খুব কমই তার প্রতিবাদ করতেন। (সুতরাং) একবার তাঁর সামনে লাউ তরকারির একটি পেয়ালা পেশ করা হলো। তিনি অঙ্গুলি দ্বারা লাউয়ের টূকরা খোঁজ করছিলেন। তখন এমন এক ব্যক্তি তাঁর নিকট প্রবেশ করলো যার গায়ে হলুদ রং-এর খুশবু চিহ্ন পরিলক্ষিত হচ্ছিল। লোকটির এভাবে নবী-এর নিকট আসা তাঁর পছন্দ হলো না। কিন্তু তিনি তাকে কিছুই বললেন না। লোকটির এ ধরনের রং ব্যবহার নবী-এর পছন্দ হলো না, কিন্তু তিনি কিছুই বলার পূর্বে লোকটি বের হয়ে গেল। তখন নবী অপর এক ব্যক্তিকে বললেন, তুমি যদি সে লোকটিকে বলে দিতে যে, হলুদ রং ব্যবহার ছেড়ে দিলেই ভাল হতো।

ফায়দা: এই হাদীস দ্বারা বোঝা যায় নবী কারো থেকে অপছন্দনীয় কোন জিনিস হতে দেখে সাথে সাথেই তাকে সাবধান করতেন না। বরং অধিকাংশ সময় উম্মতের প্রতি সহানুভূতিবশত এড়িয়ে যেতেন। লোকটিকে তৎক্ষণাৎ সামনা-সামনি কিছু না বলার পেছনে রহস্য এই ছিলো যে, এভাবে সামনা-সামনি বললে হয়ত লোকটি তাঁর কথা মান্য না করতেও পারে। এতে লোকটির ইহলোক ও পরলোকের সমূহ ক্ষতি হয়ে যাবে। আর নবী-এর কর্মনীতি এসব বিষয়ের ব্যাপারে হতো যা কোন 'উত্তম কাজ' পরিহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো। এবং এরূপ বিষয়ে দেরিতে সাবধান করলে কোনরূপ ক্ষতি নেই। কিন্তু কোন হারাম ও শরীয়ত নিষিদ্ধ অশ্লীল কাজের বিষয়ে তিনি তৎক্ষণাৎই পাকড়াও করতেন। যাহোক নবী ছিলেন তাঁর উম্মতের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ও মেহেরবান। তাঁর এই দয়া ও স্নেহের কারণেই তিনি কোন অপছন্দনীয় ব্যাপারে যা শরীয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ নহে সঙ্গে সঙ্গে পাকড়াও করতেন না। এর দ্বারা নবী-এর উত্তম তালীম ও তারবিয়াতের (শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ) অনুমান করা যায়।

١٤٥. عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ الْحَكَمِ قَالَ صَلَّيْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَعَطَسَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ فَقُلْتُ يَرْحَمُكَ اللهُ فَرَمَانِي الْقَوْمُ بِأَبْصَارِهِمْ وَضَرَبُوا بِأَيْدِيهِمْ عَلَى أَفْخَانِهِمْ فَلَمَّا رَأَيْتُهُمْ يُصْمِتُونَى لَكِنِّي سَكَتْ قَالَ فَدَعَانِي النَّبِيُّ ﷺ بِأَبِي وَأُمِّي مَا رَأَيْتُ مُعَلَّمًا أَحْسَنَ تَعْلِيمًا مِنْهُ مَا ضَرَبَنِي وَلَا سَبَّنِي ثُمَّ قَالَ إِنَّ هَذِهِ الصَّلَاةُ لَا يَصْلِحُ فِيهَا شَيْءٌ مِنْ كَلَامِ النَّاسِ إِنَّمَا هُوَ التَّسْبِيحُ وَالتَّكْبِيرُ والتَّمْحِيدُ .

১৪৫. হযরত মুয়াবিয়া ইব্‌ন আবুল হাকাম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি রাসূলুল্লাহ্-এর সাথে জামায়াতে নামায আদায় করি। (নামাযের মধ্যেই) এক ব্যক্তির হাঁচি এল। রাবী বলেন, (আমি 'আলহামদুলিল্লাহ্'-এর জবাবে) 'ইয়ারহামুকাল্লাহ্' বলে ফেললাম। তখন নামাযরত লোকেরা আমাকে চোখ তুলে দেখতে লাগলো এবং উরুর উপর হাত মারতে শুরু করলো। আমি দেখলাম তারা আমাকে জোর করে চুপ করাতে যাচ্ছে (তখন আমার খুব খারাপ লাগলো)। কিন্তু আমি নিশ্চুপ রইলাম। (নামায শেষে) নবী আমাকে ডাকলেন। আমার মাতাপিতা তাঁর জন্য কুরবান হোন। আমি নবী-এর চেয়ে কোন উত্তম শিক্ষক দেখি নাই। তিনি আমাকে না মারধর করলেন, না বকাঝকা করলেন। তারপর বললেন: নামাযে দুনিয়াবী কথাবার্তা বলা ঠিক নয়, নামায হলো আল্লাহ্র তাসবীহ্ (গুণগান) তাকবীর (মহানত্ব) তামহীদ (প্রশংসা)-এর নাম।

ফায়দা : এ ঘটনা হলো তখনকার যখন হযরত মুয়াবিয়া ইব্‌ন আবুল হাকাম (রা) ছিলেন নও মুসলিম। তখনও তিনি নামাযের সকল বিধি-বিধান শিখতে পারেন নি। তাই এ ঘটনা ঘটে গেল। হযরত মুয়াবিয়া (রা) নিজেই বলেন, ইসলাম গ্রহণের পর আমাকে ইসলামের কিছু কিছু বিধি-বিধান শেখানো হয়েছিলো। তন্মধ্যে আমাকে এও শেখানো হয়েছিলো যে, তোমার হাঁচি এলে 'আলহামদুলিল্লাহ্' বলবে। আর যদি অপর কারো হাঁচি আসে এবং সে 'আলহামদুল্লিাহ্' বলে তবে এর জবাবে তুমি 'ইয়ারহামুকাল্লাহ্' বলবে। হযরত মুয়াবিয়া (রা) বলেন, একবার আমি নবী-এর সাথে নামায পড়ছিলাম। এক ব্যক্তির হাঁচি এল। আর সে 'আলহামদুলিল্লাহ্' বললো। আমি তার জবাবে 'ইয়ারহামুকাল্লাহ্' বললাম। লোকেরা আমার দিকে চোখ তুলে তাকাতে লাগলো। বিষয়টি আমার ভীষণ খারাপ লাগলো। আমি নামাযের মধ্যেই তাদেরকে বলে ফেললাম তোমরা আমার দিকে চোখ তুলে কেনো দেখছো? আমার এ অবস্থা দেখে তারা সুবহানাল্লাহ্ বললো। তারপর নবী যখন নামায শেষ করলেন তখন জিজ্ঞেস করলেন, নামাযে কে কথা বললো? তারপর তিনি নিজেই বললেন: এ বেদুঈন। তারপর তিনি আমাকে ডাকলেন এবং বললেন, নামায ৩ কুরআন পড়া, এবং আল্লাহ্র যিকরের জন্য। সুতরাং তুমি যখন নামাযে থাকবে তখন এ সবই পড়বে। (দুনিয়াবী কথাবার্তা বলবে না।) এ ঘটনা বর্ণনার পর বর্ণনাকারী বলেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ্-এর চেয়ে স্নেহপরায়ণ ও মেহেরবান শিক্ষক জীবনেও দেখিনি।

গ্রন্থকারের এ হাদীসটি এ অনুচ্ছেদে সংকলনের উদ্দেশ্য হলো নবী কর্তৃক সাহাবায়ে কিরামের বিভিন্ন ছোট-খাটো ত্রুটিবিচ্যুতি এড়িয়ে যাওয়ার অবস্থা বর্ণনা করা এবং তিনি কিভাবে ভালবাসা ও স্নেহ-মমতা দিয়ে তালীম দিতেন তা তুলে ধরা। নবী-এর এই অনুপম আদর্শ আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্মের অনুসরণ করা একান্ত কর্তব্য।

١٤٦. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ قَاعِدًا فِي الْمَسْجِدِ وَأَصْحَابُهُ مَعَهُ إِذْ جَاءَ أَعْرَابِيُّ فَبَالَ فِي الْمَسْجِدِ فَقَالَ أَصْحَابُ النَّبِيِّ ﷺ مَا مَنْ فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ لَا تَزْرِمُوهُ ثُمَّ قَالَ إِنَّ هَذِهِ الْمَسَاجِدَ لَا تَصْلُحُ لِشَيْءٍ مِنَ الْقَدْرِ وَالْبَوْلِ وَالْخَلَاءِ أَوْ كَمَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ

১৪৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ মসজিদে অবস্থান করছিলেন। সাহাবা কিরামও তাঁর সাথে বসেছিলেন। ইত্যবসরে এক বেদুঈন সেখানে আসল এবং মসজিদের মধ্যেই (এক পাশে) পেশাব করতে লাগলো। সাহাবা কিরাম হায়! হায়! বলে তাকে পেশাব করতে বিরত রাখতে চাইলেন। কিন্তু নবী বললেন : তাকে পেশাব করতে বাধা দিও না। তারপর ঐ বেদুঈন যখন পেশাব করা শেষ করলো, তখন তাকে তিনি বললেন, দেখো, এই মসজিদগুলো আবর্জনা ছড়ানো ও পেশাব পায়খানা করার জন্য নয়। কিংবা এই ধরনেরই কোনো উক্তি রাসূলুল্লাহ্ করেছেন।

ফায়দা : এ হাদীস থেকেও নবী-এর অপরিসীম দয়া ও মমত্ববোধের অনুমান করা যায়। কোনো কোনো রিওয়ায়াতে আছে, ঐ বেদুঈন যখন পেশাব করা শেষ করলো, তখন নবী পানি আনিয়ে স্বয়ং এ স্থানটি ধৌত ও পবিত্র করান। পেশাব করার মাঝখানে ঐ বেদুঈনকে বাধা দিতে তাঁর নিষেধ করার কারণ হচ্ছে, পেশাব করার মাঝখানে বাধা দিলে তাতে তার কষ্ট হতে পারতো এবং মূত্রনালিতে পেশাব আটকে যেতে পারতো। এক রিওয়ায়াতে আছে, নবী ঐ ব্যক্তিকে ডেকে বললেন : এই মসজিদসমূহ পেশাব ও ময়লা ছড়ানোর জন্য নয়। এগুলো আল্লাহ্ তা'আলার যিক্র, নামায ও কুরআন তিলাওয়াত করার জন্য বানানো হয়েছে। এ হাদীসগুলো উম্মতের সাধারণ মানুষের জন্য উপদেশ ও তালীম-তারবিয়াতের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে এক বিরাট শিক্ষা। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের মূর্খসুলভ কাজকর্মে ধৈর্যধারণ করে তাদেরকে স্নেহ ও ভালবাসার সাথে দীনী বিষয়সমূহ শিক্ষা দেয়া উচিত।

١٤٧. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ إِذَا بَلَغَهُ مَنْ رَجُلٍ شَيْءٍ لَمْ يَقُلْ لَهُ قُلْتَ كَذَا وَكَذَا بَلْ قَالَ مَا بَالُ القَوَامِ يَقُولُوْنَ كَذَا وَكَذَا -

১৪৭. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো অপছন্দনীয় বিষয় অবগত হতেন, তখন তিনি তাকে সম্বোধন করে একথা বলতেন না যে, তুমি এরূপ এরূপ বলেছো। বরং তিনি (অনির্দিষ্টভাবে) বলতেন, লোকদের কি হয়েছে যে, তারা এরূপ এরূপ কথা বলছে?

ফায়দা : এ হাদীস থেকেও নবী সুসামাজিকতা ও মননশীলতার অনুমান করা যায়। তিনি কখনো কাউকে সম্বোধন করেও সাবধান করতেন না। আর কারো নাম ধরেও তার অপছন্দনীয় বিষয় প্রকাশ করতেন না। বরং তিনি যদি কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো অপছন্দনীয় বিষয় অবহিত হতেন এবং তিনি তাকে সতর্ক করতে চাইতেন, তবে সাধারণভাবে সাবধান করে দিতেন। যেমন তিনি বলতেন, লোকদের কি হয়েছে যে, এরূপ অলীক কথা বলে। তিনি কখনো এরূপ বলতেন না যে, অমুক ব্যক্তির কি হয়েছে যে, এরূপ অলীক কথা বলে। এ হচ্ছে তালীম-তারবিয়াতের এমন এক শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি যাতে ঝগড়া-বিবাদ ও শত্রুতা সৃষ্টি হয় না। আর যাকে উদ্দেশ্য করে একথা বলা হলো, সেও তার ভ্রান্তির ব্যাপারে অপর লোকের সামনে লজ্জিত হয় না। সামাজিক আচার বা শিক্ষার ব্যাপকতা ও সার্বজনীনতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ তাঁর উম্মতকে কত পূর্ণাঙ্গ দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, তা এই ধরনের ঘটনাবলি থেকেই অনুমিত হয়। আল্লাহ্ তা'আলা আমাদেরকে তাঁর পদাংক অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন।

١٤٨ عَنْ عِمْرَانَ بْنِ الْحُصَيْنِ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ إِذَا كَرِهَ شَيْئًا عُرِفُ ذَلِكَ فِي وَجْهِهِ -

১৪৮. হযরত ইমরান ইবন হুসায়ন (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন কোনো বিষয় অপছন্দ করতেন, তা তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল থেকেই অনুমান করা যেতো।

ফায়দা : এ বিষয়ে অন্যান্য হাদীস এবং পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদ "নবী-এর সন্তুষ্টির ও অসন্তুষ্টি নিদর্শন"-এ সবিস্তার বর্ণিত হয়েছে।

এখানে গ্রন্থকার এ হাদীসটি কেবল এজন্য বর্ণনা করেছেন যে, নবী প্রতিটি বিষয়ে সামনা-সামনি কাউকে ভর্ৎসনা করতেন না, বরং তিনি কোনো বিষয়কে অপছন্দ করলে নীরব থাকতেন। কিন্তু এই অপছন্দ তাঁর মুখমণ্ডলে অবশ্যই প্রকাশ পেতো। কোনো কোনো অপছন্দনীয় বিষয় এমন হয়, যা কেবল চেহারা দ্বারা প্রকাশ করাই যথেষ্ট হয় এবং কোনো কোনো বিষয় মুখে প্রকাশ করারও প্রয়োজন হয়। প্রথম হাদীসটি শেষোক্ত বিষয় সম্পর্কিত ছিলো। অনুরূপভাবে কোনো কোনো লোক এমন হয়ে থাকে, যাদের সতর্ক করার জন্য কেবল চেহারা দ্বারা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করাই যথেষ্ট হয় এবং কোনো কোনো লোককে সতর্ক করার জন্য মুখে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। এই দুই হাদীসের মধ্যে নবী -এর কর্ম-পদ্ধতির পার্থক্য এর উপরই নির্ভরশীল। যা হোক, নবী যে সব লোককে সংশোধন করতে চাইতেন, তিনি তার কথা ও কাজ দ্বারা তার মনে কোনো কষ্ট দিতেন না। কেননা, সংশোধন ও শিক্ষা-দীক্ষার কাজে মনে কষ্ট দান ক্ষতিকর। এতে ভালোর চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়।

١٤٩. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا اسْتَدْ وَجْهُهُ أَكْثَرَ مَسًّ لِحْيَتِهِ-

১৪৯. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ যখন কোনো কঠিন সংকটে পতিত হতেন, তখন তিনি বারংবার (মুবারক) দাড়িতে হাত বুলাতেন।

ফায়দা: এ অবস্থা রাসূলুল্লাহ্-এর চরম ধৈর্য ও সহিষ্ণুতাকেই প্রকাশ করে। নচেৎ সাধারণত মানুষ এরূপ ক্ষেত্রে মুখে তার মনের আক্রোশ প্রকাশ করে থাকে। কিন্তু তাতে সাধারণত ক্ষতি হয়। ন্যূনপক্ষে এই দুঃখ ও উষ্মা প্রকাশে মানুষের মনে কষ্ট হয়। এ কারণে রাসূলুল্লাহ্ এ পদ্ধতি পরিহার করতেন এবং স্বয়ং কষ্ট সহ্য করতেন।

١٥٠. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ النَّبِىُّ ﷺ عِنْدَ إِحْدَى أُمَّهَاتِ الْمُؤْمِنِيْنَ فَأَرْسَلَتْ إِحْدَى نِسَائِهِ بِقَصْعَةِ فِيْهَا طَعَامٌ، فَضَرَبَتْ بِيَدِ الرَّسُولِ فَسَقَطَتْ الْقَصْعَةُ فَانْكَسَرَتْ، فَأَخَذَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ الْكِسْرَتَيْنِ فَضَمَّ إِحْدَاهُمَا الْأُخْرَى ثُمَّ جَعَلَ وَيَجْمَعُ الطَّعَامَ فَيَقُولُ غَارَتْ أُمُّكُمْ كُلُوا فَكُلُوا ، فَجَلَسَ الرَّسُولُ حَتَّى جَاءَتْ الْكَاسِرَةُ بِقَصْعَتِهَا الَّتِي هِيَ فِي بَيْتِهَا فَدَفَعَ الصُّحْفَةَ الصَّحِيْحَةَ إِلَى الرَّسُوْلِ وَتَرَكَ الْمَكْسُوْرَةَ فِي الَّتِي كَسَرَتْهَا-

১৫০. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী উম্মাহাতুল মু'মিনীন-এর মধ্য থেকে কোনো একজনের নিকট অবস্থান করছিলেন। ইত্যবসরে তাঁর সহধর্মিণীদের মধ্য থেকে কোনো একজন (কিছু খাদ্যদ্রব্যসহ) একটি বাটি তাঁর কাছে প্রেরণ করেন। যে উম্মুল মু'মিনীনের নিকট তিনি ঐ দিন অবস্থান করছিলেন, তিনি খাদ্য নিয়ে আগমনকারীর হাতে হাত দ্বারা আঘাত করলেন। ফলে বাটি পড়ে গিয়ে ভেঙে গেলো। নবী তার উভয় টুক্রা তুলে নিলেন এবং তাকে একে অপরের সাথে মিলিয়ে নিলেন। এরপর ইতস্তত বিক্ষিপ্ত খাবারগুলো একত্রিত করে বললেন যে, তোমাদের মায়ের (উম্মুল মু'মিনীনের) আত্মমর্যাদাবোধে (আঘাত) লেগেছে, তোমরা খাবারগুলো খেয়ে ফেলো। সুতরাং সবাই তা খেয়ে ফেললো। খাবার নিয়ে আগমনকারী বাটি নেয়ার জন্য বসে রইল। ইতিমধ্যে বাটিটি যাঁর হাতে ভেঙেছিলো, তিনি তাঁর ঘর থেকে একটি নিখুঁত বাটি নিয়ে এলেন। নবী খাবার নিয়ে আগমনকারীকে ঐ নিখুঁত বাটিটি দিয়ে দিলেন এবং ভাঙা বাটিটি যিনি ভেঙেছিলেন তাঁরই ঘরে রেখে দিলেন।

ফায়দা : এ ঘটনাটিও নবী-এর মহৎ ক্ষমা গুণের জ্বলন্ত প্রমাণ। ঘটনাটি ছিলো এরূপ : রাসূলুল্লাহ্ উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-এর গৃহে অবস্থান করছিলেন। এই সময় তাঁর অন্য এক সহধর্মিণী কারো মাধ্যমে একটি বাটিতে করে কিছু খাবার নবী-এর নিকট পাঠালেন। একজন নারী হিসাবে হযরত আয়েশা (রা)-এর আত্মমর্যাদায় বাধলো যে, তাঁর গৃহে তাঁর কোনো সতীনের পক্ষ থেকে তাঁর স্বামীর জন্য খাবার আসবে। তাই তিনি ঐ কাজটি করলেন। একটু চিন্তা করুন, নবী-এর বিবেচনায় এ কাজটি কতখানি অপছন্দনীয় হতে পারে। কিন্তু তিনি তাঁর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পরম ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়ে হযরত আয়েশা (রা)-এর এহেন কাজের কোনো কৈফিয়ত তলব করলেন না কিংবা তাঁকে ভর্ৎসনাও করলেন না। বরং হযরত আয়েশা (রা)-এর পক্ষ থেকে নারী জাতির স্বভাবগত আত্মমর্যাদাবোধের (ঈর্ষা) ওজর পেশ করে অন্যদেরকেও নারীর এই স্বভাবগত দুর্বলতা সম্পর্কে অবহিত করলেন এবং বিক্ষিপ্ত খাবারগুলো একত্রিত করে নিজেও খেলেন ও অন্যদেরকেও খাওয়ালেন। বস্তুত এটা নবী-এরই মহান চরিত্রের প্রকৃষ্ট উদাহরণ যে, অপছন্দনীয় বিষয়ের অপছন্দনীয় অংশটুকু উপেক্ষা করে শুধু তার কৈফিয়ত তলব করা ও ভর্ৎসনা করা থেকেই বিরত থাকেননি, বরং তার সপক্ষে প্রকৃতিগত দাবির ওজরও বর্ণনা করেন।

١٥١ عَنْ أَنَسٍ قَالَ اِسْتَحْمَلَ أَبُو مُوسَى النَّبِيُّ ، فَوَافَقَ مِنْهُ شَغَلاً فَقَالَ وَاللَّهِ لَا أَحْمِلُكَ، فَلَمَّا قَفَا دَعَاهُ فَقَالَ يَارَسُوْلَ اللهِ قَدْ حَلَفْتَ لَا تَحْمِلُنِي قَالَ وَأَنَا أَحَلِفُ لَأَحْمِلَنَّكَ فَحَمَلَهُ .

১৫১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আবূ মূসা আশআরী (রা) নবী-এর নিকট সফরের জন্য বাহন চাইলেন। নবী তখন কোনো কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তাই তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! এখন আমি তোমাকে কোনো বাহন দেবো না। কিন্তু আবূ মূসা আশআরী (রা) যখন ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন নবী তাকে বাহন দেওয়ার জন্য ডাকলেন। তখন আবূ মূসা আশআরী (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি তো আমাকে বাহন না দেওয়ার কসম খেয়েছেন। নবী তখন বললেন, এখন আমি কসম করে বলছি যে, তোমাকে অবশ্যই বাহন দেবো। সুতরাং তিনি তাঁকে বাহন দিয়ে দিলেন।

ফায়দা: এ হাদীসের মর্ম সুস্পষ্ট। কোনো কোনো হাদীসে বর্ণিত আছে, যেহেতু তখন নবী এর নিকট দেওয়ার মতো কোনো বাহন ছিলো না, তাই তিনি বাহন দিতে অস্বীকার করেছিলেন। মুসলিম শরীফের (কিতাবুল ঈমান) এক হাদীসে হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, আমি একবার আমার কতিপয় আশআরী বন্ধুর সাথে নবী -এর নিকট সফরের জন্য বাহন চাইতে গেলাম। কিন্তু তিনি বাহন দিতে অস্বীকার করলেন। বললেন, আল্লাহ্র কসম! তোমাকে দেওয়ার মতো কোনো বাহন নেই। (বর্ণনাকারী বলেন) এরপর কিছুক্ষণ আমরা নবী -এর দরবারে অবস্থান করলাম। ইতিমধ্যে তাঁর কাছে কোথাও থেকে কিছু উট এসে গেলো। সুতরাং তিনি উটগুলোর মধ্য থেকে সাদা কুঁজওয়ালা তিনটা উট আমাদেরকে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। উট নিয়ে আমরা চলতে লাগলাম। আমি কিংবা আমাদের মধ্য থেকে কেউ বললো, এ উটগুলোর মধ্যে আল্লাহ্ বরকত দান করবেন না। কেননা, আমরা এসে যখন নবী -এর নিকট বাহন প্রার্থনা করেছিলাম, তখন তিনি বাহন না দেয়ার কসম খেয়েছিলেন। আর এখন আমাদেরকে বাহন দিয়েছিলেন। সুতরাং তারা নবী -এর নিকট ফিরে এলো এবং তাঁকে একথা জানালো। তিনি বললেন, আমি তো তোমাদেরকে বাহন দেইনি। তোমাদেরকে বাহন দিয়েছেন আল্লাহ্ তা'আলা। আর আল্লাহ্র কসম! আমি যদি কখনো কসম করি, এবং তার বিপরীতে তার চেয়ে উত্তম দেখতে পাই, তবে আমি সে কাজ করে ফেলি এবং কসমের কাফ্ফারা প্রদান করি।

এ হাদীস থেকে এও জানা গেলো, যদি কোনো বিষয়ে কসম খাওয়া হয় এবং এর বিপরীত কোন বস্তুতে মংগল বা কল্যাণ পরিলক্ষিত হয়, তবে ঐ কসম ভেঙে ফেলা উচিত এবং কসমের কাফ্ফারা প্রদান করা উচিত।

যেমন এক হাদীসে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, নবী বলেন, যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ে কসম খেয়েছে, তারপর ভিন্ন কাজ তার থেকে উত্তম পেয়েছে, ঐ উত্তম কাজটিই সে গ্রহণ করবে এবং সে তার পেছনের কসমের কাফ্ফারা প্রদান করবে। (মুসলিম শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮)

١٥٢. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كُسِرَتْ رُبَاعِيَّةُ النَّبِيِّ ﷺ يَوْمَ أَحُدٍ وَشَجَّ فَجَعَلَ الدَّمُ يَسِيلُ عَلَى وَجْهِهِ وَهُوَ يَمْسَحُ الدَّمُ وَيَقُولُ كَيْفَ يُفْلِحُ قَوْمُ خَضَبُوا وَجْهَ نَبِيِّهِمْ بِالدَّمِ وَهُوَ يَدْعُوهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ فَأَنْزَلَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْ

১৫২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উহুদ যুদ্ধের দিন নবী-এর দাঁত মুবারক ভেঙে গিয়েছিলো, শির মুবারক জখম হয়েছিল এবং রক্ত তাঁর চেহারা বেয়ে পড়ছিলো। তখন তিনি রক্ত মুছতে মুছতে বলছিলেন : সে জাতি কিরূপে কল্যাণ লাভ করতে পারে, যারা তাদের নবীর চেহারাকে রক্তে রঞ্জিত করে দিয়েছে। অথচ তিনি তাদেরকে আল্লাহর দীনের প্রতি দাওয়াত দিচ্ছেন। তখন মহান আল্লাহ্ এই আয়াত নাযিল করলেন : “لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْئٍ” এ ব্যাপারে আপনার কোনো ইখতিয়ার নেই।

ফায়দা : এটি উহুদ যুদ্ধের প্রসিদ্ধ ঘটনা, যা তৃতীয় হিজরীতে সংঘটিত হয়েছিলো। এ যুদ্ধেই প্রায় ৭০ জন সাহাবী শহীদ হয়েছিলেন। দৃঢ়তা, ত্যাগ ও জীবন কুরবানীর দরুনই আল্লাহ্ তা'আলা مسلمانوں একটি ক্ষুদ্র দলকে কাফিরদের বিরাট বাহিনীর মুকাবিলায় পরাজয়ের পর বিরাট বিজয় দান করেন। এই যুদ্ধেই এক হতভাগ্য আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন কুমাইয়্যা মুসলমান ব্যূহ ভেদ করে সামনে অগ্রসর হয় এবং নবী -এর শিরস্ত্রাণের উপর তলোয়ারের আঘাত হানে। ফলে তাঁর দান্দান মুবারক শহীদ হয় এবং শির মুবারক জখম হয়। এই অবস্থায় তাঁর পবিত্র মুখ দিয়ে এই উক্তি নিঃসৃত হলো “সেই জাতি কিভাবে কল্যাণ লাভ করতে পারে, যারা তাদের নবীর চেহারাকে জখম করে দেয়।” কিন্তু আল্লাহ্ পাক রহমতে আলমের মুখ-নিঃসৃত এই উক্তি পছন্দ করলেন না। আয়াত নাযিল হলো : لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْئُ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظَالِمُونَ তাদের প্রতি ক্ষমাপরবশ হবেন অথবা তাদেরকে শাস্তি দিবেন এ বিষয়ে (হে নবী) আপনার করণীয় কিছুই নেই। কারণ তারা সীমালংঘনকারী।

এ ঘটনা থেকেই অনুমান করুন যে, নবী কি পরিমাণ ক্ষমা ও দয়া প্রদর্শন করতেন। মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার পরও তিনি ঐ কাফির ও মুশরিকদের জন্য মুখে বদ্ দু'আ করেননি এবং একজন মানুষ হিসেবে তাঁর পবিত্র মুখ থেকে যে উক্তি প্রকাশ পেয়েছে তাও আল্লাহ্র নিকট তাঁর মর্যাদার উপযুক্ত মনে করা হয়নি। তাই আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে তৎক্ষণাৎ বলে দেয়া হয়েছে যে, এটা আপনার কাজ নয়। আপনার কাজ তো হচ্ছে ক্ষমা ও দয়া প্রদর্শন করা। কেননা, আপনাকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমতরূপে প্রেরণ করা হয়েছে।

রিওয়ায়াতসমূহে দেখা যায় যে, এই কষ্টদায়ক জখম অবস্থায়ও নবী -এর মুখে ছিলো এই বাণী : رَبِّ اغْفِرْ قَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ "হে আল্লাহ্! আমার জাতিকে তুমি ক্ষমা করো। কেননা, তারা জানে না।

١٥٣ عَنِ الشَّفَاءِ بِنْتِ عَبْدِ اللهِ قَالَتْ أَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَوْمًا أَسْأَلُهُ شَيْئاً فَجَعَلَ يَعْتَذِرُ إِلَى -

১৫৩. হযরত শিফা বিন্ত আবদুল্লাহ্ (রা) বলেন, একবার আমি কিছু চাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট গেলাম। কিন্তু তিনি আমার কাছে অপারগতা প্রকাশ করলেন। (কেননা, তাঁর নিকট তখন দেয়ার মতো কোনো সম্পদ ছিলো না।)

ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী এ সাহাবিয়াকে অভদ্র বা শক্ত কথা বলে বিদায় করেননি। বরং সৌজন্য ও ভদ্রতা বজায় রেখে তার কাছে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন যে, এখন আমার কাছে দেয়ার মতো কিছু নেই। নচেৎ আমি তোমাকে অবশ্যই কিছু দিতাম। অথচ এই অপারগতা প্রকাশ করারও তাঁর প্রয়োজন ছিল না।

١٥٤ عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ فَمَا زَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَعْتَنِزُ إِلَى صَفِيَّةَ وَيَقُولُ يَا صَفِيَّةُ إِنَّ أَبَاكَ أَلَّبَ عَلَى الْعَرَبِ وَفَعَلَ حَتَّى ذَهَبَ ذَلِكَ مِنْ نَفْسِهَا -

১৫৪. হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (উম্মুল মু'মিনীন হযরত) সাফিয়্যা (রা)-এর কাছে (তাঁর পিতার হত্যা সম্পর্কে, যে খায়বারের যুদ্ধে مسلمانوں হাতে নিহত হয়েছিল) ওজর পেশ করতে থাকেন এবং বললেন : হে সাফিয়্যা! তোমার পিতাই তো সারা আরবের লোকদেরকে مسلمانوں বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য উস্কিয়ে ছিলো এবং তাদেরকে সমবেত করেছিলো। এরূপ ওজর পেশ করার দরুন তাঁর অন্তর থেকে এই দুঃখ অন্তর্হিত হয়ে যায়।

ফায়দা : উম্মুল মু'মিনীন হযরত সাফিয়্যা (রা) খায়বার অধিপতির কন্যা ছিলেন। তাঁর স্বামী ছিলো বনূ নাযীর গোত্রের বিরাট ধনী ব্যক্তি। পিতা ও স্বামী উভয়েই খায়বারের যুদ্ধে নিহত হয়েছিলো। খায়বার দুর্গ বিজিত হওয়ার পর অন্যান্য যুদ্ধবন্দীর সাথে হযরত সাফিয়্যাও বন্দী হন। তাঁর এই আভিজাত্য ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের দরুন এবং তাঁর মনোরঞ্জন ও মনস্তুষ্টির জন্য নবী-এর তাঁকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করা ছাড়া কোনো উপায় ছিলো না। তাই তিনি গনীমত বণ্টনের মাধ্যমে নবী-এর ভাগে পড়লেন এবং তিনি তাঁকে তৎক্ষণাৎ আযাদ করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলেন। কিন্তু এরপর যখনই তাঁর পিতার কথা মনে পড়তো যে, সে مسلمانوں হাতে খায়বারের যুদ্ধে নিহত হয়েছে, তখন পিতৃত্বের ভালবাসার কারণে নবী-এর কাছে সে সম্পর্কে অভিযোগ উত্থাপন করতেন। নবী তাঁর মনে ব্যথা দিতেন না এবং কোনো রকম ধমক বা তিরস্কার না করে তাঁর সামনে যুক্তিসঙ্গত ওজর পেশ করতেন। তিনি বলতেন দেখ (দোষটা তো তোমার পিতারই), তোমার পিতাই তো স্বয়ং যুদ্ধ শুরু করেছিলো। যুদ্ধ না করলে সে মারাও যেতো না। সে-ই তো সারা আরবকে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্ররোচিত করেছিলো ও উস্কিয়ে দিয়েছিলো। নবী এ ভাবে স্নেহ ও নম্রতা সহকারে তাঁকে বোঝাতেন। ফলে এক সময় তাঁর অন্তর থেকে এই ব্যথা সম্পূর্ণ দূর হয়ে যায়। তিনি আর কোনো দিন এ বিষয়ে নবী -এর নিকট কোনো অভিযোগ করেননি।

١٥٥ عَنِ الْمُهَاجِرِ بْنِ قُنْفُذِ أَنَّهُ أَتَى النَّبِيَّ ﷺ وَهُوَ يَبُولُ فَسَلَّمُ عَلَيْهِ فَلَمْ يَرُدُّ عَلَيْهِ ثُمَّ تَوَضَّا ثُمَّ اعْتذَرَ إِلَيْهِ فَقَالَ إِنِّي كَرِمْتُ أَنْ أَذْكُرَ اللَّهَ إِلَّا عَلَى طُهُرٍ -

১৫৫. হযরত মুহাজির ইন্ন কুনফুয (রা) থেকে বর্ণিত, একবার তিনি নবী-এর নিকট উপস্থিত হন এবং সালাম করেন। নবী ঐ সময় পেশাব করছিলেন। তাই তিনি সালামের জবাব দিলেন না। তারপর (পেশাব শেষ করে) তিনি ওযু করে তার কাছে ওজর পেশ করলেন। বললেন, পবিত্রতা ছাড়া আল্লাহ্ নাম নেয়া আমার কাছে ভাল মনে হয়নি।

📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ > 📄 নবী (সা) কর্তৃক অপছন্দনীয় জিনিস পরিহার ও এড়িয়ে যাওয়া সম্পর্কিত রিওয়ায়াতসমূহ

📄 নবী (সা) কর্তৃক অপছন্দনীয় জিনিস পরিহার ও এড়িয়ে যাওয়া সম্পর্কিত রিওয়ায়াতসমূহ


١٤٤. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَلْمًا يُوَاجِهُ أَحَدًا بِشَيْءٍ يَكْرَهُهُ، فَقَرَّبَ إِلَيْهِ صَفْحَةٌ فِيهَا قَرْعٌ وَكَانَ يَلْتَمِسُهُ بِاصَابِعِهِ فَدَخَلَ رَجُلٌ عَلَيْهِ أَثْرُ صُفْرَةٍ فَكَرِهَهُ ، فَلَمْ يَقُلْ لَهُ شَيْئًا حَتَّى خَرَجَ ، فَقَالَ بَعْضُ الْقَوْمِ لَوْ قُلْتُمْ لِهَذَا أَنْ يَدَعْ هَذِهِ يَعْنِي الصُّفْرَةُ -

১৪৪. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর অভ্যাস ছিলো, তিনি কারো সামনা-সামনি কোনো কথা খুব কমই বলতেন। অর্থাৎ তাঁর অপছন্দনীয় কোন জিনিস দেখলেও সামনা-সামনি খুব কমই তার প্রতিবাদ করতেন। (সুতরাং) একবার তাঁর সামনে লাউ তরকারির একটি পেয়ালা পেশ করা হলো। তিনি অঙ্গুলি দ্বারা লাউয়ের টূকরা খোঁজ করছিলেন। তখন এমন এক ব্যক্তি তাঁর নিকট প্রবেশ করলো যার গায়ে হলুদ রং-এর খুশবু চিহ্ন পরিলক্ষিত হচ্ছিল। লোকটির এভাবে নবী-এর নিকট আসা তাঁর পছন্দ হলো না। কিন্তু তিনি তাকে কিছুই বললেন না। লোকটির এ ধরনের রং ব্যবহার নবী-এর পছন্দ হলো না, কিন্তু তিনি কিছুই বলার পূর্বে লোকটি বের হয়ে গেল। তখন নবী অপর এক ব্যক্তিকে বললেন, তুমি যদি সে লোকটিকে বলে দিতে যে, হলুদ রং ব্যবহার ছেড়ে দিলেই ভাল হতো।

ফায়দা: এই হাদীস দ্বারা বোঝা যায় নবী কারো থেকে অপছন্দনীয় কোন জিনিস হতে দেখে সাথে সাথেই তাকে সাবধান করতেন না। বরং অধিকাংশ সময় উম্মতের প্রতি সহানুভূতিবশত এড়িয়ে যেতেন। লোকটিকে তৎক্ষণাৎ সামনা-সামনি কিছু না বলার পেছনে রহস্য এই ছিলো যে, এভাবে সামনা-সামনি বললে হয়ত লোকটি তাঁর কথা মান্য না করতেও পারে। এতে লোকটির ইহলোক ও পরলোকের সমূহ ক্ষতি হয়ে যাবে। আর নবী-এর কর্মনীতি এসব বিষয়ের ব্যাপারে হতো যা কোন 'উত্তম কাজ' পরিহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো। এবং এরূপ বিষয়ে দেরিতে সাবধান করলে কোনরূপ ক্ষতি নেই। কিন্তু কোন হারাম ও শরীয়ত নিষিদ্ধ অশ্লীল কাজের বিষয়ে তিনি তৎক্ষণাৎই পাকড়াও করতেন। যাহোক নবী ছিলেন তাঁর উম্মতের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ও মেহেরবান। তাঁর এই দয়া ও স্নেহের কারণেই তিনি কোন অপছন্দনীয় ব্যাপারে যা শরীয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ নহে সঙ্গে সঙ্গে পাকড়াও করতেন না। এর দ্বারা নবী-এর উত্তম তালীম ও তারবিয়াতের (শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ) অনুমান করা যায়।

١٤٥. عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ الْحَكَمِ قَالَ صَلَّيْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَعَطَسَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ فَقُلْتُ يَرْحَمُكَ اللهُ فَرَمَانِي الْقَوْمُ بِأَبْصَارِهِمْ وَضَرَبُوا بِأَيْدِيهِمْ عَلَى أَفْخَانِهِمْ فَلَمَّا رَأَيْتُهُمْ يُصْمِتُونَى لَكِنِّي سَكَتْ قَالَ فَدَعَانِي النَّبِيُّ ﷺ بِأَبِي وَأُمِّي مَا رَأَيْتُ مُعَلَّمًا أَحْسَنَ تَعْلِيمًا مِنْهُ مَا ضَرَبَنِي وَلَا سَبَّنِي ثُمَّ قَالَ إِنَّ هَذِهِ الصَّلَاةُ لَا يَصْلِحُ فِيهَا شَيْءٌ مِنْ كَلَامِ النَّاسِ إِنَّمَا هُوَ التَّسْبِيحُ وَالتَّكْبِيرُ والتَّمْحِيدُ .

১৪৫. হযরত মুয়াবিয়া ইব্‌ন আবুল হাকাম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি রাসূলুল্লাহ্-এর সাথে জামায়াতে নামায আদায় করি। (নামাযের মধ্যেই) এক ব্যক্তির হাঁচি এল। রাবী বলেন, (আমি 'আলহামদুলিল্লাহ্'-এর জবাবে) 'ইয়ারহামুকাল্লাহ্' বলে ফেললাম। তখন নামাযরত লোকেরা আমাকে চোখ তুলে দেখতে লাগলো এবং উরুর উপর হাত মারতে শুরু করলো। আমি দেখলাম তারা আমাকে জোর করে চুপ করাতে যাচ্ছে (তখন আমার খুব খারাপ লাগলো)। কিন্তু আমি নিশ্চুপ রইলাম। (নামায শেষে) নবী আমাকে ডাকলেন। আমার মাতাপিতা তাঁর জন্য কুরবান হোন। আমি নবী-এর চেয়ে কোন উত্তম শিক্ষক দেখি নাই। তিনি আমাকে না মারধর করলেন, না বকাঝকা করলেন। তারপর বললেন: নামাযে দুনিয়াবী কথাবার্তা বলা ঠিক নয়, নামায হলো আল্লাহ্র তাসবীহ্ (গুণগান) তাকবীর (মহানত্ব) তামহীদ (প্রশংসা)-এর নাম।

ফায়দা : এ ঘটনা হলো তখনকার যখন হযরত মুয়াবিয়া ইব্‌ন আবুল হাকাম (রা) ছিলেন নও মুসলিম। তখনও তিনি নামাযের সকল বিধি-বিধান শিখতে পারেন নি। তাই এ ঘটনা ঘটে গেল। হযরত মুয়াবিয়া (রা) নিজেই বলেন, ইসলাম গ্রহণের পর আমাকে ইসলামের কিছু কিছু বিধি-বিধান শেখানো হয়েছিলো। তন্মধ্যে আমাকে এও শেখানো হয়েছিলো যে, তোমার হাঁচি এলে 'আলহামদুলিল্লাহ্' বলবে। আর যদি অপর কারো হাঁচি আসে এবং সে 'আলহামদুল্লিাহ্' বলে তবে এর জবাবে তুমি 'ইয়ারহামুকাল্লাহ্' বলবে। হযরত মুয়াবিয়া (রা) বলেন, একবার আমি নবী-এর সাথে নামায পড়ছিলাম। এক ব্যক্তির হাঁচি এল। আর সে 'আলহামদুলিল্লাহ্' বললো। আমি তার জবাবে 'ইয়ারহামুকাল্লাহ্' বললাম। লোকেরা আমার দিকে চোখ তুলে তাকাতে লাগলো। বিষয়টি আমার ভীষণ খারাপ লাগলো। আমি নামাযের মধ্যেই তাদেরকে বলে ফেললাম তোমরা আমার দিকে চোখ তুলে কেনো দেখছো? আমার এ অবস্থা দেখে তারা সুবহানাল্লাহ্ বললো। তারপর নবী যখন নামায শেষ করলেন তখন জিজ্ঞেস করলেন, নামাযে কে কথা বললো? তারপর তিনি নিজেই বললেন: এ বেদুঈন। তারপর তিনি আমাকে ডাকলেন এবং বললেন, নামায ৩ কুরআন পড়া, এবং আল্লাহ্র যিকরের জন্য। সুতরাং তুমি যখন নামাযে থাকবে তখন এ সবই পড়বে। (দুনিয়াবী কথাবার্তা বলবে না।) এ ঘটনা বর্ণনার পর বর্ণনাকারী বলেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ্-এর চেয়ে স্নেহপরায়ণ ও মেহেরবান শিক্ষক জীবনেও দেখিনি।

গ্রন্থকারের এ হাদীসটি এ অনুচ্ছেদে সংকলনের উদ্দেশ্য হলো নবী কর্তৃক সাহাবায়ে কিরামের বিভিন্ন ছোট-খাটো ত্রুটিবিচ্যুতি এড়িয়ে যাওয়ার অবস্থা বর্ণনা করা এবং তিনি কিভাবে ভালবাসা ও স্নেহ-মমতা দিয়ে তালীম দিতেন তা তুলে ধরা। নবী-এর এই অনুপম আদর্শ আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্মের অনুসরণ করা একান্ত কর্তব্য।

١٤٦. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ قَاعِدًا فِي الْمَسْجِدِ وَأَصْحَابُهُ مَعَهُ إِذْ جَاءَ أَعْرَابِيُّ فَبَالَ فِي الْمَسْجِدِ فَقَالَ أَصْحَابُ النَّبِيِّ ﷺ مَا مَنْ فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ لَا تَزْرِمُوهُ ثُمَّ قَالَ إِنَّ هَذِهِ الْمَسَاجِدَ لَا تَصْلُحُ لِشَيْءٍ مِنَ الْقَدْرِ وَالْبَوْلِ وَالْخَلَاءِ أَوْ كَمَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ

১৪৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ মসজিদে অবস্থান করছিলেন। সাহাবা কিরামও তাঁর সাথে বসেছিলেন। ইত্যবসরে এক বেদুঈন সেখানে আসল এবং মসজিদের মধ্যেই (এক পাশে) পেশাব করতে লাগলো। সাহাবা কিরাম হায়! হায়! বলে তাকে পেশাব করতে বিরত রাখতে চাইলেন। কিন্তু নবী বললেন : তাকে পেশাব করতে বাধা দিও না। তারপর ঐ বেদুঈন যখন পেশাব করা শেষ করলো, তখন তাকে তিনি বললেন, দেখো, এই মসজিদগুলো আবর্জনা ছড়ানো ও পেশাব পায়খানা করার জন্য নয়। কিংবা এই ধরনেরই কোনো উক্তি রাসূলুল্লাহ্ করেছেন।

ফায়দা : এ হাদীস থেকেও নবী-এর অপরিসীম দয়া ও মমত্ববোধের অনুমান করা যায়। কোনো কোনো রিওয়ায়াতে আছে, ঐ বেদুঈন যখন পেশাব করা শেষ করলো, তখন নবী পানি আনিয়ে স্বয়ং এ স্থানটি ধৌত ও পবিত্র করান। পেশাব করার মাঝখানে ঐ বেদুঈনকে বাধা দিতে তাঁর নিষেধ করার কারণ হচ্ছে, পেশাব করার মাঝখানে বাধা দিলে তাতে তার কষ্ট হতে পারতো এবং মূত্রনালিতে পেশাব আটকে যেতে পারতো। এক রিওয়ায়াতে আছে, নবী ঐ ব্যক্তিকে ডেকে বললেন : এই মসজিদসমূহ পেশাব ও ময়লা ছড়ানোর জন্য নয়। এগুলো আল্লাহ্ তা'আলার যিক্র, নামায ও কুরআন তিলাওয়াত করার জন্য বানানো হয়েছে। এ হাদীসগুলো উম্মতের সাধারণ মানুষের জন্য উপদেশ ও তালীম-তারবিয়াতের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে এক বিরাট শিক্ষা। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের মূর্খসুলভ কাজকর্মে ধৈর্যধারণ করে তাদেরকে স্নেহ ও ভালবাসার সাথে দীনী বিষয়সমূহ শিক্ষা দেয়া উচিত।

١٤٧. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ إِذَا بَلَغَهُ مَنْ رَجُلٍ شَيْءٍ لَمْ يَقُلْ لَهُ قُلْتَ كَذَا وَكَذَا بَلْ قَالَ مَا بَالُ القَوَامِ يَقُولُوْنَ كَذَا وَكَذَا -

১৪৭. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো অপছন্দনীয় বিষয় অবগত হতেন, তখন তিনি তাকে সম্বোধন করে একথা বলতেন না যে, তুমি এরূপ এরূপ বলেছো। বরং তিনি (অনির্দিষ্টভাবে) বলতেন, লোকদের কি হয়েছে যে, তারা এরূপ এরূপ কথা বলছে?

ফায়দা : এ হাদীস থেকেও নবী সুসামাজিকতা ও মননশীলতার অনুমান করা যায়। তিনি কখনো কাউকে সম্বোধন করেও সাবধান করতেন না। আর কারো নাম ধরেও তার অপছন্দনীয় বিষয় প্রকাশ করতেন না। বরং তিনি যদি কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো অপছন্দনীয় বিষয় অবহিত হতেন এবং তিনি তাকে সতর্ক করতে চাইতেন, তবে সাধারণভাবে সাবধান করে দিতেন। যেমন তিনি বলতেন, লোকদের কি হয়েছে যে, এরূপ অলীক কথা বলে। তিনি কখনো এরূপ বলতেন না যে, অমুক ব্যক্তির কি হয়েছে যে, এরূপ অলীক কথা বলে। এ হচ্ছে তালীম-তারবিয়াতের এমন এক শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি যাতে ঝগড়া-বিবাদ ও শত্রুতা সৃষ্টি হয় না। আর যাকে উদ্দেশ্য করে একথা বলা হলো, সেও তার ভ্রান্তির ব্যাপারে অপর লোকের সামনে লজ্জিত হয় না। সামাজিক আচার বা শিক্ষার ব্যাপকতা ও সার্বজনীনতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ তাঁর উম্মতকে কত পূর্ণাঙ্গ দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, তা এই ধরনের ঘটনাবলি থেকেই অনুমিত হয়। আল্লাহ্ তা'আলা আমাদেরকে তাঁর পদাংক অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন।

١٤٨ عَنْ عِمْرَانَ bْنِ الْحُصَيْنِ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ إِذَا كَرِهَ شَيْئًا عُرِفُ ذَلِكَ فِي وَجْهِهِ -

১৪৮. হযরত ইমরান ইবন হুসায়ন (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন কোনো বিষয় অপছন্দ করতেন, তা তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল থেকেই অনুমান করা যেতো।

ফায়দা : এ বিষয়ে অন্যান্য হাদীস এবং পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদ "নবী-এর সন্তুষ্টির ও অসন্তুষ্টি নিদর্শন"-এ সবিস্তার বর্ণিত হয়েছে।

এখানে গ্রন্থকার এ হাদীসটি কেবল এজন্য বর্ণনা করেছেন যে, নবী প্রতিটি বিষয়ে সামনা-সামনি কাউকে ভর্ৎসনা করতেন না, বরং তিনি কোনো বিষয়কে অপছন্দ করলে নীরব থাকতেন। কিন্তু এই অপছন্দ তাঁর মুখমণ্ডলে অবশ্যই প্রকাশ পেতো। কোনো কোনো অপছন্দনীয় বিষয় এমন হয়, যা কেবল চেহারা দ্বারা প্রকাশ করাই যথেষ্ট হয় এবং কোনো কোনো বিষয় মুখে প্রকাশ করারও প্রয়োজন হয়। প্রথম হাদীসটি শেষোক্ত বিষয় সম্পর্কিত ছিলো। অনুরূপভাবে কোনো কোনো লোক এমন হয়ে থাকে, যাদের সতর্ক করার জন্য কেবল চেহারা দ্বারা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করাই যথেষ্ট হয় এবং কোনো কোনো লোককে সতর্ক করার জন্য মুখে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। এই দুই হাদীসের মধ্যে নবী -এর কর্ম-পদ্ধতির পার্থক্য এর উপরই নির্ভরশীল। যা হোক, নবী যে সব লোককে সংশোধন করতে চাইতেন, তিনি তার কথা ও কাজ দ্বারা তার মনে কোনো কষ্ট দিতেন না। কেননা, সংশোধন ও শিক্ষা-দীক্ষার কাজে মনে কষ্ট দান ক্ষতিকর। এতে ভালোর চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়।

١٤٩. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا اسْتَدْ وَجْهُهُ أَكْثَرَ مَسًّ لِحْيَتِهِ-

১৪৯. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ যখন কোনো কঠিন সংকটে পতিত হতেন, তখন তিনি বারংবার (মুবারক) দাড়িতে হাত বুলাতেন।

ফায়দা: এ অবস্থা রাসূলুল্লাহ্-এর চরম ধৈর্য ও সহিষ্ণুতাকেই প্রকাশ করে। নচেৎ সাধারণত মানুষ এরূপ ক্ষেত্রে মুখে তার মনের আক্রোশ প্রকাশ করে থাকে। কিন্তু তাতে সাধারণত ক্ষতি হয়। ন্যূনপক্ষে এই দুঃখ ও উষ্মা প্রকাশে মানুষের মনে কষ্ট হয়। এ কারণে রাসূলুল্লাহ্ এ পদ্ধতি পরিহার করতেন এবং স্বয়ং কষ্ট সহ্য করতেন।

١٥٠. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ النَّبِىُّ ﷺ عِنْدَ إِحْدَى أُمَّهَاتِ الْمُؤْمِنِيْنَ فَأَرْسَلَتْ إِحْدَى نِسَائِهِ بِقَصْعَةِ فِيْهَا طَعَامٌ، فَضَرَبَتْ بِيَدِ الرَّسُولِ فَسَقَطَتْ الْقَصْعَةُ فَانْكَسَرَتْ، فَأَخَذَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ الْكِسْرَتَيْنِ فَضَمَّ إِحْدَاهُمَا الْأُخْرَى ثُمَّ جَعَلَ وَيَجْمَعُ الطَّعَامَ فَيَقُولُ غَارَتْ أُمُّكُمْ كُلُوا فَكُلُوا ، فَجَلَسَ الرَّسُولُ حَتَّى جَاءَتْ الْكَاسِرَةُ بِقَصْعَتِهَا الَّتِي هِيَ فِي بَيْتِهَا فَدَفَعَ الصُّحْفَةَ الصَّحِيْحَةَ إِلَى الرَّسُوْلِ وَتَرَكَ الْمَكْسُوْرَةَ فِي الَّتِي كَسَرَتْهَا-

১৫০. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী উম্মাহাতুল মু'মিনীন-এর মধ্য থেকে কোনো একজনের নিকট অবস্থান করছিলেন। ইত্যবসরে তাঁর সহধর্মিণীদের মধ্য থেকে কোনো একজন (কিছু খাদ্যদ্রব্যসহ) একটি বাটি তাঁর কাছে প্রেরণ করেন। যে উম্মুল মু'মিনীনের নিকট তিনি ঐ দিন অবস্থান করছিলেন, তিনি খাদ্য নিয়ে আগমনকারীর হাতে হাত দ্বারা আঘাত করলেন। ফলে বাটি পড়ে গিয়ে ভেঙে গেলো। নবী তার উভয় টুক্রা তুলে নিলেন এবং তাকে একে অপরের সাথে মিলিয়ে নিলেন। এরপর ইতস্তত বিক্ষিপ্ত খাবারগুলো একত্রিত করে বললেন যে, তোমাদের মায়ের (উম্মুল মু'মিনীনের) আত্মমর্যাদাবোধে (আঘাত) লেগেছে, তোমরা খাবারগুলো খেয়ে ফেলো। সুতরাং সবাই তা খেয়ে ফেললো। খাবার নিয়ে আগমনকারী বাটি নেয়ার জন্য বসে রইল। ইতিমধ্যে বাটিটি যাঁর হাতে ভেঙেছিলো, তিনি তাঁর ঘর থেকে একটি নিখুঁত বাটি নিয়ে এলেন। নবী খাবার নিয়ে আগমনকারীকে ঐ নিখুঁত বাটিটি দিয়ে দিলেন এবং ভাঙা বাটিটি যিনি ভেঙেছিলেন তাঁরই ঘরে রেখে দিলেন।

ফায়দা : এ ঘটনাটিও নবী-এর মহৎ ক্ষমা গুণের জ্বলন্ত প্রমাণ। ঘটনাটি ছিলো এরূপ : রাসূলুল্লাহ্ উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-এর গৃহে অবস্থান করছিলেন। এই সময় তাঁর অন্য এক সহধর্মিণী কারো মাধ্যমে একটি বাটিতে করে কিছু খাবার নবী-এর নিকট পাঠালেন। একজন নারী হিসাবে হযরত আয়েশা (রা)-এর আত্মমর্যাদায় বাধলো যে, তাঁর গৃহে তাঁর কোনো সতীনের পক্ষ থেকে তাঁর স্বামীর জন্য খাবার আসবে। তাই তিনি ঐ কাজটি করলেন। একটু চিন্তা করুন, নবী-এর বিবেচনায় এ কাজটি কতখানি অপছন্দনীয় হতে পারে। কিন্তু তিনি তাঁর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পরম ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়ে হযরত আয়েশা (রা)-এর এহেন কাজের কোনো কৈফিয়ত তলব করলেন না কিংবা তাঁকে ভর্ৎসনাও করলেন না। বরং হযরত আয়েশা (রা)-এর পক্ষ থেকে নারী জাতির স্বভাবগত আত্মমর্যাদাবোধের (ঈর্ষা) ওজর পেশ করে অন্যদেরকেও নারীর এই স্বভাবগত দুর্বলতা সম্পর্কে অবহিত করলেন এবং বিক্ষিপ্ত খাবারগুলো একত্রিত করে নিজেও খেলেন ও অন্যদেরকেও খাওয়ালেন। বস্তুত এটা নবী-এরই মহান চরিত্রের প্রকৃষ্ট উদাহরণ যে, অপছন্দনীয় বিষয়ের অপছন্দনীয় অংশটুকু উপেক্ষা করে শুধু তার কৈফিয়ত তলব করা ও ভর্ৎসনা করা থেকেই বিরত থাকেননি, বরং তার সপক্ষে প্রকৃতিগত দাবির ওজরও বর্ণনা করেন।

١٥١ عَنْ أَنَسٍ قَالَ اِسْتَحْمَلَ أَبُو مُوسَى النَّبِيُّ ، فَوَافَقَ مِنْهُ شَغَلاً فَقَالَ وَاللَّهِ لَا أَحْمِلُكَ، فَلَمَّا قَفَا دَعَاهُ فَقَالَ يَارَسُوْلَ اللهِ قَدْ حَلَفْتَ لَا تَحْمِلُنِي قَالَ وَأَنَا أَحَلِفُ لَأَحْمِلَنَّكَ فَحَمَلَهُ .

১৫১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আবূ মূসা আশআরী (রা) নবী-এর নিকট সফরের জন্য বাহন চাইলেন। নবী তখন কোনো কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তাই তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! এখন আমি তোমাকে কোনো বাহন দেবো না। কিন্তু আবূ মূসা আশআরী (রা) যখন ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন নবী তাকে বাহন দেওয়ার জন্য ডাকলেন। তখন আবূ মূসা আশআরী (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি তো আমাকে বাহন না দেওয়ার কসম খেয়েছেন। নবী তখন বললেন, এখন আমি কসম করে বলছি যে, তোমাকে অবশ্যই বাহন দেবো। সুতরাং তিনি তাঁকে বাহন দিয়ে দিলেন।

ফায়দা: এ হাদীসের মর্ম সুস্পষ্ট। কোনো কোনো হাদীসে বর্ণিত আছে, যেহেতু তখন নবী এর নিকট দেওয়ার মতো কোনো বাহন ছিলো না, তাই তিনি বাহন দিতে অস্বীকার করেছিলেন। মুসলিম শরীফের (কিতাবুল ঈমান) এক হাদীসে হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, আমি একবার আমার কতিপয় আশআরী বন্ধুর সাথে নবী -এর নিকট সফরের জন্য বাহন চাইতে গেলাম। কিন্তু তিনি বাহন দিতে অস্বীকার করলেন। বললেন, আল্লাহ্র কসম! তোমাকে দেওয়ার মতো কোনো বাহন নেই। (বর্ণনাকারী বলেন) এরপর কিছুক্ষণ আমরা নবী -এর দরবারে অবস্থান করলাম। ইতিমধ্যে তাঁর কাছে কোথাও থেকে কিছু উট এসে গেলো। সুতরাং তিনি উটগুলোর মধ্য থেকে সাদা কুঁজওয়ালা তিনটা উট আমাদেরকে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। উট নিয়ে আমরা চলতে লাগলাম। আমি কিংবা আমাদের মধ্য থেকে কেউ বললো, এ উটগুলোর মধ্যে আল্লাহ্ বরকত দান করবেন না। কেননা, আমরা এসে যখন নবী -এর নিকট বাহন প্রার্থনা করেছিলাম, তখন তিনি বাহন না দেয়ার কসম খেয়েছিলেন। আর এখন আমাদেরকে বাহন দিয়েছিলেন। সুতরাং তারা নবী -এর নিকট ফিরে এলো এবং তাঁকে একথা জানালো। তিনি বললেন, আমি তো তোমাদেরকে বাহন দেইনি। তোমাদেরকে বাহন দিয়েছেন আল্লাহ্ তা'আলা। আর আল্লাহ্র কসম! আমি যদি কখনো কসম করি, এবং তার বিপরীতে তার চেয়ে উত্তম দেখতে পাই, তবে আমি সে কাজ করে ফেলি এবং কসমের কাফ্ফারা প্রদান করি।

এ হাদীস থেকে এও জানা গেলো, যদি কোনো বিষয়ে কসম খাওয়া হয় এবং এর বিপরীত কোন বস্তুতে মংগল বা কল্যাণ পরিলক্ষিত হয়, তবে ঐ কসম ভেঙে ফেলা উচিত এবং কসমের কাফ্ফারা প্রদান করা উচিত।

যেমন এক হাদীসে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, নবী বলেন, যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ে কসম খেয়েছে, তারপর ভিন্ন কাজ তার থেকে উত্তম পেয়েছে, ঐ উত্তম কাজটিই সে গ্রহণ করবে এবং সে তার পেছনের কসমের কাফ্ফারা প্রদান করবে। (মুসলিম শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮)

١٥٢. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كُسِرَتْ رُبَاعِيَّةُ النَّبِيِّ ﷺ يَوْمَ أَحُدٍ وَشَجَّ فَجَعَلَ الدَّمُ يَسِيلُ عَلَى وَجْهِهِ وَهُوَ يَمْسَحُ الدَّمُ وَيَقُولُ كَيْفَ يُفْلِحُ قَوْمُ خَضَبُوا وَجْهَ نَبِيِّهِمْ بِالدَّمِ وَهُوَ يَدْعُوهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ فَأَنْزَلَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْ

১৫২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উহুদ যুদ্ধের দিন নবী-এর দাঁত মুবারক ভেঙে গিয়েছিলো, শির মুবারক জখম হয়েছিল এবং রক্ত তাঁর চেহারা বেয়ে পড়ছিলো। তখন তিনি রক্ত মুছতে মুছতে বলছিলেন : সে জাতি কিরূপে কল্যাণ লাভ করতে পারে, যারা তাদের নবীর চেহারাকে রক্তে রঞ্জিত করে দিয়েছে। অথচ তিনি তাদেরকে আল্লাহর দীনের প্রতি দাওয়াত দিচ্ছেন। তখন মহান আল্লাহ্ এই আয়াত নাযিল করলেন : “لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْئٍ” এ ব্যাপারে আপনার কোনো ইখতিয়ার নেই।

ফায়দা : এটি উহুদ যুদ্ধের প্রসিদ্ধ ঘটনা, যা তৃতীয় হিজরীতে সংঘটিত হয়েছিলো। এ যুদ্ধেই প্রায় ৭০ জন সাহাবী শহীদ হয়েছিলেন। দৃঢ়তা, ত্যাগ ও জীবন কুরবানীর দরুনই আল্লাহ্ তা'আলা मुसलमानों একটি ক্ষুদ্র দলকে কাফিরদের বিরাট বাহিনীর মুকাবিলায় পরাজয়ের পর বিরাট বিজয় দান করেন। এই যুদ্ধেই এক হতভাগ্য আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন কুমাইয়্যা মুসলমান ব্যূহ ভেদ করে সামনে অগ্রসর হয় এবং নবী -এর শিরস্ত্রাণের উপর তলোয়ারের আঘাত হানে। ফলে তাঁর দান্দান মুবারক শহীদ হয় এবং শির মুবারক জখম হয়। এই অবস্থায় তাঁর পবিত্র মুখ দিয়ে এই উক্তি নিঃসৃত হলো “সেই জাতি কিভাবে কল্যাণ লাভ করতে পারে, যারা তাদের নবীর চেহারাকে জখম করে দেয়।” কিন্তু আল্লাহ্ পাক রহমতে আলমের মুখ-নিঃসৃত এই উক্তি পছন্দ করলেন না। আয়াত নাযিল হলো : لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْئُ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظَالِمُونَ তাদের প্রতি ক্ষমাপরবশ হবেন অথবা তাদেরকে শাস্তি দিবেন এ বিষয়ে (হে নবী) আপনার করণীয় কিছুই নেই। কারণ তারা সীমালংঘনকারী।

এ ঘটনা থেকেই অনুমান করুন যে, নবী কি পরিমাণ ক্ষমা ও দয়া প্রদর্শন করতেন। মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার পরও তিনি ঐ কাফির ও মুশরিকদের জন্য মুখে বদ্ দু'আ করেননি এবং একজন মানুষ হিসেবে তাঁর পবিত্র মুখ থেকে যে উক্তি প্রকাশ পেয়েছে তাও আল্লাহ্র নিকট তাঁর মর্যাদার উপযুক্ত মনে করা হয়নি। তাই আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে তৎক্ষণাৎ বলে দেয়া হয়েছে যে, এটা আপনার কাজ নয়। আপনার কাজ তো হচ্ছে ক্ষমা ও দয়া প্রদর্শন করা। কেননা, আপনাকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমতরূপে প্রেরণ করা হয়েছে।

রিওয়ায়াতসমূহে দেখা যায় যে, এই কষ্টদায়ক জখম অবস্থায়ও নবী -এর মুখে ছিলো এই বাণী : رَبِّ اغْفِرْ قَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ "হে আল্লাহ্! আমার জাতিকে তুমি ক্ষমা করো। কেননা, তারা জানে না।

١٥٣ عَنِ الشَّفَاءِ بِنْتِ عَبْدِ اللهِ قَالَتْ أَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَوْمًا أَسْأَلُهُ شَيْئاً فَجَعَلَ يَعْتَذِرُ إِلَى -

১৫৩. হযরত শিফা বিন্ত আবদুল্লাহ্ (রা) বলেন, একবার আমি কিছু চাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট গেলাম। কিন্তু তিনি আমার কাছে অপারগতা প্রকাশ করলেন। (কেননা, তাঁর নিকট তখন দেয়ার মতো কোনো সম্পদ ছিলো না।)

ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী এ সাহাবিয়াকে অভদ্র বা শক্ত কথা বলে বিদায় করেননি। বরং সৌজন্য ও ভদ্রতা বজায় রেখে তার কাছে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন যে, এখন আমার কাছে দেয়ার মতো কিছু নেই। নচেৎ আমি তোমাকে অবশ্যই কিছু দিতাম। অথচ এই অপারগতা প্রকাশ করারও তাঁর প্রয়োজন ছিল না।

١٥٤ عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ فَمَا زَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَعْتَنِزُ إِلَى صَفِيَّةَ وَيَقُولُ يَا صَفِيَّةُ إِنَّ أَبَاكَ أَلَّبَ عَلَى الْعَرَبِ وَفَعَلَ حَتَّى ذَهَبَ ذَلِكَ مِنْ نَفْسِهَا -

১৫৪. হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (উম্মুল মু'মিনীন হযরত) সাফিয়্যা (রা)-এর কাছে (তাঁর পিতার হত্যা সম্পর্কে, যে খায়বারের যুদ্ধে مسلمانوں হাতে নিহত হয়েছিল) ওজর পেশ করতে থাকেন এবং বললেন : হে সাফিয়্যা! তোমার পিতাই তো সারা আরবের লোকদেরকে مسلمانوں বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য উস্কিয়ে ছিলো এবং তাদেরকে সমবেত করেছিলো। এরূপ ওজর পেশ করার দরুন তাঁর অন্তর থেকে এই দুঃখ অন্তর্হিত হয়ে যায়।

ফায়দা : উম্মুল মু'মিনীন হযরত সাফিয়্যা (রা) খায়বার অধিপতির কন্যা ছিলেন। তাঁর স্বামী ছিলো বনূ নাযীর গোত্রের বিরাট ধনী ব্যক্তি। পিতা ও স্বামী উভয়েই খায়বারের যুদ্ধে নিহত হয়েছিলো। খায়বার দুর্গ বিজিত হওয়ার পর অন্যান্য যুদ্ধবন্দীর সাথে হযরত সাফিয়্যাও বন্দী হন। তাঁর এই আভিজাত্য ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের দরুন এবং তাঁর মনোরঞ্জন ও মনস্তুষ্টির জন্য নবী-এর তাঁকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করা ছাড়া কোনো উপায় ছিলো না। তাই তিনি গনীমত বণ্টনের মাধ্যমে নবী-এর ভাগে পড়লেন এবং তিনি তাঁকে তৎক্ষণাৎ আযাদ করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলেন। কিন্তু এরপর যখনই তাঁর পিতার কথা মনে পড়তো যে, সে مسلمانوں হাতে খায়বারের যুদ্ধে নিহত হয়েছে, তখন পিতৃত্বের ভালবাসার কারণে নবী-এর কাছে সে সম্পর্কে অভিযোগ উত্থাপন করতেন। নবী তাঁর মনে ব্যথা দিতেন না এবং কোনো রকম ধমক বা তিরস্কার না করে তাঁর সামনে যুক্তিসঙ্গত ওজর পেশ করতেন। তিনি বলতেন দেখ (দোষটা তো তোমার পিতারই), তোমার পিতাই তো স্বয়ং যুদ্ধ শুরু করেছিলো। যুদ্ধ না করলে সে মারাও যেতো না। সে-ই তো সারা আরবকে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্ররোচিত করেছিলো ও উস্কিয়ে দিয়েছিলো। নবী এ ভাবে স্নেহ ও নম্রতা সহকারে তাঁকে বোঝাতেন। ফলে এক সময় তাঁর অন্তর থেকে এই ব্যথা সম্পূর্ণ দূর হয়ে যায়। তিনি আর কোনো দিন এ বিষয়ে নবী -এর নিকট কোনো অভিযোগ করেননি।

١٥٥ عَنِ الْمُهَاجِرِ بْنِ قُنْفُذِ أَنَّهُ أَتَى النَّبِيَّ ﷺ وَهُوَ يَبُولُ فَسَلَّمُ عَلَيْهِ فَلَمْ يَرُدُّ عَلَيْهِ ثُمَّ تَوَضَّا ثُمَّ اعْتذَرَ إِلَيْهِ فَقَالَ إِنِّي كَرِمْتُ أَنْ أَذْكُرَ اللَّهَ إِلَّا عَلَى طُهُرٍ -

১৫৫. হযরত মুহাজির ইন্ন কুনফুয (রা) থেকে বর্ণিত, একবার তিনি নবী-এর নিকট উপস্থিত হন এবং সালাম করেন। নবী ঐ সময় পেশাব করছিলেন। তাই তিনি সালামের জবাব দিলেন না। তারপর (পেশাব শেষ করে) তিনি ওযু করে তার কাছে ওজর পেশ করলেন। বললেন, পবিত্রতা ছাড়া আল্লাহ্ নাম নেয়া আমার কাছে ভাল মনে হয়নি।

📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ > 📄 উম্মতের প্রতি নবী (সা)-এর সহানুভূতি সম্পর্কিত রিওয়ায়াতসমূহ

📄 উম্মতের প্রতি নবী (সা)-এর সহানুভূতি সম্পর্কিত রিওয়ায়াতসমূহ


١٥٦ عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيُّ الله كَانَ يَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ وَهُوَ فِي الصَّلَاةِ فَيَقْرَا بِالسُّورَةِ الْقَصِيرَةِ وَالسُّورَةِ الْخَفِيفَةِ -

১৫৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ সালাতরত অবস্থায় যখন কোন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতেন তখন (শিশুটির মায়ের মনে কোন অস্থিরতার সৃষ্টি হতে পারে এ আশংকায় তিনি সালাত সংক্ষিপ্ত করে) ছোট একটি আয়াত কিংবা ছোট একটি সূরা তিলাওয়াতের মাধ্যমে সালাত শেষ করে নিতেন।

١٥٧ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ وَأَبِي سَعِيدِ الْخُدْرِى قَالَا صَلَّى بِنَا رَسُولُ اللهِ ﷺ صَلَاةَ الْغَدَاةِ وَسَمِعَ بُكَاءَ الصَّبِيِّ فَخَفَّفَ الصَّلَاةَ، فَقِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ ﷺ خَفَّقْتَ هَذِهِ الصَّلاةَ الْيَوْمَ فَقَالَ إِنِّي سَمِعْتُ بُكَاءَ صَبِي فَخَشِيْتُ أَنْ يَفْتِنَ أُمُّهُ -

১৫৭. হযরত আবূ হুরায়রা ও হযরত আবু সাঈদ খুদ্রী (রা) থেকে বর্ণিত, তাঁরা বলেন, একবার নবী আমাদেরকে নিয়ে ফজরের সালাত পড়ছিলেন। সালাত পড়ানো কালে তাঁর কানে একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ পৌঁছল। নবী তখন সালাত সংক্ষিপ্ত করে দেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো যে, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আজ আপনি সালাতকে এতটুকু সংক্ষিপ্ত করলেন? উত্তরে তিনি ইরশাদ করেন, আমি সালাতরত অবস্থায় যখন কোন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনি তখন আমার আশংকাবোধ হয়, হয়ত শিশুটির মা সালাতরত অবস্থায় পেরেশানীতে পড়বে। (এ কারণে আমি সালাত সংক্ষিপ্ত করে দিয়েছি।)

ফায়দা : উল্লিখিত হাদীসদ্বয়ের অর্থ সুস্পষ্ট। গ্রন্থকার এখানে উম্মতের প্রতি নবী -এর মনে কতটুকু মায়া ও ভালবাসা ছিল এবং তাদের প্রতি তিনি কতটুকু দরদ ও সহানুভূতি পোষণ করতেন তার বর্ণনা পেশ করেছেন। এ ধরনের হাদীসগুলি থেকে বোঝা যায় যে, নবী তাঁর উম্মতের জন্য কতখানি মায়া ও ভালবাসা এবং কতখানি দরদ ও সহানুভূতি রাখতেন। ফজরের সালাতে দীর্ঘ কিরাআত পাঠ করা মুস্তাহাব। এটিই ছিল ফজরের সালাতে নবী -এর নিয়ম। কিন্তু তিনি একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনে কেবল এ কারণে যে, এই শিশু ও শিশুটির সালাতরত মায়ের মনে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে সে জন্য নিজের নিয়ম ভঙ্গ করে সালাত সংক্ষিপ্ত করে নিতেন। যেন সালাত দীর্ঘ হওয়ার কারণে শিশু ও শিশুর মাকে অস্থির হতে না হয়।

বস্তুত মানবীয় গুণাবলির মধ্যে মায়া-মমতা একটি মহৎ গুণ এবং আল্লাহ্ তা'আলার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয় একটি অভ্যাস। এর পরিধি অনেক ব্যাপক। মায়া-মমতা ও ভালবাসার সম্পর্ক কেবল নিজের পরিবার-পরিজন ও সন্তান-সন্ততির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সকল প্রিয়জন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, অধস্তন কর্মচারী, শিষ্য ও গুরু নির্বিশেষে সকল সৃষ্ট জগতের সঙ্গে জড়িত। স্বজনদের সঙ্গে হোক আর পরজনদের সঙ্গে হোক মানুষ যখন এ মায়া-মমতাকে নিজের আদর্শ ও অভ্যাসে পরিণত করে এবং সৃষ্ট জীবের সহিত সর্বদা কোমল আচরণ করেন তখন তিনি নিজেও যেমন শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারেন তেমনি অন্যদের জন্যও শান্তি ও আনন্দপূর্ণ জীবন যাপনের কারণ হিসাবে পরিগণিত হন। এ ধরনের সদাচার দ্বারা গোটা সমাজের মধ্যে পারস্পরিক মায়া-মমতা, ভ্রাতৃত্ব, মান-সম্মান রক্ষা ও কল্যাণ কামনার এমন একটি সুন্দর পরিবেশ গড়ে উঠে যা আল্লাহ্ পাকের নিকট খুবই পছন্দনীয়। আর যে ব্যক্তির কারণে এ পরিবেশ গড়ে উঠে তিনি আল্লাহ্ পাকের বাণী ‘ سَبَقَتْ رَحْمَتِى عَلَى غَضَبِي )আমার দয়া ও অনুগ্রহ আমার ক্রোধ ও গযবের উপর প্রবল হয়ে থাকে)-এর প্রকাশস্থল হিসাবে হন। আমাদের পরম অনুগ্রহকারী সারা বিশ্বের রহমত নবী তাঁর নিম্নোক্ত বাণীতে আমাদেরকে এদিকে পথনির্দেশ করেছেন।

হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ্র নিকট থেকে নম্রতা ও কোমল আচরণ নীতির পরিপূর্ণতা লাভে সক্ষম হয়েছে সে ইহকাল ও পরকাল উভয় জাহানের সকল কল্যাণের পূর্ণতা লাভ করেছে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মায়া-মমতা ও কোমল আচরণ গুণ থেকে বঞ্চিত সে ইহকাল ও পরকাল উভয় জাহানের যাবতীয় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত।” (ইমাম বাগাভী (র) সংকলিত শারহুস্ সুন্নাহ্)।

١٥٨ عَنْ مَالِكِ بْنِ الْحُوَيْرِثِ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ وَ رَحِيمًا رَفِيقًا أَقْمَنَا عِنْدَهُ عِشْرِينَ لَيْلَةً فَظَنَّ إِنَّا قَدْ اسْتَقْنَا فَسَأَلَنَا عَمَّنْ تَرَكْنَاهُ مِنْ أَهْلِنَا فَأَخْبَرْنَاهُ فَقَالَ النَّبِيُّ ارْجِعُوا إِلَى أَهَالِيْكُمْ فَأَقِيمُوا فِيهِمْ .

১৫৮. হযরত মালিক ইবন হুয়ায়রিস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ছিলেন অতিশয় কোমল-প্রাণ, অতীব দয়ালু ও সহানুভূতিশীল। আমরা স্বগোত্রীয় একটি প্রতিনিধি দলের সাথে বিশ দিন পর্যন্ত তাঁর সান্নিধ্যে অবস্থান করেছিলাম। তখন তাঁর মনে হলো, হয়তো আমাদের মনে বাড়ি ফিরে যাওয়ার আগ্রহ সৃষ্টি হয়ে থাকবে। কাজেই তিনি আমাদেরকে ডাকলেন এবং বাড়িতে আমাদের কারা কারা আছে জিজ্ঞেস করলেন। আমরা তাঁকে বিস্তারিত জানালাম। তখন তিনি ইরশাদ করেন : এবার তোমরা নিজ নিজ পরিবার- পরিজনের কাছে ফিরে যাও এবং সেখানেই স্থায়িভাবে অবস্থান কর (এবং দীনের প্রচার ও প্রসারের কাজ করে যাও)।

ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায় যে, নবী লোকজনের মানসিক অবস্থার প্রতি কতটুকু সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। তা ছাড়া আরো বোঝা যায় যে, মানুষের জন্য তাঁর প্রাণে কতটুকু দয়া ও মমতা বিদ্যমান ছিল। আর এ কারণেই পবিত্র কুরআনে তাঁকে رَحْمَةُ الْعَالَمِينَ' উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। স্বয়ং তিনি তাঁর নিজের ব্যাপারে ইরশাদ করেছেন: أَنَا رَحْمَةُ مُهْدَاةُ -আমি সৃষ্ট জাহানের হিদায়েতের জন্য প্রেরিত রহমত।' সুবহানাল্লাহ্!

١٥٩ عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ وَإِذَا فَقَدَ الرَّجُلُ مِنْ إِخْوَانِهِ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ سَأَلَ عَنْهُ فَإِنْ كَانَ غَائِباً دَعَا لَهُ وَإِنْ كَانَ شَاهِدًا زَارَهُ وَإِنْ كَانَ مَرِيضًا عَادَهُ -

১৫৯. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যদি একাধারে তিনদিন কোন মুসলিম ভাইয়ের সাক্ষাৎ না পেতেন তা হলে তার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। সে যদি সফরে আছে বলে জানতেন তাহলে তার জন্য দু'আ করতেন। আর যদি সে (মদীনায়) উপস্থিত থাকতো (অথচ কোন অপারগতার কারণে হাজির হতে পারছে না) তা হলে তিনি নিজে তার সাক্ষাতের জন্য যেতেন। আর যদি লোকটি অসুস্থ বলে জানতেন তা হলে তিনি সেখানে গিয়ে তার সেবা-শুশ্রূষা করতেন।

ফায়দা : এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, নবী নিজের সঙ্গী ও পরিচিতদের সাথে কতখানি স্নেহপূর্ণ ও আন্তরিক, মনজয় ও খোঁজ-খবরের আচরণ করতেন। নবুওয়াতের গুরু দায়িত্ব পালনে সর্বদা ব্যাপৃত ও মশগুল থাকা সত্ত্বেও তিনি উপস্থিত ও অনুপস্থিত প্রতিটি সঙ্গীর ব্যাপারে পূর্ণ খবরাখবর রাখতেন এবং প্রত্যেকের জন্য উদার আচরণ প্রদর্শন করতেন। নবী-এর এই উন্নত চরিত্র মাধুরী বর্বর নির্মম আরব জাতির অন্তরে এমন প্রীতি ও মমতার সৃষ্টি করেছিল যার উপমা জগতের কোথাও পাওয়া যায় না। সাহাবীগণ তাঁর জন্য ছিলেন নিবেদিত-প্রাণ। ঘোরতর যুদ্ধ চলাকালে তাঁরা নবী-কে আড়ালে রেখে শত্রুর সকল তীর নিজেদের বুক পেতে নিতেন। নবী-এর যেকোন আহ্বানে তাৎক্ষণিক 'লাব্বায়ক' (আমি হাজির, আমি হাজির) বলে সাড়া দিতেন। মহান আল্লাহ্ আমাদের সকলকে এই মহান নবী-এর অনুপম স্বভাব-চরিত্র এবং তাঁর সুন্দরতম রীতি-নীতি ও কাজকর্মের পূর্ণ অনুসরণের শক্তি দান করুন।

١٦٠. عَنْ عَلِيِّ بْنِ حُسَيْنِ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ صَلَّى صَلَاةً فَعَجَلَ فِيْهَا، فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ إِنَّمَا عَجَلْتُ أَنِّي سَمِعْتُ صَبِيًّا يَبْكِي فَخَشِيْتُ أَنْ يَشُقَّ ذَلِكَ عَلَى أَبْوَيْهِ

১৬০. হযরত আলী ইব্‌ন হুসাইন (রা) থেকে বর্ণিত যে, একবার নবী সালাত পড়ালেন এবং সালাত খুব দ্রুত শেষ করলেন। তারপর বললেন: আমি সালাত ত্বরা করে শেষ করার কার হলো যে, সালাতে আমি যখন কোন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনি তখন আমার আশঙ্কা হয় যে, শিশুটির এ কান্নার দরুন তার মাতাপিতার মনে কোন কষ্টের উদ্রেক না হয়।

١٦١. عَنْ أَنَسٍ أَنَّ أَعْرَابِيًّا أَتَى النَّبِيَّ ﷺ فَسَأَلَهُ وَعَلَيْهِ بُرْدٌ فَجَذَبُهُ فَشَقَّ الْبُرْدَ حَتَّى بَقِيْتِ الْحَاشِيَةُ فِي عُنُقِ النَّبِيِّ ﷺ فَأَمَرَ لَهُ النَّبِيُّ ﷺ بِشَيْ

১৬১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক বেদুঈন নবী -এর দরবারে হাজির হয়ে কিছু প্রার্থনা করল। নবী একটি চাদর পরিহিত ছিলেন। লোকটি প্রার্থনার আতিশয্যে তাঁর চাদর ধরে এত জোরে টান দিলো যে, চাদরটি ফেঁড়ে গিয়ে একপার্শ্ব নবী-এর কাঁধের উপর ঝুলতে থাকে। নবী লোকটির এই (অসৌজন্যমূলক) আচরণ সত্ত্বেও তাকে কিছু দান করতে নির্দেশ দেন।

ফায়দা: আলোচ্য হাদীসের অর্থ সুস্পষ্ট। এ হাদীস থেকে অনুমান করা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ নিজের উম্মতের প্রতি কতটুকু দয়ালু এবং কতটুকু ক্ষমাশীল ছিলেন। একজন রুক্ষ প্রকৃতির বেদুঈন যে প্রার্থনা করতেও শিখেনি তারপর আবার দু'জাহানের সরদার মহানবী-এর সাথে এহেন অসৌজন্যমূলক আচরণ যা কেবল তাঁরই মান মর্যাদা হানিকর ময় বরং যেকোন ভদ্রলোকের পক্ষেও অসহনীয়। কিন্তু নবী এই রুক্ষ লোকটির সাথে ক্ষমাশীলতা এবং দয়াপূর্ণ আচরণ করেন; যেভাবে তিনি অন্য লোকদের সাথে আচরণ করে থাকেন। বস্তুত উন্নত চরিত্রের এই সুউচ্চ আসন তিনি ব্যতিরেকে অন্য কোন মানুষের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। একমাত্র তাঁরই পবিত্র সত্তা এই পদমর্যাদার পরিপূর্ণ ধারক। এ কারণে কুরআনে হাকীমের মধ্যে তাঁর সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে : إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ (হে নবী) নিশ্চয়ই আপনি উন্নত চরিত্রের অধিকারী। আল্লাহ্ তা'আলা আমাদের সকলকে উন্নত চরিত্র অবলম্বনের তাওফীক দান করুন। আমীন!

١٦٢. عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ قَالَ بَعَثَنِي رَسُولُ اللهِ ﷺ إِلَى الْيَمَنِ فَقَالَ يَا مُعَاذُ إِذَا كَانَ فِي الشَّتَاءِ فَغَلِسُ بِالْفَجْرِ وَاطِلِ الْقِرَاءَةَ قَدْرَ مَا يُطِيقُ النَّاسُ وَلَا تُمِلْهُمْ ، فَإِذَا كَانَ الصَّيْفُ فَأَسْفِرُ بِالْفَجْرِ فَإِنَّ اللَّيْلَ قَصِيرٌ وَالنَّاسِ يَنَامُوْنَ فَأَمْهِلْهُمْ حَتَّى يَدَارَكُوا -

১৬২. হযরত মুআয ইবন জাবাল (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাকে ইয়ামেনে (গভর্নর নিযুক্ত করে) পাঠালেন এবং বলেন, হে মুআয! শীতের মৌসুমে তুমি ফজরের সালাত শুরু ওয়াক্তে পড়াবে। আর সালাতে কিরাআত এতটুকু দীর্ঘ করবে যতটুকু লোকজনের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হয়। অতিশয় দীর্ঘ কিরাআতের কারণে মানুষের মনে যেন বিরক্তি না আসে। আর গরমের মৌসুমে তুমি ফজরের সালাত শেষ ওয়াক্তে পড়াবে। কেননা (গরম কালে) রাত ছোট হয়ে থাকে মানুষের ঘুম শেষ হয় না। কাজেই তাদেরকে এতটুকু সুযোগ দেবে যাতে তারাও সালাতে অংশগ্রহণে সক্ষম হয়।

ফায়দা: আলোচ্য হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ যেভাবে জাগতিক সকল কাজে উম্মতের প্রতি দয়া ও কোমলতার আচরণ করতেন অনুরূপ ইবাদত বন্দেগী ইত্যাদি আদায়ের ক্ষেত্রেও তিনি তাদের জন্য সহজসাধ্য পদ্ধতি অবলম্বনের প্রতি দৃষ্টি রাখতেন। সহ্য করা যায় না এমন কোন কঠোরতার দরুন ইবাদত করতে তাদের মনে যেন বিরক্তি না আসে সে জন্য তিনি সচেতন থাকতেন। এমন কি তিনি সালাতের মত উচ্চমানের ইবাদত, যার ব্যাপারে নিজেই ইরশাদ করেছেন যে, "আমার নয়নের প্রশান্তি হলো সালাত," ব্যাপারেও তিনি সহজলভ্যতা ও সহজসাধ্যতার নীতি পালনের নির্দেশ দিতেন। শীত ও গরমের মৌসুম এবং রাত দিন ছোট বড় হওয়ার প্রতি দৃষ্টি রাখার পেছনে এটিই হলো মূল রহস্য—যেন কঠোরতা দেখে শংকিত হয়ে কেউ দীনাদারী ও ইবাদত বন্দেগী ছেড়ে না বসে। আল্লাহ্ তা'আলা এই দীনের বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করে ইরশাদ করেন : وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّيْنِ مِنْ حَرَجٍ مِنْةَ أَبِيْكُمْ إِبْرَاهِيمَ এই দীনের মাঝে সংকীর্ণতার কোন কিছু নেই, এটি তোমাদের ঊর্ধ্বতন পুরুষ ইব্রাহীমের দীন" (সূরা হাজ্জ : ৭৮)

١٦٣. عَنْ جَابِرٍ قَالَ غَزَا رَسُولُ اللهِ ﷺ إِحْدَى وَعِشْرِينَ غَزْوَةٌ بِنَفْسِهِ، شَهِدْتُ تِسْعَ عَشْرَةَ غِبْتُ عَنِ اثْنَتَيْنِ، فَبَيْنَا أَنَا مَعَهُ فِي بَعْضٍ غَزَوَاتِهِ إِذَا أَعْنِي فَأَضْحَى تَحْتَ اللَّيْلِ فَبَرَكَ وَكَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فِي آخِرِنَا فِي أُخْرَيَاتِ النَّاسِ فَيَزْجِي الضَّعِيفَ وَيَرْدِفُ وَيَدْعُولَهُمْ فَانْتَهَى إِلَى وَأَنَا أَقُولُ يَا لَهَفَ أَمْتَاهُ وَمَا زَالَ لَنَا نَاضِحَ سُوْءٍ، فَقَالَ مَنْ هُذَا ؟ قُلْتُ أَنَا جَابِرُ بِأَبِي وَأُمِّي يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ مَا شَأْنُكَ ؟ قُلْتُ أَعْيِي نَاضِحْي فَقَالَ أَمَعَكَ عَصًا قُلْتُ نَعَمْ فَضَرَبَهُ ثُمَّ بَعَثَهُ ثُمَّ أَنَاخَهُ وَوَطِئَ عَلَى ذِرَاعِهِ وَقَالَ ارْكَبُ فَرَكِبْتُ فَسَايَرْتُهُ فَجَعَلَ جَمَلِي يَسْبِقُهُ فَاسْتَغْفَرَ لِي تِلْكَ اللَّيْلَةَ خَمْسًا وَعِشْرِينَ مَرَّةً - فَقَالَ لِي مَا تَرَكَ عَبْدُ اللَّهِ مِنْ الْوَادِ ؟ يَعْنِي آبَاهُ قُلْتُ سَبْعَ نِسْوَةٍ قَالَ أَتَرَكَ عَلَيْهِ دَيْنَا قُلْتُ نَعَمْ قَالَ فَإِذَا قَدِمْتَ الْمَدِينَةَ فَقَاطِعُهُمْ فَإِنْ أَبَوْا فَإِذَا حَضَرَ جِدَادَ نَخْلِكُمْ فَاذِنِي وَقَالَ لِي هَلْ تَزَوَّجْتَ ؟ قُلْتُ نَعَمْ قَالَ بِمَنْ ؟ قُلْتُ بِفَلَانَةِ بِنْتِ فُلَانٍ بِأَيِّمٍ كَانَتْ بِالْمَدِينَةِ قَالَ فَهَلاً فَتَاة تُلاعِبُهَا وَتُلاعِبُكَ ؟ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ كُنَّ عِنْدِي نِسْوَةٌ خَرَقَ يَعْنِي أَخْوَاتُهُ فَكَرِهْتُ أَنْ أَتَيْهِنَّ بِامْرَأَةٍ خَرْقَاءَ ، فَقُلْتُ هَذِهِ أَجْمَعُ الأَمْرِي قَالَ فَقَدْ أَصَبْتَ وَرَشَدْتَ فَقَالَ بِكُمْ اَشْتَرَيْتَ جَمَلَكَ قُلْتُ بِخَمْسٍ أَوَاقٍ مِنْ ذَهَبٍ قَالَ قَدْ أَخَذْنَاهُ ، فَلَمَّا قَدِمَ الْمَدِينَةَ أَتَيْتُهُ بِالْجَمَلِ فَقَالَ يَا بِلالُ : أَعْطِهِ خَمْسَ أَوَاقٍ مِنْ ذَهَبٍ يَسْتَعِينُ بِهَا فِي دَيْنِ عَبْدِ اللَّهِ وَزِدْهُ ثَلَاثًا وَارْدُدْ عَلَيْهِ جَمَلَهُ ، قَالَ هَلْ قَاطَعْتَ غُرْمَاءَ عَبْدِ اللَّهِ ؟ قُلْتُ لَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ أَتَرَكَ وَفَاء ؟ قُلْتُ لَا قَالَ لَا عَلَيْكَ إِذَا حَضَرَ جِدَادَ نَخْلِكُمْ فَاذِنِي فَاذِنْتُهُ فَجَاءَ فَدَعَا لَنَا فَاسْتَوْفِي كُلِّ غَرِيم مَا كَانَ يَطْلُبُ تَمَرًا وَفَاء وَبَقِيَ لَنَا مَا كَنَّا نَجِدُ وَأَكْثَرَ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ارْفَعُوا وَلَا تَكِيلُوا فَرَفْعَنَا فَأَكَلْنَا مِنْهُ زَمَانًا .

১৬৩. হযরত জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ একুশটি যুদ্ধে স্বয়ং অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে উনিশটিতেই আমি শামিল থাকি। অবশিষ্ট দু'টির মধ্যে উপস্থিত ছিলাম না। একবার আমি নবী -এর সঙ্গে যুদ্ধে যাত্রা করেছিলাম। এমন সময় রাত্রিকালে আমার উটটি হাঁটতে অক্ষম হয়ে পড়ল। নবী পেছনের লোকজনের সাথে আমাদের পেছনে আসছিলেন। পেছনের লোকজনের সাথে তাঁর আসার উদ্দেশ্য ছিল এই যে, তিনি পেছন থেকে দুর্বলদেরকে চলতে সাহায্য করতেন, প্রয়োজনের মুহূর্তে তাদেরকে নিজের বাহনে আরোহণ করিয়ে নিতেন এবং দুর্বলদের জন্য দু'আ করতে থাকতেন। (পথ চলতে চলতে আমিও পেছনে পড়ে গিয়েছিলাম) তিনি যখন আমার কাছে আসলেন আমি তখন নিজের দুর্বলতা ও অক্ষমতার দরুন নিজে নিজেকে তিরস্কার করছিলাম। হায়! আমার মায়ের বিনাশ! কেননা আমার উট অক্ষম হয়ে গিয়েছে। এ সময় নবী জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনার প্রতি আমার মাতাপিতা কুরবান হোক, আমি জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ্। তিনি বললেন, তোমার কি হয়েছে? আমি বললাম আমার উটটি (ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে বসে গেছে আর দাঁড়াচ্ছে না)। তিনি বললেন, তোমার হাতে (হাঁকিয়ে নেওয়ার কোন) লাঠি আছে কি? আমি বললাম, জী হ্যাঁ, আছে।

তখন তিনি লাঠির সাহায্যে উটটিকে প্রহার করলেন, এটি দাঁড়াল। তারপর পুনরায় উটটিকে বসিয়ে সম্মুখের পা দু'টি সজোরে চিপে দিলেন। তারপর আমাকে বললেন, যাও, আরোহণ কর। আমি উটটির পিঠে আরোহণ করলাম এবং চালাতে থাকলাম। দেখলাম, নবী -এর মুবারক হাতের স্পর্শের কারণে আমার উটটি তাঁর উট থেকেও আগে আগে চলতে শুরু করেছে। নবী সে রাতে আমার পঁচিশবার মাগফিরাতের দু'আ করেন। তারপর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পিতা আবদুল্লাহ মৃত্যুকালে কতজন সন্তান রেখে গিয়েছেন? আমি বললাম, সাত কন্যা। তিনি বললেন, তার উপর কি কিছু ঋণও ছিল? আমি বললাম, জী হ্যাঁ। তিনি বললেন, এবার মদীনায় ফিরে গিয়ে ঋণদাতাদের সাথে একটা ফয়সালা করে নিও। তারা যদি তোমার ফয়সালা মানতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে খেজুর আহরণের মৌসুমে তুমি আমাকে সংবাদ দিবে। তারপর তিনি আমার প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি বিবাহ করেছ? আমি বললাম, জী হ্যাঁ। তিনি বললেন, কাকে বিবাহ করেছ? আমি বললাম, অমুকের বিধবা কন্যা। তারা মদীনাতেই বসবাস করে। তিনি বললেন, কোনো কুমারীকে বিয়ে করলে না কেন? তাহলে সে তোমার জন্য এবং তুমি তার জন্য অধিকতর মনস্তুষ্টি ও ভালবাসার কারণ হতে। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্। আমাদের ঘরে অনভিজ্ঞ কুমারীরা আছে। (অর্থাৎ আমার ছোট বোনেরা সকলে কুমারী) কাজেই আমি তাদের সমবয়সের আরেকজন কুমারীকে ঘরে আনা পছন্দ করিনি। আমি সিদ্ধান্ত করেছিলাম কোন একজন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মহিলাকে ঘরে আনা হলে আমার পারিবারিক কাজকর্মে অধিকতর কল্যাণজনক প্রমাণিত হবে। নবী বললেন, তাহলে তুমি ঠিক কাজ করেছ এবং উত্তম পথ অবলম্বন করেছ। তারপর নবী আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, এ উট তুমি কত মূল্যে খরিদ করেছিলে? আমি বললাম, পাঁচ উকিয়া স্বর্ণের বিনিময়ে। তিনি বললেন, উটটি আমি তোমার কাছ থেকে খরিদ করে নিলাম। এরপর মদীনা শরীফ পৌঁছে আমি উটটি নবী-এর খেদমতে পেশ করে দেই। তিনি হযরত বিলালকে ডেকে বললেন, বিলাল তুমি জাবিরকে পাঁচ উকিয়া স্বর্ণ পরিশোধ কর। সে (তার পিতা হযরত) আবদুল্লাহ্র ঋণ শোধে এ অর্থ ব্যয় করবে। তাকে আমার পক্ষ থেকে অতিরিক্ত আরো তিন উকিয়া স্বর্ণ দিয়ে দিবে এবং তাকে তার উটটিও ফিরিয়ে দিবে।

তারপর নবী আমাকে বললেন, তুমি তোমার পিতা আবদুল্লাহ্র ঋণদাতাদের সঙ্গে কথাবার্তা ঠিক করেছ কি? আমি বললাম, জী না। নবী বললেন, আবদুল্লাহ্ কি এতটুকু সম্পদ রেখে গেছে যা দিয়ে ঋণ শোধ করা সম্ভব? আমি বললাম, জী না। তিনি বললেন, ঠিক আছে কোন অসুবিধা হবে না। তোমাদের বাগানে খেজুর আহরণের সময় ঘনিয়ে এলে আমাকে সংবাদ দিও। সে মতে আমি (সময়মত) নবীকে স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি আগমন করলেন এবং আমাদের জন্য দু'আ করলেন। (তাঁর সে দু'আর বরকতে) খেজুর থেকে ঋণদাতা সকলের পাওনা পরিপূর্ণভাবে শোধ করে দেওয়া হলো। তারপর আমাদের হাতে সেই পরিমাণ খেজুর অবশিষ্ট রয়ে গেল যতটুকু আমরা অন্যান্য বছর আহরণ করতাম। এমনকি অবশিষ্ট অংশ অন্যান্য বছরের তুলনায় পরিমাণে কিছু বেশিও ছিল। তারপর নবী আমাকে বললেন, এ খেজুরগুলি ঘরে নিয়ে যাও। তবে দেখ এগুলিকে পরিমাপ করবে না। সে মতে আমার উক্ত খেজুর বহুদিন পর্যন্ত খেতে থাকি।

ফায়দা: আলোচ্য হাদীসে প্রিয় নবী-এর দু'টি মুজিয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। একটি হলো, তাঁর দু'আর বরকতে ক্লান্ত হয়ে পড়া অক্ষম একটি উট পুনরায় শক্তি লাভ করে এবং দ্রুত গতিতে চলতে আরম্ভ করে। আর অপরটি হলো, তাঁর বরকতে সামান্য পরিমাণের খেজুর এত অধিক পরিমাণের হলো যে, তা থেকে সকল ঋণ পরিশোধ করেও অতিরিক্ত রয়ে গেল। এমন কি অন্যান্য মৌসূমে যে পরিমাণ খেজুর জাবির (রা) বাগান থেকে পেতেন তার চেয়েও বেশি রয়ে গেল।

উল্লেখিত হাদীসটি বর্ণনা করা গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হলো উম্মতের প্রতি প্রিয় নবী -এর মমত্ববোধ ও আন্তরিকতার দৃষ্টান্ত পেশ করা। বিশেষত তিনি সহায়-সম্বলহীন দরিদ্র মানুষের সাথে কতটুকু সহানুভূতি প্রদর্শন এবং তাদেরকে কত সাহায্য করতেন এ কথার প্রমাণ পেশ করা। এ হাদীসে সুস্পষ্ট বিবরণ বিদ্যমান যে, প্রিয় নবী হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ্ (রা)-কে কেবল মৌখিকভাবেই সহানুভূতি প্রদর্শন করে ক্ষান্ত হননি বরং তাঁর পিতার রেখে যাওয়া ঋণ পরিশোধের জন্য আর্থিকভাবেও সাহায্য করেন। তিনি তাঁর বাগানে উৎপাদিত খেজুরে বরকতের জন্য দু'আ করেন। ফলে আল্লাহ্ পাক তাঁর ঋণসমূহ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন। অধিকন্তু তাঁর পরিবারের আহারের জন্য তাঁর কাছে যথেষ্ট পরিমাণে উদ্বৃত্তও থেকে যায়।

বর্ণিত হাদীসের ঘটনাটির মধ্যে সমবেদনা ও আর্থিক সাহায্যের এ বিষয়টি মনস্তত্বের দিক থেকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষামূলক। এখানে দু'জাহানের রহমত প্রিয় নবী হযরত জাবির (রা)-এর মন থেকে অনুগ্রহ প্রাপ্তির বোঝা লাঘব করার উদ্দেশ্যে নামমাত্র মূল্যে তাঁর উটটি খরিদ করেন-যেন হযরত জাবির (রা)-কে এ উটের মূল্য গ্রহণে কোন সংকোচ বোধ না করেন। তাছাড়া মদীনায় পৌঁছে উটের মূল্য প্রদানের সময় অতিরিক্ত আরো তিন উকিয়াসহ বিক্রীত উটটিও তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বস্তুত হযরত জাবিরের উট খরিদ করা প্রিয় নবী-এর উদ্দেশ্য ছিল না। এ কারণে জাবির (রা) যখন উটের দ্বারা মদীনা পৌঁছা পর্যন্ত আরোহণ করার শর্ত আরোপ করেন তখন মহানবী সেই শর্ত মেনে নেন। অথচ বাহ্যিকভাবে এ ধরনের শর্তারোপ নিষিদ্ধ। কেননা অন্য হাদীসে বলা হয়েছে, نَهَى عَنْ بَيْرٍ وَشَرْطَ নবী শর্তের সাথে কোন বেচাকেনা করতে নিষেধ করেছেন কাজেই যেহেতু প্রিয় নবী -এর মূল উদ্দেশ্য উট খরিদ করা নয়, বরং উদ্দেশ্য ছিল উটের দাম বলে হযরত জাবিরকে আর্থিক সাহায্য করা। আর একারণেই তিনি উপরোক্ত শর্ত মেনে নিতে কোন দ্বিধা প্রকাশ করেন নি। তারপর মদীনা পৌঁছে তিনি কেবল উটের মূল্যই নয় বরং উটসহ অতিরিক্ত আরো তিন উকিয়া স্বর্ণ তাকে প্রদান করেন। এভাবে এ উম্মতের জন্যও কর্তব্য যে, তারা যখন নিজেদের কোন অভাবী ঋণগ্রস্ত ভাইয়ের আর্থিক সাহায্য করার ইচ্ছা করবেন তখন এমন পন্থা অবলম্বন করবেন যার ফলে অভাবী ব্যক্তি সাহায্য গ্রহণ করতে সংকোচবোধ না করেন এবং যথাসম্ভব অভাবী লোকটি অনুগ্রহ ভাজন হওয়ার বোঝা থেকে যেন হাল্কা রাখেন।

١٦٤. عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ وَاللَّهِ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ إِنْ كُنْتُ لَاشُدُّ الْحَجَرَ عَلَى بَطْنِي مِنَ الْجُوعِ وَإِنْ كُنْتُ لَاعْتَمِدُ بِيَدَيَّ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْجُوعِ وَلَقَدْ قَعَدْتُ يَوْمًا عَلَى طَرِيقِهِمْ الَّذِي يَخْرُجُونَ فِيهِ فَمَرَّ بِي أَبُو بَكْرٍ فَسَأَلْتُهُ عَنْ آيَةٍ مِنْ كِتَابِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مَا أَسْأَلُهُ عَنْهَا إِلَّا لِيَسْتَبْتَعْنِي فَمَرَّ وَلَمْ يَفْعَلْ ، ثُمَّ مَرَّ عُمَرُ فَسَأَلْتُهُ عَنْ آيَةٍ مِنْ كِتَابِ اللَّهِ مَا سَأَلْتُهُ إِلَّا لِيَسْتَبْتَعَنِي فَمَرَّ وَلَمْ يَفْعَلْ ثُمَّ مَرَّ أَبُو الْقَاسِمِ ﷺ فَعَرَفَ مَا فِي نَفْسِي وَمَا فِي وَجْهِي فَتَبَسَّمَ وَقَالَ أَبَا هُرَّ الْحَقِّ فَاتَّبَعْتُهُ فَدَخَلَ فَاسْتَأْذِنَتْ فَأَذِنَ لِي فَوَجَدَ لَبَنًا فِي قَدْحٍ فَقَالَ لِأَهْلِهِ أَنَّى لَكُمْ هُذَا اللَبَنُ ؟ قَالُوا أَهْدَاهُ لَكَ فُلَانُ، فَقَالَ يَا أَبَاهُرْ انْطَلِقِ إِلَى أَهْلِ الصُّفَةِ فَادْعُهُمْ لِي قَالَ فَاحْزَنَنِي ذَلِكَ وَأَهْلُ الصُّفَّةِ أَصْيَافُ الْإِسْلَامِ لَا يَاوُونَ إِلَى أَهْلِ وَلَا مَالٍ إِذَا جَاءَتْهُ أَرْسَلَ بِهَا إِلَيْهِمْ وَلَمْ يَزْرَا مِنْهَا شَيْئًا وَإِذَا جَاءَتْهُ هَدْيَةُ أَرْسَلَ إِلَيْهِمْ فَاشْرَكَهُمْ فِيهَا فَأَصَابَ مِنْهَا قَالَ فَأَحْزَنَنِي إِرْسَالُهُ إِيَّايَ وَقُلْتُ أَرْجُو أَنْ أَشْرَبَ مِنْ هَذَا اللَّبْنِ شَرْبَةً أَتَغَدَّى بِهَا فَمَا يُغْنِي عَنِّي هُذَا اللَّبَنُ فِي أَهْلِ الصُّفَةِ وَأَنَا الرَّسُولُ ، فَإِذَا جَاؤُا أَمَرَنِي فَكُنْتُ أَنَا أعَاطِيْهِمْ وَلَمْ يَكُنْ مِنْ طَاعَةِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَطَاعَةِ رَسُولِهِ بُدٌّ ، فَانْطَلَقْتُ إِلَيْهِمْ فَدَعَوْتُهُمْ فَأَقْبَلُوا فَاسْتَأْذَنُوا فَأَذِنَ لَهُمْ فَأَخَذُوا مَجَالِسَهُمْ مِنَ الْبَيْتِ ، وَقَالَ آبَاهُرُ قُلْتُ لَبَّيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ قُمْ فَأَعْطِهِمْ فَاخَذِ الْقَدْحَ فَاعْطِي الرَّجُلَ حَتَّى يَرْوِي ، ثُمَّ يَرُدُّهُ إِلَى حَتَّى رَوِيَ جَمِيعُ الْقَوْمَ فَانْتَهَيْتُ إِلَى رَسُولِ اللهِ ﷺ فَأَخَذَ الْقَدْحَ فَوَضَعَهُ عَلَى يَدَيْهِ ثُمَّ رَفَعَ رَأْسَهُ فَنَظَرَ إِلَى فَتَبَسَّمَ وَقَالَ أَقْعُدْ فَقَعَدْتُ فَشَرِبْتُ وَقَالَ أَشْرَبْ ، رال يَقُولُ اشْرَبْ حَتَّى قُلْتُ وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ مَا أَجِدُ لَهُ مَسْلَكًا ، قَالَ فَارْنِي فَرَدَدْتُ إِلَيْهِ الإِنَاءَ فَحَمِدَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ شَرِبَ مِنْهُ -

১৬৪. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সেই পবিত্র সত্তার কসম! যিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই যে, আমি (অনেক সময়) ক্ষুধার তাড়নায় নিজের পেটের উপর পাথর বেঁধে রাখতাম। আর (কোন কোন সময়) এই ক্ষুধাজনিত কষ্টের কারণে নিজের দু'হাত দ্বারা মাটির উপর ভর দিয়ে বসে থাকতাম। আল্লাহর শপথ, একদিন এমন হয়ে গিয়েছিলো যে, (মসজিদে নববী থেকে) বেরিয়ে যাওয়ার পথের উপর বসে পড়ি। (যেন আমার ক্ষুধার্ত অবস্থা কারোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে) এ সময় হযরত আবূ বক্র সিদ্দীক (রা) আমার নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি তাঁকে শুধু এ উদ্দেশ্যে যে, তিনি আমাকে সঙ্গে করে (ঘরে) নিয়ে যাবেন এবং কিছু খেতে দিবেন-পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু তিনি আমার প্রকৃত ইচ্ছা কিছুই উপলব্ধি করলেন না। (প্রশ্নটির জবাব দিয়ে) চলে গেলেন। আমাকে আর সঙ্গে করে নিলেন না। অতঃপর (এ পথ দিয়ে) হযরত উমর ইবন খাত্তাব (রা)-এর আগমন ঘটল। আমি তাঁকেও এ উদ্দেশ্য নিয়ে কুরআনে পাকের একটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। (এ আশায় যে) তিনি হয়ত আমাকে সঙ্গে করে ঘরে নিয়ে যাবেন। কিন্তু তিনি আমার প্রকৃত মনোভাবটি উপলব্ধি করলেন না। প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চলে গেলেন। আমাকে আর সঙ্গে করে নিলেন না। এরপর রহমতে আলম আবুল কাসিম এ পথে আগমন করলেন। তিনি আমার চেহারা দেখেই আমার অন্তরের ভাষা উপলব্ধি করে নেন। তিনি স্মিত হেসে বললেন, আবূ হির, আস, আমার সঙ্গে চল। আমি নবী -এর পিছু পিছু চললাম। তিনি উম্মুল মু'মিনীনদের একজনের ঘরে প্রবেশ করলেন। আমি বাহির থেকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে ভিতরে ডেকে নেন। এ সময় তিনি ঘরে এক পেয়ালা দুধ রক্ষিত আছে দেখলেন। জিজ্ঞেস করলেন, এ দুধ তোমার কাছে কোথা থেকে এসেছে? ঘরওয়ালারা বললেন, অমুক ব্যক্তি আপনার জন্য হাদিয়া পাঠিয়েছে। নবী তখন আমাকে বললেন, হে আবূ হির! যাও সুফফার সকলকে ডেকে আনো। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, এ কথা শুনে আমি বড় চিন্তায় পড়ে গেলাম। কেননা আহলে সুফফার সকলেই ইসলাম ও مسلمانوں মেহমান। তাদের কারোর না আছে কোন ঘরবাড়ি আর না কোন পরিবার-পরিজন। সাদাকার যে সকল জিনিস প্রিয় নবীর কাছে আসতো তিনি তা তাদের জন্য পাঠিয়ে দিতেন। তিনি নিজের জন্য এ থেকে কিছুই রাখতেন না। আর তাঁর কাছে যদি হাদিয়ার কোন কিছু আসতো তাহলে সকলকে ডেকে এনে নিজের সঙ্গে আহার করাতেন। তখন প্রিয় নবী নিজেও আহার করতেন, সঙ্গে অন্যরাও আহার করতো। (মোট কথা আহলে সুফ্ফার লোকেরা প্রায়ই অভুক্ত অবস্থায় দু'জাহানের রহমত নবী-এর অপেক্ষায় বসে থাকতেন।) আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, কাজেই নবী-এর আমাকে তাদের ডেকে আনতে পাঠানোর বিষয়টি আমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিলো। আমি মনে মনে ভাবলাম, আশা তো করেছিলাম আমি এ দুধটুকু পান করে কিছুটা স্বস্তি লাভ করবো। কিন্তু আহলে সুফফার সকলের সাথে এই এক পেয়ালা দুধের কতটুকু আমার ভাগ্যে আসবে। আবার যেহেতু আমিই তাঁদেরকে ডেকে আনছি, কাজেই তারা যখন আসবে নবী তখন আমাকেই সকলের মাঝে দুধ বণ্টন করে দিতে নির্দেশ দিবেন। (আমি নিজে রয়ে যাবো সকলের শেষে। কাজেই আমার জন্য কিছু অবশিষ্ট থাকবে কিনা বলা যায় না।)

কিন্তু আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ পালন ব্যতিরেকে কোন গত্যন্তরও নেই। এসব ভেবে আমি সুফাবাসীদের কাছে গেলাম। তাদেরকে ডাকলে তারা সকলে আসলেন। তারপর নবী -এর গৃহে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করলে তিনি অনুমতি দেন। সকলে নিজ নিজ আসনে বসার পর নবী আমাকে বললেন, হে আবূ হির! আমি বললাম, লাব্বাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তিনি বললেন, দাঁড়াও সকলকে একের পর এক দুধের এই পেয়ালা থেকে পান করতে দাও। সে মতে আমি পেয়ালাটি একজন থেকে নিয়ে অন্যজনকে পৌঁছিয়ে দিতে থাকি। তারা প্রত্যেকে তৃপ্তি ভরে পান করার পর পেয়ালা আমাকে ফেরত দিতেন। এভাবে পালাক্রমে আহলে সুফ্ফার সকলেই পেট পূর্ণ করে পান করার পর আমি পেয়ালাটি নিয়ে প্রিয় নবীর কাছে উপস্থিত হই। তিনি পেয়ালাটি নিজের সামনে রাখলেন। তারপর মাথা উপরে তুলে আমার দিকে তাকালেন এবং স্মিত হেসে বললেন, বসে পড়ো। আমি বসে গেলাম। তিনি বললেন, এবার তুমি পান করো। সে মতে আমি পেটভরে দুধ পান করলাম। তিনি পুনরায় আমাকে বললেন, পান করো। ফলে আমি আবার পান করি। (এভাবে তিনি বারবার আমাকে বলতে থাকেন আর আমি পান করতে থাকি।) অবশেষে আমি বললাম, কসম সেই সত্তার! যিনি আপনাকে সত্যসহ নবী বানিয়ে পাঠিয়েছেন, এক ঢোক পরিমাণ দুধ পান করার মতও কোন জায়গা খালি নেই। তিনি বললেন, ঠিক আছে পেয়ালাটি আমাকে দাও। আমি পেয়ালাটি প্রিয় নবীর হাতে তুলে দিলে তিনি মহান আল্লাহ্র প্রশংসা জ্ঞাপন করলেন এবং নিজেও সেই পেয়ালা থেকে পান করলেন।

ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসে প্রিয় নবী-এর এমন অত্যাশ্চর্য একটি মুজিযার বর্ণনা করা হয়েছে যা মানবীয় বুদ্ধি ও উপলব্ধির সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে। এক পেয়ালা দুধ নবী-এর বরকতে এবং তাঁর হাতে প্রকাশিত মুজিযা হিসাবে এত অধিক পরিমাণ হয়েছে যে, ষাট কিংবা সত্তর জন ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত মানুষের একটি দল তা থেকে তৃপ্তিভরে পান করার পরও তা শেষ না হওয়া মানুষের বুদ্ধির অগম্য। বস্তুতঃ মাক্সারে এ ধরনের আরো হাজার হাজার মুজিযা প্রিয় নবী-এর বরহক নবী হওয়ার কারণ করে। হযরত আবূ হুরায়রা (রা), যাকে আহলে সুফ্ফার এক পর্যায়ের নাযিম বলা চলে তিনিও মাত্র এক পেয়ালা দুধে এত সংখ্যক মানুষের জন্য যথেষ্ট হওয়ার বিষয়টি কল্পনা করতে পারেন নি। নিজে নিজের অস্থিরতা ও ব্যাকুলতার অবস্থা অতিশয় সরলতার সাথে ব্যক্ত করে দেন। আল্লাহ্ পাক এ সামান্য দুধে এত অত্যাশ্চর্যজনক বৃদ্ধি ও বরকত প্রদান করেন যে, তা সকলের জন্যই যথেষ্ট হয়ে গেল। বরং কিছু অবশিষ্টও রইল। মনে হয় যেন পেয়ালাটির পরতে পরতে কোন ঝর্ণা বিদ্যমান ছিল যে, মানুষ যতটুকু পান করেছিলো সঙ্গে সঙ্গে ততটুকু আবার পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।

এ হাদীস থেকে আরো বোঝা যায় যে, উম্মতের জন্য প্রিয় নবী ﷺ-এর মনে কতখানি আন্তরিকতা ও দরদ বিদ্যমান ছিলো। তাঁর দরদপূর্ণ দৃষ্টি উম্মতের অন্তরস্থ সূক্ষ্ম অবস্থা ও চিন্তাভাবনাকে তাদের চেহারা গবাক্ষপথ দিয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করত। হযরত আবূ বকর (রা)-এর দৃষ্টি আবূ হুরায়রা (রা)-এর চেহারা ও তার প্রশ্ন করা থেকে যে ভাবকে অনুধাবন করতে পারেননি, হযরত উমরের সচেতন চাহনি যা অনুভব করেনি দয়ার মহাসমুদ্র প্রিয় নবী ﷺ-এর দরদমাখা দৃষ্টি তা সহজেই উপলব্ধি করে নেয়।

এ হাদীস থেকে সবচেয়ে বড় যে কথাটি বোঝা যায় তা হলো অনাহারক্লিষ্ট সাহাবীদের আত্মমর্যাদাবোধ। তাঁরা অনাহার ও দারিদ্রে অকল্পনীয় যাতনা নীরবে সহ্য করতেন। কিন্তু কারোর সামনে তা প্রকাশ করতেন না। কারোর কাছে ভিক্ষা চাওয়া বা হাত পাতা তো কল্পনাই করা যায় না। এরাই হলেন সেসব দারিদ্র ব্যক্তিত্ব যাদের ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ্ পাকের ইরশাদ হলো : لِلْفُقَرَاءِ الَّذِينَ أُحْصِرُوا فِي سَبِيلِ اللهِ لَا يَسْتَطِيعُونَ ضَرْبًا فِي الْأَرْضِ يَحْسَبُهُمُ الْجَاهِلُ أَغْنِيَاءَ مِنْ التَّعَفُّفِ تَعْرِفُهُمْ بِسِيمَاهُمْ لَا يَسْأَلُونَ النَّاسَ إِلْحَافًا - প্রকৃত প্রাপ্য হলো সেসব অভাবগ্রস্ত লোকজনের, যারা আল্লাহ্ পথে এমনভাবে ব্যাপৃত থাকে যে, দেশময় ঘোরাফেরা করার সুযোগ থাকে না। যাচ্ঞা না করার কারণে অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে অভাবমুক্ত বলে ধারণা করে; (হে নবী) আপনি তাদেরকে লক্ষণ দেখেই চিনতে পারেন। তারা মানুষের কাছে নাছোড় হয়ে যাচ্ঞা করে না। (সূরা বাকারা : ২৭৩)

তাদের সম্পর্কে প্রিয় নবী ﷺ ইরশাদ করেন : يَدْخُلُ الْفُقَرَاءُ الْجَنَّةَ قَبْلَ الْأَغْنِيَاء অভাবগ্রস্তরা সম্পদশালীদের সত্তর বছর পূর্বে বেহেস্তে প্রবেশ করবে। (আল-হাদীস)

١٦٥. عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا حَدَّثَ بِالْحَدِيثِ أَوْ سَأَلَ عَنِ الْأَمْرِ كَرَّرَهُ ثَلَاثًا لَيُفْهِمْ وَيُفْهَمَ عَنْهُ -

অতি উত্তম যা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব, যদিও না সে আমল সামান্য পরিমাণের হয়। তারপর তিনি বললেন, আমাকে এখানে সালাত পড়তে কেবল এ আশংকাটিই বারণ করেছে যে, এ ব্যাপারে আবার আমার উপর এমন কোন নির্দেশনা অবতীর্ণ হয়ে যায় যা পালনে তোমরা সক্ষম হবে না।

ফায়দা : ইতিপূর্বে একটি হাদীসের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ তাঁর উম্মতের ব্যাপারে সীমাহীন দরদী ও অতিশয় দয়ালু ছিলেন। এমনকি তিনি তাদের বিভিন্ন ইবাদত পালন ও আমল করার ক্ষেত্রেও সহজসাধ্যতা ও সহজলভ্যতার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখতেন। এই দরদ ও দয়ার কারণেই তিনি রাতের সেই নিয়মিত নফল পড়া বর্জন করেন। এখানে নবী -এর আশংকাবোধ হয়েছিল যে, এভাবে নিয়মিত আদায় করা হলে এ সালাত উম্মতের উপর ফরয হয়ে যেতে পারে। আর তখন তাদের পক্ষে তা পালন করে যাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়বে।

١٦٧. عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ قَالَ بَعَثَنِي رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِلَى الْيَمِنِ وَذَكَرَ الْحَدِيثَ -

১৬৭. হযরত মুআয ইব্‌ন জাবাল (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাকে ইয়ামেনে (গভর্নর নিযুক্ত করে) প্রেরণ করেন। তারপর তিনি পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন।

ফায়দা : এ হাদীসটি জামে তিরমিযী গ্রন্থে পরিপূর্ণ বর্ণিত হয়েছে। সেখানে হযরত মুআয (রা) বলেছেন যে, প্রিয় নবী আমাকে ইয়ামেনের গভর্নর বানিয়ে পাঠান। আমি যখন যাত্রা করলাম তখন তিনি জনৈক ব্যক্তিকে পাঠিয়ে আমাকে পুনরায় ডাকালেন। আমি ফিরে আসার পর তিনি আমাকে বললেন, তুমি নিশ্চয় জান আমি তোমাকে লোক পাঠিয়ে ডেকে এনেছি কেন। তিনি আরো বললেন, দেখ "তুমি আমার অনুমতি ব্যতিরেকে হাদিয়ার নামে মানুষের কাছ থেকে কোন জিনিস গ্রহণ করো না। কেননা এটি খেয়ানতের মাল-এর অন্তর্ভুক্ত। যে ব্যক্তি খেয়ানতের মাধ্যমে সম্পদ গ্রহণ করবে তাকে কিয়ামতের দিন সেই মালসহ আল্লাহ্র সামনে উপস্থিত হতে হবে।" আমি তোমাকে এই এতটুকু কথা বলে দেয়ার জন্য পুনরায় ডেকে এনেছি। যাও, নিজের কর্তব্য পালন করো।

প্রিয় নবী -এর ওসীয়ত করার মূল কারণও হলো তাঁর অন্তরে উম্মতের প্রতি মমত্ববোধ। তিনি চাইতেন মানুষের উপর যেন কাজকে সহজ করা হয়, তাদের সাথে কোমল আচরণ করা হয়। গভর্নর বা শাসনকর্তাদেরকে হাদিয়া-তোহফা প্রদানের জটিলতা যেন তাদেরকে পোহাতে না হয়। প্রিয় নবী নিজেও এ নীতির উপর আমল করতেন এবং নিজের গভর্নরদেরকেও এ নীতি পালনের নির্দেশ দিতেন।

📘 হাদিস আখলাকুন নবী সাঃ > 📄 উম্মতের প্রতি নবী (সা)-এর সহানুভূতি সম্পর্কিত রিওয়ায়াতসমূহ

📄 উম্মতের প্রতি নবী (সা)-এর সহানুভূতি সম্পর্কিত রিওয়ায়াতসমূহ


١٥٦ عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيُّ الله كَانَ يَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ وَهُوَ فِي الصَّلَاةِ فَيَقْرَا بِالسُّورَةِ الْقَصِيرَةِ وَالسُّورَةِ الْخَفِيفَةِ -

১৫৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ সালাতরত অবস্থায় যখন কোন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতেন তখন (শিশুটির মায়ের মনে কোন অস্থিরতার সৃষ্টি হতে পারে এ আশংকায় তিনি সালাত সংক্ষিপ্ত করে) ছোট একটি আয়াত কিংবা ছোট একটি সূরা তিলাওয়াতের মাধ্যমে সালাত শেষ করে নিতেন।

١٥٧ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ وَأَبِي سَعِيدِ الْخُدْرِى قَالَا صَلَّى بِنَا رَسُولُ اللهِ ﷺ صَلَاةَ الْغَدَاةِ وَسَمِعَ بُكَاءَ الصَّبِيِّ فَخَفَّفَ الصَّلَاةَ، فَقِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ ﷺ خَفَّقْتَ هَذِهِ الصَّلاةَ الْيَوْمَ فَقَالَ إِنِّي سَمِعْتُ بُكَاءَ صَبِي فَخَشِيْتُ أَنْ يَفْتِنَ أُمُّهُ -

১৫৭. হযরত আবূ হুরায়রা ও হযরত আবু সাঈদ খুদ্রী (রা) থেকে বর্ণিত, তাঁরা বলেন, একবার নবী আমাদেরকে নিয়ে ফজরের সালাত পড়ছিলেন। সালাত পড়ানো কালে তাঁর কানে একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ পৌঁছল। নবী তখন সালাত সংক্ষিপ্ত করে দেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো যে, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আজ আপনি সালাতকে এতটুকু সংক্ষিপ্ত করলেন? উত্তরে তিনি ইরশাদ করেন, আমি সালাতরত অবস্থায় যখন কোন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনি তখন আমার আশংকাবোধ হয়, হয়ত শিশুটির মা সালাতরত অবস্থায় পেরেশানীতে পড়বে। (এ কারণে আমি সালাত সংক্ষিপ্ত করে দিয়েছি।)

ফায়দা : উল্লিখিত হাদীসদ্বয়ের অর্থ সুস্পষ্ট। গ্রন্থকার এখানে উম্মতের প্রতি নবী -এর মনে কতটুকু মায়া ও ভালবাসা ছিল এবং তাদের প্রতি তিনি কতটুকু দরদ ও সহানুভূতি পোষণ করতেন তার বর্ণনা পেশ করেছেন। এ ধরনের হাদীসগুলি থেকে বোঝা যায় যে, নবী তাঁর উম্মতের জন্য কতখানি মায়া ও ভালবাসা এবং কতখানি দরদ ও সহানুভূতি রাখতেন। ফজরের সালাতে দীর্ঘ কিরাআত পাঠ করা মুস্তাহাব। এটিই ছিল ফজরের সালাতে নবী -এর নিয়ম। কিন্তু তিনি একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনে কেবল এ কারণে যে, এই শিশু ও শিশুটির সালাতরত মায়ের মনে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে সে জন্য নিজের নিয়ম ভঙ্গ করে সালাত সংক্ষিপ্ত করে নিতেন। যেন সালাত দীর্ঘ হওয়ার কারণে শিশু ও শিশুর মাকে অস্থির হতে না হয়।

বস্তুত মানবীয় গুণাবলির মধ্যে মায়া-মমতা একটি মহৎ গুণ এবং আল্লাহ্ তা'আলার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয় একটি অভ্যাস। এর পরিধি অনেক ব্যাপক। মায়া-মমতা ও ভালবাসার সম্পর্ক কেবল নিজের পরিবার-পরিজন ও সন্তান-সন্ততির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সকল প্রিয়জন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, অধস্তন কর্মচারী, শিষ্য ও গুরু নির্বিশেষে সকল সৃষ্ট জগতের সঙ্গে জড়িত। স্বজনদের সঙ্গে হোক আর পরজনদের সঙ্গে হোক মানুষ যখন এ মায়া-মমতাকে নিজের আদর্শ ও অভ্যাসে পরিণত করে এবং সৃষ্ট জীবের সহিত সর্বদা কোমল আচরণ করেন তখন তিনি নিজেও যেমন শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারেন তেমনি অন্যদের জন্যও শান্তি ও আনন্দপূর্ণ জীবন যাপনের কারণ হিসাবে পরিগণিত হন। এ ধরনের সদাচার দ্বারা গোটা সমাজের মধ্যে পারস্পরিক মায়া-মমতা, ভ্রাতৃত্ব, মান-সম্মান রক্ষা ও কল্যাণ কামনার এমন একটি সুন্দর পরিবেশ গড়ে উঠে যা আল্লাহ্ পাকের নিকট খুবই পছন্দনীয়। আর যে ব্যক্তির কারণে এ পরিবেশ গড়ে উঠে তিনি আল্লাহ্ পাকের বাণী ‘ سَبَقَتْ رَحْمَتِى عَلَى غَضَبِي )আমার দয়া ও অনুগ্রহ আমার ক্রোধ ও গযবের উপর প্রবল হয়ে থাকে)-এর প্রকাশস্থল হিসাবে হন। আমাদের পরম অনুগ্রহকারী সারা বিশ্বের রহমত নবী তাঁর নিম্নোক্ত বাণীতে আমাদেরকে এদিকে পথনির্দেশ করেছেন।

হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ্র নিকট থেকে নম্রতা ও কোমল আচরণ নীতির পরিপূর্ণতা লাভে সক্ষম হয়েছে সে ইহকাল ও পরকাল উভয় জাহানের সকল কল্যাণের পূর্ণতা লাভ করেছে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মায়া-মমতা ও কোমল আচরণ গুণ থেকে বঞ্চিত সে ইহকাল ও পরকাল উভয় জাহানের যাবতীয় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত।” (ইমাম বাগাভী (র) সংকলিত শারহুস্ সুন্নাহ্)।

١٥٨ عَنْ مَالِكِ بْنِ الْحُوَيْرِثِ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ وَ رَحِيمًا رَفِيقًا أَقْمَنَا عِنْدَهُ عِشْرِينَ لَيْلَةً فَظَنَّ إِنَّا قَدْ اسْتَقْنَا فَسَأَلَنَا عَمَّنْ تَرَكْنَاهُ مِنْ أَهْلِنَا فَأَخْبَرْنَاهُ فَقَالَ النَّبِيُّ ارْجِعُوا إِلَى أَهَالِيْكُمْ فَأَقِيمُوا فِيهِمْ .

১৫৮. হযরত মালিক ইবন হুয়ায়রিস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ছিলেন অতিশয় কোমল-প্রাণ, অতীব দয়ালু ও সহানুভূতিশীল। আমরা স্বগোত্রীয় একটি প্রতিনিধি দলের সাথে বিশ দিন পর্যন্ত তাঁর সান্নিধ্যে অবস্থান করেছিলাম। তখন তাঁর মনে হলো, হয়তো আমাদের মনে বাড়ি ফিরে যাওয়ার আগ্রহ সৃষ্টি হয়ে থাকবে। কাজেই তিনি আমাদেরকে ডাকলেন এবং বাড়িতে আমাদের কারা কারা আছে জিজ্ঞেস করলেন। আমরা তাঁকে বিস্তারিত জানালাম। তখন তিনি ইরশাদ করেন : এবার তোমরা নিজ নিজ পরিবার- পরিজনের কাছে ফিরে যাও এবং সেখানেই স্থায়িভাবে অবস্থান কর (এবং দীনের প্রচার ও প্রসারের কাজ করে যাও)।

ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায় যে, নবী লোকজনের মানসিক অবস্থার প্রতি কতটুকু সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। তা ছাড়া আরো বোঝা যায় যে, মানুষের জন্য তাঁর প্রাণে কতটুকু দয়া ও মমতা বিদ্যমান ছিল। আর এ কারণেই পবিত্র কুরআনে তাঁকে رَحْمَةُ الْعَالَمِينَ' উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। স্বয়ং তিনি তাঁর নিজের ব্যাপারে ইরশাদ করেছেন: أَنَا رَحْمَةُ مُهْدَاةُ -আমি সৃষ্ট জাহানের হিদায়েতের জন্য প্রেরিত রহমত।' সুবহানাল্লাহ্!

١٥٩ عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ وَإِذَا فَقَدَ الرَّجُلُ مِنْ إِخْوَانِهِ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ سَأَلَ عَنْهُ فَإِنْ كَانَ غَائِباً دَعَا لَهُ وَإِنْ كَانَ شَاهِدًا زَارَهُ وَإِنْ كَانَ مَرِيضًا عَادَهُ -

১৫৯. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যদি একাধারে তিনদিন কোন মুসলিম ভাইয়ের সাক্ষাৎ না পেতেন তা হলে তার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। সে যদি সফরে আছে বলে জানতেন তাহলে তার জন্য দু'আ করতেন। আর যদি সে (মদীনায়) উপস্থিত থাকতো (অথচ কোন অপারগতার কারণে হাজির হতে পারছে না) তা হলে তিনি নিজে তার সাক্ষাতের জন্য যেতেন। আর যদি লোকটি অসুস্থ বলে জানতেন তা হলে তিনি সেখানে গিয়ে তার সেবা-শুশ্রূষা করতেন।

ফায়দা : এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, নবী নিজের সঙ্গী ও পরিচিতদের সাথে কতখানি স্নেহপূর্ণ ও আন্তরিক, মনজয় ও খোঁজ-খবরের আচরণ করতেন। নবুওয়াতের গুরু দায়িত্ব পালনে সর্বদা ব্যাপৃত ও মশগুল থাকা সত্ত্বেও তিনি উপস্থিত ও অনুপস্থিত প্রতিটি সঙ্গীর ব্যাপারে পূর্ণ খবরাখবর রাখতেন এবং প্রত্যেকের জন্য উদার আচরণ প্রদর্শন করতেন। নবী-এর এই উন্নত চরিত্র মাধুরী বর্বর নির্মম আরব জাতির অন্তরে এমন প্রীতি ও মমতার সৃষ্টি করেছিল যার উপমা জগতের কোথাও পাওয়া যায় না। সাহাবীগণ তাঁর জন্য ছিলেন নিবেদিত-প্রাণ। ঘোরতর যুদ্ধ চলাকালে তাঁরা নবী-কে আড়ালে রেখে শত্রুর সকল তীর নিজেদের বুক পেতে নিতেন। নবী-এর যেকোন আহ্বানে তাৎক্ষণিক 'লাব্বায়ক' (আমি হাজির, আমি হাজির) বলে সাড়া দিতেন। মহান আল্লাহ্ আমাদের সকলকে এই মহান নবী-এর অনুপম স্বভাব-চরিত্র এবং তাঁর সুন্দরতম রীতি-নীতি ও কাজকর্মের পূর্ণ অনুসরণের শক্তি দান করুন।

١٦٠. عَنْ عَلِيِّ بْنِ حُسَيْنِ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ صَلَّى صَلَاةً فَعَجَلَ فِيْهَا، فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ إِنَّمَا عَجَلْتُ أَنِّي سَمِعْتُ صَبِيًّا يَبْكِي فَخَشِيْتُ أَنْ يَشُقَّ ذَلِكَ عَلَى أَبْوَيْهِ

১৬০. হযরত আলী ইব্‌ন হুসাইন (রা) থেকে বর্ণিত যে, একবার নবী সালাত পড়ালেন এবং সালাত খুব দ্রুত শেষ করলেন। তারপর বললেন: আমি সালাত ত্বরা করে শেষ করার কার হলো যে, সালাতে আমি যখন কোন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনি তখন আমার আশঙ্কা হয় যে, শিশুটির এ কান্নার দরুন তার মাতাপিতার মনে কোন কষ্টের উদ্রেক না হয়।

١٦١. عَنْ أَنَسٍ أَنَّ أَعْرَابِيًّا أَتَى النَّبِيَّ ﷺ فَسَأَلَهُ وَعَلَيْهِ بُرْدٌ فَجَذَبُهُ فَشَقَّ الْبُرْدَ حَتَّى بَقِيْتِ الْحَاشِيَةُ فِي عُنُقِ النَّبِيِّ ﷺ فَأَمَرَ لَهُ النَّبِيُّ ﷺ بِشَيْ

১৬১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক বেদুঈন নবী -এর দরবারে হাজির হয়ে কিছু প্রার্থনা করল। নবী একটি চাদর পরিহিত ছিলেন। লোকটি প্রার্থনার আতিশয্যে তাঁর চাদর ধরে এত জোরে টান দিলো যে, চাদরটি ফেঁড়ে গিয়ে একপার্শ্ব নবী-এর কাঁধের উপর ঝুলতে থাকে। নবী লোকটির এই (অসৌজন্যমূলক) আচরণ সত্ত্বেও তাকে কিছু দান করতে নির্দেশ দেন।

ফায়দা: আলোচ্য হাদীসের অর্থ সুস্পষ্ট। এ হাদীস থেকে অনুমান করা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ নিজের উম্মতের প্রতি কতটুকু দয়ালু এবং কতটুকু ক্ষমাশীল ছিলেন। একজন রুক্ষ প্রকৃতির বেদুঈন যে প্রার্থনা করতেও শিখেনি তারপর আবার দু'জাহানের সরদার মহানবী-এর সাথে এহেন অসৌজন্যমূলক আচরণ যা কেবল তাঁরই মান মর্যাদা হানিকর ময় বরং যেকোন ভদ্রলোকের পক্ষেও অসহনীয়। কিন্তু নবী এই রুক্ষ লোকটির সাথে ক্ষমাশীলতা এবং দয়াপূর্ণ আচরণ করেন; যেভাবে তিনি অন্য লোকদের সাথে আচরণ করে থাকেন। বস্তুত উন্নত চরিত্রের এই সুউচ্চ আসন তিনি ব্যতিরেকে অন্য কোন মানুষের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। একমাত্র তাঁরই পবিত্র সত্তা এই পদমর্যাদার পরিপূর্ণ ধারক। এ কারণে কুরআনে হাকীমের মধ্যে তাঁর সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে : إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ (হে নবী) নিশ্চয়ই আপনি উন্নত চরিত্রের অধিকারী। আল্লাহ্ তা'আলা আমাদের সকলকে উন্নত চরিত্র অবলম্বনের তাওফীক দান করুন। আমীন!

١٦٢. عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ قَالَ بَعَثَنِي رَسُولُ اللهِ ﷺ إِلَى الْيَمَنِ فَقَالَ يَا مُعَاذُ إِذَا كَانَ فِي الشَّتَاءِ فَغَلِسُ بِالْفَجْرِ وَاطِلِ الْقِرَاءَةَ قَدْرَ مَا يُطِيقُ النَّاسُ وَلَا تُمِلْهُمْ ، فَإِذَا كَانَ الصَّيْفُ فَأَسْفِرُ بِالْفَجْرِ فَإِنَّ اللَّيْلَ قَصِيرٌ وَالنَّاسِ يَنَامُوْنَ فَأَمْهِلْهُمْ حَتَّى يَدَارَكُوا -

১৬২. হযরত মুআয ইবন জাবাল (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাকে ইয়ামেনে (গভর্নর নিযুক্ত করে) পাঠালেন এবং বলেন, হে মুআয! শীতের মৌসুমে তুমি ফজরের সালাত শুরু ওয়াক্তে পড়াবে। আর সালাতে কিরাআত এতটুকু দীর্ঘ করবে যতটুকু লোকজনের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হয়। অতিশয় দীর্ঘ কিরাআতের কারণে মানুষের মনে যেন বিরক্তি না আসে। আর গরমের মৌসুমে তুমি ফজরের সালাত শেষ ওয়াক্তে পড়াবে। কেননা (গরম কালে) রাত ছোট হয়ে থাকে মানুষের ঘুম শেষ হয় না। কাজেই তাদেরকে এতটুকু সুযোগ দেবে যাতে তারাও সালাতে অংশগ্রহণে সক্ষম হয়।

ফায়দা: আলোচ্য হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ যেভাবে জাগতিক সকল কাজে উম্মতের প্রতি দয়া ও কোমলতার আচরণ করতেন অনুরূপ ইবাদত বন্দেগী ইত্যাদি আদায়ের ক্ষেত্রেও তিনি তাদের জন্য সহজসাধ্য পদ্ধতি অবলম্বনের প্রতি দৃষ্টি রাখতেন। সহ্য করা যায় না এমন কোন কঠোরতার দরুন ইবাদত করতে তাদের মনে যেন বিরক্তি না আসে সে জন্য তিনি সচেতন থাকতেন। এমন কি তিনি সালাতের মত উচ্চমানের ইবাদত, যার ব্যাপারে নিজেই ইরশাদ করেছেন যে, "আমার নয়নের প্রশান্তি হলো সালাত," ব্যাপারেও তিনি সহজলভ্যতা ও সহজসাধ্যতার নীতি পালনের নির্দেশ দিতেন। শীত ও গরমের মৌসুম এবং রাত দিন ছোট বড় হওয়ার প্রতি দৃষ্টি রাখার পেছনে এটিই হলো মূল রহস্য—যেন কঠোরতা দেখে শংকিত হয়ে কেউ দীনাদারী ও ইবাদত বন্দেগী ছেড়ে না বসে। আল্লাহ্ তা'আলা এই দীনের বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করে ইরশাদ করেন : وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّيْنِ مِنْ حَرَجٍ مِنْةَ أَبِيْكُمْ إِبْرَاهِيمَ এই দীনের মাঝে সংকীর্ণতার কোন কিছু নেই, এটি তোমাদের ঊর্ধ্বতন পুরুষ ইব্রাহীমের দীন" (সূরা হাজ্জ : ৭৮)

١٦٣. عَنْ جَابِرٍ قَالَ غَزَا رَسُولُ اللهِ ﷺ إِحْدَى وَعِشْرِينَ غَزْوَةٌ بِنَفْسِهِ، شَهِدْتُ تِسْعَ عَشْرَةَ غِبْتُ عَنِ اثْنَتَيْنِ، فَبَيْنَا أَنَا مَعَهُ فِي بَعْضٍ غَزَوَاتِهِ إِذَا أَعْنِي فَأَضْحَى تَحْتَ اللَّيْلِ فَبَرَكَ وَكَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فِي آخِرِنَا فِي أُخْرَيَاتِ النَّاسِ فَيَزْجِي الضَّعِيفَ وَيَرْدِفُ وَيَدْعُولَهُمْ فَانْتَهَى إِلَى وَأَنَا أَقُولُ يَا لَهَفَ أَمْتَاهُ وَمَا زَالَ لَنَا نَاضِحَ سُوْءٍ، فَقَالَ مَنْ هُذَا ؟ قُلْتُ أَنَا جَابِرُ بِأَبِي وَأُمِّي يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ مَا شَأْنُكَ ؟ قُلْتُ أَعْيِي نَاضِحْي فَقَالَ أَمَعَكَ عَصًا قُلْتُ نَعَمْ فَضَرَبَهُ ثُمَّ بَعَثَهُ ثُمَّ أَنَاخَهُ وَوَطِئَ عَلَى ذِرَاعِهِ وَقَالَ ارْكَبُ فَرَكِبْتُ فَسَايَرْتُهُ فَجَعَلَ جَمَلِي يَسْبِقُهُ فَاسْتَغْفَرَ لِي تِلْكَ اللَّيْلَةَ خَمْسًا وَعِشْرِينَ مَرَّةً - فَقَالَ لِي مَا تَرَكَ عَبْدُ اللَّهِ مِنْ الْوَادِ ؟ يَعْنِي آبَاهُ قُلْتُ سَبْعَ نِسْوَةٍ قَالَ أَتَرَكَ عَلَيْهِ دَيْنَا قُلْتُ نَعَمْ قَالَ فَإِذَا قَدِمْتَ الْمَدِينَةَ فَقَاطِعُهُمْ فَإِنْ أَبَوْا فَإِذَا حَضَرَ جِدَادَ نَخْلِكُمْ فَاذِنِي وَقَالَ لِي هَلْ تَزَوَّجْتَ ؟ قُلْتُ نَعَمْ قَالَ بِمَنْ ؟ قُلْتُ بِفَلَانَةِ بِنْتِ فُلَانٍ بِأَيِّمٍ كَانَتْ بِالْمَدِينَةِ قَالَ فَهَلاً فَتَاة تُلاعِبُهَا وَتُلاعِبُكَ ؟ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ كُنَّ عِنْدِي نِسْوَةٌ خَرَقَ يَعْنِي أَخْوَاتُهُ فَكَرِهْتُ أَنْ أَتَيْهِنَّ بِامْرَأَةٍ خَرْقَاءَ ، فَقُلْتُ هَذِهِ أَجْمَعُ الأَمْرِي قَالَ فَقَدْ أَصَبْتَ وَرَشَدْتَ فَقَالَ بِكُمْ اَشْتَرَيْتَ جَمَلَكَ قُلْتُ بِخَمْسٍ أَوَاقٍ مِنْ ذَهَبٍ قَالَ قَدْ أَخَذْنَاهُ ، فَلَمَّا قَدِمَ الْمَدِينَةَ أَتَيْتُهُ بِالْجَمَلِ فَقَالَ يَا بِلالُ : أَعْطِهِ خَمْسَ أَوَاقٍ مِنْ ذَهَبٍ يَسْتَعِينُ بِهَا فِي دَيْنِ عَبْدِ اللَّهِ وَزِدْهُ ثَلَاثًا وَارْدُدْ عَلَيْهِ جَمَلَهُ ، قَالَ هَلْ قَاطَعْتَ غُرْمَاءَ عَبْدِ اللَّهِ ؟ قُلْتُ لَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ أَتَرَكَ وَفَاء ؟ قُلْتُ لَا قَالَ لَا عَلَيْكَ إِذَا حَضَرَ جِدَادَ نَخْلِكُمْ فَاذِنِي فَاذِنْتُهُ فَجَاءَ فَدَعَا لَنَا فَاسْتَوْفِي كُلِّ غَرِيم مَا كَانَ يَطْلُبُ تَمَرًا وَفَاء وَبَقِيَ لَنَا مَا كَنَّا نَجِدُ وَأَكْثَرَ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ارْفَعُوا وَلَا تَكِيلُوا فَرَفْعَنَا فَأَكَلْنَا مِنْهُ زَمَانًا .

১৬৩. হযরত জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ একুশটি যুদ্ধে স্বয়ং অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে উনিশটিতেই আমি শামিল থাকি। অবশিষ্ট দু'টির মধ্যে উপস্থিত ছিলাম না। একবার আমি নবী -এর সঙ্গে যুদ্ধে যাত্রা করেছিলাম। এমন সময় রাত্রিকালে আমার উটটি হাঁটতে অক্ষম হয়ে পড়ল। নবী পেছনের লোকজনের সাথে আমাদের পেছনে আসছিলেন। পেছনের লোকজনের সাথে তাঁর আসার উদ্দেশ্য ছিল এই যে, তিনি পেছন থেকে দুর্বলদেরকে চলতে সাহায্য করতেন, প্রয়োজনের মুহূর্তে তাদেরকে নিজের বাহনে আরোহণ করিয়ে নিতেন এবং দুর্বলদের জন্য দু'আ করতে থাকতেন। (পথ চলতে চলতে আমিও পেছনে পড়ে গিয়েছিলাম) তিনি যখন আমার কাছে আসলেন আমি তখন নিজের দুর্বলতা ও অক্ষমতার দরুন নিজে নিজেকে তিরস্কার করছিলাম। হায়! আমার মায়ের বিনাশ! কেননা আমার উট অক্ষম হয়ে গিয়েছে। এ সময় নবী জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনার প্রতি আমার মাতাপিতা কুরবান হোক, আমি জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ্। তিনি বললেন, তোমার কি হয়েছে? আমি বললাম আমার উটটি (ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে বসে গেছে আর দাঁড়াচ্ছে না)। তিনি বললেন, তোমার হাতে (হাঁকিয়ে নেওয়ার কোন) লাঠি আছে কি? আমি বললাম, জী হ্যাঁ, আছে।

তখন তিনি লাঠির সাহায্যে উটটিকে প্রহার করলেন, এটি দাঁড়াল। তারপর পুনরায় উটটিকে বসিয়ে সম্মুখের পা দু'টি সজোরে চিপে দিলেন। তারপর আমাকে বললেন, যাও, আরোহণ কর। আমি উটটির পিঠে আরোহণ করলাম এবং চালাতে থাকলাম। দেখলাম, নবী -এর মুবারক হাতের স্পর্শের কারণে আমার উটটি তাঁর উট থেকেও আগে আগে চলতে শুরু করেছে। নবী সে রাতে আমার পঁচিশবার মাগফিরাতের দু'আ করেন। তারপর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পিতা আবদুল্লাহ মৃত্যুকালে কতজন সন্তান রেখে গিয়েছেন? আমি বললাম, সাত কন্যা। তিনি বললেন, তার উপর কি কিছু ঋণও ছিল? আমি বললাম, জী হ্যাঁ। তিনি বললেন, এবার মদীনায় ফিরে গিয়ে ঋণদাতাদের সাথে একটা ফয়সালা করে নিও। তারা যদি তোমার ফয়সালা মানতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে খেজুর আহরণের মৌসুমে তুমি আমাকে সংবাদ দিবে। তারপর তিনি আমার প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি বিবাহ করেছ? আমি বললাম, জী হ্যাঁ। তিনি বললেন, কাকে বিবাহ করেছ? আমি বললাম, অমুকের বিধবা কন্যা। তারা মদীনাতেই বসবাস করে। তিনি বললেন, কোনো কুমারীকে বিয়ে করলে না কেন? তাহলে সে তোমার জন্য এবং তুমি তার জন্য অধিকতর মনস্তুষ্টি ও ভালবাসার কারণ হতে। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্। আমাদের ঘরে অনভিজ্ঞ কুমারীরা আছে। (অর্থাৎ আমার ছোট বোনেরা সকলে কুমারী) কাজেই আমি তাদের সমবয়সের আরেকজন কুমারীকে ঘরে আনা পছন্দ করিনি। আমি সিদ্ধান্ত করেছিলাম কোন একজন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মহিলাকে ঘরে আনা হলে আমার পারিবারিক কাজকর্মে অধিকতর কল্যাণজনক প্রমাণিত হবে। নবী বললেন, তাহলে তুমি ঠিক কাজ করেছ এবং উত্তম পথ অবলম্বন করেছ। তারপর নবী আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, এ উট তুমি কত মূল্যে খরিদ করেছিলে? আমি বললাম, পাঁচ উকিয়া স্বর্ণের বিনিময়ে। তিনি বললেন, উটটি আমি তোমার কাছ থেকে খরিদ করে নিলাম। এরপর মদীনা শরীফ পৌঁছে আমি উটটি নবী-এর খেদমতে পেশ করে দেই। তিনি হযরত বিলালকে ডেকে বললেন, বিলাল তুমি জাবিরকে পাঁচ উকিয়া স্বর্ণ পরিশোধ কর। সে (তার পিতা হযরত) আবদুল্লাহ্র ঋণ শোধে এ অর্থ ব্যয় করবে। তাকে আমার পক্ষ থেকে অতিরিক্ত আরো তিন উকিয়া স্বর্ণ দিয়ে দিবে এবং তাকে তার উটটিও ফিরিয়ে দিবে।

তারপর নবী আমাকে বললেন, তুমি তোমার পিতা আবদুল্লাহ্র ঋণদাতাদের সঙ্গে কথাবার্তা ঠিক করেছ কি? আমি বললাম, জী না। নবী বললেন, আবদুল্লাহ্ কি এতটুকু সম্পদ রেখে গেছে যা দিয়ে ঋণ শোধ করা সম্ভব? আমি বললাম, জী না। তিনি বললেন, ঠিক আছে কোন অসুবিধা হবে না। তোমাদের বাগানে খেজুর আহরণের সময় ঘনিয়ে এলে আমাকে সংবাদ দিও। সে মতে আমি (সময়মত) নবীকে স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি আগমন করলেন এবং আমাদের জন্য দু'আ করলেন। (তাঁর সে দু'আর বরকতে) খেজুর থেকে ঋণদাতা সকলের পাওনা পরিপূর্ণভাবে শোধ করে দেওয়া হলো। তারপর আমাদের হাতে সেই পরিমাণ খেজুর অবশিষ্ট রয়ে গেল যতটুকু আমরা অন্যান্য বছর আহরণ করতাম। এমনকি অবশিষ্ট অংশ অন্যান্য বছরের তুলনায় পরিমাণে কিছু বেশিও ছিল। তারপর নবী আমাকে বললেন, এ খেজুরগুলি ঘরে নিয়ে যাও। তবে দেখ এগুলিকে পরিমাপ করবে না। সে মতে আমার উক্ত খেজুর বহুদিন পর্যন্ত খেতে থাকি।

ফায়দা: আলোচ্য হাদীসে প্রিয় নবী-এর দু'টি মুজিয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। একটি হলো, তাঁর দু'আর বরকতে ক্লান্ত হয়ে পড়া অক্ষম একটি উট পুনরায় শক্তি লাভ করে এবং দ্রুত গতিতে চলতে আরম্ভ করে। আর অপরটি হলো, তাঁর বরকতে সামান্য পরিমাণের খেজুর এত অধিক পরিমাণের হলো যে, তা থেকে সকল ঋণ পরিশোধ করেও অতিরিক্ত রয়ে গেল। এমন কি অন্যান্য মৌসূমে যে পরিমাণ খেজুর জাবির (রা) বাগান থেকে পেতেন তার চেয়েও বেশি রয়ে গেল।

উল্লেখিত হাদীসটি বর্ণনা করা গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হলো উম্মতের প্রতি প্রিয় নবী -এর মমত্ববোধ ও আন্তরিকতার দৃষ্টান্ত পেশ করা। বিশেষত তিনি সহায়-সম্বলহীন দরিদ্র মানুষের সাথে কতটুকু সহানুভূতি প্রদর্শন এবং তাদেরকে কত সাহায্য করতেন এ কথার প্রমাণ পেশ করা। এ হাদীসে সুস্পষ্ট বিবরণ বিদ্যমান যে, প্রিয় নবী হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ্ (রা)-কে কেবল মৌখিকভাবেই সহানুভূতি প্রদর্শন করে ক্ষান্ত হননি বরং তাঁর পিতার রেখে যাওয়া ঋণ পরিশোধের জন্য আর্থিকভাবেও সাহায্য করেন। তিনি তাঁর বাগানে উৎপাদিত খেজুরে বরকতের জন্য দু'আ করেন। ফলে আল্লাহ্ পাক তাঁর ঋণসমূহ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন। অধিকন্তু তাঁর পরিবারের আহারের জন্য তাঁর কাছে যথেষ্ট পরিমাণে উদ্বৃত্তও থেকে যায়।

বর্ণিত হাদীসের ঘটনাটির মধ্যে সমবেদনা ও আর্থিক সাহায্যের এ বিষয়টি মনস্তত্বের দিক থেকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষামূলক। এখানে দু'জাহানের রহমত প্রিয় নবী হযরত জাবির (রা)-এর মন থেকে অনুগ্রহ প্রাপ্তির বোঝা লাঘব করার উদ্দেশ্যে নামমাত্র মূল্যে তাঁর উটটি খরিদ করেন-যেন হযরত জাবির (রা)-কে এ উটের মূল্য গ্রহণে কোন সংকোচ বোধ না করেন। তাছাড়া মদীনায় পৌঁছে উটের মূল্য প্রদানের সময় অতিরিক্ত আরো তিন উকিয়াসহ বিক্রীত উটটিও তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বস্তুত হযরত জাবিরের উট খরিদ করা প্রিয় নবী-এর উদ্দেশ্য ছিল না। এ কারণে জাবির (রা) যখন উটের দ্বারা মদীনা পৌঁছা পর্যন্ত আরোহণ করার শর্ত আরোপ করেন তখন মহানবী সেই শর্ত মেনে নেন। অথচ বাহ্যিকভাবে এ ধরনের শর্তারোপ নিষিদ্ধ। কেননা অন্য হাদীসে বলা হয়েছে, نَهَى عَنْ بَيْرٍ وَشَرْطَ নবী শর্তের সাথে কোন বেচাকেনা করতে নিষেধ করেছেন কাজেই যেহেতু প্রিয় নবী -এর মূল উদ্দেশ্য উট খরিদ করা নয়, বরং উদ্দেশ্য ছিল উটের দাম বলে হযরত জাবিরকে আর্থিক সাহায্য করা। আর একারণেই তিনি উপরোক্ত শর্ত মেনে নিতে কোন দ্বিধা প্রকাশ করেন নি। তারপর মদীনা পৌঁছে তিনি কেবল উটের মূল্যই নয় বরং উটসহ অতিরিক্ত আরো তিন উকিয়া স্বর্ণ তাকে প্রদান করেন। এভাবে এ উম্মতের জন্যও কর্তব্য যে, তারা যখন নিজেদের কোন অভাবী ঋণগ্রস্ত ভাইয়ের আর্থিক সাহায্য করার ইচ্ছা করবেন তখন এমন পন্থা অবলম্বন করবেন যার ফলে অভাবী ব্যক্তি সাহায্য গ্রহণ করতে সংকোচবোধ না করেন এবং যথাসম্ভব অভাবী লোকটি অনুগ্রহ ভাজন হওয়ার বোঝা থেকে যেন হাল্কা রাখেন।

١٦٤. عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ وَاللَّهِ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ إِنْ كُنْتُ لَاشُدُّ الْحَجَرَ عَلَى بَطْنِي مِنَ الْجُوعِ وَإِنْ كُنْتُ لَاعْتَمِدُ بِيَدَيَّ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْجُوعِ وَلَقَدْ قَعَدْتُ يَوْمًا عَلَى طَرِيقِهِمْ الَّذِي يَخْرُجُونَ فِيهِ فَمَرَّ بِي أَبُو بَكْرٍ فَسَأَلْتُهُ عَنْ آيَةٍ مِنْ كِتَابِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مَا أَسْأَلُهُ عَنْهَا إِلَّا لِيَسْتَبْتَعْنِي فَمَرَّ وَلَمْ يَفْعَلْ ، ثُمَّ مَرَّ عُمَرُ فَسَأَلْتُهُ عَنْ آيَةٍ مِنْ كِتَابِ اللَّهِ مَا سَأَلْتُهُ إِلَّا لِيَسْتَبْتَعَنِي فَمَرَّ وَلَمْ يَفْعَلْ ثُمَّ مَرَّ أَبُو الْقَاسِمِ ﷺ فَعَرَفَ مَا فِي نَفْسِي وَمَا فِي وَجْهِي فَتَبَسَّمَ وَقَالَ أَبَا هُرَّ الْحَقِّ فَاتَّبَعْتُهُ فَدَخَلَ فَاسْتَأْذِنَتْ فَأَذِنَ لِي فَوَجَدَ لَبَنًا فِي قَدْحٍ فَقَالَ لِأَهْلِهِ أَنَّى لَكُمْ هُذَا اللَبَنُ ؟ قَالُوا أَهْدَاهُ لَكَ فُلَانُ، فَقَالَ يَا أَبَاهُرْ انْطَلِقِ إِلَى أَهْلِ الصُّفَةِ فَادْعُهُمْ لِي قَالَ فَاحْزَنَنِي ذَلِكَ وَأَهْلُ الصُّفَّةِ أَصْيَافُ الْإِسْلَامِ لَا يَاوُونَ إِلَى أَهْلِ وَلَا مَالٍ إِذَا جَاءَتْهُ أَرْسَلَ بِهَا إِلَيْهِمْ وَلَمْ يَزْرَا مِنْهَا شَيْئًا وَإِذَا جَاءَتْهُ هَدْيَةُ أَرْسَلَ إِلَيْهِمْ فَاشْرَكَهُمْ فِيهَا فَأَصَابَ مِنْهَا قَالَ فَأَحْزَنَنِي إِرْسَالُهُ إِيَّايَ وَقُلْتُ أَرْجُو أَنْ أَشْرَبَ مِنْ هَذَا اللَّبْنِ شَرْبَةً أَتَغَدَّى بِهَا فَمَا يُغْنِي عَنِّي هُذَا اللَّبَنُ فِي أَهْلِ الصُّفَةِ وَأَنَا الرَّسُولُ ، فَإِذَا جَاؤُا أَمَرَنِي فَكُنْتُ أَنَا أعَاطِيْهِمْ وَلَمْ يَكُنْ مِنْ طَاعَةِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَطَاعَةِ رَسُولِهِ بُدٌّ ، فَانْطَلَقْتُ إِلَيْهِمْ فَدَعَوْتُهُمْ فَأَقْبَلُوا فَاسْتَأْذَنُوا فَأَذِنَ لَهُمْ فَأَخَذُوا مَجَالِسَهُمْ مِنَ الْبَيْتِ ، وَقَالَ آبَاهُرُ قُلْتُ لَبَّيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ قُمْ فَأَعْطِهِمْ فَاخَذِ الْقَدْحَ فَاعْطِي الرَّجُلَ حَتَّى يَرْوِي ، ثُمَّ يَرُدُّهُ إِلَى حَتَّى رَوِيَ جَمِيعُ الْقَوْمَ فَانْتَهَيْتُ إِلَى رَسُولِ اللهِ ﷺ فَأَخَذَ الْقَدْحَ فَوَضَعَهُ عَلَى يَدَيْهِ ثُمَّ رَفَعَ رَأْسَهُ فَنَظَرَ إِلَى فَتَبَسَّمَ وَقَالَ أَقْعُدْ فَقَعَدْتُ فَشَرِبْتُ وَقَالَ أَشْرَبْ ، رال يَقُولُ اشْرَبْ حَتَّى قُلْتُ وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ مَا أَجِدُ لَهُ مَسْلَكًا ، قَالَ فَارْنِي فَرَدَدْتُ إِلَيْهِ الإِنَاءَ فَحَمِدَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ شَرِبَ مِنْهُ -

১৬৪. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সেই পবিত্র সত্তার কসম! যিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই যে, আমি (অনেক সময়) ক্ষুধার তাড়নায় নিজের পেটের উপর পাথর বেঁধে রাখতাম। আর (কোন কোন সময়) এই ক্ষুধাজনিত কষ্টের কারণে নিজের দু'হাত দ্বারা মাটির উপর ভর দিয়ে বসে থাকতাম। আল্লাহর শপথ, একদিন এমন হয়ে গিয়েছিলো যে, (মসজিদে নববী থেকে) বেরিয়ে যাওয়ার পথের উপর বসে পড়ি। (যেন আমার ক্ষুধার্ত অবস্থা কারোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে) এ সময় হযরত আবূ বক্র সিদ্দীক (রা) আমার নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি তাঁকে শুধু এ উদ্দেশ্যে যে, তিনি আমাকে সঙ্গে করে (ঘরে) নিয়ে যাবেন এবং কিছু খেতে দিবেন-পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু তিনি আমার প্রকৃত ইচ্ছা কিছুই উপলব্ধি করলেন না। (প্রশ্নটির জবাব দিয়ে) চলে গেলেন। আমাকে আর সঙ্গে করে নিলেন না। অতঃপর (এ পথ দিয়ে) হযরত উমর ইবন খাত্তাব (রা)-এর আগমন ঘটল। আমি তাঁকেও এ উদ্দেশ্য নিয়ে কুরআনে পাকের একটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। (এ আশায় যে) তিনি হয়ত আমাকে সঙ্গে করে ঘরে নিয়ে যাবেন। কিন্তু তিনি আমার প্রকৃত মনোভাবটি উপলব্ধি করলেন না। প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চলে গেলেন। আমাকে আর সঙ্গে করে নিলেন না। এরপর রহমতে আলম আবুল কাসিম এ পথে আগমন করলেন। তিনি আমার চেহারা দেখেই আমার অন্তরের ভাষা উপলব্ধি করে নেন। তিনি স্মিত হেসে বললেন, আবূ হির, আস, আমার সঙ্গে চল। আমি নবী -এর পিছু পিছু চললাম। তিনি উম্মুল মু'মিনীনদের একজনের ঘরে প্রবেশ করলেন। আমি বাহির থেকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে ভিতরে ডেকে নেন। এ সময় তিনি ঘরে এক পেয়ালা দুধ রক্ষিত আছে দেখলেন। জিজ্ঞেস করলেন, এ দুধ তোমার কাছে কোথা থেকে এসেছে? ঘরওয়ালারা বললেন, অমুক ব্যক্তি আপনার জন্য হাদিয়া পাঠিয়েছে। নবী তখন আমাকে বললেন, হে আবূ হির! যাও সুফফার সকলকে ডেকে আনো। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, এ কথা শুনে আমি বড় চিন্তায় পড়ে গেলাম। কেননা আহলে সুফফার সকলেই ইসলাম ও مسلمانوں মেহমান। তাদের কারোর না আছে কোন ঘরবাড়ি আর না কোন পরিবার-পরিজন। সাদাকার যে সকল জিনিস প্রিয় নবীর কাছে আসতো তিনি তা তাদের জন্য পাঠিয়ে দিতেন। তিনি নিজের জন্য এ থেকে কিছুই রাখতেন না। আর তাঁর কাছে যদি হাদিয়ার কোন কিছু আসতো তাহলে সকলকে ডেকে এনে নিজের সঙ্গে আহার করাতেন। তখন প্রিয় নবী নিজেও আহার করতেন, সঙ্গে অন্যরাও আহার করতো। (মোট কথা আহলে সুফ্ফার লোকেরা প্রায়ই অভুক্ত অবস্থায় দু'জাহানের রহমত নবী-এর অপেক্ষায় বসে থাকতেন।) আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, কাজেই নবী-এর আমাকে তাদের ডেকে আনতে পাঠানোর বিষয়টি আমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিলো। আমি মনে মনে ভাবলাম, আশা তো করেছিলাম আমি এ দুধটুকু পান করে কিছুটা স্বস্তি লাভ করবো। কিন্তু আহলে সুফফার সকলের সাথে এই এক পেয়ালা দুধের কতটুকু আমার ভাগ্যে আসবে। আবার যেহেতু আমিই তাঁদেরকে ডেকে আনছি, কাজেই তারা যখন আসবে নবী তখন আমাকেই সকলের মাঝে দুধ বণ্টন করে দিতে নির্দেশ দিবেন। (আমি নিজে রয়ে যাবো সকলের শেষে। কাজেই আমার জন্য কিছু অবশিষ্ট থাকবে কিনা বলা যায় না।)

কিন্তু আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ পালন ব্যতিরেকে কোন গত্যন্তরও নেই। এসব ভেবে আমি সুফাবাসীদের কাছে গেলাম। তাদেরকে ডাকলে তারা সকলে আসলেন। তারপর নবী -এর গৃহে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করলে তিনি অনুমতি দেন। সকলে নিজ নিজ আসনে বসার পর নবী আমাকে বললেন, হে আবূ হির! আমি বললাম, লাব্বাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তিনি বললেন, দাঁড়াও সকলকে একের পর এক দুধের এই পেয়ালা থেকে পান করতে দাও। সে মতে আমি পেয়ালাটি একজন থেকে নিয়ে অন্যজনকে পৌঁছিয়ে দিতে থাকি। তারা প্রত্যেকে তৃপ্তি ভরে পান করার পর পেয়ালা আমাকে ফেরত দিতেন। এভাবে পালাক্রমে আহলে সুফ্ফার সকলেই পেট পূর্ণ করে পান করার পর আমি পেয়ালাটি নিয়ে প্রিয় নবীর কাছে উপস্থিত হই। তিনি পেয়ালাটি নিজের সামনে রাখলেন। তারপর মাথা উপরে তুলে আমার দিকে তাকালেন এবং স্মিত হেসে বললেন, বসে পড়ো। আমি বসে গেলাম। তিনি বললেন, এবার তুমি পান করো। সে মতে আমি পেটভরে দুধ পান করলাম। তিনি পুনরায় আমাকে বললেন, পান করো। ফলে আমি আবার পান করি। (এভাবে তিনি বারবার আমাকে বলতে থাকেন আর আমি পান করতে থাকি।) অবশেষে আমি বললাম, কসম সেই সত্তার! যিনি আপনাকে সত্যসহ নবী বানিয়ে পাঠিয়েছেন, এক ঢোক পরিমাণ দুধ পান করার মতও কোন জায়গা খালি নেই। তিনি বললেন, ঠিক আছে পেয়ালাটি আমাকে দাও। আমি পেয়ালাটি প্রিয় নবীর হাতে তুলে দিলে তিনি মহান আল্লাহ্র প্রশংসা জ্ঞাপন করলেন এবং নিজেও সেই পেয়ালা থেকে পান করলেন।

ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসে প্রিয় নবী-এর এমন অত্যাশ্চর্য একটি মুজিযার বর্ণনা করা হয়েছে যা মানবীয় বুদ্ধি ও উপলব্ধির সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে। এক পেয়ালা দুধ নবী-এর বরকতে এবং তাঁর হাতে প্রকাশিত মুজিযা হিসাবে এত অধিক পরিমাণ হয়েছে যে, ষাট কিংবা সত্তর জন ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত মানুষের একটি দল তা থেকে তৃপ্তিভরে পান করার পরও তা শেষ না হওয়া মানুষের বুদ্ধির অগম্য। বস্তুতঃ মাক্সারে এ ধরনের আরো হাজার হাজার মুজিযা প্রিয় নবী-এর বরহক নবী হওয়ার কারণ করে। হযরত আবূ হুরায়রা (রা), যাকে আহলে সুফ্ফার এক পর্যায়ের নাযিম বলা চলে তিনিও মাত্র এক পেয়ালা দুধে এত সংখ্যক মানুষের জন্য যথেষ্ট হওয়ার বিষয়টি কল্পনা করতে পারেন নি। নিজে নিজের অস্থিরতা ও ব্যাকুলতার অবস্থা অতিশয় সরলতার সাথে ব্যক্ত করে দেন। আল্লাহ্ পাক এ সামান্য দুধে এত অত্যাশ্চর্যজনক বৃদ্ধি ও বরকত প্রদান করেন যে, তা সকলের জন্যই যথেষ্ট হয়ে গেল। বরং কিছু অবশিষ্টও রইল। মনে হয় যেন পেয়ালাটির পরতে পরতে কোন ঝর্ণা বিদ্যমান ছিল যে, মানুষ যতটুকু পান করেছিলো সঙ্গে সঙ্গে ততটুকু আবার পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।

এ হাদীস থেকে আরো বোঝা যায় যে, উম্মতের জন্য প্রিয় নবী ﷺ-এর মনে কতখানি আন্তরিকতা ও দরদ বিদ্যমান ছিলো। তাঁর দরদপূর্ণ দৃষ্টি উম্মতের অন্তরস্থ সূক্ষ্ম অবস্থা ও চিন্তাভাবনাকে তাদের চেহারা গবাক্ষপথ দিয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করত। হযরত আবূ বকর (রা)-এর দৃষ্টি আবূ হুরায়রা (রা)-এর চেহারা ও তার প্রশ্ন করা থেকে যে ভাবকে অনুধাবন করতে পারেননি, হযরত উমরের সচেতন চাহনি যা অনুভব করেনি দয়ার মহাসমুদ্র প্রিয় নবী ﷺ-এর দরদমাখা দৃষ্টি তা সহজেই উপলব্ধি করে নেয়।

এ হাদীস থেকে সবচেয়ে বড় যে কথাটি বোঝা যায় তা হলো অনাহারক্লিষ্ট সাহাবীদের আত্মমর্যাদাবোধ। তাঁরা অনাহার ও দারিদ্রে অকল্পনীয় যাতনা নীরবে সহ্য করতেন। কিন্তু কারোর সামনে তা প্রকাশ করতেন না। কারোর কাছে ভিক্ষা চাওয়া বা হাত পাতা তো কল্পনাই করা যায় না। এরাই হলেন সেসব দারিদ্র ব্যক্তিত্ব যাদের ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ্ পাকের ইরশাদ হলো : لِلْفُقَرَاءِ الَّذِينَ أُحْصِرُوا فِي سَبِيلِ اللهِ لَا يَسْتَطِيعُونَ ضَرْبًا فِي الْأَرْضِ يَحْسَبُهُمُ الْجَاهِلُ أَغْنِيَاءَ مِنْ التَّعَفُّفِ تَعْرِفُهُمْ بِسِيمَاهُمْ لَا يَسْأَلُونَ النَّاسَ إِلْحَافًا - প্রকৃত প্রাপ্য হলো সেসব অভাবগ্রস্ত লোকজনের, যারা আল্লাহ্ পথে এমনভাবে ব্যাপৃত থাকে যে, দেশময় ঘোরাফেরা করার সুযোগ থাকে না। যাচ্ঞা না করার কারণে অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে অভাবমুক্ত বলে ধারণা করে; (হে নবী) আপনি তাদেরকে লক্ষণ দেখেই চিনতে পারেন। তারা মানুষের কাছে নাছোড় হয়ে যাচ্ঞা করে না। (সূরা বাকারা : ২৭৩)

তাদের সম্পর্কে প্রিয় নবী ﷺ ইরশাদ করেন : يَدْخُلُ الْفُقَرَاءُ الْجَنَّةَ قَبْلَ الْأَغْنِيَاء অভাবগ্রস্তরা সম্পদশালীদের সত্তর বছর পূর্বে বেহেস্তে প্রবেশ করবে। (আল-হাদীস)

١٦٥. عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا حَدَّثَ بِالْحَدِيثِ أَوْ سَأَلَ عَنِ الْأَمْرِ كَرَّرَهُ ثَلَاثًا لَيُفْهِمْ وَيُفْهَمَ عَنْهُ -

অতি উত্তম যা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব, যদিও না সে আমল সামান্য পরিমাণের হয়। তারপর তিনি বললেন, আমাকে এখানে সালাত পড়তে কেবল এ আশংকাটিই বারণ করেছে যে, এ ব্যাপারে আবার আমার উপর এমন কোন নির্দেশনা অবতীর্ণ হয়ে যায় যা পালনে তোমরা সক্ষম হবে না।

ফায়দা : ইতিপূর্বে একটি হাদীসের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ তাঁর উম্মতের ব্যাপারে সীমাহীন দরদী ও অতিশয় দয়ালু ছিলেন। এমনকি তিনি তাদের বিভিন্ন ইবাদত পালন ও আমল করার ক্ষেত্রেও সহজসাধ্যতা ও সহজলভ্যতার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখতেন। এই দরদ ও দয়ার কারণেই তিনি রাতের সেই নিয়মিত নফল পড়া বর্জন করেন। এখানে নবী -এর আশংকাবোধ হয়েছিল যে, এভাবে নিয়মিত আদায় করা হলে এ সালাত উম্মতের উপর ফরয হয়ে যেতে পারে। আর তখন তাদের পক্ষে তা পালন করে যাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়বে।

١٦٧. عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ قَالَ بَعَثَنِي رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِلَى الْيَمِنِ وَذَكَرَ الْحَدِيثَ -

১৬৭. হযরত মুআয ইব্‌ন জাবাল (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাকে ইয়ামেনে (গভর্নর নিযুক্ত করে) প্রেরণ করেন। তারপর তিনি পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন।

ফায়দা : এ হাদীসটি জামে তিরমিযী গ্রন্থে পরিপূর্ণ বর্ণিত হয়েছে। সেখানে হযরত মুআয (রা) বলেছেন যে, প্রিয় নবী আমাকে ইয়ামেনের গভর্নর বানিয়ে পাঠান। আমি যখন যাত্রা করলাম তখন তিনি জনৈক ব্যক্তিকে পাঠিয়ে আমাকে পুনরায় ডাকালেন। আমি ফিরে আসার পর তিনি আমাকে বললেন, তুমি নিশ্চয় জান আমি তোমাকে লোক পাঠিয়ে ডেকে এনেছি কেন। তিনি আরো বললেন, দেখ "তুমি আমার অনুমতি ব্যতিরেকে হাদিয়ার নামে মানুষের কাছ থেকে কোন জিনিস গ্রহণ করো না। কেননা এটি খেয়ানতের মাল-এর অন্তর্ভুক্ত। যে ব্যক্তি খেয়ানতের মাধ্যমে সম্পদ গ্রহণ করবে তাকে কিয়ামতের দিন সেই মালসহ আল্লাহ্র সামনে উপস্থিত হতে হবে।" আমি তোমাকে এই এতটুকু কথা বলে দেয়ার জন্য পুনরায় ডেকে এনেছি। যাও, নিজের কর্তব্য পালন করো।

প্রিয় নবী -এর ওসীয়ত করার মূল কারণও হলো তাঁর অন্তরে উম্মতের প্রতি মমত্ববোধ। তিনি চাইতেন মানুষের উপর যেন কাজকে সহজ করা হয়, তাদের সাথে কোমল আচরণ করা হয়। গভর্নর বা শাসনকর্তাদেরকে হাদিয়া-তোহফা প্রদানের জটিলতা যেন তাদেরকে পোহাতে না হয়। প্রিয় নবী নিজেও এ নীতির উপর আমল করতেন এবং নিজের গভর্নরদেরকেও এ নীতি পালনের নির্দেশ দিতেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00