📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি বোঝা সম্পর্কিত হাদীসসমূহ
১৩৬. عَنْ أَنَسٍ قَالَ لَمْ يَكُنْ يَأْكُلُ رَسُولُ اللهِ ﷺ عَلَى خِوَانٍ وَلَا فِي سُكُرْجَةٍ حَتَّى لَحِقَ بِاللَّهِ عَزَّ وَ جَلَّ -
১৩৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ কখনো টেবিলে বসে আহার করেন নি। এবং ছোট প্লেটেও নয়। এই অবস্থায়ই তিনি মহিমান্বিত মহান আল্লাহ্র সাথে মিলিত হয়েছেন (ইন্তিকাল করেছেন)।
ফায়দা : এ হাদীস রাসূলুল্লাহ্-এর প্রকৃতিগত বিনয় ও সরলতা সম্বলিত খানা খাওয়ার সুন্নত তরীকা ও আদব প্রকাশ করছে। টেবিল ও ভূমি থেকে উঁচু দস্তরখানে পৃথক পৃথক প্লেটে খানা খাওয়া অহংকারী ও দাম্ভিক লোকদের নিদর্শন। এর উদ্দেশ্য সাধারণত স্বীয় শান-শওকত ও অহমিকা প্রকাশ করা। এছাড়া এটা পাশ্চাত্য সভ্যতার অনুসরণ বৈ কিছু নয়। এই ধরনের লোক ফিরিঙ্গিদের মতো আহার করাকে গর্বের বিষয় বলে মনে করে। অথচ হাদীস শরীফে এসেছে مَنْ تَشَبَهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُم "যে ব্যক্তি যে জাতির অনুসরণ করবে, সে ঐ জাতির লোক বলে গণ্য হবে।" মাটিতে বসে চামড়া কিংবা কাপড় কিংবা চাটাইর দস্তরখানে হলে এক বরতনে যৌথভাবে আহার করা রাসূলে করীম -এর পবিত্র সুন্নত। আল্লাহ্ তা'আলা মুসলমানদেরকে বিশেষ করে শিক্ষিত সমাজকে পাশ্চাত্যের অনুসরণের স্থলে রাসূলুল্লাহ্-এর উসওয়ায়ে হাসানা (উত্তম আদর্শ)-কে মনেপ্রাণে অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন!
مَا ذُكِرَ مِنْ عَلَامَةِ رِضَاهُ وَعَلَامَةِ سُخْطِهِ
রাসূলুল্লাহ-এর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি বোঝা সম্পর্কিত হাদীসসমূহ
۱۳۷. عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ لا يُعْرَفُ رِضَاهُ عَضَبُهُ بِوَجْهِهِ كَانَ إِذَا رَضِيَ فَكَأَنَّمَا مُلَاحَكُ الْجُدُرِ وَجْهَهُ وَإِذْ عَضِبَ خُسِفَ لَوْنُهُ وَاسْوَدٌ، قَالَ أَبُو بَكْرٍ سَمِعْتُ أَبَا الْحَكَمِ اللَّيْثِى يَقُولُ هِيَ الْمِرْأَةُ تُوْضَعُ فِي الشَّمْسِ فَيُرَى ضُوعُهَا عَلَى الْجِدَارِ يَعْنِي قَوْلَهُ مُلَاحَكُ الْجُدُرِ -
১৩৭. হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর সন্তুষ্টি' ও অসন্তুষ্টি তাঁর চেহারা মুবারক দেখেই বোঝা যেতো। তিনি যখন কোনো ব্যাপারে খুশি হতেন, তখন তাঁর চেহারা মুবারক খুশির কারণে চমকাতে থাকতো এবং মনে হতো যেনো পাঁচিলের আলোকচ্ছটা আয়নার মতো তাঁর পবিত্র চেহারায় প্রতিফলিত হচ্ছে। পক্ষান্তরে তিনি যখন কোনো বিষয়ে অসন্তুষ্ট হতেন, তখন তাঁর চেহারা মুবারক অসন্তোষ ও ক্রোধের কারণে মলিন ও বিবর্ণ হয়ে যেতো।
আবূ বাক্স (ইব্ন আবূ আযিম) (র) বলেন, আমি আবুল হাকাম লায়সীর কাছে শুনেছি, তিনি বলতেন, নবী -এর চেহারা মুবারক ছিল আয়নার মতো। তা সূর্যের আলোর সামনে রাখলে প্রাচীরে তার বিকিরণ ঘটতো।
۱۳۸. عَنْ كَعْبِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ وَإِذَا سَرَّهُ الْأَمْرُ اسْتَنَارَ وَجْهُهُ كَأَنَّهُ دَارَةُ الْقَمَرِ -
১৩৮. হযরত কা'ব ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন কোনো বিষয়ে খুশি হতেন, তখন তাঁর চেহারা মুবারক দীপ্ত চাঁদের বৃত্তের মতো মনে হতো।
ফায়দা : এ অনুচ্ছেদে গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য শুধু রাসূলুল্লাহ্-এর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির লক্ষণ ও তা বোঝা সম্পর্কিত হাদীসসমূহ বর্ণনা করা। সুতরাং যে হাদীসেই এই অবস্থা সংক্রান্ত কথা বিদ্যমান ছিল তিনি তা সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। পূর্ণ হাদীস বর্ণনা করেন নি।
কোনো বিষয়ে নবী -এর খুশি ও সন্তুষ্ট হওয়ার লক্ষণ তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডলে তা স্পষ্ট ফুটে উঠতো। অনুরূপভাবে অপছন্দনীয় ও অনভিপ্রেত বিষয় তাঁর মনে সহসা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতো, ফলে তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডলের দিকে তাকালেই বোঝা যেতো যে, এ বিষয়টি তাঁর পছন্দনীয় নয়। প্রত্যেক ব্যক্তিই তাঁর সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি তাঁর চেহারা মুবারক দেখে অনুমান করতে পারতো। এর দ্বারা এও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, নবী সবচেয়ে অনুভূতিশীল ও কোমল-হৃদয় ছিলেন। তাঁর সুস্থ মনে প্রতিটি ভাল-মন্দ বিষয় সহসা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতো।
এক হাদীসে হযরত আবূ সাঈদ খুদ্রী (রা) থেকে পরিষ্কার বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ লজ্জা-শরমের ক্ষেত্রে একজন পর্দানশীল কুমারীর চাইতেও অধিক লজ্জাশীল ছিলেন। তিনি যখন কোনো জিনিস অপছন্দ করতেন আমরা তা তাঁর চেহারা দেখেই বুঝে ফেলতাম। (মিশকাত, পৃষ্ঠা ৬১৯)
দ্বিতীয় যে বিষয়টি এই হাদীসসমূহ থেকে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে তা হলো, রাসূলুল্লাহ্ লোকদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও সুদর্শন ছিলেন। কোনো ব্যক্তি যখন নবী -এর সৌন্দর্য বর্ণনা করতেন তখন তাঁর মুখমণ্ডলকে পূর্ণিমার চাঁদের সাথে তুলনা করতেন। এক হাদীসে হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্-এর চেহারা ছিল সবচেয়ে সুন্দর এবং তাঁর দেহের রং ছিল সবচেয়ে উজ্জ্বল। যেকোন ব্যক্তি তাঁর সৌন্দর্য বর্ণনা করতো, সে তাঁর চেহারাকে পূর্ণিমার চাঁদের সাথে তুলনা করতো। (আল ফাযায়িলুল মুহাম্মাদিয়া, লিনুহাস, পৃষ্ঠা ১৮২)
এক হাদীসে আবূ ইসহাক সুবাঈ থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত বারা'আ ইব্ন আযিব (রা)-কে একবার জিজ্ঞেস করা হলো যে, নবী-এর মুখমণ্ডল কি তলোয়ারের মতো চমকদার ছিল? তিনি বললেন, না। বরং পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল ও দেদীপ্যমান ছিল। (বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০২)
অন্য এক হাদীসে হযরত আবূ বক্র সিদ্দীক (রা) বলেন, নবী -এর মুখমণ্ডল চন্দ্রের বৃত্ত সমতুল্য চমকদার ও গোল ছিল (আল ফাযায়িলুল মুহাম্মাদিয়া, পৃষ্ঠা ১৬৬, সূত্র আবূ নুআয়মের দালায়েল গ্রন্থ)।
এক হাদীসে হযরত জাবির ইবন সামুরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ -এর মুখমণ্ডল চন্দ্র ও সূর্যের মতো উজ্জ্বল, দীপ্ত ও গোলাকার ছিল। (মুসলিম)
উপরোক্ত দু'টি হাদীসের প্রথমটিতে নবী -এর পবিত্র মুখমণ্ডলকে উজ্জ্বল আয়নার সাথে তুলনা করা হয়েছে এবং দ্বিতীয় হাদীসে চন্দ্রের বৃত্তের সাথে যা চমকদারও হয় এবং গোলাকারও। এই দু'টি বস্তু অর্থাৎ চন্দ্র ও সূর্য সর্বাপেক্ষা অধিক উজ্জ্বল বস্তু হলেও প্রকৃত অর্থে নবী -এর মুখমণ্ডলের সাথে তুলনা করা যোগ্য নয়। কোথায় চন্দ্র-সূর্য ও কোথায় তাঁর চমকদার চেহারা মুবারক। যা মহান আল্লাহ্ মা'রিফফাতের নূর ও ওহীর নূর দ্বারা এরূপ উজ্জ্বল ও প্রদীপ্ত ছিল এই অনুভব জগতের কোনো বস্তুই তাঁর সমকক্ষ হতে পারে না।
١٣٩. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ دَخَلَ عَلَى رَسُولُ اللَّهِ مَسْرُورًا تَبْرُقُ أَسَارِيرُ وَجْهِهِ ، فَقَالَ أَلَمْ تَرَى إِلَى زَيْدٍ قَالَ أَبُو بَكْرٍ لَا يَقَوْلُ أَسَارِيرُ وَجْهِهِ إلا اللَّيْثُ -
১৩৯. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ আমার কাছে আনন্দিত অবস্থায় আগমন করলেন। আনন্দের আতিশয্যের দরুন তাঁর চেহারার লাবণ্য চমকাচ্ছিল। তিনি আনন্দিত কণ্ঠে বললেন, তুমি কি যায়দ সম্পর্কে কিছু শোননি? গ্রন্থকার শায়খ আবু বাক্ (র) বলেন, এ হাদীসে উল্লিখিত (أَسَارِيرُ وَجْهِهِ) চেহারার লাবণ্য) শব্দটি হাদীসের রাবী লায়স ব্যতীত অন্য কোনো রাবী বর্ণনা করেন নি।
ফায়দা: গ্রন্থকার (র) যেহেতু কেবল নবী -এর আনন্দ চিহ্ন ও সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির লক্ষণসমূহ বর্ণনা করতে চেয়েছেন, তাই পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন নি। শুধু সেই অংশটুকুই উল্লেখ করেছেন, যা উদ্দেশ্য স্পষ্ট করার জন্য যথেষ্ট ছিল। পুরো হাদীসটি বুখারী শরীফে এই ভাষায় উল্লিখিত হয়েছে:
হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী তাঁর নিকট আগমন করলেন। তখন আনন্দে তাঁর মুখমণ্ডলের (অপরূপ) লাবণ্য চমকাচ্ছিল। অতঃপর তিনি (আনন্দিত কণ্ঠে) বললেন, আয়েশা! তুমি কি জানো না যে, খ্যাতনামা কাইয়্যাফ (Physiognomist) মুজযায মুদলাজী যায়দ ও উসামা সম্পর্কে কি বলেছে? ঐ কাইয়্যাফ এ দু'জনের পা দেখে বলেছে যে, তাদের পায়ের মধ্যে মিল ও সামঞ্জস্য রয়েছে। অর্থাৎ উভয়ের মধ্যে একজন পিতা ও একজন পুত্র। (বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০২)
ঘটনা এই ছিল যে, হযরত উসামা (রা) হযরত যায়দ ইব্ন্ন হারিসা (রা)-এর পুত্র ছিলেন। ঘটনাক্রমে তাঁর গায়ের রং ছিল অত্যন্ত কালো এবং তাঁর পিতা হযরত যায়দ ইব্ন হারিসা (রা)-এর গায়ের রং ছিল অত্যন্ত ফর্সা। এজন্য মক্কার মূর্খ লোকেরা তাঁর বংশ সম্পর্কে খোঁটা দিতো। তারা বলতো যে, উসামা যায়দের পুত্র নয়। (নাউযুবিল্লাহ্)
হযরত যায়দ ইব্ন্ন হারিসা (রা) বনূ কিলাব গোত্রের সাথে সম্পর্কযুক্ত। তাঁর মাতা একবার তাঁকে সাথে নিয়ে তাঁর গোত্রে গিয়েছিলেন। সেখানে লুটতরাজ সংঘটিত হলো, লুটেরারা হযরত যায়দকে ধরে নিয়ে উকায বাজারে বিক্রি করলো। হযরত হাকীম ইব্ন্ন হিযাম (রা) তাকে তাঁর ফুফু খাদীজা (রা)-এর জন্য চারশ' দিরহামে খরিদ করলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ যখন হযরত খাদীজা (রা)-কে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলেন, তখন তিনি তাঁর গোলাম হযরত যায়দ ইব্ন হারিসাকে রাসূলুল্লাহ্-এর সেবাযত্নের জন্য তাঁকে দান করলেন। যায়দের পিতা হারিসা (রা) যখন তাঁর পুত্রের খবর জানতে পারলেন, তখন তিনি তাকে নেয়ার জন্য নবী-এর দরবারে উপস্থিত হলেন। নবী যায়দকে ইতিয়ার দিলেন। তিনি ইচ্ছা করলে তাঁর পিতার সাথে আপন গৃহ ও গোত্রে ফিরে যেতে পারেন এবং ইচ্ছা করলে নবী-এর কাছে থেকেও যেতে পারেন। হযরত যায়দ (রা) তাঁর পিতার সাথে যেতে অস্বীকার করলেন এবং রাসূলুল্লাহ্-এর সান্নিধ্যে থাকাকে স্বীয় গোত্র ও মাতা-পিতার উপর প্রাধান্য দিলেন। নবী তাঁকে পোষ্যপুত্র বানিয়ে নিলেন এবং হযরত উম্মু আয়মান (রা)-এর সাথে তাঁকে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ করলেন। এর গর্ভেই তাঁর পুত্র হযরত উসামা (রা) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তাঁর পিতার রং-এর স্থলে মাতার রং অর্থাৎ কালো রং-এর হয়েছিলেন। তাই আরবের মূর্খ লোকেরা তাঁর বংশ সম্পর্কে সন্দেহ করতো এবং ভর্ৎসনা করতো। কিন্তু জনৈক কাইয়্যাফ যখন তাদের দু'জনের পা দেখে সত্য কথা ব্যক্ত করলো যে, উসামা ও যায়দ পিতা-পুত্র, তখন নবী খুব খুশি হলেন এবং হযরত আয়েশা (রা)-এর কাছেও তিনি তাঁর খুশির কথা ব্যক্ত করলেন। এমন কি সে খুশির নিদর্শন তাঁর মুখমণ্ডলেও পরিদৃষ্ট হচ্ছিল। তাঁর চেহারা মুবারক আনন্দের আতিশয্যে চমকাচ্ছিল। হযরত যায়দ ও উসামা (রা) দু'জনই নবী-এর খুব প্রিয় ছিলেন।
এই হাদীসটিই বুখারী শরীফের অন্য একস্থানে এই ভাষায় বর্ণিত হয়েছে: হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) বলেন, একবার এক কাইয়্যাফ আমাদের নিকট এলো তখন নবী উপস্থিত ছিলেন এবং উসামা ইব্ন যায়দ ও যায়দ ইব্ন হারিসা (রা) উভয়ে (পিতা-পুত্র) একই চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়েছিলেন। তাদের শুধু পা চাদরের বাইরে ছিল। তখন ঐ কাইয়্যাফ তাঁদের পা দেখে বললো, এই পাগুলো পরস্পর মিলে যাচ্ছে। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, কাইয়্যাফের এই উক্তির ফলে রাসূলুল্লাহ্ অত্যন্ত খুশি হলেন। কেননা আরবের লোকেরা কাইয়্যাফের কথা বিশেষত বংশের ক্ষেত্রে দলীল রূপে গণ্য করতো। সুতরাং কাইয়্যাফের এই সাক্ষ্য কুরায়শদের জন্য দাঁতভাঙ্গা জবাব ছিল। একারণেই নবী তার কথা পছন্দ করলেন এবং তিনি হযরত আয়েশার সাথেও এ বিষয়টি আলোচনা করলেন। (বুখারী শরীফ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫২০)
١٤٠. عَنْ عَلِيُّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا رَأَى مَا يُحِبُّ قَالَ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي بِنِعْمَتِهِ تَتِمُّ الصَّالِحَاتُ -
১৪০. হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন কোনো পছন্দনীয় জিনিস দেখতেন, তখন বলতেন )...... الحمد لله الذي بنعمته( সমস্ত প্রশংসা সেই সত্তার জন্য, যাঁর দয়া ও অনুগ্রহে সমস্ত ভাল কাজ সম্পন্ন হয়।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা গেল যে, নবী -এর খুশি ও সন্তুষ্টির এক বাচনিক নিদর্শন এও ছিল যে, তিনি যখন কোনো পছন্দনীয় বিষয় দেখতেন, তখন আনন্দের আতিশয্যে আল্লাহ্ প্রশংসা ও গুণ গাইতেন এবং বলতেন الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي بِنِعْمَتِهِ تَتم الصالحات যেনো এটি কিংবা এই ধরনের আরো প্রশংসা-বাণী তাঁর খুশি ও পছন্দের নিদর্শন ছিলো।
١٤١. عَنْ طَارِقِ بْنِ شِهَابٍ قَالَ سَمِعْتُ ابْنَ مَسْعُودٍ يَقُولُ شَهِدْتُ مِنَ الْمِقْدَادِ مَشْهَداً لِأَنْ أَكُونَ أَنَا صَاحِبُهُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا فِي الْأَرْضِ مِنْ شَيْءٍ وَقَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ إِذَا غَضِبَ احْمَرَّ وَجْهُهُ
১৪১. তারিক ইব্ন শিহাব (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন מסעוד (রা)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলতেন, আমি হযরত মিকদাদ ইব্ন আসওয়াদের এমন এক মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞাত আছি, সে মর্যাদা যদি আমি লাভ করতে পারতাম, তবে দুনিয়ার সকল সম্পদ থেকে আমার কাছে তা প্রিয়তর হতো। হযরত আবদুল্লাহ্ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন কোনো ব্যাপারে অসন্তুষ্ট হতেন, তখন তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল ক্রোধে লাল হয়ে যেতো।
ফায়দা : এ হাদীসের শেষাংশ থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ -এর অসন্তুষ্টির চিহ্ন এই ছিলো যে, তাঁর মুখমণ্ডল ক্রোধে লাল হয়ে উঠতো। এ হাদীসের প্রথম অংশ এক দীর্ঘ হাদীসের সংক্ষিপ্তসার। বুখারী মুসলিমের বিভিন্ন অধ্যায়ে তা সবিস্তার বর্ণিত রয়েছে। যেমন এক হাদীসে তারিক ইব্ন শিহাব (র) বলেন, আমি হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন מסעוד (রা)-কে বলতে শুনেছি, আমি হযরত মিকদাদ ইব্ন আসওয়াদ (রা)-এর এমন এক মর্তবা ও মর্যাদা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল আছি, সে মর্তবা ও মর্যাদা দুনিয়ার সকল সম্পদ থেকে আমার কাছে প্রিয়তর। সে মর্যাদা হচ্ছে এই যে, একবার মিকদাদ ইব্ন আসওয়াদ (রা) রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে হাজির হলেন। তখন নবী লোকদেরকে কাফির ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য উৎসাহিত করছিলেন। তখন মিকদাদ (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! মূসা (আ)-এর জাতি যেরূপ তাদের নবী হযরত মূসাকে বলেছিলো যে, যাও, তুমি' এবং তোমার রব দু'জনে গিয়ে আমালিকা জাতির সাথে যুদ্ধ করো আর আমরা এখানে বসে রইলাম। সেরূপ আমরা কখনো আপনাকে বলবো না। বরং আপনার ডানে-বামে, সামনে-পেছনে থেকে কাফিরদের সাথে তুমুল যুদ্ধ চালিয়ে যাবো এবং শেষ রক্তবিন্দু প্রবাহিত করবো। হাদীসের রাবী হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন מסעוד (রা) বলেন, আমি লক্ষ করলাম মিকদাদের এই কথা নবী খুব পছন্দ করলেন এবং আনন্দে তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল প্রোজ্জ্বল হয়ে উঠলো। (বুখারী শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৬৪)
হযরত মিকদাদ (রা)-এর এই জীবন-উৎসর্গমূলক উক্তি নবী খুব পছন্দ করলেন। তাই হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন מסעוד (রা) আকাঙ্ক্ষা করলেন যে, হযরত মিকদাদ (রা) তাঁর ঐ জীবন-উৎসর্গকারী বক্তব্য দ্বারা যে মর্তবা হাসিল করেছেন, তা যদি আমিও লাভ করতে পারতাম।
١٤٢. عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ وَ إِذَا غَضِبَ أَحْمَرُ وَجْهُهُ -
১৪২. হযরত উম্মু সালাম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন রাগান্বিত হতেন, তখন তাঁর চেহারা মুবারক রাগে লাল হয়ে উঠতো।
ফায়দা: এর পূর্ববর্তী হাদীসটির বিষয়বস্তুও একই। যাতে বোঝা যায় যে, নবী যখন কোনো কিছু অপছন্দ করতেন, কিংবা রাগান্বিত হতেন, তখন তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল রাগে লাল হয়ে উঠতো।
١٤٣. عَنْ أَبِي مُوسَى قَالَ سُئِلَ رَسُولُ اللهِ عَنْ أَشْيَاءَ كَرِهَهَا فَلَمَّا أَكْثَرُوا عَلَيْهِ غَضِبَ فَلَمَّا رَأَى عُمَرُ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ الْغَضَبَ فِي وَجْهِهِ قَالَ أَنَا نَتُوْبُ إِلَى اللَّهِ عَزَّوَجَلَّ عَمَّا كَرِهَ -
১৪৩. হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ -কে এমন কিছু বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, যা তাঁর অপছন্দনীয় ছিল। তিনি নীরব থাকলেন। কিন্তু লোকেরা যখন সে বিষয়ে পীড়াপীড়ি করতে লাগলো, তখন তিনি ক্রুদ্ধ হলেন। হযরত উমর (রা) যখন তাঁর মুখমণ্ডলে ক্রোধের চিহ্ন দেখলেন, তখন বললেন, আমরা আল্লাহ্র কাছে এমন বিষয় সম্পর্কে তাওবা করছি যা নবী পছন্দ করেন না।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি বোঝা সম্পর্কিত হাদীসসমূহ
১৩৬. عَنْ أَنَسٍ قَالَ لَمْ يَكُنْ يَأْكُلُ رَسُولُ اللهِ ﷺ عَلَى خِوَانٍ وَلَا فِي سُكُرْجَةٍ حَتَّى لَحِقَ بِاللَّهِ عَزَّ وَ جَلَّ -
১৩৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ কখনো টেবিলে বসে আহার করেন নি। এবং ছোট প্লেটেও নয়। এই অবস্থায়ই তিনি মহিমান্বিত মহান আল্লাহ্র সাথে মিলিত হয়েছেন (ইন্তিকাল করেছেন)।
ফায়দা : এ হাদীস রাসূলুল্লাহ্-এর প্রকৃতিগত বিনয় ও সরলতা সম্বলিত খানা খাওয়ার সুন্নত তরীকা ও আদব প্রকাশ করছে। টেবিল ও ভূমি থেকে উঁচু দস্তরখানে পৃথক পৃথক প্লেটে খানা খাওয়া অহংকারী ও দাম্ভিক লোকদের নিদর্শন। এর উদ্দেশ্য সাধারণত স্বীয় শান-শওকত ও অহমিকা প্রকাশ করা। এছাড়া এটা পাশ্চাত্য সভ্যতার অনুসরণ বৈ কিছু নয়। এই ধরনের লোক ফিরিঙ্গিদের মতো আহার করাকে গর্বের বিষয় বলে মনে করে। অথচ হাদীস শরীফে এসেছে مَنْ تَشَبَهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُم "যে ব্যক্তি যে জাতির অনুসরণ করবে, সে ঐ জাতির লোক বলে গণ্য হবে।" মাটিতে বসে চামড়া কিংবা কাপড় কিংবা চাটাইর দস্তরখানে হলে এক বরতনে যৌথভাবে আহার করা রাসূলে করীম -এর পবিত্র সুন্নত। আল্লাহ্ তা'আলা মুসলমানদেরকে বিশেষ করে শিক্ষিত সমাজকে পাশ্চাত্যের অনুসরণের স্থলে রাসূলুল্লাহ্-এর উসওয়ায়ে হাসানা (উত্তম আদর্শ)-কে মনেপ্রাণে অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন!
مَا ذُكِرَ مِنْ عَلَامَةِ رِضَاهُ وَعَلَامَةِ سُخْطِهِ
রাসূলুল্লাহ-এর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি বোঝা সম্পর্কিত হাদীসসমূহ
۱۳۷. عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ لا يُعْرَفُ رِضَاهُ عَضَبُهُ بِوَجْهِهِ كَانَ إِذَا رَضِيَ فَكَأَنَّمَا مُلَاحَكُ الْجُدُرِ وَجْهَهُ وَإِذْ عَضِبَ خُسِفَ لَوْنُهُ وَاسْوَدٌ، قَالَ أَبُو بَكْرٍ سَمِعْتُ أَبَا الْحَكَمِ اللَّيْثِى يَقُولُ هِيَ الْمِرْأَةُ تُوْضَعُ فِي الشَّمْسِ فَيُرَى ضُوعُهَا عَلَى الْجِدَارِ يَعْنِي قَوْلَهُ مُلَاحَكُ الْجُدُرِ -
১৩৭. হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর সন্তুষ্টি' ও অসন্তুষ্টি তাঁর চেহারা মুবারক দেখেই বোঝা যেতো। তিনি যখন কোনো ব্যাপারে খুশি হতেন, তখন তাঁর চেহারা মুবারক খুশির কারণে চমকাতে থাকতো এবং মনে হতো যেনো পাঁচিলের আলোকচ্ছটা আয়নার মতো তাঁর পবিত্র চেহারায় প্রতিফলিত হচ্ছে। পক্ষান্তরে তিনি যখন কোনো বিষয়ে অসন্তুষ্ট হতেন, তখন তাঁর চেহারা মুবারক অসন্তোষ ও ক্রোধের কারণে মলিন ও বিবর্ণ হয়ে যেতো।
আবূ বাক্স (ইব্ন আবূ আযিম) (র) বলেন, আমি আবুল হাকাম লায়সীর কাছে শুনেছি, তিনি বলতেন, নবী -এর চেহারা মুবারক ছিল আয়নার মতো। তা সূর্যের আলোর সামনে রাখলে প্রাচীরে তার বিকিরণ ঘটতো।
۱۳۸. عَنْ كَعْبِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ وَإِذَا سَرَّهُ الْأَمْرُ اسْتَنَارَ وَجْهُهُ كَأَنَّهُ دَارَةُ الْقَمَرِ -
১৩৮. হযরত কা'ব ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন কোনো বিষয়ে খুশি হতেন, তখন তাঁর চেহারা মুবারক দীপ্ত চাঁদের বৃত্তের মতো মনে হতো।
ফায়দা : এ অনুচ্ছেদে গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য শুধু রাসূলুল্লাহ্-এর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির লক্ষণ ও তা বোঝা সম্পর্কিত হাদীসসমূহ বর্ণনা করা। সুতরাং যে হাদীসেই এই অবস্থা সংক্রান্ত কথা বিদ্যমান ছিল তিনি তা সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। পূর্ণ হাদীস বর্ণনা করেন নি।
কোনো বিষয়ে নবী -এর খুশি ও সন্তুষ্ট হওয়ার লক্ষণ তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডলে তা স্পষ্ট ফুটে উঠতো। অনুরূপভাবে অপছন্দনীয় ও অনভিপ্রেত বিষয় তাঁর মনে সহসা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতো, ফলে তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডলের দিকে তাকালেই বোঝা যেতো যে, এ বিষয়টি তাঁর পছন্দনীয় নয়। প্রত্যেক ব্যক্তিই তাঁর সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি তাঁর চেহারা মুবারক দেখে অনুমান করতে পারতো। এর দ্বারা এও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, নবী সবচেয়ে অনুভূতিশীল ও কোমল-হৃদয় ছিলেন। তাঁর সুস্থ মনে প্রতিটি ভাল-মন্দ বিষয় সহসা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতো।
এক হাদীসে হযরত আবূ সাঈদ খুদ্রী (রা) থেকে পরিষ্কার বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ লজ্জা-শরমের ক্ষেত্রে একজন পর্দানশীল কুমারীর চাইতেও অধিক লজ্জাশীল ছিলেন। তিনি যখন কোনো জিনিস অপছন্দ করতেন আমরা তা তাঁর চেহারা দেখেই বুঝে ফেলতাম। (মিশকাত, পৃষ্ঠা ৬১৯)
দ্বিতীয় যে বিষয়টি এই হাদীসসমূহ থেকে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে তা হলো, রাসূলুল্লাহ্ লোকদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও সুদর্শন ছিলেন। কোনো ব্যক্তি যখন নবী -এর সৌন্দর্য বর্ণনা করতেন তখন তাঁর মুখমণ্ডলকে পূর্ণিমার চাঁদের সাথে তুলনা করতেন। এক হাদীসে হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্-এর চেহারা ছিল সবচেয়ে সুন্দর এবং তাঁর দেহের রং ছিল সবচেয়ে উজ্জ্বল। যেকোন ব্যক্তি তাঁর সৌন্দর্য বর্ণনা করতো, সে তাঁর চেহারাকে পূর্ণিমার চাঁদের সাথে তুলনা করতো। (আল ফাযায়িলুল মুহাম্মাদিয়া, লিনুহাস, পৃষ্ঠা ১৮২)
এক হাদীসে আবূ ইসহাক সুবাঈ থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত বারা'আ ইব্ন আযিব (রা)-কে একবার জিজ্ঞেস করা হলো যে, নবী-এর মুখমণ্ডল কি তলোয়ারের মতো চমকদার ছিল? তিনি বললেন, না। বরং পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল ও দেদীপ্যমান ছিল। (বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০২)
অন্য এক হাদীসে হযরত আবূ বক্র সিদ্দীক (রা) বলেন, নবী -এর মুখমণ্ডল চন্দ্রের বৃত্ত সমতুল্য চমকদার ও গোল ছিল (আল ফাযায়িলুল মুহাম্মাদিয়া, পৃষ্ঠা ১৬৬, সূত্র আবূ নুআয়মের দালায়েল গ্রন্থ)।
এক হাদীসে হযরত জাবির ইবন সামুরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ -এর মুখমণ্ডল চন্দ্র ও সূর্যের মতো উজ্জ্বল, দীপ্ত ও গোলাকার ছিল। (মুসলিম)
উপরোক্ত দু'টি হাদীসের প্রথমটিতে নবী -এর পবিত্র মুখমণ্ডলকে উজ্জ্বল আয়নার সাথে তুলনা করা হয়েছে এবং দ্বিতীয় হাদীসে চন্দ্রের বৃত্তের সাথে যা চমকদারও হয় এবং গোলাকারও। এই দু'টি বস্তু অর্থাৎ চন্দ্র ও সূর্য সর্বাপেক্ষা অধিক উজ্জ্বল বস্তু হলেও প্রকৃত অর্থে নবী -এর মুখমণ্ডলের সাথে তুলনা করা যোগ্য নয়। কোথায় চন্দ্র-সূর্য ও কোথায় তাঁর চমকদার চেহারা মুবারক। যা মহান আল্লাহ্ মা'রিফফাতের নূর ও ওহীর নূর দ্বারা এরূপ উজ্জ্বল ও প্রদীপ্ত ছিল এই অনুভব জগতের কোনো বস্তুই তাঁর সমকক্ষ হতে পারে না।
١٣٩. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ دَخَلَ عَلَى رَسُولُ اللَّهِ مَسْرُورًا تَبْرُقُ أَسَارِيرُ وَجْهِهِ ، فَقَالَ أَلَمْ تَرَى إِلَى زَيْدٍ قَالَ أَبُو بَكْرٍ لَا يَقَوْلُ أَسَارِيرُ وَجْهِهِ إلا اللَّيْثُ -
১৩৯. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ আমার কাছে আনন্দিত অবস্থায় আগমন করলেন। আনন্দের আতিশয্যের দরুন তাঁর চেহারার লাবণ্য চমকাচ্ছিল। তিনি আনন্দিত কণ্ঠে বললেন, তুমি কি যায়দ সম্পর্কে কিছু শোননি? গ্রন্থকার শায়খ আবু বাক্ (র) বলেন, এ হাদীসে উল্লিখিত (أَسَارِيرُ وَجْهِهِ) চেহারার লাবণ্য) শব্দটি হাদীসের রাবী লায়স ব্যতীত অন্য কোনো রাবী বর্ণনা করেন নি।
ফায়দা: গ্রন্থকার (র) যেহেতু কেবল নবী -এর আনন্দ চিহ্ন ও সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির লক্ষণসমূহ বর্ণনা করতে চেয়েছেন, তাই পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন নি। শুধু সেই অংশটুকুই উল্লেখ করেছেন, যা উদ্দেশ্য স্পষ্ট করার জন্য যথেষ্ট ছিল। পুরো হাদীসটি বুখারী শরীফে এই ভাষায় উল্লিখিত হয়েছে:
হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী তাঁর নিকট আগমন করলেন। তখন আনন্দে তাঁর মুখমণ্ডলের (অপরূপ) লাবণ্য চমকাচ্ছিল। অতঃপর তিনি (আনন্দিত কণ্ঠে) বললেন, আয়েশা! তুমি কি জানো না যে, খ্যাতনামা কাইয়্যাফ (Physiognomist) মুজযায মুদলাজী যায়দ ও উসামা সম্পর্কে কি বলেছে? ঐ কাইয়্যাফ এ দু'জনের পা দেখে বলেছে যে, তাদের পায়ের মধ্যে মিল ও সামঞ্জস্য রয়েছে। অর্থাৎ উভয়ের মধ্যে একজন পিতা ও একজন পুত্র। (বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০২)
ঘটনা এই ছিল যে, হযরত উসামা (রা) হযরত যায়দ ইব্ন্ন হারিসা (রা)-এর পুত্র ছিলেন। ঘটনাক্রমে তাঁর গায়ের রং ছিল অত্যন্ত কালো এবং তাঁর পিতা হযরত যায়দ ইব্ন হারিসা (রা)-এর গায়ের রং ছিল অত্যন্ত ফর্সা। এজন্য মক্কার মূর্খ লোকেরা তাঁর বংশ সম্পর্কে খোঁটা দিতো। তারা বলতো যে, উসামা যায়দের পুত্র নয়। (নাউযুবিল্লাহ্)
হযরত যায়দ ইব্ন্ন হারিসা (রা) বনূ কিলাব গোত্রের সাথে সম্পর্কযুক্ত। তাঁর মাতা একবার তাঁকে সাথে নিয়ে তাঁর গোত্রে গিয়েছিলেন। সেখানে লুটতরাজ সংঘটিত হলো, লুটেরারা হযরত যায়দকে ধরে নিয়ে উকায বাজারে বিক্রি করলো। হযরত হাকীম ইব্ন্ন হিযাম (রা) তাকে তাঁর ফুফু খাদীজা (রা)-এর জন্য চারশ' দিরহামে খরিদ করলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ যখন হযরত খাদীজা (রা)-কে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলেন, তখন তিনি তাঁর গোলাম হযরত যায়দ ইব্ন হারিসাকে রাসূলুল্লাহ্-এর সেবাযত্নের জন্য তাঁকে দান করলেন। যায়দের পিতা হারিসা (রা) যখন তাঁর পুত্রের খবর জানতে পারলেন, তখন তিনি তাকে নেয়ার জন্য নবী-এর দরবারে উপস্থিত হলেন। নবী যায়দকে ইতিয়ার দিলেন। তিনি ইচ্ছা করলে তাঁর পিতার সাথে আপন গৃহ ও গোত্রে ফিরে যেতে পারেন এবং ইচ্ছা করলে নবী-এর কাছে থেকেও যেতে পারেন। হযরত যায়দ (রা) তাঁর পিতার সাথে যেতে অস্বীকার করলেন এবং রাসূলুল্লাহ্-এর সান্নিধ্যে থাকাকে স্বীয় গোত্র ও মাতা-পিতার উপর প্রাধান্য দিলেন। নবী তাঁকে পোষ্যপুত্র বানিয়ে নিলেন এবং হযরত উম্মু আয়মান (রা)-এর সাথে তাঁকে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ করলেন। এর গর্ভেই তাঁর পুত্র হযরত উসামা (রা) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তাঁর পিতার রং-এর স্থলে মাতার রং অর্থাৎ কালো রং-এর হয়েছিলেন। তাই আরবের মূর্খ লোকেরা তাঁর বংশ সম্পর্কে সন্দেহ করতো এবং ভর্ৎসনা করতো। কিন্তু জনৈক কাইয়্যাফ যখন তাদের দু'জনের পা দেখে সত্য কথা ব্যক্ত করলো যে, উসামা ও যায়দ পিতা-পুত্র, তখন নবী খুব খুশি হলেন এবং হযরত আয়েশা (রা)-এর কাছেও তিনি তাঁর খুশির কথা ব্যক্ত করলেন। এমন কি সে খুশির নিদর্শন তাঁর মুখমণ্ডলেও পরিদৃষ্ট হচ্ছিল। তাঁর চেহারা মুবারক আনন্দের আতিশয্যে চমকাচ্ছিল। হযরত যায়দ ও উসামা (রা) দু'জনই নবী-এর খুব প্রিয় ছিলেন।
এই হাদীসটিই বুখারী শরীফের অন্য একস্থানে এই ভাষায় বর্ণিত হয়েছে: হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) বলেন, একবার এক কাইয়্যাফ আমাদের নিকট এলো তখন নবী উপস্থিত ছিলেন এবং উসামা ইব্ন যায়দ ও যায়দ ইব্ন হারিসা (রা) উভয়ে (পিতা-পুত্র) একই চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়েছিলেন। তাদের শুধু পা চাদরের বাইরে ছিল। তখন ঐ কাইয়্যাফ তাঁদের পা দেখে বললো, এই পাগুলো পরস্পর মিলে যাচ্ছে। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, কাইয়্যাফের এই উক্তির ফলে রাসূলুল্লাহ্ অত্যন্ত খুশি হলেন। কেননা আরবের লোকেরা কাইয়্যাফের কথা বিশেষত বংশের ক্ষেত্রে দলীল রূপে গণ্য করতো। সুতরাং কাইয়্যাফের এই সাক্ষ্য কুরায়শদের জন্য দাঁতভাঙ্গা জবাব ছিল। একারণেই নবী তার কথা পছন্দ করলেন এবং তিনি হযরত আয়েশার সাথেও এ বিষয়টি আলোচনা করলেন। (বুখারী শরীফ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫২০)
١٤٠. عَنْ عَلِيُّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا رَأَى مَا يُحِبُّ قَالَ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي بِنِعْمَتِهِ تَتِمُّ الصَّالِحَاتُ -
১৪০. হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন কোনো পছন্দনীয় জিনিস দেখতেন, তখন বলতেন )...... الحمد لله الذي بنعمته( সমস্ত প্রশংসা সেই সত্তার জন্য, যাঁর দয়া ও অনুগ্রহে সমস্ত ভাল কাজ সম্পন্ন হয়।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা গেল যে, নবী -এর খুশি ও সন্তুষ্টির এক বাচনিক নিদর্শন এও ছিল যে, তিনি যখন কোনো পছন্দনীয় বিষয় দেখতেন, তখন আনন্দের আতিশয্যে আল্লাহ্ প্রশংসা ও গুণ গাইতেন এবং বলতেন الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي بِنِعْمَتِهِ تَتم الصالحات যেনো এটি কিংবা এই ধরনের আরো প্রশংসা-বাণী তাঁর খুশি ও পছন্দের নিদর্শন ছিলো।
١٤١. عَنْ طَارِقِ بْنِ شِهَابٍ قَالَ سَمِعْتُ ابْنَ مَسْعُودٍ يَقُولُ شَهِدْتُ مِنَ الْمِقْدَادِ مَشْهَداً لِأَنْ أَكُونَ أَنَا صَاحِبُهُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا فِي الْأَرْضِ مِنْ شَيْءٍ وَقَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ إِذَا غَضِبَ احْمَرَّ وَجْهُهُ
১৪১. তারিক ইব্ন শিহাব (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন מסעוד (রা)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলতেন, আমি হযরত মিকদাদ ইব্ন আসওয়াদের এমন এক মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞাত আছি, সে মর্যাদা যদি আমি লাভ করতে পারতাম, তবে দুনিয়ার সকল সম্পদ থেকে আমার কাছে তা প্রিয়তর হতো। হযরত আবদুল্লাহ্ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন কোনো ব্যাপারে অসন্তুষ্ট হতেন, তখন তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল ক্রোধে লাল হয়ে যেতো।
ফায়দা : এ হাদীসের শেষাংশ থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ -এর অসন্তুষ্টির চিহ্ন এই ছিলো যে, তাঁর মুখমণ্ডল ক্রোধে লাল হয়ে উঠতো। এ হাদীসের প্রথম অংশ এক দীর্ঘ হাদীসের সংক্ষিপ্তসার। বুখারী মুসলিমের বিভিন্ন অধ্যায়ে তা সবিস্তার বর্ণিত রয়েছে। যেমন এক হাদীসে তারিক ইব্ন শিহাব (র) বলেন, আমি হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন מסעוד (রা)-কে বলতে শুনেছি, আমি হযরত মিকদাদ ইব্ন আসওয়াদ (রা)-এর এমন এক মর্তবা ও মর্যাদা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল আছি, সে মর্তবা ও মর্যাদা দুনিয়ার সকল সম্পদ থেকে আমার কাছে প্রিয়তর। সে মর্যাদা হচ্ছে এই যে, একবার মিকদাদ ইব্ন আসওয়াদ (রা) রাসূলুল্লাহ্ -এর দরবারে হাজির হলেন। তখন নবী লোকদেরকে কাফির ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য উৎসাহিত করছিলেন। তখন মিকদাদ (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! মূসা (আ)-এর জাতি যেরূপ তাদের নবী হযরত মূসাকে বলেছিলো যে, যাও, তুমি' এবং তোমার রব দু'জনে গিয়ে আমালিকা জাতির সাথে যুদ্ধ করো আর আমরা এখানে বসে রইলাম। সেরূপ আমরা কখনো আপনাকে বলবো না। বরং আপনার ডানে-বামে, সামনে-পেছনে থেকে কাফিরদের সাথে তুমুল যুদ্ধ চালিয়ে যাবো এবং শেষ রক্তবিন্দু প্রবাহিত করবো। হাদীসের রাবী হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন מסעוד (রা) বলেন, আমি লক্ষ করলাম মিকদাদের এই কথা নবী খুব পছন্দ করলেন এবং আনন্দে তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল প্রোজ্জ্বল হয়ে উঠলো। (বুখারী শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৬৪)
হযরত মিকদাদ (রা)-এর এই জীবন-উৎসর্গমূলক উক্তি নবী খুব পছন্দ করলেন। তাই হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন מסעוד (রা) আকাঙ্ক্ষা করলেন যে, হযরত মিকদাদ (রা) তাঁর ঐ জীবন-উৎসর্গকারী বক্তব্য দ্বারা যে মর্তবা হাসিল করেছেন, তা যদি আমিও লাভ করতে পারতাম।
١٤٢. عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ وَ إِذَا غَضِبَ أَحْمَرُ وَجْهُهُ -
১৪২. হযরত উম্মু সালাম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন রাগান্বিত হতেন, তখন তাঁর চেহারা মুবারক রাগে লাল হয়ে উঠতো।
ফায়দা: এর পূর্ববর্তী হাদীসটির বিষয়বস্তুও একই। যাতে বোঝা যায় যে, নবী যখন কোনো কিছু অপছন্দ করতেন, কিংবা রাগান্বিত হতেন, তখন তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল রাগে লাল হয়ে উঠতো।
١٤٣. عَنْ أَبِي مُوسَى قَالَ سُئِلَ رَسُولُ اللهِ عَنْ أَشْيَاءَ كَرِهَهَا فَلَمَّا أَكْثَرُوا عَلَيْهِ غَضِبَ فَلَمَّا رَأَى عُمَرُ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ الْغَضَبَ فِي وَجْهِهِ قَالَ أَنَا نَتُوْبُ إِلَى اللَّهِ عَزَّوَجَلَّ عَمَّا كَرِهَ -
১৪৩. হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ -কে এমন কিছু বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, যা তাঁর অপছন্দনীয় ছিল। তিনি নীরব থাকলেন। কিন্তু লোকেরা যখন সে বিষয়ে পীড়াপীড়ি করতে লাগলো, তখন তিনি ক্রুদ্ধ হলেন। হযরত উমর (রা) যখন তাঁর মুখমণ্ডলে ক্রোধের চিহ্ন দেখলেন, তখন বললেন, আমরা আল্লাহ্র কাছে এমন বিষয় সম্পর্কে তাওবা করছি যা নবী পছন্দ করেন না।
📄 নবী (সা) কর্তৃক অপছন্দনীয় জিনিস পরিহার ও এড়িয়ে যাওয়া সম্পর্কিত রিওয়ায়াতসমূহ
١٤٤. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَلْمًا يُوَاجِهُ أَحَدًا بِشَيْءٍ يَكْرَهُهُ، فَقَرَّبَ إِلَيْهِ صَفْحَةٌ فِيهَا قَرْعٌ وَكَانَ يَلْتَمِسُهُ بِاصَابِعِهِ فَدَخَلَ رَجُلٌ عَلَيْهِ أَثْرُ صُفْرَةٍ فَكَرِهَهُ ، فَلَمْ يَقُلْ لَهُ شَيْئًا حَتَّى خَرَجَ ، فَقَالَ بَعْضُ الْقَوْمِ لَوْ قُلْتُمْ لِهَذَا أَنْ يَدَعْ هَذِهِ يَعْنِي الصُّفْرَةُ -
১৪৪. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর অভ্যাস ছিলো, তিনি কারো সামনা-সামনি কোনো কথা খুব কমই বলতেন। অর্থাৎ তাঁর অপছন্দনীয় কোন জিনিস দেখলেও সামনা-সামনি খুব কমই তার প্রতিবাদ করতেন। (সুতরাং) একবার তাঁর সামনে লাউ তরকারির একটি পেয়ালা পেশ করা হলো। তিনি অঙ্গুলি দ্বারা লাউয়ের টূকরা খোঁজ করছিলেন। তখন এমন এক ব্যক্তি তাঁর নিকট প্রবেশ করলো যার গায়ে হলুদ রং-এর খুশবু চিহ্ন পরিলক্ষিত হচ্ছিল। লোকটির এভাবে নবী-এর নিকট আসা তাঁর পছন্দ হলো না। কিন্তু তিনি তাকে কিছুই বললেন না। লোকটির এ ধরনের রং ব্যবহার নবী-এর পছন্দ হলো না, কিন্তু তিনি কিছুই বলার পূর্বে লোকটি বের হয়ে গেল। তখন নবী অপর এক ব্যক্তিকে বললেন, তুমি যদি সে লোকটিকে বলে দিতে যে, হলুদ রং ব্যবহার ছেড়ে দিলেই ভাল হতো।
ফায়দা: এই হাদীস দ্বারা বোঝা যায় নবী কারো থেকে অপছন্দনীয় কোন জিনিস হতে দেখে সাথে সাথেই তাকে সাবধান করতেন না। বরং অধিকাংশ সময় উম্মতের প্রতি সহানুভূতিবশত এড়িয়ে যেতেন। লোকটিকে তৎক্ষণাৎ সামনা-সামনি কিছু না বলার পেছনে রহস্য এই ছিলো যে, এভাবে সামনা-সামনি বললে হয়ত লোকটি তাঁর কথা মান্য না করতেও পারে। এতে লোকটির ইহলোক ও পরলোকের সমূহ ক্ষতি হয়ে যাবে। আর নবী-এর কর্মনীতি এসব বিষয়ের ব্যাপারে হতো যা কোন 'উত্তম কাজ' পরিহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো। এবং এরূপ বিষয়ে দেরিতে সাবধান করলে কোনরূপ ক্ষতি নেই। কিন্তু কোন হারাম ও শরীয়ত নিষিদ্ধ অশ্লীল কাজের বিষয়ে তিনি তৎক্ষণাৎই পাকড়াও করতেন। যাহোক নবী ছিলেন তাঁর উম্মতের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ও মেহেরবান। তাঁর এই দয়া ও স্নেহের কারণেই তিনি কোন অপছন্দনীয় ব্যাপারে যা শরীয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ নহে সঙ্গে সঙ্গে পাকড়াও করতেন না। এর দ্বারা নবী-এর উত্তম তালীম ও তারবিয়াতের (শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ) অনুমান করা যায়।
١٤٥. عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ الْحَكَمِ قَالَ صَلَّيْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَعَطَسَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ فَقُلْتُ يَرْحَمُكَ اللهُ فَرَمَانِي الْقَوْمُ بِأَبْصَارِهِمْ وَضَرَبُوا بِأَيْدِيهِمْ عَلَى أَفْخَانِهِمْ فَلَمَّا رَأَيْتُهُمْ يُصْمِتُونَى لَكِنِّي سَكَتْ قَالَ فَدَعَانِي النَّبِيُّ ﷺ بِأَبِي وَأُمِّي مَا رَأَيْتُ مُعَلَّمًا أَحْسَنَ تَعْلِيمًا مِنْهُ مَا ضَرَبَنِي وَلَا سَبَّنِي ثُمَّ قَالَ إِنَّ هَذِهِ الصَّلَاةُ لَا يَصْلِحُ فِيهَا شَيْءٌ مِنْ كَلَامِ النَّاسِ إِنَّمَا هُوَ التَّسْبِيحُ وَالتَّكْبِيرُ والتَّمْحِيدُ .
১৪৫. হযরত মুয়াবিয়া ইব্ন আবুল হাকাম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি রাসূলুল্লাহ্-এর সাথে জামায়াতে নামায আদায় করি। (নামাযের মধ্যেই) এক ব্যক্তির হাঁচি এল। রাবী বলেন, (আমি 'আলহামদুলিল্লাহ্'-এর জবাবে) 'ইয়ারহামুকাল্লাহ্' বলে ফেললাম। তখন নামাযরত লোকেরা আমাকে চোখ তুলে দেখতে লাগলো এবং উরুর উপর হাত মারতে শুরু করলো। আমি দেখলাম তারা আমাকে জোর করে চুপ করাতে যাচ্ছে (তখন আমার খুব খারাপ লাগলো)। কিন্তু আমি নিশ্চুপ রইলাম। (নামায শেষে) নবী আমাকে ডাকলেন। আমার মাতাপিতা তাঁর জন্য কুরবান হোন। আমি নবী-এর চেয়ে কোন উত্তম শিক্ষক দেখি নাই। তিনি আমাকে না মারধর করলেন, না বকাঝকা করলেন। তারপর বললেন: নামাযে দুনিয়াবী কথাবার্তা বলা ঠিক নয়, নামায হলো আল্লাহ্র তাসবীহ্ (গুণগান) তাকবীর (মহানত্ব) তামহীদ (প্রশংসা)-এর নাম।
ফায়দা : এ ঘটনা হলো তখনকার যখন হযরত মুয়াবিয়া ইব্ন আবুল হাকাম (রা) ছিলেন নও মুসলিম। তখনও তিনি নামাযের সকল বিধি-বিধান শিখতে পারেন নি। তাই এ ঘটনা ঘটে গেল। হযরত মুয়াবিয়া (রা) নিজেই বলেন, ইসলাম গ্রহণের পর আমাকে ইসলামের কিছু কিছু বিধি-বিধান শেখানো হয়েছিলো। তন্মধ্যে আমাকে এও শেখানো হয়েছিলো যে, তোমার হাঁচি এলে 'আলহামদুলিল্লাহ্' বলবে। আর যদি অপর কারো হাঁচি আসে এবং সে 'আলহামদুল্লিাহ্' বলে তবে এর জবাবে তুমি 'ইয়ারহামুকাল্লাহ্' বলবে। হযরত মুয়াবিয়া (রা) বলেন, একবার আমি নবী-এর সাথে নামায পড়ছিলাম। এক ব্যক্তির হাঁচি এল। আর সে 'আলহামদুলিল্লাহ্' বললো। আমি তার জবাবে 'ইয়ারহামুকাল্লাহ্' বললাম। লোকেরা আমার দিকে চোখ তুলে তাকাতে লাগলো। বিষয়টি আমার ভীষণ খারাপ লাগলো। আমি নামাযের মধ্যেই তাদেরকে বলে ফেললাম তোমরা আমার দিকে চোখ তুলে কেনো দেখছো? আমার এ অবস্থা দেখে তারা সুবহানাল্লাহ্ বললো। তারপর নবী যখন নামায শেষ করলেন তখন জিজ্ঞেস করলেন, নামাযে কে কথা বললো? তারপর তিনি নিজেই বললেন: এ বেদুঈন। তারপর তিনি আমাকে ডাকলেন এবং বললেন, নামায ৩ কুরআন পড়া, এবং আল্লাহ্র যিকরের জন্য। সুতরাং তুমি যখন নামাযে থাকবে তখন এ সবই পড়বে। (দুনিয়াবী কথাবার্তা বলবে না।) এ ঘটনা বর্ণনার পর বর্ণনাকারী বলেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ্-এর চেয়ে স্নেহপরায়ণ ও মেহেরবান শিক্ষক জীবনেও দেখিনি।
গ্রন্থকারের এ হাদীসটি এ অনুচ্ছেদে সংকলনের উদ্দেশ্য হলো নবী কর্তৃক সাহাবায়ে কিরামের বিভিন্ন ছোট-খাটো ত্রুটিবিচ্যুতি এড়িয়ে যাওয়ার অবস্থা বর্ণনা করা এবং তিনি কিভাবে ভালবাসা ও স্নেহ-মমতা দিয়ে তালীম দিতেন তা তুলে ধরা। নবী-এর এই অনুপম আদর্শ আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্মের অনুসরণ করা একান্ত কর্তব্য।
١٤٦. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ قَاعِدًا فِي الْمَسْجِدِ وَأَصْحَابُهُ مَعَهُ إِذْ جَاءَ أَعْرَابِيُّ فَبَالَ فِي الْمَسْجِدِ فَقَالَ أَصْحَابُ النَّبِيِّ ﷺ مَا مَنْ فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ لَا تَزْرِمُوهُ ثُمَّ قَالَ إِنَّ هَذِهِ الْمَسَاجِدَ لَا تَصْلُحُ لِشَيْءٍ مِنَ الْقَدْرِ وَالْبَوْلِ وَالْخَلَاءِ أَوْ كَمَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ
১৪৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ মসজিদে অবস্থান করছিলেন। সাহাবা কিরামও তাঁর সাথে বসেছিলেন। ইত্যবসরে এক বেদুঈন সেখানে আসল এবং মসজিদের মধ্যেই (এক পাশে) পেশাব করতে লাগলো। সাহাবা কিরাম হায়! হায়! বলে তাকে পেশাব করতে বিরত রাখতে চাইলেন। কিন্তু নবী বললেন : তাকে পেশাব করতে বাধা দিও না। তারপর ঐ বেদুঈন যখন পেশাব করা শেষ করলো, তখন তাকে তিনি বললেন, দেখো, এই মসজিদগুলো আবর্জনা ছড়ানো ও পেশাব পায়খানা করার জন্য নয়। কিংবা এই ধরনেরই কোনো উক্তি রাসূলুল্লাহ্ করেছেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকেও নবী-এর অপরিসীম দয়া ও মমত্ববোধের অনুমান করা যায়। কোনো কোনো রিওয়ায়াতে আছে, ঐ বেদুঈন যখন পেশাব করা শেষ করলো, তখন নবী পানি আনিয়ে স্বয়ং এ স্থানটি ধৌত ও পবিত্র করান। পেশাব করার মাঝখানে ঐ বেদুঈনকে বাধা দিতে তাঁর নিষেধ করার কারণ হচ্ছে, পেশাব করার মাঝখানে বাধা দিলে তাতে তার কষ্ট হতে পারতো এবং মূত্রনালিতে পেশাব আটকে যেতে পারতো। এক রিওয়ায়াতে আছে, নবী ঐ ব্যক্তিকে ডেকে বললেন : এই মসজিদসমূহ পেশাব ও ময়লা ছড়ানোর জন্য নয়। এগুলো আল্লাহ্ তা'আলার যিক্র, নামায ও কুরআন তিলাওয়াত করার জন্য বানানো হয়েছে। এ হাদীসগুলো উম্মতের সাধারণ মানুষের জন্য উপদেশ ও তালীম-তারবিয়াতের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে এক বিরাট শিক্ষা। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের মূর্খসুলভ কাজকর্মে ধৈর্যধারণ করে তাদেরকে স্নেহ ও ভালবাসার সাথে দীনী বিষয়সমূহ শিক্ষা দেয়া উচিত।
١٤٧. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ إِذَا بَلَغَهُ مَنْ رَجُلٍ شَيْءٍ لَمْ يَقُلْ لَهُ قُلْتَ كَذَا وَكَذَا بَلْ قَالَ مَا بَالُ القَوَامِ يَقُولُوْنَ كَذَا وَكَذَا -
১৪৭. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো অপছন্দনীয় বিষয় অবগত হতেন, তখন তিনি তাকে সম্বোধন করে একথা বলতেন না যে, তুমি এরূপ এরূপ বলেছো। বরং তিনি (অনির্দিষ্টভাবে) বলতেন, লোকদের কি হয়েছে যে, তারা এরূপ এরূপ কথা বলছে?
ফায়দা : এ হাদীস থেকেও নবী সুসামাজিকতা ও মননশীলতার অনুমান করা যায়। তিনি কখনো কাউকে সম্বোধন করেও সাবধান করতেন না। আর কারো নাম ধরেও তার অপছন্দনীয় বিষয় প্রকাশ করতেন না। বরং তিনি যদি কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো অপছন্দনীয় বিষয় অবহিত হতেন এবং তিনি তাকে সতর্ক করতে চাইতেন, তবে সাধারণভাবে সাবধান করে দিতেন। যেমন তিনি বলতেন, লোকদের কি হয়েছে যে, এরূপ অলীক কথা বলে। তিনি কখনো এরূপ বলতেন না যে, অমুক ব্যক্তির কি হয়েছে যে, এরূপ অলীক কথা বলে। এ হচ্ছে তালীম-তারবিয়াতের এমন এক শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি যাতে ঝগড়া-বিবাদ ও শত্রুতা সৃষ্টি হয় না। আর যাকে উদ্দেশ্য করে একথা বলা হলো, সেও তার ভ্রান্তির ব্যাপারে অপর লোকের সামনে লজ্জিত হয় না। সামাজিক আচার বা শিক্ষার ব্যাপকতা ও সার্বজনীনতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ তাঁর উম্মতকে কত পূর্ণাঙ্গ দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, তা এই ধরনের ঘটনাবলি থেকেই অনুমিত হয়। আল্লাহ্ তা'আলা আমাদেরকে তাঁর পদাংক অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন।
١٤٨ عَنْ عِمْرَانَ بْنِ الْحُصَيْنِ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ إِذَا كَرِهَ شَيْئًا عُرِفُ ذَلِكَ فِي وَجْهِهِ -
১৪৮. হযরত ইমরান ইবন হুসায়ন (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন কোনো বিষয় অপছন্দ করতেন, তা তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল থেকেই অনুমান করা যেতো।
ফায়দা : এ বিষয়ে অন্যান্য হাদীস এবং পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদ "নবী-এর সন্তুষ্টির ও অসন্তুষ্টি নিদর্শন"-এ সবিস্তার বর্ণিত হয়েছে।
এখানে গ্রন্থকার এ হাদীসটি কেবল এজন্য বর্ণনা করেছেন যে, নবী প্রতিটি বিষয়ে সামনা-সামনি কাউকে ভর্ৎসনা করতেন না, বরং তিনি কোনো বিষয়কে অপছন্দ করলে নীরব থাকতেন। কিন্তু এই অপছন্দ তাঁর মুখমণ্ডলে অবশ্যই প্রকাশ পেতো। কোনো কোনো অপছন্দনীয় বিষয় এমন হয়, যা কেবল চেহারা দ্বারা প্রকাশ করাই যথেষ্ট হয় এবং কোনো কোনো বিষয় মুখে প্রকাশ করারও প্রয়োজন হয়। প্রথম হাদীসটি শেষোক্ত বিষয় সম্পর্কিত ছিলো। অনুরূপভাবে কোনো কোনো লোক এমন হয়ে থাকে, যাদের সতর্ক করার জন্য কেবল চেহারা দ্বারা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করাই যথেষ্ট হয় এবং কোনো কোনো লোককে সতর্ক করার জন্য মুখে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। এই দুই হাদীসের মধ্যে নবী -এর কর্ম-পদ্ধতির পার্থক্য এর উপরই নির্ভরশীল। যা হোক, নবী যে সব লোককে সংশোধন করতে চাইতেন, তিনি তার কথা ও কাজ দ্বারা তার মনে কোনো কষ্ট দিতেন না। কেননা, সংশোধন ও শিক্ষা-দীক্ষার কাজে মনে কষ্ট দান ক্ষতিকর। এতে ভালোর চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়।
١٤٩. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا اسْتَدْ وَجْهُهُ أَكْثَرَ مَسًّ لِحْيَتِهِ-
১৪৯. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ যখন কোনো কঠিন সংকটে পতিত হতেন, তখন তিনি বারংবার (মুবারক) দাড়িতে হাত বুলাতেন।
ফায়দা: এ অবস্থা রাসূলুল্লাহ্-এর চরম ধৈর্য ও সহিষ্ণুতাকেই প্রকাশ করে। নচেৎ সাধারণত মানুষ এরূপ ক্ষেত্রে মুখে তার মনের আক্রোশ প্রকাশ করে থাকে। কিন্তু তাতে সাধারণত ক্ষতি হয়। ন্যূনপক্ষে এই দুঃখ ও উষ্মা প্রকাশে মানুষের মনে কষ্ট হয়। এ কারণে রাসূলুল্লাহ্ এ পদ্ধতি পরিহার করতেন এবং স্বয়ং কষ্ট সহ্য করতেন।
١٥٠. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ النَّبِىُّ ﷺ عِنْدَ إِحْدَى أُمَّهَاتِ الْمُؤْمِنِيْنَ فَأَرْسَلَتْ إِحْدَى نِسَائِهِ بِقَصْعَةِ فِيْهَا طَعَامٌ، فَضَرَبَتْ بِيَدِ الرَّسُولِ فَسَقَطَتْ الْقَصْعَةُ فَانْكَسَرَتْ، فَأَخَذَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ الْكِسْرَتَيْنِ فَضَمَّ إِحْدَاهُمَا الْأُخْرَى ثُمَّ جَعَلَ وَيَجْمَعُ الطَّعَامَ فَيَقُولُ غَارَتْ أُمُّكُمْ كُلُوا فَكُلُوا ، فَجَلَسَ الرَّسُولُ حَتَّى جَاءَتْ الْكَاسِرَةُ بِقَصْعَتِهَا الَّتِي هِيَ فِي بَيْتِهَا فَدَفَعَ الصُّحْفَةَ الصَّحِيْحَةَ إِلَى الرَّسُوْلِ وَتَرَكَ الْمَكْسُوْرَةَ فِي الَّتِي كَسَرَتْهَا-
১৫০. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী উম্মাহাতুল মু'মিনীন-এর মধ্য থেকে কোনো একজনের নিকট অবস্থান করছিলেন। ইত্যবসরে তাঁর সহধর্মিণীদের মধ্য থেকে কোনো একজন (কিছু খাদ্যদ্রব্যসহ) একটি বাটি তাঁর কাছে প্রেরণ করেন। যে উম্মুল মু'মিনীনের নিকট তিনি ঐ দিন অবস্থান করছিলেন, তিনি খাদ্য নিয়ে আগমনকারীর হাতে হাত দ্বারা আঘাত করলেন। ফলে বাটি পড়ে গিয়ে ভেঙে গেলো। নবী তার উভয় টুক্রা তুলে নিলেন এবং তাকে একে অপরের সাথে মিলিয়ে নিলেন। এরপর ইতস্তত বিক্ষিপ্ত খাবারগুলো একত্রিত করে বললেন যে, তোমাদের মায়ের (উম্মুল মু'মিনীনের) আত্মমর্যাদাবোধে (আঘাত) লেগেছে, তোমরা খাবারগুলো খেয়ে ফেলো। সুতরাং সবাই তা খেয়ে ফেললো। খাবার নিয়ে আগমনকারী বাটি নেয়ার জন্য বসে রইল। ইতিমধ্যে বাটিটি যাঁর হাতে ভেঙেছিলো, তিনি তাঁর ঘর থেকে একটি নিখুঁত বাটি নিয়ে এলেন। নবী খাবার নিয়ে আগমনকারীকে ঐ নিখুঁত বাটিটি দিয়ে দিলেন এবং ভাঙা বাটিটি যিনি ভেঙেছিলেন তাঁরই ঘরে রেখে দিলেন।
ফায়দা : এ ঘটনাটিও নবী-এর মহৎ ক্ষমা গুণের জ্বলন্ত প্রমাণ। ঘটনাটি ছিলো এরূপ : রাসূলুল্লাহ্ উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-এর গৃহে অবস্থান করছিলেন। এই সময় তাঁর অন্য এক সহধর্মিণী কারো মাধ্যমে একটি বাটিতে করে কিছু খাবার নবী-এর নিকট পাঠালেন। একজন নারী হিসাবে হযরত আয়েশা (রা)-এর আত্মমর্যাদায় বাধলো যে, তাঁর গৃহে তাঁর কোনো সতীনের পক্ষ থেকে তাঁর স্বামীর জন্য খাবার আসবে। তাই তিনি ঐ কাজটি করলেন। একটু চিন্তা করুন, নবী-এর বিবেচনায় এ কাজটি কতখানি অপছন্দনীয় হতে পারে। কিন্তু তিনি তাঁর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পরম ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়ে হযরত আয়েশা (রা)-এর এহেন কাজের কোনো কৈফিয়ত তলব করলেন না কিংবা তাঁকে ভর্ৎসনাও করলেন না। বরং হযরত আয়েশা (রা)-এর পক্ষ থেকে নারী জাতির স্বভাবগত আত্মমর্যাদাবোধের (ঈর্ষা) ওজর পেশ করে অন্যদেরকেও নারীর এই স্বভাবগত দুর্বলতা সম্পর্কে অবহিত করলেন এবং বিক্ষিপ্ত খাবারগুলো একত্রিত করে নিজেও খেলেন ও অন্যদেরকেও খাওয়ালেন। বস্তুত এটা নবী-এরই মহান চরিত্রের প্রকৃষ্ট উদাহরণ যে, অপছন্দনীয় বিষয়ের অপছন্দনীয় অংশটুকু উপেক্ষা করে শুধু তার কৈফিয়ত তলব করা ও ভর্ৎসনা করা থেকেই বিরত থাকেননি, বরং তার সপক্ষে প্রকৃতিগত দাবির ওজরও বর্ণনা করেন।
١٥١ عَنْ أَنَسٍ قَالَ اِسْتَحْمَلَ أَبُو مُوسَى النَّبِيُّ ، فَوَافَقَ مِنْهُ شَغَلاً فَقَالَ وَاللَّهِ لَا أَحْمِلُكَ، فَلَمَّا قَفَا دَعَاهُ فَقَالَ يَارَسُوْلَ اللهِ قَدْ حَلَفْتَ لَا تَحْمِلُنِي قَالَ وَأَنَا أَحَلِفُ لَأَحْمِلَنَّكَ فَحَمَلَهُ .
১৫১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আবূ মূসা আশআরী (রা) নবী-এর নিকট সফরের জন্য বাহন চাইলেন। নবী তখন কোনো কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তাই তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! এখন আমি তোমাকে কোনো বাহন দেবো না। কিন্তু আবূ মূসা আশআরী (রা) যখন ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন নবী তাকে বাহন দেওয়ার জন্য ডাকলেন। তখন আবূ মূসা আশআরী (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি তো আমাকে বাহন না দেওয়ার কসম খেয়েছেন। নবী তখন বললেন, এখন আমি কসম করে বলছি যে, তোমাকে অবশ্যই বাহন দেবো। সুতরাং তিনি তাঁকে বাহন দিয়ে দিলেন।
ফায়দা: এ হাদীসের মর্ম সুস্পষ্ট। কোনো কোনো হাদীসে বর্ণিত আছে, যেহেতু তখন নবী এর নিকট দেওয়ার মতো কোনো বাহন ছিলো না, তাই তিনি বাহন দিতে অস্বীকার করেছিলেন। মুসলিম শরীফের (কিতাবুল ঈমান) এক হাদীসে হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, আমি একবার আমার কতিপয় আশআরী বন্ধুর সাথে নবী -এর নিকট সফরের জন্য বাহন চাইতে গেলাম। কিন্তু তিনি বাহন দিতে অস্বীকার করলেন। বললেন, আল্লাহ্র কসম! তোমাকে দেওয়ার মতো কোনো বাহন নেই। (বর্ণনাকারী বলেন) এরপর কিছুক্ষণ আমরা নবী -এর দরবারে অবস্থান করলাম। ইতিমধ্যে তাঁর কাছে কোথাও থেকে কিছু উট এসে গেলো। সুতরাং তিনি উটগুলোর মধ্য থেকে সাদা কুঁজওয়ালা তিনটা উট আমাদেরকে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। উট নিয়ে আমরা চলতে লাগলাম। আমি কিংবা আমাদের মধ্য থেকে কেউ বললো, এ উটগুলোর মধ্যে আল্লাহ্ বরকত দান করবেন না। কেননা, আমরা এসে যখন নবী -এর নিকট বাহন প্রার্থনা করেছিলাম, তখন তিনি বাহন না দেয়ার কসম খেয়েছিলেন। আর এখন আমাদেরকে বাহন দিয়েছিলেন। সুতরাং তারা নবী -এর নিকট ফিরে এলো এবং তাঁকে একথা জানালো। তিনি বললেন, আমি তো তোমাদেরকে বাহন দেইনি। তোমাদেরকে বাহন দিয়েছেন আল্লাহ্ তা'আলা। আর আল্লাহ্র কসম! আমি যদি কখনো কসম করি, এবং তার বিপরীতে তার চেয়ে উত্তম দেখতে পাই, তবে আমি সে কাজ করে ফেলি এবং কসমের কাফ্ফারা প্রদান করি।
এ হাদীস থেকে এও জানা গেলো, যদি কোনো বিষয়ে কসম খাওয়া হয় এবং এর বিপরীত কোন বস্তুতে মংগল বা কল্যাণ পরিলক্ষিত হয়, তবে ঐ কসম ভেঙে ফেলা উচিত এবং কসমের কাফ্ফারা প্রদান করা উচিত।
যেমন এক হাদীসে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, নবী বলেন, যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ে কসম খেয়েছে, তারপর ভিন্ন কাজ তার থেকে উত্তম পেয়েছে, ঐ উত্তম কাজটিই সে গ্রহণ করবে এবং সে তার পেছনের কসমের কাফ্ফারা প্রদান করবে। (মুসলিম শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮)
١٥٢. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كُسِرَتْ رُبَاعِيَّةُ النَّبِيِّ ﷺ يَوْمَ أَحُدٍ وَشَجَّ فَجَعَلَ الدَّمُ يَسِيلُ عَلَى وَجْهِهِ وَهُوَ يَمْسَحُ الدَّمُ وَيَقُولُ كَيْفَ يُفْلِحُ قَوْمُ خَضَبُوا وَجْهَ نَبِيِّهِمْ بِالدَّمِ وَهُوَ يَدْعُوهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ فَأَنْزَلَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْ
১৫২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উহুদ যুদ্ধের দিন নবী-এর দাঁত মুবারক ভেঙে গিয়েছিলো, শির মুবারক জখম হয়েছিল এবং রক্ত তাঁর চেহারা বেয়ে পড়ছিলো। তখন তিনি রক্ত মুছতে মুছতে বলছিলেন : সে জাতি কিরূপে কল্যাণ লাভ করতে পারে, যারা তাদের নবীর চেহারাকে রক্তে রঞ্জিত করে দিয়েছে। অথচ তিনি তাদেরকে আল্লাহর দীনের প্রতি দাওয়াত দিচ্ছেন। তখন মহান আল্লাহ্ এই আয়াত নাযিল করলেন : “لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْئٍ” এ ব্যাপারে আপনার কোনো ইখতিয়ার নেই।
ফায়দা : এটি উহুদ যুদ্ধের প্রসিদ্ধ ঘটনা, যা তৃতীয় হিজরীতে সংঘটিত হয়েছিলো। এ যুদ্ধেই প্রায় ৭০ জন সাহাবী শহীদ হয়েছিলেন। দৃঢ়তা, ত্যাগ ও জীবন কুরবানীর দরুনই আল্লাহ্ তা'আলা مسلمانوں একটি ক্ষুদ্র দলকে কাফিরদের বিরাট বাহিনীর মুকাবিলায় পরাজয়ের পর বিরাট বিজয় দান করেন। এই যুদ্ধেই এক হতভাগ্য আবদুল্লাহ্ ইব্ন কুমাইয়্যা মুসলমান ব্যূহ ভেদ করে সামনে অগ্রসর হয় এবং নবী -এর শিরস্ত্রাণের উপর তলোয়ারের আঘাত হানে। ফলে তাঁর দান্দান মুবারক শহীদ হয় এবং শির মুবারক জখম হয়। এই অবস্থায় তাঁর পবিত্র মুখ দিয়ে এই উক্তি নিঃসৃত হলো “সেই জাতি কিভাবে কল্যাণ লাভ করতে পারে, যারা তাদের নবীর চেহারাকে জখম করে দেয়।” কিন্তু আল্লাহ্ পাক রহমতে আলমের মুখ-নিঃসৃত এই উক্তি পছন্দ করলেন না। আয়াত নাযিল হলো : لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْئُ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظَالِمُونَ তাদের প্রতি ক্ষমাপরবশ হবেন অথবা তাদেরকে শাস্তি দিবেন এ বিষয়ে (হে নবী) আপনার করণীয় কিছুই নেই। কারণ তারা সীমালংঘনকারী।
এ ঘটনা থেকেই অনুমান করুন যে, নবী কি পরিমাণ ক্ষমা ও দয়া প্রদর্শন করতেন। মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার পরও তিনি ঐ কাফির ও মুশরিকদের জন্য মুখে বদ্ দু'আ করেননি এবং একজন মানুষ হিসেবে তাঁর পবিত্র মুখ থেকে যে উক্তি প্রকাশ পেয়েছে তাও আল্লাহ্র নিকট তাঁর মর্যাদার উপযুক্ত মনে করা হয়নি। তাই আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে তৎক্ষণাৎ বলে দেয়া হয়েছে যে, এটা আপনার কাজ নয়। আপনার কাজ তো হচ্ছে ক্ষমা ও দয়া প্রদর্শন করা। কেননা, আপনাকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমতরূপে প্রেরণ করা হয়েছে।
রিওয়ায়াতসমূহে দেখা যায় যে, এই কষ্টদায়ক জখম অবস্থায়ও নবী -এর মুখে ছিলো এই বাণী : رَبِّ اغْفِرْ قَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ "হে আল্লাহ্! আমার জাতিকে তুমি ক্ষমা করো। কেননা, তারা জানে না।
١٥٣ عَنِ الشَّفَاءِ بِنْتِ عَبْدِ اللهِ قَالَتْ أَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَوْمًا أَسْأَلُهُ شَيْئاً فَجَعَلَ يَعْتَذِرُ إِلَى -
১৫৩. হযরত শিফা বিন্ত আবদুল্লাহ্ (রা) বলেন, একবার আমি কিছু চাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট গেলাম। কিন্তু তিনি আমার কাছে অপারগতা প্রকাশ করলেন। (কেননা, তাঁর নিকট তখন দেয়ার মতো কোনো সম্পদ ছিলো না।)
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী এ সাহাবিয়াকে অভদ্র বা শক্ত কথা বলে বিদায় করেননি। বরং সৌজন্য ও ভদ্রতা বজায় রেখে তার কাছে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন যে, এখন আমার কাছে দেয়ার মতো কিছু নেই। নচেৎ আমি তোমাকে অবশ্যই কিছু দিতাম। অথচ এই অপারগতা প্রকাশ করারও তাঁর প্রয়োজন ছিল না।
١٥٤ عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ فَمَا زَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَعْتَنِزُ إِلَى صَفِيَّةَ وَيَقُولُ يَا صَفِيَّةُ إِنَّ أَبَاكَ أَلَّبَ عَلَى الْعَرَبِ وَفَعَلَ حَتَّى ذَهَبَ ذَلِكَ مِنْ نَفْسِهَا -
১৫৪. হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (উম্মুল মু'মিনীন হযরত) সাফিয়্যা (রা)-এর কাছে (তাঁর পিতার হত্যা সম্পর্কে, যে খায়বারের যুদ্ধে مسلمانوں হাতে নিহত হয়েছিল) ওজর পেশ করতে থাকেন এবং বললেন : হে সাফিয়্যা! তোমার পিতাই তো সারা আরবের লোকদেরকে مسلمانوں বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য উস্কিয়ে ছিলো এবং তাদেরকে সমবেত করেছিলো। এরূপ ওজর পেশ করার দরুন তাঁর অন্তর থেকে এই দুঃখ অন্তর্হিত হয়ে যায়।
ফায়দা : উম্মুল মু'মিনীন হযরত সাফিয়্যা (রা) খায়বার অধিপতির কন্যা ছিলেন। তাঁর স্বামী ছিলো বনূ নাযীর গোত্রের বিরাট ধনী ব্যক্তি। পিতা ও স্বামী উভয়েই খায়বারের যুদ্ধে নিহত হয়েছিলো। খায়বার দুর্গ বিজিত হওয়ার পর অন্যান্য যুদ্ধবন্দীর সাথে হযরত সাফিয়্যাও বন্দী হন। তাঁর এই আভিজাত্য ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের দরুন এবং তাঁর মনোরঞ্জন ও মনস্তুষ্টির জন্য নবী-এর তাঁকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করা ছাড়া কোনো উপায় ছিলো না। তাই তিনি গনীমত বণ্টনের মাধ্যমে নবী-এর ভাগে পড়লেন এবং তিনি তাঁকে তৎক্ষণাৎ আযাদ করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলেন। কিন্তু এরপর যখনই তাঁর পিতার কথা মনে পড়তো যে, সে مسلمانوں হাতে খায়বারের যুদ্ধে নিহত হয়েছে, তখন পিতৃত্বের ভালবাসার কারণে নবী-এর কাছে সে সম্পর্কে অভিযোগ উত্থাপন করতেন। নবী তাঁর মনে ব্যথা দিতেন না এবং কোনো রকম ধমক বা তিরস্কার না করে তাঁর সামনে যুক্তিসঙ্গত ওজর পেশ করতেন। তিনি বলতেন দেখ (দোষটা তো তোমার পিতারই), তোমার পিতাই তো স্বয়ং যুদ্ধ শুরু করেছিলো। যুদ্ধ না করলে সে মারাও যেতো না। সে-ই তো সারা আরবকে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্ররোচিত করেছিলো ও উস্কিয়ে দিয়েছিলো। নবী এ ভাবে স্নেহ ও নম্রতা সহকারে তাঁকে বোঝাতেন। ফলে এক সময় তাঁর অন্তর থেকে এই ব্যথা সম্পূর্ণ দূর হয়ে যায়। তিনি আর কোনো দিন এ বিষয়ে নবী -এর নিকট কোনো অভিযোগ করেননি।
١٥٥ عَنِ الْمُهَاجِرِ بْنِ قُنْفُذِ أَنَّهُ أَتَى النَّبِيَّ ﷺ وَهُوَ يَبُولُ فَسَلَّمُ عَلَيْهِ فَلَمْ يَرُدُّ عَلَيْهِ ثُمَّ تَوَضَّا ثُمَّ اعْتذَرَ إِلَيْهِ فَقَالَ إِنِّي كَرِمْتُ أَنْ أَذْكُرَ اللَّهَ إِلَّا عَلَى طُهُرٍ -
১৫৫. হযরত মুহাজির ইন্ন কুনফুয (রা) থেকে বর্ণিত, একবার তিনি নবী-এর নিকট উপস্থিত হন এবং সালাম করেন। নবী ঐ সময় পেশাব করছিলেন। তাই তিনি সালামের জবাব দিলেন না। তারপর (পেশাব শেষ করে) তিনি ওযু করে তার কাছে ওজর পেশ করলেন। বললেন, পবিত্রতা ছাড়া আল্লাহ্ নাম নেয়া আমার কাছে ভাল মনে হয়নি।
📄 নবী (সা) কর্তৃক অপছন্দনীয় জিনিস পরিহার ও এড়িয়ে যাওয়া সম্পর্কিত রিওয়ায়াতসমূহ
١٤٤. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَلْمًا يُوَاجِهُ أَحَدًا بِشَيْءٍ يَكْرَهُهُ، فَقَرَّبَ إِلَيْهِ صَفْحَةٌ فِيهَا قَرْعٌ وَكَانَ يَلْتَمِسُهُ بِاصَابِعِهِ فَدَخَلَ رَجُلٌ عَلَيْهِ أَثْرُ صُفْرَةٍ فَكَرِهَهُ ، فَلَمْ يَقُلْ لَهُ شَيْئًا حَتَّى خَرَجَ ، فَقَالَ بَعْضُ الْقَوْمِ لَوْ قُلْتُمْ لِهَذَا أَنْ يَدَعْ هَذِهِ يَعْنِي الصُّفْرَةُ -
১৪৪. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর অভ্যাস ছিলো, তিনি কারো সামনা-সামনি কোনো কথা খুব কমই বলতেন। অর্থাৎ তাঁর অপছন্দনীয় কোন জিনিস দেখলেও সামনা-সামনি খুব কমই তার প্রতিবাদ করতেন। (সুতরাং) একবার তাঁর সামনে লাউ তরকারির একটি পেয়ালা পেশ করা হলো। তিনি অঙ্গুলি দ্বারা লাউয়ের টূকরা খোঁজ করছিলেন। তখন এমন এক ব্যক্তি তাঁর নিকট প্রবেশ করলো যার গায়ে হলুদ রং-এর খুশবু চিহ্ন পরিলক্ষিত হচ্ছিল। লোকটির এভাবে নবী-এর নিকট আসা তাঁর পছন্দ হলো না। কিন্তু তিনি তাকে কিছুই বললেন না। লোকটির এ ধরনের রং ব্যবহার নবী-এর পছন্দ হলো না, কিন্তু তিনি কিছুই বলার পূর্বে লোকটি বের হয়ে গেল। তখন নবী অপর এক ব্যক্তিকে বললেন, তুমি যদি সে লোকটিকে বলে দিতে যে, হলুদ রং ব্যবহার ছেড়ে দিলেই ভাল হতো।
ফায়দা: এই হাদীস দ্বারা বোঝা যায় নবী কারো থেকে অপছন্দনীয় কোন জিনিস হতে দেখে সাথে সাথেই তাকে সাবধান করতেন না। বরং অধিকাংশ সময় উম্মতের প্রতি সহানুভূতিবশত এড়িয়ে যেতেন। লোকটিকে তৎক্ষণাৎ সামনা-সামনি কিছু না বলার পেছনে রহস্য এই ছিলো যে, এভাবে সামনা-সামনি বললে হয়ত লোকটি তাঁর কথা মান্য না করতেও পারে। এতে লোকটির ইহলোক ও পরলোকের সমূহ ক্ষতি হয়ে যাবে। আর নবী-এর কর্মনীতি এসব বিষয়ের ব্যাপারে হতো যা কোন 'উত্তম কাজ' পরিহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো। এবং এরূপ বিষয়ে দেরিতে সাবধান করলে কোনরূপ ক্ষতি নেই। কিন্তু কোন হারাম ও শরীয়ত নিষিদ্ধ অশ্লীল কাজের বিষয়ে তিনি তৎক্ষণাৎই পাকড়াও করতেন। যাহোক নবী ছিলেন তাঁর উম্মতের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ও মেহেরবান। তাঁর এই দয়া ও স্নেহের কারণেই তিনি কোন অপছন্দনীয় ব্যাপারে যা শরীয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ নহে সঙ্গে সঙ্গে পাকড়াও করতেন না। এর দ্বারা নবী-এর উত্তম তালীম ও তারবিয়াতের (শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ) অনুমান করা যায়।
١٤٥. عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ الْحَكَمِ قَالَ صَلَّيْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَعَطَسَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ فَقُلْتُ يَرْحَمُكَ اللهُ فَرَمَانِي الْقَوْمُ بِأَبْصَارِهِمْ وَضَرَبُوا بِأَيْدِيهِمْ عَلَى أَفْخَانِهِمْ فَلَمَّا رَأَيْتُهُمْ يُصْمِتُونَى لَكِنِّي سَكَتْ قَالَ فَدَعَانِي النَّبِيُّ ﷺ بِأَبِي وَأُمِّي مَا رَأَيْتُ مُعَلَّمًا أَحْسَنَ تَعْلِيمًا مِنْهُ مَا ضَرَبَنِي وَلَا سَبَّنِي ثُمَّ قَالَ إِنَّ هَذِهِ الصَّلَاةُ لَا يَصْلِحُ فِيهَا شَيْءٌ مِنْ كَلَامِ النَّاسِ إِنَّمَا هُوَ التَّسْبِيحُ وَالتَّكْبِيرُ والتَّمْحِيدُ .
১৪৫. হযরত মুয়াবিয়া ইব্ন আবুল হাকাম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি রাসূলুল্লাহ্-এর সাথে জামায়াতে নামায আদায় করি। (নামাযের মধ্যেই) এক ব্যক্তির হাঁচি এল। রাবী বলেন, (আমি 'আলহামদুলিল্লাহ্'-এর জবাবে) 'ইয়ারহামুকাল্লাহ্' বলে ফেললাম। তখন নামাযরত লোকেরা আমাকে চোখ তুলে দেখতে লাগলো এবং উরুর উপর হাত মারতে শুরু করলো। আমি দেখলাম তারা আমাকে জোর করে চুপ করাতে যাচ্ছে (তখন আমার খুব খারাপ লাগলো)। কিন্তু আমি নিশ্চুপ রইলাম। (নামায শেষে) নবী আমাকে ডাকলেন। আমার মাতাপিতা তাঁর জন্য কুরবান হোন। আমি নবী-এর চেয়ে কোন উত্তম শিক্ষক দেখি নাই। তিনি আমাকে না মারধর করলেন, না বকাঝকা করলেন। তারপর বললেন: নামাযে দুনিয়াবী কথাবার্তা বলা ঠিক নয়, নামায হলো আল্লাহ্র তাসবীহ্ (গুণগান) তাকবীর (মহানত্ব) তামহীদ (প্রশংসা)-এর নাম।
ফায়দা : এ ঘটনা হলো তখনকার যখন হযরত মুয়াবিয়া ইব্ন আবুল হাকাম (রা) ছিলেন নও মুসলিম। তখনও তিনি নামাযের সকল বিধি-বিধান শিখতে পারেন নি। তাই এ ঘটনা ঘটে গেল। হযরত মুয়াবিয়া (রা) নিজেই বলেন, ইসলাম গ্রহণের পর আমাকে ইসলামের কিছু কিছু বিধি-বিধান শেখানো হয়েছিলো। তন্মধ্যে আমাকে এও শেখানো হয়েছিলো যে, তোমার হাঁচি এলে 'আলহামদুলিল্লাহ্' বলবে। আর যদি অপর কারো হাঁচি আসে এবং সে 'আলহামদুল্লিাহ্' বলে তবে এর জবাবে তুমি 'ইয়ারহামুকাল্লাহ্' বলবে। হযরত মুয়াবিয়া (রা) বলেন, একবার আমি নবী-এর সাথে নামায পড়ছিলাম। এক ব্যক্তির হাঁচি এল। আর সে 'আলহামদুলিল্লাহ্' বললো। আমি তার জবাবে 'ইয়ারহামুকাল্লাহ্' বললাম। লোকেরা আমার দিকে চোখ তুলে তাকাতে লাগলো। বিষয়টি আমার ভীষণ খারাপ লাগলো। আমি নামাযের মধ্যেই তাদেরকে বলে ফেললাম তোমরা আমার দিকে চোখ তুলে কেনো দেখছো? আমার এ অবস্থা দেখে তারা সুবহানাল্লাহ্ বললো। তারপর নবী যখন নামায শেষ করলেন তখন জিজ্ঞেস করলেন, নামাযে কে কথা বললো? তারপর তিনি নিজেই বললেন: এ বেদুঈন। তারপর তিনি আমাকে ডাকলেন এবং বললেন, নামায ৩ কুরআন পড়া, এবং আল্লাহ্র যিকরের জন্য। সুতরাং তুমি যখন নামাযে থাকবে তখন এ সবই পড়বে। (দুনিয়াবী কথাবার্তা বলবে না।) এ ঘটনা বর্ণনার পর বর্ণনাকারী বলেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ্-এর চেয়ে স্নেহপরায়ণ ও মেহেরবান শিক্ষক জীবনেও দেখিনি।
গ্রন্থকারের এ হাদীসটি এ অনুচ্ছেদে সংকলনের উদ্দেশ্য হলো নবী কর্তৃক সাহাবায়ে কিরামের বিভিন্ন ছোট-খাটো ত্রুটিবিচ্যুতি এড়িয়ে যাওয়ার অবস্থা বর্ণনা করা এবং তিনি কিভাবে ভালবাসা ও স্নেহ-মমতা দিয়ে তালীম দিতেন তা তুলে ধরা। নবী-এর এই অনুপম আদর্শ আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্মের অনুসরণ করা একান্ত কর্তব্য।
١٤٦. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ قَاعِدًا فِي الْمَسْجِدِ وَأَصْحَابُهُ مَعَهُ إِذْ جَاءَ أَعْرَابِيُّ فَبَالَ فِي الْمَسْجِدِ فَقَالَ أَصْحَابُ النَّبِيِّ ﷺ مَا مَنْ فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ لَا تَزْرِمُوهُ ثُمَّ قَالَ إِنَّ هَذِهِ الْمَسَاجِدَ لَا تَصْلُحُ لِشَيْءٍ مِنَ الْقَدْرِ وَالْبَوْلِ وَالْخَلَاءِ أَوْ كَمَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ
১৪৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ মসজিদে অবস্থান করছিলেন। সাহাবা কিরামও তাঁর সাথে বসেছিলেন। ইত্যবসরে এক বেদুঈন সেখানে আসল এবং মসজিদের মধ্যেই (এক পাশে) পেশাব করতে লাগলো। সাহাবা কিরাম হায়! হায়! বলে তাকে পেশাব করতে বিরত রাখতে চাইলেন। কিন্তু নবী বললেন : তাকে পেশাব করতে বাধা দিও না। তারপর ঐ বেদুঈন যখন পেশাব করা শেষ করলো, তখন তাকে তিনি বললেন, দেখো, এই মসজিদগুলো আবর্জনা ছড়ানো ও পেশাব পায়খানা করার জন্য নয়। কিংবা এই ধরনেরই কোনো উক্তি রাসূলুল্লাহ্ করেছেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকেও নবী-এর অপরিসীম দয়া ও মমত্ববোধের অনুমান করা যায়। কোনো কোনো রিওয়ায়াতে আছে, ঐ বেদুঈন যখন পেশাব করা শেষ করলো, তখন নবী পানি আনিয়ে স্বয়ং এ স্থানটি ধৌত ও পবিত্র করান। পেশাব করার মাঝখানে ঐ বেদুঈনকে বাধা দিতে তাঁর নিষেধ করার কারণ হচ্ছে, পেশাব করার মাঝখানে বাধা দিলে তাতে তার কষ্ট হতে পারতো এবং মূত্রনালিতে পেশাব আটকে যেতে পারতো। এক রিওয়ায়াতে আছে, নবী ঐ ব্যক্তিকে ডেকে বললেন : এই মসজিদসমূহ পেশাব ও ময়লা ছড়ানোর জন্য নয়। এগুলো আল্লাহ্ তা'আলার যিক্র, নামায ও কুরআন তিলাওয়াত করার জন্য বানানো হয়েছে। এ হাদীসগুলো উম্মতের সাধারণ মানুষের জন্য উপদেশ ও তালীম-তারবিয়াতের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে এক বিরাট শিক্ষা। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের মূর্খসুলভ কাজকর্মে ধৈর্যধারণ করে তাদেরকে স্নেহ ও ভালবাসার সাথে দীনী বিষয়সমূহ শিক্ষা দেয়া উচিত।
١٤٧. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ إِذَا بَلَغَهُ مَنْ رَجُلٍ شَيْءٍ لَمْ يَقُلْ لَهُ قُلْتَ كَذَا وَكَذَا بَلْ قَالَ مَا بَالُ القَوَامِ يَقُولُوْنَ كَذَا وَكَذَا -
১৪৭. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ যখন কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো অপছন্দনীয় বিষয় অবগত হতেন, তখন তিনি তাকে সম্বোধন করে একথা বলতেন না যে, তুমি এরূপ এরূপ বলেছো। বরং তিনি (অনির্দিষ্টভাবে) বলতেন, লোকদের কি হয়েছে যে, তারা এরূপ এরূপ কথা বলছে?
ফায়দা : এ হাদীস থেকেও নবী সুসামাজিকতা ও মননশীলতার অনুমান করা যায়। তিনি কখনো কাউকে সম্বোধন করেও সাবধান করতেন না। আর কারো নাম ধরেও তার অপছন্দনীয় বিষয় প্রকাশ করতেন না। বরং তিনি যদি কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো অপছন্দনীয় বিষয় অবহিত হতেন এবং তিনি তাকে সতর্ক করতে চাইতেন, তবে সাধারণভাবে সাবধান করে দিতেন। যেমন তিনি বলতেন, লোকদের কি হয়েছে যে, এরূপ অলীক কথা বলে। তিনি কখনো এরূপ বলতেন না যে, অমুক ব্যক্তির কি হয়েছে যে, এরূপ অলীক কথা বলে। এ হচ্ছে তালীম-তারবিয়াতের এমন এক শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি যাতে ঝগড়া-বিবাদ ও শত্রুতা সৃষ্টি হয় না। আর যাকে উদ্দেশ্য করে একথা বলা হলো, সেও তার ভ্রান্তির ব্যাপারে অপর লোকের সামনে লজ্জিত হয় না। সামাজিক আচার বা শিক্ষার ব্যাপকতা ও সার্বজনীনতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ তাঁর উম্মতকে কত পূর্ণাঙ্গ দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, তা এই ধরনের ঘটনাবলি থেকেই অনুমিত হয়। আল্লাহ্ তা'আলা আমাদেরকে তাঁর পদাংক অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন।
١٤٨ عَنْ عِمْرَانَ bْنِ الْحُصَيْنِ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ إِذَا كَرِهَ شَيْئًا عُرِفُ ذَلِكَ فِي وَجْهِهِ -
১৪৮. হযরত ইমরান ইবন হুসায়ন (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যখন কোনো বিষয় অপছন্দ করতেন, তা তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল থেকেই অনুমান করা যেতো।
ফায়দা : এ বিষয়ে অন্যান্য হাদীস এবং পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদ "নবী-এর সন্তুষ্টির ও অসন্তুষ্টি নিদর্শন"-এ সবিস্তার বর্ণিত হয়েছে।
এখানে গ্রন্থকার এ হাদীসটি কেবল এজন্য বর্ণনা করেছেন যে, নবী প্রতিটি বিষয়ে সামনা-সামনি কাউকে ভর্ৎসনা করতেন না, বরং তিনি কোনো বিষয়কে অপছন্দ করলে নীরব থাকতেন। কিন্তু এই অপছন্দ তাঁর মুখমণ্ডলে অবশ্যই প্রকাশ পেতো। কোনো কোনো অপছন্দনীয় বিষয় এমন হয়, যা কেবল চেহারা দ্বারা প্রকাশ করাই যথেষ্ট হয় এবং কোনো কোনো বিষয় মুখে প্রকাশ করারও প্রয়োজন হয়। প্রথম হাদীসটি শেষোক্ত বিষয় সম্পর্কিত ছিলো। অনুরূপভাবে কোনো কোনো লোক এমন হয়ে থাকে, যাদের সতর্ক করার জন্য কেবল চেহারা দ্বারা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করাই যথেষ্ট হয় এবং কোনো কোনো লোককে সতর্ক করার জন্য মুখে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। এই দুই হাদীসের মধ্যে নবী -এর কর্ম-পদ্ধতির পার্থক্য এর উপরই নির্ভরশীল। যা হোক, নবী যে সব লোককে সংশোধন করতে চাইতেন, তিনি তার কথা ও কাজ দ্বারা তার মনে কোনো কষ্ট দিতেন না। কেননা, সংশোধন ও শিক্ষা-দীক্ষার কাজে মনে কষ্ট দান ক্ষতিকর। এতে ভালোর চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়।
١٤٩. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا اسْتَدْ وَجْهُهُ أَكْثَرَ مَسًّ لِحْيَتِهِ-
১৪৯. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ যখন কোনো কঠিন সংকটে পতিত হতেন, তখন তিনি বারংবার (মুবারক) দাড়িতে হাত বুলাতেন।
ফায়দা: এ অবস্থা রাসূলুল্লাহ্-এর চরম ধৈর্য ও সহিষ্ণুতাকেই প্রকাশ করে। নচেৎ সাধারণত মানুষ এরূপ ক্ষেত্রে মুখে তার মনের আক্রোশ প্রকাশ করে থাকে। কিন্তু তাতে সাধারণত ক্ষতি হয়। ন্যূনপক্ষে এই দুঃখ ও উষ্মা প্রকাশে মানুষের মনে কষ্ট হয়। এ কারণে রাসূলুল্লাহ্ এ পদ্ধতি পরিহার করতেন এবং স্বয়ং কষ্ট সহ্য করতেন।
١٥٠. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ النَّبِىُّ ﷺ عِنْدَ إِحْدَى أُمَّهَاتِ الْمُؤْمِنِيْنَ فَأَرْسَلَتْ إِحْدَى نِسَائِهِ بِقَصْعَةِ فِيْهَا طَعَامٌ، فَضَرَبَتْ بِيَدِ الرَّسُولِ فَسَقَطَتْ الْقَصْعَةُ فَانْكَسَرَتْ، فَأَخَذَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ الْكِسْرَتَيْنِ فَضَمَّ إِحْدَاهُمَا الْأُخْرَى ثُمَّ جَعَلَ وَيَجْمَعُ الطَّعَامَ فَيَقُولُ غَارَتْ أُمُّكُمْ كُلُوا فَكُلُوا ، فَجَلَسَ الرَّسُولُ حَتَّى جَاءَتْ الْكَاسِرَةُ بِقَصْعَتِهَا الَّتِي هِيَ فِي بَيْتِهَا فَدَفَعَ الصُّحْفَةَ الصَّحِيْحَةَ إِلَى الرَّسُوْلِ وَتَرَكَ الْمَكْسُوْرَةَ فِي الَّتِي كَسَرَتْهَا-
১৫০. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী উম্মাহাতুল মু'মিনীন-এর মধ্য থেকে কোনো একজনের নিকট অবস্থান করছিলেন। ইত্যবসরে তাঁর সহধর্মিণীদের মধ্য থেকে কোনো একজন (কিছু খাদ্যদ্রব্যসহ) একটি বাটি তাঁর কাছে প্রেরণ করেন। যে উম্মুল মু'মিনীনের নিকট তিনি ঐ দিন অবস্থান করছিলেন, তিনি খাদ্য নিয়ে আগমনকারীর হাতে হাত দ্বারা আঘাত করলেন। ফলে বাটি পড়ে গিয়ে ভেঙে গেলো। নবী তার উভয় টুক্রা তুলে নিলেন এবং তাকে একে অপরের সাথে মিলিয়ে নিলেন। এরপর ইতস্তত বিক্ষিপ্ত খাবারগুলো একত্রিত করে বললেন যে, তোমাদের মায়ের (উম্মুল মু'মিনীনের) আত্মমর্যাদাবোধে (আঘাত) লেগেছে, তোমরা খাবারগুলো খেয়ে ফেলো। সুতরাং সবাই তা খেয়ে ফেললো। খাবার নিয়ে আগমনকারী বাটি নেয়ার জন্য বসে রইল। ইতিমধ্যে বাটিটি যাঁর হাতে ভেঙেছিলো, তিনি তাঁর ঘর থেকে একটি নিখুঁত বাটি নিয়ে এলেন। নবী খাবার নিয়ে আগমনকারীকে ঐ নিখুঁত বাটিটি দিয়ে দিলেন এবং ভাঙা বাটিটি যিনি ভেঙেছিলেন তাঁরই ঘরে রেখে দিলেন।
ফায়দা : এ ঘটনাটিও নবী-এর মহৎ ক্ষমা গুণের জ্বলন্ত প্রমাণ। ঘটনাটি ছিলো এরূপ : রাসূলুল্লাহ্ উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-এর গৃহে অবস্থান করছিলেন। এই সময় তাঁর অন্য এক সহধর্মিণী কারো মাধ্যমে একটি বাটিতে করে কিছু খাবার নবী-এর নিকট পাঠালেন। একজন নারী হিসাবে হযরত আয়েশা (রা)-এর আত্মমর্যাদায় বাধলো যে, তাঁর গৃহে তাঁর কোনো সতীনের পক্ষ থেকে তাঁর স্বামীর জন্য খাবার আসবে। তাই তিনি ঐ কাজটি করলেন। একটু চিন্তা করুন, নবী-এর বিবেচনায় এ কাজটি কতখানি অপছন্দনীয় হতে পারে। কিন্তু তিনি তাঁর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পরম ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়ে হযরত আয়েশা (রা)-এর এহেন কাজের কোনো কৈফিয়ত তলব করলেন না কিংবা তাঁকে ভর্ৎসনাও করলেন না। বরং হযরত আয়েশা (রা)-এর পক্ষ থেকে নারী জাতির স্বভাবগত আত্মমর্যাদাবোধের (ঈর্ষা) ওজর পেশ করে অন্যদেরকেও নারীর এই স্বভাবগত দুর্বলতা সম্পর্কে অবহিত করলেন এবং বিক্ষিপ্ত খাবারগুলো একত্রিত করে নিজেও খেলেন ও অন্যদেরকেও খাওয়ালেন। বস্তুত এটা নবী-এরই মহান চরিত্রের প্রকৃষ্ট উদাহরণ যে, অপছন্দনীয় বিষয়ের অপছন্দনীয় অংশটুকু উপেক্ষা করে শুধু তার কৈফিয়ত তলব করা ও ভর্ৎসনা করা থেকেই বিরত থাকেননি, বরং তার সপক্ষে প্রকৃতিগত দাবির ওজরও বর্ণনা করেন।
١٥١ عَنْ أَنَسٍ قَالَ اِسْتَحْمَلَ أَبُو مُوسَى النَّبِيُّ ، فَوَافَقَ مِنْهُ شَغَلاً فَقَالَ وَاللَّهِ لَا أَحْمِلُكَ، فَلَمَّا قَفَا دَعَاهُ فَقَالَ يَارَسُوْلَ اللهِ قَدْ حَلَفْتَ لَا تَحْمِلُنِي قَالَ وَأَنَا أَحَلِفُ لَأَحْمِلَنَّكَ فَحَمَلَهُ .
১৫১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আবূ মূসা আশআরী (রা) নবী-এর নিকট সফরের জন্য বাহন চাইলেন। নবী তখন কোনো কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তাই তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! এখন আমি তোমাকে কোনো বাহন দেবো না। কিন্তু আবূ মূসা আশআরী (রা) যখন ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন নবী তাকে বাহন দেওয়ার জন্য ডাকলেন। তখন আবূ মূসা আশআরী (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি তো আমাকে বাহন না দেওয়ার কসম খেয়েছেন। নবী তখন বললেন, এখন আমি কসম করে বলছি যে, তোমাকে অবশ্যই বাহন দেবো। সুতরাং তিনি তাঁকে বাহন দিয়ে দিলেন।
ফায়দা: এ হাদীসের মর্ম সুস্পষ্ট। কোনো কোনো হাদীসে বর্ণিত আছে, যেহেতু তখন নবী এর নিকট দেওয়ার মতো কোনো বাহন ছিলো না, তাই তিনি বাহন দিতে অস্বীকার করেছিলেন। মুসলিম শরীফের (কিতাবুল ঈমান) এক হাদীসে হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, আমি একবার আমার কতিপয় আশআরী বন্ধুর সাথে নবী -এর নিকট সফরের জন্য বাহন চাইতে গেলাম। কিন্তু তিনি বাহন দিতে অস্বীকার করলেন। বললেন, আল্লাহ্র কসম! তোমাকে দেওয়ার মতো কোনো বাহন নেই। (বর্ণনাকারী বলেন) এরপর কিছুক্ষণ আমরা নবী -এর দরবারে অবস্থান করলাম। ইতিমধ্যে তাঁর কাছে কোথাও থেকে কিছু উট এসে গেলো। সুতরাং তিনি উটগুলোর মধ্য থেকে সাদা কুঁজওয়ালা তিনটা উট আমাদেরকে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। উট নিয়ে আমরা চলতে লাগলাম। আমি কিংবা আমাদের মধ্য থেকে কেউ বললো, এ উটগুলোর মধ্যে আল্লাহ্ বরকত দান করবেন না। কেননা, আমরা এসে যখন নবী -এর নিকট বাহন প্রার্থনা করেছিলাম, তখন তিনি বাহন না দেয়ার কসম খেয়েছিলেন। আর এখন আমাদেরকে বাহন দিয়েছিলেন। সুতরাং তারা নবী -এর নিকট ফিরে এলো এবং তাঁকে একথা জানালো। তিনি বললেন, আমি তো তোমাদেরকে বাহন দেইনি। তোমাদেরকে বাহন দিয়েছেন আল্লাহ্ তা'আলা। আর আল্লাহ্র কসম! আমি যদি কখনো কসম করি, এবং তার বিপরীতে তার চেয়ে উত্তম দেখতে পাই, তবে আমি সে কাজ করে ফেলি এবং কসমের কাফ্ফারা প্রদান করি।
এ হাদীস থেকে এও জানা গেলো, যদি কোনো বিষয়ে কসম খাওয়া হয় এবং এর বিপরীত কোন বস্তুতে মংগল বা কল্যাণ পরিলক্ষিত হয়, তবে ঐ কসম ভেঙে ফেলা উচিত এবং কসমের কাফ্ফারা প্রদান করা উচিত।
যেমন এক হাদীসে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, নবী বলেন, যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ে কসম খেয়েছে, তারপর ভিন্ন কাজ তার থেকে উত্তম পেয়েছে, ঐ উত্তম কাজটিই সে গ্রহণ করবে এবং সে তার পেছনের কসমের কাফ্ফারা প্রদান করবে। (মুসলিম শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮)
١٥٢. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كُسِرَتْ رُبَاعِيَّةُ النَّبِيِّ ﷺ يَوْمَ أَحُدٍ وَشَجَّ فَجَعَلَ الدَّمُ يَسِيلُ عَلَى وَجْهِهِ وَهُوَ يَمْسَحُ الدَّمُ وَيَقُولُ كَيْفَ يُفْلِحُ قَوْمُ خَضَبُوا وَجْهَ نَبِيِّهِمْ بِالدَّمِ وَهُوَ يَدْعُوهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ فَأَنْزَلَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْ
১৫২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উহুদ যুদ্ধের দিন নবী-এর দাঁত মুবারক ভেঙে গিয়েছিলো, শির মুবারক জখম হয়েছিল এবং রক্ত তাঁর চেহারা বেয়ে পড়ছিলো। তখন তিনি রক্ত মুছতে মুছতে বলছিলেন : সে জাতি কিরূপে কল্যাণ লাভ করতে পারে, যারা তাদের নবীর চেহারাকে রক্তে রঞ্জিত করে দিয়েছে। অথচ তিনি তাদেরকে আল্লাহর দীনের প্রতি দাওয়াত দিচ্ছেন। তখন মহান আল্লাহ্ এই আয়াত নাযিল করলেন : “لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْئٍ” এ ব্যাপারে আপনার কোনো ইখতিয়ার নেই।
ফায়দা : এটি উহুদ যুদ্ধের প্রসিদ্ধ ঘটনা, যা তৃতীয় হিজরীতে সংঘটিত হয়েছিলো। এ যুদ্ধেই প্রায় ৭০ জন সাহাবী শহীদ হয়েছিলেন। দৃঢ়তা, ত্যাগ ও জীবন কুরবানীর দরুনই আল্লাহ্ তা'আলা मुसलमानों একটি ক্ষুদ্র দলকে কাফিরদের বিরাট বাহিনীর মুকাবিলায় পরাজয়ের পর বিরাট বিজয় দান করেন। এই যুদ্ধেই এক হতভাগ্য আবদুল্লাহ্ ইব্ন কুমাইয়্যা মুসলমান ব্যূহ ভেদ করে সামনে অগ্রসর হয় এবং নবী -এর শিরস্ত্রাণের উপর তলোয়ারের আঘাত হানে। ফলে তাঁর দান্দান মুবারক শহীদ হয় এবং শির মুবারক জখম হয়। এই অবস্থায় তাঁর পবিত্র মুখ দিয়ে এই উক্তি নিঃসৃত হলো “সেই জাতি কিভাবে কল্যাণ লাভ করতে পারে, যারা তাদের নবীর চেহারাকে জখম করে দেয়।” কিন্তু আল্লাহ্ পাক রহমতে আলমের মুখ-নিঃসৃত এই উক্তি পছন্দ করলেন না। আয়াত নাযিল হলো : لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْئُ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظَالِمُونَ তাদের প্রতি ক্ষমাপরবশ হবেন অথবা তাদেরকে শাস্তি দিবেন এ বিষয়ে (হে নবী) আপনার করণীয় কিছুই নেই। কারণ তারা সীমালংঘনকারী।
এ ঘটনা থেকেই অনুমান করুন যে, নবী কি পরিমাণ ক্ষমা ও দয়া প্রদর্শন করতেন। মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার পরও তিনি ঐ কাফির ও মুশরিকদের জন্য মুখে বদ্ দু'আ করেননি এবং একজন মানুষ হিসেবে তাঁর পবিত্র মুখ থেকে যে উক্তি প্রকাশ পেয়েছে তাও আল্লাহ্র নিকট তাঁর মর্যাদার উপযুক্ত মনে করা হয়নি। তাই আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে তৎক্ষণাৎ বলে দেয়া হয়েছে যে, এটা আপনার কাজ নয়। আপনার কাজ তো হচ্ছে ক্ষমা ও দয়া প্রদর্শন করা। কেননা, আপনাকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমতরূপে প্রেরণ করা হয়েছে।
রিওয়ায়াতসমূহে দেখা যায় যে, এই কষ্টদায়ক জখম অবস্থায়ও নবী -এর মুখে ছিলো এই বাণী : رَبِّ اغْفِرْ قَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ "হে আল্লাহ্! আমার জাতিকে তুমি ক্ষমা করো। কেননা, তারা জানে না।
١٥٣ عَنِ الشَّفَاءِ بِنْتِ عَبْدِ اللهِ قَالَتْ أَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَوْمًا أَسْأَلُهُ شَيْئاً فَجَعَلَ يَعْتَذِرُ إِلَى -
১৫৩. হযরত শিফা বিন্ত আবদুল্লাহ্ (রা) বলেন, একবার আমি কিছু চাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ্ -এর নিকট গেলাম। কিন্তু তিনি আমার কাছে অপারগতা প্রকাশ করলেন। (কেননা, তাঁর নিকট তখন দেয়ার মতো কোনো সম্পদ ছিলো না।)
ফায়দা : এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী এ সাহাবিয়াকে অভদ্র বা শক্ত কথা বলে বিদায় করেননি। বরং সৌজন্য ও ভদ্রতা বজায় রেখে তার কাছে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন যে, এখন আমার কাছে দেয়ার মতো কিছু নেই। নচেৎ আমি তোমাকে অবশ্যই কিছু দিতাম। অথচ এই অপারগতা প্রকাশ করারও তাঁর প্রয়োজন ছিল না।
١٥٤ عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ فَمَا زَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَعْتَنِزُ إِلَى صَفِيَّةَ وَيَقُولُ يَا صَفِيَّةُ إِنَّ أَبَاكَ أَلَّبَ عَلَى الْعَرَبِ وَفَعَلَ حَتَّى ذَهَبَ ذَلِكَ مِنْ نَفْسِهَا -
১৫৪. হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (উম্মুল মু'মিনীন হযরত) সাফিয়্যা (রা)-এর কাছে (তাঁর পিতার হত্যা সম্পর্কে, যে খায়বারের যুদ্ধে مسلمانوں হাতে নিহত হয়েছিল) ওজর পেশ করতে থাকেন এবং বললেন : হে সাফিয়্যা! তোমার পিতাই তো সারা আরবের লোকদেরকে مسلمانوں বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য উস্কিয়ে ছিলো এবং তাদেরকে সমবেত করেছিলো। এরূপ ওজর পেশ করার দরুন তাঁর অন্তর থেকে এই দুঃখ অন্তর্হিত হয়ে যায়।
ফায়দা : উম্মুল মু'মিনীন হযরত সাফিয়্যা (রা) খায়বার অধিপতির কন্যা ছিলেন। তাঁর স্বামী ছিলো বনূ নাযীর গোত্রের বিরাট ধনী ব্যক্তি। পিতা ও স্বামী উভয়েই খায়বারের যুদ্ধে নিহত হয়েছিলো। খায়বার দুর্গ বিজিত হওয়ার পর অন্যান্য যুদ্ধবন্দীর সাথে হযরত সাফিয়্যাও বন্দী হন। তাঁর এই আভিজাত্য ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের দরুন এবং তাঁর মনোরঞ্জন ও মনস্তুষ্টির জন্য নবী-এর তাঁকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করা ছাড়া কোনো উপায় ছিলো না। তাই তিনি গনীমত বণ্টনের মাধ্যমে নবী-এর ভাগে পড়লেন এবং তিনি তাঁকে তৎক্ষণাৎ আযাদ করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলেন। কিন্তু এরপর যখনই তাঁর পিতার কথা মনে পড়তো যে, সে مسلمانوں হাতে খায়বারের যুদ্ধে নিহত হয়েছে, তখন পিতৃত্বের ভালবাসার কারণে নবী-এর কাছে সে সম্পর্কে অভিযোগ উত্থাপন করতেন। নবী তাঁর মনে ব্যথা দিতেন না এবং কোনো রকম ধমক বা তিরস্কার না করে তাঁর সামনে যুক্তিসঙ্গত ওজর পেশ করতেন। তিনি বলতেন দেখ (দোষটা তো তোমার পিতারই), তোমার পিতাই তো স্বয়ং যুদ্ধ শুরু করেছিলো। যুদ্ধ না করলে সে মারাও যেতো না। সে-ই তো সারা আরবকে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্ররোচিত করেছিলো ও উস্কিয়ে দিয়েছিলো। নবী এ ভাবে স্নেহ ও নম্রতা সহকারে তাঁকে বোঝাতেন। ফলে এক সময় তাঁর অন্তর থেকে এই ব্যথা সম্পূর্ণ দূর হয়ে যায়। তিনি আর কোনো দিন এ বিষয়ে নবী -এর নিকট কোনো অভিযোগ করেননি।
١٥٥ عَنِ الْمُهَاجِرِ بْنِ قُنْفُذِ أَنَّهُ أَتَى النَّبِيَّ ﷺ وَهُوَ يَبُولُ فَسَلَّمُ عَلَيْهِ فَلَمْ يَرُدُّ عَلَيْهِ ثُمَّ تَوَضَّا ثُمَّ اعْتذَرَ إِلَيْهِ فَقَالَ إِنِّي كَرِمْتُ أَنْ أَذْكُرَ اللَّهَ إِلَّا عَلَى طُهُرٍ -
১৫৫. হযরত মুহাজির ইন্ন কুনফুয (রা) থেকে বর্ণিত, একবার তিনি নবী-এর নিকট উপস্থিত হন এবং সালাম করেন। নবী ঐ সময় পেশাব করছিলেন। তাই তিনি সালামের জবাব দিলেন না। তারপর (পেশাব শেষ করে) তিনি ওযু করে তার কাছে ওজর পেশ করলেন। বললেন, পবিত্রতা ছাড়া আল্লাহ্ নাম নেয়া আমার কাছে ভাল মনে হয়নি।