📄 নবী (সা)-এর সাহসিকতা ও বীরত্ব
۹۹. عَنْ عَلِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ لَقَدْ رَأَيْتُنِي يَوْمَ بَدْرٍ وَنَحْنُ نَلُوْذُ بِالنَّبِيِّ
هُوَ أَقْرَبُنَا إِلَى الْعَدُوِّ وَكَانَ مِنْ أَشَدَّ النَّاسِ يَوْمَئِذٍ بَأْسًا -
৯৯. হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমি স্বচক্ষে দেখেছি যে, আমরা নবী -এর আশেপাশে আশ্রয় খুঁজছিলাম। আর তিনি আমাদের সকলের তুলনায় শত্রুদের বেশি কাছাকাছি পৌঁছে মুকাবিলা করে যাচ্ছেন। বদরের সেদিন তাঁরই বীরত্ব ও সাহসিকতা ছিল সর্বাধিক।
ফায়দা : চরিত্র বিশারদদের সকলে এ মর্মে একমত যে, মানব চরিত্রের সবচেয়ে বড় উপাদান হলো বীরত্ব। মানুষের যাবতীয় সদ্গুণ বীরত্বের এই ভিত্তির উপরেই গড়ে উঠে। বীরত্বের কারণে মানুষ নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা, দরদ ও অনুকম্পা, হিম্মত, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সত্য প্রকাশে নির্ভীকতা ইত্যাকার মহৎ ও উন্নত চরিত্র মাধুরী অর্জনে সক্ষম হয়। কাপুরুষ ও মনোবলহীন লোকেরা কোন কৃতিত্বের কাজ সম্পাদনে যেমন অনুপযুক্ত তেমনি নৈতিকতার মানদণ্ডেও সে হীনবল বিবেচিত হয়ে থাকে। সে মানবীয় সদ্গুণাবলি ও উন্নত চরিত্র থেকে হয় বঞ্চিত। পক্ষান্তরে যাঁরা সাহসী ও বীর পুরুষ তাঁরা সর্বদা আত্মপ্রত্যয়ী, নীতিবান, সত্যভাষী, দৃঢ় চরিত্র, ধৈর্যশীল, গম্ভীর ও ক্ষমাপরায়ণ থাকেন। এভাবে দানশীলতা, বদান্যতা, মেহমানদারী, পরোপকার ইত্যাদি সাহসী মানুষদেরই বিশেষণরূপে পরিচিত।
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সাহসিকতা ও বীরত্বের ক্ষেত্রেও ছিলেন মানুষের মধ্যে সকলের ঊর্ধ্বে। তিনি অবিচলতা ও অফুরন্ত দৃঢ়তার অধিকারী ছিলেন। জিহাদ ও রণক্ষেত্রে প্রদর্শিত তাঁর বীরত্বের বহু ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, কখনো কোন কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখে তিনি হিম্মত হারাতেন না। চরিত্রের দৃঢ়তা ও অসীম সাহসিকতা বুকে নিয়ে যাবতীয় পরিস্থিতির মুকাবিলা করে যেতেন। হুনাইন যুদ্ধে হাওয়াযিন গোত্রের লোকেরা মুসলিম বাহিনীর উপর বৃষ্টির ন্যায় তীরবর্ষণ শুরু করে। তীরন্দাজদের প্রবল আক্রমণে সাহাবীদের বহু সংখ্যক তখন মনোবল হারিয়ে ফেলেন এবং রণক্ষেত্র থেকে পিছিয়ে পড়েন।
অথচ প্রিয় নবী তখন রণক্ষেত্রে অটল দণ্ডায়মান। তাঁর চতুষ্পার্শ্বে ছিলেন কেবল কয়েকজন জানবাজ সাহাবী। তাঁরা সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় তাঁকে ঘিরে রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। এ কঠিনতম মুহূর্তে তিনি বিন্দুমাত্রও বিচলিত হননি বরং সীমাহীন সাহসিকতা ও বীরত্ব নিয়ে সঙ্গীদের মনোবল ও হিম্মত বৃদ্ধি করতে থাকেন। সামান্যতম পিছে না হটে যথারীতি কাফিরদের সঙ্গে মুকাবিলা চালিয়ে যান।
অনুরূপ একবার তিনি একটি বৃক্ষের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তখন অতর্কিতভাবে জনৈক কাফির যোদ্ধা সম্মুখে এসে তরবারি তাক করে দাঁড়ায়। লোকটি প্রিয় নবী -এর ঠিক মাথা মুবারকের বরাবর দাঁড়িয়ে বলল, হে মুহাম্মদ! এবার আমার হাত থেকে তোমাকে কে বাঁচাবে? প্রিয় নবী ভয়ভীতি বিহীন শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন: আল্লাহ্। তাঁর এই নির্ভীকতা দেখে ও বীরত্বপূর্ণ উত্তর শুনে লোকটির হৃদকম্পন শুরু হলো এবং তার হাত থেকে তাক করা তরবারি মাটিতে পড়ে গেল। (সহীহ্ বুখারী, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৫৯২)। প্রিয় নবী -এর জীবনে এ ধরনের আরো বহু ঘটনা ইতিহাস গ্রন্থাবলিতে বিদ্যমান। এ সকল ঘটনার আলোকে তিনি যে কতখানি সাহসিকতা ও বীরত্বের অধিকারী ছিলেন তা সুস্পষ্ট বোঝা যায়।
১০০. عَنْ عَلِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كُنَّا إِذَا أَحْمَرَ الْبَاسُ وَلَقِيَ الْقَوْمُ اتَّقَيْنَا بِرَسُولُ اللهِ ﷺ فَمَا يَكُونُ أَحَدُ أَقْرَبَ إِلَى الْعَدُوِّ مِنْهُ
১০০. হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রণক্ষেত্রে যুদ্ধ যখন ঘোরতর আকার ধারণ করত এবং একদল অন্যদলের মুখোমুখি হয়ে লড়াই শুরু করত, তখন আমরা নবী-এর চতুষ্পার্শ্বে আশ্রয় খুঁজতাম। আমাদের মধ্যে কেউ শত্রুপক্ষের মুকাবিলায় নবী-এর চেয়ে অগ্রবর্তী থাকত না (অর্থাৎ তিনি মুকাবিলায় সকলের অগ্রবর্তী থাকতেন)।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসটিও প্রিয় নবী-এর অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের কথা প্রকাশ করছে। কেননা কাফিরদের সঙ্গে যখন মুসলমানদের যুদ্ধ শুরু হতো এবং একদল অন্যদলের মুখোমুখি হয়ে লড়াই শুরু করত, তখন শত্রুপক্ষের সংখ্যাধিক্য এবং নিজেদের যুদ্ধ উপকরণের অপ্রতুলতা দেখে এই গুটিকতক নিরস্ত্র মুসলমান সৈন্যদের মনে ভীতির উদ্রেক হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিশেষত যে সকল যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর হাতে যুদ্ধ সরঞ্জাম বলতে কিছুই ছিল না। তখন যে কোন তেজস্বী, বাহাদুর ব্যক্তিরও শংকিত হয়ে ওঠা স্বাভাবিক। অথচ প্রিয় নবী-এর মনোবল এমন মুহূর্তগুলিতেও কেবল দৃঢ় থাকতো তাই নয় বরং নিজে অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের সঙ্গে তরবারি নিয়ে কাফিরদের সারির ভিতর ঢুকে পড়তেন। তখন মুসলিম সৈনিকদের অন্যরাও প্রিয় নবী-এর কাছাকাছি আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করতেন। কতিপয় হাদীসের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় ঘোররত লড়াইয়ের তোড়ে লোকজন দূরে হটে যেত। এ মুহূর্তে যাঁরা প্রিয় নবী-এর সঙ্গে ও কাছাকাছি থাকতেন সাহাবীদের মধ্যে তাঁদেরকে বীর সেনানী বলে বিবেচনা করা হতো।
١٠١. عَنْ سَعْدِ بْنِ عِبَاضِ الثَّمَالِي قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَلِيْلَ الْكَلَامِ قَلِيْلَ الْحَدِيثِ فَلَمَّا أُمِرَ بِالْقِتَالِ تَشَمَّرَ وَكَانَ مِنْ أَشَدِّ النَّاسِ بَأْسًا -
১০১. হযরত সাদ ইব্ন ইয়ায সামালী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ স্বভাবত ছিলেন বাকসংযমী ও মিতভাষী। কিন্তু যখন তিনি যুদ্ধের জন্য আদিষ্ট হতেন তখন এমনভাবে প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন যে তাঁকে সর্বাধিক বলিষ্ঠ যোদ্ধা ও সাহসী বলে দেখা যেত।
ফায়দা : উপরোক্ত হাদীসে প্রিয় নবী-এর দু'টি গুণের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এক. মিতভাষী হওয়া, দুই. সাহসী ও বাহাদুর হওয়া। মিতভাষী হওয়া মানব জীবনে অন্যতম সদ্গুণ। অথচ অতিশয় সহজলভ্য একটি আমল। একখানা হাদীসে প্রিয় নবী ইরশাদ করেন: আমি কি তোমাদের অত্যন্ত হালকা ও সহজলভ্য একটি আমলের কথা জানাবো? সে আমলটি হলো নীরব থাকা এবং চরিত্রবান হওয়া। (তারগীব ওয়া তারহীব, খ. ৪, পৃষ্ঠা ৩২১)
বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে প্রিয় নবী -এর স্বল্পভাষী হওয়া সম্পর্কীয় আরো বহু রিওয়ায়াত বিদ্যমান। এ সব রিওয়ায়াতের আলোকে বোঝা যায় যে, মিতভাষী হওয়াও মানব চরিত্রের অন্যতম সদ্গুণ। চরিত্র বিশারদ ও দার্শনিকদের কেউই এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন না।
গ্রন্থকার এখানে প্রিয় নবী -এর সাহসিকতা ও বীরত্বের আলোচনা প্রসঙ্গে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। কেননা হাদীসখানার শেষ বাক্যটি থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, প্রিয় নবী -কে যখনই আল্লাহ্ পাকের তরফ থেকে কোন জিহাদ বা যুদ্ধের জন্য আদেশ করা হতো তখনই তিনি কোন দ্বিধাদ্বন্দু ব্যতিরেকে অতিশয় বীরত্ব ও সাহসিকতাসহ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যেতেন। আবার রণক্ষেত্রেও তিনি সবচেয়ে অধিক সাহসী ও বীর ব্যক্তি হিসাবে প্রমাণিত হতেন।
۱۰۲. عَنِ الْبَرَاءِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كُنَّا وَاللَّهِ إِذَا أَحْمَرَّ الْبَاسُ نَتَّقِي بِهِ يَعْنِي النَّبِيُّ ﷺ وَإِنَّ الشَّجَاعَ مِنَّا الَّذِي يُحَاذِي بِهِ -
১০২. হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ্র কসম! যখন আমাদের যুদ্ধ ভয়ানক আকার ধারণ করত, তখন আমরা প্রিয় নবী -এর কাছে এসে আশ্রয় নিতাম। আর আমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিকেই সবচেয়ে বড় সাহসী ও বীর বলে গণ্য করা হতো যিনি যুদ্ধকালে প্রিয় নবী -এর সঙ্গে সঙ্গে থাকতেন।
ফায়দা: প্রিয় নবী -এর চরিত্রে যেভাবে অন্যান্য অতুলনীয় যোগ্যতা ও গুণাবলি পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান ছিল তেমনি সাহসিকতা ও বীরত্বও ছিল অতুলনীয় ও অসীম। বড় বড় যুদ্ধগুলিতে এবং যুদ্ধ জীবনের চরম আতংকের মুহূর্তগুলোর মধ্যেও তিনি এতখানি দুঃসাহসিকতার প্রমাণ দিয়েছিলেন যে, যখন বীর বাহাদুর সাহাবীগণ পর্যন্ত হিম্মতহারা হয়ে যাচ্ছিলেন এবং নিজেরা কোন আশ্রয়ের তালাশ শুরু করেছিলেন। সে মুহূর্তে সকলে তাঁর আশ্রয় পেয়ে পুনর্বার যুদ্ধ চালানোর হিম্মত লাভ করতেন। তা ছাড়া সাহাবীদের মধ্যে তখন তাঁকেই সবচেয়ে শক্তিশালী বীর বলে জ্ঞান করা হতো, যিনি নবী -এর আশ্রয়ে থেকে যুদ্ধ চালনায় দৃঢ় থাকতে সক্ষম হতেন।
۱۰۳. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ بِالْمَدِينَةِ فَزَعٌ وَرَكِبَ رَسُولُ الله ﷺ فَرَسًا لِأَبِي طَلْحَةَ فَقَالَ مَا رَأَيْنَا مِنْ شَيْءٍ وَإِنْ وَجَدْنَاهُ لَبَحْرًا -
১০৩. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার মদীনা শরীফের (এর উপর শত্রুরা অতর্কিত হামলা চালিয়েছে বলে গুজব রটেছিল। ফলে) সর্বত্র ভয় ও আতংক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় নবী হযরত আবূ তালহা (রা)-এর ঘোড়ার উপর সওয়ার হন (এবং শত্রুদের গতিবিধি জানার জন্য সম্পূর্ণ একাকী অবস্থায় তিনি বেরিয়ে পড়েন। এভাবে পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল হওয়ার পর তিনি যখন ফিরে আসেন তখন) বলেন: আমি তো এখানে ভয়ের কিছুই দেখিনি। আমি আবু তালহার ঘোড়াটিকে সমুদ্রের মত দ্রুতগতিসম্পন্ন পেলাম।
ফায়দা : এই হাদীসসহ সম্মুখে আরো দু'টি হাদীস আসছে, সবগুলোর মূল বক্তব্য অভিন্ন। ঘটনাটি ছিল এমন যে, একবার মদীনা শরীফের সর্বত্র সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল যে, 'শত্রুরা মদীনার উপর আক্রমণ চালিয়েছে। এ সংবাদ খুব দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষকে দারুণ আতংকের মধ্যে ফেলে দেয়। ভয়ের আতিশয্যে কেউ এগিয়ে পরিস্থিতির সঠিক পর্যবেক্ষণের হিম্মতটুকুও পাচ্ছিল না। কিন্তু প্রিয় নবী এ আতংকের কোন পরোয়া করেননি। তিনি তৎক্ষণাৎ হযরত আবূ তালহা (রা)-এর ঘোড়াটি নিয়ে পরিস্থিতির সঠিক পর্যবেক্ষণের জন্য সম্মুখের দিকে সম্পূর্ণ একাকী ছুটে চললেন। নবী দ্রুতগামী এ ঘোড়াটি নিয়ে মদীনা শরীফের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত চলে যান। কিন্তু কোথাও শত্রুদের আক্রমণের কোন চিহ্ন দেখতে পাননি। তিনি বুঝলেন এটি সম্পূর্ণ গুজব। কাজেই তিনি ফিরে আসলেন এবং লোকজনকে সান্ত্বনা ও অভয় দিয়ে বললেন: তোমরা ভয় পেয়ো না। এখানে আমি আতংকের কিছুই দেখিনি। অতঃপর নবী আবু তালহার ঘোড়ার প্রশংসা করে বললেন: এই ঘোড়াটি সমুদ্রের মত অত্যন্ত বেগবান ও দ্রুতগতি সম্পন্ন।
١٠٤. عَنْ أَنَسِ ابْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ فَزِعَ أَهْلُ المَدِينَةِ مَرَّةً فَرَكِبَ النَّبِيُّ ﷺ فَرَسًا كَأَنَّهُ مُقَرِّفُ فَرَكَضَهُ فِي آثَارِهِمْ فَلَمَّا رَجَعَ قَالَ وَجَدْنَاهُ بَحْرًا
১০৪. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার মদীনা শরীফের অধিবাসীরা (শত্রুদের আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে এই গুজবে) ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গিয়েছিল। নবী তৎক্ষণাৎ জীর্ণশীর্ণ দুর্বল একটি ঘোড়ায় আরোহণ করেন। তিনি এটিকে দ্রুত আক্রমণকারীদের দিকে ছুটিয়ে নিলেন। অবশেষে ফিরে এসে বললেন, আমি এটিকে সমুদ্রের মত বেগবান পেলাম (অথচ তোমরা একে দুর্বল ও ধীরগতি সম্পন্ন বলছ)।
١٠٥ عَنْ عِمْرَانَ بْنِ الحُسَيْنِ قَالَ مَا لَقِي النَّبِيُّ ﷺ إِلَّا كَانَ أَوَّلَ مَنْ يَضْرِبُ
১০৫. হযরত ইমরান ইবন হুসাইন (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোন শত্রুবাহিনীর সঙ্গে নবী -এর যখন মুকাবিলা হতো তখন যুদ্ধে তিনিই থাকতেন প্রথম আক্রমণকারী।
ফায়দা: কাফির, মুশরিক ও আল্লাহ্র দুশমনদের বিরুদ্ধে তরবারি উত্তোলনের কাজেও প্রিয় নবী থাকতেন সবার অগ্রে। প্রিয় নবী -এর এই ভূমিকা গ্রহণ তাঁর অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় বহন করে। তা ছাড়া তিনি মানসিকভাবে কতখানি দৃঢ়চেতা ও প্রবল শক্তিমান ছিলেন বর্ণিত হাদীস থেকে এটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
١٠٦. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ مِنْ أَشْجَعِ النَّاسِ وَأَسْمَحِ النَّاسِ-
১০৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে রাসূলুল্লাহ্ ছিলেন অসীম সাহসী ও সর্বোচ্চ দানশীল ব্যক্তি।
ফায়দা : উল্লিখিত হাদীসে প্রিয় নবী ﷺ-এর বিশেষ মানের দু'টি সদ্গুণের উল্লেখ করা হয়েছে। একটি হলো, তাঁর সীমাহীন বীরত্ব ও দুঃসাহসিকতা। আর অপরটি হলো পরম দানশীলতা ও বদান্যতা। দার্শনিক ও চরিত বিশারদদের সকলে এ মর্মে একমত যে, এই বীরত্ব ও দানশীলতা একটি অপরটির অনিবার্য ফলশ্রুতি।
۱۰۷. عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَحْسَنَ النَّاسِ وَأَشْجَعَ النَّاسِ وَأَسْمَحَ النَّاسِ-
১০৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক সুপুরুষ, সর্বাধিক সাহসী ও সবচেয়ে বেশি দয়া-দাক্ষিণ্যের অধিকারী।
ফায়দা : উপরোক্ত হাদীসে প্রিয় নবী ﷺ-এর তিনটি উল্লেখযোগ্য বিশেষণের কথা বলা হয়েছে। এক. তাঁর অতুলনীয় শারীরিক সুগঠন ও সৌন্দর্য, দুই. তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতা, তিন, তাঁর দানশীলতা ও দয়া-দাক্ষিণ্য। কোন সন্দেহ নেই যে, প্রিয় নবী ﷺ-এর পবিত্র সত্তা নবুওয়াতের ক্ষেত্রে যেমন সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত শিখরে অধিষ্ঠিত ছিল, তেমনি তাঁর এ সত্তা নীতিপরায়ণতা ও উন্নত চরিতাদর্শের ক্ষেত্রেও ছিল সর্বোচ্চ শিখরে প্রতিষ্ঠিত। এ মাকাম তথা মর্যাদা শুধুমাত্র তাঁর জন্যই। কারোর পক্ষে এতখানি উচ্চে আরোহণ কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়। আল্লাহ্ পাক আমাদেরকে তাঁর প্রিয়তম বন্ধুর উন্নত অনুপম চরিতাদর্শ অনুসরণের তাওফীক দান করুন। আমীন।
۱۰۸. عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ صَيْحَةُ بِالْمَدِينَةِ، فَرَكِبَ النَّبِيُّ ﷺ فَرَسًا لَأَبِي طَلْحَةَ، فَأَجْرَاهُ سَاعَةً ثُمَّ رَجَعَ فَقَالَ مَا رَأَيْنَا مِنْ شَيْ وَإِنَّ وَجَدَنَاهُ لَبَحْرًا -
১০৮. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার মদীনা শরীফের উপর শত্রুরা অতর্কিত আক্রমণ চালিয়েছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ল। প্রিয় নবী ﷺ তৎক্ষণাৎ হযরত আবূ তালহা (রা)-এর একটি ঘোড়ায় আরোহণ করেন এবং এক ঘণ্টা পর্যন্ত ঘোড়াটিকে এদিক-ওদিক ছুটিয়ে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেন। অবশেষে (ঘটনার প্রকৃত অবস্থা প্রত্যক্ষ করে) ফিরে এসে বললেন, আমি কিছুই দেখলাম না। (ভয়ের কিছুই নেই) তবে আমি এ ঘোড়াটিকে (গতিশীলতার দিক থেকে) সমুদ্রের ন্যায় পেলাম।
١٠٩. عَنْ أَبِي جَعْفَرٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ شَدِيدَ الْبَطَشِ -
১০৯. হযরত আবূ জাফর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ কঠোর পাকড়াওকারী ছিলেন।
ফায়দা : আলোচ্য হাদীসের আলোকেও বোঝা যায় যে, প্রিয় নবী যেমন সাহসিকতা ও বীরত্বের অধিকারী ছিলেন তেমনি শারীরিকভাবেও তিনি অতিশয় শক্তিশালী ও সবল ছিলেন। একখানা হাদীসে তিনি স্বয়ং ইরশাদ করেন: আমাকে চল্লিশ জন মানুষের সমান শক্তি প্রদান করা হয়েছে। আর এ কারণেই কঠিন থেকে কঠিন কিংবা শক্ত থেকে শক্ততর কোন কাজ যা সাহাবীদের কারোর পক্ষে সম্ভব হতো না সেটি তিনি অনায়াসেই করে দিতে পারতেন। পরবর্তী ১১১ নং হাদীস থেকেও প্রিয় নবী-এর এহেন অতুলনীয় শক্তিমত্তা ও দৈহিক ক্ষমতার প্রমাণ মেলে।
١١٠. عَنِ الْبَرَاءِ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَوْمَ الْخَنْدَقِ يَنْقُلُ التَّرَابَ حَتَّى وَارَى الغُبَارُ شَعْرَ صَدْرِهِ وَرَأَيْتُ النَّبِيُّ ﷺ يَرْتَجِزُ يَوْمَ الخَنْدَقِ وَهُمْ يَحْفِرُونَهُ وَهُوَ يَنْقُلُ التَّرَابَ حَتَّى وَارَى جَلْدَةُ بَطْنِهِ -
১১০. হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি খন্দক যুদ্ধের দিন দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ্ নিজে মাটি বহন করেছেন আর ধুলায় তাঁর বুকের পশমগুলি ঢেকে গিয়েছিল। তিনি বলেন, আমি আরো দেখেছি যে, খন্দকের সে দিন প্রিয় নবী উদ্দীপনাবর্ধক কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। আর সাহাবীগণ পরিখা খনন করে যাচ্ছেন। এ সময় তিনিও অন্যদের সঙ্গে মাটি বহন করেছেন। এমনকি বালির কারণে তাঁর পেটের চামড়া আবৃত হয়ে গিয়েছিল।
ফায়দা : এ ঘটনাটি হলো খন্দক যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের। আলোচ্য হাদীসের উল্লেখের দ্বারা গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হলো প্রিয় নবী-এর সীমাহীন মনোবলের কথা প্রমাণ করা এবং আল্লাহ্র পথে কঠিন থেকে কঠিনতর ও তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতর কোন কাজ সম্পাদন করতে তিনি কতখানি দৃঢ়চেতা ও সাহসী ছিলেন তা তুলে ধরা।
۱۱۱. عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ مَكَثَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَأَصْحَابُهُ يَحْفِرُونَ الخَنْدَقَ ثَلَاثًا مَا ذَاقُوْا طَعَامًا فَقَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ : إِنَّ هَذِهِ كِدْيَةٌ - مِنْ الجَبَلِ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ رَسُوْمًا بِالْمَاءِ فَرَسُوْهَا ثُمَّ جَاءَ النَّبِيُّ ﷺ فَأَخَذَ الْمِعْولَ أَوِ الْمِسْحَاةَ ثُمَّ قَالَ بِسْمِ اللهِ ثُمَّ ضَرَبَ ثَلَاثًا فَصَارَ كَثِيْبًا يَهَالُ، قَالَ جَابِرُ فَحَانَتْ مِنَى الْتِفَاتَةُ فَرَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ وَقَدَ شَدَّ بَطْنَهُ بحجر
১১১. হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (খন্দকের যুদ্ধ চলাকালে) রাসূলুল্লাহ্ ও তাঁর সাহাবীগণ তিন দিন পর্যন্ত অনাহারক্লিষ্ট অবস্থায় পরিখা খননের কাজে নিয়োজিত থাকলেন। (তখন অতিশয় শক্ত ও বিশাল আয়তনের একটি পাথর খোদাই কাজের মুখে বেরিয়ে আসে) সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এটি পর্বতের একটি মস্তবড় পাথর। রাসূলুল্লাহ্ বললেন: তোমরা পাথরটির উপর পানি ছিটিয়ে দাও। সেমতে তাঁরা পানি ছিটিয়ে দিলেন। তারপর প্রিয় নবী তাশরীফ আনেন। তিনি কোদাল বা হাতুড়ি হাতে নিয়ে 'বিসমিল্লাহ্' পাঠ করেন এবং পাথরের উপর তিনবার আঘাত হানেন। ফলে অতিশয় শক্ত পাথরটি এত নরম হয়ে গিয়েছিল যে, আঘাতের দরুন ফেটে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে বালির ন্যায় ঝরে পড়ে গেল। হযরত জাবির (রা) বলেন, এ সময় হঠাৎ আমার দৃষ্টি নবী -এর পেট মুবারকের উপর গিয়ে পড়ল। আমি দেখলাম যে, তিনি (ক্ষুধার আতিশয্যে) পেটের উপর পাথর বেঁধে রেখেছেন।
ফায়দা : আলোচ্য ঘটনাটিও খন্দকের যুদ্ধ প্রস্তুতিকালে ঘটেছিল। ইতিহাসে এ যুদ্ধকে আহযাবের যুদ্ধ নামেও অভিহিত করা হয়েছে। হিজরী ৫ বর্ষের যিল্কাদ মাসে এ যুদ্ধ শুরু হয়। প্রিয় নবী তখন মদীনা শরীফেই অবস্থানরত ছিলেন। আরবের সকল গোত্রের মুশরিক ও ইয়াহুদীরা সকলে সম্মিলিতভাবে مسلمانوں বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এবং পবিত্র মদীনা নগরী অবরোধ করে নেয়। শত্রু বাহিনীর সংখ্যা ছিল ছয় সহস্রাধিক। প্রিয় নবী অবরোধের সংবাদ পেয়ে সাহাবীদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। সাহাবী হযরত সালমান ফারসী (রা) ছিলেন পারস্যের অধিবাসী। তিনি নগর রক্ষার স্বার্থে তখন পরিখা খননের পরামর্শ দিয়ে বলেন, এমনি জটিল মুহূর্তে ইরানী যোদ্ধারা সাধারণত পরিখা খননের ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। সে মতে মদীনা নগরীর অদূরে মুসলিম সৈন্যগণ এক জায়গায় জমায়েত হন। তাঁরা পরামর্শ মোতাবেক পরিখা খননের কাজ শুরু করেন। মুসলমানদের মধ্যে সে মুহূর্তে খুব অভাব-অনটন বিরাজিত ছিল। দুর্ভিক্ষের কারণে মুসলমানগণ তিনদিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ অনাহারে কাটান, মুখে দেয়ার মত সামান্য রসদও তাদের হাতে ছিল না। কারণ শত্রু সৈন্যরা ইতিপূর্বেই মদীনা শরীফ অভিমুখে রসদ পৌছার সকল পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। এদিকে পরিস্থিতি নাজুক বিধায় দ্রুত পরিখা খননের কাজ সমাপ্ত করা আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়।
এভাবে অবরোধ ও খণ্ডযুদ্ধ প্রায় এক মাস যাবত অব্যাহত থাকে। পরিশেষে মহান আল্লাহ্ অদৃশ্য পথে মুসলমানদের সাহায্য করেন। হঠাৎ খুব শক্তিশালী একটি বায়ুর ঝড় নেমে আসে এবং অবরোধকারী আগ্রাসী বাহিনীর সমুদয় সাজ-সরঞ্জাম উড়িয়ে নিয়ে যায়। ফলত শত্রুপক্ষের মনোবল ভেঙে যায় এবং তারা পলায়নের পথ অবলম্বন করে। আর মু'মিনগণ তাদের আক্রমণ থেকে রেহাই পেয়ে যান।
গ্রন্থকার আলোচ্য অংশে প্রিয় নবী -এর শক্তিমত্তা ও দৈহিক ক্ষমতা এবং সাহসিকতা ও বীরত্বের আলোচনা করছেন এবং এতদুদ্দেশ্যেই উপরোক্ত হাদীসখানা অনুচ্ছেদের অন্তর্ভুক্ত করেন। কেননা হাদীসটির মধ্যে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, মস্তবড় যেই পাথরটি খোদাই পথে পড়েছিল, সেটিকে অন্যরা কোনক্রমেই ভাঙতে সক্ষম হয়নি। সেটি তিনি শক্তিবলে ভেঙে ফেলেন। তিনি কোদাল হাতে নিয়ে মাত্র তিনবার সজোরে আঘাত করেছিলেন। আর পাথরটি বালির ন্যায় গুঁড়িয়ে গিয়েছিল। এ ঘটনা থেকে তাঁর দৈহিক শক্তিমত্তা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
একটি বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) বলেন, প্রিয় নবী স্বয়ং ইরশাদ করেছেন যে, আমাকে চল্লিশ জন বেহেস্তী মানুষের সম-পরিমাণ শক্তি প্রদান করা হয়েছে। (তাবারানী, সূত্র-ইত্তেহাফুস সাদাহ্, খ. ৭, পৃষ্ঠা ১৪১)
۱۱۲. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَحْسَنَ النَّاسِ وَأَشْجَعَ النَّاسِ وَأَجُودَ النَّاسِ، وَلَقَدْ فَزِعَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ وَرَكِبَ فَرَسًا لِأَبِي طَلْحَةَ عَرِيًّا فَخَرَجَ النَّاسُ فَإِذَا هُمْ بِرَسُولِ اللهِ قَدْ سَبَقَهُمْ إِلَى الصَّوْتِ قَدْ اسْتَبْرَأَ الْخَبَرَ وَهُوَ يَقُولُ لَنْ تَرَاعُوا وَقَالَ النَّبِيُّ وَلَقَدْ وَجَدْنَاهُ بَحْراً أَوْ إِنَّهُ لَبَحْرٍ -
১১২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুপুরুষ, সর্বাধিক সাহসী ও সর্বোচ্চ দয়া-দাক্ষিণ্যের অধিকারী। (একবার একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ার দরুন) মদীনা শরীফের লোকজন আতংকিত হয়ে উঠেছিল। রাসূলুল্লাহ্ তৎক্ষণাৎ হযরত আবু তালহা (রা)-এর ঘোড়ায় গদি ব্যতিরেকেই সওয়ার হন এবং দ্রুতগতিতে সম্মুখে অগ্রসর হন। অবস্থা দৃষ্টে লোকজনও রাস্তায় বেরিয়ে আসে। তখন তারা দেখলো রাসূলুল্লাহ্ তাদের পূর্বেই গুজবটি যে দিক থেকে আসছিল সে দিক থেকে পর্যবেক্ষণ শেষ করে ফিরে আসছেন। প্রিয় নবী লোকজনকে বললেন: তোমরা ভয় পেয়ো না। তিনি আরো বললেন: আমি ঘোড়াটিকে সমুদ্রের ন্যায় দ্রুতগামী পেলাম অথবা তিনি বলেছেন: এটি সমুদ্রের মত (বেগবান)।
ফায়দা: সহীহ্ বুখারীতে একাধিক স্থানে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। তবে হাদীসের শব্দমালায় কিছু ভিন্নতা বিদ্যমান।১
আলোচ্য হাদীসের আলোকেও প্রিয় নবী-এর অসীম সাহসিকতা, বীরত্ব ও নির্ভীকতার প্রমাণ পাওয়া যায়। চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া আতংকের এ মুহূর্তে যখন যে কোন সময়ে মদীনার উপর শত্রুদের আক্রমণ চালানোর আশংকা বিদ্যমান, তাছাড়া শত্রুপক্ষ কোন দিক থেকে কতটুকু প্রস্তুতি নিয়ে আক্রমণ শুরু করছে তাও অজানা এমন এক নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে প্রিয় নবী-এর সম্পূর্ণ একাকী অবস্থায় অনুসন্ধানের জন্য সম্মুখে বেরিয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে তাঁর অসীম সাহসিকতার প্রমাণ বহন করে।
এ হাদীসের মধ্যেও প্রিয় নবী-এর উল্লেখযোগ্য তিনটি সদ্গুণের উল্লেখ করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, এ বিশেষণত্রয় হলো মানুষের যাবতীয় সদ্গুণের আধার। কেননা প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে তিনটি প্রকৃতিগত শক্তি বিদ্যমান থাকে। যথা ১. অনুকম্পা শক্তি, ২. ক্রোধশক্তি ও ৩. বিবেচনা শক্তি। ক্রোধ শক্তির পূর্ণতা দ্বারা ব্যক্তির মধ্যে সাহসিকতা ও বীরত্বের গুণ সৃষ্টি হয়। অনুকম্পা শক্তির পূর্ণতার কারণে ব্যক্তি দানশীলতা ও বদান্যতার গুণে গুণান্বিত হয়। আর বিবেচনা শক্তির পূর্ণতা অর্জনের ফলে ব্যক্তির মাঝে নৈপুণ্য ও বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ ঘটে। প্রিয় নবী-এর চরিত্রে উল্লিখিত সব কয়টি শক্তি পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান ছিল। এ কারণেই শক্তিগুলি থেকে উদ্ভূত গুণগুলিও ছিল তাঁর চরিত্রে পরিপূর্ণ। দার্শনিকগণ লিখেছেন, যে ব্যক্তির প্রকৃতির মধ্যে উদ্ভূত শক্তি পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান তিনি দৈহিক গঠন ও রূপ সৌন্দর্যের ক্ষেত্রেও পরিপূর্ণ মানের হবেন। কারণ বিবেচনা শক্তি ও দৈহিক সুগঠন একটি অপরটির জন্য অনিবার্য উপাদান।
۱۱۳. عَنِ الْبَرَاءِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ لَمَّا غَشِيَهُ الْمُشْرِكُونَ نَزَلَ فَجَعَلَ يَقُولُ أَنَا النَّبِيُّ لَا كَذِبَ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَمَارَنِي فِي النَّاسِ يَوْمَئِذٍ أَحَدٌ كَانَ أَشَدَّ مِنَ النَّبِيِّ
১১৩. হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুশরিকদের সৈন্য বাহিনী যখন রাসূলুল্লাহ্-কে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলল তখন তিনি নিজের বাহন থেকে অবতরণ করেন এবং বলতে লাগলেন, أَنَا النَّبِيُّ لَأَكَذِبَ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ কোন সন্দেহ নেই আমি সত্য নবী, আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান। বর্ণনাকারী বলেন, সে দিন মুসলিম বাহিনীর মধ্যে এমন একজনও ছিল না যাকে প্রিয় নবী এর তুলনায় অধিক সাহসিকতার অধিকারী বলা যায়।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসটি হুনাইনের যুদ্ধ সম্পর্কিত। এ যুদ্ধে হাওয়াযিন গোত্রের প্রসিদ্ধ তীরন্দাজ দল নিজেদের ব্যূহ থেকে অতর্কিতভাবে মুসলমানদের উপর তীরের বৃষ্টি নিক্ষেপ করেছিল। ফলে অধিকাংশ সাহাবী আহত ও শংকিত হয়ে পড়েন। তাঁদের কদম বিচলিত হয়ে যায় এবং তাঁরা রণক্ষেত্র থেকে পিছু হটে যান। কিন্তু সেই উন্মুক্ত রণক্ষেত্রে নবী স্বস্থান থেকে বিন্দুমাত্র হটেননি। তিনি সওয়ারী থেকে দ্রুত অবতরণ করে নিকটস্থ জানবায সাহাবীদেরকে নিয়ে শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে শক্তিশালী মুকাবিলা চালিয়ে যান। এ মুহূর্তে প্রিয় নবী-এর কণ্ঠ থেকে নিম্নের তেজোদ্দীপক জোশপূর্ণ বাক্যটি বেরিয়ে এসেছিল: “أَنَا النَّبِيُّ لَكَذِبُ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ" "আমি বরহক ও সত্য নবী, আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান।” বলা বাহুল্য, এটি হলো বীরত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নীতি। তাঁরা জটিল ও নাজুক কোন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে অন্যদের মনেও আবেগের সঞ্চার করার লক্ষ্যে এ ধরনের তেজোদ্দীপক বাক্য আবৃত্তি করে থাকেন। আর এ কারণেই ইসলামী শরীয়তে সমর সঙ্গীত আবৃত্তি করা ও যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের বংশগৌরব প্রকাশ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
📄 নবী (সা)-এর সাহসিকতা ও বীরত্ব
۹۹. عَنْ عَلِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ لَقَدْ رَأَيْتُنِي يَوْمَ بَدْرٍ وَنَحْنُ نَلُوْذُ بِالنَّبِيِّ
هُوَ أَقْرَبُنَا إِلَى الْعَدُوِّ وَكَانَ مِنْ أَشَدَّ النَّاسِ يَوْمَئِذٍ بَأْسًا -
৯৯. হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমি স্বচক্ষে দেখেছি যে, আমরা নবী -এর আশেপাশে আশ্রয় খুঁজছিলাম। আর তিনি আমাদের সকলের তুলনায় শত্রুদের বেশি কাছাকাছি পৌঁছে মুকাবিলা করে যাচ্ছেন। বদরের সেদিন তাঁরই বীরত্ব ও সাহসিকতা ছিল সর্বাধিক।
ফায়দা : চরিত্র বিশারদদের সকলে এ মর্মে একমত যে, মানব চরিত্রের সবচেয়ে বড় উপাদান হলো বীরত্ব। মানুষের যাবতীয় সদ্গুণ বীরত্বের এই ভিত্তির উপরেই গড়ে উঠে। বীরত্বের কারণে মানুষ নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা, দরদ ও অনুকম্পা, হিম্মত, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সত্য প্রকাশে নির্ভীকতা ইত্যাকার মহৎ ও উন্নত চরিত্র মাধুরী অর্জনে সক্ষম হয়। কাপুরুষ ও মনোবলহীন লোকেরা কোন কৃতিত্বের কাজ সম্পাদনে যেমন অনুপযুক্ত তেমনি নৈতিকতার মানদণ্ডেও সে হীনবল বিবেচিত হয়ে থাকে। সে মানবীয় সদ্গুণাবলি ও উন্নত চরিত্র থেকে হয় বঞ্চিত। পক্ষান্তরে যাঁরা সাহসী ও বীর পুরুষ তাঁরা সর্বদা আত্মপ্রত্যয়ী, নীতিবান, সত্যভাষী, দৃঢ় চরিত্র, ধৈর্যশীল, গম্ভীর ও ক্ষমাপরায়ণ থাকেন। এভাবে দানশীলতা, বদান্যতা, মেহমানদারী, পরোপকার ইত্যাদি সাহসী মানুষদেরই বিশেষণরূপে পরিচিত।
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সাহসিকতা ও বীরত্বের ক্ষেত্রেও ছিলেন মানুষের মধ্যে সকলের ঊর্ধ্বে। তিনি অবিচলতা ও অফুরন্ত দৃঢ়তার অধিকারী ছিলেন। জিহাদ ও রণক্ষেত্রে প্রদর্শিত তাঁর বীরত্বের বহু ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, কখনো কোন কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখে তিনি হিম্মত হারাতেন না। চরিত্রের দৃঢ়তা ও অসীম সাহসিকতা বুকে নিয়ে যাবতীয় পরিস্থিতির মুকাবিলা করে যেতেন। হুনাইন যুদ্ধে হাওয়াযিন গোত্রের লোকেরা মুসলিম বাহিনীর উপর বৃষ্টির ন্যায় তীরবর্ষণ শুরু করে। তীরন্দাজদের প্রবল আক্রমণে সাহাবীদের বহু সংখ্যক তখন মনোবল হারিয়ে ফেলেন এবং রণক্ষেত্র থেকে পিছিয়ে পড়েন।
অথচ প্রিয় নবী তখন রণক্ষেত্রে অটল দণ্ডায়মান। তাঁর চতুষ্পার্শ্বে ছিলেন কেবল কয়েকজন জানবাজ সাহাবী। তাঁরা সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় তাঁকে ঘিরে রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। এ কঠিনতম মুহূর্তে তিনি বিন্দুমাত্রও বিচলিত হননি বরং সীমাহীন সাহসিকতা ও বীরত্ব নিয়ে সঙ্গীদের মনোবল ও হিম্মত বৃদ্ধি করতে থাকেন। সামান্যতম পিছে না হটে যথারীতি কাফিরদের সঙ্গে মুকাবিলা চালিয়ে যান।
অনুরূপ একবার তিনি একটি বৃক্ষের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তখন অতর্কিতভাবে জনৈক কাফির যোদ্ধা সম্মুখে এসে তরবারি তাক করে দাঁড়ায়। লোকটি প্রিয় নবী -এর ঠিক মাথা মুবারকের বরাবর দাঁড়িয়ে বলল, হে মুহাম্মদ! এবার আমার হাত থেকে তোমাকে কে বাঁচাবে? প্রিয় নবী ভয়ভীতি বিহীন শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন: আল্লাহ্। তাঁর এই নির্ভীকতা দেখে ও বীরত্বপূর্ণ উত্তর শুনে লোকটির হৃদকম্পন শুরু হলো এবং তার হাত থেকে তাক করা তরবারি মাটিতে পড়ে গেল। (সহীহ্ বুখারী, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৫৯২)। প্রিয় নবী -এর জীবনে এ ধরনের আরো বহু ঘটনা ইতিহাস গ্রন্থাবলিতে বিদ্যমান। এ সকল ঘটনার আলোকে তিনি যে কতখানি সাহসিকতা ও বীরত্বের অধিকারী ছিলেন তা সুস্পষ্ট বোঝা যায়।
১০০. عَنْ عَلِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كُنَّا إِذَا أَحْمَرَ الْبَاسُ وَلَقِيَ الْقَوْمُ اتَّقَيْنَا بِرَسُولُ اللهِ ﷺ فَمَا يَكُونُ أَحَدُ أَقْرَبَ إِلَى الْعَدُوِّ مِنْهُ
১০০. হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রণক্ষেত্রে যুদ্ধ যখন ঘোরতর আকার ধারণ করত এবং একদল অন্যদলের মুখোমুখি হয়ে লড়াই শুরু করত, তখন আমরা নবী-এর চতুষ্পার্শ্বে আশ্রয় খুঁজতাম। আমাদের মধ্যে কেউ শত্রুপক্ষের মুকাবিলায় নবী-এর চেয়ে অগ্রবর্তী থাকত না (অর্থাৎ তিনি মুকাবিলায় সকলের অগ্রবর্তী থাকতেন)।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসটিও প্রিয় নবী-এর অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের কথা প্রকাশ করছে। কেননা কাফিরদের সঙ্গে যখন মুসলমানদের যুদ্ধ শুরু হতো এবং একদল অন্যদলের মুখোমুখি হয়ে লড়াই শুরু করত, তখন শত্রুপক্ষের সংখ্যাধিক্য এবং নিজেদের যুদ্ধ উপকরণের অপ্রতুলতা দেখে এই গুটিকতক নিরস্ত্র মুসলমান সৈন্যদের মনে ভীতির উদ্রেক হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিশেষত যে সকল যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর হাতে যুদ্ধ সরঞ্জাম বলতে কিছুই ছিল না। তখন যে কোন তেজস্বী, বাহাদুর ব্যক্তিরও শংকিত হয়ে ওঠা স্বাভাবিক। অথচ প্রিয় নবী-এর মনোবল এমন মুহূর্তগুলিতেও কেবল দৃঢ় থাকতো তাই নয় বরং নিজে অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের সঙ্গে তরবারি নিয়ে কাফিরদের সারির ভিতর ঢুকে পড়তেন। তখন মুসলিম সৈনিকদের অন্যরাও প্রিয় নবী-এর কাছাকাছি আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করতেন। কতিপয় হাদীসের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় ঘোররত লড়াইয়ের তোড়ে লোকজন দূরে হটে যেত। এ মুহূর্তে যাঁরা প্রিয় নবী-এর সঙ্গে ও কাছাকাছি থাকতেন সাহাবীদের মধ্যে তাঁদেরকে বীর সেনানী বলে বিবেচনা করা হতো।
١٠١. عَنْ سَعْدِ بْنِ عِبَاضِ الثَّمَالِي قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَلِيْلَ الْكَلَامِ قَلِيْلَ الْحَدِيثِ فَلَمَّا أُمِرَ بِالْقِتَالِ تَشَمَّرَ وَكَانَ مِنْ أَشَدِّ النَّاسِ بَأْسًا -
১০১. হযরত সাদ ইব্ন ইয়ায সামালী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ স্বভাবত ছিলেন বাকসংযমী ও মিতভাষী। কিন্তু যখন তিনি যুদ্ধের জন্য আদিষ্ট হতেন তখন এমনভাবে প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন যে তাঁকে সর্বাধিক বলিষ্ঠ যোদ্ধা ও সাহসী বলে দেখা যেত।
ফায়দা : উপরোক্ত হাদীসে প্রিয় নবী-এর দু'টি গুণের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এক. মিতভাষী হওয়া, দুই. সাহসী ও বাহাদুর হওয়া। মিতভাষী হওয়া মানব জীবনে অন্যতম সদ্গুণ। অথচ অতিশয় সহজলভ্য একটি আমল। একখানা হাদীসে প্রিয় নবী ইরশাদ করেন: আমি কি তোমাদের অত্যন্ত হালকা ও সহজলভ্য একটি আমলের কথা জানাবো? সে আমলটি হলো নীরব থাকা এবং চরিত্রবান হওয়া। (তারগীব ওয়া তারহীব, খ. ৪, পৃষ্ঠা ৩২১)
বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে প্রিয় নবী -এর স্বল্পভাষী হওয়া সম্পর্কীয় আরো বহু রিওয়ায়াত বিদ্যমান। এ সব রিওয়ায়াতের আলোকে বোঝা যায় যে, মিতভাষী হওয়াও মানব চরিত্রের অন্যতম সদ্গুণ। চরিত্র বিশারদ ও দার্শনিকদের কেউই এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন না।
গ্রন্থকার এখানে প্রিয় নবী -এর সাহসিকতা ও বীরত্বের আলোচনা প্রসঙ্গে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। কেননা হাদীসখানার শেষ বাক্যটি থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, প্রিয় নবী -কে যখনই আল্লাহ্ পাকের তরফ থেকে কোন জিহাদ বা যুদ্ধের জন্য আদেশ করা হতো তখনই তিনি কোন দ্বিধাদ্বন্দু ব্যতিরেকে অতিশয় বীরত্ব ও সাহসিকতাসহ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যেতেন। আবার রণক্ষেত্রেও তিনি সবচেয়ে অধিক সাহসী ও বীর ব্যক্তি হিসাবে প্রমাণিত হতেন।
۱۰۲. عَنِ الْبَرَاءِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كُنَّا وَاللَّهِ إِذَا أَحْمَرَّ الْبَاسُ نَتَّقِي بِهِ يَعْنِي النَّبِيُّ ﷺ وَإِنَّ الشَّجَاعَ مِنَّا الَّذِي يُحَاذِي بِهِ -
১০২. হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ্র কসম! যখন আমাদের যুদ্ধ ভয়ানক আকার ধারণ করত, তখন আমরা প্রিয় নবী -এর কাছে এসে আশ্রয় নিতাম। আর আমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিকেই সবচেয়ে বড় সাহসী ও বীর বলে গণ্য করা হতো যিনি যুদ্ধকালে প্রিয় নবী -এর সঙ্গে সঙ্গে থাকতেন।
ফায়দা: প্রিয় নবী -এর চরিত্রে যেভাবে অন্যান্য অতুলনীয় যোগ্যতা ও গুণাবলি পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান ছিল তেমনি সাহসিকতা ও বীরত্বও ছিল অতুলনীয় ও অসীম। বড় বড় যুদ্ধগুলিতে এবং যুদ্ধ জীবনের চরম আতংকের মুহূর্তগুলোর মধ্যেও তিনি এতখানি দুঃসাহসিকতার প্রমাণ দিয়েছিলেন যে, যখন বীর বাহাদুর সাহাবীগণ পর্যন্ত হিম্মতহারা হয়ে যাচ্ছিলেন এবং নিজেরা কোন আশ্রয়ের তালাশ শুরু করেছিলেন। সে মুহূর্তে সকলে তাঁর আশ্রয় পেয়ে পুনর্বার যুদ্ধ চালানোর হিম্মত লাভ করতেন। তা ছাড়া সাহাবীদের মধ্যে তখন তাঁকেই সবচেয়ে শক্তিশালী বীর বলে জ্ঞান করা হতো, যিনি নবী -এর আশ্রয়ে থেকে যুদ্ধ চালনায় দৃঢ় থাকতে সক্ষম হতেন।
۱۰۳. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ بِالْمَدِينَةِ فَزَعٌ وَرَكِبَ رَسُولُ الله ﷺ فَرَسًا لِأَبِي طَلْحَةَ فَقَالَ مَا رَأَيْنَا مِنْ شَيْءٍ وَإِنْ وَجَدْنَاهُ لَبَحْرًا -
১০৩. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার মদীনা শরীফের (এর উপর শত্রুরা অতর্কিত হামলা চালিয়েছে বলে গুজব রটেছিল। ফলে) সর্বত্র ভয় ও আতংক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় নবী হযরত আবূ তালহা (রা)-এর ঘোড়ার উপর সওয়ার হন (এবং শত্রুদের গতিবিধি জানার জন্য সম্পূর্ণ একাকী অবস্থায় তিনি বেরিয়ে পড়েন। এভাবে পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল হওয়ার পর তিনি যখন ফিরে আসেন তখন) বলেন: আমি তো এখানে ভয়ের কিছুই দেখিনি। আমি আবু তালহার ঘোড়াটিকে সমুদ্রের মত দ্রুতগতিসম্পন্ন পেলাম।
ফায়দা : এই হাদীসসহ সম্মুখে আরো দু'টি হাদীস আসছে, সবগুলোর মূল বক্তব্য অভিন্ন। ঘটনাটি ছিল এমন যে, একবার মদীনা শরীফের সর্বত্র সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল যে, 'শত্রুরা মদীনার উপর আক্রমণ চালিয়েছে। এ সংবাদ খুব দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষকে দারুণ আতংকের মধ্যে ফেলে দেয়। ভয়ের আতিশয্যে কেউ এগিয়ে পরিস্থিতির সঠিক পর্যবেক্ষণের হিম্মতটুকুও পাচ্ছিল না। কিন্তু প্রিয় নবী এ আতংকের কোন পরোয়া করেননি। তিনি তৎক্ষণাৎ হযরত আবূ তালহা (রা)-এর ঘোড়াটি নিয়ে পরিস্থিতির সঠিক পর্যবেক্ষণের জন্য সম্মুখের দিকে সম্পূর্ণ একাকী ছুটে চললেন। নবী দ্রুতগামী এ ঘোড়াটি নিয়ে মদীনা শরীফের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত চলে যান। কিন্তু কোথাও শত্রুদের আক্রমণের কোন চিহ্ন দেখতে পাননি। তিনি বুঝলেন এটি সম্পূর্ণ গুজব। কাজেই তিনি ফিরে আসলেন এবং লোকজনকে সান্ত্বনা ও অভয় দিয়ে বললেন: তোমরা ভয় পেয়ো না। এখানে আমি আতংকের কিছুই দেখিনি। অতঃপর নবী আবু তালহার ঘোড়ার প্রশংসা করে বললেন: এই ঘোড়াটি সমুদ্রের মত অত্যন্ত বেগবান ও দ্রুতগতি সম্পন্ন।
١٠٤. عَنْ أَنَسِ ابْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ فَزِعَ أَهْلُ المَدِينَةِ مَرَّةً فَرَكِبَ النَّبِيُّ ﷺ فَرَسًا كَأَنَّهُ مُقَرِّفُ فَرَكَضَهُ فِي آثَارِهِمْ فَلَمَّا رَجَعَ قَالَ وَجَدْنَاهُ بَحْرًا
১০৪. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার মদীনা শরীফের অধিবাসীরা (শত্রুদের আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে এই গুজবে) ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গিয়েছিল। নবী তৎক্ষণাৎ জীর্ণশীর্ণ দুর্বল একটি ঘোড়ায় আরোহণ করেন। তিনি এটিকে দ্রুত আক্রমণকারীদের দিকে ছুটিয়ে নিলেন। অবশেষে ফিরে এসে বললেন, আমি এটিকে সমুদ্রের মত বেগবান পেলাম (অথচ তোমরা একে দুর্বল ও ধীরগতি সম্পন্ন বলছ)।
١٠٥ عَنْ عِمْرَانَ بْنِ الحُسَيْنِ قَالَ مَا لَقِي النَّبِيُّ ﷺ إِلَّا كَانَ أَوَّلَ مَنْ يَضْرِبُ
১০৫. হযরত ইমরান ইবন হুসাইন (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোন শত্রুবাহিনীর সঙ্গে নবী -এর যখন মুকাবিলা হতো তখন যুদ্ধে তিনিই থাকতেন প্রথম আক্রমণকারী।
ফায়দা: কাফির, মুশরিক ও আল্লাহ্র দুশমনদের বিরুদ্ধে তরবারি উত্তোলনের কাজেও প্রিয় নবী থাকতেন সবার অগ্রে। প্রিয় নবী -এর এই ভূমিকা গ্রহণ তাঁর অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় বহন করে। তা ছাড়া তিনি মানসিকভাবে কতখানি দৃঢ়চেতা ও প্রবল শক্তিমান ছিলেন বর্ণিত হাদীস থেকে এটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
١٠٦. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ مِنْ أَشْجَعِ النَّاسِ وَأَسْمَحِ النَّاسِ-
১০৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে রাসূলুল্লাহ্ ছিলেন অসীম সাহসী ও সর্বোচ্চ দানশীল ব্যক্তি।
ফায়দা : উল্লিখিত হাদীসে প্রিয় নবী ﷺ-এর বিশেষ মানের দু'টি সদ্গুণের উল্লেখ করা হয়েছে। একটি হলো, তাঁর সীমাহীন বীরত্ব ও দুঃসাহসিকতা। আর অপরটি হলো পরম দানশীলতা ও বদান্যতা। দার্শনিক ও চরিত বিশারদদের সকলে এ মর্মে একমত যে, এই বীরত্ব ও দানশীলতা একটি অপরটির অনিবার্য ফলশ্রুতি।
۱۰۷. عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَحْسَنَ النَّاسِ وَأَشْجَعَ النَّاسِ وَأَسْمَحَ النَّاسِ-
১০৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক সুপুরুষ, সর্বাধিক সাহসী ও সবচেয়ে বেশি দয়া-দাক্ষিণ্যের অধিকারী।
ফায়দা : উপরোক্ত হাদীসে প্রিয় নবী ﷺ-এর তিনটি উল্লেখযোগ্য বিশেষণের কথা বলা হয়েছে। এক. তাঁর অতুলনীয় শারীরিক সুগঠন ও সৌন্দর্য, দুই. তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতা, তিন, তাঁর দানশীলতা ও দয়া-দাক্ষিণ্য। কোন সন্দেহ নেই যে, প্রিয় নবী ﷺ-এর পবিত্র সত্তা নবুওয়াতের ক্ষেত্রে যেমন সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত শিখরে অধিষ্ঠিত ছিল, তেমনি তাঁর এ সত্তা নীতিপরায়ণতা ও উন্নত চরিতাদর্শের ক্ষেত্রেও ছিল সর্বোচ্চ শিখরে প্রতিষ্ঠিত। এ মাকাম তথা মর্যাদা শুধুমাত্র তাঁর জন্যই। কারোর পক্ষে এতখানি উচ্চে আরোহণ কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়। আল্লাহ্ পাক আমাদেরকে তাঁর প্রিয়তম বন্ধুর উন্নত অনুপম চরিতাদর্শ অনুসরণের তাওফীক দান করুন। আমীন।
۱۰۸. عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ صَيْحَةُ بِالْمَدِينَةِ، فَرَكِبَ النَّبِيُّ ﷺ فَرَسًا لَأَبِي طَلْحَةَ، فَأَجْرَاهُ سَاعَةً ثُمَّ رَجَعَ فَقَالَ مَا رَأَيْنَا مِنْ شَيْ وَإِنَّ وَجَدَنَاهُ لَبَحْرًا -
১০৮. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার মদীনা শরীফের উপর শত্রুরা অতর্কিত আক্রমণ চালিয়েছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ল। প্রিয় নবী ﷺ তৎক্ষণাৎ হযরত আবূ তালহা (রা)-এর একটি ঘোড়ায় আরোহণ করেন এবং এক ঘণ্টা পর্যন্ত ঘোড়াটিকে এদিক-ওদিক ছুটিয়ে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেন। অবশেষে (ঘটনার প্রকৃত অবস্থা প্রত্যক্ষ করে) ফিরে এসে বললেন, আমি কিছুই দেখলাম না। (ভয়ের কিছুই নেই) তবে আমি এ ঘোড়াটিকে (গতিশীলতার দিক থেকে) সমুদ্রের ন্যায় পেলাম।
١٠٩. عَنْ أَبِي جَعْفَرٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ شَدِيدَ الْبَطَشِ -
১০৯. হযরত আবূ জাফর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ কঠোর পাকড়াওকারী ছিলেন।
ফায়দা : আলোচ্য হাদীসের আলোকেও বোঝা যায় যে, প্রিয় নবী যেমন সাহসিকতা ও বীরত্বের অধিকারী ছিলেন তেমনি শারীরিকভাবেও তিনি অতিশয় শক্তিশালী ও সবল ছিলেন। একখানা হাদীসে তিনি স্বয়ং ইরশাদ করেন: আমাকে চল্লিশ জন মানুষের সমান শক্তি প্রদান করা হয়েছে। আর এ কারণেই কঠিন থেকে কঠিন কিংবা শক্ত থেকে শক্ততর কোন কাজ যা সাহাবীদের কারোর পক্ষে সম্ভব হতো না সেটি তিনি অনায়াসেই করে দিতে পারতেন। পরবর্তী ১১১ নং হাদীস থেকেও প্রিয় নবী-এর এহেন অতুলনীয় শক্তিমত্তা ও দৈহিক ক্ষমতার প্রমাণ মেলে।
١١٠. عَنِ الْبَرَاءِ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَوْمَ الْخَنْدَقِ يَنْقُلُ التَّرَابَ حَتَّى وَارَى الغُبَارُ شَعْرَ صَدْرِهِ وَرَأَيْتُ النَّبِيُّ ﷺ يَرْتَجِزُ يَوْمَ الخَنْدَقِ وَهُمْ يَحْفِرُونَهُ وَهُوَ يَنْقُلُ التَّرَابَ حَتَّى وَارَى جَلْدَةُ بَطْنِهِ -
১১০. হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি খন্দক যুদ্ধের দিন দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ্ নিজে মাটি বহন করেছেন আর ধুলায় তাঁর বুকের পশমগুলি ঢেকে গিয়েছিল। তিনি বলেন, আমি আরো দেখেছি যে, খন্দকের সে দিন প্রিয় নবী উদ্দীপনাবর্ধক কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। আর সাহাবীগণ পরিখা খনন করে যাচ্ছেন। এ সময় তিনিও অন্যদের সঙ্গে মাটি বহন করেছেন। এমনকি বালির কারণে তাঁর পেটের চামড়া আবৃত হয়ে গিয়েছিল।
ফায়দা : এ ঘটনাটি হলো খন্দক যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের। আলোচ্য হাদীসের উল্লেখের দ্বারা গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হলো প্রিয় নবী-এর সীমাহীন মনোবলের কথা প্রমাণ করা এবং আল্লাহ্র পথে কঠিন থেকে কঠিনতর ও তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতর কোন কাজ সম্পাদন করতে তিনি কতখানি দৃঢ়চেতা ও সাহসী ছিলেন তা তুলে ধরা।
۱۱۱. عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ مَكَثَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَأَصْحَابُهُ يَحْفِرُونَ الخَنْدَقَ ثَلَاثًا مَا ذَاقُوْا طَعَامًا فَقَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ : إِنَّ هَذِهِ كِدْيَةٌ - مِنْ الجَبَلِ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ رَسُوْمًا بِالْمَاءِ فَرَسُوْهَا ثُمَّ جَاءَ النَّبِيُّ ﷺ فَأَخَذَ الْمِعْولَ أَوِ الْمِسْحَاةَ ثُمَّ قَالَ بِسْمِ اللهِ ثُمَّ ضَرَبَ ثَلَاثًا فَصَارَ كَثِيْبًا يَهَالُ، قَالَ جَابِرُ فَحَانَتْ مِنَى الْتِفَاتَةُ فَرَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ وَقَدَ شَدَّ بَطْنَهُ بحجر
১১১. হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (খন্দকের যুদ্ধ চলাকালে) রাসূলুল্লাহ্ ও তাঁর সাহাবীগণ তিন দিন পর্যন্ত অনাহারক্লিষ্ট অবস্থায় পরিখা খননের কাজে নিয়োজিত থাকলেন। (তখন অতিশয় শক্ত ও বিশাল আয়তনের একটি পাথর খোদাই কাজের মুখে বেরিয়ে আসে) সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এটি পর্বতের একটি মস্তবড় পাথর। রাসূলুল্লাহ্ বললেন: তোমরা পাথরটির উপর পানি ছিটিয়ে দাও। সেমতে তাঁরা পানি ছিটিয়ে দিলেন। তারপর প্রিয় নবী তাশরীফ আনেন। তিনি কোদাল বা হাতুড়ি হাতে নিয়ে 'বিসমিল্লাহ্' পাঠ করেন এবং পাথরের উপর তিনবার আঘাত হানেন। ফলে অতিশয় শক্ত পাথরটি এত নরম হয়ে গিয়েছিল যে, আঘাতের দরুন ফেটে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে বালির ন্যায় ঝরে পড়ে গেল। হযরত জাবির (রা) বলেন, এ সময় হঠাৎ আমার দৃষ্টি নবী -এর পেট মুবারকের উপর গিয়ে পড়ল। আমি দেখলাম যে, তিনি (ক্ষুধার আতিশয্যে) পেটের উপর পাথর বেঁধে রেখেছেন।
ফায়দা : আলোচ্য ঘটনাটিও খন্দকের যুদ্ধ প্রস্তুতিকালে ঘটেছিল। ইতিহাসে এ যুদ্ধকে আহযাবের যুদ্ধ নামেও অভিহিত করা হয়েছে। হিজরী ৫ বর্ষের যিল্কাদ মাসে এ যুদ্ধ শুরু হয়। প্রিয় নবী তখন মদীনা শরীফেই অবস্থানরত ছিলেন। আরবের সকল গোত্রের মুশরিক ও ইয়াহুদীরা সকলে সম্মিলিতভাবে مسلمانوں বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এবং পবিত্র মদীনা নগরী অবরোধ করে নেয়। শত্রু বাহিনীর সংখ্যা ছিল ছয় সহস্রাধিক। প্রিয় নবী অবরোধের সংবাদ পেয়ে সাহাবীদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। সাহাবী হযরত সালমান ফারসী (রা) ছিলেন পারস্যের অধিবাসী। তিনি নগর রক্ষার স্বার্থে তখন পরিখা খননের পরামর্শ দিয়ে বলেন, এমনি জটিল মুহূর্তে ইরানী যোদ্ধারা সাধারণত পরিখা খননের ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। সে মতে মদীনা নগরীর অদূরে মুসলিম সৈন্যগণ এক জায়গায় জমায়েত হন। তাঁরা পরামর্শ মোতাবেক পরিখা খননের কাজ শুরু করেন। মুসলমানদের মধ্যে সে মুহূর্তে খুব অভাব-অনটন বিরাজিত ছিল। দুর্ভিক্ষের কারণে মুসলমানগণ তিনদিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ অনাহারে কাটান, মুখে দেয়ার মত সামান্য রসদও তাদের হাতে ছিল না। কারণ শত্রু সৈন্যরা ইতিপূর্বেই মদীনা শরীফ অভিমুখে রসদ পৌছার সকল পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। এদিকে পরিস্থিতি নাজুক বিধায় দ্রুত পরিখা খননের কাজ সমাপ্ত করা আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়।
এভাবে অবরোধ ও খণ্ডযুদ্ধ প্রায় এক মাস যাবত অব্যাহত থাকে। পরিশেষে মহান আল্লাহ্ অদৃশ্য পথে মুসলমানদের সাহায্য করেন। হঠাৎ খুব শক্তিশালী একটি বায়ুর ঝড় নেমে আসে এবং অবরোধকারী আগ্রাসী বাহিনীর সমুদয় সাজ-সরঞ্জাম উড়িয়ে নিয়ে যায়। ফলত শত্রুপক্ষের মনোবল ভেঙে যায় এবং তারা পলায়নের পথ অবলম্বন করে। আর মু'মিনগণ তাদের আক্রমণ থেকে রেহাই পেয়ে যান।
গ্রন্থকার আলোচ্য অংশে প্রিয় নবী -এর শক্তিমত্তা ও দৈহিক ক্ষমতা এবং সাহসিকতা ও বীরত্বের আলোচনা করছেন এবং এতদুদ্দেশ্যেই উপরোক্ত হাদীসখানা অনুচ্ছেদের অন্তর্ভুক্ত করেন। কেননা হাদীসটির মধ্যে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, মস্তবড় যেই পাথরটি খোদাই পথে পড়েছিল, সেটিকে অন্যরা কোনক্রমেই ভাঙতে সক্ষম হয়নি। সেটি তিনি শক্তিবলে ভেঙে ফেলেন। তিনি কোদাল হাতে নিয়ে মাত্র তিনবার সজোরে আঘাত করেছিলেন। আর পাথরটি বালির ন্যায় গুঁড়িয়ে গিয়েছিল। এ ঘটনা থেকে তাঁর দৈহিক শক্তিমত্তা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
একটি বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) বলেন, প্রিয় নবী স্বয়ং ইরশাদ করেছেন যে, আমাকে চল্লিশ জন বেহেস্তী মানুষের সম-পরিমাণ শক্তি প্রদান করা হয়েছে। (তাবারানী, সূত্র-ইত্তেহাফুস সাদাহ্, খ. ৭, পৃষ্ঠা ১৪১)
۱۱۲. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَحْسَنَ النَّاسِ وَأَشْجَعَ النَّاسِ وَأَجُودَ النَّاسِ، وَلَقَدْ فَزِعَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ وَرَكِبَ فَرَسًا لِأَبِي طَلْحَةَ عَرِيًّا فَخَرَجَ النَّاسُ فَإِذَا هُمْ بِرَسُولِ اللهِ قَدْ سَبَقَهُمْ إِلَى الصَّوْتِ قَدْ اسْتَبْرَأَ الْخَبَرَ وَهُوَ يَقُولُ لَنْ تَرَاعُوا وَقَالَ النَّبِيُّ وَلَقَدْ وَجَدْنَاهُ بَحْراً أَوْ إِنَّهُ لَبَحْرٍ -
১১২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুপুরুষ, সর্বাধিক সাহসী ও সর্বোচ্চ দয়া-দাক্ষিণ্যের অধিকারী। (একবার একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ার দরুন) মদীনা শরীফের লোকজন আতংকিত হয়ে উঠেছিল। রাসূলুল্লাহ্ তৎক্ষণাৎ হযরত আবু তালহা (রা)-এর ঘোড়ায় গদি ব্যতিরেকেই সওয়ার হন এবং দ্রুতগতিতে সম্মুখে অগ্রসর হন। অবস্থা দৃষ্টে লোকজনও রাস্তায় বেরিয়ে আসে। তখন তারা দেখলো রাসূলুল্লাহ্ তাদের পূর্বেই গুজবটি যে দিক থেকে আসছিল সে দিক থেকে পর্যবেক্ষণ শেষ করে ফিরে আসছেন। প্রিয় নবী লোকজনকে বললেন: তোমরা ভয় পেয়ো না। তিনি আরো বললেন: আমি ঘোড়াটিকে সমুদ্রের ন্যায় দ্রুতগামী পেলাম অথবা তিনি বলেছেন: এটি সমুদ্রের মত (বেগবান)।
ফায়দা: সহীহ্ বুখারীতে একাধিক স্থানে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। তবে হাদীসের শব্দমালায় কিছু ভিন্নতা বিদ্যমান।১
আলোচ্য হাদীসের আলোকেও প্রিয় নবী-এর অসীম সাহসিকতা, বীরত্ব ও নির্ভীকতার প্রমাণ পাওয়া যায়। চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া আতংকের এ মুহূর্তে যখন যে কোন সময়ে মদীনার উপর শত্রুদের আক্রমণ চালানোর আশংকা বিদ্যমান, তাছাড়া শত্রুপক্ষ কোন দিক থেকে কতটুকু প্রস্তুতি নিয়ে আক্রমণ শুরু করছে তাও অজানা এমন এক নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে প্রিয় নবী-এর সম্পূর্ণ একাকী অবস্থায় অনুসন্ধানের জন্য সম্মুখে বেরিয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে তাঁর অসীম সাহসিকতার প্রমাণ বহন করে।
এ হাদীসের মধ্যেও প্রিয় নবী-এর উল্লেখযোগ্য তিনটি সদ্গুণের উল্লেখ করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, এ বিশেষণত্রয় হলো মানুষের যাবতীয় সদ্গুণের আধার। কেননা প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে তিনটি প্রকৃতিগত শক্তি বিদ্যমান থাকে। যথা ১. অনুকম্পা শক্তি, ২. ক্রোধশক্তি ও ৩. বিবেচনা শক্তি। ক্রোধ শক্তির পূর্ণতা দ্বারা ব্যক্তির মধ্যে সাহসিকতা ও বীরত্বের গুণ সৃষ্টি হয়। অনুকম্পা শক্তির পূর্ণতার কারণে ব্যক্তি দানশীলতা ও বদান্যতার গুণে গুণান্বিত হয়। আর বিবেচনা শক্তির পূর্ণতা অর্জনের ফলে ব্যক্তির মাঝে নৈপুণ্য ও বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ ঘটে। প্রিয় নবী-এর চরিত্রে উল্লিখিত সব কয়টি শক্তি পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান ছিল। এ কারণেই শক্তিগুলি থেকে উদ্ভূত গুণগুলিও ছিল তাঁর চরিত্রে পরিপূর্ণ। দার্শনিকগণ লিখেছেন, যে ব্যক্তির প্রকৃতির মধ্যে উদ্ভূত শক্তি পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান তিনি দৈহিক গঠন ও রূপ সৌন্দর্যের ক্ষেত্রেও পরিপূর্ণ মানের হবেন। কারণ বিবেচনা শক্তি ও দৈহিক সুগঠন একটি অপরটির জন্য অনিবার্য উপাদান।
۱۱۳. عَنِ الْبَرَاءِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ لَمَّا غَشِيَهُ الْمُشْرِكُونَ نَزَلَ فَجَعَلَ يَقُولُ أَنَا النَّبِيُّ لَا كَذِبَ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَمَارَنِي فِي النَّاسِ يَوْمَئِذٍ أَحَدٌ كَانَ أَشَدَّ مِنَ النَّبِيِّ
১১৩. হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুশরিকদের সৈন্য বাহিনী যখন রাসূলুল্লাহ্-কে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলল তখন তিনি নিজের বাহন থেকে অবতরণ করেন এবং বলতে লাগলেন, أَنَا النَّبِيُّ لَأَكَذِبَ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ কোন সন্দেহ নেই আমি সত্য নবী, আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান। বর্ণনাকারী বলেন, সে দিন মুসলিম বাহিনীর মধ্যে এমন একজনও ছিল না যাকে প্রিয় নবী এর তুলনায় অধিক সাহসিকতার অধিকারী বলা যায়।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসটি হুনাইনের যুদ্ধ সম্পর্কিত। এ যুদ্ধে হাওয়াযিন গোত্রের প্রসিদ্ধ তীরন্দাজ দল নিজেদের ব্যূহ থেকে অতর্কিতভাবে মুসলমানদের উপর তীরের বৃষ্টি নিক্ষেপ করেছিল। ফলে অধিকাংশ সাহাবী আহত ও শংকিত হয়ে পড়েন। তাঁদের কদম বিচলিত হয়ে যায় এবং তাঁরা রণক্ষেত্র থেকে পিছু হটে যান। কিন্তু সেই উন্মুক্ত রণক্ষেত্রে নবী স্বস্থান থেকে বিন্দুমাত্র হটেননি। তিনি সওয়ারী থেকে দ্রুত অবতরণ করে নিকটস্থ জানবায সাহাবীদেরকে নিয়ে শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে শক্তিশালী মুকাবিলা চালিয়ে যান। এ মুহূর্তে প্রিয় নবী -এর কণ্ঠ থেকে নিম্নের তেজোদ্দীপক জোশপূর্ণ বাক্যটি বেরিয়ে এসেছিল: “أَنَا النَّبِيُّ لَكَذِبُ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ" "আমি বরহক ও সত্য নবী, আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান।” বলা বাহুল্য, এটি হলো বীরত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নীতি। তাঁরা জটিল ও নাজুক কোন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে অন্যদের মনেও আবেগের সঞ্চার করার লক্ষ্যে এ ধরনের তেজোদ্দীপক বাক্য আবৃত্তি করে থাকেন। আর এ কারণেই ইসলামী শরীয়তে সমর সঙ্গীত আবৃত্তি করা ও যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের বংশগৌরব প্রকাশ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
📄 নবী (সা)-এর নম্রতা ও বিনয়
١١٤. عَنْ قُدَامَةَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَامِرٍ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَرْمِي الجَمْرَةَ عَلَى نَاقَةٍ شَهَبَاءَ لأَضَرْبَ وَلَا طَرْدَ وَلَا إِلَيْكَ إِلَيْكَ -
১১৪. হযরত কুদামা ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন আমির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-কে (হজ্জের মৌসুমে) খাকী বর্ণের একটি উটনীর উপর সাওয়ার হয়ে (আকাবায়) কংকর নিক্ষেপ করতে দেখেছি। (তিনি এভাবে কংকর নিক্ষেপের জন্য গিয়েছেন যে, লোকজনকে তাঁর কাছ থেকে দূরে থাকার জন্য) না কোন মারপিট ছিল আর না কোন প্রকারের হাঁকডাক। অনুরূপ 'এদিকে যাও' 'ওদিকে সর' এ সব কথাও বলা হয়নি।
ফায়দা: এ অনুচ্ছেদে প্রিয় নবী এর বিনয় ও নম্রতা বিষয়ক হাদীসসমূহ বর্ণনা করা হয়েছে। উল্লিখিত প্রথম হাদীসের থেকে তাঁর পূত-পবিত্র চরিত্রে পরম বিনয় নীতির প্রকাশ পাওয়া যাচ্ছে। কেননা প্রিয় নবী তখন একই সঙ্গে গোটা বিশ্বের পথপ্রদর্শক ও সকল নবীর সর্দার হওয়ার পাশাপাশি সমকালীন প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তা ব্যক্তিও ছিলেন। তা সত্ত্বেও তাঁর চাল-চলনে সর্বোচ্চ কর্তাসুলভ আচরণে কোন ভিন্নতা দেখা যায়নি। হজ্জের মৌসুমে হাজীদের প্রচণ্ড ভিড় থাকে। উপরন্তু তাঁদের অধিকাংশই থাকেন এমন চরিত্রের যারা নাগরিক রীতি-নীতি সম্পর্কে অসচেতন ও অনভ্যস্ত। এমন পরিস্থিতিতে একজনের শরীরে অন্যজনের শরীরের ধাক্কা লাগা, ভিড়ের চাপে কেউ নিচে পড়ে যাওয়া মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে প্রিয় নবী নিজের মর্যাদা বা মান-সম্মান বজায় রাখার উদ্দেশ্যে পৃথক কোন ব্যবস্থাই নেননি। তিনি সাধারণ হাজীদের সঙ্গে মিশে হজ্জের কাজকর্ম সম্পাদন করে যান। তাঁর আগমন উপলক্ষে রাস্তায় পথচারীদের না আসা-যাওয়া বন্ধ করা হয়েছিল, আর না তাঁর সম্মান প্রদর্শনার্থে পথচারীদেরকে 'সর' কিংবা 'দূরে থাক' ইত্যাদি বলা হয়েছিল। মোটকথা প্রিয় নবী নিজের প্রাধান্য প্রদর্শনের কোন ব্যবস্থা অবলম্বন করেননি।
এভাবে প্রিয় নবী-এর নম্রতা ও বিনয় সম্পর্কে আরো জানা যায় যে, তিনি মক্কা শরীফে যখন অসহায় ও শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থায় কালাতিপাত করছিলেন। ধৈর্য ও সহনশীলতা অবলম্বন ব্যতিরেকে তাঁর অন্য কোন পথ ছিল না। তখন আল্লাহ্ পাক তাঁকে ইখতিয়ার দিয়ে বলেছিলেনঃ হে নবী! আপনার অভিমত কি? আপনি কি বাদশাহী সংযুক্ত নবুওয়াত পেতে চান, আর না আবদিয়্যাত সংযুক্ত নবৃওয়াত? প্রিয় নবী নিজের পরম বিনয় প্রকাশ করে বাদশাহীর পরিবর্তে আবদিয়্যাত সংযুক্ত নবৃওয়াত লাভের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন এবং নিজের জন্য অভাব-অনটনের পথ বেছে নেন। অথচ নবুওয়াতের সঙ্গে বাদশাহীর সংযুক্ত প্রার্থনা করতে কোন বাধা ছিল না। তাঁর সম্মুখে হযরত সুলায়মান (আ)-এর উদাহরণও বিদ্যমান ছিল। তাছাড়া এই বাদশাহী গ্রহণ নবৃওয়াতের দায়িত্ব পালনের পথে কোন প্রতিবন্ধক বলেও বিবেচিত হতো না। কিন্তু 'রাহমাতুললিল আলামীন নিজের স্বভাবজাত চাহিদার নিরিখে বাদশাহীর উপর আবদিয়্যাতকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। এ কারণেই একাধিক হাদীসে পাওয়া যায় যে, এর পর প্রিয় নবী কখনো হাতের উপর বা পিঠের উপর ভর করে বসে পানাহার করেননি। স্বয়ং ইরশাদও করেছেন: আমি একজন নগণ্য বান্দা হিসাবে বসি, একজন ক্রীতদাস যেভাবে আহার করে আমিও সেভাবে আহার করি।
নম্রতা ও বিনয়ের এ নীতির কারণে প্রিয় নবী কখনো কোন খাদেম বা কাজের লোককে কোন ভুলের কারণে প্রহার করতেন না। আর কখনো বকাঝকাও দিতেন না। একটি হাদীসে এতটুকুও বলা হয়েছে যে, হযরত উমর (রা) বলেন, প্রিয় নবী ইরশাদ করেছেন যে, আমার প্রশংসা করতে গিয়ে তোমরা খৃস্টানদের মত বাড়াবাড়ি করো না। খৃস্টানরা তাদের নবী ঈসা (আ)-এর প্রশংসা করতে গিয়ে সীমা অতিক্রম করে এবং শেষ পর্যন্ত তার ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্ পুত্র বলে অভিহিত করে। (নাউযুবিল্লাহ্) আমি আল্লাহ্র একজন বান্দা মাত্র। কাজেই তোমরা আমাকে কেবল عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُهُ "আল্লাহ্র বান্দা ও তাঁর রাসূল" এতটুকু প্রশংসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবে।
নম্রতা ও বিনয়ের অভ্যাস আল্লাহ্ পাকের কাছেও খুবই পছন্দনীয়। পক্ষান্তরে অহংকার ও বড়ত্বের মনোভাবকে তিনি খুবই অপছন্দ করেন। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ তাঁর প্রিয় বান্দাদের চরিত্র আলোচনা করে ইরশাদ করেন:
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا -দয়াময় আল্লাহ্র খাস বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে। আর অজ্ঞ লোকেরা যখন সম্বোধন করে তখন তারা তর্কে অবতীর্ণ হয় না বরং শান্তি কামনা করে। (সূরা ফুরকান: ৬৩)
সারকথা মু'মিন মুসলমানদের বৈশিষ্ট্য হলো যে, তারা আচার-আচরণের ক্ষেত্রে নম্রতা ও বিনয় অবলম্বন করে চলে। কখনো কোন অজ্ঞ কিংবা অভদ্র লোক তাদেরকে কোন কটুকথা বললে তারা ক্ষমার চোখে দেখে এবং ভদ্রনীতির প্রদর্শন করে। গর্ব করা, অহংকার করা কিংবা আত্মম্ভরিতা প্রকাশ করা মু'মিনের কাজ নয়।
এ কারনেই একবার হযরত লোকমান (আ) নিজ পুত্রকে বেশ কিছু উপদেশ দেন। সে সব উপদেশের মধ্যে তিনি নম্রতা ও বিনয়ের নীতি অবলম্বনের কথাটি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। পবিত্র কুরআনে সে উপদেশটি নিম্নোক্ত ভাষায় বর্ণিত আছে:
وَلَا تُصَعِرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ বৎস! অহংকারবশে তুমি কখনো মানুষকে অবজ্ঞা করো না। আর পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে চলাফেরা করো না। কারণ আল্লাহ্ কোন উদ্ধত ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না। (সূরা লুকমান: ১৮)
আলিমগণ লিখেছেন, আল্লাহ্ পাকের নিকট যেভাবে অহংকার করা পছন্দনীয় নয় তেমনি অহংকারীদের চাল-চলন, রীতি-নীতি ইত্যাদি অনুসরণ করাও পছন্দনীয় নয়। অর্থাৎ কোন ব্যক্তি এমন হতে পারে যে, সে আন্তরিকভাবে অহংকারী নয় তবে অহংকারী লোকেরা যেভাবে চলে সে ব্যক্তি ঐভাবে চলাফেরা করে থাকে। আল্লাহ্ পাক তার এই চলাফেরাকে পছন্দ করেন না। ইসলামী শরীয়তের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো যে, এখানে আল্লাহ্ তা'আলার তরফ থেকে মানবীয় রীতি-নীতি ও শিষ্টাচারিতার বহু ক্ষুদ্র জিনিসকে বর্ণনা করে দেওয়া হয়েছে।
একখানা হাদীসে হযরত ইয়ায ইবন হাম্মাদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন যে, মহান আল্লাহ্ আমার নিকট এ মর্মে ওহী প্রেরণ করেছেন যে, তোমরা নম্রতা ও বিনয় অবলম্বন কর। কেউ কারুর উপর কোন অবিচার কিংবা বাড়াবাড়ি করো না। অনুরূপ কেউ কারুর উপর অহংকার কিংবা গর্ব প্রকাশ করো না (আবূ দাউদ, খ. ২, পৃষ্ঠা ৬৭১)।
অপর একখানা হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন যে, গরীবকে দান-খয়রাত করার কারণে সম্পদ হ্রাস পায় না। নম্রতা, বিনয় ও ক্ষমাপরায়ণতা ব্যক্তির সম্মান বৃদ্ধি করে। যে ব্যক্তি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে বিনয় অবলম্বন করে আল্লাহ্ পাক তার মান-সম্মান অনেক গুণে বৃদ্ধি করেন। (তিরমিযী শরীফ, খ. ২, পৃষ্ঠা ২৪)
বিনয় ও নম্রতা অবলম্বনের ফলে মানব চরিত্রে অন্যান্য আরো বহু সদ্গুণের সৃষ্টি হয়ে থাকে। বিভিন্ন হাদীসে প্রিয় নবী এগুলিকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। যেমন : এক. বিনয় অবলম্বন নিজেই একটি ইবাদত। পূর্ববর্তী হাদীস থেকে স্পষ্ট যে, আল্লাহ্ পাক মানুষকে বিনয় অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। কাজেই বিনয় অবলম্বনের ফলে ব্যক্তির জীবনে আল্লাহ্ পাকের একটি হুকুম প্রতিফলিত হয়। দুই. বিনয়ী ব্যক্তি একদিকে যেমন মহান আল্লাহ্র কাছে প্রিয় তেমনি মানুষের দৃষ্টিতেও সে পছন্দনীয় ও প্রিয় ব্যক্তি হিসাবে বিবেচিত। লোকজন মন থেকে তাকে ভালবাসে; তার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে ও মেলামেশা করতে আনন্দ পান। বিনয়ী ব্যক্তির পক্ষে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করা সহজ হয়। কারণ লোকজন এ চরিত্রের মানুষকে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কাজকর্মে নিজেদের উপর অগ্রাধিকার ও নেতৃত্ব প্রদান করতে ভালবাসে। বলা বাহুল্য, নম্রতা ও বিনয় এভাবেই মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতের উচ্চমর্যাদা দান করে। তিন. বিনয়ী ও অমায়িক ব্যক্তির দুশমনের সংখ্যা খুবই কম হয়ে থাকে। কারণ মানুষ সাধারণত তার বিনয়ী চরিত্র অবলোকন করে তার শত্রুতা কিংবা বিরোধিতা করা এবং তাকে কোন প্রকার কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকে। চার. বিনয় অবলম্বনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুফল হলো যে, বিনয়ের ফলে ব্যক্তি অতি সহজে চারিত্রিক গুণাবলির দ্বারা নিজেকে গুণান্বিত করতে সক্ষম হয়। তাই চরিত্রবান লোকদেরকে সাধারণভাবে বিনয়ী দেখা যায়। পক্ষান্তরে দাম্ভিক ও অহংকারী মানুষ আল্লাহ্ পাকের দরবারে যেমন অপছন্দনীয় তেমনি মানুষের কাছেও চরম ঘৃণিত। সে দুনিয়াবাসীর অন্তরে কখনো স্থান পায় না। তদ্রূপ আখিরাতেও তার জন্য রয়েছে চরম লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা। লোকজন তার ধনৈশ্বর্যের ভয়ে কিংবা ক্ষমতার কারণে হয়ত তার বিরুদ্ধে মুখে কিছু বলে না তবে মনে মনে তাকে অপছন্দ করে থাকে। এ সত্যতা যাচাইয়ের জন্য খুব দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা এর জ্বলন্ত সাক্ষী।
١١٥. عَنْ أَبِي الْمَلِيْحِ حَدَّثَنِي نَصَرُ بْنُ وَهَبِ الخُزَاعِيُّ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ رَكِبَ حِمَاراً مَرْسُوْنَا بِغَيْرِ سَرْجٍ مُوَكَّفٌ عَلَيْهِ قَطِيفَةٌ جَزْرِيَّةٍ ثُمَّ دَعَا مُعَاذَ بْنَ جَبَلٍ فَأَرْدَفَهُ - فَأَرْدَفَهُ -
১১৫. হযরত নাসর ইবন ওয়াহ্হাব খোযাঈ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, একদা রাসূলুল্লাহ্ এমন একটি গাধার পিঠে আরোহণ করেন যেখানে বসার কোন গদি ছিল না। তবে রশির লাগাম পরা ছিল এবং এর উপর একখণ্ড পুরাতন চামড়া রাখা ছিল। তারপর তিনি হযরত মুআয ইবন জাবাল (রা)-কে ডেকে নেন এবং নিজের পেছনে আরোহণ করান।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস থেকেও প্রিয় -এর পরম বিনয়-নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রিয় নবী নিজের শক্তি ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনের মুহূর্তে একটি সাধারণ গাধার পিঠে আরোহণ করতে দ্বিধা করেননি। অথচ তিনি যদি সামান্য ইঙ্গিতটুকুও করতেন তা হলে জান কুরবান হযরত উসমান ইব্ন আফফান (রা)-এর মত দানবীর সাহাবীগণ তাঁকে উন্নত থেকে উন্নততর সাওয়ারীর ব্যবস্থা করে দিতে বিন্দুমাত্রও বিলম্ব করতেন না।
একখানা হাদীসে হযরত আবূ সালামা (রা) বলেন, আমি প্রিয় নবী -এর যবান মুবারক থেকে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন: যে ব্যক্তির মনে শস্যদানা পরিমাণ অহংকার থাকবে সে বেহেস্তে প্রবেশ করবে না। (তারগীব ওয়া তারহীব, খ. ৪, পৃষ্ঠা ৪৫)
١١٦. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَعُودُ الْمَرِيضِ وَيَتَّبِعُ الْجَنَازَةَ وَيُجِيبُ دَعْوَةَ الْمَعْلُوكَ وَيَرْكَبُ الْحِمَارَ وَكَانَ يَوْمَ خَيْبَرَ وَيَوْمَ قُرَيْظَةَ وَالنَّصْيْرِ عَلَى حِمَارٍ مَخْطُوْمٍ بِحَبْلٍ مِنْ لِيْفَ تَحْتَهُ إِكَافُ مِنْ لِيْفَ -
১১৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর নিয়ম ছিল যে, তিনি অসুস্থদের শুশ্রূষা করতেন, জানাযার সঙ্গে হেঁটে যেতেন, গোলাম ও শ্রমিকদের আমন্ত্রণ কবুল করতেন এবং গাধার পিঠে আরোহণ করতেন। (রাবী বলেন) প্রিয় নবী খাইবার যুদ্ধের দিন একটি গাধার পিঠে আরোহী ছিলেন। এ গাধাটির লাগাম ছিল খেজুরের ছাল দিয়ে পাকানো একটি রশি এবং গাধার গদিটি ছিল খেজুরের কতগুলি ছাল ও ডালের দ্বারা বানানো। (ইবন মাজা, পৃষ্ঠা-৫৪৫)
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসে প্রিয় নবী-এর এমন চারটি উন্নত অনুপম সদ্গুণের উল্লেখ করা হয়েছে যেগুলি সাধারণত কোন নীতিপরায়ণ চরিত্র মাধুরী সম্পন্ন বিনয়ী ব্যক্তির পক্ষেই অবলম্বন করা সম্ভব হয়ে থাকে।
১. অসুস্থের সেবা শুশ্রূষা: হাদীসে পাওয়া যায় যে, প্রিয় নবী আশরাফ-আত্মাফ, ধনী-নির্ধন, আযাদ-গোলাম নির্বিশেষে সকলের খোঁজ-খবর নিতেন। কারোর অসুস্থতার সংবাদ পেলে নিঃসংকোচে তার শুশ্রূষার জন্য যেতেন। এমন কি একবার তাঁর জনৈক ইয়াহুদী খাদেম অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তিনি সেই ইয়াহুদীর শুশ্রূষা করেন। প্রিয় নবী -এর চাচা আবু তালিব ইসলাম গ্রহণ করেননি। অথচ তার অসুস্থতাকালে তিনি শুশ্রূষার জন্য গিয়েছিলেন।
২. লাশের সঙ্গে যাওয়া: প্রিয় নবী মৃতের জানাযায় শরীক হতেন। নিজেই জানাযার সালাত পড়াতেন। জানাযার পর লাশের সঙ্গে গোরস্তান পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে দাফন কাজে শরীক হতেন। একদা মসজিদে নবুবীর ঝাড়ু দানকারিণী এক মহিলা রাত্রিকালে ইন্তিকাল করেন। সাহাবীগণ রাতে প্রিয় নবী-এর কষ্ট হতে পারে এ আশংকায় তাঁকে সংবাদ দেননি। নিজেরাই মহিলার কাফন-দাফনের কাজ সম্পন্ন করে নেন। পরে এ সংবাদ প্রিয় নবী-এর নিকট পৌঁছলে তিনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং মহিলার কবরে গিয়ে জানাযা পড়ে আসেন। অনুরূপভাবে মদীনার অধিবাসী আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই ইব্ন সাল্ল ছিলেন মুনাফিকদের নেতা এবং মুসলমানদের চরম শত্রু ও ইসলাম বিদ্বেষী। এ লোকটি মারা গেলে তখনও প্রিয় নবী তার জানাযার নামায পড়িয়েছিলেন।
৩. দরিদ্রদের আমন্ত্রণ কবুল করা: দরিদ্রদের আমন্ত্রণ কবুল করা এবং তাদের কথা শোনা মানুষের অন্যতম সদ্গুণ। প্রিয় নবী প্রতিটি মানুষের বক্তব্য শুনতে চেষ্টা করতেন। একটি গোলামও যদি তাঁকে নিজ প্রয়োজন সমাধা করে দেয়ার জন্য নিয়ে যেতে চাইত তখন তিনি নিঃসংকোচে গোলামের সঙ্গে চলে যেতেন। এমন কি কোন ক্রীতদাসী পর্যন্ত তুচ্ছ কোন কাজের জন্য যখন তাঁর কাছে সাহায্য চাইত তখনও তিনি তা সমাধা করে দিতে নিজের মর্যাদার জন্য হানিকর বলে মনে করতেন না।
৪. গাধার পিঠে আরোহণ করা: প্রিয় নবী-এর জন্য উট, ঘোড়া ইত্যাদি জাতীয় উন্নত বাহন গ্রহণের ব্যবস্থা ছিল। অথচ তিনি বিনয় প্রকাশার্থে গাধা ও খচ্চরের পিঠেও সাওয়ার হতেন। বাহন হিসাবে গাধা ব্যবহার করাকে নিজের জন্য অপমানজনক মনে করতেন না। এভাবে প্রয়োজনের মুহূর্তে নিজের পেছনে অন্যকে বসিয়ে নিতেন। খায়বার যুদ্ধ ও বনু কুরায়যা ও নাযীর যুদ্ধে তিনি যখন একজন সেনাপতি ও মুসলমানদের প্রধান হিসাবে রণক্ষেত্রের পার্শ্ব অতিক্রম করছিলেন তখন তাঁর বাহনটি ছিল সামান্য একটি গাধা। অথচ এমন অবস্থায় অতিশয় বিনয়ী প্রকৃতির নেতাগণও প্রতিপক্ষকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে নিজের শৌর্যবীর্য ও জাঁকজমকের প্রকাশ আবশ্যক বলে মনে করে থাকেন। কিন্তু প্রিয় নবী-এর চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী। তিনি স্বভাবজাত নম্রতা ও বিনয় ত্যাগ করে কৃত্রিমতা অবলম্বন করাকে পছন্দ করেননি। এটিই ছিল রাহমাতুল লিল্ আলামীন -এর যথাযোগ্য উত্তম অনুপম আদর্শ।
۱۱۷. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا أَنَّهَا سُئِلَتْ مَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَصْنَعُ فِي بَيْتِهِ ؟ قَالَتْ كَمَا يَصْنَعُ أَحَدُكُمْ فِي بَيْتِهِ - يَخْصِفُ النَّعْلَ وَيُرَقِعُ الثوب -
১১৭. (উম্মুল মু'মিনীন) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত যে, একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, রাসূলুল্লাহ্ ঘরে প্রবেশ করে কি কি কাজ করতেন? উত্তরে হযরত আয়েশা (রা) বলেন, তিনি সেই সব কাজই করতেন যেগুলো সাধারণত তোমরা নিজেদের ঘরে করে থাক। তিনি নিজ হাতে জুতা সেলাই করতেন এবং কাপড়ে তালি লাগাতেন।
۱۱۸. عَنْ أَبِي بُرْدَةَ قَالَ قُلْتُ لِعَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا مَا كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَصْنَعُ فِي بَيْتِهِ ؟ قَالَتْ كَانَ فِي مِهْنَةِ أَهْلِهِ -
১১৮. হযরত আবূ বুরদা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়েশা সিদ্দীকা (রা) -কে জিজ্ঞেস করলাম যে, নবী বাড়ির ভেতরে কি কাজ করতেন? তিনি বললেন, নবী ঘরের কাজকর্মে অন্যদের সাহায্য করতেন।
۱۱۹. عَنْ مُجَاهِدٍ عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَ قُلْتُ مَا كَانَ يَصْنَعُ النَّبِيُّ فِي بَيْتِهِ قَالَتْ يَخْصِفُ النَّعْلَ وَيُرْقِعُ التَّوْبَ .
১১৯. মুজাহিদ (র) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম যে, প্রিয় নবী ঘরের ভিতর থাকাকালে কি কি কাজ করতেন? তিনি বললেন, নবী নিজ হাতে নিজের চপ্পল সেলাই করতেন এবং নিজের পোশাকে তালি লাগাতেন।
ফায়দা : উপরোক্ত তিনটি হাদীসের মর্ম প্রায় অভিন্ন। এখানে গৃহের অভ্যন্তরে থাকাকালে প্রিয় নবী যে সব কাজকর্ম করতেন বলে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) বর্ণনা করেছেন। তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ঘরের ভিতরে তিনি অতিশয় সাদাসিধা ও সরল জীবন যাপন করতেন। একজন সাধারণ মানুষের মতই ছিল তাঁর পারিবারিক জীবন। রাজকীয় রীতি-নীতি কিংবা কোন জাঁকজমক তাঁর পরিবারে ছিল না। এখানে গভীরভাবে লক্ষণীয় যে, প্রিয় নবী নবুওয়াতের মহান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হওয়া এবং বিশ্ব নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পদে সমাসীন হওয়া সত্ত্বেও তিনি ঘরে প্রবেশ করে নিজের কাজ নিজ হাতেই সম্পাদন করতেন। পারিবারিক ছোট ছোট কাজগুলি সম্পাদন করতে বিন্দুমাত্র সংকোচ বোধ করতেন না। অনুরূপভাবে তাঁর গৃহে কাজ করার মত লোকের অভাব ছিল এমনও নয়। হযরত আনাস ইবন মালিক ও হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রা) উভয়ে প্রিয় নবী -এর একান্ত খাদেম ছিলেন। প্রিয় নবী-এর কাজকর্ম আঞ্জাম দেওয়ার কাজে তাঁরা এতটুকু ঘনিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলেন যে, লোকেরা তাঁদেরকে প্রিয় নবী-এর পরিবারের সদস্য বলে মনে করতো। অনুরূপ উম্মুল মু'মিনীনদের জন্যও সেবিকা ছিল। এতদসত্ত্বেও প্রিয় নবী নিজ ঘরে প্রবেশের পর নিজের কাজকর্ম নিজেই সম্পাদন করতেন।
নম্রতা ও বিনয় আল্লাহ্ পাকের কাছেও প্রিয় এবং রাসূলুল্লাহ্-এর কাছেও ছিল প্রিয়। একখানা হাদীসে হযরত আবূ সাঈদ খুদ্রী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাকের সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে এক ধাপ বিনয় অবলম্বন করবে আল্লাহ্ পাক বেহেস্তে তার জন্য এক ধাপ মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। আর যে ব্যক্তি এক ধাপ অহংকার অবলম্বন করবে আল্লাহ্ পাক তার জন্য এক ধাপ মর্যাদা অবনতি করে দিবেন। এভাবে অহংকার অবলম্বনের কারণে আল্লাহ্ পাক ব্যক্তির মর্যাদা ক্রমে ক্রমে অবনতি করে অবশেষে দোযখের সর্বনিম্নে নিক্ষেপ করবেন। (ইবন মাজা, পৃষ্ঠা ৫৪৪, মিসর)।
۱۲۰ عَنْ عُرْوَةَ عَنْ أَسَامَةَ بْنِ زَيْدِ أَخْبَرَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ رَكِبَ يَوْمًا حِماراً بِإِكَافَ عَلَيْهِ قَطِيفَةٌ فَرَدِفَهُ أَسَامَةَ ابْنَ زَيْدٍ يَعُودُ سَعْدَ بْنَ عُبَادَةٌ فِي بَنِي الْحَارِثِ ابْنِ خَزْرَجٍ وَذَلِكَ قَبْلَ وَقْعَةِ بَدْرٍ -
১২০. হযরত উরওয়া ইব্ন যুবায়র (রা) হযরত উসামা ইবন যায়িদ (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ একটি গাধার উপর আরোহণ করেন। গাধাটির পিঠে গদি হিসেবে একটি চাদর ছিল। তারপর তিনি নিজের পেছনে হযরত উসামা ইবন যায়িদ (রা)-কে বসালেন এবং হযরত সাদ ইবন উবাদা (রা)-এর শুশ্রূষার জন্য বনু হারিস ইব্ন খাযরাজ গোত্রের আবাসস্থলে গমন করেন। এ ঘটনাটি ছিল বদর যুদ্ধের পূর্বেকার।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস উল্লেখ করার পেছনে গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হলো প্রিয় নবী -এর নম্রতা ও বিনয় চরিত্রের বর্ণনা করা। অবশ্য এতদসংক্রান্ত একখানা হাদীস ইতিপূর্বে ১১৫ নং-এ আলোচিত হয়েছে। এ হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, প্রিয় নবী নিরহংকার চরিত্রের কারণে বাহন হিসেবে সামান্য গাধাকেও ব্যবহার করেছেন। অহংকারী ও দাম্ভিক লোকদের ন্যায় বাহন হিসাবে তুচ্ছ গাধার ব্যবহারকে তিনি নিজের মর্যাদা হানিকর বলে মনে করেননি। এভাবে নিজের সঙ্গে অন্য একজনকেও বসিয়ে নিতে তাঁর কোনই সংকোচবোধ হয়নি। অথচ সাধারণভাবে কোন রাষ্ট্রপতি কিংবা কোন সম্রাট এহেন আচরণ করতে লজ্জাবোধ করবেন। ইতিহাস গ্রন্থে পাওয়া যায় যে, সফরে ও মদীনা শরীফে অবস্থান কালে বিভিন্ন স্থানে প্রিয় নবী চল্লিশ জনেরও অধিক সাহাবীকে নিজের সঙ্গে সাওয়ারীতে আরোহণের মর্যাদা দান করেন। কখনো কখনো তিনি নিজে পেছনে বসে সঙ্গীকে আগে বসতেও দিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ! এটি ছিল মহানবী-এর চরিত্র মাধুরীর নমুনা। প্রিয় নবী-এর আখলাক ও শামাইল সম্পর্কে যাঁরা অধ্যয়ন করেন তাঁদের কাছে তাঁর বিনয় ও নম্রতার বহু ঘটনা সুস্পষ্ট। তিনি সর্বদা মোটা ও স্থূল পোশাক পরিধান করতেন। সাধারণ মানের আহার গ্রহণ করতেন। তালি লাগানো জুতা ব্যবহার করতেন, নিজেই ঘরের বকরীর দুধ দোহন করতেন, নিজের জুতা নিজেই সেলাই করতেন, নিজের কাপড়-চোপড় নিজেই ধুয়ে নিতেন, গাধার পিঠে আরোহণ করে চলতে এবং নিজের সঙ্গে অন্যকে বসিয়ে নিতে কখনো লজ্জাবোধ করতেন না।
١٦١. عَنْ أَنَسٍ قَالَ لَمْ يَكُنْ شَخْصُ أَحَبُّ إِلَيْهِمْ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَكَانُوا إِذَا رَأَوْهُ لَمْ يَقُومُوا إِلَيْهِ لِمَا يَعْرِفُونَ مِنْ كَرَاعِيَّتِهِ لَهُ -
১২১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাহাবীদের মনে রাসূলুল্লাহ্ -এর চেয়ে অধিক ভালবাসা অন্য কারোর জন্য ছিল না। এতসত্ত্বেও তাঁরা রাসূলুল্লাহ্ -কে কখনো আসতে দেখে তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়াতেন না। কারণ তারা জানতেন যে, তিনি এভাবে দাঁড়ানোকে মোটেও পছন্দ করেন না।
ফায়দা : এ হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, প্রিয় নবী তাঁর সাহাবীদেরকে তাঁর প্রতি দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করতে নিষেধ করতেন। কেননা এটি অহংকারী লোকদের রীতি। অহংকারী কর্তা ব্যক্তিরা মানুষের কাছ থেকে এ ধরনের লৌকিক সম্মান পেতে চায়। আর তাদের প্রজা ও দরবারের সদস্যরাও এ পদ্ধতিতে সম্মান জানায়। কর্তা ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য হলো নিজেদের বড়ত্ব ও আধিপত্যের প্রকাশ ঘটানো এবং মানুষের কাছ থেকে জবরদস্তিমূলক সম্মান আদায় করা। আর এ কারণেই তাদের সম্মানার্থে যারা দাঁড়াবে না, তাদেরকে অপরাধী বলে গণ্য করে। অথচ কোন সন্দেহ নেই এটি নিজের অহংকার প্রকাশেরই একটি বিকল্প মাত্র, যা মিছামিছি প্রদর্শনীর অবতারণা বৈ কিছুই নয়। এ অভ্যাস খুবই মন্দ একটি অভ্যাস। এটি ব্যক্তিকে আল্লাহ্ পাকের কঠিন ক্রোধ ও গযবের মধ্যে নিপতিত করে। এ কারণেই প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা এ ধরনের প্রদর্শনী করা থেকে সাহাবীদেরকে নিষেধ করতেন।
একখানা হাদীসে হযরত আবূ উমামা (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ একটি লাঠির উপর ভর করে আমাদের দিকে আসছিলেন। আমরা তাঁর আগমন উপলক্ষে সবাই দাঁড়িয়ে গেলাম। তখন প্রিয় নবী ইরশাদ করেন : তোমরা অনারবদের ন্যায় আমার সম্মান প্রদর্শনের জন্য কখনো দাঁড়াবে না। অনারব লোকেরা একজন অন্যজনের সম্মানে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। (আবু দাউদ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা-১২৯)
প্রিয় নবী এ নির্দেশটি দিয়েছিলেন তাঁর একান্ত বিনয়ী মনোভাবের কারণে। যেন হঠাৎ কেউ দেখলে তাঁর প্রতি অহংকার বা দাম্ভিকতার সন্দেহটুকুও করতে না পারে। নতুবা তিনি খুব ভালভাবেই জানতেন যে, সাহাবীগণ তাঁকে যে সম্মান প্রদর্শন করেন তাতে বিন্দু পরিমাণ খাদ নেই, সম্পূর্ণ অকৃত্রিম। মনের গভীর থেকেই তাঁরা তাঁকে সম্মান করে থাকেন এবং অকৃত্রিমভাবে তাঁকে ভালবাসেন। এ কারণে আলিমগণ লিখেছেন, কোন বিজ্ঞ আলিম কিংবা বুযুর্গ কিংবা ন্যায়পরায়ণ কোন শাসকের সম্মান প্রদর্শনার্থে এভাবে দাঁড়ানোর মধ্যে কোন আপত্তি নেই। তবে কেউ যদি নিজের প্রভুত্ব, আধিপত্য ও অহংকার দেখানোর জন্য এভাবে সম্মানার্থে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেয় তাহলে দাঁড়ানো মাকরূহ।
হযরত আবূ মিজলায (রা) থেকে বর্ণিত যে, হযরত মুআবিয়া (রা) একবার হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র ও ইবন আমির (রা)-এর কাছে গেলেন। হযরত মুআবিয়া (রা)-কে দেখে হযরত ইব্ন আমির (রা) তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে গেলেন। এদিকে হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র (রা) স্বস্থানে উপবিষ্ট থাকেন। তখন হযরত মুআবিয়া (রা) হযরত ইব্ন আমির (রা)-কে বললেন, স্বস্থানে বসে থাকুন। কেননা আমি প্রিয় নবী -কে বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তি অন্যরা তার সম্মানার্থে দাঁড়ানোকে পছন্দ করে সে ব্যক্তির ঠিকানা হবে জাহান্নাম। (আবু দাউদ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২১৯)
উপরোক্ত হাদীস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বর্ণিত নিষেধাজ্ঞা সে সময়ের জন্য, যখন আগমনকারীর দাম্ভিকতা ও অহংকার এ কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করে। তাই দেখা যায় একটি হাদীসে এসেছে যে, আনসারদের অন্যতম বড় আলিম ও সরদার হযরত সাদ ইবন উবাদা (রা) যখন আগমন করছিলেন তখন প্রিয় নবী আনসারদের আদেশ দিয়ে বলেন, তোমাদের সর্দার আগমন করছেন। তোমরা দাঁড়িয়ে যাও। অবশ্য এখানে নবী-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল হযরত সাদ ইবন উবাদা (রা)-এর সম্মানকে বড় করে দেখানো। কেননা তাকে তখন বনু কুরায়যার বন্দীদের ব্যাপারে সালিস নিযুক্ত করা হয়েছিল।
অনুরূপভাবে দূরদেশ থেকে আগত মুসাফিরের অভ্যর্থনা কিংবা অন্তরঙ্গ কোন বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় দাঁড়ানোর মধ্যে কোন আপত্তি নেই। শর্ত হলো উভয় পক্ষের কোন দিকে প্রাণহীন প্রদর্শনী কিংবা অহংকার থাকবে না। যেন আগমনকারী মনে মনে এই সম্মান কামনা না করেন আর অভ্যর্থনাকারী কেবল লৌকিকতার জন্যই না দাঁড়ান।
١٢٢. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يُجِيبُ الْعَبْدَ وَيَعُودُ الْمَرِيضَ وَيَرْكَبُ الْحِمَارَ
১২২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাধারণ একজন গোলামের দাওয়াত কবুল করতেন, অসুস্থদের শুশ্রূষা করতেন এবং গাধার পিঠেও আরোহণ করতেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস থেকেও প্রিয় নবী -এর পরম বিনয় ও নম্রতার পরিচয় ফুটে উঠে। এভাবে আরো অন্যান্য হাদীস থেকে জানা যায় যে, প্রিয়নবী তাঁর সাহাবীদের মজলিসে নিজের জন্য কোন পার্থক্য বজায় না রেখেই বসতেন। তাঁর বসার জন্য পৃথক কোন আসন থাকত না। আর তিনি বসার মধ্যেও নিজেকে ব্যতিক্রম বানিয়ে বসতেন না। তিনি সীমাহীন সরলতা ও অনাড়म्बरতাসহ মজলিসের যেখানেই সুযোগ পেতেন সেখানেই বসতেন। বসে যেতেন। এ কারণে নতুন আগন্তুক লোকদের জন্য জিজ্ঞেস করে নিতে হতো যে, আপনাদের মধ্যে নবী কোন্ জন? কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখন নবী -এর দরবারে দূর দেশের বিভিন্ন প্রতিনিধি দলের আগমন শুরু হলো এবং নবাগতদের নানা প্রশ্নোত্তরের কারণে মজলিসের কাজকর্ম ও আলোচনায় বিঘ্ন ঘটতে লাগল, তখন সাহাবীদের বহু পীড়াপীড়ির দরুন প্রিয় নবী -এর জন্য একটি পৃথক জায়গা বানানোর আবেদন তিনি মঞ্জুর করেন। ফলে মজলিসের মধ্যে নবী কোন্ জন তা নির্ণয় করতে নবাগতদের জন্য সহজ হয়। সাহাবীগণ প্রিয় নবী -এর বসার জায়গাটির মধ্যে মাটি ফেলে সামান্য উঁচু করে খাটের মত বানিয়ে দেন। তারপরেও প্রিয় নবী কখনো সেই উঁচু জায়গায় বসতেন আবার কখনো নিচে বসে উঁচু জায়গাটির উপর হেলান দিয়ে থাকতেন। এতখানি ছিল নবীদের সর্দার শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা -এর নম্রতা ও বিনয়।
একটি হাদীসে পাওয়া যায় যে, প্রিয় নবী -কে কখনো কখনো যবের রুটি কিংবা গন্ধ হয়ে গেছে এমন চর্বি আহারের জন্যও যদি দাওয়াত দেয়া হতো তখনও তিনি কোনরূপ অসন্তুষ্টি প্রকাশ না করে সে দাওয়াত কবুল করতেন। তিনি এমনটা চিন্তা করতেন না যে, এত নিম্নমানের আহারের আমন্ত্রণে আমি কেন যাব?
অনুরূপভাবে তিনি নিজের সাথী-সঙ্গীদের শুশ্রূষার জন্যও যেতেন। অসুস্থ লোকটি আমীর কিংবা গরীব, আযাদ কিংবা গোলাম, 'ছোট কিংবা বড় – সেই বিবেচনা তাঁর কাছে ছিল না। তিনি অসুস্থের খুব কাছে গিয়ে বসতেন এবং তাকে সান্ত্বনা দিতেন। তার সুস্থতার জন্য দু'আ করতেন। হাদীসগ্রন্থে এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা পাওয়া যায়। ইতিপূর্বেও আলোচিত হয়েছে যে, তিনি সামান্য মানের বাহন গাধার পিঠে আরোহণ করতেও সংকোচ বোধ করতেন না। বলা বাহুল্য, প্রিয় নবী সমকালের সম্রাট ও দু'জাহানের রাসূল ছিলেন। তাঁর নগণ্য একজন গোলাম ব্যক্তিও উচ্চমানের বাহনে আরোহণ করে থাকে। অথচ তিনি নিজে গাধার পিঠে নির্দ্বিধায় আরোহণ করেছেন। এ সব কিছু মূলত তিনি বিনয় ও নম্রতা প্রকাশের জন্যই করেছিলেন। যেন উম্মতের লোকেরা তাঁর এ আদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।
۱۲۳. عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَجْلِسُ عَلَى الأَرْضِ وَيَأْكُلُ عَلَى الأَرْضِ وَيَعْتَقِلُ الشَّاةَ، وَيُجِيبُ دَعْوَةَ الْمَمْلُوكِ، قَالَ أَبُو إِسْمَاعِيلَ فَحَدَّثْتُ بِهِ الْأَعْمَشِ عَنْ مُسْلِمٍ فَقَالَ أَمَا إِنَّهُ كَانَ يَطْلُبَ الْعِلْمَ -
১২৩. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ নিঃসংকোচে মাটির উপর বসতেন, মাটিতে বসে আহার করতেন, নিজ হাতে খুঁটির সাথে বক্রী বাঁধতেন ও গোলামের দাওয়াত কবুল করতেন। বর্ণনাকারী আবু ইসমাঈল (র) বলেন, আমি এ হাদীসখানা মুসলিম (র)-এর বরাত দিয়ে হযরত আমাশ (র)-কে শোনালাম। তখন আমাশ (র) বললেন, তবে মনে রেখ, প্রিয় নবী -এর উদ্দেশ্য ছিল নিজ সাহাবীদের অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়া।
ফায়দা : আলোচ্য হাদীসের মধ্যে প্রিয় নবী -এর যে সব সুন্দর নীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে এগুলি তাঁর একান্ত বিনয় ও নম্রতার প্রমাণ বহন করে। কেননা এসব কাজ তিনি প্রয়োজনীয় উপকরণ কিংবা কাজের লোকজনের অভাবজনিত কারণে করেননি। তাঁর কাছে উপকরণ বা লোকজনের অভাব ছিল না। তবে তিনি নিজের নম্রতা ও বিনয় নীতি প্রকাশার্থে এসব কাজ নিজ হাতে ও নিঃসংকোচে করতেন।
বুখারী শরীফে হযরত আসওয়াদ ইব্ন ইয়াযীদ (র) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ নিজ গৃহে কি কি কাজ করে থাকতেন? তখন হযরত আয়েশা (রা) বলেন, তিনি ঘরের অন্যদের কাজকর্ম্মে স্বহস্তে সহযোগিতা করতেন। কিন্তু যখন নামাযের সময় হতো তখন কোন প্রকার বিলম্ব না করে মসজিদে চলে যেতেন। (বুখারী শরীফ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা : ৮৯২)
আলোচ্য হাদীস থেকে এ কথা সুস্পষ্ট যে, প্রিয় নবী অন্যান্য সাধারণ মানুষের ন্যায় পারিবারিক বিভিন্ন কাজে শরীক থাকতেন। উদাহরণস্বরূপ যেমন নিজে বকরীর দুধ দোহন করতেন, নিজের জুতা নিজেই সেলাই করতেন ইত্যাদি। এ বিষয়ে ইতিপূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
١٢٤ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكِ أَنَّهُ مَرَّ بِصِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ ثُمَّ حَدَّثَنَا أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ مَرَّ عَلَى صِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ وَهُوَ مُغِدٍ-
১২৪. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, একদা তিনি বালকদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি তাদেরকে সালাম দেন। তারপর আমাদেরকে হাদীস শুনিয়ে বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ বালকদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি দ্রুত পথচলা অবস্থায় তাদেরকে সালাম দেন।
١٢٥ عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ مَرَّ بِصِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ -
১২৫. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, একদা রাসূলুল্লাহ বাচ্চাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন সে মুহূর্তে তিনি তাদেরকে সালাম দেন।
١٢٦. عَنْ أَنَسٍ قَالَ بَعَثَنِي رَسُولُ اللهِ ﷺ فِي حَاجَةٍ فَمَرَرْتُ بِصِبْيَانِ فَقُمْتُ مَعَهُمْ فَأَبْطَاتُ عَلَيْهِ فَخَرَجَ وَرَانِي مَعَ الصِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ -
১২৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাকে একটি কাজের জন্য পাঠিয়েছিলেন। পথিমধ্যে বাচ্চাদের সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। আমি তাদের সেখানে দাঁড়ালাম। তাতে অনেক দেরি হয়ে গেল। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ্ আমার তালাশে বের হয়ে আমাকে বাচ্চাদের সঙ্গে দেখলেন। তখন তিনি তাদেরকে সালাম দিয়েছিলেন।
۱۲۷. عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ مَرَّ عَلَى صِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِم -
১২৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী বাচ্চাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় তিনি তাদেরকে সালাম দেন।
۱۲۸ عَنْ أَنَسٍ قَالَ أَتَى عَلَيْنَا رَسُولُ اللهِ ﷺ وَأَنَا فِي غِلْمَةٍ نَلْعَبُ فَسَلَّمَ عَلَيْنَا ثُمَّ أَرْسَلَنِي فِي حَاجَةٍ -
১২৮. আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি তখন বাচ্চাদের সঙ্গে মিলে খেলাধুলা করছিলাম। তিনি আমাদেরকে সালাম দেন। তারপর আমাকে একটি কাজের জন্য পাঠিয়ে দেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসগুলোর বক্তব্য অভিন্ন। এখানে প্রিয় নবী-এর পরম বিনয় ও নম্র আচরণের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এ সব হাদীস থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, প্রিয় নবী বাচ্চাদের শিক্ষা দানের জন্য নিজেই সালাম দিতেন। আর এভাবে তাদেরকে সালাম দেওয়া তাঁর দৃষ্টিতে কোন লজ্জা বা সম্মানহানিকর বলে মনে হতো না। বলা বাহুল্য, বাচ্চাদেরকে সালাম দেওয়ার মধ্যে বহু উপকারিতা বিদ্যমান। ১. বাচ্চাদেরকে সালাম দেওয়ার দ্বারা তাদের মধ্যে একজন অন্যজনকে সালাম দানের অভ্যাস গড়ে ওঠে। ২. তাতে সমাজে ইসলামী তাহযীব ও তামাদ্দুনের ভিত কায়েম হয়, ৩. নিজে বাচ্চাদেরকে সালাম করার দ্বারা মন থেকে গর্ব ও অহংকার ইত্যাদি দূরীভূত হয়, ৪. 'আস্সালামু আলাইকুম' বাক্যটি একটি দু'আ বিশেষ। এ দু'আটির ব্যাপক প্রচলনের কারণে শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ গড়ে ওঠে, ৫. এই সালাম ইসলামের বিশেষ একটি প্রতীক। কাজেই সর্বশ্রেণীর মাঝে সালামের ব্যাপক প্রচলন থাকলে সেটি একটি মুসলিম সমাজ বলে বোঝা যায়।
একখানা হাদীসে হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আম্র ইব্ন আস (রা) বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি প্রিয় নবীকে জিজ্ঞেস করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! ইসলামী আমলগুলোর মধ্যে কোন্ আমলটি সর্বাপেক্ষা উত্তম? প্রিয় নবী উত্তর দিলেন যে, লোকজনকে আহার করানো এবং পরিচিত ও অপরিচিত সকলকে সালাম প্রদান করা। (তারগীব ওয়া তারহীব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৩)
অপর একখানা হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন: (হে মানুষ সকল!) তোমরা যতক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণভাবে ঈমান আনয়ন করবে না ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে না। আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানদার হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি গড়ে না নিবে। আচ্ছা! আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি কাজের পরামর্শ দিব যে কাজটি করার কারণে তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও ভালবাসা গড়ে উঠবে? মনে রেখ! সে কাজটি হলো সালামের বহুল প্রচলন। তোমরা যখনই একজন অন্যজনের সাথে সাক্ষাৎ করবে তখনই তাকে সালাম করবে। আর সালাম দেওয়াকে নিজেদের বৈশিষ্ট্য বানিয়ে নাও। (তারগীব ওয়া তারহীব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৩)
একটি হাদীসে হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) রাসূলুল্লাহ্ থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি ইরশাদ করেছেন: তোমরা সালামের ব্যাপক প্রচলন করে নাও। তা হলে নিজেরা শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে থাকতে পারবে। (ঐ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৪)
হযরত সাহল ইবন হুনাইফ (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি শুধু “اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ" বলে তার আমলনামায় দশটি নেকী লেখা হয়। আর যে ব্যক্তি "اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ" বলে তার আমল নামায় বিশটি নেকী লেখা হয়। আর যে ব্যক্তি السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ বলে তার আমলনামায় ত্রিশটি নেকী লেখা হয়। (তারগীব ওয়া তারহীব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৮)
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন যে, সবচেয়ে অথর্ব হলো সে ব্যক্তি যে দু'আ করতেও অক্ষম (অর্থাৎ আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করতেও জানে না।) আর সবচেয়ে বড় কৃপণ সে ব্যক্তি যে সালাম করার ব্যাপারে কার্পণ্য করে। (তারগীব ওয়া তারহীব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৯)
হযরত আবু উমামা (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি আগে সালাম দেয় সে মহান আল্লাহর অধিক ঘনিষ্ঠ। অর্থাৎ সাক্ষাতের সময় আগে সালাম দেয়ার কারণে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাকের সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করে। (মিল্কাত শরীফ, পৃষ্ঠা ৩৯৮)
এভাবে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন যে, অগ্রে সালাম দানকারী ব্যক্তি গর্ব ও অহংকার থেকে মুক্ত থাকে। (মিল্কাত, পৃষ্ঠা ৪০০)
একখানা হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন যে, প্রিয় নবী ইরশাদ করেছেনঃ এক মুসলমানের উপর অন্য মুসলমানের ছয়টি হক (অধিকার) রয়েছে:
এক. সে অসুস্থ হলে তার সেবা-শুশ্রূষা করা, দুই. সে মারা গেলে তার কাফন ও জানাযায় শরীক হওয়া, তিন. একজন অন্যজনকে দাওয়াত করলে তা কবুল করা, চার. একজন অন্যজনের সহিত সাক্ষাতের সময় সালাম করা, পাঁচ. একজন হাঁচি দিয়ে "আলহামদু লিল্লাহ্' বলার পর অন্যজন তার জবাব দেওয়া। অর্থাৎ 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বলা।
ছয়. একজন অন্যজনের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি সর্বাবস্থায় কল্যাণ কামনা করা। (মিশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা ২৬৭)
অপর একখানা হাদীসে হযরত কাতাদা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন : তোমরা নিজ গৃহে প্রবেশের সময় ঘরের লোকজনকে সালাম দিয়ে প্রবেশ কর। আবার ঘর থেকে বের হওয়ার সময় তাদেরকে সালাম দিয়ে বের হও। (যুজাজাতুল মাসাবীহ্, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৮)
ফাতওয়ায়ে আলমগীরী গ্রন্থে আছে, “প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নিজ গৃহে প্রবেশের সময় 'আস্সালামু আলাইকুম' বলে প্রবেশ করা চাই। আর যদি কোন জনশূন্য ঘরে প্রবেশ করে তখন নিম্নোক্ত বাক্যের দ্বারা সালাম করবে। বাক্যটি হলো- السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللهِ الصالحين
۱۲۹. عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ يَزِيدَ أَنَّ النَّبِيُّ ﷺ مَرَّ بِنِسْوَةٍ فَسَلَّمَ عَلَيْهِنَّ -
১২৯. হযরত আসমা বিন্ত ইয়াযীদ (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী মহিলাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি তাদেরকে সালাম দেন।
ফায়দা : আলিমগণ লিখেছেন যে, মহিলাদেরকে সালাম দেওয়ার বিষয়টি প্রিয় নবী -এর ব্যক্তিগত আমল ছিল। কারণ তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিষ্পাপ ও আল্লাহ্ কর্তৃক সংরক্ষিত। তিনি ফিত্নায় পতিত হওয়া থেকে ছিলেন সম্পূর্ণ নিরাপদ। কাজেই প্রিয় নবী ব্যতীত অন্য লোকদের জন্য বিধান হলো গায়রে মুহাররাম মহিলাকে সালাম না দেওয়া উত্তম। অবশ্য কোন মহিলা যদি এমন হয় যে, বয়স বার্ধক্যের সীমানায় পৌঁছে গেছে তাকে সালাম দিতে কোন আপত্তি নেই। আল্লামা ইব্ন আবেদীন (র) শামী গ্রন্থে লিখেছেন যে, "গায়রে মুহাররাম ব্যক্তির জন্য কোন বেগানা মহিলাকে সালাম দেওয়া অনুচিত। তবে ঐ বেগানা মহিলা যদি বৃদ্ধা হন তাহলে তাকে সালাম দেয়া যায়। অনুরূপ যদি কোন বৃদ্ধা হাঁচি দিয়ে 'আল হামদুলিল্লাহ্' বলে তাহলে বৃদ্ধা হওয়ার কারণে তার হাঁচির জবাব দেয়া যায়। পক্ষান্তরে কোন মহিলা যদি বৃদ্ধা না হয় তা হলে তাকে সালাম কিংবা তার হাঁচির জবাব দেয়া যাবে না। (কেননা এখানে ফিত্নায় পতিত হওয়ার আশংকা আছে) তবে মনে মনে হাঁচির জবাব দিতে হবে।"
একখানা হাদীসে হযরত জারীর ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ একদল মহিলার পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় তিনি তাদেরকে সালাম দেন। (মিশকাত, পৃষ্ঠা ৩৯৯)
আল্লামা হালীমী (র) বলেন যে, যেহেতু প্রিয় নবী কোন প্রকার ফিত্নায় পতিত হওয়া থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিলেন, এ কারণে তাঁর জন্য বেগানা মহিলাকে সালাম দেওয়া জায়িয ছিল। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে নিরাপদ থাকার উপর সম্পূর্ণ নিশ্চিত থাকবেন তার জন্যও বেগানা মহিলাকে সালাম দেওয়ার অনুমতি দেওয়া যায়, অন্যথায় তার নীরব থাকাই শ্রেয়। (আউনুল মা'বুদ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫१९)
গ্রন্থকারের এখানে উপরোক্ত হাদীসগুলো উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো সালামের ব্যাপারে প্রিয় নবী -এর আমলী-নীতি তুলে ধরা। অর্থাৎ প্রিয় নবী শিশু কিংবা বৃদ্ধা, পুরুষ কিংবা মহিলা নির্বিশেষে সকলকেই সর্বাগ্রে সালাম দিতেন।
۱۳۰. عَنْ أَنَسٍ قَالَ مَا رَأَيْتُ أَحَدًا كَانَ أَرْحَمَ بِالْعِيَالِ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ وَكَانَ اسْتَرْضَعَ لِابْنِهِ إِبْرَاهِيمَ فِي أَقْصَى الْمَدِينَةِ وَكَانَ زَوْجَهَا قَيْنًا فَيَأْتَيْهِ وَعَلَيْهِ أَثْرُ الْغُبَارِ فَيَلْتَذِمُهُ وَيُقَبِّلُهُ وَيَشُمُّهُ .
১৩০. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ -এর চাইতে সন্তানদের প্রতি অধিক স্নেহপ্রবণ আর কাউকে দেখিনি। তিনি তাঁর দুগ্ধপোষ্য শিশু হযরত ইব্রাহীম (রা)-কে দুধপান করানোর জন্য মদীনার উপকণ্ঠে বসবাসকারিণী জনৈকা ধাত্রীর কাছে দিয়েছিলেন। ধাত্রীর স্বামী ছিলেন একজন কর্মকার। যখন প্রিয় নবী নিজ সন্তানকে দেখার জন্য সেখানে যেতেন তাঁর শরীর ধুলায়িত হয়ে যেত। এ সত্ত্বেও তিনি তাঁকে বুকে জড়িয়ে নিতেন। তাঁকে চুম্বন করতেন এবং নাকের কাছে তুলে সোহাগ করতেন।
۱۳۱. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ أَرْحَمَ النَّاسِ بِالصِبْيَانِ وَكَانَ لَهُ ابْنُ مُسْتَرْضَعُ فِي نَاحِيَةِ الْمَدْنَةِ وَكَانَ ظَبْرهُ قَيْنًا ، وَكَانَ يَأْتِيهِ وَنَحْنُ مَعَهُ وَقَدْ دُحِنَ الْبَيْتُ بِالإِذْخِرِ فَيَشُمُّهُ وَيُقَبِّلُهُ -
১৩১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ শিশুদের প্রতি সর্বাধিক স্নেহপ্রবণ ছিলেন। তাঁর এক দুগ্ধপোষ্য শিশুর জন্য তিনি মদীনার উপকণ্ঠের জনৈকা ধাত্রী ঠিক করেছিলেন। ধাত্রীর স্বামী ছিলেন একজন কর্মকার। প্রিয় নবী নিজ পুত্রকে দেখার জন্য সেখানে যেতেন। তাঁর সঙ্গে আমরাও থাকতাম। ধাত্রীর ঘর ইস্থির ঘাস জ্বালানো ধোঁয়ায় ভরে থাকত। এ সত্ত্বেও তিনি নিজ সন্তানকে কোলে তুলে নিতেন। তাঁকে নাকের কাছে তুলে সোহাগ করতেন এবং চুম্বন করতেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস দুটির বক্তব্য অভিন্ন। গ্রন্থকার আলোচ্য হাদীসদ্বয়কে প্রিয় নবী -এর বিনয় ও নম্রতা অনুচ্ছেদে পেশ করার কারণ হলো, এ দু'টি হাদীসে তাঁর পবিত্র জীবন যাত্রার সরলতা ও অকৃত্রিমতা সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। পাশাপাশি এ কথাও প্রমাণিত হচ্ছে যে, তিনি পরিবারের লোকজন ও সন্তান-সন্ততি বিশেষত শিশুদেরকে গভীরভাবে স্নেহ করতেন। তাঁর পরম নিরহংকারের প্রমাণ এই যে, তিনি নিজের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে দুধ পান করানোর জন্য একজন কর্মকারের মত সাধারণ ব্যক্তির ঘরে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন নি। তাছাড়া সেই কর্মকারের গৃহে বারবার যাতায়াত করা এবং পথিমধ্যে ধুলার কারণে আপাদমস্তক ভরে যাওয়াকে নিজের আত্মমর্যাদা হানিকর বলে মনে করেননি। কর্মকারদের গৃহে স্বাভাবিকভাবেই ধোঁয়া থাকে। প্রিয় নবী এ সত্ত্বেও নিঃসংকোচে তাদের গৃহে প্রবেশ করতেন। তারপর একজন সাধারণ পিতাও যখন ধুলামাখা দেহে সন্তানকে কোলে নিতে দেরি করে সেখানে তিনি এ সব উপেক্ষা করে নিজ সন্তানকে কোলে নিয়ে স্নেহ প্রবণতার পরম উদাহরণ পেশ করলেন। অথচ অহংকারী ও আত্মপূজারী লোকেরা শিশুদের সাথে এভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়া এবং তাদেরকে স্নেহ ও মমতায় জড়িয়ে নেয়াকে নিজেদের মানমর্যাদা হানিকর বলে বোধ করে থাকে।
প্রিয় নবী নিজে যেভাবে শিশুদেরকে আদর-সোহাগ করতেন সেভাবে অন্যদেরকেও তাদের আদর-সোহাগের জন্য উপদেশ দিতেন। হাদীস গ্রন্থগুলোতে এ ধরনের বহু বর্ণনা পাওয়া যায়, যেখানে শিশুদের প্রতি তাঁর সীমাহীন স্নেহ ও মমতার পরিচয় ফুটে উঠেছে। একখানা হাদীসে বলা হয়েছে যে, একদা প্রিয় নবী তাঁর দৌহিত্র হযরত হাসান (রা)-কে গভীরভাবে স্নেহ করছিলেন। এটি দেখে হযরত আকরা ইন্ন হাবিস (রা) নামক এক সাহাবী বলে উঠলেন, আমার তো দশটি সন্তান আছে। অথচ আমি তো কাউকে আদর-সোহাগ করি না। প্রিয় নবী তখন বললেন: যারা মানুষের প্রতি সোহাগ ও মায়া-মমতা করে না তাদের প্রতি আল্লাহ্ পাকও সোহাগ ও মায়া-মমতা করবেন না। (হায়াতুস্ সাহাবা, ২ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৬৯)
হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে অপর একটি সূত্রে বর্ণিত আছে যে, একবার হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-এর কাছে এক মহিলা আসল। মহিলার সঙ্গে দু'টি শিশু ছিল। হযরত আয়েশা (রা) ঐ মহিলাকে তিনটি খেজুর খেতে দিলেন। মহিলাটি তার দু'টি বাচ্চাকে দু'টি খেজুর দিয়ে একটি নিজে খেতে চাইল। এ সময় শিশুরা পুনরায় তার দিকে চোখ তুলে তাকাল। মহিলা খেজুরটিকে দু'টুক্রা করে অর্ধেক করে উভয় বাচ্চাকে দিয়ে দিল। তারপর সে চলে গেল। অতঃপর প্রিয় নবী গৃহে ফিরে আসলে হযরত আয়েশা (রা) এ ঘটনা তাঁকে শোনালেন। তখন প্রিয় নবী ইরশাদ করেন : মহিলাটি (তার সোহাগ ও মমত্ববোধের কারণে) বেহেস্তে প্রবেশ করবে। অর্থাৎ বেহেস্তের উপযুক্ত বিবেচিত হবে। (হায়াতুস্, সাহাবা, ২ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৭০)
۱۳۲. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكَ يَقُولُ مَا رُفِعَ مِنْ بَيْنَ يَدَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَضْلُ شَوَاءٍ قَطُّ وَلَا حُمِلَتْ مَعَهُ طِنْفِسَةٌ .
১৩২. হযরত আনাস ইব্ন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ থেকে কখনো উচ্ছিষ্ট ভুনা মাংস তুলে নেয়া হয়নি এবং তার জন্য কখনো কার্পেট বিছান হয়নি।
ফায়দা: রাসূলুল্লাহ্ একজন বিনয়ী সাধারণ মানুষের মতই মাটিতে বসে আহার করতেন। আহার শেষে তিনি বরতন খুব ভাল করে পরিষ্কার করতেন এবং অহংকারী লোকদের মতো খাবার বরতনে উচ্ছিষ্ট রেখে দিতেন না। খাবার বরতনে যেসব গর্বিত ও অহংকারী লোক কিছু না কিছু উচ্ছিষ্ট রেখে দেয়, তার দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য থাকে স্বীয় ধনাঢ্যতা ও প্রাচুর্য প্রকাশ করা। অর্থাৎ তারা যেনো তাদের ঐ উচ্ছিষ্ট খাবারের প্রতি তার পরিমাপ যা-ই হোক না কোন আদৌ মুখাপেক্ষী নয়। তাদের দৃষ্টিতে আহার্যের কোন কদর ও মর্যাদা নেই। (নাউযুবিল্লাহ্) নবী আকরাম হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা-এর শিক্ষা ও তাঁর জীবন পদ্ধতি এই অর্থহীন অবজ্ঞা লোক-দেখানো প্রাচুর্য থেকে (যা মূলত নিয়ামতের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন) সম্পূর্ণ ভিন্নতর ছিল। তা ছিল বিনয়, বশ্যতা ও আনুগত্যের উপর ভিত্তিশীল। তাঁর শিক্ষা ও পবিত্র জীবন চরিত্র অধ্যয়ন করলে এ সত্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাদেরকে (আহারের পর) আঙুল, বরতন (রেকাবী, প্লেট প্রভৃতি) ভালভাবে পরিষ্কার করে খেতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন, তোমরা কি জানো খাবারের কোন্ লোকমা ও কোন্ অংশের মধ্যে বরকত নিহিত রয়েছে? (মিল্কাত, পৃষ্ঠা ৩৬৩) খাবার খেয়ে রেকাবীতে উচ্ছিষ্ট রেখে দেয়া তা নষ্ট করার নামান্তর ও নিয়ামতের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন স্বরূপ। তাই বরতন ও আঙুলে লেগে থাকা খাবার উত্তমরূপে চেটে খাওয়া উচিত। অবশ্য খাবার যদি বেশি বেঁচে যায় এবং তা নষ্ট করা উদ্দেশ্য না হয়, তবে তা অবশিষ্ট রেখে দিতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু তা এইভাবে অবশিষ্ট রেখে দিবে যা নিজের কিংবা অন্য কারো খেতে ঘৃণা না হয়। এক্ষেত্রে উত্তম পন্থা হচ্ছে, প্রথমেই আহার্য প্রয়োজন মাফিক বরতনে তুলে নিতে হবে। অনুরূপভাবে চামচ বা আঙুলে যে আহার্য লেগে থাকে তাও অবশ্যই চেটে খাওয়া উচিত, যাতে আল্লাহ্ প্রদত্ত এই নিয়ামত নষ্ট না হয়।
অনুরূপ যদি আহার্যের কোনো লোকমা মাটিতে পড়ে যায়, তবে তাও তুলে নিতে হবে। অবশ্য যদি নোংরা ও নাপাক স্থানে না পড়ে। সে ক্ষেত্রে মাটি মিশ্রিত অংশ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট পরিষ্কার অংশ খেতে হবে। এটাই হচ্ছে মহান আল্লাহর দেয়া নিয়ামতের প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন, বিনয় ও আনুগত্যের নিয়ম। এক হাদীসে হযরত জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেন: শয়তান প্রতিটি কাজের সময় তোমাদের কাছে উপস্থিত থাকে এমনকি আহার করার সময়ও। তাই যখন আহার করার সময় লোকমা মাটিতে পড়ে যাবে, তখন তা তুলে নিবে এবং ধুলাবালি পরিষ্কার করে লোকমাটি খাবে। শয়তানের জন্য রেখে দিবে না। অনুরূপভাবে যখন তোমরা আহার শেষ করবে, তখন স্বীয় আঙুলসমূহ পরিষ্কার করবে এবং যে আহার্য তাতে লেগে থাকবে তা চেটে খাবে। কেননা আহার্যের কোন্ অংশে বরকত নিহিত আছে তা তোমাদের জানা নেই। (মিশকাত, পৃষ্ঠা ৩৬৩)
হযরত আনাস ইবন মালিক (রা)-এর উপরোক্ত হাদীস থেকে একথাও জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ মাটিতে বসে খেতেন এবং নিজের জন্য কোনো বিশেষ স্থান বা বিছানা পত্রের ব্যবস্থা করতেন না। যেমনিভাবে অহংকারী ও আত্মপূজারী লোকেরা স্বীয় শানশওকত প্রকাশের জন্য খাবার মজলিসে কার্পেট গালিচা কিংবা টেবিল চেয়ারের বন্দোবস্ত করে থাকে। বরং সরদারে দু'জাহান শাহানশাহে আরব ও আজম সাধারণ মানুষের মত কোনো বিছানা ছাড়াই মাটিতে বসে খানা খেতেন। এতে তার আল্লাহর বান্দাসুলভ বিনয় ও চরম গর্বহীনতাই প্রকাশ পায়। অনুরূপভাবে তিনি আসন করে বসে কিংবা ঠেস দিয়ে কখনো আহার করতেন না। এটাও আত্মগর্বীদের অভ্যাস। এ সম্পর্কে হযরত আবূ জুহায়ফা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, নবী ইরশাদ করেন: আমি আসন করে বসে (কিংবা ঠেস লাগিয়ে) কখনো আহার করি না। (মিশকাত, পৃষ্ঠা-৩৬৩)
হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন্ন আম্র (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্-কে কখনো আসন করে আহার করতে দেখা যায়নি। আর তিনি কখনো তাঁর সঙ্গীদের আগে আগে চলতেন না। (বরং বিনয়বশত তাদের মাঝখানে চলতেন) (মিশকাত, পৃষ্ঠা ২৬৬)
এক হাদীসে নবী বলেন, তোমরা আহার করার সময় জুতা খুলে নাও। কেননা এটা (জুতা খুলে নেয়া) একটি ভাল অভ্যাস। (জামি সগীর, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৮)
যেসব মুসলমান আজকাল ইউরোপের অন্ধ অনুসরণে জুতা পরিধান করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আহার করাকেই ভদ্রতা মনে করে, তাদের চিন্তা করা উচিত যে, হাশরের দিন তারা আল্লাহ্ হাবীব ও উম্মতের সুপারিশকারী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা-এর সামনে কিভাবে উপস্থিত হবে।
এই সব হাদীস থেকে নবী আহার করার সময় কি পরিমাণ বিনয় নম্রতা অবলম্বন করতেন, তা সহজেই অনুমান করা যায়। আল্লাহ্ তা'আলা সকল মুসলমানকে তাঁর সুন্দরতম চরিত্র ও অনুপম আদর্শ অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন!
۱۳۳. عَنْ أَبِي مَسْعُودٍ قَالَ أَتَى النَّبِيَّ رَجُلٌ يُكَلِّمُهُ فَأُرْعِدَ فَقَالَ عَلَيْكَ فَلَسْتُ بِمَلِكَ، إِنَّمَا أَنَا ابْنُ امْرَأَةٍ مِنْ قُرَيْشٍ كَانَتْ تَأْكُلُ الْقَدِيدَ
১৩৩. হযরত আবূ মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি নবী-এর নিকট কিছু কথা বলার জন্য এলো। কিন্তু সে তাঁর ভয়ে কাঁপতে লাগল। তিনি বললেন : ভয় করো না। আমি তো তোমার বাদশাহ নই (যে, আমাকে দেখে তুমি ভয় করবে)। বরং আমি হচ্ছি কুরায়শ বংশের এমন এক মহিলার সন্তান যিনি (সাধারণ মেয়েদের মত) শুকানো গোশত ভক্ষণ করতেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকেও নবী-এর বিনয়, নম্রতা ও আত্মগর্বহীনতা প্রকাশ পায়। এটা স্পষ্ট যে, তিনি একদিকে ছিলেন সমস্ত নবী ও রাসূলদের সরদার এবং অপরদিকে ছিলেন সমগ্র আরব-আজমের নেতা ও দু'জাহানের পথপ্রদর্শক। প্রতিটি ব্যক্তিকেই তাঁর মাহাত্ম্য, মহিমা ও প্রভাবে প্রভাবান্বিত হওয়া ছিল অবশ্যম্ভাবী। যখনই কোনো আগন্তুক তাঁর সামনে আসতো, তার ভয় ও প্রভাবের দরুন তার মধ্যে কম্পন শুরু হয়ে যেত। কিন্তু তাঁর স্বভাবগত বিনয় ও সরলতার অবস্থা ছিল এরূপ যে, তিনি তার সাথে অত্যন্ত নম্রতা ও বিনয় অবলম্বন করতেন। কেউ যদি ভয় পেতো, তবে তিনি তাকে সান্ত্বনা দিতেন এবং কথায় ও কাজে প্রকাশ করতেন। তার প্রতি দয়া ও সহানুভূতি প্রদর্শন করতেন।
134 عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ وَأَبِي ذَرٍ قَالَا كَانَ النَّبِيُّ يَجْلِسُ بَيْنَ ظَهَرَانِي أَصْحَابِهِ، فَيَجِيْبُ الْغَرِيبُ وَلَايَدْرِي أَيُّهُمْ هُوَ حَتَّى يَسْأَلَ، فَطَلَبْنَا إِلَى النَّبِيِّ الاَنْ نَجْعَلَ لَهُ مَجْلِسًا يَعْرِفُهُ الْغَرِيبُ إِذَا أَتَاهُ، فَبَنَيْنَا لَهُ دَكَأَنَا مِنْ طِينٍ فَكَانَ يَجْلِسُ عَلَيْهِ وَتَجْلِسُ بِجَانِبَيْهِ -
১৩৪. হযরত আবূ হুরায়রা ও হযরত আবূ যার (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী তাঁর সাহাবীদের মাঝখানে সাধারণ মানুষের মতো উপবেশন করতেন। কোনো আগন্তুক আগমন করলে বুঝতে পারতো না যে, তাদের মধ্যে তিনি (রাসূলুল্লাহ্) কোন্ জন যে পর্যন্ত সে জিজ্ঞেস না করতো। তাই আমরা (সাহাবীগণ) নবী-এর জন্য এমন একটি আসন তৈরির অনুমতি প্রার্থনা করলাম, যার উপর উপবেশন করলে তাঁকে আগন্তুকরা সহজেই চিনতে পারে। (বর্ণনাকারী বর্ণনা করেন) অতঃপর আমরা (তাঁর অনুমতি নিয়ে) তাঁর জন্য একটি মাটির চত্বর তৈরি করলাম। তিনি তার উপর আসন গ্রহণ করতেন এবং আমরা তাঁর উভয় দিকে (আশপাশে) বসতাম।
ফায়দা : এ হাদীস থেকেও রাসূলুল্লাহ্-এর স্বভাবগত সরলতা ও প্রকৃতিগত বিনয়-প্রিয়তার পরাকাষ্ঠা প্রকাশিত হয়। তিনি সাহাবাদের মাঝে নিরহংকারভাবে উপবেশন করতেন। যেরূপ সাধারণ বন্ধু-বান্ধবরা একসাথে মিশে বসে থাকে। আমীর-উমারা ও রাজা-বাদশাহদের মত তাঁর বসার জন্য কোনো কুরসী ছিল না; কোনো সিংহাসন, কার্পেট-গালিচা ও শাহী দরবারও ছিল না। সেখানে কোনো শাহী আড়ম্বর, দাসদাসীর করজোড় সারি, স্তাবক ও গুণগায়কদের তোশামোদ-খোশামোদও ছিল না—যাতে তাঁর স্বতন্ত্র মর্যাদা প্রকাশ পেতে পারে। কেননা এসব বিষয় ছিল তাঁর প্রকৃতিগত বিনয়ের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তিনি এসব আদৌ পছন্দ করতেন না। কিন্তু যখন বাইরের নতুন নতুন প্রতিনিধি দলের আগমন বেড়ে গেলো এবং দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তাঁর সাক্ষাৎ ও বায়আত গ্রহণের জন্য আসতে লাগলো, তখন সাহাবাগণ এ অনিবার্য প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে তাঁর বসার জন্য একটি স্বতন্ত্র আসন তৈরির আবেদন করলেন এবং তিনিও অপরিহার্যতা লক্ষ করে মাটির একটি আসন তৈরির অনুমতি দেন।
١٣٥ عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ كُلِّ جَعَلَنِي اللَّهُ فِدَاكَ مُتَّكِنًا فَإِنَّهُ أَهْوَنَ عَلَيْكَ، قَالَتْ فَأَصْغَى بِرَأْسِهِ حَتَّى كَادَ أَنْ تُصِيبَ جَبْهَتُهُ الْأَرْضَ ثُمَّ قَالَ لَا بَلْ أَكُلُ كَمَا يَأْكُلُ الْعَبْدُ وَاجْلِسُ كَمَا يَجْلِسُ الْعَبْدُ .
১৩৫. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! (আল্লাহ্ আমাকে আপনার জন্য কুরবান করে দিন) আপনি ঠেস দিয়ে বসে আহার করুন। তাতে আপনি আরাম অনুভব করবেন। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, একথা শুনে তিনি তাঁর শির মুবারক এতই নিচু করলেন যে, তাঁর কপাল মাটি স্পর্শ করার উপক্রম হলো। তারপর তিনি বললেন: না, বরং আমি একজন সাধারণ গোলামের মতো আহার করবো এবং একজন সাধারণ লোকের মতো বসবো।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, দু'জাহানের সরদার, রাব্বুল আলামীনের প্রিয়তম বন্ধু হযরত মুহাম্মদ কোনো অবস্থাতেই সরলতা ও বিনয় ত্যাগ করা পছন্দ করেন নি। খাবার জন্য বসার ক্ষেত্রে তো তিনি বিশেষভাবেই বিনয় অবলম্বন করতেন। তিনি কখনো আসন করে বসে কিংবা হেলান দিয়ে আহার করেন নি। হযরত আয়েশা (রা) যখন ভালবাসা ও সহানুভূতিবশত নবী-কে একটু আরামের সাথে বসে খাবার খেতে অনুরোধ করলেন, বরং তখন তিনি তাঁর অনুরোধ ও অবস্থানের উল্টো দাসত্ব প্রকাশের জন্য আরো যমীনের উপর ঝুঁকে গেলেন এবং মুখেও বিনয় প্রকাশ করলেন।
আলিমগণ বলেন, ঠেস কিংবা হেলান দিয়ে খানা খাওয়ার চারটি অবস্থা হতে পারে। চারটি অবস্থাই এই হাদীসের আওতায় এসে যাচ্ছে। (১) ডান বা বামে কোনো তাকিয়া বা পাঁচিল প্রভৃতির উপর ভর করা। (২) হাতের তালু মাটির উপর রেখে তার উপর ভর করা। (৩) কোনো পাঁচিল বা তাকিয়ার সাথে কোমর লাগিয়ে সাহায্য নেয়া। (৪) গদি কিংবা কার্পেট প্রভৃতির উপর আসন করে বসে আহার করা। এই চারটি অবস্থাই সুন্নতের খেলাফ।
📄 নবী (সা)-এর নম্রতা ও বিনয়
١١٤. عَنْ قُدَامَةَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَامِرٍ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَرْمِي الجَمْرَةَ عَلَى نَاقَةٍ شَهَبَاءَ لأَضَرْبَ وَلَا طَرْدَ وَلَا إِلَيْكَ إِلَيْكَ -
১১৪. হযরত কুদামা ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন আমির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-কে (হজ্জের মৌসুমে) খাকী বর্ণের একটি উটনীর উপর সাওয়ার হয়ে (আকাবায়) কংকর নিক্ষেপ করতে দেখেছি। (তিনি এভাবে কংকর নিক্ষেপের জন্য গিয়েছেন যে, লোকজনকে তাঁর কাছ থেকে দূরে থাকার জন্য) না কোন মারপিট ছিল আর না কোন প্রকারের হাঁকডাক। অনুরূপ 'এদিকে যাও' 'ওদিকে সর' এ সব কথাও বলা হয়নি।
ফায়দা: এ অনুচ্ছেদে প্রিয় নবী এর বিনয় ও নম্রতা বিষয়ক হাদীসসমূহ বর্ণনা করা হয়েছে। উল্লিখিত প্রথম হাদীসের থেকে তাঁর পূত-পবিত্র চরিত্রে পরম বিনয় নীতির প্রকাশ পাওয়া যাচ্ছে। কেননা প্রিয় নবী তখন একই সঙ্গে গোটা বিশ্বের পথপ্রদর্শক ও সকল নবীর সর্দার হওয়ার পাশাপাশি সমকালীন প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তা ব্যক্তিও ছিলেন। তা সত্ত্বেও তাঁর চাল-চলনে সর্বোচ্চ কর্তাসুলভ আচরণে কোন ভিন্নতা দেখা যায়নি। হজ্জের মৌসুমে হাজীদের প্রচণ্ড ভিড় থাকে। উপরন্তু তাঁদের অধিকাংশই থাকেন এমন চরিত্রের যারা নাগরিক রীতি-নীতি সম্পর্কে অসচেতন ও অনভ্যস্ত। এমন পরিস্থিতিতে একজনের শরীরে অন্যজনের শরীরের ধাক্কা লাগা, ভিড়ের চাপে কেউ নিচে পড়ে যাওয়া মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে প্রিয় নবী নিজের মর্যাদা বা মান-সম্মান বজায় রাখার উদ্দেশ্যে পৃথক কোন ব্যবস্থাই নেননি। তিনি সাধারণ হাজীদের সঙ্গে মিশে হজ্জের কাজকর্ম সম্পাদন করে যান। তাঁর আগমন উপলক্ষে রাস্তায় পথচারীদের না আসা-যাওয়া বন্ধ করা হয়েছিল, আর না তাঁর সম্মান প্রদর্শনার্থে পথচারীদেরকে 'সর' কিংবা 'দূরে থাক' ইত্যাদি বলা হয়েছিল। মোটকথা প্রিয় নবী নিজের প্রাধান্য প্রদর্শনের কোন ব্যবস্থা অবলম্বন করেননি।
এভাবে প্রিয় নবী-এর নম্রতা ও বিনয় সম্পর্কে আরো জানা যায় যে, তিনি মক্কা শরীফে যখন অসহায় ও শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থায় কালাতিপাত করছিলেন। ধৈর্য ও সহনশীলতা অবলম্বন ব্যতিরেকে তাঁর অন্য কোন পথ ছিল না। তখন আল্লাহ্ পাক তাঁকে ইখতিয়ার দিয়ে বলেছিলেনঃ হে নবী! আপনার অভিমত কি? আপনি কি বাদশাহী সংযুক্ত নবুওয়াত পেতে চান, আর না আবদিয়্যাত সংযুক্ত নবৃওয়াত? প্রিয় নবী নিজের পরম বিনয় প্রকাশ করে বাদশাহীর পরিবর্তে আবদিয়্যাত সংযুক্ত নবৃওয়াত লাভের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন এবং নিজের জন্য অভাব-অনটনের পথ বেছে নেন। অথচ নবুওয়াতের সঙ্গে বাদশাহীর সংযুক্ত প্রার্থনা করতে কোন বাধা ছিল না। তাঁর সম্মুখে হযরত সুলায়মান (আ)-এর উদাহরণও বিদ্যমান ছিল। তাছাড়া এই বাদশাহী গ্রহণ নবৃওয়াতের দায়িত্ব পালনের পথে কোন প্রতিবন্ধক বলেও বিবেচিত হতো না। কিন্তু 'রাহমাতুললিল আলামীন নিজের স্বভাবজাত চাহিদার নিরিখে বাদশাহীর উপর আবদিয়্যাতকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। এ কারণেই একাধিক হাদীসে পাওয়া যায় যে, এর পর প্রিয় নবী কখনো হাতের উপর বা পিঠের উপর ভর করে বসে পানাহার করেননি। স্বয়ং ইরশাদও করেছেন: আমি একজন নগণ্য বান্দা হিসাবে বসি, একজন ক্রীতদাস যেভাবে আহার করে আমিও সেভাবে আহার করি।
নম্রতা ও বিনয়ের এ নীতির কারণে প্রিয় নবী কখনো কোন খাদেম বা কাজের লোককে কোন ভুলের কারণে প্রহার করতেন না। আর কখনো বকাঝকাও দিতেন না। একটি হাদীসে এতটুকুও বলা হয়েছে যে, হযরত উমর (রা) বলেন, প্রিয় নবী ইরশাদ করেছেন যে, আমার প্রশংসা করতে গিয়ে তোমরা খৃস্টানদের মত বাড়াবাড়ি করো না। খৃস্টানরা তাদের নবী ঈসা (আ)-এর প্রশংসা করতে গিয়ে সীমা অতিক্রম করে এবং শেষ পর্যন্ত তার ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্ পুত্র বলে অভিহিত করে। (নাউযুবিল্লাহ্) আমি আল্লাহ্র একজন বান্দা মাত্র। কাজেই তোমরা আমাকে কেবল عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُهُ "আল্লাহ্র বান্দা ও তাঁর রাসূল" এতটুকু প্রশংসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবে।
নম্রতা ও বিনয়ের অভ্যাস আল্লাহ্ পাকের কাছেও খুবই পছন্দনীয়। পক্ষান্তরে অহংকার ও বড়ত্বের মনোভাবকে তিনি খুবই অপছন্দ করেন। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ তাঁর প্রিয় বান্দাদের চরিত্র আলোচনা করে ইরশাদ করেন:
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا -দয়াময় আল্লাহ্র খাস বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে। আর অজ্ঞ লোকেরা যখন সম্বোধন করে তখন তারা তর্কে অবতীর্ণ হয় না বরং শান্তি কামনা করে। (সূরা ফুরকান: ৬৩)
সারকথা মু'মিন মুসলমানদের বৈশিষ্ট্য হলো যে, তারা আচার-আচরণের ক্ষেত্রে নম্রতা ও বিনয় অবলম্বন করে চলে। কখনো কোন অজ্ঞ কিংবা অভদ্র লোক তাদেরকে কোন কটুকথা বললে তারা ক্ষমার চোখে দেখে এবং ভদ্রনীতির প্রদর্শন করে। গর্ব করা, অহংকার করা কিংবা আত্মম্ভরিতা প্রকাশ করা মু'মিনের কাজ নয়।
এ কারনেই একবার হযরত লোকমান (আ) নিজ পুত্রকে বেশ কিছু উপদেশ দেন। সে সব উপদেশের মধ্যে তিনি নম্রতা ও বিনয়ের নীতি অবলম্বনের কথাটি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। পবিত্র কুরআনে সে উপদেশটি নিম্নোক্ত ভাষায় বর্ণিত আছে:
وَلَا تُصَعِرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ বৎস! অহংকারবশে তুমি কখনো মানুষকে অবজ্ঞা করো না। আর পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে চলাফেরা করো না। কারণ আল্লাহ্ কোন উদ্ধত ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না। (সূরা লুকমান: ১৮)
আলিমগণ লিখেছেন, আল্লাহ্ পাকের নিকট যেভাবে অহংকার করা পছন্দনীয় নয় তেমনি অহংকারীদের চাল-চলন, রীতি-নীতি ইত্যাদি অনুসরণ করাও পছন্দনীয় নয়। অর্থাৎ কোন ব্যক্তি এমন হতে পারে যে, সে আন্তরিকভাবে অহংকারী নয় তবে অহংকারী লোকেরা যেভাবে চলে সে ব্যক্তি ঐভাবে চলাফেরা করে থাকে। আল্লাহ্ পাক তার এই চলাফেরাকে পছন্দ করেন না। ইসলামী শরীয়তের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো যে, এখানে আল্লাহ্ তা'আলার তরফ থেকে মানবীয় রীতি-নীতি ও শিষ্টাচারিতার বহু ক্ষুদ্র জিনিসকে বর্ণনা করে দেওয়া হয়েছে।
একখানা হাদীসে হযরত ইয়ায ইবন হাম্মাদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন যে, মহান আল্লাহ্ আমার নিকট এ মর্মে ওহী প্রেরণ করেছেন যে, তোমরা নম্রতা ও বিনয় অবলম্বন কর। কেউ কারুর উপর কোন অবিচার কিংবা বাড়াবাড়ি করো না। অনুরূপ কেউ কারুর উপর অহংকার কিংবা গর্ব প্রকাশ করো না (আবূ দাউদ, খ. ২, পৃষ্ঠা ৬৭১)।
অপর একখানা হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন যে, গরীবকে দান-খয়রাত করার কারণে সম্পদ হ্রাস পায় না। নম্রতা, বিনয় ও ক্ষমাপরায়ণতা ব্যক্তির সম্মান বৃদ্ধি করে। যে ব্যক্তি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে বিনয় অবলম্বন করে আল্লাহ্ পাক তার মান-সম্মান অনেক গুণে বৃদ্ধি করেন। (তিরমিযী শরীফ, খ. ২, পৃষ্ঠা ২৪)
বিনয় ও নম্রতা অবলম্বনের ফলে মানব চরিত্রে অন্যান্য আরো বহু সদ্গুণের সৃষ্টি হয়ে থাকে। বিভিন্ন হাদীসে প্রিয় নবী এগুলিকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। যেমন : এক. বিনয় অবলম্বন নিজেই একটি ইবাদত। পূর্ববর্তী হাদীস থেকে স্পষ্ট যে, আল্লাহ্ পাক মানুষকে বিনয় অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। কাজেই বিনয় অবলম্বনের ফলে ব্যক্তির জীবনে আল্লাহ্ পাকের একটি হুকুম প্রতিফলিত হয়। দুই. বিনয়ী ব্যক্তি একদিকে যেমন মহান আল্লাহ্র কাছে প্রিয় তেমনি মানুষের দৃষ্টিতেও সে পছন্দনীয় ও প্রিয় ব্যক্তি হিসাবে বিবেচিত। লোকজন মন থেকে তাকে ভালবাসে; তার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে ও মেলামেশা করতে আনন্দ পান। বিনয়ী ব্যক্তির পক্ষে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করা সহজ হয়। কারণ লোকজন এ চরিত্রের মানুষকে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কাজকর্মে নিজেদের উপর অগ্রাধিকার ও নেতৃত্ব প্রদান করতে ভালবাসে। বলা বাহুল্য, নম্রতা ও বিনয় এভাবেই মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতের উচ্চমর্যাদা দান করে। তিন. বিনয়ী ও অমায়িক ব্যক্তির দুশমনের সংখ্যা খুবই কম হয়ে থাকে। কারণ মানুষ সাধারণত তার বিনয়ী চরিত্র অবলোকন করে তার শত্রুতা কিংবা বিরোধিতা করা এবং তাকে কোন প্রকার কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকে। চার. বিনয় অবলম্বনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুফল হলো যে, বিনয়ের ফলে ব্যক্তি অতি সহজে চারিত্রিক গুণাবলির দ্বারা নিজেকে গুণান্বিত করতে সক্ষম হয়। তাই চরিত্রবান লোকদেরকে সাধারণভাবে বিনয়ী দেখা যায়। পক্ষান্তরে দাম্ভিক ও অহংকারী মানুষ আল্লাহ্ পাকের দরবারে যেমন অপছন্দনীয় তেমনি মানুষের কাছেও চরম ঘৃণিত। সে দুনিয়াবাসীর অন্তরে কখনো স্থান পায় না। তদ্রূপ আখিরাতেও তার জন্য রয়েছে চরম লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা। লোকজন তার ধনৈশ্বর্যের ভয়ে কিংবা ক্ষমতার কারণে হয়ত তার বিরুদ্ধে মুখে কিছু বলে না তবে মনে মনে তাকে অপছন্দ করে থাকে। এ সত্যতা যাচাইয়ের জন্য খুব দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা এর জ্বলন্ত সাক্ষী।
١١٥. عَنْ أَبِي الْمَلِيْحِ حَدَّثَنِي نَصَرُ بْنُ وَهَبِ الخُزَاعِيُّ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ رَكِبَ حِمَاراً مَرْسُوْنَا بِغَيْرِ سَرْجٍ مُوَكَّفٌ عَلَيْهِ قَطِيفَةٌ جَزْرِيَّةٍ ثُمَّ دَعَا مُعَاذَ bْنَ جَبَلٍ فَأَرْدَفَهُ - فَأَرْدَفَهُ -
১১৫. হযরত নাসর ইবন ওয়াহ্হাব খোযাঈ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, একদা রাসূলুল্লাহ্ এমন একটি গাধার পিঠে আরোহণ করেন যেখানে বসার কোন গদি ছিল না। তবে রশির লাগাম পরা ছিল এবং এর উপর একখণ্ড পুরাতন চামড়া রাখা ছিল। তারপর তিনি হযরত মুআয ইবন জাবাল (রা)-কে ডেকে নেন এবং নিজের পেছনে আরোহণ করান।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস থেকেও প্রিয় -এর পরম বিনয়-নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রিয় নবী নিজের শক্তি ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনের মুহূর্তে একটি সাধারণ গাধার পিঠে আরোহণ করতে দ্বিধা করেননি। অথচ তিনি যদি সামান্য ইঙ্গিতটুকুও করতেন তা হলে জান কুরবান হযরত উসমান ইব্ন আফফান (রা)-এর মত দানবীর সাহাবীগণ তাঁকে উন্নত থেকে উন্নততর সাওয়ারীর ব্যবস্থা করে দিতে বিন্দুমাত্রও বিলম্ব করতেন না।
একখানা হাদীসে হযরত আবূ সালামা (রা) বলেন, আমি প্রিয় নবী -এর যবান মুবারক থেকে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন: যে ব্যক্তির মনে শস্যদানা পরিমাণ অহংকার থাকবে সে বেহেস্তে প্রবেশ করবে না। (তারগীব ওয়া তারহীব, খ. ৪, পৃষ্ঠা ৪৫)
١١٦. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَعُودُ الْمَرِيضِ وَيَتَّبِعُ الْجَنَازَةَ وَيُجِيبُ دَعْوَةَ الْمَعْلُوكَ وَيَرْكَبُ الْحِمَارَ وَكَانَ يَوْمَ خَيْبَرَ وَيَوْمَ قُرَيْظَةَ وَالنَّصْيْرِ عَلَى حِمَارٍ مَخْطُوْمٍ بِحَبْلٍ مِنْ لِيْفَ تَحْتَهُ إِكَافُ مِنْ لِيْفَ -
১১৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর নিয়ম ছিল যে, তিনি অসুস্থদের শুশ্রূষা করতেন, জানাযার সঙ্গে হেঁটে যেতেন, গোলাম ও শ্রমিকদের আমন্ত্রণ কবুল করতেন এবং গাধার পিঠে আরোহণ করতেন। (রাবী বলেন) প্রিয় নবী খাইবার যুদ্ধের দিন একটি গাধার পিঠে আরোহী ছিলেন। এ গাধাটির লাগাম ছিল খেজুরের ছাল দিয়ে পাকানো একটি রশি এবং গাধার গদিটি ছিল খেজুরের কতগুলি ছাল ও ডালের দ্বারা বানানো। (ইবন মাজা, পৃষ্ঠা-৫৪৫)
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসে প্রিয় নবী-এর এমন চারটি উন্নত অনুপম সদ্গুণের উল্লেখ করা হয়েছে যেগুলি সাধারণত কোন নীতিপরায়ণ চরিত্র মাধুরী সম্পন্ন বিনয়ী ব্যক্তির পক্ষেই অবলম্বন করা সম্ভব হয়ে থাকে।
১. অসুস্থের সেবা শুশ্রূষা: হাদীসে পাওয়া যায় যে, প্রিয় নবী আশরাফ-আত্মাফ, ধনী-নির্ধন, আযাদ-গোলাম নির্বিশেষে সকলের খোঁজ-খবর নিতেন। কারোর অসুস্থতার সংবাদ পেলে নিঃসংকোচে তার শুশ্রূষার জন্য যেতেন। এমন কি একবার তাঁর জনৈক ইয়াহুদী খাদেম অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তিনি সেই ইয়াহুদীর শুশ্রূষা করেন। প্রিয় নবী -এর চাচা আবু তালিব ইসলাম গ্রহণ করেননি। অথচ তার অসুস্থতাকালে তিনি শুশ্রূষার জন্য গিয়েছিলেন।
২. লাশের সঙ্গে যাওয়া: প্রিয় নবী মৃতের জানাযায় শরীক হতেন। নিজেই জানাযার সালাত পড়াতেন। জানাযার পর লাশের সঙ্গে গোরস্তান পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে দাফন কাজে শরীক হতেন। একদা মসজিদে নবুবীর ঝাড়ু দানকারিণী এক মহিলা রাত্রিকালে ইন্তিকাল করেন। সাহাবীগণ রাতে প্রিয় নবী-এর কষ্ট হতে পারে এ আশংকায় তাঁকে সংবাদ দেননি। নিজেরাই মহিলার কাফন-দাফনের কাজ সম্পন্ন করে নেন। পরে এ সংবাদ প্রিয় নবী-এর নিকট পৌঁছলে তিনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং মহিলার কবরে গিয়ে জানাযা পড়ে আসেন। অনুরূপভাবে মদীনার অধিবাসী আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই ইব্ন সাল্ল ছিলেন মুনাফিকদের নেতা এবং مسلمانوں চরম শত্রু ও ইসলাম বিদ্বেষী। এ লোকটি মারা গেলে তখনও প্রিয় নবী তার জানাযার নামায পড়িয়েছিলেন।
৩. দরিদ্রদের আমন্ত্রণ কবুল করা: দরিদ্রদের আমন্ত্রণ কবুল করা এবং তাদের কথা শোনা মানুষের অন্যতম সদ্গুণ। প্রিয় নবী প্রতিটি মানুষের বক্তব্য শুনতে চেষ্টা করতেন। একটি গোলামও যদি তাঁকে নিজ প্রয়োজন সমাধা করে দেয়ার জন্য নিয়ে যেতে চাইত তখন তিনি নিঃসংকোচে গোলামের সঙ্গে চলে যেতেন। এমন কি কোন ক্রীতদাসী পর্যন্ত তুচ্ছ কোন কাজের জন্য যখন তাঁর কাছে সাহায্য চাইত তখনও তিনি তা সমাধা করে দিতে নিজের মর্যাদার জন্য হানিকর বলে মনে করতেন না।
৪. গাধার পিঠে আরোহণ করা: প্রিয় নবী-এর জন্য উট, ঘোড়া ইত্যাদি জাতীয় উন্নত বাহন গ্রহণের ব্যবস্থা ছিল। অথচ তিনি বিনয় প্রকাশার্থে গাধা ও খচ্চরের পিঠেও সাওয়ার হতেন। বাহন হিসাবে গাধা ব্যবহার করাকে নিজের জন্য অপমানজনক মনে করতেন না। এভাবে প্রয়োজনের মুহূর্তে নিজের পেছনে অন্যকে বসিয়ে নিতেন। খায়বার যুদ্ধ ও বনু কুরায়যা ও নাযীর যুদ্ধে তিনি যখন একজন সেনাপতি ও مسلمانوں প্রধান হিসাবে রণক্ষেত্রের পার্শ্ব অতিক্রম করছিলেন তখন তাঁর বাহনটি ছিল সামান্য একটি গাধা। অথচ এমন অবস্থায় অতিশয় বিনয়ী প্রকৃতির নেতাগণও প্রতিপক্ষকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে নিজের শৌর্যবীর্য ও জাঁকজমকের প্রকাশ আবশ্যক বলে মনে করে থাকেন। কিন্তু প্রিয় নবী-এর চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী। তিনি স্বভাবজাত নম্রতা ও বিনয় ত্যাগ করে কৃত্রিমতা অবলম্বন করাকে পছন্দ করেননি। এটিই ছিল রাহমাতুল লিল্ আলামীন -এর যথাযোগ্য উত্তম অনুপম আদর্শ।
۱۱۷. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا أَنَّهَا سُئِلَتْ مَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَصْنَعُ فِي بَيْتِهِ ؟ قَالَتْ كَمَا يَصْنَعُ أَحَدُكُمْ فِي بَيْتِهِ - يَخْصِفُ النَّعْلَ وَيُرَقِعُ الثوب -
১১৭. (উম্মুল মু'মিনীন) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত যে, একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, রাসূলুল্লাহ্ ঘরে প্রবেশ করে কি কি কাজ করতেন? উত্তরে হযরত আয়েশা (রা) বলেন, তিনি সেই সব কাজই করতেন যেগুলো সাধারণত তোমরা নিজেদের ঘরে করে থাক। তিনি নিজ হাতে জুতা সেলাই করতেন এবং কাপড়ে তালি লাগাতেন।
۱۱۸. عَنْ أَبِي بُرْدَةَ قَالَ قُلْتُ لِعَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا مَا كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَصْنَعُ فِي بَيْتِهِ ؟ قَالَتْ كَانَ فِي مِهْنَةِ أَهْلِهِ -
১১৮. হযরত আবূ বুরদা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়েশা সিদ্দীকা (রা) -কে জিজ্ঞেস করলাম যে, নবী বাড়ির ভেতরে কি কাজ করতেন? তিনি বললেন, নবী ঘরের কাজকর্মে অন্যদের সাহায্য করতেন।
۱۱۹. عَنْ مُجَاهِدٍ عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَ قُلْتُ مَا كَانَ يَصْنَعُ النَّبِيُّ فِي بَيْتِهِ قَالَتْ يَخْصِفُ النَّعْلَ وَيُرْقِعُ التَّوْبَ .
১১৯. মুজাহিদ (র) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম যে, প্রিয় নবী ঘরের ভিতর থাকাকালে কি কি কাজ করতেন? তিনি বললেন, নবী নিজ হাতে নিজের চপ্পল সেলাই করতেন এবং নিজের পোশাকে তালি লাগাতেন।
ফায়দা : উপরোক্ত তিনটি হাদীসের মর্ম প্রায় অভিন্ন। এখানে গৃহের অভ্যন্তরে থাকাকালে প্রিয় নবী যে সব কাজকর্ম করতেন বলে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) বর্ণনা করেছেন। তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ঘরের ভিতরে তিনি অতিশয় সাদাসিধা ও সরল জীবন যাপন করতেন। একজন সাধারণ মানুষের মতই ছিল তাঁর পারিবারিক জীবন। রাজকীয় রীতি-নীতি কিংবা কোন জাঁকজমক তাঁর পরিবারে ছিল না। এখানে গভীরভাবে লক্ষণীয় যে, প্রিয় নবী নবুওয়াতের মহান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হওয়া এবং বিশ্ব নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পদে সমাসীন হওয়া সত্ত্বেও তিনি ঘরে প্রবেশ করে নিজের কাজ নিজ হাতেই সম্পাদন করতেন। পারিবারিক ছোট ছোট কাজগুলি সম্পাদন করতে বিন্দুমাত্র সংকোচ বোধ করতেন না। অনুরূপভাবে তাঁর গৃহে কাজ করার মত লোকের অভাব ছিল এমনও নয়। হযরত আনাস ইবন মালিক ও হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রা) উভয়ে প্রিয় নবী -এর একান্ত খাদেম ছিলেন। প্রিয় নবী-এর কাজকর্ম আঞ্জাম দেওয়ার কাজে তাঁরা এতটুকু ঘনিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলেন যে, লোকেরা তাঁদেরকে প্রিয় নবী-এর পরিবারের সদস্য বলে মনে করতো। অনুরূপ উম্মুল মু'মিনীনদের জন্যও সেবিকা ছিল। এতদসত্ত্বেও প্রিয় নবী নিজ ঘরে প্রবেশের পর নিজের কাজকর্ম নিজেই সম্পাদন করতেন।
নম্রতা ও বিনয় আল্লাহ্ পাকের কাছেও প্রিয় এবং রাসূলুল্লাহ্-এর কাছেও ছিল প্রিয়। একখানা হাদীসে হযরত আবূ সাঈদ খুদ্রী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাকের সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে এক ধাপ বিনয় অবলম্বন করবে আল্লাহ্ পাক বেহেস্তে তার জন্য এক ধাপ মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। আর যে ব্যক্তি এক ধাপ অহংকার অবলম্বন করবে আল্লাহ্ পাক তার জন্য এক ধাপ মর্যাদা অবনতি করে দিবেন। এভাবে অহংকার অবলম্বনের কারণে আল্লাহ্ পাক ব্যক্তির মর্যাদা ক্রমে ক্রমে অবনতি করে অবশেষে দোযখের সর্বনিম্নে নিক্ষেপ করবেন। (ইবন মাজা, পৃষ্ঠা ৫৪৪, মিসর)।
۱۲۰ عَنْ عُرْوَةَ عَنْ أَسَامَةَ بْنِ زَيْدِ أَخْبَرَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ رَكِبَ يَوْمًا حِماراً بِإِكَافَ عَلَيْهِ قَطِيفَةٌ فَرَدِفَهُ أَسَامَةَ ابْنَ زَيْدٍ يَعُودُ سَعْدَ بْنَ عُبَادَةٌ فِي بَنِي الْحَارِثِ ابْنِ خَزْرَجٍ وَذَلِكَ قَبْلَ وَقْعَةِ بَدْرٍ -
১২০. হযরত উরওয়া ইব্ন যুবায়র (রা) হযরত উসামা ইবন যায়িদ (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ একটি গাধার উপর আরোহণ করেন। গাধাটির পিঠে গদি হিসেবে একটি চাদর ছিল। তারপর তিনি নিজের পেছনে হযরত উসামা ইবন যায়িদ (রা)-কে বসালেন এবং হযরত সাদ ইবন উবাদা (রা)-এর শুশ্রূষার জন্য বনু হারিস ইব্ন খাযরাজ গোত্রের আবাসস্থলে গমন করেন। এ ঘটনাটি ছিল বদর যুদ্ধের পূর্বেকার।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস উল্লেখ করার পেছনে গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হলো প্রিয় নবী -এর নম্রতা ও বিনয় চরিত্রের বর্ণনা করা। অবশ্য এতদসংক্রান্ত একখানা হাদীস ইতিপূর্বে ১১৫ নং-এ আলোচিত হয়েছে। এ হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, প্রিয় নবী নিরহংকার চরিত্রের কারণে বাহন হিসেবে সামান্য গাধাকেও ব্যবহার করেছেন। অহংকারী ও দাম্ভিক লোকদের ন্যায় বাহন হিসাবে তুচ্ছ গাধার ব্যবহারকে তিনি নিজের মর্যাদা হানিকর বলে মনে করেননি। এভাবে নিজের সঙ্গে অন্য একজনকেও বসিয়ে নিতে তাঁর কোনই সংকোচবোধ হয়নি। অথচ সাধারণভাবে কোন রাষ্ট্রপতি কিংবা কোন সম্রাট এহেন আচরণ করতে লজ্জাবোধ করবেন। ইতিহাস গ্রন্থে পাওয়া যায় যে, সফরে ও মদীনা শরীফে অবস্থান কালে বিভিন্ন স্থানে প্রিয় নবী চল্লিশ জনেরও অধিক সাহাবীকে নিজের সঙ্গে সাওয়ারীতে আরোহণের মর্যাদা দান করেন। কখনো কখনো তিনি নিজে পেছনে বসে সঙ্গীকে আগে বসতেও দিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ! এটি ছিল মহানবী-এর চরিত্র মাধুরীর নমুনা। প্রিয় নবী-এর আখলাক ও শামাইল সম্পর্কে যাঁরা অধ্যয়ন করেন তাঁদের কাছে তাঁর বিনয় ও নম্রতার বহু ঘটনা সুস্পষ্ট। তিনি সর্বদা মোটা ও স্থূল পোশাক পরিধান করতেন। সাধারণ মানের আহার গ্রহণ করতেন। তালি লাগানো জুতা ব্যবহার করতেন, নিজেই ঘরের বকরীর দুধ দোহন করতেন, নিজের জুতা নিজেই সেলাই করতেন, নিজের কাপড়-চোপড় নিজেই ধুয়ে নিতেন, গাধার পিঠে আরোহণ করে চলতে এবং নিজের সঙ্গে অন্যকে বসিয়ে নিতে কখনো লজ্জাবোধ করতেন না।
١٦١. عَنْ أَنَسٍ قَالَ لَمْ يَكُنْ شَخْصُ أَحَبُّ إِلَيْهِمْ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَكَانُوا إِذَا رَأَوْهُ لَمْ يَقُومُوا إِلَيْهِ لِمَا يَعْرِفُونَ مِنْ كَرَاعِيَّتِهِ لَهُ -
১২১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাহাবীদের মনে রাসূলুল্লাহ্ -এর চেয়ে অধিক ভালবাসা অন্য কারোর জন্য ছিল না। এতসত্ত্বেও তাঁরা রাসূলুল্লাহ্ -কে কখনো আসতে দেখে তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়াতেন না। কারণ তারা জানতেন যে, তিনি এভাবে দাঁড়ানোকে মোটেও পছন্দ করেন না।
ফায়দা : এ হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, প্রিয় নবী তাঁর সাহাবীদেরকে তাঁর প্রতি দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করতে নিষেধ করতেন। কেননা এটি অহংকারী লোকদের রীতি। অহংকারী কর্তা ব্যক্তিরা মানুষের কাছ থেকে এ ধরনের লৌকিক সম্মান পেতে চায়। আর তাদের প্রজা ও দরবারের সদস্যরাও এ পদ্ধতিতে সম্মান জানায়। কর্তা ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য হলো নিজেদের বড়ত্ব ও আধিপত্যের প্রকাশ ঘটানো এবং মানুষের কাছ থেকে জবরদস্তিমূলক সম্মান আদায় করা। আর এ কারণেই তাদের সম্মানার্থে যারা দাঁড়াবে না, তাদেরকে অপরাধী বলে গণ্য করে। অথচ কোন সন্দেহ নেই এটি নিজের অহংকার প্রকাশেরই একটি বিকল্প মাত্র, যা মিছামিছি প্রদর্শনীর অবতারণা বৈ কিছুই নয়। এ অভ্যাস খুবই মন্দ একটি অভ্যাস। এটি ব্যক্তিকে আল্লাহ্ পাকের কঠিন ক্রোধ ও গযবের মধ্যে নিপতিত করে। এ কারণেই প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা এ ধরনের প্রদর্শনী করা থেকে সাহাবীদেরকে নিষেধ করতেন।
একখানা হাদীসে হযরত আবূ উমামা (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ একটি লাঠির উপর ভর করে আমাদের দিকে আসছিলেন। আমরা তাঁর আগমন উপলক্ষে সবাই দাঁড়িয়ে গেলাম। তখন প্রিয় নবী ইরশাদ করেন : তোমরা অনারবদের ন্যায় আমার সম্মান প্রদর্শনের জন্য কখনো দাঁড়াবে না। অনারব লোকেরা একজন অন্যজনের সম্মানে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। (আবু দাউদ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা-১২৯)
প্রিয় নবী এ নির্দেশটি দিয়েছিলেন তাঁর একান্ত বিনয়ী মনোভাবের কারণে। যেন হঠাৎ কেউ দেখলে তাঁর প্রতি অহংকার বা দাম্ভিকতার সন্দেহটুকুও করতে না পারে। নতুবা তিনি খুব ভালভাবেই জানতেন যে, সাহাবীগণ তাঁকে যে সম্মান প্রদর্শন করেন তাতে বিন্দু পরিমাণ খাদ নেই, সম্পূর্ণ অকৃত্রিম। মনের গভীর থেকেই তাঁরা তাঁকে সম্মান করে থাকেন এবং অকৃত্রিমভাবে তাঁকে ভালবাসেন। এ কারণে আলিমগণ লিখেছেন, কোন বিজ্ঞ আলিম কিংবা বুযুর্গ কিংবা ন্যায়পরায়ণ কোন শাসকের সম্মান প্রদর্শনার্থে এভাবে দাঁড়ানোর মধ্যে কোন আপত্তি নেই। তবে কেউ যদি নিজের প্রভুত্ব, আধিপত্য ও অহংকার দেখানোর জন্য এভাবে সম্মানার্থে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেয় তাহলে দাঁড়ানো মাকরূহ।
হযরত আবূ মিজলায (রা) থেকে বর্ণিত যে, হযরত মুআবিয়া (রা) একবার হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র ও ইবন আমির (রা)-এর কাছে গেলেন। হযরত মুআবিয়া (রা)-কে দেখে হযরত ইব্ন আমির (রা) তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে গেলেন। এদিকে হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র (রা) স্বস্থানে উপবিষ্ট থাকেন। তখন হযরত মুআবিয়া (রা) হযরত ইব্ন আমির (রা)-কে বললেন, স্বস্থানে বসে থাকুন। কেননা আমি প্রিয় নবী -কে বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তি অন্যরা তার সম্মানার্থে দাঁড়ানোকে পছন্দ করে সে ব্যক্তির ঠিকানা হবে জাহান্নাম। (আবু দাউদ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২১৯)
উপরোক্ত হাদীস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বর্ণিত নিষেধাজ্ঞা সে সময়ের জন্য, যখন আগমনকারীর দাম্ভিকতা ও অহংকার এ কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করে। তাই দেখা যায় একটি হাদীসে এসেছে যে, আনসারদের অন্যতম বড় আলিম ও সরদার হযরত সাদ ইবন উবাদা (রা) যখন আগমন করছিলেন তখন প্রিয় নবী আনসারদের আদেশ দিয়ে বলেন, তোমাদের সর্দার আগমন করছেন। তোমরা দাঁড়িয়ে যাও। অবশ্য এখানে নবী-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল হযরত সাদ ইবন উবাদা (রা)-এর সম্মানকে বড় করে দেখানো। কেননা তাকে তখন বনু কুরায়যার বন্দীদের ব্যাপারে সালিস নিযুক্ত করা হয়েছিল।
অনুরূপভাবে দূরদেশ থেকে আগত মুসাফিরের অভ্যর্থনা কিংবা অন্তরঙ্গ কোন বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় দাঁড়ানোর মধ্যে কোন আপত্তি নেই। শর্ত হলো উভয় পক্ষের কোন দিকে প্রাণহীন প্রদর্শনী কিংবা অহংকার থাকবে না। যেন আগমনকারী মনে মনে এই সম্মান কামনা না করেন আর অভ্যর্থনাকারী কেবল লৌকিকতার জন্যই না দাঁড়ান।
١٢٢. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يُجِيبُ الْعَبْدَ وَيَعُودُ الْمَرِيضَ وَيَرْكَبُ الْحِمَارَ
১২২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাধারণ একজন গোলামের দাওয়াত কবুল করতেন, অসুস্থদের শুশ্রূষা করতেন এবং গাধার পিঠেও আরোহণ করতেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস থেকেও প্রিয় নবী -এর পরম বিনয় ও নম্রতার পরিচয় ফুটে উঠে। এভাবে আরো অন্যান্য হাদীস থেকে জানা যায় যে, প্রিয়নবী তাঁর সাহাবীদের মজলিসে নিজের জন্য কোন পার্থক্য বজায় না রেখেই বসতেন। তাঁর বসার জন্য পৃথক কোন আসন থাকত না। আর তিনি বসার মধ্যেও নিজেকে ব্যতিক্রম বানিয়ে বসতেন না। তিনি সীমাহীন সরলতা ও অনাড়म्बरতাসহ মজলিসের যেখানেই সুযোগ পেতেন সেখানেই বসতেন। বসে যেতেন। এ কারণে নতুন আগন্তুক লোকদের জন্য জিজ্ঞেস করে নিতে হতো যে, আপনাদের মধ্যে নবী কোন্ জন? কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখন নবী -এর দরবারে দূর দেশের বিভিন্ন প্রতিনিধি দলের আগমন শুরু হলো এবং নবাগতদের নানা প্রশ্নোত্তরের কারণে মজলিসের কাজকর্ম ও আলোচনায় বিঘ্ন ঘটতে লাগল, তখন সাহাবীদের বহু পীড়াপীড়ির দরুন প্রিয় নবী -এর জন্য একটি পৃথক জায়গা বানানোর আবেদন তিনি মঞ্জুর করেন। ফলে মজলিসের মধ্যে নবী কোন্ জন তা নির্ণয় করতে নবাগতদের জন্য সহজ হয়। সাহাবীগণ প্রিয় নবী -এর বসার জায়গাটির মধ্যে মাটি ফেলে সামান্য উঁচু করে খাটের মত বানিয়ে দেন। তারপরেও প্রিয় নবী কখনো সেই উঁচু জায়গায় বসতেন আবার কখনো নিচে বসে উঁচু জায়গাটির উপর হেলান দিয়ে থাকতেন। এতখানি ছিল নবীদের সর্দার শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা -এর নম্রতা ও বিনয়।
একটি হাদীসে পাওয়া যায় যে, প্রিয় নবী -কে কখনো কখনো যবের রুটি কিংবা গন্ধ হয়ে গেছে এমন চর্বি আহারের জন্যও যদি দাওয়াত দেয়া হতো তখনও তিনি কোনরূপ অসন্তুষ্টি প্রকাশ না করে সে দাওয়াত কবুল করতেন। তিনি এমনটা চিন্তা করতেন না যে, এত নিম্নমানের আহারের আমন্ত্রণে আমি কেন যাব?
অনুরূপভাবে তিনি নিজের সাথী-সঙ্গীদের শুশ্রূষার জন্যও যেতেন। অসুস্থ লোকটি আমীর কিংবা গরীব, আযাদ কিংবা গোলাম, 'ছোট কিংবা বড় – সেই বিবেচনা তাঁর কাছে ছিল না। তিনি অসুস্থের খুব কাছে গিয়ে বসতেন এবং তাকে সান্ত্বনা দিতেন। তার সুস্থতার জন্য দু'আ করতেন। হাদীসগ্রন্থে এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা পাওয়া যায়। ইতিপূর্বেও আলোচিত হয়েছে যে, তিনি সামান্য মানের বাহন গাধার পিঠে আরোহণ করতেও সংকোচ বোধ করতেন না। বলা বাহুল্য, প্রিয় নবী সমকালের সম্রাট ও দু'জাহানের রাসূল ছিলেন। তাঁর নগণ্য একজন গোলাম ব্যক্তিও উচ্চমানের বাহনে আরোহণ করে থাকে। অথচ তিনি নিজে গাধার পিঠে নির্দ্বিধায় আরোহণ করেছেন। এ সব কিছু মূলত তিনি বিনয় ও নম্রতা প্রকাশের জন্যই করেছিলেন। যেন উম্মতের লোকেরা তাঁর এ আদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।
۱۲۳. عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَجْلِسُ عَلَى الأَرْضِ وَيَأْكُلُ عَلَى الأَرْضِ وَيَعْتَقِلُ الشَّاةَ، وَيُجِيبُ دَعْوَةَ الْمَمْلُوكِ، قَالَ أَبُو إِسْمَاعِيلَ فَحَدَّثْتُ بِهِ الْأَعْمَشِ عَنْ مُسْلِمٍ فَقَالَ أَمَا إِنَّهُ كَانَ يَطْلُبَ الْعِلْمَ -
১২৩. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ নিঃসংকোচে মাটির উপর বসতেন, মাটিতে বসে আহার করতেন, নিজ হাতে খুঁটির সাথে বক্রী বাঁধতেন ও গোলামের দাওয়াত কবুল করতেন। বর্ণনাকারী আবু ইসমাঈল (র) বলেন, আমি এ হাদীসখানা মুসলিম (র)-এর বরাত দিয়ে হযরত আমাশ (র)-কে শোনালাম। তখন আমাশ (র) বললেন, তবে মনে রেখ, প্রিয় নবী -এর উদ্দেশ্য ছিল নিজ সাহাবীদের অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়া।
ফায়দা : আলোচ্য হাদীসের মধ্যে প্রিয় নবী -এর যে সব সুন্দর নীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে এগুলি তাঁর একান্ত বিনয় ও নম্রতার প্রমাণ বহন করে। কেননা এসব কাজ তিনি প্রয়োজনীয় উপকরণ কিংবা কাজের লোকজনের অভাবজনিত কারণে করেননি। তাঁর কাছে উপকরণ বা লোকজনের অভাব ছিল না। তবে তিনি নিজের নম্রতা ও বিনয় নীতি প্রকাশার্থে এসব কাজ নিজ হাতে ও নিঃসংকোচে করতেন।
বুখারী শরীফে হযরত আসওয়াদ ইব্ন ইয়াযীদ (র) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ নিজ গৃহে কি কি কাজ করে থাকতেন? তখন হযরত আয়েশা (রা) বলেন, তিনি ঘরের অন্যদের কাজকর্ম্মে স্বহস্তে সহযোগিতা করতেন। কিন্তু যখন নামাযের সময় হতো তখন কোন প্রকার বিলম্ব না করে মসজিদে চলে যেতেন। (বুখারী শরীফ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা : ৮৯২)
আলোচ্য হাদীস থেকে এ কথা সুস্পষ্ট যে, প্রিয় নবী অন্যান্য সাধারণ মানুষের ন্যায় পারিবারিক বিভিন্ন কাজে শরীক থাকতেন। উদাহরণস্বরূপ যেমন নিজে বকরীর দুধ দোহন করতেন, নিজের জুতা নিজেই সেলাই করতেন ইত্যাদি। এ বিষয়ে ইতিপূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
١٢٤ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكِ أَنَّهُ مَرَّ بِصِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ ثُمَّ حَدَّثَنَا أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ مَرَّ عَلَى صِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ وَهُوَ مُغِدٍ-
১২৪. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, একদা তিনি বালকদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি তাদেরকে সালাম দেন। তারপর আমাদেরকে হাদীস শুনিয়ে বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ বালকদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি দ্রুত পথচলা অবস্থায় তাদেরকে সালাম দেন।
١٢٥ عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ مَرَّ بِصِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ -
১২৫. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, একদা রাসূলুল্লাহ বাচ্চাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন সে মুহূর্তে তিনি তাদেরকে সালাম দেন।
١٢٦. عَنْ أَنَسٍ قَالَ بَعَثَنِي رَسُولُ اللهِ ﷺ فِي حَاجَةٍ فَمَرَرْتُ بِصِبْيَانِ فَقُمْتُ مَعَهُمْ فَأَبْطَاتُ عَلَيْهِ فَخَرَجَ وَرَانِي مَعَ الصِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ -
১২৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাকে একটি কাজের জন্য পাঠিয়েছিলেন। পথিমধ্যে বাচ্চাদের সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। আমি তাদের সেখানে দাঁড়ালাম। তাতে অনেক দেরি হয়ে গেল। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ্ আমার তালাশে বের হয়ে আমাকে বাচ্চাদের সঙ্গে দেখলেন। তখন তিনি তাদেরকে সালাম দিয়েছিলেন।
۱۲۷. عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ مَرَّ عَلَى صِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِم -
১২৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী বাচ্চাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় তিনি তাদেরকে সালাম দেন।
۱۲۸ عَنْ أَنَسٍ قَالَ أَتَى عَلَيْنَا رَسُولُ اللهِ ﷺ وَأَنَا فِي غِلْمَةٍ نَلْعَبُ فَسَلَّمَ عَلَيْنَا ثُمَّ أَرْسَلَنِي فِي حَاجَةٍ -
১২৮. আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি তখন বাচ্চাদের সঙ্গে মিলে খেলাধুলা করছিলাম। তিনি আমাদেরকে সালাম দেন। তারপর আমাকে একটি কাজের জন্য পাঠিয়ে দেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসগুলোর বক্তব্য অভিন্ন। এখানে প্রিয় নবী-এর পরম বিনয় ও নম্র আচরণের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এ সব হাদীস থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, প্রিয় নবী বাচ্চাদের শিক্ষা দানের জন্য নিজেই সালাম দিতেন। আর এভাবে তাদেরকে সালাম দেওয়া তাঁর দৃষ্টিতে কোন লজ্জা বা সম্মানহানিকর বলে মনে হতো না। বলা বাহুল্য, বাচ্চাদেরকে সালাম দেওয়ার মধ্যে বহু উপকারিতা বিদ্যমান। ১. বাচ্চাদেরকে সালাম দেওয়ার দ্বারা তাদের মধ্যে একজন অন্যজনকে সালাম দানের অভ্যাস গড়ে ওঠে। ২. তাতে সমাজে ইসলামী তাহযীব ও তামাদ্দুনের ভিত কায়েম হয়, ৩. নিজে বাচ্চাদেরকে সালাম করার দ্বারা মন থেকে গর্ব ও অহংকার ইত্যাদি দূরীভূত হয়, ৪. 'আস্সালামু আলাইকুম' বাক্যটি একটি দু'আ বিশেষ। এ দু'আটির ব্যাপক প্রচলনের কারণে শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ গড়ে ওঠে, ৫. এই সালাম ইসলামের বিশেষ একটি প্রতীক। কাজেই সর্বশ্রেণীর মাঝে সালামের ব্যাপক প্রচলন থাকলে সেটি একটি মুসলিম সমাজ বলে বোঝা যায়।
একখানা হাদীসে হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আম্র ইব্ন আস (রা) বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি প্রিয় নবীকে জিজ্ঞেস করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! ইসলামী আমলগুলোর মধ্যে কোন্ আমলটি সর্বাপেক্ষা উত্তম? প্রিয় নবী উত্তর দিলেন যে, লোকজনকে আহার করানো এবং পরিচিত ও অপরিচিত সকলকে সালাম প্রদান করা। (তারগীব ওয়া তারহীব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৩)
অপর একখানা হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন: (হে মানুষ সকল!) তোমরা যতক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণভাবে ঈমান আনয়ন করবে না ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে না। আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানদার হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি গড়ে না নিবে। আচ্ছা! আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি কাজের পরামর্শ দিব যে কাজটি করার কারণে তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও ভালবাসা গড়ে উঠবে? মনে রেখ! সে কাজটি হলো সালামের বহুল প্রচলন। তোমরা যখনই একজন অন্যজনের সাথে সাক্ষাৎ করবে তখনই তাকে সালাম করবে। আর সালাম দেওয়াকে নিজেদের বৈশিষ্ট্য বানিয়ে নাও। (তারগীব ওয়া তারহীব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৩)
একটি হাদীসে হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) রাসূলুল্লাহ্ থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি ইরশাদ করেছেন: তোমরা সালামের ব্যাপক প্রচলন করে নাও। তা হলে নিজেরা শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে থাকতে পারবে। (ঐ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৪)
হযরত সাহল ইবন হুনাইফ (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি শুধু “اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ" বলে তার আমলনামায় দশটি নেকী লেখা হয়। আর যে ব্যক্তি "اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ" বলে তার আমল নামায় বিশটি নেকী লেখা হয়। আর যে ব্যক্তি السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ বলে তার আমলনামায় ত্রিশটি নেকী লেখা হয়। (তারগীব ওয়া তারহীব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৮)
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন যে, সবচেয়ে অথর্ব হলো সে ব্যক্তি যে দু'আ করতেও অক্ষম (অর্থাৎ আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করতেও জানে না।) আর সবচেয়ে বড় কৃপণ সে ব্যক্তি যে সালাম করার ব্যাপারে কার্পণ্য করে। (তারগীব ওয়া তারহীব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৯)
হযরত আবু উমামা (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি আগে সালাম দেয় সে মহান আল্লাহর অধিক ঘনিষ্ঠ। অর্থাৎ সাক্ষাতের সময় আগে সালাম দেয়ার কারণে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাকের সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করে। (মিল্কাত শরীফ, পৃষ্ঠা ৩৯৮)
এভাবে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন מסעוד (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন যে, অগ্রে সালাম দানকারী ব্যক্তি গর্ব ও অহংকার থেকে মুক্ত থাকে। (মিল্কাত, পৃষ্ঠা ৪০০)
একখানা হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন যে, প্রিয় নবী ইরশাদ করেছেনঃ এক মুসলমানের উপর অন্য মুসলমানের ছয়টি হক (অধিকার) রয়েছে:
এক. সে অসুস্থ হলে তার সেবা-শুশ্রূষা করা, দুই. সে মারা গেলে তার কাফন ও জানাযায় শরীক হওয়া, তিন. একজন অন্যজনকে দাওয়াত করলে তা কবুল করা, চার. একজন অন্যজনের সহিত সাক্ষাতের সময় সালাম করা, পাঁচ. একজন হাঁচি দিয়ে "আলহামদু লিল্লাহ্' বলার পর অন্যজন তার জবাব দেওয়া। অর্থাৎ 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বলা।
ছয়. একজন অন্যজনের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি সর্বাবস্থায় কল্যাণ কামনা করা। (মিশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা ২৬৭)
অপর একখানা হাদীসে হযরত কাতাদা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন : তোমরা নিজ গৃহে প্রবেশের সময় ঘরের লোকজনকে সালাম দিয়ে প্রবেশ কর। আবার ঘর থেকে বের হওয়ার সময় তাদেরকে সালাম দিয়ে বের হও। (যুজাজাতুল মাসাবীহ্, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৮)
ফাতওয়ায়ে আলমগীরী গ্রন্থে আছে, “প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নিজ গৃহে প্রবেশের সময় 'আস্সালামু আলাইকুম' বলে প্রবেশ করা চাই। আর যদি কোন জনশূন্য ঘরে প্রবেশ করে তখন নিম্নোক্ত বাক্যের দ্বারা সালাম করবে। বাক্যটি হলো- السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللهِ الصالحين
۱۲۹. عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ يَزِيدَ أَنَّ النَّبِيُّ ﷺ مَرَّ بِنِسْوَةٍ فَسَلَّمَ عَلَيْهِنَّ -
১২৯. হযরত আসমা বিন্ত ইয়াযীদ (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী মহিলাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি তাদেরকে সালাম দেন।
ফায়দা : আলিমগণ লিখেছেন যে, মহিলাদেরকে সালাম দেওয়ার বিষয়টি প্রিয় নবী -এর ব্যক্তিগত আমল ছিল। কারণ তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিষ্পাপ ও আল্লাহ্ কর্তৃক সংরক্ষিত। তিনি ফিত্নায় পতিত হওয়া থেকে ছিলেন সম্পূর্ণ নিরাপদ। কাজেই প্রিয় নবী ব্যতীত অন্য লোকদের জন্য বিধান হলো গায়রে মুহাররাম মহিলাকে সালাম না দেওয়া উত্তম। অবশ্য কোন মহিলা যদি এমন হয় যে, বয়স বার্ধক্যের সীমানায় পৌঁছে গেছে তাকে সালাম দিতে কোন আপত্তি নেই। আল্লামা ইব্ন আবেদীন (র) শামী গ্রন্থে লিখেছেন যে, "গায়রে মুহাররাম ব্যক্তির জন্য কোন বেগানা মহিলাকে সালাম দেওয়া অনুচিত। তবে ঐ বেগানা মহিলা যদি বৃদ্ধা হন তাহলে তাকে সালাম দেয়া যায়। অনুরূপ যদি কোন বৃদ্ধা হাঁচি দিয়ে 'আল হামদুলিল্লাহ্' বলে তাহলে বৃদ্ধা হওয়ার কারণে তার হাঁচির জবাব দেয়া যায়। পক্ষান্তরে কোন মহিলা যদি বৃদ্ধা না হয় তা হলে তাকে সালাম কিংবা তার হাঁচির জবাব দেয়া যাবে না। (কেননা এখানে ফিত্নায় পতিত হওয়ার আশংকা আছে) তবে মনে মনে হাঁচির জবাব দিতে হবে।"
একখানা হাদীসে হযরত জারীর ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ একদল মহিলার পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় তিনি তাদেরকে সালাম দেন। (মিশকাত, পৃষ্ঠা ৩৯৯)
আল্লামা হালীমী (র) বলেন যে, যেহেতু প্রিয় নবী কোন প্রকার ফিত্নায় পতিত হওয়া থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিলেন, এ কারণে তাঁর জন্য বেগানা মহিলাকে সালাম দেওয়া জায়িয ছিল। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে নিরাপদ থাকার উপর সম্পূর্ণ নিশ্চিত থাকবেন তার জন্যও বেগানা মহিলাকে সালাম দেওয়ার অনুমতি দেওয়া যায়, অন্যথায় তার নীরব থাকাই শ্রেয়। (আউনুল মা'বুদ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫१९)
গ্রন্থকারের এখানে উপরোক্ত হাদীসগুলো উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো সালামের ব্যাপারে প্রিয় নবী -এর আমলী-নীতি তুলে ধরা। অর্থাৎ প্রিয় নবী শিশু কিংবা বৃদ্ধা, পুরুষ কিংবা মহিলা নির্বিশেষে সকলকেই সর্বাগ্রে সালাম দিতেন।
۱۳۰. عَنْ أَنَسٍ قَالَ مَا رَأَيْتُ أَحَدًا كَانَ أَرْحَمَ بِالْعِيَالِ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ وَكَانَ اسْتَرْضَعَ لِابْنِهِ إِبْرَاهِيمَ فِي أَقْصَى الْمَدِينَةِ وَكَانَ زَوْجَهَا قَيْنًا فَيَأْتَيْهِ وَعَلَيْهِ أَثْرُ الْغُبَارِ فَيَلْتَذِمُهُ وَيُقَبِّلُهُ وَيَشُمُّهُ .
১৩০. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ -এর চাইতে সন্তানদের প্রতি অধিক স্নেহপ্রবণ আর কাউকে দেখিনি। তিনি তাঁর দুগ্ধপোষ্য শিশু হযরত ইব্রাহীম (রা)-কে দুধপান করানোর জন্য মদীনার উপকণ্ঠে বসবাসকারিণী জনৈকা ধাত্রীর কাছে দিয়েছিলেন। ধাত্রীর স্বামী ছিলেন একজন কর্মকার। যখন প্রিয় নবী নিজ সন্তানকে দেখার জন্য সেখানে যেতেন তাঁর শরীর ধুলায়িত হয়ে যেত। এ সত্ত্বেও তিনি তাঁকে বুকে জড়িয়ে নিতেন। তাঁকে চুম্বন করতেন এবং নাকের কাছে তুলে সোহাগ করতেন।
۱۳۱. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ أَرْحَمَ النَّاسِ بِالصِبْيَانِ وَكَانَ لَهُ ابْنُ مُسْتَرْضَعُ فِي نَاحِيَةِ الْمَدْنَةِ وَكَانَ ظَبْرهُ قَيْنًا ، وَكَانَ يَأْتِيهِ وَنَحْنُ مَعَهُ وَقَدْ دُحِنَ الْبَيْتُ بِالإِذْخِرِ فَيَشُمُّهُ وَيُقَبِّلُهُ -
১৩১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ শিশুদের প্রতি সর্বাধিক স্নেহপ্রবণ ছিলেন। তাঁর এক দুগ্ধপোষ্য শিশুর জন্য তিনি মদীনার উপকণ্ঠের জনৈকা ধাত্রী ঠিক করেছিলেন। ধাত্রীর স্বামী ছিলেন একজন কর্মকার। প্রিয় নবী নিজ পুত্রকে দেখার জন্য সেখানে যেতেন। তাঁর সঙ্গে আমরাও থাকতাম। ধাত্রীর ঘর ইস্থির ঘাস জ্বালানো ধোঁয়ায় ভরে থাকত। এ সত্ত্বেও তিনি নিজ সন্তানকে কোলে তুলে নিতেন। তাঁকে নাকের কাছে তুলে সোহাগ করতেন এবং চুম্বন করতেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস দুটির বক্তব্য অভিন্ন। গ্রন্থকার আলোচ্য হাদীসদ্বয়কে প্রিয় নবী -এর বিনয় ও নম্রতা অনুচ্ছেদে পেশ করার কারণ হলো, এ দু'টি হাদীসে তাঁর পবিত্র জীবন যাত্রার সরলতা ও অকৃত্রিমতা সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। পাশাপাশি এ কথাও প্রমাণিত হচ্ছে যে, তিনি পরিবারের লোকজন ও সন্তান-সন্ততি বিশেষত শিশুদেরকে গভীরভাবে স্নেহ করতেন। তাঁর পরম নিরহংকারের প্রমাণ এই যে, তিনি নিজের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে দুধ পান করানোর জন্য একজন কর্মকারের মত সাধারণ ব্যক্তির ঘরে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন নি। তাছাড়া সেই কর্মকারের গৃহে বারবার যাতায়াত করা এবং পথিমধ্যে ধুলার কারণে আপাদমস্তক ভরে যাওয়াকে নিজের আত্মমর্যাদা হানিকর বলে মনে করেননি। কর্মকারদের গৃহে স্বাভাবিকভাবেই ধোঁয়া থাকে। প্রিয় নবী এ সত্ত্বেও নিঃসংকোচে তাদের গৃহে প্রবেশ করতেন। তারপর একজন সাধারণ পিতাও যখন ধুলামাখা দেহে সন্তানকে কোলে নিতে দেরি করে সেখানে তিনি এ সব উপেক্ষা করে নিজ সন্তানকে কোলে নিয়ে স্নেহ প্রবণতার পরম উদাহরণ পেশ করলেন। অথচ অহংকারী ও আত্মপূজারী লোকেরা শিশুদের সাথে এভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়া এবং তাদেরকে স্নেহ ও মমতায় জড়িয়ে নেয়াকে নিজেদের মানমর্যাদা হানিকর বলে বোধ করে থাকে।
প্রিয় নবী নিজে যেভাবে শিশুদেরকে আদর-সোহাগ করতেন সেভাবে অন্যদেরকেও তাদের আদর-সোহাগের জন্য উপদেশ দিতেন। হাদীস গ্রন্থগুলোতে এ ধরনের বহু বর্ণনা পাওয়া যায়, যেখানে শিশুদের প্রতি তাঁর সীমাহীন স্নেহ ও মমতার পরিচয় ফুটে উঠেছে। একখানা হাদীসে বলা হয়েছে যে, একদা প্রিয় নবী তাঁর দৌহিত্র হযরত হাসান (রা)-কে গভীরভাবে স্নেহ করছিলেন। এটি দেখে হযরত আকরা ইন্ন হাবিস (রা) নামক এক সাহাবী বলে উঠলেন, আমার তো দশটি সন্তান আছে। অথচ আমি তো কাউকে আদর-সোহাগ করি না। প্রিয় নবী তখন বললেন: যারা মানুষের প্রতি সোহাগ ও মায়া-মমতা করে না তাদের প্রতি আল্লাহ্ পাকও সোহাগ ও মায়া-মমতা করবেন না। (হায়াতুস্ সাহাবা, ২ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৬৯)
হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে অপর একটি সূত্রে বর্ণিত আছে যে, একবার হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-এর কাছে এক মহিলা আসল। মহিলার সঙ্গে দু'টি শিশু ছিল। হযরত আয়েশা (রা) ঐ মহিলাকে তিনটি খেজুর খেতে দিলেন। মহিলাটি তার দু'টি বাচ্চাকে দু'টি খেজুর দিয়ে একটি নিজে খেতে চাইল। এ সময় শিশুরা পুনরায় তার দিকে চোখ তুলে তাকাল। মহিলা খেজুরটিকে দু'টুক্রা করে অর্ধেক করে উভয় বাচ্চাকে দিয়ে দিল। তারপর সে চলে গেল। অতঃপর প্রিয় নবী গৃহে ফিরে আসলে হযরত আয়েশা (রা) এ ঘটনা তাঁকে শোনালেন। তখন প্রিয় নবী ইরশাদ করেন : মহিলাটি (তার সোহাগ ও মমত্ববোধের কারণে) বেহেস্তে প্রবেশ করবে। অর্থাৎ বেহেস্তের উপযুক্ত বিবেচিত হবে। (হায়াতুস্, সাহাবা, ২ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৭০)
۱۳۲. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكَ يَقُولُ مَا رُفِعَ مِنْ بَيْنَ يَدَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَضْلُ شَوَاءٍ قَطُّ وَلَا حُمِلَتْ مَعَهُ طِنْفِسَةٌ .
১৩২. হযরত আনাস ইব্ন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ থেকে কখনো উচ্ছিষ্ট ভুনা মাংস তুলে নেয়া হয়নি এবং তার জন্য কখনো কার্পেট বিছান হয়নি।
ফায়দা: রাসূলুল্লাহ্ একজন বিনয়ী সাধারণ মানুষের মতই মাটিতে বসে আহার করতেন। আহার শেষে তিনি বরতন খুব ভাল করে পরিষ্কার করতেন এবং অহংকারী লোকদের মতো খাবার বরতনে উচ্ছিষ্ট রেখে দিতেন না। খাবার বরতনে যেসব গর্বিত ও অহংকারী লোক কিছু না কিছু উচ্ছিষ্ট রেখে দেয়, তার দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য থাকে স্বীয় ধনাঢ্যতা ও প্রাচুর্য প্রকাশ করা। অর্থাৎ তারা যেনো তাদের ঐ উচ্ছিষ্ট খাবারের প্রতি তার পরিমাপ যা-ই হোক না কোন আদৌ মুখাপেক্ষী নয়। তাদের দৃষ্টিতে আহার্যের কোন কদর ও মর্যাদা নেই। (নাউযুবিল্লাহ্) নবী আকরাম হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা-এর শিক্ষা ও তাঁর জীবন পদ্ধতি এই অর্থহীন অবজ্ঞা লোক-দেখানো প্রাচুর্য থেকে (যা মূলত নিয়ামতের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন) সম্পূর্ণ ভিন্নতর ছিল। তা ছিল বিনয়, বশ্যতা ও আনুগত্যের উপর ভিত্তিশীল। তাঁর শিক্ষা ও পবিত্র জীবন চরিত্র অধ্যয়ন করলে এ সত্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাদেরকে (আহারের পর) আঙুল, বরতন (রেকাবী, প্লেট প্রভৃতি) ভালভাবে পরিষ্কার করে খেতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন, তোমরা কি জানো খাবারের কোন্ লোকমা ও কোন্ অংশের মধ্যে বরকত নিহিত রয়েছে? (মিল্কাত, পৃষ্ঠা ৩৬৩) খাবার খেয়ে রেকাবীতে উচ্ছিষ্ট রেখে দেয়া তা নষ্ট করার নামান্তর ও নিয়ামতের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন স্বরূপ। তাই বরতন ও আঙুলে লেগে থাকা খাবার উত্তমরূপে চেটে খাওয়া উচিত। অবশ্য খাবার যদি বেশি বেঁচে যায় এবং তা নষ্ট করা উদ্দেশ্য না হয়, তবে তা অবশিষ্ট রেখে দিতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু তা এইভাবে অবশিষ্ট রেখে দিবে যা নিজের কিংবা অন্য কারো খেতে ঘৃণা না হয়। এক্ষেত্রে উত্তম পন্থা হচ্ছে, প্রথমেই আহার্য প্রয়োজন মাফিক বরতনে তুলে নিতে হবে। অনুরূপভাবে চামচ বা আঙুলে যে আহার্য লেগে থাকে তাও অবশ্যই চেটে খাওয়া উচিত, যাতে আল্লাহ্ প্রদত্ত এই নিয়ামত নষ্ট না হয়।
অনুরূপ যদি আহার্যের কোনো লোকমা মাটিতে পড়ে যায়, তবে তাও তুলে নিতে হবে। অবশ্য যদি নোংরা ও নাপাক স্থানে না পড়ে। সে ক্ষেত্রে মাটি মিশ্রিত অংশ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট পরিষ্কার অংশ খেতে হবে। এটাই হচ্ছে মহান আল্লাহর দেয়া নিয়ামতের প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন, বিনয় ও আনুগত্যের নিয়ম। এক হাদীসে হযরত জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেন: শয়তান প্রতিটি কাজের সময় তোমাদের কাছে উপস্থিত থাকে এমনকি আহার করার সময়ও। তাই যখন আহার করার সময় লোকমা মাটিতে পড়ে যাবে, তখন তা তুলে নিবে এবং ধুলাবালি পরিষ্কার করে লোকমাটি খাবে। শয়তানের জন্য রেখে দিবে না। অনুরূপভাবে যখন তোমরা আহার শেষ করবে, তখন স্বীয় আঙুলসমূহ পরিষ্কার করবে এবং যে আহার্য তাতে লেগে থাকবে তা চেটে খাবে। কেননা আহার্যের কোন্ অংশে বরকত নিহিত আছে তা তোমাদের জানা নেই। (মিশকাত, পৃষ্ঠা ৩৬৩)
হযরত আনাস ইবন মালিক (রা)-এর উপরোক্ত হাদীস থেকে একথাও জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ মাটিতে বসে খেতেন এবং নিজের জন্য কোনো বিশেষ স্থান বা বিছানা পত্রের ব্যবস্থা করতেন না। যেমনিভাবে অহংকারী ও আত্মপূজারী লোকেরা স্বীয় শানশওকত প্রকাশের জন্য খাবার মজলিসে কার্পেট গালিচা কিংবা টেবিল চেয়ারের বন্দোবস্ত করে থাকে। বরং সরদারে দু'জাহান শাহানশাহে আরব ও আজম সাধারণ মানুষের মত কোনো বিছানা ছাড়াই মাটিতে বসে খানা খেতেন। এতে তার আল্লাহর বান্দাসুলভ বিনয় ও চরম গর্বহীনতাই প্রকাশ পায়। অনুরূপভাবে তিনি আসন করে বসে কিংবা ঠেস দিয়ে কখনো আহার করতেন না। এটাও আত্মগর্বীদের অভ্যাস। এ সম্পর্কে হযরত আবূ জুহায়ফা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, নবী ইরশাদ করেন: আমি আসন করে বসে (কিংবা ঠেস লাগিয়ে) কখনো আহার করি না। (মিশকাত, পৃষ্ঠা-৩৬৩)
হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন্ন আম্র (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্-কে কখনো আসন করে আহার করতে দেখা যায়নি। আর তিনি কখনো তাঁর সঙ্গীদের আগে আগে চলতেন না। (বরং বিনয়বশত তাদের মাঝখানে চলতেন) (মিশকাত, পৃষ্ঠা ২৬৬)
এক হাদীসে নবী বলেন, তোমরা আহার করার সময় জুতা খুলে নাও। কেননা এটা (জুতা খুলে নেয়া) একটি ভাল অভ্যাস। (জামি সগীর, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৮)
যেসব মুসলমান আজকাল ইউরোপের অন্ধ অনুসরণে জুতা পরিধান করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আহার করাকেই ভদ্রতা মনে করে, তাদের চিন্তা করা উচিত যে, হাশরের দিন তারা আল্লাহ্ হাবীব ও উম্মতের সুপারিশকারী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা-এর সামনে কিভাবে উপস্থিত হবে।
এই সব হাদীস থেকে নবী আহার করার সময় কি পরিমাণ বিনয় নম্রতা অবলম্বন করতেন, তা সহজেই অনুমান করা যায়। আল্লাহ্ তা'আলা সকল মুসলমানকে তাঁর সুন্দরতম চরিত্র ও অনুপম আদর্শ অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন!
۱۳۳. عَنْ أَبِي مَسْعُودٍ قَالَ أَتَى النَّبِيَّ رَجُلٌ يُكَلِّمُهُ فَأُرْعِدَ فَقَالَ عَلَيْكَ فَلَسْتُ بِمَلِكَ، إِنَّمَا أَنَا ابْنُ امْرَأَةٍ مِنْ قُرَيْشٍ كَانَتْ تَأْكُلُ الْقَدِيدَ
১৩৩. হযরত আবূ מסעוד (রা) বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি নবী-এর নিকট কিছু কথা বলার জন্য এলো। কিন্তু সে তাঁর ভয়ে কাঁপতে লাগল। তিনি বললেন : ভয় করো না। আমি তো তোমার বাদশাহ নই (যে, আমাকে দেখে তুমি ভয় করবে)। বরং আমি হচ্ছি কুরায়শ বংশের এমন এক মহিলার সন্তান যিনি (সাধারণ মেয়েদের মত) শুকানো গোশত ভক্ষণ করতেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকেও নবী-এর বিনয়, নম্রতা ও আত্মগর্বহীনতা প্রকাশ পায়। এটা স্পষ্ট যে, তিনি একদিকে ছিলেন সমস্ত নবী ও রাসূলদের সরদার এবং অপরদিকে ছিলেন সমগ্র আরব-আজমের নেতা ও দু'জাহানের পথপ্রদর্শক। প্রতিটি ব্যক্তিকেই তাঁর মাহাত্ম্য, মহিমা ও প্রভাবে প্রভাবান্বিত হওয়া ছিল অবশ্যম্ভাবী। যখনই কোনো আগন্তুক তাঁর সামনে আসতো, তার ভয় ও প্রভাবের দরুন তার মধ্যে কম্পন শুরু হয়ে যেত। কিন্তু তাঁর স্বভাবগত বিনয় ও সরলতার অবস্থা ছিল এরূপ যে, তিনি তার সাথে অত্যন্ত নম্রতা ও বিনয় অবলম্বন করতেন। কেউ যদি ভয় পেতো, তবে তিনি তাকে সান্ত্বনা দিতেন এবং কথায় ও কাজে প্রকাশ করতেন। তার প্রতি দয়া ও সহানুভূতি প্রদর্শন করতেন।
134 عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ وَأَبِي ذَرٍ قَالَا كَانَ النَّبِيُّ يَجْلِسُ بَيْنَ ظَهَرَانِي أَصْحَابِهِ، فَيَجِيْبُ الْغَرِيبُ وَلَايَدْرِي أَيُّهُمْ هُوَ حَتَّى يَسْأَلَ، فَطَلَبْنَا إِلَى النَّبِيِّ الاَنْ نَجْعَلَ لَهُ مَجْلِسًا يَعْرِفُهُ الْغَرِيبُ إِذَا أَتَاهُ، فَبَنَيْنَا لَهُ دَكَأَنَا مِنْ طِينٍ فَكَانَ يَجْلِسُ عَلَيْهِ وَتَجْلِسُ بِجَانِبَيْهِ -
১৩৪. হযরত আবূ হুরায়রা ও হযরত আবূ যার (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী তাঁর সাহাবীদের মাঝখানে সাধারণ মানুষের মতো উপবেশন করতেন। কোনো আগন্তুক আগমন করলে বুঝতে পারতো না যে, তাদের মধ্যে তিনি (রাসূলুল্লাহ্) কোন্ জন যে পর্যন্ত সে জিজ্ঞেস না করতো। তাই আমরা (সাহাবীগণ) নবী-এর জন্য এমন একটি আসন তৈরির অনুমতি প্রার্থনা করলাম, যার উপর উপবেশন করলে তাঁকে আগন্তুকরা সহজেই চিনতে পারে। (বর্ণনাকারী বর্ণনা করেন) অতঃপর আমরা (তাঁর অনুমতি নিয়ে) তাঁর জন্য একটি মাটির চত্বর তৈরি করলাম। তিনি তার উপর আসন গ্রহণ করতেন এবং আমরা তাঁর উভয় দিকে (আশপাশে) বসতাম।
ফায়দা : এ হাদীস থেকেও রাসূলুল্লাহ্-এর স্বভাবগত সরলতা ও প্রকৃতিগত বিনয়-প্রিয়তার পরাকাষ্ঠা প্রকাশিত হয়। তিনি সাহাবাদের মাঝে নিরহংকারভাবে উপবেশন করতেন। যেরূপ সাধারণ বন্ধু-বান্ধবরা একসাথে মিশে বসে থাকে। আমীর-উমারা ও রাজা-বাদশাহদের মত তাঁর বসার জন্য কোনো কুরসী ছিল না; কোনো সিংহাসন, কার্পেট-গালিচা ও শাহী দরবারও ছিল না। সেখানে কোনো শাহী আড়ম্বর, দাসদাসীর করজোড় সারি, স্তাবক ও গুণগায়কদের তোশামোদ-খোশামোদও ছিল না—যাতে তাঁর স্বতন্ত্র মর্যাদা প্রকাশ পেতে পারে। কেননা এসব বিষয় ছিল তাঁর প্রকৃতিগত বিনয়ের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তিনি এসব আদৌ পছন্দ করতেন না। কিন্তু যখন বাইরের নতুন নতুন প্রতিনিধি দলের আগমন বেড়ে গেলো এবং দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তাঁর সাক্ষাৎ ও বায়আত গ্রহণের জন্য আসতে লাগলো, তখন সাহাবাগণ এ অনিবার্য প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে তাঁর বসার জন্য একটি স্বতন্ত্র আসন তৈরির আবেদন করলেন এবং তিনিও অপরিহার্যতা লক্ষ করে মাটির একটি আসন তৈরির অনুমতি দেন।
١٣٥ عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ كُلِّ جَعَلَنِي اللَّهُ فِدَاكَ مُتَّكِنًا فَإِنَّهُ أَهْوَنَ عَلَيْكَ، قَالَتْ فَأَصْغَى بِرَأْسِهِ حَتَّى كَادَ أَنْ تُصِيبَ جَبْهَتُهُ الْأَرْضَ ثُمَّ قَالَ لَا بَلْ أَكُلُ كَمَا يَأْكُلُ الْعَبْدُ وَاجْلِسُ كَمَا يَجْلِسُ الْعَبْدُ .
১৩৫. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! (আল্লাহ্ আমাকে আপনার জন্য কুরবান করে দিন) আপনি ঠেস দিয়ে বসে আহার করুন। তাতে আপনি আরাম অনুভব করবেন। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, একথা শুনে তিনি তাঁর শির মুবারক এতই নিচু করলেন যে, তাঁর কপাল মাটি স্পর্শ করার উপক্রম হলো। তারপর তিনি বললেন: না, বরং আমি একজন সাধারণ গোলামের মতো আহার করবো এবং একজন সাধারণ লোকের মতো বসবো।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, দু'জাহানের সরদার, রাব্বুল আলামীনের প্রিয়তম বন্ধু হযরত মুহাম্মদ কোনো অবস্থাতেই সরলতা ও বিনয় ত্যাগ করা পছন্দ করেন নি। খাবার জন্য বসার ক্ষেত্রে তো তিনি বিশেষভাবেই বিনয় অবলম্বন করতেন। তিনি কখনো আসন করে বসে কিংবা হেলান দিয়ে আহার করেন নি। হযরত আয়েশা (রা) যখন ভালবাসা ও সহানুভূতিবশত নবী-কে একটু আরামের সাথে বসে খাবার খেতে অনুরোধ করলেন, বরং তখন তিনি তাঁর অনুরোধ ও অবস্থানের উল্টো দাসত্ব প্রকাশের জন্য আরো যমীনের উপর ঝুঁকে গেলেন এবং মুখেও বিনয় প্রকাশ করলেন।
আলিমগণ বলেন, ঠেস কিংবা হেলান দিয়ে খানা খাওয়ার চারটি অবস্থা হতে পারে। চারটি অবস্থাই এই হাদীসের আওতায় এসে যাচ্ছে। (১) ডান বা বামে কোনো তাকিয়া বা পাঁচিল প্রভৃতির উপর ভর করা। (২) হাতের তালু মাটির উপর রেখে তার উপর ভর করা। (৩) কোনো পাঁচিল বা তাকিয়ার সাথে কোমর লাগিয়ে সাহায্য নেয়া। (৪) গদি কিংবা কার্পেট প্রভৃতির উপর আসন করে বসে আহার করা। এই চারটি অবস্থাই সুন্নতের খেলাফ।