📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বদান্যতা সম্পর্কিত হাদীসসমূহ
۸۱ عَنْ عُمَرَ بْنِ عَبْدِ اللهِ مَوْلَى غَفَرَةَ حَدَّثَنِي إِبْرَاهِيمُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ الْحَنَفِيَّةِ مِنْ وَلَدٍ عَلِيِّ قَالَ كَانَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ إِذَا نَعَتَ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ أَجْوَدَ النَّاسِ كَفَّا وَأَكْرَمَهُمْ عِشْرَةً مَنْ خَالَطَهُ فَعَرَفَهُ أَحَبَّهُ -
৮১. গাফারার আযাদকৃত গোলাম হযরত উমর ইব্ন আবদুল্লাহ্ (র) বলেন, হযরত আলী (রা)-এর বংশধর ইব্রাহীম ইন মুহাম্মদ ইব্ন হানাফিয়্যা (র) আমাকে বলেছেনঃ হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) যখনই রাসূলুল্লাহ্ -এর গুণাবলি বর্ণনা করতেন, তখন বলতেন, রাসূলুল্লাহ্ সবচেয়ে দানশীল ও উদারহস্ত ছিলেন এবং তিনি ছিলেন সবচেয়ে অধিক সুসম্পর্ক রক্ষাকারী। তাই যে কেউ তাঁর সাথে মেলামেশা করতো এবং তাঁর চরিত্র সম্পর্কে অবহিত হতো, সেই তাঁকে অত্যধিক ভালবাসতো।
ফায়দা: নবী সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদার ছিলেন। বদান্যতা ছিল তাঁর স্বভাবগত আল্লাহ্ প্রদত্ত গুণ। তিনি কখনো কোনো প্রার্থনার জবাবে 'না' বলেননি। কোনো প্রার্থনাকারীকে শূন্যহাতে ফিরিয়ে দেননি। দানও করতেন এমন পরিমাণ যে, স্বয়ং প্রার্থনাকারীও তাজ্জব মনে করতো। কখনো কোনো প্রার্থনাকারীকে দেওয়ার জন্য যদি তাঁর কাছে কিছু না থাকতো, তবে তিনি পরে তাকে দেওয়ার ওয়াদা করতেন এবং সে ওয়াদা তিনি পূর্ণ করতেন। কখনো কখনো অন্যের নিকট থেকে ঋণ নিয়ে দান করতেন। মেলামেশা ও সামাজিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও তাঁর পবিত্র জীবন ছিল সর্বাধিক সমুন্নত। সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলতেন। ছোট-বড়োর শিষ্টাচারের প্রতি লক্ষ্য রাখতেন। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন এবং সকল প্রতিবেশী ও সাক্ষাৎ প্রার্থীর সাথে তিনি বিনম্র ব্যবহার করতেন। তাঁর এই মহান অনুপম চরিত্র দেখেই লোকেরা তাঁর ভক্ত হয়ে গিয়েছিলো। তাঁকে সকলে অপরিসীম ভালবাসতো। তিনি প্রত্যেকের সাথে যথাযোগ্য সুব্যবহার করতেন। কাউকে কোনো প্রকার কষ্ট দিতেন না। সর্বদা সদ্ব্যবহার, সুবিচার, বিনয়-নম্রতা, সত্য কথা, প্রতিশ্রুতি পালন, শিশু ও ছোটদের প্রতি মমতা প্রদর্শন ছিল তাঁর উন্নত চরিত্রের নিদর্শন। সুতরাং যে ব্যক্তিই তাঁর সাহচর্য কয়েক মুহূর্তও লাভ করতো, সে-ই তাঁকে অত্যন্ত ভালবাসতে শুরু করতো। এক হাদীসে আছে, নবী বলেছেন: দানশীল ব্যক্তি আল্লাহ্রও নিকটবর্তী, জান্নাতেরও নিকটবর্তী, লোকজনেরও নিকটবর্তী (আর জাহান্নামের) আগুন থেকে দূরবর্তী। পক্ষান্তরে কৃপণ ব্যক্তি আল্লাহর রহমত থেকেও দূরবর্তী, জান্নাত থেকেও দূরবর্তী, লোকজন থেকেও দূরবর্তী (এবং জাহান্নামের) আগুনের নিকটবর্তী। তিনি আরো বলেন, আল্লাহর নিকট একজন মূর্খ দানশীল ব্যক্তি একজন কৃপণ শিক্ষিত ব্যক্তি অপেক্ষা অনেক উত্তম (তিরমিযী শরীফ)। সুবহানাল্লাহ্! দানশীলতা আল্লাহ্ও খুব প্রিয়। কেননা, তিনি নিজেই খুব দয়ালু ও দানশীল। তাই তাঁর সুন্দর নামসমূহের মধ্যে 'দয়ালু' (كَرِيْم) ও দানশীল (جواد)-ও উল্লিখিত হয়েছে। আল্লাহ যেমন অপরিসীম দানশীল ও পরম দয়ালু তেমনি তাঁর প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা ﷺ বদান্যতা ও দানশীলতার ক্ষেত্রে সকল মানুষের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চতম স্থানের অধিকারী। তাঁর দানশীলতা সম্পর্কিত হাদীসগুলো সামনে বিবৃত হবে। এই হাদীসগুলো দ্বারাই তাঁর বদান্যতা ও দানশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়।
عَنِ ابْنِ عَمْرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَجُودَ وَلَا أَنْجَدَ وَلَا أَشْجَعَ وَلَا أَرْضَى مِنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ -
৮২. হযরত ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ ﷺ অপেক্ষা অধিক দানশীল ও দাতা, অধিক সাহসী, বড় বীর, অধিক ধৈর্যশীল ও পরিতুষ্ট কোনো ব্যক্তিকে দেখিনি।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, যেখানে নবী ﷺ সকল মানুষের মধ্যে সবচেয়ে অধিক দানশীল ও দাতা ছিলেন, সেখানে তিনি সবচেয়ে অধিক সাহসী বীর, ধৈর্যশীল ও অল্পে তুষ্টও ছিলেন। তাঁর যুদ্ধ বিগ্রহ থেকেই তা প্রমাণিত হতে পারে কত বড় বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, যাতে তাঁকে হাজারো বিপদ-আপদ, নানাবিধ দুঃখকষ্ট ভোগ করতে হয়েছে, পবিত্র মুখমণ্ডল যখমী হয়েছে, দান্দান মুবারক শহীদ হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনো হতোদ্যম ও সাহসহীনতার প্রমাণ দেননি। বরং সর্বদা দৃঢ়তা, সাহসিকতা ও বীরত্বের সাথে তার মুকাবিলা করেছেন। তাঁর দৃঢ়সংকল্প ও ধৈর্যের মধ্যে কোন তারতম্য ঘটেনি। তাঁর পবিত্র জীবনের সূচনাই হয়েছে দৃঢ় সংকল্প ও ধৈর্য-সহ্যের মধ্য দিয়ে। আরবের মূর্খ ও বিদ্বেষপরায়ণ মুশরিকদের মধ্যে যারা কখনো তাদের পিতৃপুরুষদের অন্ধ অনুসরণ ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিল না, যারা শত শত বছর থেকে মূর্তি পূজা করে আসছিল, তিনি একাকী দাঁড়িয়ে তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দেন। তখন তাঁর কোনো সঙ্গী ও সাহায্যকারী ছিলো না। তিনি আল্লাহ্ উপর ভরসা রেখে দৃঢ় সংকল্প ও সাহসিকতার সাথে মুশরিক ও কাফিরদেরকে দীন ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। আরবের শিশুরা পর্যন্ত তাঁর বিরোধিতা করতো। মক্কার কাফিররা তাঁকে দুঃখ-কষ্ট দিতো। দুষ্ট বালকেরা তাঁকে পাথর মারতো। তিনি রক্তে রঞ্জিত হতেন। কিন্তু এতসত্ত্বেও তিনি সাহস হারাতেন না। বরং অনমনীয়তার সাথে তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিতেন। শেষে এমন একদিন এলো, যখন আরবের প্রতিটি গৃহে তাওহীদের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হলো এবং তাদের শিশুরা পর্যন্ত তাঁর ভক্ত ও প্রেমিক হয়ে পড়লো। তিনি সমগ্র আরব ও অনারবের বন্ধু হয়ে গেলেন।
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَجْوَدَ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ حِيْنَ يَلْقَاهُ جِبْرَئِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ -
৮৩. হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ লোকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল ছিলেন। বিশেষত রমযানের মাসে তাঁর দানশীলতার মাত্রা অত্যধিক বেড়ে যেতো, যখন হযরত জিব্রাঈল (আ) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য আগমন করতেন।
ফায়দা: এখানে গ্রন্থকার পুরো হাদীসটি উদ্ধৃত করেননি। বরং নবী-এর দানশীলতার সাথে সম্পর্কিত অংশটুকু উদ্ধৃত করেছেন। এ হাদীস সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে সবিস্তার বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, নবী লোকদের মধ্যে সর্বাধিক দানশীল ও দাতা ছিলেন। আর রমযান মাসে যখন হযরত জিব্রাঈল (আ) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য আগমন করতেন, তখন তাঁর দানশীলতা অন্যান্য সময় অপেক্ষা অনেক গুণ বেড়ে যেতো। তখন তিনি অত্যধিক মাত্রায় দান-খয়রাত করতেন। জিব্রাঈল (আ) রমযান মাসে প্রতিদিন তাঁর নিকট আগমন করতেন এবং কুরআন শরীফের শুনানি করতেন। ঐ সময় তিনি ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন বায়ুর চেয়েও অধিক দান-খয়রাত করতেন। অর্থাৎ নবী রমযান মাসে দান-খয়রাতের পরিমাণ এতই বৃদ্ধি করতেন যে, বর্ণনাকারী তাঁর দান-খয়রাতের আধিক্যকে ঝড়ো হওয়ার গতিবেগের সাথে তুলনা করেছেন। রমযান মাসে নবী-এর অধিক দান-খয়রাত করার কারণ হচ্ছে, ঐ পবিত্র মাসে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাদের উপর অপরিসীম দয়া ও কৃপা করে থাকেন। তাঁর রিযিক তাদের উপর অবারিত করে দেন। রোযাদারদের সকল কর্মকাণ্ডের বিনিময় এই পবিত্র মাসের কারণে দশগুণ থেকে সত্তর গুণ পর্যন্ত বেশি প্রদান করেন। এ মাসে একবার কুরআন খতম করলে সত্তরবার কুরআন খতম করার সওয়াব পাওয়া যায়। এক রাকআত নফল সালাত পড়ার সওয়াব সত্তর রাকআত পড়ার সমান হয়। এক পয়সা ব্যয় করার সওয়াব সত্তর পয়সা ব্যয় করার সমান হয়। এ ছাড়া আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর অসীম কৃপায় রোযাদার বান্দাদের পেছনের সমস্ত গুনাহ্ও মাফ করে দেন। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রমযান মাসের শেষ রাতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রোযাদার বান্দাদের ক্ষমা ঘোষণা করেন। তাই আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা ও আল্লাহ্ এই দানশীলতার গুণটি রপ্ত করতেন এবং অন্যদেরকেও রপ্ত করার নির্দেশ দিতেন। বর্ণিত আছে )تَخَلَّفُوْا بِأَخْلَاقِ اللَّهِ( )তোমরা আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হও)। তাই আল্লাহ্ গুণাবলি নিজের মধ্যে সৃষ্টি করা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনার প্রমাণ। আল্লাহ্ আমাদেরকে তাঁর প্রদর্শিত পথে সঠিকভাবে চলার তাওফীক দান করুন।
٨٤ عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَجُلاً أَتَى النَّبِيُّ ﷺ فَسَأَلَهُ فَأَعْطَاهُ غَنَمًا بَيْنَ جَبَلَيْنَ فَأَتَى الرَّجُلُ قَوْمَهُ ، فَقَالَ أَسْلِمُوا فَإِنَّ مُحَمَّدًا يُعْطِى عَطَاء رَجُلٍ مَا يَخَافُ فَاقَةً .
৮৪. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত যে, জনৈক ব্যক্তি নবী -এর নিকট এসে (আর্থিক সাহায্য) প্রার্থনা করলো। তিনি তাকে দুই পাহাড়ের মধ্যকার সব বকরী দান করলেন। তখন ঐ ব্যক্তি তার গোত্রের মধ্যে এসে বললো, হে লোক সকল! তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো। কেননা, মুহাম্মদ সেই ব্যক্তির ন্যায় দান করে থাকেন, যার দারিদ্রের কোনো আশংকা নাই।
ফায়দা : এই রিওয়ায়াতটিই মিশকাত শরীফে হযরত আনাস (রা) থেকে এই ভাষায় বর্ণিত হয়েছে : জনৈক ব্যক্তি নবী -এর নিকট দুই পাহাড় সমান ছাগ প্রার্থনা করলো। তিনি তা তাকে দান করলেন। তখন ঐ ব্যক্তি তার গোত্রে এসে বললো, হে আমার গোত্র! তোমরা সবাই মুসলমান হয়ে যাও। আল্লাহ্র কসম! মুহাম্মদ এতই দান করেন যে, নিজে দরিদ্র হয়ে যাওয়ারও ভয় করেন না।
শামায়েলে তিরমিযীতে হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ্ কখনো কোনো বন্ধু (ভবিষ্যতের জন্য) সঞ্চয় করে রাখতেন না। (বরং তৎক্ষণাৎ সাহাবাদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন)।
এই হাদীসগুলো থেকেই নবী -এর বদান্যতা ও দানশীলতা সম্পর্কে অনুমান করা যায়। কেননা যে যত চাইত তিনি তাকে তা দান করতেন। কখনো প্রার্থনাকারীকে তাঁর নামে ঋণ নিয়ে প্রয়োজন মিটানোর অনুমতি দিতেন। যেমন সামনের হাদীসসমূহে বিধৃত হয়েছে। নবী -এর এই বদান্যতার পরাকাষ্ঠা ও আল্লাহ্র উপর পূর্ণ ভরসায় বিস্মিত হয়ে ঐ প্রার্থনাকারী তার গোত্রকেও ঈমান ও ইসলামের দাওয়াত দেয় এবং নিজেও ঈমান আনে।
এক হাদীসে হযরত ইবন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত আছে, নবী বলেন : ঈর্ষা কেবল দুই ব্যক্তির উপর হতে পারে। এক. সেই ব্যক্তি—যাকে আল্লাহ্ তা'আলা ধন-সম্পদও দিয়েছেন এবং তাকে ঐ সম্পদ আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করারও তাওফীক দিয়েছেন। দুই. সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ্ তা'আলা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা দান করেছেন এবং সে তা দ্বারা নিজেও পরিচালিত হয় এবং অপরকেও তা শিক্ষা দেয়। (রিয়াদুস্-সালিহীন)
অন্য এক হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, নবী বলেছেন : প্রত্যহ সকাল বেলা যখন আল্লাহ্র বান্দা নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয়, তখন তার সাথে দু'জন ফিরিশতাও আসমান থেকে অবতরণ করেন। তাদের একজন বলেন, হে আল্লাহ্! ব্যয়কারী, দানশীল ও দাতা ব্যক্তিকে তার বিনিময় দান করো। দ্বিতীয় ফিরিস্তা বলেন, হে আল্লাহ্! বখীল ও কৃপণ ব্যক্তির সম্পদে তুমি ধস নামাও। (বুখারী ও মুসলিম)
অপর এক হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। নবী বলেন : আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন : হে আদাম সন্তান! তুমি আল্লাহ্র সৃষ্টির জন্য ধন-সম্পদ ব্যয় করো, তোমার জন্যও আল্লাহর পক্ষ থেকে ব্যয় করা হবে। (রিয়াদুস্-সালিহীন)।
٨٥ عَنْ عُمَرَ بْنِ عَبْدِ اللهِ مَوْلَى غَفْرَةَ حَدَّثَنِي إِبْرَاهِيمَ ابْنُ مُحَمَّدٍ مِنْ وُلِدَ عَلِيِّ قَالَ كَانَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ إِذَا وَصَفَ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ كَانَ أَجْوَدَ النَّاسِ كَفَّا وَأَجْرَأَ النَّاسِ صَدْرًا وَأَصْدَقَ النَّاسِ لِهْجَةً وَأَوفَاهُمْ بِذِمَّةٍ، وَأَلْيَنَهُمْ عَرِيكَةً وَاكَرَمَهُمْ عِشْرَةً، مَنْ رَاهُ بَدِيهَةً هَابَهُ، وَمَنْ خَالَطَهُ فَعَرَفَهُ أَحَبَّهُ لَمْ أَرَ قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ مِثْلَهُ -
৮৫. হযরত গাফারা (রা) এর মাওলা (আযাদকৃত গোলাম) উমর ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার কাছে ইব্রাহীম ইন মুহাম্মদ (যিনি হযরত আলী (রা)-এর বংশধর) হাদীস বর্ণনা করেন যে, হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) যখন নবী-এর (সুন্দরতম) গুণাবলি বর্ণনা করতেন, তখন বলতেন যে, তিনি সবচেয়ে উদার হস্ত, সবচেয়ে সাহসী-হৃদয়, সবচেয়ে সত্যভাষী, সবচেয়ে ওয়াদা পালনকারী, সবচেয়ে নম্র-স্বভাব এবং সবচেয়ে ভদ্র জীবন যাপনকারী ছিলেন। যে ব্যক্তি হঠাৎ তাঁকে দেখত তার মনে ভীতির সঞ্চার হতো এবং যে ব্যক্তি তাঁর সাহচর্য লাভ করতো ও তাঁর অতুলনীয় স্বভাব সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হতো, সে তাঁকে ভালবাসতে শুরু করতো। আমি তাঁর পূর্বে কখনো তাঁর মতো (সর্বগুণে গুণান্বিত) মানুষ দেখিনি এবং তার পরেও দেখিনি।
ফায়দা : হযরত আলী (রা)-এর এ হাদীস পূর্বের একটি হাদীসের আওতায় বর্ণিত হয়েছে। এখানে হাদীসের কিছু কথা পূর্বোক্ত হাদীস অপেক্ষা বেশি বর্ণিত হয়েছে, যা নবী -এর মহৎ গুণাবলি ও উন্নত চরিত্রাবলি ব্যাখ্যা করছে। এসব অনুপম গুণ ও চরিত্রাবলি আয়ত্ত করা আমাদের প্রাথমিক কর্তব্য। নবী-এর পূর্ণ আনুগত্যের মূল কথাই হচ্ছে তাঁর সুমহান গুণাবলি ও সমুন্নত চরিত্রাবলিকে নিজের মধ্যে সৃষ্টি করা, তাঁর পবিত্র জীবন ও প্রশংসিত চরিত্র অনুসরণ করা। আল্লাহ্ পাক আমাদের সবাইকে পূর্ণভাবে তাঁর পদাংক অনুসরণ করার এবং তাঁর সর্বাঙ্গীণ অনুগত ও অনুসারী হওয়ার এবং তাঁর গুণাবলি ও সুন্দরতম চরিত্রাবলি নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি করার তাওফীক দান করুন।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِى اللهُ عَنْهُ قَالَ لَمْ يُسْئَلُ رَسُولُ اللهِ ﷺ شَيْئًا قَطُّ عَلَى الْإِسْلَامِ إِلَّا أَعْطَاهُ وَإِنَّ رَجُلاً أَتَاهُ فَسَأَلَهُ فَأَعْطَاهُ غَنَمًا بَيْنَ جَبَلَيْنِ فَرَجَعَ إِلَى قَوْمِهِ فَقَالَ أَسْلِمُوا فَإِنَّ مُحَمَّدًا يُعْطِي عَطَاءُ مَا يَخْشَى فِيْهِ الْفَاقَةً -
৮৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ এর নিকট ইসলামের নামে যখনই কোনো বস্তু চাওয়া হয়েছে, তিনি তা অবশ্যই প্রদান করেছেন। একবার এক ব্যক্তি এসে তাঁর নিকট প্রার্থনা করলো। তিনি তাকে ছাগলের একটি পূর্ণ পালই প্রদান করলেন, যা দুই পাহাড়ের মাঝখানে ছড়িয়ে ছিল। তারপর ঐ ব্যক্তি তাঁর গোত্রের মধ্যে ফিরে গিয়ে বললো, (হে আমার গোত্র) তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো। কেননা মুহাম্মদ এমনভাবে দান করেন যে, তারপর দারিদ্র্যের কোনো আশংকাই থাকে না।
ফায়দা : এ হাদীসটিও সামান্য পরিবর্তনসহ ইতিপূর্বে একটি হাদীসের আওতায় বর্ণিত হয়েছে। এ হাদীস থেকে নবী-এর পরম দানশীলতা অনুমান করুন। তিনি কতবড় দানশীল ও দাতা ছিলেন তা এর দ্বারাই পরিমাপ করা যায়। নবী-এর দান ও বশিশের এই অবস্থা ছিল সর্বব্যাপী। যে কেউ তাঁর দরবারে ইসলামের নামে আঁচল পেতে দিতো, যে তার প্রার্থিত বস্তু দ্বারা আঁচল পূর্ণ করে ফিরে যেতো এবং সাথে সাথে তাঁর ঔদার্য ও আল্লাহ্র উপর পূর্ণ ভরসা দেখে তার ঈমান আরো মযবুত হয়ে যেতো। সে তার কাওম ও গোত্রকে এরূপ মূর্তিমান দানশীল ও উদার নবীর দীন কবুল করার উপদেশ দিতো। সত্য বলতে কি, দুনিয়ায় চারিত্রিক শক্তি এমন কিছু করে দেখতে পারে যা সামরিক শক্তি কখনো দেখতে পারে না। চরিত্রই হচ্ছে সেই হাতিয়ার যা দ্বারা চরম ঔদ্ধত্য ও বিদ্রোহী অন্তর বশ করা যায়। একথা মোটেই সত্য নয় যে, তলোয়ার দ্বারা ইসলাম দুনিয়ায় বিস্তার লাভ করেছে। বরং ইসলাম সত্য নবীর (আমার মাতা-पिता তাঁর জন্য উৎসর্গিত হোক) সুমহান চরিত্র ও সমুন্নত গুণাবলির আধ্যাত্মিক শক্তি দ্বারা বিশ্ব-ধর্মে পরিণত হয়েছে, যার বহু জীবন্ত উদাহরণ ইসলামের ইতিহাসে বিধৃত আছে।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّ النَّبِيُّ كَانَ لَا يُسْئَلُ شَيْئًا إِلَّا أَعْطَاهُ
৮৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী-এর নিকট যে বস্তুই প্রার্থনা করা হতো, তিনি তা দান করতেন।
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ مَا سُئِلَ رَسُولُ اللهِ ﷺ شَيْئًا قَطُّ قَالَ لَا -
৮৮. হযরত জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ -এর কাছে কিছু চাওয়া হয়েছে এবং তিনি তা দেননি-এরূপ কখনো হয়নি।
. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ لَا يَقُولُ لِشَيْ يُسْأَلُ لا -
৮৯. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী-এর নিকট কোনো কিছু চাওয়া হলে তিনি 'না' বলতেন না।
فَمَنَعَهُ عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ مَاسُئِلَ النَّبِيُّ شَيْئًا قَطُّ
৯০. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর নিকট কোনো বস্তু প্রার্থনা করা হয়েছে এবং তিনি তা নিষেধ করেছেন এরূপ কখনো হয়নি।
ফায়দা: উপরোক্ত চারটি হাদীসের বিষয়বস্তু একই। এগুলো থেকে বোঝা যায় যে, প্রার্থনাকারীর প্রার্থনা ও অভাবগ্রস্তের অভাব পূরণ করা ছিল নবী -এর প্রকৃতি ও স্বভাবের অন্তর্গত। তিনি কাউকে শূন্য হাতে ও নিরাশ করে ফিরিয়ে দেননি। কখনো মুখে 'না' শব্দ উচ্চারণ করেননি। তাঁর এই গুণের কথাই এক আরব কবি এভাবে উল্লেখ করেছেন-
مَا قَالَ لا قَطُّ إِلا فِي تَشَهُدِهِ + لَوْلاَ التَّشَهُدُ كَانَتْ لَاؤُهُ نَعَمْ -
"কালিমা শাহাদত ছাড়া তিনি কখনো 'লা' (না) বলেননি। কালিমা শাহাদত যদি না হতো তবে তাঁর 'লা' (না)-ও নাআম (হ্যাঁ) হয়ে যেত।" এই মর্মই ফারসী কবি নিম্নোক্ত চরণে ব্যক্ত করেছেন:
نزفت لا بزبان مباركش هركز + مكربه اشهد ان لا اله الا الله
"তাঁর যবান মুবারকে কখনো 'না' শব্দ উচ্চারিত হয়নি। যদি হয়ে থাকে, তবে তা হয়েছে কালিমা শাহাদত "أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ" -এর মধ্যে।"
নবী -এর বদান্যতার ক্ষেত্রে পরিমাণের কোনো প্রশ্ন ছিল না। তিনি ছোট-বড় সব চাওয়া পূরণ করতেন। যেমন পূর্বোক্ত এক হাদীস থেকে জানা যায় যে, জনৈক ব্যক্তি যখন দুই পাহাড়ের উপত্যকাপূর্ণ বক্রীর পাল প্রার্থনা করলো, তখন তিনি তাও দান করে দেন। তাঁর কাছে যদি এর চেয়েও বেশি চাওয়া হতো, তবে তিনি তাও দিয়ে দিতেন। নবী -এর এই বদান্যতা তো ছিল কেউ কিছু প্রার্থনা করার সময়। কিন্তু তাঁর নিকট যখন কোথাও থেকে কোনো সম্পদ আসতো, তখন তিনি প্রার্থনা ছাড়াই পাওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তিকে ডেকে ডেকে প্রদান করতেন। তিনি কখনো সম্পদ সঞ্চয় করে রাখতেন না। বরং সত্বর তা বণ্টন করে দিতেন। হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, একবার নবী -এর নিকট বাহরাইন থেকে বেশ কিছু মালপত্র এলো। তিনি বললেন, ওগুলো মসজিদের আঙ্গিনায় বিছিয়ে দাও। এর পূর্বে এত সম্পদ তাঁর নিকট কখনো আসেনি। (বুখারী)
তিনি এই সমুদয় সম্পদ সাহাবাদের মধ্যে বিতরণ করলেন। বিতরণের পর তাঁর নিকট একটি দিরহামও অবশিষ্ট ছিল না। দানশীলতা ছিল নবী -এর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু এবং কৃপণতা ছিল সবচেয়ে ঘৃণ্য ব্যাপার। এক হাদীসে হযরত ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন, আমি নবী -কে বলতে শুনেছি, বদান্যতা আল্লাহ্ তা'আলার সবচেয়ে বড় সৃষ্টি। (তারগীব ও তারহীব)।
হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, নবী বলেছেন: জান্নাতে এমন একটি ঘর আছে, যার নাম 'বায়তুস্ সাখা' দান-নিকেতন (তারগীব)। কৃপণতার অপনিন্দায় নবী -এর বহু হাদীস বর্ণিত রয়েছে। এক হাদীসে হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, নবী বলেছেন: জুলুম থেকে আত্মরক্ষা করো, কেননা জুলুম কিয়ামতের দিন ঘনঘোর অন্ধকাররূপে আত্মপ্রকাশ করবে। আর কৃপণতা থেকে দূরে থাকো, কেননা কৃপণতাই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ধ্বংস করেছে। তাদেরকে রক্তারক্তি করতে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং হারামকে হালাল করতে তাদেরকে উৎসাহ যুগিয়েছে (রিয়াদুস্-সালিহীন)। বস্তুত কৃপণতা এমন এক কুঅভ্যাস ও ধ্বংসাত্মক হীন কাজ, যা সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রকে কলুষিত করে। কৃপণের কারণেই সমাজে ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়। পরস্পরে অনৈক্য ও মনোমালিন্য দেখা দেয়। গোটা সমাজ বিপর্যস্ত হয়। কৃপণতার কারণেই গরীব, মিস্কীন, ভিক্ষুক, অভাবগ্রস্ত, অসহায় ও বেকার লোকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। আর এভাবে গোটা জাতির অবস্থা মন্দ থেকে মন্দতর হতে থাকে। তাছাড়া সাহায্য-সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার দরুন এই লোকগুলোই সমাজে অপরাধ ও বিপর্যয় সৃষ্টির কারণ হয়। ব্যক্তি হিসাবে কৃপণের কার্পণ্য ও ঐশ্বর্য প্রীতির দরুন বন্ধু-বান্ধবের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে বাধ্য হয়। সামান্য সম্পদের জন্য সে লড়াই করতে ও জীবন দিতে প্রস্তুত হয়। ফলে পরস্পরের মধ্যে দুশমনী ও শত্রুতার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। রক্তারক্তি পর্যন্ত পরিস্থিতি গড়ায়। কৃপণতার এই নিন্দনীয় ও অনিষ্টকর স্বভাব থেকে আল্লাহ্ সকল মুসলিমকে রক্ষা করুন। আমাদের নবী ও এই কুস্বভাব থেকে মহান আল্লাহ্ আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, নবী হরমামেশা এই দু'আ করতেন: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُبِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحُزْنِ وَأَعُوْذُبِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالكَسَلِ وَأَعُوْذُبِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ -
হে আল্লাহ্! আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি দুঃসহ চিন্তা ও সন্তাপ থেকে। আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি অসামর্থ্য ও আলস্য থেকে। তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি কাপুরুষতা ও কৃপণতা থেকে।
۹۱ عَنْ هَارُونَ بْنِ رِيَابِ قَالَ قَدِمَ عَلَى النَّبِيُّ ﷺ سَبْعُونَ أَلْفَ دِرْهَم وَهُوَ أَكْثَرُ مَالٍ أُتِيَ بِهِ قَطُّ، فَوَضَعَ عَلَى حَصِيرٍ ثُمَّ قَامَ إِلَيْهَا يَقْسِمُهَا فَمَا رَدَّ سَائِلاً حَتَّى فَرَغَ مِنْهُ -
৯১. হযরত হারুন ইন্ন রিয়াব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার নবী-এর নিকট সত্তর হাজার দিরহাম এলো। ইতিপূর্বে এত বেশি অর্থ আর কখনো তাঁর কাছে আসেনি। তিনি তা চাটাইয়ের উপর রেখে বণ্টন করা শুরু করলেন। কোনো প্রার্থনাকারীকেই তিনি (শূন্য হাতে) ফিরিয়ে দেননি। (এমনিভাবে) সম্পূর্ণ অর্থই তিনি বণ্টন করে দেন।
ফায়দা: নবী -এর অভ্যাস ছিল, যখনই কোথাও থেকে তাঁর নিকট কোনো অর্থ-সম্পদ আসতো, তিনি সঙ্গে সঙ্গে সে খবর প্রচার করে দিতেন। দরিদ্র ও অভাবীদের ডেকে তিনি তা তৎক্ষণাৎ বণ্টন করে দিতেন। নিজের কাছে কখনো জমা করে রাখতেন না। অনেক সময় এমনও হতো যে, প্রচার করে বিতরণ করা সত্ত্বেও কিছু সম্পদ অবশিষ্ট থেকে যেতো। তার হদাব ও গ্রহণকারী কেউ থাকতো না। তখন তিনি খুব কষ্ট ও অস্বস্তি বোধ করতেন; অস্থির ও ব্যাকুল হয়ে পড়তেন। সম্পূর্ণ সম্পদ বণ্টন না করা পর্যন্ত তিনি স্বস্তি লাভ করতেন না। এক হাদীসে হযরত উম্মু সালামা (রা) বলেন, একবার নবী বিমর্ষ অবস্থায় গৃহে আগমন করেন। উম্মু সালামা (রা) জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি চিন্তিত কেন? তিনি বললেন, গতকাল যে সাতটি দীনার এসেছিল, সন্ধ্যা পর্যন্ত তা আমার বিছানায় পড়ে আছে। কোনো গ্রহণকারী পাওয়া যায়নি (মুসনাদে আহমাদ)।
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ النَّبِيُّ وَ لَا يُسْئَلُ شَيْئًا فَيَمْنَعُهُ -
৯২. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর নিকট যখনই কোনো কিছু চাওয়া হতো, তিনি তা প্রদান করতেন, নিষেধ করতেন না।
۹۳ . عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ أَبِي بَكْرٍ عَنْ بَعْضٍ بَنِي سَاعِدَةَ قَالَ سَمِعْتُ أَبَا أسَيْدٍ مَالِكِ ابْنِ رَبِيعَةَ يَقُولُ كَانَ النَّبِيُّ لَا يَمْنَعُ شَيْئًا يُسْئَلُ -
৯৩. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবূ বাকর (রা) বানূ সাঈদার জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন যে, আমি আবূ উসাইদ মালিক ইবন রাবীআ (রা)-কে বলতে শুনেছি, নবী-এর নিকট যে জিনিসই চাওয়া হতো, তিনি তা দিতে অস্বীকার করতেন না (বরং দিয়ে দিতেন)।
٩٤. عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ كَانَ الْمُسْلِمُونَ لَا يَنْظُرُونَ إِلَى أَبِي سُفْيَانَ وَلَا يُقَاعِدُونَهُ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ ثَلَاثُ أَعْطِيْهُنَّ، قَالَ نَعَمْ قَالَ عِنْدِي أَحْسَنُ الْعَرَبِ وَاجْمَلُهُ أُمُّ حَبِيْبَةَ أَزَوِّجُكَمَا قَالَ نَعَمْ، قَالَ وَمُعَاوِيَةَ تَجْعَلُ كَاتِبًا بَيْنَ يَدَيْكَ قَالَ نَعَمْ، وَتُؤْمِرُنِي حَتَّى أَقَاتِلَ الْكُفَّارَ كَمَا قَاتَلْتُ الْمُسْلِمِينَ قَالَ نَعَمْ، قَالَ أَبُو زَمَيْلٍ وَلَوْلَا أَنَّهُ طَلَبَ ذَلِكَ مِنَ النَّبِيِّ مَا أَعْطَاهُ لِأَنَّهُ لَمْ يَكُنْ يُسْئَلُ شَيْئًا قَطُّ إِلَّا قَالَ نَعَمْ .
৯৪. হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুসলিম জনতা হযরত আবু সুফিয়ান (রা)-কে (তাঁর কাফির থাকাকালে মুসলমানদের সাথে চরম শত্রুতা করার কারণে) সুনযরে দেখতেন না। তাঁর সাথে উঠাবসাও করতেন না। একবার আবু সুফিয়ান (রা) বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমাকে তিনটি বিশেষ (মর্যাদা) দান করুন। তিনি বললেন, বেশ ভালো (বলো, তা কি?) আবূ সূফিয়ান (রা) বলেন, আমার কন্যা উম্মু হাবীবা (রা) আরবের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী ও রূপসী রমণী। আমি তাকে আপনার নিকট বিবাহ দিলাম। (আপনি কবুল করুন) তিনি বললেন, বেশ ভালো। তারপর তিনি [আবু সুফিয়ান (রা) বললেন, মুআবিয়াকে আপনি আপনার পেশকার বানিয়ে নিন। তিনি বললেন, বেশ তাই করা হলো। এরপর তিনি [আবূ সুফিয়ান (রা)) বললেন, আপনি আমাকে কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য সেনাপতি (আমীরুল হাব) বানিয়ে দিন। যাতে আমি পূর্বে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যেরূপ যুদ্ধ করেছিলাম, এখন কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তার প্রায়শ্চিত্ত করতে পারি। নবী বললেন, বহুত আচ্ছা। তিনি তাঁকে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বাহিনীর অধিনায়ক বানিয়ে দিলেন। আবূ যামীল (র) বলেন, আবূ সুফিয়ান (রা) যদি নবী-এর নিকট ঐগুলো প্রার্থনা না করতেন, তবে তিনি তা তাঁকে আদৌ দান করতেন না। কিন্তু কথা হচ্ছে, নবী-এর নিকট কেউ কোনো জিনিস প্রার্থনা করলে তিনি তা তাকে দান করতেন। অস্বীকার করতেন না।
ফায়দা: এ হাদীস সামান্য পরিবর্তনসহ মুসলিম শরীফে আবূ সুফিয়ানের মর্যাদা ও গুণাবলি অনুচ্ছেদে উল্লিখিত হয়েছে। কিন্তু এ হাদীসের প্রথম অংশ সম্পর্কে হাদীস-বিশেষজ্ঞগণের চরম আপত্তি রয়েছে। আর তা হচ্ছে সকল ঐতিহাসিক এ ব্যাপারে একমত যে, হযরত আবূ সুফিয়ান (রা) ৮ হিজরীতে মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন। আর নবী-এর সাথে উম্মুল মু'মিনীন হযরত উম্মু হাবীবা (রা)-এর বিবাহ হয়েছিল তার বহু আগে ৬ হিজরী (মতান্তরে ৭ হিজরীতে)। তখন আবু সুফিয়ান মুসলমানও হননি। সুতরাং এ সময় হযরত আবু সুফিয়ান (রা) কর্তৃক তাঁর কন্যা উম্মু হাবীবাকে বিবাহের জন্য নবী-এর নিকট পেশ করা কোনোক্রমেই সঠিক হতে পারে না। কোনো কোনো আলিম লিখেছেন, মূলত হযরত আবু সুফিয়ান (রা) নবী-এর কাছে এই প্রস্তাব করেছিলেন ইসলাম গ্রহণের পরে স্বীয় সন্তোষ প্রকাশের মানসে। যেনো এ সময়ে তিনি স্বীয় সম্মতি জ্ঞাপনার্থে নতুনভাবে নবী-এর কাছে প্রস্তাব করছেন। যা হোক, হাদীসটির সনদ দুর্বল। এ হাদীস বর্ণনা করা দ্বারা গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে নবী-এর বদান্যতা ও দানশীলতা বর্ণনা করা। নবী আবু সুফিয়ানের মতো ইসলামের শত্রুকেও ইসলাম গ্রহণের পর গৌরব ও মর্যাদা দান করতে কার্পণ্য করেননি। এ কারণেই এ হাদীসটি গ্রন্থকার তাঁর কিতাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। যেনো নবী -এর দরবার থেকে ধনসম্পদের মতো মান- মর্যাদাও অকাতরে দান করা হতো।
٩٥ عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَجُلًا أَتَى النَّبِيَّ وَ يَسْأَلُهُ فَقَالَ مَا عِنْدِي شَيْ وَلَكِنْ ابْتَعْ عَلَى فَإِذَا جَاءَنَا شَيْ قَضَيْنَاهُ - قَالَ عُمَرُ رَضِيَ - اللَّهُ عَنْهُ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا كَلَّفَكَ اللَّهُ مَا لَا تَقْدِرُ عَلَيْهِ قَالَ فَكَرِهَ النَّبِيُّ فَقَالَ رَجُل أَنْفِقْ وَلَا تَخَفْ مِنْ ذِي الْعَرْشِ اقْلاَلاً، فَتَبَسَّمَ النَّبِيُّ ﷺ وَعُرِفَ السَّرُورُ فِي وَجْهِهِ -
৯৫. হযরত উমর ইবন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত, একবার কোনো এক (অভাবী) লোক নবী-এর নিকট এসে (আর্থিক সাহায্য) প্রার্থনা করলো। তিনি বললেন, আমার নিকট এ মুহূর্তে কিছু নেই। তুমি আমার নামে কিনে নাও। আমার কাছে যখন কিছু আসবে তখন তা আমি পরিশোধ করে দেবো। হযরত উমর (রা) বলেন, (এ কথা শুনে) আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আল্লাহ্ আপনাকে সাধ্যের অতীত কোনো কাজ করার নির্দেশ দেননি। বর্ণনাকারী বলেন, নবী হযরত উমরের এ কথা পছন্দ করলেন না। তখন অন্য এক সাহাবী বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি দেদার খরচ করুন এবং আরশের মালিকের পক্ষ থেকে স্বল্পতার আশংকা একেবারেই করবেন না। নবী (এই সাহাবীর কথা খুব পছন্দ করলেন এবং) মুচকি হাসলেন। তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডলে তখন আনন্দের চিহ্ন ফুটে উঠলো।
ফায়দা: এ হাদীস থেকেও নবী-এর বদান্যতা ও দানশীলতার পরাকাষ্ঠা অনুমিত হয়। তাঁর কাছে কিছুই নেই; তা সত্ত্বেও তিনি প্রার্থনাকারীকে দান করতে অস্বীকার করলেন না, তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিলেন না। বরং অন্যের নিকট থেকে ধার করে তার প্রয়োজন পূরণ করতে বললেন এবং সে ধার নিজে পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। কোনো প্রার্থনাকারীকেই শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেয়া তিনি পছন্দ করতেন না। তাঁর দান ও বদান্যতা হযরত উমর (রা)-এর মতো সুবিখ্যাত সাহাবীর পরামর্শ ও অভিমতের উপর প্রাধান্য পেল। দানের ব্যাপারে নবী হযরত উমর (রা)-এর পরামর্শও মেনে নেননি বরং একজন সাধারণ সাহাবীর কথা পছন্দ করেন। দানের সপক্ষে মত প্রকাশ করায় একজন সাধারণ সাহাবীর কথায় তিনি উৎফুল্ল হন।
٩٦ عَنْ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمُ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّهُ قَالَ بَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ وَمَعَهُ النَّاسُ مَقْفَلَهُ مِنْ حُنَيْنِ عَلَقَتِ الأَعْرَابُ يَسْأَلُونَهُ حَتَّى اضْطَرُّوهُ إِلَى سُمُرَةٍ فَخَطِفَتْ رِدَاءَهُ فَوَقَفَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَقَالَ أَعْطُونِي رِدَانِي، لَوْ كَانَ لِي عَدَدُ هُذِهِ الْعِضَاءِ نَعَمًا لَقَسَمْتُهُ بَيْنَكُمْ ثُمَّ لاَ تَجِدُوْنِي بَخِيْلاً وَ لَا كَذَّابًا ولَا جَبَانًا -
৯৬. হযরত জুবায়র ইন্ন মুতইম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ লোকদের সাথে হুনাইনের যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। তখন কিছু গ্রামীণ লোক তাঁকে জড়িয়ে ধরলো এবং (আর্থিক) সাহায্য প্রার্থনা করলো। এমনকি তারা তাঁকে ঠেলে একটি কণ্টকময় বৃক্ষের কাছে নিয়ে গেলো এবং তাতে তাঁর চাদরখানা আটকে গেলো। তখন রাসূলুল্লাহ্ থেমে গেলেন এবং বললেন, আমার চাদরটি আমাকে দিয়ে দাও। যদি আমার কাছে এখন এই কাঁটাযুক্ত বৃক্ষের কাঁটা সংখ্যক জন্তু (চতুষ্পদ প্রাণী) থাকতো, তবে আমি তাও তোমাদের মধ্যে বিতরণ করে দিতাম। এ ব্যাপারে তোমরা আমাকে কৃপণ দেখতে পেতে না এবং (ওয়াদা করার ক্ষেত্রে) মিথ্যুক ও (ব্যয় করার ব্যাপারে ভীত ও) কাপুরুষও দেখতে না।
ফায়দা : এ হাদীস হুনাইন যুদ্ধ সম্পর্কিত। নবী হুনাইন যুদ্ধে যে সম্পদ লাভ করেছিলেন, তা সাহাবাদের মধ্যে বণ্টন করে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। তখন তাঁর নিকট অবশিষ্ট কিছুই ছিল না। পথিমধ্য গ্রামীণ লোকেরা অজ্ঞতাবশত এসে তাঁকে ঘিরে ধরলো এবং আর্থিক সাহায্য প্রার্থনা করলো। নবী অপারগ ছিলেন। তিনি তাদেরকে জানালেন যে, যদি আমার কাছে এখন কোনো সম্পদ থাকতো, তবে আমি তোমাদেরকে অবশ্যই সাহায্য করতাম। সামান্যতম কার্পণ্য করতাম না।
۹۷ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي لَيْلى قَالَ سَمِعْتُ أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَيَّا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ يَقُولُ آتَيْتُ أَنَا وَفَاطِمَةُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا وَالْعَبَّاسُ وَزَيْدُ بْنُ حَارِثَةَ النَّبِيُّ ﷺ فَقَالَ الْعَبَّاسُ يَا رَسُولَ اللهِ : كَبِرَ سِنِّي وَرَقَ عَظَمِي رَأَيْتَ أَنْ تَأْمُرَ لِي بِكَذَا وَسَقَا مِنَ الطَّعَامِ فَافْعَلَ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَأَفْعَلُ، فَقَالَتْ فَاطِمَةُ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا يَا رَسُولَ اللهِ : إِنْ رَأَيْتَ أَنْ تَأْمُرْ لِي كَمَا أَمَرْتَ لِعَمِّكَ فَافْعَلْ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَأَفْعَلُ، فَقَالَ زَيْدُ ابْنُ حَارِثَةَ أَرْضًا كَانَتْ مَعِيشَتِي مِنْهَا ثُمَّ قَبَضْتَهَا فَإِنْ رَأَيْتَ أَنْ تَرُدَّهَا عَلَى فَافْعَلُ ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَافْعَلُ فَقُلْتُ أَنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنْ رَأَيْتَ أَنْ تُوَلِّيَنِي هُذَا الْحَقُّ الَّذِي جَعَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لَنَا فِي كِتَابِهِ مِنْ هُذَا الْخُمُسُ فَأَقْسِمْهُ فِي حَيَاتِكَ حَتَّى لَايُنَازِ عَنِيْهِ أَحَد بَعْدَكَ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَأَفْعَلُ ذَلِكَ فَوَلَانِيْهِ رَسُولُ اللهِ ﷺ -
৯৭. হযরত আবদুর রহমান ইব্ন আবূ লায়লা (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমীরুল মু'মিনীন হযরত আলী (রা)-কে বলতে শুনেছি, আমি, ফাতিমা, আব্বাস ও যায়দ ইবন হারিসা (রা) একবার নবী -এর নিকট হাযির হলাম। তখন আব্বাস (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার বয়স অনেক হয়েছে এবং আমার শক্তি খর্ব হয়ে গেলো। সুতরাং আপনি সঙ্গত মনে করলে আমার জন্য বায়তুল মাল থেকে এতো এতো ওয়াসাক খাদ্যশস্য দেয়ার নির্দেশ দিন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁর আবেদন মঞ্জুর করলেন এবং বললেন, আমি অবশ্যই তা করবো। এরপর ফাতিমা (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি আপনার চাচার জন্য যে নির্দেশ দিয়েছেন, সঙ্গত মনে করলে আমার জন্যও অনুরূপ সাহায্যের নির্দেশ দিন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁর আবেদনও মঞ্জুর করলেন এবং বললেন, আমি তোমার জন্যও তাই করবো। এরপর (তাঁর আযাদকৃত দাস পালক পুত্র) যায়দ ইবন হারিসা (রা) বলেন, আমার নিকট একখণ্ড জমি ছিল। তা দিয়ে আমার জীবিকা নির্বাহ হতো। আপনি আইনের বলে তা বাজেয়াপ্ত করেছেন। এখন আপনি যদি সঙ্গত মনে করেন, তবে সেই জমিটুকু আমাকে ফেরত দিন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁর আবেদনও মঞ্জুর করলেন এবং বললেন, আমি অবশ্যই তা করবো। হযরত আলী (রা) বলেন, তারপর আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি যদি সঙ্গত মনে করেন, তবে আমাকে বায়তুল মাল থেকে এক-পঞ্চমাংশ মালে গনীমতের অধিকার, যা আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর কিতাবে আমাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন-বণ্টন করার মুতাওয়াল্লী বানিয়ে দিন। তাহলে আমি তা আপনার জীবদ্দশায়ই বণ্টন করতে থাকবো এবং আপনার পরে এ ব্যাপারে আমার সাথে কেউ বিবাদে লিপ্ত হতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ্ তাঁর আবেদনও মঞ্জুর করলেন এবং বললেন, আমি তা অবশ্যই করবো। হযরত আলী (রা) বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ্ আমাকে ঐ এক-পঞ্চমাংশ বণ্টন করার নির্দেশ দান করেন।
ফায়দা : এ পূর্ববর্তী হাদীসসমূহে নবী-এর বদান্যতা সম্পর্কে বিশদ আলোচনা এসেছে। এ হাদীস থেকে বোঝা যায়, নবী যেরূপ অন্যদেরকে তাঁর বিপুল বদান্যতা ও দানশীলতা দ্বারা বিভূষিত করতেন, অনুরূপ তাঁর আত্মীয়-স্বজনের সাথেও দয়া-দাক্ষিণ্য প্রদর্শন করতেন-এটাই হচ্ছে আল্লাহ্ তা'আলার নির্দেশ। আর এ কারণেই তিনি তাঁর আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন এবং তাদেরকে ধন-সম্পদ দান করা ছিল তাঁর মহান চরিত্রের একটি বিশেষ গুণ। এ হাদীসে উল্লিখিত নবী-এর নিকট সাহায্য প্রার্থনার জন্য আগত ব্যক্তিগণ ছিলেন তাঁর আত্মীয়-স্বজন। হযরত আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিব (রা) তাঁর শ্রদ্ধেয় চাচা। হযরত ফাতিমা (রা) তাঁর কলিজার টুকুরা স্নেহের কন্যা। হযরত আলী (রা) তাঁর চাচাত ভাই ও স্নেহের জামাতা এবং হযরত যায়দ ইবন হারিসা (রা) নবী-এর প্রিয় সাহাবী ও আযাদকৃত গোলাম ও পালক পুত্র। এই ব্যক্তিগণ নবী -এর নিকট এসে নিজ নিজ প্রয়োজন তুলে ধরেন এবং তিনি তাঁর পরম ঔদার্য ও সহানুভূতিবশত তাঁদের সবার আবেদন মঞ্জুর করেন। কাউকেই শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেননি।
۹۸ عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ قَالَتْ أَنْشَدَ أَبُو بَكْرٍ قَوْلَ لَبِيْدٍ : أَخٌ لِي أَمَّا كُلُّ شَيْ سَأَلْتُهُ فَيُعْطَى وَأَمَّا كُلُّ ذَنْبٍ فَيَغْفِرُ : فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ هُكَذَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ
৯৮. হযরত আসমা বিন্ত আবূ বক্স (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার (হযরত) আবূ বক্স সিদ্দীক (রা) কবি লবীদ (রা)-এর এই পংক্তি দু'টি আবৃত্তি করলেন: أَخٌ لِي أَمَّا كُلُّ شَيْ سَأَلْتُهُ + فَيُعْطِي وَأَمَّا كُلُّ ذَنْبٍ فَيَغْفِرُ
"আমার এক ভাই আছে, আমি যদি তাঁর কাছে কিছু চাই, তিনি তা তৎক্ষণাৎ আমাকে দিয়ে দেন এবং সব দোষত্রুটি ক্ষমা কর দেন।" এবং বললেন, রাসূলুল্লাহ এ গুণেই গুণান্বিত ছিলেন।
ফায়দা : হযরত লবীদ (রা) জাহিলিয়াত যুগের বিখ্যাত কবিদের অন্যতম। তাঁর নাম লবীদ ইব্ন রাবীআ ইব্ন মালিক। বানু কিলাব প্রতিনিধি দলের সাথে তিনি নবী -এর দরবারে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি কাব্যচর্চা ত্যাগ করেন। (মাআরিফে ইব্ন কুতায়বা, পৃষ্ঠা-৩৩২)। অপর এক হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, নবী বলেন : লবীদের সবচেয়ে সত্য কবিতা হচ্ছে এটি :
الا كُلُّ شَيْ مَا خَلَا اللهُ بَاطِل + وَكُلُّ نَعِيمٍ لَا مَحَالَةً زَائِلُ -
জেনে রাখো, আল্লাহ্ ছাড়া সব জিনিসই বাতিল ও মিথ্যা আর দুনিয়ার সব নিয়ামতই নিশ্চিত বিলীয়মান। (বুখারী শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০৮)
নবী হযরত লবীদ (রা)-এর কবিতা খুব পছন্দ করতেন। কেননা, তাঁর কবিতায় প্রায়শ আল্লাহ্ তাওহীদ, রিসালাত, কিয়ামত, পুরস্কার, শাস্তি ইত্যাদি উল্লেখিত হতো।
গ্রন্থকার এ হাদীসটি নবী -এর দানশীলতা ও বদান্যতা অনুচ্ছেদে উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে, হযরত লবীদ (রা) তাঁর এই কবিতায় তাঁর মামদূহ বা প্রশংসিতের দানশীলতা ও বদান্যতার আলোচনা করেছেন। তাই হযরত আবূ বক্র (রা) এই কবিতাটি রাসূলুল্লাহ্ -এর উদ্দেশ্যে আবৃত্তি করেন। অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন যে, আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা দানশীলতা ও বদান্যতা গুণের এই মানদণ্ডে পুরোপুরি উত্তীর্ণ ছিলেন।
টিকাঃ
১. 'ওয়াসাক' একটি মাপের নাম, যা ষাট সা-এর সমান। সা হলো সাড়ে তিন সের। কারো কারো মতে 'ওয়াসাক' এক উট সমান বোঝাকেও বলা হয়।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বদান্যতা সম্পর্কিত হাদীসসমূহ
۸۱ عَنْ عُمَرَ بْنِ عَبْدِ اللهِ مَوْلَى غَفَرَةَ حَدَّثَنِي إِبْرَاهِيمُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ الْحَنَفِيَّةِ مِنْ وَلَدٍ عَلِيِّ قَالَ كَانَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ إِذَا نَعَتَ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ أَجْوَدَ النَّاسِ كَفَّا وَأَكْرَمَهُمْ عِشْرَةً مَنْ خَالَطَهُ فَعَرَفَهُ أَحَبَّهُ -
৮১. গাফারার আযাদকৃত গোলাম হযরত উমর ইব্ন আবদুল্লাহ্ (র) বলেন, হযরত আলী (রা)-এর বংশধর ইব্রাহীম ইন মুহাম্মদ ইব্ন হানাফিয়্যা (র) আমাকে বলেছেনঃ হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) যখনই রাসূলুল্লাহ্ -এর গুণাবলি বর্ণনা করতেন, তখন বলতেন, রাসূলুল্লাহ্ সবচেয়ে দানশীল ও উদারহস্ত ছিলেন এবং তিনি ছিলেন সবচেয়ে অধিক সুসম্পর্ক রক্ষাকারী। তাই যে কেউ তাঁর সাথে মেলামেশা করতো এবং তাঁর চরিত্র সম্পর্কে অবহিত হতো, সেই তাঁকে অত্যধিক ভালবাসতো।
ফায়দা: নবী সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদার ছিলেন। বদান্যতা ছিল তাঁর স্বভাবগত আল্লাহ্ প্রদত্ত গুণ। তিনি কখনো কোনো প্রার্থনার জবাবে 'না' বলেননি। কোনো প্রার্থনাকারীকে শূন্যহাতে ফিরিয়ে দেননি। দানও করতেন এমন পরিমাণ যে, স্বয়ং প্রার্থনাকারীও তাজ্জব মনে করতো। কখনো কোনো প্রার্থনাকারীকে দেওয়ার জন্য যদি তাঁর কাছে কিছু না থাকতো, তবে তিনি পরে তাকে দেওয়ার ওয়াদা করতেন এবং সে ওয়াদা তিনি পূর্ণ করতেন। কখনো কখনো অন্যের নিকট থেকে ঋণ নিয়ে দান করতেন। মেলামেশা ও সামাজিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও তাঁর পবিত্র জীবন ছিল সর্বাধিক সমুন্নত। সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলতেন। ছোট-বড়োর শিষ্টাচারের প্রতি লক্ষ্য রাখতেন। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন এবং সকল প্রতিবেশী ও সাক্ষাৎ প্রার্থীর সাথে তিনি বিনম্র ব্যবহার করতেন। তাঁর এই মহান অনুপম চরিত্র দেখেই লোকেরা তাঁর ভক্ত হয়ে গিয়েছিলো। তাঁকে সকলে অপরিসীম ভালবাসতো। তিনি প্রত্যেকের সাথে যথাযোগ্য সুব্যবহার করতেন। কাউকে কোনো প্রকার কষ্ট দিতেন না। সর্বদা সদ্ব্যবহার, সুবিচার, বিনয়-নম্রতা, সত্য কথা, প্রতিশ্রুতি পালন, শিশু ও ছোটদের প্রতি মমতা প্রদর্শন ছিল তাঁর উন্নত চরিত্রের নিদর্শন। সুতরাং যে ব্যক্তিই তাঁর সাহচর্য কয়েক মুহূর্তও লাভ করতো, সে-ই তাঁকে অত্যন্ত ভালবাসতে শুরু করতো। এক হাদীসে আছে, নবী বলেছেন: দানশীল ব্যক্তি আল্লাহ্রও নিকটবর্তী, জান্নাতেরও নিকটবর্তী, লোকজনেরও নিকটবর্তী (আর জাহান্নামের) আগুন থেকে দূরবর্তী। পক্ষান্তরে কৃপণ ব্যক্তি আল্লাহর রহমত থেকেও দূরবর্তী, জান্নাত থেকেও দূরবর্তী, লোকজন থেকেও দূরবর্তী (এবং জাহান্নামের) আগুনের নিকটবর্তী। তিনি আরো বলেন, আল্লাহর নিকট একজন মূর্খ দানশীল ব্যক্তি একজন কৃপণ শিক্ষিত ব্যক্তি অপেক্ষা অনেক উত্তম (তিরমিযী শরীফ)। সুবহানাল্লাহ্! দানশীলতা আল্লাহ্ও খুব প্রিয়। কেননা, তিনি নিজেই খুব দয়ালু ও দানশীল। তাই তাঁর সুন্দর নামসমূহের মধ্যে 'দয়ালু' (كَرِيْم) ও দানশীল (جواد)-ও উল্লিখিত হয়েছে। আল্লাহ যেমন অপরিসীম দানশীল ও পরম দয়ালু তেমনি তাঁর প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা ﷺ বদান্যতা ও দানশীলতার ক্ষেত্রে সকল মানুষের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চতম স্থানের অধিকারী। তাঁর দানশীলতা সম্পর্কিত হাদীসগুলো সামনে বিবৃত হবে। এই হাদীসগুলো দ্বারাই তাঁর বদান্যতা ও দানশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়।
عَنِ ابْنِ عَمْرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَجُودَ وَلَا أَنْجَدَ وَلَا أَشْجَعَ وَلَا أَرْضَى مِنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ -
৮২. হযরত ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ ﷺ অপেক্ষা অধিক দানশীল ও দাতা, অধিক সাহসী, বড় বীর, অধিক ধৈর্যশীল ও পরিতুষ্ট কোনো ব্যক্তিকে দেখিনি।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, যেখানে নবী ﷺ সকল মানুষের মধ্যে সবচেয়ে অধিক দানশীল ও দাতা ছিলেন, সেখানে তিনি সবচেয়ে অধিক সাহসী বীর, ধৈর্যশীল ও অল্পে তুষ্টও ছিলেন। তাঁর যুদ্ধ বিগ্রহ থেকেই তা প্রমাণিত হতে পারে কত বড় বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, যাতে তাঁকে হাজারো বিপদ-আপদ, নানাবিধ দুঃখকষ্ট ভোগ করতে হয়েছে, পবিত্র মুখমণ্ডল যখমী হয়েছে, দান্দান মুবারক শহীদ হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনো হতোদ্যম ও সাহসহীনতার প্রমাণ দেননি। বরং সর্বদা দৃঢ়তা, সাহসিকতা ও বীরত্বের সাথে তার মুকাবিলা করেছেন। তাঁর দৃঢ়সংকল্প ও ধৈর্যের মধ্যে কোন তারতম্য ঘটেনি। তাঁর পবিত্র জীবনের সূচনাই হয়েছে দৃঢ় সংকল্প ও ধৈর্য-সহ্যের মধ্য দিয়ে। আরবের মূর্খ ও বিদ্বেষপরায়ণ মুশরিকদের মধ্যে যারা কখনো তাদের পিতৃপুরুষদের অন্ধ অনুসরণ ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিল না, যারা শত শত বছর থেকে মূর্তি পূজা করে আসছিল, তিনি একাকী দাঁড়িয়ে তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দেন। তখন তাঁর কোনো সঙ্গী ও সাহায্যকারী ছিলো না। তিনি আল্লাহ্ উপর ভরসা রেখে দৃঢ় সংকল্প ও সাহসিকতার সাথে মুশরিক ও কাফিরদেরকে দীন ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। আরবের শিশুরা পর্যন্ত তাঁর বিরোধিতা করতো। মক্কার কাফিররা তাঁকে দুঃখ-কষ্ট দিতো। দুষ্ট বালকেরা তাঁকে পাথর মারতো। তিনি রক্তে রঞ্জিত হতেন। কিন্তু এতসত্ত্বেও তিনি সাহস হারাতেন না। বরং অনমনীয়তার সাথে তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিতেন। শেষে এমন একদিন এলো, যখন আরবের প্রতিটি গৃহে তাওহীদের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হলো এবং তাদের শিশুরা পর্যন্ত তাঁর ভক্ত ও প্রেমিক হয়ে পড়লো। তিনি সমগ্র আরব ও অনারবের বন্ধু হয়ে গেলেন।
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَجْوَدَ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ حِيْنَ يَلْقَاهُ جِبْرَئِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ -
৮৩. হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ লোকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল ছিলেন। বিশেষত রমযানের মাসে তাঁর দানশীলতার মাত্রা অত্যধিক বেড়ে যেতো, যখন হযরত জিব্রাঈল (আ) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য আগমন করতেন।
ফায়দা: এখানে গ্রন্থকার পুরো হাদীসটি উদ্ধৃত করেননি। বরং নবী-এর দানশীলতার সাথে সম্পর্কিত অংশটুকু উদ্ধৃত করেছেন। এ হাদীস সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে সবিস্তার বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, নবী লোকদের মধ্যে সর্বাধিক দানশীল ও দাতা ছিলেন। আর রমযান মাসে যখন হযরত জিব্রাঈল (আ) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য আগমন করতেন, তখন তাঁর দানশীলতা অন্যান্য সময় অপেক্ষা অনেক গুণ বেড়ে যেতো। তখন তিনি অত্যধিক মাত্রায় দান-খয়রাত করতেন। জিব্রাঈল (আ) রমযান মাসে প্রতিদিন তাঁর নিকট আগমন করতেন এবং কুরআন শরীফের শুনানি করতেন। ঐ সময় তিনি ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন বায়ুর চেয়েও অধিক দান-খয়রাত করতেন। অর্থাৎ নবী রমযান মাসে দান-খয়রাতের পরিমাণ এতই বৃদ্ধি করতেন যে, বর্ণনাকারী তাঁর দান-খয়রাতের আধিক্যকে ঝড়ো হওয়ার গতিবেগের সাথে তুলনা করেছেন। রমযান মাসে নবী-এর অধিক দান-খয়রাত করার কারণ হচ্ছে, ঐ পবিত্র মাসে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাদের উপর অপরিসীম দয়া ও কৃপা করে থাকেন। তাঁর রিযিক তাদের উপর অবারিত করে দেন। রোযাদারদের সকল কর্মকাণ্ডের বিনিময় এই পবিত্র মাসের কারণে দশগুণ থেকে সত্তর গুণ পর্যন্ত বেশি প্রদান করেন। এ মাসে একবার কুরআন খতম করলে সত্তরবার কুরআন খতম করার সওয়াব পাওয়া যায়। এক রাকআত নফল সালাত পড়ার সওয়াব সত্তর রাকআত পড়ার সমান হয়। এক পয়সা ব্যয় করার সওয়াব সত্তর পয়সা ব্যয় করার সমান হয়। এ ছাড়া আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর অসীম কৃপায় রোযাদার বান্দাদের পেছনের সমস্ত গুনাহ্ও মাফ করে দেন। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রমযান মাসের শেষ রাতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রোযাদার বান্দাদের ক্ষমা ঘোষণা করেন। তাই আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা ও আল্লাহ্ এই দানশীলতার গুণটি রপ্ত করতেন এবং অন্যদেরকেও রপ্ত করার নির্দেশ দিতেন। বর্ণিত আছে )تَخَلَّفُوْا بِأَخْلَاقِ اللَّهِ( )তোমরা আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হও)। তাই আল্লাহ্ গুণাবলি নিজের মধ্যে সৃষ্টি করা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনার প্রমাণ। আল্লাহ্ আমাদেরকে তাঁর প্রদর্শিত পথে সঠিকভাবে চলার তাওফীক দান করুন।
٨٤ عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَجُلاً أَتَى النَّبِيُّ ﷺ فَسَأَلَهُ فَأَعْطَاهُ غَنَمًا بَيْنَ جَبَلَيْنَ فَأَتَى الرَّجُلُ قَوْمَهُ ، فَقَالَ أَسْلِمُوا فَإِنَّ مُحَمَّدًا يُعْطِى عَطَاء رَجُلٍ مَا يَخَافُ فَاقَةً .
৮৪. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত যে, জনৈক ব্যক্তি নবী -এর নিকট এসে (আর্থিক সাহায্য) প্রার্থনা করলো। তিনি তাকে দুই পাহাড়ের মধ্যকার সব বকরী দান করলেন। তখন ঐ ব্যক্তি তার গোত্রের মধ্যে এসে বললো, হে লোক সকল! তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো। কেননা, মুহাম্মদ সেই ব্যক্তির ন্যায় দান করে থাকেন, যার দারিদ্রের কোনো আশংকা নাই।
ফায়দা : এই রিওয়ায়াতটিই মিশকাত শরীফে হযরত আনাস (রা) থেকে এই ভাষায় বর্ণিত হয়েছে : জনৈক ব্যক্তি নবী -এর নিকট দুই পাহাড় সমান ছাগ প্রার্থনা করলো। তিনি তা তাকে দান করলেন। তখন ঐ ব্যক্তি তার গোত্রে এসে বললো, হে আমার গোত্র! তোমরা সবাই মুসলমান হয়ে যাও। আল্লাহ্র কসম! মুহাম্মদ এতই দান করেন যে, নিজে দরিদ্র হয়ে যাওয়ারও ভয় করেন না।
শামায়েলে তিরমিযীতে হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ্ কখনো কোনো বন্ধু (ভবিষ্যতের জন্য) সঞ্চয় করে রাখতেন না। (বরং তৎক্ষণাৎ সাহাবাদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন)।
এই হাদীসগুলো থেকেই নবী -এর বদান্যতা ও দানশীলতা সম্পর্কে অনুমান করা যায়। কেননা যে যত চাইত তিনি তাকে তা দান করতেন। কখনো প্রার্থনাকারীকে তাঁর নামে ঋণ নিয়ে প্রয়োজন মিটানোর অনুমতি দিতেন। যেমন সামনের হাদীসসমূহে বিধৃত হয়েছে। নবী -এর এই বদান্যতার পরাকাষ্ঠা ও আল্লাহ্র উপর পূর্ণ ভরসায় বিস্মিত হয়ে ঐ প্রার্থনাকারী তার গোত্রকেও ঈমান ও ইসলামের দাওয়াত দেয় এবং নিজেও ঈমান আনে।
এক হাদীসে হযরত ইবন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত আছে, নবী বলেন : ঈর্ষা কেবল দুই ব্যক্তির উপর হতে পারে। এক. সেই ব্যক্তি—যাকে আল্লাহ্ তা'আলা ধন-সম্পদও দিয়েছেন এবং তাকে ঐ সম্পদ আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করারও তাওফীক দিয়েছেন। দুই. সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ্ তা'আলা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা দান করেছেন এবং সে তা দ্বারা নিজেও পরিচালিত হয় এবং অপরকেও তা শিক্ষা দেয়। (রিয়াদুস্-সালিহীন)
অন্য এক হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, নবী বলেছেন : প্রত্যহ সকাল বেলা যখন আল্লাহ্র বান্দা নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয়, তখন তার সাথে দু'জন ফিরিশতাও আসমান থেকে অবতরণ করেন। তাদের একজন বলেন, হে আল্লাহ্! ব্যয়কারী, দানশীল ও দাতা ব্যক্তিকে তার বিনিময় দান করো। দ্বিতীয় ফিরিস্তা বলেন, হে আল্লাহ্! বখীল ও কৃপণ ব্যক্তির সম্পদে তুমি ধস নামাও। (বুখারী ও মুসলিম)
অপর এক হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। নবী বলেন : আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন : হে আদাম সন্তান! তুমি আল্লাহ্র সৃষ্টির জন্য ধন-সম্পদ ব্যয় করো, তোমার জন্যও আল্লাহর পক্ষ থেকে ব্যয় করা হবে। (রিয়াদুস্-সালিহীন)।
٨٥ عَنْ عُمَرَ بْنِ عَبْدِ اللهِ مَوْلَى غَفْرَةَ حَدَّثَنِي إِبْرَاهِيمَ ابْنُ مُحَمَّدٍ مِنْ وُلِدَ عَلِيِّ قَالَ كَانَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ إِذَا وَصَفَ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ كَانَ أَجْوَدَ النَّاسِ كَفَّا وَأَجْرَأَ النَّاسِ صَدْرًا وَأَصْدَقَ النَّاسِ لِهْجَةً وَأَوفَاهُمْ بِذِمَّةٍ، وَأَلْيَنَهُمْ عَرِيكَةً وَاكَرَمَهُمْ عِشْرَةً، مَنْ رَاهُ بَدِيهَةً هَابَهُ، وَمَنْ خَالَطَهُ فَعَرَفَهُ أَحَبَّهُ لَمْ أَرَ قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ مِثْلَهُ -
৮৫. হযরত গাফারা (রা) এর মাওলা (আযাদকৃত গোলাম) উমর ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার কাছে ইব্রাহীম ইন মুহাম্মদ (যিনি হযরত আলী (রা)-এর বংশধর) হাদীস বর্ণনা করেন যে, হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) যখন নবী-এর (সুন্দরতম) গুণাবলি বর্ণনা করতেন, তখন বলতেন যে, তিনি সবচেয়ে উদার হস্ত, সবচেয়ে সাহসী-হৃদয়, সবচেয়ে সত্যভাষী, সবচেয়ে ওয়াদা পালনকারী, সবচেয়ে নম্র-স্বভাব এবং সবচেয়ে ভদ্র জীবন যাপনকারী ছিলেন। যে ব্যক্তি হঠাৎ তাঁকে দেখত তার মনে ভীতির সঞ্চার হতো এবং যে ব্যক্তি তাঁর সাহচর্য লাভ করতো ও তাঁর অতুলনীয় স্বভাব সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হতো, সে তাঁকে ভালবাসতে শুরু করতো। আমি তাঁর পূর্বে কখনো তাঁর মতো (সর্বগুণে গুণান্বিত) মানুষ দেখিনি এবং তার পরেও দেখিনি।
ফায়দা : হযরত আলী (রা)-এর এ হাদীস পূর্বের একটি হাদীসের আওতায় বর্ণিত হয়েছে। এখানে হাদীসের কিছু কথা পূর্বোক্ত হাদীস অপেক্ষা বেশি বর্ণিত হয়েছে, যা নবী -এর মহৎ গুণাবলি ও উন্নত চরিত্রাবলি ব্যাখ্যা করছে। এসব অনুপম গুণ ও চরিত্রাবলি আয়ত্ত করা আমাদের প্রাথমিক কর্তব্য। নবী-এর পূর্ণ আনুগত্যের মূল কথাই হচ্ছে তাঁর সুমহান গুণাবলি ও সমুন্নত চরিত্রাবলিকে নিজের মধ্যে সৃষ্টি করা, তাঁর পবিত্র জীবন ও প্রশংসিত চরিত্র অনুসরণ করা। আল্লাহ্ পাক আমাদের সবাইকে পূর্ণভাবে তাঁর পদাংক অনুসরণ করার এবং তাঁর সর্বাঙ্গীণ অনুগত ও অনুসারী হওয়ার এবং তাঁর গুণাবলি ও সুন্দরতম চরিত্রাবলি নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি করার তাওফীক দান করুন।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِى اللهُ عَنْهُ قَالَ لَمْ يُسْئَلُ رَسُولُ اللهِ ﷺ شَيْئًا قَطُّ عَلَى الْإِسْلَامِ إِلَّا أَعْطَاهُ وَإِنَّ رَجُلاً أَتَاهُ فَسَأَلَهُ فَأَعْطَاهُ غَنَمًا بَيْنَ جَبَلَيْنِ فَرَجَعَ إِلَى قَوْمِهِ فَقَالَ أَسْلِمُوا فَإِنَّ مُحَمَّدًا يُعْطِي عَطَاءُ مَا يَخْشَى فِيْهِ الْفَاقَةً -
৮৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ এর নিকট ইসলামের নামে যখনই কোনো বস্তু চাওয়া হয়েছে, তিনি তা অবশ্যই প্রদান করেছেন। একবার এক ব্যক্তি এসে তাঁর নিকট প্রার্থনা করলো। তিনি তাকে ছাগলের একটি পূর্ণ পালই প্রদান করলেন, যা দুই পাহাড়ের মাঝখানে ছড়িয়ে ছিল। তারপর ঐ ব্যক্তি তাঁর গোত্রের মধ্যে ফিরে গিয়ে বললো, (হে আমার গোত্র) তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো। কেননা মুহাম্মদ এমনভাবে দান করেন যে, তারপর দারিদ্র্যের কোনো আশংকাই থাকে না।
ফায়দা : এ হাদীসটিও সামান্য পরিবর্তনসহ ইতিপূর্বে একটি হাদীসের আওতায় বর্ণিত হয়েছে। এ হাদীস থেকে নবী-এর পরম দানশীলতা অনুমান করুন। তিনি কতবড় দানশীল ও দাতা ছিলেন তা এর দ্বারাই পরিমাপ করা যায়। নবী-এর দান ও বশিশের এই অবস্থা ছিল সর্বব্যাপী। যে কেউ তাঁর দরবারে ইসলামের নামে আঁচল পেতে দিতো, যে তার প্রার্থিত বস্তু দ্বারা আঁচল পূর্ণ করে ফিরে যেতো এবং সাথে সাথে তাঁর ঔদার্য ও আল্লাহ্র উপর পূর্ণ ভরসা দেখে তার ঈমান আরো মযবুত হয়ে যেতো। সে তার কাওম ও গোত্রকে এরূপ মূর্তিমান দানশীল ও উদার নবীর দীন কবুল করার উপদেশ দিতো। সত্য বলতে কি, দুনিয়ায় চারিত্রিক শক্তি এমন কিছু করে দেখতে পারে যা সামরিক শক্তি কখনো দেখতে পারে না। চরিত্রই হচ্ছে সেই হাতিয়ার যা দ্বারা চরম ঔদ্ধত্য ও বিদ্রোহী অন্তর বশ করা যায়। একথা মোটেই সত্য নয় যে, তলোয়ার দ্বারা ইসলাম দুনিয়ায় বিস্তার লাভ করেছে। বরং ইসলাম সত্য নবীর (আমার মাতা-পিতা তাঁর জন্য উৎসর্গিত হোক) সুমহান চরিত্র ও সমুন্নত গুণাবলির আধ্যাত্মিক শক্তি দ্বারা বিশ্ব-ধর্মে পরিণত হয়েছে, যার বহু জীবন্ত উদাহরণ ইসলামের ইতিহাসে বিধৃত আছে।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّ النَّبِيُّ كَانَ لَا يُسْئَلُ شَيْئًا إِلَّا أَعْطَاهُ
৮৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী-এর নিকট যে বস্তুই প্রার্থনা করা হতো, তিনি তা দান করতেন।
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ مَا سُئِلَ رَسُولُ اللهِ ﷺ شَيْئًا قَطُّ قَالَ لَا -
৮৮. হযরত জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ -এর কাছে কিছু চাওয়া হয়েছে এবং তিনি তা দেননি-এরূপ কখনো হয়নি।
. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ لَا يَقُولُ لِشَيْ يُسْأَلُ لا -
৮৯. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী-এর নিকট কোনো কিছু চাওয়া হলে তিনি 'না' বলতেন না।
فَمَنَعَهُ عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ مَاسُئِلَ النَّبِيُّ شَيْئًا قَطُّ
৯০. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর নিকট কোনো বস্তু প্রার্থনা করা হয়েছে এবং তিনি তা নিষেধ করেছেন এরূপ কখনো হয়নি।
ফায়দা: উপরোক্ত চারটি হাদীসের বিষয়বস্তু একই। এগুলো থেকে বোঝা যায় যে, প্রার্থনাকারীর প্রার্থনা ও অভাবগ্রস্তের অভাব পূরণ করা ছিল নবী -এর প্রকৃতি ও স্বভাবের অন্তর্গত। তিনি কাউকে শূন্য হাতে ও নিরাশ করে ফিরিয়ে দেননি। কখনো মুখে 'না' শব্দ উচ্চারণ করেননি। তাঁর এই গুণের কথাই এক আরব কবি এভাবে উল্লেখ করেছেন-
مَا قَالَ لا قَطُّ إِلا فِي تَشَهُدِهِ + لَوْلاَ التَّشَهُدُ كَانَتْ لَاؤُهُ نَعَمْ -
"কালিমা শাহাদত ছাড়া তিনি কখনো 'লা' (না) বলেননি। কালিমা শাহাদত যদি না হতো তবে তাঁর 'লা' (না)-ও নাআম (হ্যাঁ) হয়ে যেত।" এই মর্মই ফারসী কবি নিম্নোক্ত চরণে ব্যক্ত করেছেন:
نزفت لا بزبان مباركش هركز + مكربه اشهد ان لا اله الا الله
"তাঁর যবান মুবারকে কখনো 'না' শব্দ উচ্চারিত হয়নি। যদি হয়ে থাকে, তবে তা হয়েছে কালিমা শাহাদত "أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ" -এর মধ্যে।"
নবী -এর বদান্যতার ক্ষেত্রে পরিমাণের কোনো প্রশ্ন ছিল না। তিনি ছোট-বড় সব চাওয়া পূরণ করতেন। যেমন পূর্বোক্ত এক হাদীস থেকে জানা যায় যে, জনৈক ব্যক্তি যখন দুই পাহাড়ের উপত্যকাপূর্ণ বক্রীর পাল প্রার্থনা করলো, তখন তিনি তাও দান করে দেন। তাঁর কাছে যদি এর চেয়েও বেশি চাওয়া হতো, তবে তিনি তাও দিয়ে দিতেন। নবী -এর এই বদান্যতা তো ছিল কেউ কিছু প্রার্থনা করার সময়। কিন্তু তাঁর নিকট যখন কোথাও থেকে কোনো সম্পদ আসতো, তখন তিনি প্রার্থনা ছাড়াই পাওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তিকে ডেকে ডেকে প্রদান করতেন। তিনি কখনো সম্পদ সঞ্চয় করে রাখতেন না। বরং সত্বর তা বণ্টন করে দিতেন। হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, একবার নবী -এর নিকট বাহরাইন থেকে বেশ কিছু মালপত্র এলো। তিনি বললেন, ওগুলো মসজিদের আঙ্গিনায় বিছিয়ে দাও। এর পূর্বে এত সম্পদ তাঁর নিকট কখনো আসেনি। (বুখারী)
তিনি এই সমুদয় সম্পদ সাহাবাদের মধ্যে বিতরণ করলেন। বিতরণের পর তাঁর নিকট একটি দিরহামও অবশিষ্ট ছিল না। দানশীলতা ছিল নবী -এর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু এবং কৃপণতা ছিল সবচেয়ে ঘৃণ্য ব্যাপার। এক হাদীসে হযরত ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন, আমি নবী -কে বলতে শুনেছি, বদান্যতা আল্লাহ্ তা'আলার সবচেয়ে বড় সৃষ্টি। (তারগীব ও তারহীব)।
হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, নবী বলেছেন: জান্নাতে এমন একটি ঘর আছে, যার নাম 'বায়তুস্ সাখা' দান-নিকেতন (তারগীব)। কৃপণতার অপনিন্দায় নবী -এর বহু হাদীস বর্ণিত রয়েছে। এক হাদীসে হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, নবী বলেছেন: জুলুম থেকে আত্মরক্ষা করো, কেননা জুলুম কিয়ামতের দিন ঘনঘোর অন্ধকাররূপে আত্মপ্রকাশ করবে। আর কৃপণতা থেকে দূরে থাকো, কেননা কৃপণতাই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ধ্বংস করেছে। তাদেরকে রক্তারক্তি করতে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং হারামকে হালাল করতে তাদেরকে উৎসাহ যুগিয়েছে (রিয়াদুস্-সালিহীন)। বস্তুত কৃপণতা এমন এক কুঅভ্যাস ও ধ্বংসাত্মক হীন কাজ, যা সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রকে কলুষিত করে। কৃপণের কারণেই সমাজে ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়। পরস্পরে অনৈক্য ও মনোমালিন্য দেখা দেয়। গোটা সমাজ বিপর্যস্ত হয়। কৃপণতার কারণেই গরীব, মিস্কীন, ভিক্ষুক, অভাবগ্রস্ত, অসহায় ও বেকার লোকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। আর এভাবে গোটা জাতির অবস্থা মন্দ থেকে মন্দতর হতে থাকে। তাছাড়া সাহায্য-সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার দরুন এই লোকগুলোই সমাজে অপরাধ ও বিপর্যয় সৃষ্টির কারণ হয়। ব্যক্তি হিসাবে কৃপণের কার্পণ্য ও ঐশ্বর্য প্রীতির দরুন বন্ধু-বান্ধবের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে বাধ্য হয়। সামান্য সম্পদের জন্য সে লড়াই করতে ও জীবন দিতে প্রস্তুত হয়। ফলে পরস্পরের মধ্যে দুশমনী ও শত্রুতার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। রক্তারক্তি পর্যন্ত পরিস্থিতি গড়ায়। কৃপণতার এই নিন্দনীয় ও অনিষ্টকর স্বভাব থেকে আল্লাহ্ সকল মুসলিমকে রক্ষা করুন। আমাদের নবী ও এই কুস্বভাব থেকে মহান আল্লাহ্ আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, নবী হরমামেশা এই দু'আ করতেন: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُبِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحُزْنِ وَأَعُوْذُبِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالكَسَلِ وَأَعُوْذُبِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ -
হে আল্লাহ্! আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি দুঃসহ চিন্তা ও সন্তাপ থেকে। আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি অসামর্থ্য ও আলস্য থেকে। তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি কাপুরুষতা ও কৃপণতা থেকে।
۹۱ عَنْ هَارُونَ بْنِ رِيَابِ قَالَ قَدِمَ عَلَى النَّبِيُّ ﷺ سَبْعُونَ أَلْفَ دِرْهَم وَهُوَ أَكْثَرُ مَالٍ أُتِيَ بِهِ قَطُّ، فَوَضَعَ عَلَى حَصِيرٍ ثُمَّ قَامَ إِلَيْهَا يَقْسِمُهَا فَمَا رَدَّ سَائِلاً حَتَّى فَرَغَ مِنْهُ -
৯১. হযরত হারুন ইন্ন রিয়াব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার নবী-এর নিকট সত্তর হাজার দিরহাম এলো। ইতিপূর্বে এত বেশি অর্থ আর কখনো তাঁর কাছে আসেনি। তিনি তা চাটাইয়ের উপর রেখে বণ্টন করা শুরু করলেন। কোনো প্রার্থনাকারীকেই তিনি (শূন্য হাতে) ফিরিয়ে দেননি। (এমনিভাবে) সম্পূর্ণ অর্থই তিনি বণ্টন করে দেন।
ফায়দা: নবী -এর অভ্যাস ছিল, যখনই কোথাও থেকে তাঁর নিকট কোনো অর্থ-সম্পদ আসতো, তিনি সঙ্গে সঙ্গে সে খবর প্রচার করে দিতেন। দরিদ্র ও অভাবীদের ডেকে তিনি তা তৎক্ষণাৎ বণ্টন করে দিতেন। নিজের কাছে কখনো জমা করে রাখতেন না। অনেক সময় এমনও হতো যে, প্রচার করে বিতরণ করা সত্ত্বেও কিছু সম্পদ অবশিষ্ট থেকে যেতো। তার হদাব ও গ্রহণকারী কেউ থাকতো না। তখন তিনি খুব কষ্ট ও অস্বস্তি বোধ করতেন; অস্থির ও ব্যাকুল হয়ে পড়তেন। সম্পূর্ণ সম্পদ বণ্টন না করা পর্যন্ত তিনি স্বস্তি লাভ করতেন না। এক হাদীসে হযরত উম্মু সালামা (রা) বলেন, একবার নবী বিমর্ষ অবস্থায় গৃহে আগমন করেন। উম্মু সালামা (রা) জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি চিন্তিত কেন? তিনি বললেন, গতকাল যে সাতটি দীনার এসেছিল, সন্ধ্যা পর্যন্ত তা আমার বিছানায় পড়ে আছে। কোনো গ্রহণকারী পাওয়া যায়নি (মুসনাদে আহমাদ)।
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ النَّبِيُّ وَ لَا يُسْئَلُ شَيْئًا فَيَمْنَعُهُ -
৯২. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর নিকট যখনই কোনো কিছু চাওয়া হতো, তিনি তা প্রদান করতেন, নিষেধ করতেন না।
۹۳ . عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ أَبِي بَكْرٍ عَنْ بَعْضٍ بَنِي سَاعِدَةَ قَالَ سَمِعْتُ أَبَا أسَيْدٍ مَالِكِ ابْنِ رَبِيعَةَ يَقُولُ كَانَ النَّبِيُّ لَا يَمْنَعُ شَيْئًا يُسْئَلُ -
৯৩. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবূ বাকর (রা) বানূ সাঈদার জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন যে, আমি আবূ উসাইদ মালিক ইবন রাবীআ (রা)-কে বলতে শুনেছি, নবী-এর নিকট যে জিনিসই চাওয়া হতো, তিনি তা দিতে অস্বীকার করতেন না (বরং দিয়ে দিতেন)।
٩٤. عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ كَانَ الْمُسْلِمُونَ لَا يَنْظُرُونَ إِلَى أَبِي سُفْيَانَ وَلَا يُقَاعِدُونَهُ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ ثَلَاثُ أَعْطِيْهُنَّ، قَالَ نَعَمْ قَالَ عِنْدِي أَحْسَنُ الْعَرَبِ وَاجْمَلُهُ أُمُّ حَبِيْبَةَ أَزَوِّجُكَمَا قَالَ نَعَمْ، قَالَ وَمُعَاوِيَةَ تَجْعَلُ كَاتِبًا بَيْنَ يَدَيْكَ قَالَ نَعَمْ، وَتُؤْمِرُنِي حَتَّى أَقَاتِلَ الْكُفَّارَ كَمَا قَاتَلْتُ الْمُسْلِمِينَ قَالَ نَعَمْ، قَالَ أَبُو زَمَيْلٍ وَلَوْلَا أَنَّهُ طَلَبَ ذَلِكَ مِنَ النَّبِيِّ مَا أَعْطَاهُ لِأَنَّهُ لَمْ يَكُنْ يُسْئَلُ شَيْئًا قَطُّ إِلَّا قَالَ نَعَمْ .
৯৪. হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুসলিম জনতা হযরত আবু সুফিয়ান (রা)-কে (তাঁর কাফির থাকাকালে মুসলমানদের সাথে চরম শত্রুতা করার কারণে) সুনযরে দেখতেন না। তাঁর সাথে উঠাবসাও করতেন না। একবার আবু সুফিয়ান (রা) বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমাকে তিনটি বিশেষ (মর্যাদা) দান করুন। তিনি বললেন, বেশ ভালো (বলো, তা কি?) আবূ সূফিয়ান (রা) বলেন, আমার কন্যা উম্মু হাবীবা (রা) আরবের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী ও রূপসী রমণী। আমি তাকে আপনার নিকট বিবাহ দিলাম। (আপনি কবুল করুন) তিনি বললেন, বেশ ভালো। তারপর তিনি [আবু সুফিয়ান (রা) বললেন, মুআবিয়াকে আপনি আপনার পেশকার বানিয়ে নিন। তিনি বললেন, বেশ তাই করা হলো। এরপর তিনি [আবূ সুফিয়ান (রা)) বললেন, আপনি আমাকে কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য সেনাপতি (আমীরুল হাব) বানিয়ে দিন। যাতে আমি পূর্বে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যেরূপ যুদ্ধ করেছিলাম, এখন কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তার প্রায়শ্চিত্ত করতে পারি। নবী বললেন, বহুত আচ্ছা। তিনি তাঁকে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বাহিনীর অধিনায়ক বানিয়ে দিলেন। আবূ যামীল (র) বলেন, আবূ সুফিয়ান (রা) যদি নবী-এর নিকট ঐগুলো প্রার্থনা না করতেন, তবে তিনি তা তাঁকে আদৌ দান করতেন না। কিন্তু কথা হচ্ছে, নবী-এর নিকট কেউ কোনো জিনিস প্রার্থনা করলে তিনি তা তাকে দান করতেন। অস্বীকার করতেন না।
ফায়দা: এ হাদীস সামান্য পরিবর্তনসহ মুসলিম শরীফে আবূ সুফিয়ানের মর্যাদা ও গুণাবলি অনুচ্ছেদে উল্লিখিত হয়েছে। কিন্তু এ হাদীসের প্রথম অংশ সম্পর্কে হাদীস-বিশেষজ্ঞগণের চরম আপত্তি রয়েছে। আর তা হচ্ছে সকল ঐতিহাসিক এ ব্যাপারে একমত যে, হযরত আবূ সুফিয়ান (রা) ৮ হিজরীতে মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন। আর নবী-এর সাথে উম্মুল মু'মিনীন হযরত উম্মু হাবীবা (রা)-এর বিবাহ হয়েছিল তার বহু আগে ৬ হিজরী (মতান্তরে ৭ হিজরীতে)। তখন আবু সুফিয়ান মুসলমানও হননি। সুতরাং এ সময় হযরত আবু সুফিয়ান (রা) কর্তৃক তাঁর কন্যা উম্মু হাবীবাকে বিবাহের জন্য নবী-এর নিকট পেশ করা কোনোক্রমেই সঠিক হতে পারে না। কোনো কোনো আলিম লিখেছেন, মূলত হযরত আবু সুফিয়ান (রা) নবী-এর কাছে এই প্রস্তাব করেছিলেন ইসলাম গ্রহণের পরে স্বীয় সন্তোষ প্রকাশের মানসে। যেনো এ সময়ে তিনি স্বীয় সম্মতি জ্ঞাপনার্থে নতুনভাবে নবী-এর কাছে প্রস্তাব করছেন। যা হোক, হাদীসটির সনদ দুর্বল। এ হাদীস বর্ণনা করা দ্বারা গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে নবী-এর বদান্যতা ও দানশীলতা বর্ণনা করা। নবী আবু সুফিয়ানের মতো ইসলামের শত্রুকেও ইসলাম গ্রহণের পর গৌরব ও মর্যাদা দান করতে কার্পণ্য করেননি। এ কারণেই এ হাদীসটি গ্রন্থকার তাঁর কিতাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। যেনো নবী -এর দরবার থেকে ধনসম্পদের মতো মান- মর্যাদাও অকাতরে দান করা হতো।
٩٥ عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَجُلًا أَتَى النَّبِيَّ وَ يَسْأَلُهُ فَقَالَ مَا عِنْدِي شَيْ وَلَكِنْ ابْتَعْ عَلَى فَإِذَا جَاءَنَا شَيْ قَضَيْنَاهُ - قَالَ عُمَرُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا كَلَّفَكَ اللَّهُ مَا لَا تَقْدِرُ عَلَيْهِ قَالَ فَكَرِهَ النَّبِيُّ فَقَالَ رَجُل أَنْفِقْ وَلَا تَخَفْ مِنْ ذِي الْعَرْشِ اقْلاَلاً، فَتَبَسَّمَ النَّبِيُّ ﷺ وَعُرِفَ السَّرُورُ فِي وَجْهِهِ -
৯৫. হযরত উমর ইবন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত, একবার কোনো এক (অভাবী) লোক নবী-এর নিকট এসে (আর্থিক সাহায্য) প্রার্থনা করলো। তিনি বললেন, আমার নিকট এ মুহূর্তে কিছু নেই। তুমি আমার নামে কিনে নাও। আমার কাছে যখন কিছু আসবে তখন তা আমি পরিশোধ করে দেবো। হযরত উমর (রা) বলেন, (এ কথা শুনে) আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আল্লাহ্ আপনাকে সাধ্যের অতীত কোনো কাজ করার নির্দেশ দেননি। বর্ণনাকারী বলেন, নবী হযরত উমরের এ কথা পছন্দ করলেন না। তখন অন্য এক সাহাবী বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি দেদার খরচ করুন এবং আরশের মালিকের পক্ষ থেকে স্বল্পতার আশংকা একেবারেই করবেন না। নবী (এই সাহাবীর কথা খুব পছন্দ করলেন এবং) মুচকি হাসলেন। তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডলে তখন আনন্দের চিহ্ন ফুটে উঠলো।
ফায়দা: এ হাদীস থেকেও নবী-এর বদান্যতা ও দানশীলতার পরাকাষ্ঠা অনুমিত হয়। তাঁর কাছে কিছুই নেই; তা সত্ত্বেও তিনি প্রার্থনাকারীকে দান করতে অস্বীকার করলেন না, তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিলেন না। বরং অন্যের নিকট থেকে ধার করে তার প্রয়োজন পূরণ করতে বললেন এবং সে ধার নিজে পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। কোনো প্রার্থনাকারীকেই শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেয়া তিনি পছন্দ করতেন না। তাঁর দান ও বদান্যতা হযরত উমর (রা)-এর মতো সুবিখ্যাত সাহাবীর পরামর্শ ও অভিমতের উপর প্রাধান্য পেল। দানের ব্যাপারে নবী হযরত উমর (রা)-এর পরামর্শও মেনে নেননি বরং একজন সাধারণ সাহাবীর কথা পছন্দ করেন। দানের সপক্ষে মত প্রকাশ করায় একজন সাধারণ সাহাবীর কথায় তিনি উৎফুল্ল হন।
٩٦ عَنْ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمُ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّهُ قَالَ بَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ وَمَعَهُ النَّاسُ مَقْفَلَهُ مِنْ حُنَيْنِ عَلَقَتِ الأَعْرَابُ يَسْأَلُونَهُ حَتَّى اضْطَرُّوهُ إِلَى سُمُرَةٍ فَخَطِفَتْ رِدَاءَهُ فَوَقَفَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَقَالَ أَعْطُونِي رِدَانِي، لَوْ كَانَ لِي عَدَدُ هُذِهِ الْعِضَاءِ نَعَمًا لَقَسَمْتُهُ بَيْنَكُمْ ثُمَّ لاَ تَجِدُوْنِي بَخِيْلاً وَ لَا كَذَّابًا ولَا جَبَانًا -
৯৬. হযরত জুবায়র ইন্ন মুতইম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ লোকদের সাথে হুনাইনের যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। তখন কিছু গ্রামীণ লোক তাঁকে জড়িয়ে ধরলো এবং (আর্থিক) সাহায্য প্রার্থনা করলো। এমনকি তারা তাঁকে ঠেলে একটি কণ্টকময় বৃক্ষের কাছে নিয়ে গেলো এবং তাতে তাঁর চাদরখানা আটকে গেলো। তখন রাসূলুল্লাহ্ থেমে গেলেন এবং বললেন, আমার চাদরটি আমাকে দিয়ে দাও। যদি আমার কাছে এখন এই কাঁটাযুক্ত বৃক্ষের কাঁটা সংখ্যক জন্তু (চতুষ্পদ প্রাণী) থাকতো, তবে আমি তাও তোমাদের মধ্যে বিতরণ করে দিতাম। এ ব্যাপারে তোমরা আমাকে কৃপণ দেখতে পেতে না এবং (ওয়াদা করার ক্ষেত্রে) মিথ্যুক ও (ব্যয় করার ব্যাপারে ভীত ও) কাপুরুষও দেখতে না।
ফায়দা : এ হাদীস হুনাইন যুদ্ধ সম্পর্কিত। নবী হুনাইন যুদ্ধে যে সম্পদ লাভ করেছিলেন, তা সাহাবাদের মধ্যে বণ্টন করে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। তখন তাঁর নিকট অবশিষ্ট কিছুই ছিল না। পথিমধ্য গ্রামীণ লোকেরা অজ্ঞতাবশত এসে তাঁকে ঘিরে ধরলো এবং আর্থিক সাহায্য প্রার্থনা করলো। নবী অপারগ ছিলেন। তিনি তাদেরকে জানালেন যে, যদি আমার কাছে এখন কোনো সম্পদ থাকতো, তবে আমি তোমাদেরকে অবশ্যই সাহায্য করতাম। সামান্যতম কার্পণ্য করতাম না।
۹۷ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي لَيْلى قَالَ سَمِعْتُ أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَيَّا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ يَقُولُ آتَيْتُ أَنَا وَفَاطِمَةُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا وَالْعَبَّاسُ وَزَيْدُ بْنُ حَارِثَةَ النَّبِيُّ ﷺ فَقَالَ الْعَبَّاسُ يَا رَسُولَ اللهِ : كَبِرَ سِنِّي وَرَقَ عَظَمِي رَأَيْتَ أَنْ تَأْمُرَ لِي بِكَذَا وَسَقَا مِنَ الطَّعَامِ فَافْعَلَ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَأَفْعَلُ، فَقَالَتْ فَاطِمَةُ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا يَا رَسُولَ اللهِ : إِنْ رَأَيْتَ أَنْ تَأْمُرْ لِي كَمَا أَمَرْتَ لِعَمِّكَ فَافْعَلْ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَأَفْعَلُ، فَقَالَ زَيْدُ ابْنُ حَارِثَةَ أَرْضًا كَانَتْ مَعِيشَتِي مِنْهَا ثُمَّ قَبَضْتَهَا فَإِنْ رَأَيْتَ أَنْ تَرُدَّهَا عَلَى فَافْعَلُ ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَأَفْعَلُ فَقُلْتُ أَنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنْ رَأَيْتَ أَنْ تُوَلِّيَنِي هُذَا الْحَقُّ الَّذِي جَعَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لَنَا فِي كِتَابِهِ مِنْ هَذَا الْخُمُسُ فَأَقْسِمْهُ فِي حَيَاتِكَ حَتَّى لَايُنَازِ عَنِيْهِ أَحَد بَعْدَكَ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَأَفْعَلُ ذَلِكَ فَوَلَانِيْهِ رَسُولُ اللهِ ﷺ -
৯৭. হযরত আবদুর রহমান ইব্ন আবূ লায়লা (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমীরুল মু'মিনীন হযরত আলী (রা)-কে বলতে শুনেছি, আমি, ফাতিমা, আব্বাস ও যায়দ ইবন হারিসা (রা) একবার নবী -এর নিকট হাযির হলাম। তখন আব্বাস (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার বয়স অনেক হয়েছে এবং আমার শক্তি খর্ব হয়ে গেলো। সুতরাং আপনি সঙ্গত মনে করলে আমার জন্য বায়তুল মাল থেকে এতো এতো ওয়াসাক খাদ্যশস্য দেয়ার নির্দেশ দিন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁর আবেদন মঞ্জুর করলেন এবং বললেন, আমি অবশ্যই তা করবো। এরপর ফাতিমা (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি আপনার চাচার জন্য যে নির্দেশ দিয়েছেন, সঙ্গত মনে করলে আমার জন্যও অনুরূপ সাহায্যের নির্দেশ দিন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁর আবেদনও মঞ্জুর করলেন এবং বললেন, আমি তোমার জন্যও তাই করবো। এরপর (তাঁর আযাদকৃত দাস পালক পুত্র) যায়দ ইবন হারিসা (রা) বলেন, আমার নিকট একখণ্ড জমি ছিল। তা দিয়ে আমার জীবিকা নির্বাহ হতো। আপনি আইনের বলে তা বাজেয়াপ্ত করেছেন। এখন আপনি যদি সঙ্গত মনে করেন, তবে সেই জমিটুকু আমাকে ফেরত দিন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁর আবেদনও মঞ্জুর করলেন এবং বললেন, আমি অবশ্যই তা করবো। হযরত আলী (রা) বলেন, তারপর আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি যদি সঙ্গত মনে করেন, তবে আমাকে বায়তুল মাল থেকে এক-পঞ্চমাংশ মালে গনীমতের অধিকার, যা আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর কিতাবে আমাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন-বণ্টন করার মুতাওয়াল্লী বানিয়ে দিন। তাহলে আমি তা আপনার জীবদ্দশায়ই বণ্টন করতে থাকবো এবং আপনার পরে এ ব্যাপারে আমার সাথে কেউ বিবাদে লিপ্ত হতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ্ তাঁর আবেদনও মঞ্জুর করলেন এবং বললেন, আমি তা অবশ্যই করবো। হযরত আলী (রা) বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ্ আমাকে ঐ এক-পঞ্চমাংশ বণ্টন করার নির্দেশ দান করেন।
ফায়দা : এ পূর্ববর্তী হাদীসসমূহে নবী-এর বদান্যতা সম্পর্কে বিশদ আলোচনা এসেছে। এ হাদীস থেকে বোঝা যায়, নবী যেরূপ অন্যদেরকে তাঁর বিপুল বদান্যতা ও দানশীলতা দ্বারা বিভূষিত করতেন, অনুরূপ তাঁর আত্মীয়-স্বজনের সাথেও দয়া-দাক্ষিণ্য প্রদর্শন করতেন-এটাই হচ্ছে আল্লাহ্ তা'আলার নির্দেশ। আর এ কারণেই তিনি তাঁর আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন এবং তাদেরকে ধন-সম্পদ দান করা ছিল তাঁর মহান চরিত্রের একটি বিশেষ গুণ। এ হাদীসে উল্লিখিত নবী-এর নিকট সাহায্য প্রার্থনার জন্য আগত ব্যক্তিগণ ছিলেন তাঁর আত্মীয়-স্বজন। হযরত আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিব (রা) তাঁর শ্রদ্ধেয় চাচা। হযরত ফাতিমা (রা) তাঁর কলিজার টুকুরা স্নেহের কন্যা। হযরত আলী (রা) তাঁর চাচাত ভাই ও স্নেহের জামাতা এবং হযরত যায়দ ইবন হারিসা (রা) নবী-এর প্রিয় সাহাবী ও আযাদকৃত গোলাম ও পালক পুত্র। এই ব্যক্তিগণ নবী -এর নিকট এসে নিজ নিজ প্রয়োজন তুলে ধরেন এবং তিনি তাঁর পরম ঔদার্য ও সহানুভূতিবশত তাঁদের সবার আবেদন মঞ্জুর করেন। কাউকেই শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেননি।
۹۸ عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ قَالَتْ أَنْشَدَ أَبُو بَكْرٍ قَوْلَ لَبِيْدٍ : أَخٌ لِي أَمَّا كُلُّ شَيْ سَأَلْتُهُ فَيُعْطَى وَأَمَّا كُلُّ ذَنْبٍ فَيَغْفِرُ : فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ هُكَذَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ
৯৮. হযরত আসমা বিন্ত আবূ বক্স (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার (হযরত) আবূ বক্স সিদ্দীক (রা) কবি লবীদ (রা)-এর এই পংক্তি দু'টি আবৃত্তি করলেন:
أَخٌ لِي أَمَّا كُلُّ شَيْ سَأَلْتُهُ + فَيُعْطِي وَأَمَّا كُلُّ ذَنْبٍ فَيَغْفِرُ
"আমার এক ভাই আছে, আমি যদি তাঁর কাছে কিছু চাই, তিনি তা তৎক্ষণাৎ আমাকে দিয়ে দেন এবং সব দোষত্রুটি ক্ষমা কর দেন।" এবং বললেন, রাসূলুল্লাহ এ গুণেই গুণান্বিত ছিলেন।
ফায়দা : হযরত লবীদ (রা) জাহিলিয়াত যুগের বিখ্যাত কবিদের অন্যতম। তাঁর নাম লবীদ ইব্ন রাবীআ ইব্ন মালিক। বানু কিলাব প্রতিনিধি দলের সাথে তিনি নবী -এর দরবারে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি কাব্যচর্চা ত্যাগ করেন। (মাআরিফে ইব্ন কুতায়বা, পৃষ্ঠা-৩৩২)। অপর এক হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, নবী বলেন : লবীদের সবচেয়ে সত্য কবিতা হচ্ছে এটি :
الا كُلُّ شَيْ مَا خَلَا اللهُ بَاطِل + وَكُلُّ نَعِيمٍ لَا مَحَالَةً زَائِلُ -
জেনে রাখো, আল্লাহ্ ছাড়া সব জিনিসই বাতিল ও মিথ্যা আর দুনিয়ার সব নিয়ামতই নিশ্চিত বিলীয়মান। (বুখারী শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০৮)
নবী হযরত লবীদ (রা)-এর কবিতা খুব পছন্দ করতেন। কেননা, তাঁর কবিতায় প্রায়শ আল্লাহ্ তাওহীদ, রিসালাত, কিয়ামত, পুরস্কার, শাস্তি ইত্যাদি উল্লেখিত হতো।
গ্রন্থকার এ হাদীসটি নবী -এর দানশীলতা ও বদান্যতা অনুচ্ছেদে উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে, হযরত লবীদ (রা) তাঁর এই কবিতায় তাঁর মামদূহ বা প্রশংসিতের দানশীলতা ও বদান্যতার আলোচনা করেছেন। তাই হযরত আবূ বক্র (রা) এই কবিতাটি রাসূলুল্লাহ্ -এর উদ্দেশ্যে আবৃত্তি করেন। অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন যে, আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা দানশীলতা ও বদান্যতা গুণের এই মানদণ্ডে পুরোপুরি উত্তীর্ণ ছিলেন।
টিকাঃ
১. 'ওয়াসাক' একটি মাপের নাম, যা ষাট সা-এর সমান। সা হলো সাড়ে তিন সের। কারো কারো মতে 'ওয়াসাক' এক উট সমান বোঝাকেও বলা হয়।
📄 নবী (সা)-এর সাহসিকতা ও বীরত্ব
۹۹. عَنْ عَلِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ لَقَدْ رَأَيْتُنِي يَوْمَ بَدْرٍ وَنَحْنُ نَلُوْذُ بِالنَّبِيِّ
هُوَ أَقْرَبُنَا إِلَى الْعَدُوِّ وَكَانَ مِنْ أَشَدَّ النَّاسِ يَوْمَئِذٍ بَأْسًا -
৯৯. হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমি স্বচক্ষে দেখেছি যে, আমরা নবী -এর আশেপাশে আশ্রয় খুঁজছিলাম। আর তিনি আমাদের সকলের তুলনায় শত্রুদের বেশি কাছাকাছি পৌঁছে মুকাবিলা করে যাচ্ছেন। বদরের সেদিন তাঁরই বীরত্ব ও সাহসিকতা ছিল সর্বাধিক।
ফায়দা : চরিত্র বিশারদদের সকলে এ মর্মে একমত যে, মানব চরিত্রের সবচেয়ে বড় উপাদান হলো বীরত্ব। মানুষের যাবতীয় সদ্গুণ বীরত্বের এই ভিত্তির উপরেই গড়ে উঠে। বীরত্বের কারণে মানুষ নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা, দরদ ও অনুকম্পা, হিম্মত, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সত্য প্রকাশে নির্ভীকতা ইত্যাকার মহৎ ও উন্নত চরিত্র মাধুরী অর্জনে সক্ষম হয়। কাপুরুষ ও মনোবলহীন লোকেরা কোন কৃতিত্বের কাজ সম্পাদনে যেমন অনুপযুক্ত তেমনি নৈতিকতার মানদণ্ডেও সে হীনবল বিবেচিত হয়ে থাকে। সে মানবীয় সদ্গুণাবলি ও উন্নত চরিত্র থেকে হয় বঞ্চিত। পক্ষান্তরে যাঁরা সাহসী ও বীর পুরুষ তাঁরা সর্বদা আত্মপ্রত্যয়ী, নীতিবান, সত্যভাষী, দৃঢ় চরিত্র, ধৈর্যশীল, গম্ভীর ও ক্ষমাপরায়ণ থাকেন। এভাবে দানশীলতা, বদান্যতা, মেহমানদারী, পরোপকার ইত্যাদি সাহসী মানুষদেরই বিশেষণরূপে পরিচিত।
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সাহসিকতা ও বীরত্বের ক্ষেত্রেও ছিলেন মানুষের মধ্যে সকলের ঊর্ধ্বে। তিনি অবিচলতা ও অফুরন্ত দৃঢ়তার অধিকারী ছিলেন। জিহাদ ও রণক্ষেত্রে প্রদর্শিত তাঁর বীরত্বের বহু ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, কখনো কোন কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখে তিনি হিম্মত হারাতেন না। চরিত্রের দৃঢ়তা ও অসীম সাহসিকতা বুকে নিয়ে যাবতীয় পরিস্থিতির মুকাবিলা করে যেতেন। হুনাইন যুদ্ধে হাওয়াযিন গোত্রের লোকেরা মুসলিম বাহিনীর উপর বৃষ্টির ন্যায় তীরবর্ষণ শুরু করে। তীরন্দাজদের প্রবল আক্রমণে সাহাবীদের বহু সংখ্যক তখন মনোবল হারিয়ে ফেলেন এবং রণক্ষেত্র থেকে পিছিয়ে পড়েন।
অথচ প্রিয় নবী তখন রণক্ষেত্রে অটল দণ্ডায়মান। তাঁর চতুষ্পার্শ্বে ছিলেন কেবল কয়েকজন জানবাজ সাহাবী। তাঁরা সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় তাঁকে ঘিরে রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। এ কঠিনতম মুহূর্তে তিনি বিন্দুমাত্রও বিচলিত হননি বরং সীমাহীন সাহসিকতা ও বীরত্ব নিয়ে সঙ্গীদের মনোবল ও হিম্মত বৃদ্ধি করতে থাকেন। সামান্যতম পিছে না হটে যথারীতি কাফিরদের সঙ্গে মুকাবিলা চালিয়ে যান।
অনুরূপ একবার তিনি একটি বৃক্ষের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তখন অতর্কিতভাবে জনৈক কাফির যোদ্ধা সম্মুখে এসে তরবারি তাক করে দাঁড়ায়। লোকটি প্রিয় নবী -এর ঠিক মাথা মুবারকের বরাবর দাঁড়িয়ে বলল, হে মুহাম্মদ! এবার আমার হাত থেকে তোমাকে কে বাঁচাবে? প্রিয় নবী ভয়ভীতি বিহীন শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন: আল্লাহ্। তাঁর এই নির্ভীকতা দেখে ও বীরত্বপূর্ণ উত্তর শুনে লোকটির হৃদকম্পন শুরু হলো এবং তার হাত থেকে তাক করা তরবারি মাটিতে পড়ে গেল। (সহীহ্ বুখারী, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৫৯২)। প্রিয় নবী -এর জীবনে এ ধরনের আরো বহু ঘটনা ইতিহাস গ্রন্থাবলিতে বিদ্যমান। এ সকল ঘটনার আলোকে তিনি যে কতখানি সাহসিকতা ও বীরত্বের অধিকারী ছিলেন তা সুস্পষ্ট বোঝা যায়।
১০০. عَنْ عَلِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كُنَّا إِذَا أَحْمَرَ الْبَاسُ وَلَقِيَ الْقَوْمُ اتَّقَيْنَا بِرَسُولُ اللهِ ﷺ فَمَا يَكُونُ أَحَدُ أَقْرَبَ إِلَى الْعَدُوِّ مِنْهُ
১০০. হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রণক্ষেত্রে যুদ্ধ যখন ঘোরতর আকার ধারণ করত এবং একদল অন্যদলের মুখোমুখি হয়ে লড়াই শুরু করত, তখন আমরা নবী-এর চতুষ্পার্শ্বে আশ্রয় খুঁজতাম। আমাদের মধ্যে কেউ শত্রুপক্ষের মুকাবিলায় নবী-এর চেয়ে অগ্রবর্তী থাকত না (অর্থাৎ তিনি মুকাবিলায় সকলের অগ্রবর্তী থাকতেন)।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসটিও প্রিয় নবী-এর অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের কথা প্রকাশ করছে। কেননা কাফিরদের সঙ্গে যখন মুসলমানদের যুদ্ধ শুরু হতো এবং একদল অন্যদলের মুখোমুখি হয়ে লড়াই শুরু করত, তখন শত্রুপক্ষের সংখ্যাধিক্য এবং নিজেদের যুদ্ধ উপকরণের অপ্রতুলতা দেখে এই গুটিকতক নিরস্ত্র মুসলমান সৈন্যদের মনে ভীতির উদ্রেক হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিশেষত যে সকল যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর হাতে যুদ্ধ সরঞ্জাম বলতে কিছুই ছিল না। তখন যে কোন তেজস্বী, বাহাদুর ব্যক্তিরও শংকিত হয়ে ওঠা স্বাভাবিক। অথচ প্রিয় নবী-এর মনোবল এমন মুহূর্তগুলিতেও কেবল দৃঢ় থাকতো তাই নয় বরং নিজে অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের সঙ্গে তরবারি নিয়ে কাফিরদের সারির ভিতর ঢুকে পড়তেন। তখন মুসলিম সৈনিকদের অন্যরাও প্রিয় নবী-এর কাছাকাছি আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করতেন। কতিপয় হাদীসের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় ঘোররত লড়াইয়ের তোড়ে লোকজন দূরে হটে যেত। এ মুহূর্তে যাঁরা প্রিয় নবী-এর সঙ্গে ও কাছাকাছি থাকতেন সাহাবীদের মধ্যে তাঁদেরকে বীর সেনানী বলে বিবেচনা করা হতো।
١٠١. عَنْ سَعْدِ بْنِ عِبَاضِ الثَّمَالِي قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَلِيْلَ الْكَلَامِ قَلِيْلَ الْحَدِيثِ فَلَمَّا أُمِرَ بِالْقِتَالِ تَشَمَّرَ وَكَانَ مِنْ أَشَدِّ النَّاسِ بَأْسًا -
১০১. হযরত সাদ ইব্ন ইয়ায সামালী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ স্বভাবত ছিলেন বাকসংযমী ও মিতভাষী। কিন্তু যখন তিনি যুদ্ধের জন্য আদিষ্ট হতেন তখন এমনভাবে প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন যে তাঁকে সর্বাধিক বলিষ্ঠ যোদ্ধা ও সাহসী বলে দেখা যেত।
ফায়দা : উপরোক্ত হাদীসে প্রিয় নবী-এর দু'টি গুণের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এক. মিতভাষী হওয়া, দুই. সাহসী ও বাহাদুর হওয়া। মিতভাষী হওয়া মানব জীবনে অন্যতম সদ্গুণ। অথচ অতিশয় সহজলভ্য একটি আমল। একখানা হাদীসে প্রিয় নবী ইরশাদ করেন: আমি কি তোমাদের অত্যন্ত হালকা ও সহজলভ্য একটি আমলের কথা জানাবো? সে আমলটি হলো নীরব থাকা এবং চরিত্রবান হওয়া। (তারগীব ওয়া তারহীব, খ. ৪, পৃষ্ঠা ৩২১)
বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে প্রিয় নবী -এর স্বল্পভাষী হওয়া সম্পর্কীয় আরো বহু রিওয়ায়াত বিদ্যমান। এ সব রিওয়ায়াতের আলোকে বোঝা যায় যে, মিতভাষী হওয়াও মানব চরিত্রের অন্যতম সদ্গুণ। চরিত্র বিশারদ ও দার্শনিকদের কেউই এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন না।
গ্রন্থকার এখানে প্রিয় নবী -এর সাহসিকতা ও বীরত্বের আলোচনা প্রসঙ্গে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। কেননা হাদীসখানার শেষ বাক্যটি থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, প্রিয় নবী -কে যখনই আল্লাহ্ পাকের তরফ থেকে কোন জিহাদ বা যুদ্ধের জন্য আদেশ করা হতো তখনই তিনি কোন দ্বিধাদ্বন্দু ব্যতিরেকে অতিশয় বীরত্ব ও সাহসিকতাসহ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যেতেন। আবার রণক্ষেত্রেও তিনি সবচেয়ে অধিক সাহসী ও বীর ব্যক্তি হিসাবে প্রমাণিত হতেন।
۱۰۲. عَنِ الْبَرَاءِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كُنَّا وَاللَّهِ إِذَا أَحْمَرَّ الْبَاسُ نَتَّقِي بِهِ يَعْنِي النَّبِيُّ ﷺ وَإِنَّ الشَّجَاعَ مِنَّا الَّذِي يُحَاذِي بِهِ -
১০২. হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ্র কসম! যখন আমাদের যুদ্ধ ভয়ানক আকার ধারণ করত, তখন আমরা প্রিয় নবী -এর কাছে এসে আশ্রয় নিতাম। আর আমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিকেই সবচেয়ে বড় সাহসী ও বীর বলে গণ্য করা হতো যিনি যুদ্ধকালে প্রিয় নবী -এর সঙ্গে সঙ্গে থাকতেন।
ফায়দা: প্রিয় নবী -এর চরিত্রে যেভাবে অন্যান্য অতুলনীয় যোগ্যতা ও গুণাবলি পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান ছিল তেমনি সাহসিকতা ও বীরত্বও ছিল অতুলনীয় ও অসীম। বড় বড় যুদ্ধগুলিতে এবং যুদ্ধ জীবনের চরম আতংকের মুহূর্তগুলোর মধ্যেও তিনি এতখানি দুঃসাহসিকতার প্রমাণ দিয়েছিলেন যে, যখন বীর বাহাদুর সাহাবীগণ পর্যন্ত হিম্মতহারা হয়ে যাচ্ছিলেন এবং নিজেরা কোন আশ্রয়ের তালাশ শুরু করেছিলেন। সে মুহূর্তে সকলে তাঁর আশ্রয় পেয়ে পুনর্বার যুদ্ধ চালানোর হিম্মত লাভ করতেন। তা ছাড়া সাহাবীদের মধ্যে তখন তাঁকেই সবচেয়ে শক্তিশালী বীর বলে জ্ঞান করা হতো, যিনি নবী -এর আশ্রয়ে থেকে যুদ্ধ চালনায় দৃঢ় থাকতে সক্ষম হতেন।
۱۰۳. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ بِالْمَدِينَةِ فَزَعٌ وَرَكِبَ رَسُولُ الله ﷺ فَرَسًا لِأَبِي طَلْحَةَ فَقَالَ مَا رَأَيْنَا مِنْ شَيْءٍ وَإِنْ وَجَدْنَاهُ لَبَحْرًا -
১০৩. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার মদীনা শরীফের (এর উপর শত্রুরা অতর্কিত হামলা চালিয়েছে বলে গুজব রটেছিল। ফলে) সর্বত্র ভয় ও আতংক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় নবী হযরত আবূ তালহা (রা)-এর ঘোড়ার উপর সওয়ার হন (এবং শত্রুদের গতিবিধি জানার জন্য সম্পূর্ণ একাকী অবস্থায় তিনি বেরিয়ে পড়েন। এভাবে পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল হওয়ার পর তিনি যখন ফিরে আসেন তখন) বলেন: আমি তো এখানে ভয়ের কিছুই দেখিনি। আমি আবু তালহার ঘোড়াটিকে সমুদ্রের মত দ্রুতগতিসম্পন্ন পেলাম।
ফায়দা : এই হাদীসসহ সম্মুখে আরো দু'টি হাদীস আসছে, সবগুলোর মূল বক্তব্য অভিন্ন। ঘটনাটি ছিল এমন যে, একবার মদীনা শরীফের সর্বত্র সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল যে, 'শত্রুরা মদীনার উপর আক্রমণ চালিয়েছে। এ সংবাদ খুব দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষকে দারুণ আতংকের মধ্যে ফেলে দেয়। ভয়ের আতিশয্যে কেউ এগিয়ে পরিস্থিতির সঠিক পর্যবেক্ষণের হিম্মতটুকুও পাচ্ছিল না। কিন্তু প্রিয় নবী এ আতংকের কোন পরোয়া করেননি। তিনি তৎক্ষণাৎ হযরত আবূ তালহা (রা)-এর ঘোড়াটি নিয়ে পরিস্থিতির সঠিক পর্যবেক্ষণের জন্য সম্মুখের দিকে সম্পূর্ণ একাকী ছুটে চললেন। নবী দ্রুতগামী এ ঘোড়াটি নিয়ে মদীনা শরীফের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত চলে যান। কিন্তু কোথাও শত্রুদের আক্রমণের কোন চিহ্ন দেখতে পাননি। তিনি বুঝলেন এটি সম্পূর্ণ গুজব। কাজেই তিনি ফিরে আসলেন এবং লোকজনকে সান্ত্বনা ও অভয় দিয়ে বললেন: তোমরা ভয় পেয়ো না। এখানে আমি আতংকের কিছুই দেখিনি। অতঃপর নবী আবু তালহার ঘোড়ার প্রশংসা করে বললেন: এই ঘোড়াটি সমুদ্রের মত অত্যন্ত বেগবান ও দ্রুতগতি সম্পন্ন।
١٠٤. عَنْ أَنَسِ ابْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ فَزِعَ أَهْلُ المَدِينَةِ مَرَّةً فَرَكِبَ النَّبِيُّ ﷺ فَرَسًا كَأَنَّهُ مُقَرِّفُ فَرَكَضَهُ فِي آثَارِهِمْ فَلَمَّا رَجَعَ قَالَ وَجَدْنَاهُ بَحْرًا
১০৪. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার মদীনা শরীফের অধিবাসীরা (শত্রুদের আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে এই গুজবে) ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গিয়েছিল। নবী তৎক্ষণাৎ জীর্ণশীর্ণ দুর্বল একটি ঘোড়ায় আরোহণ করেন। তিনি এটিকে দ্রুত আক্রমণকারীদের দিকে ছুটিয়ে নিলেন। অবশেষে ফিরে এসে বললেন, আমি এটিকে সমুদ্রের মত বেগবান পেলাম (অথচ তোমরা একে দুর্বল ও ধীরগতি সম্পন্ন বলছ)।
١٠٥ عَنْ عِمْرَانَ بْنِ الحُسَيْنِ قَالَ مَا لَقِي النَّبِيُّ ﷺ إِلَّا كَانَ أَوَّلَ مَنْ يَضْرِبُ
১০৫. হযরত ইমরান ইবন হুসাইন (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোন শত্রুবাহিনীর সঙ্গে নবী -এর যখন মুকাবিলা হতো তখন যুদ্ধে তিনিই থাকতেন প্রথম আক্রমণকারী।
ফায়দা: কাফির, মুশরিক ও আল্লাহ্র দুশমনদের বিরুদ্ধে তরবারি উত্তোলনের কাজেও প্রিয় নবী থাকতেন সবার অগ্রে। প্রিয় নবী -এর এই ভূমিকা গ্রহণ তাঁর অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় বহন করে। তা ছাড়া তিনি মানসিকভাবে কতখানি দৃঢ়চেতা ও প্রবল শক্তিমান ছিলেন বর্ণিত হাদীস থেকে এটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
١٠٦. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ مِنْ أَشْجَعِ النَّاسِ وَأَسْمَحِ النَّاسِ-
১০৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে রাসূলুল্লাহ্ ছিলেন অসীম সাহসী ও সর্বোচ্চ দানশীল ব্যক্তি।
ফায়দা : উল্লিখিত হাদীসে প্রিয় নবী ﷺ-এর বিশেষ মানের দু'টি সদ্গুণের উল্লেখ করা হয়েছে। একটি হলো, তাঁর সীমাহীন বীরত্ব ও দুঃসাহসিকতা। আর অপরটি হলো পরম দানশীলতা ও বদান্যতা। দার্শনিক ও চরিত বিশারদদের সকলে এ মর্মে একমত যে, এই বীরত্ব ও দানশীলতা একটি অপরটির অনিবার্য ফলশ্রুতি।
۱۰۷. عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَحْسَنَ النَّاسِ وَأَشْجَعَ النَّاسِ وَأَسْمَحَ النَّاسِ-
১০৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক সুপুরুষ, সর্বাধিক সাহসী ও সবচেয়ে বেশি দয়া-দাক্ষিণ্যের অধিকারী।
ফায়দা : উপরোক্ত হাদীসে প্রিয় নবী ﷺ-এর তিনটি উল্লেখযোগ্য বিশেষণের কথা বলা হয়েছে। এক. তাঁর অতুলনীয় শারীরিক সুগঠন ও সৌন্দর্য, দুই. তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতা, তিন, তাঁর দানশীলতা ও দয়া-দাক্ষিণ্য। কোন সন্দেহ নেই যে, প্রিয় নবী ﷺ-এর পবিত্র সত্তা নবুওয়াতের ক্ষেত্রে যেমন সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত শিখরে অধিষ্ঠিত ছিল, তেমনি তাঁর এ সত্তা নীতিপরায়ণতা ও উন্নত চরিতাদর্শের ক্ষেত্রেও ছিল সর্বোচ্চ শিখরে প্রতিষ্ঠিত। এ মাকাম তথা মর্যাদা শুধুমাত্র তাঁর জন্যই। কারোর পক্ষে এতখানি উচ্চে আরোহণ কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়। আল্লাহ্ পাক আমাদেরকে তাঁর প্রিয়তম বন্ধুর উন্নত অনুপম চরিতাদর্শ অনুসরণের তাওফীক দান করুন। আমীন।
۱۰۸. عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ صَيْحَةُ بِالْمَدِينَةِ، فَرَكِبَ النَّبِيُّ ﷺ فَرَسًا لَأَبِي طَلْحَةَ، فَأَجْرَاهُ سَاعَةً ثُمَّ رَجَعَ فَقَالَ مَا رَأَيْنَا مِنْ شَيْ وَإِنَّ وَجَدَنَاهُ لَبَحْرًا -
১০৮. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার মদীনা শরীফের উপর শত্রুরা অতর্কিত আক্রমণ চালিয়েছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ল। প্রিয় নবী ﷺ তৎক্ষণাৎ হযরত আবূ তালহা (রা)-এর একটি ঘোড়ায় আরোহণ করেন এবং এক ঘণ্টা পর্যন্ত ঘোড়াটিকে এদিক-ওদিক ছুটিয়ে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেন। অবশেষে (ঘটনার প্রকৃত অবস্থা প্রত্যক্ষ করে) ফিরে এসে বললেন, আমি কিছুই দেখলাম না। (ভয়ের কিছুই নেই) তবে আমি এ ঘোড়াটিকে (গতিশীলতার দিক থেকে) সমুদ্রের ন্যায় পেলাম।
١٠٩. عَنْ أَبِي جَعْفَرٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ شَدِيدَ الْبَطَشِ -
১০৯. হযরত আবূ জাফর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ কঠোর পাকড়াওকারী ছিলেন।
ফায়দা : আলোচ্য হাদীসের আলোকেও বোঝা যায় যে, প্রিয় নবী যেমন সাহসিকতা ও বীরত্বের অধিকারী ছিলেন তেমনি শারীরিকভাবেও তিনি অতিশয় শক্তিশালী ও সবল ছিলেন। একখানা হাদীসে তিনি স্বয়ং ইরশাদ করেন: আমাকে চল্লিশ জন মানুষের সমান শক্তি প্রদান করা হয়েছে। আর এ কারণেই কঠিন থেকে কঠিন কিংবা শক্ত থেকে শক্ততর কোন কাজ যা সাহাবীদের কারোর পক্ষে সম্ভব হতো না সেটি তিনি অনায়াসেই করে দিতে পারতেন। পরবর্তী ১১১ নং হাদীস থেকেও প্রিয় নবী-এর এহেন অতুলনীয় শক্তিমত্তা ও দৈহিক ক্ষমতার প্রমাণ মেলে।
١١٠. عَنِ الْبَرَاءِ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَوْمَ الْخَنْدَقِ يَنْقُلُ التَّرَابَ حَتَّى وَارَى الغُبَارُ شَعْرَ صَدْرِهِ وَرَأَيْتُ النَّبِيُّ ﷺ يَرْتَجِزُ يَوْمَ الخَنْدَقِ وَهُمْ يَحْفِرُونَهُ وَهُوَ يَنْقُلُ التَّرَابَ حَتَّى وَارَى جَلْدَةُ بَطْنِهِ -
১১০. হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি খন্দক যুদ্ধের দিন দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ্ নিজে মাটি বহন করেছেন আর ধুলায় তাঁর বুকের পশমগুলি ঢেকে গিয়েছিল। তিনি বলেন, আমি আরো দেখেছি যে, খন্দকের সে দিন প্রিয় নবী উদ্দীপনাবর্ধক কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। আর সাহাবীগণ পরিখা খনন করে যাচ্ছেন। এ সময় তিনিও অন্যদের সঙ্গে মাটি বহন করেছেন। এমনকি বালির কারণে তাঁর পেটের চামড়া আবৃত হয়ে গিয়েছিল।
ফায়দা : এ ঘটনাটি হলো খন্দক যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের। আলোচ্য হাদীসের উল্লেখের দ্বারা গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হলো প্রিয় নবী-এর সীমাহীন মনোবলের কথা প্রমাণ করা এবং আল্লাহ্র পথে কঠিন থেকে কঠিনতর ও তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতর কোন কাজ সম্পাদন করতে তিনি কতখানি দৃঢ়চেতা ও সাহসী ছিলেন তা তুলে ধরা।
۱۱۱. عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ مَكَثَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَأَصْحَابُهُ يَحْفِرُونَ الخَنْدَقَ ثَلَاثًا مَا ذَاقُوْا طَعَامًا فَقَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ : إِنَّ هَذِهِ كِدْيَةٌ - مِنْ الجَبَلِ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ رَسُوْمًا بِالْمَاءِ فَرَسُوْهَا ثُمَّ جَاءَ النَّبِيُّ ﷺ فَأَخَذَ الْمِعْولَ أَوِ الْمِسْحَاةَ ثُمَّ قَالَ بِسْمِ اللهِ ثُمَّ ضَرَبَ ثَلَاثًا فَصَارَ كَثِيْبًا يَهَالُ، قَالَ جَابِرُ فَحَانَتْ مِنَى الْتِفَاتَةُ فَرَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ وَقَدَ شَدَّ بَطْنَهُ بحجر
১১১. হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (খন্দকের যুদ্ধ চলাকালে) রাসূলুল্লাহ্ ও তাঁর সাহাবীগণ তিন দিন পর্যন্ত অনাহারক্লিষ্ট অবস্থায় পরিখা খননের কাজে নিয়োজিত থাকলেন। (তখন অতিশয় শক্ত ও বিশাল আয়তনের একটি পাথর খোদাই কাজের মুখে বেরিয়ে আসে) সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এটি পর্বতের একটি মস্তবড় পাথর। রাসূলুল্লাহ্ বললেন: তোমরা পাথরটির উপর পানি ছিটিয়ে দাও। সেমতে তাঁরা পানি ছিটিয়ে দিলেন। তারপর প্রিয় নবী তাশরীফ আনেন। তিনি কোদাল বা হাতুড়ি হাতে নিয়ে 'বিসমিল্লাহ্' পাঠ করেন এবং পাথরের উপর তিনবার আঘাত হানেন। ফলে অতিশয় শক্ত পাথরটি এত নরম হয়ে গিয়েছিল যে, আঘাতের দরুন ফেটে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে বালির ন্যায় ঝরে পড়ে গেল। হযরত জাবির (রা) বলেন, এ সময় হঠাৎ আমার দৃষ্টি নবী -এর পেট মুবারকের উপর গিয়ে পড়ল। আমি দেখলাম যে, তিনি (ক্ষুধার আতিশয্যে) পেটের উপর পাথর বেঁধে রেখেছেন।
ফায়দা : আলোচ্য ঘটনাটিও খন্দকের যুদ্ধ প্রস্তুতিকালে ঘটেছিল। ইতিহাসে এ যুদ্ধকে আহযাবের যুদ্ধ নামেও অভিহিত করা হয়েছে। হিজরী ৫ বর্ষের যিল্কাদ মাসে এ যুদ্ধ শুরু হয়। প্রিয় নবী তখন মদীনা শরীফেই অবস্থানরত ছিলেন। আরবের সকল গোত্রের মুশরিক ও ইয়াহুদীরা সকলে সম্মিলিতভাবে مسلمانوں বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এবং পবিত্র মদীনা নগরী অবরোধ করে নেয়। শত্রু বাহিনীর সংখ্যা ছিল ছয় সহস্রাধিক। প্রিয় নবী অবরোধের সংবাদ পেয়ে সাহাবীদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। সাহাবী হযরত সালমান ফারসী (রা) ছিলেন পারস্যের অধিবাসী। তিনি নগর রক্ষার স্বার্থে তখন পরিখা খননের পরামর্শ দিয়ে বলেন, এমনি জটিল মুহূর্তে ইরানী যোদ্ধারা সাধারণত পরিখা খননের ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। সে মতে মদীনা নগরীর অদূরে মুসলিম সৈন্যগণ এক জায়গায় জমায়েত হন। তাঁরা পরামর্শ মোতাবেক পরিখা খননের কাজ শুরু করেন। মুসলমানদের মধ্যে সে মুহূর্তে খুব অভাব-অনটন বিরাজিত ছিল। দুর্ভিক্ষের কারণে মুসলমানগণ তিনদিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ অনাহারে কাটান, মুখে দেয়ার মত সামান্য রসদও তাদের হাতে ছিল না। কারণ শত্রু সৈন্যরা ইতিপূর্বেই মদীনা শরীফ অভিমুখে রসদ পৌছার সকল পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। এদিকে পরিস্থিতি নাজুক বিধায় দ্রুত পরিখা খননের কাজ সমাপ্ত করা আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়।
এভাবে অবরোধ ও খণ্ডযুদ্ধ প্রায় এক মাস যাবত অব্যাহত থাকে। পরিশেষে মহান আল্লাহ্ অদৃশ্য পথে মুসলমানদের সাহায্য করেন। হঠাৎ খুব শক্তিশালী একটি বায়ুর ঝড় নেমে আসে এবং অবরোধকারী আগ্রাসী বাহিনীর সমুদয় সাজ-সরঞ্জাম উড়িয়ে নিয়ে যায়। ফলত শত্রুপক্ষের মনোবল ভেঙে যায় এবং তারা পলায়নের পথ অবলম্বন করে। আর মু'মিনগণ তাদের আক্রমণ থেকে রেহাই পেয়ে যান।
গ্রন্থকার আলোচ্য অংশে প্রিয় নবী -এর শক্তিমত্তা ও দৈহিক ক্ষমতা এবং সাহসিকতা ও বীরত্বের আলোচনা করছেন এবং এতদুদ্দেশ্যেই উপরোক্ত হাদীসখানা অনুচ্ছেদের অন্তর্ভুক্ত করেন। কেননা হাদীসটির মধ্যে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, মস্তবড় যেই পাথরটি খোদাই পথে পড়েছিল, সেটিকে অন্যরা কোনক্রমেই ভাঙতে সক্ষম হয়নি। সেটি তিনি শক্তিবলে ভেঙে ফেলেন। তিনি কোদাল হাতে নিয়ে মাত্র তিনবার সজোরে আঘাত করেছিলেন। আর পাথরটি বালির ন্যায় গুঁড়িয়ে গিয়েছিল। এ ঘটনা থেকে তাঁর দৈহিক শক্তিমত্তা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
একটি বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) বলেন, প্রিয় নবী স্বয়ং ইরশাদ করেছেন যে, আমাকে চল্লিশ জন বেহেস্তী মানুষের সম-পরিমাণ শক্তি প্রদান করা হয়েছে। (তাবারানী, সূত্র-ইত্তেহাফুস সাদাহ্, খ. ৭, পৃষ্ঠা ১৪১)
۱۱۲. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَحْسَنَ النَّاسِ وَأَشْجَعَ النَّاسِ وَأَجُودَ النَّاسِ، وَلَقَدْ فَزِعَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ وَرَكِبَ فَرَسًا لِأَبِي طَلْحَةَ عَرِيًّا فَخَرَجَ النَّاسُ فَإِذَا هُمْ بِرَسُولِ اللهِ قَدْ سَبَقَهُمْ إِلَى الصَّوْتِ قَدْ اسْتَبْرَأَ الْخَبَرَ وَهُوَ يَقُولُ لَنْ تَرَاعُوا وَقَالَ النَّبِيُّ وَلَقَدْ وَجَدْنَاهُ بَحْراً أَوْ إِنَّهُ لَبَحْرٍ -
১১২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুপুরুষ, সর্বাধিক সাহসী ও সর্বোচ্চ দয়া-দাক্ষিণ্যের অধিকারী। (একবার একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ার দরুন) মদীনা শরীফের লোকজন আতংকিত হয়ে উঠেছিল। রাসূলুল্লাহ্ তৎক্ষণাৎ হযরত আবু তালহা (রা)-এর ঘোড়ায় গদি ব্যতিরেকেই সওয়ার হন এবং দ্রুতগতিতে সম্মুখে অগ্রসর হন। অবস্থা দৃষ্টে লোকজনও রাস্তায় বেরিয়ে আসে। তখন তারা দেখলো রাসূলুল্লাহ্ তাদের পূর্বেই গুজবটি যে দিক থেকে আসছিল সে দিক থেকে পর্যবেক্ষণ শেষ করে ফিরে আসছেন। প্রিয় নবী লোকজনকে বললেন: তোমরা ভয় পেয়ো না। তিনি আরো বললেন: আমি ঘোড়াটিকে সমুদ্রের ন্যায় দ্রুতগামী পেলাম অথবা তিনি বলেছেন: এটি সমুদ্রের মত (বেগবান)।
ফায়দা: সহীহ্ বুখারীতে একাধিক স্থানে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। তবে হাদীসের শব্দমালায় কিছু ভিন্নতা বিদ্যমান।১
আলোচ্য হাদীসের আলোকেও প্রিয় নবী-এর অসীম সাহসিকতা, বীরত্ব ও নির্ভীকতার প্রমাণ পাওয়া যায়। চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া আতংকের এ মুহূর্তে যখন যে কোন সময়ে মদীনার উপর শত্রুদের আক্রমণ চালানোর আশংকা বিদ্যমান, তাছাড়া শত্রুপক্ষ কোন দিক থেকে কতটুকু প্রস্তুতি নিয়ে আক্রমণ শুরু করছে তাও অজানা এমন এক নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে প্রিয় নবী-এর সম্পূর্ণ একাকী অবস্থায় অনুসন্ধানের জন্য সম্মুখে বেরিয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে তাঁর অসীম সাহসিকতার প্রমাণ বহন করে।
এ হাদীসের মধ্যেও প্রিয় নবী-এর উল্লেখযোগ্য তিনটি সদ্গুণের উল্লেখ করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, এ বিশেষণত্রয় হলো মানুষের যাবতীয় সদ্গুণের আধার। কেননা প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে তিনটি প্রকৃতিগত শক্তি বিদ্যমান থাকে। যথা ১. অনুকম্পা শক্তি, ২. ক্রোধশক্তি ও ৩. বিবেচনা শক্তি। ক্রোধ শক্তির পূর্ণতা দ্বারা ব্যক্তির মধ্যে সাহসিকতা ও বীরত্বের গুণ সৃষ্টি হয়। অনুকম্পা শক্তির পূর্ণতার কারণে ব্যক্তি দানশীলতা ও বদান্যতার গুণে গুণান্বিত হয়। আর বিবেচনা শক্তির পূর্ণতা অর্জনের ফলে ব্যক্তির মাঝে নৈপুণ্য ও বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ ঘটে। প্রিয় নবী-এর চরিত্রে উল্লিখিত সব কয়টি শক্তি পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান ছিল। এ কারণেই শক্তিগুলি থেকে উদ্ভূত গুণগুলিও ছিল তাঁর চরিত্রে পরিপূর্ণ। দার্শনিকগণ লিখেছেন, যে ব্যক্তির প্রকৃতির মধ্যে উদ্ভূত শক্তি পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান তিনি দৈহিক গঠন ও রূপ সৌন্দর্যের ক্ষেত্রেও পরিপূর্ণ মানের হবেন। কারণ বিবেচনা শক্তি ও দৈহিক সুগঠন একটি অপরটির জন্য অনিবার্য উপাদান।
۱۱۳. عَنِ الْبَرَاءِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ لَمَّا غَشِيَهُ الْمُشْرِكُونَ نَزَلَ فَجَعَلَ يَقُولُ أَنَا النَّبِيُّ لَا كَذِبَ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَمَارَنِي فِي النَّاسِ يَوْمَئِذٍ أَحَدٌ كَانَ أَشَدَّ مِنَ النَّبِيِّ
১১৩. হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুশরিকদের সৈন্য বাহিনী যখন রাসূলুল্লাহ্-কে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলল তখন তিনি নিজের বাহন থেকে অবতরণ করেন এবং বলতে লাগলেন, أَنَا النَّبِيُّ لَأَكَذِبَ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ কোন সন্দেহ নেই আমি সত্য নবী, আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান। বর্ণনাকারী বলেন, সে দিন মুসলিম বাহিনীর মধ্যে এমন একজনও ছিল না যাকে প্রিয় নবী এর তুলনায় অধিক সাহসিকতার অধিকারী বলা যায়।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসটি হুনাইনের যুদ্ধ সম্পর্কিত। এ যুদ্ধে হাওয়াযিন গোত্রের প্রসিদ্ধ তীরন্দাজ দল নিজেদের ব্যূহ থেকে অতর্কিতভাবে মুসলমানদের উপর তীরের বৃষ্টি নিক্ষেপ করেছিল। ফলে অধিকাংশ সাহাবী আহত ও শংকিত হয়ে পড়েন। তাঁদের কদম বিচলিত হয়ে যায় এবং তাঁরা রণক্ষেত্র থেকে পিছু হটে যান। কিন্তু সেই উন্মুক্ত রণক্ষেত্রে নবী স্বস্থান থেকে বিন্দুমাত্র হটেননি। তিনি সওয়ারী থেকে দ্রুত অবতরণ করে নিকটস্থ জানবায সাহাবীদেরকে নিয়ে শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে শক্তিশালী মুকাবিলা চালিয়ে যান। এ মুহূর্তে প্রিয় নবী-এর কণ্ঠ থেকে নিম্নের তেজোদ্দীপক জোশপূর্ণ বাক্যটি বেরিয়ে এসেছিল: “أَنَا النَّبِيُّ لَكَذِبُ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ" "আমি বরহক ও সত্য নবী, আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান।” বলা বাহুল্য, এটি হলো বীরত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নীতি। তাঁরা জটিল ও নাজুক কোন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে অন্যদের মনেও আবেগের সঞ্চার করার লক্ষ্যে এ ধরনের তেজোদ্দীপক বাক্য আবৃত্তি করে থাকেন। আর এ কারণেই ইসলামী শরীয়তে সমর সঙ্গীত আবৃত্তি করা ও যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের বংশগৌরব প্রকাশ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
📄 নবী (সা)-এর সাহসিকতা ও বীরত্ব
۹۹. عَنْ عَلِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ لَقَدْ رَأَيْتُنِي يَوْمَ بَدْرٍ وَنَحْنُ نَلُوْذُ بِالنَّبِيِّ
هُوَ أَقْرَبُنَا إِلَى الْعَدُوِّ وَكَانَ مِنْ أَشَدَّ النَّاسِ يَوْمَئِذٍ بَأْسًا -
৯৯. হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমি স্বচক্ষে দেখেছি যে, আমরা নবী -এর আশেপাশে আশ্রয় খুঁজছিলাম। আর তিনি আমাদের সকলের তুলনায় শত্রুদের বেশি কাছাকাছি পৌঁছে মুকাবিলা করে যাচ্ছেন। বদরের সেদিন তাঁরই বীরত্ব ও সাহসিকতা ছিল সর্বাধিক।
ফায়দা : চরিত্র বিশারদদের সকলে এ মর্মে একমত যে, মানব চরিত্রের সবচেয়ে বড় উপাদান হলো বীরত্ব। মানুষের যাবতীয় সদ্গুণ বীরত্বের এই ভিত্তির উপরেই গড়ে উঠে। বীরত্বের কারণে মানুষ নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা, দরদ ও অনুকম্পা, হিম্মত, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সত্য প্রকাশে নির্ভীকতা ইত্যাকার মহৎ ও উন্নত চরিত্র মাধুরী অর্জনে সক্ষম হয়। কাপুরুষ ও মনোবলহীন লোকেরা কোন কৃতিত্বের কাজ সম্পাদনে যেমন অনুপযুক্ত তেমনি নৈতিকতার মানদণ্ডেও সে হীনবল বিবেচিত হয়ে থাকে। সে মানবীয় সদ্গুণাবলি ও উন্নত চরিত্র থেকে হয় বঞ্চিত। পক্ষান্তরে যাঁরা সাহসী ও বীর পুরুষ তাঁরা সর্বদা আত্মপ্রত্যয়ী, নীতিবান, সত্যভাষী, দৃঢ় চরিত্র, ধৈর্যশীল, গম্ভীর ও ক্ষমাপরায়ণ থাকেন। এভাবে দানশীলতা, বদান্যতা, মেহমানদারী, পরোপকার ইত্যাদি সাহসী মানুষদেরই বিশেষণরূপে পরিচিত।
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সাহসিকতা ও বীরত্বের ক্ষেত্রেও ছিলেন মানুষের মধ্যে সকলের ঊর্ধ্বে। তিনি অবিচলতা ও অফুরন্ত দৃঢ়তার অধিকারী ছিলেন। জিহাদ ও রণক্ষেত্রে প্রদর্শিত তাঁর বীরত্বের বহু ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, কখনো কোন কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখে তিনি হিম্মত হারাতেন না। চরিত্রের দৃঢ়তা ও অসীম সাহসিকতা বুকে নিয়ে যাবতীয় পরিস্থিতির মুকাবিলা করে যেতেন। হুনাইন যুদ্ধে হাওয়াযিন গোত্রের লোকেরা মুসলিম বাহিনীর উপর বৃষ্টির ন্যায় তীরবর্ষণ শুরু করে। তীরন্দাজদের প্রবল আক্রমণে সাহাবীদের বহু সংখ্যক তখন মনোবল হারিয়ে ফেলেন এবং রণক্ষেত্র থেকে পিছিয়ে পড়েন।
অথচ প্রিয় নবী তখন রণক্ষেত্রে অটল দণ্ডায়মান। তাঁর চতুষ্পার্শ্বে ছিলেন কেবল কয়েকজন জানবাজ সাহাবী। তাঁরা সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় তাঁকে ঘিরে রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। এ কঠিনতম মুহূর্তে তিনি বিন্দুমাত্রও বিচলিত হননি বরং সীমাহীন সাহসিকতা ও বীরত্ব নিয়ে সঙ্গীদের মনোবল ও হিম্মত বৃদ্ধি করতে থাকেন। সামান্যতম পিছে না হটে যথারীতি কাফিরদের সঙ্গে মুকাবিলা চালিয়ে যান।
অনুরূপ একবার তিনি একটি বৃক্ষের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তখন অতর্কিতভাবে জনৈক কাফির যোদ্ধা সম্মুখে এসে তরবারি তাক করে দাঁড়ায়। লোকটি প্রিয় নবী -এর ঠিক মাথা মুবারকের বরাবর দাঁড়িয়ে বলল, হে মুহাম্মদ! এবার আমার হাত থেকে তোমাকে কে বাঁচাবে? প্রিয় নবী ভয়ভীতি বিহীন শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন: আল্লাহ্। তাঁর এই নির্ভীকতা দেখে ও বীরত্বপূর্ণ উত্তর শুনে লোকটির হৃদকম্পন শুরু হলো এবং তার হাত থেকে তাক করা তরবারি মাটিতে পড়ে গেল। (সহীহ্ বুখারী, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৫৯২)। প্রিয় নবী -এর জীবনে এ ধরনের আরো বহু ঘটনা ইতিহাস গ্রন্থাবলিতে বিদ্যমান। এ সকল ঘটনার আলোকে তিনি যে কতখানি সাহসিকতা ও বীরত্বের অধিকারী ছিলেন তা সুস্পষ্ট বোঝা যায়।
১০০. عَنْ عَلِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كُنَّا إِذَا أَحْمَرَ الْبَاسُ وَلَقِيَ الْقَوْمُ اتَّقَيْنَا بِرَسُولُ اللهِ ﷺ فَمَا يَكُونُ أَحَدُ أَقْرَبَ إِلَى الْعَدُوِّ مِنْهُ
১০০. হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রণক্ষেত্রে যুদ্ধ যখন ঘোরতর আকার ধারণ করত এবং একদল অন্যদলের মুখোমুখি হয়ে লড়াই শুরু করত, তখন আমরা নবী-এর চতুষ্পার্শ্বে আশ্রয় খুঁজতাম। আমাদের মধ্যে কেউ শত্রুপক্ষের মুকাবিলায় নবী-এর চেয়ে অগ্রবর্তী থাকত না (অর্থাৎ তিনি মুকাবিলায় সকলের অগ্রবর্তী থাকতেন)।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসটিও প্রিয় নবী-এর অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের কথা প্রকাশ করছে। কেননা কাফিরদের সঙ্গে যখন মুসলমানদের যুদ্ধ শুরু হতো এবং একদল অন্যদলের মুখোমুখি হয়ে লড়াই শুরু করত, তখন শত্রুপক্ষের সংখ্যাধিক্য এবং নিজেদের যুদ্ধ উপকরণের অপ্রতুলতা দেখে এই গুটিকতক নিরস্ত্র মুসলমান সৈন্যদের মনে ভীতির উদ্রেক হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিশেষত যে সকল যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর হাতে যুদ্ধ সরঞ্জাম বলতে কিছুই ছিল না। তখন যে কোন তেজস্বী, বাহাদুর ব্যক্তিরও শংকিত হয়ে ওঠা স্বাভাবিক। অথচ প্রিয় নবী-এর মনোবল এমন মুহূর্তগুলিতেও কেবল দৃঢ় থাকতো তাই নয় বরং নিজে অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের সঙ্গে তরবারি নিয়ে কাফিরদের সারির ভিতর ঢুকে পড়তেন। তখন মুসলিম সৈনিকদের অন্যরাও প্রিয় নবী-এর কাছাকাছি আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করতেন। কতিপয় হাদীসের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় ঘোররত লড়াইয়ের তোড়ে লোকজন দূরে হটে যেত। এ মুহূর্তে যাঁরা প্রিয় নবী-এর সঙ্গে ও কাছাকাছি থাকতেন সাহাবীদের মধ্যে তাঁদেরকে বীর সেনানী বলে বিবেচনা করা হতো।
١٠١. عَنْ سَعْدِ بْنِ عِبَاضِ الثَّمَالِي قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَلِيْلَ الْكَلَامِ قَلِيْلَ الْحَدِيثِ فَلَمَّا أُمِرَ بِالْقِتَالِ تَشَمَّرَ وَكَانَ مِنْ أَشَدِّ النَّاسِ بَأْسًا -
১০১. হযরত সাদ ইব্ন ইয়ায সামালী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ স্বভাবত ছিলেন বাকসংযমী ও মিতভাষী। কিন্তু যখন তিনি যুদ্ধের জন্য আদিষ্ট হতেন তখন এমনভাবে প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন যে তাঁকে সর্বাধিক বলিষ্ঠ যোদ্ধা ও সাহসী বলে দেখা যেত।
ফায়দা : উপরোক্ত হাদীসে প্রিয় নবী-এর দু'টি গুণের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এক. মিতভাষী হওয়া, দুই. সাহসী ও বাহাদুর হওয়া। মিতভাষী হওয়া মানব জীবনে অন্যতম সদ্গুণ। অথচ অতিশয় সহজলভ্য একটি আমল। একখানা হাদীসে প্রিয় নবী ইরশাদ করেন: আমি কি তোমাদের অত্যন্ত হালকা ও সহজলভ্য একটি আমলের কথা জানাবো? সে আমলটি হলো নীরব থাকা এবং চরিত্রবান হওয়া। (তারগীব ওয়া তারহীব, খ. ৪, পৃষ্ঠা ৩২১)
বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে প্রিয় নবী -এর স্বল্পভাষী হওয়া সম্পর্কীয় আরো বহু রিওয়ায়াত বিদ্যমান। এ সব রিওয়ায়াতের আলোকে বোঝা যায় যে, মিতভাষী হওয়াও মানব চরিত্রের অন্যতম সদ্গুণ। চরিত্র বিশারদ ও দার্শনিকদের কেউই এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন না।
গ্রন্থকার এখানে প্রিয় নবী -এর সাহসিকতা ও বীরত্বের আলোচনা প্রসঙ্গে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। কেননা হাদীসখানার শেষ বাক্যটি থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, প্রিয় নবী -কে যখনই আল্লাহ্ পাকের তরফ থেকে কোন জিহাদ বা যুদ্ধের জন্য আদেশ করা হতো তখনই তিনি কোন দ্বিধাদ্বন্দু ব্যতিরেকে অতিশয় বীরত্ব ও সাহসিকতাসহ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যেতেন। আবার রণক্ষেত্রেও তিনি সবচেয়ে অধিক সাহসী ও বীর ব্যক্তি হিসাবে প্রমাণিত হতেন।
۱۰۲. عَنِ الْبَرَاءِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كُنَّا وَاللَّهِ إِذَا أَحْمَرَّ الْبَاسُ نَتَّقِي بِهِ يَعْنِي النَّبِيُّ ﷺ وَإِنَّ الشَّجَاعَ مِنَّا الَّذِي يُحَاذِي بِهِ -
১০২. হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ্র কসম! যখন আমাদের যুদ্ধ ভয়ানক আকার ধারণ করত, তখন আমরা প্রিয় নবী -এর কাছে এসে আশ্রয় নিতাম। আর আমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিকেই সবচেয়ে বড় সাহসী ও বীর বলে গণ্য করা হতো যিনি যুদ্ধকালে প্রিয় নবী -এর সঙ্গে সঙ্গে থাকতেন।
ফায়দা: প্রিয় নবী -এর চরিত্রে যেভাবে অন্যান্য অতুলনীয় যোগ্যতা ও গুণাবলি পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান ছিল তেমনি সাহসিকতা ও বীরত্বও ছিল অতুলনীয় ও অসীম। বড় বড় যুদ্ধগুলিতে এবং যুদ্ধ জীবনের চরম আতংকের মুহূর্তগুলোর মধ্যেও তিনি এতখানি দুঃসাহসিকতার প্রমাণ দিয়েছিলেন যে, যখন বীর বাহাদুর সাহাবীগণ পর্যন্ত হিম্মতহারা হয়ে যাচ্ছিলেন এবং নিজেরা কোন আশ্রয়ের তালাশ শুরু করেছিলেন। সে মুহূর্তে সকলে তাঁর আশ্রয় পেয়ে পুনর্বার যুদ্ধ চালানোর হিম্মত লাভ করতেন। তা ছাড়া সাহাবীদের মধ্যে তখন তাঁকেই সবচেয়ে শক্তিশালী বীর বলে জ্ঞান করা হতো, যিনি নবী -এর আশ্রয়ে থেকে যুদ্ধ চালনায় দৃঢ় থাকতে সক্ষম হতেন।
۱۰۳. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ بِالْمَدِينَةِ فَزَعٌ وَرَكِبَ رَسُولُ الله ﷺ فَرَسًا لِأَبِي طَلْحَةَ فَقَالَ مَا رَأَيْنَا مِنْ شَيْءٍ وَإِنْ وَجَدْنَاهُ لَبَحْرًا -
১০৩. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার মদীনা শরীফের (এর উপর শত্রুরা অতর্কিত হামলা চালিয়েছে বলে গুজব রটেছিল। ফলে) সর্বত্র ভয় ও আতংক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় নবী হযরত আবূ তালহা (রা)-এর ঘোড়ার উপর সওয়ার হন (এবং শত্রুদের গতিবিধি জানার জন্য সম্পূর্ণ একাকী অবস্থায় তিনি বেরিয়ে পড়েন। এভাবে পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল হওয়ার পর তিনি যখন ফিরে আসেন তখন) বলেন: আমি তো এখানে ভয়ের কিছুই দেখিনি। আমি আবু তালহার ঘোড়াটিকে সমুদ্রের মত দ্রুতগতিসম্পন্ন পেলাম।
ফায়দা : এই হাদীসসহ সম্মুখে আরো দু'টি হাদীস আসছে, সবগুলোর মূল বক্তব্য অভিন্ন। ঘটনাটি ছিল এমন যে, একবার মদীনা শরীফের সর্বত্র সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল যে, 'শত্রুরা মদীনার উপর আক্রমণ চালিয়েছে। এ সংবাদ খুব দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষকে দারুণ আতংকের মধ্যে ফেলে দেয়। ভয়ের আতিশয্যে কেউ এগিয়ে পরিস্থিতির সঠিক পর্যবেক্ষণের হিম্মতটুকুও পাচ্ছিল না। কিন্তু প্রিয় নবী এ আতংকের কোন পরোয়া করেননি। তিনি তৎক্ষণাৎ হযরত আবূ তালহা (রা)-এর ঘোড়াটি নিয়ে পরিস্থিতির সঠিক পর্যবেক্ষণের জন্য সম্মুখের দিকে সম্পূর্ণ একাকী ছুটে চললেন। নবী দ্রুতগামী এ ঘোড়াটি নিয়ে মদীনা শরীফের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত চলে যান। কিন্তু কোথাও শত্রুদের আক্রমণের কোন চিহ্ন দেখতে পাননি। তিনি বুঝলেন এটি সম্পূর্ণ গুজব। কাজেই তিনি ফিরে আসলেন এবং লোকজনকে সান্ত্বনা ও অভয় দিয়ে বললেন: তোমরা ভয় পেয়ো না। এখানে আমি আতংকের কিছুই দেখিনি। অতঃপর নবী আবু তালহার ঘোড়ার প্রশংসা করে বললেন: এই ঘোড়াটি সমুদ্রের মত অত্যন্ত বেগবান ও দ্রুতগতি সম্পন্ন।
١٠٤. عَنْ أَنَسِ ابْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ فَزِعَ أَهْلُ المَدِينَةِ مَرَّةً فَرَكِبَ النَّبِيُّ ﷺ فَرَسًا كَأَنَّهُ مُقَرِّفُ فَرَكَضَهُ فِي آثَارِهِمْ فَلَمَّا رَجَعَ قَالَ وَجَدْنَاهُ بَحْرًا
১০৪. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার মদীনা শরীফের অধিবাসীরা (শত্রুদের আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে এই গুজবে) ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গিয়েছিল। নবী তৎক্ষণাৎ জীর্ণশীর্ণ দুর্বল একটি ঘোড়ায় আরোহণ করেন। তিনি এটিকে দ্রুত আক্রমণকারীদের দিকে ছুটিয়ে নিলেন। অবশেষে ফিরে এসে বললেন, আমি এটিকে সমুদ্রের মত বেগবান পেলাম (অথচ তোমরা একে দুর্বল ও ধীরগতি সম্পন্ন বলছ)।
١٠٥ عَنْ عِمْرَانَ بْنِ الحُسَيْنِ قَالَ مَا لَقِي النَّبِيُّ ﷺ إِلَّا كَانَ أَوَّلَ مَنْ يَضْرِبُ
১০৫. হযরত ইমরান ইবন হুসাইন (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোন শত্রুবাহিনীর সঙ্গে নবী -এর যখন মুকাবিলা হতো তখন যুদ্ধে তিনিই থাকতেন প্রথম আক্রমণকারী।
ফায়দা: কাফির, মুশরিক ও আল্লাহ্র দুশমনদের বিরুদ্ধে তরবারি উত্তোলনের কাজেও প্রিয় নবী থাকতেন সবার অগ্রে। প্রিয় নবী -এর এই ভূমিকা গ্রহণ তাঁর অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় বহন করে। তা ছাড়া তিনি মানসিকভাবে কতখানি দৃঢ়চেতা ও প্রবল শক্তিমান ছিলেন বর্ণিত হাদীস থেকে এটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
١٠٦. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ مِنْ أَشْجَعِ النَّاسِ وَأَسْمَحِ النَّاسِ-
১০৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে রাসূলুল্লাহ্ ছিলেন অসীম সাহসী ও সর্বোচ্চ দানশীল ব্যক্তি।
ফায়দা : উল্লিখিত হাদীসে প্রিয় নবী ﷺ-এর বিশেষ মানের দু'টি সদ্গুণের উল্লেখ করা হয়েছে। একটি হলো, তাঁর সীমাহীন বীরত্ব ও দুঃসাহসিকতা। আর অপরটি হলো পরম দানশীলতা ও বদান্যতা। দার্শনিক ও চরিত বিশারদদের সকলে এ মর্মে একমত যে, এই বীরত্ব ও দানশীলতা একটি অপরটির অনিবার্য ফলশ্রুতি।
۱۰۷. عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَحْسَنَ النَّاسِ وَأَشْجَعَ النَّاسِ وَأَسْمَحَ النَّاسِ-
১০৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক সুপুরুষ, সর্বাধিক সাহসী ও সবচেয়ে বেশি দয়া-দাক্ষিণ্যের অধিকারী।
ফায়দা : উপরোক্ত হাদীসে প্রিয় নবী ﷺ-এর তিনটি উল্লেখযোগ্য বিশেষণের কথা বলা হয়েছে। এক. তাঁর অতুলনীয় শারীরিক সুগঠন ও সৌন্দর্য, দুই. তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতা, তিন, তাঁর দানশীলতা ও দয়া-দাক্ষিণ্য। কোন সন্দেহ নেই যে, প্রিয় নবী ﷺ-এর পবিত্র সত্তা নবুওয়াতের ক্ষেত্রে যেমন সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত শিখরে অধিষ্ঠিত ছিল, তেমনি তাঁর এ সত্তা নীতিপরায়ণতা ও উন্নত চরিতাদর্শের ক্ষেত্রেও ছিল সর্বোচ্চ শিখরে প্রতিষ্ঠিত। এ মাকাম তথা মর্যাদা শুধুমাত্র তাঁর জন্যই। কারোর পক্ষে এতখানি উচ্চে আরোহণ কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়। আল্লাহ্ পাক আমাদেরকে তাঁর প্রিয়তম বন্ধুর উন্নত অনুপম চরিতাদর্শ অনুসরণের তাওফীক দান করুন। আমীন।
۱۰۸. عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ صَيْحَةُ بِالْمَدِينَةِ، فَرَكِبَ النَّبِيُّ ﷺ فَرَسًا لَأَبِي طَلْحَةَ، فَأَجْرَاهُ سَاعَةً ثُمَّ رَجَعَ فَقَالَ مَا رَأَيْنَا مِنْ شَيْ وَإِنَّ وَجَدَنَاهُ لَبَحْرًا -
১০৮. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার মদীনা শরীফের উপর শত্রুরা অতর্কিত আক্রমণ চালিয়েছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ল। প্রিয় নবী ﷺ তৎক্ষণাৎ হযরত আবূ তালহা (রা)-এর একটি ঘোড়ায় আরোহণ করেন এবং এক ঘণ্টা পর্যন্ত ঘোড়াটিকে এদিক-ওদিক ছুটিয়ে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেন। অবশেষে (ঘটনার প্রকৃত অবস্থা প্রত্যক্ষ করে) ফিরে এসে বললেন, আমি কিছুই দেখলাম না। (ভয়ের কিছুই নেই) তবে আমি এ ঘোড়াটিকে (গতিশীলতার দিক থেকে) সমুদ্রের ন্যায় পেলাম।
١٠٩. عَنْ أَبِي جَعْفَرٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ شَدِيدَ الْبَطَشِ -
১০৯. হযরত আবূ জাফর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ কঠোর পাকড়াওকারী ছিলেন।
ফায়দা : আলোচ্য হাদীসের আলোকেও বোঝা যায় যে, প্রিয় নবী যেমন সাহসিকতা ও বীরত্বের অধিকারী ছিলেন তেমনি শারীরিকভাবেও তিনি অতিশয় শক্তিশালী ও সবল ছিলেন। একখানা হাদীসে তিনি স্বয়ং ইরশাদ করেন: আমাকে চল্লিশ জন মানুষের সমান শক্তি প্রদান করা হয়েছে। আর এ কারণেই কঠিন থেকে কঠিন কিংবা শক্ত থেকে শক্ততর কোন কাজ যা সাহাবীদের কারোর পক্ষে সম্ভব হতো না সেটি তিনি অনায়াসেই করে দিতে পারতেন। পরবর্তী ১১১ নং হাদীস থেকেও প্রিয় নবী-এর এহেন অতুলনীয় শক্তিমত্তা ও দৈহিক ক্ষমতার প্রমাণ মেলে।
١١٠. عَنِ الْبَرَاءِ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَوْمَ الْخَنْدَقِ يَنْقُلُ التَّرَابَ حَتَّى وَارَى الغُبَارُ شَعْرَ صَدْرِهِ وَرَأَيْتُ النَّبِيُّ ﷺ يَرْتَجِزُ يَوْمَ الخَنْدَقِ وَهُمْ يَحْفِرُونَهُ وَهُوَ يَنْقُلُ التَّرَابَ حَتَّى وَارَى جَلْدَةُ بَطْنِهِ -
১১০. হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি খন্দক যুদ্ধের দিন দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ্ নিজে মাটি বহন করেছেন আর ধুলায় তাঁর বুকের পশমগুলি ঢেকে গিয়েছিল। তিনি বলেন, আমি আরো দেখেছি যে, খন্দকের সে দিন প্রিয় নবী উদ্দীপনাবর্ধক কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। আর সাহাবীগণ পরিখা খনন করে যাচ্ছেন। এ সময় তিনিও অন্যদের সঙ্গে মাটি বহন করেছেন। এমনকি বালির কারণে তাঁর পেটের চামড়া আবৃত হয়ে গিয়েছিল।
ফায়দা : এ ঘটনাটি হলো খন্দক যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের। আলোচ্য হাদীসের উল্লেখের দ্বারা গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হলো প্রিয় নবী-এর সীমাহীন মনোবলের কথা প্রমাণ করা এবং আল্লাহ্র পথে কঠিন থেকে কঠিনতর ও তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতর কোন কাজ সম্পাদন করতে তিনি কতখানি দৃঢ়চেতা ও সাহসী ছিলেন তা তুলে ধরা।
۱۱۱. عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ مَكَثَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَأَصْحَابُهُ يَحْفِرُونَ الخَنْدَقَ ثَلَاثًا مَا ذَاقُوْا طَعَامًا فَقَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ : إِنَّ هَذِهِ كِدْيَةٌ - مِنْ الجَبَلِ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ رَسُوْمًا بِالْمَاءِ فَرَسُوْهَا ثُمَّ جَاءَ النَّبِيُّ ﷺ فَأَخَذَ الْمِعْولَ أَوِ الْمِسْحَاةَ ثُمَّ قَالَ بِسْمِ اللهِ ثُمَّ ضَرَبَ ثَلَاثًا فَصَارَ كَثِيْبًا يَهَالُ، قَالَ جَابِرُ فَحَانَتْ مِنَى الْتِفَاتَةُ فَرَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ وَقَدَ شَدَّ بَطْنَهُ بحجر
১১১. হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (খন্দকের যুদ্ধ চলাকালে) রাসূলুল্লাহ্ ও তাঁর সাহাবীগণ তিন দিন পর্যন্ত অনাহারক্লিষ্ট অবস্থায় পরিখা খননের কাজে নিয়োজিত থাকলেন। (তখন অতিশয় শক্ত ও বিশাল আয়তনের একটি পাথর খোদাই কাজের মুখে বেরিয়ে আসে) সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এটি পর্বতের একটি মস্তবড় পাথর। রাসূলুল্লাহ্ বললেন: তোমরা পাথরটির উপর পানি ছিটিয়ে দাও। সেমতে তাঁরা পানি ছিটিয়ে দিলেন। তারপর প্রিয় নবী তাশরীফ আনেন। তিনি কোদাল বা হাতুড়ি হাতে নিয়ে 'বিসমিল্লাহ্' পাঠ করেন এবং পাথরের উপর তিনবার আঘাত হানেন। ফলে অতিশয় শক্ত পাথরটি এত নরম হয়ে গিয়েছিল যে, আঘাতের দরুন ফেটে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে বালির ন্যায় ঝরে পড়ে গেল। হযরত জাবির (রা) বলেন, এ সময় হঠাৎ আমার দৃষ্টি নবী -এর পেট মুবারকের উপর গিয়ে পড়ল। আমি দেখলাম যে, তিনি (ক্ষুধার আতিশয্যে) পেটের উপর পাথর বেঁধে রেখেছেন।
ফায়দা : আলোচ্য ঘটনাটিও খন্দকের যুদ্ধ প্রস্তুতিকালে ঘটেছিল। ইতিহাসে এ যুদ্ধকে আহযাবের যুদ্ধ নামেও অভিহিত করা হয়েছে। হিজরী ৫ বর্ষের যিল্কাদ মাসে এ যুদ্ধ শুরু হয়। প্রিয় নবী তখন মদীনা শরীফেই অবস্থানরত ছিলেন। আরবের সকল গোত্রের মুশরিক ও ইয়াহুদীরা সকলে সম্মিলিতভাবে مسلمانوں বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এবং পবিত্র মদীনা নগরী অবরোধ করে নেয়। শত্রু বাহিনীর সংখ্যা ছিল ছয় সহস্রাধিক। প্রিয় নবী অবরোধের সংবাদ পেয়ে সাহাবীদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। সাহাবী হযরত সালমান ফারসী (রা) ছিলেন পারস্যের অধিবাসী। তিনি নগর রক্ষার স্বার্থে তখন পরিখা খননের পরামর্শ দিয়ে বলেন, এমনি জটিল মুহূর্তে ইরানী যোদ্ধারা সাধারণত পরিখা খননের ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। সে মতে মদীনা নগরীর অদূরে মুসলিম সৈন্যগণ এক জায়গায় জমায়েত হন। তাঁরা পরামর্শ মোতাবেক পরিখা খননের কাজ শুরু করেন। মুসলমানদের মধ্যে সে মুহূর্তে খুব অভাব-অনটন বিরাজিত ছিল। দুর্ভিক্ষের কারণে মুসলমানগণ তিনদিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ অনাহারে কাটান, মুখে দেয়ার মত সামান্য রসদও তাদের হাতে ছিল না। কারণ শত্রু সৈন্যরা ইতিপূর্বেই মদীনা শরীফ অভিমুখে রসদ পৌছার সকল পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। এদিকে পরিস্থিতি নাজুক বিধায় দ্রুত পরিখা খননের কাজ সমাপ্ত করা আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়।
এভাবে অবরোধ ও খণ্ডযুদ্ধ প্রায় এক মাস যাবত অব্যাহত থাকে। পরিশেষে মহান আল্লাহ্ অদৃশ্য পথে মুসলমানদের সাহায্য করেন। হঠাৎ খুব শক্তিশালী একটি বায়ুর ঝড় নেমে আসে এবং অবরোধকারী আগ্রাসী বাহিনীর সমুদয় সাজ-সরঞ্জাম উড়িয়ে নিয়ে যায়। ফলত শত্রুপক্ষের মনোবল ভেঙে যায় এবং তারা পলায়নের পথ অবলম্বন করে। আর মু'মিনগণ তাদের আক্রমণ থেকে রেহাই পেয়ে যান।
গ্রন্থকার আলোচ্য অংশে প্রিয় নবী -এর শক্তিমত্তা ও দৈহিক ক্ষমতা এবং সাহসিকতা ও বীরত্বের আলোচনা করছেন এবং এতদুদ্দেশ্যেই উপরোক্ত হাদীসখানা অনুচ্ছেদের অন্তর্ভুক্ত করেন। কেননা হাদীসটির মধ্যে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, মস্তবড় যেই পাথরটি খোদাই পথে পড়েছিল, সেটিকে অন্যরা কোনক্রমেই ভাঙতে সক্ষম হয়নি। সেটি তিনি শক্তিবলে ভেঙে ফেলেন। তিনি কোদাল হাতে নিয়ে মাত্র তিনবার সজোরে আঘাত করেছিলেন। আর পাথরটি বালির ন্যায় গুঁড়িয়ে গিয়েছিল। এ ঘটনা থেকে তাঁর দৈহিক শক্তিমত্তা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
একটি বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) বলেন, প্রিয় নবী স্বয়ং ইরশাদ করেছেন যে, আমাকে চল্লিশ জন বেহেস্তী মানুষের সম-পরিমাণ শক্তি প্রদান করা হয়েছে। (তাবারানী, সূত্র-ইত্তেহাফুস সাদাহ্, খ. ৭, পৃষ্ঠা ১৪১)
۱۱۲. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَحْسَنَ النَّاسِ وَأَشْجَعَ النَّاسِ وَأَجُودَ النَّاسِ، وَلَقَدْ فَزِعَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ وَرَكِبَ فَرَسًا لِأَبِي طَلْحَةَ عَرِيًّا فَخَرَجَ النَّاسُ فَإِذَا هُمْ بِرَسُولِ اللهِ قَدْ سَبَقَهُمْ إِلَى الصَّوْتِ قَدْ اسْتَبْرَأَ الْخَبَرَ وَهُوَ يَقُولُ لَنْ تَرَاعُوا وَقَالَ النَّبِيُّ وَلَقَدْ وَجَدْنَاهُ بَحْراً أَوْ إِنَّهُ لَبَحْرٍ -
১১২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুপুরুষ, সর্বাধিক সাহসী ও সর্বোচ্চ দয়া-দাক্ষিণ্যের অধিকারী। (একবার একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ার দরুন) মদীনা শরীফের লোকজন আতংকিত হয়ে উঠেছিল। রাসূলুল্লাহ্ তৎক্ষণাৎ হযরত আবু তালহা (রা)-এর ঘোড়ায় গদি ব্যতিরেকেই সওয়ার হন এবং দ্রুতগতিতে সম্মুখে অগ্রসর হন। অবস্থা দৃষ্টে লোকজনও রাস্তায় বেরিয়ে আসে। তখন তারা দেখলো রাসূলুল্লাহ্ তাদের পূর্বেই গুজবটি যে দিক থেকে আসছিল সে দিক থেকে পর্যবেক্ষণ শেষ করে ফিরে আসছেন। প্রিয় নবী লোকজনকে বললেন: তোমরা ভয় পেয়ো না। তিনি আরো বললেন: আমি ঘোড়াটিকে সমুদ্রের ন্যায় দ্রুতগামী পেলাম অথবা তিনি বলেছেন: এটি সমুদ্রের মত (বেগবান)।
ফায়দা: সহীহ্ বুখারীতে একাধিক স্থানে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। তবে হাদীসের শব্দমালায় কিছু ভিন্নতা বিদ্যমান।১
আলোচ্য হাদীসের আলোকেও প্রিয় নবী-এর অসীম সাহসিকতা, বীরত্ব ও নির্ভীকতার প্রমাণ পাওয়া যায়। চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া আতংকের এ মুহূর্তে যখন যে কোন সময়ে মদীনার উপর শত্রুদের আক্রমণ চালানোর আশংকা বিদ্যমান, তাছাড়া শত্রুপক্ষ কোন দিক থেকে কতটুকু প্রস্তুতি নিয়ে আক্রমণ শুরু করছে তাও অজানা এমন এক নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে প্রিয় নবী-এর সম্পূর্ণ একাকী অবস্থায় অনুসন্ধানের জন্য সম্মুখে বেরিয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে তাঁর অসীম সাহসিকতার প্রমাণ বহন করে।
এ হাদীসের মধ্যেও প্রিয় নবী-এর উল্লেখযোগ্য তিনটি সদ্গুণের উল্লেখ করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, এ বিশেষণত্রয় হলো মানুষের যাবতীয় সদ্গুণের আধার। কেননা প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে তিনটি প্রকৃতিগত শক্তি বিদ্যমান থাকে। যথা ১. অনুকম্পা শক্তি, ২. ক্রোধশক্তি ও ৩. বিবেচনা শক্তি। ক্রোধ শক্তির পূর্ণতা দ্বারা ব্যক্তির মধ্যে সাহসিকতা ও বীরত্বের গুণ সৃষ্টি হয়। অনুকম্পা শক্তির পূর্ণতার কারণে ব্যক্তি দানশীলতা ও বদান্যতার গুণে গুণান্বিত হয়। আর বিবেচনা শক্তির পূর্ণতা অর্জনের ফলে ব্যক্তির মাঝে নৈপুণ্য ও বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ ঘটে। প্রিয় নবী-এর চরিত্রে উল্লিখিত সব কয়টি শক্তি পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান ছিল। এ কারণেই শক্তিগুলি থেকে উদ্ভূত গুণগুলিও ছিল তাঁর চরিত্রে পরিপূর্ণ। দার্শনিকগণ লিখেছেন, যে ব্যক্তির প্রকৃতির মধ্যে উদ্ভূত শক্তি পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান তিনি দৈহিক গঠন ও রূপ সৌন্দর্যের ক্ষেত্রেও পরিপূর্ণ মানের হবেন। কারণ বিবেচনা শক্তি ও দৈহিক সুগঠন একটি অপরটির জন্য অনিবার্য উপাদান।
۱۱۳. عَنِ الْبَرَاءِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ لَمَّا غَشِيَهُ الْمُشْرِكُونَ نَزَلَ فَجَعَلَ يَقُولُ أَنَا النَّبِيُّ لَا كَذِبَ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَمَارَنِي فِي النَّاسِ يَوْمَئِذٍ أَحَدٌ كَانَ أَشَدَّ مِنَ النَّبِيِّ
১১৩. হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুশরিকদের সৈন্য বাহিনী যখন রাসূলুল্লাহ্-কে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলল তখন তিনি নিজের বাহন থেকে অবতরণ করেন এবং বলতে লাগলেন, أَنَا النَّبِيُّ لَأَكَذِبَ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ কোন সন্দেহ নেই আমি সত্য নবী, আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান। বর্ণনাকারী বলেন, সে দিন মুসলিম বাহিনীর মধ্যে এমন একজনও ছিল না যাকে প্রিয় নবী এর তুলনায় অধিক সাহসিকতার অধিকারী বলা যায়।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসটি হুনাইনের যুদ্ধ সম্পর্কিত। এ যুদ্ধে হাওয়াযিন গোত্রের প্রসিদ্ধ তীরন্দাজ দল নিজেদের ব্যূহ থেকে অতর্কিতভাবে মুসলমানদের উপর তীরের বৃষ্টি নিক্ষেপ করেছিল। ফলে অধিকাংশ সাহাবী আহত ও শংকিত হয়ে পড়েন। তাঁদের কদম বিচলিত হয়ে যায় এবং তাঁরা রণক্ষেত্র থেকে পিছু হটে যান। কিন্তু সেই উন্মুক্ত রণক্ষেত্রে নবী স্বস্থান থেকে বিন্দুমাত্র হটেননি। তিনি সওয়ারী থেকে দ্রুত অবতরণ করে নিকটস্থ জানবায সাহাবীদেরকে নিয়ে শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে শক্তিশালী মুকাবিলা চালিয়ে যান। এ মুহূর্তে প্রিয় নবী -এর কণ্ঠ থেকে নিম্নের তেজোদ্দীপক জোশপূর্ণ বাক্যটি বেরিয়ে এসেছিল: “أَنَا النَّبِيُّ لَكَذِبُ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ" "আমি বরহক ও সত্য নবী, আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান।” বলা বাহুল্য, এটি হলো বীরত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নীতি। তাঁরা জটিল ও নাজুক কোন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে অন্যদের মনেও আবেগের সঞ্চার করার লক্ষ্যে এ ধরনের তেজোদ্দীপক বাক্য আবৃত্তি করে থাকেন। আর এ কারণেই ইসলামী শরীয়তে সমর সঙ্গীত আবৃত্তি করা ও যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের বংশগৌরব প্রকাশ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।