📄 নবী (সা)-এর ক্ষমাগুণ সম্পর্কিত বর্ণনা
৬৫. হযরত মুআবিয়া ইন্ন হায়দা (রা) থেকে বর্ণিত যে, তাঁর গোত্রের জনৈক ব্যক্তি নবী-এর কাছে হাযির হয়ে বললো, আমার পড়শীদেরকে কোন্ অপরাধে বন্দী করা হয়েছে? নবী তার এই ঔদ্ধত্যের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করলেন না। ফলে সে তাঁকে হুমকি দিয়ে বললো, আমি যদি একথা সবার সামনে বলে দেই, তবে তারা ভাববে যে, তুমি তো লোকদেরকে অন্যায় ও জুলুম করা থেকে বারণ করো কিন্তু নিজে তা মেনে চলো না। এ কথা শুনে তৎক্ষণাৎ তার ভাই উঠে দাঁড়ালো এবং বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! সে তার দুর্ব্যবহার থেকে বিরত থাকবে (আমি তার দায়িত্ব নিলাম) তখন তিনি বললেন, শোনো! তোমরা যদি একথা বলেও থাকো এবং আমি যদি এ কাজ করেও থাকি, তবে মনে রেখো! আমিই তার প্রতিফল ভোগ করবো, তোমরা নয়। তারপর তিনি সাহাবাগণকে বললেন, ঐ ব্যক্তির পড়শীদেরকে মুক্ত করে দাও।
ফায়দা : এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (র)-এর মুসনাদে এর চেয়ে বিস্তারিতভাবে বিবৃত হয়েছে। হযরত মুআবিয়া ইন্ন হায়দা (রা) বলেন, নবী আমার গোত্রের কতিপয় লোককে কোনো এক অভিযোগের ভিত্তিতে বন্দী করেছিলেন। সেই ব্যাপারে আমার গোত্রের জনৈক ব্যক্তি তাঁর নিকট উপস্থিত হলো, তিনি তখন খুত্বা দিচ্ছিলেন। সে (রাগান্বিত অবস্থায়ই অত্যন্ত অভদ্রভাবে) বললো, আমার পড়শীদেরকে কেন বন্দী করা হয়েছে? নবী চুপ রইলেন। কোনো জবাব দিলেন না। তারপর সে তাঁকে ধমক দিয়ে বললো (আমি যদি আপনার এই অত্যাচারমূলক কার্যকলাপ জনসমক্ষে তুলে ধরি, তবে লোকেরা বলবে, আপনি অন্য লোকদেরকে তো জুলুম অত্যাচার ও নির্যাতন-উৎপীড়ন থেকে বারণ করেন, কিন্তু অহেতুক নিজে তা থেকে বিরত থাকেন না। রাসূলুল্লাহ্ তার কথা সম্পূর্ণ শুনতে পাননি, তাই) লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এই লোকটি কি বলছে? মুআবিয়া ইবন হায়দা (রা) বলেন, (আমি একথা শুনে সামনে অগ্রসর হলাম এবং) উভয়ের কথাবার্তার মাঝখানে অন্তরায় সাজলাম। আমার আশংকা ছিল, নবী যদি আমার গোত্রকে বদ-দু'আ করেন, তবে তাদের কখনো কল্যাণ হবে না। কিন্তু একটু পরেই তিনি ঐ ব্যক্তির কথা বুঝতে পারলেন এবং বললেন, লোকেরা তো একথা বলেছে (এবং অপবাদ দিয়েছে) এবং ভবিষ্যতেও এরূপ বলবে। কিন্তু আল্লাহ্র কসম! আমি যদি এরূপ করি, তবে তার প্রতিফল আমি ভোগ করবো তারা নয়! এরপর তিনি সাহাবাগণকে নির্দেশ দিলেন যে, ঐ ব্যক্তির পড়শীদেরকে মুক্তিদান করো।
এ হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রাসূলুল্লাহ্ কত বড় ভদ্র ও মহান চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। লোকদের অহেতুক অভদ্র ও অশালীন আচরণ সত্ত্বেও তিনি তাদের সাথে সর্বদা ক্ষমা ও দয়াই প্রদর্শন করতেন। কখনো প্রতিশোধ নিতেন না। মুখ দিয়ে খারাপ কথা সর্বদা উচ্চারণ করতেন না, শাস্তিও দিতেন না। এমনকি তাদেরকে বদ-দু'আও করতেন না। বরং সম্পূর্ণ ক্ষমা করে দিতেন। তাঁর গোটা জীবন-চরিত ও সমগ্র ঘটনাই এ কথার সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপারে কারো থেকে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি।
সহীহ্ বুখারীতে শিষ্টাচার অধ্যায়ে (২য় খণ্ড, ৯০৪ পৃষ্ঠা) হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ কখনো তাঁর নিজের ব্যাপারে কারো থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। তবে আল্লাহ্ দীন ও তাঁর বিধি-বিধানের অবমাননা করা হলে তার প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন।
٦٦ حَدَّثَ عَبْدُ اللهِ بْنِ الزُّبَيْرِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رِجَالًا مِنَ الْأَنْصَارِ خَاصَمُوا الزُّبَيْرَ فِي شِرْجٍ مِنْ شَرَاجِ الْحَرَّةِ الَّتِي يَسْقُوْنَ بِهَا الْمَاءَ ، فَغَضِبَ الأَنْصَارِيُّ وَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ إِنْ كَانَ ابْنُ عَمَّتِكَ ، فَتَلَوْنَ وَجْهُ النَّبِيِّ وَقَالَ اسْقِ يَازُبَيْرُ ثُمَّ احْبِسِ الْمَاءَ حَتَّى يَبْلُغَ الْجُدُرَ ثُمَّ ارْسِلِ الْمَاءَ إلى جَارِكَ -
৬৬. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র (রা) থেকে বর্ণিত যে, (একবার আমার পিতা) হযরত যুবায়র (রা)-এর সাথে মদীনার প্রস্তরময় অঞ্চলের এমন এক পানির নালার ব্যাপারে এক আনসারীর বিবাদ হলো যা থেকে (আশপাশের) লোকটি (তাদের ক্ষেত ও বাগানসমূহের) পানি সেচ দিতো। শেষে এই বিবাদ নবী -এর দরবারে পেশ হলো। তিনি সে বিবাদ মীমাংসা করলেন। ঐ আনসারী তার বোকামি ও বক্রবুদ্ধির দরুন এ মীমাংসাকে যুবায়রের প্রতি পক্ষপাতিত্ব বলে গণ্য করলো এবং ক্রুদ্ধ হয়ে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! যুবায়র আপনার ফুফাত ভাই। (এজন্য আপনি তার পক্ষপাতিত্ব করেছেন। যেহেতু এটি ছিল তাঁর সততা ও ন্যায় বিচারের বিরুদ্ধে আক্রমণ) তাই তাঁর মুখমণ্ডল মুবারক রাগে লাল হয়ে উঠলো। কিন্তু তিনি ঐ অভদ্র আনসারীকে কিছুই বললেন না এবং যুবায়র (রা)-কে বললেন: যুবায়র! তুমি তোমার ক্ষেতে পানি সেচ করো এবং ক্ষেতের আল পর্যন্ত পানি জমিয়ে রেখে তারপর তোমার পড়শীর ক্ষেতে পানি ছেড়ে দাও।
ফায়দা: গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য ছিল যেহেতু রাসূলুল্লাহ্ -এর ক্ষমা গুণের বর্ণনা দেয়া, তাই তিনি ক্ষমার সাথে সম্পর্কিত এই হাদীসের শেষ অংশটুকু শুধু বর্ণনা করেন। মিশকাত শরীফে (পৃষ্ঠা ২৫৯) পুরো হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। তাতে আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র (রা) বর্ণনা করেন যে, (প্রথম অর্থাৎ আনসারী কর্তৃক রাগান্বিত করার পূর্বে) রাসূলুল্লাহ হযরত যুবায়র (রা)-কে বলেন, যুবায়র! তুমি (তোমার ক্ষেতে প্রয়োজন পরিমাণ) পানি সেচ করো। তারপর তোমার পড়শীর (ক্ষেতের) দিকে পানি ছেড়ে দাও। নবী কর্তৃক হযরত যুবায়র (রা)-কে এই পরামর্শ দান ছিল পড়শীর অধিকার ও প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করার ভিত্তিতে। কিন্তু নির্বোধ আনসারী তাকে যুবায়রের প্রতি পক্ষপাতিত্ব মনে করে ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলো (এবং) বললো, যুবায়র আপনার ফুফাত ভাই বলে আপনি তার পক্ষপাতিত্ব ও আমার অধিকার হরণ করছেন। তখন নবী নির্দেশ দিলেনঃ হে যুবায়র! তুমি তোমার ক্ষেতে পানি সেচ করো এবং তোমার ক্ষেতের আল পর্যন্ত পানি বেঁধে রাখো। তারপর তোমার পড়শীর ক্ষেতের দিকে পানি ছেড়ে দিবে। বর্ণনাকারী হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র (রা) বলেন, আনসারী যখন পক্ষপাতিত্বের অপবাদ দিয়ে রাসূলুল্লাহ -কে রাগান্বিত করে দিলো, তখন তিনি বিচার নীতির স্পষ্ট বিধি অনুযায়ী যুবায়রের অধিকার১ তাকে পুরোপুরি দিয়ে দেন। এর পূর্বে তিনি (উভয়ের সুবিধা ও প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে) মীমাংসা করার ভিত্তিতে এমন এক পরামর্শ দিয়েছিলেন যাতে উভয়ের জন্য সুবিধা ছিল।
হাদীস থেকে রাসূলুল্লাহ্-এর উদার মানসিকতা সম্পর্কে অনুমান করুন। আনসারী নবী-এর সততা ও আমানতদারীর উপর আক্রমণ করছে, অধিকার হরণ ও পক্ষপাতিত্বের অপবাদ দিচ্ছে, প্রচণ্ড ক্রোধে তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল রক্তিমবর্ণ ধারণ করছে। কিন্তু তাঁর পবিত্র মুখ থেকে একটি বাক্যও উচ্চারিত হচ্ছে না। কেননা, তিনি জানেন যে, ঐ ব্যক্তি যদিও মুসলমান তবে নির্বোধ ও ক্রোধে অভিভূত। তার কথায় উত্তেজিত হওয়া ঠিক নয়। কিন্তু তার হুঁশিয়ারি ও শিক্ষার জন্য হযরত যুবায়র (রা)-কে তার পূর্ণ অধিকার বুঝে নিতে বললেন। আর এটাই হচ্ছে ক্রোধ সংবরণ করা ও অপরাধীর অপরাধ ক্ষমা করার উত্তম আদর্শের উচ্চতম মাপকাঠি, যে সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন: وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّسِ وَاللَّهِ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ - সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল, আল্লাহ্ সৎকর্মপরায়ণদেরকে ভালবাসেন। (সূরা আলে ইমরান: ১৩৪)
কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তার নিষ্পাপ নবীর উপর এই পক্ষপাতিত্বের অপবাদ সহ্য করেননি! এবং তৎক্ষণাৎ আয়াত নাযিল করে উম্মতকে জানিয়ে দিলেন যে, নবী -এর ফয়সালাকে তা নিজের মনঃপূত হোক কিংবা না হোক মনেপ্রাণে গ্রহণ ও মান্য করা ছাড়া আল্লাহর নিকট তোমাদের ঈমানও সঠিক নয়। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন:
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا -
৬৯. হযরত জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ মাহারিবে খাসফা নামক স্থানে (বানু গাতফানের সাথে) যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে অবস্থান করছিলেন। (যুদ্ধ তখনো শুরু হয়নি কিন্তু) কাফিররা মুসলমানদের অসতর্কতার সুযোগ খুঁজছিল। জনৈক কাফির চুপিসারে এসে রাসূলুল্লাহ্ -এর শিয়রে দাঁড়ালো (তিনি তখন একটি গাছের নিচে আরাম করছিলেন) এবং বলল, এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? তিনি বললেন, আল্লাহ্! তৎক্ষণাৎ তার হাত থেকে তলোয়ার পড়ে গেলো। রাসূলুল্লাহ্ তলোয়ারটি তুলে নিলেন এবং বললেন, এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? সে বললো, আপনি ক্ষমতা পেয়ে উত্তম গ্রেফতারকারী হন। সুতরাং আপনি আমার জীবন রক্ষা করে উত্তম অনুগ্রহকারী হওয়ার প্রমাণ দিন। তিনি বললেন : তুমি কি সাক্ষ্য দিচ্ছো যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোনো মা'বুদ নেই আর আমি হচ্ছি আল্লাহ্র রাসূল? সে বললো, না অবশ্য আমি (অঙ্গীকার করছি যে) আপনার বিরুদ্ধে কখনো যুদ্ধ করবো না। (কোনো যুদ্ধে) আপনার সাথেও যোগদান করবো না এবং আপনার প্রতিপক্ষের সাথেও যোগদান করবো না। রাসূলুল্লাহ্ তাকে ছেড়ে দিলেন। সে তার সঙ্গীদের কাছে এলো। এবং বললো, আমি সর্বোত্তম ব্যক্তির হাত থেকে মুক্তি পেয়ে তোমাদের কাছে এসেছি।
ফায়দা : মাহারিবে খাসফা যুদ্ধের প্রসিদ্ধ নাম 'যাতুর্ রিকা'। এ যুদ্ধকে 'যাতুর্ রিকা' বলার কারণ, প্রস্তর কংকরময় ভূমিতে সফর করার দরুন মুসলমানদের পা যখম হয়ে গিয়েছিল এবং তাঁরা পায়ে পট্টি বেঁধে রেখেছিলেন। কোনো কোনো চরিতকার বলেন, 'যাতুর রিকা' হচ্ছে একটি লাল ও সাদা-কালো প্রস্তরময় পাহাড়ের নাম এবং এই যুদ্ধের নামকরণও পাহাড় করা হয়েছে। বানু গাতফানের বিপুল সংখ্যক লোক মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য সমবেত হয়েছিল। কিন্তু তাদের হামলা করার সাহস হয়নি, তাই যুদ্ধ হয়নি। এ ঘটনা ঘটেছিল চতুর্থ হিজরীর মুহররম কিংবা জমাদিউল আউয়াল মাসে।
এ ঘটনাও রাসূলুল্লাহ্ -এর আল্লাহ্ প্রদত্ত গুণ ক্ষমা ও দয়ার অনুপম দৃষ্টান্ত। জাগতিক কর্মকৌশল ও ফন্দি-ফিকিরের দিকে দৃষ্টিপাতকারীদের মতে এ হামলা ও শত্রুকে জীবিত ছেড়ে দেওয়ার কোনো সঙ্গত কারণ ছিল না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ -এর দৃষ্টি ছিল সমস্ত কারণের আদি কারণ আল্লাহ্ তা'আলার প্রতি। এজন্য তিনি ঐ ব্যক্তিকে ছেড়ে দেন। রাসূলুল্লাহ্ -এর এই ক্ষমা ও দয়ার কি ফল হয়েছিল? স্বগোত্রীয়দের কাছে গিয়ে তাঁর সম্পর্কে সে যে সাক্ষ্য দিয়েছিল তাতেই তা প্রতিভাত হয়।
عَنْ أَسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّهُ أَخْبَرَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ رَكِبَ .
عَلَى حِمَارٍ فَقَالَ لِسَعْدٍ أَلَمْ تَسْمَعْ مَا قَالَ أَبُو الْحُبَابُ يُرِيدُ عَبْدَ اللَّهِ بْنِ أَبَيِّ قَالَ كَذَا وَكَذَا فَقَالَ سَعْدُ بْنُ عُبَادَةَ اعْفُ عَنْهُ وَاصْفَحْ، فَعَفَا عَنْهُ رَسُولُ اللهِ الله
وَكَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَأَصْحَابُهُ يَعْفُوْنَ عَنْهُ أَهْلَ الْكِتَابَيْنِ وَالْمُشْرِكِينَ فَأَنْزَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ فَاعْفُوا وَاصْفَحُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ -
৭০. হযরত উসামা ইব্ন যায়দ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বর্ণনা করেন যে, একবার রাসূলুল্লাহ গাধার উপর সাওয়ার ছিলেন। [হযরত সা'দ ইবন উবাদা (রা)-এর শুশ্রূষার জন্য তিনি গমন করছিলেন। তিনি সা'দ ইব্ন উবাদা (রা)-কে (তাঁর গৃহে পৌঁছে) বললেন, তুমি কি শোননি আবূ হুবাব অর্থাৎ আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই (মুনাফিক নেতা) কি বলেছে? তিনি তার কথার পুনরুক্তি করে বললেন, সে আমাকে এরূপ এরূপ বলেছে। তখন সা'দ ইব্ন উবাদা (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি তাকে ক্ষমা করে দিন এবং উপেক্ষা করুন। তিনি তাকে ক্ষমা করে দিলেন। (বর্ণনাকারী বলেন) রাসূলুল্লাহ্ ও তাঁর সাহাবা কিরাম সাধারণত আহলি কিতাব ও মুশরিকদের এরূপ কটুবাক্য ও ক্লেশদানকেও অনুরূপ ক্ষমা করে দিতেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ (প্রশংসারূপে) এই আয়াত নাযিল করেন:
فَاعْفُوا وَاصْفَحُوْا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرُ -
তোমরা ক্ষমা করো ও অপেক্ষা করো যতক্ষণ না আল্লাহ্ (যুদ্ধ ও প্রতিশোধের) কোনো নির্দেশ দেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।
ফায়দা : এখানেও যেহেতু গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে রাসূলুল্লাহ্-এর ক্ষমা ও দয়া গুণের বর্ণনা করা, সেহেতু পূর্ণ হাদীস বর্ণনা করেননি। বরং ঐ সংক্রান্ত অংশটুকু বর্ণনা করাকেই যথেষ্ট মনে করেছেন। পূরো হাদীসটি সহীহ বুখারীতে উল্লিখিত হয়েছে: একবার রাসূলুল্লাহ্ হযরত সা'দ ইব্ন উবাদা (রা)-এর শুশ্রূষার জন্য গাধার উপর আরোহণ করে রওয়ানা করেন। তাঁর পিছনে তিনি উসামা ইব্ন যায়দ (রা)-কে বসিয়ে নেন। তিনি একটি জনসমাবেশের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে মুনাফিক-নেতা আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই ইব্ন সালূলও উপস্থিত ছিল। সমাবেশে উপস্থিতদের মধ্যে মুসলমান, ইয়াহূদী, মুশরিক সবাই ছিলো। নবী-এর বাহনের চলার কারণে যখন ধুলাবালি উড়ে গিয়ে সমাবেশে পড়লো, তখন আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই তার নাকে চাদর গুঁজে দিলো এবং নবী-কে বললো, দেখো, আমাদের উপর ধুলি উড়িয়ো না। তোমার গাধার ধুলোবালি আমার দেমাগ খারাপ করে দিয়েছে। নবী তার কথায় কর্ণপাত করলেন না এবং সমাবেশে উপস্থিত জনতাকে সালাম করে বাহন থেকে নেমে অমুসলিমদের ইসলামের দাওয়াত দেওয়া শুরু করেন। কিন্তু সে (আবদুল্লাহ্) তাঁকে সম্বোধন করে বললো, দেখো, এটা ঠিক না, আমাদের সভায় এসে আমাদের বিব্রত করবে না। তুমি তোমার বাহনের উপর উঠো এবং যে তোমার কাছে যাবে তাকে তোমার দীনের দাওয়াত দাও। তখন আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহা (রা) যিনি ঐ সভায় উপবিষ্ট ছিলেন-নবীকে বললেন, আপনি অবশ্যই আমাদের সভা-সমাবেশে আগমন করবেন। আমরা আপনার আহ্বান ও বক্তব্য পছন্দ করি। এ নিয়ে কথা কাটাকাটি এতই বেড়ে গেলো যে, মুসলিম, ইয়াহুদী ও মুশরিকদের পরস্পরের মধ্যে বচসা, গালিগালাজ ও হাতাহাতি পর্যন্ত গড়ায়। এমনকি যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার আশংকা দেখা দেয়। কিন্তু নবী অতিকষ্টে তাদেরকে থামিয়ে দেন এবং ব্যাপারটি মিটমাট হয়ে যায়। এরপর তিনি তাঁর বাহনের উপর আরোহণ করে সাদ ইবন উবাদা (রা)-এর বাড়িতে গমন করেন এবং তাঁর সাথে সাক্ষাৎকালে তাঁকে বলেনঃ হে সা'দ্! তুমি কি শোননি যে, একটু আগে আবূ হুবাব অর্থাৎ আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই ইব্ন সালূল কি বলেছে? সাদ (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি তাকে ক্ষমা করুন এবং তার কথার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করবেন না।
এটি ইসলামের প্রথম দিকের ঘটনা। তখনো জিহাদ ও যুদ্ধের হুকুম নাযিল হয়নি। তখন মুসলিমদের প্রতি নির্দেশ ছিল ঐসব কাফির ও ইয়াহুদীদের নিকট থেকে কোনোরূপ প্রতিশোধ না নেয়ার এবং তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ও যুদ্ধ করার নির্দেশ নাযিল না হওয়া পর্যন্ত ক্ষমা ও উপেক্ষা করে চলার। কিন্তু নবী এত উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন যে, জিহাদ ও যুদ্ধের হুকুম নাযিল হওয়ার পরও তিনি মদীনার ঐ সব মুনাফিককে তাদের মুনাফিকী ও ইসলামের বিরোধিতার জন্য শাস্তি দেননি এবং তাদের বিরুদ্ধে কখনো যুদ্ধ করেননি। এই ক্ষমা ও দয়ার ফলেই ক্রমে ক্রমে সমস্ত মুনাফিক অবশেষে একনিষ্ঠ মুসলমান হয়ে যায়। কেবল কয়েকজন ছাড়া, যারা তাদের মুনাফিক থাকা অবস্থায়ই বিভীষিকাময় মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে।
۷۱. عَنِ الزُّهْرِيُّ حَدَّثَنِي عُمَارَةَ بْنُ خُزَيْمَةَ أَنَّ عَمَّهُ حَدَّثَهُ (وَهُوَ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيُّ ( أَنَّ النَّبِيَّ وَابْتَاعَ فَرَسًا مِنْ أَعْرَابِي فَاسْتَتْبَعَهُ النَّبِي لِيُعطيه ثَمَنَ فَرَسِهِ فَأسْرَعَ النَّبِيُّ الْمَشْيَ وَابْطَأَ الْأَعْرَابِيُّ فَطَفِقَ رِجَالٌ يُعَرِضُوْنَ لِلأَعْرَابِي يُسَارِمُونَهُ بِالْفَرَسِ لَا يَشْعُرُونَ أَنَّ النَّبِيَّ ابْتَاعَهُ حَتَّى زَادَ بَعْضُهُمْ لِلْأَعْرَابِي فِي السَّوْمِ عَلَى الثَّمَنِ الَّذِي ابْتَاعُهُ النَّبِي فَنَادَى الْأَعْرَابِيُّ فَقَالَ لَئِنْ كُنْتَ مُمْتَاعًا هُذَا الْفَرَسَ فَابْتَعْهُ وَإِلَّا بِعْتُهُ فَقَالَ النَّبِيُّ حِيْنَ سَمِعَ نِدَاءَ الْأَعْرَابِي أَوَلَيْسَ قَدْ ابْتَعْتُهُ فَقَالَ لَا وَاللَّهِ مَا بِعْتَكَ فَقَالَ بَلَى قَدِ ابْتُعْتُهُ مِنْكَ ، فَطَفِقَ النَّاسُ يَلُؤْذُونَ بِالنَّبِيِّ الله وَالأَعْرَابِي يَقُولُ هُلَمَّ شَهِيدًا فَلْيَشْهَدْ أَنَّى قَدْ بَايَعْتُكَ ، فَمَنْ جَاءَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ قَالَ لِلأَعْرَابِي وَيْلَكَ أَنَّ النَّبِيُّ وَ لَمْ يَقُولُ الأَحَقَّا .
৭১. যুহরী (র) বলেন, আমার নিকট উমারা ইবন খুযায়মা (র) বর্ণনা করেন যে, আমার নিকট আমার চাচা (যিনি নবী-এর একজন সাহাবী ছিলেন) বর্ণনা করেন। নবী একবার কোনো এক বেদুঈনের নিকট থেকে একটি ঘোড়া ক্রয় করেন এবং মূল্য পরিশোধ করার জন্য তাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা হন। নবী জোর কদমে অগ্রসর হচ্ছিলেন। আর ঐ বেদুঈন চলছিলো ঢিমে-তেতালা গতিতে। (ফলে ঐ বেদুঈন নবী এর অনেক পেছনে পড়ে গেলো) এবং লোকেরা তাকে রাস্তায় থামিয়ে ঘোড়াটি ক্রয় করার কথাবার্তা শুরু করলো। তারা জানতো না যে, এ ঘোড়াটি নবী খরিদ করেছেন। সুতরাং কেউ কেউ ঐ ঘোড়াটির মূল্য নবী-এর স্থিরীকৃত মূল্যের চেয়েও অধিক হাঁকালো। এই অবস্থা দেখে বেদুঈনের মনে গোলমাল দেখা দিলো। সে নবী-কে ডেকে বললো, আপনি যদি এ ঘোড়াটি ক্রয় করতে চান, তবে ক্রয় করুন নতুবা আমি অন্য কারো কাছে বিক্রি করে দেবো। নবী বেদুঈনের কথা শুনে বললেন, আরে আমি কি তোমার কাছ থেকে ঘোড়াটি ক্রয় করিনি? সে বললো, না। আল্লাহ্র কসম! আমি ঘোড়াটি আপনার কাছে বিক্রি করিনি। নবী বললেন, তুমি এ কি বলছো! আমি তো তোমার নিকট থেকে ঘোড়াটি ক্রয় করেছি। নবী ও বেদুঈনের আশপাশে লোকজন জড়ো হতে শুরু করলো। তখন বেদুঈন বলতে লাগলো, (আচ্ছা) আপনি যদি সত্যবাদী হন, তবে আমি যে আপনার কাছে ঘোড়াটি বিক্রি করেছি এ ব্যাপারে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থিত করুন। কিন্তু সেখানে যে মুসলিমই আসতো, সেই ঐ বেদুঈনকে বলতো যে, আরে হতভাগা! নবী তো সত্য ছাড়া কিছু বলতেই পারেন না।
ফায়দা: দেখুন, এ ঘটনায় হতভাগা বেদুঈন তার গোয়ার্তুমির দরুন নবী-এর সততা ও সাধুতার উপর কত বড় আক্রমণ করলো। একজন নিরীহ সাধারণ মানুষও এরূপ ঔদ্ধত্য সহ্য করতে পারে না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ কৃপা ও করুণার মূর্ত প্রতীকরূপে বেদুঈনের কথা শ্রবণ করেন। তাকে কিছুই বললেন না। আল্লাহ্ সত্যই বলেছেন (بِالْمُؤْمِنِينَ رَقُفُ رَّحِيمٌ )মু'মিনদের প্রতি তিনি বড়ই দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু। (সূরা তাওবা: ২৮)
۷۲. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتِ ابْتَاعَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ جَزُورًا مِنْ أَعْرَابِي بِوَسَقٍ مِّنْ تَمَرِ النَّخِيرَةِ - فَجَاءَ بِهِ إِلَى مَنْزِلِهِ فَالْتَمَسُ التَّمَرُ فَلَمْ يَجِدْهُ فِي الْبَيْتِ قَالَ فَخَرَجَ إِلَى الْأَعْرَابِي فَقَالَ يَا عَبْدَ اللَّهِ أَنَّا ابْتَعْنَا مِنْكَ جزُورَكَ هُذَا بِوَسَقٍ مِنْ تَمَرِ النَّخِيرَةِ نَحْنُ نَرَى أَنَّهُ عِنْدَنَا فَلَمْ نَجِدْهُ، فَقَالَ الْأَعْرَابِيُّ وَاغْدَرَاهُ وَاغَدْرَاهُ فَوَكَزَهُ النَّاسُ وَقَالُوا لِرَسُولِ تَقُولُ هَذَا ؟ فَقَالَ دَعُوهُ -
৭২. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ জনৈক বেদুঈন থেকে এক 'ওয়াসাক' মওজুদ কৃত খেজুরের বিনিময়ে একটি উট ক্রয় করলেন (তাঁর ধারণা ছিল গৃহে খেজুর মওজুদ আছে) তাই তিনি তাকে গৃহে নিয়ে এলেন এবং খেজুর তালাশ করলেন, কিন্তু খেজুর পাওয়া গেলো না। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তৎক্ষণাৎ বেদুঈনের কাছে গেলেন এবং তাকে বললেন, হে আল্লাহ্র বান্দা! আমি তোমার নিকট থেকে এক 'ওয়াসাক' খেজুরের বিনিময়ে তোমার এই উটটি ক্রয় করেছিলাম। আমার ধারণা ছিল, খেজুর আমার কাছে মওজুদ আছে, কিন্তু এখন দেখলাম নেই। এ কথা শুনে বেদুঈন বললো, হায় ধোঁকাবাজি! হায় ধোঁকাবাজি!! তখন লোকেরা তাকে ঘুষি মারা শুরু করলো এবং বললো, হতভাগা! রাসূলুল্লাহকে এরূপ কথা বলছো! তখন তিনি বললেন, তোমরা তাকে ছেড়ে দাও।
ফায়দা: রাসূলুল্লাহ্ কোনো নিয়ম বিরোধী কথা বলেননি। প্রায়ই এরূপ ঘটনা ঘটে থাকে। এটাকে প্রতারণা ও অসাধুতা বলা যায় না। কেননা, তখনো বিক্রীত দ্রব্য বিক্রেতার নিকটই ছিল। কিন্তু ঐ বেদুঈন ব্যক্তি তার গোয়ার্তুমি ও মূর্খতার দরুন নবী -কে অসাধু ও প্রতারক বলে তাঁকে চরমভাবে অপমানিত করেছে। লক্ষণীয় যে, অজ্ঞতার দরুন নবী-কে গালমন্দ করা ধর্মত্যাগ ও হত্যাযোগ্য অপরাধ না হলেও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ-এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যেহেতু এ বিষয়টি ছিল স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ এর পবিত্র সত্তার সাথে সম্পর্কিত, তাই তিনি তাঁর মর্যাদা অনুযায়ী ঐ বেয়াদব ও দুষ্ট লোকটিকে শাস্তি না দিয়ে ক্ষমা করে দেন।
۷۳. عَنْ مَهْدِي بْنِ عِمْرَانَ قَالَ رَأَيْتُ أَبَا الطُّفَيْلِ جِيئَ بِهِ فِي كَسَاءِ وَالْقِيَ فِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ فَقِيلَ هُذَا قَدْ رَأَى النَّبِيُّ فَدَنَوْتُ مِنْهُ فَقَالَ رَأَيْتُ رَسُولُ اللَّهِ وَ فَاتَّبَعْتُهُ حَتَّى أَتَى دَارًا فَدَفَعَ بَابَهَا فَدَخَلَ فَإِذَا لَيْسَ فِي الدَّارِ إِلَّا قَطِيفَةُ فَنَفَضَهَا فَإِذَا رَجُلٌ أَعْوَرُ فَقَالَ أَشْهَدُ أَنِّي رَسُولُ اللَّهِ ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ لا تَعْوَذُوا بِاللَّهِ مِنْ شَرِّ هَذَا -
৭৩. মাহদী ইব্ন ইমরান (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি দেখলাম, হযরত আবূ তোফায়ল (রা)-কে মসজিদে হারামে নিয়ে এসে শায়িত করা হয়েছে। তিনি তখন চাদরে আবৃত ছিলেন। কেউ বলেন, ইনি নবীকে দর্শন করেছেন। অর্থাৎ আবূ তোফায়ল (রা) নবী-এর সাহাবী ছিলেন। মাহ্দী ইব্ন ইমরান (রা) বলেন, আমি হযরত আবূ তোফায়ল (রা)-এর কাছ থেকে হাদীস শোনার জন্য তাঁর নিকট গেলাম। তিনি বললেন, একবার আমি রাসূলুল্লাহ্-কে কোথাও যেতে দেখলাম। আমিও তাঁর পেছনে পেছনে রওয়ানা হলাম। তিনি একটি গৃহে উপস্থিত হলেন এবং দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন। গৃহে একটি কম্বল পড়ে ছিলো। কম্বলটি ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। তিনি ঐ কম্বলটি ধরে হেঁচকা টান মারলেন। তার মধ্য থেকে একটি কানা (একচক্ষু বিশিষ্ট) লোক বেরিয়ে এলো। সে রাসূলুল্লাহ্-কে বললো, আপনি কি সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, আমি আল্লাহর রাসূল? তখন রাসূলুল্লাহ্ বললেন, হে লোক সকল! তোমরা তার অনিষ্ট থেকে আল্লাহর পানাহ চাও।
ফায়দা: এই ব্যক্তি ছিল ইব্ন সায়্যাদ। সহীহ বুখারী ও হাদীসের অন্যান্য কিতাবে তার কাহিনী সবিস্তার বর্ণিত হয়েছে। ইব্ন সায়্যাদের ডাকনাম 'সাফ' এবং এক বর্ণনা মতে আবদুল্লাহ্। এ ছিল মদীনার এক ইয়াহুদী। এর সম্পর্কে বর্ণনাকারীদের বিভিন্ন উক্তি রয়েছে। কেউ কেউ তাকে দাজ্জালও বলেন। বর্ণনাসমূহ থেকে জানা যায়, সে প্রতিশ্রুত দাজ্জাল না হলেও ফিত্না সৃষ্টিতে কমও ছিল না। বাল্যকাল থেকেই গণক ও জাদুকরের মতো কথা বলতো। আল্লাহ্ তা'আলা মুসলিমদের পরীক্ষার জন্য তাকে সৃষ্টি করেছিলেন। প্রথমে সে নিজেকে নবী বলে দাবি করতো। কিন্তু শেষে ইসলাম গ্রহণ করে। মুসলমানদের সাথে হজ্জ ও জিহাদ প্রভৃতিতেও শরীক হয়। কিন্তু তারপরও সে এই ধরনের উচ্ছৃংখল কথাবার্তা বলতো। গ্রন্থকারের এই হাদীসটিও এ স্থলে বর্ণনা করার কারণ হচ্ছে, এ ধরনের উচ্ছৃংখলতা ও ধৃষ্টতা ছাড়াও সে নবী-এর সামনে নিজেকে নবী বলে দাবি করে এবং স্বয়ং নবী-কেই তার উপর ঈমান আনার জন্য আহ্বান করে। নবী তাকে হত্যা করেননি এবং কোনো শাস্তিও দেননি। কারণ সে ছিল তখন বালক। তাছাড়া মদীনার ইয়াহূদীর সাথে তখন নবী সন্ধিবদ্ধও ছিলেন। অবশ্য তিনি লোকদেরকে তার অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য সাবধান করে দেন।
٧٤ عَنْ أَنَسٍ أَنَّ يَهُودِيَّةً اَتَتِ النَّبِيُّ بِشَاةٍ مُسْمُوْمَةٍ لِيَأْكُلَ مِنْهَا فَجِيَ بِهَا إِلَى النَّبِيُّ فَسَأَلَهَا عَن ذَلِكَ، فَقَالَتْ أَرَدْتُ قَتْلَكَ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ وَمَا كَانَ اللَّهُ لَيُسَلِّطْكِ عَلَى ذَلِكَ أَوْ قَالَ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ قَالُوا أَفَلَا نَقْتُلُهَا؟ قَالَ لَا -
৭৪. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, জনৈক ইয়াহুদী নারী নবী-এর নিকট একটি ভুনা বক্রীর বাচ্চা আহারের জন্য নিয়ে আসে। তাতে সে বিষ মিশ্রিত করেছিল। (এরপর নবী যখন ঐ গোস্ত বিষ মিশ্রিত হওয়ার সংবাদ মহান আল্লাহ্ তরফ থেকে জানতে পারলেন, তখন এ স্ত্রীলোকটিকে ডাকালেন) লোকেরা নবী-এর নিকট তাকে উপস্থিত করলো। তিনি ঐ বিষ মিশ্রিত গোস্ত সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এ কাণ্ড কেন করেছো? ঐ (উদ্ধত) নারী বললো, আমি আপনাকে হত্যা করতে চেয়েছি। তখন রাসূলুল্লাহ্ বললেন: মহান আল্লাহ্ তোমাকে এ কাজে সফল হতে দেবেন না (অর্থাৎ তুমি নবীকে হত্যা করতে পারবে না)। কিংবা বলেছেন, কোনো মুসলিমের বিরুদ্ধে আল্লাহ তা'আলা তোমাকে এ ব্যাপারে সফল করবেন না। সাহাবাগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা কি তাকে হত্যা করবো না? তিনি বললেন, না।
ফায়দা: এখানেও হাদীসের শুধু সেই অংশই বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে নবী-এর ক্ষমা ও দয়া গুণের আলোচনা রয়েছে। অন্যান্য রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, খায়বারের অধিবাসী এক ইয়াহুদী নারী বিষ মিশ্রিত করে একটি ভুনা বক্সী নবী-এর নিকট পেশ করলো। তিনি ঐ বক্রীর গোস্তের মধ্য থেকে হাতার একটি অংশ ভক্ষণ করলেন। তাঁর সাথে আরো কিছু সাহাবীও খাচ্ছিলেন। তাঁরাও এই বিষ মিশ্রিত বক্সীর গোস্ত খাওয়া শুরু করলেন। কিন্তু লোকক্কা মুখে দিতেই নবী সাহাবাদের নির্দেশ দিলেন যে, তোমরা খাওয়া বন্ধ করো (গোস্তে বিষ মিশ্রিত করা হয়েছে) এবং তখনই তিনি ঐ ইয়াহুদী নারীকে ডেকে পাঠালেন। (আসার পর) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এই বক্রীর গোস্তে বিষ মিশিয়েছো? সে বললো, আপনাকে কে বলেছে? তিনি বললেন, এই টুকরোটি আমাকে বলে দিয়েছে যা আমার হাতে রয়েছে। তখন ঐ ইয়াহুদী নারী স্বীকার করলো এবং বললো, আমি আপনাকে পরীক্ষা করার জন্য বিষ মিশিয়েছি। আপনি যদি সত্য নবী হন তবে এই বিষে আপনার কোনো ক্ষতি হবে না। কেননা, আপনি তা অবগত হতে পারবেন। আর আপনি যদি সত্য নবী না হন, তবে ধ্বংস হয়ে যাবেন এবং আমরা আপনার থেকে মুক্তি পাবো। নবী ঐ নারীকে তার প্রাণনাশের চেষ্টা সত্ত্বেও কোনো শাস্তি দেননি। বরং ক্ষমা করে দেন। নবী-এর সাথে যে সাহাবী ঐ মাংস ভক্ষণ করেছিলেন, তিনি ঐ বিষের প্রতিক্রিয়ায় ইন্তিকাল করেন।
অন্যান্য রিওয়ায়াত থেকে জানা যায় যে, নবী তাঁর নিজের পক্ষ থেকে ঐ নারীকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন, এবং প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। অবশ্য যখন ঐ বিষে হযরত বিশর ইন্ন বারাআ (রা) ইন্তিকাল করেন, তখন তাঁর কিসাসস্বরূপ তিনি ঐ নারীকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ হাদীস থেকে অনুমিত হয়, তিনি তাঁর প্রাণের শত্রুদের সাথে কি পরিমাণ সদয় আচরণ করতেন। তিনি ইচ্ছাকৃত হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন না। বরং তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া ছাড়াও তাদের কল্যাণ কামনাও করতেন। যেমন বিভিন্ন ঘটনা ও রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে, তায়েফে শত্রুরা কি পরিমাণ তাঁকে নির্যাতন করে। দুষ্ট ও দুরন্ত বালকদেরকে লেলিয়ে দিয়ে প্রস্তর বর্ষণের মাধ্যমে তাঁকে রক্তাক্ত করা হয়েছে। নবীজীর মাথা গোঁজার কোথাও আশ্রয় ছিল না।
তায়েফের নেতারা দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিলো। আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে ঐ সময় হযরত জিব্রাঈল (আ) পাহাড়ের অধিকর্তা ফিরিস্তাকে সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং বলেন যে, আপনি হুকুম দিলে এখনই এই দুই পাহাড়ের মাঝে ফেলে তাদেরকে পিষে মারা হবে। কিন্তু তাঁর পবিত্র মুখ থেকে এই দু'আই নিঃসৃত হলো اللَّهُمَّ أَهْدِ قَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُوْنَ ) আল্লাহ্! আমার জাতিকে হিদায়াত করুন। কেননা, এরা জানে না (যে, আমি আল্লাহ্ রাসূল)"।
٧٥ عَنْ زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ قَالَ سَجِرَ النَّبِيُّ اللهِ رَجُلٌ مِنَ الْيَهُودِ قَالَ فَاشْتَكَي لِذلِكَ أَيَّامًا ، قَالَ فَأَتَاهُ جِبْرَئِيلُ عَلَيْهِ السَّلامُ فَقَالَ إِنَّ رَجُلاً مِنَ الْيَهُودِ سَحَرَكَ فَعُقِدَلَكَ عَقْدًا فَأَرْسَلَ رَسُولُ اللهِ ﷺ عَلِيًّا فَاسْتَخْرَجَهَا فَجَاءَ بِهَا، فَجَعَلَ كُلَّمَا حَلَّ عُقْدَةً وَجَدَ لِذلِكَ خِفَّةً، فَقَامَ رَسُولُ اللهِ ﷺ كَأَنَّمَا أُنْشِطَ مِنْ عِقَال: فَمَا ذَكَرَ ذَلِكَ لِليَهُودِي وَلَآرَاهُ فِي وَجْهِهِ قَطُّ -
৭৫. হযরত যায়িদ ইব্ন আরকাম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার এক ইয়াহুদী নবী-কে জাদু করলেন। ফলে তিনি কিছুদিন অসুস্থ বোধ করছিলেন।' বর্ণনাকারী বলেন, তারপর একদিন তাঁর নিকট হযরত জিব্রাঈল (আ) আগমন করে তাঁকে অবগত করলেন যে, জনৈক ইয়াহুদী আপনাকে জাদু করেছে এবং (কালো) সূতার মধ্যে গিরা লাগিয়েছে। নবী তখন হযরত আলী (রা)-কে সেখানে পাঠালেন। হযরত আলী (রা) সেই তাগা সেখান থেকে তুলে আনেন। নবী ঐ গিরাগুলো খুলতে শুরু করেন। এক একটি গিরা খোলার সাথে সাথে তাঁর কষ্টের উপশম অনুভূত হতো। সবগুলো গিরা খোলার সাথে সাথে তিনি এমনভাবে দাঁড়িয়ে গেলেন, যেমন কোনো বাঁধা ব্যক্তি রশি থেকে মুক্ত হয়েছেন। কিন্তু তিনি কখনো ঐ জাদুর আলোচনা ঐ ইয়াহূদীর সাথে করেননি এবং কখনো তিনি প্রতিশোধের দৃষ্টিতে তার প্রতি তাকাননি।
ফায়দা : রিওয়ায়াত সমূহে বর্ণিত হয়েছে যে, ঐ ইয়াহুদীর নাম ছিল লাবীদ ইব্ আসাম। সে ছিলো বানু যুরায়ক গোত্রের লোক। সে নবীকে মেরে ফেলার জন্য (নাউযুবিল্লাহ্) তাঁর উপর প্রচণ্ড রকমের জাদু করেছিলো। মুশরিক ও ইয়াহুদীরা ছিলো তাঁর প্রাণের শত্রু। তাঁকে যে কোনোভাবে এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য ছিলো তারা সদা তৎপর। গোপন স্থানে লুকিয়ে থেকে আঁধার রাতে তাঁর উপর হামলা করেছে, বিষ প্রয়োগ করেছে এবং যখন তাতে ব্যর্থ হয়েছে, তখন তাঁকে জাদু দ্বারা মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আল্লাহ্ তাঁর নবীর সাথে ওয়াদা করেছিলেন যে, মানুষের হাত থেকে তাঁকে রক্ষা করবেন। وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنْ النَّاسِ )আল্লাহ্ আপনাকে লোকের হাত থেকে বাঁচাবেন)। তাই আল্লাহ্ তাঁর নবীকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন। কোথাও মুশরিকদের উপর প্রভাব ফেলে তাদের থেকে রক্ষা করেছেন, কোথাও ওহীর মাধ্যমে আসন্ন বিপদ সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করেছেন এবং কোথাও ফেরেস্তা পাঠিয়ে তাঁকে সাহায্য করেছেন। নবী-এর নিকট সব উপায় বিদ্যমান ছিলো। যেভাবে ইচ্ছা ঐ ইয়াহুদী ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। তাদেরকে সম্পূর্ণ ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা কখনো করেননি। প্রতিবার কাফিরদের কষ্ট দানকে ক্ষমা করে দিতেন এবং তাদের প্রতি দয়া করতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিলো, তারা হিদায়াত কবুল না করলেও তাদের সন্তান-সন্ততি অবশ্যই সুপথে আসবে। তিনি প্রতিনিয়ত তাঁর জাতির হিদায়াতের জন্য দু'আ করতেন। বিশেষ করে স্বীয় ব্যক্তিগত ব্যাপারে কখনো প্রতিশোধ নিতেন না। তাই ইয়াহুদী যখন তাঁর উপর জাদু করলো তিনি তার প্রতি একটু অসন্তোষও প্রকাশ করেননি, তাকে শান্তি দেননি। এমনকি তার সাথে এ ব্যাপারে আলোচনাও করেননি। অপর এক রিওয়ায়াতে বর্ণিত আছে, এ ব্যাপারে হযরত আয়েশা (রা) তাঁকে বলেছিলেন যে, আপনি ঐ ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচারণা কেন চালাচ্ছেন না। তিনি জবাব দিলেন, আল্লাহ্ আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। তাই আমি তার দুর্নাম রটানো পছন্দ করলাম না। এটাই ছিলো তাঁর উঁচুমন ও মহান আল্লাহ্র বাণী ( إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٌ “নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত)-এর বাস্তব নমুনা।
عَنِ ابْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ لَمَّا كَانَ يَوْمَ الْفَتْحِ أَرْسَلَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِلَى صَفْوَانَ بْنِ أُمَيَّةَ بْنِ خَلْفَ وَأَبِي سُفْيَانَ بْنَ حَرْبٍ وَإِلَى الْحَارِثِ بْنِ هِشَامٍ، قَالَ ابْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ فَقُلْتُ قَدْ أَمْكَنَنِي اللهُ عَزَّ وَجَلَّ مِنْهُمْ بِمَا صَنَعُوا حَتَّى قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مَثَلِي وَمَثَلُكُمْ كَمَا قَالَ يُوسُفُ لِإِخْوَتِهِ لاَ تَشْرِيْبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ فَانْفَضَحْتُ حَيَاءً مِنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ
৭৬. হযরত (উমর) ইব্ন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ সাওয়ান ইবন উমায়্যা ইবন খালফ, আবু সুফিয়ান ইব্ন হারব ও হারিস ইবন হিশামকে ডেকে পাঠালেন। হযরত উমর (রা) বলেন, আমি আপন মনে বললাম, আজ আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে তাদের কৃতকর্মের শাস্তিদান ও প্রতিশোধ গ্রহণের সুযোগ দান করবেন। কেননা, স্পষ্টতই এরা যুদ্ধবন্দী। নবী তাদেরকে হত্যা করাবেন এবং আমার দ্বারাই এ কাজ করাবেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ সে সময় বললেন, এখন আমার ও তোমাদের দৃষ্টান্ত সম্পূর্ণ হযরত ইউসুফ ও তাঁর ভাইদের মতো। এজন্য আমি তাই বলবো, যা হযরত ইউসুফ (আ) বলেছিলেন : ”لاَ تَشْرِيْبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ - কাজেই তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের ক্ষমা করুন। হযরত উমর (রা) বলেন, (তাঁর এই উদারতা দেখে) আমি লজ্জায় নতমুখ হয়ে গেলাম। (আমি যেখানে প্রতিশোধ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, আনন্দ উল্লাস করছি, তিনি সেখানে আজীবনের দুশমনদেরকে ক্ষমার সুসংবাদ শোনাচ্ছেন।)
عَنْ عُبَيْدِ اللهِ بْنِ أَبِي رَافِعٍ كَاتِبٍ عَلَى أَنَّهُ سَمِعَ عَلِيًّا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ يَقُولُ بَعَثَنِي رَسُولُ اللهِ ﷺ أنا والزُّبَيْرُ وَالْمِقْدَادِ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ انْطَلِقُوا حَتَّى تَأْتُوا رَوْضَةَ خَاخٍ، فَإِنَّ بِهَا ظَعِيْنَةً مَعَهَا كِتَابُ فَخُذُوهُ مِنْهَا فَانْطَلَقْنَا حَتَّى آتَيْنَا رَوْضَةَ خَاخٍ فَقُلْنَا أَخْرِجْى الْكِتَابَ فَقَالَتْ مَا مَعِي مِنْ كِتَابِ قُلْنَا لَتُخْرِجَنَّ الْكِتَابَ أَوْ لَنُقَلِبَنَّ الثَّيَابَ فَأَخْرَجُوهُ مِنْ عِقَاصِهَا فَأَتْيَنَا بِهِ النَّبِيُّ فَإِذَا فِيْهِ مِنْ حَاطِبِ بْنِ أَبِي بَلْتَعَةَ إِلَى أُنَاسِ مِنَ الْمُشْرِكِينَ يُخْبِرُهُمْ أَمْرًا مِنْ أَمْرِ رَسُولِ اللهِ ﷺ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَا حَاطِبُ مَا هُذَا ؟ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ لا تَعْجَلْ عَلَى إِنِّي كُنْتُ امْرًا مُلْصِقًا فِي قَوْمِي، وَكَانَ مَعَكَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ لَهُمْ قَرَابَاتُ بِمَكَّةَ يَحَمُوْنَ اَهْلِيْهِمْ فَأَحْبَبْتُ إِذَا فَاتَنِي ذَلِكَ مِنْهُمْ مِنَ النَّسَبِ أَنْ أَتَّخِذَ فِيْهِمْ يَدًا يَحَمُوْنَ بِهَا قَرَابَتِي، وَلَمْ أَفْعَلْ ذَلِكَ كُفْرًا وَلَا رِضًا بِالْكُفْرِ بَعْدَ الإِسْلامِ وَلَا ارْتِدَادًا عَنْ دِيْنِي فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ صَدَقَكُمْ فَقَالَ عُمَرُ أَضْرِبُ عُنُقَ هُذَا الْمَنَافِقِ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِنَّهُ قَدْ شَهِدَ بَدْرًا وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّ اللَّهَ اطَّلَعَ إِلَى أَهْلِ بَدْرٍ فَقَالَ اعْمَلُوْا مَا شِئْتُمْ فَقَدْ غَفَرْتُ لَكُمْ
৭৭. হযরত আলী (রা)-এর কাতিব (লিপিকার) উবায়দুল্লাহ্ ইব্ন্ন রাফি হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ যুবায়র, মিকদাদ (রা) ও আমাকে (এক মহিলা গুপ্তচরকে গ্রেফতার করার জন্য) প্রেরণ করেন এবং বলেন: তোমরা চলে যাও। যখন 'রাওযা খাখ' নামক স্থানে পৌঁছবে, সেখানে একটি স্ত্রীলোকের সাথে তোমাদের সাক্ষাৎ হবে। তার নিকট একটি চিঠি আছে। চিঠিটা তার নিকট থেকে নিয়ে আসবে। আলী (রা) বলেন, আমরা তখনই রওয়ানা দিলাম। যখন আমরা 'রাওযা খাখ' পৌছলাম। সেখানেই ঐ স্ত্রীলোকটিকে দেখতে পেলাম। আমরা তাকে বললাম, 'চিঠি বের করো'। সে বললো, 'আমার কাছে কোন চিঠি নেই।' আমরা তাকে (ধমক দিয়ে) বললাম, চিঠি বের করো নতুবা আমরা তোমার দেহ তল্লাশি করবো। [হযরত আলী (রা) বলেন], তখন সে চিঠি তার চুলের খোঁপার মধ্য থেকে বের করলো। আমরা সে চিঠি নিয়ে নবী -এর নিকট উপস্থিত হলাম। (তিনি ঐ চিঠি খুলে দেখলেন), তাতে লেখা আছেঃ "হাতিব ইব্ন আবূ বালতা'আর পক্ষ থেকে (মক্কার) মুশরিকদের প্রতি" চিঠিতে রাসূলুল্লাহ্-এর কোনো যুদ্ধের গোপন খবর দেয়া হয়েছিলো। তিনি হাতিবকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন: হে হাতিব! এ কী ব্যাপার? হাতিব (রা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে মেহেরবানী করে তাড়াহুড়ো করবেন না। প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, আমি বংশগতভাবে কুরায়শী নই। বরং আমার গোত্র কুরায়শের মিত্র। আর এই সুবাদেই কুরায়শের সাথে আমার সামান্যতম সম্পর্ক বিদ্যমান। তাদের সাথে আমার কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক আদৌ নেই। অথচ আপনার সাথে যেসব মুহাজির আছেন, মক্কায় তাদের সবার আত্মীয়-স্বজন রয়েছে। (তাদের আত্মীয়-স্বজন) তাদের ধন-সন্তান রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। তাই আমি যখন দেখলাম, মক্কায় আমার এমন কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই, যারা আমার সম্পদ সন্তান রক্ষণাবেক্ষণ করবে, তখন আমি মক্কার মুশরিকদের প্রতি কিছু অনুগ্রহ করা শ্রেয় মনে করলাম, যাতে তারা আমার সম্পদ-সন্তানের রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং তাদের কোনো ক্ষতি না করে। এটা আমি কুফর বা ইসলাম গ্রহণের পর কুফরীর প্রতি সন্তোষ প্রকাশ এবং আপন দীন ত্যাগ করার ভিত্তিতে আদৌ করিনি। (আমি এখনো ঠিক পূর্বের মতো একনিষ্ঠ মুসলিম রয়েছি। তখন রাসূলুল্লাহ্ সকল সাহাবাকে সম্বোধন করে বললেন: হাতিব তোমাদের কাছে সত্য কথা প্রকাশ করে দিয়েছে। (সে অজ্ঞতাবশতঃ এই ভুল করেছে) তখন হযরত উমর (রা) দাঁড়িয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি কি তার শিরশ্ছেদ করবো না? তিনি বললেন, না, এরূপ করবে না। এ ব্যক্তি তো বদরের যুদ্ধে শরীক ছিল। মহান আল্লাহ্ বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি কত মেহেরবান তা কি তুমি জানো? আল্লাহ্ বলেছেন : اعْمَلُوْا مَا شِئْتُمْ فَقَدْ غَفَرَتْ لَكُمْ তোমরা যা ইচ্ছা করো। আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি।
ফায়দা: এটি একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা, হাতিব ইব্ন আবূ বালতা'আ (রা) সেই সকল মুহাজিরের অন্যতম; যাঁরা ইসলাম গ্রহণের দরুন মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেছেন। নিজেদের সকল সহায়-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি ইসলামের জন্য মক্কায় ছেড়ে এসেছেন। হাতিব (রা) বদরের সেই সব সৌভাগ্যবান মুহাজির সাহাবীগণের অন্যতম, যারা মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করে দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ লাভ করেছিলেন। তাঁর সম্পর্কেই মহান আল্লাহ্ এই আয়াতসমূহ নাযিল করেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُوْنَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُمْ مِنَ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ أَنْ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ رَبَّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَادًا فِي سَبِيْلِي وَابْتِغَاءَ مَرْضَاتِي تُسِرُّونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَأَنَا أَعْلَمُ بِمَا أَخْفَيْتُمُ وَمَا أَعْلَنْتُمْ وَمَنْ يَفْعَلْهُ مِنْكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيلَ إِنْ يَثْقَفُوكُمْ يَكُونُوا لَكُمْ أَعْدَاءً وَيَبْسُطُوا إِلَيْكُمْ أَيْدِيَهُمْ وَالْسِنَتَهُمْ بِالسُّوْءِ وَوَدُّوا لَوْ تَكْفُرُونَ، لَنْ تَنْفَعَكُمْ أَرْحَامُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَفْصِلُ بَيْنَكُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ بَصِيْرُ.
হে মু'মিনগণ! আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে না। তোমরা কি তাদের সাথে বন্ধুত্ব করছো? অথচ তারা তোমাদের নিকট যে সত্য এসেছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছে। রাসূলকে এবং তোমাদেরকে বহিষ্কার করেছে এই কারণে যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে বিশ্বাস করো। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য আমার পথে জিহাদের উদ্দেশ্যে বহির্গত হয়ে থাকো, তবে কেন তোমরা তাদের সাথে গোপন বন্ধুত্ব করছো? তোমরা যা গোপন করো এবং তোমরা যা প্রকাশ করো, তা আমি সম্যক অবগত। তোমাদের মধ্যে যে কেউ এটা করে সে তো বিচ্যুত হয় সরল পথ হতে। তোমাদেরকে কাবু করতে পারলে তারা হবে তোমাদের শত্রু এবং হাত ও জিহ্বা দ্বারা তোমাদের অনিষ্ট সাধন করবে এবং চাইবে যে, তোমরাও কুফরী করো। তোমাদের আত্মীয়-স্বজন ও সন্তান-সন্ততি কিয়ামতের দিন তোমাদের কোনো কাজে আসবে না। আল্লাহ্ তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করে দিবেন। তোমরা যা কর, তিনি তা দেখেন। (সূরা মুমতাহিনা : ১-৩)
হযরত হাতিব (রা) ইয়ামনের অধিবাসী ছিলেন। পূর্ণ নাম হাতিব ইব্ন আবূ বালতা'আ ইব্ন আম্র ইবন উমাইর ইবন সালামা ইবন সা'ব ইব্ন সাহল লাখামী। তিনি কুরায়শের বনূ আসাদ ইব্ন আবদুল উয্যার মিত্র ছিলেন। কেউ কেউ বলেন, হযরত যুবার (রা) এর মিত্র ছিলেন। তিনি যে বদরী সাহাবী ছিলেন সে ব্যাপারে সবাই একমত। বদরের যুদ্ধ ছাড়াও তিনি হুদায়বিয়ার যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। হযরত উসমান (রা)-এর খিলাফতকালে ৩০ হিজরীতে ৬৫ বছর বয়সে তিনি ইন্তিকাল করেন।
তিনি ইয়ামন থেকে মক্কায় এসে বসবাস করছিলেন। মক্কাবাসীদের সাথে তার কোনো আত্মীয়তা ছিল না। নবী-এর হিজরতের পর তিনি তাঁর পুত্রগণ ও ভাইদের ছেড়ে মদীনায় হিজরত করেন। সুতরাং মক্কার মুশরিকদের তরফ থেকে তাঁর সম্পদ-সন্তানের ক্ষতির আশংকা সততই ছিল। সেই আশংকায় তিনি (অজ্ঞতাবশত) এই কৌশল অবলম্বন করলেন যে, মক্কার মুশরিকদের প্রতি কিছু অনুগ্রহ দেখাবেন, যার দরুন তারা তাঁর সম্পদ-সন্তানের কোনো ক্ষতি করবে না। তাই তিনি মক্কার মুশরিকদের কাছে এই মর্মে এক চিঠি লিখলেন যে, “রাসূলুল্লাহ্ অমুক দিন তোমাদের উপর আক্রমণ করবেন।” মক্কার মুশরিকদের কাছে গোপনে এই চিঠিটা পৌঁছাবার জন্য তিনি একটি স্ত্রীলোককে প্রেরণ করলেন। আল্লাহ্ তা'আলা ওহীর মাধ্যমে তাঁর নবীকে এই রহস্য জানিয়ে দিলেন এবং তিনি ঐ চিঠি উদ্ধার করলেন। তাঁকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তাঁর সত্যতা স্বীকার করলেন এবং নবী-এর কাছে সব কথা খুলে বললেন। তিনি বললেন, আমি এ সব এই বিশ্বাস রেখেই করেছি যে, আল্লাহ্ আপনাকে এই যুদ্ধে অবশ্যই জয়লাভ করাবেন। আমার চিঠিতে ইসলামের এতটুকু ক্ষতি হবে না। কিন্তু আমার পরিবার-পরিজন ও মাল-আসবাব এই সামান্য উপকার দ্বারা রক্ষা পাবে। নবী ও শুধু তাঁর সত্যবাদিতার দরুন তাঁর ওযর কবুল করলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন। সাহাবাগণকেও জানিয়ে দিলেন যে, আমি তাঁকে এজন্য ক্ষমা করে দিয়েছি।
এই ঘটনা থেকেই প্রতীয়মান হয় যে, রাসূলুল্লাহ্ কি পরিমাণ ক্ষমা ও দয়া করতেন। যুদ্ধের তথ্য বিশেষ করে হামলার দিন-তারিখ দুশমনকে জানিয়ে দেওয়া হত্যাযোগ্য অপরাধ। আর এ কারণেই হযরত উমর (রা) তাঁকে হত্যা করার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন। কিন্তু নবী এতবড় অপরাধকেও নিছক তাঁর সত্যবাদিতা ও একনিষ্ঠতার দরুন ক্ষমা করে দিলেন এবং কোনো শাস্তি বিধান করলেন না।
۷۸ عَنْ أَبِي ذَرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ أَتِي رَسُولُ اللَّهِ ﷺ بِرَجُلٍ قَدْ شَرِبَ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ اضْرِبُوهُ فَمِنَّا الضَّارِبُ بِيَدِهِ، وَمِنَّا الضَّارِبُ بِنَعْلِهِ، وَمِنَّا الضَّارِبُ بِثَوْبِهِ ، فَلَمَّا انْصَرَفَ قَالَ الْقَوْمِ أَخْزَاكَ اللَّهُ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لا تَقُولُوا هَكَذَا وَلَا تُعِينُوا الشَّيْطَانَ عَلَيْهِ وَلَكِنْ قُولُوا رَحِمَكَ اللَّهُ -
৭৮. হযরত আবূ যার (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর নিকট এক মদ্যপ ব্যক্তিকে আনা হলো। তিনি লোকদেরকে বললেন: ওকে পিটাও। (বর্ণনাকারী বলেন, এ আদেশ পাওয়া মাত্রই) আমাদের মধ্য থেকে কেউ তাকে হাত দিয়ে মারা শুরু করলো, কেউ জুতা দিয়ে এবং কেউ কাপড় দিয়ে। এরপর সে যখন মারপিট খেয়ে চলে গেলো, তখন এক ব্যক্তি তাকে বদ্ দু'আ দিলো এবং বললো, আল্লাহ্ তোকে হেয় ও অপদস্থ করুন। তখন রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বললেন, এভাবে বলো না এবং এ কথা বলে তার উপর শয়তানকে প্রবল করো না। বরং বলো, আল্লাহ্ তোমার উপর রহম (দয়া) করুন।
ফায়দা : নবী ﷺ সবার সাথে সদ্ব্যবহার করতেন। কখনো কাউকে নিজেও বদ্ দু'আ করতেন না এবং অন্যকেও বদ্ দু'আ করতে নিষেধ করতেন। একজন মদ্যপায়ীকেও বদ্ দু'আ দেয়া তিনি পছন্দ করলেন না। আর যখন কেউ বদ্ দু'আ দিলো, তখন তাকেও তা থেকে বিরত রাখলেন, বললেন: বদ্ দু'আ করো না, বরং তার কল্যাণ কামনা করো। তবে তিনি ঐ মদ্যপায়ীকে মারপিট করার যে আদেশ করেছিলেন, তা ছিল মদপানের শাস্তিস্বরূপ। উল্লেখ্য যে, তখনো মদ্যপানের দণ্ড নির্ধারিত হয়নি, তাই মারপিট করে ছেড়ে দেন।
۷۹. عَنْ عَبْدِ اللهِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَسَمَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قِسْمًا، فَقَالَ رَجُلٌ مِّنَ الْأَنْصَارِ إِنَّ هَذِهِ القِسْمَةَ مَا أُرِيدُ بِهَا وَجْهُ اللَّهِ فَذُكِرَتْ ذَلِكَ لِلنَّبِيِّ ﷺ فَأَحْمَرُ وَجْهَهُ وَقَالَ رَحْمَةُ الله عَلَى مُوسَى قَدْ أُوْذِيَ بِأَكْثَرَ مِنْ هُذَا فَصَبَرَ -
৭৯. হযরত আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ ﷺ মালে গনীমত বণ্টন করছিলেন। জনৈক আনসারী (কটাক্ষ করে) বললো, এ বন্টনে আল্লাহ্র সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়নি। বর্ণনাকারী বলেন, এ কথা নবী ﷺ-এর কর্ণগোচর হলো। এ কথা শোনামাত্রই তাঁর চেহারা মুবারক লাল হয়ে উঠলো। তিনি বললেন, মূসা (আ)-এর উপর আল্লাহ্র রহমত হোক! তাঁকে এর চেয়েও বেশি কষ্ট দেয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি ধৈর্যধারণ করেছেন।
ফায়দা : আরব গোত্রসমূহের মধ্যে পরস্পর শত্রুতা ও দুশমনী সব সময় লেগেই থাকতো। নবী ﷺ যখন এ দুনিয়ায় আবির্ভূত হন, তখন তিনি তাঁদেরকে এক দীন ও এক পথে এনে দাঁড় করিয়ে দেন। তাঁদের মধ্যে ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ও ভালবাসার এমন আত্মা ফুঁকে দেন, যাতে তাদের মধ্যে ধীরে ধীরে প্রেম-ভালবাসা, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি হওয়া শুরু করলো। পুরানো শত্রুতা দূর হতে লাগলো। তা সত্ত্বেও এমন কিছু লোক অবশিষ্ট ছিল যাদের মধ্যে পূর্ণরূপে প্রেম-ভালবাসা সৃষ্টি হয়নি। বিশেষত আনসারগণ তাদের চাষাবাদে ব্যস্ত থাকার দরুন নবী-এর সাহচর্য থেকে যথোচিত উপকৃত হতে পারতো না। যেমন: একদিন যখন তিনি গনীমতের কিছু মাল সাহাবাদের মধ্যে বণ্টন করেছিলেন, তখন তাঁর বণ্টন খুব সুষ্ঠু হওয়া সত্ত্বেও ঐ ধরনের এক আনসারীর মনে অন্য গোত্রের লোককে সম্পদ লাভ করতে দেখে তার পুরানো শত্রুতা জাগ্রত হলো। সে (অজ্ঞানবশত) নবী-এর বণ্টনকে অবিচার বলে আখ্যায়িত করলো এবং তাঁর ব্যাপারে এই অশিষ্ট বাক্য প্রয়োগ করলো। কিন্তু নবী ঐ আনসার ব্যক্তির কথা শুনে ধৈর্য ধারণ করলেন এবং তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। তিনি উম্মতকে শিক্ষা দেয়ার জন্য বললেন, হযরত মুসা (আ)-কে আমার চেয়েও অধিক কষ্ট দেয়া হয়েছিল। তিনিও ধৈর্য ধারণ করেছিলেন। আমিও ধৈর্য ধারণ করছি। তোমরাও এরূপ ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করবে। এটাই নবীদের তরীকা বা পথ। নবী ইচ্ছা করলে ঐ আনসারকে তার ঔদ্ধত্যের শাস্তি দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি ক্ষমা করে দেন এবং তাকে কিছুই বললেন না। এই হচ্ছে তাঁর উদারনৈতিক শিক্ষা। এই নৈতিক উদারতা শক্তি দ্বারাই ইসলাম সারা বিশ্বে বিস্তার লাভ করছে।
عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لَا يُبَلِّغُنِي احَدٌ مِنْكُمْ عَنْ أَحَدٍ مِنْ أَصْحَابِي شَيْئًا فَانِي أُحِبُّ أَنْ أَخْرُجَ إِلَيْكُمْ وَأَنَا سَلِيمُ الصدر -
৮০. হযরত ইবন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ বলেছেন: তোমাদের মধ্যে কেউ আমার কোনো সাহাবী সম্পর্কে আমার কাছে কোনো অভিযোগ করবে না। কেননা, আমি তোমাদের সামনে যখন আসবো তখন তোমাদের ব্যাপারে আমার হৃদয় প্রশান্ত থাকুক— এটাই আমি চাই।
ফায়দা : আরব গোত্রসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও ভালবাসা অক্ষুণ্ণ রাখা এবং পারস্পরিক সুসম্পর্ক রাখার জন্য নবী ঘোষণা করেছিলেন যে, কোনো ব্যক্তি আমার কাছে কারো বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযোগ করবে না, যাতে তার প্রতি আমার মনে কোনো অসন্তোষ বা বিষণ্ণ ভাব জাগতে পারে। এ হাদীস নবী-এর ক্ষমা ও দয়ার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রমাণ। কেননা, কারো থেকে প্রতিশোধ নেয়ার ন্যূনতম মাধ্যম হচ্ছে তার সম্পর্কে কোনো কুৎসা শোনা বা প্রচার করা, যাতে তার অপমান হয় ও বদনাম রটে যায়। কিন্তু নবী তার শিকড়ই উপড়ে ফেলেন। সকল সাহাবাকে এই মর্মে নিষেধ করে দেন যে, তোমাদের কেউ কারো বিরুদ্ধে আমার কাছে কোনো অভিযোগ বা বদনাম করবে না, যাতে তোমাদের প্রতি আমার মন সর্বদা পরিষ্কার থাকে এবং আমি তোমাদের প্রত্যেকের সাথে ইনসাফ ও সুবিচারমূলক আচরণ করি। আর এই উত্তম আদর্শই )اُسْوَةُ حَسَنَةً( আমার সমস্ত উম্মত নিজেদের বৈশিষ্ট্য )شعار( বানাবে। এখানে স্মর্তব্য যে, কারো বদনাম শোনা ও শোনানোর মধ্যেই পারস্পরিক সম্পর্কে অবনতির বীজ উপ্ত থাকে। নবী তাঁর উপরোক্ত ঘোষণার মাধ্যমে তার মূলোৎপাটন করতে চেয়েছেন।
টিকাঃ
১. প্রকাশ থাকে যে, الاقرب فالاقرب )যে সবচেয়ে নিকটবর্তী সে সবচেয়ে প্রথম হকদার) এই নীতি অনুযায়ী হযরত যুবায়র (রা)-এর পানি সেচ অধিকার ছিল আনসারীর পূর্বে। তাছাড়া ফসলের ক্ষেত বা বাগানের আল পর্যন্ত পানি বেঁধে রাখা প্রত্যেক ক্ষেত বা বাগান মালিকের অধিকার। তাই রাসূলুল্লাহ্-এর প্রথম উক্তি উভয় পক্ষের মধ্যে মীমাংসার ভিত্তিতে ছিল এবং দ্বিতীয় নির্দেশ ছিল আইনের বিচার।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বদান্যতা সম্পর্কিত হাদীসসমূহ
۸۱ عَنْ عُمَرَ بْنِ عَبْدِ اللهِ مَوْلَى غَفَرَةَ حَدَّثَنِي إِبْرَاهِيمُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ الْحَنَفِيَّةِ مِنْ وَلَدٍ عَلِيِّ قَالَ كَانَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ إِذَا نَعَتَ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ أَجْوَدَ النَّاسِ كَفَّا وَأَكْرَمَهُمْ عِشْرَةً مَنْ خَالَطَهُ فَعَرَفَهُ أَحَبَّهُ -
৮১. গাফারার আযাদকৃত গোলাম হযরত উমর ইব্ন আবদুল্লাহ্ (র) বলেন, হযরত আলী (রা)-এর বংশধর ইব্রাহীম ইন মুহাম্মদ ইব্ন হানাফিয়্যা (র) আমাকে বলেছেনঃ হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) যখনই রাসূলুল্লাহ্ -এর গুণাবলি বর্ণনা করতেন, তখন বলতেন, রাসূলুল্লাহ্ সবচেয়ে দানশীল ও উদারহস্ত ছিলেন এবং তিনি ছিলেন সবচেয়ে অধিক সুসম্পর্ক রক্ষাকারী। তাই যে কেউ তাঁর সাথে মেলামেশা করতো এবং তাঁর চরিত্র সম্পর্কে অবহিত হতো, সেই তাঁকে অত্যধিক ভালবাসতো।
ফায়দা: নবী সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদার ছিলেন। বদান্যতা ছিল তাঁর স্বভাবগত আল্লাহ্ প্রদত্ত গুণ। তিনি কখনো কোনো প্রার্থনার জবাবে 'না' বলেননি। কোনো প্রার্থনাকারীকে শূন্যহাতে ফিরিয়ে দেননি। দানও করতেন এমন পরিমাণ যে, স্বয়ং প্রার্থনাকারীও তাজ্জব মনে করতো। কখনো কোনো প্রার্থনাকারীকে দেওয়ার জন্য যদি তাঁর কাছে কিছু না থাকতো, তবে তিনি পরে তাকে দেওয়ার ওয়াদা করতেন এবং সে ওয়াদা তিনি পূর্ণ করতেন। কখনো কখনো অন্যের নিকট থেকে ঋণ নিয়ে দান করতেন। মেলামেশা ও সামাজিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও তাঁর পবিত্র জীবন ছিল সর্বাধিক সমুন্নত। সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলতেন। ছোট-বড়োর শিষ্টাচারের প্রতি লক্ষ্য রাখতেন। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন এবং সকল প্রতিবেশী ও সাক্ষাৎ প্রার্থীর সাথে তিনি বিনম্র ব্যবহার করতেন। তাঁর এই মহান অনুপম চরিত্র দেখেই লোকেরা তাঁর ভক্ত হয়ে গিয়েছিলো। তাঁকে সকলে অপরিসীম ভালবাসতো। তিনি প্রত্যেকের সাথে যথাযোগ্য সুব্যবহার করতেন। কাউকে কোনো প্রকার কষ্ট দিতেন না। সর্বদা সদ্ব্যবহার, সুবিচার, বিনয়-নম্রতা, সত্য কথা, প্রতিশ্রুতি পালন, শিশু ও ছোটদের প্রতি মমতা প্রদর্শন ছিল তাঁর উন্নত চরিত্রের নিদর্শন। সুতরাং যে ব্যক্তিই তাঁর সাহচর্য কয়েক মুহূর্তও লাভ করতো, সে-ই তাঁকে অত্যন্ত ভালবাসতে শুরু করতো। এক হাদীসে আছে, নবী বলেছেন: দানশীল ব্যক্তি আল্লাহ্রও নিকটবর্তী, জান্নাতেরও নিকটবর্তী, লোকজনেরও নিকটবর্তী (আর জাহান্নামের) আগুন থেকে দূরবর্তী। পক্ষান্তরে কৃপণ ব্যক্তি আল্লাহর রহমত থেকেও দূরবর্তী, জান্নাত থেকেও দূরবর্তী, লোকজন থেকেও দূরবর্তী (এবং জাহান্নামের) আগুনের নিকটবর্তী। তিনি আরো বলেন, আল্লাহর নিকট একজন মূর্খ দানশীল ব্যক্তি একজন কৃপণ শিক্ষিত ব্যক্তি অপেক্ষা অনেক উত্তম (তিরমিযী শরীফ)। সুবহানাল্লাহ্! দানশীলতা আল্লাহ্ও খুব প্রিয়। কেননা, তিনি নিজেই খুব দয়ালু ও দানশীল। তাই তাঁর সুন্দর নামসমূহের মধ্যে 'দয়ালু' (كَرِيْم) ও দানশীল (جواد)-ও উল্লিখিত হয়েছে। আল্লাহ যেমন অপরিসীম দানশীল ও পরম দয়ালু তেমনি তাঁর প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা ﷺ বদান্যতা ও দানশীলতার ক্ষেত্রে সকল মানুষের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চতম স্থানের অধিকারী। তাঁর দানশীলতা সম্পর্কিত হাদীসগুলো সামনে বিবৃত হবে। এই হাদীসগুলো দ্বারাই তাঁর বদান্যতা ও দানশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়।
عَنِ ابْنِ عَمْرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَجُودَ وَلَا أَنْجَدَ وَلَا أَشْجَعَ وَلَا أَرْضَى مِنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ -
৮২. হযরত ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ ﷺ অপেক্ষা অধিক দানশীল ও দাতা, অধিক সাহসী, বড় বীর, অধিক ধৈর্যশীল ও পরিতুষ্ট কোনো ব্যক্তিকে দেখিনি।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, যেখানে নবী ﷺ সকল মানুষের মধ্যে সবচেয়ে অধিক দানশীল ও দাতা ছিলেন, সেখানে তিনি সবচেয়ে অধিক সাহসী বীর, ধৈর্যশীল ও অল্পে তুষ্টও ছিলেন। তাঁর যুদ্ধ বিগ্রহ থেকেই তা প্রমাণিত হতে পারে কত বড় বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, যাতে তাঁকে হাজারো বিপদ-আপদ, নানাবিধ দুঃখকষ্ট ভোগ করতে হয়েছে, পবিত্র মুখমণ্ডল যখমী হয়েছে, দান্দান মুবারক শহীদ হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনো হতোদ্যম ও সাহসহীনতার প্রমাণ দেননি। বরং সর্বদা দৃঢ়তা, সাহসিকতা ও বীরত্বের সাথে তার মুকাবিলা করেছেন। তাঁর দৃঢ়সংকল্প ও ধৈর্যের মধ্যে কোন তারতম্য ঘটেনি। তাঁর পবিত্র জীবনের সূচনাই হয়েছে দৃঢ় সংকল্প ও ধৈর্য-সহ্যের মধ্য দিয়ে। আরবের মূর্খ ও বিদ্বেষপরায়ণ মুশরিকদের মধ্যে যারা কখনো তাদের পিতৃপুরুষদের অন্ধ অনুসরণ ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিল না, যারা শত শত বছর থেকে মূর্তি পূজা করে আসছিল, তিনি একাকী দাঁড়িয়ে তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দেন। তখন তাঁর কোনো সঙ্গী ও সাহায্যকারী ছিলো না। তিনি আল্লাহ্ উপর ভরসা রেখে দৃঢ় সংকল্প ও সাহসিকতার সাথে মুশরিক ও কাফিরদেরকে দীন ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। আরবের শিশুরা পর্যন্ত তাঁর বিরোধিতা করতো। মক্কার কাফিররা তাঁকে দুঃখ-কষ্ট দিতো। দুষ্ট বালকেরা তাঁকে পাথর মারতো। তিনি রক্তে রঞ্জিত হতেন। কিন্তু এতসত্ত্বেও তিনি সাহস হারাতেন না। বরং অনমনীয়তার সাথে তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিতেন। শেষে এমন একদিন এলো, যখন আরবের প্রতিটি গৃহে তাওহীদের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হলো এবং তাদের শিশুরা পর্যন্ত তাঁর ভক্ত ও প্রেমিক হয়ে পড়লো। তিনি সমগ্র আরব ও অনারবের বন্ধু হয়ে গেলেন।
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَجْوَدَ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ حِيْنَ يَلْقَاهُ جِبْرَئِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ -
৮৩. হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ লোকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল ছিলেন। বিশেষত রমযানের মাসে তাঁর দানশীলতার মাত্রা অত্যধিক বেড়ে যেতো, যখন হযরত জিব্রাঈল (আ) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য আগমন করতেন।
ফায়দা: এখানে গ্রন্থকার পুরো হাদীসটি উদ্ধৃত করেননি। বরং নবী-এর দানশীলতার সাথে সম্পর্কিত অংশটুকু উদ্ধৃত করেছেন। এ হাদীস সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে সবিস্তার বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, নবী লোকদের মধ্যে সর্বাধিক দানশীল ও দাতা ছিলেন। আর রমযান মাসে যখন হযরত জিব্রাঈল (আ) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য আগমন করতেন, তখন তাঁর দানশীলতা অন্যান্য সময় অপেক্ষা অনেক গুণ বেড়ে যেতো। তখন তিনি অত্যধিক মাত্রায় দান-খয়রাত করতেন। জিব্রাঈল (আ) রমযান মাসে প্রতিদিন তাঁর নিকট আগমন করতেন এবং কুরআন শরীফের শুনানি করতেন। ঐ সময় তিনি ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন বায়ুর চেয়েও অধিক দান-খয়রাত করতেন। অর্থাৎ নবী রমযান মাসে দান-খয়রাতের পরিমাণ এতই বৃদ্ধি করতেন যে, বর্ণনাকারী তাঁর দান-খয়রাতের আধিক্যকে ঝড়ো হওয়ার গতিবেগের সাথে তুলনা করেছেন। রমযান মাসে নবী-এর অধিক দান-খয়রাত করার কারণ হচ্ছে, ঐ পবিত্র মাসে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাদের উপর অপরিসীম দয়া ও কৃপা করে থাকেন। তাঁর রিযিক তাদের উপর অবারিত করে দেন। রোযাদারদের সকল কর্মকাণ্ডের বিনিময় এই পবিত্র মাসের কারণে দশগুণ থেকে সত্তর গুণ পর্যন্ত বেশি প্রদান করেন। এ মাসে একবার কুরআন খতম করলে সত্তরবার কুরআন খতম করার সওয়াব পাওয়া যায়। এক রাকআত নফল সালাত পড়ার সওয়াব সত্তর রাকআত পড়ার সমান হয়। এক পয়সা ব্যয় করার সওয়াব সত্তর পয়সা ব্যয় করার সমান হয়। এ ছাড়া আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর অসীম কৃপায় রোযাদার বান্দাদের পেছনের সমস্ত গুনাহ্ও মাফ করে দেন। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রমযান মাসের শেষ রাতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রোযাদার বান্দাদের ক্ষমা ঘোষণা করেন। তাই আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা ও আল্লাহ্ এই দানশীলতার গুণটি রপ্ত করতেন এবং অন্যদেরকেও রপ্ত করার নির্দেশ দিতেন। বর্ণিত আছে )تَخَلَّفُوْا بِأَخْلَاقِ اللَّهِ( )তোমরা আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হও)। তাই আল্লাহ্ গুণাবলি নিজের মধ্যে সৃষ্টি করা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনার প্রমাণ। আল্লাহ্ আমাদেরকে তাঁর প্রদর্শিত পথে সঠিকভাবে চলার তাওফীক দান করুন।
٨٤ عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَجُلاً أَتَى النَّبِيُّ ﷺ فَسَأَلَهُ فَأَعْطَاهُ غَنَمًا بَيْنَ جَبَلَيْنَ فَأَتَى الرَّجُلُ قَوْمَهُ ، فَقَالَ أَسْلِمُوا فَإِنَّ مُحَمَّدًا يُعْطِى عَطَاء رَجُلٍ مَا يَخَافُ فَاقَةً .
৮৪. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত যে, জনৈক ব্যক্তি নবী -এর নিকট এসে (আর্থিক সাহায্য) প্রার্থনা করলো। তিনি তাকে দুই পাহাড়ের মধ্যকার সব বকরী দান করলেন। তখন ঐ ব্যক্তি তার গোত্রের মধ্যে এসে বললো, হে লোক সকল! তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো। কেননা, মুহাম্মদ সেই ব্যক্তির ন্যায় দান করে থাকেন, যার দারিদ্রের কোনো আশংকা নাই।
ফায়দা : এই রিওয়ায়াতটিই মিশকাত শরীফে হযরত আনাস (রা) থেকে এই ভাষায় বর্ণিত হয়েছে : জনৈক ব্যক্তি নবী -এর নিকট দুই পাহাড় সমান ছাগ প্রার্থনা করলো। তিনি তা তাকে দান করলেন। তখন ঐ ব্যক্তি তার গোত্রে এসে বললো, হে আমার গোত্র! তোমরা সবাই মুসলমান হয়ে যাও। আল্লাহ্র কসম! মুহাম্মদ এতই দান করেন যে, নিজে দরিদ্র হয়ে যাওয়ারও ভয় করেন না।
শামায়েলে তিরমিযীতে হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ্ কখনো কোনো বন্ধু (ভবিষ্যতের জন্য) সঞ্চয় করে রাখতেন না। (বরং তৎক্ষণাৎ সাহাবাদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন)।
এই হাদীসগুলো থেকেই নবী -এর বদান্যতা ও দানশীলতা সম্পর্কে অনুমান করা যায়। কেননা যে যত চাইত তিনি তাকে তা দান করতেন। কখনো প্রার্থনাকারীকে তাঁর নামে ঋণ নিয়ে প্রয়োজন মিটানোর অনুমতি দিতেন। যেমন সামনের হাদীসসমূহে বিধৃত হয়েছে। নবী -এর এই বদান্যতার পরাকাষ্ঠা ও আল্লাহ্র উপর পূর্ণ ভরসায় বিস্মিত হয়ে ঐ প্রার্থনাকারী তার গোত্রকেও ঈমান ও ইসলামের দাওয়াত দেয় এবং নিজেও ঈমান আনে।
এক হাদীসে হযরত ইবন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত আছে, নবী বলেন : ঈর্ষা কেবল দুই ব্যক্তির উপর হতে পারে। এক. সেই ব্যক্তি—যাকে আল্লাহ্ তা'আলা ধন-সম্পদও দিয়েছেন এবং তাকে ঐ সম্পদ আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করারও তাওফীক দিয়েছেন। দুই. সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ্ তা'আলা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা দান করেছেন এবং সে তা দ্বারা নিজেও পরিচালিত হয় এবং অপরকেও তা শিক্ষা দেয়। (রিয়াদুস্-সালিহীন)
অন্য এক হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, নবী বলেছেন : প্রত্যহ সকাল বেলা যখন আল্লাহ্র বান্দা নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয়, তখন তার সাথে দু'জন ফিরিশতাও আসমান থেকে অবতরণ করেন। তাদের একজন বলেন, হে আল্লাহ্! ব্যয়কারী, দানশীল ও দাতা ব্যক্তিকে তার বিনিময় দান করো। দ্বিতীয় ফিরিস্তা বলেন, হে আল্লাহ্! বখীল ও কৃপণ ব্যক্তির সম্পদে তুমি ধস নামাও। (বুখারী ও মুসলিম)
অপর এক হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। নবী বলেন : আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন : হে আদাম সন্তান! তুমি আল্লাহ্র সৃষ্টির জন্য ধন-সম্পদ ব্যয় করো, তোমার জন্যও আল্লাহর পক্ষ থেকে ব্যয় করা হবে। (রিয়াদুস্-সালিহীন)।
٨٥ عَنْ عُمَرَ بْنِ عَبْدِ اللهِ مَوْلَى غَفْرَةَ حَدَّثَنِي إِبْرَاهِيمَ ابْنُ مُحَمَّدٍ مِنْ وُلِدَ عَلِيِّ قَالَ كَانَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ إِذَا وَصَفَ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ كَانَ أَجْوَدَ النَّاسِ كَفَّا وَأَجْرَأَ النَّاسِ صَدْرًا وَأَصْدَقَ النَّاسِ لِهْجَةً وَأَوفَاهُمْ بِذِمَّةٍ، وَأَلْيَنَهُمْ عَرِيكَةً وَاكَرَمَهُمْ عِشْرَةً، مَنْ رَاهُ بَدِيهَةً هَابَهُ، وَمَنْ خَالَطَهُ فَعَرَفَهُ أَحَبَّهُ لَمْ أَرَ قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ مِثْلَهُ -
৮৫. হযরত গাফারা (রা) এর মাওলা (আযাদকৃত গোলাম) উমর ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার কাছে ইব্রাহীম ইন মুহাম্মদ (যিনি হযরত আলী (রা)-এর বংশধর) হাদীস বর্ণনা করেন যে, হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) যখন নবী-এর (সুন্দরতম) গুণাবলি বর্ণনা করতেন, তখন বলতেন যে, তিনি সবচেয়ে উদার হস্ত, সবচেয়ে সাহসী-হৃদয়, সবচেয়ে সত্যভাষী, সবচেয়ে ওয়াদা পালনকারী, সবচেয়ে নম্র-স্বভাব এবং সবচেয়ে ভদ্র জীবন যাপনকারী ছিলেন। যে ব্যক্তি হঠাৎ তাঁকে দেখত তার মনে ভীতির সঞ্চার হতো এবং যে ব্যক্তি তাঁর সাহচর্য লাভ করতো ও তাঁর অতুলনীয় স্বভাব সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হতো, সে তাঁকে ভালবাসতে শুরু করতো। আমি তাঁর পূর্বে কখনো তাঁর মতো (সর্বগুণে গুণান্বিত) মানুষ দেখিনি এবং তার পরেও দেখিনি।
ফায়দা : হযরত আলী (রা)-এর এ হাদীস পূর্বের একটি হাদীসের আওতায় বর্ণিত হয়েছে। এখানে হাদীসের কিছু কথা পূর্বোক্ত হাদীস অপেক্ষা বেশি বর্ণিত হয়েছে, যা নবী -এর মহৎ গুণাবলি ও উন্নত চরিত্রাবলি ব্যাখ্যা করছে। এসব অনুপম গুণ ও চরিত্রাবলি আয়ত্ত করা আমাদের প্রাথমিক কর্তব্য। নবী-এর পূর্ণ আনুগত্যের মূল কথাই হচ্ছে তাঁর সুমহান গুণাবলি ও সমুন্নত চরিত্রাবলিকে নিজের মধ্যে সৃষ্টি করা, তাঁর পবিত্র জীবন ও প্রশংসিত চরিত্র অনুসরণ করা। আল্লাহ্ পাক আমাদের সবাইকে পূর্ণভাবে তাঁর পদাংক অনুসরণ করার এবং তাঁর সর্বাঙ্গীণ অনুগত ও অনুসারী হওয়ার এবং তাঁর গুণাবলি ও সুন্দরতম চরিত্রাবলি নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি করার তাওফীক দান করুন।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِى اللهُ عَنْهُ قَالَ لَمْ يُسْئَلُ رَسُولُ اللهِ ﷺ شَيْئًا قَطُّ عَلَى الْإِسْلَامِ إِلَّا أَعْطَاهُ وَإِنَّ رَجُلاً أَتَاهُ فَسَأَلَهُ فَأَعْطَاهُ غَنَمًا بَيْنَ جَبَلَيْنِ فَرَجَعَ إِلَى قَوْمِهِ فَقَالَ أَسْلِمُوا فَإِنَّ مُحَمَّدًا يُعْطِي عَطَاءُ مَا يَخْشَى فِيْهِ الْفَاقَةً -
৮৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ এর নিকট ইসলামের নামে যখনই কোনো বস্তু চাওয়া হয়েছে, তিনি তা অবশ্যই প্রদান করেছেন। একবার এক ব্যক্তি এসে তাঁর নিকট প্রার্থনা করলো। তিনি তাকে ছাগলের একটি পূর্ণ পালই প্রদান করলেন, যা দুই পাহাড়ের মাঝখানে ছড়িয়ে ছিল। তারপর ঐ ব্যক্তি তাঁর গোত্রের মধ্যে ফিরে গিয়ে বললো, (হে আমার গোত্র) তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো। কেননা মুহাম্মদ এমনভাবে দান করেন যে, তারপর দারিদ্র্যের কোনো আশংকাই থাকে না।
ফায়দা : এ হাদীসটিও সামান্য পরিবর্তনসহ ইতিপূর্বে একটি হাদীসের আওতায় বর্ণিত হয়েছে। এ হাদীস থেকে নবী-এর পরম দানশীলতা অনুমান করুন। তিনি কতবড় দানশীল ও দাতা ছিলেন তা এর দ্বারাই পরিমাপ করা যায়। নবী-এর দান ও বশিশের এই অবস্থা ছিল সর্বব্যাপী। যে কেউ তাঁর দরবারে ইসলামের নামে আঁচল পেতে দিতো, যে তার প্রার্থিত বস্তু দ্বারা আঁচল পূর্ণ করে ফিরে যেতো এবং সাথে সাথে তাঁর ঔদার্য ও আল্লাহ্র উপর পূর্ণ ভরসা দেখে তার ঈমান আরো মযবুত হয়ে যেতো। সে তার কাওম ও গোত্রকে এরূপ মূর্তিমান দানশীল ও উদার নবীর দীন কবুল করার উপদেশ দিতো। সত্য বলতে কি, দুনিয়ায় চারিত্রিক শক্তি এমন কিছু করে দেখতে পারে যা সামরিক শক্তি কখনো দেখতে পারে না। চরিত্রই হচ্ছে সেই হাতিয়ার যা দ্বারা চরম ঔদ্ধত্য ও বিদ্রোহী অন্তর বশ করা যায়। একথা মোটেই সত্য নয় যে, তলোয়ার দ্বারা ইসলাম দুনিয়ায় বিস্তার লাভ করেছে। বরং ইসলাম সত্য নবীর (আমার মাতা-पिता তাঁর জন্য উৎসর্গিত হোক) সুমহান চরিত্র ও সমুন্নত গুণাবলির আধ্যাত্মিক শক্তি দ্বারা বিশ্ব-ধর্মে পরিণত হয়েছে, যার বহু জীবন্ত উদাহরণ ইসলামের ইতিহাসে বিধৃত আছে।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّ النَّبِيُّ كَانَ لَا يُسْئَلُ شَيْئًا إِلَّا أَعْطَاهُ
৮৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী-এর নিকট যে বস্তুই প্রার্থনা করা হতো, তিনি তা দান করতেন।
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ مَا سُئِلَ رَسُولُ اللهِ ﷺ شَيْئًا قَطُّ قَالَ لَا -
৮৮. হযরত জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ -এর কাছে কিছু চাওয়া হয়েছে এবং তিনি তা দেননি-এরূপ কখনো হয়নি।
. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ لَا يَقُولُ لِشَيْ يُسْأَلُ لا -
৮৯. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী-এর নিকট কোনো কিছু চাওয়া হলে তিনি 'না' বলতেন না।
فَمَنَعَهُ عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ مَاسُئِلَ النَّبِيُّ شَيْئًا قَطُّ
৯০. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর নিকট কোনো বস্তু প্রার্থনা করা হয়েছে এবং তিনি তা নিষেধ করেছেন এরূপ কখনো হয়নি।
ফায়দা: উপরোক্ত চারটি হাদীসের বিষয়বস্তু একই। এগুলো থেকে বোঝা যায় যে, প্রার্থনাকারীর প্রার্থনা ও অভাবগ্রস্তের অভাব পূরণ করা ছিল নবী -এর প্রকৃতি ও স্বভাবের অন্তর্গত। তিনি কাউকে শূন্য হাতে ও নিরাশ করে ফিরিয়ে দেননি। কখনো মুখে 'না' শব্দ উচ্চারণ করেননি। তাঁর এই গুণের কথাই এক আরব কবি এভাবে উল্লেখ করেছেন-
مَا قَالَ لا قَطُّ إِلا فِي تَشَهُدِهِ + لَوْلاَ التَّشَهُدُ كَانَتْ لَاؤُهُ نَعَمْ -
"কালিমা শাহাদত ছাড়া তিনি কখনো 'লা' (না) বলেননি। কালিমা শাহাদত যদি না হতো তবে তাঁর 'লা' (না)-ও নাআম (হ্যাঁ) হয়ে যেত।" এই মর্মই ফারসী কবি নিম্নোক্ত চরণে ব্যক্ত করেছেন:
نزفت لا بزبان مباركش هركز + مكربه اشهد ان لا اله الا الله
"তাঁর যবান মুবারকে কখনো 'না' শব্দ উচ্চারিত হয়নি। যদি হয়ে থাকে, তবে তা হয়েছে কালিমা শাহাদত "أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ" -এর মধ্যে।"
নবী -এর বদান্যতার ক্ষেত্রে পরিমাণের কোনো প্রশ্ন ছিল না। তিনি ছোট-বড় সব চাওয়া পূরণ করতেন। যেমন পূর্বোক্ত এক হাদীস থেকে জানা যায় যে, জনৈক ব্যক্তি যখন দুই পাহাড়ের উপত্যকাপূর্ণ বক্রীর পাল প্রার্থনা করলো, তখন তিনি তাও দান করে দেন। তাঁর কাছে যদি এর চেয়েও বেশি চাওয়া হতো, তবে তিনি তাও দিয়ে দিতেন। নবী -এর এই বদান্যতা তো ছিল কেউ কিছু প্রার্থনা করার সময়। কিন্তু তাঁর নিকট যখন কোথাও থেকে কোনো সম্পদ আসতো, তখন তিনি প্রার্থনা ছাড়াই পাওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তিকে ডেকে ডেকে প্রদান করতেন। তিনি কখনো সম্পদ সঞ্চয় করে রাখতেন না। বরং সত্বর তা বণ্টন করে দিতেন। হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, একবার নবী -এর নিকট বাহরাইন থেকে বেশ কিছু মালপত্র এলো। তিনি বললেন, ওগুলো মসজিদের আঙ্গিনায় বিছিয়ে দাও। এর পূর্বে এত সম্পদ তাঁর নিকট কখনো আসেনি। (বুখারী)
তিনি এই সমুদয় সম্পদ সাহাবাদের মধ্যে বিতরণ করলেন। বিতরণের পর তাঁর নিকট একটি দিরহামও অবশিষ্ট ছিল না। দানশীলতা ছিল নবী -এর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু এবং কৃপণতা ছিল সবচেয়ে ঘৃণ্য ব্যাপার। এক হাদীসে হযরত ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন, আমি নবী -কে বলতে শুনেছি, বদান্যতা আল্লাহ্ তা'আলার সবচেয়ে বড় সৃষ্টি। (তারগীব ও তারহীব)।
হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, নবী বলেছেন: জান্নাতে এমন একটি ঘর আছে, যার নাম 'বায়তুস্ সাখা' দান-নিকেতন (তারগীব)। কৃপণতার অপনিন্দায় নবী -এর বহু হাদীস বর্ণিত রয়েছে। এক হাদীসে হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, নবী বলেছেন: জুলুম থেকে আত্মরক্ষা করো, কেননা জুলুম কিয়ামতের দিন ঘনঘোর অন্ধকাররূপে আত্মপ্রকাশ করবে। আর কৃপণতা থেকে দূরে থাকো, কেননা কৃপণতাই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ধ্বংস করেছে। তাদেরকে রক্তারক্তি করতে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং হারামকে হালাল করতে তাদেরকে উৎসাহ যুগিয়েছে (রিয়াদুস্-সালিহীন)। বস্তুত কৃপণতা এমন এক কুঅভ্যাস ও ধ্বংসাত্মক হীন কাজ, যা সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রকে কলুষিত করে। কৃপণের কারণেই সমাজে ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়। পরস্পরে অনৈক্য ও মনোমালিন্য দেখা দেয়। গোটা সমাজ বিপর্যস্ত হয়। কৃপণতার কারণেই গরীব, মিস্কীন, ভিক্ষুক, অভাবগ্রস্ত, অসহায় ও বেকার লোকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। আর এভাবে গোটা জাতির অবস্থা মন্দ থেকে মন্দতর হতে থাকে। তাছাড়া সাহায্য-সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার দরুন এই লোকগুলোই সমাজে অপরাধ ও বিপর্যয় সৃষ্টির কারণ হয়। ব্যক্তি হিসাবে কৃপণের কার্পণ্য ও ঐশ্বর্য প্রীতির দরুন বন্ধু-বান্ধবের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে বাধ্য হয়। সামান্য সম্পদের জন্য সে লড়াই করতে ও জীবন দিতে প্রস্তুত হয়। ফলে পরস্পরের মধ্যে দুশমনী ও শত্রুতার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। রক্তারক্তি পর্যন্ত পরিস্থিতি গড়ায়। কৃপণতার এই নিন্দনীয় ও অনিষ্টকর স্বভাব থেকে আল্লাহ্ সকল মুসলিমকে রক্ষা করুন। আমাদের নবী ও এই কুস্বভাব থেকে মহান আল্লাহ্ আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, নবী হরমামেশা এই দু'আ করতেন: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُبِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحُزْنِ وَأَعُوْذُبِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالكَسَلِ وَأَعُوْذُبِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ -
হে আল্লাহ্! আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি দুঃসহ চিন্তা ও সন্তাপ থেকে। আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি অসামর্থ্য ও আলস্য থেকে। তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি কাপুরুষতা ও কৃপণতা থেকে।
۹۱ عَنْ هَارُونَ بْنِ رِيَابِ قَالَ قَدِمَ عَلَى النَّبِيُّ ﷺ سَبْعُونَ أَلْفَ دِرْهَم وَهُوَ أَكْثَرُ مَالٍ أُتِيَ بِهِ قَطُّ، فَوَضَعَ عَلَى حَصِيرٍ ثُمَّ قَامَ إِلَيْهَا يَقْسِمُهَا فَمَا رَدَّ سَائِلاً حَتَّى فَرَغَ مِنْهُ -
৯১. হযরত হারুন ইন্ন রিয়াব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার নবী-এর নিকট সত্তর হাজার দিরহাম এলো। ইতিপূর্বে এত বেশি অর্থ আর কখনো তাঁর কাছে আসেনি। তিনি তা চাটাইয়ের উপর রেখে বণ্টন করা শুরু করলেন। কোনো প্রার্থনাকারীকেই তিনি (শূন্য হাতে) ফিরিয়ে দেননি। (এমনিভাবে) সম্পূর্ণ অর্থই তিনি বণ্টন করে দেন।
ফায়দা: নবী -এর অভ্যাস ছিল, যখনই কোথাও থেকে তাঁর নিকট কোনো অর্থ-সম্পদ আসতো, তিনি সঙ্গে সঙ্গে সে খবর প্রচার করে দিতেন। দরিদ্র ও অভাবীদের ডেকে তিনি তা তৎক্ষণাৎ বণ্টন করে দিতেন। নিজের কাছে কখনো জমা করে রাখতেন না। অনেক সময় এমনও হতো যে, প্রচার করে বিতরণ করা সত্ত্বেও কিছু সম্পদ অবশিষ্ট থেকে যেতো। তার হদাব ও গ্রহণকারী কেউ থাকতো না। তখন তিনি খুব কষ্ট ও অস্বস্তি বোধ করতেন; অস্থির ও ব্যাকুল হয়ে পড়তেন। সম্পূর্ণ সম্পদ বণ্টন না করা পর্যন্ত তিনি স্বস্তি লাভ করতেন না। এক হাদীসে হযরত উম্মু সালামা (রা) বলেন, একবার নবী বিমর্ষ অবস্থায় গৃহে আগমন করেন। উম্মু সালামা (রা) জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি চিন্তিত কেন? তিনি বললেন, গতকাল যে সাতটি দীনার এসেছিল, সন্ধ্যা পর্যন্ত তা আমার বিছানায় পড়ে আছে। কোনো গ্রহণকারী পাওয়া যায়নি (মুসনাদে আহমাদ)।
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ النَّبِيُّ وَ لَا يُسْئَلُ شَيْئًا فَيَمْنَعُهُ -
৯২. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর নিকট যখনই কোনো কিছু চাওয়া হতো, তিনি তা প্রদান করতেন, নিষেধ করতেন না।
۹۳ . عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ أَبِي بَكْرٍ عَنْ بَعْضٍ بَنِي سَاعِدَةَ قَالَ سَمِعْتُ أَبَا أسَيْدٍ مَالِكِ ابْنِ رَبِيعَةَ يَقُولُ كَانَ النَّبِيُّ لَا يَمْنَعُ شَيْئًا يُسْئَلُ -
৯৩. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবূ বাকর (রা) বানূ সাঈদার জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন যে, আমি আবূ উসাইদ মালিক ইবন রাবীআ (রা)-কে বলতে শুনেছি, নবী-এর নিকট যে জিনিসই চাওয়া হতো, তিনি তা দিতে অস্বীকার করতেন না (বরং দিয়ে দিতেন)।
٩٤. عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ كَانَ الْمُسْلِمُونَ لَا يَنْظُرُونَ إِلَى أَبِي سُفْيَانَ وَلَا يُقَاعِدُونَهُ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ ثَلَاثُ أَعْطِيْهُنَّ، قَالَ نَعَمْ قَالَ عِنْدِي أَحْسَنُ الْعَرَبِ وَاجْمَلُهُ أُمُّ حَبِيْبَةَ أَزَوِّجُكَمَا قَالَ نَعَمْ، قَالَ وَمُعَاوِيَةَ تَجْعَلُ كَاتِبًا بَيْنَ يَدَيْكَ قَالَ نَعَمْ، وَتُؤْمِرُنِي حَتَّى أَقَاتِلَ الْكُفَّارَ كَمَا قَاتَلْتُ الْمُسْلِمِينَ قَالَ نَعَمْ، قَالَ أَبُو زَمَيْلٍ وَلَوْلَا أَنَّهُ طَلَبَ ذَلِكَ مِنَ النَّبِيِّ مَا أَعْطَاهُ لِأَنَّهُ لَمْ يَكُنْ يُسْئَلُ شَيْئًا قَطُّ إِلَّا قَالَ نَعَمْ .
৯৪. হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুসলিম জনতা হযরত আবু সুফিয়ান (রা)-কে (তাঁর কাফির থাকাকালে মুসলমানদের সাথে চরম শত্রুতা করার কারণে) সুনযরে দেখতেন না। তাঁর সাথে উঠাবসাও করতেন না। একবার আবু সুফিয়ান (রা) বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমাকে তিনটি বিশেষ (মর্যাদা) দান করুন। তিনি বললেন, বেশ ভালো (বলো, তা কি?) আবূ সূফিয়ান (রা) বলেন, আমার কন্যা উম্মু হাবীবা (রা) আরবের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী ও রূপসী রমণী। আমি তাকে আপনার নিকট বিবাহ দিলাম। (আপনি কবুল করুন) তিনি বললেন, বেশ ভালো। তারপর তিনি [আবু সুফিয়ান (রা) বললেন, মুআবিয়াকে আপনি আপনার পেশকার বানিয়ে নিন। তিনি বললেন, বেশ তাই করা হলো। এরপর তিনি [আবূ সুফিয়ান (রা)) বললেন, আপনি আমাকে কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য সেনাপতি (আমীরুল হাব) বানিয়ে দিন। যাতে আমি পূর্বে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যেরূপ যুদ্ধ করেছিলাম, এখন কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তার প্রায়শ্চিত্ত করতে পারি। নবী বললেন, বহুত আচ্ছা। তিনি তাঁকে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বাহিনীর অধিনায়ক বানিয়ে দিলেন। আবূ যামীল (র) বলেন, আবূ সুফিয়ান (রা) যদি নবী-এর নিকট ঐগুলো প্রার্থনা না করতেন, তবে তিনি তা তাঁকে আদৌ দান করতেন না। কিন্তু কথা হচ্ছে, নবী-এর নিকট কেউ কোনো জিনিস প্রার্থনা করলে তিনি তা তাকে দান করতেন। অস্বীকার করতেন না।
ফায়দা: এ হাদীস সামান্য পরিবর্তনসহ মুসলিম শরীফে আবূ সুফিয়ানের মর্যাদা ও গুণাবলি অনুচ্ছেদে উল্লিখিত হয়েছে। কিন্তু এ হাদীসের প্রথম অংশ সম্পর্কে হাদীস-বিশেষজ্ঞগণের চরম আপত্তি রয়েছে। আর তা হচ্ছে সকল ঐতিহাসিক এ ব্যাপারে একমত যে, হযরত আবূ সুফিয়ান (রা) ৮ হিজরীতে মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন। আর নবী-এর সাথে উম্মুল মু'মিনীন হযরত উম্মু হাবীবা (রা)-এর বিবাহ হয়েছিল তার বহু আগে ৬ হিজরী (মতান্তরে ৭ হিজরীতে)। তখন আবু সুফিয়ান মুসলমানও হননি। সুতরাং এ সময় হযরত আবু সুফিয়ান (রা) কর্তৃক তাঁর কন্যা উম্মু হাবীবাকে বিবাহের জন্য নবী-এর নিকট পেশ করা কোনোক্রমেই সঠিক হতে পারে না। কোনো কোনো আলিম লিখেছেন, মূলত হযরত আবু সুফিয়ান (রা) নবী-এর কাছে এই প্রস্তাব করেছিলেন ইসলাম গ্রহণের পরে স্বীয় সন্তোষ প্রকাশের মানসে। যেনো এ সময়ে তিনি স্বীয় সম্মতি জ্ঞাপনার্থে নতুনভাবে নবী-এর কাছে প্রস্তাব করছেন। যা হোক, হাদীসটির সনদ দুর্বল। এ হাদীস বর্ণনা করা দ্বারা গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে নবী-এর বদান্যতা ও দানশীলতা বর্ণনা করা। নবী আবু সুফিয়ানের মতো ইসলামের শত্রুকেও ইসলাম গ্রহণের পর গৌরব ও মর্যাদা দান করতে কার্পণ্য করেননি। এ কারণেই এ হাদীসটি গ্রন্থকার তাঁর কিতাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। যেনো নবী -এর দরবার থেকে ধনসম্পদের মতো মান- মর্যাদাও অকাতরে দান করা হতো।
٩٥ عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَجُلًا أَتَى النَّبِيَّ وَ يَسْأَلُهُ فَقَالَ مَا عِنْدِي شَيْ وَلَكِنْ ابْتَعْ عَلَى فَإِذَا جَاءَنَا شَيْ قَضَيْنَاهُ - قَالَ عُمَرُ رَضِيَ - اللَّهُ عَنْهُ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا كَلَّفَكَ اللَّهُ مَا لَا تَقْدِرُ عَلَيْهِ قَالَ فَكَرِهَ النَّبِيُّ فَقَالَ رَجُل أَنْفِقْ وَلَا تَخَفْ مِنْ ذِي الْعَرْشِ اقْلاَلاً، فَتَبَسَّمَ النَّبِيُّ ﷺ وَعُرِفَ السَّرُورُ فِي وَجْهِهِ -
৯৫. হযরত উমর ইবন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত, একবার কোনো এক (অভাবী) লোক নবী-এর নিকট এসে (আর্থিক সাহায্য) প্রার্থনা করলো। তিনি বললেন, আমার নিকট এ মুহূর্তে কিছু নেই। তুমি আমার নামে কিনে নাও। আমার কাছে যখন কিছু আসবে তখন তা আমি পরিশোধ করে দেবো। হযরত উমর (রা) বলেন, (এ কথা শুনে) আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আল্লাহ্ আপনাকে সাধ্যের অতীত কোনো কাজ করার নির্দেশ দেননি। বর্ণনাকারী বলেন, নবী হযরত উমরের এ কথা পছন্দ করলেন না। তখন অন্য এক সাহাবী বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি দেদার খরচ করুন এবং আরশের মালিকের পক্ষ থেকে স্বল্পতার আশংকা একেবারেই করবেন না। নবী (এই সাহাবীর কথা খুব পছন্দ করলেন এবং) মুচকি হাসলেন। তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডলে তখন আনন্দের চিহ্ন ফুটে উঠলো।
ফায়দা: এ হাদীস থেকেও নবী-এর বদান্যতা ও দানশীলতার পরাকাষ্ঠা অনুমিত হয়। তাঁর কাছে কিছুই নেই; তা সত্ত্বেও তিনি প্রার্থনাকারীকে দান করতে অস্বীকার করলেন না, তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিলেন না। বরং অন্যের নিকট থেকে ধার করে তার প্রয়োজন পূরণ করতে বললেন এবং সে ধার নিজে পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। কোনো প্রার্থনাকারীকেই শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেয়া তিনি পছন্দ করতেন না। তাঁর দান ও বদান্যতা হযরত উমর (রা)-এর মতো সুবিখ্যাত সাহাবীর পরামর্শ ও অভিমতের উপর প্রাধান্য পেল। দানের ব্যাপারে নবী হযরত উমর (রা)-এর পরামর্শও মেনে নেননি বরং একজন সাধারণ সাহাবীর কথা পছন্দ করেন। দানের সপক্ষে মত প্রকাশ করায় একজন সাধারণ সাহাবীর কথায় তিনি উৎফুল্ল হন।
٩٦ عَنْ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمُ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّهُ قَالَ بَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ وَمَعَهُ النَّاسُ مَقْفَلَهُ مِنْ حُنَيْنِ عَلَقَتِ الأَعْرَابُ يَسْأَلُونَهُ حَتَّى اضْطَرُّوهُ إِلَى سُمُرَةٍ فَخَطِفَتْ رِدَاءَهُ فَوَقَفَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَقَالَ أَعْطُونِي رِدَانِي، لَوْ كَانَ لِي عَدَدُ هُذِهِ الْعِضَاءِ نَعَمًا لَقَسَمْتُهُ بَيْنَكُمْ ثُمَّ لاَ تَجِدُوْنِي بَخِيْلاً وَ لَا كَذَّابًا ولَا جَبَانًا -
৯৬. হযরত জুবায়র ইন্ন মুতইম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ লোকদের সাথে হুনাইনের যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। তখন কিছু গ্রামীণ লোক তাঁকে জড়িয়ে ধরলো এবং (আর্থিক) সাহায্য প্রার্থনা করলো। এমনকি তারা তাঁকে ঠেলে একটি কণ্টকময় বৃক্ষের কাছে নিয়ে গেলো এবং তাতে তাঁর চাদরখানা আটকে গেলো। তখন রাসূলুল্লাহ্ থেমে গেলেন এবং বললেন, আমার চাদরটি আমাকে দিয়ে দাও। যদি আমার কাছে এখন এই কাঁটাযুক্ত বৃক্ষের কাঁটা সংখ্যক জন্তু (চতুষ্পদ প্রাণী) থাকতো, তবে আমি তাও তোমাদের মধ্যে বিতরণ করে দিতাম। এ ব্যাপারে তোমরা আমাকে কৃপণ দেখতে পেতে না এবং (ওয়াদা করার ক্ষেত্রে) মিথ্যুক ও (ব্যয় করার ব্যাপারে ভীত ও) কাপুরুষও দেখতে না।
ফায়দা : এ হাদীস হুনাইন যুদ্ধ সম্পর্কিত। নবী হুনাইন যুদ্ধে যে সম্পদ লাভ করেছিলেন, তা সাহাবাদের মধ্যে বণ্টন করে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। তখন তাঁর নিকট অবশিষ্ট কিছুই ছিল না। পথিমধ্য গ্রামীণ লোকেরা অজ্ঞতাবশত এসে তাঁকে ঘিরে ধরলো এবং আর্থিক সাহায্য প্রার্থনা করলো। নবী অপারগ ছিলেন। তিনি তাদেরকে জানালেন যে, যদি আমার কাছে এখন কোনো সম্পদ থাকতো, তবে আমি তোমাদেরকে অবশ্যই সাহায্য করতাম। সামান্যতম কার্পণ্য করতাম না।
۹۷ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي لَيْلى قَالَ سَمِعْتُ أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَيَّا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ يَقُولُ آتَيْتُ أَنَا وَفَاطِمَةُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا وَالْعَبَّاسُ وَزَيْدُ بْنُ حَارِثَةَ النَّبِيُّ ﷺ فَقَالَ الْعَبَّاسُ يَا رَسُولَ اللهِ : كَبِرَ سِنِّي وَرَقَ عَظَمِي رَأَيْتَ أَنْ تَأْمُرَ لِي بِكَذَا وَسَقَا مِنَ الطَّعَامِ فَافْعَلَ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَأَفْعَلُ، فَقَالَتْ فَاطِمَةُ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا يَا رَسُولَ اللهِ : إِنْ رَأَيْتَ أَنْ تَأْمُرْ لِي كَمَا أَمَرْتَ لِعَمِّكَ فَافْعَلْ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَأَفْعَلُ، فَقَالَ زَيْدُ ابْنُ حَارِثَةَ أَرْضًا كَانَتْ مَعِيشَتِي مِنْهَا ثُمَّ قَبَضْتَهَا فَإِنْ رَأَيْتَ أَنْ تَرُدَّهَا عَلَى فَافْعَلُ ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَافْعَلُ فَقُلْتُ أَنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنْ رَأَيْتَ أَنْ تُوَلِّيَنِي هُذَا الْحَقُّ الَّذِي جَعَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لَنَا فِي كِتَابِهِ مِنْ هُذَا الْخُمُسُ فَأَقْسِمْهُ فِي حَيَاتِكَ حَتَّى لَايُنَازِ عَنِيْهِ أَحَد بَعْدَكَ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَأَفْعَلُ ذَلِكَ فَوَلَانِيْهِ رَسُولُ اللهِ ﷺ -
৯৭. হযরত আবদুর রহমান ইব্ন আবূ লায়লা (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমীরুল মু'মিনীন হযরত আলী (রা)-কে বলতে শুনেছি, আমি, ফাতিমা, আব্বাস ও যায়দ ইবন হারিসা (রা) একবার নবী -এর নিকট হাযির হলাম। তখন আব্বাস (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার বয়স অনেক হয়েছে এবং আমার শক্তি খর্ব হয়ে গেলো। সুতরাং আপনি সঙ্গত মনে করলে আমার জন্য বায়তুল মাল থেকে এতো এতো ওয়াসাক খাদ্যশস্য দেয়ার নির্দেশ দিন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁর আবেদন মঞ্জুর করলেন এবং বললেন, আমি অবশ্যই তা করবো। এরপর ফাতিমা (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি আপনার চাচার জন্য যে নির্দেশ দিয়েছেন, সঙ্গত মনে করলে আমার জন্যও অনুরূপ সাহায্যের নির্দেশ দিন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁর আবেদনও মঞ্জুর করলেন এবং বললেন, আমি তোমার জন্যও তাই করবো। এরপর (তাঁর আযাদকৃত দাস পালক পুত্র) যায়দ ইবন হারিসা (রা) বলেন, আমার নিকট একখণ্ড জমি ছিল। তা দিয়ে আমার জীবিকা নির্বাহ হতো। আপনি আইনের বলে তা বাজেয়াপ্ত করেছেন। এখন আপনি যদি সঙ্গত মনে করেন, তবে সেই জমিটুকু আমাকে ফেরত দিন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁর আবেদনও মঞ্জুর করলেন এবং বললেন, আমি অবশ্যই তা করবো। হযরত আলী (রা) বলেন, তারপর আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি যদি সঙ্গত মনে করেন, তবে আমাকে বায়তুল মাল থেকে এক-পঞ্চমাংশ মালে গনীমতের অধিকার, যা আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর কিতাবে আমাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন-বণ্টন করার মুতাওয়াল্লী বানিয়ে দিন। তাহলে আমি তা আপনার জীবদ্দশায়ই বণ্টন করতে থাকবো এবং আপনার পরে এ ব্যাপারে আমার সাথে কেউ বিবাদে লিপ্ত হতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ্ তাঁর আবেদনও মঞ্জুর করলেন এবং বললেন, আমি তা অবশ্যই করবো। হযরত আলী (রা) বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ্ আমাকে ঐ এক-পঞ্চমাংশ বণ্টন করার নির্দেশ দান করেন।
ফায়দা : এ পূর্ববর্তী হাদীসসমূহে নবী-এর বদান্যতা সম্পর্কে বিশদ আলোচনা এসেছে। এ হাদীস থেকে বোঝা যায়, নবী যেরূপ অন্যদেরকে তাঁর বিপুল বদান্যতা ও দানশীলতা দ্বারা বিভূষিত করতেন, অনুরূপ তাঁর আত্মীয়-স্বজনের সাথেও দয়া-দাক্ষিণ্য প্রদর্শন করতেন-এটাই হচ্ছে আল্লাহ্ তা'আলার নির্দেশ। আর এ কারণেই তিনি তাঁর আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন এবং তাদেরকে ধন-সম্পদ দান করা ছিল তাঁর মহান চরিত্রের একটি বিশেষ গুণ। এ হাদীসে উল্লিখিত নবী-এর নিকট সাহায্য প্রার্থনার জন্য আগত ব্যক্তিগণ ছিলেন তাঁর আত্মীয়-স্বজন। হযরত আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিব (রা) তাঁর শ্রদ্ধেয় চাচা। হযরত ফাতিমা (রা) তাঁর কলিজার টুকুরা স্নেহের কন্যা। হযরত আলী (রা) তাঁর চাচাত ভাই ও স্নেহের জামাতা এবং হযরত যায়দ ইবন হারিসা (রা) নবী-এর প্রিয় সাহাবী ও আযাদকৃত গোলাম ও পালক পুত্র। এই ব্যক্তিগণ নবী -এর নিকট এসে নিজ নিজ প্রয়োজন তুলে ধরেন এবং তিনি তাঁর পরম ঔদার্য ও সহানুভূতিবশত তাঁদের সবার আবেদন মঞ্জুর করেন। কাউকেই শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেননি।
۹۸ عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ قَالَتْ أَنْشَدَ أَبُو بَكْرٍ قَوْلَ لَبِيْدٍ : أَخٌ لِي أَمَّا كُلُّ شَيْ سَأَلْتُهُ فَيُعْطَى وَأَمَّا كُلُّ ذَنْبٍ فَيَغْفِرُ : فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ هُكَذَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ
৯৮. হযরত আসমা বিন্ত আবূ বক্স (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার (হযরত) আবূ বক্স সিদ্দীক (রা) কবি লবীদ (রা)-এর এই পংক্তি দু'টি আবৃত্তি করলেন: أَخٌ لِي أَمَّا كُلُّ شَيْ سَأَلْتُهُ + فَيُعْطِي وَأَمَّا كُلُّ ذَنْبٍ فَيَغْفِرُ
"আমার এক ভাই আছে, আমি যদি তাঁর কাছে কিছু চাই, তিনি তা তৎক্ষণাৎ আমাকে দিয়ে দেন এবং সব দোষত্রুটি ক্ষমা কর দেন।" এবং বললেন, রাসূলুল্লাহ এ গুণেই গুণান্বিত ছিলেন।
ফায়দা : হযরত লবীদ (রা) জাহিলিয়াত যুগের বিখ্যাত কবিদের অন্যতম। তাঁর নাম লবীদ ইব্ন রাবীআ ইব্ন মালিক। বানু কিলাব প্রতিনিধি দলের সাথে তিনি নবী -এর দরবারে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি কাব্যচর্চা ত্যাগ করেন। (মাআরিফে ইব্ন কুতায়বা, পৃষ্ঠা-৩৩২)। অপর এক হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, নবী বলেন : লবীদের সবচেয়ে সত্য কবিতা হচ্ছে এটি :
الا كُلُّ شَيْ مَا خَلَا اللهُ بَاطِل + وَكُلُّ نَعِيمٍ لَا مَحَالَةً زَائِلُ -
জেনে রাখো, আল্লাহ্ ছাড়া সব জিনিসই বাতিল ও মিথ্যা আর দুনিয়ার সব নিয়ামতই নিশ্চিত বিলীয়মান। (বুখারী শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০৮)
নবী হযরত লবীদ (রা)-এর কবিতা খুব পছন্দ করতেন। কেননা, তাঁর কবিতায় প্রায়শ আল্লাহ্ তাওহীদ, রিসালাত, কিয়ামত, পুরস্কার, শাস্তি ইত্যাদি উল্লেখিত হতো।
গ্রন্থকার এ হাদীসটি নবী -এর দানশীলতা ও বদান্যতা অনুচ্ছেদে উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে, হযরত লবীদ (রা) তাঁর এই কবিতায় তাঁর মামদূহ বা প্রশংসিতের দানশীলতা ও বদান্যতার আলোচনা করেছেন। তাই হযরত আবূ বক্র (রা) এই কবিতাটি রাসূলুল্লাহ্ -এর উদ্দেশ্যে আবৃত্তি করেন। অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন যে, আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা দানশীলতা ও বদান্যতা গুণের এই মানদণ্ডে পুরোপুরি উত্তীর্ণ ছিলেন।
টিকাঃ
১. 'ওয়াসাক' একটি মাপের নাম, যা ষাট সা-এর সমান। সা হলো সাড়ে তিন সের। কারো কারো মতে 'ওয়াসাক' এক উট সমান বোঝাকেও বলা হয়।
📄 নবী (সা)-এর সাহসিকতা ও বীরত্ব
۹۹. عَنْ عَلِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ لَقَدْ رَأَيْتُنِي يَوْمَ بَدْرٍ وَنَحْنُ نَلُوْذُ بِالنَّبِيِّ
هُوَ أَقْرَبُنَا إِلَى الْعَدُوِّ وَكَانَ مِنْ أَشَدَّ النَّاسِ يَوْمَئِذٍ بَأْسًا -
৯৯. হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বদর যুদ্ধের দিন আমি স্বচক্ষে দেখেছি যে, আমরা নবী -এর আশেপাশে আশ্রয় খুঁজছিলাম। আর তিনি আমাদের সকলের তুলনায় শত্রুদের বেশি কাছাকাছি পৌঁছে মুকাবিলা করে যাচ্ছেন। বদরের সেদিন তাঁরই বীরত্ব ও সাহসিকতা ছিল সর্বাধিক।
ফায়দা : চরিত্র বিশারদদের সকলে এ মর্মে একমত যে, মানব চরিত্রের সবচেয়ে বড় উপাদান হলো বীরত্ব। মানুষের যাবতীয় সদ্গুণ বীরত্বের এই ভিত্তির উপরেই গড়ে উঠে। বীরত্বের কারণে মানুষ নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা, দরদ ও অনুকম্পা, হিম্মত, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সত্য প্রকাশে নির্ভীকতা ইত্যাকার মহৎ ও উন্নত চরিত্র মাধুরী অর্জনে সক্ষম হয়। কাপুরুষ ও মনোবলহীন লোকেরা কোন কৃতিত্বের কাজ সম্পাদনে যেমন অনুপযুক্ত তেমনি নৈতিকতার মানদণ্ডেও সে হীনবল বিবেচিত হয়ে থাকে। সে মানবীয় সদ্গুণাবলি ও উন্নত চরিত্র থেকে হয় বঞ্চিত। পক্ষান্তরে যাঁরা সাহসী ও বীর পুরুষ তাঁরা সর্বদা আত্মপ্রত্যয়ী, নীতিবান, সত্যভাষী, দৃঢ় চরিত্র, ধৈর্যশীল, গম্ভীর ও ক্ষমাপরায়ণ থাকেন। এভাবে দানশীলতা, বদান্যতা, মেহমানদারী, পরোপকার ইত্যাদি সাহসী মানুষদেরই বিশেষণরূপে পরিচিত।
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সাহসিকতা ও বীরত্বের ক্ষেত্রেও ছিলেন মানুষের মধ্যে সকলের ঊর্ধ্বে। তিনি অবিচলতা ও অফুরন্ত দৃঢ়তার অধিকারী ছিলেন। জিহাদ ও রণক্ষেত্রে প্রদর্শিত তাঁর বীরত্বের বহু ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, কখনো কোন কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখে তিনি হিম্মত হারাতেন না। চরিত্রের দৃঢ়তা ও অসীম সাহসিকতা বুকে নিয়ে যাবতীয় পরিস্থিতির মুকাবিলা করে যেতেন। হুনাইন যুদ্ধে হাওয়াযিন গোত্রের লোকেরা মুসলিম বাহিনীর উপর বৃষ্টির ন্যায় তীরবর্ষণ শুরু করে। তীরন্দাজদের প্রবল আক্রমণে সাহাবীদের বহু সংখ্যক তখন মনোবল হারিয়ে ফেলেন এবং রণক্ষেত্র থেকে পিছিয়ে পড়েন।
অথচ প্রিয় নবী তখন রণক্ষেত্রে অটল দণ্ডায়মান। তাঁর চতুষ্পার্শ্বে ছিলেন কেবল কয়েকজন জানবাজ সাহাবী। তাঁরা সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় তাঁকে ঘিরে রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। এ কঠিনতম মুহূর্তে তিনি বিন্দুমাত্রও বিচলিত হননি বরং সীমাহীন সাহসিকতা ও বীরত্ব নিয়ে সঙ্গীদের মনোবল ও হিম্মত বৃদ্ধি করতে থাকেন। সামান্যতম পিছে না হটে যথারীতি কাফিরদের সঙ্গে মুকাবিলা চালিয়ে যান।
অনুরূপ একবার তিনি একটি বৃক্ষের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তখন অতর্কিতভাবে জনৈক কাফির যোদ্ধা সম্মুখে এসে তরবারি তাক করে দাঁড়ায়। লোকটি প্রিয় নবী -এর ঠিক মাথা মুবারকের বরাবর দাঁড়িয়ে বলল, হে মুহাম্মদ! এবার আমার হাত থেকে তোমাকে কে বাঁচাবে? প্রিয় নবী ভয়ভীতি বিহীন শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন: আল্লাহ্। তাঁর এই নির্ভীকতা দেখে ও বীরত্বপূর্ণ উত্তর শুনে লোকটির হৃদকম্পন শুরু হলো এবং তার হাত থেকে তাক করা তরবারি মাটিতে পড়ে গেল। (সহীহ্ বুখারী, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৫৯২)। প্রিয় নবী -এর জীবনে এ ধরনের আরো বহু ঘটনা ইতিহাস গ্রন্থাবলিতে বিদ্যমান। এ সকল ঘটনার আলোকে তিনি যে কতখানি সাহসিকতা ও বীরত্বের অধিকারী ছিলেন তা সুস্পষ্ট বোঝা যায়।
১০০. عَنْ عَلِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كُنَّا إِذَا أَحْمَرَ الْبَاسُ وَلَقِيَ الْقَوْمُ اتَّقَيْنَا بِرَسُولُ اللهِ ﷺ فَمَا يَكُونُ أَحَدُ أَقْرَبَ إِلَى الْعَدُوِّ مِنْهُ
১০০. হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রণক্ষেত্রে যুদ্ধ যখন ঘোরতর আকার ধারণ করত এবং একদল অন্যদলের মুখোমুখি হয়ে লড়াই শুরু করত, তখন আমরা নবী-এর চতুষ্পার্শ্বে আশ্রয় খুঁজতাম। আমাদের মধ্যে কেউ শত্রুপক্ষের মুকাবিলায় নবী-এর চেয়ে অগ্রবর্তী থাকত না (অর্থাৎ তিনি মুকাবিলায় সকলের অগ্রবর্তী থাকতেন)।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসটিও প্রিয় নবী-এর অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের কথা প্রকাশ করছে। কেননা কাফিরদের সঙ্গে যখন মুসলমানদের যুদ্ধ শুরু হতো এবং একদল অন্যদলের মুখোমুখি হয়ে লড়াই শুরু করত, তখন শত্রুপক্ষের সংখ্যাধিক্য এবং নিজেদের যুদ্ধ উপকরণের অপ্রতুলতা দেখে এই গুটিকতক নিরস্ত্র মুসলমান সৈন্যদের মনে ভীতির উদ্রেক হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিশেষত যে সকল যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর হাতে যুদ্ধ সরঞ্জাম বলতে কিছুই ছিল না। তখন যে কোন তেজস্বী, বাহাদুর ব্যক্তিরও শংকিত হয়ে ওঠা স্বাভাবিক। অথচ প্রিয় নবী-এর মনোবল এমন মুহূর্তগুলিতেও কেবল দৃঢ় থাকতো তাই নয় বরং নিজে অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের সঙ্গে তরবারি নিয়ে কাফিরদের সারির ভিতর ঢুকে পড়তেন। তখন মুসলিম সৈনিকদের অন্যরাও প্রিয় নবী-এর কাছাকাছি আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করতেন। কতিপয় হাদীসের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় ঘোররত লড়াইয়ের তোড়ে লোকজন দূরে হটে যেত। এ মুহূর্তে যাঁরা প্রিয় নবী-এর সঙ্গে ও কাছাকাছি থাকতেন সাহাবীদের মধ্যে তাঁদেরকে বীর সেনানী বলে বিবেচনা করা হতো।
١٠١. عَنْ سَعْدِ بْنِ عِبَاضِ الثَّمَالِي قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَلِيْلَ الْكَلَامِ قَلِيْلَ الْحَدِيثِ فَلَمَّا أُمِرَ بِالْقِتَالِ تَشَمَّرَ وَكَانَ مِنْ أَشَدِّ النَّاسِ بَأْسًا -
১০১. হযরত সাদ ইব্ন ইয়ায সামালী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ স্বভাবত ছিলেন বাকসংযমী ও মিতভাষী। কিন্তু যখন তিনি যুদ্ধের জন্য আদিষ্ট হতেন তখন এমনভাবে প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন যে তাঁকে সর্বাধিক বলিষ্ঠ যোদ্ধা ও সাহসী বলে দেখা যেত।
ফায়দা : উপরোক্ত হাদীসে প্রিয় নবী-এর দু'টি গুণের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এক. মিতভাষী হওয়া, দুই. সাহসী ও বাহাদুর হওয়া। মিতভাষী হওয়া মানব জীবনে অন্যতম সদ্গুণ। অথচ অতিশয় সহজলভ্য একটি আমল। একখানা হাদীসে প্রিয় নবী ইরশাদ করেন: আমি কি তোমাদের অত্যন্ত হালকা ও সহজলভ্য একটি আমলের কথা জানাবো? সে আমলটি হলো নীরব থাকা এবং চরিত্রবান হওয়া। (তারগীব ওয়া তারহীব, খ. ৪, পৃষ্ঠা ৩২১)
বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে প্রিয় নবী -এর স্বল্পভাষী হওয়া সম্পর্কীয় আরো বহু রিওয়ায়াত বিদ্যমান। এ সব রিওয়ায়াতের আলোকে বোঝা যায় যে, মিতভাষী হওয়াও মানব চরিত্রের অন্যতম সদ্গুণ। চরিত্র বিশারদ ও দার্শনিকদের কেউই এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন না।
গ্রন্থকার এখানে প্রিয় নবী -এর সাহসিকতা ও বীরত্বের আলোচনা প্রসঙ্গে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। কেননা হাদীসখানার শেষ বাক্যটি থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, প্রিয় নবী -কে যখনই আল্লাহ্ পাকের তরফ থেকে কোন জিহাদ বা যুদ্ধের জন্য আদেশ করা হতো তখনই তিনি কোন দ্বিধাদ্বন্দু ব্যতিরেকে অতিশয় বীরত্ব ও সাহসিকতাসহ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যেতেন। আবার রণক্ষেত্রেও তিনি সবচেয়ে অধিক সাহসী ও বীর ব্যক্তি হিসাবে প্রমাণিত হতেন।
۱۰۲. عَنِ الْبَرَاءِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كُنَّا وَاللَّهِ إِذَا أَحْمَرَّ الْبَاسُ نَتَّقِي بِهِ يَعْنِي النَّبِيُّ ﷺ وَإِنَّ الشَّجَاعَ مِنَّا الَّذِي يُحَاذِي بِهِ -
১০২. হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ্র কসম! যখন আমাদের যুদ্ধ ভয়ানক আকার ধারণ করত, তখন আমরা প্রিয় নবী -এর কাছে এসে আশ্রয় নিতাম। আর আমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিকেই সবচেয়ে বড় সাহসী ও বীর বলে গণ্য করা হতো যিনি যুদ্ধকালে প্রিয় নবী -এর সঙ্গে সঙ্গে থাকতেন।
ফায়দা: প্রিয় নবী -এর চরিত্রে যেভাবে অন্যান্য অতুলনীয় যোগ্যতা ও গুণাবলি পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান ছিল তেমনি সাহসিকতা ও বীরত্বও ছিল অতুলনীয় ও অসীম। বড় বড় যুদ্ধগুলিতে এবং যুদ্ধ জীবনের চরম আতংকের মুহূর্তগুলোর মধ্যেও তিনি এতখানি দুঃসাহসিকতার প্রমাণ দিয়েছিলেন যে, যখন বীর বাহাদুর সাহাবীগণ পর্যন্ত হিম্মতহারা হয়ে যাচ্ছিলেন এবং নিজেরা কোন আশ্রয়ের তালাশ শুরু করেছিলেন। সে মুহূর্তে সকলে তাঁর আশ্রয় পেয়ে পুনর্বার যুদ্ধ চালানোর হিম্মত লাভ করতেন। তা ছাড়া সাহাবীদের মধ্যে তখন তাঁকেই সবচেয়ে শক্তিশালী বীর বলে জ্ঞান করা হতো, যিনি নবী -এর আশ্রয়ে থেকে যুদ্ধ চালনায় দৃঢ় থাকতে সক্ষম হতেন।
۱۰۳. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ بِالْمَدِينَةِ فَزَعٌ وَرَكِبَ رَسُولُ الله ﷺ فَرَسًا لِأَبِي طَلْحَةَ فَقَالَ مَا رَأَيْنَا مِنْ شَيْءٍ وَإِنْ وَجَدْنَاهُ لَبَحْرًا -
১০৩. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার মদীনা শরীফের (এর উপর শত্রুরা অতর্কিত হামলা চালিয়েছে বলে গুজব রটেছিল। ফলে) সর্বত্র ভয় ও আতংক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় নবী হযরত আবূ তালহা (রা)-এর ঘোড়ার উপর সওয়ার হন (এবং শত্রুদের গতিবিধি জানার জন্য সম্পূর্ণ একাকী অবস্থায় তিনি বেরিয়ে পড়েন। এভাবে পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল হওয়ার পর তিনি যখন ফিরে আসেন তখন) বলেন: আমি তো এখানে ভয়ের কিছুই দেখিনি। আমি আবু তালহার ঘোড়াটিকে সমুদ্রের মত দ্রুতগতিসম্পন্ন পেলাম।
ফায়দা : এই হাদীসসহ সম্মুখে আরো দু'টি হাদীস আসছে, সবগুলোর মূল বক্তব্য অভিন্ন। ঘটনাটি ছিল এমন যে, একবার মদীনা শরীফের সর্বত্র সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল যে, 'শত্রুরা মদীনার উপর আক্রমণ চালিয়েছে। এ সংবাদ খুব দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষকে দারুণ আতংকের মধ্যে ফেলে দেয়। ভয়ের আতিশয্যে কেউ এগিয়ে পরিস্থিতির সঠিক পর্যবেক্ষণের হিম্মতটুকুও পাচ্ছিল না। কিন্তু প্রিয় নবী এ আতংকের কোন পরোয়া করেননি। তিনি তৎক্ষণাৎ হযরত আবূ তালহা (রা)-এর ঘোড়াটি নিয়ে পরিস্থিতির সঠিক পর্যবেক্ষণের জন্য সম্মুখের দিকে সম্পূর্ণ একাকী ছুটে চললেন। নবী দ্রুতগামী এ ঘোড়াটি নিয়ে মদীনা শরীফের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত চলে যান। কিন্তু কোথাও শত্রুদের আক্রমণের কোন চিহ্ন দেখতে পাননি। তিনি বুঝলেন এটি সম্পূর্ণ গুজব। কাজেই তিনি ফিরে আসলেন এবং লোকজনকে সান্ত্বনা ও অভয় দিয়ে বললেন: তোমরা ভয় পেয়ো না। এখানে আমি আতংকের কিছুই দেখিনি। অতঃপর নবী আবু তালহার ঘোড়ার প্রশংসা করে বললেন: এই ঘোড়াটি সমুদ্রের মত অত্যন্ত বেগবান ও দ্রুতগতি সম্পন্ন।
١٠٤. عَنْ أَنَسِ ابْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ فَزِعَ أَهْلُ المَدِينَةِ مَرَّةً فَرَكِبَ النَّبِيُّ ﷺ فَرَسًا كَأَنَّهُ مُقَرِّفُ فَرَكَضَهُ فِي آثَارِهِمْ فَلَمَّا رَجَعَ قَالَ وَجَدْنَاهُ بَحْرًا
১০৪. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার মদীনা শরীফের অধিবাসীরা (শত্রুদের আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে এই গুজবে) ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গিয়েছিল। নবী তৎক্ষণাৎ জীর্ণশীর্ণ দুর্বল একটি ঘোড়ায় আরোহণ করেন। তিনি এটিকে দ্রুত আক্রমণকারীদের দিকে ছুটিয়ে নিলেন। অবশেষে ফিরে এসে বললেন, আমি এটিকে সমুদ্রের মত বেগবান পেলাম (অথচ তোমরা একে দুর্বল ও ধীরগতি সম্পন্ন বলছ)।
١٠٥ عَنْ عِمْرَانَ بْنِ الحُسَيْنِ قَالَ مَا لَقِي النَّبِيُّ ﷺ إِلَّا كَانَ أَوَّلَ مَنْ يَضْرِبُ
১০৫. হযরত ইমরান ইবন হুসাইন (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোন শত্রুবাহিনীর সঙ্গে নবী -এর যখন মুকাবিলা হতো তখন যুদ্ধে তিনিই থাকতেন প্রথম আক্রমণকারী।
ফায়দা: কাফির, মুশরিক ও আল্লাহ্র দুশমনদের বিরুদ্ধে তরবারি উত্তোলনের কাজেও প্রিয় নবী থাকতেন সবার অগ্রে। প্রিয় নবী -এর এই ভূমিকা গ্রহণ তাঁর অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় বহন করে। তা ছাড়া তিনি মানসিকভাবে কতখানি দৃঢ়চেতা ও প্রবল শক্তিমান ছিলেন বর্ণিত হাদীস থেকে এটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
١٠٦. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ مِنْ أَشْجَعِ النَّاسِ وَأَسْمَحِ النَّاسِ-
১০৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে রাসূলুল্লাহ্ ছিলেন অসীম সাহসী ও সর্বোচ্চ দানশীল ব্যক্তি।
ফায়দা : উল্লিখিত হাদীসে প্রিয় নবী ﷺ-এর বিশেষ মানের দু'টি সদ্গুণের উল্লেখ করা হয়েছে। একটি হলো, তাঁর সীমাহীন বীরত্ব ও দুঃসাহসিকতা। আর অপরটি হলো পরম দানশীলতা ও বদান্যতা। দার্শনিক ও চরিত বিশারদদের সকলে এ মর্মে একমত যে, এই বীরত্ব ও দানশীলতা একটি অপরটির অনিবার্য ফলশ্রুতি।
۱۰۷. عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَحْسَنَ النَّاسِ وَأَشْجَعَ النَّاسِ وَأَسْمَحَ النَّاسِ-
১০৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক সুপুরুষ, সর্বাধিক সাহসী ও সবচেয়ে বেশি দয়া-দাক্ষিণ্যের অধিকারী।
ফায়দা : উপরোক্ত হাদীসে প্রিয় নবী ﷺ-এর তিনটি উল্লেখযোগ্য বিশেষণের কথা বলা হয়েছে। এক. তাঁর অতুলনীয় শারীরিক সুগঠন ও সৌন্দর্য, দুই. তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতা, তিন, তাঁর দানশীলতা ও দয়া-দাক্ষিণ্য। কোন সন্দেহ নেই যে, প্রিয় নবী ﷺ-এর পবিত্র সত্তা নবুওয়াতের ক্ষেত্রে যেমন সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত শিখরে অধিষ্ঠিত ছিল, তেমনি তাঁর এ সত্তা নীতিপরায়ণতা ও উন্নত চরিতাদর্শের ক্ষেত্রেও ছিল সর্বোচ্চ শিখরে প্রতিষ্ঠিত। এ মাকাম তথা মর্যাদা শুধুমাত্র তাঁর জন্যই। কারোর পক্ষে এতখানি উচ্চে আরোহণ কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়। আল্লাহ্ পাক আমাদেরকে তাঁর প্রিয়তম বন্ধুর উন্নত অনুপম চরিতাদর্শ অনুসরণের তাওফীক দান করুন। আমীন।
۱۰۸. عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ صَيْحَةُ بِالْمَدِينَةِ، فَرَكِبَ النَّبِيُّ ﷺ فَرَسًا لَأَبِي طَلْحَةَ، فَأَجْرَاهُ سَاعَةً ثُمَّ رَجَعَ فَقَالَ مَا رَأَيْنَا مِنْ شَيْ وَإِنَّ وَجَدَنَاهُ لَبَحْرًا -
১০৮. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার মদীনা শরীফের উপর শত্রুরা অতর্কিত আক্রমণ চালিয়েছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ল। প্রিয় নবী ﷺ তৎক্ষণাৎ হযরত আবূ তালহা (রা)-এর একটি ঘোড়ায় আরোহণ করেন এবং এক ঘণ্টা পর্যন্ত ঘোড়াটিকে এদিক-ওদিক ছুটিয়ে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেন। অবশেষে (ঘটনার প্রকৃত অবস্থা প্রত্যক্ষ করে) ফিরে এসে বললেন, আমি কিছুই দেখলাম না। (ভয়ের কিছুই নেই) তবে আমি এ ঘোড়াটিকে (গতিশীলতার দিক থেকে) সমুদ্রের ন্যায় পেলাম।
١٠٩. عَنْ أَبِي جَعْفَرٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ شَدِيدَ الْبَطَشِ -
১০৯. হযরত আবূ জাফর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ কঠোর পাকড়াওকারী ছিলেন।
ফায়দা : আলোচ্য হাদীসের আলোকেও বোঝা যায় যে, প্রিয় নবী যেমন সাহসিকতা ও বীরত্বের অধিকারী ছিলেন তেমনি শারীরিকভাবেও তিনি অতিশয় শক্তিশালী ও সবল ছিলেন। একখানা হাদীসে তিনি স্বয়ং ইরশাদ করেন: আমাকে চল্লিশ জন মানুষের সমান শক্তি প্রদান করা হয়েছে। আর এ কারণেই কঠিন থেকে কঠিন কিংবা শক্ত থেকে শক্ততর কোন কাজ যা সাহাবীদের কারোর পক্ষে সম্ভব হতো না সেটি তিনি অনায়াসেই করে দিতে পারতেন। পরবর্তী ১১১ নং হাদীস থেকেও প্রিয় নবী-এর এহেন অতুলনীয় শক্তিমত্তা ও দৈহিক ক্ষমতার প্রমাণ মেলে।
١١٠. عَنِ الْبَرَاءِ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَوْمَ الْخَنْدَقِ يَنْقُلُ التَّرَابَ حَتَّى وَارَى الغُبَارُ شَعْرَ صَدْرِهِ وَرَأَيْتُ النَّبِيُّ ﷺ يَرْتَجِزُ يَوْمَ الخَنْدَقِ وَهُمْ يَحْفِرُونَهُ وَهُوَ يَنْقُلُ التَّرَابَ حَتَّى وَارَى جَلْدَةُ بَطْنِهِ -
১১০. হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি খন্দক যুদ্ধের দিন দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ্ নিজে মাটি বহন করেছেন আর ধুলায় তাঁর বুকের পশমগুলি ঢেকে গিয়েছিল। তিনি বলেন, আমি আরো দেখেছি যে, খন্দকের সে দিন প্রিয় নবী উদ্দীপনাবর্ধক কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। আর সাহাবীগণ পরিখা খনন করে যাচ্ছেন। এ সময় তিনিও অন্যদের সঙ্গে মাটি বহন করেছেন। এমনকি বালির কারণে তাঁর পেটের চামড়া আবৃত হয়ে গিয়েছিল।
ফায়দা : এ ঘটনাটি হলো খন্দক যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের। আলোচ্য হাদীসের উল্লেখের দ্বারা গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হলো প্রিয় নবী-এর সীমাহীন মনোবলের কথা প্রমাণ করা এবং আল্লাহ্র পথে কঠিন থেকে কঠিনতর ও তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতর কোন কাজ সম্পাদন করতে তিনি কতখানি দৃঢ়চেতা ও সাহসী ছিলেন তা তুলে ধরা।
۱۱۱. عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ مَكَثَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَأَصْحَابُهُ يَحْفِرُونَ الخَنْدَقَ ثَلَاثًا مَا ذَاقُوْا طَعَامًا فَقَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ : إِنَّ هَذِهِ كِدْيَةٌ - مِنْ الجَبَلِ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ رَسُوْمًا بِالْمَاءِ فَرَسُوْهَا ثُمَّ جَاءَ النَّبِيُّ ﷺ فَأَخَذَ الْمِعْولَ أَوِ الْمِسْحَاةَ ثُمَّ قَالَ بِسْمِ اللهِ ثُمَّ ضَرَبَ ثَلَاثًا فَصَارَ كَثِيْبًا يَهَالُ، قَالَ جَابِرُ فَحَانَتْ مِنَى الْتِفَاتَةُ فَرَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ وَقَدَ شَدَّ بَطْنَهُ بحجر
১১১. হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (খন্দকের যুদ্ধ চলাকালে) রাসূলুল্লাহ্ ও তাঁর সাহাবীগণ তিন দিন পর্যন্ত অনাহারক্লিষ্ট অবস্থায় পরিখা খননের কাজে নিয়োজিত থাকলেন। (তখন অতিশয় শক্ত ও বিশাল আয়তনের একটি পাথর খোদাই কাজের মুখে বেরিয়ে আসে) সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এটি পর্বতের একটি মস্তবড় পাথর। রাসূলুল্লাহ্ বললেন: তোমরা পাথরটির উপর পানি ছিটিয়ে দাও। সেমতে তাঁরা পানি ছিটিয়ে দিলেন। তারপর প্রিয় নবী তাশরীফ আনেন। তিনি কোদাল বা হাতুড়ি হাতে নিয়ে 'বিসমিল্লাহ্' পাঠ করেন এবং পাথরের উপর তিনবার আঘাত হানেন। ফলে অতিশয় শক্ত পাথরটি এত নরম হয়ে গিয়েছিল যে, আঘাতের দরুন ফেটে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে বালির ন্যায় ঝরে পড়ে গেল। হযরত জাবির (রা) বলেন, এ সময় হঠাৎ আমার দৃষ্টি নবী -এর পেট মুবারকের উপর গিয়ে পড়ল। আমি দেখলাম যে, তিনি (ক্ষুধার আতিশয্যে) পেটের উপর পাথর বেঁধে রেখেছেন।
ফায়দা : আলোচ্য ঘটনাটিও খন্দকের যুদ্ধ প্রস্তুতিকালে ঘটেছিল। ইতিহাসে এ যুদ্ধকে আহযাবের যুদ্ধ নামেও অভিহিত করা হয়েছে। হিজরী ৫ বর্ষের যিল্কাদ মাসে এ যুদ্ধ শুরু হয়। প্রিয় নবী তখন মদীনা শরীফেই অবস্থানরত ছিলেন। আরবের সকল গোত্রের মুশরিক ও ইয়াহুদীরা সকলে সম্মিলিতভাবে مسلمانوں বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এবং পবিত্র মদীনা নগরী অবরোধ করে নেয়। শত্রু বাহিনীর সংখ্যা ছিল ছয় সহস্রাধিক। প্রিয় নবী অবরোধের সংবাদ পেয়ে সাহাবীদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। সাহাবী হযরত সালমান ফারসী (রা) ছিলেন পারস্যের অধিবাসী। তিনি নগর রক্ষার স্বার্থে তখন পরিখা খননের পরামর্শ দিয়ে বলেন, এমনি জটিল মুহূর্তে ইরানী যোদ্ধারা সাধারণত পরিখা খননের ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। সে মতে মদীনা নগরীর অদূরে মুসলিম সৈন্যগণ এক জায়গায় জমায়েত হন। তাঁরা পরামর্শ মোতাবেক পরিখা খননের কাজ শুরু করেন। মুসলমানদের মধ্যে সে মুহূর্তে খুব অভাব-অনটন বিরাজিত ছিল। দুর্ভিক্ষের কারণে মুসলমানগণ তিনদিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ অনাহারে কাটান, মুখে দেয়ার মত সামান্য রসদও তাদের হাতে ছিল না। কারণ শত্রু সৈন্যরা ইতিপূর্বেই মদীনা শরীফ অভিমুখে রসদ পৌছার সকল পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। এদিকে পরিস্থিতি নাজুক বিধায় দ্রুত পরিখা খননের কাজ সমাপ্ত করা আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়।
এভাবে অবরোধ ও খণ্ডযুদ্ধ প্রায় এক মাস যাবত অব্যাহত থাকে। পরিশেষে মহান আল্লাহ্ অদৃশ্য পথে মুসলমানদের সাহায্য করেন। হঠাৎ খুব শক্তিশালী একটি বায়ুর ঝড় নেমে আসে এবং অবরোধকারী আগ্রাসী বাহিনীর সমুদয় সাজ-সরঞ্জাম উড়িয়ে নিয়ে যায়। ফলত শত্রুপক্ষের মনোবল ভেঙে যায় এবং তারা পলায়নের পথ অবলম্বন করে। আর মু'মিনগণ তাদের আক্রমণ থেকে রেহাই পেয়ে যান।
গ্রন্থকার আলোচ্য অংশে প্রিয় নবী -এর শক্তিমত্তা ও দৈহিক ক্ষমতা এবং সাহসিকতা ও বীরত্বের আলোচনা করছেন এবং এতদুদ্দেশ্যেই উপরোক্ত হাদীসখানা অনুচ্ছেদের অন্তর্ভুক্ত করেন। কেননা হাদীসটির মধ্যে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, মস্তবড় যেই পাথরটি খোদাই পথে পড়েছিল, সেটিকে অন্যরা কোনক্রমেই ভাঙতে সক্ষম হয়নি। সেটি তিনি শক্তিবলে ভেঙে ফেলেন। তিনি কোদাল হাতে নিয়ে মাত্র তিনবার সজোরে আঘাত করেছিলেন। আর পাথরটি বালির ন্যায় গুঁড়িয়ে গিয়েছিল। এ ঘটনা থেকে তাঁর দৈহিক শক্তিমত্তা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
একটি বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) বলেন, প্রিয় নবী স্বয়ং ইরশাদ করেছেন যে, আমাকে চল্লিশ জন বেহেস্তী মানুষের সম-পরিমাণ শক্তি প্রদান করা হয়েছে। (তাবারানী, সূত্র-ইত্তেহাফুস সাদাহ্, খ. ৭, পৃষ্ঠা ১৪১)
۱۱۲. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَحْسَنَ النَّاسِ وَأَشْجَعَ النَّاسِ وَأَجُودَ النَّاسِ، وَلَقَدْ فَزِعَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ وَرَكِبَ فَرَسًا لِأَبِي طَلْحَةَ عَرِيًّا فَخَرَجَ النَّاسُ فَإِذَا هُمْ بِرَسُولِ اللهِ قَدْ سَبَقَهُمْ إِلَى الصَّوْتِ قَدْ اسْتَبْرَأَ الْخَبَرَ وَهُوَ يَقُولُ لَنْ تَرَاعُوا وَقَالَ النَّبِيُّ وَلَقَدْ وَجَدْنَاهُ بَحْراً أَوْ إِنَّهُ لَبَحْرٍ -
১১২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুপুরুষ, সর্বাধিক সাহসী ও সর্বোচ্চ দয়া-দাক্ষিণ্যের অধিকারী। (একবার একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ার দরুন) মদীনা শরীফের লোকজন আতংকিত হয়ে উঠেছিল। রাসূলুল্লাহ্ তৎক্ষণাৎ হযরত আবু তালহা (রা)-এর ঘোড়ায় গদি ব্যতিরেকেই সওয়ার হন এবং দ্রুতগতিতে সম্মুখে অগ্রসর হন। অবস্থা দৃষ্টে লোকজনও রাস্তায় বেরিয়ে আসে। তখন তারা দেখলো রাসূলুল্লাহ্ তাদের পূর্বেই গুজবটি যে দিক থেকে আসছিল সে দিক থেকে পর্যবেক্ষণ শেষ করে ফিরে আসছেন। প্রিয় নবী লোকজনকে বললেন: তোমরা ভয় পেয়ো না। তিনি আরো বললেন: আমি ঘোড়াটিকে সমুদ্রের ন্যায় দ্রুতগামী পেলাম অথবা তিনি বলেছেন: এটি সমুদ্রের মত (বেগবান)।
ফায়দা: সহীহ্ বুখারীতে একাধিক স্থানে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। তবে হাদীসের শব্দমালায় কিছু ভিন্নতা বিদ্যমান।১
আলোচ্য হাদীসের আলোকেও প্রিয় নবী-এর অসীম সাহসিকতা, বীরত্ব ও নির্ভীকতার প্রমাণ পাওয়া যায়। চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া আতংকের এ মুহূর্তে যখন যে কোন সময়ে মদীনার উপর শত্রুদের আক্রমণ চালানোর আশংকা বিদ্যমান, তাছাড়া শত্রুপক্ষ কোন দিক থেকে কতটুকু প্রস্তুতি নিয়ে আক্রমণ শুরু করছে তাও অজানা এমন এক নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে প্রিয় নবী-এর সম্পূর্ণ একাকী অবস্থায় অনুসন্ধানের জন্য সম্মুখে বেরিয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে তাঁর অসীম সাহসিকতার প্রমাণ বহন করে।
এ হাদীসের মধ্যেও প্রিয় নবী-এর উল্লেখযোগ্য তিনটি সদ্গুণের উল্লেখ করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, এ বিশেষণত্রয় হলো মানুষের যাবতীয় সদ্গুণের আধার। কেননা প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে তিনটি প্রকৃতিগত শক্তি বিদ্যমান থাকে। যথা ১. অনুকম্পা শক্তি, ২. ক্রোধশক্তি ও ৩. বিবেচনা শক্তি। ক্রোধ শক্তির পূর্ণতা দ্বারা ব্যক্তির মধ্যে সাহসিকতা ও বীরত্বের গুণ সৃষ্টি হয়। অনুকম্পা শক্তির পূর্ণতার কারণে ব্যক্তি দানশীলতা ও বদান্যতার গুণে গুণান্বিত হয়। আর বিবেচনা শক্তির পূর্ণতা অর্জনের ফলে ব্যক্তির মাঝে নৈপুণ্য ও বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ ঘটে। প্রিয় নবী-এর চরিত্রে উল্লিখিত সব কয়টি শক্তি পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান ছিল। এ কারণেই শক্তিগুলি থেকে উদ্ভূত গুণগুলিও ছিল তাঁর চরিত্রে পরিপূর্ণ। দার্শনিকগণ লিখেছেন, যে ব্যক্তির প্রকৃতির মধ্যে উদ্ভূত শক্তি পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান তিনি দৈহিক গঠন ও রূপ সৌন্দর্যের ক্ষেত্রেও পরিপূর্ণ মানের হবেন। কারণ বিবেচনা শক্তি ও দৈহিক সুগঠন একটি অপরটির জন্য অনিবার্য উপাদান।
۱۱۳. عَنِ الْبَرَاءِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ لَمَّا غَشِيَهُ الْمُشْرِكُونَ نَزَلَ فَجَعَلَ يَقُولُ أَنَا النَّبِيُّ لَا كَذِبَ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَمَارَنِي فِي النَّاسِ يَوْمَئِذٍ أَحَدٌ كَانَ أَشَدَّ مِنَ النَّبِيِّ
১১৩. হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুশরিকদের সৈন্য বাহিনী যখন রাসূলুল্লাহ্-কে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলল তখন তিনি নিজের বাহন থেকে অবতরণ করেন এবং বলতে লাগলেন, أَنَا النَّبِيُّ لَأَكَذِبَ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ কোন সন্দেহ নেই আমি সত্য নবী, আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান। বর্ণনাকারী বলেন, সে দিন মুসলিম বাহিনীর মধ্যে এমন একজনও ছিল না যাকে প্রিয় নবী এর তুলনায় অধিক সাহসিকতার অধিকারী বলা যায়।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসটি হুনাইনের যুদ্ধ সম্পর্কিত। এ যুদ্ধে হাওয়াযিন গোত্রের প্রসিদ্ধ তীরন্দাজ দল নিজেদের ব্যূহ থেকে অতর্কিতভাবে মুসলমানদের উপর তীরের বৃষ্টি নিক্ষেপ করেছিল। ফলে অধিকাংশ সাহাবী আহত ও শংকিত হয়ে পড়েন। তাঁদের কদম বিচলিত হয়ে যায় এবং তাঁরা রণক্ষেত্র থেকে পিছু হটে যান। কিন্তু সেই উন্মুক্ত রণক্ষেত্রে নবী স্বস্থান থেকে বিন্দুমাত্র হটেননি। তিনি সওয়ারী থেকে দ্রুত অবতরণ করে নিকটস্থ জানবায সাহাবীদেরকে নিয়ে শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে শক্তিশালী মুকাবিলা চালিয়ে যান। এ মুহূর্তে প্রিয় নবী-এর কণ্ঠ থেকে নিম্নের তেজোদ্দীপক জোশপূর্ণ বাক্যটি বেরিয়ে এসেছিল: “أَنَا النَّبِيُّ لَكَذِبُ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ" "আমি বরহক ও সত্য নবী, আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান।” বলা বাহুল্য, এটি হলো বীরত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নীতি। তাঁরা জটিল ও নাজুক কোন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে অন্যদের মনেও আবেগের সঞ্চার করার লক্ষ্যে এ ধরনের তেজোদ্দীপক বাক্য আবৃত্তি করে থাকেন। আর এ কারণেই ইসলামী শরীয়তে সমর সঙ্গীত আবৃত্তি করা ও যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের বংশগৌরব প্রকাশ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
📄 নবী (সা)-এর নম্রতা ও বিনয়
١١٤. عَنْ قُدَامَةَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَامِرٍ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَرْمِي الجَمْرَةَ عَلَى نَاقَةٍ شَهَبَاءَ لأَضَرْبَ وَلَا طَرْدَ وَلَا إِلَيْكَ إِلَيْكَ -
১১৪. হযরত কুদামা ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন আমির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্-কে (হজ্জের মৌসুমে) খাকী বর্ণের একটি উটনীর উপর সাওয়ার হয়ে (আকাবায়) কংকর নিক্ষেপ করতে দেখেছি। (তিনি এভাবে কংকর নিক্ষেপের জন্য গিয়েছেন যে, লোকজনকে তাঁর কাছ থেকে দূরে থাকার জন্য) না কোন মারপিট ছিল আর না কোন প্রকারের হাঁকডাক। অনুরূপ 'এদিকে যাও' 'ওদিকে সর' এ সব কথাও বলা হয়নি।
ফায়দা: এ অনুচ্ছেদে প্রিয় নবী এর বিনয় ও নম্রতা বিষয়ক হাদীসসমূহ বর্ণনা করা হয়েছে। উল্লিখিত প্রথম হাদীসের থেকে তাঁর পূত-পবিত্র চরিত্রে পরম বিনয় নীতির প্রকাশ পাওয়া যাচ্ছে। কেননা প্রিয় নবী তখন একই সঙ্গে গোটা বিশ্বের পথপ্রদর্শক ও সকল নবীর সর্দার হওয়ার পাশাপাশি সমকালীন প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তা ব্যক্তিও ছিলেন। তা সত্ত্বেও তাঁর চাল-চলনে সর্বোচ্চ কর্তাসুলভ আচরণে কোন ভিন্নতা দেখা যায়নি। হজ্জের মৌসুমে হাজীদের প্রচণ্ড ভিড় থাকে। উপরন্তু তাঁদের অধিকাংশই থাকেন এমন চরিত্রের যারা নাগরিক রীতি-নীতি সম্পর্কে অসচেতন ও অনভ্যস্ত। এমন পরিস্থিতিতে একজনের শরীরে অন্যজনের শরীরের ধাক্কা লাগা, ভিড়ের চাপে কেউ নিচে পড়ে যাওয়া মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে প্রিয় নবী নিজের মর্যাদা বা মান-সম্মান বজায় রাখার উদ্দেশ্যে পৃথক কোন ব্যবস্থাই নেননি। তিনি সাধারণ হাজীদের সঙ্গে মিশে হজ্জের কাজকর্ম সম্পাদন করে যান। তাঁর আগমন উপলক্ষে রাস্তায় পথচারীদের না আসা-যাওয়া বন্ধ করা হয়েছিল, আর না তাঁর সম্মান প্রদর্শনার্থে পথচারীদেরকে 'সর' কিংবা 'দূরে থাক' ইত্যাদি বলা হয়েছিল। মোটকথা প্রিয় নবী নিজের প্রাধান্য প্রদর্শনের কোন ব্যবস্থা অবলম্বন করেননি।
এভাবে প্রিয় নবী-এর নম্রতা ও বিনয় সম্পর্কে আরো জানা যায় যে, তিনি মক্কা শরীফে যখন অসহায় ও শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থায় কালাতিপাত করছিলেন। ধৈর্য ও সহনশীলতা অবলম্বন ব্যতিরেকে তাঁর অন্য কোন পথ ছিল না। তখন আল্লাহ্ পাক তাঁকে ইখতিয়ার দিয়ে বলেছিলেনঃ হে নবী! আপনার অভিমত কি? আপনি কি বাদশাহী সংযুক্ত নবুওয়াত পেতে চান, আর না আবদিয়্যাত সংযুক্ত নবৃওয়াত? প্রিয় নবী নিজের পরম বিনয় প্রকাশ করে বাদশাহীর পরিবর্তে আবদিয়্যাত সংযুক্ত নবৃওয়াত লাভের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন এবং নিজের জন্য অভাব-অনটনের পথ বেছে নেন। অথচ নবুওয়াতের সঙ্গে বাদশাহীর সংযুক্ত প্রার্থনা করতে কোন বাধা ছিল না। তাঁর সম্মুখে হযরত সুলায়মান (আ)-এর উদাহরণও বিদ্যমান ছিল। তাছাড়া এই বাদশাহী গ্রহণ নবৃওয়াতের দায়িত্ব পালনের পথে কোন প্রতিবন্ধক বলেও বিবেচিত হতো না। কিন্তু 'রাহমাতুললিল আলামীন নিজের স্বভাবজাত চাহিদার নিরিখে বাদশাহীর উপর আবদিয়্যাতকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। এ কারণেই একাধিক হাদীসে পাওয়া যায় যে, এর পর প্রিয় নবী কখনো হাতের উপর বা পিঠের উপর ভর করে বসে পানাহার করেননি। স্বয়ং ইরশাদও করেছেন: আমি একজন নগণ্য বান্দা হিসাবে বসি, একজন ক্রীতদাস যেভাবে আহার করে আমিও সেভাবে আহার করি।
নম্রতা ও বিনয়ের এ নীতির কারণে প্রিয় নবী কখনো কোন খাদেম বা কাজের লোককে কোন ভুলের কারণে প্রহার করতেন না। আর কখনো বকাঝকাও দিতেন না। একটি হাদীসে এতটুকুও বলা হয়েছে যে, হযরত উমর (রা) বলেন, প্রিয় নবী ইরশাদ করেছেন যে, আমার প্রশংসা করতে গিয়ে তোমরা খৃস্টানদের মত বাড়াবাড়ি করো না। খৃস্টানরা তাদের নবী ঈসা (আ)-এর প্রশংসা করতে গিয়ে সীমা অতিক্রম করে এবং শেষ পর্যন্ত তার ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্ পুত্র বলে অভিহিত করে। (নাউযুবিল্লাহ্) আমি আল্লাহ্র একজন বান্দা মাত্র। কাজেই তোমরা আমাকে কেবল عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُهُ "আল্লাহ্র বান্দা ও তাঁর রাসূল" এতটুকু প্রশংসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবে।
নম্রতা ও বিনয়ের অভ্যাস আল্লাহ্ পাকের কাছেও খুবই পছন্দনীয়। পক্ষান্তরে অহংকার ও বড়ত্বের মনোভাবকে তিনি খুবই অপছন্দ করেন। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ তাঁর প্রিয় বান্দাদের চরিত্র আলোচনা করে ইরশাদ করেন:
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا -দয়াময় আল্লাহ্র খাস বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে। আর অজ্ঞ লোকেরা যখন সম্বোধন করে তখন তারা তর্কে অবতীর্ণ হয় না বরং শান্তি কামনা করে। (সূরা ফুরকান: ৬৩)
সারকথা মু'মিন মুসলমানদের বৈশিষ্ট্য হলো যে, তারা আচার-আচরণের ক্ষেত্রে নম্রতা ও বিনয় অবলম্বন করে চলে। কখনো কোন অজ্ঞ কিংবা অভদ্র লোক তাদেরকে কোন কটুকথা বললে তারা ক্ষমার চোখে দেখে এবং ভদ্রনীতির প্রদর্শন করে। গর্ব করা, অহংকার করা কিংবা আত্মম্ভরিতা প্রকাশ করা মু'মিনের কাজ নয়।
এ কারনেই একবার হযরত লোকমান (আ) নিজ পুত্রকে বেশ কিছু উপদেশ দেন। সে সব উপদেশের মধ্যে তিনি নম্রতা ও বিনয়ের নীতি অবলম্বনের কথাটি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। পবিত্র কুরআনে সে উপদেশটি নিম্নোক্ত ভাষায় বর্ণিত আছে:
وَلَا تُصَعِرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ বৎস! অহংকারবশে তুমি কখনো মানুষকে অবজ্ঞা করো না। আর পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে চলাফেরা করো না। কারণ আল্লাহ্ কোন উদ্ধত ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না। (সূরা লুকমান: ১৮)
আলিমগণ লিখেছেন, আল্লাহ্ পাকের নিকট যেভাবে অহংকার করা পছন্দনীয় নয় তেমনি অহংকারীদের চাল-চলন, রীতি-নীতি ইত্যাদি অনুসরণ করাও পছন্দনীয় নয়। অর্থাৎ কোন ব্যক্তি এমন হতে পারে যে, সে আন্তরিকভাবে অহংকারী নয় তবে অহংকারী লোকেরা যেভাবে চলে সে ব্যক্তি ঐভাবে চলাফেরা করে থাকে। আল্লাহ্ পাক তার এই চলাফেরাকে পছন্দ করেন না। ইসলামী শরীয়তের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো যে, এখানে আল্লাহ্ তা'আলার তরফ থেকে মানবীয় রীতি-নীতি ও শিষ্টাচারিতার বহু ক্ষুদ্র জিনিসকে বর্ণনা করে দেওয়া হয়েছে।
একখানা হাদীসে হযরত ইয়ায ইবন হাম্মাদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন যে, মহান আল্লাহ্ আমার নিকট এ মর্মে ওহী প্রেরণ করেছেন যে, তোমরা নম্রতা ও বিনয় অবলম্বন কর। কেউ কারুর উপর কোন অবিচার কিংবা বাড়াবাড়ি করো না। অনুরূপ কেউ কারুর উপর অহংকার কিংবা গর্ব প্রকাশ করো না (আবূ দাউদ, খ. ২, পৃষ্ঠা ৬৭১)।
অপর একখানা হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন যে, গরীবকে দান-খয়রাত করার কারণে সম্পদ হ্রাস পায় না। নম্রতা, বিনয় ও ক্ষমাপরায়ণতা ব্যক্তির সম্মান বৃদ্ধি করে। যে ব্যক্তি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে বিনয় অবলম্বন করে আল্লাহ্ পাক তার মান-সম্মান অনেক গুণে বৃদ্ধি করেন। (তিরমিযী শরীফ, খ. ২, পৃষ্ঠা ২৪)
বিনয় ও নম্রতা অবলম্বনের ফলে মানব চরিত্রে অন্যান্য আরো বহু সদ্গুণের সৃষ্টি হয়ে থাকে। বিভিন্ন হাদীসে প্রিয় নবী এগুলিকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। যেমন : এক. বিনয় অবলম্বন নিজেই একটি ইবাদত। পূর্ববর্তী হাদীস থেকে স্পষ্ট যে, আল্লাহ্ পাক মানুষকে বিনয় অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। কাজেই বিনয় অবলম্বনের ফলে ব্যক্তির জীবনে আল্লাহ্ পাকের একটি হুকুম প্রতিফলিত হয়। দুই. বিনয়ী ব্যক্তি একদিকে যেমন মহান আল্লাহ্র কাছে প্রিয় তেমনি মানুষের দৃষ্টিতেও সে পছন্দনীয় ও প্রিয় ব্যক্তি হিসাবে বিবেচিত। লোকজন মন থেকে তাকে ভালবাসে; তার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে ও মেলামেশা করতে আনন্দ পান। বিনয়ী ব্যক্তির পক্ষে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করা সহজ হয়। কারণ লোকজন এ চরিত্রের মানুষকে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কাজকর্মে নিজেদের উপর অগ্রাধিকার ও নেতৃত্ব প্রদান করতে ভালবাসে। বলা বাহুল্য, নম্রতা ও বিনয় এভাবেই মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতের উচ্চমর্যাদা দান করে। তিন. বিনয়ী ও অমায়িক ব্যক্তির দুশমনের সংখ্যা খুবই কম হয়ে থাকে। কারণ মানুষ সাধারণত তার বিনয়ী চরিত্র অবলোকন করে তার শত্রুতা কিংবা বিরোধিতা করা এবং তাকে কোন প্রকার কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকে। চার. বিনয় অবলম্বনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুফল হলো যে, বিনয়ের ফলে ব্যক্তি অতি সহজে চারিত্রিক গুণাবলির দ্বারা নিজেকে গুণান্বিত করতে সক্ষম হয়। তাই চরিত্রবান লোকদেরকে সাধারণভাবে বিনয়ী দেখা যায়। পক্ষান্তরে দাম্ভিক ও অহংকারী মানুষ আল্লাহ্ পাকের দরবারে যেমন অপছন্দনীয় তেমনি মানুষের কাছেও চরম ঘৃণিত। সে দুনিয়াবাসীর অন্তরে কখনো স্থান পায় না। তদ্রূপ আখিরাতেও তার জন্য রয়েছে চরম লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা। লোকজন তার ধনৈশ্বর্যের ভয়ে কিংবা ক্ষমতার কারণে হয়ত তার বিরুদ্ধে মুখে কিছু বলে না তবে মনে মনে তাকে অপছন্দ করে থাকে। এ সত্যতা যাচাইয়ের জন্য খুব দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা এর জ্বলন্ত সাক্ষী।
١١٥. عَنْ أَبِي الْمَلِيْحِ حَدَّثَنِي نَصَرُ بْنُ وَهَبِ الخُزَاعِيُّ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ رَكِبَ حِمَاراً مَرْسُوْنَا بِغَيْرِ سَرْجٍ مُوَكَّفٌ عَلَيْهِ قَطِيفَةٌ جَزْرِيَّةٍ ثُمَّ دَعَا مُعَاذَ بْنَ جَبَلٍ فَأَرْدَفَهُ - فَأَرْدَفَهُ -
১১৫. হযরত নাসর ইবন ওয়াহ্হাব খোযাঈ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, একদা রাসূলুল্লাহ্ এমন একটি গাধার পিঠে আরোহণ করেন যেখানে বসার কোন গদি ছিল না। তবে রশির লাগাম পরা ছিল এবং এর উপর একখণ্ড পুরাতন চামড়া রাখা ছিল। তারপর তিনি হযরত মুআয ইবন জাবাল (রা)-কে ডেকে নেন এবং নিজের পেছনে আরোহণ করান।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস থেকেও প্রিয় -এর পরম বিনয়-নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রিয় নবী নিজের শক্তি ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনের মুহূর্তে একটি সাধারণ গাধার পিঠে আরোহণ করতে দ্বিধা করেননি। অথচ তিনি যদি সামান্য ইঙ্গিতটুকুও করতেন তা হলে জান কুরবান হযরত উসমান ইব্ন আফফান (রা)-এর মত দানবীর সাহাবীগণ তাঁকে উন্নত থেকে উন্নততর সাওয়ারীর ব্যবস্থা করে দিতে বিন্দুমাত্রও বিলম্ব করতেন না।
একখানা হাদীসে হযরত আবূ সালামা (রা) বলেন, আমি প্রিয় নবী -এর যবান মুবারক থেকে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন: যে ব্যক্তির মনে শস্যদানা পরিমাণ অহংকার থাকবে সে বেহেস্তে প্রবেশ করবে না। (তারগীব ওয়া তারহীব, খ. ৪, পৃষ্ঠা ৪৫)
١١٦. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَعُودُ الْمَرِيضِ وَيَتَّبِعُ الْجَنَازَةَ وَيُجِيبُ دَعْوَةَ الْمَعْلُوكَ وَيَرْكَبُ الْحِمَارَ وَكَانَ يَوْمَ خَيْبَرَ وَيَوْمَ قُرَيْظَةَ وَالنَّصْيْرِ عَلَى حِمَارٍ مَخْطُوْمٍ بِحَبْلٍ مِنْ لِيْفَ تَحْتَهُ إِكَافُ مِنْ لِيْفَ -
১১৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্-এর নিয়ম ছিল যে, তিনি অসুস্থদের শুশ্রূষা করতেন, জানাযার সঙ্গে হেঁটে যেতেন, গোলাম ও শ্রমিকদের আমন্ত্রণ কবুল করতেন এবং গাধার পিঠে আরোহণ করতেন। (রাবী বলেন) প্রিয় নবী খাইবার যুদ্ধের দিন একটি গাধার পিঠে আরোহী ছিলেন। এ গাধাটির লাগাম ছিল খেজুরের ছাল দিয়ে পাকানো একটি রশি এবং গাধার গদিটি ছিল খেজুরের কতগুলি ছাল ও ডালের দ্বারা বানানো। (ইবন মাজা, পৃষ্ঠা-৫৪৫)
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসে প্রিয় নবী-এর এমন চারটি উন্নত অনুপম সদ্গুণের উল্লেখ করা হয়েছে যেগুলি সাধারণত কোন নীতিপরায়ণ চরিত্র মাধুরী সম্পন্ন বিনয়ী ব্যক্তির পক্ষেই অবলম্বন করা সম্ভব হয়ে থাকে।
১. অসুস্থের সেবা শুশ্রূষা: হাদীসে পাওয়া যায় যে, প্রিয় নবী আশরাফ-আত্মাফ, ধনী-নির্ধন, আযাদ-গোলাম নির্বিশেষে সকলের খোঁজ-খবর নিতেন। কারোর অসুস্থতার সংবাদ পেলে নিঃসংকোচে তার শুশ্রূষার জন্য যেতেন। এমন কি একবার তাঁর জনৈক ইয়াহুদী খাদেম অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তিনি সেই ইয়াহুদীর শুশ্রূষা করেন। প্রিয় নবী -এর চাচা আবু তালিব ইসলাম গ্রহণ করেননি। অথচ তার অসুস্থতাকালে তিনি শুশ্রূষার জন্য গিয়েছিলেন।
২. লাশের সঙ্গে যাওয়া: প্রিয় নবী মৃতের জানাযায় শরীক হতেন। নিজেই জানাযার সালাত পড়াতেন। জানাযার পর লাশের সঙ্গে গোরস্তান পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে দাফন কাজে শরীক হতেন। একদা মসজিদে নবুবীর ঝাড়ু দানকারিণী এক মহিলা রাত্রিকালে ইন্তিকাল করেন। সাহাবীগণ রাতে প্রিয় নবী-এর কষ্ট হতে পারে এ আশংকায় তাঁকে সংবাদ দেননি। নিজেরাই মহিলার কাফন-দাফনের কাজ সম্পন্ন করে নেন। পরে এ সংবাদ প্রিয় নবী-এর নিকট পৌঁছলে তিনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং মহিলার কবরে গিয়ে জানাযা পড়ে আসেন। অনুরূপভাবে মদীনার অধিবাসী আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই ইব্ন সাল্ল ছিলেন মুনাফিকদের নেতা এবং মুসলমানদের চরম শত্রু ও ইসলাম বিদ্বেষী। এ লোকটি মারা গেলে তখনও প্রিয় নবী তার জানাযার নামায পড়িয়েছিলেন।
৩. দরিদ্রদের আমন্ত্রণ কবুল করা: দরিদ্রদের আমন্ত্রণ কবুল করা এবং তাদের কথা শোনা মানুষের অন্যতম সদ্গুণ। প্রিয় নবী প্রতিটি মানুষের বক্তব্য শুনতে চেষ্টা করতেন। একটি গোলামও যদি তাঁকে নিজ প্রয়োজন সমাধা করে দেয়ার জন্য নিয়ে যেতে চাইত তখন তিনি নিঃসংকোচে গোলামের সঙ্গে চলে যেতেন। এমন কি কোন ক্রীতদাসী পর্যন্ত তুচ্ছ কোন কাজের জন্য যখন তাঁর কাছে সাহায্য চাইত তখনও তিনি তা সমাধা করে দিতে নিজের মর্যাদার জন্য হানিকর বলে মনে করতেন না।
৪. গাধার পিঠে আরোহণ করা: প্রিয় নবী-এর জন্য উট, ঘোড়া ইত্যাদি জাতীয় উন্নত বাহন গ্রহণের ব্যবস্থা ছিল। অথচ তিনি বিনয় প্রকাশার্থে গাধা ও খচ্চরের পিঠেও সাওয়ার হতেন। বাহন হিসাবে গাধা ব্যবহার করাকে নিজের জন্য অপমানজনক মনে করতেন না। এভাবে প্রয়োজনের মুহূর্তে নিজের পেছনে অন্যকে বসিয়ে নিতেন। খায়বার যুদ্ধ ও বনু কুরায়যা ও নাযীর যুদ্ধে তিনি যখন একজন সেনাপতি ও মুসলমানদের প্রধান হিসাবে রণক্ষেত্রের পার্শ্ব অতিক্রম করছিলেন তখন তাঁর বাহনটি ছিল সামান্য একটি গাধা। অথচ এমন অবস্থায় অতিশয় বিনয়ী প্রকৃতির নেতাগণও প্রতিপক্ষকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে নিজের শৌর্যবীর্য ও জাঁকজমকের প্রকাশ আবশ্যক বলে মনে করে থাকেন। কিন্তু প্রিয় নবী-এর চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী। তিনি স্বভাবজাত নম্রতা ও বিনয় ত্যাগ করে কৃত্রিমতা অবলম্বন করাকে পছন্দ করেননি। এটিই ছিল রাহমাতুল লিল্ আলামীন -এর যথাযোগ্য উত্তম অনুপম আদর্শ।
۱۱۷. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا أَنَّهَا سُئِلَتْ مَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَصْنَعُ فِي بَيْتِهِ ؟ قَالَتْ كَمَا يَصْنَعُ أَحَدُكُمْ فِي بَيْتِهِ - يَخْصِفُ النَّعْلَ وَيُرَقِعُ الثوب -
১১৭. (উম্মুল মু'মিনীন) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত যে, একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, রাসূলুল্লাহ্ ঘরে প্রবেশ করে কি কি কাজ করতেন? উত্তরে হযরত আয়েশা (রা) বলেন, তিনি সেই সব কাজই করতেন যেগুলো সাধারণত তোমরা নিজেদের ঘরে করে থাক। তিনি নিজ হাতে জুতা সেলাই করতেন এবং কাপড়ে তালি লাগাতেন।
۱۱۸. عَنْ أَبِي بُرْدَةَ قَالَ قُلْتُ لِعَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا مَا كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَصْنَعُ فِي بَيْتِهِ ؟ قَالَتْ كَانَ فِي مِهْنَةِ أَهْلِهِ -
১১৮. হযরত আবূ বুরদা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়েশা সিদ্দীকা (রা) -কে জিজ্ঞেস করলাম যে, নবী বাড়ির ভেতরে কি কাজ করতেন? তিনি বললেন, নবী ঘরের কাজকর্মে অন্যদের সাহায্য করতেন।
۱۱۹. عَنْ مُجَاهِدٍ عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَ قُلْتُ مَا كَانَ يَصْنَعُ النَّبِيُّ فِي بَيْتِهِ قَالَتْ يَخْصِفُ النَّعْلَ وَيُرْقِعُ التَّوْبَ .
১১৯. মুজাহিদ (র) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম যে, প্রিয় নবী ঘরের ভিতর থাকাকালে কি কি কাজ করতেন? তিনি বললেন, নবী নিজ হাতে নিজের চপ্পল সেলাই করতেন এবং নিজের পোশাকে তালি লাগাতেন।
ফায়দা : উপরোক্ত তিনটি হাদীসের মর্ম প্রায় অভিন্ন। এখানে গৃহের অভ্যন্তরে থাকাকালে প্রিয় নবী যে সব কাজকর্ম করতেন বলে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) বর্ণনা করেছেন। তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ঘরের ভিতরে তিনি অতিশয় সাদাসিধা ও সরল জীবন যাপন করতেন। একজন সাধারণ মানুষের মতই ছিল তাঁর পারিবারিক জীবন। রাজকীয় রীতি-নীতি কিংবা কোন জাঁকজমক তাঁর পরিবারে ছিল না। এখানে গভীরভাবে লক্ষণীয় যে, প্রিয় নবী নবুওয়াতের মহান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হওয়া এবং বিশ্ব নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পদে সমাসীন হওয়া সত্ত্বেও তিনি ঘরে প্রবেশ করে নিজের কাজ নিজ হাতেই সম্পাদন করতেন। পারিবারিক ছোট ছোট কাজগুলি সম্পাদন করতে বিন্দুমাত্র সংকোচ বোধ করতেন না। অনুরূপভাবে তাঁর গৃহে কাজ করার মত লোকের অভাব ছিল এমনও নয়। হযরত আনাস ইবন মালিক ও হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রা) উভয়ে প্রিয় নবী -এর একান্ত খাদেম ছিলেন। প্রিয় নবী-এর কাজকর্ম আঞ্জাম দেওয়ার কাজে তাঁরা এতটুকু ঘনিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলেন যে, লোকেরা তাঁদেরকে প্রিয় নবী-এর পরিবারের সদস্য বলে মনে করতো। অনুরূপ উম্মুল মু'মিনীনদের জন্যও সেবিকা ছিল। এতদসত্ত্বেও প্রিয় নবী নিজ ঘরে প্রবেশের পর নিজের কাজকর্ম নিজেই সম্পাদন করতেন।
নম্রতা ও বিনয় আল্লাহ্ পাকের কাছেও প্রিয় এবং রাসূলুল্লাহ্-এর কাছেও ছিল প্রিয়। একখানা হাদীসে হযরত আবূ সাঈদ খুদ্রী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাকের সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে এক ধাপ বিনয় অবলম্বন করবে আল্লাহ্ পাক বেহেস্তে তার জন্য এক ধাপ মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। আর যে ব্যক্তি এক ধাপ অহংকার অবলম্বন করবে আল্লাহ্ পাক তার জন্য এক ধাপ মর্যাদা অবনতি করে দিবেন। এভাবে অহংকার অবলম্বনের কারণে আল্লাহ্ পাক ব্যক্তির মর্যাদা ক্রমে ক্রমে অবনতি করে অবশেষে দোযখের সর্বনিম্নে নিক্ষেপ করবেন। (ইবন মাজা, পৃষ্ঠা ৫৪৪, মিসর)।
۱۲۰ عَنْ عُرْوَةَ عَنْ أَسَامَةَ بْنِ زَيْدِ أَخْبَرَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ رَكِبَ يَوْمًا حِماراً بِإِكَافَ عَلَيْهِ قَطِيفَةٌ فَرَدِفَهُ أَسَامَةَ ابْنَ زَيْدٍ يَعُودُ سَعْدَ بْنَ عُبَادَةٌ فِي بَنِي الْحَارِثِ ابْنِ خَزْرَجٍ وَذَلِكَ قَبْلَ وَقْعَةِ بَدْرٍ -
১২০. হযরত উরওয়া ইব্ন যুবায়র (রা) হযরত উসামা ইবন যায়িদ (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ একটি গাধার উপর আরোহণ করেন। গাধাটির পিঠে গদি হিসেবে একটি চাদর ছিল। তারপর তিনি নিজের পেছনে হযরত উসামা ইবন যায়িদ (রা)-কে বসালেন এবং হযরত সাদ ইবন উবাদা (রা)-এর শুশ্রূষার জন্য বনু হারিস ইব্ন খাযরাজ গোত্রের আবাসস্থলে গমন করেন। এ ঘটনাটি ছিল বদর যুদ্ধের পূর্বেকার।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস উল্লেখ করার পেছনে গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হলো প্রিয় নবী -এর নম্রতা ও বিনয় চরিত্রের বর্ণনা করা। অবশ্য এতদসংক্রান্ত একখানা হাদীস ইতিপূর্বে ১১৫ নং-এ আলোচিত হয়েছে। এ হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, প্রিয় নবী নিরহংকার চরিত্রের কারণে বাহন হিসেবে সামান্য গাধাকেও ব্যবহার করেছেন। অহংকারী ও দাম্ভিক লোকদের ন্যায় বাহন হিসাবে তুচ্ছ গাধার ব্যবহারকে তিনি নিজের মর্যাদা হানিকর বলে মনে করেননি। এভাবে নিজের সঙ্গে অন্য একজনকেও বসিয়ে নিতে তাঁর কোনই সংকোচবোধ হয়নি। অথচ সাধারণভাবে কোন রাষ্ট্রপতি কিংবা কোন সম্রাট এহেন আচরণ করতে লজ্জাবোধ করবেন। ইতিহাস গ্রন্থে পাওয়া যায় যে, সফরে ও মদীনা শরীফে অবস্থান কালে বিভিন্ন স্থানে প্রিয় নবী চল্লিশ জনেরও অধিক সাহাবীকে নিজের সঙ্গে সাওয়ারীতে আরোহণের মর্যাদা দান করেন। কখনো কখনো তিনি নিজে পেছনে বসে সঙ্গীকে আগে বসতেও দিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ! এটি ছিল মহানবী-এর চরিত্র মাধুরীর নমুনা। প্রিয় নবী-এর আখলাক ও শামাইল সম্পর্কে যাঁরা অধ্যয়ন করেন তাঁদের কাছে তাঁর বিনয় ও নম্রতার বহু ঘটনা সুস্পষ্ট। তিনি সর্বদা মোটা ও স্থূল পোশাক পরিধান করতেন। সাধারণ মানের আহার গ্রহণ করতেন। তালি লাগানো জুতা ব্যবহার করতেন, নিজেই ঘরের বকরীর দুধ দোহন করতেন, নিজের জুতা নিজেই সেলাই করতেন, নিজের কাপড়-চোপড় নিজেই ধুয়ে নিতেন, গাধার পিঠে আরোহণ করে চলতে এবং নিজের সঙ্গে অন্যকে বসিয়ে নিতে কখনো লজ্জাবোধ করতেন না।
١٦١. عَنْ أَنَسٍ قَالَ لَمْ يَكُنْ شَخْصُ أَحَبُّ إِلَيْهِمْ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَكَانُوا إِذَا رَأَوْهُ لَمْ يَقُومُوا إِلَيْهِ لِمَا يَعْرِفُونَ مِنْ كَرَاعِيَّتِهِ لَهُ -
১২১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাহাবীদের মনে রাসূলুল্লাহ্ -এর চেয়ে অধিক ভালবাসা অন্য কারোর জন্য ছিল না। এতসত্ত্বেও তাঁরা রাসূলুল্লাহ্ -কে কখনো আসতে দেখে তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়াতেন না। কারণ তারা জানতেন যে, তিনি এভাবে দাঁড়ানোকে মোটেও পছন্দ করেন না।
ফায়দা : এ হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, প্রিয় নবী তাঁর সাহাবীদেরকে তাঁর প্রতি দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করতে নিষেধ করতেন। কেননা এটি অহংকারী লোকদের রীতি। অহংকারী কর্তা ব্যক্তিরা মানুষের কাছ থেকে এ ধরনের লৌকিক সম্মান পেতে চায়। আর তাদের প্রজা ও দরবারের সদস্যরাও এ পদ্ধতিতে সম্মান জানায়। কর্তা ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য হলো নিজেদের বড়ত্ব ও আধিপত্যের প্রকাশ ঘটানো এবং মানুষের কাছ থেকে জবরদস্তিমূলক সম্মান আদায় করা। আর এ কারণেই তাদের সম্মানার্থে যারা দাঁড়াবে না, তাদেরকে অপরাধী বলে গণ্য করে। অথচ কোন সন্দেহ নেই এটি নিজের অহংকার প্রকাশেরই একটি বিকল্প মাত্র, যা মিছামিছি প্রদর্শনীর অবতারণা বৈ কিছুই নয়। এ অভ্যাস খুবই মন্দ একটি অভ্যাস। এটি ব্যক্তিকে আল্লাহ্ পাকের কঠিন ক্রোধ ও গযবের মধ্যে নিপতিত করে। এ কারণেই প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা এ ধরনের প্রদর্শনী করা থেকে সাহাবীদেরকে নিষেধ করতেন।
একখানা হাদীসে হযরত আবূ উমামা (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ একটি লাঠির উপর ভর করে আমাদের দিকে আসছিলেন। আমরা তাঁর আগমন উপলক্ষে সবাই দাঁড়িয়ে গেলাম। তখন প্রিয় নবী ইরশাদ করেন : তোমরা অনারবদের ন্যায় আমার সম্মান প্রদর্শনের জন্য কখনো দাঁড়াবে না। অনারব লোকেরা একজন অন্যজনের সম্মানে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। (আবু দাউদ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা-১২৯)
প্রিয় নবী এ নির্দেশটি দিয়েছিলেন তাঁর একান্ত বিনয়ী মনোভাবের কারণে। যেন হঠাৎ কেউ দেখলে তাঁর প্রতি অহংকার বা দাম্ভিকতার সন্দেহটুকুও করতে না পারে। নতুবা তিনি খুব ভালভাবেই জানতেন যে, সাহাবীগণ তাঁকে যে সম্মান প্রদর্শন করেন তাতে বিন্দু পরিমাণ খাদ নেই, সম্পূর্ণ অকৃত্রিম। মনের গভীর থেকেই তাঁরা তাঁকে সম্মান করে থাকেন এবং অকৃত্রিমভাবে তাঁকে ভালবাসেন। এ কারণে আলিমগণ লিখেছেন, কোন বিজ্ঞ আলিম কিংবা বুযুর্গ কিংবা ন্যায়পরায়ণ কোন শাসকের সম্মান প্রদর্শনার্থে এভাবে দাঁড়ানোর মধ্যে কোন আপত্তি নেই। তবে কেউ যদি নিজের প্রভুত্ব, আধিপত্য ও অহংকার দেখানোর জন্য এভাবে সম্মানার্থে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেয় তাহলে দাঁড়ানো মাকরূহ।
হযরত আবূ মিজলায (রা) থেকে বর্ণিত যে, হযরত মুআবিয়া (রা) একবার হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র ও ইবন আমির (রা)-এর কাছে গেলেন। হযরত মুআবিয়া (রা)-কে দেখে হযরত ইব্ন আমির (রা) তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে গেলেন। এদিকে হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র (রা) স্বস্থানে উপবিষ্ট থাকেন। তখন হযরত মুআবিয়া (রা) হযরত ইব্ন আমির (রা)-কে বললেন, স্বস্থানে বসে থাকুন। কেননা আমি প্রিয় নবী -কে বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তি অন্যরা তার সম্মানার্থে দাঁড়ানোকে পছন্দ করে সে ব্যক্তির ঠিকানা হবে জাহান্নাম। (আবু দাউদ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২১৯)
উপরোক্ত হাদীস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বর্ণিত নিষেধাজ্ঞা সে সময়ের জন্য, যখন আগমনকারীর দাম্ভিকতা ও অহংকার এ কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করে। তাই দেখা যায় একটি হাদীসে এসেছে যে, আনসারদের অন্যতম বড় আলিম ও সরদার হযরত সাদ ইবন উবাদা (রা) যখন আগমন করছিলেন তখন প্রিয় নবী আনসারদের আদেশ দিয়ে বলেন, তোমাদের সর্দার আগমন করছেন। তোমরা দাঁড়িয়ে যাও। অবশ্য এখানে নবী-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল হযরত সাদ ইবন উবাদা (রা)-এর সম্মানকে বড় করে দেখানো। কেননা তাকে তখন বনু কুরায়যার বন্দীদের ব্যাপারে সালিস নিযুক্ত করা হয়েছিল।
অনুরূপভাবে দূরদেশ থেকে আগত মুসাফিরের অভ্যর্থনা কিংবা অন্তরঙ্গ কোন বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় দাঁড়ানোর মধ্যে কোন আপত্তি নেই। শর্ত হলো উভয় পক্ষের কোন দিকে প্রাণহীন প্রদর্শনী কিংবা অহংকার থাকবে না। যেন আগমনকারী মনে মনে এই সম্মান কামনা না করেন আর অভ্যর্থনাকারী কেবল লৌকিকতার জন্যই না দাঁড়ান।
١٢٢. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يُجِيبُ الْعَبْدَ وَيَعُودُ الْمَرِيضَ وَيَرْكَبُ الْحِمَارَ
১২২. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাধারণ একজন গোলামের দাওয়াত কবুল করতেন, অসুস্থদের শুশ্রূষা করতেন এবং গাধার পিঠেও আরোহণ করতেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস থেকেও প্রিয় নবী -এর পরম বিনয় ও নম্রতার পরিচয় ফুটে উঠে। এভাবে আরো অন্যান্য হাদীস থেকে জানা যায় যে, প্রিয়নবী তাঁর সাহাবীদের মজলিসে নিজের জন্য কোন পার্থক্য বজায় না রেখেই বসতেন। তাঁর বসার জন্য পৃথক কোন আসন থাকত না। আর তিনি বসার মধ্যেও নিজেকে ব্যতিক্রম বানিয়ে বসতেন না। তিনি সীমাহীন সরলতা ও অনাড়म्बरতাসহ মজলিসের যেখানেই সুযোগ পেতেন সেখানেই বসতেন। বসে যেতেন। এ কারণে নতুন আগন্তুক লোকদের জন্য জিজ্ঞেস করে নিতে হতো যে, আপনাদের মধ্যে নবী কোন্ জন? কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখন নবী -এর দরবারে দূর দেশের বিভিন্ন প্রতিনিধি দলের আগমন শুরু হলো এবং নবাগতদের নানা প্রশ্নোত্তরের কারণে মজলিসের কাজকর্ম ও আলোচনায় বিঘ্ন ঘটতে লাগল, তখন সাহাবীদের বহু পীড়াপীড়ির দরুন প্রিয় নবী -এর জন্য একটি পৃথক জায়গা বানানোর আবেদন তিনি মঞ্জুর করেন। ফলে মজলিসের মধ্যে নবী কোন্ জন তা নির্ণয় করতে নবাগতদের জন্য সহজ হয়। সাহাবীগণ প্রিয় নবী -এর বসার জায়গাটির মধ্যে মাটি ফেলে সামান্য উঁচু করে খাটের মত বানিয়ে দেন। তারপরেও প্রিয় নবী কখনো সেই উঁচু জায়গায় বসতেন আবার কখনো নিচে বসে উঁচু জায়গাটির উপর হেলান দিয়ে থাকতেন। এতখানি ছিল নবীদের সর্দার শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা -এর নম্রতা ও বিনয়।
একটি হাদীসে পাওয়া যায় যে, প্রিয় নবী -কে কখনো কখনো যবের রুটি কিংবা গন্ধ হয়ে গেছে এমন চর্বি আহারের জন্যও যদি দাওয়াত দেয়া হতো তখনও তিনি কোনরূপ অসন্তুষ্টি প্রকাশ না করে সে দাওয়াত কবুল করতেন। তিনি এমনটা চিন্তা করতেন না যে, এত নিম্নমানের আহারের আমন্ত্রণে আমি কেন যাব?
অনুরূপভাবে তিনি নিজের সাথী-সঙ্গীদের শুশ্রূষার জন্যও যেতেন। অসুস্থ লোকটি আমীর কিংবা গরীব, আযাদ কিংবা গোলাম, 'ছোট কিংবা বড় – সেই বিবেচনা তাঁর কাছে ছিল না। তিনি অসুস্থের খুব কাছে গিয়ে বসতেন এবং তাকে সান্ত্বনা দিতেন। তার সুস্থতার জন্য দু'আ করতেন। হাদীসগ্রন্থে এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা পাওয়া যায়। ইতিপূর্বেও আলোচিত হয়েছে যে, তিনি সামান্য মানের বাহন গাধার পিঠে আরোহণ করতেও সংকোচ বোধ করতেন না। বলা বাহুল্য, প্রিয় নবী সমকালের সম্রাট ও দু'জাহানের রাসূল ছিলেন। তাঁর নগণ্য একজন গোলাম ব্যক্তিও উচ্চমানের বাহনে আরোহণ করে থাকে। অথচ তিনি নিজে গাধার পিঠে নির্দ্বিধায় আরোহণ করেছেন। এ সব কিছু মূলত তিনি বিনয় ও নম্রতা প্রকাশের জন্যই করেছিলেন। যেন উম্মতের লোকেরা তাঁর এ আদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।
۱۲۳. عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَجْلِسُ عَلَى الأَرْضِ وَيَأْكُلُ عَلَى الأَرْضِ وَيَعْتَقِلُ الشَّاةَ، وَيُجِيبُ دَعْوَةَ الْمَمْلُوكِ، قَالَ أَبُو إِسْمَاعِيلَ فَحَدَّثْتُ بِهِ الْأَعْمَشِ عَنْ مُسْلِمٍ فَقَالَ أَمَا إِنَّهُ كَانَ يَطْلُبَ الْعِلْمَ -
১২৩. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ নিঃসংকোচে মাটির উপর বসতেন, মাটিতে বসে আহার করতেন, নিজ হাতে খুঁটির সাথে বক্রী বাঁধতেন ও গোলামের দাওয়াত কবুল করতেন। বর্ণনাকারী আবু ইসমাঈল (র) বলেন, আমি এ হাদীসখানা মুসলিম (র)-এর বরাত দিয়ে হযরত আমাশ (র)-কে শোনালাম। তখন আমাশ (র) বললেন, তবে মনে রেখ, প্রিয় নবী -এর উদ্দেশ্য ছিল নিজ সাহাবীদের অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়া।
ফায়দা : আলোচ্য হাদীসের মধ্যে প্রিয় নবী -এর যে সব সুন্দর নীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে এগুলি তাঁর একান্ত বিনয় ও নম্রতার প্রমাণ বহন করে। কেননা এসব কাজ তিনি প্রয়োজনীয় উপকরণ কিংবা কাজের লোকজনের অভাবজনিত কারণে করেননি। তাঁর কাছে উপকরণ বা লোকজনের অভাব ছিল না। তবে তিনি নিজের নম্রতা ও বিনয় নীতি প্রকাশার্থে এসব কাজ নিজ হাতে ও নিঃসংকোচে করতেন।
বুখারী শরীফে হযরত আসওয়াদ ইব্ন ইয়াযীদ (র) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ নিজ গৃহে কি কি কাজ করে থাকতেন? তখন হযরত আয়েশা (রা) বলেন, তিনি ঘরের অন্যদের কাজকর্ম্মে স্বহস্তে সহযোগিতা করতেন। কিন্তু যখন নামাযের সময় হতো তখন কোন প্রকার বিলম্ব না করে মসজিদে চলে যেতেন। (বুখারী শরীফ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা : ৮৯২)
আলোচ্য হাদীস থেকে এ কথা সুস্পষ্ট যে, প্রিয় নবী অন্যান্য সাধারণ মানুষের ন্যায় পারিবারিক বিভিন্ন কাজে শরীক থাকতেন। উদাহরণস্বরূপ যেমন নিজে বকরীর দুধ দোহন করতেন, নিজের জুতা নিজেই সেলাই করতেন ইত্যাদি। এ বিষয়ে ইতিপূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
١٢٤ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكِ أَنَّهُ مَرَّ بِصِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ ثُمَّ حَدَّثَنَا أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ مَرَّ عَلَى صِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ وَهُوَ مُغِدٍ-
১২৪. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, একদা তিনি বালকদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি তাদেরকে সালাম দেন। তারপর আমাদেরকে হাদীস শুনিয়ে বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ বালকদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি দ্রুত পথচলা অবস্থায় তাদেরকে সালাম দেন।
١٢٥ عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ مَرَّ بِصِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ -
১২৫. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, একদা রাসূলুল্লাহ বাচ্চাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন সে মুহূর্তে তিনি তাদেরকে সালাম দেন।
١٢٦. عَنْ أَنَسٍ قَالَ بَعَثَنِي رَسُولُ اللهِ ﷺ فِي حَاجَةٍ فَمَرَرْتُ بِصِبْيَانِ فَقُمْتُ مَعَهُمْ فَأَبْطَاتُ عَلَيْهِ فَخَرَجَ وَرَانِي مَعَ الصِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ -
১২৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাকে একটি কাজের জন্য পাঠিয়েছিলেন। পথিমধ্যে বাচ্চাদের সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। আমি তাদের সেখানে দাঁড়ালাম। তাতে অনেক দেরি হয়ে গেল। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ্ আমার তালাশে বের হয়ে আমাকে বাচ্চাদের সঙ্গে দেখলেন। তখন তিনি তাদেরকে সালাম দিয়েছিলেন।
۱۲۷. عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ مَرَّ عَلَى صِبْيَانِ فَسَلَّمَ عَلَيْهِم -
১২৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী বাচ্চাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় তিনি তাদেরকে সালাম দেন।
۱۲۸ عَنْ أَنَسٍ قَالَ أَتَى عَلَيْنَا رَسُولُ اللهِ ﷺ وَأَنَا فِي غِلْمَةٍ نَلْعَبُ فَسَلَّمَ عَلَيْنَا ثُمَّ أَرْسَلَنِي فِي حَاجَةٍ -
১২৮. আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি তখন বাচ্চাদের সঙ্গে মিলে খেলাধুলা করছিলাম। তিনি আমাদেরকে সালাম দেন। তারপর আমাকে একটি কাজের জন্য পাঠিয়ে দেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীসগুলোর বক্তব্য অভিন্ন। এখানে প্রিয় নবী-এর পরম বিনয় ও নম্র আচরণের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এ সব হাদীস থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, প্রিয় নবী বাচ্চাদের শিক্ষা দানের জন্য নিজেই সালাম দিতেন। আর এভাবে তাদেরকে সালাম দেওয়া তাঁর দৃষ্টিতে কোন লজ্জা বা সম্মানহানিকর বলে মনে হতো না। বলা বাহুল্য, বাচ্চাদেরকে সালাম দেওয়ার মধ্যে বহু উপকারিতা বিদ্যমান। ১. বাচ্চাদেরকে সালাম দেওয়ার দ্বারা তাদের মধ্যে একজন অন্যজনকে সালাম দানের অভ্যাস গড়ে ওঠে। ২. তাতে সমাজে ইসলামী তাহযীব ও তামাদ্দুনের ভিত কায়েম হয়, ৩. নিজে বাচ্চাদেরকে সালাম করার দ্বারা মন থেকে গর্ব ও অহংকার ইত্যাদি দূরীভূত হয়, ৪. 'আস্সালামু আলাইকুম' বাক্যটি একটি দু'আ বিশেষ। এ দু'আটির ব্যাপক প্রচলনের কারণে শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ গড়ে ওঠে, ৫. এই সালাম ইসলামের বিশেষ একটি প্রতীক। কাজেই সর্বশ্রেণীর মাঝে সালামের ব্যাপক প্রচলন থাকলে সেটি একটি মুসলিম সমাজ বলে বোঝা যায়।
একখানা হাদীসে হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আম্র ইব্ন আস (রা) বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি প্রিয় নবীকে জিজ্ঞেস করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! ইসলামী আমলগুলোর মধ্যে কোন্ আমলটি সর্বাপেক্ষা উত্তম? প্রিয় নবী উত্তর দিলেন যে, লোকজনকে আহার করানো এবং পরিচিত ও অপরিচিত সকলকে সালাম প্রদান করা। (তারগীব ওয়া তারহীব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৩)
অপর একখানা হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন: (হে মানুষ সকল!) তোমরা যতক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণভাবে ঈমান আনয়ন করবে না ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে না। আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানদার হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি গড়ে না নিবে। আচ্ছা! আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি কাজের পরামর্শ দিব যে কাজটি করার কারণে তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও ভালবাসা গড়ে উঠবে? মনে রেখ! সে কাজটি হলো সালামের বহুল প্রচলন। তোমরা যখনই একজন অন্যজনের সাথে সাক্ষাৎ করবে তখনই তাকে সালাম করবে। আর সালাম দেওয়াকে নিজেদের বৈশিষ্ট্য বানিয়ে নাও। (তারগীব ওয়া তারহীব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৩)
একটি হাদীসে হযরত বারাআ ইব্ন আযিব (রা) রাসূলুল্লাহ্ থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি ইরশাদ করেছেন: তোমরা সালামের ব্যাপক প্রচলন করে নাও। তা হলে নিজেরা শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে থাকতে পারবে। (ঐ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৪)
হযরত সাহল ইবন হুনাইফ (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি শুধু “اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ" বলে তার আমলনামায় দশটি নেকী লেখা হয়। আর যে ব্যক্তি "اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ" বলে তার আমল নামায় বিশটি নেকী লেখা হয়। আর যে ব্যক্তি السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ বলে তার আমলনামায় ত্রিশটি নেকী লেখা হয়। (তারগীব ওয়া তারহীব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৮)
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন যে, সবচেয়ে অথর্ব হলো সে ব্যক্তি যে দু'আ করতেও অক্ষম (অর্থাৎ আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করতেও জানে না।) আর সবচেয়ে বড় কৃপণ সে ব্যক্তি যে সালাম করার ব্যাপারে কার্পণ্য করে। (তারগীব ওয়া তারহীব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৯)
হযরত আবু উমামা (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি আগে সালাম দেয় সে মহান আল্লাহর অধিক ঘনিষ্ঠ। অর্থাৎ সাক্ষাতের সময় আগে সালাম দেয়ার কারণে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাকের সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করে। (মিল্কাত শরীফ, পৃষ্ঠা ৩৯৮)
এভাবে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন যে, অগ্রে সালাম দানকারী ব্যক্তি গর্ব ও অহংকার থেকে মুক্ত থাকে। (মিল্কাত, পৃষ্ঠা ৪০০)
একখানা হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন যে, প্রিয় নবী ইরশাদ করেছেনঃ এক মুসলমানের উপর অন্য মুসলমানের ছয়টি হক (অধিকার) রয়েছে:
এক. সে অসুস্থ হলে তার সেবা-শুশ্রূষা করা, দুই. সে মারা গেলে তার কাফন ও জানাযায় শরীক হওয়া, তিন. একজন অন্যজনকে দাওয়াত করলে তা কবুল করা, চার. একজন অন্যজনের সহিত সাক্ষাতের সময় সালাম করা, পাঁচ. একজন হাঁচি দিয়ে "আলহামদু লিল্লাহ্' বলার পর অন্যজন তার জবাব দেওয়া। অর্থাৎ 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বলা।
ছয়. একজন অন্যজনের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি সর্বাবস্থায় কল্যাণ কামনা করা। (মিশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা ২৬৭)
অপর একখানা হাদীসে হযরত কাতাদা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন : তোমরা নিজ গৃহে প্রবেশের সময় ঘরের লোকজনকে সালাম দিয়ে প্রবেশ কর। আবার ঘর থেকে বের হওয়ার সময় তাদেরকে সালাম দিয়ে বের হও। (যুজাজাতুল মাসাবীহ্, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৮)
ফাতওয়ায়ে আলমগীরী গ্রন্থে আছে, “প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নিজ গৃহে প্রবেশের সময় 'আস্সালামু আলাইকুম' বলে প্রবেশ করা চাই। আর যদি কোন জনশূন্য ঘরে প্রবেশ করে তখন নিম্নোক্ত বাক্যের দ্বারা সালাম করবে। বাক্যটি হলো- السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللهِ الصالحين
۱۲۹. عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ يَزِيدَ أَنَّ النَّبِيُّ ﷺ مَرَّ بِنِسْوَةٍ فَسَلَّمَ عَلَيْهِنَّ -
১২৯. হযরত আসমা বিন্ত ইয়াযীদ (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী মহিলাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি তাদেরকে সালাম দেন।
ফায়দা : আলিমগণ লিখেছেন যে, মহিলাদেরকে সালাম দেওয়ার বিষয়টি প্রিয় নবী -এর ব্যক্তিগত আমল ছিল। কারণ তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিষ্পাপ ও আল্লাহ্ কর্তৃক সংরক্ষিত। তিনি ফিত্নায় পতিত হওয়া থেকে ছিলেন সম্পূর্ণ নিরাপদ। কাজেই প্রিয় নবী ব্যতীত অন্য লোকদের জন্য বিধান হলো গায়রে মুহাররাম মহিলাকে সালাম না দেওয়া উত্তম। অবশ্য কোন মহিলা যদি এমন হয় যে, বয়স বার্ধক্যের সীমানায় পৌঁছে গেছে তাকে সালাম দিতে কোন আপত্তি নেই। আল্লামা ইব্ন আবেদীন (র) শামী গ্রন্থে লিখেছেন যে, "গায়রে মুহাররাম ব্যক্তির জন্য কোন বেগানা মহিলাকে সালাম দেওয়া অনুচিত। তবে ঐ বেগানা মহিলা যদি বৃদ্ধা হন তাহলে তাকে সালাম দেয়া যায়। অনুরূপ যদি কোন বৃদ্ধা হাঁচি দিয়ে 'আল হামদুলিল্লাহ্' বলে তাহলে বৃদ্ধা হওয়ার কারণে তার হাঁচির জবাব দেয়া যায়। পক্ষান্তরে কোন মহিলা যদি বৃদ্ধা না হয় তা হলে তাকে সালাম কিংবা তার হাঁচির জবাব দেয়া যাবে না। (কেননা এখানে ফিত্নায় পতিত হওয়ার আশংকা আছে) তবে মনে মনে হাঁচির জবাব দিতে হবে।"
একখানা হাদীসে হযরত জারীর ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ একদল মহিলার পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় তিনি তাদেরকে সালাম দেন। (মিশকাত, পৃষ্ঠা ৩৯৯)
আল্লামা হালীমী (র) বলেন যে, যেহেতু প্রিয় নবী কোন প্রকার ফিত্নায় পতিত হওয়া থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিলেন, এ কারণে তাঁর জন্য বেগানা মহিলাকে সালাম দেওয়া জায়িয ছিল। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে নিরাপদ থাকার উপর সম্পূর্ণ নিশ্চিত থাকবেন তার জন্যও বেগানা মহিলাকে সালাম দেওয়ার অনুমতি দেওয়া যায়, অন্যথায় তার নীরব থাকাই শ্রেয়। (আউনুল মা'বুদ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫१९)
গ্রন্থকারের এখানে উপরোক্ত হাদীসগুলো উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো সালামের ব্যাপারে প্রিয় নবী -এর আমলী-নীতি তুলে ধরা। অর্থাৎ প্রিয় নবী শিশু কিংবা বৃদ্ধা, পুরুষ কিংবা মহিলা নির্বিশেষে সকলকেই সর্বাগ্রে সালাম দিতেন।
۱۳۰. عَنْ أَنَسٍ قَالَ مَا رَأَيْتُ أَحَدًا كَانَ أَرْحَمَ بِالْعِيَالِ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ وَكَانَ اسْتَرْضَعَ لِابْنِهِ إِبْرَاهِيمَ فِي أَقْصَى الْمَدِينَةِ وَكَانَ زَوْجَهَا قَيْنًا فَيَأْتَيْهِ وَعَلَيْهِ أَثْرُ الْغُبَارِ فَيَلْتَذِمُهُ وَيُقَبِّلُهُ وَيَشُمُّهُ .
১৩০. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ -এর চাইতে সন্তানদের প্রতি অধিক স্নেহপ্রবণ আর কাউকে দেখিনি। তিনি তাঁর দুগ্ধপোষ্য শিশু হযরত ইব্রাহীম (রা)-কে দুধপান করানোর জন্য মদীনার উপকণ্ঠে বসবাসকারিণী জনৈকা ধাত্রীর কাছে দিয়েছিলেন। ধাত্রীর স্বামী ছিলেন একজন কর্মকার। যখন প্রিয় নবী নিজ সন্তানকে দেখার জন্য সেখানে যেতেন তাঁর শরীর ধুলায়িত হয়ে যেত। এ সত্ত্বেও তিনি তাঁকে বুকে জড়িয়ে নিতেন। তাঁকে চুম্বন করতেন এবং নাকের কাছে তুলে সোহাগ করতেন।
۱۳۱. عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ أَرْحَمَ النَّاسِ بِالصِبْيَانِ وَكَانَ لَهُ ابْنُ مُسْتَرْضَعُ فِي نَاحِيَةِ الْمَدْنَةِ وَكَانَ ظَبْرهُ قَيْنًا ، وَكَانَ يَأْتِيهِ وَنَحْنُ مَعَهُ وَقَدْ دُحِنَ الْبَيْتُ بِالإِذْخِرِ فَيَشُمُّهُ وَيُقَبِّلُهُ -
১৩১. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ শিশুদের প্রতি সর্বাধিক স্নেহপ্রবণ ছিলেন। তাঁর এক দুগ্ধপোষ্য শিশুর জন্য তিনি মদীনার উপকণ্ঠের জনৈকা ধাত্রী ঠিক করেছিলেন। ধাত্রীর স্বামী ছিলেন একজন কর্মকার। প্রিয় নবী নিজ পুত্রকে দেখার জন্য সেখানে যেতেন। তাঁর সঙ্গে আমরাও থাকতাম। ধাত্রীর ঘর ইস্থির ঘাস জ্বালানো ধোঁয়ায় ভরে থাকত। এ সত্ত্বেও তিনি নিজ সন্তানকে কোলে তুলে নিতেন। তাঁকে নাকের কাছে তুলে সোহাগ করতেন এবং চুম্বন করতেন।
ফায়দা: উপরোক্ত হাদীস দুটির বক্তব্য অভিন্ন। গ্রন্থকার আলোচ্য হাদীসদ্বয়কে প্রিয় নবী -এর বিনয় ও নম্রতা অনুচ্ছেদে পেশ করার কারণ হলো, এ দু'টি হাদীসে তাঁর পবিত্র জীবন যাত্রার সরলতা ও অকৃত্রিমতা সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। পাশাপাশি এ কথাও প্রমাণিত হচ্ছে যে, তিনি পরিবারের লোকজন ও সন্তান-সন্ততি বিশেষত শিশুদেরকে গভীরভাবে স্নেহ করতেন। তাঁর পরম নিরহংকারের প্রমাণ এই যে, তিনি নিজের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে দুধ পান করানোর জন্য একজন কর্মকারের মত সাধারণ ব্যক্তির ঘরে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন নি। তাছাড়া সেই কর্মকারের গৃহে বারবার যাতায়াত করা এবং পথিমধ্যে ধুলার কারণে আপাদমস্তক ভরে যাওয়াকে নিজের আত্মমর্যাদা হানিকর বলে মনে করেননি। কর্মকারদের গৃহে স্বাভাবিকভাবেই ধোঁয়া থাকে। প্রিয় নবী এ সত্ত্বেও নিঃসংকোচে তাদের গৃহে প্রবেশ করতেন। তারপর একজন সাধারণ পিতাও যখন ধুলামাখা দেহে সন্তানকে কোলে নিতে দেরি করে সেখানে তিনি এ সব উপেক্ষা করে নিজ সন্তানকে কোলে নিয়ে স্নেহ প্রবণতার পরম উদাহরণ পেশ করলেন। অথচ অহংকারী ও আত্মপূজারী লোকেরা শিশুদের সাথে এভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়া এবং তাদেরকে স্নেহ ও মমতায় জড়িয়ে নেয়াকে নিজেদের মানমর্যাদা হানিকর বলে বোধ করে থাকে।
প্রিয় নবী নিজে যেভাবে শিশুদেরকে আদর-সোহাগ করতেন সেভাবে অন্যদেরকেও তাদের আদর-সোহাগের জন্য উপদেশ দিতেন। হাদীস গ্রন্থগুলোতে এ ধরনের বহু বর্ণনা পাওয়া যায়, যেখানে শিশুদের প্রতি তাঁর সীমাহীন স্নেহ ও মমতার পরিচয় ফুটে উঠেছে। একখানা হাদীসে বলা হয়েছে যে, একদা প্রিয় নবী তাঁর দৌহিত্র হযরত হাসান (রা)-কে গভীরভাবে স্নেহ করছিলেন। এটি দেখে হযরত আকরা ইন্ন হাবিস (রা) নামক এক সাহাবী বলে উঠলেন, আমার তো দশটি সন্তান আছে। অথচ আমি তো কাউকে আদর-সোহাগ করি না। প্রিয় নবী তখন বললেন: যারা মানুষের প্রতি সোহাগ ও মায়া-মমতা করে না তাদের প্রতি আল্লাহ্ পাকও সোহাগ ও মায়া-মমতা করবেন না। (হায়াতুস্ সাহাবা, ২ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৬৯)
হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে অপর একটি সূত্রে বর্ণিত আছে যে, একবার হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-এর কাছে এক মহিলা আসল। মহিলার সঙ্গে দু'টি শিশু ছিল। হযরত আয়েশা (রা) ঐ মহিলাকে তিনটি খেজুর খেতে দিলেন। মহিলাটি তার দু'টি বাচ্চাকে দু'টি খেজুর দিয়ে একটি নিজে খেতে চাইল। এ সময় শিশুরা পুনরায় তার দিকে চোখ তুলে তাকাল। মহিলা খেজুরটিকে দু'টুক্রা করে অর্ধেক করে উভয় বাচ্চাকে দিয়ে দিল। তারপর সে চলে গেল। অতঃপর প্রিয় নবী গৃহে ফিরে আসলে হযরত আয়েশা (রা) এ ঘটনা তাঁকে শোনালেন। তখন প্রিয় নবী ইরশাদ করেন : মহিলাটি (তার সোহাগ ও মমত্ববোধের কারণে) বেহেস্তে প্রবেশ করবে। অর্থাৎ বেহেস্তের উপযুক্ত বিবেচিত হবে। (হায়াতুস্, সাহাবা, ২ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৭০)
۱۳۲. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكَ يَقُولُ مَا رُفِعَ مِنْ بَيْنَ يَدَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَضْلُ شَوَاءٍ قَطُّ وَلَا حُمِلَتْ مَعَهُ طِنْفِسَةٌ .
১৩২. হযরত আনাস ইব্ন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ থেকে কখনো উচ্ছিষ্ট ভুনা মাংস তুলে নেয়া হয়নি এবং তার জন্য কখনো কার্পেট বিছান হয়নি।
ফায়দা: রাসূলুল্লাহ্ একজন বিনয়ী সাধারণ মানুষের মতই মাটিতে বসে আহার করতেন। আহার শেষে তিনি বরতন খুব ভাল করে পরিষ্কার করতেন এবং অহংকারী লোকদের মতো খাবার বরতনে উচ্ছিষ্ট রেখে দিতেন না। খাবার বরতনে যেসব গর্বিত ও অহংকারী লোক কিছু না কিছু উচ্ছিষ্ট রেখে দেয়, তার দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য থাকে স্বীয় ধনাঢ্যতা ও প্রাচুর্য প্রকাশ করা। অর্থাৎ তারা যেনো তাদের ঐ উচ্ছিষ্ট খাবারের প্রতি তার পরিমাপ যা-ই হোক না কোন আদৌ মুখাপেক্ষী নয়। তাদের দৃষ্টিতে আহার্যের কোন কদর ও মর্যাদা নেই। (নাউযুবিল্লাহ্) নবী আকরাম হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা-এর শিক্ষা ও তাঁর জীবন পদ্ধতি এই অর্থহীন অবজ্ঞা লোক-দেখানো প্রাচুর্য থেকে (যা মূলত নিয়ামতের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন) সম্পূর্ণ ভিন্নতর ছিল। তা ছিল বিনয়, বশ্যতা ও আনুগত্যের উপর ভিত্তিশীল। তাঁর শিক্ষা ও পবিত্র জীবন চরিত্র অধ্যয়ন করলে এ সত্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ আমাদেরকে (আহারের পর) আঙুল, বরতন (রেকাবী, প্লেট প্রভৃতি) ভালভাবে পরিষ্কার করে খেতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন, তোমরা কি জানো খাবারের কোন্ লোকমা ও কোন্ অংশের মধ্যে বরকত নিহিত রয়েছে? (মিল্কাত, পৃষ্ঠা ৩৬৩) খাবার খেয়ে রেকাবীতে উচ্ছিষ্ট রেখে দেয়া তা নষ্ট করার নামান্তর ও নিয়ামতের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন স্বরূপ। তাই বরতন ও আঙুলে লেগে থাকা খাবার উত্তমরূপে চেটে খাওয়া উচিত। অবশ্য খাবার যদি বেশি বেঁচে যায় এবং তা নষ্ট করা উদ্দেশ্য না হয়, তবে তা অবশিষ্ট রেখে দিতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু তা এইভাবে অবশিষ্ট রেখে দিবে যা নিজের কিংবা অন্য কারো খেতে ঘৃণা না হয়। এক্ষেত্রে উত্তম পন্থা হচ্ছে, প্রথমেই আহার্য প্রয়োজন মাফিক বরতনে তুলে নিতে হবে। অনুরূপভাবে চামচ বা আঙুলে যে আহার্য লেগে থাকে তাও অবশ্যই চেটে খাওয়া উচিত, যাতে আল্লাহ্ প্রদত্ত এই নিয়ামত নষ্ট না হয়।
অনুরূপ যদি আহার্যের কোনো লোকমা মাটিতে পড়ে যায়, তবে তাও তুলে নিতে হবে। অবশ্য যদি নোংরা ও নাপাক স্থানে না পড়ে। সে ক্ষেত্রে মাটি মিশ্রিত অংশ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট পরিষ্কার অংশ খেতে হবে। এটাই হচ্ছে মহান আল্লাহর দেয়া নিয়ামতের প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন, বিনয় ও আনুগত্যের নিয়ম। এক হাদীসে হযরত জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ ইরশাদ করেন: শয়তান প্রতিটি কাজের সময় তোমাদের কাছে উপস্থিত থাকে এমনকি আহার করার সময়ও। তাই যখন আহার করার সময় লোকমা মাটিতে পড়ে যাবে, তখন তা তুলে নিবে এবং ধুলাবালি পরিষ্কার করে লোকমাটি খাবে। শয়তানের জন্য রেখে দিবে না। অনুরূপভাবে যখন তোমরা আহার শেষ করবে, তখন স্বীয় আঙুলসমূহ পরিষ্কার করবে এবং যে আহার্য তাতে লেগে থাকবে তা চেটে খাবে। কেননা আহার্যের কোন্ অংশে বরকত নিহিত আছে তা তোমাদের জানা নেই। (মিশকাত, পৃষ্ঠা ৩৬৩)
হযরত আনাস ইবন মালিক (রা)-এর উপরোক্ত হাদীস থেকে একথাও জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ মাটিতে বসে খেতেন এবং নিজের জন্য কোনো বিশেষ স্থান বা বিছানা পত্রের ব্যবস্থা করতেন না। যেমনিভাবে অহংকারী ও আত্মপূজারী লোকেরা স্বীয় শানশওকত প্রকাশের জন্য খাবার মজলিসে কার্পেট গালিচা কিংবা টেবিল চেয়ারের বন্দোবস্ত করে থাকে। বরং সরদারে দু'জাহান শাহানশাহে আরব ও আজম সাধারণ মানুষের মত কোনো বিছানা ছাড়াই মাটিতে বসে খানা খেতেন। এতে তার আল্লাহর বান্দাসুলভ বিনয় ও চরম গর্বহীনতাই প্রকাশ পায়। অনুরূপভাবে তিনি আসন করে বসে কিংবা ঠেস দিয়ে কখনো আহার করতেন না। এটাও আত্মগর্বীদের অভ্যাস। এ সম্পর্কে হযরত আবূ জুহায়ফা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, নবী ইরশাদ করেন: আমি আসন করে বসে (কিংবা ঠেস লাগিয়ে) কখনো আহার করি না। (মিশকাত, পৃষ্ঠা-৩৬৩)
হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন্ন আম্র (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্-কে কখনো আসন করে আহার করতে দেখা যায়নি। আর তিনি কখনো তাঁর সঙ্গীদের আগে আগে চলতেন না। (বরং বিনয়বশত তাদের মাঝখানে চলতেন) (মিশকাত, পৃষ্ঠা ২৬৬)
এক হাদীসে নবী বলেন, তোমরা আহার করার সময় জুতা খুলে নাও। কেননা এটা (জুতা খুলে নেয়া) একটি ভাল অভ্যাস। (জামি সগীর, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৮)
যেসব মুসলমান আজকাল ইউরোপের অন্ধ অনুসরণে জুতা পরিধান করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আহার করাকেই ভদ্রতা মনে করে, তাদের চিন্তা করা উচিত যে, হাশরের দিন তারা আল্লাহ্ হাবীব ও উম্মতের সুপারিশকারী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা-এর সামনে কিভাবে উপস্থিত হবে।
এই সব হাদীস থেকে নবী আহার করার সময় কি পরিমাণ বিনয় নম্রতা অবলম্বন করতেন, তা সহজেই অনুমান করা যায়। আল্লাহ্ তা'আলা সকল মুসলমানকে তাঁর সুন্দরতম চরিত্র ও অনুপম আদর্শ অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন!
۱۳۳. عَنْ أَبِي مَسْعُودٍ قَالَ أَتَى النَّبِيَّ رَجُلٌ يُكَلِّمُهُ فَأُرْعِدَ فَقَالَ عَلَيْكَ فَلَسْتُ بِمَلِكَ، إِنَّمَا أَنَا ابْنُ امْرَأَةٍ مِنْ قُرَيْشٍ كَانَتْ تَأْكُلُ الْقَدِيدَ
১৩৩. হযরত আবূ মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি নবী-এর নিকট কিছু কথা বলার জন্য এলো। কিন্তু সে তাঁর ভয়ে কাঁপতে লাগল। তিনি বললেন : ভয় করো না। আমি তো তোমার বাদশাহ নই (যে, আমাকে দেখে তুমি ভয় করবে)। বরং আমি হচ্ছি কুরায়শ বংশের এমন এক মহিলার সন্তান যিনি (সাধারণ মেয়েদের মত) শুকানো গোশত ভক্ষণ করতেন।
ফায়দা : এ হাদীস থেকেও নবী-এর বিনয়, নম্রতা ও আত্মগর্বহীনতা প্রকাশ পায়। এটা স্পষ্ট যে, তিনি একদিকে ছিলেন সমস্ত নবী ও রাসূলদের সরদার এবং অপরদিকে ছিলেন সমগ্র আরব-আজমের নেতা ও দু'জাহানের পথপ্রদর্শক। প্রতিটি ব্যক্তিকেই তাঁর মাহাত্ম্য, মহিমা ও প্রভাবে প্রভাবান্বিত হওয়া ছিল অবশ্যম্ভাবী। যখনই কোনো আগন্তুক তাঁর সামনে আসতো, তার ভয় ও প্রভাবের দরুন তার মধ্যে কম্পন শুরু হয়ে যেত। কিন্তু তাঁর স্বভাবগত বিনয় ও সরলতার অবস্থা ছিল এরূপ যে, তিনি তার সাথে অত্যন্ত নম্রতা ও বিনয় অবলম্বন করতেন। কেউ যদি ভয় পেতো, তবে তিনি তাকে সান্ত্বনা দিতেন এবং কথায় ও কাজে প্রকাশ করতেন। তার প্রতি দয়া ও সহানুভূতি প্রদর্শন করতেন।
134 عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ وَأَبِي ذَرٍ قَالَا كَانَ النَّبِيُّ يَجْلِسُ بَيْنَ ظَهَرَانِي أَصْحَابِهِ، فَيَجِيْبُ الْغَرِيبُ وَلَايَدْرِي أَيُّهُمْ هُوَ حَتَّى يَسْأَلَ، فَطَلَبْنَا إِلَى النَّبِيِّ الاَنْ نَجْعَلَ لَهُ مَجْلِسًا يَعْرِفُهُ الْغَرِيبُ إِذَا أَتَاهُ، فَبَنَيْنَا لَهُ دَكَأَنَا مِنْ طِينٍ فَكَانَ يَجْلِسُ عَلَيْهِ وَتَجْلِسُ بِجَانِبَيْهِ -
১৩৪. হযরত আবূ হুরায়রা ও হযরত আবূ যার (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী তাঁর সাহাবীদের মাঝখানে সাধারণ মানুষের মতো উপবেশন করতেন। কোনো আগন্তুক আগমন করলে বুঝতে পারতো না যে, তাদের মধ্যে তিনি (রাসূলুল্লাহ্) কোন্ জন যে পর্যন্ত সে জিজ্ঞেস না করতো। তাই আমরা (সাহাবীগণ) নবী-এর জন্য এমন একটি আসন তৈরির অনুমতি প্রার্থনা করলাম, যার উপর উপবেশন করলে তাঁকে আগন্তুকরা সহজেই চিনতে পারে। (বর্ণনাকারী বর্ণনা করেন) অতঃপর আমরা (তাঁর অনুমতি নিয়ে) তাঁর জন্য একটি মাটির চত্বর তৈরি করলাম। তিনি তার উপর আসন গ্রহণ করতেন এবং আমরা তাঁর উভয় দিকে (আশপাশে) বসতাম।
ফায়দা : এ হাদীস থেকেও রাসূলুল্লাহ্-এর স্বভাবগত সরলতা ও প্রকৃতিগত বিনয়-প্রিয়তার পরাকাষ্ঠা প্রকাশিত হয়। তিনি সাহাবাদের মাঝে নিরহংকারভাবে উপবেশন করতেন। যেরূপ সাধারণ বন্ধু-বান্ধবরা একসাথে মিশে বসে থাকে। আমীর-উমারা ও রাজা-বাদশাহদের মত তাঁর বসার জন্য কোনো কুরসী ছিল না; কোনো সিংহাসন, কার্পেট-গালিচা ও শাহী দরবারও ছিল না। সেখানে কোনো শাহী আড়ম্বর, দাসদাসীর করজোড় সারি, স্তাবক ও গুণগায়কদের তোশামোদ-খোশামোদও ছিল না—যাতে তাঁর স্বতন্ত্র মর্যাদা প্রকাশ পেতে পারে। কেননা এসব বিষয় ছিল তাঁর প্রকৃতিগত বিনয়ের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তিনি এসব আদৌ পছন্দ করতেন না। কিন্তু যখন বাইরের নতুন নতুন প্রতিনিধি দলের আগমন বেড়ে গেলো এবং দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তাঁর সাক্ষাৎ ও বায়আত গ্রহণের জন্য আসতে লাগলো, তখন সাহাবাগণ এ অনিবার্য প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে তাঁর বসার জন্য একটি স্বতন্ত্র আসন তৈরির আবেদন করলেন এবং তিনিও অপরিহার্যতা লক্ষ করে মাটির একটি আসন তৈরির অনুমতি দেন।
١٣٥ عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ كُلِّ جَعَلَنِي اللَّهُ فِدَاكَ مُتَّكِنًا فَإِنَّهُ أَهْوَنَ عَلَيْكَ، قَالَتْ فَأَصْغَى بِرَأْسِهِ حَتَّى كَادَ أَنْ تُصِيبَ جَبْهَتُهُ الْأَرْضَ ثُمَّ قَالَ لَا بَلْ أَكُلُ كَمَا يَأْكُلُ الْعَبْدُ وَاجْلِسُ كَمَا يَجْلِسُ الْعَبْدُ .
১৩৫. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! (আল্লাহ্ আমাকে আপনার জন্য কুরবান করে দিন) আপনি ঠেস দিয়ে বসে আহার করুন। তাতে আপনি আরাম অনুভব করবেন। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, একথা শুনে তিনি তাঁর শির মুবারক এতই নিচু করলেন যে, তাঁর কপাল মাটি স্পর্শ করার উপক্রম হলো। তারপর তিনি বললেন: না, বরং আমি একজন সাধারণ গোলামের মতো আহার করবো এবং একজন সাধারণ লোকের মতো বসবো।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, দু'জাহানের সরদার, রাব্বুল আলামীনের প্রিয়তম বন্ধু হযরত মুহাম্মদ কোনো অবস্থাতেই সরলতা ও বিনয় ত্যাগ করা পছন্দ করেন নি। খাবার জন্য বসার ক্ষেত্রে তো তিনি বিশেষভাবেই বিনয় অবলম্বন করতেন। তিনি কখনো আসন করে বসে কিংবা হেলান দিয়ে আহার করেন নি। হযরত আয়েশা (রা) যখন ভালবাসা ও সহানুভূতিবশত নবী-কে একটু আরামের সাথে বসে খাবার খেতে অনুরোধ করলেন, বরং তখন তিনি তাঁর অনুরোধ ও অবস্থানের উল্টো দাসত্ব প্রকাশের জন্য আরো যমীনের উপর ঝুঁকে গেলেন এবং মুখেও বিনয় প্রকাশ করলেন।
আলিমগণ বলেন, ঠেস কিংবা হেলান দিয়ে খানা খাওয়ার চারটি অবস্থা হতে পারে। চারটি অবস্থাই এই হাদীসের আওতায় এসে যাচ্ছে। (১) ডান বা বামে কোনো তাকিয়া বা পাঁচিল প্রভৃতির উপর ভর করা। (২) হাতের তালু মাটির উপর রেখে তার উপর ভর করা। (৩) কোনো পাঁচিল বা তাকিয়ার সাথে কোমর লাগিয়ে সাহায্য নেয়া। (৪) গদি কিংবা কার্পেট প্রভৃতির উপর আসন করে বসে আহার করা। এই চারটি অবস্থাই সুন্নতের খেলাফ।