📄 নবী (সা)-এর ক্ষমাগুণ সম্পর্কিত বর্ণনা
৬৫. হযরত মুআবিয়া ইন্ন হায়দা (রা) থেকে বর্ণিত যে, তাঁর গোত্রের জনৈক ব্যক্তি নবী-এর কাছে হাযির হয়ে বললো, আমার পড়শীদেরকে কোন্ অপরাধে বন্দী করা হয়েছে? নবী তার এই ঔদ্ধত্যের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করলেন না। ফলে সে তাঁকে হুমকি দিয়ে বললো, আমি যদি একথা সবার সামনে বলে দেই, তবে তারা ভাববে যে, তুমি তো লোকদেরকে অন্যায় ও জুলুম করা থেকে বারণ করো কিন্তু নিজে তা মেনে চলো না। এ কথা শুনে তৎক্ষণাৎ তার ভাই উঠে দাঁড়ালো এবং বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! সে তার দুর্ব্যবহার থেকে বিরত থাকবে (আমি তার দায়িত্ব নিলাম) তখন তিনি বললেন, শোনো! তোমরা যদি একথা বলেও থাকো এবং আমি যদি এ কাজ করেও থাকি, তবে মনে রেখো! আমিই তার প্রতিফল ভোগ করবো, তোমরা নয়। তারপর তিনি সাহাবাগণকে বললেন, ঐ ব্যক্তির পড়শীদেরকে মুক্ত করে দাও।
ফায়দা : এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (র)-এর মুসনাদে এর চেয়ে বিস্তারিতভাবে বিবৃত হয়েছে। হযরত মুআবিয়া ইন্ন হায়দা (রা) বলেন, নবী আমার গোত্রের কতিপয় লোককে কোনো এক অভিযোগের ভিত্তিতে বন্দী করেছিলেন। সেই ব্যাপারে আমার গোত্রের জনৈক ব্যক্তি তাঁর নিকট উপস্থিত হলো, তিনি তখন খুত্বা দিচ্ছিলেন। সে (রাগান্বিত অবস্থায়ই অত্যন্ত অভদ্রভাবে) বললো, আমার পড়শীদেরকে কেন বন্দী করা হয়েছে? নবী চুপ রইলেন। কোনো জবাব দিলেন না। তারপর সে তাঁকে ধমক দিয়ে বললো (আমি যদি আপনার এই অত্যাচারমূলক কার্যকলাপ জনসমক্ষে তুলে ধরি, তবে লোকেরা বলবে, আপনি অন্য লোকদেরকে তো জুলুম অত্যাচার ও নির্যাতন-উৎপীড়ন থেকে বারণ করেন, কিন্তু অহেতুক নিজে তা থেকে বিরত থাকেন না। রাসূলুল্লাহ্ তার কথা সম্পূর্ণ শুনতে পাননি, তাই) লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এই লোকটি কি বলছে? মুআবিয়া ইবন হায়দা (রা) বলেন, (আমি একথা শুনে সামনে অগ্রসর হলাম এবং) উভয়ের কথাবার্তার মাঝখানে অন্তরায় সাজলাম। আমার আশংকা ছিল, নবী যদি আমার গোত্রকে বদ-দু'আ করেন, তবে তাদের কখনো কল্যাণ হবে না। কিন্তু একটু পরেই তিনি ঐ ব্যক্তির কথা বুঝতে পারলেন এবং বললেন, লোকেরা তো একথা বলেছে (এবং অপবাদ দিয়েছে) এবং ভবিষ্যতেও এরূপ বলবে। কিন্তু আল্লাহ্র কসম! আমি যদি এরূপ করি, তবে তার প্রতিফল আমি ভোগ করবো তারা নয়! এরপর তিনি সাহাবাগণকে নির্দেশ দিলেন যে, ঐ ব্যক্তির পড়শীদেরকে মুক্তিদান করো।
এ হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রাসূলুল্লাহ্ কত বড় ভদ্র ও মহান চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। লোকদের অহেতুক অভদ্র ও অশালীন আচরণ সত্ত্বেও তিনি তাদের সাথে সর্বদা ক্ষমা ও দয়াই প্রদর্শন করতেন। কখনো প্রতিশোধ নিতেন না। মুখ দিয়ে খারাপ কথা সর্বদা উচ্চারণ করতেন না, শাস্তিও দিতেন না। এমনকি তাদেরকে বদ-দু'আও করতেন না। বরং সম্পূর্ণ ক্ষমা করে দিতেন। তাঁর গোটা জীবন-চরিত ও সমগ্র ঘটনাই এ কথার সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপারে কারো থেকে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি।
সহীহ্ বুখারীতে শিষ্টাচার অধ্যায়ে (২য় খণ্ড, ৯০৪ পৃষ্ঠা) হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ কখনো তাঁর নিজের ব্যাপারে কারো থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। তবে আল্লাহ্ দীন ও তাঁর বিধি-বিধানের অবমাননা করা হলে তার প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন।
٦٦ حَدَّثَ عَبْدُ اللهِ بْنِ الزُّبَيْرِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رِجَالًا مِنَ الْأَنْصَارِ خَاصَمُوا الزُّبَيْرَ فِي شِرْجٍ مِنْ شَرَاجِ الْحَرَّةِ الَّتِي يَسْقُوْنَ بِهَا الْمَاءَ ، فَغَضِبَ الأَنْصَارِيُّ وَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ إِنْ كَانَ ابْنُ عَمَّتِكَ ، فَتَلَوْنَ وَجْهُ النَّبِيِّ وَقَالَ اسْقِ يَازُبَيْرُ ثُمَّ احْبِسِ الْمَاءَ حَتَّى يَبْلُغَ الْجُدُرَ ثُمَّ ارْسِلِ الْمَاءَ إلى جَارِكَ -
৬৬. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র (রা) থেকে বর্ণিত যে, (একবার আমার পিতা) হযরত যুবায়র (রা)-এর সাথে মদীনার প্রস্তরময় অঞ্চলের এমন এক পানির নালার ব্যাপারে এক আনসারীর বিবাদ হলো যা থেকে (আশপাশের) লোকটি (তাদের ক্ষেত ও বাগানসমূহের) পানি সেচ দিতো। শেষে এই বিবাদ নবী -এর দরবারে পেশ হলো। তিনি সে বিবাদ মীমাংসা করলেন। ঐ আনসারী তার বোকামি ও বক্রবুদ্ধির দরুন এ মীমাংসাকে যুবায়রের প্রতি পক্ষপাতিত্ব বলে গণ্য করলো এবং ক্রুদ্ধ হয়ে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! যুবায়র আপনার ফুফাত ভাই। (এজন্য আপনি তার পক্ষপাতিত্ব করেছেন। যেহেতু এটি ছিল তাঁর সততা ও ন্যায় বিচারের বিরুদ্ধে আক্রমণ) তাই তাঁর মুখমণ্ডল মুবারক রাগে লাল হয়ে উঠলো। কিন্তু তিনি ঐ অভদ্র আনসারীকে কিছুই বললেন না এবং যুবায়র (রা)-কে বললেন: যুবায়র! তুমি তোমার ক্ষেতে পানি সেচ করো এবং ক্ষেতের আল পর্যন্ত পানি জমিয়ে রেখে তারপর তোমার পড়শীর ক্ষেতে পানি ছেড়ে দাও।
ফায়দা: গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য ছিল যেহেতু রাসূলুল্লাহ্ -এর ক্ষমা গুণের বর্ণনা দেয়া, তাই তিনি ক্ষমার সাথে সম্পর্কিত এই হাদীসের শেষ অংশটুকু শুধু বর্ণনা করেন। মিশকাত শরীফে (পৃষ্ঠা ২৫৯) পুরো হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। তাতে আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র (রা) বর্ণনা করেন যে, (প্রথম অর্থাৎ আনসারী কর্তৃক রাগান্বিত করার পূর্বে) রাসূলুল্লাহ হযরত যুবায়র (রা)-কে বলেন, যুবায়র! তুমি (তোমার ক্ষেতে প্রয়োজন পরিমাণ) পানি সেচ করো। তারপর তোমার পড়শীর (ক্ষেতের) দিকে পানি ছেড়ে দাও। নবী কর্তৃক হযরত যুবায়র (রা)-কে এই পরামর্শ দান ছিল পড়শীর অধিকার ও প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করার ভিত্তিতে। কিন্তু নির্বোধ আনসারী তাকে যুবায়রের প্রতি পক্ষপাতিত্ব মনে করে ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলো (এবং) বললো, যুবায়র আপনার ফুফাত ভাই বলে আপনি তার পক্ষপাতিত্ব ও আমার অধিকার হরণ করছেন। তখন নবী নির্দেশ দিলেনঃ হে যুবায়র! তুমি তোমার ক্ষেতে পানি সেচ করো এবং তোমার ক্ষেতের আল পর্যন্ত পানি বেঁধে রাখো। তারপর তোমার পড়শীর ক্ষেতের দিকে পানি ছেড়ে দিবে। বর্ণনাকারী হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র (রা) বলেন, আনসারী যখন পক্ষপাতিত্বের অপবাদ দিয়ে রাসূলুল্লাহ -কে রাগান্বিত করে দিলো, তখন তিনি বিচার নীতির স্পষ্ট বিধি অনুযায়ী যুবায়রের অধিকার১ তাকে পুরোপুরি দিয়ে দেন। এর পূর্বে তিনি (উভয়ের সুবিধা ও প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে) মীমাংসা করার ভিত্তিতে এমন এক পরামর্শ দিয়েছিলেন যাতে উভয়ের জন্য সুবিধা ছিল।
হাদীস থেকে রাসূলুল্লাহ্-এর উদার মানসিকতা সম্পর্কে অনুমান করুন। আনসারী নবী-এর সততা ও আমানতদারীর উপর আক্রমণ করছে, অধিকার হরণ ও পক্ষপাতিত্বের অপবাদ দিচ্ছে, প্রচণ্ড ক্রোধে তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল রক্তিমবর্ণ ধারণ করছে। কিন্তু তাঁর পবিত্র মুখ থেকে একটি বাক্যও উচ্চারিত হচ্ছে না। কেননা, তিনি জানেন যে, ঐ ব্যক্তি যদিও মুসলমান তবে নির্বোধ ও ক্রোধে অভিভূত। তার কথায় উত্তেজিত হওয়া ঠিক নয়। কিন্তু তার হুঁশিয়ারি ও শিক্ষার জন্য হযরত যুবায়র (রা)-কে তার পূর্ণ অধিকার বুঝে নিতে বললেন। আর এটাই হচ্ছে ক্রোধ সংবরণ করা ও অপরাধীর অপরাধ ক্ষমা করার উত্তম আদর্শের উচ্চতম মাপকাঠি, যে সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন: وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّسِ وَاللَّهِ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ - সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল, আল্লাহ্ সৎকর্মপরায়ণদেরকে ভালবাসেন। (সূরা আলে ইমরান: ১৩৪)
কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তার নিষ্পাপ নবীর উপর এই পক্ষপাতিত্বের অপবাদ সহ্য করেননি! এবং তৎক্ষণাৎ আয়াত নাযিল করে উম্মতকে জানিয়ে দিলেন যে, নবী -এর ফয়সালাকে তা নিজের মনঃপূত হোক কিংবা না হোক মনেপ্রাণে গ্রহণ ও মান্য করা ছাড়া আল্লাহর নিকট তোমাদের ঈমানও সঠিক নয়। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন:
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا -
৬৯. হযরত জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ মাহারিবে খাসফা নামক স্থানে (বানু গাতফানের সাথে) যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে অবস্থান করছিলেন। (যুদ্ধ তখনো শুরু হয়নি কিন্তু) কাফিররা মুসলমানদের অসতর্কতার সুযোগ খুঁজছিল। জনৈক কাফির চুপিসারে এসে রাসূলুল্লাহ্ -এর শিয়রে দাঁড়ালো (তিনি তখন একটি গাছের নিচে আরাম করছিলেন) এবং বলল, এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? তিনি বললেন, আল্লাহ্! তৎক্ষণাৎ তার হাত থেকে তলোয়ার পড়ে গেলো। রাসূলুল্লাহ্ তলোয়ারটি তুলে নিলেন এবং বললেন, এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? সে বললো, আপনি ক্ষমতা পেয়ে উত্তম গ্রেফতারকারী হন। সুতরাং আপনি আমার জীবন রক্ষা করে উত্তম অনুগ্রহকারী হওয়ার প্রমাণ দিন। তিনি বললেন : তুমি কি সাক্ষ্য দিচ্ছো যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোনো মা'বুদ নেই আর আমি হচ্ছি আল্লাহ্র রাসূল? সে বললো, না অবশ্য আমি (অঙ্গীকার করছি যে) আপনার বিরুদ্ধে কখনো যুদ্ধ করবো না। (কোনো যুদ্ধে) আপনার সাথেও যোগদান করবো না এবং আপনার প্রতিপক্ষের সাথেও যোগদান করবো না। রাসূলুল্লাহ্ তাকে ছেড়ে দিলেন। সে তার সঙ্গীদের কাছে এলো। এবং বললো, আমি সর্বোত্তম ব্যক্তির হাত থেকে মুক্তি পেয়ে তোমাদের কাছে এসেছি।
ফায়দা : মাহারিবে খাসফা যুদ্ধের প্রসিদ্ধ নাম 'যাতুর্ রিকা'। এ যুদ্ধকে 'যাতুর্ রিকা' বলার কারণ, প্রস্তর কংকরময় ভূমিতে সফর করার দরুন মুসলমানদের পা যখম হয়ে গিয়েছিল এবং তাঁরা পায়ে পট্টি বেঁধে রেখেছিলেন। কোনো কোনো চরিতকার বলেন, 'যাতুর রিকা' হচ্ছে একটি লাল ও সাদা-কালো প্রস্তরময় পাহাড়ের নাম এবং এই যুদ্ধের নামকরণও পাহাড় করা হয়েছে। বানু গাতফানের বিপুল সংখ্যক লোক মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য সমবেত হয়েছিল। কিন্তু তাদের হামলা করার সাহস হয়নি, তাই যুদ্ধ হয়নি। এ ঘটনা ঘটেছিল চতুর্থ হিজরীর মুহররম কিংবা জমাদিউল আউয়াল মাসে।
এ ঘটনাও রাসূলুল্লাহ্ -এর আল্লাহ্ প্রদত্ত গুণ ক্ষমা ও দয়ার অনুপম দৃষ্টান্ত। জাগতিক কর্মকৌশল ও ফন্দি-ফিকিরের দিকে দৃষ্টিপাতকারীদের মতে এ হামলা ও শত্রুকে জীবিত ছেড়ে দেওয়ার কোনো সঙ্গত কারণ ছিল না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ -এর দৃষ্টি ছিল সমস্ত কারণের আদি কারণ আল্লাহ্ তা'আলার প্রতি। এজন্য তিনি ঐ ব্যক্তিকে ছেড়ে দেন। রাসূলুল্লাহ্ -এর এই ক্ষমা ও দয়ার কি ফল হয়েছিল? স্বগোত্রীয়দের কাছে গিয়ে তাঁর সম্পর্কে সে যে সাক্ষ্য দিয়েছিল তাতেই তা প্রতিভাত হয়।
عَنْ أَسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّهُ أَخْبَرَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ رَكِبَ .
عَلَى حِمَارٍ فَقَالَ لِسَعْدٍ أَلَمْ تَسْمَعْ مَا قَالَ أَبُو الْحُبَابُ يُرِيدُ عَبْدَ اللَّهِ بْنِ أَبَيِّ قَالَ كَذَا وَكَذَا فَقَالَ سَعْدُ بْنُ عُبَادَةَ اعْفُ عَنْهُ وَاصْفَحْ، فَعَفَا عَنْهُ رَسُولُ اللهِ الله
وَكَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَأَصْحَابُهُ يَعْفُوْنَ عَنْهُ أَهْلَ الْكِتَابَيْنِ وَالْمُشْرِكِينَ فَأَنْزَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ فَاعْفُوا وَاصْفَحُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ -
৭০. হযরত উসামা ইব্ন যায়দ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বর্ণনা করেন যে, একবার রাসূলুল্লাহ গাধার উপর সাওয়ার ছিলেন। [হযরত সা'দ ইবন উবাদা (রা)-এর শুশ্রূষার জন্য তিনি গমন করছিলেন। তিনি সা'দ ইব্ন উবাদা (রা)-কে (তাঁর গৃহে পৌঁছে) বললেন, তুমি কি শোননি আবূ হুবাব অর্থাৎ আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই (মুনাফিক নেতা) কি বলেছে? তিনি তার কথার পুনরুক্তি করে বললেন, সে আমাকে এরূপ এরূপ বলেছে। তখন সা'দ ইব্ন উবাদা (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি তাকে ক্ষমা করে দিন এবং উপেক্ষা করুন। তিনি তাকে ক্ষমা করে দিলেন। (বর্ণনাকারী বলেন) রাসূলুল্লাহ্ ও তাঁর সাহাবা কিরাম সাধারণত আহলি কিতাব ও মুশরিকদের এরূপ কটুবাক্য ও ক্লেশদানকেও অনুরূপ ক্ষমা করে দিতেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ (প্রশংসারূপে) এই আয়াত নাযিল করেন:
فَاعْفُوا وَاصْفَحُوْا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرُ -
তোমরা ক্ষমা করো ও অপেক্ষা করো যতক্ষণ না আল্লাহ্ (যুদ্ধ ও প্রতিশোধের) কোনো নির্দেশ দেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।
ফায়দা : এখানেও যেহেতু গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে রাসূলুল্লাহ্-এর ক্ষমা ও দয়া গুণের বর্ণনা করা, সেহেতু পূর্ণ হাদীস বর্ণনা করেননি। বরং ঐ সংক্রান্ত অংশটুকু বর্ণনা করাকেই যথেষ্ট মনে করেছেন। পূরো হাদীসটি সহীহ বুখারীতে উল্লিখিত হয়েছে: একবার রাসূলুল্লাহ্ হযরত সা'দ ইব্ন উবাদা (রা)-এর শুশ্রূষার জন্য গাধার উপর আরোহণ করে রওয়ানা করেন। তাঁর পিছনে তিনি উসামা ইব্ন যায়দ (রা)-কে বসিয়ে নেন। তিনি একটি জনসমাবেশের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে মুনাফিক-নেতা আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই ইব্ন সালূলও উপস্থিত ছিল। সমাবেশে উপস্থিতদের মধ্যে মুসলমান, ইয়াহূদী, মুশরিক সবাই ছিলো। নবী-এর বাহনের চলার কারণে যখন ধুলাবালি উড়ে গিয়ে সমাবেশে পড়লো, তখন আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই তার নাকে চাদর গুঁজে দিলো এবং নবী-কে বললো, দেখো, আমাদের উপর ধুলি উড়িয়ো না। তোমার গাধার ধুলোবালি আমার দেমাগ খারাপ করে দিয়েছে। নবী তার কথায় কর্ণপাত করলেন না এবং সমাবেশে উপস্থিত জনতাকে সালাম করে বাহন থেকে নেমে অমুসলিমদের ইসলামের দাওয়াত দেওয়া শুরু করেন। কিন্তু সে (আবদুল্লাহ্) তাঁকে সম্বোধন করে বললো, দেখো, এটা ঠিক না, আমাদের সভায় এসে আমাদের বিব্রত করবে না। তুমি তোমার বাহনের উপর উঠো এবং যে তোমার কাছে যাবে তাকে তোমার দীনের দাওয়াত দাও। তখন আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহা (রা) যিনি ঐ সভায় উপবিষ্ট ছিলেন-নবীকে বললেন, আপনি অবশ্যই আমাদের সভা-সমাবেশে আগমন করবেন। আমরা আপনার আহ্বান ও বক্তব্য পছন্দ করি। এ নিয়ে কথা কাটাকাটি এতই বেড়ে গেলো যে, মুসলিম, ইয়াহুদী ও মুশরিকদের পরস্পরের মধ্যে বচসা, গালিগালাজ ও হাতাহাতি পর্যন্ত গড়ায়। এমনকি যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার আশংকা দেখা দেয়। কিন্তু নবী অতিকষ্টে তাদেরকে থামিয়ে দেন এবং ব্যাপারটি মিটমাট হয়ে যায়। এরপর তিনি তাঁর বাহনের উপর আরোহণ করে সাদ ইবন উবাদা (রা)-এর বাড়িতে গমন করেন এবং তাঁর সাথে সাক্ষাৎকালে তাঁকে বলেনঃ হে সা'দ্! তুমি কি শোননি যে, একটু আগে আবূ হুবাব অর্থাৎ আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই ইব্ন সালূল কি বলেছে? সাদ (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি তাকে ক্ষমা করুন এবং তার কথার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করবেন না।
এটি ইসলামের প্রথম দিকের ঘটনা। তখনো জিহাদ ও যুদ্ধের হুকুম নাযিল হয়নি। তখন মুসলিমদের প্রতি নির্দেশ ছিল ঐসব কাফির ও ইয়াহুদীদের নিকট থেকে কোনোরূপ প্রতিশোধ না নেয়ার এবং তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ও যুদ্ধ করার নির্দেশ নাযিল না হওয়া পর্যন্ত ক্ষমা ও উপেক্ষা করে চলার। কিন্তু নবী এত উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন যে, জিহাদ ও যুদ্ধের হুকুম নাযিল হওয়ার পরও তিনি মদীনার ঐ সব মুনাফিককে তাদের মুনাফিকী ও ইসলামের বিরোধিতার জন্য শাস্তি দেননি এবং তাদের বিরুদ্ধে কখনো যুদ্ধ করেননি। এই ক্ষমা ও দয়ার ফলেই ক্রমে ক্রমে সমস্ত মুনাফিক অবশেষে একনিষ্ঠ মুসলমান হয়ে যায়। কেবল কয়েকজন ছাড়া, যারা তাদের মুনাফিক থাকা অবস্থায়ই বিভীষিকাময় মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে।
۷۱. عَنِ الزُّهْرِيُّ حَدَّثَنِي عُمَارَةَ بْنُ خُزَيْمَةَ أَنَّ عَمَّهُ حَدَّثَهُ (وَهُوَ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيُّ ( أَنَّ النَّبِيَّ وَابْتَاعَ فَرَسًا مِنْ أَعْرَابِي فَاسْتَتْبَعَهُ النَّبِي لِيُعطيه ثَمَنَ فَرَسِهِ فَأسْرَعَ النَّبِيُّ الْمَشْيَ وَابْطَأَ الْأَعْرَابِيُّ فَطَفِقَ رِجَالٌ يُعَرِضُوْنَ لِلأَعْرَابِي يُسَارِمُونَهُ بِالْفَرَسِ لَا يَشْعُرُونَ أَنَّ النَّبِيَّ ابْتَاعَهُ حَتَّى زَادَ بَعْضُهُمْ لِلْأَعْرَابِي فِي السَّوْمِ عَلَى الثَّمَنِ الَّذِي ابْتَاعُهُ النَّبِي فَنَادَى الْأَعْرَابِيُّ فَقَالَ لَئِنْ كُنْتَ مُمْتَاعًا هُذَا الْفَرَسَ فَابْتَعْهُ وَإِلَّا بِعْتُهُ فَقَالَ النَّبِيُّ حِيْنَ سَمِعَ نِدَاءَ الْأَعْرَابِي أَوَلَيْسَ قَدْ ابْتَعْتُهُ فَقَالَ لَا وَاللَّهِ مَا بِعْتَكَ فَقَالَ بَلَى قَدِ ابْتُعْتُهُ مِنْكَ ، فَطَفِقَ النَّاسُ يَلُؤْذُونَ بِالنَّبِيِّ الله وَالأَعْرَابِي يَقُولُ هُلَمَّ شَهِيدًا فَلْيَشْهَدْ أَنَّى قَدْ بَايَعْتُكَ ، فَمَنْ جَاءَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ قَالَ لِلأَعْرَابِي وَيْلَكَ أَنَّ النَّبِيُّ وَ لَمْ يَقُولُ الأَحَقَّا .
৭১. যুহরী (র) বলেন, আমার নিকট উমারা ইবন খুযায়মা (র) বর্ণনা করেন যে, আমার নিকট আমার চাচা (যিনি নবী-এর একজন সাহাবী ছিলেন) বর্ণনা করেন। নবী একবার কোনো এক বেদুঈনের নিকট থেকে একটি ঘোড়া ক্রয় করেন এবং মূল্য পরিশোধ করার জন্য তাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা হন। নবী জোর কদমে অগ্রসর হচ্ছিলেন। আর ঐ বেদুঈন চলছিলো ঢিমে-তেতালা গতিতে। (ফলে ঐ বেদুঈন নবী এর অনেক পেছনে পড়ে গেলো) এবং লোকেরা তাকে রাস্তায় থামিয়ে ঘোড়াটি ক্রয় করার কথাবার্তা শুরু করলো। তারা জানতো না যে, এ ঘোড়াটি নবী খরিদ করেছেন। সুতরাং কেউ কেউ ঐ ঘোড়াটির মূল্য নবী-এর স্থিরীকৃত মূল্যের চেয়েও অধিক হাঁকালো। এই অবস্থা দেখে বেদুঈনের মনে গোলমাল দেখা দিলো। সে নবী-কে ডেকে বললো, আপনি যদি এ ঘোড়াটি ক্রয় করতে চান, তবে ক্রয় করুন নতুবা আমি অন্য কারো কাছে বিক্রি করে দেবো। নবী বেদুঈনের কথা শুনে বললেন, আরে আমি কি তোমার কাছ থেকে ঘোড়াটি ক্রয় করিনি? সে বললো, না। আল্লাহ্র কসম! আমি ঘোড়াটি আপনার কাছে বিক্রি করিনি। নবী বললেন, তুমি এ কি বলছো! আমি তো তোমার নিকট থেকে ঘোড়াটি ক্রয় করেছি। নবী ও বেদুঈনের আশপাশে লোকজন জড়ো হতে শুরু করলো। তখন বেদুঈন বলতে লাগলো, (আচ্ছা) আপনি যদি সত্যবাদী হন, তবে আমি যে আপনার কাছে ঘোড়াটি বিক্রি করেছি এ ব্যাপারে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থিত করুন। কিন্তু সেখানে যে মুসলিমই আসতো, সেই ঐ বেদুঈনকে বলতো যে, আরে হতভাগা! নবী তো সত্য ছাড়া কিছু বলতেই পারেন না।
ফায়দা: দেখুন, এ ঘটনায় হতভাগা বেদুঈন তার গোয়ার্তুমির দরুন নবী-এর সততা ও সাধুতার উপর কত বড় আক্রমণ করলো। একজন নিরীহ সাধারণ মানুষও এরূপ ঔদ্ধত্য সহ্য করতে পারে না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ কৃপা ও করুণার মূর্ত প্রতীকরূপে বেদুঈনের কথা শ্রবণ করেন। তাকে কিছুই বললেন না। আল্লাহ্ সত্যই বলেছেন (بِالْمُؤْمِنِينَ رَقُفُ رَّحِيمٌ )মু'মিনদের প্রতি তিনি বড়ই দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু। (সূরা তাওবা: ২৮)
۷۲. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتِ ابْتَاعَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ جَزُورًا مِنْ أَعْرَابِي بِوَسَقٍ مِّنْ تَمَرِ النَّخِيرَةِ - فَجَاءَ بِهِ إِلَى مَنْزِلِهِ فَالْتَمَسُ التَّمَرُ فَلَمْ يَجِدْهُ فِي الْبَيْتِ قَالَ فَخَرَجَ إِلَى الْأَعْرَابِي فَقَالَ يَا عَبْدَ اللَّهِ أَنَّا ابْتَعْنَا مِنْكَ جزُورَكَ هُذَا بِوَسَقٍ مِنْ تَمَرِ النَّخِيرَةِ نَحْنُ نَرَى أَنَّهُ عِنْدَنَا فَلَمْ نَجِدْهُ، فَقَالَ الْأَعْرَابِيُّ وَاغْدَرَاهُ وَاغَدْرَاهُ فَوَكَزَهُ النَّاسُ وَقَالُوا لِرَسُولِ تَقُولُ هَذَا ؟ فَقَالَ دَعُوهُ -
৭২. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ জনৈক বেদুঈন থেকে এক 'ওয়াসাক' মওজুদ কৃত খেজুরের বিনিময়ে একটি উট ক্রয় করলেন (তাঁর ধারণা ছিল গৃহে খেজুর মওজুদ আছে) তাই তিনি তাকে গৃহে নিয়ে এলেন এবং খেজুর তালাশ করলেন, কিন্তু খেজুর পাওয়া গেলো না। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তৎক্ষণাৎ বেদুঈনের কাছে গেলেন এবং তাকে বললেন, হে আল্লাহ্র বান্দা! আমি তোমার নিকট থেকে এক 'ওয়াসাক' খেজুরের বিনিময়ে তোমার এই উটটি ক্রয় করেছিলাম। আমার ধারণা ছিল, খেজুর আমার কাছে মওজুদ আছে, কিন্তু এখন দেখলাম নেই। এ কথা শুনে বেদুঈন বললো, হায় ধোঁকাবাজি! হায় ধোঁকাবাজি!! তখন লোকেরা তাকে ঘুষি মারা শুরু করলো এবং বললো, হতভাগা! রাসূলুল্লাহকে এরূপ কথা বলছো! তখন তিনি বললেন, তোমরা তাকে ছেড়ে দাও।
ফায়দা: রাসূলুল্লাহ্ কোনো নিয়ম বিরোধী কথা বলেননি। প্রায়ই এরূপ ঘটনা ঘটে থাকে। এটাকে প্রতারণা ও অসাধুতা বলা যায় না। কেননা, তখনো বিক্রীত দ্রব্য বিক্রেতার নিকটই ছিল। কিন্তু ঐ বেদুঈন ব্যক্তি তার গোয়ার্তুমি ও মূর্খতার দরুন নবী -কে অসাধু ও প্রতারক বলে তাঁকে চরমভাবে অপমানিত করেছে। লক্ষণীয় যে, অজ্ঞতার দরুন নবী-কে গালমন্দ করা ধর্মত্যাগ ও হত্যাযোগ্য অপরাধ না হলেও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ-এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যেহেতু এ বিষয়টি ছিল স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ এর পবিত্র সত্তার সাথে সম্পর্কিত, তাই তিনি তাঁর মর্যাদা অনুযায়ী ঐ বেয়াদব ও দুষ্ট লোকটিকে শাস্তি না দিয়ে ক্ষমা করে দেন।
۷۳. عَنْ مَهْدِي بْنِ عِمْرَانَ قَالَ رَأَيْتُ أَبَا الطُّفَيْلِ جِيئَ بِهِ فِي كَسَاءِ وَالْقِيَ فِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ فَقِيلَ هُذَا قَدْ رَأَى النَّبِيُّ فَدَنَوْتُ مِنْهُ فَقَالَ رَأَيْتُ رَسُولُ اللَّهِ وَ فَاتَّبَعْتُهُ حَتَّى أَتَى دَارًا فَدَفَعَ بَابَهَا فَدَخَلَ فَإِذَا لَيْسَ فِي الدَّارِ إِلَّا قَطِيفَةُ فَنَفَضَهَا فَإِذَا رَجُلٌ أَعْوَرُ فَقَالَ أَشْهَدُ أَنِّي رَسُولُ اللَّهِ ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ لا تَعْوَذُوا بِاللَّهِ مِنْ شَرِّ هَذَا -
৭৩. মাহদী ইব্ন ইমরান (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি দেখলাম, হযরত আবূ তোফায়ল (রা)-কে মসজিদে হারামে নিয়ে এসে শায়িত করা হয়েছে। তিনি তখন চাদরে আবৃত ছিলেন। কেউ বলেন, ইনি নবীকে দর্শন করেছেন। অর্থাৎ আবূ তোফায়ল (রা) নবী-এর সাহাবী ছিলেন। মাহ্দী ইব্ন ইমরান (রা) বলেন, আমি হযরত আবূ তোফায়ল (রা)-এর কাছ থেকে হাদীস শোনার জন্য তাঁর নিকট গেলাম। তিনি বললেন, একবার আমি রাসূলুল্লাহ্-কে কোথাও যেতে দেখলাম। আমিও তাঁর পেছনে পেছনে রওয়ানা হলাম। তিনি একটি গৃহে উপস্থিত হলেন এবং দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন। গৃহে একটি কম্বল পড়ে ছিলো। কম্বলটি ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। তিনি ঐ কম্বলটি ধরে হেঁচকা টান মারলেন। তার মধ্য থেকে একটি কানা (একচক্ষু বিশিষ্ট) লোক বেরিয়ে এলো। সে রাসূলুল্লাহ্-কে বললো, আপনি কি সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, আমি আল্লাহর রাসূল? তখন রাসূলুল্লাহ্ বললেন, হে লোক সকল! তোমরা তার অনিষ্ট থেকে আল্লাহর পানাহ চাও।
ফায়দা: এই ব্যক্তি ছিল ইব্ন সায়্যাদ। সহীহ বুখারী ও হাদীসের অন্যান্য কিতাবে তার কাহিনী সবিস্তার বর্ণিত হয়েছে। ইব্ন সায়্যাদের ডাকনাম 'সাফ' এবং এক বর্ণনা মতে আবদুল্লাহ্। এ ছিল মদীনার এক ইয়াহুদী। এর সম্পর্কে বর্ণনাকারীদের বিভিন্ন উক্তি রয়েছে। কেউ কেউ তাকে দাজ্জালও বলেন। বর্ণনাসমূহ থেকে জানা যায়, সে প্রতিশ্রুত দাজ্জাল না হলেও ফিত্না সৃষ্টিতে কমও ছিল না। বাল্যকাল থেকেই গণক ও জাদুকরের মতো কথা বলতো। আল্লাহ্ তা'আলা মুসলিমদের পরীক্ষার জন্য তাকে সৃষ্টি করেছিলেন। প্রথমে সে নিজেকে নবী বলে দাবি করতো। কিন্তু শেষে ইসলাম গ্রহণ করে। মুসলমানদের সাথে হজ্জ ও জিহাদ প্রভৃতিতেও শরীক হয়। কিন্তু তারপরও সে এই ধরনের উচ্ছৃংখল কথাবার্তা বলতো। গ্রন্থকারের এই হাদীসটিও এ স্থলে বর্ণনা করার কারণ হচ্ছে, এ ধরনের উচ্ছৃংখলতা ও ধৃষ্টতা ছাড়াও সে নবী-এর সামনে নিজেকে নবী বলে দাবি করে এবং স্বয়ং নবী-কেই তার উপর ঈমান আনার জন্য আহ্বান করে। নবী তাকে হত্যা করেননি এবং কোনো শাস্তিও দেননি। কারণ সে ছিল তখন বালক। তাছাড়া মদীনার ইয়াহূদীর সাথে তখন নবী সন্ধিবদ্ধও ছিলেন। অবশ্য তিনি লোকদেরকে তার অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য সাবধান করে দেন।
٧٤ عَنْ أَنَسٍ أَنَّ يَهُودِيَّةً اَتَتِ النَّبِيُّ بِشَاةٍ مُسْمُوْمَةٍ لِيَأْكُلَ مِنْهَا فَجِيَ بِهَا إِلَى النَّبِيُّ فَسَأَلَهَا عَن ذَلِكَ، فَقَالَتْ أَرَدْتُ قَتْلَكَ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ وَمَا كَانَ اللَّهُ لَيُسَلِّطْكِ عَلَى ذَلِكَ أَوْ قَالَ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ قَالُوا أَفَلَا نَقْتُلُهَا؟ قَالَ لَا -
৭৪. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, জনৈক ইয়াহুদী নারী নবী-এর নিকট একটি ভুনা বক্রীর বাচ্চা আহারের জন্য নিয়ে আসে। তাতে সে বিষ মিশ্রিত করেছিল। (এরপর নবী যখন ঐ গোস্ত বিষ মিশ্রিত হওয়ার সংবাদ মহান আল্লাহ্ তরফ থেকে জানতে পারলেন, তখন এ স্ত্রীলোকটিকে ডাকালেন) লোকেরা নবী-এর নিকট তাকে উপস্থিত করলো। তিনি ঐ বিষ মিশ্রিত গোস্ত সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এ কাণ্ড কেন করেছো? ঐ (উদ্ধত) নারী বললো, আমি আপনাকে হত্যা করতে চেয়েছি। তখন রাসূলুল্লাহ্ বললেন: মহান আল্লাহ্ তোমাকে এ কাজে সফল হতে দেবেন না (অর্থাৎ তুমি নবীকে হত্যা করতে পারবে না)। কিংবা বলেছেন, কোনো মুসলিমের বিরুদ্ধে আল্লাহ তা'আলা তোমাকে এ ব্যাপারে সফল করবেন না। সাহাবাগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা কি তাকে হত্যা করবো না? তিনি বললেন, না।
ফায়দা: এখানেও হাদীসের শুধু সেই অংশই বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে নবী-এর ক্ষমা ও দয়া গুণের আলোচনা রয়েছে। অন্যান্য রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, খায়বারের অধিবাসী এক ইয়াহুদী নারী বিষ মিশ্রিত করে একটি ভুনা বক্সী নবী-এর নিকট পেশ করলো। তিনি ঐ বক্রীর গোস্তের মধ্য থেকে হাতার একটি অংশ ভক্ষণ করলেন। তাঁর সাথে আরো কিছু সাহাবীও খাচ্ছিলেন। তাঁরাও এই বিষ মিশ্রিত বক্সীর গোস্ত খাওয়া শুরু করলেন। কিন্তু লোকক্কা মুখে দিতেই নবী সাহাবাদের নির্দেশ দিলেন যে, তোমরা খাওয়া বন্ধ করো (গোস্তে বিষ মিশ্রিত করা হয়েছে) এবং তখনই তিনি ঐ ইয়াহুদী নারীকে ডেকে পাঠালেন। (আসার পর) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এই বক্রীর গোস্তে বিষ মিশিয়েছো? সে বললো, আপনাকে কে বলেছে? তিনি বললেন, এই টুকরোটি আমাকে বলে দিয়েছে যা আমার হাতে রয়েছে। তখন ঐ ইয়াহুদী নারী স্বীকার করলো এবং বললো, আমি আপনাকে পরীক্ষা করার জন্য বিষ মিশিয়েছি। আপনি যদি সত্য নবী হন তবে এই বিষে আপনার কোনো ক্ষতি হবে না। কেননা, আপনি তা অবগত হতে পারবেন। আর আপনি যদি সত্য নবী না হন, তবে ধ্বংস হয়ে যাবেন এবং আমরা আপনার থেকে মুক্তি পাবো। নবী ঐ নারীকে তার প্রাণনাশের চেষ্টা সত্ত্বেও কোনো শাস্তি দেননি। বরং ক্ষমা করে দেন। নবী-এর সাথে যে সাহাবী ঐ মাংস ভক্ষণ করেছিলেন, তিনি ঐ বিষের প্রতিক্রিয়ায় ইন্তিকাল করেন।
অন্যান্য রিওয়ায়াত থেকে জানা যায় যে, নবী তাঁর নিজের পক্ষ থেকে ঐ নারীকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন, এবং প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। অবশ্য যখন ঐ বিষে হযরত বিশর ইন্ন বারাআ (রা) ইন্তিকাল করেন, তখন তাঁর কিসাসস্বরূপ তিনি ঐ নারীকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ হাদীস থেকে অনুমিত হয়, তিনি তাঁর প্রাণের শত্রুদের সাথে কি পরিমাণ সদয় আচরণ করতেন। তিনি ইচ্ছাকৃত হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন না। বরং তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া ছাড়াও তাদের কল্যাণ কামনাও করতেন। যেমন বিভিন্ন ঘটনা ও রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে, তায়েফে শত্রুরা কি পরিমাণ তাঁকে নির্যাতন করে। দুষ্ট ও দুরন্ত বালকদেরকে লেলিয়ে দিয়ে প্রস্তর বর্ষণের মাধ্যমে তাঁকে রক্তাক্ত করা হয়েছে। নবীজীর মাথা গোঁজার কোথাও আশ্রয় ছিল না।
তায়েফের নেতারা দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিলো। আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে ঐ সময় হযরত জিব্রাঈল (আ) পাহাড়ের অধিকর্তা ফিরিস্তাকে সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং বলেন যে, আপনি হুকুম দিলে এখনই এই দুই পাহাড়ের মাঝে ফেলে তাদেরকে পিষে মারা হবে। কিন্তু তাঁর পবিত্র মুখ থেকে এই দু'আই নিঃসৃত হলো اللَّهُمَّ أَهْدِ قَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُوْنَ ) আল্লাহ্! আমার জাতিকে হিদায়াত করুন। কেননা, এরা জানে না (যে, আমি আল্লাহ্ রাসূল)"।
٧٥ عَنْ زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ قَالَ سَجِرَ النَّبِيُّ اللهِ رَجُلٌ مِنَ الْيَهُودِ قَالَ فَاشْتَكَي لِذلِكَ أَيَّامًا ، قَالَ فَأَتَاهُ جِبْرَئِيلُ عَلَيْهِ السَّلامُ فَقَالَ إِنَّ رَجُلاً مِنَ الْيَهُودِ سَحَرَكَ فَعُقِدَلَكَ عَقْدًا فَأَرْسَلَ رَسُولُ اللهِ ﷺ عَلِيًّا فَاسْتَخْرَجَهَا فَجَاءَ بِهَا، فَجَعَلَ كُلَّمَا حَلَّ عُقْدَةً وَجَدَ لِذلِكَ خِفَّةً، فَقَامَ رَسُولُ اللهِ ﷺ كَأَنَّمَا أُنْشِطَ مِنْ عِقَال: فَمَا ذَكَرَ ذَلِكَ لِليَهُودِي وَلَآرَاهُ فِي وَجْهِهِ قَطُّ -
৭৫. হযরত যায়িদ ইব্ন আরকাম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার এক ইয়াহুদী নবী-কে জাদু করলেন। ফলে তিনি কিছুদিন অসুস্থ বোধ করছিলেন।' বর্ণনাকারী বলেন, তারপর একদিন তাঁর নিকট হযরত জিব্রাঈল (আ) আগমন করে তাঁকে অবগত করলেন যে, জনৈক ইয়াহুদী আপনাকে জাদু করেছে এবং (কালো) সূতার মধ্যে গিরা লাগিয়েছে। নবী তখন হযরত আলী (রা)-কে সেখানে পাঠালেন। হযরত আলী (রা) সেই তাগা সেখান থেকে তুলে আনেন। নবী ঐ গিরাগুলো খুলতে শুরু করেন। এক একটি গিরা খোলার সাথে সাথে তাঁর কষ্টের উপশম অনুভূত হতো। সবগুলো গিরা খোলার সাথে সাথে তিনি এমনভাবে দাঁড়িয়ে গেলেন, যেমন কোনো বাঁধা ব্যক্তি রশি থেকে মুক্ত হয়েছেন। কিন্তু তিনি কখনো ঐ জাদুর আলোচনা ঐ ইয়াহূদীর সাথে করেননি এবং কখনো তিনি প্রতিশোধের দৃষ্টিতে তার প্রতি তাকাননি।
ফায়দা : রিওয়ায়াত সমূহে বর্ণিত হয়েছে যে, ঐ ইয়াহুদীর নাম ছিল লাবীদ ইব্ আসাম। সে ছিলো বানু যুরায়ক গোত্রের লোক। সে নবীকে মেরে ফেলার জন্য (নাউযুবিল্লাহ্) তাঁর উপর প্রচণ্ড রকমের জাদু করেছিলো। মুশরিক ও ইয়াহুদীরা ছিলো তাঁর প্রাণের শত্রু। তাঁকে যে কোনোভাবে এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য ছিলো তারা সদা তৎপর। গোপন স্থানে লুকিয়ে থেকে আঁধার রাতে তাঁর উপর হামলা করেছে, বিষ প্রয়োগ করেছে এবং যখন তাতে ব্যর্থ হয়েছে, তখন তাঁকে জাদু দ্বারা মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আল্লাহ্ তাঁর নবীর সাথে ওয়াদা করেছিলেন যে, মানুষের হাত থেকে তাঁকে রক্ষা করবেন। وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنْ النَّاسِ )আল্লাহ্ আপনাকে লোকের হাত থেকে বাঁচাবেন)। তাই আল্লাহ্ তাঁর নবীকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন। কোথাও মুশরিকদের উপর প্রভাব ফেলে তাদের থেকে রক্ষা করেছেন, কোথাও ওহীর মাধ্যমে আসন্ন বিপদ সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করেছেন এবং কোথাও ফেরেস্তা পাঠিয়ে তাঁকে সাহায্য করেছেন। নবী-এর নিকট সব উপায় বিদ্যমান ছিলো। যেভাবে ইচ্ছা ঐ ইয়াহুদী ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। তাদেরকে সম্পূর্ণ ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা কখনো করেননি। প্রতিবার কাফিরদের কষ্ট দানকে ক্ষমা করে দিতেন এবং তাদের প্রতি দয়া করতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিলো, তারা হিদায়াত কবুল না করলেও তাদের সন্তান-সন্ততি অবশ্যই সুপথে আসবে। তিনি প্রতিনিয়ত তাঁর জাতির হিদায়াতের জন্য দু'আ করতেন। বিশেষ করে স্বীয় ব্যক্তিগত ব্যাপারে কখনো প্রতিশোধ নিতেন না। তাই ইয়াহুদী যখন তাঁর উপর জাদু করলো তিনি তার প্রতি একটু অসন্তোষও প্রকাশ করেননি, তাকে শান্তি দেননি। এমনকি তার সাথে এ ব্যাপারে আলোচনাও করেননি। অপর এক রিওয়ায়াতে বর্ণিত আছে, এ ব্যাপারে হযরত আয়েশা (রা) তাঁকে বলেছিলেন যে, আপনি ঐ ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচারণা কেন চালাচ্ছেন না। তিনি জবাব দিলেন, আল্লাহ্ আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। তাই আমি তার দুর্নাম রটানো পছন্দ করলাম না। এটাই ছিলো তাঁর উঁচুমন ও মহান আল্লাহ্র বাণী ( إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٌ “নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত)-এর বাস্তব নমুনা।
عَنِ ابْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ لَمَّا كَانَ يَوْمَ الْفَتْحِ أَرْسَلَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِلَى صَفْوَانَ بْنِ أُمَيَّةَ بْنِ خَلْفَ وَأَبِي سُفْيَانَ بْنَ حَرْبٍ وَإِلَى الْحَارِثِ بْنِ هِشَامٍ، قَالَ ابْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ فَقُلْتُ قَدْ أَمْكَنَنِي اللهُ عَزَّ وَجَلَّ مِنْهُمْ بِمَا صَنَعُوا حَتَّى قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مَثَلِي وَمَثَلُكُمْ كَمَا قَالَ يُوسُفُ لِإِخْوَتِهِ لاَ تَشْرِيْبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ فَانْفَضَحْتُ حَيَاءً مِنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ
৭৬. হযরত (উমর) ইব্ন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ সাওয়ান ইবন উমায়্যা ইবন খালফ, আবু সুফিয়ান ইব্ন হারব ও হারিস ইবন হিশামকে ডেকে পাঠালেন। হযরত উমর (রা) বলেন, আমি আপন মনে বললাম, আজ আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে তাদের কৃতকর্মের শাস্তিদান ও প্রতিশোধ গ্রহণের সুযোগ দান করবেন। কেননা, স্পষ্টতই এরা যুদ্ধবন্দী। নবী তাদেরকে হত্যা করাবেন এবং আমার দ্বারাই এ কাজ করাবেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ সে সময় বললেন, এখন আমার ও তোমাদের দৃষ্টান্ত সম্পূর্ণ হযরত ইউসুফ ও তাঁর ভাইদের মতো। এজন্য আমি তাই বলবো, যা হযরত ইউসুফ (আ) বলেছিলেন : ”لاَ تَشْرِيْبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ - কাজেই তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের ক্ষমা করুন। হযরত উমর (রা) বলেন, (তাঁর এই উদারতা দেখে) আমি লজ্জায় নতমুখ হয়ে গেলাম। (আমি যেখানে প্রতিশোধ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, আনন্দ উল্লাস করছি, তিনি সেখানে আজীবনের দুশমনদেরকে ক্ষমার সুসংবাদ শোনাচ্ছেন।)
عَنْ عُبَيْدِ اللهِ بْنِ أَبِي رَافِعٍ كَاتِبٍ عَلَى أَنَّهُ سَمِعَ عَلِيًّا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ يَقُولُ بَعَثَنِي رَسُولُ اللهِ ﷺ أنا والزُّبَيْرُ وَالْمِقْدَادِ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ انْطَلِقُوا حَتَّى تَأْتُوا رَوْضَةَ خَاخٍ، فَإِنَّ بِهَا ظَعِيْنَةً مَعَهَا كِتَابُ فَخُذُوهُ مِنْهَا فَانْطَلَقْنَا حَتَّى آتَيْنَا رَوْضَةَ خَاخٍ فَقُلْنَا أَخْرِجْى الْكِتَابَ فَقَالَتْ مَا مَعِي مِنْ كِتَابِ قُلْنَا لَتُخْرِجَنَّ الْكِتَابَ أَوْ لَنُقَلِبَنَّ الثَّيَابَ فَأَخْرَجُوهُ مِنْ عِقَاصِهَا فَأَتْيَنَا بِهِ النَّبِيُّ فَإِذَا فِيْهِ مِنْ حَاطِبِ بْنِ أَبِي بَلْتَعَةَ إِلَى أُنَاسِ مِنَ الْمُشْرِكِينَ يُخْبِرُهُمْ أَمْرًا مِنْ أَمْرِ رَسُولِ اللهِ ﷺ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَا حَاطِبُ مَا هُذَا ؟ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ لا تَعْجَلْ عَلَى إِنِّي كُنْتُ امْرًا مُلْصِقًا فِي قَوْمِي، وَكَانَ مَعَكَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ لَهُمْ قَرَابَاتُ بِمَكَّةَ يَحَمُوْنَ اَهْلِيْهِمْ فَأَحْبَبْتُ إِذَا فَاتَنِي ذَلِكَ مِنْهُمْ مِنَ النَّسَبِ أَنْ أَتَّخِذَ فِيْهِمْ يَدًا يَحَمُوْنَ بِهَا قَرَابَتِي، وَلَمْ أَفْعَلْ ذَلِكَ كُفْرًا وَلَا رِضًا بِالْكُفْرِ بَعْدَ الإِسْلامِ وَلَا ارْتِدَادًا عَنْ دِيْنِي فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ صَدَقَكُمْ فَقَالَ عُمَرُ أَضْرِبُ عُنُقَ هُذَا الْمَنَافِقِ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِنَّهُ قَدْ شَهِدَ بَدْرًا وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّ اللَّهَ اطَّلَعَ إِلَى أَهْلِ بَدْرٍ فَقَالَ اعْمَلُوْا مَا شِئْتُمْ فَقَدْ غَفَرْتُ لَكُمْ
৭৭. হযরত আলী (রা)-এর কাতিব (লিপিকার) উবায়দুল্লাহ্ ইব্ন্ন রাফি হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ যুবায়র, মিকদাদ (রা) ও আমাকে (এক মহিলা গুপ্তচরকে গ্রেফতার করার জন্য) প্রেরণ করেন এবং বলেন: তোমরা চলে যাও। যখন 'রাওযা খাখ' নামক স্থানে পৌঁছবে, সেখানে একটি স্ত্রীলোকের সাথে তোমাদের সাক্ষাৎ হবে। তার নিকট একটি চিঠি আছে। চিঠিটা তার নিকট থেকে নিয়ে আসবে। আলী (রা) বলেন, আমরা তখনই রওয়ানা দিলাম। যখন আমরা 'রাওযা খাখ' পৌছলাম। সেখানেই ঐ স্ত্রীলোকটিকে দেখতে পেলাম। আমরা তাকে বললাম, 'চিঠি বের করো'। সে বললো, 'আমার কাছে কোন চিঠি নেই।' আমরা তাকে (ধমক দিয়ে) বললাম, চিঠি বের করো নতুবা আমরা তোমার দেহ তল্লাশি করবো। [হযরত আলী (রা) বলেন], তখন সে চিঠি তার চুলের খোঁপার মধ্য থেকে বের করলো। আমরা সে চিঠি নিয়ে নবী -এর নিকট উপস্থিত হলাম। (তিনি ঐ চিঠি খুলে দেখলেন), তাতে লেখা আছেঃ "হাতিব ইব্ন আবূ বালতা'আর পক্ষ থেকে (মক্কার) মুশরিকদের প্রতি" চিঠিতে রাসূলুল্লাহ্-এর কোনো যুদ্ধের গোপন খবর দেয়া হয়েছিলো। তিনি হাতিবকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন: হে হাতিব! এ কী ব্যাপার? হাতিব (রা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে মেহেরবানী করে তাড়াহুড়ো করবেন না। প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, আমি বংশগতভাবে কুরায়শী নই। বরং আমার গোত্র কুরায়শের মিত্র। আর এই সুবাদেই কুরায়শের সাথে আমার সামান্যতম সম্পর্ক বিদ্যমান। তাদের সাথে আমার কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক আদৌ নেই। অথচ আপনার সাথে যেসব মুহাজির আছেন, মক্কায় তাদের সবার আত্মীয়-স্বজন রয়েছে। (তাদের আত্মীয়-স্বজন) তাদের ধন-সন্তান রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। তাই আমি যখন দেখলাম, মক্কায় আমার এমন কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই, যারা আমার সম্পদ সন্তান রক্ষণাবেক্ষণ করবে, তখন আমি মক্কার মুশরিকদের প্রতি কিছু অনুগ্রহ করা শ্রেয় মনে করলাম, যাতে তারা আমার সম্পদ-সন্তানের রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং তাদের কোনো ক্ষতি না করে। এটা আমি কুফর বা ইসলাম গ্রহণের পর কুফরীর প্রতি সন্তোষ প্রকাশ এবং আপন দীন ত্যাগ করার ভিত্তিতে আদৌ করিনি। (আমি এখনো ঠিক পূর্বের মতো একনিষ্ঠ মুসলিম রয়েছি। তখন রাসূলুল্লাহ্ সকল সাহাবাকে সম্বোধন করে বললেন: হাতিব তোমাদের কাছে সত্য কথা প্রকাশ করে দিয়েছে। (সে অজ্ঞতাবশতঃ এই ভুল করেছে) তখন হযরত উমর (রা) দাঁড়িয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি কি তার শিরশ্ছেদ করবো না? তিনি বললেন, না, এরূপ করবে না। এ ব্যক্তি তো বদরের যুদ্ধে শরীক ছিল। মহান আল্লাহ্ বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি কত মেহেরবান তা কি তুমি জানো? আল্লাহ্ বলেছেন : اعْمَلُوْا مَا شِئْتُمْ فَقَدْ غَفَرَتْ لَكُمْ তোমরা যা ইচ্ছা করো। আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি।
ফায়দা: এটি একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা, হাতিব ইব্ন আবূ বালতা'আ (রা) সেই সকল মুহাজিরের অন্যতম; যাঁরা ইসলাম গ্রহণের দরুন মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেছেন। নিজেদের সকল সহায়-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি ইসলামের জন্য মক্কায় ছেড়ে এসেছেন। হাতিব (রা) বদরের সেই সব সৌভাগ্যবান মুহাজির সাহাবীগণের অন্যতম, যারা মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করে দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ লাভ করেছিলেন। তাঁর সম্পর্কেই মহান আল্লাহ্ এই আয়াতসমূহ নাযিল করেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُوْنَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُمْ مِنَ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ أَنْ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ رَبَّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَادًا فِي سَبِيْلِي وَابْتِغَاءَ مَرْضَاتِي تُسِرُّونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَأَنَا أَعْلَمُ بِمَا أَخْفَيْتُمُ وَمَا أَعْلَنْتُمْ وَمَنْ يَفْعَلْهُ مِنْكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيلَ إِنْ يَثْقَفُوكُمْ يَكُونُوا لَكُمْ أَعْدَاءً وَيَبْسُطُوا إِلَيْكُمْ أَيْدِيَهُمْ وَالْسِنَتَهُمْ بِالسُّوْءِ وَوَدُّوا لَوْ تَكْفُرُونَ، لَنْ تَنْفَعَكُمْ أَرْحَامُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَفْصِلُ بَيْنَكُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ بَصِيْرُ.
হে মু'মিনগণ! আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে না। তোমরা কি তাদের সাথে বন্ধুত্ব করছো? অথচ তারা তোমাদের নিকট যে সত্য এসেছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছে। রাসূলকে এবং তোমাদেরকে বহিষ্কার করেছে এই কারণে যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে বিশ্বাস করো। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য আমার পথে জিহাদের উদ্দেশ্যে বহির্গত হয়ে থাকো, তবে কেন তোমরা তাদের সাথে গোপন বন্ধুত্ব করছো? তোমরা যা গোপন করো এবং তোমরা যা প্রকাশ করো, তা আমি সম্যক অবগত। তোমাদের মধ্যে যে কেউ এটা করে সে তো বিচ্যুত হয় সরল পথ হতে। তোমাদেরকে কাবু করতে পারলে তারা হবে তোমাদের শত্রু এবং হাত ও জিহ্বা দ্বারা তোমাদের অনিষ্ট সাধন করবে এবং চাইবে যে, তোমরাও কুফরী করো। তোমাদের আত্মীয়-স্বজন ও সন্তান-সন্ততি কিয়ামতের দিন তোমাদের কোনো কাজে আসবে না। আল্লাহ্ তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করে দিবেন। তোমরা যা কর, তিনি তা দেখেন। (সূরা মুমতাহিনা : ১-৩)
হযরত হাতিব (রা) ইয়ামনের অধিবাসী ছিলেন। পূর্ণ নাম হাতিব ইব্ন আবূ বালতা'আ ইব্ন আম্র ইবন উমাইর ইবন সালামা ইবন সা'ব ইব্ন সাহল লাখামী। তিনি কুরায়শের বনূ আসাদ ইব্ন আবদুল উয্যার মিত্র ছিলেন। কেউ কেউ বলেন, হযরত যুবার (রা) এর মিত্র ছিলেন। তিনি যে বদরী সাহাবী ছিলেন সে ব্যাপারে সবাই একমত। বদরের যুদ্ধ ছাড়াও তিনি হুদায়বিয়ার যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। হযরত উসমান (রা)-এর খিলাফতকালে ৩০ হিজরীতে ৬৫ বছর বয়সে তিনি ইন্তিকাল করেন।
তিনি ইয়ামন থেকে মক্কায় এসে বসবাস করছিলেন। মক্কাবাসীদের সাথে তার কোনো আত্মীয়তা ছিল না। নবী-এর হিজরতের পর তিনি তাঁর পুত্রগণ ও ভাইদের ছেড়ে মদীনায় হিজরত করেন। সুতরাং মক্কার মুশরিকদের তরফ থেকে তাঁর সম্পদ-সন্তানের ক্ষতির আশংকা সততই ছিল। সেই আশংকায় তিনি (অজ্ঞতাবশত) এই কৌশল অবলম্বন করলেন যে, মক্কার মুশরিকদের প্রতি কিছু অনুগ্রহ দেখাবেন, যার দরুন তারা তাঁর সম্পদ-সন্তানের কোনো ক্ষতি করবে না। তাই তিনি মক্কার মুশরিকদের কাছে এই মর্মে এক চিঠি লিখলেন যে, “রাসূলুল্লাহ্ অমুক দিন তোমাদের উপর আক্রমণ করবেন।” মক্কার মুশরিকদের কাছে গোপনে এই চিঠিটা পৌঁছাবার জন্য তিনি একটি স্ত্রীলোককে প্রেরণ করলেন। আল্লাহ্ তা'আলা ওহীর মাধ্যমে তাঁর নবীকে এই রহস্য জানিয়ে দিলেন এবং তিনি ঐ চিঠি উদ্ধার করলেন। তাঁকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তাঁর সত্যতা স্বীকার করলেন এবং নবী-এর কাছে সব কথা খুলে বললেন। তিনি বললেন, আমি এ সব এই বিশ্বাস রেখেই করেছি যে, আল্লাহ্ আপনাকে এই যুদ্ধে অবশ্যই জয়লাভ করাবেন। আমার চিঠিতে ইসলামের এতটুকু ক্ষতি হবে না। কিন্তু আমার পরিবার-পরিজন ও মাল-আসবাব এই সামান্য উপকার দ্বারা রক্ষা পাবে। নবী ও শুধু তাঁর সত্যবাদিতার দরুন তাঁর ওযর কবুল করলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন। সাহাবাগণকেও জানিয়ে দিলেন যে, আমি তাঁকে এজন্য ক্ষমা করে দিয়েছি।
এই ঘটনা থেকেই প্রতীয়মান হয় যে, রাসূলুল্লাহ্ কি পরিমাণ ক্ষমা ও দয়া করতেন। যুদ্ধের তথ্য বিশেষ করে হামলার দিন-তারিখ দুশমনকে জানিয়ে দেওয়া হত্যাযোগ্য অপরাধ। আর এ কারণেই হযরত উমর (রা) তাঁকে হত্যা করার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন। কিন্তু নবী এতবড় অপরাধকেও নিছক তাঁর সত্যবাদিতা ও একনিষ্ঠতার দরুন ক্ষমা করে দিলেন এবং কোনো শাস্তি বিধান করলেন না।
۷۸ عَنْ أَبِي ذَرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ أَتِي رَسُولُ اللَّهِ ﷺ بِرَجُلٍ قَدْ شَرِبَ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ اضْرِبُوهُ فَمِنَّا الضَّارِبُ بِيَدِهِ، وَمِنَّا الضَّارِبُ بِنَعْلِهِ، وَمِنَّا الضَّارِبُ بِثَوْبِهِ ، فَلَمَّا انْصَرَفَ قَالَ الْقَوْمِ أَخْزَاكَ اللَّهُ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لا تَقُولُوا هَكَذَا وَلَا تُعِينُوا الشَّيْطَانَ عَلَيْهِ وَلَكِنْ قُولُوا رَحِمَكَ اللَّهُ -
৭৮. হযরত আবূ যার (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর নিকট এক মদ্যপ ব্যক্তিকে আনা হলো। তিনি লোকদেরকে বললেন: ওকে পিটাও। (বর্ণনাকারী বলেন, এ আদেশ পাওয়া মাত্রই) আমাদের মধ্য থেকে কেউ তাকে হাত দিয়ে মারা শুরু করলো, কেউ জুতা দিয়ে এবং কেউ কাপড় দিয়ে। এরপর সে যখন মারপিট খেয়ে চলে গেলো, তখন এক ব্যক্তি তাকে বদ্ দু'আ দিলো এবং বললো, আল্লাহ্ তোকে হেয় ও অপদস্থ করুন। তখন রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বললেন, এভাবে বলো না এবং এ কথা বলে তার উপর শয়তানকে প্রবল করো না। বরং বলো, আল্লাহ্ তোমার উপর রহম (দয়া) করুন।
ফায়দা : নবী ﷺ সবার সাথে সদ্ব্যবহার করতেন। কখনো কাউকে নিজেও বদ্ দু'আ করতেন না এবং অন্যকেও বদ্ দু'আ করতে নিষেধ করতেন। একজন মদ্যপায়ীকেও বদ্ দু'আ দেয়া তিনি পছন্দ করলেন না। আর যখন কেউ বদ্ দু'আ দিলো, তখন তাকেও তা থেকে বিরত রাখলেন, বললেন: বদ্ দু'আ করো না, বরং তার কল্যাণ কামনা করো। তবে তিনি ঐ মদ্যপায়ীকে মারপিট করার যে আদেশ করেছিলেন, তা ছিল মদপানের শাস্তিস্বরূপ। উল্লেখ্য যে, তখনো মদ্যপানের দণ্ড নির্ধারিত হয়নি, তাই মারপিট করে ছেড়ে দেন।
۷۹. عَنْ عَبْدِ اللهِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَسَمَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قِسْمًا، فَقَالَ رَجُلٌ مِّنَ الْأَنْصَارِ إِنَّ هَذِهِ القِسْمَةَ مَا أُرِيدُ بِهَا وَجْهُ اللَّهِ فَذُكِرَتْ ذَلِكَ لِلنَّبِيِّ ﷺ فَأَحْمَرُ وَجْهَهُ وَقَالَ رَحْمَةُ الله عَلَى مُوسَى قَدْ أُوْذِيَ بِأَكْثَرَ مِنْ هُذَا فَصَبَرَ -
৭৯. হযরত আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ ﷺ মালে গনীমত বণ্টন করছিলেন। জনৈক আনসারী (কটাক্ষ করে) বললো, এ বন্টনে আল্লাহ্র সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়নি। বর্ণনাকারী বলেন, এ কথা নবী ﷺ-এর কর্ণগোচর হলো। এ কথা শোনামাত্রই তাঁর চেহারা মুবারক লাল হয়ে উঠলো। তিনি বললেন, মূসা (আ)-এর উপর আল্লাহ্র রহমত হোক! তাঁকে এর চেয়েও বেশি কষ্ট দেয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি ধৈর্যধারণ করেছেন।
ফায়দা : আরব গোত্রসমূহের মধ্যে পরস্পর শত্রুতা ও দুশমনী সব সময় লেগেই থাকতো। নবী ﷺ যখন এ দুনিয়ায় আবির্ভূত হন, তখন তিনি তাঁদেরকে এক দীন ও এক পথে এনে দাঁড় করিয়ে দেন। তাঁদের মধ্যে ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ও ভালবাসার এমন আত্মা ফুঁকে দেন, যাতে তাদের মধ্যে ধীরে ধীরে প্রেম-ভালবাসা, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি হওয়া শুরু করলো। পুরানো শত্রুতা দূর হতে লাগলো। তা সত্ত্বেও এমন কিছু লোক অবশিষ্ট ছিল যাদের মধ্যে পূর্ণরূপে প্রেম-ভালবাসা সৃষ্টি হয়নি। বিশেষত আনসারগণ তাদের চাষাবাদে ব্যস্ত থাকার দরুন নবী-এর সাহচর্য থেকে যথোচিত উপকৃত হতে পারতো না। যেমন: একদিন যখন তিনি গনীমতের কিছু মাল সাহাবাদের মধ্যে বণ্টন করেছিলেন, তখন তাঁর বণ্টন খুব সুষ্ঠু হওয়া সত্ত্বেও ঐ ধরনের এক আনসারীর মনে অন্য গোত্রের লোককে সম্পদ লাভ করতে দেখে তার পুরানো শত্রুতা জাগ্রত হলো। সে (অজ্ঞানবশত) নবী-এর বণ্টনকে অবিচার বলে আখ্যায়িত করলো এবং তাঁর ব্যাপারে এই অশিষ্ট বাক্য প্রয়োগ করলো। কিন্তু নবী ঐ আনসার ব্যক্তির কথা শুনে ধৈর্য ধারণ করলেন এবং তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। তিনি উম্মতকে শিক্ষা দেয়ার জন্য বললেন, হযরত মুসা (আ)-কে আমার চেয়েও অধিক কষ্ট দেয়া হয়েছিল। তিনিও ধৈর্য ধারণ করেছিলেন। আমিও ধৈর্য ধারণ করছি। তোমরাও এরূপ ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করবে। এটাই নবীদের তরীকা বা পথ। নবী ইচ্ছা করলে ঐ আনসারকে তার ঔদ্ধত্যের শাস্তি দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি ক্ষমা করে দেন এবং তাকে কিছুই বললেন না। এই হচ্ছে তাঁর উদারনৈতিক শিক্ষা। এই নৈতিক উদারতা শক্তি দ্বারাই ইসলাম সারা বিশ্বে বিস্তার লাভ করছে।
عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لَا يُبَلِّغُنِي احَدٌ مِنْكُمْ عَنْ أَحَدٍ مِنْ أَصْحَابِي شَيْئًا فَانِي أُحِبُّ أَنْ أَخْرُجَ إِلَيْكُمْ وَأَنَا سَلِيمُ الصدر -
৮০. হযরত ইবন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ বলেছেন: তোমাদের মধ্যে কেউ আমার কোনো সাহাবী সম্পর্কে আমার কাছে কোনো অভিযোগ করবে না। কেননা, আমি তোমাদের সামনে যখন আসবো তখন তোমাদের ব্যাপারে আমার হৃদয় প্রশান্ত থাকুক— এটাই আমি চাই।
ফায়দা : আরব গোত্রসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও ভালবাসা অক্ষুণ্ণ রাখা এবং পারস্পরিক সুসম্পর্ক রাখার জন্য নবী ঘোষণা করেছিলেন যে, কোনো ব্যক্তি আমার কাছে কারো বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযোগ করবে না, যাতে তার প্রতি আমার মনে কোনো অসন্তোষ বা বিষণ্ণ ভাব জাগতে পারে। এ হাদীস নবী-এর ক্ষমা ও দয়ার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রমাণ। কেননা, কারো থেকে প্রতিশোধ নেয়ার ন্যূনতম মাধ্যম হচ্ছে তার সম্পর্কে কোনো কুৎসা শোনা বা প্রচার করা, যাতে তার অপমান হয় ও বদনাম রটে যায়। কিন্তু নবী তার শিকড়ই উপড়ে ফেলেন। সকল সাহাবাকে এই মর্মে নিষেধ করে দেন যে, তোমাদের কেউ কারো বিরুদ্ধে আমার কাছে কোনো অভিযোগ বা বদনাম করবে না, যাতে তোমাদের প্রতি আমার মন সর্বদা পরিষ্কার থাকে এবং আমি তোমাদের প্রত্যেকের সাথে ইনসাফ ও সুবিচারমূলক আচরণ করি। আর এই উত্তম আদর্শই )اُسْوَةُ حَسَنَةً( আমার সমস্ত উম্মত নিজেদের বৈশিষ্ট্য )شعار( বানাবে। এখানে স্মর্তব্য যে, কারো বদনাম শোনা ও শোনানোর মধ্যেই পারস্পরিক সম্পর্কে অবনতির বীজ উপ্ত থাকে। নবী তাঁর উপরোক্ত ঘোষণার মাধ্যমে তার মূলোৎপাটন করতে চেয়েছেন।
টিকাঃ
১. প্রকাশ থাকে যে, الاقرب فالاقرب )যে সবচেয়ে নিকটবর্তী সে সবচেয়ে প্রথম হকদার) এই নীতি অনুযায়ী হযরত যুবায়র (রা)-এর পানি সেচ অধিকার ছিল আনসারীর পূর্বে। তাছাড়া ফসলের ক্ষেত বা বাগানের আল পর্যন্ত পানি বেঁধে রাখা প্রত্যেক ক্ষেত বা বাগান মালিকের অধিকার। তাই রাসূলুল্লাহ্-এর প্রথম উক্তি উভয় পক্ষের মধ্যে মীমাংসার ভিত্তিতে ছিল এবং দ্বিতীয় নির্দেশ ছিল আইনের বিচার।
📄 নবী (সা)-এর ক্ষমাগুণ সম্পর্কিত বর্ণনা
৬৫. হযরত মুআবিয়া ইন্ন হায়দা (রা) থেকে বর্ণিত যে, তাঁর গোত্রের জনৈক ব্যক্তি নবী-এর কাছে হাযির হয়ে বললো, আমার পড়শীদেরকে কোন্ অপরাধে বন্দী করা হয়েছে? নবী তার এই ঔদ্ধত্যের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করলেন না। ফলে সে তাঁকে হুমকি দিয়ে বললো, আমি যদি একথা সবার সামনে বলে দেই, তবে তারা ভাববে যে, তুমি তো লোকদেরকে অন্যায় ও জুলুম করা থেকে বারণ করো কিন্তু নিজে তা মেনে চলো না। এ কথা শুনে তৎক্ষণাৎ তার ভাই উঠে দাঁড়ালো এবং বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! সে তার দুর্ব্যবহার থেকে বিরত থাকবে (আমি তার দায়িত্ব নিলাম) তখন তিনি বললেন, শোনো! তোমরা যদি একথা বলেও থাকো এবং আমি যদি এ কাজ করেও থাকি, তবে মনে রেখো! আমিই তার প্রতিফল ভোগ করবো, তোমরা নয়। তারপর তিনি সাহাবাগণকে বললেন, ঐ ব্যক্তির পড়শীদেরকে মুক্ত করে দাও।
ফায়দা : এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (র)-এর মুসনাদে এর চেয়ে বিস্তারিতভাবে বিবৃত হয়েছে। হযরত মুআবিয়া ইন্ন হায়দা (রা) বলেন, নবী আমার গোত্রের কতিপয় লোককে কোনো এক অভিযোগের ভিত্তিতে বন্দী করেছিলেন। সেই ব্যাপারে আমার গোত্রের জনৈক ব্যক্তি তাঁর নিকট উপস্থিত হলো, তিনি তখন খুত্বা দিচ্ছিলেন। সে (রাগান্বিত অবস্থায়ই অত্যন্ত অভদ্রভাবে) বললো, আমার পড়শীদেরকে কেন বন্দী করা হয়েছে? নবী চুপ রইলেন। কোনো জবাব দিলেন না। তারপর সে তাঁকে ধমক দিয়ে বললো (আমি যদি আপনার এই অত্যাচারমূলক কার্যকলাপ জনসমক্ষে তুলে ধরি, তবে লোকেরা বলবে, আপনি অন্য লোকদেরকে তো জুলুম অত্যাচার ও নির্যাতন-উৎপীড়ন থেকে বারণ করেন, কিন্তু অহেতুক নিজে তা থেকে বিরত থাকেন না। রাসূলুল্লাহ্ তার কথা সম্পূর্ণ শুনতে পাননি, তাই) লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এই লোকটি কি বলছে? মুআবিয়া ইবন হায়দা (রা) বলেন, (আমি একথা শুনে সামনে অগ্রসর হলাম এবং) উভয়ের কথাবার্তার মাঝখানে অন্তরায় সাজলাম। আমার আশংকা ছিল, নবী যদি আমার গোত্রকে বদ-দু'আ করেন, তবে তাদের কখনো কল্যাণ হবে না। কিন্তু একটু পরেই তিনি ঐ ব্যক্তির কথা বুঝতে পারলেন এবং বললেন, লোকেরা তো একথা বলেছে (এবং অপবাদ দিয়েছে) এবং ভবিষ্যতেও এরূপ বলবে। কিন্তু আল্লাহ্র কসম! আমি যদি এরূপ করি, তবে তার প্রতিফল আমি ভোগ করবো তারা নয়! এরপর তিনি সাহাবাগণকে নির্দেশ দিলেন যে, ঐ ব্যক্তির পড়শীদেরকে মুক্তিদান করো।
এ হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রাসূলুল্লাহ্ কত বড় ভদ্র ও মহান চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। লোকদের অহেতুক অভদ্র ও অশালীন আচরণ সত্ত্বেও তিনি তাদের সাথে সর্বদা ক্ষমা ও দয়াই প্রদর্শন করতেন। কখনো প্রতিশোধ নিতেন না। মুখ দিয়ে খারাপ কথা সর্বদা উচ্চারণ করতেন না, শাস্তিও দিতেন না। এমনকি তাদেরকে বদ-দু'আও করতেন না। বরং সম্পূর্ণ ক্ষমা করে দিতেন। তাঁর গোটা জীবন-চরিত ও সমগ্র ঘটনাই এ কথার সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপারে কারো থেকে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি।
সহীহ্ বুখারীতে শিষ্টাচার অধ্যায়ে (২য় খণ্ড, ৯০৪ পৃষ্ঠা) হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ কখনো তাঁর নিজের ব্যাপারে কারো থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। তবে আল্লাহ্ দীন ও তাঁর বিধি-বিধানের অবমাননা করা হলে তার প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন।
٦٦ حَدَّثَ عَبْدُ اللهِ بْنِ الزُّبَيْرِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رِجَالًا مِنَ الْأَنْصَارِ خَاصَمُوا الزُّبَيْرَ فِي شِرْجٍ مِنْ شَرَاجِ الْحَرَّةِ الَّتِي يَسْقُوْنَ بِهَا الْمَاءَ ، فَغَضِبَ الأَنْصَارِيُّ وَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ إِنْ كَانَ ابْنُ عَمَّتِكَ ، فَتَلَوْنَ وَجْهُ النَّبِيِّ وَقَالَ اسْقِ يَازُبَيْرُ ثُمَّ احْبِسِ الْمَاءَ حَتَّى يَبْلُغَ الْجُدُرَ ثُمَّ ارْسِلِ الْمَاءَ إلى جَارِكَ -
৬৬. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র (রা) থেকে বর্ণিত যে, (একবার আমার পিতা) হযরত যুবায়র (রা)-এর সাথে মদীনার প্রস্তরময় অঞ্চলের এমন এক পানির নালার ব্যাপারে এক আনসারীর বিবাদ হলো যা থেকে (আশপাশের) লোকটি (তাদের ক্ষেত ও বাগানসমূহের) পানি সেচ দিতো। শেষে এই বিবাদ নবী -এর দরবারে পেশ হলো। তিনি সে বিবাদ মীমাংসা করলেন। ঐ আনসারী তার বোকামি ও বক্রবুদ্ধির দরুন এ মীমাংসাকে যুবায়রের প্রতি পক্ষপাতিত্ব বলে গণ্য করলো এবং ক্রুদ্ধ হয়ে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! যুবায়র আপনার ফুফাত ভাই। (এজন্য আপনি তার পক্ষপাতিত্ব করেছেন। যেহেতু এটি ছিল তাঁর সততা ও ন্যায় বিচারের বিরুদ্ধে আক্রমণ) তাই তাঁর মুখমণ্ডল মুবারক রাগে লাল হয়ে উঠলো। কিন্তু তিনি ঐ অভদ্র আনসারীকে কিছুই বললেন না এবং যুবায়র (রা)-কে বললেন: যুবায়র! তুমি তোমার ক্ষেতে পানি সেচ করো এবং ক্ষেতের আল পর্যন্ত পানি জমিয়ে রেখে তারপর তোমার পড়শীর ক্ষেতে পানি ছেড়ে দাও।
ফায়দা: গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য ছিল যেহেতু রাসূলুল্লাহ্ -এর ক্ষমা গুণের বর্ণনা দেয়া, তাই তিনি ক্ষমার সাথে সম্পর্কিত এই হাদীসের শেষ অংশটুকু শুধু বর্ণনা করেন। মিশকাত শরীফে (পৃষ্ঠা ২৫৯) পুরো হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। তাতে আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র (রা) বর্ণনা করেন যে, (প্রথম অর্থাৎ আনসারী কর্তৃক রাগান্বিত করার পূর্বে) রাসূলুল্লাহ হযরত যুবায়র (রা)-কে বলেন, যুবায়র! তুমি (তোমার ক্ষেতে প্রয়োজন পরিমাণ) পানি সেচ করো। তারপর তোমার পড়শীর (ক্ষেতের) দিকে পানি ছেড়ে দাও। নবী কর্তৃক হযরত যুবায়র (রা)-কে এই পরামর্শ দান ছিল পড়শীর অধিকার ও প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করার ভিত্তিতে। কিন্তু নির্বোধ আনসারী তাকে যুবায়রের প্রতি পক্ষপাতিত্ব মনে করে ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলো (এবং) বললো, যুবায়র আপনার ফুফাত ভাই বলে আপনি তার পক্ষপাতিত্ব ও আমার অধিকার হরণ করছেন। তখন নবী নির্দেশ দিলেনঃ হে যুবায়র! তুমি তোমার ক্ষেতে পানি সেচ করো এবং তোমার ক্ষেতের আল পর্যন্ত পানি বেঁধে রাখো। তারপর তোমার পড়শীর ক্ষেতের দিকে পানি ছেড়ে দিবে। বর্ণনাকারী হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র (রা) বলেন, আনসারী যখন পক্ষপাতিত্বের অপবাদ দিয়ে রাসূলুল্লাহ -কে রাগান্বিত করে দিলো, তখন তিনি বিচার নীতির স্পষ্ট বিধি অনুযায়ী যুবায়রের অধিকার১ তাকে পুরোপুরি দিয়ে দেন। এর পূর্বে তিনি (উভয়ের সুবিধা ও প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে) মীমাংসা করার ভিত্তিতে এমন এক পরামর্শ দিয়েছিলেন যাতে উভয়ের জন্য সুবিধা ছিল।
হাদীস থেকে রাসূলুল্লাহ্-এর উদার মানসিকতা সম্পর্কে অনুমান করুন। আনসারী নবী-এর সততা ও আমানতদারীর উপর আক্রমণ করছে, অধিকার হরণ ও পক্ষপাতিত্বের অপবাদ দিচ্ছে, প্রচণ্ড ক্রোধে তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল রক্তিমবর্ণ ধারণ করছে। কিন্তু তাঁর পবিত্র মুখ থেকে একটি বাক্যও উচ্চারিত হচ্ছে না। কেননা, তিনি জানেন যে, ঐ ব্যক্তি যদিও মুসলমান তবে নির্বোধ ও ক্রোধে অভিভূত। তার কথায় উত্তেজিত হওয়া ঠিক নয়। কিন্তু তার হুঁশিয়ারি ও শিক্ষার জন্য হযরত যুবায়র (রা)-কে তার পূর্ণ অধিকার বুঝে নিতে বললেন। আর এটাই হচ্ছে ক্রোধ সংবরণ করা ও অপরাধীর অপরাধ ক্ষমা করার উত্তম আদর্শের উচ্চতম মাপকাঠি, যে সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন: وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّسِ وَاللَّهِ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ - সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল, আল্লাহ্ সৎকর্মপরায়ণদেরকে ভালবাসেন। (সূরা আলে ইমরান: ১৩৪)
কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তার নিষ্পাপ নবীর উপর এই পক্ষপাতিত্বের অপবাদ সহ্য করেননি! এবং তৎক্ষণাৎ আয়াত নাযিল করে উম্মতকে জানিয়ে দিলেন যে, নবী -এর ফয়সালাকে তা নিজের মনঃপূত হোক কিংবা না হোক মনেপ্রাণে গ্রহণ ও মান্য করা ছাড়া আল্লাহর নিকট তোমাদের ঈমানও সঠিক নয়। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন:
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا -
৬৯. হযরত জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ মাহারিবে খাসফা নামক স্থানে (বানু গাতফানের সাথে) যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে অবস্থান করছিলেন। (যুদ্ধ তখনো শুরু হয়নি কিন্তু) কাফিররা মুসলমানদের অসতর্কতার সুযোগ খুঁজছিল। জনৈক কাফির চুপিসারে এসে রাসূলুল্লাহ্ -এর শিয়রে দাঁড়ালো (তিনি তখন একটি গাছের নিচে আরাম করছিলেন) এবং বলল, এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? তিনি বললেন, আল্লাহ্! তৎক্ষণাৎ তার হাত থেকে তলোয়ার পড়ে গেলো। রাসূলুল্লাহ্ তলোয়ারটি তুলে নিলেন এবং বললেন, এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? সে বললো, আপনি ক্ষমতা পেয়ে উত্তম গ্রেফতারকারী হন। সুতরাং আপনি আমার জীবন রক্ষা করে উত্তম অনুগ্রহকারী হওয়ার প্রমাণ দিন। তিনি বললেন : তুমি কি সাক্ষ্য দিচ্ছো যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোনো মা'বুদ নেই আর আমি হচ্ছি আল্লাহ্র রাসূল? সে বললো, না অবশ্য আমি (অঙ্গীকার করছি যে) আপনার বিরুদ্ধে কখনো যুদ্ধ করবো না। (কোনো যুদ্ধে) আপনার সাথেও যোগদান করবো না এবং আপনার প্রতিপক্ষের সাথেও যোগদান করবো না। রাসূলুল্লাহ্ তাকে ছেড়ে দিলেন। সে তার সঙ্গীদের কাছে এলো। এবং বললো, আমি সর্বোত্তম ব্যক্তির হাত থেকে মুক্তি পেয়ে তোমাদের কাছে এসেছি।
ফায়দা : মাহারিবে খাসফা যুদ্ধের প্রসিদ্ধ নাম 'যাতুর্ রিকা'। এ যুদ্ধকে 'যাতুর্ রিকা' বলার কারণ, প্রস্তর কংকরময় ভূমিতে সফর করার দরুন মুসলমানদের পা যখম হয়ে গিয়েছিল এবং তাঁরা পায়ে পট্টি বেঁধে রেখেছিলেন। কোনো কোনো চরিতকার বলেন, 'যাতুর রিকা' হচ্ছে একটি লাল ও সাদা-কালো প্রস্তরময় পাহাড়ের নাম এবং এই যুদ্ধের নামকরণও পাহাড় করা হয়েছে। বানু গাতফানের বিপুল সংখ্যক লোক মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য সমবেত হয়েছিল। কিন্তু তাদের হামলা করার সাহস হয়নি, তাই যুদ্ধ হয়নি। এ ঘটনা ঘটেছিল চতুর্থ হিজরীর মুহররম কিংবা জমাদিউল আউয়াল মাসে।
এ ঘটনাও রাসূলুল্লাহ্ -এর আল্লাহ্ প্রদত্ত গুণ ক্ষমা ও দয়ার অনুপম দৃষ্টান্ত। জাগতিক কর্মকৌশল ও ফন্দি-ফিকিরের দিকে দৃষ্টিপাতকারীদের মতে এ হামলা ও শত্রুকে জীবিত ছেড়ে দেওয়ার কোনো সঙ্গত কারণ ছিল না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ -এর দৃষ্টি ছিল সমস্ত কারণের আদি কারণ আল্লাহ্ তা'আলার প্রতি। এজন্য তিনি ঐ ব্যক্তিকে ছেড়ে দেন। রাসূলুল্লাহ্ -এর এই ক্ষমা ও দয়ার কি ফল হয়েছিল? স্বগোত্রীয়দের কাছে গিয়ে তাঁর সম্পর্কে সে যে সাক্ষ্য দিয়েছিল তাতেই তা প্রতিভাত হয়।
عَنْ أَسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّهُ أَخْبَرَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ رَكِبَ .
عَلَى حِمَارٍ فَقَالَ لِسَعْدٍ أَلَمْ تَسْمَعْ مَا قَالَ أَبُو الْحُبَابُ يُرِيدُ عَبْدَ اللَّهِ بْنِ أَبَيِّ قَالَ كَذَا وَكَذَا فَقَالَ سَعْدُ بْنُ عُبَادَةَ اعْفُ عَنْهُ وَاصْفَحْ، فَعَفَا عَنْهُ رَسُولُ اللهِ الله
وَكَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَأَصْحَابُهُ يَعْفُوْنَ عَنْهُ أَهْلَ الْكِتَابَيْنِ وَالْمُشْرِكِينَ فَأَنْزَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ فَاعْفُوا وَاصْفَحُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ -
৭০. হযরত উসামা ইব্ন যায়দ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বর্ণনা করেন যে, একবার রাসূলুল্লাহ গাধার উপর সাওয়ার ছিলেন। [হযরত সা'দ ইবন উবাদা (রা)-এর শুশ্রূষার জন্য তিনি গমন করছিলেন। তিনি সা'দ ইব্ন উবাদা (রা)-কে (তাঁর গৃহে পৌঁছে) বললেন, তুমি কি শোননি আবূ হুবাব অর্থাৎ আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই (মুনাফিক নেতা) কি বলেছে? তিনি তার কথার পুনরুক্তি করে বললেন, সে আমাকে এরূপ এরূপ বলেছে। তখন সা'দ ইব্ন উবাদা (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি তাকে ক্ষমা করে দিন এবং উপেক্ষা করুন। তিনি তাকে ক্ষমা করে দিলেন। (বর্ণনাকারী বলেন) রাসূলুল্লাহ্ ও তাঁর সাহাবা কিরাম সাধারণত আহলি কিতাব ও মুশরিকদের এরূপ কটুবাক্য ও ক্লেশদানকেও অনুরূপ ক্ষমা করে দিতেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ (প্রশংসারূপে) এই আয়াত নাযিল করেন:
فَاعْفُوا وَاصْفَحُوْا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرُ -
তোমরা ক্ষমা করো ও অপেক্ষা করো যতক্ষণ না আল্লাহ্ (যুদ্ধ ও প্রতিশোধের) কোনো নির্দেশ দেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।
ফায়দা : এখানেও যেহেতু গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে রাসূলুল্লাহ্-এর ক্ষমা ও দয়া গুণের বর্ণনা করা, সেহেতু পূর্ণ হাদীস বর্ণনা করেননি। বরং ঐ সংক্রান্ত অংশটুকু বর্ণনা করাকেই যথেষ্ট মনে করেছেন। পূরো হাদীসটি সহীহ বুখারীতে উল্লিখিত হয়েছে: একবার রাসূলুল্লাহ্ হযরত সা'দ ইব্ন উবাদা (রা)-এর শুশ্রূষার জন্য গাধার উপর আরোহণ করে রওয়ানা করেন। তাঁর পিছনে তিনি উসামা ইব্ন যায়দ (রা)-কে বসিয়ে নেন। তিনি একটি জনসমাবেশের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে মুনাফিক-নেতা আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই ইব্ন সালূলও উপস্থিত ছিল। সমাবেশে উপস্থিতদের মধ্যে মুসলমান, ইয়াহূদী, মুশরিক সবাই ছিলো। নবী-এর বাহনের চলার কারণে যখন ধুলাবালি উড়ে গিয়ে সমাবেশে পড়লো, তখন আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই তার নাকে চাদর গুঁজে দিলো এবং নবী-কে বললো, দেখো, আমাদের উপর ধুলি উড়িয়ো না। তোমার গাধার ধুলোবালি আমার দেমাগ খারাপ করে দিয়েছে। নবী তার কথায় কর্ণপাত করলেন না এবং সমাবেশে উপস্থিত জনতাকে সালাম করে বাহন থেকে নেমে অমুসলিমদের ইসলামের দাওয়াত দেওয়া শুরু করেন। কিন্তু সে (আবদুল্লাহ্) তাঁকে সম্বোধন করে বললো, দেখো, এটা ঠিক না, আমাদের সভায় এসে আমাদের বিব্রত করবে না। তুমি তোমার বাহনের উপর উঠো এবং যে তোমার কাছে যাবে তাকে তোমার দীনের দাওয়াত দাও। তখন আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহা (রা) যিনি ঐ সভায় উপবিষ্ট ছিলেন-নবীকে বললেন, আপনি অবশ্যই আমাদের সভা-সমাবেশে আগমন করবেন। আমরা আপনার আহ্বান ও বক্তব্য পছন্দ করি। এ নিয়ে কথা কাটাকাটি এতই বেড়ে গেলো যে, মুসলিম, ইয়াহুদী ও মুশরিকদের পরস্পরের মধ্যে বচসা, গালিগালাজ ও হাতাহাতি পর্যন্ত গড়ায়। এমনকি যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার আশংকা দেখা দেয়। কিন্তু নবী অতিকষ্টে তাদেরকে থামিয়ে দেন এবং ব্যাপারটি মিটমাট হয়ে যায়। এরপর তিনি তাঁর বাহনের উপর আরোহণ করে সাদ ইবন উবাদা (রা)-এর বাড়িতে গমন করেন এবং তাঁর সাথে সাক্ষাৎকালে তাঁকে বলেনঃ হে সা'দ্! তুমি কি শোননি যে, একটু আগে আবূ হুবাব অর্থাৎ আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই ইব্ন সালূল কি বলেছে? সাদ (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি তাকে ক্ষমা করুন এবং তার কথার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করবেন না।
এটি ইসলামের প্রথম দিকের ঘটনা। তখনো জিহাদ ও যুদ্ধের হুকুম নাযিল হয়নি। তখন মুসলিমদের প্রতি নির্দেশ ছিল ঐসব কাফির ও ইয়াহুদীদের নিকট থেকে কোনোরূপ প্রতিশোধ না নেয়ার এবং তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ও যুদ্ধ করার নির্দেশ নাযিল না হওয়া পর্যন্ত ক্ষমা ও উপেক্ষা করে চলার। কিন্তু নবী এত উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন যে, জিহাদ ও যুদ্ধের হুকুম নাযিল হওয়ার পরও তিনি মদীনার ঐ সব মুনাফিককে তাদের মুনাফিকী ও ইসলামের বিরোধিতার জন্য শাস্তি দেননি এবং তাদের বিরুদ্ধে কখনো যুদ্ধ করেননি। এই ক্ষমা ও দয়ার ফলেই ক্রমে ক্রমে সমস্ত মুনাফিক অবশেষে একনিষ্ঠ মুসলমান হয়ে যায়। কেবল কয়েকজন ছাড়া, যারা তাদের মুনাফিক থাকা অবস্থায়ই বিভীষিকাময় মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে।
۷۱. عَنِ الزُّهْرِيُّ حَدَّثَنِي عُمَارَةَ بْنُ خُزَيْمَةَ أَنَّ عَمَّهُ حَدَّثَهُ (وَهُوَ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيُّ ( أَنَّ النَّبِيَّ وَابْتَاعَ فَرَسًا مِنْ أَعْرَابِي فَاسْتَتْبَعَهُ النَّبِي لِيُعطيه ثَمَنَ فَرَسِهِ فَأسْرَعَ النَّبِيُّ الْمَشْيَ وَابْطَأَ الْأَعْرَابِيُّ فَطَفِقَ رِجَالٌ يُعَرِضُوْنَ لِلأَعْرَابِي يُسَارِمُونَهُ بِالْفَرَسِ لَا يَشْعُرُونَ أَنَّ النَّبِيَّ ابْتَاعَهُ حَتَّى زَادَ بَعْضُهُمْ لِلْأَعْرَابِي فِي السَّوْمِ عَلَى الثَّمَنِ الَّذِي ابْتَاعُهُ النَّبِي فَنَادَى الْأَعْرَابِيُّ فَقَالَ لَئِنْ كُنْتَ مُمْتَاعًا هُذَا الْفَرَسَ فَابْتَعْهُ وَإِلَّا بِعْتُهُ فَقَالَ النَّبِيُّ حِيْنَ سَمِعَ نِدَاءَ الْأَعْرَابِي أَوَلَيْسَ قَدْ ابْتَعْتُهُ فَقَالَ لَا وَاللَّهِ مَا بِعْتَكَ فَقَالَ بَلَى قَدِ ابْتُعْتُهُ مِنْكَ ، فَطَفِقَ النَّاسُ يَلُؤْذُونَ بِالنَّبِيِّ الله وَالأَعْرَابِي يَقُولُ هُلَمَّ شَهِيدًا فَلْيَشْهَدْ أَنَّى قَدْ بَايَعْتُكَ ، فَمَنْ جَاءَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ قَالَ لِلأَعْرَابِي وَيْلَكَ أَنَّ النَّبِيُّ وَ لَمْ يَقُولُ الأَحَقَّا .
৭১. যুহরী (র) বলেন, আমার নিকট উমারা ইবন খুযায়মা (র) বর্ণনা করেন যে, আমার নিকট আমার চাচা (যিনি নবী-এর একজন সাহাবী ছিলেন) বর্ণনা করেন। নবী একবার কোনো এক বেদুঈনের নিকট থেকে একটি ঘোড়া ক্রয় করেন এবং মূল্য পরিশোধ করার জন্য তাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা হন। নবী জোর কদমে অগ্রসর হচ্ছিলেন। আর ঐ বেদুঈন চলছিলো ঢিমে-তেতালা গতিতে। (ফলে ঐ বেদুঈন নবী এর অনেক পেছনে পড়ে গেলো) এবং লোকেরা তাকে রাস্তায় থামিয়ে ঘোড়াটি ক্রয় করার কথাবার্তা শুরু করলো। তারা জানতো না যে, এ ঘোড়াটি নবী খরিদ করেছেন। সুতরাং কেউ কেউ ঐ ঘোড়াটির মূল্য নবী-এর স্থিরীকৃত মূল্যের চেয়েও অধিক হাঁকালো। এই অবস্থা দেখে বেদুঈনের মনে গোলমাল দেখা দিলো। সে নবী-কে ডেকে বললো, আপনি যদি এ ঘোড়াটি ক্রয় করতে চান, তবে ক্রয় করুন নতুবা আমি অন্য কারো কাছে বিক্রি করে দেবো। নবী বেদুঈনের কথা শুনে বললেন, আরে আমি কি তোমার কাছ থেকে ঘোড়াটি ক্রয় করিনি? সে বললো, না। আল্লাহ্র কসম! আমি ঘোড়াটি আপনার কাছে বিক্রি করিনি। নবী বললেন, তুমি এ কি বলছো! আমি তো তোমার নিকট থেকে ঘোড়াটি ক্রয় করেছি। নবী ও বেদুঈনের আশপাশে লোকজন জড়ো হতে শুরু করলো। তখন বেদুঈন বলতে লাগলো, (আচ্ছা) আপনি যদি সত্যবাদী হন, তবে আমি যে আপনার কাছে ঘোড়াটি বিক্রি করেছি এ ব্যাপারে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থিত করুন। কিন্তু সেখানে যে মুসলিমই আসতো, সেই ঐ বেদুঈনকে বলতো যে, আরে হতভাগা! নবী তো সত্য ছাড়া কিছু বলতেই পারেন না।
ফায়দা: দেখুন, এ ঘটনায় হতভাগা বেদুঈন তার গোয়ার্তুমির দরুন নবী-এর সততা ও সাধুতার উপর কত বড় আক্রমণ করলো। একজন নিরীহ সাধারণ মানুষও এরূপ ঔদ্ধত্য সহ্য করতে পারে না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ কৃপা ও করুণার মূর্ত প্রতীকরূপে বেদুঈনের কথা শ্রবণ করেন। তাকে কিছুই বললেন না। আল্লাহ্ সত্যই বলেছেন (بِالْمُؤْمِنِينَ رَقُفُ رَّحِيمٌ )মু'মিনদের প্রতি তিনি বড়ই দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু। (সূরা তাওবা: ২৮)
۷۲. عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتِ ابْتَاعَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ جَزُورًا مِنْ أَعْرَابِي بِوَسَقٍ مِّنْ تَمَرِ النَّخِيرَةِ - فَجَاءَ بِهِ إِلَى مَنْزِلِهِ فَالْتَمَسُ التَّمَرُ فَلَمْ يَجِدْهُ فِي الْبَيْتِ قَالَ فَخَرَجَ إِلَى الْأَعْرَابِي فَقَالَ يَا عَبْدَ اللَّهِ أَنَّا ابْتَعْنَا مِنْكَ جزُورَكَ هُذَا بِوَسَقٍ مِنْ تَمَرِ النَّخِيرَةِ نَحْنُ نَرَى أَنَّهُ عِنْدَنَا فَلَمْ نَجِدْهُ، فَقَالَ الْأَعْرَابِيُّ وَاغْدَرَاهُ وَاغَدْرَاهُ فَوَكَزَهُ النَّاسُ وَقَالُوا لِرَسُولِ تَقُولُ هَذَا ؟ فَقَالَ دَعُوهُ -
৭২. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ জনৈক বেদুঈন থেকে এক 'ওয়াসাক' মওজুদ কৃত খেজুরের বিনিময়ে একটি উট ক্রয় করলেন (তাঁর ধারণা ছিল গৃহে খেজুর মওজুদ আছে) তাই তিনি তাকে গৃহে নিয়ে এলেন এবং খেজুর তালাশ করলেন, কিন্তু খেজুর পাওয়া গেলো না। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তৎক্ষণাৎ বেদুঈনের কাছে গেলেন এবং তাকে বললেন, হে আল্লাহ্র বান্দা! আমি তোমার নিকট থেকে এক 'ওয়াসাক' খেজুরের বিনিময়ে তোমার এই উটটি ক্রয় করেছিলাম। আমার ধারণা ছিল, খেজুর আমার কাছে মওজুদ আছে, কিন্তু এখন দেখলাম নেই। এ কথা শুনে বেদুঈন বললো, হায় ধোঁকাবাজি! হায় ধোঁকাবাজি!! তখন লোকেরা তাকে ঘুষি মারা শুরু করলো এবং বললো, হতভাগা! রাসূলুল্লাহকে এরূপ কথা বলছো! তখন তিনি বললেন, তোমরা তাকে ছেড়ে দাও।
ফায়দা: রাসূলুল্লাহ্ কোনো নিয়ম বিরোধী কথা বলেননি। প্রায়ই এরূপ ঘটনা ঘটে থাকে। এটাকে প্রতারণা ও অসাধুতা বলা যায় না। কেননা, তখনো বিক্রীত দ্রব্য বিক্রেতার নিকটই ছিল। কিন্তু ঐ বেদুঈন ব্যক্তি তার গোয়ার্তুমি ও মূর্খতার দরুন নবী -কে অসাধু ও প্রতারক বলে তাঁকে চরমভাবে অপমানিত করেছে। লক্ষণীয় যে, অজ্ঞতার দরুন নবী-কে গালমন্দ করা ধর্মত্যাগ ও হত্যাযোগ্য অপরাধ না হলেও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ-এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যেহেতু এ বিষয়টি ছিল স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ এর পবিত্র সত্তার সাথে সম্পর্কিত, তাই তিনি তাঁর মর্যাদা অনুযায়ী ঐ বেয়াদব ও দুষ্ট লোকটিকে শাস্তি না দিয়ে ক্ষমা করে দেন।
۷۳. عَنْ مَهْدِي بْنِ عِمْرَانَ قَالَ رَأَيْتُ أَبَا الطُّفَيْلِ جِيئَ بِهِ فِي كَسَاءِ وَالْقِيَ فِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ فَقِيلَ هُذَا قَدْ رَأَى النَّبِيُّ فَدَنَوْتُ مِنْهُ فَقَالَ رَأَيْتُ رَسُولُ اللَّهِ وَ فَاتَّبَعْتُهُ حَتَّى أَتَى دَارًا فَدَفَعَ بَابَهَا فَدَخَلَ فَإِذَا لَيْسَ فِي الدَّارِ إِلَّا قَطِيفَةُ فَنَفَضَهَا فَإِذَا رَجُلٌ أَعْوَرُ فَقَالَ أَشْهَدُ أَنِّي رَسُولُ اللَّهِ ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ لا تَعْوَذُوا بِاللَّهِ مِنْ شَرِّ هَذَا -
৭৩. মাহদী ইব্ন ইমরান (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি দেখলাম, হযরত আবূ তোফায়ল (রা)-কে মসজিদে হারামে নিয়ে এসে শায়িত করা হয়েছে। তিনি তখন চাদরে আবৃত ছিলেন। কেউ বলেন, ইনি নবীকে দর্শন করেছেন। অর্থাৎ আবূ তোফায়ল (রা) নবী-এর সাহাবী ছিলেন। মাহ্দী ইব্ন ইমরান (রা) বলেন, আমি হযরত আবূ তোফায়ল (রা)-এর কাছ থেকে হাদীস শোনার জন্য তাঁর নিকট গেলাম। তিনি বললেন, একবার আমি রাসূলুল্লাহ্-কে কোথাও যেতে দেখলাম। আমিও তাঁর পেছনে পেছনে রওয়ানা হলাম। তিনি একটি গৃহে উপস্থিত হলেন এবং দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন। গৃহে একটি কম্বল পড়ে ছিলো। কম্বলটি ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। তিনি ঐ কম্বলটি ধরে হেঁচকা টান মারলেন। তার মধ্য থেকে একটি কানা (একচক্ষু বিশিষ্ট) লোক বেরিয়ে এলো। সে রাসূলুল্লাহ্-কে বললো, আপনি কি সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, আমি আল্লাহর রাসূল? তখন রাসূলুল্লাহ্ বললেন, হে লোক সকল! তোমরা তার অনিষ্ট থেকে আল্লাহর পানাহ চাও।
ফায়দা: এই ব্যক্তি ছিল ইব্ন সায়্যাদ। সহীহ বুখারী ও হাদীসের অন্যান্য কিতাবে তার কাহিনী সবিস্তার বর্ণিত হয়েছে। ইব্ন সায়্যাদের ডাকনাম 'সাফ' এবং এক বর্ণনা মতে আবদুল্লাহ্। এ ছিল মদীনার এক ইয়াহুদী। এর সম্পর্কে বর্ণনাকারীদের বিভিন্ন উক্তি রয়েছে। কেউ কেউ তাকে দাজ্জালও বলেন। বর্ণনাসমূহ থেকে জানা যায়, সে প্রতিশ্রুত দাজ্জাল না হলেও ফিত্না সৃষ্টিতে কমও ছিল না। বাল্যকাল থেকেই গণক ও জাদুকরের মতো কথা বলতো। আল্লাহ্ তা'আলা মুসলিমদের পরীক্ষার জন্য তাকে সৃষ্টি করেছিলেন। প্রথমে সে নিজেকে নবী বলে দাবি করতো। কিন্তু শেষে ইসলাম গ্রহণ করে। মুসলমানদের সাথে হজ্জ ও জিহাদ প্রভৃতিতেও শরীক হয়। কিন্তু তারপরও সে এই ধরনের উচ্ছৃংখল কথাবার্তা বলতো। গ্রন্থকারের এই হাদীসটিও এ স্থলে বর্ণনা করার কারণ হচ্ছে, এ ধরনের উচ্ছৃংখলতা ও ধৃষ্টতা ছাড়াও সে নবী-এর সামনে নিজেকে নবী বলে দাবি করে এবং স্বয়ং নবী-কেই তার উপর ঈমান আনার জন্য আহ্বান করে। নবী তাকে হত্যা করেননি এবং কোনো শাস্তিও দেননি। কারণ সে ছিল তখন বালক। তাছাড়া মদীনার ইয়াহূদীর সাথে তখন নবী সন্ধিবদ্ধও ছিলেন। অবশ্য তিনি লোকদেরকে তার অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য সাবধান করে দেন।
٧٤ عَنْ أَنَسٍ أَنَّ يَهُودِيَّةً اَتَتِ النَّبِيُّ بِشَاةٍ مُسْمُوْمَةٍ لِيَأْكُلَ مِنْهَا فَجِيَ بِهَا إِلَى النَّبِيُّ فَسَأَلَهَا عَن ذَلِكَ، فَقَالَتْ أَرَدْتُ قَتْلَكَ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ وَمَا كَانَ اللَّهُ لَيُسَلِّطْكِ عَلَى ذَلِكَ أَوْ قَالَ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ قَالُوا أَفَلَا نَقْتُلُهَا؟ قَالَ لَا -
৭৪. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, জনৈক ইয়াহুদী নারী নবী-এর নিকট একটি ভুনা বক্রীর বাচ্চা আহারের জন্য নিয়ে আসে। তাতে সে বিষ মিশ্রিত করেছিল। (এরপর নবী যখন ঐ গোস্ত বিষ মিশ্রিত হওয়ার সংবাদ মহান আল্লাহ্ তরফ থেকে জানতে পারলেন, তখন এ স্ত্রীলোকটিকে ডাকালেন) লোকেরা নবী-এর নিকট তাকে উপস্থিত করলো। তিনি ঐ বিষ মিশ্রিত গোস্ত সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এ কাণ্ড কেন করেছো? ঐ (উদ্ধত) নারী বললো, আমি আপনাকে হত্যা করতে চেয়েছি। তখন রাসূলুল্লাহ্ বললেন: মহান আল্লাহ্ তোমাকে এ কাজে সফল হতে দেবেন না (অর্থাৎ তুমি নবীকে হত্যা করতে পারবে না)। কিংবা বলেছেন, কোনো মুসলিমের বিরুদ্ধে আল্লাহ তা'আলা তোমাকে এ ব্যাপারে সফল করবেন না। সাহাবাগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা কি তাকে হত্যা করবো না? তিনি বললেন, না।
ফায়দা: এখানেও হাদীসের শুধু সেই অংশই বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে নবী-এর ক্ষমা ও দয়া গুণের আলোচনা রয়েছে। অন্যান্য রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, খায়বারের অধিবাসী এক ইয়াহুদী নারী বিষ মিশ্রিত করে একটি ভুনা বক্সী নবী-এর নিকট পেশ করলো। তিনি ঐ বক্রীর গোস্তের মধ্য থেকে হাতার একটি অংশ ভক্ষণ করলেন। তাঁর সাথে আরো কিছু সাহাবীও খাচ্ছিলেন। তাঁরাও এই বিষ মিশ্রিত বক্সীর গোস্ত খাওয়া শুরু করলেন। কিন্তু লোকক্কা মুখে দিতেই নবী সাহাবাদের নির্দেশ দিলেন যে, তোমরা খাওয়া বন্ধ করো (গোস্তে বিষ মিশ্রিত করা হয়েছে) এবং তখনই তিনি ঐ ইয়াহুদী নারীকে ডেকে পাঠালেন। (আসার পর) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এই বক্রীর গোস্তে বিষ মিশিয়েছো? সে বললো, আপনাকে কে বলেছে? তিনি বললেন, এই টুকরোটি আমাকে বলে দিয়েছে যা আমার হাতে রয়েছে। তখন ঐ ইয়াহুদী নারী স্বীকার করলো এবং বললো, আমি আপনাকে পরীক্ষা করার জন্য বিষ মিশিয়েছি। আপনি যদি সত্য নবী হন তবে এই বিষে আপনার কোনো ক্ষতি হবে না। কেননা, আপনি তা অবগত হতে পারবেন। আর আপনি যদি সত্য নবী না হন, তবে ধ্বংস হয়ে যাবেন এবং আমরা আপনার থেকে মুক্তি পাবো। নবী ঐ নারীকে তার প্রাণনাশের চেষ্টা সত্ত্বেও কোনো শাস্তি দেননি। বরং ক্ষমা করে দেন। নবী-এর সাথে যে সাহাবী ঐ মাংস ভক্ষণ করেছিলেন, তিনি ঐ বিষের প্রতিক্রিয়ায় ইন্তিকাল করেন।
অন্যান্য রিওয়ায়াত থেকে জানা যায় যে, নবী তাঁর নিজের পক্ষ থেকে ঐ নারীকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন, এবং প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। অবশ্য যখন ঐ বিষে হযরত বিশর ইন্ন বারাআ (রা) ইন্তিকাল করেন, তখন তাঁর কিসাসস্বরূপ তিনি ঐ নারীকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ হাদীস থেকে অনুমিত হয়, তিনি তাঁর প্রাণের শত্রুদের সাথে কি পরিমাণ সদয় আচরণ করতেন। তিনি ইচ্ছাকৃত হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন না। বরং তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া ছাড়াও তাদের কল্যাণ কামনাও করতেন। যেমন বিভিন্ন ঘটনা ও রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে, তায়েফে শত্রুরা কি পরিমাণ তাঁকে নির্যাতন করে। দুষ্ট ও দুরন্ত বালকদেরকে লেলিয়ে দিয়ে প্রস্তর বর্ষণের মাধ্যমে তাঁকে রক্তাক্ত করা হয়েছে। নবীজীর মাথা গোঁজার কোথাও আশ্রয় ছিল না।
তায়েফের নেতারা দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিলো। আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে ঐ সময় হযরত জিব্রাঈল (আ) পাহাড়ের অধিকর্তা ফিরিস্তাকে সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং বলেন যে, আপনি হুকুম দিলে এখনই এই দুই পাহাড়ের মাঝে ফেলে তাদেরকে পিষে মারা হবে। কিন্তু তাঁর পবিত্র মুখ থেকে এই দু'আই নিঃসৃত হলো اللَّهُمَّ أَهْدِ قَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُوْنَ ) আল্লাহ্! আমার জাতিকে হিদায়াত করুন। কেননা, এরা জানে না (যে, আমি আল্লাহ্ রাসূল)"।
٧٥ عَنْ زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ قَالَ سَجِرَ النَّبِيُّ اللهِ رَجُلٌ مِنَ الْيَهُودِ قَالَ فَاشْتَكَي لِذلِكَ أَيَّامًا ، قَالَ فَأَتَاهُ جِبْرَئِيلُ عَلَيْهِ السَّلامُ فَقَالَ إِنَّ رَجُلاً مِنَ الْيَهُودِ سَحَرَكَ فَعُقِدَلَكَ عَقْدًا فَأَرْسَلَ رَسُولُ اللهِ ﷺ عَلِيًّا فَاسْتَخْرَجَهَا فَجَاءَ بِهَا، فَجَعَلَ كُلَّمَا حَلَّ عُقْدَةً وَجَدَ لِذلِكَ خِفَّةً، فَقَامَ رَسُولُ اللهِ ﷺ كَأَنَّمَا أُنْشِطَ مِنْ عِقَال: فَمَا ذَكَرَ ذَلِكَ لِليَهُودِي وَلَآرَاهُ فِي وَجْهِهِ قَطُّ -
৭৫. হযরত যায়িদ ইব্ন আরকাম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার এক ইয়াহুদী নবী-কে জাদু করলেন। ফলে তিনি কিছুদিন অসুস্থ বোধ করছিলেন।' বর্ণনাকারী বলেন, তারপর একদিন তাঁর নিকট হযরত জিব্রাঈল (আ) আগমন করে তাঁকে অবগত করলেন যে, জনৈক ইয়াহুদী আপনাকে জাদু করেছে এবং (কালো) সূতার মধ্যে গিরা লাগিয়েছে। নবী তখন হযরত আলী (রা)-কে সেখানে পাঠালেন। হযরত আলী (রা) সেই তাগা সেখান থেকে তুলে আনেন। নবী ঐ গিরাগুলো খুলতে শুরু করেন। এক একটি গিরা খোলার সাথে সাথে তাঁর কষ্টের উপশম অনুভূত হতো। সবগুলো গিরা খোলার সাথে সাথে তিনি এমনভাবে দাঁড়িয়ে গেলেন, যেমন কোনো বাঁধা ব্যক্তি রশি থেকে মুক্ত হয়েছেন। কিন্তু তিনি কখনো ঐ জাদুর আলোচনা ঐ ইয়াহূদীর সাথে করেননি এবং কখনো তিনি প্রতিশোধের দৃষ্টিতে তার প্রতি তাকাননি।
ফায়দা : রিওয়ায়াত সমূহে বর্ণিত হয়েছে যে, ঐ ইয়াহুদীর নাম ছিল লাবীদ ইব্ আসাম। সে ছিলো বানু যুরায়ক গোত্রের লোক। সে নবীকে মেরে ফেলার জন্য (নাউযুবিল্লাহ্) তাঁর উপর প্রচণ্ড রকমের জাদু করেছিলো। মুশরিক ও ইয়াহুদীরা ছিলো তাঁর প্রাণের শত্রু। তাঁকে যে কোনোভাবে এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য ছিলো তারা সদা তৎপর। গোপন স্থানে লুকিয়ে থেকে আঁধার রাতে তাঁর উপর হামলা করেছে, বিষ প্রয়োগ করেছে এবং যখন তাতে ব্যর্থ হয়েছে, তখন তাঁকে জাদু দ্বারা মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আল্লাহ্ তাঁর নবীর সাথে ওয়াদা করেছিলেন যে, মানুষের হাত থেকে তাঁকে রক্ষা করবেন। وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنْ النَّاسِ )আল্লাহ্ আপনাকে লোকের হাত থেকে বাঁচাবেন)। তাই আল্লাহ্ তাঁর নবীকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন। কোথাও মুশরিকদের উপর প্রভাব ফেলে তাদের থেকে রক্ষা করেছেন, কোথাও ওহীর মাধ্যমে আসন্ন বিপদ সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করেছেন এবং কোথাও ফেরেস্তা পাঠিয়ে তাঁকে সাহায্য করেছেন। নবী-এর নিকট সব উপায় বিদ্যমান ছিলো। যেভাবে ইচ্ছা ঐ ইয়াহুদী ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। তাদেরকে সম্পূর্ণ ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা কখনো করেননি। প্রতিবার কাফিরদের কষ্ট দানকে ক্ষমা করে দিতেন এবং তাদের প্রতি দয়া করতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিলো, তারা হিদায়াত কবুল না করলেও তাদের সন্তান-সন্ততি অবশ্যই সুপথে আসবে। তিনি প্রতিনিয়ত তাঁর জাতির হিদায়াতের জন্য দু'আ করতেন। বিশেষ করে স্বীয় ব্যক্তিগত ব্যাপারে কখনো প্রতিশোধ নিতেন না। তাই ইয়াহুদী যখন তাঁর উপর জাদু করলো তিনি তার প্রতি একটু অসন্তোষও প্রকাশ করেননি, তাকে শান্তি দেননি। এমনকি তার সাথে এ ব্যাপারে আলোচনাও করেননি। অপর এক রিওয়ায়াতে বর্ণিত আছে, এ ব্যাপারে হযরত আয়েশা (রা) তাঁকে বলেছিলেন যে, আপনি ঐ ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচারণা কেন চালাচ্ছেন না। তিনি জবাব দিলেন, আল্লাহ্ আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। তাই আমি তার দুর্নাম রটানো পছন্দ করলাম না। এটাই ছিলো তাঁর উঁচুমন ও মহান আল্লাহ্র বাণী ( إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٌ “নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত)-এর বাস্তব নমুনা।
عَنِ ابْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ لَمَّا كَانَ يَوْمَ الْفَتْحِ أَرْسَلَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِلَى صَفْوَانَ بْنِ أُمَيَّةَ بْنِ خَلْفَ وَأَبِي سُفْيَانَ بْنَ حَرْبٍ وَإِلَى الْحَارِثِ بْنِ هِشَامٍ، قَالَ ابْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ فَقُلْتُ قَدْ أَمْكَنَنِي اللهُ عَزَّ وَجَلَّ مِنْهُمْ bِمَا صَنَعُوا حَتَّى قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مَثَلِي وَمَثَلُكُمْ كَمَا قَالَ يُوسُفُ لِإِخْوَتِهِ لاَ تَشْرِيْبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ فَانْفَضَحْتُ حَيَاءً مِنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ
৭৬. হযরত (উমর) ইব্ন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ সাওয়ান ইবন উমায়্যা ইবন খালফ, আবু সুফিয়ান ইব্ন হারব ও হারিস ইবন হিশামকে ডেকে পাঠালেন। হযরত উমর (রা) বলেন, আমি আপন মনে বললাম, আজ আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে তাদের কৃতকর্মের শাস্তিদান ও প্রতিশোধ গ্রহণের সুযোগ দান করবেন। কেননা, স্পষ্টতই এরা যুদ্ধবন্দী। নবী তাদেরকে হত্যা করাবেন এবং আমার দ্বারাই এ কাজ করাবেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ সে সময় বললেন, এখন আমার ও তোমাদের দৃষ্টান্ত সম্পূর্ণ হযরত ইউসুফ ও তাঁর ভাইদের মতো। এজন্য আমি তাই বলবো, যা হযরত ইউসুফ (আ) বলেছিলেন : ”لاَ تَشْرِيْبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ - কাজেই তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের ক্ষমা করুন। হযরত উমর (রা) বলেন, (তাঁর এই উদারতা দেখে) আমি লজ্জায় নতমুখ হয়ে গেলাম। (আমি যেখানে প্রতিশোধ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, আনন্দ উল্লাস করছি, তিনি সেখানে আজীবনের দুশমনদেরকে ক্ষমার সুসংবাদ শোনাচ্ছেন।)
عَنْ عُبَيْدِ اللهِ بْنِ أَبِي رَافِعٍ كَاتِبٍ عَلَى أَنَّهُ سَمِعَ عَلِيًّا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ يَقُولُ بَعَثَنِي رَسُولُ اللهِ ﷺ أنا والزُّبَيْرُ وَالْمِقْدَادِ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ انْطَلِقُوا حَتَّى تَأْتُوا رَوْضَةَ خَاخٍ، فَإِنَّ بِهَا ظَعِيْنَةً مَعَهَا كِتَابُ فَخُذُوهُ مِنْهَا فَانْطَلَقْنَا حَتَّى آتَيْنَا رَوْضَةَ خَاخٍ فَقُلْنَا أَخْرِجْى الْكِتَابَ فَقَالَتْ مَا مَعِي مِنْ كِتَابِ قُلْنَا لَتُخْرِجَنَّ الْكِتَابَ أَوْ لَنُقَلِبَنَّ الثَّيَابَ فَأَخْرَجُوهُ مِنْ عِقَاصِهَا فَأَتْيَنَا بِهِ النَّبِيُّ فَإِذَا فِيْهِ مِنْ حَاطِبِ بْنِ أَبِي بَلْتَعَةَ إِلَى أُنَاسِ مِنَ الْمُشْرِكِينَ يُخْبِرُهُمْ أَمْرًا مِنْ أَمْرِ رَسُولِ اللهِ ﷺ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَا حَاطِبُ مَا هُذَا ؟ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ لا تَعْجَلْ عَلَى إِنِّي كُنْتُ امْرًا مُلْصِقًا فِي قَوْمِي، وَكَانَ مَعَكَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ لَهُمْ قَرَابَاتُ بِمَكَّةَ يَحَمُوْنَ اَهْلِيْهِمْ فَأَحْبَبْتُ إِذَا فَاتَنِي ذَلِكَ مِنْهُمْ مِنَ النَّسَبِ أَنْ أَتَّخِذَ فِيْهِمْ يَدًا يَحَمُوْنَ بِهَا قَرَابَتِي، وَلَمْ أَفْعَلْ ذَلِكَ كُفْرًا وَلَا رِضًا بِالْكُفْرِ بَعْدَ الإِسْلامِ وَلَا ارْتِدَادًا عَنْ دِيْنِي فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ صَدَقَكُمْ فَقَالَ عُمَرُ أَضْرِبُ عُنُقَ هُذَا الْمَنَافِقِ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِنَّهُ قَدْ شَهِدَ بَدْرًا وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّ اللَّهَ اطَّلَعَ إِلَى أَهْلِ بَدْرٍ فَقَالَ اعْمَلُوْا مَا شِئْتُمْ فَقَدْ غَفَرْتُ لَكُمْ
৭৭. হযরত আলী (রা)-এর কাতিব (লিপিকার) উবায়দুল্লাহ্ ইব্ন্ন রাফি হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ যুবায়র, মিকদাদ (রা) ও আমাকে (এক মহিলা গুপ্তচরকে গ্রেফতার করার জন্য) প্রেরণ করেন এবং বলেন: তোমরা চলে যাও। যখন 'রাওযা খাখ' নামক স্থানে পৌঁছবে, সেখানে একটি স্ত্রীলোকের সাথে তোমাদের সাক্ষাৎ হবে। তার নিকট একটি চিঠি আছে। চিঠিটা তার নিকট থেকে নিয়ে আসবে। আলী (রা) বলেন, আমরা তখনই রওয়ানা দিলাম। যখন আমরা 'রাওযা খাখ' পৌছলাম। সেখানেই ঐ স্ত্রীলোকটিকে দেখতে পেলাম। আমরা তাকে বললাম, 'চিঠি বের করো'। সে বললো, 'আমার কাছে কোন চিঠি নেই।' আমরা তাকে (ধমক দিয়ে) বললাম, চিঠি বের করো নতুবা আমরা তোমার দেহ তল্লাশি করবো। [হযরত আলী (রা) বলেন], তখন সে চিঠি তার চুলের খোঁপার মধ্য থেকে বের করলো। আমরা সে চিঠি নিয়ে নবী -এর নিকট উপস্থিত হলাম। (তিনি ঐ চিঠি খুলে দেখলেন), তাতে লেখা আছেঃ "হাতিব ইব্ন আবূ বালতা'আর পক্ষ থেকে (মক্কার) মুশরিকদের প্রতি" চিঠিতে রাসূলুল্লাহ্-এর কোনো যুদ্ধের গোপন খবর দেয়া হয়েছিলো। তিনি হাতিবকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন: হে হাতিব! এ কী ব্যাপার? হাতিব (রা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে মেহেরবানী করে তাড়াহুড়ো করবেন না। প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, আমি বংশগতভাবে কুরায়শী নই। বরং আমার গোত্র কুরায়শের মিত্র। আর এই সুবাদেই কুরায়শের সাথে আমার সামান্যতম সম্পর্ক বিদ্যমান। তাদের সাথে আমার কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক আদৌ নেই। অথচ আপনার সাথে যেসব মুহাজির আছেন, মক্কায় তাদের সবার আত্মীয়-স্বজন রয়েছে। (তাদের আত্মীয়-স্বজন) তাদের ধন-সন্তান রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। তাই আমি যখন দেখলাম, মক্কায় আমার এমন কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই, যারা আমার সম্পদ সন্তান রক্ষণাবেক্ষণ করবে, তখন আমি মক্কার মুশরিকদের প্রতি কিছু অনুগ্রহ করা শ্রেয় মনে করলাম, যাতে তারা আমার সম্পদ-সন্তানের রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং তাদের কোনো ক্ষতি না করে। এটা আমি কুফর বা ইসলাম গ্রহণের পর কুফরীর প্রতি সন্তোষ প্রকাশ এবং আপন দীন ত্যাগ করার ভিত্তিতে আদৌ করিনি। (আমি এখনো ঠিক পূর্বের মতো একনিষ্ঠ মুসলিম রয়েছি। তখন রাসূলুল্লাহ্ সকল সাহাবাকে সম্বোধন করে বললেন: হাতিব তোমাদের কাছে সত্য কথা প্রকাশ করে দিয়েছে। (সে অজ্ঞতাবশতঃ এই ভুল করেছে) তখন হযরত উমর (রা) দাঁড়িয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি কি তার শিরশ্ছেদ করবো না? তিনি বললেন, না, এরূপ করবে না। এ ব্যক্তি তো বদরের যুদ্ধে শরীক ছিল। মহান আল্লাহ্ বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি কত মেহেরবান তা কি তুমি জানো? আল্লাহ্ বলেছেন : اعْمَلُوْا مَا شِئْتُمْ فَقَدْ غَفَرَتْ لَكُمْ তোমরা যা ইচ্ছা করো। আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি।
ফায়দা: এটি একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা, হাতিব ইব্ন আবূ বালতা'আ (রা) সেই সকল মুহাজিরের অন্যতম; যাঁরা ইসলাম গ্রহণের দরুন মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেছেন। নিজেদের সকল সহায়-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি ইসলামের জন্য মক্কায় ছেড়ে এসেছেন। হাতিব (রা) বদরের সেই সব সৌভাগ্যবান মুহাজির সাহাবীগণের অন্যতম, যারা মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করে দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ লাভ করেছিলেন। তাঁর সম্পর্কেই মহান আল্লাহ্ এই আয়াতসমূহ নাযিল করেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُوْنَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُمْ مِنَ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ أَنْ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ رَبَّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَادًا فِي سَبِيْلِي وَابْتِغَاءَ مَرْضَاتِي تُسِرُّونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَأَنَا أَعْلَمُ بِمَا أَخْفَيْتُمُ وَمَا أَعْلَنْتُمْ وَمَنْ يَفْعَلْهُ مِنْكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيلَ إِنْ يَثْقَفُوكُمْ يَكُونُوا لَكُمْ أَعْدَاءً وَيَبْسُطُوا إِلَيْكُمْ أَيْدِيَهُمْ وَالْسِنَتَهُمْ بِالسُّوْءِ وَوَدُّوا لَوْ تَكْفُرُونَ، لَنْ تَنْفَعَكُمْ أَرْحَامُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَفْصِلُ بَيْنَكُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ بَصِيْرُ.
হে মু'মিনগণ! আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে না। তোমরা কি তাদের সাথে বন্ধুত্ব করছো? অথচ তারা তোমাদের নিকট যে সত্য এসেছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছে। রাসূলকে এবং তোমাদেরকে বহিষ্কার করেছে এই কারণে যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে বিশ্বাস করো। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য আমার পথে জিহাদের উদ্দেশ্যে বহির্গত হয়ে থাকো, তবে কেন তোমরা তাদের সাথে গোপন বন্ধুত্ব করছো? তোমরা যা গোপন করো এবং তোমরা যা প্রকাশ করো, তা আমি সম্যক অবগত। তোমাদের মধ্যে যে কেউ এটা করে সে তো বিচ্যুত হয় সরল পথ হতে। তোমাদেরকে কাবু করতে পারলে তারা হবে তোমাদের শত্রু এবং হাত ও জিহ্বা দ্বারা তোমাদের অনিষ্ট সাধন করবে এবং চাইবে যে, তোমরাও কুফরী করো। তোমাদের আত্মীয়-স্বজন ও সন্তান-সন্ততি কিয়ামতের দিন তোমাদের কোনো কাজে আসবে না। আল্লাহ্ তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করে দিবেন। তোমরা যা কর, তিনি তা দেখেন। (সূরা মুমতাহিনা : ১-৩)
হযরত হাতিব (রা) ইয়ামনের অধিবাসী ছিলেন। পূর্ণ নাম হাতিব ইব্ন আবূ বালতা'আ ইব্ন আম্র ইবন উমাইর ইবন সালামা ইবন সা'ব ইব্ন সাহল লাখামী। তিনি কুরায়শের বনূ আসাদ ইব্ন আবদুল উয্যার মিত্র ছিলেন। কেউ কেউ বলেন, হযরত যুবার (রা) এর মিত্র ছিলেন। তিনি যে বদরী সাহাবী ছিলেন সে ব্যাপারে সবাই একমত। বদরের যুদ্ধ ছাড়াও তিনি হুদায়বিয়ার যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। হযরত উসমান (রা)-এর খিলাফতকালে ৩০ হিজরীতে ৬৫ বছর বয়সে তিনি ইন্তিকাল করেন।
তিনি ইয়ামন থেকে মক্কায় এসে বসবাস করছিলেন। মক্কাবাসীদের সাথে তার কোনো আত্মীয়তা ছিল না। নবী-এর হিজরতের পর তিনি তাঁর পুত্রগণ ও ভাইদের ছেড়ে মদীনায় হিজরত করেন। সুতরাং মক্কার মুশরিকদের তরফ থেকে তাঁর সম্পদ-সন্তানের ক্ষতির আশংকা সততই ছিল। সেই আশংকায় তিনি (অজ্ঞতাবশত) এই কৌশল অবলম্বন করলেন যে, মক্কার মুশরিকদের প্রতি কিছু অনুগ্রহ দেখাবেন, যার দরুন তারা তাঁর সম্পদ-সন্তানের কোনো ক্ষতি করবে না। তাই তিনি মক্কার মুশরিকদের কাছে এই মর্মে এক চিঠি লিখলেন যে, “রাসূলুল্লাহ্ অমুক দিন তোমাদের উপর আক্রমণ করবেন।” মক্কার মুশরিকদের কাছে গোপনে এই চিঠিটা পৌঁছাবার জন্য তিনি একটি স্ত্রীলোককে প্রেরণ করলেন। আল্লাহ্ তা'আলা ওহীর মাধ্যমে তাঁর নবীকে এই রহস্য জানিয়ে দিলেন এবং তিনি ঐ চিঠি উদ্ধার করলেন। তাঁকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তাঁর সত্যতা স্বীকার করলেন এবং নবী-এর কাছে সব কথা খুলে বললেন। তিনি বললেন, আমি এ সব এই বিশ্বাস রেখেই করেছি যে, আল্লাহ্ আপনাকে এই যুদ্ধে অবশ্যই জয়লাভ করাবেন। আমার চিঠিতে ইসলামের এতটুকু ক্ষতি হবে না। কিন্তু আমার পরিবার-পরিজন ও মাল-আসবাব এই সামান্য উপকার দ্বারা রক্ষা পাবে। নবী ও শুধু তাঁর সত্যবাদিতার দরুন তাঁর ওযর কবুল করলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন। সাহাবাগণকেও জানিয়ে দিলেন যে, আমি তাঁকে এজন্য ক্ষমা করে দিয়েছি।
এই ঘটনা থেকেই প্রতীয়মান হয় যে, রাসূলুল্লাহ্ কি পরিমাণ ক্ষমা ও দয়া করতেন। যুদ্ধের তথ্য বিশেষ করে হামলার দিন-তারিখ দুশমনকে জানিয়ে দেওয়া হত্যাযোগ্য অপরাধ। আর এ কারণেই হযরত উমর (রা) তাঁকে হত্যা করার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন। কিন্তু নবী এতবড় অপরাধকেও নিছক তাঁর সত্যবাদিতা ও একনিষ্ঠতার দরুন ক্ষমা করে দিলেন এবং কোনো শাস্তি বিধান করলেন না।
۷۸ عَنْ أَبِي ذَرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ أَتِي رَسُولُ اللَّهِ ﷺ بِرَجُلٍ قَدْ شَرِبَ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ اضْرِبُوهُ فَمِنَّا الضَّارِبُ بِيَدِهِ، وَمِنَّا الضَّارِبُ بِنَعْلِهِ، وَمِنَّا الضَّارِبُ بِثَوْبِهِ ، فَلَمَّا انْصَرَفَ قَالَ الْقَوْمِ أَخْزَاكَ اللَّهُ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لا تَقُولُوا هَكَذَا وَلَا تُعِينُوا الشَّيْطَانَ عَلَيْهِ وَلَكِنْ قُولُوا رَحِمَكَ اللَّهُ -
৭৮. হযরত আবূ যার (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর নিকট এক মদ্যপ ব্যক্তিকে আনা হলো। তিনি লোকদেরকে বললেন: ওকে পিটাও। (বর্ণনাকারী বলেন, এ আদেশ পাওয়া মাত্রই) আমাদের মধ্য থেকে কেউ তাকে হাত দিয়ে মারা শুরু করলো, কেউ জুতা দিয়ে এবং কেউ কাপড় দিয়ে। এরপর সে যখন মারপিট খেয়ে চলে গেলো, তখন এক ব্যক্তি তাকে বদ্ দু'আ দিলো এবং বললো, আল্লাহ্ তোকে হেয় ও অপদস্থ করুন। তখন রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বললেন, এভাবে বলো না এবং এ কথা বলে তার উপর শয়তানকে প্রবল করো না। বরং বলো, আল্লাহ্ তোমার উপর রহম (দয়া) করুন।
ফায়দা : নবী ﷺ সবার সাথে সদ্ব্যবহার করতেন। কখনো কাউকে নিজেও বদ্ দু'আ করতেন না এবং অন্যকেও বদ্ দু'আ করতে নিষেধ করতেন। একজন মদ্যপায়ীকেও বদ্ দু'আ দেয়া তিনি পছন্দ করলেন না। আর যখন কেউ বদ্ দু'আ দিলো, তখন তাকেও তা থেকে বিরত রাখলেন, বললেন: বদ্ দু'আ করো না, বরং তার কল্যাণ কামনা করো। তবে তিনি ঐ মদ্যপায়ীকে মারপিট করার যে আদেশ করেছিলেন, তা ছিল মদপানের শাস্তিস্বরূপ। উল্লেখ্য যে, তখনো মদ্যপানের দণ্ড নির্ধারিত হয়নি, তাই মারপিট করে ছেড়ে দেন।
۷۹. عَنْ عَبْدِ اللهِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَسَمَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قِسْمًا، فَقَالَ رَجُلٌ مِّنَ الْأَنْصَارِ إِنَّ هَذِهِ القِسْمَةَ مَا أُرِيدُ بِهَا وَجْهُ اللَّهِ فَذُكِرَتْ ذَلِكَ لِلنَّبِيِّ ﷺ فَأَحْمَرُ وَجْهَهُ وَقَالَ رَحْمَةُ الله عَلَى مُوسَى قَدْ أُوْذِيَ بِأَكْثَرَ مِنْ هُذَا فَصَبَرَ -
৭৯. হযরত আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ ﷺ মালে গনীমত বণ্টন করছিলেন। জনৈক আনসারী (কটাক্ষ করে) বললো, এ বন্টনে আল্লাহ্র সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়নি। বর্ণনাকারী বলেন, এ কথা নবী ﷺ-এর কর্ণগোচর হলো। এ কথা শোনামাত্রই তাঁর চেহারা মুবারক লাল হয়ে উঠলো। তিনি বললেন, মূসা (আ)-এর উপর আল্লাহ্র রহমত হোক! তাঁকে এর চেয়েও বেশি কষ্ট দেয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি ধৈর্যধারণ করেছেন।
ফায়দা : আরব গোত্রসমূহের মধ্যে পরস্পর শত্রুতা ও দুশমনী সব সময় লেগেই থাকতো। নবী ﷺ যখন এ দুনিয়ায় আবির্ভূত হন, তখন তিনি তাঁদেরকে এক দীন ও এক পথে এনে দাঁড় করিয়ে দেন। তাঁদের মধ্যে ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ও ভালবাসার এমন আত্মা ফুঁকে দেন, যাতে তাদের মধ্যে ধীরে ধীরে প্রেম-ভালবাসা, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি হওয়া শুরু করলো। পুরানো শত্রুতা দূর হতে লাগলো। তা সত্ত্বেও এমন কিছু লোক অবশিষ্ট ছিল যাদের মধ্যে পূর্ণরূপে প্রেম-ভালবাসা সৃষ্টি হয়নি। বিশেষত আনসারগণ তাদের চাষাবাদে ব্যস্ত থাকার দরুন নবী-এর সাহচর্য থেকে যথোচিত উপকৃত হতে পারতো না। যেমন: একদিন যখন তিনি গনীমতের কিছু মাল সাহাবাদের মধ্যে বণ্টন করেছিলেন, তখন তাঁর বণ্টন খুব সুষ্ঠু হওয়া সত্ত্বেও ঐ ধরনের এক আনসারীর মনে অন্য গোত্রের লোককে সম্পদ লাভ করতে দেখে তার পুরানো শত্রুতা জাগ্রত হলো। সে (অজ্ঞানবশত) নবী-এর বণ্টনকে অবিচার বলে আখ্যায়িত করলো এবং তাঁর ব্যাপারে এই অশিষ্ট বাক্য প্রয়োগ করলো। কিন্তু নবী ঐ আনসার ব্যক্তির কথা শুনে ধৈর্য ধারণ করলেন এবং তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। তিনি উম্মতকে শিক্ষা দেয়ার জন্য বললেন, হযরত মুসা (আ)-কে আমার চেয়েও অধিক কষ্ট দেয়া হয়েছিল। তিনিও ধৈর্য ধারণ করেছিলেন। আমিও ধৈর্য ধারণ করছি। তোমরাও এরূপ ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করবে। এটাই নবীদের তরীকা বা পথ। নবী ইচ্ছা করলে ঐ আনসারকে তার ঔদ্ধত্যের শাস্তি দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি ক্ষমা করে দেন এবং তাকে কিছুই বললেন না। এই হচ্ছে তাঁর উদারনৈতিক শিক্ষা। এই নৈতিক উদারতা শক্তি দ্বারাই ইসলাম সারা বিশ্বে বিস্তার লাভ করছে।
عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لَا يُبَلِّغُنِي احَدٌ مِنْكُمْ عَنْ أَحَدٍ مِنْ أَصْحَابِي شَيْئًا فَانِي أُحِبُّ أَنْ أَخْرُجَ إِلَيْكُمْ وَأَنَا سَلِيمُ الصدر -
৮০. হযরত ইবন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ বলেছেন: তোমাদের মধ্যে কেউ আমার কোনো সাহাবী সম্পর্কে আমার কাছে কোনো অভিযোগ করবে না। কেননা, আমি তোমাদের সামনে যখন আসবো তখন তোমাদের ব্যাপারে আমার হৃদয় প্রশান্ত থাকুক— এটাই আমি চাই।
ফায়দা : আরব গোত্রসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও ভালবাসা অক্ষুণ্ণ রাখা এবং পারস্পরিক সুসম্পর্ক রাখার জন্য নবী ঘোষণা করেছিলেন যে, কোনো ব্যক্তি আমার কাছে কারো বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযোগ করবে না, যাতে তার প্রতি আমার মনে কোনো অসন্তোষ বা বিষণ্ণ ভাব জাগতে পারে। এ হাদীস নবী-এর ক্ষমা ও দয়ার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রমাণ। কেননা, কারো থেকে প্রতিশোধ নেয়ার ন্যূনতম মাধ্যম হচ্ছে তার সম্পর্কে কোনো কুৎসা শোনা বা প্রচার করা, যাতে তার অপমান হয় ও বদনাম রটে যায়। কিন্তু নবী তার শিকড়ই উপড়ে ফেলেন। সকল সাহাবাকে এই মর্মে নিষেধ করে দেন যে, তোমাদের কেউ কারো বিরুদ্ধে আমার কাছে কোনো অভিযোগ বা বদনাম করবে না, যাতে তোমাদের প্রতি আমার মন সর্বদা পরিষ্কার থাকে এবং আমি তোমাদের প্রত্যেকের সাথে ইনসাফ ও সুবিচারমূলক আচরণ করি। আর এই উত্তম আদর্শই )اُسْوَةُ حَسَنَةً( আমার সমস্ত উম্মত নিজেদের বৈশিষ্ট্য )شعار( বানাবে। এখানে স্মর্তব্য যে, কারো বদনাম শোনা ও শোনানোর মধ্যেই পারস্পরিক সম্পর্কে অবনতির বীজ উপ্ত থাকে। নবী তাঁর উপরোক্ত ঘোষণার মাধ্যমে তার মূলোৎপাটন করতে চেয়েছেন।
টিকাঃ
১. প্রকাশ থাকে যে, الاقرب فالاقرب )যে সবচেয়ে নিকটবর্তী সে সবচেয়ে প্রথম হকদার) এই নীতি অনুযায়ী হযরত যুবায়র (রা)-এর পানি সেচ অধিকার ছিল আনসারীর পূর্বে। তাছাড়া ফসলের ক্ষেত বা বাগানের আল পর্যন্ত পানি বেঁধে রাখা প্রত্যেক ক্ষেত বা বাগান মালিকের অধিকার। তাই রাসূলুল্লাহ্-এর প্রথম উক্তি উভয় পক্ষের মধ্যে মীমাংসার ভিত্তিতে ছিল এবং দ্বিতীয় নির্দেশ ছিল আইনের বিচার।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বদান্যতা সম্পর্কিত হাদীসসমূহ
۸۱ عَنْ عُمَرَ بْنِ عَبْدِ اللهِ مَوْلَى غَفَرَةَ حَدَّثَنِي إِبْرَاهِيمُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ الْحَنَفِيَّةِ مِنْ وَلَدٍ عَلِيِّ قَالَ كَانَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ إِذَا نَعَتَ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ أَجْوَدَ النَّاسِ كَفَّا وَأَكْرَمَهُمْ عِشْرَةً مَنْ خَالَطَهُ فَعَرَفَهُ أَحَبَّهُ -
৮১. গাফারার আযাদকৃত গোলাম হযরত উমর ইব্ন আবদুল্লাহ্ (র) বলেন, হযরত আলী (রা)-এর বংশধর ইব্রাহীম ইন মুহাম্মদ ইব্ন হানাফিয়্যা (র) আমাকে বলেছেনঃ হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) যখনই রাসূলুল্লাহ্ -এর গুণাবলি বর্ণনা করতেন, তখন বলতেন, রাসূলুল্লাহ্ সবচেয়ে দানশীল ও উদারহস্ত ছিলেন এবং তিনি ছিলেন সবচেয়ে অধিক সুসম্পর্ক রক্ষাকারী। তাই যে কেউ তাঁর সাথে মেলামেশা করতো এবং তাঁর চরিত্র সম্পর্কে অবহিত হতো, সেই তাঁকে অত্যধিক ভালবাসতো।
ফায়দা: নবী সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদার ছিলেন। বদান্যতা ছিল তাঁর স্বভাবগত আল্লাহ্ প্রদত্ত গুণ। তিনি কখনো কোনো প্রার্থনার জবাবে 'না' বলেননি। কোনো প্রার্থনাকারীকে শূন্যহাতে ফিরিয়ে দেননি। দানও করতেন এমন পরিমাণ যে, স্বয়ং প্রার্থনাকারীও তাজ্জব মনে করতো। কখনো কোনো প্রার্থনাকারীকে দেওয়ার জন্য যদি তাঁর কাছে কিছু না থাকতো, তবে তিনি পরে তাকে দেওয়ার ওয়াদা করতেন এবং সে ওয়াদা তিনি পূর্ণ করতেন। কখনো কখনো অন্যের নিকট থেকে ঋণ নিয়ে দান করতেন। মেলামেশা ও সামাজিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও তাঁর পবিত্র জীবন ছিল সর্বাধিক সমুন্নত। সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলতেন। ছোট-বড়োর শিষ্টাচারের প্রতি লক্ষ্য রাখতেন। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন এবং সকল প্রতিবেশী ও সাক্ষাৎ প্রার্থীর সাথে তিনি বিনম্র ব্যবহার করতেন। তাঁর এই মহান অনুপম চরিত্র দেখেই লোকেরা তাঁর ভক্ত হয়ে গিয়েছিলো। তাঁকে সকলে অপরিসীম ভালবাসতো। তিনি প্রত্যেকের সাথে যথাযোগ্য সুব্যবহার করতেন। কাউকে কোনো প্রকার কষ্ট দিতেন না। সর্বদা সদ্ব্যবহার, সুবিচার, বিনয়-নম্রতা, সত্য কথা, প্রতিশ্রুতি পালন, শিশু ও ছোটদের প্রতি মমতা প্রদর্শন ছিল তাঁর উন্নত চরিত্রের নিদর্শন। সুতরাং যে ব্যক্তিই তাঁর সাহচর্য কয়েক মুহূর্তও লাভ করতো, সে-ই তাঁকে অত্যন্ত ভালবাসতে শুরু করতো। এক হাদীসে আছে, নবী বলেছেন: দানশীল ব্যক্তি আল্লাহ্রও নিকটবর্তী, জান্নাতেরও নিকটবর্তী, লোকজনেরও নিকটবর্তী (আর জাহান্নামের) আগুন থেকে দূরবর্তী। পক্ষান্তরে কৃপণ ব্যক্তি আল্লাহর রহমত থেকেও দূরবর্তী, জান্নাত থেকেও দূরবর্তী, লোকজন থেকেও দূরবর্তী (এবং জাহান্নামের) আগুনের নিকটবর্তী। তিনি আরো বলেন, আল্লাহর নিকট একজন মূর্খ দানশীল ব্যক্তি একজন কৃপণ শিক্ষিত ব্যক্তি অপেক্ষা অনেক উত্তম (তিরমিযী শরীফ)। সুবহানাল্লাহ্! দানশীলতা আল্লাহ্ও খুব প্রিয়। কেননা, তিনি নিজেই খুব দয়ালু ও দানশীল। তাই তাঁর সুন্দর নামসমূহের মধ্যে 'দয়ালু' (كَرِيْم) ও দানশীল (جواد)-ও উল্লিখিত হয়েছে। আল্লাহ যেমন অপরিসীম দানশীল ও পরম দয়ালু তেমনি তাঁর প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা ﷺ বদান্যতা ও দানশীলতার ক্ষেত্রে সকল মানুষের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চতম স্থানের অধিকারী। তাঁর দানশীলতা সম্পর্কিত হাদীসগুলো সামনে বিবৃত হবে। এই হাদীসগুলো দ্বারাই তাঁর বদান্যতা ও দানশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়।
عَنِ ابْنِ عَمْرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَجُودَ وَلَا أَنْجَدَ وَلَا أَشْجَعَ وَلَا أَرْضَى مِنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ -
৮২. হযরত ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ ﷺ অপেক্ষা অধিক দানশীল ও দাতা, অধিক সাহসী, বড় বীর, অধিক ধৈর্যশীল ও পরিতুষ্ট কোনো ব্যক্তিকে দেখিনি।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, যেখানে নবী ﷺ সকল মানুষের মধ্যে সবচেয়ে অধিক দানশীল ও দাতা ছিলেন, সেখানে তিনি সবচেয়ে অধিক সাহসী বীর, ধৈর্যশীল ও অল্পে তুষ্টও ছিলেন। তাঁর যুদ্ধ বিগ্রহ থেকেই তা প্রমাণিত হতে পারে কত বড় বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, যাতে তাঁকে হাজারো বিপদ-আপদ, নানাবিধ দুঃখকষ্ট ভোগ করতে হয়েছে, পবিত্র মুখমণ্ডল যখমী হয়েছে, দান্দান মুবারক শহীদ হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনো হতোদ্যম ও সাহসহীনতার প্রমাণ দেননি। বরং সর্বদা দৃঢ়তা, সাহসিকতা ও বীরত্বের সাথে তার মুকাবিলা করেছেন। তাঁর দৃঢ়সংকল্প ও ধৈর্যের মধ্যে কোন তারতম্য ঘটেনি। তাঁর পবিত্র জীবনের সূচনাই হয়েছে দৃঢ় সংকল্প ও ধৈর্য-সহ্যের মধ্য দিয়ে। আরবের মূর্খ ও বিদ্বেষপরায়ণ মুশরিকদের মধ্যে যারা কখনো তাদের পিতৃপুরুষদের অন্ধ অনুসরণ ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিল না, যারা শত শত বছর থেকে মূর্তি পূজা করে আসছিল, তিনি একাকী দাঁড়িয়ে তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দেন। তখন তাঁর কোনো সঙ্গী ও সাহায্যকারী ছিলো না। তিনি আল্লাহ্ উপর ভরসা রেখে দৃঢ় সংকল্প ও সাহসিকতার সাথে মুশরিক ও কাফিরদেরকে দীন ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। আরবের শিশুরা পর্যন্ত তাঁর বিরোধিতা করতো। মক্কার কাফিররা তাঁকে দুঃখ-কষ্ট দিতো। দুষ্ট বালকেরা তাঁকে পাথর মারতো। তিনি রক্তে রঞ্জিত হতেন। কিন্তু এতসত্ত্বেও তিনি সাহস হারাতেন না। বরং অনমনীয়তার সাথে তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিতেন। শেষে এমন একদিন এলো, যখন আরবের প্রতিটি গৃহে তাওহীদের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হলো এবং তাদের শিশুরা পর্যন্ত তাঁর ভক্ত ও প্রেমিক হয়ে পড়লো। তিনি সমগ্র আরব ও অনারবের বন্ধু হয়ে গেলেন।
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَجْوَدَ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ حِيْنَ يَلْقَاهُ جِبْرَئِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ -
৮৩. হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ লোকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল ছিলেন। বিশেষত রমযানের মাসে তাঁর দানশীলতার মাত্রা অত্যধিক বেড়ে যেতো, যখন হযরত জিব্রাঈল (আ) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য আগমন করতেন।
ফায়দা: এখানে গ্রন্থকার পুরো হাদীসটি উদ্ধৃত করেননি। বরং নবী-এর দানশীলতার সাথে সম্পর্কিত অংশটুকু উদ্ধৃত করেছেন। এ হাদীস সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে সবিস্তার বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, নবী লোকদের মধ্যে সর্বাধিক দানশীল ও দাতা ছিলেন। আর রমযান মাসে যখন হযরত জিব্রাঈল (আ) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য আগমন করতেন, তখন তাঁর দানশীলতা অন্যান্য সময় অপেক্ষা অনেক গুণ বেড়ে যেতো। তখন তিনি অত্যধিক মাত্রায় দান-খয়রাত করতেন। জিব্রাঈল (আ) রমযান মাসে প্রতিদিন তাঁর নিকট আগমন করতেন এবং কুরআন শরীফের শুনানি করতেন। ঐ সময় তিনি ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন বায়ুর চেয়েও অধিক দান-খয়রাত করতেন। অর্থাৎ নবী রমযান মাসে দান-খয়রাতের পরিমাণ এতই বৃদ্ধি করতেন যে, বর্ণনাকারী তাঁর দান-খয়রাতের আধিক্যকে ঝড়ো হওয়ার গতিবেগের সাথে তুলনা করেছেন। রমযান মাসে নবী-এর অধিক দান-খয়রাত করার কারণ হচ্ছে, ঐ পবিত্র মাসে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাদের উপর অপরিসীম দয়া ও কৃপা করে থাকেন। তাঁর রিযিক তাদের উপর অবারিত করে দেন। রোযাদারদের সকল কর্মকাণ্ডের বিনিময় এই পবিত্র মাসের কারণে দশগুণ থেকে সত্তর গুণ পর্যন্ত বেশি প্রদান করেন। এ মাসে একবার কুরআন খতম করলে সত্তরবার কুরআন খতম করার সওয়াব পাওয়া যায়। এক রাকআত নফল সালাত পড়ার সওয়াব সত্তর রাকআত পড়ার সমান হয়। এক পয়সা ব্যয় করার সওয়াব সত্তর পয়সা ব্যয় করার সমান হয়। এ ছাড়া আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর অসীম কৃপায় রোযাদার বান্দাদের পেছনের সমস্ত গুনাহ্ও মাফ করে দেন। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রমযান মাসের শেষ রাতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রোযাদার বান্দাদের ক্ষমা ঘোষণা করেন। তাই আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা ও আল্লাহ্ এই দানশীলতার গুণটি রপ্ত করতেন এবং অন্যদেরকেও রপ্ত করার নির্দেশ দিতেন। বর্ণিত আছে )تَخَلَّفُوْا بِأَخْلَاقِ اللَّهِ( )তোমরা আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হও)। তাই আল্লাহ্ গুণাবলি নিজের মধ্যে সৃষ্টি করা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনার প্রমাণ। আল্লাহ্ আমাদেরকে তাঁর প্রদর্শিত পথে সঠিকভাবে চলার তাওফীক দান করুন।
٨٤ عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَجُلاً أَتَى النَّبِيُّ ﷺ فَسَأَلَهُ فَأَعْطَاهُ غَنَمًا بَيْنَ جَبَلَيْنَ فَأَتَى الرَّجُلُ قَوْمَهُ ، فَقَالَ أَسْلِمُوا فَإِنَّ مُحَمَّدًا يُعْطِى عَطَاء رَجُلٍ مَا يَخَافُ فَاقَةً .
৮৪. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত যে, জনৈক ব্যক্তি নবী -এর নিকট এসে (আর্থিক সাহায্য) প্রার্থনা করলো। তিনি তাকে দুই পাহাড়ের মধ্যকার সব বকরী দান করলেন। তখন ঐ ব্যক্তি তার গোত্রের মধ্যে এসে বললো, হে লোক সকল! তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো। কেননা, মুহাম্মদ সেই ব্যক্তির ন্যায় দান করে থাকেন, যার দারিদ্রের কোনো আশংকা নাই।
ফায়দা : এই রিওয়ায়াতটিই মিশকাত শরীফে হযরত আনাস (রা) থেকে এই ভাষায় বর্ণিত হয়েছে : জনৈক ব্যক্তি নবী -এর নিকট দুই পাহাড় সমান ছাগ প্রার্থনা করলো। তিনি তা তাকে দান করলেন। তখন ঐ ব্যক্তি তার গোত্রে এসে বললো, হে আমার গোত্র! তোমরা সবাই মুসলমান হয়ে যাও। আল্লাহ্র কসম! মুহাম্মদ এতই দান করেন যে, নিজে দরিদ্র হয়ে যাওয়ারও ভয় করেন না।
শামায়েলে তিরমিযীতে হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ্ কখনো কোনো বন্ধু (ভবিষ্যতের জন্য) সঞ্চয় করে রাখতেন না। (বরং তৎক্ষণাৎ সাহাবাদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন)।
এই হাদীসগুলো থেকেই নবী -এর বদান্যতা ও দানশীলতা সম্পর্কে অনুমান করা যায়। কেননা যে যত চাইত তিনি তাকে তা দান করতেন। কখনো প্রার্থনাকারীকে তাঁর নামে ঋণ নিয়ে প্রয়োজন মিটানোর অনুমতি দিতেন। যেমন সামনের হাদীসসমূহে বিধৃত হয়েছে। নবী -এর এই বদান্যতার পরাকাষ্ঠা ও আল্লাহ্র উপর পূর্ণ ভরসায় বিস্মিত হয়ে ঐ প্রার্থনাকারী তার গোত্রকেও ঈমান ও ইসলামের দাওয়াত দেয় এবং নিজেও ঈমান আনে।
এক হাদীসে হযরত ইবন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত আছে, নবী বলেন : ঈর্ষা কেবল দুই ব্যক্তির উপর হতে পারে। এক. সেই ব্যক্তি—যাকে আল্লাহ্ তা'আলা ধন-সম্পদও দিয়েছেন এবং তাকে ঐ সম্পদ আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করারও তাওফীক দিয়েছেন। দুই. সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ্ তা'আলা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা দান করেছেন এবং সে তা দ্বারা নিজেও পরিচালিত হয় এবং অপরকেও তা শিক্ষা দেয়। (রিয়াদুস্-সালিহীন)
অন্য এক হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, নবী বলেছেন : প্রত্যহ সকাল বেলা যখন আল্লাহ্র বান্দা নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয়, তখন তার সাথে দু'জন ফিরিশতাও আসমান থেকে অবতরণ করেন। তাদের একজন বলেন, হে আল্লাহ্! ব্যয়কারী, দানশীল ও দাতা ব্যক্তিকে তার বিনিময় দান করো। দ্বিতীয় ফিরিস্তা বলেন, হে আল্লাহ্! বখীল ও কৃপণ ব্যক্তির সম্পদে তুমি ধস নামাও। (বুখারী ও মুসলিম)
অপর এক হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। নবী বলেন : আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন : হে আদাম সন্তান! তুমি আল্লাহ্র সৃষ্টির জন্য ধন-সম্পদ ব্যয় করো, তোমার জন্যও আল্লাহর পক্ষ থেকে ব্যয় করা হবে। (রিয়াদুস্-সালিহীন)।
٨٥ عَنْ عُمَرَ بْنِ عَبْدِ اللهِ مَوْلَى غَفْرَةَ حَدَّثَنِي إِبْرَاهِيمَ ابْنُ مُحَمَّدٍ مِنْ وُلِدَ عَلِيِّ قَالَ كَانَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ إِذَا وَصَفَ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ كَانَ أَجْوَدَ النَّاسِ كَفَّا وَأَجْرَأَ النَّاسِ صَدْرًا وَأَصْدَقَ النَّاسِ لِهْجَةً وَأَوفَاهُمْ بِذِمَّةٍ، وَأَلْيَنَهُمْ عَرِيكَةً وَاكَرَمَهُمْ عِشْرَةً، مَنْ رَاهُ بَدِيهَةً هَابَهُ، وَمَنْ خَالَطَهُ فَعَرَفَهُ أَحَبَّهُ لَمْ أَرَ قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ مِثْلَهُ -
৮৫. হযরত গাফারা (রা) এর মাওলা (আযাদকৃত গোলাম) উমর ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার কাছে ইব্রাহীম ইন মুহাম্মদ (যিনি হযরত আলী (রা)-এর বংশধর) হাদীস বর্ণনা করেন যে, হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) যখন নবী-এর (সুন্দরতম) গুণাবলি বর্ণনা করতেন, তখন বলতেন যে, তিনি সবচেয়ে উদার হস্ত, সবচেয়ে সাহসী-হৃদয়, সবচেয়ে সত্যভাষী, সবচেয়ে ওয়াদা পালনকারী, সবচেয়ে নম্র-স্বভাব এবং সবচেয়ে ভদ্র জীবন যাপনকারী ছিলেন। যে ব্যক্তি হঠাৎ তাঁকে দেখত তার মনে ভীতির সঞ্চার হতো এবং যে ব্যক্তি তাঁর সাহচর্য লাভ করতো ও তাঁর অতুলনীয় স্বভাব সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হতো, সে তাঁকে ভালবাসতে শুরু করতো। আমি তাঁর পূর্বে কখনো তাঁর মতো (সর্বগুণে গুণান্বিত) মানুষ দেখিনি এবং তার পরেও দেখিনি।
ফায়দা : হযরত আলী (রা)-এর এ হাদীস পূর্বের একটি হাদীসের আওতায় বর্ণিত হয়েছে। এখানে হাদীসের কিছু কথা পূর্বোক্ত হাদীস অপেক্ষা বেশি বর্ণিত হয়েছে, যা নবী -এর মহৎ গুণাবলি ও উন্নত চরিত্রাবলি ব্যাখ্যা করছে। এসব অনুপম গুণ ও চরিত্রাবলি আয়ত্ত করা আমাদের প্রাথমিক কর্তব্য। নবী-এর পূর্ণ আনুগত্যের মূল কথাই হচ্ছে তাঁর সুমহান গুণাবলি ও সমুন্নত চরিত্রাবলিকে নিজের মধ্যে সৃষ্টি করা, তাঁর পবিত্র জীবন ও প্রশংসিত চরিত্র অনুসরণ করা। আল্লাহ্ পাক আমাদের সবাইকে পূর্ণভাবে তাঁর পদাংক অনুসরণ করার এবং তাঁর সর্বাঙ্গীণ অনুগত ও অনুসারী হওয়ার এবং তাঁর গুণাবলি ও সুন্দরতম চরিত্রাবলি নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি করার তাওফীক দান করুন।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِى اللهُ عَنْهُ قَالَ لَمْ يُسْئَلُ رَسُولُ اللهِ ﷺ شَيْئًا قَطُّ عَلَى الْإِسْلَامِ إِلَّا أَعْطَاهُ وَإِنَّ رَجُلاً أَتَاهُ فَسَأَلَهُ فَأَعْطَاهُ غَنَمًا بَيْنَ جَبَلَيْنِ فَرَجَعَ إِلَى قَوْمِهِ فَقَالَ أَسْلِمُوا فَإِنَّ مُحَمَّدًا يُعْطِي عَطَاءُ مَا يَخْشَى فِيْهِ الْفَاقَةً -
৮৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ এর নিকট ইসলামের নামে যখনই কোনো বস্তু চাওয়া হয়েছে, তিনি তা অবশ্যই প্রদান করেছেন। একবার এক ব্যক্তি এসে তাঁর নিকট প্রার্থনা করলো। তিনি তাকে ছাগলের একটি পূর্ণ পালই প্রদান করলেন, যা দুই পাহাড়ের মাঝখানে ছড়িয়ে ছিল। তারপর ঐ ব্যক্তি তাঁর গোত্রের মধ্যে ফিরে গিয়ে বললো, (হে আমার গোত্র) তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো। কেননা মুহাম্মদ এমনভাবে দান করেন যে, তারপর দারিদ্র্যের কোনো আশংকাই থাকে না।
ফায়দা : এ হাদীসটিও সামান্য পরিবর্তনসহ ইতিপূর্বে একটি হাদীসের আওতায় বর্ণিত হয়েছে। এ হাদীস থেকে নবী-এর পরম দানশীলতা অনুমান করুন। তিনি কতবড় দানশীল ও দাতা ছিলেন তা এর দ্বারাই পরিমাপ করা যায়। নবী-এর দান ও বশিশের এই অবস্থা ছিল সর্বব্যাপী। যে কেউ তাঁর দরবারে ইসলামের নামে আঁচল পেতে দিতো, যে তার প্রার্থিত বস্তু দ্বারা আঁচল পূর্ণ করে ফিরে যেতো এবং সাথে সাথে তাঁর ঔদার্য ও আল্লাহ্র উপর পূর্ণ ভরসা দেখে তার ঈমান আরো মযবুত হয়ে যেতো। সে তার কাওম ও গোত্রকে এরূপ মূর্তিমান দানশীল ও উদার নবীর দীন কবুল করার উপদেশ দিতো। সত্য বলতে কি, দুনিয়ায় চারিত্রিক শক্তি এমন কিছু করে দেখতে পারে যা সামরিক শক্তি কখনো দেখতে পারে না। চরিত্রই হচ্ছে সেই হাতিয়ার যা দ্বারা চরম ঔদ্ধত্য ও বিদ্রোহী অন্তর বশ করা যায়। একথা মোটেই সত্য নয় যে, তলোয়ার দ্বারা ইসলাম দুনিয়ায় বিস্তার লাভ করেছে। বরং ইসলাম সত্য নবীর (আমার মাতা-पिता তাঁর জন্য উৎসর্গিত হোক) সুমহান চরিত্র ও সমুন্নত গুণাবলির আধ্যাত্মিক শক্তি দ্বারা বিশ্ব-ধর্মে পরিণত হয়েছে, যার বহু জীবন্ত উদাহরণ ইসলামের ইতিহাসে বিধৃত আছে।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّ النَّبِيُّ كَانَ لَا يُسْئَلُ شَيْئًا إِلَّا أَعْطَاهُ
৮৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী-এর নিকট যে বস্তুই প্রার্থনা করা হতো, তিনি তা দান করতেন।
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ مَا سُئِلَ رَسُولُ اللهِ ﷺ شَيْئًا قَطُّ قَالَ لَا -
৮৮. হযরত জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ -এর কাছে কিছু চাওয়া হয়েছে এবং তিনি তা দেননি-এরূপ কখনো হয়নি।
. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ لَا يَقُولُ لِشَيْ يُسْأَلُ لا -
৮৯. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী-এর নিকট কোনো কিছু চাওয়া হলে তিনি 'না' বলতেন না।
فَمَنَعَهُ عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ مَاسُئِلَ النَّبِيُّ شَيْئًا قَطُّ
৯০. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর নিকট কোনো বস্তু প্রার্থনা করা হয়েছে এবং তিনি তা নিষেধ করেছেন এরূপ কখনো হয়নি।
ফায়দা: উপরোক্ত চারটি হাদীসের বিষয়বস্তু একই। এগুলো থেকে বোঝা যায় যে, প্রার্থনাকারীর প্রার্থনা ও অভাবগ্রস্তের অভাব পূরণ করা ছিল নবী -এর প্রকৃতি ও স্বভাবের অন্তর্গত। তিনি কাউকে শূন্য হাতে ও নিরাশ করে ফিরিয়ে দেননি। কখনো মুখে 'না' শব্দ উচ্চারণ করেননি। তাঁর এই গুণের কথাই এক আরব কবি এভাবে উল্লেখ করেছেন-
مَا قَالَ لا قَطُّ إِلا فِي تَشَهُدِهِ + لَوْلاَ التَّشَهُدُ كَانَتْ لَاؤُهُ نَعَمْ -
"কালিমা শাহাদত ছাড়া তিনি কখনো 'লা' (না) বলেননি। কালিমা শাহাদত যদি না হতো তবে তাঁর 'লা' (না)-ও নাআম (হ্যাঁ) হয়ে যেত।" এই মর্মই ফারসী কবি নিম্নোক্ত চরণে ব্যক্ত করেছেন:
نزفت لا بزبان مباركش هركز + مكربه اشهد ان لا اله الا الله
"তাঁর যবান মুবারকে কখনো 'না' শব্দ উচ্চারিত হয়নি। যদি হয়ে থাকে, তবে তা হয়েছে কালিমা শাহাদত "أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ" -এর মধ্যে।"
নবী -এর বদান্যতার ক্ষেত্রে পরিমাণের কোনো প্রশ্ন ছিল না। তিনি ছোট-বড় সব চাওয়া পূরণ করতেন। যেমন পূর্বোক্ত এক হাদীস থেকে জানা যায় যে, জনৈক ব্যক্তি যখন দুই পাহাড়ের উপত্যকাপূর্ণ বক্রীর পাল প্রার্থনা করলো, তখন তিনি তাও দান করে দেন। তাঁর কাছে যদি এর চেয়েও বেশি চাওয়া হতো, তবে তিনি তাও দিয়ে দিতেন। নবী -এর এই বদান্যতা তো ছিল কেউ কিছু প্রার্থনা করার সময়। কিন্তু তাঁর নিকট যখন কোথাও থেকে কোনো সম্পদ আসতো, তখন তিনি প্রার্থনা ছাড়াই পাওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তিকে ডেকে ডেকে প্রদান করতেন। তিনি কখনো সম্পদ সঞ্চয় করে রাখতেন না। বরং সত্বর তা বণ্টন করে দিতেন। হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, একবার নবী -এর নিকট বাহরাইন থেকে বেশ কিছু মালপত্র এলো। তিনি বললেন, ওগুলো মসজিদের আঙ্গিনায় বিছিয়ে দাও। এর পূর্বে এত সম্পদ তাঁর নিকট কখনো আসেনি। (বুখারী)
তিনি এই সমুদয় সম্পদ সাহাবাদের মধ্যে বিতরণ করলেন। বিতরণের পর তাঁর নিকট একটি দিরহামও অবশিষ্ট ছিল না। দানশীলতা ছিল নবী -এর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু এবং কৃপণতা ছিল সবচেয়ে ঘৃণ্য ব্যাপার। এক হাদীসে হযরত ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন, আমি নবী -কে বলতে শুনেছি, বদান্যতা আল্লাহ্ তা'আলার সবচেয়ে বড় সৃষ্টি। (তারগীব ও তারহীব)।
হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, নবী বলেছেন: জান্নাতে এমন একটি ঘর আছে, যার নাম 'বায়তুস্ সাখা' দান-নিকেতন (তারগীব)। কৃপণতার অপনিন্দায় নবী -এর বহু হাদীস বর্ণিত রয়েছে। এক হাদীসে হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, নবী বলেছেন: জুলুম থেকে আত্মরক্ষা করো, কেননা জুলুম কিয়ামতের দিন ঘনঘোর অন্ধকাররূপে আত্মপ্রকাশ করবে। আর কৃপণতা থেকে দূরে থাকো, কেননা কৃপণতাই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ধ্বংস করেছে। তাদেরকে রক্তারক্তি করতে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং হারামকে হালাল করতে তাদেরকে উৎসাহ যুগিয়েছে (রিয়াদুস্-সালিহীন)। বস্তুত কৃপণতা এমন এক কুঅভ্যাস ও ধ্বংসাত্মক হীন কাজ, যা সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রকে কলুষিত করে। কৃপণের কারণেই সমাজে ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়। পরস্পরে অনৈক্য ও মনোমালিন্য দেখা দেয়। গোটা সমাজ বিপর্যস্ত হয়। কৃপণতার কারণেই গরীব, মিস্কীন, ভিক্ষুক, অভাবগ্রস্ত, অসহায় ও বেকার লোকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। আর এভাবে গোটা জাতির অবস্থা মন্দ থেকে মন্দতর হতে থাকে। তাছাড়া সাহায্য-সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার দরুন এই লোকগুলোই সমাজে অপরাধ ও বিপর্যয় সৃষ্টির কারণ হয়। ব্যক্তি হিসাবে কৃপণের কার্পণ্য ও ঐশ্বর্য প্রীতির দরুন বন্ধু-বান্ধবের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে বাধ্য হয়। সামান্য সম্পদের জন্য সে লড়াই করতে ও জীবন দিতে প্রস্তুত হয়। ফলে পরস্পরের মধ্যে দুশমনী ও শত্রুতার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। রক্তারক্তি পর্যন্ত পরিস্থিতি গড়ায়। কৃপণতার এই নিন্দনীয় ও অনিষ্টকর স্বভাব থেকে আল্লাহ্ সকল মুসলিমকে রক্ষা করুন। আমাদের নবী ও এই কুস্বভাব থেকে মহান আল্লাহ্ আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, নবী হরমামেশা এই দু'আ করতেন: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُبِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحُزْنِ وَأَعُوْذُبِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالكَسَلِ وَأَعُوْذُبِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ -
হে আল্লাহ্! আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি দুঃসহ চিন্তা ও সন্তাপ থেকে। আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি অসামর্থ্য ও আলস্য থেকে। তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি কাপুরুষতা ও কৃপণতা থেকে।
۹۱ عَنْ هَارُونَ بْنِ رِيَابِ قَالَ قَدِمَ عَلَى النَّبِيُّ ﷺ سَبْعُونَ أَلْفَ دِرْهَم وَهُوَ أَكْثَرُ مَالٍ أُتِيَ بِهِ قَطُّ، فَوَضَعَ عَلَى حَصِيرٍ ثُمَّ قَامَ إِلَيْهَا يَقْسِمُهَا فَمَا رَدَّ سَائِلاً حَتَّى فَرَغَ مِنْهُ -
৯১. হযরত হারুন ইন্ন রিয়াব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার নবী-এর নিকট সত্তর হাজার দিরহাম এলো। ইতিপূর্বে এত বেশি অর্থ আর কখনো তাঁর কাছে আসেনি। তিনি তা চাটাইয়ের উপর রেখে বণ্টন করা শুরু করলেন। কোনো প্রার্থনাকারীকেই তিনি (শূন্য হাতে) ফিরিয়ে দেননি। (এমনিভাবে) সম্পূর্ণ অর্থই তিনি বণ্টন করে দেন।
ফায়দা: নবী -এর অভ্যাস ছিল, যখনই কোথাও থেকে তাঁর নিকট কোনো অর্থ-সম্পদ আসতো, তিনি সঙ্গে সঙ্গে সে খবর প্রচার করে দিতেন। দরিদ্র ও অভাবীদের ডেকে তিনি তা তৎক্ষণাৎ বণ্টন করে দিতেন। নিজের কাছে কখনো জমা করে রাখতেন না। অনেক সময় এমনও হতো যে, প্রচার করে বিতরণ করা সত্ত্বেও কিছু সম্পদ অবশিষ্ট থেকে যেতো। তার হদাব ও গ্রহণকারী কেউ থাকতো না। তখন তিনি খুব কষ্ট ও অস্বস্তি বোধ করতেন; অস্থির ও ব্যাকুল হয়ে পড়তেন। সম্পূর্ণ সম্পদ বণ্টন না করা পর্যন্ত তিনি স্বস্তি লাভ করতেন না। এক হাদীসে হযরত উম্মু সালামা (রা) বলেন, একবার নবী বিমর্ষ অবস্থায় গৃহে আগমন করেন। উম্মু সালামা (রা) জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি চিন্তিত কেন? তিনি বললেন, গতকাল যে সাতটি দীনার এসেছিল, সন্ধ্যা পর্যন্ত তা আমার বিছানায় পড়ে আছে। কোনো গ্রহণকারী পাওয়া যায়নি (মুসনাদে আহমাদ)।
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ النَّبِيُّ وَ لَا يُسْئَلُ شَيْئًا فَيَمْنَعُهُ -
৯২. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর নিকট যখনই কোনো কিছু চাওয়া হতো, তিনি তা প্রদান করতেন, নিষেধ করতেন না।
۹۳ . عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ أَبِي بَكْرٍ عَنْ بَعْضٍ بَنِي سَاعِدَةَ قَالَ سَمِعْتُ أَبَا أسَيْدٍ مَالِكِ ابْنِ رَبِيعَةَ يَقُولُ كَانَ النَّبِيُّ لَا يَمْنَعُ شَيْئًا يُسْئَلُ -
৯৩. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবূ বাকর (রা) বানূ সাঈদার জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন যে, আমি আবূ উসাইদ মালিক ইবন রাবীআ (রা)-কে বলতে শুনেছি, নবী-এর নিকট যে জিনিসই চাওয়া হতো, তিনি তা দিতে অস্বীকার করতেন না (বরং দিয়ে দিতেন)।
٩٤. عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ كَانَ الْمُسْلِمُونَ لَا يَنْظُرُونَ إِلَى أَبِي سُفْيَانَ وَلَا يُقَاعِدُونَهُ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ ثَلَاثُ أَعْطِيْهُنَّ، قَالَ نَعَمْ قَالَ عِنْدِي أَحْسَنُ الْعَرَبِ وَاجْمَلُهُ أُمُّ حَبِيْبَةَ أَزَوِّجُكَمَا قَالَ نَعَمْ، قَالَ وَمُعَاوِيَةَ تَجْعَلُ كَاتِبًا بَيْنَ يَدَيْكَ قَالَ نَعَمْ، وَتُؤْمِرُنِي حَتَّى أَقَاتِلَ الْكُفَّارَ كَمَا قَاتَلْتُ الْمُسْلِمِينَ قَالَ نَعَمْ، قَالَ أَبُو زَمَيْلٍ وَلَوْلَا أَنَّهُ طَلَبَ ذَلِكَ مِنَ النَّبِيِّ مَا أَعْطَاهُ لِأَنَّهُ لَمْ يَكُنْ يُسْئَلُ شَيْئًا قَطُّ إِلَّا قَالَ نَعَمْ .
৯৪. হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুসলিম জনতা হযরত আবু সুফিয়ান (রা)-কে (তাঁর কাফির থাকাকালে মুসলমানদের সাথে চরম শত্রুতা করার কারণে) সুনযরে দেখতেন না। তাঁর সাথে উঠাবসাও করতেন না। একবার আবু সুফিয়ান (রা) বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমাকে তিনটি বিশেষ (মর্যাদা) দান করুন। তিনি বললেন, বেশ ভালো (বলো, তা কি?) আবূ সূফিয়ান (রা) বলেন, আমার কন্যা উম্মু হাবীবা (রা) আরবের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী ও রূপসী রমণী। আমি তাকে আপনার নিকট বিবাহ দিলাম। (আপনি কবুল করুন) তিনি বললেন, বেশ ভালো। তারপর তিনি [আবু সুফিয়ান (রা) বললেন, মুআবিয়াকে আপনি আপনার পেশকার বানিয়ে নিন। তিনি বললেন, বেশ তাই করা হলো। এরপর তিনি [আবূ সুফিয়ান (রা)) বললেন, আপনি আমাকে কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য সেনাপতি (আমীরুল হাব) বানিয়ে দিন। যাতে আমি পূর্বে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যেরূপ যুদ্ধ করেছিলাম, এখন কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তার প্রায়শ্চিত্ত করতে পারি। নবী বললেন, বহুত আচ্ছা। তিনি তাঁকে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বাহিনীর অধিনায়ক বানিয়ে দিলেন। আবূ যামীল (র) বলেন, আবূ সুফিয়ান (রা) যদি নবী-এর নিকট ঐগুলো প্রার্থনা না করতেন, তবে তিনি তা তাঁকে আদৌ দান করতেন না। কিন্তু কথা হচ্ছে, নবী-এর নিকট কেউ কোনো জিনিস প্রার্থনা করলে তিনি তা তাকে দান করতেন। অস্বীকার করতেন না।
ফায়দা: এ হাদীস সামান্য পরিবর্তনসহ মুসলিম শরীফে আবূ সুফিয়ানের মর্যাদা ও গুণাবলি অনুচ্ছেদে উল্লিখিত হয়েছে। কিন্তু এ হাদীসের প্রথম অংশ সম্পর্কে হাদীস-বিশেষজ্ঞগণের চরম আপত্তি রয়েছে। আর তা হচ্ছে সকল ঐতিহাসিক এ ব্যাপারে একমত যে, হযরত আবূ সুফিয়ান (রা) ৮ হিজরীতে মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন। আর নবী-এর সাথে উম্মুল মু'মিনীন হযরত উম্মু হাবীবা (রা)-এর বিবাহ হয়েছিল তার বহু আগে ৬ হিজরী (মতান্তরে ৭ হিজরীতে)। তখন আবু সুফিয়ান মুসলমানও হননি। সুতরাং এ সময় হযরত আবু সুফিয়ান (রা) কর্তৃক তাঁর কন্যা উম্মু হাবীবাকে বিবাহের জন্য নবী-এর নিকট পেশ করা কোনোক্রমেই সঠিক হতে পারে না। কোনো কোনো আলিম লিখেছেন, মূলত হযরত আবু সুফিয়ান (রা) নবী-এর কাছে এই প্রস্তাব করেছিলেন ইসলাম গ্রহণের পরে স্বীয় সন্তোষ প্রকাশের মানসে। যেনো এ সময়ে তিনি স্বীয় সম্মতি জ্ঞাপনার্থে নতুনভাবে নবী-এর কাছে প্রস্তাব করছেন। যা হোক, হাদীসটির সনদ দুর্বল। এ হাদীস বর্ণনা করা দ্বারা গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে নবী-এর বদান্যতা ও দানশীলতা বর্ণনা করা। নবী আবু সুফিয়ানের মতো ইসলামের শত্রুকেও ইসলাম গ্রহণের পর গৌরব ও মর্যাদা দান করতে কার্পণ্য করেননি। এ কারণেই এ হাদীসটি গ্রন্থকার তাঁর কিতাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। যেনো নবী -এর দরবার থেকে ধনসম্পদের মতো মান- মর্যাদাও অকাতরে দান করা হতো।
٩٥ عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَجُلًا أَتَى النَّبِيَّ وَ يَسْأَلُهُ فَقَالَ مَا عِنْدِي شَيْ وَلَكِنْ ابْتَعْ عَلَى فَإِذَا جَاءَنَا شَيْ قَضَيْنَاهُ - قَالَ عُمَرُ رَضِيَ - اللَّهُ عَنْهُ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا كَلَّفَكَ اللَّهُ مَا لَا تَقْدِرُ عَلَيْهِ قَالَ فَكَرِهَ النَّبِيُّ فَقَالَ رَجُل أَنْفِقْ وَلَا تَخَفْ مِنْ ذِي الْعَرْشِ اقْلاَلاً، فَتَبَسَّمَ النَّبِيُّ ﷺ وَعُرِفَ السَّرُورُ فِي وَجْهِهِ -
৯৫. হযরত উমর ইবন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত, একবার কোনো এক (অভাবী) লোক নবী-এর নিকট এসে (আর্থিক সাহায্য) প্রার্থনা করলো। তিনি বললেন, আমার নিকট এ মুহূর্তে কিছু নেই। তুমি আমার নামে কিনে নাও। আমার কাছে যখন কিছু আসবে তখন তা আমি পরিশোধ করে দেবো। হযরত উমর (রা) বলেন, (এ কথা শুনে) আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আল্লাহ্ আপনাকে সাধ্যের অতীত কোনো কাজ করার নির্দেশ দেননি। বর্ণনাকারী বলেন, নবী হযরত উমরের এ কথা পছন্দ করলেন না। তখন অন্য এক সাহাবী বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি দেদার খরচ করুন এবং আরশের মালিকের পক্ষ থেকে স্বল্পতার আশংকা একেবারেই করবেন না। নবী (এই সাহাবীর কথা খুব পছন্দ করলেন এবং) মুচকি হাসলেন। তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডলে তখন আনন্দের চিহ্ন ফুটে উঠলো।
ফায়দা: এ হাদীস থেকেও নবী-এর বদান্যতা ও দানশীলতার পরাকাষ্ঠা অনুমিত হয়। তাঁর কাছে কিছুই নেই; তা সত্ত্বেও তিনি প্রার্থনাকারীকে দান করতে অস্বীকার করলেন না, তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিলেন না। বরং অন্যের নিকট থেকে ধার করে তার প্রয়োজন পূরণ করতে বললেন এবং সে ধার নিজে পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। কোনো প্রার্থনাকারীকেই শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেয়া তিনি পছন্দ করতেন না। তাঁর দান ও বদান্যতা হযরত উমর (রা)-এর মতো সুবিখ্যাত সাহাবীর পরামর্শ ও অভিমতের উপর প্রাধান্য পেল। দানের ব্যাপারে নবী হযরত উমর (রা)-এর পরামর্শও মেনে নেননি বরং একজন সাধারণ সাহাবীর কথা পছন্দ করেন। দানের সপক্ষে মত প্রকাশ করায় একজন সাধারণ সাহাবীর কথায় তিনি উৎফুল্ল হন।
٩٦ عَنْ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمُ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّهُ قَالَ بَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ وَمَعَهُ النَّاسُ مَقْفَلَهُ مِنْ حُنَيْنِ عَلَقَتِ الأَعْرَابُ يَسْأَلُونَهُ حَتَّى اضْطَرُّوهُ إِلَى سُمُرَةٍ فَخَطِفَتْ رِدَاءَهُ فَوَقَفَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَقَالَ أَعْطُونِي رِدَانِي، لَوْ كَانَ لِي عَدَدُ هُذِهِ الْعِضَاءِ نَعَمًا لَقَسَمْتُهُ بَيْنَكُمْ ثُمَّ لاَ تَجِدُوْنِي بَخِيْلاً وَ لَا كَذَّابًا ولَا جَبَانًا -
৯৬. হযরত জুবায়র ইন্ন মুতইম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ লোকদের সাথে হুনাইনের যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। তখন কিছু গ্রামীণ লোক তাঁকে জড়িয়ে ধরলো এবং (আর্থিক) সাহায্য প্রার্থনা করলো। এমনকি তারা তাঁকে ঠেলে একটি কণ্টকময় বৃক্ষের কাছে নিয়ে গেলো এবং তাতে তাঁর চাদরখানা আটকে গেলো। তখন রাসূলুল্লাহ্ থেমে গেলেন এবং বললেন, আমার চাদরটি আমাকে দিয়ে দাও। যদি আমার কাছে এখন এই কাঁটাযুক্ত বৃক্ষের কাঁটা সংখ্যক জন্তু (চতুষ্পদ প্রাণী) থাকতো, তবে আমি তাও তোমাদের মধ্যে বিতরণ করে দিতাম। এ ব্যাপারে তোমরা আমাকে কৃপণ দেখতে পেতে না এবং (ওয়াদা করার ক্ষেত্রে) মিথ্যুক ও (ব্যয় করার ব্যাপারে ভীত ও) কাপুরুষও দেখতে না।
ফায়দা : এ হাদীস হুনাইন যুদ্ধ সম্পর্কিত। নবী হুনাইন যুদ্ধে যে সম্পদ লাভ করেছিলেন, তা সাহাবাদের মধ্যে বণ্টন করে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। তখন তাঁর নিকট অবশিষ্ট কিছুই ছিল না। পথিমধ্য গ্রামীণ লোকেরা অজ্ঞতাবশত এসে তাঁকে ঘিরে ধরলো এবং আর্থিক সাহায্য প্রার্থনা করলো। নবী অপারগ ছিলেন। তিনি তাদেরকে জানালেন যে, যদি আমার কাছে এখন কোনো সম্পদ থাকতো, তবে আমি তোমাদেরকে অবশ্যই সাহায্য করতাম। সামান্যতম কার্পণ্য করতাম না।
۹۷ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي لَيْلى قَالَ سَمِعْتُ أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَيَّا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ يَقُولُ آتَيْتُ أَنَا وَفَاطِمَةُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا وَالْعَبَّاسُ وَزَيْدُ بْنُ حَارِثَةَ النَّبِيُّ ﷺ فَقَالَ الْعَبَّاسُ يَا رَسُولَ اللهِ : كَبِرَ سِنِّي وَرَقَ عَظَمِي رَأَيْتَ أَنْ تَأْمُرَ لِي بِكَذَا وَسَقَا مِنَ الطَّعَامِ فَافْعَلَ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَأَفْعَلُ، فَقَالَتْ فَاطِمَةُ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا يَا رَسُولَ اللهِ : إِنْ رَأَيْتَ أَنْ تَأْمُرْ لِي كَمَا أَمَرْتَ لِعَمِّكَ فَافْعَلْ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَأَفْعَلُ، فَقَالَ زَيْدُ ابْنُ حَارِثَةَ أَرْضًا كَانَتْ مَعِيشَتِي مِنْهَا ثُمَّ قَبَضْتَهَا فَإِنْ رَأَيْتَ أَنْ تَرُدَّهَا عَلَى فَافْعَلُ ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَافْعَلُ فَقُلْتُ أَنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنْ رَأَيْتَ أَنْ تُوَلِّيَنِي هُذَا الْحَقُّ الَّذِي جَعَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لَنَا فِي كِتَابِهِ مِنْ هُذَا الْخُمُسُ فَأَقْسِمْهُ فِي حَيَاتِكَ حَتَّى لَايُنَازِ عَنِيْهِ أَحَد بَعْدَكَ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَأَفْعَلُ ذَلِكَ فَوَلَانِيْهِ رَسُولُ اللهِ ﷺ -
৯৭. হযরত আবদুর রহমান ইব্ন আবূ লায়লা (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমীরুল মু'মিনীন হযরত আলী (রা)-কে বলতে শুনেছি, আমি, ফাতিমা, আব্বাস ও যায়দ ইবন হারিসা (রা) একবার নবী -এর নিকট হাযির হলাম। তখন আব্বাস (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার বয়স অনেক হয়েছে এবং আমার শক্তি খর্ব হয়ে গেলো। সুতরাং আপনি সঙ্গত মনে করলে আমার জন্য বায়তুল মাল থেকে এতো এতো ওয়াসাক খাদ্যশস্য দেয়ার নির্দেশ দিন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁর আবেদন মঞ্জুর করলেন এবং বললেন, আমি অবশ্যই তা করবো। এরপর ফাতিমা (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি আপনার চাচার জন্য যে নির্দেশ দিয়েছেন, সঙ্গত মনে করলে আমার জন্যও অনুরূপ সাহায্যের নির্দেশ দিন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁর আবেদনও মঞ্জুর করলেন এবং বললেন, আমি তোমার জন্যও তাই করবো। এরপর (তাঁর আযাদকৃত দাস পালক পুত্র) যায়দ ইবন হারিসা (রা) বলেন, আমার নিকট একখণ্ড জমি ছিল। তা দিয়ে আমার জীবিকা নির্বাহ হতো। আপনি আইনের বলে তা বাজেয়াপ্ত করেছেন। এখন আপনি যদি সঙ্গত মনে করেন, তবে সেই জমিটুকু আমাকে ফেরত দিন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁর আবেদনও মঞ্জুর করলেন এবং বললেন, আমি অবশ্যই তা করবো। হযরত আলী (রা) বলেন, তারপর আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি যদি সঙ্গত মনে করেন, তবে আমাকে বায়তুল মাল থেকে এক-পঞ্চমাংশ মালে গনীমতের অধিকার, যা আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর কিতাবে আমাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন-বণ্টন করার মুতাওয়াল্লী বানিয়ে দিন। তাহলে আমি তা আপনার জীবদ্দশায়ই বণ্টন করতে থাকবো এবং আপনার পরে এ ব্যাপারে আমার সাথে কেউ বিবাদে লিপ্ত হতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ্ তাঁর আবেদনও মঞ্জুর করলেন এবং বললেন, আমি তা অবশ্যই করবো। হযরত আলী (রা) বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ্ আমাকে ঐ এক-পঞ্চমাংশ বণ্টন করার নির্দেশ দান করেন।
ফায়দা : এ পূর্ববর্তী হাদীসসমূহে নবী-এর বদান্যতা সম্পর্কে বিশদ আলোচনা এসেছে। এ হাদীস থেকে বোঝা যায়, নবী যেরূপ অন্যদেরকে তাঁর বিপুল বদান্যতা ও দানশীলতা দ্বারা বিভূষিত করতেন, অনুরূপ তাঁর আত্মীয়-স্বজনের সাথেও দয়া-দাক্ষিণ্য প্রদর্শন করতেন-এটাই হচ্ছে আল্লাহ্ তা'আলার নির্দেশ। আর এ কারণেই তিনি তাঁর আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন এবং তাদেরকে ধন-সম্পদ দান করা ছিল তাঁর মহান চরিত্রের একটি বিশেষ গুণ। এ হাদীসে উল্লিখিত নবী-এর নিকট সাহায্য প্রার্থনার জন্য আগত ব্যক্তিগণ ছিলেন তাঁর আত্মীয়-স্বজন। হযরত আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিব (রা) তাঁর শ্রদ্ধেয় চাচা। হযরত ফাতিমা (রা) তাঁর কলিজার টুকুরা স্নেহের কন্যা। হযরত আলী (রা) তাঁর চাচাত ভাই ও স্নেহের জামাতা এবং হযরত যায়দ ইবন হারিসা (রা) নবী-এর প্রিয় সাহাবী ও আযাদকৃত গোলাম ও পালক পুত্র। এই ব্যক্তিগণ নবী -এর নিকট এসে নিজ নিজ প্রয়োজন তুলে ধরেন এবং তিনি তাঁর পরম ঔদার্য ও সহানুভূতিবশত তাঁদের সবার আবেদন মঞ্জুর করেন। কাউকেই শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেননি।
۹۸ عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ قَالَتْ أَنْشَدَ أَبُو بَكْرٍ قَوْلَ لَبِيْدٍ : أَخٌ لِي أَمَّا كُلُّ شَيْ سَأَلْتُهُ فَيُعْطَى وَأَمَّا كُلُّ ذَنْبٍ فَيَغْفِرُ : فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ هُكَذَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ
৯৮. হযরত আসমা বিন্ত আবূ বক্স (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার (হযরত) আবূ বক্স সিদ্দীক (রা) কবি লবীদ (রা)-এর এই পংক্তি দু'টি আবৃত্তি করলেন: أَخٌ لِي أَمَّا كُلُّ شَيْ سَأَلْتُهُ + فَيُعْطِي وَأَمَّا كُلُّ ذَنْبٍ فَيَغْفِرُ
"আমার এক ভাই আছে, আমি যদি তাঁর কাছে কিছু চাই, তিনি তা তৎক্ষণাৎ আমাকে দিয়ে দেন এবং সব দোষত্রুটি ক্ষমা কর দেন।" এবং বললেন, রাসূলুল্লাহ এ গুণেই গুণান্বিত ছিলেন।
ফায়দা : হযরত লবীদ (রা) জাহিলিয়াত যুগের বিখ্যাত কবিদের অন্যতম। তাঁর নাম লবীদ ইব্ন রাবীআ ইব্ন মালিক। বানু কিলাব প্রতিনিধি দলের সাথে তিনি নবী -এর দরবারে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি কাব্যচর্চা ত্যাগ করেন। (মাআরিফে ইব্ন কুতায়বা, পৃষ্ঠা-৩৩২)। অপর এক হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, নবী বলেন : লবীদের সবচেয়ে সত্য কবিতা হচ্ছে এটি :
الا كُلُّ شَيْ مَا خَلَا اللهُ بَاطِل + وَكُلُّ نَعِيمٍ لَا مَحَالَةً زَائِلُ -
জেনে রাখো, আল্লাহ্ ছাড়া সব জিনিসই বাতিল ও মিথ্যা আর দুনিয়ার সব নিয়ামতই নিশ্চিত বিলীয়মান। (বুখারী শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০৮)
নবী হযরত লবীদ (রা)-এর কবিতা খুব পছন্দ করতেন। কেননা, তাঁর কবিতায় প্রায়শ আল্লাহ্ তাওহীদ, রিসালাত, কিয়ামত, পুরস্কার, শাস্তি ইত্যাদি উল্লেখিত হতো।
গ্রন্থকার এ হাদীসটি নবী -এর দানশীলতা ও বদান্যতা অনুচ্ছেদে উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে, হযরত লবীদ (রা) তাঁর এই কবিতায় তাঁর মামদূহ বা প্রশংসিতের দানশীলতা ও বদান্যতার আলোচনা করেছেন। তাই হযরত আবূ বক্র (রা) এই কবিতাটি রাসূলুল্লাহ্ -এর উদ্দেশ্যে আবৃত্তি করেন। অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন যে, আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা দানশীলতা ও বদান্যতা গুণের এই মানদণ্ডে পুরোপুরি উত্তীর্ণ ছিলেন।
টিকাঃ
১. 'ওয়াসাক' একটি মাপের নাম, যা ষাট সা-এর সমান। সা হলো সাড়ে তিন সের। কারো কারো মতে 'ওয়াসাক' এক উট সমান বোঝাকেও বলা হয়।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বদান্যতা সম্পর্কিত হাদীসসমূহ
۸۱ عَنْ عُمَرَ بْنِ عَبْدِ اللهِ مَوْلَى غَفَرَةَ حَدَّثَنِي إِبْرَاهِيمُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ الْحَنَفِيَّةِ مِنْ وَلَدٍ عَلِيِّ قَالَ كَانَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ إِذَا نَعَتَ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ أَجْوَدَ النَّاسِ كَفَّا وَأَكْرَمَهُمْ عِشْرَةً مَنْ خَالَطَهُ فَعَرَفَهُ أَحَبَّهُ -
৮১. গাফারার আযাদকৃত গোলাম হযরত উমর ইব্ন আবদুল্লাহ্ (র) বলেন, হযরত আলী (রা)-এর বংশধর ইব্রাহীম ইন মুহাম্মদ ইব্ন হানাফিয়্যা (র) আমাকে বলেছেনঃ হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) যখনই রাসূলুল্লাহ্ -এর গুণাবলি বর্ণনা করতেন, তখন বলতেন, রাসূলুল্লাহ্ সবচেয়ে দানশীল ও উদারহস্ত ছিলেন এবং তিনি ছিলেন সবচেয়ে অধিক সুসম্পর্ক রক্ষাকারী। তাই যে কেউ তাঁর সাথে মেলামেশা করতো এবং তাঁর চরিত্র সম্পর্কে অবহিত হতো, সেই তাঁকে অত্যধিক ভালবাসতো।
ফায়দা: নবী সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদার ছিলেন। বদান্যতা ছিল তাঁর স্বভাবগত আল্লাহ্ প্রদত্ত গুণ। তিনি কখনো কোনো প্রার্থনার জবাবে 'না' বলেননি। কোনো প্রার্থনাকারীকে শূন্যহাতে ফিরিয়ে দেননি। দানও করতেন এমন পরিমাণ যে, স্বয়ং প্রার্থনাকারীও তাজ্জব মনে করতো। কখনো কোনো প্রার্থনাকারীকে দেওয়ার জন্য যদি তাঁর কাছে কিছু না থাকতো, তবে তিনি পরে তাকে দেওয়ার ওয়াদা করতেন এবং সে ওয়াদা তিনি পূর্ণ করতেন। কখনো কখনো অন্যের নিকট থেকে ঋণ নিয়ে দান করতেন। মেলামেশা ও সামাজিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও তাঁর পবিত্র জীবন ছিল সর্বাধিক সমুন্নত। সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলতেন। ছোট-বড়োর শিষ্টাচারের প্রতি লক্ষ্য রাখতেন। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন এবং সকল প্রতিবেশী ও সাক্ষাৎ প্রার্থীর সাথে তিনি বিনম্র ব্যবহার করতেন। তাঁর এই মহান অনুপম চরিত্র দেখেই লোকেরা তাঁর ভক্ত হয়ে গিয়েছিলো। তাঁকে সকলে অপরিসীম ভালবাসতো। তিনি প্রত্যেকের সাথে যথাযোগ্য সুব্যবহার করতেন। কাউকে কোনো প্রকার কষ্ট দিতেন না। সর্বদা সদ্ব্যবহার, সুবিচার, বিনয়-নম্রতা, সত্য কথা, প্রতিশ্রুতি পালন, শিশু ও ছোটদের প্রতি মমতা প্রদর্শন ছিল তাঁর উন্নত চরিত্রের নিদর্শন। সুতরাং যে ব্যক্তিই তাঁর সাহচর্য কয়েক মুহূর্তও লাভ করতো, সে-ই তাঁকে অত্যন্ত ভালবাসতে শুরু করতো। এক হাদীসে আছে, নবী বলেছেন: দানশীল ব্যক্তি আল্লাহ্রও নিকটবর্তী, জান্নাতেরও নিকটবর্তী, লোকজনেরও নিকটবর্তী (আর জাহান্নামের) আগুন থেকে দূরবর্তী। পক্ষান্তরে কৃপণ ব্যক্তি আল্লাহর রহমত থেকেও দূরবর্তী, জান্নাত থেকেও দূরবর্তী, লোকজন থেকেও দূরবর্তী (এবং জাহান্নামের) আগুনের নিকটবর্তী। তিনি আরো বলেন, আল্লাহর নিকট একজন মূর্খ দানশীল ব্যক্তি একজন কৃপণ শিক্ষিত ব্যক্তি অপেক্ষা অনেক উত্তম (তিরমিযী শরীফ)। সুবহানাল্লাহ্! দানশীলতা আল্লাহ্ও খুব প্রিয়। কেননা, তিনি নিজেই খুব দয়ালু ও দানশীল। তাই তাঁর সুন্দর নামসমূহের মধ্যে 'দয়ালু' (كَرِيْم) ও দানশীল (جواد)-ও উল্লিখিত হয়েছে। আল্লাহ যেমন অপরিসীম দানশীল ও পরম দয়ালু তেমনি তাঁর প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা ﷺ বদান্যতা ও দানশীলতার ক্ষেত্রে সকল মানুষের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চতম স্থানের অধিকারী। তাঁর দানশীলতা সম্পর্কিত হাদীসগুলো সামনে বিবৃত হবে। এই হাদীসগুলো দ্বারাই তাঁর বদান্যতা ও দানশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়।
عَنِ ابْنِ عَمْرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَجُودَ وَلَا أَنْجَدَ وَلَا أَشْجَعَ وَلَا أَرْضَى مِنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ -
৮২. হযরত ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ ﷺ অপেক্ষা অধিক দানশীল ও দাতা, অধিক সাহসী, বড় বীর, অধিক ধৈর্যশীল ও পরিতুষ্ট কোনো ব্যক্তিকে দেখিনি।
ফায়দা : এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, যেখানে নবী ﷺ সকল মানুষের মধ্যে সবচেয়ে অধিক দানশীল ও দাতা ছিলেন, সেখানে তিনি সবচেয়ে অধিক সাহসী বীর, ধৈর্যশীল ও অল্পে তুষ্টও ছিলেন। তাঁর যুদ্ধ বিগ্রহ থেকেই তা প্রমাণিত হতে পারে কত বড় বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, যাতে তাঁকে হাজারো বিপদ-আপদ, নানাবিধ দুঃখকষ্ট ভোগ করতে হয়েছে, পবিত্র মুখমণ্ডল যখমী হয়েছে, দান্দান মুবারক শহীদ হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনো হতোদ্যম ও সাহসহীনতার প্রমাণ দেননি। বরং সর্বদা দৃঢ়তা, সাহসিকতা ও বীরত্বের সাথে তার মুকাবিলা করেছেন। তাঁর দৃঢ়সংকল্প ও ধৈর্যের মধ্যে কোন তারতম্য ঘটেনি। তাঁর পবিত্র জীবনের সূচনাই হয়েছে দৃঢ় সংকল্প ও ধৈর্য-সহ্যের মধ্য দিয়ে। আরবের মূর্খ ও বিদ্বেষপরায়ণ মুশরিকদের মধ্যে যারা কখনো তাদের পিতৃপুরুষদের অন্ধ অনুসরণ ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিল না, যারা শত শত বছর থেকে মূর্তি পূজা করে আসছিল, তিনি একাকী দাঁড়িয়ে তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দেন। তখন তাঁর কোনো সঙ্গী ও সাহায্যকারী ছিলো না। তিনি আল্লাহ্ উপর ভরসা রেখে দৃঢ় সংকল্প ও সাহসিকতার সাথে মুশরিক ও কাফিরদেরকে দীন ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। আরবের শিশুরা পর্যন্ত তাঁর বিরোধিতা করতো। মক্কার কাফিররা তাঁকে দুঃখ-কষ্ট দিতো। দুষ্ট বালকেরা তাঁকে পাথর মারতো। তিনি রক্তে রঞ্জিত হতেন। কিন্তু এতসত্ত্বেও তিনি সাহস হারাতেন না। বরং অনমনীয়তার সাথে তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিতেন। শেষে এমন একদিন এলো, যখন আরবের প্রতিটি গৃহে তাওহীদের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হলো এবং তাদের শিশুরা পর্যন্ত তাঁর ভক্ত ও প্রেমিক হয়ে পড়লো। তিনি সমগ্র আরব ও অনারবের বন্ধু হয়ে গেলেন।
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَجْوَدَ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ حِيْنَ يَلْقَاهُ جِبْرَئِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ -
৮৩. হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ লোকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল ছিলেন। বিশেষত রমযানের মাসে তাঁর দানশীলতার মাত্রা অত্যধিক বেড়ে যেতো, যখন হযরত জিব্রাঈল (আ) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য আগমন করতেন।
ফায়দা: এখানে গ্রন্থকার পুরো হাদীসটি উদ্ধৃত করেননি। বরং নবী-এর দানশীলতার সাথে সম্পর্কিত অংশটুকু উদ্ধৃত করেছেন। এ হাদীস সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে সবিস্তার বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, নবী লোকদের মধ্যে সর্বাধিক দানশীল ও দাতা ছিলেন। আর রমযান মাসে যখন হযরত জিব্রাঈল (আ) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য আগমন করতেন, তখন তাঁর দানশীলতা অন্যান্য সময় অপেক্ষা অনেক গুণ বেড়ে যেতো। তখন তিনি অত্যধিক মাত্রায় দান-খয়রাত করতেন। জিব্রাঈল (আ) রমযান মাসে প্রতিদিন তাঁর নিকট আগমন করতেন এবং কুরআন শরীফের শুনানি করতেন। ঐ সময় তিনি ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন বায়ুর চেয়েও অধিক দান-খয়রাত করতেন। অর্থাৎ নবী রমযান মাসে দান-খয়রাতের পরিমাণ এতই বৃদ্ধি করতেন যে, বর্ণনাকারী তাঁর দান-খয়রাতের আধিক্যকে ঝড়ো হওয়ার গতিবেগের সাথে তুলনা করেছেন। রমযান মাসে নবী-এর অধিক দান-খয়রাত করার কারণ হচ্ছে, ঐ পবিত্র মাসে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাদের উপর অপরিসীম দয়া ও কৃপা করে থাকেন। তাঁর রিযিক তাদের উপর অবারিত করে দেন। রোযাদারদের সকল কর্মকাণ্ডের বিনিময় এই পবিত্র মাসের কারণে দশগুণ থেকে সত্তর গুণ পর্যন্ত বেশি প্রদান করেন। এ মাসে একবার কুরআন খতম করলে সত্তরবার কুরআন খতম করার সওয়াব পাওয়া যায়। এক রাকআত নফল সালাত পড়ার সওয়াব সত্তর রাকআত পড়ার সমান হয়। এক পয়সা ব্যয় করার সওয়াব সত্তর পয়সা ব্যয় করার সমান হয়। এ ছাড়া আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর অসীম কৃপায় রোযাদার বান্দাদের পেছনের সমস্ত গুনাহ্ও মাফ করে দেন। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রমযান মাসের শেষ রাতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রোযাদার বান্দাদের ক্ষমা ঘোষণা করেন। তাই আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা ও আল্লাহ্ এই দানশীলতার গুণটি রপ্ত করতেন এবং অন্যদেরকেও রপ্ত করার নির্দেশ দিতেন। বর্ণিত আছে )تَخَلَّفُوْا بِأَخْلَاقِ اللَّهِ( )তোমরা আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হও)। তাই আল্লাহ্ গুণাবলি নিজের মধ্যে সৃষ্টি করা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনার প্রমাণ। আল্লাহ্ আমাদেরকে তাঁর প্রদর্শিত পথে সঠিকভাবে চলার তাওফীক দান করুন।
٨٤ عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَجُلاً أَتَى النَّبِيُّ ﷺ فَسَأَلَهُ فَأَعْطَاهُ غَنَمًا بَيْنَ جَبَلَيْنَ فَأَتَى الرَّجُلُ قَوْمَهُ ، فَقَالَ أَسْلِمُوا فَإِنَّ مُحَمَّدًا يُعْطِى عَطَاء رَجُلٍ مَا يَخَافُ فَاقَةً .
৮৪. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত যে, জনৈক ব্যক্তি নবী -এর নিকট এসে (আর্থিক সাহায্য) প্রার্থনা করলো। তিনি তাকে দুই পাহাড়ের মধ্যকার সব বকরী দান করলেন। তখন ঐ ব্যক্তি তার গোত্রের মধ্যে এসে বললো, হে লোক সকল! তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো। কেননা, মুহাম্মদ সেই ব্যক্তির ন্যায় দান করে থাকেন, যার দারিদ্রের কোনো আশংকা নাই।
ফায়দা : এই রিওয়ায়াতটিই মিশকাত শরীফে হযরত আনাস (রা) থেকে এই ভাষায় বর্ণিত হয়েছে : জনৈক ব্যক্তি নবী -এর নিকট দুই পাহাড় সমান ছাগ প্রার্থনা করলো। তিনি তা তাকে দান করলেন। তখন ঐ ব্যক্তি তার গোত্রে এসে বললো, হে আমার গোত্র! তোমরা সবাই মুসলমান হয়ে যাও। আল্লাহ্র কসম! মুহাম্মদ এতই দান করেন যে, নিজে দরিদ্র হয়ে যাওয়ারও ভয় করেন না।
শামায়েলে তিরমিযীতে হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ্ কখনো কোনো বন্ধু (ভবিষ্যতের জন্য) সঞ্চয় করে রাখতেন না। (বরং তৎক্ষণাৎ সাহাবাদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন)।
এই হাদীসগুলো থেকেই নবী -এর বদান্যতা ও দানশীলতা সম্পর্কে অনুমান করা যায়। কেননা যে যত চাইত তিনি তাকে তা দান করতেন। কখনো প্রার্থনাকারীকে তাঁর নামে ঋণ নিয়ে প্রয়োজন মিটানোর অনুমতি দিতেন। যেমন সামনের হাদীসসমূহে বিধৃত হয়েছে। নবী -এর এই বদান্যতার পরাকাষ্ঠা ও আল্লাহ্র উপর পূর্ণ ভরসায় বিস্মিত হয়ে ঐ প্রার্থনাকারী তার গোত্রকেও ঈমান ও ইসলামের দাওয়াত দেয় এবং নিজেও ঈমান আনে।
এক হাদীসে হযরত ইবন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত আছে, নবী বলেন : ঈর্ষা কেবল দুই ব্যক্তির উপর হতে পারে। এক. সেই ব্যক্তি—যাকে আল্লাহ্ তা'আলা ধন-সম্পদও দিয়েছেন এবং তাকে ঐ সম্পদ আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করারও তাওফীক দিয়েছেন। দুই. সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ্ তা'আলা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা দান করেছেন এবং সে তা দ্বারা নিজেও পরিচালিত হয় এবং অপরকেও তা শিক্ষা দেয়। (রিয়াদুস্-সালিহীন)
অন্য এক হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, নবী বলেছেন : প্রত্যহ সকাল বেলা যখন আল্লাহ্র বান্দা নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয়, তখন তার সাথে দু'জন ফিরিশতাও আসমান থেকে অবতরণ করেন। তাদের একজন বলেন, হে আল্লাহ্! ব্যয়কারী, দানশীল ও দাতা ব্যক্তিকে তার বিনিময় দান করো। দ্বিতীয় ফিরিস্তা বলেন, হে আল্লাহ্! বখীল ও কৃপণ ব্যক্তির সম্পদে তুমি ধস নামাও। (বুখারী ও মুসলিম)
অপর এক হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। নবী বলেন : আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন : হে আদাম সন্তান! তুমি আল্লাহ্র সৃষ্টির জন্য ধন-সম্পদ ব্যয় করো, তোমার জন্যও আল্লাহর পক্ষ থেকে ব্যয় করা হবে। (রিয়াদুস্-সালিহীন)।
٨٥ عَنْ عُمَرَ بْنِ عَبْدِ اللهِ مَوْلَى غَفْرَةَ حَدَّثَنِي إِبْرَاهِيمَ ابْنُ مُحَمَّدٍ مِنْ وُلِدَ عَلِيِّ قَالَ كَانَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ إِذَا وَصَفَ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ كَانَ أَجْوَدَ النَّاسِ كَفَّا وَأَجْرَأَ النَّاسِ صَدْرًا وَأَصْدَقَ النَّاسِ لِهْجَةً وَأَوفَاهُمْ بِذِمَّةٍ، وَأَلْيَنَهُمْ عَرِيكَةً وَاكَرَمَهُمْ عِشْرَةً، مَنْ رَاهُ بَدِيهَةً هَابَهُ، وَمَنْ خَالَطَهُ فَعَرَفَهُ أَحَبَّهُ لَمْ أَرَ قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ مِثْلَهُ -
৮৫. হযরত গাফারা (রা) এর মাওলা (আযাদকৃত গোলাম) উমর ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার কাছে ইব্রাহীম ইন মুহাম্মদ (যিনি হযরত আলী (রা)-এর বংশধর) হাদীস বর্ণনা করেন যে, হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) যখন নবী-এর (সুন্দরতম) গুণাবলি বর্ণনা করতেন, তখন বলতেন যে, তিনি সবচেয়ে উদার হস্ত, সবচেয়ে সাহসী-হৃদয়, সবচেয়ে সত্যভাষী, সবচেয়ে ওয়াদা পালনকারী, সবচেয়ে নম্র-স্বভাব এবং সবচেয়ে ভদ্র জীবন যাপনকারী ছিলেন। যে ব্যক্তি হঠাৎ তাঁকে দেখত তার মনে ভীতির সঞ্চার হতো এবং যে ব্যক্তি তাঁর সাহচর্য লাভ করতো ও তাঁর অতুলনীয় স্বভাব সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হতো, সে তাঁকে ভালবাসতে শুরু করতো। আমি তাঁর পূর্বে কখনো তাঁর মতো (সর্বগুণে গুণান্বিত) মানুষ দেখিনি এবং তার পরেও দেখিনি।
ফায়দা : হযরত আলী (রা)-এর এ হাদীস পূর্বের একটি হাদীসের আওতায় বর্ণিত হয়েছে। এখানে হাদীসের কিছু কথা পূর্বোক্ত হাদীস অপেক্ষা বেশি বর্ণিত হয়েছে, যা নবী -এর মহৎ গুণাবলি ও উন্নত চরিত্রাবলি ব্যাখ্যা করছে। এসব অনুপম গুণ ও চরিত্রাবলি আয়ত্ত করা আমাদের প্রাথমিক কর্তব্য। নবী-এর পূর্ণ আনুগত্যের মূল কথাই হচ্ছে তাঁর সুমহান গুণাবলি ও সমুন্নত চরিত্রাবলিকে নিজের মধ্যে সৃষ্টি করা, তাঁর পবিত্র জীবন ও প্রশংসিত চরিত্র অনুসরণ করা। আল্লাহ্ পাক আমাদের সবাইকে পূর্ণভাবে তাঁর পদাংক অনুসরণ করার এবং তাঁর সর্বাঙ্গীণ অনুগত ও অনুসারী হওয়ার এবং তাঁর গুণাবলি ও সুন্দরতম চরিত্রাবলি নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি করার তাওফীক দান করুন।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِى اللهُ عَنْهُ قَالَ لَمْ يُسْئَلُ رَسُولُ اللهِ ﷺ شَيْئًا قَطُّ عَلَى الْإِسْلَامِ إِلَّا أَعْطَاهُ وَإِنَّ رَجُلاً أَتَاهُ فَسَأَلَهُ فَأَعْطَاهُ غَنَمًا بَيْنَ جَبَلَيْنِ فَرَجَعَ إِلَى قَوْمِهِ فَقَالَ أَسْلِمُوا فَإِنَّ مُحَمَّدًا يُعْطِي عَطَاءُ مَا يَخْشَى فِيْهِ الْفَاقَةً -
৮৬. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ এর নিকট ইসলামের নামে যখনই কোনো বস্তু চাওয়া হয়েছে, তিনি তা অবশ্যই প্রদান করেছেন। একবার এক ব্যক্তি এসে তাঁর নিকট প্রার্থনা করলো। তিনি তাকে ছাগলের একটি পূর্ণ পালই প্রদান করলেন, যা দুই পাহাড়ের মাঝখানে ছড়িয়ে ছিল। তারপর ঐ ব্যক্তি তাঁর গোত্রের মধ্যে ফিরে গিয়ে বললো, (হে আমার গোত্র) তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো। কেননা মুহাম্মদ এমনভাবে দান করেন যে, তারপর দারিদ্র্যের কোনো আশংকাই থাকে না।
ফায়দা : এ হাদীসটিও সামান্য পরিবর্তনসহ ইতিপূর্বে একটি হাদীসের আওতায় বর্ণিত হয়েছে। এ হাদীস থেকে নবী-এর পরম দানশীলতা অনুমান করুন। তিনি কতবড় দানশীল ও দাতা ছিলেন তা এর দ্বারাই পরিমাপ করা যায়। নবী-এর দান ও বশিশের এই অবস্থা ছিল সর্বব্যাপী। যে কেউ তাঁর দরবারে ইসলামের নামে আঁচল পেতে দিতো, যে তার প্রার্থিত বস্তু দ্বারা আঁচল পূর্ণ করে ফিরে যেতো এবং সাথে সাথে তাঁর ঔদার্য ও আল্লাহ্র উপর পূর্ণ ভরসা দেখে তার ঈমান আরো মযবুত হয়ে যেতো। সে তার কাওম ও গোত্রকে এরূপ মূর্তিমান দানশীল ও উদার নবীর দীন কবুল করার উপদেশ দিতো। সত্য বলতে কি, দুনিয়ায় চারিত্রিক শক্তি এমন কিছু করে দেখতে পারে যা সামরিক শক্তি কখনো দেখতে পারে না। চরিত্রই হচ্ছে সেই হাতিয়ার যা দ্বারা চরম ঔদ্ধত্য ও বিদ্রোহী অন্তর বশ করা যায়। একথা মোটেই সত্য নয় যে, তলোয়ার দ্বারা ইসলাম দুনিয়ায় বিস্তার লাভ করেছে। বরং ইসলাম সত্য নবীর (আমার মাতা-পিতা তাঁর জন্য উৎসর্গিত হোক) সুমহান চরিত্র ও সমুন্নত গুণাবলির আধ্যাত্মিক শক্তি দ্বারা বিশ্ব-ধর্মে পরিণত হয়েছে, যার বহু জীবন্ত উদাহরণ ইসলামের ইতিহাসে বিধৃত আছে।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّ النَّبِيُّ كَانَ لَا يُسْئَلُ شَيْئًا إِلَّا أَعْطَاهُ
৮৭. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত যে, নবী-এর নিকট যে বস্তুই প্রার্থনা করা হতো, তিনি তা দান করতেন।
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ مَا سُئِلَ رَسُولُ اللهِ ﷺ شَيْئًا قَطُّ قَالَ لَا -
৮৮. হযরত জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ -এর কাছে কিছু চাওয়া হয়েছে এবং তিনি তা দেননি-এরূপ কখনো হয়নি।
. عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ لَا يَقُولُ لِشَيْ يُسْأَلُ لا -
৮৯. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী-এর নিকট কোনো কিছু চাওয়া হলে তিনি 'না' বলতেন না।
فَمَنَعَهُ عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ مَاسُئِلَ النَّبِيُّ شَيْئًا قَطُّ
৯০. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর নিকট কোনো বস্তু প্রার্থনা করা হয়েছে এবং তিনি তা নিষেধ করেছেন এরূপ কখনো হয়নি।
ফায়দা: উপরোক্ত চারটি হাদীসের বিষয়বস্তু একই। এগুলো থেকে বোঝা যায় যে, প্রার্থনাকারীর প্রার্থনা ও অভাবগ্রস্তের অভাব পূরণ করা ছিল নবী -এর প্রকৃতি ও স্বভাবের অন্তর্গত। তিনি কাউকে শূন্য হাতে ও নিরাশ করে ফিরিয়ে দেননি। কখনো মুখে 'না' শব্দ উচ্চারণ করেননি। তাঁর এই গুণের কথাই এক আরব কবি এভাবে উল্লেখ করেছেন-
مَا قَالَ لا قَطُّ إِلا فِي تَشَهُدِهِ + لَوْلاَ التَّشَهُدُ كَانَتْ لَاؤُهُ نَعَمْ -
"কালিমা শাহাদত ছাড়া তিনি কখনো 'লা' (না) বলেননি। কালিমা শাহাদত যদি না হতো তবে তাঁর 'লা' (না)-ও নাআম (হ্যাঁ) হয়ে যেত।" এই মর্মই ফারসী কবি নিম্নোক্ত চরণে ব্যক্ত করেছেন:
نزفت لا بزبان مباركش هركز + مكربه اشهد ان لا اله الا الله
"তাঁর যবান মুবারকে কখনো 'না' শব্দ উচ্চারিত হয়নি। যদি হয়ে থাকে, তবে তা হয়েছে কালিমা শাহাদত "أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ" -এর মধ্যে।"
নবী -এর বদান্যতার ক্ষেত্রে পরিমাণের কোনো প্রশ্ন ছিল না। তিনি ছোট-বড় সব চাওয়া পূরণ করতেন। যেমন পূর্বোক্ত এক হাদীস থেকে জানা যায় যে, জনৈক ব্যক্তি যখন দুই পাহাড়ের উপত্যকাপূর্ণ বক্রীর পাল প্রার্থনা করলো, তখন তিনি তাও দান করে দেন। তাঁর কাছে যদি এর চেয়েও বেশি চাওয়া হতো, তবে তিনি তাও দিয়ে দিতেন। নবী -এর এই বদান্যতা তো ছিল কেউ কিছু প্রার্থনা করার সময়। কিন্তু তাঁর নিকট যখন কোথাও থেকে কোনো সম্পদ আসতো, তখন তিনি প্রার্থনা ছাড়াই পাওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তিকে ডেকে ডেকে প্রদান করতেন। তিনি কখনো সম্পদ সঞ্চয় করে রাখতেন না। বরং সত্বর তা বণ্টন করে দিতেন। হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, একবার নবী -এর নিকট বাহরাইন থেকে বেশ কিছু মালপত্র এলো। তিনি বললেন, ওগুলো মসজিদের আঙ্গিনায় বিছিয়ে দাও। এর পূর্বে এত সম্পদ তাঁর নিকট কখনো আসেনি। (বুখারী)
তিনি এই সমুদয় সম্পদ সাহাবাদের মধ্যে বিতরণ করলেন। বিতরণের পর তাঁর নিকট একটি দিরহামও অবশিষ্ট ছিল না। দানশীলতা ছিল নবী -এর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু এবং কৃপণতা ছিল সবচেয়ে ঘৃণ্য ব্যাপার। এক হাদীসে হযরত ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন, আমি নবী -কে বলতে শুনেছি, বদান্যতা আল্লাহ্ তা'আলার সবচেয়ে বড় সৃষ্টি। (তারগীব ও তারহীব)।
হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, নবী বলেছেন: জান্নাতে এমন একটি ঘর আছে, যার নাম 'বায়তুস্ সাখা' দান-নিকেতন (তারগীব)। কৃপণতার অপনিন্দায় নবী -এর বহু হাদীস বর্ণিত রয়েছে। এক হাদীসে হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, নবী বলেছেন: জুলুম থেকে আত্মরক্ষা করো, কেননা জুলুম কিয়ামতের দিন ঘনঘোর অন্ধকাররূপে আত্মপ্রকাশ করবে। আর কৃপণতা থেকে দূরে থাকো, কেননা কৃপণতাই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ধ্বংস করেছে। তাদেরকে রক্তারক্তি করতে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং হারামকে হালাল করতে তাদেরকে উৎসাহ যুগিয়েছে (রিয়াদুস্-সালিহীন)। বস্তুত কৃপণতা এমন এক কুঅভ্যাস ও ধ্বংসাত্মক হীন কাজ, যা সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রকে কলুষিত করে। কৃপণের কারণেই সমাজে ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়। পরস্পরে অনৈক্য ও মনোমালিন্য দেখা দেয়। গোটা সমাজ বিপর্যস্ত হয়। কৃপণতার কারণেই গরীব, মিস্কীন, ভিক্ষুক, অভাবগ্রস্ত, অসহায় ও বেকার লোকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। আর এভাবে গোটা জাতির অবস্থা মন্দ থেকে মন্দতর হতে থাকে। তাছাড়া সাহায্য-সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার দরুন এই লোকগুলোই সমাজে অপরাধ ও বিপর্যয় সৃষ্টির কারণ হয়। ব্যক্তি হিসাবে কৃপণের কার্পণ্য ও ঐশ্বর্য প্রীতির দরুন বন্ধু-বান্ধবের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে বাধ্য হয়। সামান্য সম্পদের জন্য সে লড়াই করতে ও জীবন দিতে প্রস্তুত হয়। ফলে পরস্পরের মধ্যে দুশমনী ও শত্রুতার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। রক্তারক্তি পর্যন্ত পরিস্থিতি গড়ায়। কৃপণতার এই নিন্দনীয় ও অনিষ্টকর স্বভাব থেকে আল্লাহ্ সকল মুসলিমকে রক্ষা করুন। আমাদের নবী ও এই কুস্বভাব থেকে মহান আল্লাহ্ আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, নবী হরমামেশা এই দু'আ করতেন: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُبِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحُزْنِ وَأَعُوْذُبِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالكَسَلِ وَأَعُوْذُبِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ -
হে আল্লাহ্! আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি দুঃসহ চিন্তা ও সন্তাপ থেকে। আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি অসামর্থ্য ও আলস্য থেকে। তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি কাপুরুষতা ও কৃপণতা থেকে।
۹۱ عَنْ هَارُونَ بْنِ رِيَابِ قَالَ قَدِمَ عَلَى النَّبِيُّ ﷺ سَبْعُونَ أَلْفَ دِرْهَم وَهُوَ أَكْثَرُ مَالٍ أُتِيَ بِهِ قَطُّ، فَوَضَعَ عَلَى حَصِيرٍ ثُمَّ قَامَ إِلَيْهَا يَقْسِمُهَا فَمَا رَدَّ سَائِلاً حَتَّى فَرَغَ مِنْهُ -
৯১. হযরত হারুন ইন্ন রিয়াব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার নবী-এর নিকট সত্তর হাজার দিরহাম এলো। ইতিপূর্বে এত বেশি অর্থ আর কখনো তাঁর কাছে আসেনি। তিনি তা চাটাইয়ের উপর রেখে বণ্টন করা শুরু করলেন। কোনো প্রার্থনাকারীকেই তিনি (শূন্য হাতে) ফিরিয়ে দেননি। (এমনিভাবে) সম্পূর্ণ অর্থই তিনি বণ্টন করে দেন।
ফায়দা: নবী -এর অভ্যাস ছিল, যখনই কোথাও থেকে তাঁর নিকট কোনো অর্থ-সম্পদ আসতো, তিনি সঙ্গে সঙ্গে সে খবর প্রচার করে দিতেন। দরিদ্র ও অভাবীদের ডেকে তিনি তা তৎক্ষণাৎ বণ্টন করে দিতেন। নিজের কাছে কখনো জমা করে রাখতেন না। অনেক সময় এমনও হতো যে, প্রচার করে বিতরণ করা সত্ত্বেও কিছু সম্পদ অবশিষ্ট থেকে যেতো। তার হদাব ও গ্রহণকারী কেউ থাকতো না। তখন তিনি খুব কষ্ট ও অস্বস্তি বোধ করতেন; অস্থির ও ব্যাকুল হয়ে পড়তেন। সম্পূর্ণ সম্পদ বণ্টন না করা পর্যন্ত তিনি স্বস্তি লাভ করতেন না। এক হাদীসে হযরত উম্মু সালামা (রা) বলেন, একবার নবী বিমর্ষ অবস্থায় গৃহে আগমন করেন। উম্মু সালামা (রা) জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি চিন্তিত কেন? তিনি বললেন, গতকাল যে সাতটি দীনার এসেছিল, সন্ধ্যা পর্যন্ত তা আমার বিছানায় পড়ে আছে। কোনো গ্রহণকারী পাওয়া যায়নি (মুসনাদে আহমাদ)।
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ النَّبِيُّ وَ لَا يُسْئَلُ شَيْئًا فَيَمْنَعُهُ -
৯২. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী -এর নিকট যখনই কোনো কিছু চাওয়া হতো, তিনি তা প্রদান করতেন, নিষেধ করতেন না।
۹۳ . عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ أَبِي بَكْرٍ عَنْ بَعْضٍ بَنِي سَاعِدَةَ قَالَ سَمِعْتُ أَبَا أسَيْدٍ مَالِكِ ابْنِ رَبِيعَةَ يَقُولُ كَانَ النَّبِيُّ لَا يَمْنَعُ شَيْئًا يُسْئَلُ -
৯৩. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবূ বাকর (রা) বানূ সাঈদার জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন যে, আমি আবূ উসাইদ মালিক ইবন রাবীআ (রা)-কে বলতে শুনেছি, নবী-এর নিকট যে জিনিসই চাওয়া হতো, তিনি তা দিতে অস্বীকার করতেন না (বরং দিয়ে দিতেন)।
٩٤. عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ كَانَ الْمُسْلِمُونَ لَا يَنْظُرُونَ إِلَى أَبِي سُفْيَانَ وَلَا يُقَاعِدُونَهُ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ ثَلَاثُ أَعْطِيْهُنَّ، قَالَ نَعَمْ قَالَ عِنْدِي أَحْسَنُ الْعَرَبِ وَاجْمَلُهُ أُمُّ حَبِيْبَةَ أَزَوِّجُكَمَا قَالَ نَعَمْ، قَالَ وَمُعَاوِيَةَ تَجْعَلُ كَاتِبًا بَيْنَ يَدَيْكَ قَالَ نَعَمْ، وَتُؤْمِرُنِي حَتَّى أَقَاتِلَ الْكُفَّارَ كَمَا قَاتَلْتُ الْمُسْلِمِينَ قَالَ نَعَمْ، قَالَ أَبُو زَمَيْلٍ وَلَوْلَا أَنَّهُ طَلَبَ ذَلِكَ مِنَ النَّبِيِّ مَا أَعْطَاهُ لِأَنَّهُ لَمْ يَكُنْ يُسْئَلُ شَيْئًا قَطُّ إِلَّا قَالَ نَعَمْ .
৯৪. হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুসলিম জনতা হযরত আবু সুফিয়ান (রা)-কে (তাঁর কাফির থাকাকালে মুসলমানদের সাথে চরম শত্রুতা করার কারণে) সুনযরে দেখতেন না। তাঁর সাথে উঠাবসাও করতেন না। একবার আবু সুফিয়ান (রা) বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমাকে তিনটি বিশেষ (মর্যাদা) দান করুন। তিনি বললেন, বেশ ভালো (বলো, তা কি?) আবূ সূফিয়ান (রা) বলেন, আমার কন্যা উম্মু হাবীবা (রা) আরবের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী ও রূপসী রমণী। আমি তাকে আপনার নিকট বিবাহ দিলাম। (আপনি কবুল করুন) তিনি বললেন, বেশ ভালো। তারপর তিনি [আবু সুফিয়ান (রা) বললেন, মুআবিয়াকে আপনি আপনার পেশকার বানিয়ে নিন। তিনি বললেন, বেশ তাই করা হলো। এরপর তিনি [আবূ সুফিয়ান (রা)) বললেন, আপনি আমাকে কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য সেনাপতি (আমীরুল হাব) বানিয়ে দিন। যাতে আমি পূর্বে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যেরূপ যুদ্ধ করেছিলাম, এখন কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তার প্রায়শ্চিত্ত করতে পারি। নবী বললেন, বহুত আচ্ছা। তিনি তাঁকে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বাহিনীর অধিনায়ক বানিয়ে দিলেন। আবূ যামীল (র) বলেন, আবূ সুফিয়ান (রা) যদি নবী-এর নিকট ঐগুলো প্রার্থনা না করতেন, তবে তিনি তা তাঁকে আদৌ দান করতেন না। কিন্তু কথা হচ্ছে, নবী-এর নিকট কেউ কোনো জিনিস প্রার্থনা করলে তিনি তা তাকে দান করতেন। অস্বীকার করতেন না।
ফায়দা: এ হাদীস সামান্য পরিবর্তনসহ মুসলিম শরীফে আবূ সুফিয়ানের মর্যাদা ও গুণাবলি অনুচ্ছেদে উল্লিখিত হয়েছে। কিন্তু এ হাদীসের প্রথম অংশ সম্পর্কে হাদীস-বিশেষজ্ঞগণের চরম আপত্তি রয়েছে। আর তা হচ্ছে সকল ঐতিহাসিক এ ব্যাপারে একমত যে, হযরত আবূ সুফিয়ান (রা) ৮ হিজরীতে মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন। আর নবী-এর সাথে উম্মুল মু'মিনীন হযরত উম্মু হাবীবা (রা)-এর বিবাহ হয়েছিল তার বহু আগে ৬ হিজরী (মতান্তরে ৭ হিজরীতে)। তখন আবু সুফিয়ান মুসলমানও হননি। সুতরাং এ সময় হযরত আবু সুফিয়ান (রা) কর্তৃক তাঁর কন্যা উম্মু হাবীবাকে বিবাহের জন্য নবী-এর নিকট পেশ করা কোনোক্রমেই সঠিক হতে পারে না। কোনো কোনো আলিম লিখেছেন, মূলত হযরত আবু সুফিয়ান (রা) নবী-এর কাছে এই প্রস্তাব করেছিলেন ইসলাম গ্রহণের পরে স্বীয় সন্তোষ প্রকাশের মানসে। যেনো এ সময়ে তিনি স্বীয় সম্মতি জ্ঞাপনার্থে নতুনভাবে নবী-এর কাছে প্রস্তাব করছেন। যা হোক, হাদীসটির সনদ দুর্বল। এ হাদীস বর্ণনা করা দ্বারা গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে নবী-এর বদান্যতা ও দানশীলতা বর্ণনা করা। নবী আবু সুফিয়ানের মতো ইসলামের শত্রুকেও ইসলাম গ্রহণের পর গৌরব ও মর্যাদা দান করতে কার্পণ্য করেননি। এ কারণেই এ হাদীসটি গ্রন্থকার তাঁর কিতাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। যেনো নবী -এর দরবার থেকে ধনসম্পদের মতো মান- মর্যাদাও অকাতরে দান করা হতো।
٩٥ عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَجُلًا أَتَى النَّبِيَّ وَ يَسْأَلُهُ فَقَالَ مَا عِنْدِي شَيْ وَلَكِنْ ابْتَعْ عَلَى فَإِذَا جَاءَنَا شَيْ قَضَيْنَاهُ - قَالَ عُمَرُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا كَلَّفَكَ اللَّهُ مَا لَا تَقْدِرُ عَلَيْهِ قَالَ فَكَرِهَ النَّبِيُّ فَقَالَ رَجُل أَنْفِقْ وَلَا تَخَفْ مِنْ ذِي الْعَرْشِ اقْلاَلاً، فَتَبَسَّمَ النَّبِيُّ ﷺ وَعُرِفَ السَّرُورُ فِي وَجْهِهِ -
৯৫. হযরত উমর ইবন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত, একবার কোনো এক (অভাবী) লোক নবী-এর নিকট এসে (আর্থিক সাহায্য) প্রার্থনা করলো। তিনি বললেন, আমার নিকট এ মুহূর্তে কিছু নেই। তুমি আমার নামে কিনে নাও। আমার কাছে যখন কিছু আসবে তখন তা আমি পরিশোধ করে দেবো। হযরত উমর (রা) বলেন, (এ কথা শুনে) আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আল্লাহ্ আপনাকে সাধ্যের অতীত কোনো কাজ করার নির্দেশ দেননি। বর্ণনাকারী বলেন, নবী হযরত উমরের এ কথা পছন্দ করলেন না। তখন অন্য এক সাহাবী বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি দেদার খরচ করুন এবং আরশের মালিকের পক্ষ থেকে স্বল্পতার আশংকা একেবারেই করবেন না। নবী (এই সাহাবীর কথা খুব পছন্দ করলেন এবং) মুচকি হাসলেন। তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডলে তখন আনন্দের চিহ্ন ফুটে উঠলো।
ফায়দা: এ হাদীস থেকেও নবী-এর বদান্যতা ও দানশীলতার পরাকাষ্ঠা অনুমিত হয়। তাঁর কাছে কিছুই নেই; তা সত্ত্বেও তিনি প্রার্থনাকারীকে দান করতে অস্বীকার করলেন না, তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিলেন না। বরং অন্যের নিকট থেকে ধার করে তার প্রয়োজন পূরণ করতে বললেন এবং সে ধার নিজে পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। কোনো প্রার্থনাকারীকেই শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেয়া তিনি পছন্দ করতেন না। তাঁর দান ও বদান্যতা হযরত উমর (রা)-এর মতো সুবিখ্যাত সাহাবীর পরামর্শ ও অভিমতের উপর প্রাধান্য পেল। দানের ব্যাপারে নবী হযরত উমর (রা)-এর পরামর্শও মেনে নেননি বরং একজন সাধারণ সাহাবীর কথা পছন্দ করেন। দানের সপক্ষে মত প্রকাশ করায় একজন সাধারণ সাহাবীর কথায় তিনি উৎফুল্ল হন।
٩٦ عَنْ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمُ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّهُ قَالَ بَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ وَمَعَهُ النَّاسُ مَقْفَلَهُ مِنْ حُنَيْنِ عَلَقَتِ الأَعْرَابُ يَسْأَلُونَهُ حَتَّى اضْطَرُّوهُ إِلَى سُمُرَةٍ فَخَطِفَتْ رِدَاءَهُ فَوَقَفَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَقَالَ أَعْطُونِي رِدَانِي، لَوْ كَانَ لِي عَدَدُ هُذِهِ الْعِضَاءِ نَعَمًا لَقَسَمْتُهُ بَيْنَكُمْ ثُمَّ لاَ تَجِدُوْنِي بَخِيْلاً وَ لَا كَذَّابًا ولَا جَبَانًا -
৯৬. হযরত জুবায়র ইন্ন মুতইম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ লোকদের সাথে হুনাইনের যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। তখন কিছু গ্রামীণ লোক তাঁকে জড়িয়ে ধরলো এবং (আর্থিক) সাহায্য প্রার্থনা করলো। এমনকি তারা তাঁকে ঠেলে একটি কণ্টকময় বৃক্ষের কাছে নিয়ে গেলো এবং তাতে তাঁর চাদরখানা আটকে গেলো। তখন রাসূলুল্লাহ্ থেমে গেলেন এবং বললেন, আমার চাদরটি আমাকে দিয়ে দাও। যদি আমার কাছে এখন এই কাঁটাযুক্ত বৃক্ষের কাঁটা সংখ্যক জন্তু (চতুষ্পদ প্রাণী) থাকতো, তবে আমি তাও তোমাদের মধ্যে বিতরণ করে দিতাম। এ ব্যাপারে তোমরা আমাকে কৃপণ দেখতে পেতে না এবং (ওয়াদা করার ক্ষেত্রে) মিথ্যুক ও (ব্যয় করার ব্যাপারে ভীত ও) কাপুরুষও দেখতে না।
ফায়দা : এ হাদীস হুনাইন যুদ্ধ সম্পর্কিত। নবী হুনাইন যুদ্ধে যে সম্পদ লাভ করেছিলেন, তা সাহাবাদের মধ্যে বণ্টন করে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। তখন তাঁর নিকট অবশিষ্ট কিছুই ছিল না। পথিমধ্য গ্রামীণ লোকেরা অজ্ঞতাবশত এসে তাঁকে ঘিরে ধরলো এবং আর্থিক সাহায্য প্রার্থনা করলো। নবী অপারগ ছিলেন। তিনি তাদেরকে জানালেন যে, যদি আমার কাছে এখন কোনো সম্পদ থাকতো, তবে আমি তোমাদেরকে অবশ্যই সাহায্য করতাম। সামান্যতম কার্পণ্য করতাম না।
۹۷ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي لَيْلى قَالَ سَمِعْتُ أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَيَّا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ يَقُولُ آتَيْتُ أَنَا وَفَاطِمَةُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا وَالْعَبَّاسُ وَزَيْدُ بْنُ حَارِثَةَ النَّبِيُّ ﷺ فَقَالَ الْعَبَّاسُ يَا رَسُولَ اللهِ : كَبِرَ سِنِّي وَرَقَ عَظَمِي رَأَيْتَ أَنْ تَأْمُرَ لِي بِكَذَا وَسَقَا مِنَ الطَّعَامِ فَافْعَلَ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَأَفْعَلُ، فَقَالَتْ فَاطِمَةُ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا يَا رَسُولَ اللهِ : إِنْ رَأَيْتَ أَنْ تَأْمُرْ لِي كَمَا أَمَرْتَ لِعَمِّكَ فَافْعَلْ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَأَفْعَلُ، فَقَالَ زَيْدُ ابْنُ حَارِثَةَ أَرْضًا كَانَتْ مَعِيشَتِي مِنْهَا ثُمَّ قَبَضْتَهَا فَإِنْ رَأَيْتَ أَنْ تَرُدَّهَا عَلَى فَافْعَلُ ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَأَفْعَلُ فَقُلْتُ أَنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنْ رَأَيْتَ أَنْ تُوَلِّيَنِي هُذَا الْحَقُّ الَّذِي جَعَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لَنَا فِي كِتَابِهِ مِنْ هَذَا الْخُمُسُ فَأَقْسِمْهُ فِي حَيَاتِكَ حَتَّى لَايُنَازِ عَنِيْهِ أَحَد بَعْدَكَ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَأَفْعَلُ ذَلِكَ فَوَلَانِيْهِ رَسُولُ اللهِ ﷺ -
৯৭. হযরত আবদুর রহমান ইব্ন আবূ লায়লা (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমীরুল মু'মিনীন হযরত আলী (রা)-কে বলতে শুনেছি, আমি, ফাতিমা, আব্বাস ও যায়দ ইবন হারিসা (রা) একবার নবী -এর নিকট হাযির হলাম। তখন আব্বাস (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার বয়স অনেক হয়েছে এবং আমার শক্তি খর্ব হয়ে গেলো। সুতরাং আপনি সঙ্গত মনে করলে আমার জন্য বায়তুল মাল থেকে এতো এতো ওয়াসাক খাদ্যশস্য দেয়ার নির্দেশ দিন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁর আবেদন মঞ্জুর করলেন এবং বললেন, আমি অবশ্যই তা করবো। এরপর ফাতিমা (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি আপনার চাচার জন্য যে নির্দেশ দিয়েছেন, সঙ্গত মনে করলে আমার জন্যও অনুরূপ সাহায্যের নির্দেশ দিন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁর আবেদনও মঞ্জুর করলেন এবং বললেন, আমি তোমার জন্যও তাই করবো। এরপর (তাঁর আযাদকৃত দাস পালক পুত্র) যায়দ ইবন হারিসা (রা) বলেন, আমার নিকট একখণ্ড জমি ছিল। তা দিয়ে আমার জীবিকা নির্বাহ হতো। আপনি আইনের বলে তা বাজেয়াপ্ত করেছেন। এখন আপনি যদি সঙ্গত মনে করেন, তবে সেই জমিটুকু আমাকে ফেরত দিন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁর আবেদনও মঞ্জুর করলেন এবং বললেন, আমি অবশ্যই তা করবো। হযরত আলী (রা) বলেন, তারপর আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি যদি সঙ্গত মনে করেন, তবে আমাকে বায়তুল মাল থেকে এক-পঞ্চমাংশ মালে গনীমতের অধিকার, যা আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর কিতাবে আমাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন-বণ্টন করার মুতাওয়াল্লী বানিয়ে দিন। তাহলে আমি তা আপনার জীবদ্দশায়ই বণ্টন করতে থাকবো এবং আপনার পরে এ ব্যাপারে আমার সাথে কেউ বিবাদে লিপ্ত হতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ্ তাঁর আবেদনও মঞ্জুর করলেন এবং বললেন, আমি তা অবশ্যই করবো। হযরত আলী (রা) বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ্ আমাকে ঐ এক-পঞ্চমাংশ বণ্টন করার নির্দেশ দান করেন।
ফায়দা : এ পূর্ববর্তী হাদীসসমূহে নবী-এর বদান্যতা সম্পর্কে বিশদ আলোচনা এসেছে। এ হাদীস থেকে বোঝা যায়, নবী যেরূপ অন্যদেরকে তাঁর বিপুল বদান্যতা ও দানশীলতা দ্বারা বিভূষিত করতেন, অনুরূপ তাঁর আত্মীয়-স্বজনের সাথেও দয়া-দাক্ষিণ্য প্রদর্শন করতেন-এটাই হচ্ছে আল্লাহ্ তা'আলার নির্দেশ। আর এ কারণেই তিনি তাঁর আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন এবং তাদেরকে ধন-সম্পদ দান করা ছিল তাঁর মহান চরিত্রের একটি বিশেষ গুণ। এ হাদীসে উল্লিখিত নবী-এর নিকট সাহায্য প্রার্থনার জন্য আগত ব্যক্তিগণ ছিলেন তাঁর আত্মীয়-স্বজন। হযরত আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিব (রা) তাঁর শ্রদ্ধেয় চাচা। হযরত ফাতিমা (রা) তাঁর কলিজার টুকুরা স্নেহের কন্যা। হযরত আলী (রা) তাঁর চাচাত ভাই ও স্নেহের জামাতা এবং হযরত যায়দ ইবন হারিসা (রা) নবী-এর প্রিয় সাহাবী ও আযাদকৃত গোলাম ও পালক পুত্র। এই ব্যক্তিগণ নবী -এর নিকট এসে নিজ নিজ প্রয়োজন তুলে ধরেন এবং তিনি তাঁর পরম ঔদার্য ও সহানুভূতিবশত তাঁদের সবার আবেদন মঞ্জুর করেন। কাউকেই শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেননি।
۹۸ عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ قَالَتْ أَنْشَدَ أَبُو بَكْرٍ قَوْلَ لَبِيْدٍ : أَخٌ لِي أَمَّا كُلُّ شَيْ سَأَلْتُهُ فَيُعْطَى وَأَمَّا كُلُّ ذَنْبٍ فَيَغْفِرُ : فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ هُكَذَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ
৯৮. হযরত আসমা বিন্ত আবূ বক্স (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার (হযরত) আবূ বক্স সিদ্দীক (রা) কবি লবীদ (রা)-এর এই পংক্তি দু'টি আবৃত্তি করলেন:
أَخٌ لِي أَمَّا كُلُّ شَيْ سَأَلْتُهُ + فَيُعْطِي وَأَمَّا كُلُّ ذَنْبٍ فَيَغْفِرُ
"আমার এক ভাই আছে, আমি যদি তাঁর কাছে কিছু চাই, তিনি তা তৎক্ষণাৎ আমাকে দিয়ে দেন এবং সব দোষত্রুটি ক্ষমা কর দেন।" এবং বললেন, রাসূলুল্লাহ এ গুণেই গুণান্বিত ছিলেন।
ফায়দা : হযরত লবীদ (রা) জাহিলিয়াত যুগের বিখ্যাত কবিদের অন্যতম। তাঁর নাম লবীদ ইব্ন রাবীআ ইব্ন মালিক। বানু কিলাব প্রতিনিধি দলের সাথে তিনি নবী -এর দরবারে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি কাব্যচর্চা ত্যাগ করেন। (মাআরিফে ইব্ন কুতায়বা, পৃষ্ঠা-৩৩২)। অপর এক হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, নবী বলেন : লবীদের সবচেয়ে সত্য কবিতা হচ্ছে এটি :
الا كُلُّ شَيْ مَا خَلَا اللهُ بَاطِل + وَكُلُّ نَعِيمٍ لَا مَحَالَةً زَائِلُ -
জেনে রাখো, আল্লাহ্ ছাড়া সব জিনিসই বাতিল ও মিথ্যা আর দুনিয়ার সব নিয়ামতই নিশ্চিত বিলীয়মান। (বুখারী শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০৮)
নবী হযরত লবীদ (রা)-এর কবিতা খুব পছন্দ করতেন। কেননা, তাঁর কবিতায় প্রায়শ আল্লাহ্ তাওহীদ, রিসালাত, কিয়ামত, পুরস্কার, শাস্তি ইত্যাদি উল্লেখিত হতো।
গ্রন্থকার এ হাদীসটি নবী -এর দানশীলতা ও বদান্যতা অনুচ্ছেদে উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে, হযরত লবীদ (রা) তাঁর এই কবিতায় তাঁর মামদূহ বা প্রশংসিতের দানশীলতা ও বদান্যতার আলোচনা করেছেন। তাই হযরত আবূ বক্র (রা) এই কবিতাটি রাসূলুল্লাহ্ -এর উদ্দেশ্যে আবৃত্তি করেন। অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন যে, আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা দানশীলতা ও বদান্যতা গুণের এই মানদণ্ডে পুরোপুরি উত্তীর্ণ ছিলেন।
টিকাঃ
১. 'ওয়াসাক' একটি মাপের নাম, যা ষাট সা-এর সমান। সা হলো সাড়ে তিন সের। কারো কারো মতে 'ওয়াসাক' এক উট সমান বোঝাকেও বলা হয়।